আকিমুন রহমানের গল্প: একটি নিতান্ত রূপকথা


।।এক।।

এক দেশের এক মাসের নাম মাঘ। দেশের বেশিরটা গ্রাম, কমটা শহর। মাঘ মাসে, সেই দেশের গ্রামে গ্রামে, বেজায় শীত নামে! সীমাছাড়া শীত। তবে রক্ষা, শীতের দিন-কয়টা, একেবারে কম! আঙুলের কড়ায় গুনে ফেলা যায়- এমন কম। ওদিকে, পাতির পর পাতি ভরলেও ফুরাবে না এমন, এতো বেশি গরমের দিন ওইখানে, ওই দেশের গ্রামে। গ্রামের মানুষেরা জানে, ক্রোশ ক্রোশ পথ পেরুলে পরে, সকলের চেয়ে বড়ো শহরটাতে পৌঁছে যাওয়া যায়! যেতে যেতে যেতে - অনেক প্রান্তর, পথঘাট, গ্রামের পরে গ্রাম, আর কত দিন কত রাত্রি পার হলে পরে- সেই শহরটা আছে। সেখানেও শীত পড়ে। তবে সেই শীত কী তাদের শীতের মতোই কনকনে তব্দা ধরানো, না মিহি মোলায়েম হালকা পাতলা! তারা তা জানে না।কোন সেই পরদাদার আমল থেকেই-গ্রামের মানুষেরা- কখনো অই বিরাট শহরটাতে যায় না! দু’একজন মানুষ- দুএকবার-ছোটো শহরের সীমানা বরবার গিয়ে ফেরতও এসেছে! নিতান্ত গত্যন্তর ছিল না বলেই যেতে হয়েছে তাদের! তবে তারা গেছে-একেবারে গরমের দিনে! তারা তখন নিজেদের কাজ শেষ করা নিয়ে এতো হুড়াহুড়িতে থাকে যে, ওটা গরমের দিন না শীতের দিন- সেই হিসাবটা খেয়াল করারও ফুরসত পায় নাই। মানে মানে গ্রামে ফেরার তাড়া-তাগাদা নিয়ে তখন তারা কাজ সেরেছে, তারপর হুড়মুড় বাড়িতে ফিরে এসেছে!
 
কি সমস্যা শহরে?

কী সমস্যা?
 
শহরে রাজত্ব করে রাক্ষসেরা, আর এদিকে গ্রামে আছে বান-বাতাসের রাজত্ব! বান বাতাস আর রাক্ষসেরা- পুরা দেশটাকে দুইভাগে ভাগ করে নিয়ে রাজত্ব করে যাচ্ছে! বহু বহুদিন ধরে রাজত্ব করে যাচ্ছে! বহু বহু দিন হয়- গ্রামের মানুষ শহরে যায় না! শহরে না রাক্ষসেরা আছে! আর ওদিকে, গ্রামের কথা- শহরের মানুষের আর মনেই নেই। রাক্ষসেরা শহরে আছে। সম্ভবত তারা শুধু শহরেই থাকতে পছন্দ করে! বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, গ্রামে তাদের কখনো দেখা যায় নাই।
 
গ্রামেও হয়তো তারা আসে, কিন্তু চেহারা-সুরত বদলে হয়তো চেনাজানা মানুষের বেশ ধরে আসে। তাই হয়তো গ্রামের লোকে তাদের চিনতে পারে না!
 
বা, এই যে এতো বাউল-ফকির, যোগী-সন্ন্যাসী গ্রামের ঘরে ঘরে ভিখ মাগতে আসে! একের পর এক আসতেই থাকে! তারাই যে রাক্ষসেরা না সেইকথা কে বলতে পারে? হয়তো তারা ওইসব রূপ ধরে আসে, দোরে দোরে ভিখ মাগার নামে খর চোখ-কান নিয়ে লোকের সবকথা শোনে, তারপর হয়তো নিজের মতো করে চলে যায়। কার ঘরে কে জাগে? কোনো ঘরে কেউ জাগে না।
 
সকল গাঁয়ের ঘরে ঘরে লোকেরা কাজ-কাম করে, খায় দায়, ঘুমায়। আবার ঘুম থেকে ওঠে, নানা কষ্টের টানাটানিতে ছিঁড়ে-ফেঁড়ে যায়! এ ওরে দুশমণি করে, দুশমণি করে, ঝামেলার চক্করে ফেলে দেয়, ভোগায়! ভোগান্তিতে পড়ে, হাঁটে-চলে, কিন্তু কেউ জাগে না। জাগে না বলে- কারো মনে কখনো এই কথা হানা দেয় না যে, যাই, দেইক্ষা আসি গা তো রাক্ষসের রাজত্বির দ্যাশটা ! ক্যামনে রাজত্ব করতাছে তারা? মানুষের বেশ ধইরা, না নিজেগো আসল চেহারা নিয়া - রাজত্বি করতাছে? বিত্তান্তটা দেখি তো!
 
এই কথা কারো মনে- কোনোদিন আসে না। পরদাদার কড়ড়া নিষেধ আছে। থাকুক রাক্ষসেরা রাক্ষসের মোতন। তাগো খোঁজ নিয়া-গ্রামের লোকের কোন দরকার! আর, গ্রামের লোকের জীবনে কী জ্বালা-যন্ত্রণার কোনো শেষ আছে! গ্রামে বান-বাতাসের তুফান রাজত্বি চলে না? চলে! এই রাজত্বিতে দিনরাত সবসময়, শীত- গরম বারো মাস, কেবল না পোড়া-দগ্ধ হয়ে বেঁচে থাকতে হয়!
 
কখন কার ওপর যে বানবাতাসে ভর করবে, কারে যে কখন পানিতে চুবিয়ে শেষ করে রেখে যাবে, কে যে কখন ভোর রাতে চেনা মানুষের ডাক শুনে বেরিয়ে অচেনা বান-বাতাসের হাতে বেঘোরে জান খোয়াবে, কেউ জানে না! বান-বাতাসে সন্ধ্যারাতেই কার ঘাড় মটকে বিলের পাঁকে গুঁজে রাখবে কেউ বলতে পারে না!
 
পরদাদার কালে গ্রামের আতালে-চাতালে, পুকুরপাড়ে, উঠানের শেষ মাথায়- চালতা গাছের সীমাসংখ্যা ছিল না! তখন গ্রামে বানবাতাসের উৎপাতেরও কোনো শেষ ছিল না! এই কিনা বান-বাতাসে তমুকের ঝিকে ধরে নিয়ে- চালতা গাছের মগডালে তুলে রেখেছে! ওই কিনা অমুকের পুতের বৌরে নিয়ে গিয়ে- চৌচালা ঘরের চালের টুয়ায় বসিয়ে রেখেছে! এসব তখন ছিল নিত্য ব্যাপার!
 
তখন,অইসবকিছুর কোনোটাই যদি না হতো, তো অন্য আরেক উৎপাত-ঘটতোই ঘটতো! তখন হতো কী, সন্ধ্যা রাত থেকেই গ্রামের চালে চালে- বেধুম ঢিল পড়াপড়ির ব্যাপার-চলতেই থাকত চলতেই থাকত! লোকে তখন অই ঢিল্লার হামদাম সহ্য করে, না নিজেদের জান বাঁচায়! অইসবের মধ্যে তারা কোন পরাণেই বা ঘরে বাস করে! কীভাবে বাস করে!
 
তার ওপর অই পরদাদার আমলেই- গরম-শীত ভেদে আবার বানবাতাসের আজাবের ধরণও ছিল ভিন্ন! গরমের দিনে তা-পোড়া তা-পোড়া দগদগানিতে যখন লোকের প্রাণ ছটফট করতে থাকত, তখন কিনা বান-বাতাসে পাওয়া লোকে দেখো কী করতে থাকে! সে কিনা ছালা-কাঁথা মুড়ি দিয়ে দিয়ে শরীরের শীতের কম্প সামলানোর চেষ্টা দিতে থাকে!
 
শীতের দিনে বান-বাতাসে দেখো তখন- লোকেরে - অন্য কোন চরকি নাচন নাচায়ে চলে! এদিকে বেঘোর শীত! শীতের চোটে তখন লোকের দাঁতে দাঁত বাড়ি খাচ্ছে! হাড্ডি কনকনাচ্ছে! তখন দেখো বান-বাতাসলাগা মানুুষটায় কী করে! সে গিয়ে পুষ্কুনীতে নেমে থাকে! মধ্যরাত নাই,দিনের দুপুর নাই, সে খালি ডুবায় খালি ডুবায়! খালি সে ভিজাকাপড়ে গাছের আগার ডালে গিয়া বইসা থাকে! আর কতক্ষণ পর পর- খালি দাঁতি খাইতে থাকে! আহারে! তার তখন খাওয়া নাই, লওয়া নাই, হুঁশ নাই, লজ্জাশরম হায়াপর্দা, কিচ্ছুর কোনো তাল নাই!
 
সেই দূরকালে-সেই কোন পরদাদার দিনে- সেই যে যখন গ্রামে বেশুমার চালতা গাছ ছিল,তখন- এমনটাই হয়ে চলছিল! সেইসময়ে একজন তখন স্বপ্নে এই কথা পায় যে, যত অনিষ্টির মূলে আছে এই চালতা গাছগরানেরা! তারাই হইতাছে বানবাতাসের মূল আখড়া। চালতা গাছদের তুলে-মূলে নিপাত করো,জানে বাঁচবা!
 
তখন মুরুব্বিরা আর কী করে! তারা দল বেঁধে চালতাগাছদের খেদানী দিতে যায়! জনমকার মতন খেদানী দিতে যায়! ময়মুরুব্বিরা দোয়াকালাম পড়ে, ধুন্দুমার সোর-সাড়া তুলে- গ্রামের সকল চালতাগাছ ঝাড়ে-বংশে নির্বংশ করে। তাতে ভালো যতটা হয়, মন্দটা হয় তার দশ গুণ বেশি। আগে, দুষী গাছদের সীমানা-চৌহদ্দি না মাড়লে, বুঝে-শুনে মেনে-বেছে চললে, বান-বাতাসের সাধ্য ছিল না, কারো শরীরে এসে ভর করে! সকল চালতাগাছরে বিদায় দেওয়ার পরেও কিন্তু, বান-বাতাসে, গ্রামের ওপর থেকে তাদের রাজত্বি ছাড়ে না! চালতাগাছেরা নাই তো কী! থাকার জন্য জিনিসের কোনো অভাব আছে নাকি? তারা তারপর থেকে কেবল- হাওয়ায় হাওয়ায় উড়তে থাকে! তারপর থেকে, কেউই আর বলতে পারে না- কার ওপর কখন বান-বাতাসে আছর করবে! কোনখান থেকে আসবে তারা, ক্যামনে এসে ক্যামনে লোকের শরীরে ভর করে নেবে! আহহারে যন্ত্রণা!
 
বান-বাতাসের এইসব আজাব নিয়ে যখন গ্রামের লোকের জীবন-একেবারে পাতাপাতা, তখন কী তাদের শহরের কথা মনে আনার কোনো ফুরসত আছে? শহরের রাক্ষসের চেহারা-সুরত, কী রাজত্বি করার ধরণ-ধারণ নিয়ে চিন্তা করার হুঁশ কি আছে নাকি তাদের? গ্রামের লোকেরা কারোরই আর টাউনের রাক্ষসদের বিষয়-আশয় নিয়ে পড়ে থাকার উপায় নাই! এতো কোনো ঠেকাও নাই ! নিজেদের বানবাতাসের রাজত্বির- বিবিধ জ্বালা-যন্ত্রণায় তাদের জীবনই দেখো কেমন পোড়াপোড়া! থাকুক গা টাউনের রাক্ষসেরা! যেমনে ইচ্ছা থাকুক গা!
 
তার ওপর- এই এখনকার দিনের গ্রামে - গরমের কালে গরম আর শীতের দিনে শীতের - যেন কোনো লেখাজোখা নেই। এই শুকনা খা খা গরম চলতে থাকে, তো এই দপ করে- দাউদাউ দমকা গরম এসে- লোকের শরীরটারে পোড়ানো শুরু করে। তারবাদে হঠাৎই সেই পোড়ান্তি দিতে থাকা গরমটা নাই হয়ে যায়! তার জায়গায় এসে হাজির হয়- ভেজা ভেজা, পাত্থরের মতন ভারী, চিমসানো ভ্যাপসা জাতের এক গরম! সেইটায় এসেই লোকের শরীরে- চিমটি দিতে থাকে! ওরে বাপ্পুইস রে! কী বেজাইত্তা চিমটি যে দিতে থাকে! সেই চিমটির জ্বালায় লোকের শরীর না পানি হয়ে যেতে থাকে! দর দর দর পানি! খালি ঝরতে থাকে- ঝরতে থাকে!
 
এমনে এমনে গরম যায়! তবে শীতেই বা রেহাই কোথায়! একদিন আতকার উপরে- দুপ করে হিমশীতল বাতাস এসে হাজির হয়! হয়েই করে কী- লোকের শরীরে জোর ঝাপটা-বাড়ি দেওয়া শুরু করে! সেই বাড়ির চোটে- হাড্ডির ভেতরে না তগ-নগদ কনকনানী শুরু হয়ে যায়! লোকেরা জারে কাঁপে, কাঁপতে থাকে; আর বলাবলি করে, “আরে খাইছে রে! আগুন মাসেই এই অবস্থা! অই ত্তো আইতাছে মাঘ মাস! বাঘা জারের দিন! এই জারে এইবার কেটায় বাঁচবো,আরে কেটায় যাইবো গা! খোদায় জানে!”
 
দাঁতেদাঁতে বাড়ি-খাওয়ানো,হাড্ডি ঠকঠকানো ওই শীতের দিনগুলা সামাল দেয়ার জন্য- তাদের না আছে একটার জায়গার দুইটা পিরান, না আছে দুইটার জায়গায় তিনটা কাঁথা!
 
ঘরে ঘরে প্রায় সকলেরই শীতের সম্বল বলতে আছে- খান কয়েকমাত্র কাঁথা! তার একটা-দুটা তো বিছানা পাতার জন্যই লেগে যায়! বাকি যে-কয়টা থাকে, নিজেরা মিলমূল করে করে- সেইগুলার ভিতরে সেঁধায়, তারপর কোনোরকমে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকে তারা! মাঘের রাত ভরে ভরে-অই দশা করে করে-তারা ঘুমাবার চেষ্টা করে চলে! গ্রামের প্রায় সকল ঘরেই-অই একই অবস্থা! সেইখানের সকল ঘরেরই লেবড়া-জেবড়া বেড়ার ফাঁক দিয়ে দিয়ে- হু হু শীত ঢোকে! সারাটা রাত ঢোকে! লোকেরা সারারাত শীতে হুনহুনাতে থাকে! তবদা খেতে থাকে! এর মধ্যে, অই সন্ধ্যারাতে আর ভোরসকালেই- একটু-যেট্টুুক আরাম পায় লোকে। সন্ধ্যারাতে আর ভোর-বিহানে, ধানের নাড়া-কুটা-ঘুটে জ্বেলে জ্বেলে ধুম আগুন পোহায় -সকল বাড়ির মানুষ! যে যার মতো আগুন পোহায়! সন্ধ্যাকালে তাদের মুখ-চোখ থাকে একেবারে পাটা-পুতার মতন হিম-চুপ! তবে সকালে তাদের সকলের মুখ খুব খলবলাতে থাকে! তারা তখন রোদকে ডাকতে থাকে; রইদ, ওঠ্ ওঠ্ ওঠ। আয়রে রইদ! ওঠ্ ওঠ্ ওঠ্!


।।দুই।।



তেমন এক মাঘ মাসের দিনে, গ্রামের এক গৃহস্থের মেয়েকে কিনা, একটা ঠেকার কর্ম সারার জন্য দূরের ক্ষেতে যেতে হয়! গৃহস্থের মেয়ে ক্ষেতে যাবে এটা এমন নতুন কী কথা! নিত্য দিনভরে- সব ঘরেরই কোনো না কোনো মেয়ে , কত কত কাজে, হরদম ক্ষেতের দিকে যাচ্ছে। ক্ষেতের মুনিষদের খাবারের পোটলাটা, কী পানির বদনাটা, কী হুঁকা-তামাকটা- দিয়ে আসার ব্যাপারটা আছে! বা, ক্ষেতের আইলের ডেমি শাকের ভোমাঝাড় থেকে এক কোচড় শাক তুলে নিয়ে আসাটা আছে! নাইলে, আইল ধরে হেঁটে হেঁটে -একটু দূরের গাঙে গিয়ে- গাওগোছল করা আর কাঁথা-হোগলা ধোয়াপাখলা সারার বিষয়টা তো আছেই।
 
তবে ওই গৃহস্থের মেয়ে সেইদিন, এমন-সেমন কোনো কাজ করার জন্য, ক্ষেতে যায় নাই! গরুর খুটা দেওয়ার কর্মখানা করার জন্য-তারে অইদিন- ক্ষেতে যাওয়া লাগে! অই গ্রামের গরু চরতে দেবার জন্য আছে মস্ত এক ক্ষেত! তবে সেটা একেবারেই গাঁ লাগোয়া নয়! গ্রাম থেকে সেটা অনেকটাই দূরে।
 
গাঁয়ের ঢাল বেয়ে নামলেই- পাওয়া যায় ফসলী মাঠ। ক্ষেতের পরে ক্ষেত, ক্ষেতের পরে ক্ষেত! সংবচ্ছর ফসলে ঠাসা সব ক্ষেত! তাদের আইল ধরে যেতে যেতে যেতে তারপর বহুদূরে পাওয়া যায় এক ধু ধু মাঠ! আশপাশ সুমসাম, সবুজে-সবুজ! সেই মাঠের মধ্যিখানে খাড়া আছে -একটা একলা শিমুল গাছ। দূরে দূরে ফসলী জমিরা- চারপাশ দিয়ে ঘিরে ঘিরে আছে ওই পতিত মাঠখানারে! সেইখানেই অই গ্রামের গরু-বাছুরেরা দিনভর চরে বেড়ায়!
 
সেই জনমনিষ্যিহীন খা খা ক্ষেতে কিনা- মাঘমাসের ভরদুপুরে- গৃহস্থের মেয়ে লুলু বানু যায়- গরু খুটা দিতে!
 
লুলু বানুদের সংসারের বড়ো বেহাল দশা। তাদের সংসারের মাথা যে বাবা, সে আজকে দুইসন হয় দুনিয়াতে নাই। এক যে ভাই আছে লুলু বানুর; তার নাম ইদু মিয়া! সে বড়ো মাথাগরম পোলা! আর, তার মুখের কথারও কোনো খাজনা-ট্যাকসো নাই, ভালো-মন্দের বুঝ করাকরি নাই! যা তার মুখে আসে, সেইটাই সে ধুমাধ্ধুম বলে দেয়! হায়রে হায়! কথাখানা কওয়ার পরে - কী ফল ফলবে, কোন ছিদ্দতের তলে পড়তে হবে- সেই চিন্তা মাথায় আসে না সেই পোলার!
 
তার অই অমন তারছিঁড়া জিব্বার কারণে- নিত্য তাদের সংসারে ফ্যাসাদ আসতাছে! দুনিয়ার ফ্যাসাদ! ঘরে লুলু বানুর মা আছে, বাপের মা দাদি- সেও জীবিত আছে। অই মুরুব্বিরা ইদু মিয়ারে কত বুঝসুঝ দেয়, কিন্তু সেই পোলা কারো কোনো কথা গ্রাহ্য করে না! সে চলে তার নিজের ইচ্ছা মতো! আর, যখন তার যেমন ইচ্ছা হয়,সেই মতো যা খুশি বলতে থাকে! আর ক্যাচাল বান্ধায়। ধুন্দুমার ক্যাচাল!
 
লুলু বানুর দাদি বলে যে, তাগো এই ইদু মিয়া আপনা থেকে অমন অঘটন ঘটায় না! এর পিছনে আছে বানবাতাসের কারিগরী! ইদু মিয়ার ওপরে বানবাতাসের কঠিন ভর আছে, সেইজন্য সে অমন জাতনাশা, ছিদ্দতের কাজ করে ফেলে! তাতে খালি গুষ্টির নাকই কাটা যায় না, গুষ্টির ওপর আজদাহা আজদাহা গজবও নামে!
 
নিজের বাজান মরার চার দিনের দিন সন্ধ্যাকালে,ইদু মিয়া, সবচেয়ে কঠিন ফ্যাসাদখানা বান্ধায়ে ছাড়ে! ঘরের সকলের কলজাই তখন শোকে দগদগা, সকলের চক্ষেই তখন খালি পানির ঢল! তার মধ্যে মায়ে আর দাদিয়ে খেয়াল করে দেখে, লুলু বানুর বাপের ভাই মনু মিয়ায় বড় কেমন জানি নাদানীপনা শুরু করছে!
 
চারদিনের দিন আছরের ওয়াক্তের পরে, দোয়া-কালাম-খতম-টতম পড়ে, মৌলভী সাবেরা অপেক্ষা করতে থাকে; মনু মিয়ার পৌঁছানোর খবর নাই। হুজুরেরা মাগরেবের নামাজ শেষ করে, তখনও মনু মিয়ার দেখা নাই। উঠানে ফকির-মিসকিনেরা বসে থেকে থেকে কাতর হয়ে যেতে থাকে, তাদের পাতে পাতে তোবারক দেওয়ার কোনো উপায় থাকে না! মোনাজাত শেষ না হলে কেমনে তোবারক দেওয়া যাবে! আগে মোনাজাত ধরে, মউতা -মানুষটার জন্য দোয়াপানা চাইতে হবে, আল্লাপাকের রহম চেয়ে কান্নাকাটি করতে হবে,তারপর তো শেষ না হলে তোবাররক বণ্টন! তার আগে কোনোমতেই,দুনিয়ার কোনোখানেই, তোবারক দেয়ার কোনো নিয়ম নাই!
 
আছরের ওয়াক্তে মনু মিয়ায় একটা কামলারে দিয়ে হুকুম পাঠায়, সে এসে পাড়া না-দেওয়া পর্যন্ত যেন- তার ভাইয়ের রুহের জন্য মোনাজাত ধরা না হয়! দুনিয়ায় তার একটামাত্র বড়ভাইই তো আছিল! পরাণের সেই ভাইয়ে এখন আল্লাতালার দরবারে গেছে গা! তার চাইরদিনের দোয়াখায়েরের-এর সময়ে, মনুমিয়া না থাকলে কেমনে হবে!

তবে মোনাজাত ধরার জন্য আসতে- তার কিঞ্চিৎ দেরি হবে। গঞ্জের আড়তে অইদিন বৈকালে বেচাকেনা বেশি হওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে! অমন ঠেকার কাম ফেলে রেখে -মনু মিয়ায় কেমনে চলে আসে! কিন্তু তারে ছাড়া যেন মোনাজাত ধরা না হয়! খবরদার!
 
মনু মিয়ার ফরমাস মতো হুজুরেরা বসে থাকে- থাকে! তারা জিকির করে, দোয়া দরুদ পড়ে পড়ে পড়ে! কিন্তু মনু মিয়ারে আসতে দেখা যায় না! এমনে এমনে একেবারে প্রায় এশার ওয়াক্ত হয়ে যায়! মনু মিয়ার কোনো চিহ্নও দেখা যায় না! আর কত অমন অকামে বসা দিয়া থাকা যায়! হুজুরেরা বলে, আর তাদের বসার উপায় নাই। উঠানে বসে থাকা মিসকিনরাও ঢুলতে ঢুলতে জানান দেয়, যামু গা!
 
এমনকালে দাদি ইদন নেসা বিবি কী মোনাজাত শেষ করার কথা না বলে পারে! তখন একদিকে তগনগদ কোনোরকমে মোনাজাত শেষ হয়, আরেকদিকে লোকের পাতে পাতে তোবারক পড়তে থাকে! ডাইলে-চাইলে রান্ধা ল্যাটকা খিচুড়ি! সেই ঠান্ডা জিনিস মুখে তুলে কী আর লোকে কোনো স্বাদ পায়? তোবা তোবা! লোকের না উগলানী উঠতে থাকে!
 
তবে মনু মিয়া এসে কিন্তু ব্যাপারখানারে সোজাভাবে নেয় না! অপমানির চোটে সে বিরাট ধমকাধামকি দিতে থাকে! বহুত চিল্লাপাল্লা করতে থাকে! গুষ্টির সকলেই জানে, মনু মিয়া পয়সাঅলা লোক! টাকার গরমের ঝাপটের কারণে তার শরীরের ক্রোধ আর সীমার মধ্যে থাকতে পারে নাই! এমনে অন্য সময়ে মনু মিয়ার চেতের কালে,অন্যরা বোবা দিয়ে থাকে! একদম বোবা মেরে থাকে, আর মনু মিয়া সেই বোবা সকলের ওপরে আচ্ছা মতো নিজের চেত ঢেলে ঢেলে - নিজেরে খালাস দেয়!
 
সেইরাতে, সেই মউতা-মোনাজাতের বাড়ির সকলেও যখন, মুখ বুজে, অই হুজ্জোত শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করছে, তখনই কিনা ইদু মিয়া ফোঁস করে ওঠে। মনু মিয়ার মুখ বরাবর উল্টা গরজানী দিয়ে বলে, “আপনেরে, এমুন কুয়ারা দেহাইতে- কে আইতে কইছে? আপনে না-আইলেও, আমাগো আটকাইতো না ! আটকায় নাই তো!”
 
হায়রে হায়! তারপর যে তুফান আসলো বাড়িতে! মনু মিয়া রাগে ফাতফাতায়ে ওঠে! কুঁদায়, চিল্লায়! “তর পোলার খ্যাতা পুড়ি! এমুন হারামজাদা পোলা আমি -একবারে দশটা কইরা জন্ম দেই। বেয়াদ্দবের ঝাড়! ফকিন্নির ছাওয়ের বোলে এত্তা বড়ো চোপা! শালার পো শালা!”
 
এমন-তেমন বকাবাজির হুংকারের চোটে মিসকিনগুলারসুদ্ধা কইলজার পানি শুকায়ে যায়! তারা আর তখন তবারক খাবে কী, নিজের নিজের সানকি হাতে নিয়ে একেকজনে ঝাড়া দৌড় দেয়! ইয়া আল্লা! এইসব কীসের আলামত! আজকার এইদিনে- কোথায় মুর্দার আত্মার মাগফেরাত মাঙবে লোকে! তার জায়গায় কিনা শুরু হইছে এমুন গালিগালাজ আর ধুম চিৎকার! কীসের দোয়াখায়ের- কীসের রুহের মাগফেরাত চাওয়া- কীসের কী! ইয়া আল্লা!
 
ঘরের মেয়েলোকেরা আল্লাকে ডাকতে থাকে! বেদিশা বেতালা হয়ে ডাকতে থাকে, ‘রহম করো মাবুদ! রহম করো!’ অমন কালেই ঘরের সকল মাতারি শোনে, মনু মিয়া আবার না-জানি কী বলতাছে! এইবার আর চিল্লানী-খেঁজানী নাই! এইবার গলা তার ভার-ভারন্ত,গমগমা! “শোনোরে আমার জ্ঞাতিগুষ্টি, তোমরা যে যে আমারে চাইবা, এক্ষণ তারা সগলতে আমার লগে লগে- এই বাড়ি ছাইড়া চইল্লা যাইবা!”
 
তারপর মনু মিয়া তার মায়েরে ডাক দেয়, “যুদি আমারে চাও,তাইলে কইলাম - এই বাড়িত আর- এক দণ্ড থাকবা না। লও, আমার লগে এক্ষণ!” গুষ্টির ভাই-বেরাদব-জ্ঞাতিজন সকলে- ধুপধাপ কদম ফেলে -মনু মিয়ার সঙ্গে সঙ্গে মউতাবাড়ি থেকে বের হয়ে যায়! একেবারে থুতু ফেলতে ফেলতেই বের হয়ে যায়!
 
ইদন নেসা বিবি উঠানে খাড়া হয়ে, পান চাবাতে চাবাতে, জ্ঞাতিগুষ্টির সকলের সেই চলে যাওয়াটারে দেখে-দেখে! কাউরে সে পিছু ডাকে না! কাউরে সে আটকানোর চেষ্টাও করে না! ‘এমন এতিমটিরে- এমনে ফালাইয়া থুইয়া- যাইবো গা ইদন নেসা বিবিয়ে? মউতা পুতের ফরজন্দগিলির লেইগা- তাগো দাদির কোনো ঠেকা থাকবো না? জ্যাতা পুতের এমুনই নি খ্যামতা? খোদার রাস্তা ভুলাইয়া দিবো সেয়? জিন্দিগিতে অইটা অইবো না! আর কে কইছে যে, এই নাদানকীপানা মনু মিয়ায়ই করতাছে? না না! এইর পিছে অবশ্য অবশ্যই কুবাতাসের কারসাজি আছে!’
 
সেইজন্যই ইদনসেনা বিবি মনুমিয়ার ডাকে- কানমাত্র দেয় না, যাওয়া তো বহুত দূর!
 
কু বাতাসের ভরের চোটে- সেই যে সেই সন্ধ্যাকালে- আত্মীয় স্বজনেরা বাড়ি ছাড়ে; তারপর থেকে আর কেউ একজনও লুলু বানুদের খয়খোঁজ করতে আসে না। তারা খয়খোঁজ করে মনু মিয়ার, আসে যায় তার বাড়িতে। লুলু বানুরা মরছে না বাঁচছে-সেইদিকে ফিরাও দেখে না! বানবাতাসের রাজত্বিতে- এমন এমন

জ্বালা-অপমান-অপদস্তি নিয়েই লোকেরে বেঁচে থাকতে হচ্ছে!
 
এখন এই যে অমন একঘরে অবস্থা লুলুবানুদের! সেইটা কোন কারণে? সেইটা বানবাতাসের কারণে! সেই গায়েবী বান-বাতাসে দেখো- অই গজবখানা ঢেলে দিয়েই শান্তি পায় নাই! সে কিনা সংসারের ওপর-আরো আরো গজব নামায়ে আনতাছে! বানবাতাসে এখন ইদু মিয়ার উপর ষোলআনা ভর করে ফেলছে!
 
সেই ভরের ঠেলায়ই এখন ইদু মিয়া দেখো- কোন নাচন্তি নাচতাছে! সে এখন সউদি যাওয়ার জন্য গরজানী দিতাছে! সউদি যাওয়ার টাকাটা কোনখান থেকে আসবে?

“ক্যান! জমি-জিরাত কিছু কম আছে নি? বাপে কিছু কম থুইয়া গেছে? হেটি বেচলে দেখি -ছালা বোঝাই টেকা পাওয়া যাইবো!” ইদু মিয়া সুন্দর মীমাংসা দিয়ে দেয়!

এই জমিকয়টার আয়েই না সংসারখান চলে? সেইগুলারে বেচে ফেললে-সংসার চলবে কেমন করে? আর, অই যে এক মাইয়াসন্তান লুলু বানু! তার ভবিষ্যৎ আছে না?

“লুলু বানুর আবার ভবিষ্যৎ কী!” ইদু মিয়া ক্রোধে দাপাতে থাকে! “সে এইসব কিচ্ছু শুনতে চায় না। কোনো ছেদাকথা য্যান তার কানে- কেউ দিতে না-আসে!” এই যে, এমন হিতাহিত ভুলেছে ইদু মিয়ায়! এই যে সে অমন ঠ্যাঁটামি করে চলেছে! এইসব কি? এইগুলা- কে ইদু মিয়ারে দিয়া করাইতাছে? করাচ্ছে সেই দুশমন-বান বাতাসে।
 
সেইকারণেই এখন ইদু মিয়ায় এমন পাগল হইয়া লাফাইতাছে! সউদি তার যাওয়া লাগবোই লাগবো!। সেইখানে মাসে মাসে ক্যাশ টাকা! তাইলে সেইনে লাল হইতে কতক্ষণ! একবার খালি যাইতে পারলেই হয়!
 
আজকা দিন সাতেক হয়, শিমুলকান্দির মধু হাজির পুতে- সউদি থেকে দেশে আসছে! সেই পোলার সঙ্গে ইদু মিয়ার চিনপরিচয় আছে! পুরানো সেই চিনপরিচয়রে -এখন আবার নতুন করে ঝালাই করে নেওয়ার জন্য- আজকা ভোর সকালেই ইদু মিয়া-দুই ক্রোশ দূরের শিমুলকান্দি গ্রামে গেছে! বাড়ির যে বান্ধা মুনিষ- সেও ইদু মিয়ার সঙ্গে গেছে। সে গেছে মধু হাজির পুতের আনা সউদি কম্বলখানারে- একবার চোখের দেখাটা দেখে আসতে!
 
এমন কম্বল- পাঁচ গ্রামের কোনো বাড়ির- কারো ঘরেই নাই! পাঁচ গ্রামের কেউই- এর আগে কোনোদিন -এমন জিনিস- চক্ষে দেখে নাই! এমন নাকি নরম সেই জিনিস, হাত দিয়া তারে ধরতে গেলেই শরীরে কাঁপুনি ওঠে! পরিষ্কার বোঝা যায়, এইটা বেহেশতী জিনিস! জীবনে এমন একটা জিনিস না দেইক্ষা -এই টেন্টন মিয়ায় বাইচ্চা থাকবো! মাইনষে তারে আভাইগ্গা কইবো না?



।।তিন।।


এখন, ঘরের ওই দুইজন বেটায়, কখন বাড়িতে ফিরবে কে বলতে পারে! মুনিষটাই রোজ ভোরে ভোরে -গরুটারে চরাতে নিয়ে যায়! সেইদিন বেহেশতী কম্বল দেখার জোশে সে এমন মাতোয়ারা থাকে, গরুটার কথা তার আর মাথায়ই থাকে না। ইদন নেসা বিবি যত তারে বলে, আগে গরু খুটা দিয়া আয়! ওরে তুই আগে-গরুরে খুটা দিতে যা? সে তত ঘোষণা দিতে থাকে; ‘আউজকা গরু- গোয়ালে বান্ধা থাকুক! বহুত খইলভূষি দেওয়া আছে! সোন্দর চলবো! আউজকা খুটা দেওনের কোন কাম?’
 
বাসিমুখের গরু গোয়ালে বান্ধা পড়ে থাকে! ওদিকে সে আথালে- পাথালে শিমুলকান্দির দিকে ছোটে। এই যে হুকুমের চাকরে- দাদির হুকুমরে কানে নিলো না! এই যে সে এমুন ফাল পাড়া ধরলো! এইটা কী এমনে এমনে হইলো? বানবাতাসে অরে বেদিশা না করলে কী-সে এমনটা করার আস্পর্দা দেখাতে পারে! পারে না।

এখন এই অবলা জীবে- তাজা ঘাসটা পায় কেমনে? ঘাস না পাইলে, সারাটা দিন, গুরুটার আত্মায় কষ্ট পাইবো না? গরু চরাতে-কারে এখন পাঠায় ইদন নেসা বিবি! হাতে আছে এক ফালানি বিবি, যারে কিনা দাদিয়ে- গরু খুটা দিতে যেতে বলতে পারে।
 
ফালানি বিবি বাড়ির আঙিনা-লাগোয়া একচাল ঘরখানে থাকে। সে সকল দরকারের সময়, সংসারের কাজে হাত লাগায়! উঠান লেপে, ধান সেদ্ধ করে, ধান ভানে, গোবরের ঘুঁটা দেয়, হাড়িপাতিল মাজার কাজ সারে; আর, দরকারে গরু খুটা দিতে নিয়ে যায়।
 
কিন্তু সেদিন জগৎ-সংসার তার কাছে হয়ে আছে একেবারে বিষ-জহর! দুনিয়ার ওপর থেকে তার তখন -মায়াবাস্না উঠে যাওয়ার অবস্থা! ফালানি বিবি সেইদিন-হাসিখুশি হালেই- সকালের আগুন পোহায়! এমনকী সে নিজেও ওই বেহেশতী কম্বলখানা দেখার জন্য শিমুলকান্দি রওনা করবে কিনা- সেইকথাও আগুন পোহাতে পোহাতে চিন্তা করে! তবে আতকার উপরে অমন যাত্রার উদ্যোগ- সে কী করে নেয়! নিজের চালাঘরের মেঝেটার মাটি আজকে অনেকদিন হয়-ঝুরঝুরা হয়ে আছে! পুরাটা মেঝেতে- গর্ত করে করে ইঁদুরে একেবারে নান্দিনাশ করে রেখেছে! অইটারে এই এক্ষণই একটা পোক্ত লেপা দেওয়া দরকার! আর একটা বেলাও-অই মেঝেরে- এমনে ফেলে রাখা যাবে না! তাইলেই সাপের আনাযানা শুরু হয়ে যাবে! আল্লা-রসুল!
 
ফালানি বিবি একেবারে ভোর আন্ধারেই-একটু কোনোরকম পানিপান্তা খেয়েই- লেপা শুরু করতে যায়। কিন্তু ওই কাজ শুরু করবে কী তার আগেই তার হাতরথ তব্দা লেগে সারা! হায় হায়! তাকের উপরে রাখা- দুইসেরি হাড়িখানারে দেখি- তাকের উপরে দেখা যায় না! পুরা দেখি গায়েব সেইখানা!
 
ফালানি বিবি সেই হাড়িটারে কিনেছে-এই ত্তো মাত্রই- দুইদিন আগে! ধকপকা সাদা সিলভারের হাড়িটারে তারপর সে তাকের উপরেই সাজানী দিয়া রাখছে! সেইটার দিকে চোখ গেলেই না - ফালানি বিবির পরাণ- খুশিতে ফাল দিয়া ফাল দিয়া উঠতাছিল! আজকা সকালে আগুন পোহাতে যাবার আগেও,সেইটারে দেখে দেখে, ফালানি বিবির পরাণ কত না আহ্লাদ পাইতাছিল!
 
আগুন পোহাইয়া ফিরে এসে কী দেখে ফালানি বিবি? দেখে যে, ঘরের আর সবকিছু - জায়গায় জিনিস জায়গায়ই আছে! খালি নয়া হাড়িখানেই নাই হয়ে গেছে! দুঃখে শিলপাটার মতন পাত্থর হয়ে যায় সে। খালি ওই একটা জিনিসরে নিতেই কিনা চোর আসছে! কোন চোরায় যে নিছে অইটা,সেইটা কী আর ফালানির বোঝোনের বাকি আছে! নয়া হাড়িখানরে নিছে জমশের মিয়ায়! কপালের দোষে অই খাটাসের পুতে হইতাছে গিয়া তার খসম। ফালানি বিবি জান-পরাণ পাতাপাতা কইরা কইরা - সংসারের একেকখান জিনিস জোড়ে! আর পোংটার পুতে দরকার মতন সেই জিনিসরে চুরি কইরা নেয়! নিয়া বেচে! বেইচ্ছা ফূর্তি করে।
 
গেল রোজার ঈদের যাকাতের কাপড়খানা ঘরে আইন্না খালি থুইছে ফালানি বিবি, অমনি চউখটা ফিরাতে না-ফিরাতেই সেই কাপড়খানরে -কোন ফাঁকে আইয়া তুইল্লা লইয়া গেছে গা- চোট্টার গুষ্টি চোট্টায়! খোঁজ করতে করতে ততক্ষণে, জিনিসটা বেইচ্ছা, সেই টাকার অর্ধেক দিয়া জুয়ায় হাইরা বইয়া রইছে হারামজাদায়। তখন কপালে মারা ছাড়া ফালানি বিবির আর কী করার থাকে? আর কিচ্ছু করার থাকে না। এমনে সইতে সইতে দিন যায় তার! এমনে আর কত!

ঘরের খুঁটির বাঁশে ফোঁকড় করে, গোপন পয়সা জমিয়ে দেখেছে ফালানি বিবি, ক্যামনে জানি অই চশমখোরে সেইটারও খোঁজ পেয়ে যায়! পোড়াকপাইল্লায় একটা পাই-পয়সাও ফালায়ে যায় না। সেই দাগা ফালানিয়ে সহ্য করে নাই নাকি ? করছে! কিন্তুক আর না! চেতে দপদপায়ে ওঠে ফলানি বিবির ভিতরটা! এই একবার কান্দে সে, এই কতক্ষণ চিল্লায়! এই করতে করতে শেষে ফালানিয়ে গিয়ে -আঙিনার আতা গাছের গোড়ার লেট দিয়ে বসে। বসে, গলা ছেড়ে বিলাপ দিতে থাকে! আর একটু পর পর, ইদন নেসা বিবিরে ডাক পাড়তে থাকে! “খালা, ও খালা হোনেন গা খালা! আমারে এই কুত্তার ছাওয়ের তেনে ছাড়ান লইয়া দ্যান। আপনেরা ময়মুরুব্বি দশজোনে- আমার এই উবগারটা করেন গো খালা!”
 
ইদন নেসা বিবি এক কাজ সারে, আরেক কাজ শুরু করে, আর ফালানি বিবির বিলাপ চিৎকার শুনতে থাকে। এইগুলি হইলো রাগ-গোস্বার কথা। এইগুলারে গোনায় ধরতে নাই! নাইলে ফালানি বিবি কি জানে না , এইকাম জমশেররে দিয়া আসলে কারা করাইতাছে? করাইতাছে বান-বাতাসে!
 
তো, জ্বালা-জ্বালা হয়ে এইসব আবোল-তাবোল কথা ফলানি বিবি বলতাছে; বলতে থাকুক! ভিতরের রাগঝাল তাইলে আপনে-আপনেই কমন্তি পাবে! তাই এইসকল বকাবাজিতে কান দিতে নাই! আর, কান দিতে চাইলেও কী সেইটা করতে পারছে নাকি ইদন নেসা বিবি? তার নিজের ভিতরেই দেখো কড়া এক অশান্তি- কেমন থোম ধরে বসে আছে ! সেইটা নিয়াই না পেরেশান হয়ে আছে সে! গাভীন গরুখানে গোয়ালে বান্ধা আছে। তার লগে বান্ধা আছে ড্যাকরা বাছুরটা। এই যে অর্ধেকটা দিন যাইতাছে গা! গরু দুইটায় কেবল খড়-খইল মুখে দিয়ে পড়ে আছে। জ্যাতা ঘাস ছাড়া এগো চলে! চলে না! না-বুঝ প্রাণীর এমন অযত্ন! এইটা খোদায় সইবো!

এই অশান্তিতে ইদন নেসা বিবি এমন বেদিশা থাকে যে, জ্বালা- যন্ত্রণা-তাপে ভাজা ভাজা হতে থাকে ফালানি বিবিকেও কাজের ফরমাস দিতে তার মুখে আটকায় না। বলে,“ যাস না গো মা? কয়টা ঘাস কাইট্টা লইয়া আয় গা,গরুটির লেইগা!”

‘এই গেরামের মাটিতে বইয়া তো আর -আমি একটা কুটাসুদ্ধা লাড়মু না! এই জিন্দিগিতে আর না!’

“কী কলি?”

‘আমি টাউনে গিয়া ভিক্ষা মাইগ্গা খামু। তবু জমশেইরা হারামজাদার মোখ দেখমু না!’
 
ফালানি বিবির এই যে জিদ্দি, এই যে ক্রোধ- এইসবের পিছনে যে আসলে কীসে আছে- সেইটা ইদন নেসা বিবি খুব ভালো করেই বোঝে! এই জিদ্দির মূলে আছে, মাইনষের দুষমন সেই বানবাতাসে! বানবাতাসেই এখন ফালানিরে এমুন নাউট্টা নাচন নাচাইতাছে! এমুন বয়রা-আন্ধা করে রাখছে! সেই কারণেই এখন আর ফালানির কানে কোনো কথা ঢুকবো না! বান-বাতাসে সেইটা ঢুকতে দিবো না! ফালানিরে দিয়া এখন কোনো কাজ করানিরও উপায় নেই।
 
গরুর জন্য ঘাসের বন্দোবস্তটা করার জন্য, নাইলে গরু দুইটারে মাঠে খুটা দিতে পাঠানোর জন্য- অন্য একটা কোনো উপায় খুঁজতে হবে। মুনিষটায়, বা ইদু মিয়ার ভরসায় থাকলে না হুদা সর্বনাশ হইবো! তাগো ফিরতে ফিরতে দিন কাবার হবেই।
 
তাইলে উপায়? গরুর ঘাসের জোগাড় তাইলে হয় ক্যামনে!
 
বাড়িতে মেয়েলোক আছে তিনজন! লুলু বানু আছে! তার দাদি ইদন নেসা বিবি আছে, আর আছে লুলু বানুর মায়ে। লুলু বানুর মায়ে হইলো গিয়া এই গ্রামের বউ! সে যাবে নাকি গরু খুটা দিতে! কী বেপর্দা কথাবার্তা! আর গরু চরানোর মাঠ কী ধারে-কাছে কোনোখানে! সেইটা না দুনিয়ার দূরে! ক্ষেতের আল ধরে হেঁটে হেঁটে, গরু বাছুর সামলে নিয়ে নিয়ে -সেই অত দূরে-ইদন নেসা বিবি ক্যামনে যায়! তার বুড়া কোমরে কনকনানির শেষ নাই! হাতেও সেই শক্তি নাই যে, পাঁচনটা নাড়ে! তাইলে এখন লুলু বানুই ভরসা।
 
লুলু বানুর ওপর বান-বাতাসের ভর হওয়ার আলামত- দু চারবার য্যান একটু একটু পাওয়া গিয়েছিল! তবে সেইগুলা কঠিন কোনো ভর লাগার ব্যাপার ছিল না! তারপরেও সাবধানের মাইর নাই। লুলু বানু হুঁশ করে যাক, একটু কোনো বিপদও য্যান না ঘটে!
 
মাঘ মাসের ভরভরন্ত দুপুরের বেলা- লুলু বানু যায় গরু খুটা দিতে! আলের পরে আল পেরিয়ে এগোয় সে। তার আগে আগে গাভীন গরুটা যেতে থাকে! তারও আগে হাঁটতে থাকে ড্যাকরা বাছুরটায়। আলের দুইপাশে দুইপাশে রাই সরিষার ক্ষেত! সরিষা ফুলদের গন্ধ আর বাহার -লুলু বানুকে এক কদম -এগোতে দিতে চায় না! কিন্তু আইল বরাবর- দাঁড়ায় কী করে সে! পথ-ঘাটের নানাসব শোভা আর ঠমক-ঠামক দেখে, এমন আতকা দাঁড়িয়ে পড়ার উপায় নাই লুলু বানুর! কড়া নিষেধ দেওয়া আছে! অমন টাসকি-খাওয়া চক্ষে,তুমি কোনোদিগে তাকায়া আছো? অইটার মানে কী? মানে হইলো, বানবাতাসে ভর করতাছে তোমার উপরে! লুলু বানুর দাদিয়ে সেইকথা- দিনরাত বলতাছে না?
 
আর সে না হয় ক্ষেতিখোলার শোভা দেখার জন্য একটু দাঁড়ালোই, সেটা নাইলে লুলু বানু করলোই! কিন্তু গরু বাছুর দুইটার কী শোভা দেখার কোনো ঠেকা আছে? নাই! অই যে তারা চলতাছে তো চলতাছেই। অই দেখো- লুলু বানুর গরু বাছুরেরা- হনর-হনর করতে করতে কতদূরে চলে গেছে! লুলু বানু এইখানে এমনে উতলা চক্ষে দাঁড়ায়ে থাক, আর ওইদিকে গরুবাছুর দুইটায় শেষে একলা কোন দেশে- নিখোঁজ হয়ে যাক! ওরে সর্বনাশ রে! তখন লুলু বানুও হনহনিয়ে ছোটা ধরে। ওহ! রক্ষা যে, গরু-বাছুর দোনোটার মুখেই খাপা বাঁধা আছে। তারা এখন পরের ক্ষেতে মুুখ দিবে- এমন সাধ্য নাই!
 
এক দৌড়ে ক্ষেতে গিয়ে, তাড়াতাড়ি খুটা দিয়ে, চক্ষের পলকে যেন লুলু বানু বাড়িতে ফিরতি যায়। তার গরু নিয়া মেলা দেওয়ার সময়,তার বুজি তো তারে তন্নতন্ন করে, এই হুঁশিয়ারী দিয়ে দিয়েছে! দুনিয়ায় নি বানবাতাসের কোনো লেখাজোখা আছে! ভরদুপুরে নিরালা মাঠে, কোন বাতাসে কারে যে পেয়ে বসে- সেই কথা কে বলতে পারে!
 
সেইবারের জ্যৈষ্ঠমাসের,একদম সকাল বেলাতেই না সেই বিপদটা প্রায় এসে যাচ্ছিল! তখন না বানবাতাসে লুলু বানুরে একেবারে ধরি ধরি অবস্থা করে ফেলছিল! আল্লা! কপাল গুনে সেই বিপদ অল্পের ওপর দিয়ে গিছে সেইবার! বিষয়খানা তগনগদ- ইদন নেসা বিবির চক্ষে পড়ে গেছিল বলেই না- অল্পের উপর দিয়ে বিপদখানা কাটছে! ব্যাপার বুঝে বুজি করে কী, তার নাতিন লুলু বানুরে ধরে এনে, সঙ্গে সঙ্গে ঘরের চালের নিচ দাঁড় করায়! ঢোকে ঢোকে কাঞ্জির পানি খাওয়ায় ! নাতিনের শরীরে সোনা-রূপার পানি ছিটায়! দুই খাবলা নুন, পিঁড়ির নিচে রেখে, সেই পিঁড়ির ওপর, লুলু বানুরে আধা প্রহর বেলা ধরে- দাঁড় করায়ে রাখে! তবেই না বালাই দূর হয়!
 
সেই জ্যৈষ্ঠমাসের সকালবেলায় বুজি লুলু বানুরে বলে, “যা! তরাতরি কইরা- তর ফুপুরে চিতই পিঠাগিলি দিয়া আয় গা তো!” ফুফু থাকে অন্য গ্রামে। ক্ষেত ধরে আড়াআড়ি হাঁটা দিলে, সেখানে যেতে লাগে অল্পক্ষণ। নিজেদের গ্রামের ক্ষেতিখোলার শেষে, ওই অন্য গ্রামখানে ঢোকার মুখেই -বিরাট এক বাগিচা আছে! সেইটা লিচু বাগিচা। সেইখানে এমনে-সেমনে ছড়ায়ে আছে লিচুগাছ! খালি লিচুগাছ! দুনিয়ার লিচু গাছ সেইখানে! বাগিচার এক পাশে ঢলঢলে এক দীঘি! দীঘির পাড়ে পোড়াদগ্ধ আর ভাঙাচোরা একখানা বাড়ি! পাকা বাড়ি,তবে বেহদ্দ এক ছাড়াবাড়ি সেইটা! পোদ্দার বাড়ি! ওইখানে একদিন কবে নাকি পোদ্দার বাড়ির লোকেরা বসত করতো! উঠান-বাড়ি আর লিচুবাগিচায় বাগিচায়- কবে নাকি একদিন লোকের গমগমা চলাচলতি আছিল! এখন, খালি মরা পাতা বোঝাই বাগিচার ঘাসে ঘাসে রইদ-বিষ্টির আনা-যানাটুক আছে!

জ্যৈষ্ঠ মাসের দিনে, লিচু গাছের ডালে ডালে, কাচায়-পাকায় কত কত লিচু! লুলু বানুর একলা চোখেরা সেই কড়া-কচি লিচুদের দিকে তাকায়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু সে যেন অন্য কিছু দেখতে পেতে থাকে! সে দেখে যে, একদিন কবে জানি, এই বাড়িতে - এই যে পোদ্দার বাড়িতে- অই তো- আগুনে লেগে গেছে! কবে জানি নিজেদের বাড়ির ঢালে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে - অই যে তারা দুই ভাইবোন- এই বাড়িটারে পুড়ে পুড়ে যেতে- দেখতে পাচ্ছে! আহ্হারে!
 
অই ত্তো! কারা কারা জানি-সেই আগুনলাগা বাড়িটার দিকে দৌড়ে দৌড়ে আসতাছে! না না! তারা আগুন নিভাইতে আসতাছে না! তারা আসছে - বাড়ির জিনিসপাতি লুট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য! কে একজন জানি- এক ঝাঁকা তামা-কাসার হাড়িপাতিল নিয়ে ছুটলো! অই যে! কে এক বেটায় জানি- নকশাকরা খাটের পায়া হাতে নিয়ে- দৌড় দিলো! কারা জানি ধরাধরি করে করে- কাঠের সিন্দুকটারে-নিয়ে চলে গেল! অই তো- অই তো- পোদ্দার বাড়ি একদিকে আগুনে পুড়তাছে,আবার আরেকদিকে লুটও হয়ে যাইতাছে!
 
অই যে দুই ছোটো ভাই-বইন, অইসব দেখতাছে,তাগো দোনোজনেরে অই যে- পিছন তেনে- কে জানি ডাকে! ডর-তরাসে ঠকঠকাতে থাকা একটা গলা-যেন- পিছন থেকে- অই যে ডাক দিতাছে! “আরে তরা জলদি ঘরে আয়! রায়টের দিনে- হায় হায়- সবখানে লুট অইতাছে! কার মাইর আইয়া কাছ উপরে পড়ে! ঘরে আয় ঘরে আয় রে তরা!”
 
লুলু বানু তখন পোড়া বাড়িটার দিকে আরও মন দিয়ে চেয়ে থেকে থেকে- মনে করতে চায় যে, অই আগুন লাগালাগির বিষয়টা কী সে স্বপ্নে দেখেছিল? নাকি সত্য সত্যই- একেবারে নিজের চোখে- লুলু বানু অই আগুন লাগার বিষয়টা ঘটতে দেখেছিল! স্বপন আছিল অইটা? নাকি হাছা বিষয় আছিল! কোনটা? কোনটা?
 
এমন সময় লুলু বানু শোনে, তার পিছনে অই দেখো -বুজি কী ডাকচিৎকার দিতাছে! আল্লা!

বুজি বাড়ির ঢালে এসে দেখে, অই যে দূরে- পোদ্দার বাড়ির ধু ধু বাগিচার কিনারে- লুলু বানুর মতন কারে জানি দেখা যায়! পরাণ তার ছ্যাৎ করে ওঠে! তার নাতিনে অইনে অমুন থির হইয়া- খাড়াইয়া রইছে ক্যান! তারে বানবাতাসে পায় নাই তো! বুজি জানপরাণ হাতে নিয়ে ছুটে এসে দেখে, আল্লা মাবুদ গো! নাতিনে তার য্যান আর নাতিন নাই! তার চোখ দেখো- একেবারে যেন- নিশি পাওয়া মানুষের চোখের মতন ঘোলা ঘোলা হয়ে আছে! তার দেহখানা মাটির দুনিয়াতেই খাড়া আছে, কিন্তু আসল লুল বানুু য্যান আর মাটির দুনিয়াতে নাই ! খোদা খোদা!
 
শেষে কিসের ফুপুর বাড়িতে যাওয়া কিসের চিতই পিঠা দেওয়া আর কিসের কী!

আর অই চিতই পিঠা নিয়া- অই যে এতোক্ষণ খোলা মাঠে আর অমন এক ছাড়াবাড়িতে-লুলু বানু খাড়া হয়ে আছিল! ততক্ষণে তাগো কী বানবাতাসে পায় নাই? তাইলে পিঠা কী আর পিঠা আছে! বানবাতাসের নজর লেগে গেছে না! এখন, সেই পিঠা যেই খাবে, তারই না জান নিয়া টানাটানি পড়বে!
 
অত্তোগুলি পিঠারে না শেষে তখন- ইদন নেসা বিবি- লিচু বাগিচার এক মাথায় ধুপ করে ঢেলে দেয়! এমনে এমনে ফেলে তো আর দেয় না! আসলে সে তখন অইমতে- বানবাতাসেরে ভোগ দেয় আর কী। তারপর লুলু বানুরে হাতে ধরে নিয়ে সে সটান বাড়িতে আসে! একবারও পিছু ফিরে চাওয়া নাই, কী ঘাড় ঘোরানো নাই!

অই যে লুলু বানু তখন অমন থির দাঁড়িয়ে পড়েছিল- ছাড়াবাড়ির বাগিচায় থোম ধরে দাঁড়ায়ে পড়েছিল; সেইটা কেনো? বুজি যে তারে তরাতরি কইরা পথ পাড়ি দিতে কইছিল, সেই কথা যে একটুও আর লুলু বানুর মনে আছিল না! সেইটা কি? সেইটা কোন কারণে? কারণ পিঠার উপরে বান-বাতাসের নজর পড়ছিল! আবার লুলু বানুর উপরেও বানবাতাসে প্রায় ভর করে ফেলছিল! সেই কারণেই তখন- লুলু বানুর অমন - তবদা দিয়া খাড়াইয়া থাকোন। সেই কথা ঘরের মানুষের খুব খেয়াল আছে! সেইকথা সকলের চেয়ে বেশি মনে আছে- ইদন নেসা বিবির! সেই কারণেই সে লুলু বানুকে গরু খুটা দিতে পাঠায় বটে, তবে ভয়ে তার পরাণ কাঁপতে থাকে! সেই ডরের ঠেলায়ই সে লুলু বানুরে বারবার বলে, “ দেখ! তুই কইলাম- যাবি আর আবি! দেরি য্যান না অয়!”

লুলু বানু জবাব দেয়,‘আইচ্ছা!’
 
ইদন নেসা বিবি বলে, “বাইত তেনে আতে কইরা খাইট্টাটা লইয়া যা। নাইলে মাটিতে খুটিটা গাড়বি ক্যামনে!” শেষে খুটা গাড়ার জন্য শক্ত কিছু খুঁজতে খুঁজতে, খুঁজে পেয়ে খুটা গাড়তে গাড়তে, ওদিকে দেরি হোক; আর ততক্ষণে লুলু বানু বানবাতাসের নজরে পড়ে যাক আর কী! খোদাতাল্লা করিম! এমুন বিপদ দিও না। সিয়ান নাতিন! বিয়ার যুগ্যি! অরে একবার বাতাসে ভর দিলে- জীবনেও তো আর বিয়া হইবো না! দুষী মাইয়া কে নিবো! আল্লা রছুল!
 
লুলু বানু একহাতে খাইট্টাটা নেয় ভারী পোক্ত কাঠোর টুকরাটা, অন্য হাতে পাঁচনটারে ধরে। গরু চরানোর ক্ষেত- সেই কোন দূরে! মাঘ মাসের দিনে যত দূরে চোখ দেও- খালি হলুদে হলুদ ক্ষেত! রাই সরিষার ক্ষেত! সেইখানে হলুদের ঢল। তার মধ্যিখানে এই গরু চরানোর মাঠখানা - আধমরা আধকাচা ঘাস নিয়ে - সংবচ্ছর খা খা করে। মস্ত মাঠখানে একটা মাত্র গাছ শিমুল গাছ। এখন এই মাঘ মাসে, সেই গাছ- কী লালে লাল! কোনো ডালে একটা পাতা পর্যন্ত নাই ! খালি ফুল, লাল ফুল ডাল ভরা ফুল, মাটি ঢেকে রাখা ফুল। লালে লাল এই শিমুলের দিকে তাকাও, আরো খা খা লাগবে এই মাঠ! পরাণ কাঁপানো খা খা!
 
সেই খা খা মাঠে ,এখন কিনা আছে কেবল একলা লুলু বানু! সে গরু খুটা দেয় দেয়, আর চারপাশরে দেখে! আশপাশ সুমসাম; শুধু চক্ষের সামনে লাল, শুধু লাল! শুধু মাথার ওপরে রোদ! ঝলক-বলক হলুদ রোদ! সেই রোদেরে-এই একবার মনে হয় যেন সর্ষে ফুলের মতো কচি হলুদ রঙা! এই মনে হয়- যেন সেই রোদ মিষ্টি কুমড়ার ফুেলর মতন! দগদগা হলুদ। সেই রোদের দিকে চোখ যায় লুলু বানুর! তার হাতের খাইট্টা হাতেই থাকে, সে আর গরুর খুটায় বাড়ি দেবে কী! তার হাত ওঠে না, চোখ সরে না!

মাঠে জনমনিষ্যি নেই। ভোর বেলাবেলি যারা গরু চরাতে এসেছিল, তারা কখন বাড়ি ফিরে গেছে! যাওয়ার আগে-অই তো-লম্বা দড়ির খুটা গেড়ে, গরুছাগলদের নিজের নিজের মতো করে চরতে দিয়ে গেছে! এতো বেলায় এইখানে এখন একলা শুধু লুলু বানু ! শিমুলের ডালে ডালে একটু একটু লিলুয়া বাতাস নড়েচড়ে, সেইটা দেখে দেখে লুলু বানুর মনও যেন কেমন একটু লড়েচড়ে! “থাকি তাইলে এট্টু এইনে? বই এট্টু? এট্টু জিরাই নাইলে? এতো জলদি বাইত যাওনের কোন ঠেকা! যামুনে এট্টু পরে!” এমন কথা মনে নিয়ে নিয়ে লুলু বানু একটু হাঁটেচলে, তারপর শিমুল গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে পড়ে।
দক্ষিণে ওই কত দূরে রেলের পুল! ওই দেখা যায়! যেন লাল একখান রেখা! সেই পুলেরে লুলু বানু কোনোদিন কাছ থেকে দেখে নাই। ওইটা আসলে দেখতে কেমন-সেইটা একটুও জানে না লুলু বানু। শুধু এমন দূরের মাঠক্ষেত থেকেই ওইটারে আবছা দেখেছে লুলু বানু! একটা লম্বা লাল জিনিস তার ওপর দিয়ে রেল যায়।

যদি বিদ্যাশিক্ষার উপায় থাকত লুলু বানুর, তাইলে তারে অবশ্যই একদিন - সেই দূরের টাউনে যেতে হতো! রেলে চড়ে তখন তো এই পুলের ওপর দিয়েই -টাউনে যাওয়া লাগতো!। সেই টাউনেই না রাক্ষসের রাজত্বি! সর্বনাশ! লুলু বানু কিনা সেইখানে যাওয়ার কথা মনে আনতাছে!

থাক! তার ভাইগ্যে লেখা নাই যে,সেয় অই পুল দেখে! তার ভাইগ্যে বিদ্যাশিক্ষা করোনের কথাও লেখা নাই! তাইলে কেমনে তার বিদ্যাশিক্ষা হইবো? তাগো গ্রামে পড়ালেখা কে করে ! কেউ করে না! সেইটা করে শহরের লোকেরা! আর দেখো সেইখানেই -রাক্ষসেরা বসত করে! লুলু বানু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
 
কেনো সে অমন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে? সরষে ফুলের মিঠা গন্ধে-তার উথাল-পাথাল লাগে বলে অমনটা করে? নাকি রাক্ষসদের কথা স্মরণ করে তার ভয় লাগে বলে সে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে! সেইটা সে বোঝে না। অই দেখো, সরিষার ফুলে ফুলে ভোমরারা কেমুন ওড়াওড়ি ঘোরাঘুরি করতাছে! কেমুন আওয়াজ যে করে ভোমরাগুলি! ভোম ভোম ভোম ভোম ভোম- ভোম ভোম ভোম! ভোমরাগিলি একবার যুদি আওয়াজ করোনে একটু ক্ষান্তি দেয়! ইস! ভোম ভোম ভোম ভোম করে চলতাছে তো চলতাছেই! এতো আওয়াজ কেমনে করো রে ভোমরার গুষ্টি?

এইমতে একটানা ভোমরার ভোম ভোম শুনতে শুনতে লুলু বানুর হঠাৎই খেয়াল হয়; সে বহুতক্ষণ ধরে, জনমনিষ্যিহীন মাঠে, একা একলা,এই যে লেট দিয়ে বসে আছে!
 
তখন একবার লুলু বানুর মনে হতে থাকে, ‘যাইগা বাইত! এমনে এইনে বইয়া থাইক্কা কাম কী!’ একবার তার মন বলতে থাকে,‘ আট্টু থাকি! থাকলে কি অয়?’
 
মিয়া ভাইয়ে যে ক্যান বিদ্যাশিক্ষার ধারে কাছে গ্যাল না! গেরামের যেট্টুক ল্যাখাপড়া আছে, সেট্টুকই তো কিছুতেই করলো না সেয়! তারে কত জোরজবরদস্তি করা হইলো, কত বুঝানো-শোনানো! কত তারে তোয়াজ-তোষামদ করা! কত মিনতি কত দোহাই! কিন্তু কার কথা কে কানে তোলে!’

ওদিকে সেই ভাইয়ের বইন হইয়া- লুলু বানু ক্যামনে বিদ্যাশিক্ষা করে! সেইটা ক্যামনে হবে? যুগ-জনম ধইরা, গেরামের ঘরে ঘরে সগলেতেই জানে, তাগো দুনিয়ার -মাইয়া মাইনষের চুলা গুতান্তিই সার! মাইয়ালোকে জন্মই নেয়- পাতিল ঠেলনের লেইগা!’
 
অমনসব কথাবার্তার মধ্যেও তো- সে- যেট্টুক পারছে,পড়তে চাইছেই। কিন্তুক ঘরের সগলতে তার বিদ্যাশিক্ষার টান-টানানীরে একেবারে গোণায় ধরে নাই! তারা জানে তো, ঘরের মাইয়া সন্তানরে- পড়ানো আর না-পড়ানো একই কথা! সেই কথা লুলু বানুও তো জানে!’
 
কাজেই ঘরের পাঁচজনে তখন- লুলুবানুরে আর আগাইতেই দেয় নাই! লুলু বানু তখন বিদ্যাশিক্ষা করোনের লেইগা জনমকার কান্দন কান্দছে! তারবাদে আর সে কোনোদিন- বই হাতে নেয় নাই! বইয়ের দিকে একবার- ফিরাও তাকায় নাই সেয়! কিন্তু সে দেখছে,বিদ্যাশিক্ষার লেইগা তার মনখানে, কেবলই টাটায়ে যাইতাছে! সেই টাটানীর কোনো থামা-থামন্তী নাই! চুপে চুপে কেবল টাটায়! খালি টাটায়ে চলছেই!’
 
এই যে দেখো-এই এখন-কেমন উড়াধুরা বাতাস দিতাছে! দেখো! এইটা কোনো একটা-আস্তা লম্বা একখানা বাতাস না! এই য্যান-এই কেমন ছোটো ছোটো- টুকরা টুকরা বাতাস! এই বাতাসে সরিষা ফুলের গন্ধমাখানো আছে! কেমুন য্যান লেবু লেবু গন্ধ! কেমুন অচিন লাগতাছে অমুন গন্ধঅলা বাতাসরে!’

নিজের সমস্তটা শরীরে- সেই গন্ধের ঝাপটটা পেতে পেতে- লুলু বানুর মাথাটা আচমকাই একটা কেমন ধাক্কা পায়! তার মাথায় কী পড়লো এইটা! ওপর থেকে তার মাথায় কী পড়লো এমন? ধুপ!

 ওপরের শিমুল গাছের ডাল থেকে একটা মস্ত বড়ো আর দপদপা লাল শিমুল ফুল দেখো- ঝরে পড়েছে লুলু বানুর মাথায়! ‘তোবা তোবা! ফুলটায় পড়োনের আর জাগা পাইল না? আমার মাথাটা ছাড়া-আর কোনো জাগা পাইলো না উয়ে!’ শিমুলফুলের কীর্তি দেখে- একা একাই- হেসে কুটিকুটি হতে থাকে লুলু বানু! ‘ কী কারবার দেখো!’
 
এমন একলা হাসোনের মধ্যে থাকতে থাকতেই লুলু বানু টের পায়, অই যে তার আশপাশে- খাটো খাটো, ঠান্ডা, লেবুগন্ধঅলা বাতাস বইতাছে! সেই বাতাসে য্যান - লুলু বানুর চোখ দুইটারে আর- জাগনা থাকতে দিতে চাইতাছে না! চোখ ভাইঙ্গা ঘুম আইতাছে লুলু বানুর! লুলু বানু আর- একটু অল্পও- জাগনা দিয়া থাকে, সেই সাধ্যিই তার নাই! বাড়ির পথে তাইলে অখন সেয়-কেমনে হাঁটা ধরবো? কী জানি কেমনে যাবে সে!

সেই লালে-লাল শিমুল গাছের তলায় বসে- ওই হু হু নিরালা মাঠেই- চক্ষের পলকে ঘুমিয়ে যায় লুুলু বানু!


।।চার।।



আছরের আজান হয়ে গেছে- সেই কখন! সন্ধ্যাও তো প্রায় ঘনায়েই আসছে! মাঘমাসের বিকালের রোদ- এই তো আর একটুর মধ্যেই- দুনিয়া থেকে- নাই হয়ে যাবে! ঝুপ করে- নাই হয়ে যাবে! দুপুরের পর থেকে-ইদন নেসা বিবির জানটা যেন আর- পাঁজরার ভেতরে তিষ্টাতে পারছে না! তার পা-দুইটা যেন এক লহমার জন্য থির হওয়ার রাস্তা পাচ্ছে না! তারা খালি ঘর-বার,ঘর-বার করে চলছে তো চলছেই!
 
‘লুলু বানু অখনও বাইত আসে না ক্যান! তারে সাফসাফা করে বলা আছে, গরু দুইটারে খুটা দিয়া- লগে লগে সেয় য্যান- বাইত আইয়া পড়ে! কই! সেয় তো হুকুম মাফিক- ফিরা আসে নাই! আইচ্ছা বুঝলাম, গরুগো ঘাস খাওয়াইয়া-একবারে নিজের লগে কইরা- ফিরত আনার নিয়ত করছে সেয়! বুঝলাম, বেলা একেবারে পইড়া যাওনের পরে- ফিরত আওনের নিয়তই করছে উয়ে। কিন্তুক সেই বেলাও তো-সেই কোন আগেই- ঢইল্লা পড়ছে! তাইলে উয়ে এহনও আসে না ক্যান! লুলু বানুর কী হইলো? হায় হায়! গরুটিরই বা কী কোন দশা হইলো! কেও সেই খোঁজ অখন- কেটায় আইন্না দেয়! না ইদু মিয়ায় না মুনিষটায় কেউই তো শিমুলকান্দি তেনে ফিরে নাই! পিছামারার ছাওয়েরা কোন মউজ করতাছে কেটায় জানে! বাড়ির কথা মনে রাখোনোর কোনো ঠেকা নি আছে অইগুলানের! এখন, কার কাছে যায় ইদন নেসা বিবি, কারে জিগায়! কী করে!’ তরাসে ছটফটাতে ছটফটাতে শেষে তার মনে পড়ে যে, ফালানি তো ঘরেই আছে!
 
ফালানি বিবি হাড়ির শোকে পাথর হয়ে, সেই যে দুপুরের কালে কাৎ হয়েছে, আর তার নড়নচড়ন নাই! রান্না খাওয়া- সব বাদ। কিসের জন্য আর এইসব করা! এই দুনিয়াতে আর থাইক্কা ফায়দা কী! এমুন সোন্দর হাড়িটা অমুন কষ্টের ট্যাকায় কিনা জিনিস! পারছে ফালানি বিবি- সেইটারে রাখতে! পারে নাইক্কা! একেকবার হাড়িটার কথা তার মনে আসতাছে; আর অমনেই য্যান- কইলজার ভিতরে -আগুনে দবদবানি দিয়া উঠতাছে! আহ্হারে!

অমন আগুনে-পুড়ন্তি থাকোনের সময়ে সে কিনা শোনে ইদন নেসা বিবির ডাক! খালার ডাকটারে য্যান এট্টু কেমুন শোনাইতাছে! ডাকটারে য্যান কেমুন ভয়তরাসে ভরা ভরা শোনাইতাছে! ফালানি ফালানি লো!

এমুন ডাকের জব নি না-দিয়া থাকোন যায়! আর নি তখন ফালানি বিবি ঘরে বইয়া থাকতে পারে! লুলু বানু বইনে না সোনার মাইয়া! তার কী হইলো! ওরে খোদা!
 
ফালানি বিবি পড়িমরি করে লুলু বানু বইনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। তবে ক্ষেতের দিকে পা বাড়ানোর আগে সে; বাড়ির চাতাল-আতাল, সজনাগাছের তলা, আর কুয়াতলায়- একটা চক্কর দিয়া নিতে ভুল করে না! গোয়ালঘরে উঁকি দেয়! লুলু বানু বইনে চুপেচাপে বাইত আইয়া নি বইয়া রইছে কোনোখানে!

না! কোনোখানে তার কোনো চিহ্ন নাই। পড়শিগো কারো ঘরে সে নাই, বাড়ির ঢালের তিসিক্ষেতের সামনের আঙিনায় নাই। তাইলে আর বাকি থাকে কী? বাকি থাকে শুধু গরু চরানোর মাঠে গিয়া খোঁজ নেওয়ার বিষয়টা! ফালানি বিবি গরু খুটা দেওয়ার মাঠখানের দিকে হুড়মুড় ছোটে! ঘন আন্ধার হওয়ার আগে তো সেইখান থেকে তারে ফিরেও আসা লাগবে! সে একলা মেয়েমানুষ- সেইখানে যাইতাছে!

‘ফালানি লো মা, এট্টু আস্তে যা! আমি নি তর লগে লউরাইয়া পারমু?’ পেছনে থেকে ইদন নেসা বিবির গলা ফালানির দিকে - পড়িমড়ি আসতে থাকে! হাঁফাতে হাঁফাতে আসতে থাকে। ‘ও! খালায়ও তবে আইতাছে! তাইলে আর ফালানি বিবির ডর কিয়ের! এহন তো তারা দুইজন!’
 
তার দুইজনে সেই ভরসন্ধ্যার কালে- হা হা বিরান মাঠে গিয়ে দেখে, অইত্তো দেখো লুলু বানু! অই তিনসন্ধ্যার কালে- অইখানে- কি করে সে? সে কিনা শিমুল গাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে ঘুমাইতাছে!

‘হায় হায় হায়! হায় হায় হায়! এমনে এইনে পইড়া রইছে মাইয়ায়! এইটা কিমুন কথা! কি অইছে রে বইন? আমাগো সোনাবান্ধব বইন! কি অইছে তর?’ ইদন নেসা বিবি দৌড়ে গিয়ে লুলু বানুকে ধরে। সেই পরশখান লুলু বানু পায় কী পায় না- ধড়মড় করে জেগে ওঠে সে! জেগে উঠেও সে যেন সত্যকারের জাগনা পায় না! সে তখন কেমন একরকমের তবদা-লাগা চোখে- সামনের দিকে চেয়ে থাকে। ইদন নেসা বিবির দিকে তো তাকায়ই না, ফালানিরেও যেন তার খেয়ালে আসে না! লুলু বানুর অই চেয়ে থাকাটাকে দেখে পরিষ্কারই বোঝা যায়, ওটা শুধু কোনোরকমে চোখ খুলে রাখা মাত্র! ওই চোখ আদতে এখন কিছুই দেখছে না!
 
মাবুদ মাবুদ! লুলু বানুরে নিয়া - আর তো অই বিরানে- খাড়াইয়া থাকা চলে না! ইদন নেসা বিবির কাছে-লক্ষণ তো ভালা মনে হইতাছে না! তরাতরি গরুর খুঁটা তুলে হাঁটা ধরে ফালানি বিবি। দাদিই অখন তার নিজের নাতিনরে ধইরা নিয়ে চলুক! সেইটাই ভালো। জোর কদমে হাঁটা ধরে ফালানি বিবি।
 
দাদি এদিকে দোয়া দরুদ পড়ে! নাতিনের মাথায় আউলা-পাথাইল্লা ফুঁ দেয়! তারবাদে থেকে থেকে, নাতিনের পিঠে থাবড়া দিতে থাকে! হুঁশে আয় ধন! হুঁশে আয়! কিন্তু লুলু বানু আহও্ করে না, উহুও করে না, সাড়াও দেয় না! সে খালি তার দাদির লগে লগে হাঁটতে থাকে!
 
তবে, সেই হাঁটাও য্যান কেমন! য্যান কেউ একজনে একটা পুতলারে মাটি দিয়া হ্যাচড়াইয়া নিতাছে! আইচ্ছা! যেমনে হাঁটে হাঁটুক এখন লুলু বানু! আগে তো এখন মানে মানে বাইত যাওয়া হউক! তারপর টোটকা কবজ পানি- পড়া- যা কিছু আছে, সব দিয়া, লুলু বানুরে দোষছাড়া কইয়া নেওয়া যাইবো নে! দুনিয়ায় বানবাতাস যেমন আছে, মুশকিল আসানও তো তেমন আছে! আল্লা আল্লা!
 
‘লুলু বানু, ঘুমাইয়া গেছিলি ক্যান বইন? নিরালা পাতরে- মাইনষে এমনে ঘোমায়?’ ইদন নেসা বিবি কথা চালানোর চেষ্টাটা ছাড়ে না! লুলু বানু কোনো উত্তর দেয় না। শুধু আলপথ ধরে হাঁটতে থাকে- থপর থপর। ফালানি বিবি গরুবাছুর খেদানী দিতে দিতে -আগে আগে যেতে থাকে ঠিকই, কিন্তু কান তার পাতা থাকে- অই দাদি নাতিনের দিকেই। ‘হায় হায় হায়! লুলু বানু বইনে দি কোনো রাও করে না!’ ফালানি বিবির পরাণ ছাঁৎ করে ওঠে। তার অনেক ডর লাগতে থাকে! কিন্তু গরু খেদিয়ে খেদিয়ে সে এমন ভঙ্গীতে হাঁটতে থাকে, যেন তোদার দুনিয়ায় কিছইু হয় নাই!

ওই যে বাড়ির ঘাটা দেখা যায়!
 
বাড়ির ঘাটায় খাড়া আছে-ঝাঁকড়া জোয়ান জাম গাছখানা! ডালাপালার শেষ নাই তার। লুলু বানু কিনা সেই বেঘোর সন্ধ্যাকালে- হুড়মুড় -সেই জামগাছে উঠে যায়! আতকার উপরে এইটা কী গজব আইলো! খোদা! দাদি থ মুখে তাকায়ে থাকে! মুখ দিয়ে তার একটা কোনো রাও বের হয় না! ফালানি বিবি ডরে কাঁপতে থাকে। গরু যে গরু- তারাও তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এইটা কী হইলো! এইটা কী! লুলু বানু বইন বইন নাইম্মা আহো নামো নামো!
 
কিসের নামানামি- কিসের ডাকাডাকি! লুলু বানু কিচ্ছু শুনতে পায় না। কোনোদিকে চেয়ে দেখে না! সে জাম গাছের মাঝামাঝির ডালপালার বসে, পা ঝুলিয়ে দিয়ে, বিলাপ করা ধরে, উ উ উ উ উ!

রাত ঘন হতে থাকে, লুলু বানু গাছ থেকে নামে না! তার টানা বিলাপ- টানা চলতেই থাকে। শীত ক্রমে তাগড়া থেকে তাগড়া হতে থাকে, বুড়া মানুষ ইদন নেসা বিবি -কতক্ষণ এমুন জারের মধ্যে- জাম গাছের গোড়ায় বইয়া থাকতে পারে! ওশ ধীরে ঘন হয়ে উঠতে থাকে! ওশেরে ক্রমে- ঘর লেপাপোছার পানিগোলা মাটির মতন - ভারী আর ঘোলা ঘোলা লাগতে থাকে! এমুন ওশের মধ্যে- ফালানি বিবি ক্যামনে নিজে বসে থাকে! ক্যামনে বুড়ামানুষ খালারে বইসা থাকতে দেয়! দুইজনে একবার ঘরে যায়, একটু কাৎ হয়, আবার আন্ধার জামতলায় আসে!
 
গাছের আগায় লুলুবানু - যেমনকার বসা ছিল- তেমনই বসা আছে! ঘোরতর বানবাতাস না লাগলে- এমুন দশা হইতে পারে কোনো মাইনষের? হইতে পারে না! এটা তারা দুজনেই বুঝে ওঠে। এখন, রাত না-পোহাইলে তো কিছু করোনের কোনো উপায় নাই! এই দুই মাতারি-কেমনে গাছে চড়ে,কেমনে অই পাগলা ছেড়ীরে নামায়ে আনে! দুই বেটার একটায়ও তো ফিরে নাই! হায় হায় রে!
 
ভোররাতের কালে, ঘরের সকলে যখন ঘরের ভিতরে প্রায় দাঁতি খেয়ে পড়ে আছে, তখন লুলু বানু, শীতে হিমকাষ্ঠ হওয়া শরীরটারে নিয়ে হেঁচড়ে-পাছড়ে নেমে আসে! নেমে, সে আন্ধাধোন্ধা কতক্ষণ উঠান ভরে হাঁটে! পরনের কাপড় তার আউলা-ঝাউলা, আঁচলখানা দেখো মাটিতে কী হ্যাচরানই না হ্যাচরাইতাছে! কোনোদিগে কোনো হুঁশ নাই তার। ‘লুলু বানু, আমার কইলজার টুকরা! ঘরে আহো মা! তোমার মায়ের কথাখান শোন ধন!’ মায়ে কত ডাকে। লুলু বানু শুনতে পায় না। বুজি পানিপড়া এনে শরীরে ছিটাতে থাকে; দোষ কাট্ দোষ কাট্! দোষ কাটবে কী, পানিপড়া শরীরে লাগা মাত্র, লুলু বানু চিল্লানি দিয়ে ওঠে। তারপর কুয়ায় ঝাঁপ দেওয়ার জন্য লৌড় দেয়! আল্লা-আল্লা! রক্ষা করো মাবুদ!
 
বাড়ির লোকের ডাকচিৎকারে, বাড়ির উঠানটা, চক্ষের পলকে অড়শি-পড়শিতে গিজগিজা হয়ে যায়! পুরা গ্রাম ভেঙে পড়ে ইদু মিয়াদের উঠানে। হুজুরে আসে, তেল পড়া আসে। তাবিজ-কবজ, কোরান-খতম, সোনা-রূপা ভেজানো পানি ছিটানো- চলতে থাকে। যত এসব চলতে থাকে, তত লুলু বানু , বিলাপ করতে করতে দাঁতি লাগতে থাকে।
 
দাঁতি ভাঙলে পরে, কোন ফাঁকে যে সে, গাঙে গিয়ে ডুবানো শুরু করে! ঘরের কেউ টের পায় না। খোঁজ খোঁজ খোঁজ! হায় হায়! শেষে পাড়ার পোলাপানরা সংবাদ আনে, অই ত্তো দেহো গা! লুলু বানু গাঙে ডুবাইতাছে! চোখ তার টকটক্কা লাল! তাও হেয় ডুবান বন্ধ করতাছে না! কেউঅইর ডাক হোনতাছে না।

সকলে মিলে জোরজবরদস্তি করে -গাঙ থেকে তুলে নিয়ে আসে তারে; কিন্তু ঘরে এনে ফল কী! অই ত্তো! আবার দাঁতি লাগতাছে তার! হায় হায়!
 
বেতালা-বেবোধা হয়ে যাওয়া সকলে তখন বোঝে, পোক্তরকমে বাইন্ধা থোওন ছাড়া- এই মাইয়ারে রক্ষার - আর কোনো রাস্তা নাই! মোটা কাছি দিয়ে লুলু বানুরে, ঘরের খাম্বার সঙ্গে শক্ত করে বান্ধা হয়। বান্ধা দশায়ই- এই একবার সে দাঁতি লাগে, এই একবার তার দাঁতি ভাঙে। এদিকে, মুখে একটা কুটাগাছসুদ্ধা কাটে না লুলু বানুয়ে! হায় হায়! না-খাইয়াই তো মইরা যাইবো গা উয়ে! হায় হায়! ইদন নেসা

বিবির হাতরথে আর কোনো বল নাই। তার কারণেই তো পরাণের নাতিনের এই হাল। এইবার আল্লায় তারে তুইল্লা নেউক। লোকসমাজে আর তার মোখ দেখানের উপায় নাই!

খবর পেয়ে হরদিশা হয়ে ওস্তাদজীয়ে আসে। লুলু বানুর যা কিছু বিদ্যাশিক্ষা, সবই সে এই ওস্তাদজীর কাছেই করছে! এই মাইয়ার - বিদ্যাশিক্ষা করার কেমুন বাসনা আছিল সেইটা খালি তার ওস্তাদজীই জানে! এমুন জান-পরাণ দিয়া বিদ্যাশিক্ষা করতে চাওয়া পাগলা- আর কী এক জনও আছে এই গেরামে? ওস্তাদজী কিরাকমস খাইয়া কইতে পারে, একটাও নাই। এই গ্রাম তো দূর, আশপাশের পাঁচ গ্রামের মধ্যে সুদ্ধা,কেউ নাই। একজনও নাই। সেই লক্ষ্মীর কপালে এমুন বিপদ! ওস্তাদজী দড়িবান্দা লুলু বানুর পাশে বসে থাকে। তার চোখ দিয়া দরদরায়ে পানি নামার বিরাম থাকে না!
 
লুলু বানু মাটিতে বসা লুলু বানু- চোখ বন্ধ করে বিলাপ করতাছে তো করতাছেই। বিলাপের বিরাম নাই, থামা-কমা নাই! চলছে তো চলছেই। বিলাপে বিলাপে লুলু বানু কী জানি কী বলে! ওস্তাদজী কান খাড়া করে। কী বলে মাইয়াটায়! ‘আমি টাউনে যামু! আমারে টাউনে যাইতে দে! আমার বিদ্যাশিক্ষা হয় নাই। আমি বিদ্যাশিক্ষা করমু! আমারে ছাইড়া দে! আমি টাউনে যামু। ওরে আমার বিদ্যাশিক্ষারে! তেমন দিগে নেও রে আমারে! টাউনরে, তুই কই থাকো? বিদ্যাশিক্ষা- বিদ্যাশিক্ষা গো! তোমাগো বাড়ি কই!’ বিলাপে বিলাপে অই একই কথা,লুলু বানু, বলে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই! অই কথার কোনো থামাথামি নাই! কোনো একটু বিরাম-সিরামও নাই! হায় রে কপাল! লুলুবানু এইগুলা কী বলে!
 
এমন বাতাস লাগা- আগানগর গ্রামের কেউ কোনোদিন- দেখে নাই। আর দশটা বাতাস লাগা, যা কিনা গেরামের বৌ ঝিগো নিত্য লাগতাছে সেই বাতাস-লাগা তো এমুন না! অমন বাতাস-লাগাগো কেউ কেউ খিলখিলাইয়া হাসা শুরু করে! তারবাদে তারা হাসতে হাসতে দাঁতি খায়। কেউ কেউ কান্দে! কান্দে কান্দে! কান্দতে কান্দতে দাঁতি খায়। মুখ-নাক দিয়া তাগো গ্যাজলা লালা বাইর অয়! তখন তাগো নাকের সামনে মরিচ-পোড়া নিয়া ধরো! ব্যস! সব ঠান্ডা। তাবিজ-কবজ নিয়া তাগো ডাইন হাতে আর কোমরে বান্ধো! সব ঠিক!
 
লুলু বানুরে তো কিছুই ধরতাছে না! উপরুন্ত তার উপরের ভর য্যান ক্রমে বাড়তাছে। আর এইটা কেমুন বাতাস লাগছে অর? এই বান-বাতাসে কিনা বিদ্যাশিক্ষাগো বাড়ি বিছরাইতাছে! লোকেরা ডরে টাসকি খেয়ে যায়। যাহা তাহা বাতাসে তো তাইলে ভর করে নাই লুলু বানুর উপরে! বহুত জাঁহাবাজ কিছু একটায় তো তাইলে ভর করছে! খোদা খোদা!।
 
এইভাবে মাস যায়, বছরও যায় যায় প্রায়! ভর-লাগা লুলু বানু যেমন বেধোন্ধা আছিল,তেমন বেধোন্ধাই থাকে! ঘরের মানুষে -এমন নাড়াঝাড়া- আর কত সহ্য করবো! ইদু মিয়ার বিয়াশাদীর দিন আসতাছে না? জুয়ান পোলা! ইদু মিয়ায় চেতাচেতি করতে থাকে! এমুন আগলা-পাগলা অবস্থাটার মধ্যে -কোন বাড়ির মাইয়াটা আইসা- শান্তিতে থাকবো! নতুন বৌয়ে- ডরাইয়া মইরা যাইবো গা না? মায়ে-বুজিয়ে এই বাতাস-লাগাটার কী ব্যবস্থা করবো-করুক সেইটা!
 
এই যে ইদু মিয়ার এমন না-হক চেতাচেতি এইটাও কি এমনে এমনে? এইর পিছে বান-বাতাসের বিটলামীটা নাই? আছে! খুবই আছে। সেইটা সকলেই বোঝে, কিন্তু আগুনের জ্বীনের লগে কী মাটির মানুষে জোলাইয়া পারে? পারে না!
 
তখন খবর পেয়ে ওস্তাদজী আবার আসে! শেষে সাব্যস্ত হয়, ওস্তাদজী লুলু বানুরে নিয়া টাউনে রেখে আসবে! শোনা কথা থেকে ওস্তাদজী জানে, এই গ্রামের চল্লিশ ক্রোশ পরে যে টাউনটা আছে,সেইখানে আছে এক গুরুর আশ্রম! লুকিয়ে-চুরিয়ে সেইখানে লুলু বানুরে নিতে যেতে পারে ওস্তাদজী! তারবাদে ওস্তাদজী- সেই গুরুর হাতেপায়ে ধরতে হলে ধরবে! এইমতে হইলেও যুদি -লুলু বানুরে সেইখানে -রাইক্ষা আসোন যায়! বাকি লুলু বানুর কপাল।
 
পরদিন ভোরবেলা, আগানগর গ্রামের মানুষ, তাদের ডরে কাঁটা দিতে থাকা জনপ্রাণ নিয়ে দেখে যে, অই ত্তো লুলু বানুরে টাউনে যাইতাছে! অই তো ওস্তাদজী- লুলু বানুকে শহরে নিয়ে যাচ্ছে! সবাই জানে, শহরে আছে রাক্ষসের রাজত্বি। সবাই জানে, এই যাওয়া লুলু বানুর শেষ যাওয়া। রাক্ষসদের দুনিয়ায় গিয়ে আর কোনোদিন কেউ ফিরে আসতে পারে নাকি! পারে না! বাইচ্ছাই তো থাকে না! ফিরোন তো দূরের কথা!


।।পাঁচ।।

অনেক বছর ধরে, টাউনের দেশে, রাক্ষসের রাজত্ব চলছে। রাক্ষসের রাজত্বের আগে, কোনো এক কালে, ওটা মানুষদের রাজত্বের দেশ ছিল। সেটা কবে ছিল, একথা এখন- এই নতুন কালের মানুষের - একটুও জানা নেই। যারা জানে, তাদের দু’চারজন মাত্র এখন বেঁচে আছে! গোপনে,লুকিয়ে-চুরিয়ে,বেঁকে-চুরে, কোনোমতে বেঁচে আছে তারা। এমন কী, ঘরে- একলা নিজের কাছেও - তারা কখনো স্বীকার করে না যে, মানুষের রাজত্ব কালের কথা-তাদের স্মরণে আছে!
 
রাক্ষসেরা তাদের শাসনামলের একেবারে গোড়াতেই ফরমান জারি করে, আগেকার মনুষ্য-রাজত্বের কথা- কিছুতেই স্মরণে রাখা চলবে না! রাক্ষসদের কাছে যেসব মানুষকে স্মরণবাদী বলে সন্দেহ হতে থাকে, তাদেরকে তারা বিনা জিজ্ঞাসাতেই পীড়ন করা শুরু করে! বিবিধ বিকট পীড়ন দিয়ে দিয়ে অইসব মানুষের শরীর এবং মস্তিষ্ক -তারা কদর্যরকম অথর্ব করে দেয়! সেই ভয়াবহতাকে প্রত্যক্ষ করে,দেশের সকল স্বস্তিবাদী,আগেকার সকল কথা একেবারে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে ভুলে যেতে শুরু করে!
 
লোককে বিস্মরণময় করে রাখার জন্য শুধু ওই একটি পন্থা গ্রহণ করেই রাক্ষসেরা সন্তুষ্ট থাকেনি! তারা অন্য আরেকটি ব্যবস্থাও গ্রহণ করে। এবং সেটিও অতীব কার্যকর একটি ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়! রাক্ষসেরা করে কী, মুদ্রার তোড়ে লোককে ভাসিয়ে-উড়িয়ে নেওয়া শুরু করে!
 
যে যত বিস্মরণ-দক্ষ বলে নিজেকে প্রতিপন্ন করতে পারে, তার দিকে তত মুদ্রার তোড় বইয়ে দেওয়া হতে থাকে! মুদ্রার ঝনৎকারে ও মুদ্রাস্পর্শের সুখে- দেশের বড়ো একটা অংশ- আপসে আপ- গাঢ় থেকে গাঢ় বিস্মৃতিসম্পন্ন হয়ে গেছে!
 
তার পাশাপাশি, অন্য বহুজনও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিস্মৃতিপ্রবণ হয়ে ওঠে! তারা এই আশায় অমনটা হয়ে ওঠে যে, অচিরেই তাহলে তারাও পাবে রাক্ষস অনুগ্রহ! তারাও তবে মুদ্রার উষ্ণ তীব্র তোড়ে ভেসে যাবার ভাগ্য পাবে!
 
রাক্ষসেরা, তাদের রাজত্বের গোড়ার শতাব্দীগুলোতে, এইভাবে মানুষদের দেহে ও অস্তিত্বে শেকলে পরিয়ে নেয়। পরে ধীরে ধীরে পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটায় তারা! তখন ভিন্ন এক প্রক্রিয়ায় শেকল পরানো চলতে থাকে!
 
রাক্ষসেরা প্রকাশ্যে রক্তপাত ঘটায় না, হনন করে না, কিংবা হুড়মুড় গোগ্রাসে কাউকে তারা মুখেও তুলে নেয় না! তাদের আহার প্রক্রিয়া মনুষ্যকুলের মতো নয়। তাদের প্রিয়তম আহার্য মনুষ্য-মগজ এবং একটি তীব্রতম লেহনেই তারা তাদের আহার কর্ম সম্পন্ন করে থাকে! একযুগে একবার ওই আহার্য - তাদের গ্রহণ করতে হয়, আবার একযুগ পরে তাদের খাদ্যের দরকার পড়ে!
 
টাউন শাসক যেই রাক্ষসরাজ,তার খাদ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া অতি শিল্পসম্মত! তার পছন্দ নবীন বিদ্যার্থী মগজ! গুরুগৃহে পাঠ সম্পন্ন করা, চিক্কন, মাথা উঁচোতে থাকা, সরসতম ধীমান মগজ - তাকে খেতে পেতে হয়! বারো বছর একবার করে-অই আহার্যটুকুই গ্রহণ করে সে!
 
অন্য সাধারণ সকল মনুষ্যের মগজ বরাদ্দ করা আছে- সাধারণ রাক্ষসদের জন্য! সেগুলোই তাদের আহার্য, রাক্ষস-রাজণ্যের চাই রাজ্যের মেধাবী মগজ। রাজ্যের মনুষ্যশিশুরা মাতৃক্রোড়, বাল্যাবস্থা পেরিয়ে গুরুতীর্থে প্রবেশ করে। সেখানে দ্বাদশবর্ষ অতিক্রান্ত হলে তারা স্নাতক হয়ে ওঠে। স্নাতক হবার জন্য সকলকেই দুরূহ পরীক্ষার স্তর পেরুতে হয়, তবে এই রাজ্যে সেরা বিশজন হবার পথ হচ্ছে দুরূহতম।
 
বিদ্যার্থীরা অনলস দেহমন নিয়ে অনুশীলনের দুস্তর পথ পাড়ি দেয়! তাদের সকলের প্রাণই এই বাঞ্ছায় তড়পাতে থাকে যে, প্রথম বিশজনের একজন তার হওয়া চাইই চাই। বিদ্যার্থীদের চেয়েও অধিক উদ্বেগাকুল, অস্থির হয়ে থাকে অভিভাবকেরা। নিজ সন্তানটিকে প্রথম থেকে বিংশতিতম স্থানের- যে কোনো একটিতে দেখার উদগ্র বাসনায়- তারাই দিবারাত্র ছটফটাতে থাকে।

কোনো তাদের অমন কাতরতা থাকে?

সেই কারণটা কেউই কখনো মুখে বলে না! তবে মনে মনে সকলেই জানে-কেনো তারা অমন উদগ্ররকমে কাতর হয়ে থাকে!
 
দেশ দখল করে নেওয়ার প্রথম বছর থেকেই- রাক্ষসরাজা করে কী- দেশের প্রথম বিশজন স্নাতককে - রাজকীয় সম্মান দেওয়া শুরু করে। তখন পুষ্প ও লালগালিচায়- দুগ্ধধবল ময়ূরপঙ্খী জলযান সজ্জিত হয়। আর, রাজা স্বয়ং প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে থেকে স্নাতকদের স্বাগত জানায়! খাদ্য পানীয় দিয়ে আপ্যায়িত হতে হতে, স্নাতকগণ দেখে,রাজন্য স্বয়ং তাদের যত্নআত্তির তদারকি করছে!
 
নগরে পিতামাতাগণ গৌরবে ফুলে উঠতে থাকে! আর, জলযান যেতে থাকে দূরে থেকে দূরে, সমুদ্র মোহনার দিকে। পূর্ণিমার মধ্যরাতে দশদিক যখন জ্যোৎস্নায় ঝলমলাতে থাকে, জাহাজের ডেকে স্নাতকেরা যখন হাসিহুল্লোড় আর নৃত্য-সঙ্গীতে তুমুল মেতে যেতে থাকে, তখন নিরিবিলি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে- রাজা ছড়াতে থাকে তার জিভ। সে জিভ বিস্তার করে দিতে থাকে- স্নাতকদের দিকে।
 
সবকটা নবীন মাথার ওপরে - রাজা ধীরে ধীরে ছড়ায়ে দেয় - তার আগুনলাল লকলকে জিহ্বা! তারপর সাপটে লেহন করে। তীব্র প্রবল লেহন! একবার! একবারই যথেষ্ট। তার ছলবলে, লেহন-অধীর জিহ্বা সবকটা বিদ্যার্থী- মগজকে লেপ্টে নিয়ে আসে ! আর খুলির ভেতরে হয়তো ফেলে রেখে আসে দুচার ফোঁটা লালা!

বাইরে বিদ্যার্থীদের খুলি থাকে অবিকল, অটুট, স্বাভাবিক! শুধু খুলির ভেতরটা ফাঁকা ধু ধু! চৌচির শুকনো পুকুর- প্রায়! তার এককোণে শুধু পড়ে থাকে কয়েক ফোঁটা তাগড়া লালা।
 
যন্ত্রণা ও খিঁচুনি কুঁকড়ে-দুমড়ে দিতে থাকে স্নাতকদের শরীর! তবে তা পলকের জন্য মাত্র। তারপরেই আবার যেন জেগে ওঠে তারা! নব উচ্ছ্বাসে, উপভোগ ও ভোগের স্পৃহায় খলবলাতে থাকে তারা! বোধ করতে থাকে লোভ! প্রবল লোভ ও উপভোগের লালসায়- ভরে যায় তাদের খুলি। ওইসবকিছুই জন্মাতে থাকে- খুলির ভেতরে পড়ে থাকা লালা থেকে।

ধু ধু খুলিতে স্তূপীকৃত লোভ ও লালসা ও আত্মপরতা নিয়ে- তারা ফিরে আসে ডাঙায়। ডাঙায় তাদের স্বজনেরা তখন সুখে উল্লসিত, প্রীত, সন্তোষে জ্বলজ্বলে! কত কী উপটোকন আসছে তাদের দিকে! ওইসবকিছুতে রাজন্যের মেধাপৃষ্টপোষকতার গাঢ় স্বাক্ষর মুদ্রিত হয়ে আছে! ওই তো আসছে -বিংশজনের প্রত্যেকের জন্য আসছে- দ্বিচক্র রথ! দ্রুতগামী ও সুদর্শন। আসছে পাত্রবোঝাই মুদ্রা, বিবিধ বস্ত্র, বিনোদন সামগ্রী! এইসব বিনোদনসামগ্রী অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন! এরা কখনো ভোগস্পৃহাকে নির্বাপিত হতে দেয় না! বরং বিচিত্ররকম ভোগস্পৃহ হতেই প্রাণিত করে! সদা সর্বদাই অমনটা করে!
 
এইভাবে যেতে যেতে বহু প্রজন্ম ধরে- টাউনের দেশে বেড়ে উঠেছে- মগজ খোয়ানো মানুষেরা! লোভময় ও ভোগস্পৃহ লোকসকল। এইভাবেই শেকল পরানো তারা! তারা জাগে, কাজে যায়, ঘুমায়, চলতে থাকে, এবং চালাতে থাকে ভোগ ও উপভোগ । মানুষের মতো পুতুলেরা সব! এভাবেই চলছে বহু কাল ধরে। তারা কেউ দেখে না, চিন্তা করে না, ধ্যান ও তপস্যা করে না, নতুন তত্ত্ব ও তার ভাষ্য রচনা করে না, পদার্থবিদ্যার গূঢ় রহস্য ব্যাখ্যা করতে পারে না। দুরূহ তত্ত্বের কথা শুনলে -তারা শিউরে ওঠে! তারা শুধু চাকুরি করে- রাক্ষসদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে! তারা রাক্ষসদের বিধিবিধান মোতাবেকই-চাকুরির জন্য তৈরি হয়!। হুকুম তামিল করে, ফরমাস খাটে, রাক্ষস-খোক্কসদের শীত ও তাপ নিয়ন্ত্রিত সুবিশাল ভবনে- মধ্যরাত পর্যন্ত -বসে বসে কাজ করে। কড়ি গোণার কাজ, মুদ্রার হিশেবপত্র মেলাবার কাজ। এইভাবে অনেক অনেক পুরুষ ধরে- রাক্ষস-খোক্কসদের রাজত্বে- লোকের দিন যায় রাত আসে!
 
সেইখানে লুলু বানু এসে পৌঁছে; মাঘ মাসের বানবাতাসে পাওয়া লুলু বানু! তাকে গোপন কক্ষে লুকিয়ে- সবক দিতে দিতে - অইসব কথা তন্নতন্ন করে জানাতে থাকেন গুরুজি। রাক্ষসরাজের জিহ্বার বেদম সাপটের মধ্যে পড়ার পরেও, কী আশ্চর্য, একদিন তিনি টের পান যে, তার মগজ চিন্তা করছে! ক্রুদ্ধ হচ্ছে! এমনকী স্বপ্ন দেখেছে! ঝাপসা ঝাপসা হলেও স্বপ্ন দেখছে!
 
তাহলে! তাহলে কি কোনো অজ্ঞাত কারণে - তার মস্তিষ্ক সেই সর্বগ্রাসী লেহন থেকে সেইদিন রেহাই পেয়েছিল? খানিকটা হলেও রেহাই পেয়েছিল? হয়তো তাই ঘটেছিল। হয়তো তাই! কিন্তু সে ধন্দের মীমাংসা করার কোনো উপায়ও যেমন ছিল না তার, তেমনি সেটা মীমাংসার ইচ্ছেও তার মনে জাগে নি। তিনি শুধু বুঝেছিলেন যে, ওটা গোপন রাখতে হবে! খুব খুব গোপন! 
 
ওই কথা গোপনই ছিল, আর প্রকাশ্যে চলছিল- বিধিমাফিক চলাচলতি। তারমধ্যে এসে পৌঁছুলো কিনা - এই মেয়ে। যখন দিন ফুরানোর দিন, যখন বিষম কর্কট রোগ বাসা বেঁধেছে গুরুজির শরীরে; এবং ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে তার সকল অঙ্গ! তখন, জীবনের এমন দিনে, ভাগ্য তাকে নিয়ে যে এমন কৌতুক করবে, কে জানতো! একটি বালিকা কিনা ভেসে ভেসে - তার দরোজায়! বিদ্যাশিক্ষার জন্য-তার দরোজায়! ফাঁপা খুলির দেশে এসে পৌঁচেছে কিনা একটা জ্যান্ত হৃদয় ও স্বপ্ন! ওকে -ওকে বাঁচাতেই হবে। কন্যাটির মগজ - তাকে বাঁচাতেই হবে।
 
লালু বানু, তুমি ঘরে ফিরে যাও গো মেয়ে!
 
বিদ্যাশিক্ষা করতে করতে লুলু বানু -গুরুজির সেই হুকুম শোনে! শোনে। কই যাবে লুলু বানু। সে তো জানে, গাঁয়ে ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই তার! গ্রামের লোকেরা চিরদিন ধরে জানে; শহরে, রাক্ষসের দেশে, একবার যে গেছে- সে আর মানুষ নাই! সেও এক ঘোর রাক্ষস ছাড়া অন্য কিছু থাকে না তখন! তেমন এক রাক্ষস হয়ে ওঠা লুলু বানুরে- তারা আর কীভাবে- গাঁয়ে ঠাঁই দেবে!
 
লুলুবানু তার গ্রামের চৌহদ্দিতে- খালি একটা পাও রেখেই- দেখুক না! অরা তারে আস্তা রাখবে? রাখবে না। লুলু বানুর জন্য কানতে কানতেই - গ্রামের সকলে- লুলু বানুরে শেষ করবে! আর, কেনো ঘরে ফিরে যাবে লুলু বানু? বিদ্যা শিক্ষা করার আগুন কী তার অন্তরে নাই! সে কি ভুলে গেছে- সেই অন্তর-জ্বলুনির কথা?

বানবাতাসের নজরে না-পড়লে, অন্তরের অই কথা, অন্তরের কোন ভিতরে যে ঝুম মেরে পড়ে থাকত! তার সন্ধান লুলু বানু পর্যন্ত জানতে পারতো না! এখন, এই যে- এই সেই বিদ্যা! তারে লুলু বানু- একটু একটু করে পাচ্ছে! সেইটার শেষ দেখবে না সে! এই যে পথ! এই পথের শেষ দেখবো না, লুলু বানু? শেষটা দেখতে যে -সাধ যায় তার!
 
টাউনের গুরুজি কেবল তড়পায়! লুলু বানু, ঘরে ফিরা যাও রে। কেমনে লুলু বানু যায়? কেমনে যায়! বান-বাতাসের আছর থেকে কি রেহাই মিলেছে তার? মিলে নাই তো! এখনও, যখন-তখন তার ওই ঝুম ভর হয়, মাথা ঘোরাঘূর্তি চলছে তো চলছেই! লুলু বানুর চাইরপাশের দুনিয়া খালি ঘোরে- খালি চক্কর দেয়! তার গলা দিয়া চিকন সুর বাইর হইতাছে তো হইতাছেই! বেদম বাইর হইতাছে! গ্রামে যেই হাল, টাউনে সেই একই হাল! কই যায় তবে লুলু বানু!

“না গো মেয়ে, ঘরেই যাও গা তুমি!”

‘ এই বান-বাতাসের নিদানের সন্ধান পাইতে মন চায় আমার,গুরুজি!’

“এইখানে থাকলে রাক্ষসেরা একদিন জানবোই! তোমারে বাঁচাইতে পারমু না আমি!”

‘আমার আর বাঁচা-মরা কী!’ লুলু বানু এই জানে বটে, কিন্তু এমনে এমনে আর কয়দিন- এইখানে- থাকে সে!

মন তারে খালি ধাক্কায়, ‘চল রে হাতরথ! যেইদিগে চোখ যায়, যাই গা!’

সেইখানে কি নিদানরে পাওয়া যাবে?

মন বলে, ‘খুঁজলে না মেলে কী?’

ভোর আন্ধারকালে লুলু বানু আবার পথে পথে। ডরে তার পাও কাঁপে, শরীর থরথরায়!

লুলু বানু যায় যায় !

যায়, আর মনেরে সে নানা মতে কত বুঝ দেয়!

সাক্ষী ওই আকাশের মেঘ, উড়াধুরা বাউলা মেঘ!

অমাবস্যা রাতের ঝকমক তারাসকল

সাক্ষী ঊষাকাল! শুকতারা, আর ঘোর কৃষ্ণ আষাঢ়ের মেঘ!

লুলুবানু নিদানের সন্ধান ছাড়া- এই জীবনে- ঘরে ফিরবো না!



লেখক পরিচিতি:

আকিমুন রহমান

ইনডিপেন্ডেট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এ অধ্যাপনারত আকিমুন রহমান পিএইচ ডি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ; আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ, সােনার খড়কুটো, পাশে শুধু ছায়া ছিলাে, পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে, রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া এ মাছি, এইসব নিভৃত কুহক।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ