অনুবাদক : রিটন খান
১
আজ আমার একটানা সতেরো দিন না ঘুমিয়ে কাটানোর দিন।
অনিদ্রা সম্পর্কে আমি কথা বলছি না। কারণ, অনিদ্রা সম্পর্কে কিছুটা হলেও আমার জানা। কলেজে পড়ার সময়, অনিদ্রা রোগের মতো কিছু একটা আমার ছিল। এই 'কিছু একটা' ব্যবহার করার কারণ হলো, সাধারণভাবে পৃথিবীর সবখানে অনিদ্রার যে উপসর্গগুলো থাকে, সে সম্পর্কে আমার যথেষ্ট দ্বিধা রয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে, অনিদ্রা রোগ আছে কি না সেটুকু হয়তো জানা যেত। কিন্তু আমি যাইনি। আমার মতে, হাসপাতালে গিয়েও কোনও উপকার হতো না। এই ধারণার কোনও বিশেষ ভিত্তি ছিল বলে মনে হয় না। শুধু অনুমান ছিল, সেখানে গিয়ে কোনও উপকার হবে না। সেহেতু ডাক্তারের কাছে যাওয়া ছাড়াও, পরিবার বা বন্ধুদের কাছেও কিছু বলিনি। আমি জানতাম, সবাই শুধু বলবে - হাসপাতালে যাও।
প্রায় এক মাস ধরে চলেছিল 'অনিদ্রার মতো একটা কিছু'। সেই এক মাসে একবারও ঠিকমতো ঘুম আসেনি। রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলেই অজ্ঞাত কারণে সচেতন হয়ে উঠতাম। অনেক চেষ্টা তদবিরেও ঘুম আসতো না। যতই ঘুমানোর চেষ্টা করতাম, ততই ঘুম ছুটে যেত। এমনকি ঘুমনোর ওষুধ, মদ কোনটাতেই কোনও কাজ হয়নি।
ভোরের দিকে কিছুটা হালকা ঘুম আসতো। কিন্তু সেটাকে ঘুম বলা যায় এমন নয়। আঙুলের ডগা দিয়ে ঘুমের ডগাকে শুধু স্পর্শ করার মতো একটা অনুভূতি হতো মাত্র। আর আমার চেতনা তখনও সম্পূর্ণ সজাগ। আমি যদিও কিছুটা তন্দ্রায় ডুবে যেতাম, তবুও মনে হতো ঠিক যেন পাতলা দেয়ালের অপর পাশের ঘরে আমার চেতনা স্পষ্ট জেগে আছে এবং সেখান থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার দেহটা মৃদু আলোয় ভাসতে থাকতো, সেই সাথে সে যেন নিজের বোধকেও পাহারায় রাখতো। মনে হতো আমি যেন সেই আধো-ঘুম জাগরণের মাঝে আটকে থাকা কেউ।
এই আধা-ঘুম অবস্থাটি সারাদিন আমাকে আচ্ছন্ন রাখতো। মাথাটা সব সময় হালকা মনে হতো। আমার আসেপাশের জিনিসের অবস্থান নির্ণয়ে আমি অক্ষম হয়ে পড়তাম। কিছুক্ষণ পর ঢেউয়ের মতো ঝিমিয়ে পড়ার অবস্থাটা ফিরে আসতো। ট্রেনে, ক্লাসে বসে বা রাতের খাবার খাওয়ার সময় নিজের অজ্ঞাতে ঝিমিয়ে পড়তাম। কখনও কখনও মনে হতো আমার চেতনা শরীর থেকে দূরে সরে গেছে। পৃথিবীটা নীরবে দুলতো। হাতের জিনিসপত্র মাটিতে পড়ে যেত। আমার পেনসিল, ব্যাগ কাঁটা চামচগুলি মেঝেতে পড়ে ঝনঝনিয়ে উঠতো। সেখানেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার ইচ্ছা হতো। কিন্তু সবই বৃথা। জেগে থাকাটাই যেন আমার নিয়তি। ওর শীতল ছায়া সব সময় অনুভব করতাম। মনে হতো সেটা আমারই ছায়া। খুব অদ্ভুত, ঝিমিয়ে পড়ার মধ্যেও ভাবতাম। বুঝতে পারতাম আমি নিজের ছায়ার মধ্যেই আছি। আমি ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে হাঁটতাম, ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে খেতাম, ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে লোকদের সাথে কথা বলতাম। কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, আমার এই দুর্দশাটি আমার চারপাশের কারোরই দৃষ্টিগত হয়নি। সেই এক মাসের মধ্যে আমার ছয় কেজি ওজন কমে গিয়েছিল। তারপরেও কারও চোখেই পড়লো না যে আমি ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে বেঁচে আছি।
এমন অনিদ্রা নিয়েই আমি বেঁচে ছিলাম। আমার শরীরটা যেন ডোবা মানুষের মতো ভাসছিল। সেখানে যেন সবকিছুই ছিল অস্পষ্ট ঘোলাটে। আমার বেঁচে থাকাটাকে মনে হতো একধরনের ভুল। মনে হতো প্রচণ্ড বাতাস হলে আমার শরীরটা নিয়ে আমি হয়তো উড়ে গিয়ে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে পড়বো। পৃথিবীর শেষ প্রান্তে, কোনও অজানা অদেখা স্থানে। তারপর আমার শরীর চেতনা থেকে চিরকালের মতো বিদায় নেবে। সেজন্য নিজেকে কিছুর সাথে শক্ত করে বাঁধতে চাইতাম। কিন্তু চারদিকে নিজেকে শক্তিশালী করে বাঁধার মতো কিছুই চোখে পড়েনি।
পরে রাতে সেই ভয়ংকর জাগরণের ক্ষণ আসত। সেই জাগরণের সামনে আমি ছিলাম অত্যন্ত দুর্বল। মনে হতো যেন কোনও শক্তি আমাকে জাগরণের কেন্দ্রে আবদ্ধ করেছে। তার শক্তি এতই প্রবল ছিল যে ধৈর্য ধরে সকালের অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় ছিল না। রাতের অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতাম। কিছুই ভাবতে পারতাম না। ঘড়ির টিকটাক শুনতে শুনতে, অন্ধকার ঘন হয়ে আবার ফিকে হয়ে যাওয়া দেখতাম।
কিন্তু একদিন হঠাৎ অনিদ্রা চলে গেল। কোনও ইঙ্গিত বা কারণ ছাড়াই হঠাৎ জাগরণের পর্বটি শেষ হয়ে গেল। হঠাৎ যেন ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালাম। মনে হলো কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করছে। কিন্তু কিছুই মনে পড়েনি। হেঁটে নিজের ঘরে গিয়ে, পোশাক না খুলেই বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সেই থেকে একনাগাড়ে সাতাশ ঘণ্টা গভীর ঘুমে আছি। মা অনেকবার ঝাঁকি দিয়েও ঘুম ভাঙাতে পারেনি। এমনকি চোখে সামান্য কম্পনও হয়নি। শেষে চোখ খোলার পর আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছিলাম। যেমন ছিলাম, তেমনি। বোধহয়।
কেন অনিদ্রার রোগ হয়েছিল এবং কেনই হঠাৎ সেটা সেরে গেল, আমি বুঝতে পারিনি। তা ছিল দূর থেকে আসা কোনও বিপজ্জনক সাইরেনের মতো। কোনো অজানা উৎস থেকে এসে আমার মাথার উপর দিয়ে, আবার কোথায় চলে গেছে। কিন্তু যেভাবেই হোক সেটা এসে আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখে চলে গেছে।
এবারের এই অনিদ্রার রোগটা পূর্বের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুরু থেকেই আলাদা। এবার, আমি একটুও ঘুমতে পারছি না। একটুও ঘুম হচ্ছে না। ঘুম না হওয়া ছাড়া অন্য সবকিছু স্বাভাবিক। চেতনাও পূর্ণ স্পষ্ট। শরীরে কোনও পরিবর্তন নেই। খাদ্যাভিরুচি ভালো, খিদেও পায় বেশ। বর্তমানের এই অবস্থায় কোনও সমস্যা নেই, শুধু একদম ঘুমতে পারছি না।
আমার স্বামী বা সন্তানরা লক্ষ করেননি যে আমি সতেরো দিন ধরে একটুও ঘুমাইনি। আমিও তাদের কিছু বলিনি। কারণ বললে তারা হাসপাতালে যেতে বলবে, যা আমি জানি সম্পূর্ণ অর্থহীন। ঘুমের ওষুধ খেয়ে এর সমাধান হবে না। সেজন্য আমি নিজেই এর সঙ্গে লড়াই করছি। আগের মতো এবারেও এর সমাধান আমাকে নিজেই খুঁজতে হবে।
সেজন্য তারা জানে না যে আমি ঘুমাতে পারছি না। আমার জীবন আগে যেভাবে চলতো, ঠিক সেভাবেই চলছে। শান্তিতে এবং নিয়মমাফিক। সকালে স্বামী ও সন্তানদের যার যার গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়ার পর নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাজারে যাই। আমার স্বামী একজন দাঁতের ডাক্তার। তার বন্ধুর সাথে মিলে আমাদের বাসার কাছাকাছি একটি ক্লিনিক খুলেছে। তাদের হাত ভালো থাকায় খুব সাফল্য পেয়েছে। এখন তারা খুব ব্যস্ত।
আমার স্বামী বলে, সে আরামদায়ক একটা জীবন কাটাতে চেয়েছিল। তবে এ নিয়ে তার কোনও অভিযোগ নেই। আমি জানি সে ঠিকই বলেছে। তার আসলেই কোনও অভিযোগ নেই, এটা সত্য। ক্লিনিক খোলার জন্য আমাদের অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়েছিল। প্রতিযোগিতা বেশি থাকায় রোগী পাওয়া এবং কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
ক্লিনিক খোলার সময় আমাদের বয়স ছিল অল্প, পয়সাও ছিল না, সন্তানরাও ছোট ছিল। এই কঠিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকব কি না জানতাম না। কিন্তু গত পাঁচ বছর কোনোভাবে বেঁচে আছি। আমার কোনও অভিযোগ নেই। ঋণের অর্ধেক টাকা এখনো ফেরত দেওয়া বাকি।
"তুমি খুব হ্যান্ডসাম, সেজন্যই অনেক রোগী পাও", স্বামীর উদ্দেশ্যে এটা আমার প্রতিদিনকার ঠাট্টা। সত্যিকারের সুদর্শন ও নয়, তাই আমি এমন কথা বলি। আমার স্বামীর চেহারা বড়ই অদ্ভুত। আজও ভেবে দেখি, আরও হ্যান্ডসাম প্রেমিক থাকা সত্ত্বেও কেন এই অদ্ভুত চেহারার লোকটিকেই বিয়ে করেছিলাম।
আমার স্বামীর মুখের সেই অদ্ভুত দিকটা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সেটা না সুদর্শন, না কুৎসিত। কোন নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যই না। শুধু 'অদ্ভুত' শব্দটাই সঠিক। সেই অদ্ভুতত্বটা ধরা কঠিন। একবার সেটা ধরতে পারলে 'অদ্ভুত'-এর চিত্র পুরোটাই বুঝতে পারতাম। কিন্তু এখনো সেটা ধরতে পারিনি। একবার মুখটা আঁকার চেষ্টা করেও মনে করতে পারিনি। সেই অজানা অদ্ভুতত্ব ছাড়া আর কিছুই মনে পড়েনি।
এই বিষয়টি আমাকে সময় সময় চিন্তায় ফেলে দেয়।
এই বিষয়টি আমাকে সময় সময় চিন্তায় ফেলে দেয়। তবে সমাজের অনেকেই তাকে পছন্দ করে এবং এটি তার কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দাঁতের ডাক্তার না হলেও, আমার ধারণা সব কাজেই সে সফল হতো। অনেকেই তার সঙ্গে কথা বলে স্বস্তি পায়, নিজেদেরকে বেশ নিরাপদ অনুভব করে। এর আগে এই ধরনের কাউকে দেখার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। আমার সব বন্ধুই তাকে খুব পছন্দ করে। নিশ্চয়ই আমিও পছন্দ করি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে, আমি তার প্রতি আসক্ত নই।
তবে সে খুব সহজেই হাসতে পারে, ঠিক বাচ্চাদের মতো। আমার মতে অন্য কোনও প্রাপ্তবয়স্ক এভাবে হাসতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই, তার দাঁত খুব সুন্দর।
"আমি যে হ্যান্ডসাম, তাতে আমার দায় নেই" - এই মন্তব্য দিয়ে আমার স্বামী অকপট হাসে। এ ঘটনা নিয়মিত ঘটে থাকে। এটি আমাদের মধ্যে চলমান একটি গল্প। কিন্তু এর মাধ্যমে আসলে আমরা নিজেদের সম্পর্কের বাস্তবতা পরীক্ষা করি। এটি আমাদের জীবনের একটি প্রয়োজনীয় অংশ।
সে সকাল আটটায় ব্লুবার্ডে উঠে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যায়। বাচ্চাকে পাশে বসায়। বাচ্চার স্কুল ওর ক্লিনিক যাওয়ার পথেই। আমি বলি, "সাবধানে যেও।" সে বলে, "হ্যাঁ ঠিক আছে।" প্রতিদিনই একই কথোপকথন। তারপর সে গান বাজিয়ে গুনগুন করে গাড়ি চালায়। হাত নাড়া শেষে সে চলে যায়। আমরা উভয়েই একই ভাবে হাত নাড়ি। মনে হয় কেউ আমাদের নাচ শেখাচ্ছে।
আমার একটি পুরোনো হোন্ডা সিটি গাড়ি আছে যা আমি আমার বন্ধুর কাছ থেকে খুব কম দামে কিনেছিলাম। গাড়িটি পুরোনো হওয়ায় কখনও কখনও ইঞ্জিন চালু করার সময় সমস্যা হয়। তবে সেটা সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর নয়। সবাইকে কখনো না কখনো এরকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমার মনে হয় ধৈর্য ধারণ করে এগুলো মোকাবেলা করা উচিত। আমার স্বামী বলে এটা নাকি আমার গাধা। যাইহোক, তবু এটি তো আমার নিজস্ব গাড়ি।
আমি সেই পুরোনো গাড়িতেই সুপারমার্কেটে কেনাকাটা করতে যাই। ফেরার পর বাড়ির কাজকর্ম করি - ঘর পরিষ্কার করি, কাপড় ধুই। দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করি। চেষ্টা করি সকালের মধ্যেই দ্রুত সব কাজ শেষ করে ফেলতে, যাতে বিকেলে নিজের জন্য সময় থাকে।
আমার স্বামী দুপুর বারোটার পর খাবার খেতে আসে। সে বাইরের খাবার খাওয়াটা খুব পছন্দ করে না। তাই বাড়িতে এসে খাওয়াটাই তার পছন্দ। আমি দুপুরের খাবারের জন্য কোনও বিশেষ রান্না করি না, আগের দিনের অবশিষ্ট খাবার গরম করে দিই। আমার কাছে স্বামীর সঙ্গে একসাথে খাওয়াটা একা খাওয়ার চেয়ে অনেক আনন্দদায়ক।
আগে ক্লিনিক শুরুর সময় বেশির ভাগ দিনই বিকেলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকত না। দুপুরের খাবারের পর আমরা প্রায়ই বিছানায় শুয়ে পড়তাম। সেটা ছিল একটি ভালো সময়। চারপাশ শান্তিতে ভরপুর থাকতো এবং বিকেলের আলো ঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়তো। আমাদের বয়স ছিল খুব কম, সেসময় আমরা খুব সুখী ছিলাম।
আমরা মনে করি যে এখনও আমরা খুব সুখী। আমাদের সম্পর্কে কোনও সমস্যা নেই। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে জীবন পরিবর্তিত হয়েছে। এখন বিকেলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকায় খাওয়ার পর ও দাঁত মেঝে ক্লিনিকে চলে যায়। তার জন্য অপেক্ষায় থাকে শত শত দাঁত। আমরা জানি জীবন চলছে নিজেদের পছন্দের বাইরেও। তবুও আমরা সন্তুষ্ট।
স্বামী চলে যাওয়ার পর আমি সাঁতারের জন্য স্পোর্টস ক্লাবে যাই। তারপর আধঘণ্টার মতো সাঁতার কাটি। বেশ কষ্ট করেই সাঁতার কাটি। এমনিতে সাঁতার আমার খুব পছন্দের নয়। আমি সাঁতারের মাধ্যমে অতিরিক্ত ওজন বাড়তে দেই না এবং শরীরকে ফিট রাখি। অনেক আগে থেকেই আমার দেহের গড়নটা আমার খুব পছন্দের। সত্যি বলতে কী, নিজের চেহারাটা আমার খুব ভালো লাগে এরকম কখনো মনে হয়নি। আবার খারাপও মনে হয়নি। কিন্তু নিজের দেহটা আমার খুব পছন্দের। নিরাবরণ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতে আমি খুব ভালোবাসি। তারপর সেই নরম দেহের বাঁক ও তার সেক্সি গঠনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে আমার ভালো লাগে। সবসময় অনুভব হয় আমার দেহটায় কিছু একটা রয়েছে। সেটা ঠিক কী বুঝতে না পারলেও সেটা হারাতেও চাই না। সেটা হারানো আমার জন্য কঠিন।
আমার বয়স ত্রিশ। ত্রিশ বছর বয়সে বুঝতে পারি, জীবন এখনও শেষ হয়নি। বয়স বেড়ে যাওয়া খুব আনন্দের বিষয় নয়, তবু এর কিছু সুবিধা আছে বলে আমার মনে হয়। এটা হয়তো একধরনের মানসিক সমস্যা। তবে একটা বিষয় আমার কাছে খুব স্পষ্ট। যদি ত্রিশ হওয়া কোনও মহিলা নিজের দেহটাকে ভালবাসে আর সত্যি আশা করে যে তার দেহের গঠন ঠিক যেমনটা হওয়া উচিত তেমনটাই থাকুক, তাহলে তাকে সেই পরিমাণ পরিশ্রম করতে হবে। আমি আমার মায়ের কাছ থেকে এটা শিখেছি। আমার মা আগে খুব সুন্দরী ছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, এখন তা নেই। আমি মার মতো হতে চাই না।
সাঁতারের পর বাকি সময়টা কীভাবে কাটাব সেটা সেদিনের উপর নির্ভর করে। কখনো কখনো স্টেশনের সামনে ঘুরে ঘুরে উইন্ডো শপিং করি, কখনো বাসায় ফিরে বই পড়ি বা রেডিও শুনি। শেষ পর্যন্ত বাচ্চা স্কুল থেকে ফিরলে, আমি ওকে খাওয়াই। সে খেয়ে বন্ধুদের সাথে খেলতে বের হয়। এখনো সে টিউশনে যায় না, বাড়িতেও তেমন পড়াশোনা করে না। আমার স্বামী বলে, খেলাধুলা করলে বাচ্চারা স্বাভাবিকভাবে বাড়ে। ওকে বাইরে যাওয়ার সময় আমি বলি, সাবধানে যাও। বাচ্চাও বলে, ঠিক আছে। ঠিক আমার স্বামীর মতো।
সন্ধ্যা হলে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করি। বাচ্চা সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসে এবং টিভিতে মাংগা দেখে। ক্লিনিক থেকে দেরি না হলে আমার স্বামীও সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসে। ও মদ্যপান বা বাইরে ঘোরাফেরা পছন্দ করে না। কাজ শেষ হলে সোজা বাড়ি ফিরে।
খাওয়ার সময় আমরা তিনজনই দিনভরের ঘটনা নিয়ে কথা বলি। সবচেয়ে বেশি কথা বলে আমাদের ছেলে। চারপাশের প্রতিটি ঘটনাই তার কাছে নতুন এবং রহস্যময়। সে যা বলে, আমরা সেই নিয়ে আলোচনা করি। খাওয়া শেষ হলে সে নিজের পছন্দ মতো টিভি দেখে, বই পড়ে বা বাবার সাথে গেম খেলে। হোমওয়ার্ক করে নেয়। রাত আটটায় সে ঘুমিয়ে পড়ে। আমি তাকে শুভরাত্রি বলে ঘরের আলো নিভিয়ে দিই।
এরপর আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সময়। ও সংবাদপত্র পড়ে, আমরা রোগী অথবা সংবাদপত্রের খবর নিয়ে কথা বলি। তারপর সে ক্লাসিকাল সঙ্গীত শোনে। আমিও শুনি, তবে হেডেন-মোজার্টের পার্থক্য বুঝতে পারি না। ও বলে, পার্থক্য বুঝতে না পারলেও সুন্দরকে সুন্দর বলাটাই যথেষ্ট। আমি বলি, ঠিক যেমন তুমি হ্যান্ডসাম।
"হ্যাঁ, আমি যেমন হ্যান্ডসাম", আমার সঙ্গে সেও বলে। তারপর হাসে। মনে হয় আমার কথা ওকে খুশি করে।
এটিই আমার জীবন। বলা যেতে পারে, আমার নিদ্রাহীন জীবন। সাধারণত, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ছিল শুধু। আমি তখন ডায়রি লিখতাম, তবে দুই-তিন দিন পর ভুলেও যেতাম কোনদিন কী লিখেছিলাম। গতকাল এবং তার আগের দিন পাল্টাপাল্টি হলেও কোনও সমস্যা হতো না। কখনও কখনও ভাবি, এ কেমন জীবন! তবে এতটা ফাঁকা বোধ হয় না। আমি শুধু অবাক হই। এমন এক বাস্তবতা যেখানে দিনের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। যার অংশ হয়েছি আমি, যা আমাকে পুরোপুরি ভাসিয়ে দিয়েছে। এমন এক বাস্তবতা যেখানে বুঝতে পারার আগেই নিজের পায়ের ছাপ মিলিয়ে যায় বাতাসে। এমন সময়ে আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি অনেকক্ষণ। প্রায় পনেরো মিনিট, শূন্য মনে, কোনও চিন্তা ছাড়াই। নিজের মুখটিকে শুধু একটি বস্তু হিসাবে দেখি। এভাবে তাকালে মনে হয় আমার মুখটি ধীরে ধীরে আমার থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। শুধু একসাথে থাকা একটি 'বস্তু' হিসাবে। বুঝতে পারি এটিই বর্তমান। পায়ের ছাপের সাথে তার কোনও সম্পর্ক নেই। আমি এভাবেই বাস্তবের সাথে এখন একসাথে বাস করছি, এটিই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখন আমি ঘুমাতে পারছি না। ঘুমানো বন্ধ হওয়ার পর থেকে আমি ডায়রি লেখাও বন্ধ করে দিয়েছি।
২
যে রাতে প্রথম ঘুমাতে পারিনি, সেই রাতের কথা আমার বেশ মনে আছে। আমি খুব অশুভ একটি স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্নটি অন্ধকার এবং ভয়াবহ। বিষয়বস্তু মনে নেই, শুধু একটি অশুভ অনুভূতির কথা মনে আছে। স্বপ্নের শেষ মুহূর্তে আমার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খোলার পর কিছুক্ষণ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। হাত-পা অচল হয়ে গিয়েছিল, নড়াচড়া করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল আমি গভীর এক খালি গর্তে পড়ে আছি, শুধু নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
আমি ভাবলাম ওটা স্বপ্ন। তারপর শান্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম, নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করলাম। হৃদপিন্ড তীব্রভাবে ওঠানামা করছিল, রক্ত ফুসফুসে পাঠানোর জন্য। তবে সময়ের সাথে সাথে সেটি নিয়ন্ত্রণে এলো। কটা বাজে! পাশের ঘড়িটি দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঘাড় ঘোরানো গেল না। হঠাৎ পায়ের দিকে কিছু একটা লক্ষ করলাম। একটি অস্পষ্ট কালো ছায়ার মতো। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেললাম। হৃদপিন্ড, ফুসফুস, সমস্ত শরীর - সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। আমি চকিত চোখে সেই ছায়ার দিকে তাকালাম।
আমি চোখ বড় করলাম, এমনিতেই সেই ছায়াটি স্পষ্ট হতে থাকল। প্রথমে বাইরের রেখাগুলি, তারপর ধীরে ধীরে মুখের বিশেষণগুলি। একজন কালো জামা পরা বৃদ্ধ। ছোট ধূসর চুল, সংকুঞ্চিত গাল। সে নিঃশব্দে আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বড় চোখ, লাল ফোসকা পর্যন্ত স্পষ্ট। কিন্তু কোনও মনোভাব নেই মুখে। কোনও কথা নেই। ফাঁকা।
বুঝতে পারলাম এটা স্বপ্ন নয়, স্বপ্ন থেকেই তো জেগেছি। এটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব। নড়ার চেষ্টা করলাম। স্বামীকে ডাকব বা আলো জ্বালব ভাবলাম। কিন্তু এক আঙুলও নড়াতে পারলাম না। নড়তে না পারা বুঝতেই হঠাৎ ভয় করতে লাগল। মনের গভীরে ভয়ের ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল। সেই ভয় আমার অস্তিত্বে ঢুকে গেল। চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু গলা খোলা গেল না। জিভও নড়ল না। শুধু সেই বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হলাম।
বৃদ্ধের হাতে একটি লম্বাকার জিনিস ছিল, যা জ্বলজ্বল করছিল। আমি সেটি ভালো করে দেখতে চাইলাম। একটি পুরাতন চীনা জলপাত্র বুঝতে পারলাম। সে তাড়াতাড়ি জলপাত্রটি উপরে তুলে আমার পায়ের উপর জল ঢালতে শুরু করল। কিন্তু আমি সেই জলের স্পর্শ অনুভব করতে পারলাম না। জল পড়ার শব্দও শুনলাম। তবু পা কিছুই অনুভব করল না।
বৃদ্ধটি আমার পায়ে জল ঢেলেই চলেছে। অবাক করা ব্যাপার হলো, যতই জল ঢালুক না কেন পাত্রের জল শেষ হচ্ছিল না। ভাবলাম, এভাবে চললে আমার পা পচে যাবে। এতক্ষণ জল ঢালা হলে তো ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক। আর এমন হলে তো আমি সহ্য করতে পারব না।
আমি চোখ বন্ধ করে, সর্বশক্তিতে এক চিৎকার দিলাম।
কিন্তু আমার চিৎকার বাইরে বের হলো না। জিভ একচুলও নড়লো না। শুধু শূন্যে প্রতিধ্বনিত হলো চিৎকার। সেই নিঃশব্দ চিৎকার আমার শরীরের মধ্যে ছুটতে লাগলো। হৃৎপিণ্ড থেমে গেল। মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। চিৎকারটি আমার কোষের কোণায় কোণায় ঢুকে গেল। মনে হলো আমার ভেতরে কিছুটা মরে পচে গেল। সেই নৈঃশব্দ্যময় চিৎকার আমার অনেক কিছু ধ্বংস করে দিলো।
আমি চোখ খোলার পর বৃদ্ধটি আর ছিল না। জলপাত্রও গায়েব ছিল। আমার পাও শুকনো ছিল। বিছানায় কোনও জলের চিহ্ন ছিল না, শুকনোই ছিল। কিন্তু আমার শরীর অস্বাভাবিক পরিমাণে ঘামে ভিজে ছিল। কেউ এত ঘামতে পারে-- সেটি বুঝতে পারছিলাম না।
আমি আঙুল একটা করে নাড়তে পারছি, হাত বাঁকাতে পারছি। গোড়ালি ঘোরানো যাচ্ছে, হাঁটু ভাঁজ করা যাচ্ছে। সাবধানে সারা শরীর নাড়ানো গেল। তারপর উঠে বসলাম। রাস্তার আলোতে ঘরের প্রত্যেক কোণা খুঁজে দেখলাম, কোথাও বৃদ্ধটি ছিল না। আশ্বস্ত হলাম যে সবকিছুই ঠিক আছে।
বালিশের পাশে ঘড়িটি দেখে বুঝলাম সাড়ে বারোটা বাজে। আমি গতকাল রাত এগারোটার আগে ঘুমিয়েছিলাম, অর্থাৎ এক ঘণ্টারও বেশি ঘুমইনি। পাশে আমার স্বামী গভীর ঘুমে ছিল। প্রায় অচেতনাবস্থায়। সে একবার ঘুমিয়ে পড়লে ভয়াবহ কিছু না হওয়া পর্যন্ত তার ঘুম ভাঙে না।
আমি বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গিয়ে ঘামে ভেজা জামাটি ওয়াশিং মেশিনে ছুড়ে দিলাম। তারপর নতুন পোশাক পরে বসার ঘরে গিয়ে লাইট জ্বালিয়ে সোফায় বসলাম। সেদিন রাতে আমার শরীরের মিয়ানো ভাবটা কমাতে একটু ব্রান্ডি নিলাম। কলেজের পরে আমি এসব নেওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজকের কথাটি ভিন্ন।
কাবার্ডে একটি পুরাতন রেমি মার্টিন বোতল ছিল। সেটিই ছিল একমাত্র অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়। কে দিয়েছিল মনে পড়ছে না। বোতলে হালকা ধুলো জমেছে। ব্রান্ডি গ্লাস না থাকায় সাধারণ গ্লাসে দুই সেন্টিমিটার মতো ঢাললাম। ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে পান করলাম।
শরীর তখনও কাঁপছিল কিন্তু ভয় কমে আসছিল। মনে হলো এটা হয়তো মারাত্মক অচলতা। এর আগে আমার এক বান্ধবীর কাছে এমন অভিজ্ঞতার কথা শুনেছিলাম। সে বলেছিল এটা এত স্পষ্ট যে স্বপ্ন বলে মনে হয় না। আমারও মনে হচ্ছে এটা স্বপ্ন নয়। তবে স্বপ্নের মতো এক অভিজ্ঞতা। ভয়টা কমলেও শরীরের কম্পন গেল না। চামড়ায় মৃদু কম্পন অনুভব করছিলাম। মনে হয় শব্দহীন চিৎকারটি শরীরে সেঁধিয়ে এই কম্পন সৃষ্টি করেছে।
আমি চোখ বন্ধ করে আরেকট চুমুক ব্র্যান্ডি খেলাম। অনুভব করলাম জীবন্ত জিনিসের মতো লিকারটি গলা দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে।
হঠাৎ করে ছেলের কথা মনে পড়ল। ছেলের ঘরে গিয়ে দেখলাম সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। যা আমার ঘুম ভাঙিয়েছিল তা ছেলের ক্ষতি করেনি, শুধু আমাকেই প্রভাবিত করেছে। আশ্বস্ত হয়ে ফিরে এলাম।
আমি বসার ঘরে ফিরে গেলাম এবং ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতে লাগলাম। ঘুম আসছিল না। মনের অশান্তি দূর করার জন্য কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি উত্তম মনে হলো।
আরেকবার ব্র্যান্ডি নেবো কি না ভাবছিলাম। সেই সময় আমার আরও একটু মদ খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল। শরীরকে আরও একটু উত্তপ্ত করলে মন্দ হতো না। ব্রান্ডির তীব্র গন্ধটি বেশ উপভোগ করছিলাম। কিন্তু সকালের আগেই এই ঝামেলা থাকে আমাকে মুক্ত হতে হবে তাই ওসব আর ছুঁলাম না। ব্র্যান্ডিটি আলমারিতে রেখে গ্লাসটি পরিষ্কার করে ফেললাম। এরপর ফ্রিজ থেকে স্ট্রবেরি বার করে খেলাম।
মনে হলো আমার শরীরের কাঁপুনিটি একটু থেমেছে।
আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। কালো পোশাক পরা বৃদ্ধ ব্যক্তিটি আসলে কে ছিল? দেখে মনে হচ্ছিল একজন সাধারণ বৃদ্ধ। কিন্তু তার সেই কালো পোশাকটি ছিল খুবই বিচিত্র। যদিও দেখে মনে হচ্ছিল সুইড সুট, কিন্তু এমন ধরনের পোশাক আগে কখনো দেখিনি। আবার তার চোখগুলোও ছিল মারাত্মক লাল, যা আমাকে অবাক করে দিয়েছিল। তবে আমার পায়ে সেই বৃদ্ধের জল ঢালার কারণ বুঝতে পারছি না। এ এক অজানা ও রহস্যময় অভিজ্ঞতা।
এসব কারণের কোনও উত্তরও জানার উপায় নেই।
আমার বন্ধুর যখন মারাত্মক অসাড়তার মতো হয়েছিল, তখন ও তার হবু স্বামীর বাড়িতে ছিল। যখন ও ঘুমোচ্ছিল তখন এক কঠিন মুখের বুড়ো এসে বলেছিল, “তুই এক্ষুনি এই বাড়ি থেকে বের হ।” ও আমার মতো একটুও নড়তে পারছিল না। প্রচণ্ড ঘামে ভিজে গিয়েছিল। ওই লোকটা যে হবু স্বামীর মরা বাপের ভুত, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পরের দিন হবু স্বামীর কাছে তার বাবার ছবি দেখে বুঝতে পেরেছিল যে গত রাতে দেখা লোকটার চেহারা একেবারে আলাদা। বন্ধু বলেছিল, হয়তো তখন খুব বেশিই চিন্তা করছিলাম, তাই এই অসাড়তা জাতীয় কিছু হয়েছিল।
কিন্তু আমার তো এখন তেমন হওয়ার কথা নয়। এটা আমার নিজের বাড়ি, এখানে আমাকে কে ভয় দেখাবে? আমার এমন অবস্থা হওয়ার কোনও কারণই নেই।
এসব আবোল তাবোল ভাবাটা অর্থহীন। এটা একটা স্বপ্ন মাত্র। কাল সাঁতারের পর বন্ধুদের অনুরোধে হয়তো একটু বেশি টেনিস খেলে ফেলেছিলাম। তাই হাত-পা এমন ভারী লাগছিল।
পরীক্ষা করার জন্য স্ট্রবেরিগুলো খেয়ে সোফায় শুয়ে চোখটা বন্ধ করলাম।
ঘুম একেবারেই নেই।
কি করা যায়? সত্যি চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই।
ভাবলাম, যতক্ষণ না ঘুম পাচ্ছে, বই পড়ি। শোবার ঘর থেকে আমি একটা উপন্যাসের বই নিয়ে এলাম। বাতি জ্বালিয়েই বই খুঁজছিলাম কিন্তু আমার স্বামীর ঘুমের কোনো নড়চড় হয় নি। আমার একটা দীর্ঘ রাশান উপন্যাস পড়তে ইচ্ছে করছিল তাই আনা কারেনিনাকে পছন্দ করলাম। হাইস্কুলে পড়ার সময় এই উপন্যাসটি পড়েছিলাম একবার। প্রধান চরিত্র রেল লাইনে আত্মহত্যা করে এটা ছাড়া আর তেমন কিছু মনে পড়ছেনা। সকল সুখী পরিবারই এক, কিন্তু অসুখী পরিবারগুলি সব ভিন্ন রকমের। এমনি কিছু ছিল গল্পের থিম। গল্পের নায়িকা যে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে এমন ইঙ্গিত ছিল গল্পের শুরুতেই। ঘোড়াদৌড়ের ঘটনাও ছিল মনে হয়। নাকি সেটা অন্য কোনও গল্পের?
সোফায় বসে বইটি খুললাম। মনে হলো কতদিন পরে যে এমন আরাম করে পড়ছি। বিকেলের দিকে সময় থাকলে ঘণ্টা-খানেক বই নিয়ে বসি। কিন্তু ওই বসা পর্যন্তই। বই হাতে নিয়েই নানান সাংসারিক চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। বাবার অপারেশনের কথা, ছেলের কথা, ফ্রিজে বাজার কত আছে এই সব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে কখন যে সময় গড়িয়ে যায়, কিন্তু বই আর পড়া হয় না।
এমন করে কবে যে বই আমার জীবন থেকে হারিয়ে যায় আমি বুঝতেই পারি না। কিন্তু বিষয়টা খুবই অদ্ভুত। অল্প বয়স থেকে আমার জীবনের কেন্দ্রটাই ছিল বই। স্কুলের লাইব্রেরি থেকে নিয়ে বই পড়া তো চলতোই সাথে হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে বই কিনতাম। হাইস্কুল পর্যন্ত আমার মতো বই পাগল কেউ ছিল না। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে আমি মাঝের। বাবা-মা দুজনেই চাকরি করার কারণে বাইরেই থাকতেন, আমার প্রতি পরিবারের কারোই তেমন নজর ছিল না। তাই বই-ই ছিল আমার একমাত্র সঙ্গী। বই নিয়ে কোনও প্রতিযোগিতা থাকলে আমার অংশগ্রহণ চাই চাই। আসলে পুরস্কার হিসাবে বই কেনার টাকাটুকু হলেই আমার চলত। এরপর ইউনিভার্সিটিতে এসে আমি ইংরেজি সাহিত্যে পড়া শুরু করে ছিলাম। সেখানে আমার রেজাল্ট ছিল চমৎকার। ক্যাথারিন ম্যান্সফিল্ড সম্পর্কে একটা প্রবন্ধ লিখে ক্লাসের সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলাম। প্রফেসর বলেছিলেন এটাতেই যেন আমি মাস্টারস করি। অ্যাকাডেমিক লেখাপড়া আমার জন্য নয়। তাই আমার ঝোঁক ছিল চাকরির প্রতি। ইউনিভার্সিটিতে থেকে গেলেও আর্থিক সঙ্গতি আমার ছিল না। আমরা যে একেবারে গরীব ছিলাম তা নয়। তবে আমার দুটো ছোট বোন ছিল, সেই কারণে ইউনিভার্সিটি শেষে নিজের জীবন নিজেই গুছিয়ে নেওয়াটা আমার জন্য খুব জরুরি ছিল। আসলে স্বাবলম্বী হওয়া ছাড়া আমার আর কোনও উপায় ছিল না।
শেষ কবে যে একটা ভালো বই পড়েছিলাম কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। সেই পড়ুয়া জীবনটা আমার কোথায় হারিয়ে গেল?
অথচ সেই রাতে আমি আনা কারেনিনায় মনোযোগ দিতে পেরেছিলাম। কখন যে বইয়ের মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম মনে নেই। আনা কারেনিনা আর ব্রন্সকির রেল স্টেশনে দেখা হওয়া পর্যন্ত একটানা পড়ে তবেই উঠলাম। আবারও কিছুটা ব্র্যান্ডি গ্লাসে ঢেলে চুমুক দিলাম।
অনেক দিন আগে যখন প্রথম পড়েছিলাম, তখন সঠিকভাবে মনোযোগ দেইনি বলে মনে হয়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, যদি ভালোভাবে চিন্তা করি, দেখব যে উপন্যাসটি খুবই বিশদভাবে লেখা। উপন্যাসের প্রথম শত পৃষ্ঠা পর্যন্ত, নায়িকা আনার চেহারা একবারও উল্লেখ করা হয়নি। সেসময়ের পাঠকদের কাছে, বিশেষ করে নায়িকার চেহারা না দেখানোটা অস্বাভাবিক ছিল না বলে মনে হয়। অব্লনস্কির মতো একজন সাধারণ চরিত্রের জীবনের নানা খুঁটিনাটি পড়ে পড়ে, সেসময়ের পাঠকরা কি একজন সুন্দরী নায়িকার চরিত্র আশা করত? সম্ভবত তাই হয়ে থাকত। সেসময় সম্ভবত মানুষের হাতে অনেক বেশি সময় ছিল। অন্তত উপন্যাস যারা পড়তো।
হঠাৎ লক্ষ করলাম ঘড়ির কাঁটা তিনটেতে নেমে এসেছে। তিনটে? অথচ আমার মোটেও ঘুম আসছিল না!
এখন আমি কী করব, ভাবলাম।
একেবারেই ঘুম আসছে না। এভাবেই বই পড়তে থাকলেও চলে। পরে কী হয় তা জানার ইচ্ছে করছে। তবে এখন অবশ্যই ঘুমাতে হবে।
আগের মতো, রাতে ঘুম না পেয়ে থাকার ঘটনা মনে পড়ে গেল। সবকিছুই অস্পষ্ট লাগছিল, যেন মেঘাচ্ছন্ন দিনের মতো। সেরকম ঘটনা আর ঘটবে না। আমি তখন একজন ছাত্রী ছিলাম। এখন ব্যাপারটা সেরকম নয়। এখন আমি একজন স্ত্রী এবং মা। এখানে দায়িত্ব রয়েছে। যেমন স্বামীর জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা দরকার, তেমনি সন্তানের যত্ন নেওয়াও প্রয়োজন।
কিন্তু অনুভব করছিলাম, বিছানায় শুয়ে থাকলেও ঘুম আসবে না। সেটা বুঝতে পারছিলাম। আমি মাথা নাড়লাম। কিছুই করার নেই, যাই করি না কেন ঘুম আসবে না। উপরন্তু বইটি পড়ার ইচ্ছাও করছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে টেবিলে থাকা বইটিতে চোখ রাখলাম।
ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত আমি আনা কারেনিনার গল্পে ডুবে পড়েছিলাম। আনা এবং ব্রনস্কি বলনাচে থাকাকালীন একে অপরের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে এবং অপরিহার্য ভাবে প্রেমে পড়ে যায়। ঘোড়াদৌড়ের সময় ব্রনস্কির ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়া দেখে আনা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে যায় এবং স্বামীর কাছে নিজের বিশ্বাসঘাতকতা স্বীকার করে। আমিও যেন ব্রনস্কির সাথে ঘোড়ায় চড়ে, সব বাধা টপকে যেতে যেতে, দর্শকদের উল্লাস শুনতে পাচ্ছিলাম। তারপর, ব্রনস্কির ঘোড়ার থেকে পড়ে যাওয়াও দেখতে পেলাম দর্শকদের আসন থেকে। ভোর হয়ে এলে, বই রেখে, রান্নাঘরে গিয়ে কফি বানিয়ে খেলাম। মস্তিষ্কে ঘোরা উপন্যাস আর হঠাৎ করে পাওয়া প্রচণ্ড খিদে, আমি আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। মনে হলো আমার চেতনা এবং শরীর দুটি পৃথক বস্তু। পাউরুটি কেটে চিজ স্যান্ডউইচ বানালাম। পরে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়েই খেয়ে ফেললাম। এত ভয়াবহ খিদে আমার কখনো পায় না। প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার মতো তীব্র খিদে। একটা স্যান্ডউইচ খাওয়ার পরেও মনে হলো পেট ভরেনি, সেহেতু আরেকটা স্যান্ডউইচ তৈরি করে খাই। পরে আরেক কাপ কফি পান করি।
৩
আমি যে সকাল পর্যন্ত একটুও ঘুমাইনি, সেটা স্বামীকে জানাইনি। লুকানোর উদ্দেশ্য ছিল না। শুধু তখন বলার প্রয়োজন মনে হয়নি। বললেও কিছু ঘটবে এমন নয়, আর একরাত না ঘুমানো তেমন গুরুতর সমস্যাও নয়। সবার সাথেই এমন হয় কখনও কখনও।
প্রতিদিনের মতো আমি ওকে কফি বানিয়ে দিলাম এবং ছেলেকে গরম দুধ। ও টোস্ট খেলো, আর ছেলে কর্নফ্লেক্স। তারপর তারা বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। আমি বললাম, "সাবধানে যেও"। তারা হাত নাড়লো। তাদের যাওয়ার পর, আমি ভাবলাম আজ কী করব। রান্নাঘরে গিয়ে দেখলাম, কাল দুপুর পর্যন্ত খাবারের ব্যবস্থা আছে। তাই আজ বাজার না করলেও সমস্যা হবে না।
ব্যাঙ্কে কিছু কাজ ছিল, কিন্তু সেটা কালকে করলেও হবে।
সোফায় বসে আবার আমি আনা কারেনিনা পড়া শুরু করলাম। নতুন করে পড়তে গিয়ে বুঝতে পারলাম, আনা কারেনিনার বিষয়বস্তু আমি এতটাই ভুলে গিয়েছি যে প্রায়ই মনে পড়ে না। চরিত্র, ঘটনা, সবকিছু নতুন লাগছে। অদ্ভুত ব্যাপার। প্রথমে অবশ্য খুব প্রভাবিত হয়েছিলাম, কিন্তু পরে সব ভুলে গেছি। যা মাথায় থাকা উচিত ছিল, সেসব হৃদয়কাঁপানো স্মৃতি আমার অজান্তেই মুছে গেছে।
আগের সেই দিনগুলোতে, শুধু বই পড়ে কাটিয়ে দেওয়া বিশাল সময়টা আসলে কী ছিল?
বই পড়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ ঐ বিষয়ে ভাবলাম। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না, এবং যে বিষয়ে ভাবছিলাম তাও মনে পড়ে না। এক মুহূর্তের জন্য চিন্তাশূন্য হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়েছিলাম। তারপর মাথা নিচু করে আবার বইটি পড়া শুরু করলাম।
প্রথম খণ্ডের মাঝামাঝি জায়গায় একটি শুকিয়ে গুঁড়ো হয়ে থাকা চকলেট লেগে ছিল। দেখে মনে পড়লো, হাই স্কুলে পড়ার সময় চকলেট খেতে খেতেই এই বইটি পড়েছিলাম। বই পড়ার সাথে কিছু খাওয়া আমার খুব পছন্দ ছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকে আর কোনও মিষ্টি জিনিস খাই না। কারণ স্বামী এবং ছেলে দুজনেরই মিষ্টি অপছন্দ। তাই বাড়িতে কোনও মিষ্টি জিনিস থাকে না।
মিষ্টি খাওয়াটা আমার স্বামী একেবারেই পছন্দ করে না। ছেলেকেও খেতে দেয় না। তাই বাড়িতে মিষ্টি জিনিস একদমই নেই।
সেই দশ বছর পুরনো রঙহীন হয়ে যাওয়া চকলেটটি দেখে আমার চকলেট খাওয়ার প্রবল আগ্রহ জাগল। আগের মতো চকলেট খেয়ে কারেনিনা পড়ার ইচ্ছা হলো। আমার শরীরের প্রতিটি কোষ যেন চকলেটের আসক্তিতে কুঁকড়ে যাচ্ছে, তা অনুভব করতে পারছিলাম।
গায়ে কার্ডিগান চাপিয়ে আমি এলিভেটরে নিচে নেমে এলাম। কাছাকাছি দোকানে গিয়ে সবচেয়ে মিষ্টি মনে হওয়া মিল্ক চকলেট কিনলাম দুটি। তারপর দোকান থেকে বের হয়েই প্যাকেট খুলে হাঁটতে হাঁটতে সেই চকলেটগুলি খেলাম। মিল্ক চকলেটের সুবাস মুখে ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যেই আমার শরীরের প্রতিটি অংশ মিষ্টি স্বাদটি শুষে নিল, তা স্পষ্ট অনুভব করতে পারলাম। এলিভেটরে দ্বিতীয় চকলেটও খেলাম। এলিভেটরের ভিতর চকলেটের গন্ধে ভরে গেল।
সোফায় বসে চকলেট খেতে খেতে আনা কারেনিনা পড়া শুরু করলাম। একটুও ঘুম পাচ্ছিল না, ক্লান্তিও লাগছিল না। ইচ্ছা করলেই শুধু পড়তে পারছিলাম। ধীরে ধীরে খেয়ে একটা চকলেট শেষ হলে, আরেকটির মোড়ক খুলে অর্ধেকটি খেলাম প্রথম খণ্ডের দুই তৃতীয়াংশ পড়ে ফেলার পর, ঘড়ির দিকে তাকালাম। পৌনে বারোটা। (দুইটা চকলেট কিনেছিল– পথে আর এলিভেটরে খেলো– বাড়িতে এসেও আবার দুটো থাকে কীভাবে? এখানে কিছু মিসিং দেখবেন এই অংশটা)
পৌনে বারোটা?
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে আসবে। আমি দ্রুত বইটি বন্ধ করে রান্নাঘরে গেলাম। তারপর সসপ্যানে জল ঢেলে, গ্যাস জ্বালিয়ে রান্না শুরু করলাম। পেঁয়াজ শাক কুচিয়ে, সোবা সেদ্ধ করলাম। ফ্রিজ থেকে তোফু বের করে হিয়াক্কো তৈরি করলাম। তারপর বাথরুমে গিয়ে দাঁত পরিষ্কার করলাম।
জল ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আমার স্বামী ফিরে এলো। বলল, আজ কাজ একটু দ্রুত শেষ হয়ে গেছে।
আমরা দুজনে মিলে সোবা খেলাম। সোবা খাওয়ার সময় আমার স্বামী নতুন দাঁত পরিষ্কারকারী যন্ত্র ক্রয়ের কথা উল্লেখ করলো। সে বলল, পুরনো যন্ত্রের তুলনায় এটি দিয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার হবে, সময়ও কম লাগবে। মূল্য একটু বেশি হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব মনে হয়, কারণ এখন অনেকেই শুধু দাঁত পরিষ্কারের জন্যই আসে। আমার মতামত জিজ্ঞাসা করলো। কিন্তু সেসময় আমার মনে ছিল না এ নিয়ে ভাবতে। তবে স্বামীর জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে হলো, তাই বললাম প্রয়োজনে ক্রয় করা ঠিক, অকারণে তো আর এই টাকাটা খরচা করা হচ্ছে না।
তুমি ঠিকই বলেছো, স্বামী সায় দিলো। সে আমার কথার পুনরাবৃত্তি করে বললো, অকারণে এই টাকা খরচ করা হচ্ছে না। তারপর আর কিছু না বলে সোবা খাওয়া শুরু করলো।
জানালার বাইরে গাছের ডালে একজোড়া পাখি কিচিরমিচির করছিল। আমি শুধু তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ভাবছিলাম, এতক্ষণ ধরে আমার ঘুম আসছে না, এত বেশি সময় জেগে আছি তবুও কোনও ঘুমের ইঙ্গিত নেই। কী কারণে এমন হচ্ছে বুঝতে পারছি না।
আমি যখন বাসন তুলে গোছগোছ করছিলাম, তখন আমার স্বামী সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। তার পাশেই ছিল আনা কারেনিনা। সেদিকে সে বিশেষ কোনও মনোযোগ দেয়নি। আমি কি বই পড়ি না পড়ি তা নিয়ে ওর কোন মাথা ব্যথা নেই।
আমার বাসন মাজা হয়ে গেলে ও বলল, আজকে একটা ভালো খবর আছে। বল তো কি?
আমি বললাম, জানি না তো।
বিকেলের প্রথম রোগীকে বাতিল করে এসেছি, তাই আজ দেড়টা পর্যন্ত সময় আছে। এই বলে ও মুচকি হাসল।
এর মধ্যে আমি ভালো খবর হওয়ার কোনও কারণ খুঁজে পেলাম না। কি কারণ হতে পারে?
ও বিছানার দিকে ইঙ্গিত করতেই খেয়াল হলো যে ও সেক্সের কথা বলছে। কিন্তু আমার এতটুকুও ইচ্ছে করছিল না। সেক্স না করলে যে কেন চলে না, আমার মাথায় ঢোকে না। আমি তখন ভাবছি, আবার কখন বইটা নিয়ে বসব। একা একা সোফায় বসে, চকলেট খেতে খেতে, আনা কারেনিনা-র পাতায় চোখ রাখতে ইচ্ছে করছিল। বাসন মাজার সময়ে কেবল ব্রন্সকির কথাই মনে পড়ছিল।
আমি চোখ বন্ধ করে, কপালের দুপাশে আঙুল দিয়ে চেপে ধরলাম। বললাম যে আসলে সকাল থেকেই আমার মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। আজকে আমাকে মাফ করে দাও। আমি মাঝে মধ্যেই খুব মাথা ব্যথায় কষ্ট পাই বলে, ও সহজেই আমার কথাগুলো বিশ্বাস করল। ও বলল, আর কাজ না করে একটু শুয়ে নাও তাহলে। ও এক ঘন্টারও বেশি সময় ধরে সোফায় বসে, গান শুনতে শুনতে, আরাম করে খবরের কাগজ পড়তে লাগল। তারপর আবার ক্লিনিকের সরঞ্জামের গল্প করতে লাগল। আজকাল যতই দামি মেশিন কিনুক না কেন, দুই তিন বছরের মধ্যেই সেগুলো পুরোনো হয়ে গিয়ে আবার না কিনলে হয় না। সেজন্য, চিকিৎসার সরঞ্জাম তৈরি করা কম্পানিগুলোই শুধু লাভ করছে। এইসব গল্প। আমি মাঝে মাঝেই হুঁ হাঁ করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু কিছুই শুনছিলাম না।
আমার স্বামী বেরিয়ে যাওয়ার পর, খবরের কাগজটা ভাঁজ করলাম। সোফার কুশনগুলো হাত দিয়ে চাপড়ে ঠিক করলাম। তারপর জায়গা মতো গুছিয়ে রাখলাম। জানালায় হেলান দিয়ে বসে ঘরের মধ্যে ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখলাম। ভাবলাম যে ঘুম পাচ্ছে না কেন? অনেক আগে কয়েকবার এমন রাত জাগার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, কিন্তু এত লম্বা সময় ধরে কখনো হয় নি। সাধারণত আমি অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়ি, আর কোন কারণে ঘুমোতে না পারলেও ঘুম ঘুম ভাব হয় আমার। কিন্তু শুধু ঘুম যে পাচ্ছে না তাই নয়, মাথাটাও যেন একেবারে পরিষ্কার।
রান্নাঘরে গিয়ে কফি গরম করলাম। এরপর ভাবলাম কি করা যায়। আনা কারেনিনা বইটির বাকিটুকু পড়তে ইচ্ছে করছিল। আবার সেই সাথে, প্রতিদিনের মতো পুলে গিয়ে সাঁতার কাটার ইচ্ছেটাও ছিল। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে ঠিক করলাম যে সাঁতারেই যাব। ভালো করে হয়তো বোঝাতে পারছি না, আমি হয়তো শরীরটাকে প্রচুর খাটুনি দিয়ে, শরীরের ভেতর থেকে কি যেন একটা তাড়িয়ে বের করে দিতে চাই। তাড়াতে চাই। কিন্তু কী তাড়াতে চাইছি আমি? জানি না।
সেই ‘কিছু একটা’র - একটা নাম দিতে চাইছিলাম, কিন্তু কোনও যুতসই শব্দ মাথায় এলো না। সঠিক শব্দ বাছাই করাটা আমি একেবারেই পারি না, টলস্টয় বেশ ভালো শব্দটা খুঁজে বার করতে পারেন।
যাই হোক, আমি রোজকার মতোই ব্যাগের মধ্যে সুইমিং কস্টিউমটা ভরে, গাড়ি চালিয়ে ক্লাবের দিকে বেড়িয়ে পড়লাম। সুইমিং পুলে পরিচিত কেউই ছিল না। শুধুমাত্র, অল্পবয়সি একটা ছেলে আর একজন মাঝবয়সি মহিলা ছিল।
আমি নিয়মমাফিক আধঘন্টা সাঁতার কাটলাম। এরপর আরও পনেরো মিনিট সাঁতার কাটলাম। শেষে, সমস্ত শক্তি দিয়ে আরও একবার করলাম। দম ফুরিয়ে গেলে, বুঝতে পারলাম যে এখনও শরীরে প্রচুর শক্তি রয়েছে। পুল থেকে ওঠার পর মনে হলো সবাই যেন আমায় দেখছে।
তিনটে বাজতে তখনও কিছু বাকি, বাড়ি ফেরার পথে ব্যাঙ্কের কাজটা সারলাম। সুপার মার্কেটে গিয়ে বাজারটাও করে ফেলব কিনা ভাবছি, কিন্তু শেষমেশ বাড়িই ফিরে গেলাম। তারপর আবারও আনা কারেনিনা নিয়ে বসে পড়লাম ৷ বাকি চকলেটটুকু খেলাম। চারটের সময় ছেলে ফিরে এলো, ওকে জুস দিয়ে, বাড়ির তৈরি ফলের জ্যাম দিলাম। এরপর রাতের খাবারের ব্যবস্থা শুরু করলাম। প্রথমে ডিপ ফ্রিজ থেকে মাংস বার করে রাখলাম বরফ ছাড়ানোর জন্য। তারপর সবজি কেটে রাখলাম ভাজার জন্য। মিসোশিরু স্যুপ তৈরি করে রেখে, ভাতটাও বানিয়ে নিলাম। মেশিনের মতো দ্রুত গতিতে কাজগুলো করে ফেললাম।
একটুও ঘুম পাচ্ছিল না। আবার আনা কারেনিনা পড়তে শুরু করলাম।
৪
দশটা বাজার পরে আমি, আমার স্বামীর সঙ্গে বিছানায় গেলাম। তারপর একসঙ্গে ঘুমোবার ভাণ করলাম। মাথার কাছের আলোটা নেভানো মাত্র ও সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল। যেন আলোর সুইচ এবং ওর চেতনা একই তার দিয়ে জোড়া লাগানো।
সত্যি কি দারুণ। এরকম কেউ প্রায় নেই বললেই চলে। ঘুমের জন্য কষ্ট পাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি। আমার বাবাও সেই দলের ছিল। ভালো করে একটু ঘুমোতে পারত না বলে সবসময় খিটমিট করত। একে তো ঘুম হয় না, তার উপর আবার একটু আওয়াজেই চোখ খুলে যায়।
কিন্তু আমার স্বামী পুরো আলাদা। একবার ঘুমোলে, সকালের আগে ঘুম ভাঙবে না। বিয়ের পরে, এই ব্যাপারটা আমার অদ্ভুত মনে হত, আমি নানান ভাবে পরীক্ষা করে দেখতাম যে কী করলে এই লোকটার ঘুম তাড়ানো যায়। ড্রপার দিয়ে মুখের উপর পানি ফেলে দেখেছি, তুলি দিয়ে নাকের ডগায় সুড়সুড়ি দিয়ে দেখেছি। কিন্তু কোনও কিছুই ওর ঘুমকে হারাতে পারেনি। বেশিক্ষণ বিরক্ত করলে, একটু আওয়াজ করে বুঝিয়ে দিত যে অসুবিধা হচ্ছে। ও স্বপ্ন পর্যন্ত কখনো দেখেনি। অন্তত, কী স্বপ্ন দেখেছে মনে করতে পারত না। এটা অবশ্যই বলা যায় যে অনিদ্রা ওর কখনই হয়নি। কচ্ছপের মতো শুধু ঘুমোয়।
প্রতিদিনের মতো আমি মিনিট দশেক শুয়ে থেকে, নিঃশব্দে বিছানা ছাড়লাম। তারপর বসার ঘরে গিয়ে, বাতি জ্বালিয়ে, ব্র্যান্ডি ঢাললাম গেলাসে। তারপর সোফায় বসে ব্র্যান্ডির স্বাদ নিতে নিতে বই পড়লাম। বইয়ের তাকে লুকিয়ে রাখা চকলেট বার করে খেলাম। এর মধ্যেই সকাল হয়ে এলো। সকাল হতেই বই বন্ধ করে, কফি বানালাম, স্যান্ডউইচ খেলাম।
আমি ঘরের সব কাজ শেষ করে সারা সকাল বই পড়লাম। দুপুরের দিকে ওর জন্য খাবার বানালাম। একটার আগেই স্বামী বেরিয়ে গেলে, আমি পুলে সাঁতার কাটতে গেলাম। যেদিন থেকে ঘুমোতে পারছি না, সেদিন থেকে আমি এক ঘন্টা সাঁতার কাটা শুরু করেছি। আধঘন্টার এক্সসারসাইজটা যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না। সাঁতার কাটার সময়, শুধু সাঁতারেই মন দিচ্ছিলাম। অন্য কোনও বিষয় চিন্তা করছিলাম না। কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না।
আমি নিয়মমাফিক বাজার হাট করেছি, রান্না করেছি, ঘর পরিষ্কার করেছি, বাচ্চার দেখাশোনা করেছি। স্বামীর সঙ্গে সেক্স করেছি। ইচ্ছে না করলে, এটা একেবারেই কঠিন ছিল না। যথেষ্ট সহজ ছিল। মাথা আর শরীরের কানেকশনটা কাট করে দিলেই হয়ে যায়। আর শরীরটা দরকার অনুযায়ী চালিয়ে গেলেই হলো।
অনিদ্রার পর থেকে আমি কেমন যেন বুঝতে পারছিলাম যে বাস্তবটা তেমন জটিল বিষয় নয়। বাস্তবকে আয়ত্বে রাখাটা আসলে অত্যন্ত সহজ। একটা মেশিনকে চালানোর মতোই ব্যবহার করা ও পুনরাবৃত্তি করে যাওয়া। শুধু পুনরাবৃত্তি।
অবশ্য কিছু পরিবর্তন মাঝে মধ্যে হয়েছে। আমার শাশুড়ি এলে, সবাই মিলে বাইরে খেয়েছিলাম। রবিবার সবাই মিলে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। সেবার ছেলেটার ভীষণ পেট খারাপ করেছিল। কিন্তু এইসব ঘটনার কোনটাই আমার অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেয় না। এগুলো শুধুমাত্র শব্দহীন বাতাসের মতো আমার চারপাশে পাক খায়।
এই ভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেল। কেউই আমার কোনও পরিবর্তন লক্ষ করেনি। আমি যে একটুও না ঘুমিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বই পড়ছি, অথবা আমার মাথাটা যে বাস্তবের থেকে কয়েকশো বছর আগে, কত হাজার কিলোমিটার দূরে কোথাও আছে, তার খোঁজ কেউই করেনি। আমি যতই নিয়মের খাতিরে, মেশিনের মতো, ভালবাসাহীন, সহানুভূতিহীন ভাবে বাস্তবের সব কিছু মেনে চলি না কেন, স্বামী, ছেলে, শাশুড়ি, সবাই, রোজকার মতো একই রকম ভাবে আমার সাথে কথা বলে।
অনিদ্রার দিনগুলো গড়িয়ে গিয়ে যখন দ্বিতীয় সপ্তাহ শুরু হলো, আমি দুশ্চিন্তায় নেতিয়ে পড়তে লাগলাম। যাই হোক না কেন, পরিস্থিতিটা একটু অস্বাভাবিক। মানুষ মাত্রেই ঘুমোয়, আর ঘুমোয় না এমন মানুষও নেই। অনেক দিন আগে, মানুষকে ঘুমোতে না দিয়ে অত্যাচারের কথা কোথাও যেন পড়েছিলাম। বোধহয় নাৎসিদের অত্যাচার।
কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তো না ঘুমিয়ে এক সপ্তাহ কেটে গেছে। অনেকটা বেশি। তা সত্ত্বেও আমার শরীর একেবারেই দুর্বল লাগছে না। বরঞ্চ অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি চনমনে মনে হচ্ছে নিজেকে।
একদিন গোসলের পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমার অনাবৃত শরীরটার দিকে তাকালাম। অবাক হয়ে দেখলাম, আমার শরীরে যেন যৌবন ফেটে পড়ছে। আমি গলা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত সর্বত্র ভালো করে নজর করে দেখলাম। সেখানে এক টুকরো বাড়তি মেদ নেই। তাই বলে আমার শরীরটা কিশোরীর শরীরের মতো আর নেই। কিন্তু কৈশোরের তুলনায় বেশ সজীব।
খেয়াল করে দেখলাম যে আমি আগে যা ভাবতাম, তার তুলনায় অনেক সুন্দর হয়েছি। মনে হলো যেন তারুণ্য ফিরে এসেছে। চব্বিশ বলেও চালিয়ে দেওয়া যাবে। চামড়াটা মসৃণ আর চোখটাও চকচক করছে। ঠোঁটটা ভিজে ভিজে আর গালের হাড়ের অংশের ছায়া একেবারেই চোখে পড়ছে না। আমি আয়নার সামনে বসে আধঘন্টা চুপচাপ শুধু নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বিভিন্ন দিক থেকে পরখ করে দেখলাম। কোনোরকম ভুল আমি ভাবিনি। আমি সত্যি সত্যিই সুন্দর হয়েছি।
কিন্তু ঘুম কিছুতে আসে না।
ডাক্তারের কাছে যাব কিনা ভাবলাম। আমার একজন পরিচিত ডাক্তার রয়েছে। কিন্তু ডাক্তার আমার কথা শুনে কীরকম প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে ভাবতেই, মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে? এক সপ্তাহের উপর ঘুমাইনি বললে, প্রথমেই বলবে আমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। অথবা সাধারণ ইনসমনিয়ার নিউরোসিস হিসেবে ধরে নেবে। এমনও হতে পারে যে, আমার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করে কোনও বড় হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে পরীক্ষার জন্য।
তখন কি হবে?
কত ধরনের টেস্ট যে করাবে ঈশ্বরই জানেন।
এত কিছু সহ্য করতে পারব বলে মনে হয় না। আমি একা শান্তিতে, আরাম করে বই পড়তে চাই। প্রতিদিন এক ঘন্টা, নিয়ম করে সাঁতার কাটতে চাই। সবথেকে বেশি যেটা চাই সেটা হল 'স্বাধীনতা'। হাসপাতালে মোটেই ভর্তি হতে চাই না ৷ তাছাড়া, হাসপাতালে ভর্তি হলেই বা কি জানা যাবে? হয়তো, গাদাখানেক পরীক্ষা করে, নানান সম্ভাবনার গল্প তৈরি করবে। ওই রকম একটা জায়গায় বন্দি হয়ে যেতে চাইছিলাম না।
একদিন লাইব্রেরিতে গিয়ে ঘুমের বিষয়ে একটা বই পড়ে দেখলাম। ঘুম নিয়ে বইটাতে সেরকম কিছু ছিল না, শুধু তাই নয় আসল ব্যাপারটাই ছিল না। ঘুম হচ্ছে আসলে বিশ্রাম এটাই। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করার মতো। লম্বা সময় অবিরাম ইঞ্জিন চালিয়ে রাখলে সেটা অবশেষে খারাপ হয়ে যায়। গাড়ির ইঞ্জিন অনিবার্যভাবে তাপ সৃষ্টি করে এবং জমে যাওয়া তাপটাই তখন যন্ত্রের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাড়ায়। সেই কারণে ইঞ্জিন থেকে তাপটা বার করে দেওয়ার জন্য বিশ্রাম করানোটা জরুরি। যাকে কুল ডাউন করা বলে। ইঞ্জিন বন্ধ করা বলতে গেলে, এটাই হচ্ছে ঘুম। মানুষের ক্ষেত্রে, এটা শরীর আর মনকে বিশ্রাম দেওয়া। মানুষ শুয়ে মাংসপেশিকে বিশ্রাম দেয় আর সেই সাথে চোখ বন্ধ করে চিন্তাকে অব্যহতি দেয়। বাড়তি চিন্তাকে স্বপ্নের মাধ্যমে মুক্ত করে।
একটি বইয়ে খুব আকর্ষণীয় এক বিষয় খেয়াল করলাম। লেখক জানিয়েছেন, মানুষ, তার ভাবনায়ই হোক বা দেহের ক্রিয়াকলাপেই হোক, নির্দিষ্ট স্বভাব অতিক্রম করতে পারে না। মানুষ অচেতনভাবেই নিজের আচরণ এবং ভাবনার একটা ঝুঁকি গড়ে তোলে, এবং, একবার এমন ঝুঁকি উৎপন্ন হয়ে গেলে, তা প্রবল কিছু না ঘটলে সেটা মিটে যায় না। তার মানে, মানুষ সেই ঝুঁকিগুলির বাঁধনে আটকে থাকে। ঘুম, এই প্রবণতার দিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকে যাওয়াকে—লেখক যেটা জুতোর ক্ষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ঘুম সেই ঝুঁকে পড়াটা নিয়ন্ত্রণ করে, সারিয়ে তোলে। মানুষ ঘুমের মাংসপেশীর এক দিকে কার্যকলাপ শিথিল করে এবং অপর দিকে চিন্তা প্রসেসরগুলি শান্ত করে ইলেক্ট্রিক রিলিজ করে। এইভাবেই মানুষ শিথিল হয়ে যায়। এটা মানুষের সিস্টেমে, ভাগ্য কর্তৃক নির্ধারিত আচরণ, এবং কেউই সেই নির্ধারণ থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না। লেখক বলেছেন, যদি কেউ বেরিয়ে যায়, তাহলে তার অস্তিত্বের কাঠামো হারিয়ে যায়।
প্রবণতা মনে করলেই নিত্যদিনের ঘরকন্যার কাজ মাথায় আসে। আমি ঘরের যে কাজগুলো নিরন্তর যন্ত্রণাহীনভাবে করি, সেগুলো রান্না, বাজার করা, ছোট কাজকাম, বাচ্চাকে শেখানো। এগুলো কিন্তু প্রবণতার বাইরের কিছু নয়। আমি চোখ বন্ধ করেও এই কাজগুলো করতে পারি। এটা কারণ, এই কাজগুলো কিছুই নয়, কেবল এক ধরণের প্রবণতা। একটা বোতাম চাপা, একটা লিভার টানা। এমনটা করলেই জীবন গড়গড়িয়ে এগিয়ে চলে। শরীরের গতিও একে বারে প্রবণতা। আমি জুতোর তলা মোচরানোর মতো প্রবণতায় নষ্ট হই, আর তারপরে শান্তি পাওয়ার জন্য প্রতিদিন ঘুম প্রয়োজন।
ব্যাপারটা এইরকম কি?
আমি একবার আবার সুযোগ নিয়ে লেখাটা খুব সতর্কভাবে পড়লাম। তারপর মাথা ঝাঁকালাম। ঠিক ঐ রকমই, বিষয়টা ঐরকমই মনে হচ্ছে। তাহলে, আমার জীবনটা কি শেষ হয়ে যাচ্ছে? আমি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছি, সেটাকে উপশম করার জন্য ঘুম ধরছি। এই পুনরাবৃত্তির অধিক কিছু কি আছে? তারপর, একই জায়গায় ঘুরে যাওয়া? কেবল বয়স বাড়িয়ে যাওয়া?
আমি লাইব্রেরির টেবিলের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লাম।
ঘুমের কোনো মানে নেই, আমি চিন্তা করলাম। যদি কোনো ভাবে পাগল হয়ে যাই, অনিদ্রার জন্য যদি আমি জীবনের অস্তিত্বটা হারিয়ে ফেলি, তাহলেও ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যেতে পারে। কিছুই যায় আসে না। আমি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে চাই না। এবং সেই ধীরগতির ক্ষয়টা পূরণ করার জন্য, নির্ধারিত সময়ে ঘুমের প্রয়োজন হলেও, আমি তা করতে চাই না। আমার কিছুই চাই না। আমার শরীরটা যদি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যায়, আমার মনটা তো আমার নিজের। আমি তা কেবল আমার জন্যই রাখব। কাউকে দেবো না। ক্ষয় মিটাতে চাই না। আমি ঘুমাব না।
মনে মনে এমনটাই ঠিক করে আমি লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে পড়লাম।
৫
এই ভাবে অনিদ্রার ভয়টা আমি উড়িয়ে দেই। ভয় বলতে কিছু নেই। সহজ ভাবে বললে, শুধুমাত্র সামনে এগিয়ে যাওয়া। আমি চিন্তা করলাম, “আমি জীবনকে প্রসারিত করবো।” রাত দশটা থেকে ভোর ছটা পর্যন্ত এই সময়টি, তা তো আমার নিজের। এ পর্যন্ত, একটা সম্পূর্ণ দিনের তিন ভাগের এক ভাগ সময়টি, ঘুমের জন্য যেটা সবাই বলে থাকে “শান্ত হওয়ার জন্য ক্ষয় পূরণ” করেই সময় কাটিয়ে দেই। কিন্তু এখন সেটা আমার নিজের। অন্যের নয়। আমার জিনিস। আমি ঐ সময়টি আমার ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহার করব। কেউ বাধা দিতে পারবে না। এটা নিশ্চয়ই আমার বর্ধিত জীবন। আমার জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ আমি বর্ধিত করছি।
জীববিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা এটাকে বলবেন অস্বাভাবিক ব্যাপার। এটা সত্যি হলেও হতে পারে। এই রকম একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার চালিয়ে যাওয়ার প্রতিদানে আমাকে হয়তো বা কিছু দিতেও হতে পারে।
সত্যি বলতে, আমার যাই হোক না কেন, সমস্ত কিছুর জন্য আমি প্রস্তুত। যদি জীবনের ওঠা নামায় আমি তাড়াতাড়ি মরেও যাই, আমার কিছু যাবে আসবে না। জীবনটাকে আমি এখন বর্ধিত করছি। সেটাই দারুণ ব্যাপার। সেখানেই আমার প্রতিরোধ। এখানেই, আমি যে বেঁচে আছি, সেই অনুভূতিটা রয়েছে। আমি ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছি না। অন্তত আমার ক্ষীণ না হওয়া অংশটা সেখানে অবস্থান করছে। সেই জন্যই, আমি নিজে বেঁচে আছি। বেঁচে থাকার অনুভূতি না থাকা সত্ত্বেও জীবন চলছে যে মানুষদের, তাদের প্রতি আমার কোনও বক্তব্য নেই। এটা আমি এখন জোড় দিয়ে বলতে পারি।
ও ঘুমিয়ে পড়ার পর, সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে, বসার ঘরে এসে সোফায় গা এলিয়ে, ব্র্যান্ডি খেতে খেতে, বইটা খুলতাম। এক সপ্তাহে আনা কারেনিনা আমি তিনবার পড়েছি। যতবার পড়েছি, প্রত্যেকবার নতুন কিছু আবিস্কার করেছি। এই লম্বা উপন্যাস নানারকম রহস্যের সমাধানে ভর্তি। রহস্য উদঘাটনের মধ্যে আবার নতুন রহস্য লুকিয়ে থাকে। গল্পটা যেন একটা জাদুর বাক্সের মতো করে লেখা, পৃথিবীর মধ্যে আরেকটা পৃথিবী, আবার সেই পৃথিবীটার মধ্যে আরও একটি পৃথিবী। তারপর পৃথিবীগুলো একসাথে জুড়ে গিয়ে একটা দুনিয়া তৈরি করছে। সেই দুনিয়াটা সেখানেই অপেক্ষা করছে, কখন পাঠক তাকে আবিষ্কার করবে। আমি তার মাত্র সামান্য কিছু কিছুই বুঝতে পেরেছিলাম। টলস্টয় কি বলতে চাইছেন, পাঠকদের কাছ থেকে কি আশা করছেন, সেই মেসেজটা কী ভাবে দানা বাঁধছে, উপন্যাসের কোন জায়গাটা তাই লেখককেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। উঁচু টিলার উপর দাঁড়ালে চারপাশটা যেমন দেখতে পাওয়া যায় ঠিক সেভাবেই যেন আমি সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পারছিলাম।
যতই মনোযোগ দিয়ে বইটা পড়ি না কেন, একেবারেই ক্লান্তি বোধ করি নি। অনেকবার আনা কারেনিনা পড়ার পর আমি দস্তয়ভস্কি পড়েছিলাম। মনোযোগ দিয়ে একের পর এক বই আমি পড়তে পারছিলাম, অথচ ক্লান্তির কোনও লক্ষণই ছিল না। বইয়ের খুব কঠিন জায়গাগুলোও অনায়াসে বুঝতে পারছিলাম।
আমার মনে হলো, এটাই আসল আমি। আমি নিজেকে প্রসারিত করেছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মনোযোগ। যে সমস্ত মানুষেরা মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারে না, তারা যেন চোখ থাকতেও দেখতে পায় না।
ব্র্যান্ডিটা ফুরিয়ে গেলে আমার খেয়াল হলো প্রায় এক বোতল ব্র্যান্ডি খেয়ে ফেলেছি। দোকানে গিয়ে আর এক বোতল রেমি মার্টিন কিনলাম। সেই সাথে রেড ওয়াইনও এক বোতল। তারপর ব্র্যান্ডি খাওয়ার জন্য একটা ভালো ক্রিস্টালের গেলাসও সাথে চকলেট আর বিস্কিট।
অনেক সময়ে এমন হয়েছে, বই পড়তে গিয়ে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছি। তখন বই রেখে, কখনো ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেছি, কখনো বা কিছু এক্সারসাইজ করে নিয়েছি। মনে হলে মাঝরাতে বাইরে বেরিয়ে কিছুটা হাঁটাহাঁটিও করেছি। পোশাক পালটে, গাড়িটা বের করে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরেছি। মাঝে মাঝে, সারারাত খোলা থাকা রেস্টুরেন্টে কফি খেতেও গেছি, কিন্তু লোকজনের মুখোমুখি হওয়াটা ঝামেলার বিষয় বলে, সাধারণত গাড়ির থেকে নামিনি। কোনও জায়গা দেখে খুব বিপজ্জনক নয় বলে মনে হলে, গাড়ি থামিয়ে অন্যমনস্কভাবে নানা চিন্তাও করেছি। কখনো আবার বন্দর পর্যন্ত গিয়ে জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়েও থেকেছি।
একবার পুলিস এসে জিজ্ঞাসা করেছিল। রাত্রি আড়াইটায়, জেটির কাছে রাস্তার আলোর নিচে গাড়ি দাঁড় করিয়ে, জাহাজের আলো দেখতে দেখতে রেডিও চালিয়ে গান শুনছিলাম। পুলিশ ঠকঠক করে জানলার কাচে ঠোকা মারল। আমি জানলার কাচ নামালাম। পুলিশটি হ্যান্ডসাম ছিল আর খুব বিনয়ীও ছিল। আমি বললাম যে আসলে আমার ঘুম আসছে না তাই এখানে। ড্রাইভার লাইসেন্স দেখতে চাওয়ায় সেটা দিলাম। ছেলেটা বেশ খানিকক্ষণ ওটা দেখল। তারপর বলল যে এখানে গত মাসেই একটা খুন হয়েছে। তিনজন অল্পবয়সি ছেলে একজোড়া প্রেমিক প্রেমিকাকে আক্রমণ করে ছেলেটাকে খুন করেছে আর মেয়েটাকে ধর্ষণ করেছে। আমারও মনে পড়ল যে এই ঘটনাটার কথা আমি শুনেছিলাম। পুলিশ ছেলেটাও বলল যে বিশেষ কোনও কাজ না থাকলে এত রাতে এই সময় এই অঞ্চলে ঘোরাফেরা না করাটাই ভালো। আমি ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম যে এখুনি চলে যাচ্ছি। পুলিশও আমাকে লাইসেন্সটা ফেরত দিয়ে দিলো। এরপর আমিও ওখান থেকে চলে এলাম।
ওই একবারই কেউ এসে আমার সাথে আলাপ করেছিল। এছাড়া, আমি সাধারণত একা একাই, এক ঘন্টা বা দুই ঘন্টা রাতের শহরে ঢুঁ মেরেছি। তারপর ফ্ল্যাটের পার্কিং-এর অন্ধকারে, ঘুমন্ত স্বামীর সাদা গাড়িটির পাশে গাড়ি পার্ক করেছি। তারপর খটখট শব্দ তুলে ঠান্ডা হয়ে আসা ইঞ্জিনের শব্দে কান পেতেছি। ইঞ্জিনের শব্দটা মিলিয়ে গেলে, আমি গাড়ি থেকে নেমে, এলিভেটরে করে উপড়ে উঠে গেছি।
ঘরে ফিরে প্রথমেই বেডরুমে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছি যে ও তখনও ঘুমিয়েই আছে। যাই ঘটে যাক না কেন, ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তারপর ছেলের ঘরে গিয়ে দেখেছি যে ছেলেও তার বাবার মতো গভীর ভাবে ঘুমিয়ে। দুজনেই, কিছুই জানে না। দুজনেই যেন এটা বিশ্বাস করে যে পৃথিবীটা কোনও পরিবর্তন ছাড়া ঠিক আগের মতোই চলছে। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। ওদের অজান্তেই পৃথিবীটা পালটে যাচ্ছে। যেখান থেকে পেছনের দিকে আর ফেরা যাবে না।
একদিন কোনও এক রাতে আমি অনেকক্ষণ ধরে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। শোওয়ার ঘরে হঠাৎ একটা আওয়াজ হওয়ায়, আমি ধড়মড়িয়ে উঠে গিয়ে দেখি, অ্যালার্ম ঘড়িটা মাটিতে পড়ে গেছে। হয়তো বা ঘুমের ঘোরে হাত নাড়ানোর ফলে, স্বামীর হাতে লেগে ঘড়িটা পড়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও, ও ঘুমিয়ে ছিল, যেন কিছুই হয়নি। কী করলে এই লোকটা চোখ খুলবে কে জানে। আমি ঘড়িটা মাটি থেকে তুলে টেবিলের উপরে রাখলাম। তারপর ওর হাতের মধ্যে হাত গুঁজে, স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বহুদিন পর বোধহয় এইভাবে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। কত বছর হবে কে জানে?
বিয়ের পর প্রায়ই ওর ঘুমন্ত মুখ দেখতাম। শুধুমাত্র ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই একটা শান্ত আর নিশ্চিন্ত বোধ করতাম। মনে হতো, ও ঘুমিয়ে থাকলেও, কোথায় যেন আমাকে নিরাপদে রেখেছে। সেজন্য, আমি ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে পারতাম।
কিন্তু কবে থেকে যেন সেটা করা বন্ধ করে ফেলেছি। একটু ভেবে দেখার চেষ্টা করলাম। সেটা বোধহয়, ছেলের নাম ঠিক করার সময় আমার আর ওর মায়ের মধ্যে একটা ঝগড়া হয় তখন থেকে। ওর মা ধর্মের ব্যাপারে একটু বাড়াবাড়িই করতেন বলে, কোথাও থেকে একটা বিশেষ নামের প্রস্তাব এসেছিল।
নামটা কি ছিল ভুলে গেছি, সে যাই হোক ওই বিষয়টা আমার একেবারেই অপছন্দ হয়েছিল। সেবার আমার সাথে শাশুড়ির প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল। তখন ও কোনওরকম কথাই বলেনি, শুধু আমাদের দুজনকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল।
সেই সময়ই আমি বুঝতে পেরেছিলাম সে আমাকে আসলে আগলে রাখে না। সত্যি, সে একেবারেই আমার পক্ষ নেয় নি। সেজন্য আমি ভয়ংকর রেগেছিলাম। এটা বহুদিন আগেকার কথা এবং তারপর আমার শাশুড়ির সঙ্গে সম্পর্কটা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। ছেলের নাম আমি নিজেই রেখেছিলাম। আমার স্বামীর সঙ্গেও খুব তাড়াতাড়িই সম্পর্কটা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল।
সম্ভবত, সেই সময় থেকেই আমি ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকাটা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
আমি ওখানে দাঁড়িয়েই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কুম্ভকর্ণের মতো ও ঘুমোচ্ছিল। লেপের তলা থেকে বাঁকানো অবস্থায় খালি পাটা বেড়িয়ে ছিল। পা'টা এমন ভাবে বাঁকানো ছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল যেন অন্য কারোর পা। মস্ত বড় মুখটা অর্ধেক খোলা আর নিচের ঠোঁটটা ঝুলে পড়েছে। চোখের তলার বিশ্রী রকমের বড় তিলটার কেমন যেন অশ্লীল। বন্ধ চোখের মধ্যেও কোথাও একটা অশ্লীল ভাব। সব মিলিয়ে, আমার মনে হচ্ছিল, যেন একটা লোক ঘুমিয়ে আছে। ঘুমিয়ে থাকার ধরনটাও জড় পদার্থের মতন। ভাবলাম, আগে তো এরকম ছিল না। বিয়ের ঠিক পর ওর মুখটা একেবারে টান টান ছিল। এই রকম গভীর ঘুমোলেও, এমন বিশ্রী মুখ সম্ভবত হতো না।
মনে করে দেখার চেষ্টা করলাম যে আগে ওর ঘুমন্ত মুখটা কেমন ছিল। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না। শুধুমাত্র এইটুকুই মনে পড়লো যে এতটা খারাপ ছিল না। এটা আমার ধারণাও হতে পারে। হয়তো তখনও একই রকম মুখ করে ঘুমোতো, শুধু তখন অনেক সহানুভূতিশীল ছিলাম। অন্তত আমার মা হলে তাই বলবে। এটা আমার মায়ের একটা বিশেষ স্বভাব।
কিন্তু আমি খুব ভালো করেই বুঝি যে ব্যাপারটা সেরকম নয়। আমার স্বামীর চেহারাটা কুৎসিত হয়ে গেছে। মুখের টান টান ভাবটা চলে গেছে। এটাই বয়স হয়ে যাওয়া। ওর বয়স হয়ে গেছে, আর তার উপর ক্লান্ত হয়ে গেছে। জীর্ণ হয়ে গেছে। এরপর যত দিন যাবে ততই যে আরও কুৎসিত হয়ে যাবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমারও সেটা সহ্য করে যেতে হবে।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। দীর্ঘশ্বাসের মতো সামান্য জিনিসে ওর ঘুম ভাঙে না।
আমি শোওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। আবার ব্র্যান্ডি খেতে খেতে বই পড়তে লাগলাম। কিন্তু কি যেন একটা মনের মধ্যে খচ্ খচ্ করতে লাগল। আমি বই রেখে ছেলের ঘরে গেলাম। তারপর করিডোরের আলোয় ছেলের মুখটা স্থির দেখতে পেলাম। ছেলেও তার বাবার মতোই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। মুখটা মসৃণ। স্বাভাবিক, আমার স্বামীর মুখের থেকে বেশ আলাদা। গালটা চকচকে আর অশালীনতার কোন ছাপও নেই।
কি যেন একটা আমার স্নায়ুকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ছেলের ব্যাপারে এই রকম অনুভব প্রথম হলো। ছেলের ঠিক কোন বিষয়টা যে স্নায়ুকে ছুঁয়ে যেতে পারে। আমি আবার নিজের হাতের মধ্যে অন্য হাত গুঁজে দাঁড়ালাম। অবশ্যই আমি ছেলেকে খুবই ভালবাসি। অথচ এখন ব্যাপারটা আমাকে বিচলিত করছে। আমি ঘাড় নাড়লাম।
কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে, চোখ খুলে ছেলের ঘুমন্ত মুখটা দেখলাম। তারপর বুঝতে পারলাম কোন ব্যাপারটা আমাকে বিচলিত করছে। ছেলের ঘুমন্ত মুখটা একেবারে ওর বাবার ঘুমন্ত মুখের মতো। আর মুখটা একেবারে আমার শাশুড়ির মুখের মতন। আমি আবার ঘাড় নাড়লাম। ভাবলাম, শেষমেষ ও তো আসলে অন্য একজন মানুষ। হয়তো, বড় হয়ে আমাকে একটুও বুঝতে পারবে না। ঠিক যেমন, ওর বাবা আমাকে বুঝতে পারে না।
আমি ছেলেকে ভালবাসি। কিন্তু ভবিষ্যতে আমি নিজেই হয়তো আর এভাবে ওকে ভালবাসতে পারব না, এমন একটা আশঙ্কা মনের মধ্যে এলো। কোনও মা এমন চিন্তা করে না।। কিন্তু আমি ঠিক জানি। হঠাৎ করে কোনও একদিন এই ছেলেকেই হয়তো আমি অবহেলা করতে শুরু করব। ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে এরকম মনে হলো। আমি ছেলের ঘরের দরজাটা টেনে দিয়ে, করিডরের আলোটা নিভিয়ে দিলাম। বসার ঘরের সোফায় ফিরে বই খুললাম। কয়েক পাতা পড়ার পর বই বন্ধ করে ঘড়ির দিকে তাকালাম। প্রায় তিনটে বাজে।
ভাবলাম ঘুম না আসার আজ কত দিন হলে। প্রথম যেদিন ঘুমোতে পারিনি, সেটা ছিল গত গত সপ্তাহের মঙ্গলবার। তার মানে আজ ঠিক সতেরো দিন হলো। এই সতেরো দিন ধরে আমি অনিদ্রায় কাটাচ্ছি। সতেরোটা দিন, সতেরোটা রাত। অনেকটা লম্বা সময়। ঘুম বলতে যে আসলে কি? এখন যেন আর মনে করতে পারি না। আমি চোখ বুজে ঘুমের অনুভূতিটা আনার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেখানে জেগে থাকা একটা অন্ধকারই শুধু ছিল। যা আমাকে শুধু মৃত্যুর কথাই মনে করালো। আমি কি তাহলে মরে যাব?
আমি ভাবলাম, আমি যদি এখন মরে যাই, তাহলে আমার জীবনটা কী ছিল? আমার জীবনটা যে কী ছিল সেটা অবশ্যই আমার জানা নেই। মরে যাওয়াটাই বা তাহলে কী?
ঘুমটা মৃত্যুরই একটা ধরন বলে ভাবতাম। ঘুমকে আরও বিস্তৃত করলে যা হয় সেটাকেই আমি মৃত্যু হিসেবে কল্পনা করতাম। সহজে বলতে গেলে, সাধারণ ঘুমের তুলনায় অনেক গভীর।
কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, এমনটা নাও হতে পারে। মৃত্যুটা, সম্ভবত ঘুমের থেকে একেবারে আলাদা রকমের একটা অবস্থা, আমি এখন যেমন দেখছি, সেই রকম, অন্ধকারে জেগে থাকা। মৃত্যু হয়তো সেই অন্ধকারের মধ্যে অনাদি কাল ধরে জেগে থাকার মতো একটা ব্যাপার।
মৃত্যু বলতে যে অবস্থাটা, সেটা যদি বিশ্রাম নাই হয়, তাহলে আমাদের এই ক্লান্তিময় অপূর্ণ জীবনে পরিত্রাণটা কেমন হবে? মৃত্যু অবশেষে কী, কেউই জানে না। কেউ কি মৃত্যুকে সত্যিই দেখেছে? কেউ দেখেনি। মৃত্যুকে যে দেখছে, সে তো মরে যাচ্ছে। জীবিত কেউ আসলে মৃত্যুকে জানে না শুধুমাত্র একটা ধারণা করতে পারে। ধারণাটা যাই হোক না কেন, সেটা শুধু ধারণার বেশি কিছু নয়। মৃত্যু যে এক ধরনের বিশ্রাম হওয়াই উচিত, এ কথাও যথেষ্ট জোড়ের সাথে বলা যায় না। না মরলে সত্যটাকে জানা যাবে না।
প্রচণ্ড একটা ভয় এসে আমাকে চেপে ধরল। মনে হলো যেন শিরদাঁড়াটা দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গিয়ে, শিরদাঁড়াটা শক্ত হয়ে গেল। চোখের সামনে, সব কিছুকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকা, শুধু অন্ধকারটাকে দেখতে লাগলাম। এটাই যদি মৃত্যু হয়, তাহলে, আমি কী করব? মৃত্যু বলতে, অনন্তকাল যদি এই ভাবে জেগে থেকে শুধু অন্ধকার দেখে যাওয়া হয়, তাহলে? অবশেষে আমি চোখ খুলে, গেলাসে যেটুকু ব্র্যান্ডি ছিল, সেটা এক ঢোকে শেষ করে ফেললাম।
রাতের পোশাক ছেড়ে, জিনস, টি-শার্ট, বেসবল হ্যাট পড়ে নিচের পার্কিং লটে এলাম।
গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে, কিছুক্ষণ ইঞ্জিনটা চালিয়ে রাখলাম। তারপর কান পেতে ইঞ্জিনের শব্দ শুনলাম। এরপর স্টিয়ারিং-এ দুহাত রেখে, বেশ কয়েকবার বড় বড় নিঃশ্বাস নিলাম। গাড়িটা যে ছুটছে, সেটা যেন অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি বুঝতে পারলাম। মনে হচ্ছিল, ঠিক যেন বরফের উপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছে, সাবধানে গিয়ারটা পালটে, শহর ছেড়ে, বড় রাস্তায় গিয়ে উঠলাম।
রাত প্রায় তিনটে বেজে গেছে, তা সত্ত্বেও রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা মোটেও কম নয়। দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দেওয়া বিশালাকার ট্রাকগুলো রাস্তা কাঁপিয়ে ছুটে চলেছে। ওরা ঘুমোয় না। রাতে রাস্তা খালি থাকে বলে ওরা দুপুরে ঘুমিয়ে রাতে ট্রাক চালায়। ভাবলাম, আমি তো দুপুরেও, আবার রাতেও কাজ করতে পারি। কারণ, আমার ঘুমের প্রয়োজন নেই। আমাকে, মনুষ্য জাতির এক নাটকীয় বিবর্তনের অগ্রণী হিসাবে ভাবলে কেমন হয়? না ঘুমানো মহিলা। হাসি পেয়ে গেল।
রেডিওতে গান শুনতে শুনতে, বন্দর পর্যন্ত চলে এলাম। একটু ক্লাসিকাল মিউজিক শোনার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু রাতের রেডিওর কোন স্টেশনেই ক্লাসিকাল মিউজিক বাজাচ্ছিল না। শুধু ক্লান্তিকর জাপানি রক মিউজিক। মোজার্টের থেকেও, হেডেনের থেকেও যেন দূরে সরে যাচ্ছি।
পারকের সাদা দাগ টানা পার্কিং-এ গাড়িটা দাঁড় করিয়ে, ইঞ্জিনটা বন্ধ করে দিলাম। চারিদিকে খোলা, স্ট্রিট লাইটের আলোয় সবচেয়ে উজ্জ্বল জায়গাটা বেছে নিলাম। পার্কিং-এ আর একটাই মাত্র গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অল্পবয়সিরা পছন্দ করে, এমন একটা গাড়ি। সাদা, ডাবল ডোর গাড়ি। একটু পুরোনো। হয়তো প্রেমিক প্রেমিকা। হোটেলের পয়সা নেই বলে, গাড়ির ভেতরেই সময় কাটাচ্ছে। ঝামেলা এড়াতে, টুপিটা একটু বেশি করে চেপে পড়লাম, যাতে আমাকে মহিলা বলে বোঝা না যায়। গাড়ির দরজাটা লক করা আছে কিনা, আর একবার দেখে নিলাম।
চিন্তাশূন্যভাবে চারিপাশ দেখতে দেখতে হঠাৎই ইউনিভার্সিটির প্রথম দিকে বয়ফ্রেন্ডের সাথে গাড়ি করে ড্রাইভে গিয়ে, গাড়ির ভেতরে আদর করার কথাটা মনে পড়ে গেল। সেই সময়, মাঝখানে ও নিজেকে সম্বরণ করতে না পেরে বলেছিল, একটু ঢোকাতে দেবে প্লিজ। আমি বলেছিলাম, না একেবারেই না, গাড়ির মধ্যে এসব সেক্স-টেক্স আমার পছন্দ নয়। সেই ছেলেটার মুখটা যেন একটা ধোঁয়াশার মধ্যে হারিয়ে গেছে। মনে হয়, সে যেন কোনও অতীতের এক অস্পষ্ট স্মৃতি। অতীতের সেই দিনগুলি যেন অনেক দূরে, অনেক কাল আগের। সবকিছুই এখন শুধুই ইতিহাস।
ঘুমের সাথে সাথে যেন আমার স্মৃতিগুলিও ঘুমিয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে যখন আমি সেই স্মৃতিগুলিকে ফিরে পাই, তখন মনে হয় যেন সেগুলি অন্য কারও। যেন আমার আগের আমি আর এই আমি এক নয়।
এই পরিবর্তনটা আমি একাই বুঝতে পারি। অন্য কেউ বুঝতে পারে না। তারা হয়তো আমার কথা বিশ্বাস করবে না। তারা হয়তো আমাকে অদ্ভুত বা পাগল ভাববে।
কিন্তু আমি সত্যি সত্যি বদলাচ্ছি।
আমি কতক্ষণ যে চুপ করে বসে ছিলাম, তা নিজেও জানি না। সেইভাবেই স্টিয়ারিংয়ের উপর হাত রেখে, চোখ বন্ধ করে চুপ করেই আমি বসে ছিলাম। ঘুমহীন অন্ধকারটাকে দেখতে দেখতে আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন ভেতরে ভেতরে একা হয়ে যাচ্ছি।
সেই সময়, মানুষের উপস্থিতিতে হঠাৎ নিজের মধ্যে ফিরে এলাম। ঠিক পাশেই যেন একটা লোক। আমি চোখ খুলে চারপাশে তাকালাম। গাড়ির বাইরে একজন দাঁড়িয়ে আছে। আর, গাড়ির দরজাটা খোলার চেষ্টা করছে। অবশ্যই দরজাটা ভেতর থেকে লক করা ছিল। অন্ধকার ছায়াটা যেন গাড়ির দুদিকেই ছড়িয়ে পড়েছে। ডান দিকের দরজায়, বাঁ দিকের দরজায়, এমনকি গাড়ির সামনে এবং পেছনেও। মুখটা দেখা যাচ্ছে না, পোশাকও বোঝা যাচ্ছে না। শুধু অন্ধকার ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ওই দুটো ছায়ার মধ্যে আটকে পড়ে আমার হোন্ডা সিটিটাকে ভয়ঙ্কর ছোট বলে মনে হচ্ছিল। ঠিক যেন একটা ছোট কেকের বাক্সের মধ্যে আটকে পড়েছি। বুঝতে পারছিলাম গাড়িটা ডাইনে বাঁয়ে দোলাচ্ছে। ডানদিকের কাঁচের জানালাটা হাতের মুঠি দিয়ে দুমদুম করে পেটাচ্ছিল। এটা যে পুলিশ নয়, সেটা ভালো করেই বুঝতে পারছিলাম। পুলিশরা এরকম করে না। এইভাবে গাড়িও দোলায় না। আমি ঢোঁক গিললাম। এখন আমার কি করা উচিত? মাথা একদম কাজ করছে না। বুঝতে পারছি ঘামে বগলের নিচটা ভিজে যাচ্ছে। ভাবলাম, এখান থেকে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে যেতে হবে। চাবি, চাবিটা ঘোরাতে হবে। আমি হাত বাড়িয়ে, চাবিটা ধরে ডানদিকে ঘোরালাম। স্টারটার মোটরের আওয়াজ শোনা গেল।
কিন্তু ইঞ্জিন জ্বলে উঠল না।
আমার আঙুলগুলো ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। চোখ বন্ধ করে, আর একবার চাবিটা সাবধানে ঘুরিয়ে দেখলাম। কিন্তু, না। বিশাল দেওয়ালের গায়ে নখের আঁচড়ের মতো শব্দ শুধু শোনা গেল। একই জায়গায় ঘুরে যাচ্ছে। শুধু একই জায়গায় ঘুরে যাচ্ছে। তার উপর ওই অন্ধকার ছায়া দুটো সেই লোক দুটো আমার গাড়িটাকে সমানে দুলিয়ে যাচ্ছে। দুলুনিটা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। ওরা বোধহয় গাড়িটাকে উলটিয়েই দেবে।
"কোথাও একটা ভুল হচ্ছে," আমি ভাবলাম। "ঠান্ডা মাথায় ভাবলে, আমি বুঝতে পারব।" আমি চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবলাম। "ঠিক আছে," আমি নিজেকে বললাম। "ঠান্ডা মাথায়, ঠিক করে ভাবো। কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।"
ভুলটা কোথায়, বুঝতে পারছি না। মাথার ভেতরটা ঘন অন্ধকার, আর আমি হারিয়ে যাচ্ছি। হাত থরথর করে কাঁপছে, চাবিটা ধরতে পারছি না। আবার চেষ্টা করতে গিয়ে, চাবিটা হাত থেকে পড়ে গেল। শরীরটা ঝুঁকিয়ে নিচ থেকে চাবিটা তুলতে গেলাম, কিন্তু গাড়িটা দুলে উঠল। স্টিয়ারিং-এ কপালটা ঠুকে গেল।
হাল ছেড়ে দিলাম। চোখের জলে ভিজে গেল মুখ। এই ছোট্ট বাক্সে বন্দি হয়ে কোথাও যেতে পারব না। রাতের গভীর অন্ধকারে, লোক দুটো গাড়িটাকে দুলিয়েই চলেছে। মনে হচ্ছে, আমার গাড়িটাকে উলটে দেবে।
অনুবাদক পরিচিতি
রিটন খান
লেখক। অনুবাদক।
যুক্তরাষ্ট্রের আটলাণ্টায় থাকেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আটলাণ্টায় থাকেন।


0 মন্তব্যসমূহ