অর্ক চট্টোপাধ্যায়ের গল্প : হেমবরণ


নিসর্গের একলা হতে মানুষের দরকার পড়ে না—একথা অবহেলায় বুঝেছিল হেমবরণ। অবহেলা নাকি হেলা? কোনটা লেখা ঠিক হত? হল? হেলায় বুঝেছিল? না, না, অবহেলায় বুঝেছিল হেমবরণ। অবহেলার সংসার ছিল তার জীবন। সবসময় এক রানের জন্য ম্যাচ হারতে হারতে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট দলের মত মনে হত নিজেকে। হেম্ব্রম নাকি তার নাম হেমবরণ?

তাও তো মানুষ কেবল ব্যাকড্রপ বানিয়ে ছবি তুলে যায়ঃ নেচার ফটোগ্রাফি নাম দিলেও অধিকাংশ ছবিতে নিজেকে দেখা যায়, অথবা বন্ধু পরিজন। নিসর্গের একা হতে যেন মানুষের দরকার পড়ে? না পড়ে না তো! তবে একাকীত্ব কে চায়? সবাই নিজেকে দোকা, তেকা, চোকা চোখা ইত্যাদি প্রভৃতি দেখাতে চায়। সমাজ মাধ্যম জায়গা করে দেয় এই দেখনদারির! ‘দেখ আমি বাড়ছি মাম্মা!’ আমি কোথায় কোথায় ট্রাভেল করছি দেখো? জায়গাটার থেকে বড় হল আমার সেখানে থাকা! আরে আমি তো আছিই, নাহলে আর ছবি তুলছি কি করে? সব ছবিতে নিজের বা নিজেদের থাকার কি কোন দরকার আছে? আমার ক্লিকের ফ্রেমই তো আমি! আবার আলাদা করে অবয়বের কি প্রয়োজন? ‘একলা হতে চাইছে আকাশ’, কে যেন লিখেছিল?

পড়ে থাকতে কেমন লাগে তা ভালো করে বুঝত হেমবরণ। অনেক কিছু আছে এ পৃথিবীতে যা ঠিক করে জানা না গেলেও বুঝে নেওয়া যায়। অন্যের অপ্রাপ্তি যে নিজের প্রাপ্তি নয় বা অন্যের প্রাপ্তি যে নিজের অপ্রাপ্তি নয় তা কি আর জানা নেই কিন্তু তাও অধিকতর মানুষ অমনটাই বুঝে নেয়! থাকা মানেই কি পড়ে থাকা? অবশেষ কাকে বলে তা হেমবরণ ভালোই বুঝেছে জীবনে। কতলোক ছেড়ে চলে গেছে তাকে, একে একে, ঘনিয়ে এসেছে শূন্যতা! সেও আসে আর যায় কিন্তু তাও বারবার ফিরে আসে। নিসর্গের একাকীত্বের জন্য! একদিন আর ফিরবে না এটা হেমবরণের জানা। তাও নিজেকে পোড়ো বাড়ির মত মনে হয়। ডালপালায় বড্ড বেশী স্মৃতি জড়িয়ে গেছে। এরপর কি তবে চলে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে?

সেদিন সারাদিন ঝেঁপে বৃষ্টি আর আকাশ মিশকালো। সিনেমা হলের ইভনিং শো শেষ হওয়ার পর পেছনদিককার সিঁড়ি ধরে মানুষের ঢল। এতো লোক বেরিয়েছে এই বর্ষণমুখর দিনে! তারই মধ্যে একদল বাঁদর ঢুকে পড়েছে আর লোকেরা ভয়ে থেমে যাচ্ছে, নামতে পারছে না। এক বাঁদর চকিতে সিঁড়ির রেলিং ধরে উপরে উঠে গেল অন্ধকারে। একটা ফ্লোর নীচে নামতে লোকজন দেখল এক কোণে জানলার কাছে মায়ের কোলে বাঁদরের বাচ্চা। বৃষ্টি এড়াতে সিনেমা হলে আশ্রয় নিয়েছে। বাচ্চা আর মা দুজনেই খানিক ভিজে গেছে! বাকিটা ভিজবে না বলে ভিতরে ঢুকে এসেছে! লোকজন আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে তাদের পাশ কাটিয়ে! পাছে ওপর থেকে বাবা চলে আসে? বাঁদরেরা চট করে একা থাকে না, সঙ্ঘবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা করে! যত গাছ কাটা পড়ে তত গ্রামে শহরে হাউজিংয়ে আরও বেশী দেখা যায় তাদের। মানুষের ধারেকাছে আসলে সে ভয় পায় অথবা ভয় পাওয়ায়। এই দুইয়ের বাইরে আর কিই বা করতে পারে মানুষ?

পাঠক ভাবছেন হেমবরণ কোথায় গেল? নাকি লোকটার নাম হেম্ব্রম। চিন্তা নেই, মরেনি, একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। ওর আসা যাওয়ার মাঝে এই বন্দরকথাটুকু বলে দিলাম!

কদিন বৃষ্টির পর যেরকম মারকাটারি একখান রোদ ওঠে তেমন হেমবরণ ফিরে আসার পর আরও বিষণ্ণ বোধ করে। প্রত্যেকবার যাওয়া আসার একটা কষ্ট আছে তো? সে চলে গেলে প্রকৃতি একাকী হয়ে পড়ে, তারপর আবার ডাক পড়ে তার। অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবার পর একদিন-দুদিন যেমন খালি পড়ে থাকে প্যান্ডেল, ঠিক তেমনই হেমবরণের পড়ে থাকা। এই বুঝি কেউ এসে ম্যারাপ বেঁধে নিয়ে চলে গেল। ঠিক যেমন শশ্মানঘাটে সৎকারের অপেক্ষা করতে করতে সদ্য মানুষ থেকে লাশ হওয়া মালটা ভাবে, কখন উঠবো চিতায় বা এই বুঝি ঢুকিয়ে দিল চুল্লীতে! শেষ হয়ে আসা চোখে কি একবার দেখে নেয় বিদায়ের পৃথিবীকে? হেমবরণের দৃষ্টির মধ্যে তেমন এক রুহানি ইঙ্গিত তৈরি হয়েছে আজকাল। তবে কি তার মিলিয়ে যাবার সময় হল?

লোকটা একবার ফোনে বলেছিল হেমকে, “জানেন আমার আজকাল মৃত্যুচেতনা এসে গেছে! সেদিন এক বন্ধু মারা গেল, শ্মশানে ওকে পোড়াতে গিয়ে কেন জানি না মনে হল নিজেকে পোড়াতে এসেছি!” হেমবরণ বিশেষ পাত্তা দেয়নি কথাটাকে! আরে ভাই মৃত্যুচেতনা তো জন্ম থেকেই থাকে! আমরা ভাবি বাচ্চারা মৃত্যু বোঝে না, অল দ্যাট ক্র্যাপ অ্যাবাউট মাম্মি বিকামিং অ্যা স্টার! ধুস! হেমবরণের দিব্যি মনে আছে ছোটবেলায় এক আত্মীয়, দূরসম্পর্কের জ্যাঠাইমার মৃত্যুর পর ম্যাটাডোরে তার বডি নিয়ে যাবার সময় সে একবারও কাউকে জিজ্ঞাসা করেনি, জ্যাঠাইমার কি হয়েছে! পরিষ্কার বুঝেছিল, জ্যাঠাইমা মরে গেছে, তাই খাটিয়ায় তুলে ধুপধুনো দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হেমবরণের মা রেগে গেছিল, ঐটুকু বাঁচাকে বডির সঙ্গে নিয়ে যাওয়ায় কিন্তু বাবা বলেছিল, না না, সবকিছুই জেনে বুঝে নেওয়া ভালো! হেমবরণ ঠিক কি জেনেবুঝেছিল তা বলা মুশকিল কিন্তু মৃত্যুচেতনা তার বরাবরই ছিল। ফোনে লোকটার মৃত্যুচেতনার কথা একেবারে গুরুত্ব না দিলেও কেলোটা তখন হল যখন লোকটা তার এক মাসের মধ্যেই ঝুপ করে মরে গেল! তবে কি নিজেকে সেদিন পুড়িয়ে দিয়ে এসেছিল সে?

ধুপগড়। রোদের দুর্গ! কি সুন্দর নাম! লোকজন বেড়াতে যায়। সানরাইজ আর সানসেট দারুণ দেখা যায় মধ্যপ্রদেশের পাঁচমাড়ি সন্নিকটস্থ এই পাহাড়চুড়োয়। লোকে দলবেঁধে আসে। সেবার একদল লোক সানরাইজ পয়েন্ট থেকে সানসেট দেখেছিল। তাদের ছাড়া অন্য কেউ ছিল না সেখানে। আর কোলে করে এনেছিল বাড়ির বয়ঃজ্যেষ্ঠ কুক্কুরীকে। সে বেচারি ডিসেম্বরের শীতে ধুপগড়ের উচ্চতায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ভয় নাকি উত্তেজনা বোঝা যায়নি! ঐ কম্পন সময়ের বুকে কামড়ের মত বসে যাচ্ছিল আসন্ন সূর্যাস্তের আকাশে। একাধিক পাহাড়ের স্রোতবদ্ধ ছায়া তখন আলো অন্ধকারের কোরাস গড়ছে ধুপগড়ের সন্ধ্যায়। একেকটি স্রোত বয়স্কা কুক্কুরীর মত কেঁপে উঠছে সান্ধ্য শীৎকারে।

হেমবরণ কই? চলে গেছে। ফিরবে তো নাকি এবার ভ্যানিশ? শূন্য প্রকৃতি কি আবার ডেকে নেবে তাকে নাকি নিসর্গ এবার উপসর্গ হয়ে স্বর্গের পথ দেখাবে আমাদের জলজ্যান্ত প্রেতকুমারকে?

হেমবরণ আসলে মানুষ নয়। সে এক অভিশপ্ত প্রেত। পৃথিবীতে যখনই কোন মানুষ মরে, হেমবরণকে একবার মরতে হয় তার সঙ্গে। মরতে হয় কিন্তু তারপর আবার যেই কেউ একটা জন্মে যায়, মানে পৃথিবীর যে কোন জায়গায় যেই কোন একটা বাচ্চা জন্মায়, হেমবরণ আবার বেঁচে ওঠে, ফিরে আসে, আসতে বাধ্য হয়! জন্ম এবং মৃত্যু এতো বেশী হয় পৃথিবীতে এবং এত ঘন ঘন হয় যে প্রতি মুহূর্তে হেমবরণ একবার মরে আর পরমুহূর্তে আবার বেঁচে ওঠে। অনেকসময় তো ভালো করে মরবার সময়টুকুও পায়না। মরতে না মরতেই আবার বেঁচে উঠতে হয়। কি পাপ করেছিল জীবনে যে মরবার পর এমন হয়েছে, তা জানে না হেমবরণ। জীবন থেকে নিরাবয়ব কিছু স্মৃতি (ফোনের মৃত্যুসচেতন বন্ধু বা মৃত জ্যাঠাইমা) ভেসে আসে তার কাছে কিন্তু কে ছিল সে মরে যাবার আগে তা সঠিক মনে পড়ে না। কতগুলো জীবনমৃত্যুচক্রের পর তার মুক্তি তাও জানে না সে! তবে প্রত্যেকবার ফিরে আসার পর আরও দুর্বল লাগে নিজেকে। ভাবে এবার শেষ। তারপর মনে হয় তার যে শরীর নেই! শেষ অনেক আগেই হয়ে গেছে! এই নরক তার ভাগশেষ! ‘ইস রাত কি সুবহ নহি’!

হেমবরণের ছবি ওঠে না। ভূতেরা ফটোবম্ব করে না সচরাচর! ভুল করে কোন মানুষের তোলা ফ্রেমে চলে আসলে ফাঁকা ফ্রেম তথা নেচার ফটোগ্রাফি হয়ে যায়। পৃথিবীতে জন্ম মৃত্যুর ভিতরকার ব্যবধান ঈষৎ বাড়লে কয়েকটি অন্তর্বর্তী মুহূর্ত এসে পড়ে হেমবরণের হাতে। ঐটুকুই তার ছুটি। তখন সে এদেশ ওদেশ, যেখানে শেষ মৃত্যু বা জন্ম হয়েছিল, সেখানে প্রকৃতিদর্শন করে বেড়ায়। ভাবে যে লোকটা মরছে তাকে যদি মরবার আগে একবার দেখতে পারতো বা জানতে পারতো, তাহলেও একটা মানুষ মানুষ ভাব হত! এতো শুধু শরীরে বা সূক্ষ্মশরীরে মৃত্যু আর জন্মের অনুভূতি হওয়া। কে জন্মাচ্ছে আর কেই বা মরছে তাও জানতে পারে না হেমবরণ! অথচ প্রতিটা জন্ম আর মৃত্যু তার অস্তিত্ব তথা অনস্তিত্বকে আধাআধি চিরে দিয়ে যায়।

এবারকার মৃত্যু অনুভূতি শেষ হলে হেমবরণ দেখে সে এক হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। জানালার বাইরে নামটা পড়া যাচ্ছে মেইন গেটের বোর্ড থেকেঃ অমলেন্দু বোধ নিকেতন!

লোকটার নাম কি হেমবরণ না হেম্ব্রম? ও ৪৬ নম্বর ঘরে থাকে। অ্যাকিউট সাইকোসিস! পরিবারে কেউ নেই। এক বন্ধু এসে ভর্তি করে দিয়ে গেছে এই হোমে। নানারকম ওষুধের ঠ্যালায় প্রায় সারাদিনই ঘুমিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙে। কি সব স্বপ্ন দেখে কে জানে। জেগে উঠে ফ্যালফ্যাল করে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে। নিথর দৃষ্টিতে কত মৃত্যু, কত জীবনের সন্নিবিষ্ট সীমানা পেরোবার বোধ লেগে থাকে। ওর নাম আলফ্রেড রাউল হেম্ব্রম। ডাক্তার সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ওকে হেমবরণ বলে ডাকেন। হেমবরণ ডাকে সাড়া দেয়। এত সামান্য ধ্বনিবৈষম্য টের পায়না! আজকাল একটা কথা বারবার বলছে হেমবরণ। ডক্টর চট্টোপাধ্যায় তাই তার ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন ঐ বাক্যঃ নিসর্গের একলা হতে মানুষের দরকার পড়ে না।

কেস ডায়েরিতে বাক্যটা লিখতে লিখতে হেমবরণকে কবি বা দার্শনিক মনে হয় সন্দীপনবাবুর। তারপর নিজেকে সংশোধন করে নেন! উই মাস্ট নট রোম্যান্টিসাইজ ম্যাডনেস, দ্যাট টু মি অ্যাজ এ ডক্টর!



লেখক পরিচিতি
অর্ক চট্টোপাধ্যায়
কথাসাহিত্যিক। প্রবন্ধকার।
পশ্চিম বঙ্গ। ভারত। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ