একদম পাশের গলি। গলির মোড়ে বিকেল সাড়ে ছ’টার আগে খানিক দাঁড়িয়ে থাকলেই তাকে দেখতে পারে তুলিকা। একটু আধটু যে দেখেনি পেছন থেকে তা নয়। তবে পুরোপুরি দেখবো দেখবো করে দু’বছর কেটে গেল কিন্তু দেখা হয়ে উঠলো না। সত্যি বলতে কি তুলিকা ইচ্ছে করেই দেখছে না। কী হবে দেখে? সেই একমাথা কোঁকড়া চুল আর বিভক্ত চিবুক নিয়ে যে সিনিয়র চিকিৎসক গাড়ি থেকে নামে সে কি সামান্যতম কৌতূহলে গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝবয়সী এক সেবিকার পানে ফিরে তাকাবে? তুলিকা কি আসলেই চায় সে তাকে দেখবে, না কেবল তুলিকাই দেখে নেবে সেই ছেলেটিকে যে পঁচিশ বছর আগে তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে অন্ধকার গলি পার করে দিয়েছিল। কেউ জানেনা, কোনোদিন জানবে না কোঁকড়া চুলের ছেলেটি তাকে তীব্র চুম্বনে আমূল আন্দোলিত করে ছেড়ে দিয়েছিল। সে রাতে তুলিকার তুমুল জ্বর।
উপজেলা শহরের পোষ্টমাস্টারের মেয়ে তুলিকা। সুলেখা, তুলিকা আর কলিকা তিন বোন। বাসায় ঢোকার মুখে বাবার অফিস আর বাসার মাঝামাঝি একটা লম্বা গলি। ওদের পাশের বাসাটা সাব-রেজিস্ট্রারের। কলিকার বয়সী জমজ ছেলে তাদের। ক্লাস সিক্সের তুলিকা কলিকা আর জমজ সোনা-মনাকে নিয়ে ছুটির দিনের বিকেলে গলির মধ্যে এ জানালা ও জানালায় মায়ের পুরোনো শাড়ির পর্দা টাঙ্গিয়ে নাটক করতো। ওদের পাঠ্য বইয়ের ‘কাজির বিচার’ নাটকের পুরোটাই তুলিকার মুখস্ত ছিল। সোনা আর কলিকা সংলাপ আওড়াতে পারতো কিন্তু মনা তোতলাতো। তুলিকা বলতো-
‘যখন তায়েফের বনে শিকারে গিয়ে আমি তৃষ্ণায় ছটফট করছিলাম, তখন পানি দিয়ে যে আমার প্রাণ রক্ষা করেছিল সে কি তুমি? সেই ব্যক্তি তুমি নও কি?’
একটু কমজোর বলে মনাকে অপ্রধান চরিত্র দেয়া হতো। মনাকে বলতে হতো –‘জি হুজুর সেই ব্যক্তি আমি’। কিন্তু সে বলতো- ‘জুজুর। সেই ভেতকি আমি’।
তুলিকার মহা পড়ুয়া বড়বোন মাঝে মাঝে ওদের নাটক দেখতে আসতো আর হি হি করে গড়িয়ে পড়তো। একবার দুপুরে তুলিকা কেবল গলির মধ্যে শাড়ি ঝুলাতে শুরু করেছে, কলিকা জলচৌকির ওপরে উঠে-
‘ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়িরা পাঁচবোন থাকে কালনায়
শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায়, হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়’ শুরু করেছে অমনি সুলেখা এসে কান ধরে কলিকাকে বাড়ির মধ্যে পাঠিয়ে দিল, তুলিকাকে শাড়ি গুটাতে বলে দুজনে মিলে জলচৌকি ধরাধরি করে গোসলখানার পেছনে দিয়ে এলো আর গজগজ
করতে লাগলো-
‘আমার বড়লোক বান্ধবীরা আসবে আজ, আর উনারা গলির মধ্যে হাট-বাজার বসিয়েছেন। ফের যদি নাটক ফাটক করিস তো এমন ডলা দেবো না!’ তুলিকার উদ্দেশ্যে ঝাড়ি মেরে সুলেখা নিজেই গলিটা সুন্দর করে ঝাঁট দিয়ে ফেললো।
পড়াশুনায় মাঝারিমানের তুলিকার মনে হতো জামা জুতা চুলের ফিতা ওসব ওর কিচ্ছু চাইনা। ওর কেবল গলিটা চাই। মা্যের সাথে ওদের তিনবোনকে নিয়ে বাবা ‘দীপ জ্বেলে যাই’ সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। ওটা দেখে আসার পর তুলিকার কাছে গলি হয়ে উঠেছিল ওর সিনেমার আঙিনা। দুপুরে সবাই ঘুমালে মায়ের কাঁথা বানানোর জন্য রেখে যাওয়া নানীর সাদা শাড়ি পরে ও সুচিত্রা সেন হতো। জানালার শিক ধরে মিছিমিছি কাঁদতো। উল্টাপাল্টা শাড়ি পরে ছুটে ছুটে অভিনয় করতে গিয়ে গলির মধ্যে আছাড় খেত।
সোনা-মনার বাবা বদলি হয়ে গেলে নতুন সাব-রেজিস্ট্রার এলো পাশের বাড়ি। তুলিকা মহা খুশি। ওদের মেয়েটা তুলিকার সাথে একই ক্লাসের। মনাকে নিয়ে নাটক করতে গিয়ে খুব ঝামেলা হতো, আর সোনাটা ছিল বেশি পাকনা। এবার নাইসকে ও গড়ে পিটে তৈরি করতে পারবে। তবে ওর বড় ভাইটা যেন কেমন! ছুটির দুপুরে নাইসকে ডাকতে গেলেই বলে-
‘নাইস এখন ঘুমাবে। বিকেলে কুমির ডাঙা খেলতে যাবেখন’।
নাইসের মা কী ভাল! তুলিকার মায়ের সাথে আসতে না আসতেই ভাব হয়ে গেল। তুলিকারা উনাকে ডাকতো ‘নতুন চাচি’। নাইসকে শিখিয়ে পড়িয়ে তুলিকা আবার নাটক রেডি করলো। নতুন চাচি নিজের ভালো দুটো শাড়ি এনে দুটো ক্লিপ দিয়ে স্টেজের পর্দার মত আটকে দিল। তাই দেখে তুলিকার মা-ও খাবার টেবিলের চারটে চেয়ার এনে স্টেজের সামনে গলির মুখে সারিবদ্ধভাবে রাখলো। সুলেখা ওদের চরিত্র অনুযায়ী সাজিয়েও দিল। কলিকা আর নাইস আশানুরূপ পাঠ করলো। যা কোনদিন হয় না তুলিকার তা-ই হলো, সে সংলাপ ভুলে যাচ্ছিল। কারণ সামনের চেয়ারে নতুন চাচি, মা, সুলেখা আর কোঁকড়া চুলের সুদর্শন নাইসের ভাই সিফাত বসে ছিল। সুলেখা সিফাতকে বলছিল-
‘বিশ্বাস করেন ও কোনোদিন এমন করে না, সব পাঠ ওর মুখস্ত। আপনারা নতুন বলে একটু নার্ভাস আরকি। সামনে ছুটির দিনে আর একটা করলে দেখবেন একেবারে ঝরঝরে’।
‘আমি আর দেখতে আসতে পারবো না। আমার সামনে ফাইনাল’- আন্তরিকতার সাথেই বললো সিফাত।
‘ম্যাট্রিক?’
‘না, ইন্টার’
‘আমি নিউ টেন’।
তারপর কোনো এক বিদ্যুতবিহীন অতিক্রান্ত সন্ধ্যায় তুলিকা নাইসদের বাসা থেকে নিজেদের বাসায় ফিরছিল। নাইসের মা সিফাতকে অন্ধকার গলিটা পার করে দিয়ে আসতে বললো। সিফাত গলির মধ্যে ঢুকেই তুলিকাকে পাঁজাকোলা করে তুলে অকস্মাত তীব্র চুম্বন দিয়ে বাসার গোড়ায় ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। তুলিকা খুব কাঁপছিল। মাত্র দশ পা গিয়ে ঘরে উঠতে ওর বিশ মিনিট লেগেছিল। ওর বিবর্ণ মুখ, কম্পিত শরীর দেখে ওর মা বোনরা ওকে জড়িয়ে ধরেছিল। অন্ধকার গলিতে ভয় পেয়ে অমন সাহসী মেয়েটির হতবিহবল অবস্থায় সবাই দিশেহারা। ওর মা সঙ্গে সঙ্গে লোহার খুন্তি আগুনে লাল করে এক বাটি পানির মধ্যে ডুবিয়ে পানিটা তুলিকাকে খাইয়ে দিল। তুলিকা সবটুকু বমি করে দিল। সে রাতে ওর ধুম জ্বর।
এরপর তুলিকা অনেকদিন নাইসদের বাড়ি যায়নি। কিন্তু বাড়ির বাইরে সন্ধ্যে অবদি কলিকা আর নাইসের সাথে কুমির ডাঙা খেলেছে। সবাই বাসায় ঢুকে গেলে সে সন্ধ্যার আঁধারে একা একা গলির মধ্যে অকারণে দাঁড়িয়ে থেকেছে। ওর একটুও ভয় লাগেনি। ওদের বেড়ার প্রাচিরের ফাঁক দিয়ে পাশের বাড়ির সবটুকু দেখেছে। নতুন চাচি বারান্দায় সিফাতের পড়ার টেবিলে চা নাস্তা দিয়ে যায়। চাচা ইজি চেয়ারে বসে ছোট আয়না হাতে নিয়ে ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে গোঁফের শাদা লোম তোলে, নাইস ক্রুসের লেস লাগানো হাতা কাটা জামা পরে স্কিপিং করে এক, দুই, তিন…পঞ্চাশ। সিফাত কখনো এ বাড়ির পানে উঁকিও দেয় না।
ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে সিফাত নতুন চাচির সাথে মিস্টির হাঁড়ি নিয়ে আসে। সুলেখা আর ওর মা আপ্যায়ন করে বসায়। কলিকা ছুটে গিয়ে মিষ্টি খায়, নতুন চাচি তুলিকাকেও ডাকে কিন্তু তুলিকা একমনে ওর পড়ার টেবিল গুছাতে থাকে। সিফাত কি একবার ডাকতে পারতো না? না, লেখাপড়া নিয়ে সুলেখার সাথে আলাপ হচ্ছে। রসগোল্লা তুলিকার ভারি পছন্দ। কিন্তু সেই মিষ্টি সে ছুঁয়েও দেখেনি।
তিন মেয়ের পর ছেলের আশায় তুলিকার মা আবার অন্তঃসত্ত্বা। ওরা সবাই মিলে গরমের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাবে। ওখানে কিছুদিন পরেই মায়ের ছেলে হবে। মা নতুন চাচির হাত ধরে বিদায় নিল। চাচি বললো-
‘এবার নিশ্চয় আল্লাহ ছেলের মুখ দেখাবেন। দোয়া করি। আমার ছেলের জন্যও দোয়া করবেন আপা, যেন ডাক্তারিতে চাঞ্চ পায়। ঢাকায় গেছে পরীক্ষা দিতে’।
‘আপনি ভাগ্যবতী আপা। আমার যেন খুব ভয় লাগছে। শরীরের মধ্যে ভাল ঠেকে না’
‘এসময় এরকম মনে হয়’- কানে কানে ফিসফিস করে বলে ‘পেটে ছেলে থাকলে শরীরটা খারাপ লাগে। আমারও লাগতো’।
তুলিকার মা ম্লান হাসে। কিচ্ছু বলে না।
জীবন একেবারে পাল্টে গেল তুলিকাদের। গ্রামে গিয়ে আর বাবার চাকুরিস্থলে ফেরা হয়নি ওদের। দু’মাস পর ওর মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেল। সাথে নবজাতিকা বোনটিও। বছর দেড়েক পর অবস্থাপন্ন চাকুরে পাত্র দেখে সুলেখার বিয়ে হয়ে গেল। তুলিকার বাবা আবার বিয়ে করলো। এক বছর ঘুরতেই ওদের নতুন মায়ের কোল জুড়ে এলো ছেলে। ওদের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে বাবার উৎসাহের নদীতে পলি জমতে শুরু করলো। ওরই মধ্যে তুলিকার মেজ মামা এসে নার্সিং প্রশিক্ষণে ভর্তি হবার জন্য তুলিকার বাবাকে বলে কয়ে ব্যবস্থা করে গেল। লেখাপড়া একেবারে বন্ধ হবার চেয়ে ওটা বরং মন্দের ভালো। অন্তত কলিকার পড়াশুনার খরচটা ও বহন করতে পারবে। যেভাবেই হোক কলিকাকে ও এম এ পাস করাবেই।
সময় গড়িয়ে গেল। বসন্ত আসে, শীত ফিরে যায়। কলিগরা তুলিকাকে বিয়ের কথা বলে। আগে ও উত্তর দিত-
‘কলিকা পাস করুক। একটা চাকরি হোক ওর। বিয়ে করুক। তারপর দেখবো’
‘তারপর তোমার বুঝি বয়স কমতে থাকবে?
‘বয়স তো আমার ক্লাস সেভেনেই পড়ে আছে’- মনে মনে বলে ও। ‘ক্লাস সেভেন, অন্ধকার গলি, মল্লিকা কলি, প্রথম অলি’।
তাই বলে প্রথম অলির জন্যই যে সে এখনো একা তা মোটেই নয়। বিয়ে ওর কাছে রীতিমত ভীতিকর। ওর দু’দুটো রুমমেটের বিয়ে পরবর্তী ভয়ঙ্কর অবস্থা ওকে ক্রমশ বিয়েবিমুখ করে তুলেছে। তাছাড়া মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলো না।
এখন একটা গলি পেরোলেই প্রথম অলিকে দেখে আসতে পারে তুলিকা। যে কোনো ছুতো নিয়ে ওই ক্লিনিকে যেতেই পারে। কখনো কোনো সন্ধ্যায় গলির মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েও থাকে। দু’বছর হয়ে গেল। কবে না জানি এখান থেকে চলেই যায় ডাঃ সিফাত রাব্বী এসোসিয়েট প্রফেসর। একটা বুদ্ধি বের করে তুলিকা। নাইস আর নতুন চাচির কথা জিজ্ঞাসা করতে গেলে কোনো দোষ হবে না। ও ওর সবচে পছন্দের একটা ধুসর রঙের তাঁতের শাড়ি পরে চেম্বারে ঢুকে খানিক দাঁড়িয়ে থাকবে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করবে-
‘চিনতে পারছেন?’
‘চিনবো না মানে? তুলিকা। আমার প্রথম প্রেম’
‘সামনের গলিটার পরেই আমার ক্লিনিক। আমি আপনাকে রোজ দেখি’
‘আবার গলি? তুমি এখনো একা?’
‘আমি তো সেই অন্ধকার গলির সন্ধ্যা থেকেই একা’
‘এখনো অভিনয় কর?’
‘আমি অভিনয় করতে পারি না, পারি না, পারি না’ -দীপ জ্বেলে যাই-এর সুচিত্রা সেন হয়ে উঠবে তুলিকা।
‘আমার সাথে যোগাযোগ রাখোনি কেন?’
‘বারে, আমাদের জীবনে কত ঝড় বয়ে গেল। একবারটা খোঁজও নিলেন না’
‘তুমি তো আমার জীবনে ঝড় তুলে গেছ’।
সত্যি সত্যিই একদিন পর তুলিকা আরেক সেবিকার কাছে এক ঘন্টার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ওর ধূসর তাঁতের শাড়ি পরে, কপালে ছোট্ট টিপ এঁকে, ঢিলেঢালা এলো খোঁপায় একটা বেলকুঁড়ি গুজে ডাঃ সিফাতের চেম্বারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ভেতরে রোগী ছিল। এটেন্ডেন্ট তুলিকাকে চিনতো। রোগী বেরোলেই ওকে ঢুকিয়ে দিল।
‘কী ব্যাপার?’ – চোখে মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে ডাঃ সিফাতের প্রশ্ন।
‘আমাকে চিনতে পারছেন?’
‘না, ও হ্যাঁ। কিন্তু নামটা যেন কী?’
একবার বসতেও বললো না ডাঃ সিফাত। তুলিকা দাঁড়িয়েই থাকে। ওর মনে হলো খোঁপা থেকে টুপ করে বেলকুঁড়িটা ঝরে পড়লো। তুলিকা পা দিয়ে ওটা মাড়িয়ে দেয়।
‘তোমার বড় বোন সুলেখা কোথায়? ও কেমন আছে? কোথায় বিয়ে হয়েছে? ওর সাথে একবার দেখা করার খুব ইচ্ছে ছিল।’
তুলিকা কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে দেখে ওর স্যান্ডেলের জোর ঘর্ষণে বেলকুঁড়িটা কখন যেন শাদা মেঝের সাথে মিশে একাকার। কিংবা ও কোনো বেলকুঁড়ি গোঁজেইনি খোঁপায়। ও ভেবেছিল। সেটা নিশ্চয় ভুলে গেছে। তা না হলে কোনো চিহ্ন থাকবে না?


0 মন্তব্যসমূহ