গল্পের নির্মাণ : বিপুল দাস



ফুকো, দেরিদা, বাখতিনের তত্ত্ব বা বোর্হেসের ছোটগল্পের বৈশিষ্ট নিয়ে আলোচনা করব না। আমি তার অধিকারীও নই। নিতান্ত একজন গল্পকার হিসেবে জীবন এবং সাহিত্যকে যেমন দেখেছি, নিজের লেখালেখির অভিজ্ঞতাই আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।

এই সময়ে বাংলাভাষায় যারা ছোটগল্প লিখছেন, হাতে গোণা দু’একজনকে বাদ দিলে যা পড়ে থাকছে, সেগুলো পড়ে মনে হতেই পারে চলাচলের নিরাপদ, প্রথাগত পথকেই তারা বেছে নিয়েছেন। ব্যক্তিবিশেষের গল্প বলার ভঙ্গিতে একটু উনিশবিশ হচ্ছে, কিন্তু ভয়ংকর কোনও বিষ্ফোরণ, যার তীব্রতা কাঁপিয়ে দিতে পারত সনাতন কাঠামো, গল্পবলার প্রথাগত প্রকরণকে আক্রমণ করে খুঁজে আনতে পারত নতুন কৌশল – তেমন বারুদগন্ধী বিপজ্জনক পথে প্রায় কেউ নেই। হাতে গোণা দুচারজনের লেখায় সেই দুঃসাহসের ইশারাটুকু কখনও ঝিলিক দিয়ে যায়। কিন্তু পাঠকের কাছে পৌঁছবার জন্য একটা আকুতি বোধহয় লেখার সময় গোপনে কোথাও কাজ করে। লেখক-পাঠক communication—দায়, সেতুবন্ধনের গোপন প্রবৃত্তি পরোক্ষে কাজ করে। সেই দায় শেষ পর্যন্ত পাঠককে একটা গল্প শোনাতে চায়। তখন সমঝোতার প্রশ্ন আসে। কেমন হবে আমার বলার ভঙ্গি, কাদের জন্য আমি গল্প লিখছি, সমাজের কোন শ্রেণীর মানুষের কাছে আমি আমার বার্তাটুকু পৌঁছে দিতে চাই, emotional factor, নাকি cerebral factor – কাকে বেশি প্রাধান্য দেব।

তখন যে প্রশ্নটা অবধারিতভাবে উঠে আসে, তা হল – সাহিত্য কি একধরণের বিনোদনের উপকরণ, নাকি আমাদের জীবনযাপনে অবিরত যে সংশয়, যে সংকট আমাদের বেঁচে থাকাকে বিপদগ্রস্ত করে রাখে, তাকে উন্মোচিত করা। আমাদের বেঁচে থাকার গ্রাফ তো কখনওই সরলরেখা নয়। অজস্র উঁচুনিচু রেখা। বিচিত্র, রহস্যময়। প্রেম, অপ্রেম, ঘৃণা, ভালোবাসা, পেটের খিদে এবং যৌনতা, কাম ও ঘাম, অশ্রু এবং রক্ত – এসব কিছুই একজন লেখকের কালির সঙ্গে মিশে থাকে। এর ভেতর কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ – সেটা নির্দেশ করার দায় লেখকের নয়। সে দায় সমাজসংস্কারকদের, সমাজসেবীর, গুরুদেবের, আচার্যদের, যুগাবতার মহাপুরুষদের। লেখক শুধু সত্ত্ব এবং তমঃ, আলো এবং আঁধারকে শিল্পসম্মতভাবে চিহ্ণিত করেন। যদি বিনোদন হয়, তবে সে লেখায় cerebral factor –এর কোনও প্রয়োজন পড়ে না। সেখানে বাণিজ্যমুখীনতাই প্রধান বিচার্য বিষয়। পাঠকের ইচ্ছাপূরণের জন্য গোলগল্প চাই। পাঠকের কাছে খুব সহজে পৌঁছে যাওয়ার কয়েকটা সমীকরণ থাকে। সে সব পড়ার পর একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয় শুধু। কিন্তু যে রসায়নে কমলকুমার মজুমদারের ‘মতিলাল পাদ্‌রি’ বা বিমল করের ‘আঙুরলতা’ গল্প চিরকালের জন্য পাঠকের মনে আসন পেতে বসে, সে রসায়ন এসব বাণিজ্যমুখী গল্পে থাকে না।

‘মতিলাল পাদরি’ গল্পে শেষের দিকের একটি প্যারা মনে করুন। ‘ এই প্রকান্ড বনভূমি, সুদীর্ঘ বৃক্ষরাজি, তির্যক আলোকপাত। সমস্ত কিছুই রহস্যময়। শিশুর ভীত চোখ এখনও কাকে খোঁজে, চোখ অনবরত মোছার ফলে মুখমন্ডল মলিন হয়েছে। সে কাঁদে, এগিয়ে আসে। আলোক ভেদ করে তার কান্নার শব্দ। পাখী উড়ে যায়, পাতা উড়ে উড়ে পড়ে আর দু-চারটে শালফুল পালকের মত দুলে দুলে নামে। শিশুপুত্র টলতে টলতে আসছে। পাদরি নিজের বুকে যেন লাথি মেরে লাফ দিয়ে উঠেই দৌড়ে শিশুর কাছে গিয়ে আছড়ে পড়লেন। শুধু তার ছোট দেহে মুখ ঘষতে ঘষতে ক্ষীণস্বরে বললেন, ‘ও প্রাণ, ও প্রাণ।‘ পটভূমি, প্রকৃতি, শিশুর ভেতর চিরকালের প্রাণের স্পন্দন, এই যেন সেই বেথেলহেমের দেবশিশু, মনেপড়ে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কলকাতার যীশু, কলকাতার ব্যস্ত রাজপথের সমস্ত চলমানতা যে উলঙ্গ শিশু স্তব্ধ করে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছিল। ওই একটি মুহূর্ত শিল্প সৃষ্টি করে। মহাজীবনের কথা বলেন কমলকুমার। অন্ত্যজ এক রমণীর, ভামর, জারজ সন্তানের দেহে মুখ ঘষছেন একজন পাদরি। বলছেন – আমি সত্যই ক্রিশ্চান নই গো বাপ। এই কনফেসন গল্পটিকে এক অসম্ভব উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

এ সময়ের ছোটগল্প – এ সময় বলতে আমি ধরুণ বলছি গত পঁচিশ থেকে তিরিশ বছর। এ সময়টা জুড়ে একদম হাল সময়টা ছেড়ে দিলে রাজনৈতিক ভাবে মোটামুটি স্থিতাবস্থাই বলা যায়। বামফ্রন্টের শাসনকাল। এ সময় শহর নয়, দ্রুত পালটে যাচ্ছিল গ্রামজীবন। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য লড়াইএর কৌশল, জীবনযাপন পদ্ধতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল। আপনারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন গত পঁচিশতিরিশ বছরের বাংলা ছোটগল্পে এই পরিবর্তনই লেখকদের কলমে উঠে আসছিল। বেঁচে থাকার জন্য সমস্ত উপাদান, মানুষ, পরিবেশ – এসবের দ্রুত পরিবর্তন, ফলে ব্যক্তিমানুষ এবং গোষ্ঠিবদ্ধমানুষ – মানুষের বেঁচে থাকায় হঠাৎ বদল ঘটে যাচ্ছিল। একটা দুটো উদাহরণ – পুকুর, বাঁশঝাড়, আলপথ, ব্রতকথা, গরুরুগাড়ি – একটা দুটো করে কমে যাচ্ছে। আসছে এস টি ডি বুথ, মোবাইল, বাইক, মোমোর দোকান। আমাদের চোখের সামনে এই ছিল হারুদার মুদিদোকান, হয়ে গেল মনিকা শপিং প্লাজা। এই পরিবর্তন আমাদের সবার চোখের সামনেই ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু লেখক সমাজের এই পাল্টে যাওয়া, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইতিহাসটুকু লিখে রাখেন। এ ভাবেই এ সময়ের কজন গল্পকার, নাম উল্লেখ করেই বলছি – অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, কিন্নর রায়, আফসার আহমেদ, নলিনী বেরাদের গল্পে বারে বারে এই পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। ছোট ছোট বর্ণনার ভেতর দিয়ে প্রকৃত সত্যসন্ধানের চেষ্টা। ভারতবর্ষকে চেনার চেষ্টা।

আসলে যখন কোনও রাজনৈতিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা আমাদের বেঁচে থাকাকে, আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে, তখন শিল্প, প্রধানত সাহিত্য এগিয়ে আসে তার লড়াই নিয়ে। ভাষাকে, অক্ষরকে হাতিয়ার করে সমস্ত মানুষের চেতনাকে, তার বোধের কাছে লড়াই করার বার্তাটুকু পৌঁছে দেয়। এ লড়াই, বুঝতেই পারছেন বন্দুককামান নিয়ে লড়াই নয়, মনুষ্যত্বহীনতা, লোভ, হিংসা, জাতিদাঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতা – যা এই সমাজকে, সভ্যতাকে পেছন দিকে টানে, তাকেই চিনিয়ে দেন লেখক।

আসলে সংশয় এবং সংকট। আমাদের বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত এই সংশয় এবং সংকটে আক্রান্ত। আমরা কোনও সময় এর স্বরূপ স্পষ্ট বুঝতে পারি। যেমন ধরুন, আর্থিক দৈন্য, জীবিকার অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সংকট, সামাজিক পীড়ন, আমার চেয়ে যে শক্তিশালী, তার কাছ থেকে নিত্য অপমান ও লাঞ্ছনা – এসব দিয়ে তো আমরা প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হচ্ছি। দু’ধরনের খিদে সেই আদিম কাল থেকেই মানুষকে আক্রমণ করে এসেছে। পেটের খিদে আর যৌন চাহিদা। যে সমস্যাগুলোর কথা বললাম, সেগুলো আর আমাদের বেঁচে থাকা – এদুটোকে যদি দুটো তল কল্পনা করি, তবে প্রতি মুহূর্তে এই দুটি তলে প্রচন্ড ঘর্ষণ হয়ে চলেছে। এই ঘর্ষণ থেকেই শিল্প জন্ম নেয়। মসৃণ জীবনযাপনে কোনও শিল্প তৈরি হয় না। ফুটে বেরনোর, ফেটে পড়ার কোনও রসায়ন সেখানে কাজ করে না। দ্বন্দ্ব ছাড়া বিকাশ হয় না, এ তো বৈজ্ঞানিক সত্য।

আর এক ধরণের সন্ত্রাসও খুব গোপনে মানুষের বেঁচে থাকায় কাজ করে। রাষ্ট্রীয় পীড়ন, রাজনৈতিক চাপ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা, প্রাণঘাতী অসুখের ভয়, দুর্ঘটনার আশঙ্কা। ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিয়েছি, তারপর যদি কোনও খারাপ খবর আসে ? আমাদের বেঁচে থাকায় যে উষ্ণতা রয়েছে, এসব ফাক্টর এক ধরণের হিমশীতল ভয় আমাদের বিপদগ্রস্ত করে রাখে। একজন গল্পকার এসব চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। একটা গল্প-কাঠামোর ওপর এসব উপাদান দিয়ে গল্পপ্রতিমা নির্মান করেন। একমেটে হয়, দোমেটে হয়, রঙ চাপানো হয়, গর্জন্ তেল মাখানো হয়। ডাকের সাজের শেষে একটি ছোটগল্প ঝলমল করে।

কিন্তু, একদম হাল আমলের গল্পকারদের বয়স যদি ধরে নিই তিরিশ থেকে ষাট, তবে তারা স্পষ্টভাবে বিশ্বযুদ্ধ দ্যাখেননি, দাঙ্গা, মন্বন্তর, তেভাগা আন্দোলন দ্যাখেননি। অর্থাৎ গোটা সমাজ, সংসারকে এবং নিজের অস্তিত্বকে তুমুলভাবে একেবারে খাদের কিনারায় নিয়ে যেতে পারে, এমন অবস্থা তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাইরে। একমাত্র সত্তর দশকের নকশাল আন্দোলন তাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে। অথচ খুবই বিস্ময়ের ব্যাপার এই আন্দোলন নিয়ে বড়মাপের কোনও উপন্যাস লেখা হল না। বিক্ষিপ্ত ভাবে কারও লেখায় এসেছে মাত্র।

আমাদের বেঁচে থাকায় একটা centre of gravity থাকে। ভরকেন্দ্র। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমরা অবিরত চেষ্টা করে যাই সেই ভরকেন্দ্রকে সুস্থিত রাখার জন্য। নইলে আমাদের বেঁচে থাকাই টালমাটাল হয়ে যায়। সেই সংকট আর সংশয় চিরকালের। শুধু রূপ পালটে পালটে জীবনকে আক্রমণ করে। এখনও বাথানিয়াটোলায় দলিতের রক্ত আলপথের ঘাসে লেগে থাকে। এখনও স্বামী যেখানে বলে, স্ত্রীকে ব্যালটপেপারে সেখানে ছাপ দিতে বলে, সেখানে ছাপ দিতে হয়। এখনও অফিসে, ট্রামেবাসেট্রেনেমেট্রোরেলে মেয়েদের যৌন হেনস্থা নিত্যকার ব্যাপার। এখনও দাম না পেয়ে, ঋণের ফাঁসে আলু ও তুলোচাষির আত্মহত্যা। এখনও শ্রমিক শোষণ, শিশুশ্রম। এসব সংকটের কথা উঠে আসছে এই সময়ের ছোটগল্পে। বেঁচে থাকার জন্য সেই ভরকেন্দ্র যাতে stable থাকে, সেজন্য আমরা অনেক দৃশ্য দেখতে চাইনা, অনেক শব্দ শুনতে চাইনা, অনেক গলি এড়িয়ে যাই দুর্গন্ধের জন্য। লেখক এসব উন্মোচন করেন। এক একজনের বলার ভঙ্গি এক একরকম। কেউ খুব তির্যক ভঙ্গিতে, শ্লেষাত্মক ভাষায় আক্রমণ করছেন। স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘মানুষরতন’ গল্পটার কথা ভাবুন। আদর্শবাদী বাবা তার ছেলেকে রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি করতে চেয়েছিল। অথচ তাকে মিথ্যের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

মানুষের বেঁচে থাকায় যন্ত্রণা এবং আনন্দ চিরকালের। শুধু উপাদানগুলো পালটে যাচ্ছে। আসছে মোবাইল, কম্পিউটার, মাইক্রোআভেন, আইপড, আইপ্যাড, নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, ওবামা, সুইট কর্ন চিকেন স্যুপ, ডিপ টিউবওয়েল, পঞ্চায়েত নির্বাচন, টুলুপাম্প। আসবেই। জীবনের কথা লিখতে হলে এসব তো আসবেই। এসব নিয়েই তো আমাদের দিনযাপন। এগুলো বাদ দিয়ে কীভাবে জীবনের চালচিত্র তৈরি হবে। এখন তো মারী নেই, মড়ক নেই, দাঙ্গা নেই, যুদ্ধ নেই, অন্তত দৃশ্যত নেই। তবুও একধরণের অদৃশ্য সন্ত্রাস কি আমাদের সন্ত্রস্ত করে রাখে না। অস্পষ্ট একটা নাম-না-জানা ভয় আমাদের স্বপ্নে আসে। কী করে অস্বীকার করি। এই সময়ের লেখায়, বিশেষ করে যারা নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখার সঙ্গে পরিচিত, আশা করি আমার সঙ্গে একমত হবেন।

লেখককে তো ইতিহাসসচেতন হতেই হয়। না হলে কীভাবে তিনি এই সভ্যতার, মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার কথা লিখবেন। মানুষ কত দীর্ঘপথ দিল। কত ধর্মযুদ্ধের নামে অন্যায় যুদ্ধ, এখনও ডাইনির মাংসপোড়া গন্ধে উল্লাস শোনা যায়, কত সাম্রাজ্যের উত্থানপতন হল। এসব কিছু মন্থন করে জীবনের রহস্যময়তার কথা, কোনও এক সার সত্যের সন্ধান করে যান লেখক। পুরাণের নতুন পাঠ, মঙ্গলপাঠের নবনির্মাণ, যে পাশ্চাত্য লেখনরীতিকে মডেল করে একসময় আধুনিকতার সংজ্ঞা ঠিক করা হয়েছিল, তাকে অতিক্রম করে দেশজ পাঁচালি, ব্রতকথা, পুরাণ, মঙ্গলকাব্যের বিনির্মানের মধ্য দিয়ে,আমাদের লোককথা, উপকথাকে নতুন আঙ্গিকে লিখছেন অনেকেই। অন্যরকম শৈলীতে যারা লিখছেন, তাদের ভেতর রবিশঙ্কর বল, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, গৌতম সেনগুপ্ত, শাহ্‌যাদা ফিরদৌস ও আরও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য।

যে অর্থে কমলকুমারের মতিলাল পাদরি বা নিম অন্নপূর্ণা, বিমল করের আত্মজা বা আঙুরলতা, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গোঘ্ন, শীর্ষেন্দুর উত্তরের ব্যালকনি, সন্দীপনের মীরাবউদি আমাদের মনে চিরকালের আসন পেতে বসেছে, জীবনকে দেখার যে গভীর দৃষ্টিভঙ্গির জন্য গল্পগুলো চিরায়ত হয়ে উঠেছে, এমন লেখা ইদানীং খুব একটা চোখে পড়ছে না। রাশি রাশি পুজোসাহিত্য, রাশি রাশি লিটল্‌ ম্যাগাজিন পড়ছি, কিন্তু ওই যে, প্রথমেই বলেছিলাম – একটা বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে দেবার মত লেখা, পাঠকের ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দেবার মত লেখা – সে কিন্তু বিরল। এখনও ‘অলীক মানুষ’-এর মত বা বাঘারু বর্মনের মত আর একটা চরিত্র বাংলা সাহিত্যে এল না। সমসাময়িক সমস্যা নিয়ে লেখার একটা প্রবণতা সব সময়েই থাকে। তা থাকুক, কিন্তু পাঠক শিল্পের ভেতর দিয়েই সুদূরকে ছুঁতে চায়। জীবনের একটা রহস্যময়তা আছে। মানুষ সেদিকেই উঁকি মারতে চায়। যে লেখক এ কালের কথাকে সেই চিরকালের কথায় নিয়ে যেতে পারেন, তিনিই সত্যিকারের দ্রষ্টা, এবং স্রষ্টা তো বটেই। একজন বড় লেখককে একবার বলতে শুনেছিলাম – তোমার পা থাকবে মাটিতে, কিন্তু দৃষ্টি প্রসারিত হবে দিগন্তের দিকে।

আসলে তো জীবনকে বুঝতে পারা। মানুষকে দ্যাখা। দেখতে দেখতে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে ওঠে। ছোটগল্প সেই বহুচর্চিত ছোটকথা, ছোটব্যথার বা একমাত্রিকতার সংজ্ঞা থেকে এখন অনেক সরে এসেছে। অন্তত বিমল কর পর্যন্ত ছোটগল্পে একমাত্রিক স্বর শুনতে পাই। পরবর্তী সময়ে একটা ছোটগল্পের ভেতরেই অনেক স্বর শোনা যেতে লাগল। গল্প যেন একটা প্রিজম্‌। পাঠ শেষ হলে পাঠক বুঝতে পারেন একটি নয়, অনেক রং-এর আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন লেখক। মূলগল্পকে আশ্রয় করে অনেক সমস্যা ছুঁয়ে রয়েছে। আসলে যে protagonist, তার পৃথিবীও এখন অনেক প্রসারিত। তার অভিজ্ঞতায় ঢুকে পড়েছে IT sector, কৃষি ও শিল্পের দ্বন্দ্ব, ভোগবাদ, নগরায়ন, বিশ্বায়ন, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের জটিলতা। ফলে ছোটগল্প এখন বহুস্বরান্তিক। অনেক রং-এর আলো ছড়িয়ে পড়ছে একটি ছোটগল্প থেকে।

তিনটি ছোটগল্পের কথা আমি জাস্ট উল্লেখ করব। গল্প তিনটি আমাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছিল। প্রথমটি জগদীশ গুপ্তের ‘দিবসের শেষে’। এ গল্পে নারাণীর পাঁচ বছরের ছেলে ঘুম থেকে উঠেই তার মাকে বলেছিল – মা, আজ আমায় কুমীরে নেবে’। এখান থেকেই গল্পটির suspense তৈরি হয়েছিল। গল্পটার কথনশৈলী এমন ম্যাজিক্যাল, প্রতিমুহূর্তে পাঠকের মনে হয় তার আশপাশেই বুঝি দুটো ড্যাবড্যাবে চোখ জলের ওপর ভেসে তাকেই লক্ষ করে যাচ্ছে। এই হল গল্পের ভেতরে সংশয় তৈরি করা। দিনের শেষে সত্যি কুমির এসেছিল। দ্বিতীয় গল্প সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের। বিপন্ন একজন মানুষ গলায় দড়ি দিয়ে মরবে বলে ফ্যানের সঙ্গে দড়ি বাঁধছে। তার ছোট্ট ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাকা ছেলের মত সে বাবাকে জিজ্ঞেস করছে – বাবা, গলায় দড়ি দিচ্ছ ? ‘গলায় দড়ি’ শব্দের গূঢ় ব্যঞ্জনা সে জানে না। অথচ ওই একটি শব্দে তীব্র সংকটের সামনে সন্দীপন আমাদের দাঁড় করিয়ে দিলেন। মিতকথন, আর অমোঘ তীক্ষ্ণতায় পাঠকের মননে একটা বিষ্ফোরণ হয়। আর একটি গল্প নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘পাগল ও প্রেমিক’। গল্পের নায়ক খাঁচায় পাখি পুষতে ভালোবাসত। কিন্তু তার প্রেমিকার মনে হত এটা এক ধরণের নিষ্ঠুরতা। শেষ পর্যন্ত প্রেমিক তার নায়িকার জন্য খাঁচার দরজা খুলে দিয়েছিল। পাখিটা বাইরে এলেই অন্য পাখিরা তাকে ঠুকরে মেরে ফেলেছিল। একটু ভাবুন, কোথায় গল্পটার সৌন্দর্য। কোথায় শিল্প রচিত হল। কোন সূক্ষ্ম ইশারা বেয়ে জীবনের গূঢ় তামাশার কথা লেখা হল। এ গল্পের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা বিষাদময় একটা সৌন্দর্যচেতনা আমাকে দীর্ঘদিন অবশ করে রেখেছিল।

ছোটগল্পের ভাষা এবং আঙ্গিক নিয়ে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। নিমগল্প, হাংরিগল্প, গল্পহীন গল্প, না-গল্প, অণুগল্প। কিন্তু মানুষ বোধহয় শেষপর্যন্ত একটা গল্পই শুনতে চায়। সেই রামায়ণমহাভারতের, বা তারও আগের সময় থেকে মাঠাকুমার কোলে বসে গল্প শোনা, হয়তো গর্ভবাস থেকেই সে শোনে যুদ্ধ আর পরীর গল্প। হাজার হাজার দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এখনও মানুষ গল্পই শুনতে চায়। নিমগল্প নয়, অমৃতের গল্প। থাকুক না হয় গল্পের ভেতরে আর একটা গল্প। বুঝ লোক, যে জান সন্ধান।

আসলে, যখন ভাষা নীরবে অক্ষরের মাধ্যমে মানুষের চেতনায় পৌঁছতে পারেনি, তখন নিশ্চয় মানুষের জীবনযাপন শুধুমাত্র আহারনিদ্রামৈথুন, এই তিনটি প্রবৃত্তি নির্ভর ছিল না। মানুষের চেতনার জগৎ অতি বিস্তৃত। প্রকৃত পক্ষে প্রকৃতির সমস্ত উপাদান সব সময়ই তার মননে কাজ করতে থাকে। নদী, পাহাড়, অরণ্য, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, বন্যা, ভূমিকম্প, বনের পশুপাখি – সব। যদি ঘটনা এটা না হয়ে ওটা হত, এই ভাবনা থেকেই কল্পলোকে যাত্রা শুরু হয়। মানুষ গল্প শুনতে আর গল্প বলতে আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে। হাটচালার নীচে একজন কথকের চারপাশে ভিড় জমে ওঠে।

১৯৯৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সময় গুন্টার গ্রাস to be continued নামে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটির কিছু অংশ বলছি। “ মানুষ সর্বদাই গল্প বলে এসেছে। মানুষ লিখতে, পড়তে ও সাক্ষর হতে শেখার বহু আগে সবাই অন্য সব মানুষদের গল্পগুলো শুনত। অবিলম্বেই দেখা গেল যে এই গল্প বলিয়েদের মধ্যে যারা অশিক্ষিত ছিলেন, তারা অন্যদের চেয়ে বেশি ভালো গল্প বলতে পারতেন। অর্থাৎ তাদের মিথ্যেগুলো আরও বেশি মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারতেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার এমন এক উপায় আবিষ্কার করেছিলেন, যাতে গল্পের শান্ত, মসৃণ গতি কমিয়ে সেটি এমন আর একটি কোনও শাখানদীর গতিপথে চালিত করা যেত, যা ক্রমশ শুকিয়ে ওঠা দূরে থাক, হঠাৎই কিছু অসাধারণ ভাবে প্রশস্ত গতিপথে পরিণত হত। অবশ্যই এই স্তরে গল্পের ধারা বেশ কিছু উৎসহীন বিষয়ের অবশিষ্টগুলিতে পরিপূর্ণ হয়ে থাকে – এগুলিই হল সাব-প্লটের বিষয়বস্তু। এই আদিম কাহিনিকারদের দিনের আলো বা লন্ঠনের আলো বা রাতের আঁধার, কোনও কিছুরই পরোয়া করতে হত না এবং আসলে তারা এই আলোয়াঁধারিকে কাজে লাগাতেন তাদের গল্পগুলিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলতে। শুষ্ক প্রান্তর বা ভয়ংকর জলপ্রপাত – এসবের কোনও কিছুই তাঁদের থামাতে পারত না। গল্পগুলো শুনে আবার বহু শ্রোতা নিজেরাই গল্প বলার তাগিদ অনুভব করতেন।
যখন মানুষ লিখতে জানত না এবং স্বাভাবিক ভাবে একই কারণে তারা লিখে উঠতে পারত না, সেই সময়ে ঠিক কী ধরণের গল্প বলা হত ? খুন আর মানুষহত্যার কাহিনিগুলোর অবতারণা করা হয়েছে প্রথম দিকে। খরা, বন্যা, ফ্যাট ইয়ার, লীন ইয়ারের সাথেই জেনোসাইড বা গণহত্যার গল্প বহুপূর্বেই অন্তর্গত হয়েছে। গবাদি পশু এবং ক্রীতদাসদের দীর্ঘতালিকা যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য ছিল এবং বীরদের গল্পগুলির ক্ষেত্রে কে কার আগে এবং কে পরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই বংশতালিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ ছাড়া কোনও গল্পকেই বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যেত না।

ত্রিকোণ প্রেমের গল্প, যা এখনও যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং তার সঙ্গেই দৈত্যদের কাহিনি – আধা পুরুষ, আধা পশু, যারা গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে তাদের রাস্তা ঠিকই খুঁজে পেত, কিংবা জলাভূমিতে ওত্‌ পেতে বসে থাকা শিকারের জন্য – শুরু থেকেই মানুষের আকর্ষণের বিষয়বস্তু হয়ে রয়েছে। জনপ্রিয়তার কথা বলতে গেলে সবচেয়ে আগে বোধহয় বলতে হয় – দেবদেবী এবং তাদের মূর্তি সম্পর্কে নানান কিংবদন্তী পরিবর্তিত হয়ে অবশেষে একজন কাহিনিকারের লিপিতে বন্দী হয়েছিল এবং তার নাম সম্ভবত ছিল হোমার। বাইবেলের ক্ষেত্রে অবশ্য কাহিনিকারেরা ছিলেন একাধিক। চীন, পারস্য, ভারত ও পেরুর পার্বত্য এলাকা, যেখানেই লিখন পদ্ধতির উন্নতি হয়েছে, কাহিনিকারেরা দলগতভাবে হোক বা একক, নামহীন ভাবে হোক বা নামসুদ্ধ – সবাই লিতারেতি বা পন্ডিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়”।

গুন্টার গ্রাসের দীর্ঘ বক্তৃতার এই অংশটুকু শোনানোর কারণ আর কিছুই নয়, ভাষা যখন সাংকেতিক চিহ্নে আবদ্ধ হয়নি, শুধুমাত্র কথকের উচ্চারিত শব্দগুলো প্রকাশ করত জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা, তখন বিষয়ের বৈশিষ্ট্য কী ছিল, কোন ধরণের গল্প মানুষ বারে বারে শুনতে চাইত, মনের গভীরের কোন ইচ্ছাপূরণের বাসনা তাকে তাড়িত করত গল্পগুলোর দিকে – এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য।

গ্রামেগঞ্জে তো গল্পের শেষ নেই। গল্পগুলো নদীর মত গড়াতে থাকে। পারের লোকজন জানে। কেউ আঁজলা ভরে, কেউ ঘটি, কেউ কলস ভরে গল্পের জল ঘরে বয়ে নিয়ে যায়। আসলে তো বংশগত ভাবে তারা গল্পটাকেই বয়ে নিয়ে চলে। চা-এর দোকানে বসে চা-এ চুমুক দিতে দিতে, মাঠে নিড়ানির সময়, সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় জলের মত গল্পগুলো বা গল্পের জলধারা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। রক্তের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে। তারপর ভেতরে ভেতরে সাজানো গোছানো চলতে থাকে। মানুষের অভ্যাস এ রকমই। হাতপায়ের মত আমাদের মাথার ভেতরেও কতগুলো আঙুল থাকে। সব সময়ে কিছু একটা আঁকড়ে ধরে সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নতুন কিছু বানাতে চায়। আমরা বলি মননক্রিয়া, আমরা বলি ক্রিয়েটিভ সিকনেস। সেই গল্পের মত জল নিয়ে তার মনোবাসনার আঙ্গিকে নতুন একটা গল্প তৈরি হয়।

গল্পের নদী গড়াতে গড়াতে অনেকদূরের জনপদে পৌঁছলে গল্পের গায়ে নতুন মাটি, নতুন রং লাগে। কোনও একজন কথক হাটচালায় বসে তার ঝুলি খুলে গল্প শুরু করলে চারপাশে লোকজন জমাট হতে শুরু করে। সবাই যেন সমস্ত শরীর দিয়ে গল্পটা শুষে নিতে থাকে। কথকঠাকুর গল্পের সুতো ছড়িয়ে দেয়, বাতাসে দোল-খাওয়া সেই সুতো ধরে সবাই তার মনের মত নক্‌শা তৈরি করে নেয়। গল্পের যে অংশ তার মনোগত হয়নি, তার ইচ্ছাপূরণের মত হয়নি, সেই অংশ সে তার ভাবনা দিয়ে বিনির্মাণ করে। সেটা নির্ভর করে শ্রোতার বিশেষ মানসিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। বিজয়ী দলের পক্ষে যেমন সোচ্চার সম্মতি থাকে, তেমনি পরাজিত দলের জন্যও কখনও ভালোবাসা তৈরি হয়। খেয়াল করে দেখুন টম অ্যান্ড জেরি দেখার সময় অবচেতনেই আমরা জেরির পক্ষ সমর্থন করতে শুরু করি।

এ ভাবেই হয়তো কোনও এক হাটচালায় বিশুঠাকুর নামের কোনও এক কথকের চারপাশে সবাই গোল হয়ে বসে। বলো বিশুভাই, তারপর ? রায়বংশ কি ফৌত হয়ে গেল? বংশে বাতি দেবে কে? কার্তিক মাসে পূর্বপুরুষদের জন্য আকাশপ্রদীপ জ্বালবে কে ? গল্প বলো কথকঠাকুর। তোমার গল্প যেন নদীর জলের ধারা। আমাদের বারোমাসে শরীরে মিশে যায়। আমাদের মাথার ভেতরে জমা থাকে। আমাদের ছেলেপুলেদের তো গল্প বলতে হবে। গল্প ছাড়া মানুষ বাঁচে না। অনেক কথা ভুলে যাব, অনেক কথা আমরা নিজেরাই তৈরি করে নেব। এক বিশুপাগলের কথা, হয়তো এক কুঠিয়ালের গোমস্তার গল্প, নীলকুঠির স্কটিশ সাহেব ম্যাকার্থির কথা। সব নদীর মত বয়ে যাবে।

পুরনো গল্প কিন্তু মরে না। বাঁক নেয়, তার ধারায় নতুন গল্পের জল এসে মিশতে থাকে। নদীর মত তালুক, মহাল, গঞ্জ, পরগণার ভেতর দিয়ে বইতে থাকে গল্পের নদী।

এবার আসল কথায় আসি। আসলে ব্যাপারটা কিন্তু অস্ত্বিত্ত্বের সংকট। সেই আদিম যুগ থেকেই সহস্র প্রতিকূলতাকে পার হয়ে বেঁচে থাকার তীব্র লড়াই ভেতরে ভেতরে আমাদের অবচেতনেই একটা ডিফেনস্‌ মেকানিজম্‌ তৈরি করে দেয়। সেই আদিম যুগে যা ছিল অতর্কিতে ভয়ংকর বন্যপশুর আক্রমণের ভয়, এখন তাই হয়েছে সামাজিক ভাবে দুর্বলের ওপর অধিক সবলের আক্রমণ। শুধুমাত্র সন্দেহের বশে পুলিশের অত্যাচার, রাষ্ট্রীয় পীড়ন। বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে তো কম সংগ্রাম করতে হয়নি। নিরক্ষরেখার উষ্ণতা, মেরু অঞ্চলের শৈত্য, ঘুম মাছির কামড়, খরা, বন্যা, ভূমিকম্প, মহামারীর মত দুর্যোগ। ছোট ছোট বিভিন্ন উপজাতিদের ভেতরে উর্বর জমি, পালিত পশু, উৎপাদিত ফসল, ভূখন্ডের সীমানা নিয়ে জাতিদাঙ্গা, বন্যপশুর আক্রমণ, গুপ্তঘাতকের ভয়। গুন্টার গ্রাসের ভাষণের এক জায়গায় এ জন্যই আমরা পেয়েছি যে, গল্পকারদের মুখে প্রথম দিকে খুন, দাঙ্গা, জেনোসাইডের গল্পগুলো প্রাধান্য পেত। বিভিন্ন উপজাতিদের ভেতরে তাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধজয়ের গল্পগুলো পুরুষানুক্রমিক ভাবেই তারা বহন করে নিয়ে যেত।

বেঁচে থাকার ভেতরে এই যে একটা ভয় সব সময় কাজ করে, এই ভয়কে অতিক্রম করার জন্য আমাদের কল্পনায় আমরা একটা কাল্পনিক শক্তির ভরকেন্দ্র তৈরি করি। এই ভরকেন্দ্রের স্বপক্ষে মনে মনে যুক্তি সাজাই। শক্তির এই কেন্দ্র হতে পারে কোনও দেবতা, হতে পারে দৈবশক্তিধর কোনও বীরপুরুষ, হতে পারে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন কোনও ডাইনি। কিংবা আধা মানুষ, আধা পশু জাতীয় কোনও রহস্যময় প্রাণী। এমন কি আকাশ থেকে ভেসে আসা কোনও দৈব বাণী হতে পারে বা কোনও অদ্ভুত গোলক।

আমি জানি না আজ কারখানার গেটে গিয়ে ক্লোজারের নোটিস দেখব কি না, আমি জানি না আমার সন্তানকে স্কুলবাসে তুলে দেবার পর সে সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরবে কি না, আমি জানি না লোন নিয়ে অনেক কষ্টে তৈরি করা আমার বাড়ির ছাদ আজ ভূমিকম্পে আমার মাথার ওপর ভেঙে পড়বে কিনা, আমি জানি না নদীর পারে আমার চালাঘর আজ প্রবল বন্যায় ভেসে যাবে কি না, আমি জানি না রাষ্ট্রের বুলডোজার এসে আজ রাতে আমার বস্তি উচ্ছেদ করে দিয়ে যাবে কি না, আমি জানি না সামান্য অজুহাতে আজ গভীর রাতে পুলিশ আমার দরজায় কড়া নাড়বে কি না। আমি জানি না আজ অফিস যাওয়ার পথে জঙ্গী-পুলিশের লড়াই-এ মাঝে আমার বুকেই গুলি লাগবে কি না। রোদ-ঝলমল সুস্থ জীবনযাপনের ভেতরে খুব ম্লান ছায়ার মত এই সমস্যাগুলো লুকিয়ে থাকে। এই হল অস্ত্বিত্ত্বের সংকট।

এবার গুন্টার গ্রাসের ভাষণ লক্ষ করব। লিখনপদ্ধতি আবিস্কারের আগেই কিন্তু কথকঠাকুর এই গল্পগুলোই রকমফেরে বলেছেন। অশুভ দানবশক্তির বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম, গুপ্তহত্যা, একজন হিরোর আবির্ভাব, ফ্যাট ইয়ার, লীন ইয়ার, গণহত্যা – কখনও পুরুষকার, কখনও দৈবের শক্তিতে শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়ের কীর্তি তো মানুষেরই মানসজাত কল্পনার প্রতিচ্ছবি। কথক শুধু ইচ্ছেপূরণের ইশারাটুকু দিয়ে যায়। আসলে, এ সময়ের একজন শক্তিশালী গল্পকার শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বারে বারে বলতেন, মসৃণ জীবনযাপনে কোনও শিল্প তৈরি হয় না। অস্ত্বিত্ত্বের সংকট আর বেঁচে থাকার সংশয়ের ভেতর দিয়েই শিল্প গড়ে ওঠে। বেঁচে থাকার ওই ডিফেনস্‌ মেকানিজমের বর্ণনার ভেতর দিয়েই শিল্প তৈরি হয়। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে সেই বর্ণনা যদি স্লোগান সর্বস্ব হয়, তবে তা কখনই শিল্প হয়ে উঠতে পারে না। শুধু মেনিফেস্টো।

তা হলে গল্প আর ঘটনার নীরস বর্ণনা কখনও এক হয় না। আসলে গল্পের ভেতরে থাকে স্ট্রেস থেকে বেরিয়ে আসার একটা প্রাণান্তকর চেষ্টা। একটা পাথরকে তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে উঁচুতে নিয়ে গেলে তার ভেতরে কাজ করার শক্তি আসে, একটা রবারের টুকরোকে টেনে লম্বা করলে সেও কাজ করার শক্তি সঞ্চয় করে, জলের স্রোত অনেক উঁচুতে থাকে বলেই প্রবল বেগে টারবাইন ঘোরাতে পারে। এ রকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যা থেকে আমরা বুঝতে পারি অস্বাভাবিক অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় আসার জন্য প্রত্যেকটা বস্তুর ভেতরে স্ট্রেস ও স্ট্রেনের খেলা চলে। মানুষের জীবনযাপনে, বেঁচে থাকার ভেতরেও সব সময় সেই ফোর্স কাজ করে। যা স্বাভাবিক নয় সেই ঘটনাই মানুষের কল্পনাকে উশকে দেয়। এক সময় সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ মানুষের কাছে অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল। তা থেকে প্রাচীন মানুষ গল্প তৈরি করত। আজ সেটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। সেখানে আর কোনও গল্প নেই। কিন্তু যদি দেখি সব দিক দিয়ে সফল একজন মানুষ আত্মহত্যা করেছে, সেটা একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার। তার পেছনে একটা গল্পের খোঁজ করি আমরা। রাস্তায় পুলিশ কোনও মানুষকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আমাদের বিস্ময় জাগে না, কিন্তু যদি দেখি সাধারণ একজন মানুষ পুলিশকে কলার ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সেটা আমাদের কাছে খুবই অস্বাভাবিক। বুঝতে পারি এর পেছনে একটা গল্প আচ্ছে। রাস্তায় আজ যে ঘটনা দেখলাম, রাতে হয়তো একা একা চিন্তা করি। তখন অনেকগুলো ‘যদি’ আপনা হতেই আমাদের ভাবনায় ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। গাড়িটা যদি আমাকেই চাপা দিত ... এখান থেকেই গল্প শুরু হয়। না হলে তো সেটা শুধু একটা দুর্ঘটনার বিবরণ হত। ফোটোগ্রাফিক সত্য আর শিল্পীর হাতে-আঁকা ছবির সত্যের ভেতরে এখানেই ফারাক হয়ে যায়। আমার পকেট থেকেই যদি পার্সটা চুরি হত, লোকটাকে যদি কেউ হাসপাতালে নিয়ে না যায়, ওর বাড়ির লোক যদি খবর না পায়, নীপা কেন আজ একবারও ফোন করল না, বাড়িতে কি কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে – এই সব অসংখ্য ‘যদি’র সুতো বেয়ে আমাদের মনে অবচেতনেই গল্প তৈরি হতে থাকে। অর্থাৎ মনন ও চিন্তনের অস্বাভাবিক অবস্থা থেকে রেহাই পেতেই যেন কল্পকথার জন্ম হতে থাকে। এ জন্যই গুন্টার গ্রাস বলেছিলেন প্রাচীনকালের সেই সব কথকদের ভেতর যারা অশিক্ষিত ছিলেন, তারা অন্যদের চেয়ে ভালো গল্প বলতে পারতেন। অর্থাৎ তারা মিথ্যেগুলো শ্রোতাদের কাছে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারতেন।

কিন্তু শ্রোতার কাছে গল্প মোহময় এবং আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার জন্য আরও কিছু ফ্যাক্টর কাজ করে। সাংবাদিকের দেওয়া ঘটনার নিখুঁত তথ্যের বিবরণ কখনও গল্প হয় না। তা হলে রোজ খবরের কাগজ বোঝাই গল্প আমাদের পড়তে হত। কোনও স্বাভাবিক ঘটনা কখনওই আমাদের মনের জগতকে আলোড়িত করে না; কিন্তু ঘটনা অস্বাভাবিক হলেই তার ভেতরে কিছু শক্তি জন্মায়। সেই শক্তি ঘটনাকে অন্য এক পরিণতির দিকে ঠেলতে থাকে। যেমন রবার টেনে বড় করলে তার ভেতরে একটা শক্তি সঞ্চিত হয়, এই শক্তি একটা পাথরের টুকরোকে অনেক দূরে ছুঁড়ে দেয়। ঘটনাও স্ট্রেস থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে। সেটা কাজ করে আমাদের চিন্তার জগতে। আর মুক্তি পাওয়াই গল্প তৈরির রসায়ন। ঘটনার তো অনেকগুলো তল বা মাত্রা থাকে। সেগুলোকে যদি গল্পঘরের জানালাদরজা মনে করি, তবে সেই বিভিন্ন পথে কল্পনার আসাযাওয়া শুরু হয়। তখন আর ঘটনার শুকনো বর্ণনা নয়, গুন্টার গ্রাসের ভাষায় এক ‘মিথ্যেবাদী’ গল্প শোনাতে বসে কবে সে এক ঝর্ণার ধারে প্রকান্ড এক বাঘ দেখেছিল, কিংবা গুহার ভেতরে সে দেখতে পেয়েছিল অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক পশুর চেহারার এক ভয়ংকর প্রাণী। এক নাবিক মৎস্যকন্যার গল্প শোনায়। একজন মোমেন বলে যে প্রতি অমাবস্যায় পিরসাহেব কালো আলখাল্লা পরে এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে যায়। সে নিজের চোখে দেখেছে। একটি বাচ্চাছেলে তার ঠাকুদার কাছে যুদ্ধের গল্প শোনে। কেমন করে স্পেনীয় আর্মাডা এসে ইনকাদের সমস্ত সোনা লুঠ করে নিয়েছিল, সেই গল্প শত বছর ধরে ল্যাটিন আমেরিকার পথে পথে ভেসে বেড়ায়। মানুষ শুনতে থাকে দেবদেবীর মাহাত্ম্যমূলক আখ্যান, নির্দয় প্রকৃতির কাছে অসহায় আত্ম-সমর্পণের গল্প, প্রবল শক্তির কাছে নতজানু হওয়ার আখ্যান। হিরো ওয়রশিপের প্রবৃত্তি থেকে বীর যোদ্ধাদের কাহিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এখনও উপন্যাসে, সিনেমায়, টিভি সিরিয়ালে সংকটাপন্ন মানুষ সেই হিরোর কাছে নতজানু। দুষ্টের দমন করে যে হাততালি পায়, আসলে পাঠক, শ্রোতা বা দর্শকের সঙ্গে ওই বীরপুরুষের এক ধরণের আইডেন্টিটি হারমোনাইজেশন ঘটতে থাকে। ইচ্ছাপূরণের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় মনে হয় আমিই জিৎ, আমিই দেব, আমিই শাহরুখ খান।

বীরত্বমূলক আখ্যানগূলোর ভেতরেও সেই কল্পনার সুতো ছড়িয়ে দেবার টেকনিক কাজ করে। সেই সুতো দিয়ে যে যত রঙিন জাল বুনতে পারে, যে যত বড় ‘মিথ্যুক’, সে তত হাততালি পায়। একা বীর খালি হাতে কুড়িজন অস্ত্রধারীর সঙ্গে লড়াই করে নায়িকাকে উদ্ধার করে শেষ পর্যন্ত আমরা একটা দমচাপা নিঃশ্বাস ছাড়তে পারি। বুকের ভেতরে বিশ্বাসের বাতাস বয়ে যায়। একটা গল্প শোনার পর বাড়ি ফিরে সেই গল্প মনের ভেতরে জারিত হতে থাকে। শ্রোতা সেই গল্প থেকে আর একটা উপ-গল্প তৈরি করে। পুরনো গল্প মরে না। তার স্রোতে এসে মিশতে থাকে পরবর্তী সময়ের জলের ধারা, নতুন গল্প।

আরও একটা ফ্যাক্টর কাজ করে। সেটা হল অনিশ্চয়তা আর রহস্যময়তা। কথক এমন ভাবে তার কথকতার জাল ছড়াতে থাকেন, সাদামাটা ঘরোয়া দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বাইরে যেন একটা জাদুকরি কুহকজড়ানো বাতাস বইতে থাকে কথকতার আসরজুড়ে। রোজকার ঘামঝরানো পরিশ্রমের বাইরে কথক হয়তো এক জাদুগালিচার গল্প বলেন। হয়তো এক সন্তের গল্প বলেন যার কৃপায় বোবা কথা বলে, কাটামুন্ড জোড়া লেগে যায়। এমন জুতোর গল্প বলেন যেটা পায়ে দিয়ে ইচ্ছেমত দেশভ্রমণ করা যায়। এ অভিজ্ঞতা তো আপনাদের সবার আছে। মানুষের বুকের ভেতরে যে অসম্ভব বাসনাগুলো গোপনে লুকিয়ে থাকে, যে ফ্যান্টাসি আমরা গোপনে লালন করি, গল্পের রহস্যময়তা তাকে স্পর্শ করে। যেন ভারচুয়াল রিয়ালিটির ভেতর দিয়ে আমাদের বাসনার নিবৃত্তি হয়। এই আধো বুঝতে পারা, আধো বুঝতে না পারার ভেতরে স্ট্রেস থাকে। এই স্ট্রেস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যে গল্প শোনে, সে না-বোঝা রহস্যময়তার ভেতর থেকে আরও গল্প নিজের মত করে বিনির্মাণ করে নেয়। আর, অনিশ্চয়তা তো থাকবেই। কথক যদি কী হতে পারে, আসলে সেটা বিশাল একটা সাপ নয়, একটা মোটা দড়ি, কুমির নয়, শেষ পর্যন্ত দেখা গেল একটা গাছের গুঁড়ি – এসব আগেই বলে দেন, তবে তো সেটি আর গল্প থাকে না, সাংবাদিকসুলভ নিছক ঘটনার বিবরণ হয়ে ওঠে। নীরস সেই গল্প যেন ফোটোগ্রাফিক রিয়েলিটির মত কঠিন সত্য, গল্পের যে মাধুরী মানুষকে চিরকাল আবিষ্ট করে রেখেছে, সেই প্রাণলাবণ্যটুকু আর থাকে না।

এবার রবি ঠাকুরের একটা কবিতা বলি। আমি এতক্ষণ যা বলার চেষ্টা করেছি, রবীন্দ্রনাথ যেন কবিতার কয়েকটি লাইনে তার সার কথাটুকু বলে গেছেন। তুমি বললে ‘যাসনে খোকা ওরে,’/আমি বলি ‘দেখো না চুপ করে।‘/ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,/ঢাল তলোয়ার ঝনঝনিয়ে বাজে,/ কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে,/ শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।/কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,/ কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।/এত লোকের সঙ্গে লড়াই করে/ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে।/আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে/ বলছি এসে,’লড়াই গেছে থেমে,’/তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে / চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে --/বলছ, ’ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল!/ কী দুর্দশাই হত তা না হলে।‘/ রোজ কত কী ঘটে যাহা-তাহা--/ এমন কেন সত্যি হয় না, আহা।/ঠিক যেন এক গল্প হত তবে,/শুনত যারা অবাক হত সবে,

এমন করেই রোজ যা ঘটে, সবই গল্প হয়ে ওঠে না। কিন্তু ঘটেনি, অথচ ঘটার সব শর্তই রয়েছে, সেই কথাই শেষ পর্যন্ত গল্প হয়ে ওঠে।


লেখক পরিচিতি
বিপুল দাস
কথাসাহিত্যিক
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ