গত দু বছরে আট লক্ষ সংখ্যালঘু দেশত্যাগ করেছে বাংলাদেশ থেকে, খবরটা বাংলাদেশ সংবাদ মাধ্যমের; পড়ে, হিমাংশু, একটু উৎসাহিত, মহুলের অ্যাকাউন্টে ঢুকে জেনে নিলো তার চট্টগ্রাম কেমন, সে কেমন, আছে; কাজকর্ম জীবনজীবিকা কতখানি নিরুপদ্রব, কতটা বিপন্নতা, কতটা নিরাপদ, ক'কদম এগলো দেশত্যাগ।
ফেসবুকে আনফ্রেন্ড, মেসেঞ্জার ব্লক, হোয়াটসঅ্যাপ ব্লক; আনফ্রেন্ড বলেই প্রতিদিন তার প্রোফাইলে ঢোকে, মহুলও ঢোকে তার প্রোফাইলে; যে-যার জীবনকাহিনী লেখে এবং যে-যার জীবন ও কাহিনী জেনে নেয়; লেখালেখি জানাজানি ঢোকাঢুকির প্রতিক্রিয়া সূক্ষ্মভাবে তাদের পোস্টে ছায়া ফ্যালে, ফেসবুক তো ওপেন পার্সোনাল ডাইরি, সেও বোঝে, মহুলও বোঝে পারস্পরিক টানাপোড়েন। হয়তো, নিশ্চিত, উভয়ের চেতন অবচেতনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানতে অথবা জানাতে সে, মহুল, হিমাংশুকে ব্লক করে নি, হিমাংশুও ব্লক করেনি তাকে।
ভগ্ন সরস্বতীমূর্তির ছবি পাঠিয়ে, মহুল লিখেছিলো, মৌলবাদীদের আক্রমণে সে যদি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তার ফাস্ট প্রায়োরিটি ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ার বেঙ্গল; ইন্ডিয়ার কোথাও না কোথাও তসলিমা নাসরিন নিরাপদেই তো আছেন। পশ্চিমবঙ্গই সে বাছবে, বাংলাভাষার জন্যই; তার মনেই হবে না, এ পরবাসে রবে কে? শান্তিনিকেতন সামনে, আসানসোলে হিমাংশুর বাড়ি বলতেই লাফিয়ে উঠে মেসেঞ্জারেই, নজরুলের শহরের লোক তুমি!
—চুরুলিয়া তোমার বাড়ির পাশেই!
—আমাদের জাতীয় কবি।
—দেশত্যাগ করলে নজরুলের কী দরকার?
—দেশহীনের সেক্সপিয়ার রবীন্দ্রনাথ নজরুল কিছুই থাকে না।
—তখন তার অস্তিত্বটাই বায়বীয়।
—বাকি সব প্রতীক।
ইন্ডিয়ায় এসে সংখ্যাগুরুর অংশ হয়ে উঠলে তার প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে জানতে চাইলো হিমাংশু।
সে বললো, দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস নেবো,
—অনেক দিনের চাপা প্রশ্বাস সশব্দে নির্ভয়ে ছাড়বো বাতাসে।
স্বদেশে বসেই সে আক্রমণাত্মক, ভারত বাংলাদেশ মিলে তার ফ্যানফলোয়ার লাখ খানেক; কাটাকাটা কথার খিস্তি-সহযোগে আক্রমণাত্মক পোস্ট তৎসহ কত্থকের বহুবিধ মুদ্রায় লাস্যময় সেল্ফি, আধ ঘন্টায় দু-বঙ্গের ৫০০ লাইক কাড়ে, কমেন্ট বক্স উপচে পড়ে প্রশংসায়। সুন্দরী ও শিক্ষিতা, সঠিক জায়গায় সযুক্তি কাঁচা খিস্তি ঝাড়লে তা এনাক্রনিজম, তা আকর্ষণীয়, তা জীবন্ত প্রতিবাদ, পতপত করে উড়তে থাকে পাখা মেলে, যেন জুনুন সে নিজেই, যেন এখুনি ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বে স্টেনগান মেসিনগান ট্যাঙ্ক মর্টার নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে। এবং অথবা, তার হাতেপায়েঘাড়েগদ্দানে ভয়াবহ-মোটা কোমরে কত্থকের মুদ্রা ও পুরুষসুলভ খিস্তি তাকে সেক্সি করে, যেন এখুনি কাপড়চোপড় খুলে সঙ্গমে আহ্বান করবে; মোটা হয়ে গেলেও শরীরের আবেদন তীব্র।
পোস্ট পড়ে মনে হয়, সেপারেশনের পর থেকে একদিনও যৌনবঞ্চিত নয় সে।
আমি কার সঙ্গে সেক্স করবো, সে ডিসিশন নেবো আমিই।
আমি নারী, আমি সব পারি,
বাল পারো!
সেক্সের সময় তুমি ওপরে শোবে নাকি নিচে,
তা স্থির করতে তোমার শক্তি আছে সব-পারো নারী?
পরকীয়া-দক্ষ স্বামীকে দেবতা-জ্ঞানে চায়ের কাপ বাড়িয়ে হাসিমুখে পাশে দাঁড়ানো তো তোমার পাতিব্রত্য প্রতিষ্ঠায়।
—নেক্সট অভিবাসন হবে কানাডা কিম্বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র…
—ইন্ডিয়া যদি ভিসা না দেয়।
—ভিসা পেয়ে যাবে,
—ইন্ডিয়ায় কিন্তু বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করতে পারবে না।
—কেন? কেন?
কপালে মেদ সত্ত্বেও ভাঁজ, প্লাক ভুরুতে চঞ্চলতা
—তুমি তো অনুপ্রবেশ করবে না,
—পাসপোর্ট ভিসায় তো তোমার স্বামীর নামটিই থাকবে।
—ডিভোর্স ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে অসম্ভব।
—লিভ ইন করতে পারো।
—মানবাধিকার, কানাডা আমেরিকায় মজবুত।
—যদিও আমার সোনার বাংলা,
—আমি তোমায় ভালোবাসি।
হিমাংশুর অবসর নিতে তখনো চার বছর, এক্সটেনশন নিলে আরো ন বছর, নটা বছর মানবজীবনে দীর্ঘ, মধ্যিখানে কোভিড, একটি উৎকন্ঠিত অবসর জীবন বিশ্বজনতার; শক্তিচালিত না, বুদ্ধিচালিত না, বাজার যাওয়া নেই, ক্লাশ নেই, ঘরবন্দী অলস অবসরে পড়াশুনো পর্যন্ত না, মেধার সব দায়টা নিয়েছে ফেসবুক, ফেসবুক আর ফেসবুক। এতবড়ো সঙ্কটে একা ফেসবুক বাঁচিয়ে রেখেছিল এতবড়ো মানবসভ্যতাকে। সম্পর্কের নতুন বিন্যাস, নতুন জটজটিলতায়, নতুন আবেগঅনুভূতিতে নতুন জীবনধারার স্রোতে, পাড়ে বসে দেখতে দেখতে হিমাংশুও কখন জলে নেমে গেছে সকলের মতো, তাতেই, হিমাংশু, ফেসবুকে, চেনা একটা নাম, সেই কি, সেই কি, চেহারাটায় পঁয়ত্রিশ বছরের ধুলোবালিছাই, নিছকই কৌতুহল, কমেন্ট করলো, আপনি কি বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজের?
—১৯৭৯-এর ব্যাচ?
তৎক্ষণাৎ জবাব, হ্যারে আমিই।
পাত্তাই দেয়নি যে-রূপসী কলেজ পাঠকালে, তার গলায় এখন লালঝোল।
—কে জানতো ক্লাসমেটদের মধ্যে তুইই হয়ে উঠবি ফেমাস?
— তাহলে কি,
—তোকে ছাড়তাম?
—তোর ইন্টারেস্ট আছে আমার ওপর,
—জানতাম তো।
পুনরায় লিখলো, তুই তো সুপ্রতিষ্ঠিত।
—বিখ্যাত।
—প্রফেসর
—ডক্টরেট।
—রিসার্চার।
—লেখক।
—গল্পকার।
—ঔপন্যাসিক…
—আসানসোলেই বাড়ি বানিয়েছিস?
—অনেক বড়ো নিশ্চয়ই?
—গাড়ি কিনেছিস?
—তোর তো মাইনে প্রচুর।
—ইউনিভার্সিটির প্রফেসরদের স্কেল তো আইএএস রেঙ্কের।
—আমারও খুব ইচ্ছে ছিল
—প্রফেসর হই।
—প্রফেসরদের আমি খুব লাইক করি।
সামাজিক সম্মান ওই প্রাক্তনীর চেয়ে, বর্তমানে, আড়েবহরে, হিমাংশুর বেশি; হয়তো আর্থিক দিক থেকেও তুলনায় সলভেন্ট ভাবছে তাকে, বলেই, কেবলমাত্র হাউস ওয়াইফ, বিয়ের পর, পেটে-সন্তান কোলে-সন্তান নিয়ে এমএ করেছে, প্রাইভেটে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে; তার ডিগ্রি-অনুরাগের প্রশংসা ছাড়া আর কী করতে পারে হিমাংশু, প্রফেসর যখন?
প্রশংসা করলো, পড়ন্ত বেলাতেও, আকর্ষণীয় রূপের।
—তুই যুবতীটিই আছিস!
—তোর বউ নিশ্চয়ই অও-নে-ক সুন্দরী?
প্রফেসরদের লাইক করা একদার ইন্টারেস্ট তৎসহ ক্লাশমেট ফেসবুক দেখাটা উস্কে দিলো, এভাবেই, যেভাবে তাকে আবিষ্কার করেছে, অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়ার আদিম আনন্দে একে একে কতো হারিয়ে যাওয়া ক্লাশমেট রুমমেট হোস্টেলমেট, কলকাতামেট জুকারবার্গের সহায়তায় খুঁজে পাচ্ছে, ঘরে বসেই, ফটাফট।
নস্টালজিয়া এক বিমার, তাকে খোঁজা আরো বড়ো বিকার, একবার আক্রান্ত হলে পা পিছন পানেই এগোয়। পাত্তাই দেয়নি যে-রূপসী কলেজ পাঠকালে, তাকে আর পাত্তা দিলোনা হিমাংশু। অহঙ্কারের উদ্ভব সবার আগে, তার সরীসৃপ গতি অনন্তে প্রবহমান, তার ভঙ্গুরতাও সর্বাগ্রে।
হিমাংশু, তাহলে, এখুনি, বুড়ো হতে যাবে কেন? প্রোফাইলে কেবল মেয়েদের, বলাবাহুল্য সুন্দরীদের; একসঙ্গে অত অত সুন্দরী, তাদের রকম, প্রকার, শারীরিক, বদনিক, চৌলিক, গাঠনিক, চৌখিক, বেশবাশিক , চৌষট্টি ইনটু চৌষট্টি ইকুয়েলটু চার হাজার নাইন্টি সিক্স কলাভঙ্গিমার অপ্সরী ইন্দ্রের সভাতেও ছিলনা-দের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালো।
ইন্দ্রের অপ্সরী দরকার ছিল ধ্যানভঙ্গ, অধিকার ও আগ্রাসনে, হিমাংশুর দরকার কিসে?
কিসের জন্য??
রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করতে তার প্রোফাইলই কাফি। প্রোফাইলে কে আর সত্যি কোর্ট-এফিডেফিট তথ্য দেয়, ফটোটা পর্যন্ত দশ বছর আগের, পটাপট হারেম ভরে যেতে লাগল পৃথিবী-ধোঁড়া অপ্সরীতে। মেনকা রম্ভা উর্বশী করে গোটা পাঁচেক সেই সুন্দরী-সমুদ্রের মুক্তো তখন তার দিবারাত্রের অপ্সরী, তাকে নাচায়, সেও নাচায়। পারস্পরিক নাচানাচির ছন্দেগানেসাহিত্যেকলায়ছলায়ভ্রূকুটিতে একা মহুলই নারীরত্ন, কে কাকে কাত করলো, নাকি সে টলিয়ে দিলো তাকে, তা আজ মনীষার সাবজেক্ট। মেয়েরা কত রকমের ফটো সাঁটে, কত কিসিমের ফিগার তাদের, কত স্টোরি, কত টিকটক, কত পোস্ট, কত মনোবাসনা , কত মনোবিকলন। ফেসবুক আলো হয়ে থাকে স্টোরিতে, পোস্টে, ফটোতে।
তখন মহুল মুখিয়ে আছে যে-কোনো বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠিত পুং-এর জন্য, যতটা নিজের জন্য ততোধিক তার সদ্য ঝেড়েফেলা কুৎসিত জন্মদাগতুল্য স্বামীটির মুখে নুড়ো ঘসে দিতে, মরীয়া, পোস্ট পড়লেই বোঝা যায় মনোবাসনা; জানালো, আমি পুরুষতন্ত্রকে ঘেন্না করি।
—পুরুষদের পছন্দ করো না?
— আমি কিন্তু পুরুষই।
—সংসার তো অপৌরুষেয় নয়।
—প্রকৃত পুরুষের দাসী হতেও ভাগ্য লাগে।
নারী স্বাধীনতা ভারতে স্বীকৃত বলে, নারীদের অধিকার আইন ও সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত বলে, ডিভোর্স করার, লিভ-ইনের অধিকার স্বীকৃত বলে, সর্বোপরি পিতার সম্পত্তিতে পুত্র-সমতুল অধিকার স্বীকৃত বলে, আদালত নির্ধারিত খরপোস প্রাক্তন হেজব্যান্ড দিতে বাধ্য বলে, ভারতের নারীবাদী আন্দোলন রূপচর্চার গাড্ডায় পড়ে আছে। বাংলাদেশে কত সেপারেটেড নারী! তারা বীরাঙ্গনা, তাদের চেতনায় এখনো মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিদিন ২১-শে ফেব্রুয়ারি; কখনো গেরিলাকৌশল কখনো সরাসরি রণাঙ্গনে, তারা। বাংলাদেশী মহিলাদের হিমাংশু লাইক করে, প্রতিটি জেলার বাংলাদেশী মহিলা তার ফেসবুক ফ্রেন্ড। একদল সেপারেটেড নারী, বিবাহ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কত কাহিনী কত তত্ত্ব কত মতামত রেখে যাচ্ছে। কত অকপটে লিখতে পারে কত নেই -এর কথা, কত যৌনাচারের কাহিনী, কত না বলা কথা। তেমনই মহুল, সেপারেটেড, নারীবাদী। প্রোফাইলে লেখা যদিও মেরিড।
—আইনত আমি তো ওই পাষণ্ডটারই স্ত্রী,
—জানো, এক পাড়ায় থাকি,
—নিজের গর্ভের সন্তানদের দেখতে পর্যন্ত পাই না।
—কথা বলা তো দূরের বিষয়।
হিমাংশু কষ্ট পেলো এবং পেলো না। দম্পতির দম্, যাকে দমন করা হয়, অবদমিত হওয়া তার আইনত প্রাপ্য।
—দমন-অপরাধের গ্লানিতে পতি আরো স্বাভাবিক দানব হবে।
—সন্তান, হিন্দু আইন অনুযায়ী পিতার ।
—মাতার অধিকারে পড়ে না।
—উৎপাদিত দ্রব্য মালিকের, মজুরের নয়।
—না চষলে ফসল হয়?
—নারী তো জমি।
—উর্বর অথবা ঊষর।
—লিঙ্গ ও লাঙল,
—উভয়েই কর্ষণ করে।
—শস্য কি মাটির হয়?
—আমাদের দেশে তো ডিভোর্স নেই।
—চাইলেও দ্বিতীয় বার বিয়ে করতে পারবো না।
কী মিষ্টি হাসলো মেয়েটি, আমাদের দেশ মনুশাস্ত্রের অনুশাসনাধীন।
—বিষয়টা অর্থনীতিও।
—জমির আইনের সঙ্গে স্ত্রী স্বাধীনতা কোরিলেটেড।
— হিন্দু মেয়েরাও শত্রুসম্পত্তি,
—দখল করাই যেতে পারে।
—দলে দলে ধর্মান্তরিত হচ্ছে।
—সেপারেটেডরা।
—আমার মা অসাধারণ সুন্দরী ছিল জানো।
—মা বরাবরই চেয়েছিলো আমাদের নিয়ে শহরে চলে আসতে,
—বাবা কিন্তু তাঁর ভাই, মা, বাবার বিশাল সংসারের খরচ জোগাতে টাকার খামতি হবে ভেবে শহরে আনেন নি।
—কাকেও।
—জানো কেন?
—আমাদের যে কোনো ভাই নেই।
—বাবার সম্পত্তির অধিকার পাবে তো বাবার ভাইপোরা।
নস্টালজিয়া আক্রান্ত মেয়েটি বড়ো মুখর,
—জানো,
—একবার এক ভোরে ঘুমচোখে দেখি, মাটির সিঁড়ির দু ধাপ ওপরে দাঁড়িয়ে বাবা, দু-ধাপ নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের পিঠে একটা লাথি মারলো,
—খুব জোরে না হলেও বিশুদ্ধ লাথি ছিল।
কথার আঘাতে নাকি পদাঘাতে, সে, যার প্রোফাইলে লেখা নাম মহুল, তখন হাঁপাচ্ছে।
হিমাংশু বলেছিল, আমি ঘটি।
সমূহ বাঙাল-বিদ্বেষ নিয়েও হিমাংশু জানে, বিশ্ববিশ্রুত বাঙালির সবাই পূর্ববঙ্গ রিলেটেড, তার মানে, সেও, বিশ্ববিশ্রুত হতে চাইছে, এমন আকাঙ্ক্ষায় বললো, খাঁটি ঘটি।
—ঘটিরা মাছ রান্না করলেও মিষ্টি দেয়।
—আমাদের পুরুলিয়া বাঙালদের চেয়েও বেশি ঝাল খায়।
—তবে তো খাপে খাপে মিলে গেল।
টুক করে পাকা আমটি পেড়ে নিলো হিমাংশু,
তোমাকে ভালোবাসি।
—আমিও কি তোমাকে কম ভালোবাসি?
ভালোবাসা কত সরল ও সহজ।
প্রাগৈতিহাসিক যুগ পার করে শরীরে প্রাচীনতম তামাটে শ্যাওলা, সিন্ধু সভ্যতার কোমর বাঁকানো নারীটি, বললো, আজ থেকে ২২/২৫ বছর আগে আমাদের যোগাযোগ হলে জীবনটা অন্যরকম হতো, বলো?
—জীবন জীবনের মতোই হতো।
—হয়তো তোমার সঙ্গেও সেপারেশন হতো।
—অন্তত স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার পেতাম, —ডিভোর্সের অধিকার পেতাম,
—পুনর্বিবাহের অধিকার পেতাম ।
—ভাঙবার জন্য গড়তাম,
—বলো?
—ভাঙতেও তো পারতাম সত্যিকারের।
—আমি কিন্তু বিবাহিত।
—তাতে কি?
—আমাদের দেশে হিন্দু পুরুষেরা অগণন বিয়ে করতে পারে।
—আমাদের দেশে কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে বেআইনি,
—স্ত্রী বেঁচে থাকতে,
—যদি ফির বিয়ে করো,
—উপপত্নীর মর্যাদা পাবে।
—তার স্বামীর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তিতে অধিকার নেই।
—তাতে আমার লাভলোকসান কিছুই নেই,
—আমাদের দেশে যে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকারই নেই।
—সম্পত্তির আকাঙ্ক্ষাও আমাদের রক্তে নেই।
—ভালোবাসবে, তাহলেই হবে।
—তোমার অরিজিন তো ভারতীয়।
—ভারতীয় মেয়েরা স্বামীকে দেবতাজ্ঞানে দেখে।
—ডিভোর্স পেপার না দেখাতে পারলে তো আইনি বেআইনি কোনো বিয়েই এদেশে অসম্ভব।
—কত বদলেছে জানো আমার স্বদেশ, জানো? —ঋতু পর্যন্ত আলাদা হয়ে গেছে।
—আমাদের ভাষা মুসলমানী বাংলা।
প্রেম স্বর্গীয় অতএব বিকৃত, অতএব মাংসাশী।
—তুমি কি সন্তান চাও?
—পুনরায়?
—অবশ্যই।
—গর্ভযন্ত্রণা এত ভালো লাগে?
—যন্ত্রণার পর অনাবিল আনন্দ পায় নারী।
তার প্রোফাইল পিকচারে তার ছেড়ে আসা পুত্রের মা-বেটার চুমোয়-চুমোয় জড়াজড়ি। তার ছেলে এখন অনেক বড়ো, তার কাছে সন্তানের অমন জড়াজড়ি উষ্ণতার ছবি এ-জীবনে হয়তো অলীক, এটাই তার মাতৃসত্তার স্থির প্রতীক, কতোটা রক্তক্ষরণে তার দিনমান তার রূপক, কতটা রাঙারঙিন ভবিষ্যৎ চেয়েছিল তার পোট্রেট।
সন্তানকে মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়ার আইনী অধিকার আছে বাংলাদেশের বিবাহ বিচ্ছিন্নতায়।
—আরো সন্তান নেবে?
—মাতৃত্ব আদিম,
—স্ত্রী শব্দের অর্থ, যেখানে গর্ভ সংহত হয়।
—মাটি সবসময় জন্ম দিয়ে যায়।
—পৃথিবীর আরণ্যকময়তা বনোচ্ছেদ-আসক্ত মানব বুঝবে না।
—মন্টোও চেয়েছিলেন ইসমত চুঘতাই তাঁর বিবি হোন,
—হয়নি।
—আমরাও চাইছি,
—হবে কি?
জবাবের বদলে একটি জমাটি ছবি পাঠিয়েছে, তার লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণের ওপর সমান্তরাল রাক্ষুসে তারকাঁটার জটজটিলতা।
রাজনীতি কবে ভূগোলে হারিয়ে যাবে?
নারী প্রজা ছাত্র জমি কর্মী শ্রমিক সবাইকে স্ত্রী শব্দে সনাক্ত করে রাষ্ট্র।
আলাপের কয়েকটি দিনেই ইনবক্সে তুমুল মত্ত বাতাচারে তাদের প্রেম ও ততোধিক দ্রুততায় তার বিবাহ প্রস্তাব।
—এবারে আর আপত্তি হবে না,
অর্থাৎ বিয়েতে, অর্থাৎ মহুলের ব্রাহ্মণ পিতার।
—তুমি তো ব্রাহ্মণ।
তার প্রেম করে বিয়ে করা প্রাক্তনটি কায়স্থ।
—তুমি কি পিতার অধীনা?
—আমাদের পিতারা কন্যার জন্ম দিয়ে হাত মুছে নেয়।
—নিজেকেই নিজের ডেসটিনি বুঝে নিতে হয়।
—পিতৃবাধ্য কন্যাও ভাগ্য নির্ভর।
— ইন্ডিয়ার বউ হয়ে যাবো।
—মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকবো।
—নিজের দেশ আত্মীয়স্বজন সবকিছু ছেড়ে বিদেশি হতে মায়া লাগবে না?
—না।
—তোমার নাড়ি পোঁতা আছে তো ও মাটিতে?
—প্রেমবন্ধনের যুগ এটা নয়।
—বর্তমানের সব বন্ধন, চুক্তি।
—বন্ড।
—কর্মফলে তার অধিকার নেই।
—সে উৎপাদক মাত্র।
—জানো, পুরুলিয়ায় একটি প্রবাদ আছে,
—ভাত দেয় কি ভাতারে, ভাত দেয় গতরে।
—বুঝছো তো,
—বিবাহ যতটা ধর্মের, তার চেয়েও বেশি ইকোনোমি?
—তাহলে পাত্তাড়ি গোটাও।
—মানবজাতি পাত্তাড়ি খোলার সুযোগ পেলো কবে?
—সারভাইভনেসের মধ্যেই রয়ে গেছে নোমাডিক স্বভাব…
দল বেঁধে থাকাটা অনিবার্য জেনেও কত কোটি বছর এক সঙ্গে থেকে হঠাৎ কিসের অ-সুখে একটা দল অরণ্য নদী জন্তুজানোয়ার ভরা অন্নপ্রাচুর্য ছেড়ে ডার্ক কন্টিনেন্ট পরিত্যাগ করে ভূমধ্যসাগরের আলপথ ধরে এপাশে এসে আবার দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো?
বিভক্ত হয়ে যাওয়াটি থেকেই মানবজাতি বিচ্ছিন্নতায় অভ্যস্ত।
পলায়নপর জীব ।
একদল আল্পস পেরিয়ে হল নার্ডিক, টেক্সাস। আর একটা দল মরুভূমি পেরিয়ে হল ট্রপিক্যাল, ইন্দো-এরিয়ান।
অরণ্যের ফল পুষ্করিণীর জলেই পেয়ে গেল আরামবিরামস্থবিরতা,
তাদের পৃথিবী তো ছোটই।
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পৃথিবী হিমালয় থেকে বিন্ধ্য পর্বত পাতালে স্বর্গে মর্ত্যে বিভক্ত।
এই জিন জানে অঋণী আর অপ্রবাসীই একমাত্র সুখী।
এই জিন বিশ্ব-অর্থনীতি আর বিশ্ববাজারের মুখে ডেস্টিনি নির্ভর।
এই জিন কখনোই কলম্বাসের জন্ম দেবে না, ভাস্কো-ডা-গামাও না।
টেক্সাসদের পূর্বপুরুষতুতো বোন হয়ে মহুলের রক্তের গভীরে ডুব সাঁতার কাটে আদিবাসীঘৃণা, ব্লেকদের স্লেভ বানানো। নিজে স্লেভ হতে সে কি পারে এতদিনের প্রভুত্বের পর? সে তো সারাজীবন আকাঙ্ক্ষা করে গেছে শান্তি প্রভুত্ব স্থিরতা। অধীনতা তার রক্তে নেই, নেই বলে অত রণরক্ত সফলতা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
কিন্তু রাজনীতি কি তা হতে দেয়? মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু আছে কি পুঁজিবাদী দুনিয়ায়? পৃথিবীকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অতি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নামধেয় সার্বভৌম হতে চাওয়ার স্বভাবটিও তো কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন।
ধর্ম তার আমিষাশী তরবার।
সংখ্যালঘু হয়ে যা সে সইছে, সংখ্যাগুরু হয়ে তার সুদআসল ফিরিয়ে নিতে সে তাহলে মানবিক গুণেই মরীয়া? মৎস্যগন্ধা-নারী কর্ণফুলীর ওপার থেকে রূপালি ইলিশের মতো লাফিয়ে উঠলো এক্সপোর্ট হতে।
—মৎস্যগন্ধা মানে জানো?
—বলো…
—আমি-আমি গন্ধের, যাকে বলে আমিষ গন্ধ,
—মালিকানার গন্ধ,
—আধুনিকা, তুমি কিন্তু রাষ্ট্রের অধীনা।
—বৃথামাংস ভোজন করো না।
তখন, বিকেলের সূর্য, সকালেরও হতে পারে, শৈশব আর বার্ধক্য যেমন একাকার নাবালকত্বে, তদ্রূপ মোবাইলে একাকার প্রাত-সায়ান্ন, গাছের পাতার ঝিলমিল ডেকোরেশনটাই কিন্তু শহুরে সৌন্দর্য, পেছনে ফিকে ফিনকির অন্ধকার, কালচে, বাতাসে ভাসমান মরা কিম্বা কচিরোদের লাশ, ছায়া পুবেও হতে পারে, পশ্চিমেও হতে পারে, তিরতির; বাতাস এমন ঢেউ-খেলে-যায় বঙ্গভূম-ব্যাকগ্রাউন্ডে মহুলের চুলের ওড়াওড়ি, বললো, আর এ দেশে থাকা অসম্ভব!
—তোমার দেশে গেলে থাকতে দেবে?
—কোথায় থাকবে,
—ইন্ডিয়ায় না ভারতে?
থতমত মেয়েটি প্রস্তরীভুত, হিমাংশু বললো, চলে এসো।
—বেঙ্গলে।
রিক্সা থেকে নেমে মহুলের মাটি পা ছোঁয় নি এখনো, তখনো রিক্সার চাকায় গতি, দ্রুততম গতির মহিলা, টানটান চুলেও খুচরো দু-একটি উড়ন্ত, শাড়ি তো পাতাবাহার, সমুদ্র-ঢেউতুল্য সিঁড়ি দুটো-দুটো ভেঙে যেতে যেতে, টুসটুসে ঘামে সিক্ত মহাকর্ষের টান ছিঁড়তে গতি ছাড়িয়ে দ্রুততম গতির মহিলা সিঁড়িতে সিঁড়িতে।
হুমড়ি-খেয়ে-পড়া আটকে দিতে হিমাংশু দ্রুত হাত বাড়ায়, অমনি করে কেউ সিঁড়ি ভাঙে? অমন অ্যাকসিডেন্টাল স্টেপ?
— আসলে আমি তো উড়ছি।
স্ক্রিন জুড়ে বিরাট একটি হাসি, মস্ত একটা আকাশ টাঙিয়ে দিয়েছো তুমি।
জলস্তম্ভের মতো সে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে সিঁড়িতেই। চতুর্দিক বর্ণিল, সাত সাত্তে চৌষট্টি কলার বিচ্ছুরণ, পৃগুগণ। তন্ত্রে একেই বলেছে যোগিনী।
যে অবিশেষে দ্যাখে, সেই পশু।
ক্যামেরা অন্ধ হইয়া দ্যাখে।
আকাশ, আকাশের দিকে ঘুরে গেল মোবাইল, নাকি আকাশ ঢুকে গেল মোবাইলে; আকাশের কোনো রাষ্ট্র নাই। মোবাইল কাঁপছে বলে রাষ্ট্রও কম্পমান।
—জানলাম, আমার অন্তত একজন আছেন। —মাথার ওপর, ছাদ।
—তোমাকে কি রোজ এমনি দৌড়ঝাঁপ করে অফিস যেতে হয়?
–-পৃথিবীতে রাজাও পরাধীন।
—আহা!
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, জুম্মাবার ছুটির আনন্দ নেবে বলে ছ'টা সারাদিন চার পাঁচটা ফোনে উৎকন্ঠিত রোগীদের সঙ্গে বকবক করে সন্ধ্যেতে আর ফোনে কথা বলে না, মেসেজ লেখে।
— সন্ধ্যেয় করলে না যে?
—কল?
–-রাতেই তো বিরহ মূর্তি পায়।
মেসেজে লিখলো, প্রিয়জন বুকের ভেতর চলে আসে।
সকালেই মহুল মেসেঞ্জার ভিডিওতে, কথা ফুটেছে, একা একা জেগে কাটালাম। এক ফোঁটা ঘুম এলো না।
—এই দুঃসময়ে ঘুমোতে পারা যায়?
তারপরই অগ্নি অঙ্গার, নট অ্যাভেলেভেল।
নেটওয়ার্ক প্রবলেম।
তার ছবি এবং মনখারাপ আর আতঙ্ক, ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনে এমন একগুচ্ছ ফটোসহ পোস্ট দিয়েছে ফেসবুকে।
ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। দুদিন পর ভিডিও কলে, তার হাসিমুখ; বললো,আর বাংলাদেশে থাকা সত্যি অসম্ভব।
–-তো চলেই এসো।
শেখ হাসিনা বলছেন, দেশত্যাগীরা মানসিক অসুস্থ। তাহলে, মহুলও কি মানসিক অসুস্থ? প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছেন; রাষ্ট্রের ভাষ্যে; অসুস্থরাই ১৯৪৭ থেকে ২০২৩, দেশত্যাগ করতে করতে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। পুরোপুরি ইস্লামিক কান্ট্রি করে তুলতে না পারার ক্ষোভ নানা জনের পোস্টে পোস্টে, ছিন্নভিন্ন দেবী প্রতিমা, টুকরোও তো সমগ্রতা, রক্তও তো প্রতীক, মৃত্যু তো বৃহত্তর প্রতীক। যার মূর্তি পূজা হয়, সে সত্যি সত্যি মৃত। মৃতদেহের জন্য এত উত্তেজনা ঠিক না। শোক বেমানান।
—চলে এসো, একবস্ত্রে চলে এসো।
—তুমি এতো ভালোবাসো?
—তোমার চেয়ে তোমার দুঃসময়কে বেশি ভালোবাসি,
—জানো তো, আমাদের দেশে হিন্দুদের ডিভোর্স নেই।
—পুনর্বিবাহ নেই।
— জন্ম, বিবাহ এবং মৃত্যু।
—মাঝখানে সন্তান ধারণ।
—এই হলো রমণী জীবন।
—তার পিতার সম্পত্তিতে অধিকার নেই।
—তার স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার নেই।
—তার গর্ভজাত সন্তানের ওপরও অধিকার নেই।
—দেখবে?
মোবাইল জুড়ে ক্লোজআপ একটি স্তন, তাতে তীক্ষ্ণ কিছু দিয়ে চিরে দেওয়ার পুরোনো ক্ষতচিহ্ন, ভূতুড়ে, আবছায়া। এই বুঝি ইন্দ্রত্ব হাতছাড়া হয়ে গেল, সদাসতর্ক উৎকন্ঠিত বণিকসমাজের প্রতিনিধি শুধু বিনষ্টিই জানে; বশ্যতাই জানে, তার সবকিছু আত্মসাৎ করা চাই, তার হাতে আছে গন্ধর্ববিদ্যা, তপস্যায় বিঘ্ন ঘটানো চাই।
মহুল আঙুল দিয়ে তুলে দেখায় দু-সন্তানের চুষে যাওয়া তরল স্তন,
—এগুলো ব্লেড দিয়ে চিরে,
—বলেছিল,
—যাঃ! কাকেও ভোগ করতে দেব না!
টুসটুস করছে মেয়েটির স্তনের বোঁটা। তার চারদিকে সূর্যরশ্মির মতো বিচ্ছুরিত শিল্পসুলভ ব্লেডের ক্ষতচিহ্ন।
এতবড়ো খতরনাক সম্পর্ক নিছক ব্যক্তিগত পরিসরে হজম করা মুশকিল। পৃথিবীতে স্বামী স্ত্রীর মতো অনাত্মীয় কেউ নেই; বড়ো গাঢ় আদর করতে করতে, গিন্নিকে, মহুলের কথা বললো হিমাংশু, খুব দগদগে করেই বললো তার অসহায় অবস্থাটি, করুণা সৃষ্টি করতে পারে এতটাই প্রতিমা।
—অসহায়াকে কি আমরা আশ্রয় দিতে পারি?
হিমাংশুর ধর্মপত্নী, বললো, নানা কারণে মেয়েদের সেপারেশন হয়।
—বিয়ের আগে সব প্রেমিকই স্বর্গ মুঠো খুলে অল্প অল্প দেখায়,
—বিয়ের পর ধরিয়ে দেয় একটি বিশুদ্ধ নরক। —তারপর ধরো....,
—অর্গাজম না হলে মেয়ে পরপুরুষমুখো হয়। —তারপর ধরো…
অনিঃশেষ ধরো ধরো-য় হিমাংশু তখন অধৈর্য।
বিশ্বদুনিয়াকে তুড়ে দেওয়া যায়, বুকে এখন অজর-দুদ্দস্যি অনিঃশেষ নির্ঝরিণী স্ত্রী, মাঝে মাঝে হালুম দিয়ে জানান দিচ্ছে অস্তিত্ব, গলকম্বল বেয়ে অতৃপ্তির ঘাম। প্রয়োজনে সহমরণে যাবে, স্বামীর দ্বিতীয় সঙ্গম মানবে না! কোনো মানুষই আর সুখী নয়। গভীর গভীরতর অসুখ ছাড়া বেঁচে থাকাও মিথ্যে। নিজের মুদ্রাদোষকে একা হতে দেবার দোষে দুষ্ট বলবার যুগ পেরিয়ে গেছে। অনুভূতিপ্রবণ মানুষের জীবনে আর শান্তি থাকবে না।
—পৃথিবীর কোনো অসহায়াকেই আশ্রয় দিতে আমার আপত্তি নেই।
—ভয় তোমাকে নিয়ে…
—সে আমার চেয়ে অনেক ছোট।
—বোনের মতো থাকবে।
—পুরুষের লিঙ্গ সম্পর্ক মানে না।
—চিতাতেও লকলক করে।
কেন মানুষ নেক্সট ডে-তে বেঁচে থাকতে চায়? সব লেখা হয়ে যাবার পরেও কেন সে লিখতে চায় দ্বিতীয় অধ্যায়? পরমার্থের ধ্বংসস্তূপে বড় একা-একা, নেক্সট ডে-র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আজের ডাল ভাঙা, জানে, পরের দিনই আবার ডালে ফেঁকড়ি গজাবে। পুনঃপুনঃ জেগে ওঠাই তবে লাইফ।
যৌনতার জয় হোক।
বিকারের জয় হোক।
হিমাংশুর যে প্রেম ছিল একাধিক মেয়ের সঙ্গে, গৃহিণী জানে। প্রত্যেকের ছবি, প্রতিটি প্রেমপত্র তার দেখা এবং পড়া। একজন যে মরেছে নিজের আগুনে নিজেই পুড়ে, তারই অবিমিশ্রকারিতায়, নিজের শরীর ছাই করে উড়িয়ে দিয়েছে স্বেচ্ছায়, সেটাও তার জানা। মহুলের ছবি দেখে বললো, স্বেচ্ছাদগ্ধার স্মৃতিউদ্ধার।
—এরও তো দাঁতে ফাঁক, তোমার ইয়ের মতো।
আত্মদগ্ধার নাম আর বললো না। বোকা বোকা হাসলো হিমাংশু, তার ওপর রোদ্দুর ঢেলে দিলেই প্রকৃতি, গৃহিণী বললো, স্মৃতিতে বাস করে বার্ধক্য।
আত্মদগ্ধার স্মৃতিতে এখনো, কখনো কখনো বহুরাত হিমাংশু বিমনা, সেটাও তিনি জানেন এবং উপভোগ করেন প্রেমবঞ্চিত সে-নারী। প্রেম না করলে ঈর্ষাটাও বোধহয় জন্মায় না।
—বিয়ে জন্মজন্মান্তরের কোনো সম্পর্ক নয়।
গৃহিণীকে প্রথম দিন থেকেই বলে আসছে হিমাংশু।
—তোমার যাকে পছন্দ তার কাছে যেতে পারো,
—যার সঙ্গে খুশি নতুন করে ঘর বাঁধতে পারো, —লিভ টুগেদার করতে পারো।
—বিয়ে কোনো অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক নয়।
ধর্মপত্নী বললো, তুমি এমন জানলে চুটিয়ে প্রেম করতাম।
—কতো ছেলে প্রেমপ্রস্তাব দিয়েছিলো।
—জানো?
—পাত্তা দিইনি।
—এখন পস্তাচ্ছি।
—সতীত্ব তোমাকে কাহিল করেছিল।
তাও ছুঁই ছুঁই ৫০-এ। সারাজীবনের প্রচেষ্টায় তিনি হিমাংশুর অনেককিছু, নিছক ধূমপানটাও বন্ধ করতে পারেন নি। অন্নজল বন্ধ করে দেওয়া, কথাবার্তা বন্ধ করে দেওয়া, ছেলেকে হিমাংশুর কাছে আসতে না দেওয়া, বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া, ডিভোর্সের হুমকি দেওয়া, আত্মীয়দের দিয়ে চাপ দেওয়া, বন্ধুদের দিয়ে চাপ দেওয়া, ইত্যাদি করেও ব্যর্থ কলহান্তরিতা স্বীকার করে নিয়েছে পরাজয়; পুনরায় হারতে হবে, অভাবিতপূর্বের কাছে, যে নিজেই জীবনে হেরে গো-হারা— গৃহিণীকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল,
সেই হিমাংশু, একগুঁয়ে হিমাংশু, এক কথায় ধূমপান ছেড়ে দিলো, মাত্র একবার, কী আদুরে গলায়, এ-মা! তুমি স্মোক করো!
ছেড়ে দিও।
বকা দেব কিন্তু!
ব্যাস, এইটুকু টোটকাতেই এত বছরের ধূম্রপ্রেম, অ্যাটলিস্ট মাসাধিককাল, বন্ধ ছিল প্রেমিকার কথায়। প্রাথমিক স্তরে গৃহিণী খুশি হয়েছিলো, মনে মনে ধন্যবাদ দিয়েছিলো সেই ভার্চুয়াল প্রেমিকা মহুলকে, একমাত্র তারই, হিমাংশুর চরিত্র সংশোধনের ক্ষমতা আছে, স্থিরনিশ্চয় বিশ্বাসে, সে, যেচে, তাকে, সেই ভার্চুয়াল প্রেমিকাকে, মেসেঞ্জার কল করে প্রস্তাব দিয়েছিলো, তুমি তোমার দাদাকে বিয়ে করো।
হিমাংশু ও মহুল তারস্বরে হো হো করে হেসেছিলো, আমাদের/তোমাদের দেশে দুটো বিয়ে বেআইনি।
—আমি ডিভোর্স দেব।
—তোমাকে তো শায়েস্তা করতে পারবে এ মেয়ে!
সেদিনই, সে-রাতে হেরে গিয়েছিল দুজন। হিমাংশুকে ব্লক করে দিলো মহুল, আর, হিমাংশু, পুনরায়, সিগারেট ধরালো।
দুঃখের মাধুরী করিলে দিশেহারা সিগারেট বিহনে উদযাপন হয়?
তারপর মাসাধিককাল, বাক্যবিনিময় বন্ধ, আড়-চোখেও দেখেনি, সেই মাসাধিককাল বিপন্ন সময়, কেউ, কাকেও।
একা।
উভয়েই,
ভয়াবহ রকমের একা।
তবুও কখনো, কোনো রাতে, পাশটিতে শুয়ে গভীরভাবে কোনো লেখা, কোনো চিন্তা, ঘুমকে বসতে দিচ্ছে না চোখে, এসেও ফড়ফড় করে উড়ে যাচ্ছে ঘুম, চোখ খোলা, পাশের সে, বলে উঠলো, মনে পড়ছে ওর কথা?
হিমাংশু বলে, না।
বেদনা-সর্বনাশ-মোহ-অন্ধকার-পুলক-অনুভব- প্রত্যাশা-প্রতারণা-কলঙ্ক-বিরহের ঘন-বুনোট কোনো-কিছু একটা সে-রাতে আসতেই দিলো না নিদ্রাকে।
—অত অকৃতজ্ঞ হয়ো না। ভালো তো বাসতো?
—না বাসতো না।
—আমরা মেয়েরা চিনি।
—ও কত রাত ঘুমোয় নি, আমি জানি।
—বিয়ে করলেই কি মেয়েরা বিধবা হয়?
—তাঁর সামনে-পিছনে কিছু-নেই জীবনে।
—তুমি পুনরায় তাকে অনাথ করেছো।
—বিধবা করেছো।
---আমি জানতাম, তুমি ফির সিগারেট ধরবে।
—সিগারেটের মতোন এত চুম্বন কে দিয়েছে অত নিবিষ্ট মৈথুন?
—আমি তো আর তোমাকে শ্রদ্ধা করতে পারবোনা।
—ভক্তিও না,
—ভালোবাসা তো নয়ই।
প্রেম এখনও সেই প্রাচীন প্রস্তরযুগেই পড়ে আছে। তাকে আধুনিক করা কী হিমাংশুর পক্ষে সম্ভব?
সে রাতে কেন যে, তারাভরা আকাশের তলাকেই, স্ত্রীবিছানাঘরদোর নয়, আকাশ ভরা তারাকেই কেন সে সঙ্গী করেছিল, নাকি উপমহাদেশে এক একটিই আকাশের তলায় বসবাস করা, একই বঙ্গোপসাগরের ঢেউভেজা হাওয়াবাতাসের ভেতর সে মহুলের স্বাদগন্ধস্পর্শ পাচ্ছিল, তার স্তনযোনি সহ সারা শরীর? সবাই যখন নিদ্রা যায়, দণ্ড জেগে ওঠে। সে অনাবিল একটি হস্তমৈথুনে, তখন, উৎক্ষিপ্ত বীর্যে মহুল শস্যসম্ভবা, ভারি একটি আদিগন্ত সোনালি মাঠ। অস্তিত্বে অনস্তিত্বে সে একটি লাশ, হিমাংশু বেঁচে আছে বলে, ঘরে ফেরা-হিমাংশু তাঁকে, তার গৃহিণীকে, বিবাহকালীন জীবনে, এই একবারই, কাঁদতে দেখলো, ওই ২২ মার্চ, মঙ্গলবার, রাত্রে।
কাঁদলে নিজেকে বড়ো দীন লাগে।
সে-এক রাতে, কী আশ্চর্য সমাপতন, হিমাংশুর দাঁতে অসহ্য ব্যথা, তাঁর প্রাচীন ছিন্ন -লিগামেন্টে প্রাণঘাতী বেদনা, ওষুধের কৌটা খুঁজে পাওয়া গেল মাত্র একটি ব্রুফেন, ট্যাবলেট। জলের বোতল ও সেই বেদনার লালে-লালিম ব্রুফেন বিছানায় পাশে ছোট টেবিলে সারারাত জেগে রইলো, তারাও জেগে রইলো যন্ত্রণায়, বিছানার দুপ্রান্তে। একে অপরকে গোপন করতে, কে কতোটা ডুবছে ব্যথার অতলে, এক অলীক কম্পিটিশন, সেই দূরত্বে, অসহনীয় যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে গৃহিণী জিজ্ঞেস করলো, ওর খবর নিয়েছো? ওদের লকডাউন…
—মাইনে পাচ্ছে না হয়তো,
—প্রাইভেট কোম্পানি…
কিং তন্ন যেনাসি মমানুকম্প্যা।
—তার কোনো দোষ নেই।
হিমাংশু বললো, তুমি পেনকিলার খাও।
—আমি লবন-জল গরম করে নিয়েছি, ব্যথা নেই।
সে বললো, না, তুমি খাও। আমি নিক্যাপ বেঁধেছি।
—ব্যথা নেই।
সারা রাত্তির যন্ত্রণার প্রহরী অনড়অচল একমাত্র ওই একক ব্রুফেন। সে-ই জানে, কতোটা ব্যথা সহ্য করা যেতে পারে। ব্যথা তাদের মাঝখানে মস্ত একটি স্পেস।
পত্নীসহ যুধিষ্ঠিরও স্বর্গে যেতে পারেন নি, পত্নীটিই সব চেয়ে আগে লুড়কে গেছলো, তেমতি গৃহিণী, বুঝছেন, পঞ্চনারীর নাথ, তাঁর, তাহার স্বামী, বিগ্রহটি, স্বর্গে পৌঁছবে না কারো প্রতি বিশেষ ভালোবাসায়। তার একক স্বর্গবাস নিশ্চিত জেনে জাতিসংঘ যেমন উদ্বেগ প্রকাশ করে হঠাৎ বেধে ওঠা যুদ্ধে কিম্বা জেনোসাইডে, তদ্রূপ উদ্বেগে গৃহিণী বললো,
—কালই পাপ বিদায় করো। সব দাঁতগুলো তুলে ফেলো।
—কদ্দিন রাত-দুপুরে জ্বলবে!?
—এবার ব্রুফেন স্টকে থাকবে।
—পেইনকিলার সব সময়েই ভালো কি?
—সময়েসুযোগে মহা উপকারী।
—কিন্তু জানো তো, একদিনে, একটির বেশি দাঁত তুলবে না ডেনটিস্ট।
—শাসক কবে সমূলে উৎপাটন করেছে সমূহ যন্ত্রণা?
—শাসকের দরকার নেই, আমিই পারি।
—একটা আধলা ইঁট ছুঁড়ে সব যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে দেবো একদিন!
—তুমি তো তুমি, তোমার চোদ্দ পুরুষের দাঁতও ভেঙে যাবে।
—ঝুরঝুর।
ভঙ্গুর দাঁতের পতন-শব্দ সুর হয় তার জিহ্বাগ্রে।
—তারপর বিধবা হবে।
—বৈধব্য যে কী ভালো, কী মিষ্টি...
—প্রেমও একটা পুঁজিবাদী চক্রান্ত।
—সেদিন পড়লাম, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের প্রধান অর্থনীতিবিদ লোরেন্স সামার্স গোপন নোটে সহকর্মীদের মতামত জানতে চান, সেটাই ১৯৯২-তে লেখা হয়েছে Let them pollution নামে।
সীমা, তার বউ, উঠে বসলো বিছানায়, সত্যি কখনো তোমার সঙ্গে কেউ প্রেম করেছিলো?
—মানে কেউ ভালোবেসেছিলো?
তন্ত্রানুসারে ভারতবর্ষ তিনভাগে বিভক্ত। বিন্ধ্যাচল থেকে চট্টগ্রাম, বিন্ধ্যাচল থেকে কন্যাকুমারিকা, বিন্ধ্যাচল থেকে নেপাল, মহাচীন, কাশ্মীর; তন্ত্রগুলির নাম, যথাক্রমে, বিষ্ণুক্রান্তা অশ্বক্রান্তা বা গজক্রান্তা ও রথক্রান্তা। প্রত্যেক ক্রান্তায় ৬৪-টি করে মোট একশো বিরানব্বইটি তন্ত্র গোটা ভারতে প্রচলিত।
নীলতন্ত্র বিষ্ণুক্রান্তার অন্তর্গত।
মহুল নীলতন্ত্রের সাধিকা।
সাধিকা, দেশ বলতে, যেটুকু যা জানছে তার সাধনায়, তাই লিখে রাখছে ফেসবুকে। এভাবেই মহাভারত রচিত হয়েছিল, বাইবেল কোরান ত্রিপিটক বেদ গীতা; হিমাংশুও তাই পড়ছে ব্লক করে দেওয়া তার প্রোফাইলে। শাস্ত্র সবার কাছে উন্মুক্ত হয় নি একদিনে, উন্মুক্ত ছিল যতদিন শ্রুতি ছিল; মানুষ, জ্ঞানী হবে, জ্ঞানকে লুকোনোও যাবে, বঞ্চিত করাও যাবে মানুষ থেকে মানবের কাছে, সেই লিপি, বহু ব্যবহৃত লিপির জ্ঞানে, মহুল লিখছে, সে জানে একলব্যকে আঙুল কাটতে হয়েছিল, মধুকৈটভবকে জান দিতে হয়েছিল, তবু, তবুও।
নতুন একটি প্রোফাইল খুলে হিমাংশু মহুলের নিষিদ্ধ প্রোফাইলে গিয়ে তার স্টেটাস পড়ছে:
১. সংখ্যালঘুদের ২৬ লাখ একর মানে ১০৫২২ বর্গ কিলোমিটার জমি দখল হয়ে গেছে বা তারা সে জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। এই জমির পরিমাণ ইজরাইল রাষ্ট্রের অর্ধেক! ইজরাইলের আয়তন ২২১৪৫ বর্গ কিলোমিটার। অর্থাৎ, ইজরাইল ফিলিস্তিনিদের যে পরিমাণ জমি দখল করেছে তার অর্ধেক বাংলাদেশের হিন্দুরা হারিয়েছে।
২. শত্রু সম্পত্তি আইনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মূল মালিকানার ২৬ লাখ একর বেদখল বা ভূমিচ্যুত করা হয়েছে। এই ২৬ লাখ একরের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশই কৃষি জমি...১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ দশকে মোট ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।
৩. বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় না, হয় হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ওপর মুসলিমদের অত্যাচার।
৪. একটি মাত্র মুসলিম পরিবার গ্রামের বাকি সমস্ত হিন্দু পরিবারের অত্যাচারের কারণ হতে পারে। ২৫-টি হিন্দু পরিবারের ক্ষমতা নেই ওই একটি মাত্র মুসলিম পরিবারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।
৫. দুর্গাপূজায় ঢাক কিম্বা মাইক বাজানো আজানের সময় বন্ধ রাখতে হয়। আজানের জন্য যদি ঢাক বন্ধ হয়, পুষ্পাঞ্জলির সময় আজানই বা কেন বন্ধ হবে না?
৬. প্রতি বছর মূর্তি ভাঙচুর করাটা যেন মুসলিম সম্প্রদায়ের কর্মসূচি। শ্মশান দখল করে মসজিদ বানাচ্ছে।
৭…..
৮…..
৯…..
১০…
…….
…….
২০১৯—সংখ্যালঘু নির্যাতন ৮০৬, ২৩টি খুন, ১০৪ জন ধর্মান্তরিত, ১৬২ জন উচ্ছেদ, ৪৩টি মূর্তি ভাঙা, ৩৮টি জবর দখল।
২০২০—৬০ পরিবারের ঘরছাড়া, ২৩টি মন্দির ভাঙচুর, ১৭ টি জীবনহানি, ৩০টি গণধর্ষণ, ২৬টি ধর্মান্তরিত, ২৬,টি শ্মশান দখল, ৮৮টি বাস্তুভিটা দোকান লুট।
২০২১…
২০২২…
২০২৩…
২০২৪…
…. ……
…. ……
হিমাংশু আর পড়ছে না।
হিমাংশু আর পড়বে না।।


0 মন্তব্যসমূহ