চাররাস্তার মোড়ে, যেখানে জীবন ছিল আগে, ছিল যোগ, সেখানে এখন বিয়োগের কংক্রিট।
এপাশে, আমাদের বাড়ির দিকটায়, পুকুর ছিল একটা। পানিতে বুক আর কাদায় পাড় ভরে শুয়ে থাকত সে। পাশ দিয়ে চলে গেছে গ্রামে ঢোকার রাস্তা। বর্ষায় সে হয়ে উঠত পুকুরটারই অংশ। আকারে প্রকারে তখন আর আলাদা মনে হতো না তাদের। চেনা-পা জানা-চোখ না হলে রাস্তাকে পুকুর আর পুকুরকে রাস্তা ভেবে ভুল করা স্বাভাবিক। তবে অভিজ্ঞ পায়েই হাঁসেরা ছুটে আসত রাস্তা ধরে, আর ঠিকঠিক পুকুরপাড়েই গুঁজে দিত করিতকর্মা ঠোঁট।
এপাশে, আমাদের বাড়ির দিকটায়, পুকুর ছিল একটা। পানিতে বুক আর কাদায় পাড় ভরে শুয়ে থাকত সে। পাশ দিয়ে চলে গেছে গ্রামে ঢোকার রাস্তা। বর্ষায় সে হয়ে উঠত পুকুরটারই অংশ। আকারে প্রকারে তখন আর আলাদা মনে হতো না তাদের। চেনা-পা জানা-চোখ না হলে রাস্তাকে পুকুর আর পুকুরকে রাস্তা ভেবে ভুল করা স্বাভাবিক। তবে অভিজ্ঞ পায়েই হাঁসেরা ছুটে আসত রাস্তা ধরে, আর ঠিকঠিক পুকুরপাড়েই গুঁজে দিত করিতকর্মা ঠোঁট।
জায়গাটা এখন পুরোদস্তুর ডাঙা, তার ওপর শিকড় গেঁড়েছে হাততিনেক উঁচু ইটের ভিত। রাস্তাটাও কালো পিচে মোড়ানো। সারাদিনের রোদে তপ্ত সেই পিচে অনিচ্ছায় পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছে দুর্বল একদল হাঁস। আর এমনভাবে তাকাচ্ছে ভিতটার ওপাশে, যেন পুকুরটা আজো আছে। হয়তো খাবার জোটেনি পর্যাপ্ত, বা মন ওঠেনি খেয়ে। প্যাঁক প্যাঁক স্বরে হাহাকার ঝরছে তুমুল। তা ছাপিয়েও আমি শুনতে পাচ্ছি আকূল মায়ের ডাক।
তবু আমি দাঁড়িয়ে আছি এখানে, এই রাস্তার মোড়ে।
মোড়টার ওপাশে, মানে বিগতপুকুরের বিপরীতে, একটা জঙ্গল ছিল তখন। বর্ষায় তার কাছে ছলাত ছলাত অভিসারে যেত পুকুরটা। শরতে আবার বিচ্ছেদ। বিরহে তারপর শুকিয়ে যেত পুকুর, জঙ্গলের বিক্ষত পাতা আর বিমর্ষ আগাছায় গড়িয়ে বেড়াত শোক। সেই মলিনতা পায়ে এঁকেই নিজেদের জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকত বাঁশঝাঁড়েরা। রাতে রাতে তাদের গায়ে জমে থাকা ঘন আঁধারে আলোর টোকা দিয়ে লুকোচুরি খেলত দুষ্টু জোনাক। রঙচঙা সেই সজীব জঙ্গলের জায়গায় এখন ধূসর দালান- স্বর্গের টিকিটঘর।
এমন পবিত্র ঘরের ছায়ায় দাঁড়িয়েও কেন যেন দমবন্ধ লাগছে আমার।
আপুর কলেজ ছুটি হয় বিকেলে, আমার স্কুল দুপুরে। একা চলতে ভয় করে বলে খাওয়া শেষে আমিই গিয়ে নিয়ে আসি ওকে। তারপর খেলতে যাই। খেলতে খেলতে পরশু ঝড় উঠল হঠাৎ। উঠতেই আমি দৌড়ে গেলাম চেয়ারম্যানের বাগানে। সঙ্গী সাথীরা হুটোপাটি করছে, কাড়াকাড়ি করছে; তবে আমি স্থির। বাগানের সবচেয়ে লম্বা সবচেয়ে বড় গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছি। ওর আম তো আম না, যেন ডাসা পেঁপে যেন পাকা আপেল। অথচ বোঁটা এত শক্ত, অন্যদিকে যখন লুটোপুটি, এখানে তখন একটা দুটো পড়ছে কি পড়ছে না। তাও আবার গড়িয়ে গড়িয়ে সাঁতার কাটতে যাচ্ছে পুকুরে। ফলে ঝড়ে উড়ে কাদায় পা গেঁথে আমি বাড়ি ফিরছিলাম খালি হাতেই। আগেও ক’বার হয়েছে এমন। দেখে মনে হয় মায়া হয় লাবু ভাইয়ার। বলল বিকেলে সে বাগানে থাকবে কাল, আমি যেন যাই।
আপুকে বড়রাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে রেখে তাই ওদিকটায় ঢুকেছিলাম কাল। ঢুকতেই একটা স্বর্গ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে বলল, ‘যত ইচ্ছা আম পাড়, যা’! আর যায় কোথায়, লাফাতে লাফাতে আমি উঠে গেলাম গাছে। জামা-খুলে-বানানো থলেতে ডজনখানেক আম নিয়ে তারপর যখন আমি বড়রাস্তায় আবার, ঘাম মুছতে মুছতে দেখি আপু নেই কোথাও। ডাকাডাকি করলাম, এদিক ওদিক খুঁজলাম। নেই।
ভেবেছিলাম আমার দেরি দেখেই হয়তো আপা চলে গেছে একা একা। কিন্তু না, বাড়িতে গিয়ে দেখি, আসেনি। এসেছে আমার ফেরার প্রায় ঘণ্টাদুয়েক পর, সন্ধ্যা উৎরে দিয়ে। এসেছে গায়ে কাদামাটি মেখে, কাঁদতে কাঁদতে। সে কান্না থামেনি রাতেও। সকালে উঠে শুনি বিষ খেয়েছে। উঠোনের একপাশে তখন চিকিৎসার তোড়জোড়, অন্যপাশে নিন্দা-বিদ্রূপের ঝড়। এতসবের মাঝেই ওখান থেকে লাথি মেরে তাড়িয়েছে আব্বা আমাকে। নিজেরও রাগ লাগছে নিজের ওপর- আমের লোভ না করলে এই দুর্যোগ আসত না হয়তো। আপুর জন্য খারাপও লাগছে। সব মিলিয়ে একটু বিষণ্ন আমি। আমার দমবন্ধ লাগছে।
এমন হলে আমি আকাশ দেখি।
আটপৌরে মেঘ আর সাদাসিধে মেদ ভরা স্থূল আকাশ-দেখার কিছু নেই। তবু তাকিয়ে আছি। ঘাড় লেগে আসলে, বা চোখ ঝাপসা হয়ে এলে, জিরিয়ে নিচ্ছি একটু, বিশ্রাম দিচ্ছি দৃষ্টিটাকে। তখন আবার মনে পড়ছে সকালের ক্লেদ। আবার মন খারাপ হচ্ছে। আবার আকাশ দেখছি।
এই দেখা-না-দেখার মধ্যেই হঠাৎ দেখি মস্ত একটা শিল্পকর্ম ঝুলে আছে।
লাল সাপ একটা, না না, অনেকগুলো আগুনলাল সাপ, গা পেঁচিয়ে বসে আছে। পাশেই রাজকীয় বাঘ। হরিণ দেখা যাচ্ছে কয়েকটা, দেখা যাচ্ছে জিরাফ আর জেব্রাও। বড় বড় মাংসল পেশী তাদের, যেন এস এম সুলতানের আঁকা। তার ফাঁক ফোকরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ছাইরঙা স্পেস। পাশঘিরে নীলাকার ফ্রেম। সাদামেঘের হাতিঘোড়া, কাশবন, মেঘপাহাড়, আগুনলাগা সমুদ্রতট অনেক দেখেছি। তবে এই দৃশ্যের সঙ্গে তাদের তুলনাও চলে না। এমন ছবি কি বাঁধাই করে রাখতে হয় না? ঝুলিয়ে রাখতে হয় না ঝগড়ার ইট আর মায়ার সিমেন্টে বাঁধানো সংসারের দেয়ালে?
ক্যামেরাটা ছিল ঘরে। খুঁজে নিয়ে উঠোনে আসতেই দেখি, ওমা, ছবিটা আর নেই। সারা আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে ছাই। তা কেন! মোড় থেকে বাড়ি। এটুকু পথ পেরোতেই আমার বহুক্ষণ লেগে গেল কি?
নাকি আমি ভুল দেখলাম, ভেসে চলা ছাইয়ের ভেলা ছাড়া আর কিছু তো নেই!
বোনের এমন দুর্যোগের দিনে মামুলি ওই মেঘের জন্য উতলা হয়েছি, আমি কি পাষাণ? বকতে ইচ্ছে করছে নিজেকে। তবু আমি ডুবে আছি চিত্রকর্মটায়। মনে হচ্ছে ছাইয়ের আড়ালেই লুকিয়ে আছে সে, বিশ্রাম নিচ্ছে, কিছুক্ষণ পরই তাকাবে আবার। তাকালেই ক্লিক করব। আকাশে এমন থ্রিডি প্রাণিজগত বনভূমি দেখে কেউ বিশ্বাসই করবে না এটা আঁকা ছবি না। ওয়ালে ওয়ালে হইচই পড়ে যাবে নিশ্চয়ই। ছাইও দেখছি সরে যাচ্ছে একটু একটু করে। আর উঁকি দিচ্ছে আমার এস এম সুলতান। আমার রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আমার চিত্রা হরিণ।
বোনের ঘর থেকে তখন বেরিয়ে এলো ক্যাডারমতো একটা ছেলে। চেয়ারম্যানের চ্যালা সে, লাবু শুয়োরের বডিগার্ড। কাল যা হয়েছে হয়েছে, শুয়োরটার বিরুদ্ধে কেস করে আমরা যেন আরো বিপদে না পড়ি, সে ব্যাপারে সতর্ক করতে এসেছে। রাগ তো ফুটছিলই টগবগ, শয়তানটার হাতে আমাদের প্রাণকে দেখে সেটা বেড়ে গেল আরও। প্রাণ আমার বোনের পোষা, প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে পাখিটাকে সে। দৌড়ে সেটা কেড়ে নিতে যাচ্ছি, এমন সময় আহাজারি এলো বড়ঘর থেকে।
কিন্তু গিয়ে দেখি কিছু নেই, সবগুলো ঘর পড়ে আছে খালি। বাইরেও সেই একই অবস্থা। আমাদের শিকড় হয়ে উঠোন কামড়ে পড়ে থাকা মা, তাকে ছায়া দিতে গাছ হয়ে যাওয়া বাবা, রঙীন ঘুড়ির মতো উদ্ধত ভাই, বইয়ের ভাঁজে সাজিয়ে রাখা ময়ূর পাখনার মতো বিব্রত বোন, স্বরে সজারুর কাঁটা নিয়ে ফোঁড়ন কাটা প্রতিবেশি- কেউ নেই। যেন তারা বুকপকেটের ছিদ্র দিয়ে গড়িয়ে পড়া মার্বেল শৈশব। অথবা তারা ইটের ভীতে ফুরিয়ে যাওয়া ওই পুকুর, কিংবা তার মৌসুমী প্রেমিক ভয়ভরা জঙ্গল।
জঙ্গলটার কোনায় এক গোরস্তান ছিল। আর কিছুদূরেই একটা শ্মশান। তাদের ভয়েই আমার সবুজ কাঁচা গ্রাম সেসময় শহরে যেত আষ্টপ্রহর। এখন আর যেতে হয় না, শহরই এগিয়ে এসেছে। দেখতেও গ্রামটাকে প্রায় শহরের মতো লাগে। শহরের-মতো-লাগা এই গ্রাম আর ওদিকের সত্যিকারের শহরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে উঁচু প্রাচীরের ভেতর আজ উৎসব।
কদিন আগেই এলাকার ক্ষমতা নিয়েছে লাবু মিয়া। তাকে অভিনন্দন জানাতেই এই আয়োজন। বাড়িটার আকাশে জীবন্ত রঙে লেখা ‘বিজয় সংবর্ধনা’। তার ফাঁক-ফোকরে হলুদ কালো নকশী চামড়া- বাঘের, হরিণের। পাশ ঘিরে সবুজপাতার বেড়, সারাদিনের রোদে পাতাগুলো মলিন, ছাইরঙা। তারওপর কনেদেখা আলো পড়ছে। দূর থেকে দেখলে পুরো ব্যাপারটাকে একটা মনোরম চিত্রকর্মই মনে হয়। তবে ময়ূরের পেখম আর সিংহের কেশরগুলো দুলছে এমন, বিশ্বাসই হয় না যে শিল্পীর কারসাজি ওসব। আয়োজকদের একজনকে জিজ্ঞেস করতেই অবশ্য ভুলটা ভাঙল। সত্যিকারের সিংহ ময়ূর আর বাঘ হরিণকেই নাকি এরা গেঁথে দিয়েছে আকাশে। কী ভয়ংকর! এদের দিয়ে কি সবই সম্ভব? কবে না জানি এরা মানুষকেও সজ্জার উপকরণ করে ছাড়বে! আচ্ছা, আকাশের দিকে তাকিয়ে এই সজ্জাকেই কি শিল্পকর্ম ভেবে অমন পাগল হয়েছিলাম আমি? হতে পারে। শৈশবের উঠোন থেকে এদিকে তাকালে তো আকাশ-কুসুমই লাগে সবকিছু।
ভাবছি আর মানুষ দেখছি। তা মুখের ভিড়ে হঠাৎ দেখি চেনা চেনা একজন। কর্তৃত্বের সঙ্গে আয়োজনের তদারকী করছে ছেলেটা। ও কি ঠিক সেই মাস্তান, যাকে আমি খুঁজছি এত বছর? একটু তাই নজরে রাখতে হলো। সুযোগ পেলে সাজা তাকে আজ দেবোই।
লাবু মিয়া এখন দেবতা; উপযুক্ত পূজার্চনায় ঘাটতি রাখছেন না বক্তারা মঞ্চে। মনোযোগের খানিকটা সেদিকেও একটু ছিল। হঠাৎ দেখি আলপথ ধরে হাঁটছি আমি। সামনে হেঁটে চলেছে জন্তুটা, সঙ্গে আরেক যুবক। দু’জনের হাতে দু’টো বোতল। কিছু পরে অন্যজন চলে গেল বামে, বড় রাস্তার দিকে; আর সে চলল সোজা, হন হন। ছেলেটার বয়স কম, গতি বেশি। আর আমার মেদমলিন শরীর, নিয়মিত হাঁটা হয় না, কুলিয়ে উঠছি না। তবু যতক্ষণ দৃষ্টিসীমায় ছিল, এগিয়েছি সমানতালে। তারপর ছুটে এলো আমবাগান এক, আর আমি হারিয়ে ফেললাম তাকে।
ভালো করে দেখার জন্য তখন উঁচুমতো একটা ঢিঁবির ওপর উঠলাম।
সেখান থেকে সংবর্ধনার দিকে তাকাতেই শিউরে উঠলাম আবার। এতগুলো বন্যপ্রাণীসহ প্রায় আস্ত একটা বন আকাশে ঝুলিয়ে যে অন্যায় এরা করেছে, তার কি কোনো শাস্তি হবে না? লোকে হয়তো ভয়ে বলছে না কিছু, কিন্তু আমি কেন চুপ থাকব?
জায়গাটাও উপযুক্ত, আকাশের ছবি এখান থেকেই তোলা যাবে সবচেয়ে ভালো। তুলছি, এমন সময় ক’জন লোক এগিয়ে এলো। ভয়ে ভয়ে ক্যামেরা লুকোতে গিয়ে দেখি- আন্তরিক চাহনী তাদের, আর দৃষ্টি আপন। চিনতেই বুকের ভেতর লাফিয়ে উঠল খোলসে মাছের ঝাঁক। একসাথে বই পড়েছি আমরা; ঘুম পড়েছি, পড়েছি প্রেমেও। তারপর উঠে পড়ে ছুটে পড়ে আলাদা হয়ে গেছি যে যার মতন। এতদিন পর ওদের দেখছি, খোলসে মাছের লাফঝাঁপ থামতে সময় তো লাগবেই।
তারপরই প্রশ্ন: তোরা এখানে কেমন করে?
সংবর্ধনার উঠোনে আমাকে দেখেই ছুটে এসেছিল; তা ওদের এড়ানোর জন্যই নাকি বেরিয়ে এসেছি আমি! আহারে মানুষ, যা-ই ঘটুক, নিজের সাথে মিলিয়ে দেখে। এই নিয়েই গড়াচ্ছিল আলাপ। কথায় কথায় আমার ভাইরাল হওয়া ভিডিওটা নিয়েও ফোড়ন কাটলো নয়ন। যদিও ওর বউ শুনেছি পালিয়ে গেছে একজনের সঙ্গে, আমিও সেসব টানব কি না ভাবছি। তাকিয়ে দেখি আকাশের ছবিটা দেখা যাচ্ছে না আর। অতবড় লেখা, অতগুলো জ্যান্ত তাজা প্রাণ, নিমেষেই মিলিয়ে গেল কী করে? ছেলেটাই বা লুকালো কোথায়! কিছুই খোঁজা হলো না। ওরা আমাকে নিয়ে গেল টেনে- এতদিন পর দেখা, একটু আড্ডা মাস্তি হবে।
বাগানের মধ্যে দিয়ে পথ। এখান থেকে ডানে বহুদূর, ওই দিগন্ত পর্যন্ত, আগে বুক বিছিয়ে থাকত সবুজ ধানখেত। সেখানে এখন তপ্ত কারখানা। ওপাশের লাল প্রাচীরেরটা মনে হয় চামড়ার, না যেন স্টিলের; এপাশের হলুদটা বিড়ি-সিগারেটের। তার গেটের সামনে কয়েকটা দোকান। সেখানে দুটো গাছ ছিল পাশাপাশি- একটা অশ্বত্থ, আরেকটা তেঁতুল। তাতে ভূত থাকত দুইঘর। ভয় দেখাত মানুষকে, আর বাগে পেলেই মটকে দিত ঘাড়। সন্ধ্যা থেকে কেউ আর তাই এমুখো হতো না ভয়ে। তবে দিনের আলোয় এদিকের আলপথগুলোই ছিল সুখকর শর্টকাট। এই শর্টকাট ধরেই স্কুলে যেতাম আমি। আর গাছদুটোর ত্রিসীমানায় এলেই মন্ত্র পড়তাম বিড়বিড়। তিরতির কাঁপা সেসব স্মৃতিই আমাকে টেনে নিয়ে গেল দোকানগুলোর দিকে।
বেঞ্চে বসে গল্প করছে দুজন। মুখে অদ্ভুত মাস্ক, দেখেই খেয়াল হলো আমারও নাক জ্বলছে।
কোথায় পাওয়া যাবে এটা?
উত্তরে পাঁচড়া চুলকাতে চুলকাতে মোটামতন লোকটা ‘কিনবার চাইলে মার্কেটে পাইবেন। আর খালি দেখবার চাইলে এইডা লইয়াই দেখতারেন’ বলে এগিয়ে দিলো মাস্কটা তার।
‘আমগো মালিকই এইডা ইমপোট করতাছে অহন। হ্যার শোরুম থেইকাই লয় মানুষ।’ চিকন ছেলেটা বলল। তারও গা-ভর্তি ঘা। কিছু শুকনো, কিছু গ্যাদগ্যাদ করছে। রুমাল নিয়ে তা মুছতে ব্যস্ত সে।
‘কী হয়েছে এসব? ডাক্তার দেখান না?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘দেহাইছি না আবার! গাদা গাদা ওষুদ দেয়, বালের ওষুদ, কাজ হয় না কিছুই।’
‘আপনার হাতেও কি একই সমস্যা?’ প্রথমজনকে বললাম।
‘হয়। শুদু আমগো না, এলেকার প্রায় হগলেরই এই অবস্তা। কেরোর শুনি বুকি বেতা তো কেরোর আবার মাতায়। আরো কত রোগবালাই যে হইতাছে অহন!’
‘তাইলে বোজো, দুইডা কারখানারই এই ঠ্যালা, আর তুমি কইতাছো আরেট্টা হইলেও নিকি ভালাই!’
‘ভালা যে হইবো, চোখ বন্দ না রাইকলে তুমিও বুজতা!’
‘বুজচি তো, মালিকের তিনতলা বাড়ি ছয়তলা হইবো, আর আমগোর রোগ বালাইয়ের লিস্টি বাড়বো।’
‘রোগ শোকই দ্যাকলা শুদু, ফ্যাক্টরির চাকায় কতগুলান সুংসার যে চলতাছে সেইটে দ্যাকলা না? দ্যাকলা না যে কত বাচ্চার ল্যাহাপড়া চলতাছে ওই ট্যাকায়?’
‘তা তো দেখছিই। তয় খাল ভইর্যা বন কাইট্যা ফ্যাক্টরি করনের কোনো দরকার দেহি নাই।’
‘আমবাগানের মালিকও হুনলাম এই কতাই কইছে। কইছে, এই বাগান আমগোর ঐতিজ্য, ইডারে কাইট্যা ফ্যক্টরি করবার দিবো না।’
শুনতে শুনতেই কারখানার হুইসেল। শুনে আমরা হাঁটা ধরলাম আবার।
এগুতে কষ্ট হচ্ছে। কালো কয়লা আর রঙিণ বর্জ্যরে স্তূপ চারপাশে। তীব্র কটু গন্ধ আসছে নাকে, বহুক্ষণ দম বন্ধ করে একবার দু’বার শ্বাস নিচ্ছি। মাঝে মাঝে মুখ উঁচু করে হাঁটছি, যেন খোলা বাতাস পাই।
বাগান পার হলে একটা খাল। শুকিয়ে যাওয়ার আগে খালটা নদী ছিল। তাকে ভরাট করে করেই মার্কেট। তার ছাদ থেকে লাফ দিলেই তামাকের ক্ষেত, তারপর বন। বনটার ওপর সুন্দর আরেকটা ছবি দেখতে পেলাম। ভীষণ দৈত্যের মতো লাল, ভেতরে বাইরে ঘন ছাইরং। মনে হচ্ছে বড় একপাত্র আগুন, তা থেকে বলক দিয়ে উঠছে ধোঁয়া। আগের ছবিটার মতো রঙিন না, তবে ইচ্ছে করলে এটাতেও বাঘ হরিণ বা অন্যান্য প্রাণের অবয়ব খুঁজে নেওয়া যায়। ছবিটা থাকতে থাকতেই তাই বাজিয়ে দিলাম ক্লিক। স্বপনের মুখে তখন আর্তনাদ, ‘আহারে, এত সুন্দর বনটা এমন বেঘোরে পুড়তেছে! এত আগুন লাগল কী করে?’ তাই তো, এ তো দেখছি সত্যিই আগুন! পট পট ঠাস ঠাস গাছ ফাটার আওয়াজ আসছে কানে। আসছে নানাপ্রাণীর চিৎকারও।
পাশেই একটা পাওয়ারপ্ল্যান্ট হওয়ার কথা। অনুমোদনের সময় যদিও পক্ষে-বিপক্ষে বকছিল নানাজন, তবে কাগজপত্র নাকি ঠিকঠাকই ছিল সব। আমারও একটা সাইন সম্ভবত ছিল ফাইলটাতে। আমার বউয়ের এনজিও তাই বড় একটা প্রোজেক্ট পাচ্ছে। প্ল্যান্টটা রান করলে দেশেরও অনেক লাভ। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে, কাজের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু কিছুই আপাতত হচ্ছে না পরিবেশবাদি এক রিটের কারণে। তারা বলছে ওখানে প্ল্যান্ট হলে নাকি উজাড় হয়ে যাবে বন ও নদী। তা, প্ল্যান্ট হওয়ার আগেই যে পুড়ে যাচ্ছে সব! ভাবছি আর ছবি তুলছি। আর ক্লিকে ক্লিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে আগুন।
কদিন আগে এমন করেই পুড়ছিল আমাজন। কত করুণ কত মর্মান্তিক ছবি যে তখন ভেসে বেড়িয়েছে যোগাযোগ মাধ্যমে! একটা তো আমার লেগেই আছে চোখে। বুকপানিতে হেঁটে যাচ্ছে এক উদ্ধারকারী সেনা। তার কাঁধে মাথা রেখে সন্তানের মতো শুয়ে আছে একটা বাঘ। বিহ্বল বিভ্রান্ত দুটো চোখ মেলে তাকিয়ে আছে অপলক। দিগ্বিদিক আগুন থেকেও যে বেঁচে এসেছে সে, বিশ্বাস করতে পারছে না হয়তো। চোখজোড়ায় প্রশ্ন করুণ: ‘আমাদের কী অপরাধ!’
বনটার কাছে যেতে পারলে অমন সব ছবি তোলার সুযোগ হয়তো আমারও হবে। তবে সাহস হচ্ছে না একা যাওয়ার। হঠাৎ তখন দৌড় শুরু করল স্বপন, সোজা বনের দিকে। যেন ওরই বন, তিনবালতি পানি আর দুইমগ ঘাম ঢেলে আগুন নেভাবে। অন্যরা আবার ঠিক উল্টো, ফিরে যাচ্ছে সেদিকেই যেদিক দিয়ে এসেছিলাম। মাঝখানে আমি বুঝতে পারছি না কী করব। ছবি তুলতে যাব, নাকি ফিরে যাব নিরাপত্তার খোঁজে। ভাবতে ভাবতেই দেখি এগিয়ে আসছে শুয়োরটা আবার। হাতে সেই বোতল।
আসো, বাছাধন, মাস্তানির মজা এবার দেখাচ্ছি তোমারে।
মজাটা যদিও সে-ই দেখালো।
কাছাকাছি এসেই বোতলটা ছুড়ে মারল আমার দিকে।
বোতলের মুখে গোঁজা সাদা কাপড়, কাপড়ে লাল আগুন। চীনা ড্রাগনের মতো উড়ে এসে সেটা পড়ল পায়ের কাছে। পড়তেই চুরমার ভেঙে গেল কাচ, বেরিয়ে পড়ল ভেতরের তরল। সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে গেল চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বৈর্জ্যে, আর তা জড়িয়ে থাকা স্থিরতায়। দেখেই ভয়ের এক বাজরেখা চমকে গেল বুকে। কাঁপতে কাঁপতে আমি শুরু করলাম দ্রুতগতির দৌড়। কিন্তু এগুতে পারছি না, কষ্ট হচ্ছে খুব। যাও বা একটু পারছি, পথ তাতে এগোচ্ছে না একটুও। কোনোমতে হাঁচড়ে পাচড়ে যেতে যেতে দেখি, কিছুদূরেই পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছে আবির, তড়পাচ্ছে পা ধরে। এক মুহূর্ত মনে হলো যাই, ওকে টেনে তুলি। পরক্ষণেই আবার ভাবলাম, না থাক, আগে আপন প্রাণ। কিছুক্ষণ পর অবশ্য নিজেও অমন পড়লাম। ইট পাথরের খোয়া আর কাঠ কাঠি ছড়ানো সেখানে। ছিঁড়ে গেল হাঁটু ও কনুই। উঠতে পারছি না। ওদিকে ধেয়ে আসছে তাপ, নাকে জ্বালাময় বাতাস। পড়ে থাকলে একটু পরই হয়তো দাহ হয়ে যাবে আমার।
হুড়মুড়িয়ে তাই উঠলাম পড়িমরি। উঠেই আবার দৌড়ের কসরত। না পেরে প্রায় হামাগুঁড়ি দিয়ে হাঁটা। কিন্তু বাতাস যেন টেনে ধরছে পেছন থেকে। এগুতেই পারছি না। আগুন ততক্ষণে ছড়িয়ে গেছে, বেরুনোর উপায় নেই। কিছুটা সবুজ তবু দেখা যাচ্ছে যেদিকে, গড়াগড়ি দিয়ে সেদিকে যেতে যেতে মনে হলো, দিকে দিকে আগুন হয়তো এভাবেই লাগানো হচ্ছে, নইলে আচমকা কেন জ্বলে উঠবে সব? ছেলেটার ছবি নিতে পারলে একটা কাজের কাজ হতো। সবচেয়ে ভালো হতো আগুনের বোতল ছুড়ে মারার ছবিটা নিলে। ইশ, কী ভুলটাই না করেছি! এমনই হয় আমার। কাজের সময় হুঁশ থাকে না, কাজের শেষে ফোঁস ফোঁস।
অনুতাপ এক মৃদু আগুন, যতটা তা পোড়ায়, জ্বালায় তারচেয়ে বেশি।
আগুন থেকে বেঁচেও তাই জ্বলতে থাকলাম ভেতরে ভেতরে। ততক্ষণে হাঁপ ধরে গেছে, একটু দাঁড়িয়েছি দম নিতে। বাগানের এ দিকটায় বর্জ্যরে স্তূপ নেই। তবে প্রচুর ডাল পাতা শুকনো। আগুনও আসছে দ্রুত। অস্থির অপেক্ষা করছি, দমটা বাগে এলেই ছুটব। তার আগেই হন্তদন্ত পায়ের আওয়াজ। তাকাতেই দেখি আমার দিকে আগুনমুখো এক লাইটার ছুড়ে দিয়ে জন্তুটা পালাচ্ছে আবার। হাওয়ায় ভেসে আমার পায়ের কাছে এসে পড়ল সেটা। পড়তেই সবুজ ডেনিমে ছড়িয়ে গেল কমলারঙ, ছড়িয়ে গেল জ্বলন।
দমটা আমার সত্যিই বন্ধ হয়ে আসলো এবার। বুকের ভেতর আটকে থাকা নিঃশ্বাস বেরোতে পারছে না। নতুন করে শ্বাসও নিতে পারছি না। মনে হচ্ছে তলিয়ে যাচ্ছি অনন্তে। যেতে যেতেও ছবি নিলাম তার একটা, সে তাতে বেশ কিছুটা দূরে। মোটা একটা গাছের আড়ালে তার পা। হাতের ব্যাজটা দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে তার ইউনিফর্মও। সবাই জানে, লাবু মিয়ার লোকেরাই অমন উদ্ধত রং পরে। তদন্তে এটা কাজে লাগবে ভালোই।
দ্রুত ফোন করলাম সাংবাদিক ভাইকে। তার ডাকে ছুটে গেলাম আগুনসমেত।
শীতাতাপ কক্ষ, বসে আছি আরামদায়ক ভিজিটরস চেয়ারে। তবে হৃদপিণ্ডটা পিংপং বল, লাফাচ্ছে অস্থির। ধোঁয়াছোটা স্বরে প্রায় চিৎকার করে কথা বলছি। ওপাশে বসে সাংবাদিকটা যদিও শুনছে না সেসব, মন দিয়ে দেখছে ছবিগুলো। হয়তো হিসাবও কষছে এসব ছাপলে পত্রিকার কাটতি হবে কি না; মুখটায় তাই আলগা গাম্ভীর্য, চোখদুটো সরু করে আনা- যেন বীক্ষণযন্ত্র। ভেতরে বিষয়বুদ্ধি খেলে গেলে মানুষের মুখে এমনই কপট চেহারা ভাসে।
তাতে একটু হাসি মেখে সে তারপর তাকাল আমার দিকে। কয়েকটা ছবি সে রাখছে। যদি ছাপা হয়, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। এমন হলে বেশি করে দাম হাঁকতে হয় শুনেছি। তা না করে আমি হে হে করছি। ছবিগুলো যে তারা ছাপবে, নিচে নাম থাকবে আমার, তাতেই যেন খুশি। বেরিয়ে আসতেই অবশ্য বদলে গেল মতি। ছবির নিচে নাম থাকলে তো সহজেই আমাকে চিনে ফেলবে লোকে। চাকরি খেয়ে দেয় যদি, কিংবা-
এমন ব্যস্ত সময়, কোনো কিছুই তলিয়ে দেখার সুযোগ নেই কারোর। সত্য-মিথ্যা বলেও কিছু নেই, আছে শুধু পক্ষ আর বিপক্ষ। যা-ই আপনি বলুন, কারো না কারো বিপক্ষে তা যাবেই। গেলেই রেহাই নেই আর; কোনো একদিন সকালে উঠে পত্রিকায় দেখবেন, নেই হয়ে গেছেন। কত তুচ্ছ কারনেই না মানুষ মেরে ফেলছে মানুষকে এখন-
না না, নাম ছাপানো যাবে না; দরকার নেই আমার বিখ্যাত হওয়ার। অনুরোধটা করতেই ভেতরে ঢুকলাম আবার।
ঢুকেই দেখি, কোথায় সাংবাদিক, এসে তো পড়েছি থানায়!
চেয়ারে এক গম্ভীর অফিসার। অফিসার কোথায়, ও তো আমার বন্ধু আবির! ‘আবির, দোস্তরে, কী অবস্থা তোর এখন? আমবাগানে তোকে পড়ে থাকতে দেখেই ছুটে যাচ্ছিলাম তুলতে। তা, যেতে গিয়েই আমি পড়ে গেলাম মুখ থুবড়ে। এই দ্যাখ কী কাটা কেটেছে কনুই আমার!’ বলে হাত বাঁকাতেই দেখি, কাটাকুটা নেই কিছুই! হাঁটুটাও ঠিকঠাক। সামনেও দেখি আবির না, বসে আছে সত্যিই এক অফিসার। মনোযোগ দিয়ে সে তাকিয়ে আছে ডেস্কটপে। একটার পর একটা ছবি ভাসছে সেখানে। কী আশ্চর্য, সবগুলোই আমার! লাবু কুত্তার সংবর্ধনায় ঘুরঘুর করছি। কারখানা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলছি। তারপর আমবাগানে। শেষ ছবিটায় নিচু হয়ে আছি, মাথাটা হেলানো সামনের দিকে; হাতটা ঝুলানো, খালি; তার কিছু দূরেই আগুনের বোতল, যেন কেবলই সেটা ছুড়ে দিলাম। ঠিকরে বেরুনো চোখে তাকিয়ে আছি, নড়তে পারছি না, যেন বাজ পড়েছে মাথায়। পাশ কাটিয়ে তখন সেই ছেলেটা ঢুকলো, বোতলটা যে ছুড়েছে আসলে। দেখেই উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। ‘আমবাগানটায় ফ্যাক্টরি করতে চায় ওরা। কিন্তু মালিক তা করতে দেবে না বলেই তাতে আগুন দিয়েছে এই লোক।’ বলতে লাগলাম ঠিক কখন কখন আরো কী কী করেছে। তবে আমাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে অফিসার মজে গেল আলাপে।
কী যে খাতির দু’জনার! এমন ভাব, যেন তারা ইয়ার-দোস্ত। ছেলেটাও ধুরন্ধর, কথা বলছে শান্ত গোছালো স্বরে। ‘বন হইতেছে প্রাণের আধার, প্রকৃতির এক বড় মাস্টারপিস। ব্যক্তিস্বার্থে তারেই কিনা ধ্বংস করতেছে এরা!’ আমাকে দেখিয়ে বলল লাবুর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য আমিই নাকি আগুন দিয়েছি বনে।
কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, থামিয়ে দিলো অফিসার। বলল, ষড়যন্ত্র ও বন পোড়ানোর অভিযোগে আমাকে আটক করা হচ্ছে।
তা কেন? কেন আমি সাজা পাব তার জন্য যা করিইনি? তাই দিলাম দৌড়। তবে, আগেই বলেছি, কেমন যেন ভারী হয়ে আছে পা দু’টো, তুলতেই পারছি না। অন্য সময় দেখেছি দৌড়তে না পারলে আমি উড়তে শুরু করি। উড়ে উড়ে চলে যাই এ গাছ থেকে সে গাছ। সেই আশায় পাখির ডানার মতো উঁচিয়ে দিলাম হাত। কিন্তু উড়তে পারার আগেই বহু ক’জন এসে আমায় ধরে ফেলল আষ্টেপৃষ্ঠে।
এরপর কি ক্রসফায়ার, নাকি এনকাউন্টার? নাকি গুম? ভয়ে আতঙ্কে আমি গুটিয়ে গেলাম শামুকের মতো।
বাচ্চাদের মুখ মনে পড়ছে, একা ওরা থাকবে কী করে?
বাবার কেমো চলছে, মায়ের ওষুধ শেষ- কে টানবে এত?
ভাবতেই আমি পুঁতে যাচ্ছি মাটিতে। কান্না করছি, বলছি সব ষড়যন্ত্র, সব মিথ্যা। বলছি, ওই পাষাণটাই আগুন দিয়েছে সবখানে- বনে, কারখানায়; তারও বহু আগে আমাদের সংসারে। আমি যে সরকারি লোক, আমার যে ক্ষমতা অনেক, তাও হয়তো বললাম। তবু আমায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। যত চেষ্টা করছি ছাড়া পাওয়ার, দপাদপ কিলঘুষি তত পড়ছে চোয়ালে, বুকে, পিঠে।
তারপর একটা কবর। না না, মনে হচ্ছে কবরের মতোই সরু একটা ঘর। শরীরে আমার তীব্র ব্যথা। চোখ জ্বলছে, বুক জ্বলছে; তেষ্টা লেগেছে। বন্ধ হয়ে আসছে দম। জেগে থাকতে কষ্ট, অথচ ঘুমোতেও পারছি না।
তবে কি আমি স্বপ্ন দেখছি? ভাবতেই হুড়মুড়িয়ে উঠলাম, চেষ্টা করলাম জেগে ওঠার। কিন্তু জাগতেও পারলাম না।
দেয়ালে টিকটিক করছে সময়। ঘড়ির কাঁটায় অন্ধকার। আঁধার আমার চোখেও। কালির মতো ঘন সে আঁধার চুঁইয়ে পড়ছে পাপড়ি থেকে। আন্দাজের ওপর নড়াচড়া করছি। হঠাৎ জোরে হোঁচট লাগল টেবিলে, নাকি চৌকিতে কে জানে। যা-ই হোক, তার ওপর পানি, কিছুটা পড়ে গেল, কিছুটা খেলাম চেটে চেটে। কিন্তু পানি যেন তা না, যেন আলকাতরা, খেতেই গলাবুক জ্বলতে লাগল আরো।
মাথার ওপরে খোলা ঘুলঘুলি। বাতাস ঢুকছে। তাতেও শিসার গন্ধ।
নাক জ্বলছে, তীব্র তেজে, জ্বলছে চোখ।
কী করব আমি তখন? কী করব? করব কী? বুঝতে পারি না। না পেরে বেরিয়ে আসি ঘুলঘুলি দিয়ে।
আকাশে তখনও জাদু- মস্ত একটা শিল্পকর্ম ঝুলে আছে। কালো-হলুদ বাঘ, আর হলুদ-সবুজ হরিণ। আর গাছ। আর ময়ূর। আর মানুষ পাখি সাপ। সবার গায়ে আগুন, বেঘোরে পুড়ছে সবাই।
[বিশ ঊনিশ]
কাছাকাছি এসেই বোতলটা ছুড়ে মারল আমার দিকে।
বোতলের মুখে গোঁজা সাদা কাপড়, কাপড়ে লাল আগুন। চীনা ড্রাগনের মতো উড়ে এসে সেটা পড়ল পায়ের কাছে। পড়তেই চুরমার ভেঙে গেল কাচ, বেরিয়ে পড়ল ভেতরের তরল। সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে গেল চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বৈর্জ্যে, আর তা জড়িয়ে থাকা স্থিরতায়। দেখেই ভয়ের এক বাজরেখা চমকে গেল বুকে। কাঁপতে কাঁপতে আমি শুরু করলাম দ্রুতগতির দৌড়। কিন্তু এগুতে পারছি না, কষ্ট হচ্ছে খুব। যাও বা একটু পারছি, পথ তাতে এগোচ্ছে না একটুও। কোনোমতে হাঁচড়ে পাচড়ে যেতে যেতে দেখি, কিছুদূরেই পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছে আবির, তড়পাচ্ছে পা ধরে। এক মুহূর্ত মনে হলো যাই, ওকে টেনে তুলি। পরক্ষণেই আবার ভাবলাম, না থাক, আগে আপন প্রাণ। কিছুক্ষণ পর অবশ্য নিজেও অমন পড়লাম। ইট পাথরের খোয়া আর কাঠ কাঠি ছড়ানো সেখানে। ছিঁড়ে গেল হাঁটু ও কনুই। উঠতে পারছি না। ওদিকে ধেয়ে আসছে তাপ, নাকে জ্বালাময় বাতাস। পড়ে থাকলে একটু পরই হয়তো দাহ হয়ে যাবে আমার।
হুড়মুড়িয়ে তাই উঠলাম পড়িমরি। উঠেই আবার দৌড়ের কসরত। না পেরে প্রায় হামাগুঁড়ি দিয়ে হাঁটা। কিন্তু বাতাস যেন টেনে ধরছে পেছন থেকে। এগুতেই পারছি না। আগুন ততক্ষণে ছড়িয়ে গেছে, বেরুনোর উপায় নেই। কিছুটা সবুজ তবু দেখা যাচ্ছে যেদিকে, গড়াগড়ি দিয়ে সেদিকে যেতে যেতে মনে হলো, দিকে দিকে আগুন হয়তো এভাবেই লাগানো হচ্ছে, নইলে আচমকা কেন জ্বলে উঠবে সব? ছেলেটার ছবি নিতে পারলে একটা কাজের কাজ হতো। সবচেয়ে ভালো হতো আগুনের বোতল ছুড়ে মারার ছবিটা নিলে। ইশ, কী ভুলটাই না করেছি! এমনই হয় আমার। কাজের সময় হুঁশ থাকে না, কাজের শেষে ফোঁস ফোঁস।
অনুতাপ এক মৃদু আগুন, যতটা তা পোড়ায়, জ্বালায় তারচেয়ে বেশি।
আগুন থেকে বেঁচেও তাই জ্বলতে থাকলাম ভেতরে ভেতরে। ততক্ষণে হাঁপ ধরে গেছে, একটু দাঁড়িয়েছি দম নিতে। বাগানের এ দিকটায় বর্জ্যরে স্তূপ নেই। তবে প্রচুর ডাল পাতা শুকনো। আগুনও আসছে দ্রুত। অস্থির অপেক্ষা করছি, দমটা বাগে এলেই ছুটব। তার আগেই হন্তদন্ত পায়ের আওয়াজ। তাকাতেই দেখি আমার দিকে আগুনমুখো এক লাইটার ছুড়ে দিয়ে জন্তুটা পালাচ্ছে আবার। হাওয়ায় ভেসে আমার পায়ের কাছে এসে পড়ল সেটা। পড়তেই সবুজ ডেনিমে ছড়িয়ে গেল কমলারঙ, ছড়িয়ে গেল জ্বলন।
দমটা আমার সত্যিই বন্ধ হয়ে আসলো এবার। বুকের ভেতর আটকে থাকা নিঃশ্বাস বেরোতে পারছে না। নতুন করে শ্বাসও নিতে পারছি না। মনে হচ্ছে তলিয়ে যাচ্ছি অনন্তে। যেতে যেতেও ছবি নিলাম তার একটা, সে তাতে বেশ কিছুটা দূরে। মোটা একটা গাছের আড়ালে তার পা। হাতের ব্যাজটা দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে তার ইউনিফর্মও। সবাই জানে, লাবু মিয়ার লোকেরাই অমন উদ্ধত রং পরে। তদন্তে এটা কাজে লাগবে ভালোই।
দ্রুত ফোন করলাম সাংবাদিক ভাইকে। তার ডাকে ছুটে গেলাম আগুনসমেত।
শীতাতাপ কক্ষ, বসে আছি আরামদায়ক ভিজিটরস চেয়ারে। তবে হৃদপিণ্ডটা পিংপং বল, লাফাচ্ছে অস্থির। ধোঁয়াছোটা স্বরে প্রায় চিৎকার করে কথা বলছি। ওপাশে বসে সাংবাদিকটা যদিও শুনছে না সেসব, মন দিয়ে দেখছে ছবিগুলো। হয়তো হিসাবও কষছে এসব ছাপলে পত্রিকার কাটতি হবে কি না; মুখটায় তাই আলগা গাম্ভীর্য, চোখদুটো সরু করে আনা- যেন বীক্ষণযন্ত্র। ভেতরে বিষয়বুদ্ধি খেলে গেলে মানুষের মুখে এমনই কপট চেহারা ভাসে।
তাতে একটু হাসি মেখে সে তারপর তাকাল আমার দিকে। কয়েকটা ছবি সে রাখছে। যদি ছাপা হয়, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। এমন হলে বেশি করে দাম হাঁকতে হয় শুনেছি। তা না করে আমি হে হে করছি। ছবিগুলো যে তারা ছাপবে, নিচে নাম থাকবে আমার, তাতেই যেন খুশি। বেরিয়ে আসতেই অবশ্য বদলে গেল মতি। ছবির নিচে নাম থাকলে তো সহজেই আমাকে চিনে ফেলবে লোকে। চাকরি খেয়ে দেয় যদি, কিংবা-
এমন ব্যস্ত সময়, কোনো কিছুই তলিয়ে দেখার সুযোগ নেই কারোর। সত্য-মিথ্যা বলেও কিছু নেই, আছে শুধু পক্ষ আর বিপক্ষ। যা-ই আপনি বলুন, কারো না কারো বিপক্ষে তা যাবেই। গেলেই রেহাই নেই আর; কোনো একদিন সকালে উঠে পত্রিকায় দেখবেন, নেই হয়ে গেছেন। কত তুচ্ছ কারনেই না মানুষ মেরে ফেলছে মানুষকে এখন-
না না, নাম ছাপানো যাবে না; দরকার নেই আমার বিখ্যাত হওয়ার। অনুরোধটা করতেই ভেতরে ঢুকলাম আবার।
ঢুকেই দেখি, কোথায় সাংবাদিক, এসে তো পড়েছি থানায়!
চেয়ারে এক গম্ভীর অফিসার। অফিসার কোথায়, ও তো আমার বন্ধু আবির! ‘আবির, দোস্তরে, কী অবস্থা তোর এখন? আমবাগানে তোকে পড়ে থাকতে দেখেই ছুটে যাচ্ছিলাম তুলতে। তা, যেতে গিয়েই আমি পড়ে গেলাম মুখ থুবড়ে। এই দ্যাখ কী কাটা কেটেছে কনুই আমার!’ বলে হাত বাঁকাতেই দেখি, কাটাকুটা নেই কিছুই! হাঁটুটাও ঠিকঠাক। সামনেও দেখি আবির না, বসে আছে সত্যিই এক অফিসার। মনোযোগ দিয়ে সে তাকিয়ে আছে ডেস্কটপে। একটার পর একটা ছবি ভাসছে সেখানে। কী আশ্চর্য, সবগুলোই আমার! লাবু কুত্তার সংবর্ধনায় ঘুরঘুর করছি। কারখানা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলছি। তারপর আমবাগানে। শেষ ছবিটায় নিচু হয়ে আছি, মাথাটা হেলানো সামনের দিকে; হাতটা ঝুলানো, খালি; তার কিছু দূরেই আগুনের বোতল, যেন কেবলই সেটা ছুড়ে দিলাম। ঠিকরে বেরুনো চোখে তাকিয়ে আছি, নড়তে পারছি না, যেন বাজ পড়েছে মাথায়। পাশ কাটিয়ে তখন সেই ছেলেটা ঢুকলো, বোতলটা যে ছুড়েছে আসলে। দেখেই উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। ‘আমবাগানটায় ফ্যাক্টরি করতে চায় ওরা। কিন্তু মালিক তা করতে দেবে না বলেই তাতে আগুন দিয়েছে এই লোক।’ বলতে লাগলাম ঠিক কখন কখন আরো কী কী করেছে। তবে আমাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে অফিসার মজে গেল আলাপে।
কী যে খাতির দু’জনার! এমন ভাব, যেন তারা ইয়ার-দোস্ত। ছেলেটাও ধুরন্ধর, কথা বলছে শান্ত গোছালো স্বরে। ‘বন হইতেছে প্রাণের আধার, প্রকৃতির এক বড় মাস্টারপিস। ব্যক্তিস্বার্থে তারেই কিনা ধ্বংস করতেছে এরা!’ আমাকে দেখিয়ে বলল লাবুর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য আমিই নাকি আগুন দিয়েছি বনে।
কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, থামিয়ে দিলো অফিসার। বলল, ষড়যন্ত্র ও বন পোড়ানোর অভিযোগে আমাকে আটক করা হচ্ছে।
তা কেন? কেন আমি সাজা পাব তার জন্য যা করিইনি? তাই দিলাম দৌড়। তবে, আগেই বলেছি, কেমন যেন ভারী হয়ে আছে পা দু’টো, তুলতেই পারছি না। অন্য সময় দেখেছি দৌড়তে না পারলে আমি উড়তে শুরু করি। উড়ে উড়ে চলে যাই এ গাছ থেকে সে গাছ। সেই আশায় পাখির ডানার মতো উঁচিয়ে দিলাম হাত। কিন্তু উড়তে পারার আগেই বহু ক’জন এসে আমায় ধরে ফেলল আষ্টেপৃষ্ঠে।
এরপর কি ক্রসফায়ার, নাকি এনকাউন্টার? নাকি গুম? ভয়ে আতঙ্কে আমি গুটিয়ে গেলাম শামুকের মতো।
বাচ্চাদের মুখ মনে পড়ছে, একা ওরা থাকবে কী করে?
বাবার কেমো চলছে, মায়ের ওষুধ শেষ- কে টানবে এত?
ভাবতেই আমি পুঁতে যাচ্ছি মাটিতে। কান্না করছি, বলছি সব ষড়যন্ত্র, সব মিথ্যা। বলছি, ওই পাষাণটাই আগুন দিয়েছে সবখানে- বনে, কারখানায়; তারও বহু আগে আমাদের সংসারে। আমি যে সরকারি লোক, আমার যে ক্ষমতা অনেক, তাও হয়তো বললাম। তবু আমায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। যত চেষ্টা করছি ছাড়া পাওয়ার, দপাদপ কিলঘুষি তত পড়ছে চোয়ালে, বুকে, পিঠে।
তারপর একটা কবর। না না, মনে হচ্ছে কবরের মতোই সরু একটা ঘর। শরীরে আমার তীব্র ব্যথা। চোখ জ্বলছে, বুক জ্বলছে; তেষ্টা লেগেছে। বন্ধ হয়ে আসছে দম। জেগে থাকতে কষ্ট, অথচ ঘুমোতেও পারছি না।
তবে কি আমি স্বপ্ন দেখছি? ভাবতেই হুড়মুড়িয়ে উঠলাম, চেষ্টা করলাম জেগে ওঠার। কিন্তু জাগতেও পারলাম না।
দেয়ালে টিকটিক করছে সময়। ঘড়ির কাঁটায় অন্ধকার। আঁধার আমার চোখেও। কালির মতো ঘন সে আঁধার চুঁইয়ে পড়ছে পাপড়ি থেকে। আন্দাজের ওপর নড়াচড়া করছি। হঠাৎ জোরে হোঁচট লাগল টেবিলে, নাকি চৌকিতে কে জানে। যা-ই হোক, তার ওপর পানি, কিছুটা পড়ে গেল, কিছুটা খেলাম চেটে চেটে। কিন্তু পানি যেন তা না, যেন আলকাতরা, খেতেই গলাবুক জ্বলতে লাগল আরো।
মাথার ওপরে খোলা ঘুলঘুলি। বাতাস ঢুকছে। তাতেও শিসার গন্ধ।
নাক জ্বলছে, তীব্র তেজে, জ্বলছে চোখ।
কী করব আমি তখন? কী করব? করব কী? বুঝতে পারি না। না পেরে বেরিয়ে আসি ঘুলঘুলি দিয়ে।
আকাশে তখনও জাদু- মস্ত একটা শিল্পকর্ম ঝুলে আছে। কালো-হলুদ বাঘ, আর হলুদ-সবুজ হরিণ। আর গাছ। আর ময়ূর। আর মানুষ পাখি সাপ। সবার গায়ে আগুন, বেঘোরে পুড়ছে সবাই।
[বিশ ঊনিশ]


0 মন্তব্যসমূহ