ওয়ালিদ প্রত্যয়ের গল্প : না-নির্বাণ



…কিন্তু আপনি কল্পনা করতে পারবেন না; যদি আপনাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় একটা কালো ঘরে; দরজা নেই, জানালা নেই, নেই কোনো আসবাব, আলো নেই, অন্ধকারও না। ধরে নিন, আপনি জানেন না এই ঘরে কীভাবে এসেছেন বা ঘর থেকে বেরোবেন কবে? এমতাবস্থায় কী কল্পনা করবেন আপনি?

আমার বয়স কম; সাতাশ। তবে দেখলে মনে হয়,আরো বেশি; ত্রিশ/একত্রিশ। আবার ওজন ৬০/৬১ হলেও আমার নিজেকে প্রায় ৯০ লাগে। শহরের সবচেয়ে বড় সুপারশপে আমার একটা চাকরি আছে; কিন্তু চাকরি-পদের কোনো নাম নেই। আমার কাজ প্রতিদিন সকাল নয়টায় শপে উপস্থিত হওয়া, গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে আইল ধরে ধরে হেঁটে কাস্টমারদের উপর চোখ রাখা- কেউ চুরি করছে কিনা। মাথার উপর গোটা দশেক সিসি ক্যামেরা থাকার পরেও যে আমার চাকরিটা তিন বছর যাবৎ বহাল তবিয়তে আছে এ-জন্য আমি আমাদের মালিকের প্রতি জন্ম-কৃতজ্ঞ, যেনো তিনিই আমার পিতা; ‘জন্মদাতার চেয়ে অন্নদাতার মর্যাদা বেশি;’ তাই প্রায় সময়ই মালিকের কথামতো কখনো কখনো শপের আবর্জনা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসতে এবং প্রায়ই মালিকের বাড়ির টুকটাক কাজ করে দিতে হয়; বাজার করা, তাঁর ছেলেকে স্কুল থেকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এইতো। এসব ছাড়া আমার আর কোনো কর্মক্ষমতা নেই। ওহ না, আরেকটা ক্ষমতা আছে- আমি মৃতদের কথা বুঝতে পারি।

প্রথমে ভাবতাম পৃথিবীর সবাই এমন; পরে বুঝলাম আমি একা। তখন মনে হলো এটা অসুখ আমার; কিন্তু ‘ক্ষমতা’ শব্দটা মাথায় আসতে অনেক সময় লেগে গেলো। আপনাদের যাদের আমি সেই কালো ঘরে প্রবেশ করাতে পেরেছিলাম, যারা সেসময় কিছু কল্পনা করতে পারেননি, শুধু তাদের আমার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা জেনে রাখা দরকার। আমি তখন ক্লাস সিক্স/সেভেন; আমার ছোটোবোন মারা গেলো। ওর কোনো নাম রাখা হয়নি। মেয়েটার ছিলো জন্ম-অসুখ; এতোটাই পাতলা ছিলো ওর গায়ের চামড়া যে, ভেতরের সব অর্গান স্পষ্ট দেখা যেতো। যেনো ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিকের মানুষ। চামড়া ভেদ করে দেখতাম একটা নীলচে হৃদপিন্ড ছন্দে ছন্দে ধুকধুক করছে, শিরা-উপশিরা দপদপ করছে লালকালো রক্তের ধাক্কায়। মায়ের বুকে মুখ দিলে দেখতাম, ওর গলা বেয়ে নেমে পাকস্থলিতে ঢেউ দিচ্ছে মায়ের দুধ। দুই/তিন শহর দূর দূর থেকেও মানুষজন বাচ্চাকে দেখতে এসেছিলো। জন্মের পাঁচদিন বাদে, এশার আযানের আগের এক সন্ধ্যায়, আমরা সবাই দেখলাম- মেয়েটার হৃদপিন্ড বিড়ালের মতো হয়তো তার চেয়েও জোরে পাম্প করছে; ওর শরীরের দশছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসছে হার্ট চলাচলের বেগময় শব্দ। বাবা দৌঁড়ে পাশের মসজিদের মৌলবি নিয়ে এলেন। ছোটোবোন তখন মায়ের গা ঘেঁষে বিছানায় শোয়া; অসচেতন আব্রুর দরুণ ক্লিভেজ বের হয়ে থাকা মায়ের দুধভর্তি ভেজা ভেজা স্তনজোড়ার দিকে তিন চার পলক তাকিয়ে থেকে মৌলবি বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে শুরু করলেন। দোয়ায় কাজ হলো না, ছোট্ট হৃদপিন্ডটা কাঁচা ডিমের মতো ফেটে গেলো, ভেতর থেকে কুসুম বেরোলো না, বের হলো গন্ধযুক্ত কালচে জল; সারা শরীর মুহূর্তেই ক্যামন অন্ধকার হয়ে গেলো মেয়েটার। আমি ওর দিকে ঠায় তাকানো; যেনো স্পষ্ট, দূর থেকে আসা তবু কাছের, চিনচিনে তবু ব্যথামুক্ত কন্ঠে কেউ একজন বলল, ‘এভাবে তাকিয়ো না।’ আশপাশের কারোর ঠোঁট নড়েনি, সবাই স্তব্ধ হয়ে সাদা থেকে কালো হয়ে যাওয়ার রঙ পরিবর্তন দেখতে ব্যস্ত। আমার মাথার ভেতর থেকে যেনো কেউ বলেছে কথাটা, একটা আঠারো উনিশ বছরের নারী কন্ঠস্বর। আমিও হয়তো মাথায় মাথায় সেই কন্ঠস্বরকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আমাদের ছেড়ে যাচ্ছো, তোমার কষ্ট হচ্ছে না?’ হয়তো সে উত্তরে বলেছিলো, ‘না!’

কাউকে এই বিষয়ে কিছু বলিনি; তবে বহুবার মৃত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনতে চেয়েছি; পাশের বাড়ির বৃদ্ধ লোক কিংবা পরিচিত-অপরিচিত যে কেউ। এলাকায় মাইকে মৃত্যু সংবাদ শুনলেই দৌঁড়; লাশের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থেকেছি, কিন্তু আত্মীয়দের বিলাপ ছাড়া কিছুই শুনিনি। আরেকটু বয়স বাড়ার পর; আরেকটু বুদ্ধি-বৃদ্ধির পরে আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম যে, ঐদিন, এশার আযানের পূর্ব-সন্ধ্যায় আমি আসলে কিছুই শুনিনি। ছোটোবোন নিশ্চয়ই আমাদের ছেড়ে যেতে কষ্ট পাবে না, আমাদের কারোর সাথে সম্পর্ক তৈরীর সুযোগই হয়নি ওর। আমি জানি, যেমন আপনারাও জানেন নিশ্চয়ই, সমস্ত দুঃখ জড়িয়ে আছে ঘনিষ্ঠতায়। কারো প্রস্থানে যন্ত্রণা পাওয়ার জন্য তার সাথে সম্পর্ক থাকতে হয়। আমার শিশুমন হয়তো, এটাই আমাকে বুঝিয়েছে তখন, একটু অন্যভাবে, একটু অবচেতনায়, একটা অল্টারনেটিভ রিয়েলিটি তৈরী করে। কিন্তু বেশিদিন না, আমি আবারো আগের অবস্থায় ফিরে গেলাম এবং আমার স্বস্তি হলো যেদিন আমার চোখের সামনে, আমার কোলে মাথা রেখে আমার বন্ধু মারা গেলো। একটা ফিফটি সিসি হিরো হোন্ডায় ছিলাম দু’জন, ও চালাচ্ছিলো; কোথায় যাচ্ছিলাম বা কোথা থেকে ফিরছিলাম মনে নেই। শুধু মনে করতে পারি প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার স্পিড, ফাঁকা রাস্তা এবং একটা মোড়। আমরা কেউই দেখিনি মোড়ের ওপাশ থেকে আরেকটা লোকাল বাস টার্ন নিচ্ছে, বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে আমার বন্ধু হোন্ডার ডিরেকশন অন্যদিকে ঘোরাতেই রাস্তার পাশে টঙ দোকানে ঢুকে গেলাম, ছাউনি দেওয়া বাঁশের বর্ধিত তীক্ষ্ম মাথা বন্ধুর গলা ছিঁড়ে বেরিয়ে গেলো। কয়েক সেকেন্ড, জবাই করা গরুর মতো ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ হচ্ছে ফেড়ে যাওয়া গলাটা থেকে। আমার ডান হাতের কব্জি ভাঙলো, দু’হাঁটুর চামড়া ছিলে গেলো। রক্তে ফোবিয়া থাকার পরেও সেদিন কেনো যেনো আমি অজ্ঞান হতে পারলাম না। চিৎ হয়ে পড়ে থাকা হোন্ডার শরীর থেকে কোনোমতে পা ছুটিয়ে আমি বাম হাত দিয়ে চেপে ধরতে চাইলাম বন্ধুর গলা। ঠিক সেই মুহূর্তে, ঠিক সেদিন এশার সন্ধ্যার মতো আমার বন্ধুর কন্ঠস্বরে কেউ একজন হয়তো আমার মাথার ভেতরে বলেছিলো, ‘মরে যাচ্ছি, কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি মরে যেতে চাইনি!’ আমাদের বয়স তখন আঠারো কী উনিশ!

এরপর আরো কিছু মৃত্যু দেখেছি আমি; বাবা, মা, পোষা কুকুর, তিনরাস্তার মোড়ে বঙ্গবন্ধুর মুরাল বসানোর জন্য কেটে ফেলা শতবর্ষী বটগাছ, বিদ্যুৎস্পৃশ হয়ে তারে উলটো হয়ে লটকে থাকা বাদুড়। আমি বুঝলাম, মৃতদের কথা না, আমি কেবল জান বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটায় বলা কথাটুকু শুনতে পাই। পৃথিবীর আর কেউ না, আমি একা, শুধু আমি।

শেষ সময়ে বলা শেষ বাক্যটুকু শোনার নেশা আমাকে মোহিত করে ফেললো। রাত বিরাত আমি ঘুরে বেড়াই হাসপাতালের আইলে আইলে। উন্মাদের মতো মানুষের মৃত্যুর অপেক্ষা করি, যমদূত হয়ে বসে থাকি অসুস্থ মানুষের শিথানে, অবচেতনভাবে মোনাজাত করি পৃথিবীর সমস্ত ঔষুধ অকেজো হয়ে যাক। উঠতি যৌবনে পর্ণ ম্যাগাজিন পড়ে চোখের সীমানায় সব নারীকে যেমন কামনা করেছি, তেমনি যেকোনো প্রাণ দেখলেই এখন আমার তাদের মৃত্যু-কথা শুনতে ইচ্ছা করে। আপনারা কেউ জানেন না, কতজন কতো কতো অদ্ভুত কথা বলে যায়, নিজের জীবনের প্রতি আফসোস এবং জীবিতদের প্রতি ঘৃণা তাদের বয়ানে ঠিকরে পড়ে। যত বৃদ্ধ হোক, শরীর পঁচে যাক যতোই, আমি এখনো এমন কাউকে দেখিনি যে মৃত্যুকে গ্রহণ করেছে উপহারস্বরূপ, সানন্দে অথবা শান্তিতে। মরণ কখনোই শ্যাম-সমান না। যেমন শেষবার শুনেছি- আট/নয় বছরের একটা ছেলের কথা; আমাদের সুপারশপের দরজায়। সেদিন বিরোধীদলের রাজনৈতিক সভা; পুরো রাস্তাজুড়ে থৈ থৈ মানুষ। স্লোগানের স্পন্দনে শপের কাচ ভেঙে যাচ্ছে যাচ্ছে। এরপরের ঘটনা অনুমেয়; সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠন সাথে পুলিশের বাহিনী মিলে সভা ভাঙতে ছুটে এলো; কে কোনোদিকে দৌঁড়াচ্ছে কোনো তাল নেই, ঢিলের আঘাতে ভেঙে যাওয়া মৌচাকের মৌমাছি সবাই যেনো-বা; স্লোগান থেকে চিৎকার, গুলির আওয়াজ, কাচ ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ, ইটের টুকরা পড়ছে আকাশ থেকে, যাদের মাথায় হেলমেট নেই, আমার সেই বন্ধুর মতো গলগল রক্ত পড়ছে তাদের মাথা থেকে। মালিক হুকুম করলেন, যা তাঁর আরো আগে করা উচিৎ ছিলো, ‘হাউয়ার পো শাটার লাগা,’ আমরা, কর্মচারীরা দৌঁড়ে বাইরে এলাম, তখনই দেখি, দরজার সামনে একটা বাচ্চা ছেলের মুখের একপাশ থেঁৎলে গেছে, তাকে কোলে নিয়ে, ওর মা হবে হয়তো, চিৎকার করছেন। মা ছেলের দিকে তাকানো সময় নেই কারোর, পদতলে মাড়িয়ে যে যার মতো আমাদের শপে ঢোকার চেষ্টা করছেন; জান বাঁচাও। আমি ওদের সামনে দাঁড়ালাম, হাঁটু গেড়ে বসে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার নাড়িভুড়ি উলটে আসা বমিটাকে কোনোমত আটকে মহিলাকে বললাম, ‘দোকানের ভিত্রে আসেন।’ মায়ের চিৎকার কিংবা সমবেত মানুষের কথার মধ্যে আমার কথা উবে গেলো, বাচ্চাকে তুলে ধরার চেষ্টা করতেই পেছন থেকে মালিক শার্ট টেনে তাড়াহুড়ো করে বললেন, ‘শাটার নামা!’ সেই সময় একটা ঝাঁকুনি দিলো বাচ্চাটা, আমার দুনিয়া স্তব্ধ হয়ে গেলো, শুধু কানের কাছে, হয়তো মাথায় কাছে, বোধয় শুনলাম, ‘আমার বিড়ালটাকে বোলো, আমি ওকে ভালোবাসি!’

গন্ডোগল মিটতে অনেক রাত হলো সেদিন, আমরা সবাই শপের ভেতর বন্দি হয়ে থাকলাম। যারা যারা, ভাগ্যক্রমে ঠেলেঠুলে আমাদের শপের প্রবেশ করতে পেরেছিলো, তারা আর বেরোলো না। গোটা শয়েক মানুষ তো হবেই। মালিক আমাকে ডেকে বললেন, ‘সবের উপ্রে নজর রাখ, এইগুলা কিন্তু চোরের গুষ্ঠি!’ আমি মুখ নীচু করে বললাম, ‘কারা? সরকারী না বিরোধী?’ মালিক আমার চেয়েও কন্ঠ নামিয়ে বললেন, ‘সবডি!’ কাজেই বাছবিচার না করে আমি সবার উপরে চোখ রাখলাম, কারো মাথায় লাল ক্যাপ, শ্রমিক; কারো চোখে রোদ চশমা, নেতা; কারো গায়ে শাদা পাঞ্জাবি। সেদিন জম্পেশ বিক্রি হলো; চার ঘন্টার মতো দোকানে বন্দি, কোকাকোলা এক লিটার বিক্রি হলো পাঁচ সাতটা, দোকানে সিগারেট নেই বলে রোদচশমা ভায়েরা কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করলেন। ক্যাশ কাউন্টারে রাখা টেলিভিশনের খবরে বলা হলো, হামলায় সরকার দলীয় এক নেতার মৃত্যু, আহত তিন। কোকাকোলায় চুমুক দিয়ে জনৈক পাঞ্জাবিওয়ালা বিড়বিড় করে বললেন, ‘বাটপার!’ লাল টুপি শ্রমিকেরা একে অন্যের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করে বললো, ‘ট্যাকা দেওনের কতা, পাইলাম না। লস!’ ঝড়-পরবর্তী সময়ের মতো পরিবেশ শান্ত হলো একসময়ে; আমি আমার দায়িত্ব পালন করে চললাম, কেউ কিছু চুরি করলো না বলে এই পরিশ্রম বৃথা মনে হলো। কোমড় পর্যন্ত খোলা শাটারের ফাঁক দিয়ে এক এক করে মাথা নামিয়ে বের হতে থাকলো লাল টুপি, রোদ চশমা আর পাঞ্জাবীরা। আমিও বের হলাম, দোকানের সামনে ‘ওয়েলকাম’ লেখা পাপোশের উপর কালো রক্ত তখনো মোছেনি। বাচ্চাটাকে শেষমেষ নিয়ে গেলো কীভাবে?

সেরাতে ঘুমের সমস্যা হলো; কোত্থেকে কোন একটা কালো বিড়াল সারারাত ঘরের ভেতর ঘোরাঘুরি করলো; চিচি শব্দ করলো, টেবিলের ওপর রাখা সমকালীন লেখকদের গল্পসংকলনের উপর পেচ্ছাব করলো ছেড় ছেড় করে। কয়েকবার বিলবিল করে বের করে দিলাম, দরজা আটতেই দেখি আবার টেবিলের নীচে বসা। সেরাতে অন্ধকারে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমি বিড়ালের জ্বলন্ত সবুজ চোখ ছাড়া কিছুই দেখিনি।

আজ বিষ্যুদবার; সবার মতো এই বারটা আমারো প্রিয়; বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ডিউটি, এরপর টানা ছত্রিশ ঘন্টা কোনো কাজ নেই। শহরের মোড়ে মোড়ে অফিস ফেরত মানুষেরা চা সিগারেট আর তেলেভাজা খায়; ছাত্ররা গাঁজা স্কোর করে, কবিরা যায় পানশালায়। আমি হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরি। ভিক্ষুকের লাহান হাঁটু গেড়ে বসে থাকি তাদের বিছানার পাশে।

এখন সাড়ে চারটা বাজে; শপের ম্যানজ্‌ সেকশনে পারফিউমের বোতলের সারি ঠিকঠাক করার সময় পাশ থেকে একজন প্রশ্নবোধক স্বরে বললো, ‘আরে, তুই?’ আমি মাথা ঘোরালাম; ছুটির ঠিক আধঘন্টা আগে এমন একজনের সাথে দেখা হলো যার সাথে আমার দেখা হওয়া উচিৎ ছিলো না। যে ডেকেছে তার নাম ‘নিক্বণ।’ আমার স্কুলমেট; এক সময় ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিলো, কলেজে ওঠার পর ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় আর কোনো যোগাযোগ থাকেনি। ছেলেটা দেখতে সুন্দর, ক্লাস টেন পর্যন্ত ওর ফর্সা গালে ছিলো হাতে গোনা দাড়ি, এখন বেশ চাপ দাড়ি হয়েছে। আমি ওর দাড়ির দিকে তাকিয়েই মুচকি হাসলাম; আমার দৌঁড়ে পালাতে ইচ্ছা করছিলো কিন্তু ততক্ষণে নিক্বণ হ্যান্ডশেকভাবে হাত বাড়িয়ে রেখেছে। ‘কতদিন পর দেখা? দশ বছর?’ উৎসুক চোখে সে আমার দিকে চেয়ে থাকে, দশ বছর হবে হয়তো, কিংবা তারও বেশি। টুকটাক কুশল বিনিময়ের সময় ওর গলা থেকে বন্ধুত্বের স্রোত উপচে পড়ছে। যেনো গত দশ বছর মনে মনে খুঁজেছে আমাকে। ‘তারপর কী অবস্থা?’ ‘বিয়েশাদি?’ ‘আশেপাশেই থাকিস?’ ‘শুকিয়ে গেছিস ক্যানো?’ –নিক্বণ এমন প্রশ্ন করলো পরপর। আমিও ভাইভার মতো সঠিক উত্তর দিতে চেষ্টা করলাম। ওর হাতের ঝুড়িতে শপ থেকে কেনা নানা জিনিসপত্র। গায়ে ইস্ত্রি ভাঙা শার্ট, বাম কব্জির উপর কালো ঘড়ি, চুলগুলো যত্নে আঁচড়ানো। ছোটোবেলার গোলগাল চেহারা এখন কিছুটা ভেঙেছে। কথায় কথায় জানলাম, ফিনল্যান্ড থেকে কিছুদিন হয় দেশে ফিরেছে সে। ওখানে কী? ইউনিভার্সিটি অফ হেলসিঙ্কিতে মাস্টার্স, ওখানেই ম্যানেজম্যান্টের উপর পিএইচডি। বিয়ে করেছে গতবছর; ফিনল্যান্ডেই। মেয়েটা বাংলাদেশের, ফ্যামিলিসহ ওখানে থাকে; এখন প্রেগন্যান্ট। কথা বলতে বলতে অনেক সময় চলে গেলো, আমার আনন্দময় ছত্রিশ ঘন্টার শুরুয়াতও হলো দেখতে দেখতে। বাসি রক্তমাখা ‘ওয়েলকাম’ পাপোশ এখনো সরানো হয়নি, ওটা মাড়িয়েই দুইজন বাইরে আসি। নিক্বণের গাড়ি শপের বাইরে পার্ক করা; ওঠার আগে বলল, ‘একদিন বাড়িতে আয়, আড্ডা দেওয়া যাবে। আগামী মাসের তিন তারিখে আমার ফ্লাইট!’ আমি বললাম, ‘যাবো!’ নিক্বণ আমার কাছে এসে কানে কানে বলার মতো বললো, ‘দেশের যে অবস্থা! অবশ্য বাইরেও শান্তি নাই। এক হিশেবে তোরাই ভালো আছিস। পার্টি ফার্টি করিস নাকি?’ আমি ওর কথার জবাব দিতে পারলাম না, এতক্ষণে ওর গায়ে মাখা যে সুবাস দূর থেকে নাকে আসছিলো, এখন গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর পর সেটা হলো আরো তীব্র; আমার মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেলো ঘ্রাণে বা গন্ধে। এই গান্ধিক-মাতম বজায় রেখেই আমার সাথে পুনরায় হাত মিলিয়ে গাড়িতে উঠে সে হাওয়া হয়ে গেলো। আমি একলা আদম হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, এরপর হাঁটা শুরু করলাম। অনেকদিন পর; বুকের কাছে ষ্টীলের ট্রে নিয়ে সিগারেট বিক্রেতার কাছ থেকে একটা গোল্ডলিফ নিয়ে ঠোঁটের মাঝখানে চেপে ধরি; প্রথম টানেই আমার দুনিয়া দুলতে শুরু করে। ইচ্ছে ছিলো, কাজ শেষে সোহ্‌রাওয়ার্দী হাসপাতালে যাবো; ওখানে এক নং ওয়ার্ডে যত মৃত্যুযাত্রী মানুষের ভিড়। বিছানা সব দখল, মেঝেতেও অসুস্থ মানুষ। আমি ঘুরে ঘুরে দেখবো কে মারা যাচ্ছে।

কিন্তু আমার এখন ওখানে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। নিক্বণকে দেখার পর কেমন একটা টগবগে নহর শরীর জুড়ে শুরু হয়েছিলো সেটা থামাতে পারছি না কিছুতেই। ছেলেটা কী স্বাভাবিকভাবে কথা বলে গেলো; আর আমার মাথায়, নিশ্চয়ই এটা অনেকদিন পর সিগারেট খাওয়ার ফল, ক্রমাগত দৃশ্যায়িত হতে থাকলো সেদিনের ঘটনাটা, আজ থেকে এগারো বছর আগের দুপুর; নির্জন এবং শব্দহীন। তখন নিক্বণের সাথে খাতির বেশ, প্রায়ই ওর বাড়িতে যেতাম, ও আমার বাড়িতে আসতো না কখনো। ওদের বাড়িটা বিশাল, মানুষ কম। ওর মা কোনো একটা মহিলা কল্যাণ সমিতির সভাপতি। সারাদিন বাইরে বাইরে। নিক্বণের বাবা ব্যবসায়ী, কিসের ব্যবসা জানি না। দুপুরে ও ছাড়া বাড়িতে শুধু থাকতো ওদের দুইজন কাজের মহিলা। আমি আর নিক্বণ নিনটেন্ডো’তে ভিডিও গেম খেলতাম। কোনো ডিস্টার্বেন্স নেই। সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকলেও কিছু এসে যায় না। একদিন দুপুরে; একটা কমিক বইয়ের ক্যারেকটার নিয়ে কথা বলার সময় নিক্বণ হঠাৎই আমাকে প্রশ্ন করেছিলো, ‘তুই কাউকে কখনো চুমু খেয়েছিস?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ!’ ‘কাকে?’ সাগ্রহে জানতে চাইলে আমি উত্তর দেই, ‘মাকে!’ ‘ধুর ছাগল, সেই চুমু না। ঠোঁটে ঠোঁটে?’ আমি বলেছি, ‘না।’ কেউ শুনে না ফেলার মতো মৃদুস্বরে সে বলে, ‘খাবি?’ আমি চোখ সরু করি, ‘কাকে?’ নিক্বণ আরো কাছে ঘেঁষে এসেছিলো, ‘আমাকে?’ আমি অবাক হয়ে বলেছি, ‘ছেলে ছেলে চুমু খাওয়া যায় নাকি?’ উত্তরে সে আমার নাকের কাছে চলে এসেছে, ওর উষ্ণ নিঃশ্বাসে আমার চামড়া ঝলসে যাচ্ছিলো; পাতলা ঠোঁটের একটা হালকা স্পর্শ আমার নীচের ঠোঁটের কম্পন বাড়িয়ে দিলো কয়েকগুণ; পানসে থুথুর স্বাদ যেনোবা আমরুজ চাবাচ্ছি। শকের মতো ছিটকে দূরে সরে এসেছি, নিক্বণ ঘাবড়ায়নি; দূরত্ব কমিয়ে আবার কাছে এলো, সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে আবারো সেই একই কাজ, আমার চোখ বন্ধ, ওর নিঃশ্বাসের তোড়ে আমি নিজে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলাম। আমার দম আরো বন্ধ হয়ে এলো যখন অনুভব করলাম কোনো একটা মোলায়েম হাত আমার শিশ্ন চেপে ধরেছে, ক্রমে শক্ত হওয়া শিশ্ন থেকে হাতের শক্ত মুঠো ছাড়িয়ে নেওয়ার শক্তি আমার ছিলো না। নিক্বণ আরেকটা হাত দিয়ে ওর নিজের অঙ্গ চলনা করে যাচ্ছে। দুইটা ঘামার্ত কিশোর দেহ বিছানায় শুয়ে ছিলো দুপুর থেকে সন্ধ্যা, চুপচাপ, নিস্তব্ধ এবং ক্লান্ত…

আজকে নিক্বণ বড় হয়ে গেছে, হবু বাবা সে, নামের আগে ডক্টরেট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি, পকেটে কয়েকখানা কার্ড। আমার হাতে কেবল অর্ধপোড়া গোল্ডলিফ, মাথাভর্তি মৃত মানুষের কথা। আমি এমন একজন মানুষ যার অস্তিত্বতে কিংবা না-অস্তিত্বে পৃথিবীর কিছু এসে যায় না; আমার কোনো পিছুটান নেই; আমার জন্য ঘরে কেউ অপেক্ষা করে থাকে না। আমি চাইলে যেমন খুশি জীবন কাটাতে পারি অথবা পারি এই মুহূর্তে চলন্ত কোনো গাড়ির নীচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে। এই যে আমি আমার ক্ষমতার কথা কাউকে জানালাম না; ভয়ানক একটা সত্য নিয়ে আমাকে একা একা চলে যেতে হবে, আজ এই বিষ্যুদবার সন্ধ্যায়, পুরোনো মিতার সাথে দেখা হওয়ার পর, আমার খুব আফসোস চাড়া দিচ্ছে। স্বীকৃতি না পেলে ক্ষমতার কোনো মূল্য নেই। আমার ইচ্ছে করছে চিৎকার করে শহরবাসীকে জানাতে, আমি মৃতদের কথা শুনতে পারি, শুধু আমি, শুধু আমি। আমাকে কুর্নিশ করতে হবে না; কেবল একবার তাকাও আমার দিকে।

আমি জানি, আমি সবার কাছেই নজরহীন! আমার জন্মক্ষমতার কোনো বাজারদর নেই; মানুষ মৃতদের কথা শুনতে চায় না, ওদের আগ্রহ স্রেফ জীবিত নিয়ে। আমি কী? মৃত না জীবিত? আমার চলে যাওয়ার মুহূর্তে বলা কথাটাও কেউ শুনবে না, এমন একটা জীবন আমি ঠিক কতদিন বহন করবো? আমার জানতে মন চায়, সেই ক্ষণটায়, আমার শেষ নিঃশ্বাস বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষণে আমি কী বলবো? কার কার প্রতি অভিযোগ থাকবে আমার? দরিদ্র পিতা? ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকা? রাষ্ট্র? সমাজ? নাকি নিজের প্রতি?

ঘরে ফিরতে আমার রাত হয়ে যায়; শহরের মসৃণ শরীরে ফোঁড়া উঠার মতো একটা কালো ঘর। মাথাটা আজ বড় ঝিমঝিম করে; এতদিন যাদের মৃত্যুবাক্য শুনেছি, সব যেনো একত্রে বাজতে থাকে কানের কাছে। দুইহাত দিয়ে কান চেপেও বন্ধ করা যায় না এই সভা। টিমটিমে আলোর মধ্যে পকেট থেকে চাবি বের করে আমি ঘরের দরজা খুলি। আমার আগে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকা লাল আলোয় দেখতে পাই, ঘরের মেঝে, সিঙ্গেল বিছানা, টেবিল আর বুকশেলফের উপর গিজগিজ করছে শত শত বিড়াল। ছাই রঙা, কালো, সাদা এবং ব্রাউন- আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে সবাই। ওদের পশমের গন্ধে সারাঘর ভেসে যাচ্ছে। আমি দরজা বন্ধ করি, মাথার ভেতর বাজতে থাকা ক্রমাগত শব্দ আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দিচ্ছে না। যত এগোই, বিড়ালেরা সরে সরে রাস্তা তৈরী করে দেয়। বিছানায় গা দিতেই মনে হয় তলিয়ে যাচ্ছি, এ যেনো জলের তৈরী তোশক, আমাকে শুষে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। টের পাই, একটা কালো বিড়াল আমার বুকের ওপর এসে শোয়, আরেকটা মাথার কাছে, কয়েকটা পায়ে, হাতে, জঙ্ঘায়। ওদের কাটায়ালা জিভের লেহনে আমার চামড়া ছিলে যাচ্ছে, বুকে শোয়া বিড়ালটা আমার গলায় এসে দাঁত বসালে মনে হয়, সেই বন্ধুর মতো ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছে রক্ত; মুখের এক অংশ থেঁৎলে দিচ্ছে আরেকটা বিড়াল, ওদের ওজনে বুকের ওপর এমন চাপ অনুভব করছি যেনো হৃদপিন্ড এখনি ফেটে যাবে। ধীরে ধীরে আমি চলে এলাম একটা কালো ঘরে, দরজা নেই, জানালা নেই, আলো নেই, অন্ধকার নেই। আশেপাশে কোনো মানুষ নেই, কোনো বিড়াল নেই। আমি কিছু চিন্তা করতে পারছি না, কেবল বিড়বিড় করে কার উদ্দেশ্যে যে বলে যাচ্ছি, বলেই যাচ্ছি, আমি মৃতদের কথা শুনতে পারি, শুধু আমি, শুধু আমি…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ