কুলদা রায়ের গল্প : কালু কুকুরটির মৃত্যু বনাম অসীত বিশ্বাস



লোকটি যে এসেছিল সেটা সত্যি। আবার সত্যি নাও হতে পারে। লোকটিকে কেউ আসতেই দেখেনি। তখনো শহরে লঞ্চঘাটটি আছে। পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। তবে বড়ো লঞ্চ এখন ভেড়ে না। নদী অনেকটাই হেজেমেজে গেছে। টেকেরহাট থেকে ট্রলারলঞ্চ আসে। ঘণ্টা পাঁচেক লাগে। অথবা এখান থেকে ট্রলারলঞ্চ টেকেরহাট যায়। সেখান থেকে বাসধরে ঢাকা অথবা বরিশাল যায়। এরমধ্যে টেকেরহাট থেকে এখানে গাড়ি চলাচল হবো হবো করছে। কবে যে হবে সেটা ঠিক নেই। 

হয়তো লোকটি লঞ্চেই এসেছে। তখনো ভোর হয়নি। কুয়াশা ছিল। যদি লোকটি এসে থাকে, তবে এর মধ্যে লোকটি টুপ করে নেমে পড়েছে। লঞ্চঘাটের রুটিকলার দোকানদার টেপুর চোখ এড়িতে গেছে। মাছিটিও তার চোখ এড়াতে পারে না। কিন্তু লোকটি এড়াতে পেরেছে– এটা একটা বড় রকমের বিস্ময়। 

এর থেকেও বড় বিস্ময় আছে। সেটা হলো লোকটি বিশ্বাসবাড়ি ঢুকে পড়েছে। ঢুকে সোজা বারান্দায় বসেছে। শুধু বসে নয়, হতে পারে এর মধ্যে কিছুটা ঘুমিয়েও নিয়েছে। এর চেয়েও আরো বিস্ময় হলো–বাড়ির কালু কুকুরটি টু শব্দটি করেনি। বারান্দার পাশটিতে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। নো নড়ন চড়ন। নাকও ডাকছে। এবং হতে পারে কুকুরটির পাশেই লোকটি কিছুক্ষণ বসে থেকেছে। কাউকে ডাকবে কি ডাকবে না এই রাতে, ডেকে কারো ঘুম ভাঙানো কি ঠিক হবে কিনা এটা ভাবতে গিয়ে কিছুটা দোনামোনা করেছে। তারপর কুকুরটি পাশেই কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। 

ভোর ভোর এ বাড়িতে উমার মা আসে। নিয়ম মতো উঠোন ঝাড় দেয়। গোবর দিয়ে নিকোয়। রান্নাঘর থেকে থালাঘটিবাটি বের করে কলতলায় নিয়ে ধুয়ে টুয়ে রাখে। আজও এই কাজগুলো করেছে। করার সময় বারান্দায় কুকুরটিকে দেখেছে বটে। কিন্তু কোনো লোক দেখতে পায়নি। অন্যদিন এ সময় কুকুরটি জেগে ওঠে। উঠোনে লেজ তুলে হাঁটে। তাকে দেখে একটু ঘেউ করে ওঠে। তাকে কিছু খাবারও দিয়ে থাকে উমার মা। আজ তাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অবাক হয়েছে। কুকুরটাকে না ডেকে উমার মা কাজ সেরে চলে গেছে। বাড়ির চৌহদ্দি পার হতে গিয়ে তার একবার মনে হয়েছে উঠোনের ঈশান কোনার আমগাছটায় কে একজন বসে আছে। এই ভোরে এতোদিন এ বাড়িতে কেউ আসে না। তাই মনের ভুল ভেবে নিয়ে উমার মা আর আমগাছটির দিকে পেছন ফিরে তাকাল না। সোজা চলে গেল। তার তাড়া আছে। আরেকবাড়ির কাজে যেতে হবে। 

তবে এই আমগাছের নিচে হেলান দিয়ে বসে থাকতে থাকতে লোকটিকে মুড়ি চিবুতেও দেখা যায়। 

এর মধ্যে এ বাড়ির মা মানুষটি উঠে পড়েন। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসেন। বেরিয়ে একবার পূব দিকে তাকান। সেদিকে তাকিয়ে সূর্যপ্রণাম সারেন। বিড়বিড় করে বলেন, 
ওঁ জবা কুসুম সন্কাশং কাশ্য পেয়ং মহাদ্যুতিম।
ধান্তারিং সর্ব পাপঘ্নং প্রণতস্মি দিবাকরম্।

তৃতীয়বার যখন মন্ত্রটি বলতে যাবেন ঠিক তখন তার মনে হলো গুটি গুটি পায়ে কে একজন আমগাছটার নিচ থেকে হেঁটে এলো। এসে তার পায়ের কাছে নিচু হয়ে প্রণাম সারল। তিনি ঠিক ঠাওর করতে পারলেন না। আবছা মতো দেখতে পেলেন। শুধু আস্তে করে বললেন, সুখী হও। 

তার পর আর কথা নেই। তিনি অভ্যাসবশে আবার দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। যেতে যেতে তার মনে হলো আবছা মতো যে তাকে প্রণাম করেছে সে আসলে কেউ নয়। তার মনের ভুল। ভুল করে এরকম মাঝে মাঝে কেউ তাকে প্রণাম করতে আসে বলে মনে হয়। তার ছেলের বৌ মীরারানী বলে, ও আমাগো কালু কুকুর। আপনার পায়ের কাছে ঘোরে, মা। 

হতে পারে। কুকুরটি তার নেওটা। তবে কুকুরটি এলে তার ঘ্রাণ টের পান তিনি। যে তাকে প্রণাম করে বলে মনে হয় তার কোনো ঘ্রাণ তিনি পান না। তার একটু ধ্বন্ধ লাগে। ঘরে যেতে যেতে মনে হয় কুকুরটির ঘ্রাণ এই ভোরে তিনি পাননি। ঘেউ করে তার গলার স্বরও তিনি পাননি। এরকম কখনো হয় না। কুকুরটি তাহলে গেল কোথায়? 

এটা ভাবতে ভাবতে তার হাই উঠে। তিনি আবার ঘুমের মধ্যে ডুবে যান। 

মীরারানীর ঘুম ফজরের আজানের আগেই পাতলা হয়ে যায়। তারপরও আরেকটু ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু শ্বাশুড়ী মাঝে মাঝে জেগে ওঠে। বাইরে যায়। আবার মাঝে মাঝে রান্নাঘরে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। হাড়িকুড়ি খোঁজে। ভুল করে রান্নাচাপানোর চেষ্টা করে। টুং টাং শব্দ পেলে মীরারানী উঠে তাকে ধরে নিয়ে আসে। 

আজ শ্বাশুড়ী সেরকম কিছু করেননি। বাইরে থেকে এসে দরজাটি ঠিক লাগিয়েছেন। আবার একটু ঘুমিয়ে নিতে পারে মীরারানী। কিন্তু সে উঠে পড়ল। তার এ সময় চায়ের তেষ্টা পায়। রান্নাঘরে গিয়ে চা চাপায়। এরপর রুটি গড়তে হবে। ডাল রান্না করতে হবে। আর নাবড়া। 

এর মধ্যে রান্নাঘরের কাছে পাশের বাড়ির ভুলু কুকুরটি এসে গেল। এসে লেজ নাড়াতে লাগল। ছোট্ট করে ঘেউ ঘেউ শব্দ করল। একটু অবাক হলো মীরারানী। ভুলু কুকুরটি উঠোনে এলে তাদের কালু কুকুরটি শুরুতে তেড়ে আসে। তীব্রভাবে ঘেউ ঘেউ করে ভুলুর সঙ্গে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়। আজ ভুলু এলো বটে কিন্তু কালুর কোনো রা নেই।

মীরারানী রুটি বেলতে বেলতে ডাকে, কালু। কালু। 

কালুর কোনো ফিরতি আওয়াজ পেলো না। বা ছুটে আসার শব্দও এলো না। প্রথম রুটিটি হাতে করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দার দিকে তাকাল। সেখানে কালু নেই। তার দিকে তাকিয়ে মীরারানী ডাকল, কালু, তু তু তু।

তু তু করে ডাকলেই কুকুরটি যেখানেই থাকুক না কেনো ঠিক চলে আসে। আজ এলো না। 

তার মন কেমন কেমন করে উঠল। উঠোনে এসে আবার জোরে জোরে ডাকল , কালু কালু। 

পাশের বাড়ির ভুলু কুকুরটিও তার সঙ্গে গলা তুলে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। 

সে আওয়াজ শুনে শ্বাশুড়ী ঘর থেকে হহুম জড়ানো গলায় বলে উঠল, ও বউ মা, ভুলু ডাকে ক্যান। কালুর ডাক শুনতি পাইতিছি না ক্যান। 

শ্বাশুড়ীর এই কথা শুনে মীরারানী একটু কেঁপে উঠল। তারপর উত্তর করল, কালুরে রুটি দিছি। আপনি ঘুমায় যান। চিন্তা করবেন না। 

ভুলু কুকুরটি তখন বাড়ির চারপাশে ঘুরতে লাগল। নাক শুঁকে শুঁকে বনতুলসী আর বিলাই হেঁচড়ার ঝোঁপের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে মাথা ঢুকিয়ে আবার পিছিয়ে এলো। পিছিয়ে এসে মীরারানীর কাছে ছুটে এলো। তার গা ঘেষে দাঁড়িয়ে ঝোঁপটির দিকে মুখ রেখে তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। 

মীরারানী কাছে গিয়ে দেখতে পেল ঝোঁপের ভেতরে কালু কুকুরটি শুয়ে আছে। জিহবা বের হয়ে আছে। কোনো সাড়া শব্দ নেই। তার ভয় করতে লাগল। চেঁচিয়ে বলতে লাগল, কালু, ও কালু…। 

পাশের বাড়ির একটি চোদ্দ পনেরো বছরের ছেলে এগিয়ে এলো। ঝোঁপের খুব কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, কোনো শ্বাস নাই। মনে হয় মইরা গেছে। 

মীরারানী এইবার সত্যি সত্যি ভয় পেলো। তার বিয়ের পর এই কালুকে এ বাড়িতে দেখে আসছে। তার বেশ যত্ন-আত্তি আছে এ পরিবারে। বাড়ির কর্তা কালুকে এনেছিলেন গেদু অবস্থায়। তিনি চলে গেলে শ্বাশুড়ী মানুষটি তার দেখভাল করে। ছোট ছেলে অসিত পড়তে ঢাকায় চলে গেলে কালুতেই আপনজ্ঞান করে চলে। এখন চোখে দেখতে না পেলেও তাকে কানের আড়াল করে না। 

মীরারানী তাকে বলল, মইরা গেছে সত্যি?

—হ। তাই তো মনে হচ্ছে। 

–বের করে আন তো। 

ছেলেটি একটু দোনামোনা করে। বলে, কাকারে ডাকেন। 

মীরারানীর স্বামী নিশীথ বেলা করে ঘুমায়। তাকে ডাকলে বিরক্ত হয়। মুখ খারাপ করে। সেজন্য এখনি ডাকতে চায় না। ছেলেটিকে বলল, কাকারে আননের কাম কি! তুইই বাইর কইরা আন। 

–আমার ভয় করে। বলে ছেলেটি দাঁড়ায় না। চলে যায়। যেতে যেতে বলে, তাইলে আমার কাকারে নিয়া আসি।

ছেলেটি তখনি আসে না। আসবে কিনা অথবা কখন আসবে তার ঠিক নেই। একটু দোনামোনা করে মীরারানী ঘরে গেল। নিশীথ তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। নাক ডাকছে। তার গায়ে কয়েকবার ঠেলে দিতেই চোখ মেলল। চোখ দুটো লাল। আর ঘোর লাগা। ঘড় ঘড় করে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার?

–কালু মনে হয় মইরা গেছে। 

–কে মরছে? অসীত? 

–না। আমাগো কালু। 

–ঝামেলা কইরো না। অসীত হইলে কথা ছিল। 

এরপরে আর কথা নেই। পাশ ফিরে আবার নাক ডাকতে শুরু করল। তার মাথার মধ্যে কালু না অসীত এইসব প্রশ্ন নেই। আছে শুধু ঘুম। বেচারা তাস খেলে ফেরে রাত করে। 

পাশের ঘরে মা মানুষটি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে না। জানালা দিয়ে এক ফালি রোদ তার মুখে পড়েছে। মীরারানী জানালাটি একটু চেপে দিল। এবার পাশের বাড়ির ছেলেটিকে ডাকতে যেতে হবে। তাকে না পেলে অন্য কাউকে। নিজেও মৃত কুকুরটিকে টেনে আনতে পারে। তার শরীরে সে জোর আছে। কিন্তু পোয়াতি বলে সে ছোঁবে না। 

ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে দেখতে পেল ছেলেটি এসেছে। 

ছেলেটার কাকাও এসেছে। সঙ্গে তার ঠাম্মা। 

ঠাম্মার পায়ে সমস্যা আছে। একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। এসে ঝোঁপের দিকে তাকিয়ে বললেন, এ দেহি মইরা গেছে।

তারপর আকাশের দিক চোখ রাখলেন। তারপর মীরারানীর পেটের দিকে তাকালেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর কাকা-ভাতিজাকে বললেন, আর দেরি করিস না। অরে বের কইরা আন। মরা আগানেবাগানে ফেলে রাখা ঠিক না। 

ছেলেটির কাকা কুকুরটির পা ধরে টেনে বের করে আনল। ঠাম্মার দিকে তাকিয়ে কাকা বলল, গা তো এখনো গরম। মরে নাই মনে হয়। 

–কস কি ছোঁড়া। মরছে বলেই তো ঝোঁপের মধ্যে সান্ধাইয়া ছিল। ডাকলে সাঁড়া দেয় না। ভালো কইরা দেখ। দেখ প্যাট নড়ে কিনা। 

ছেলেটি ভালো করে কুকুরটির পেট আর বুকে হাত দিয়ে বলল, ধুক ফুক করছে মনে হয়। 

–মনে হয় কিরে ছোঁড়া। নড়ছে কিনা সেইটা দেখ। 

ছেলেটির কাকা বুকে হাত দিয়ে দেখল। তখনো ধুকফুক করছে। মরেনি। ঠাম্মা মানুষটি এক ঘটি জল এনে কুকুরটির মাথায় ঢালল। একটু নড়ল চড়ল বলে মনে হলো। কিন্তু চোখ খুলল না। 

ছেলেটির কাকা গভীরভাবে চিন্তা করে বলল, চিকিৎসা দিলে কুকুরটি বাঁচতে পারে। 

শুনে ঠাম্মা মানুষটি হেসে বলল, দাদারে, মানসেই চিকিৎসা পায় না, আবার কুকুরের চিকিৎসা। 

এ শহরে একটি পশু হাসপাতাল আছে বটে। সেখানে মুরগির টিকা পাওয়া যায়। আর গরুর কিছু চিকিৎসা মেলে। কিন্তু এ ধরনের ছাড়া কুকুরের চিকিৎসা মেলবে কিনা সন্দেহ। আর কুকুরের চিকিৎসা কে বা করেছে আগে। তাছাড়া এ বাড়ির লোকজন কুকুরটিকে নিতে দেবে কিনা সে জানে না। বেশ জটিল অবস্থা। তবু কাকা মানুষটি হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটে গেল। আগে ডাক্তারের খোঁজ নেভে। তারপর কুকুরের চিকিৎসা। 

ততক্ষণে ঊঠোনে ভীড় জমে গেছে। এই ভোরের হাওয়ায় মধ্যে সামান্য রোদ উঠেছে। শিউলিগাছটি থেকে ফুল ঝরে পড়ছে। তার মধ্যে কুকুরটি মরতে বসেছে। হয়তো মরেই গেছে। এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। 

কুকুরটির বয়েস হয়েছিল। এ বাড়ির বাবা মানুষটি তালতলা থেকে ফেরার সময় পথ থেকে কুকুরটিকে কুড়িয়ে এনেছিলেন। প্রতিদিন তিনি বারান্দায় খেতে বসতেন কাঁঠাল কাঠের পিড়িতে বসে। তার পরনে ধুতি। খেতে বসেই হাঁক পাড়তেন, কালু কালু। যেখানেই থাকুক না কেনো কালু কুকুরটি সেই হাঁক শুনে ছুটে আসত। লেজনেড়ে একবার শুধু বলত, ঘেউ। এগুলো সবাই জানে।

বুড়ি ঠাম্মা মীরারানীকে বলল, অবস্থা তো ভালো ঠেকছে না। তোমার শাউড়িরে ডাকবা নাকি?

মীরারানী খুব নিচু স্বরে উত্তর দিল, মারে ডাকনের দরকার নাই। তার শরীরটা খারাপ। কালুরে এই অবস্থায় দেখলে কী হতে কী হয়।

–তাতো বুজলাম বৌমা। কিন্তু অখনতরি না মরলিও বাঁচনের কোনো লক্ষ্মণ দেখি না। তবুও যদি সায়েম কবিরাজ থাকত। তাইলে তিনি ঠিক ঠিক একটা বিহিত কইরে ফেলতি পারতেন। সায়েম কবিরাজ একবার তু করলিই হইত। যমরাজের হাত থিকা ছুইটা আসত। 

উপস্থিত লোকজনের কেউ কেউ মাথা নাড়ে। কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সায়েম কবিরাজ চলে গিয়ে এলাকার লোকজনরে বিপদে ফেলে গিয়েছেন। তার কোনো পোলাপাইনও নাই যে তার এলেম ধরে রাখবে। শুধু ডাক্তারের উপর ভরসা করে চলে না। 

পাঁচুর বাপ নামের প্রতিবেশি লোকটি নিচু হয়ে কুকুরটির গায়ে হাত দিল। হাত দিল বুকের কাছেও। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, আর ভরসা নাই। কালু অনেক আগেই মইরা গেছে। কিন্তু–

এই কিন্তু শব্দটি শুনে সবাই কৌতুহলী হয়। পাঁচুর বাপে যা-তা কথা বলে না। কথার ওজন আছে। বলল, কিন্তু আমি ভাবছি কুকুরডা মইরা গেল কেমনে? মরনের তো সময় হয় নাই। কাল রাতেও বাড়ির ফেরার সময় কালুর ডাক শুনছি। ডাকের মধ্যেও তো খারাপ কিছু মনে হয় নাই। সাপেটাপে কাটল নাকি? 

পাঁচুর বাপে কালুর চার পা-ই ভালো করে দেখল। সাপে কাটলে ক্ষত থাকত। রক্তচিহ্নও দেখা যেতো। সেটা নেই। নেই দেখে ঠাম্মা মানুষটি হাফ ছেড়ে বাঁচল। বলল, বাঁচাইছে। সাপে কাটে নাই। কাটলি ওঝাকে ডাকন লাগত। ওঝা এক সময় ছিল বটে। বেচারা বেশ ক বছর আগে দেশ ছেড়ে চলে গেছে। এখন কেউ নেই। লোকজনের মনে সব সময় একটা ভয় ভয় করে। ভরসা করার মতো কেউ নেই। 

পাঁচুর বাপ ঠাম্মার কথাটি শুনল বটে কিন্তু তাতে বিশেষ খুশি হতে দেখা গেল না। তার কপাল কুঁচকে গেছে। খুব চিন্তিতভাবে বলল, তাইলে তো এটা মার্ডার কেস। 

মার্ডার কেস শুনে কেউ কেউ হেসে উঠল। কেউ কেউ হাসি গোপন করল। আবার কেউ কেউ বলে উঠল একালে তো মার্ডার কেস হয় মানুষের। কুত্তা বিড়ালের মার্ডার কেস হয় কিবা? 

–হয় না কেন? হয়। হয়। পাঁচুর বাপে উত্তর দিল। তোমাগো তখন জন্ম হয় নাই। হেইপাড়ায় বিমল সাহার বাড়ি ডাকাতরা এসে ডাকাতি করতি পারে না। রাতে বাড়ির মধ্যে ঢুকলেই তাগো পোষা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করে। সাহাবাবুর বাড়ির সবাই জাইগা ওঠে। বিপদ বটে। শেষে একদিন ডাকাতরা কুকুরডারেই মাইরা ফেলল। তারপর আরেকদিন তারা ডাকাতি করল। 

–কুকুরডারে মারনের কালে চেচামেচি করে নাই?

–করবে কিভাবে? তারা তো খাবারের লগে বিষ দিছিল। একদম মুখে কোনো রা নেই। ছাপা হয়ে গেল। 

শুনে মীরারানী পুরোটা বুঝতে পারে না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ঠাম্মা মানুষ ফ্যাল ফ্যাল করার মানুষটি নয়। তার মাথায় চিন্তা আসার সঙ্গে সঙ্গে মুখ দিয়ে বের করে। জিজ্ঞেস করল, সেইডা তো- বুঝলাম পাঁচুর বাপ। কিন্তু আসল কথাডা কও। এই কুকুররে বিষ দেওয়ার পেছনে অন্য কোনো ঝামেলা থামকি পারে কিনা কও। 

এবার পাঁচুর বাপ মাথা চুলকায়। কী বলতে কী বলবে ঠাওর করতে পারছে না। লোকজন তার দিকে চেয়ে আছে। ঠাম্মা মানুষটিও নাছোড়বান্দা। যতক্ষণ না যুত মতো জবাব না পাবে ততক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করেই যাবে। এমনকি তার বাড়ি গিয়ে হাজির হবে। পালিয়েও উপায় নেই। মধ্যরাতে ঘুম থেকে ওঠাবে। বলবে, ও পাঁচুর বাপ, কথাডা তো শ্যাষ করলা না। না শুনতি পারলি তো খাওন দাওনও করতি পারছি না। নিন্দও পাড়তি পারছি না। ভয়ানক জ্বালা। 

বুড়ির কাছ থেকে নিস্তার পেতে কিনা জানি না, পাঁচুর বাপ বলে, বিষ দেওয়ার অনেক কারণ থাকতি পারে। পয়লা–কুকুরডারে মাইরা ধরেন যে ডাকাতি করন সোজা। তারপর ধরেন যে খুব ভয় দেওন যাতে এই বাড়ির লোকজন বাড়িটা ছাইড়া যায়। অথবা খুব কম দামে বাড়িডা বেঁইচা দিতে বাধ্য হয়। 

–দুসরা হলো… 

বলতে গিয়ে পাঁচুর বাপে থেমে যায়। মুখে তার কথা সরে না। বার কয়েক এ বাড়ির মীরারানির দিকে তাকায়। তাকে অপাঙ্গে দেখে। তারপর বুড়ির কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, এই বাড়ির কর্তামশাই নাই। বড় ছাওয়ালের চাকরি করে বটে, তবে ঘরসংসারে মতি নাই। রাতে মদ গিল্যা আইসা ফোস ফোস কইরা নিন্দ পাড়ে। ঘরবাড়ির কী হইল কি হইওল না– তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ছোট ছাওয়াল বাড়ি নাই। লক্ষ্মীমতি বৌডা ভারী সুন্দর। ভগবান না করুক, এই বৌডারেও লুট কইরা লইতে পারে। বলা তো যায় না। দিনকাল খারাপ। নাকি কন!

শুনে সবাই একটু নড়েচড়ে ওঠে। তারা নিজ নিজ পরিবারপরিজনের কথা ভাবে। আর মীরারানী হঠাৎ একটা বড় শূণ্যতা বোধ করে। তার হঠাৎ করে শীত শীত লাগতে শুরু করে। 

তেশরা…

ঠিক তেশরা কথাটি পাঁচুর বাপে বলে, এইটা পুলিশ কেস। 

শুনে সবাই সমস্বরে বলে ওঠে, পুলিশ! 

– হ্যাঁ পুলিশ। এই বাড়ির কুকুরটা হুট করে বেঘোরে মারা গেছে। তার তো মারা যাওয়ার কথা নয়। দিব্যি জলজ্যান্ত কুকুরটি। কথাবার্তা নাই ঝোঁপের মধ্যে মৃত পাওয়া গেল। এটা সোজা ব্যাপার নয়। কেউ না কেউ মেরেছে। এটা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ। মার্ডার কেস। 

মার্ডার কেসে শাস্তি ফাঁসি। গলায় দড়ি ঝুলিয়ে মেরে ফেলবে। শুনে সবাই এবার সত্যি সত্যি সত্যি বিচলিত হয়ে ওঠে। কী করবে ভেবে পায় না। কিন্তু এখানেও কেউ দাঁড়ানোর সাহস পায় না। সবাই মিনমিন করে কেটে পড়ার চেষ্টা করে। সেটা দেখে পাঁচুর বাপে ঠা ঠা করে হেসে ওঠে। বলে, চইলা গিয়া লাভ নাই। সবাই সন্দোর লিস্টিতে আছো। কেউ বাদ বাদ যাবা না। 

সবাই থমকে দাঁড়ায়। ফিরে আসে। মাটির দিকে তাকিয়ে পাঁচুর বাপ এবার মিটি মিটি হাসে। তারপর গম্ভীর হয়ে বলে, দিনকাল খারাপ বাবা। এখন কোনো রিস্ক নেওন ঠিক নয়। তয়–

কাকপক্ষী জানার আগে এইটারে হাপিস করে দিতে হবে। 

–কিন্তু কেউ কেউ তো জেনে গেছেই। কেউ কেউ তো জানবেই। 

–সেইটা নিয়ে ভাইবো না। তার একটা ব্যবস্থা হবে। বলে পাঁচুর বাপে দু আঙ্গুলে টাকার সঙ্কেত দেখায়। তারপর বলে, এইটা দিও কিছু কিছু। 

–একটা কুকুরের জন্য এতো কাণ্ড! বুড়ি বলে।

এইবার একটা বিড়ি ধরায় পাঁচুর বাপে। দুটো সুখটান দিয়ে বলে, কুকুর তো কুকুর, মাছি মারলেও মার্ডার কেসে ঠেস দিতে পারে পুলিশ। তা তোমরা যদি না চাও আমি তাইলে যাই। ঝামেলা হইলে আমারে কিছু কবার পারবা না। 

পাঁচুর বাপে সত্যি সত্যি বিড়ি টানতে টানতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যেতে গেল। সেটা দেখে লোকজন চঞ্চল হয়ে উঠল। ঠাম্মা বুড়ি মানুষটি এক তীব্র বেদনা মিশিয়ে পাঁচুর বাপের নাম ধরে ডেকে উঠল। ছুটে গিয়ে তার হাত ধরল। বলল, রাগ করিস ক্যান পাঁচুর বাপ। তুই না দেখলি কেডা দেখবি! তার চেয়ে ক কী করণ যায়।

একথার পরে আর কোনো কথা নেই। পাঁচুর বাপে কুকুরের কাছে যায়। ঝোঁপের কাছে যায়। দুটো ছেলে কুকুরটাকে দ্রুত টেনে আবার ভেতরে নিয়ে যায়। কে একজন কোদাল নিয়ে সেখানে গর্ত খুড়তে শুরু করে। পাঁচুর বাপে সেদিকে তাকিয়ে বলে, কুকুরডারে গর্তে পোতো। তারপর ডাকাত আর পুলিশরে ঠাণ্ডা করণ। সেইডা আমি দেখবো। দিনকাল খারাপ। 

বুড়ি এবার এ বাড়ির বৌ মীরারানীর কাছে যায়। বলে, ও নাত বৌ, সের খানেক লবণ আন। কুকুরডারে মাটি দেওনের সময় গর্তের চারদিকে ছিটায় দিতি হবে। নইলে যে ভুত হইতে পারে। শুড় শুড় করে ঘরে চলে আস্তি পারে। প্যাটে তোর বাচ্চা। 

লবণ আনবে কি আনবে না এটা নিয়ে ভাবনার আগে মীরারানীর মনে হলো, সবার আগে শ্বাশুড়ি মাকে সবার আগে মৃত্যু সংবাদটি জানানো দরকার। শেষবার তাকে অন্তত চোখের দেখাটা দেখানো দরকার। যদি দেখানো না হয় তবে পরে হয়তো যখন কালু কুকুরটার খোঁজ করবে হয়তো তখন কালুকে না পেয়ে, কালুর মৃত্যু খবরটি পেয়ে, কালুর যে মৃত্যু হয়েছে এ খবরটি সময়মতো জানানো হয়নি এটি বুঝতে পেরে তিনি হয়তো গভীরশোক পাবেন, হয়তো এজন্য তিনি ছেলে বৌকেই দায়ী করবেন, ছেলেবৌকে অভিশাপ দেবেন, সে অভিশাপে যদি তার পেটের সন্তানটির কোনো ক্ষতি হয় তবে তার জন্য ভবিষ্যতে দু:খের আর শেষ থাকবে না। 

এই ভেবে মীরারানী পায়ে পায়ে ঘরের দিস্কে গেল। ঘরে ঢোকার আগে খোলা জানালা দিয়ে দেখতে পায় শ্বাশুড়ি মানুষটি হা করে করে আছেন বিছানায়। রোদ পড়েছে তার গালে–মাথায়। একটা মাছিও ভ্যান ভ্যান করে উড়ছে সেই মুখের কাছে। চোখ বন্ধ। আচমকা মীরারানীর আতঙ্ক হয়। দরোজা দিয়ে দ্রুতপায়ে ঘরে ঢোকে। কাছে গিয়ে শ্বাশুড়ির নাকের কাছে আঙুল রাখে। বুঝতে চেষ্টা করে তার শ্বাস আছে কি নেই। দেহে প্রাণবায়ুর আছে কি নেই। মনে হয়, নেই। শ্বাস নেই। প্রাণবায়ু উড়ে গেছে। শুনে তার নিজের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। চিৎকার করে উঠতে যাবে, তখনি শ্বাশুড়ি মার বাঁদিকে্র চোখটি সামান্য খোলে। আর বলে ওঠেন, কালুরে খাইতে দেছো বৌমা? 

এই কথা শুনে মীরারানীর শ্বাস আবার ফিরে আসে। কালুর মৃত্যু সংবাদটি তাকে দিতে ভুলে যায়। বা বলতে আর ইচ্ছে করে না। তার বদলে বলে, খাইছে মা। সব চেটেপুটে খাইছে। 

শুনে শ্বাশুড়ি মা আবার চোখ করেন। পাশ ফিরে শোন। গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে বলেন, কালুরে যত্ন নিও বৌমা। নইলে অগো বাবা কষ্ট পাবে। 

কালু কুকুরটির জন্য কবর খোড়া প্রায় শেষ হওয়ার পথে, তখন পাশের বাড়ির ভুলু কুকুরটি একটু দূরে আমলকি গাছের তলায় মাটিতে থুতনিতে মুখ রেখে আর্তনাদ করে উঠল। সে আর্তনাদ এমনভাবে করতে থাকে তা যেন আমলকি থাকের নিচ থেকে নয় যেন তা বহু দূর থেকে ভেসে আসছে মনে হয়। সেটা শুনে ছেলে দুটো কোদাল নামিয়ে রাখে। কপালের ঘাম মোছে। সবাইকে ডেকে বলে, তাইলে এবার কালুরে নিয়া আসেন। দেরী কইরেন না। 

এ সময়ে বিশ্বাসবাড়ির উঠোনে পাড়ার অনেক মানুষ কোনো না কোনোভাবে খবর পেয়ে চলে এসেছে। দাঁড়িয়ে তারা কালু কুকুরটিকে নিয়ে হায় হায় করতে থাকে। তারা এই হায় হায় করতে করতে কালু কুকুরটির কর্তা মশাইকে নিয়ে কথা বলে। বলে কর্তা মশাই থাকলে কুকুরটি এরকম বেঘোরে মারা পড়ত না। কর্তা মশাই শুধু এই কুকুরটিকে নয় পাড়ার তাবৎ লোকজনকেই দেখেশুনে রাখত। কোনো ঝামেলা ঘটার সুযোগ পেতো না। এইসব গুণগুণানি শুনে পাঁচুর বাপে একটু হৈচৈ করে ওঠে। বলে, এইরকম লোকজন আসতে থাকলে তো বিপদ। পুলিশ কিংবা ডাকাত, ডাকাত কিংবা পুলিশ কাউকেই তো ম্যানেজ করন যাবে নানে। 

শুনে বুড়ি ঠাম্মা বলে ওঠে, ট্যাকাটুকা যখন নিচ্ছ বাপা তুমি ওগো মুখ থামাতে, তাইলে আমাগো একটু মন খুলে কান্নাকাটি করতে দেবা না কেনো! 

বুড়ির একথার পরে পাড়ার লোকজন মনে করতে পারে কর্তামশাই মারা গেলে তাকে ঘিরে নামগান করেছিল। গানে গানে মাতম তুলে দিয়েছিল। কর্তামশাইয়ের কালু কুকুরটির মৃত্যুতেও তারা চুপ করে থাকতে পারে না। তার বেলায়ও নামগান করতে হাউস করে। তারা কালু কুকুরটিকে উঠোনের মাঝখানে রেখে ঘিরে ঘিরে নামগান করতে থাকে। দুএকজন খোলকর্তাল নিয়ে আসে। তালে তাকে নেচে নেচে বাজাতে থাকে। 

যখন মাতাম উঠবে উঠবে করবে ঠিক তখনি তাদের ঠেলেঠুলে একটি লোক উঠোনে ঢুকে পড়ে। ঢুকে দুহাত প্রসারিত করে মাঝখানে দাঁড়ায়। লোকটি আর দশজনের চেয়ে একটু লম্বা আর ঢ্যাঙ্গা বলে সবার মাথার উপর দিয়ে তার মাথা ছাড়য়ে যায়। তাকে হেলা করা যায় না। কিন্তু সবাইকে হেলা করে একটা ঠোঙ্গা থেকে দুমুঠ মুড়ি মুখে দেয়।মচর মচর করে চাবাতে থাকে। আর তার লম্বা জুলফির পাশে রগ জেগে ওঠে। 

সবাই তাকে দেখে চুপ মেরে যায়। হাওয়াও যেন থেমে যায়। আমলকি গাছের পাতা নড়ে না। কে একজন ছোট্ট ছেলে ছোট করে চেচিয়ে উঠতে গিয়ে চুপ মেরে যায়। এমনকি আমলকি গাছে নিচের ভুলু কুকুরটিও থাবা থেকে মুখটি তোলে। পিটপিট করে লোকটার পানে চায়। তবে বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে না। একবার আস্তে করে হলেও শব্দ করে বসে, ঘেউ। 

আর এই ঘেউ শব্দ শুনেই উপস্থিত লোকজন বুঝতে পারে, তারা সহসা চুও মেরে আছে। এরকম চুপ মেরে যাওয়াটা তাদের চৌদ্দ পুরুষের ইতিহাসে নেই। কিন্তু কেনো জানি আজ সেই ইতিহাসটাই তাদের অজান্তে ভেঙ্গে গেছে। নিশ্চয়ই তাদের জগৎ কোনো এক বিচিত্র কারণে পাল্টে গেছে। তার নজির এই লম্বা ঢ্যাঙ্গা জুলফি পাকা লোকটা। তাদের সন্দেহ হয় এই লোকটি আসলে সত্যি নয়। বিভ্রম মাত্র। বিভ্রম যে তা সত্যি প্রমাণ করতে এদের মধ্যে কে একজন জিজ্ঞেস করে, অথবা জিজ্ঞেস করতে যায়, ভাই–আপনের হাল সাকিন কোথায়? 

এই জিজ্ঞাসাটা করে অথবা করতে যাবে ঠিম এ সময়েই তার চোখের দিকে লোকটা তাকায়। সেই চোখে অদ্ভুত এক আগুণকে দেখা যায়। আর সেই আগুণ দেখা মাত্রই তার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হয় না। কেবল অপেক্ষা করে। 

আর তখনি লোকটির মুড়ি খাওয়া শেষ হলো। সবাইকে

উদ্দেশ্য করে লোকটি বলে, একটি খবর এনেছি।

লোকজন এবার বেশ কৌতুহলী হয়। কিন্তু সে কৌতুহল প্রকাশ করার সুযোগ ঘটে না। লোকটি বলে, ঢাকায় মিলিটারি নেমেছে। 

মিলিটারি যে নেমেছে এটা সবাই জানে। এই দেশে মাঝেমধ্যেই মিলিটারি নামে। শুরু হয়েছিল আয়ুব খানকে দিয়ে। তিনি দশ বছর ছিলেন। তারপর ইয়াহিয়া খান। পঁচাত্তরে জিয়া। তারপর এখন এরশাদ। কথায় কথায় তারা ডাণ্ডাবাড়ি দেয়। পাবলিকের কোনো দামই নেই তাদের কাছে। লাগলে পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারতে দেরি করে না। তাদের মুখের কথাই আইন। 

লোকটি আবার বলে, ঢাকায় ছাত্র মিছিলে এবার এরশাদ ট্রাক তুলে দিয়েছে। অনেক ছাত্র মারা গেছে। 

এখবরটি গত কালকের। এরা সবাই জানে। বিবিসির খবরে শুনেছে। তবু লোকজনের মধ্যে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। এগুলো মিলিটারি শাসকদের কাছে এইসব জলভাত। 

সেটা বুঝতে পেরে লোকটি একটু অবাক হয়। বেশ কিছুক্ষণ সবার চোখের দিকে তাকায়। তারপরে বলে, এ শহরের একজন আছে মৃতদের লিস্টে। 

এবার লোকজন নড়েচড়ে বসে। তারা এটা জানত না। তারা এবারে বলে ওঠে, কে, কে–কী নাম তার? 

এ শহরের বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রী ঢাকায় পড়ে। এ শহরের সবাই সবাইকে চেনে। ফলে মৃত ছাত্রটি তাদের পরিচিতই হবে। এমনকি স্বজনও হতে পারে। তারা আতঙ্কিত বোধ করে। 

লোকটি বলে, অসীত। 

এবারে বুড়ি ঠাম্মা মানুষটি কথা কয়ে ওঠে, কী নাম কইলা?

–অসীত। অসীত। 

–কোন অসীত গো বাবা?

–অসীতবরণ বিশ্বাস। এ বাড়ির অসীত। 

শুনে মাটিতে আছড়ে পড়ে বুড়ি ঠাম্মা। চেচিয়ে ওঠে, আমাগো অসীত! ও বাবাগো। একি হইল রে বাপ। 

মীরারানী রান্নাঘরে ডাল সম্বরা দিচ্ছিল। চেঁচানি শুনে ছুটে যায় ঘরের মধ্যে। স্বামী নিশীথ তখন গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তাকে ঠেলা মেরে জাগায়। জানায়, অসীত মইরা গেছে। 

নিশীথের পুরোপুরি জাগে না। তার চোখ বন্ধই থাকে। জড়ানো গলায় বলে, কে মইরা গেছে?

–অসীত। আমাগো অসীত। 

এবারে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে পাশ ফেরে নিশীথ। আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে উত্তর করে, অসীত। এইবার নিয়ে পাঁচবার মরল। যাও। বিরক্ত করো না। ঘুমাইতে দেও। 

শুনে মীরারানী সেখানে দাঁড়াল না। আরো ডাকলে লোকটার মেজাজ বিগড়ে যাবে। হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গালিগাজাজ করবে। শেষ দুচার ঘা দিয়েও বসবে। এখন সে গর্ভদশায় আছে। ঘা খেলে পেটেরটার বিপদ হতে পারে। তাই সে সোজা শ্বাশুড়ির ঘরে গেল। 

শ্বাশুড়ি জানালার কাছে কান ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উঠোন থেকে লোকটার কথা শুনছে। 

লোকটা বলছে, গুলিস্থান ফুলবাড়িয়া বাস স্ট্যান্ডের কাছে ছাত্ররা মিছিল করছিল। তখন পুলিশ মিছিলের উপর ট্রাক চালিয়ে দিয়েছে। কালকে। বেশ কজন মারা গেছে। আরো কজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। পুলিশ লাশগুলো নিয়ে গেছে। দুজনের নাম গেছে। সেলিম আর দেলোয়ার। 

– তাইলে আমাগো অসীত? অসীতের কী হইল? সে কি মরা নাই? 

–অসীত মরে নাই। আবার মরছে। ট্রাকের ধাক্কা খেয়ে অসীত রাস্তা থেকে একটু দূরে ছিটকে পড়েছিল। পুলিশ তাকে দেখতে পায়নি। আহত অসীতকে দ্রুত সরিয়ে বস্তির ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তখনও অসীত জীবিত। হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। পুলিশ পাহারা দিচ্ছিল। অসীত বস্তির মধ্যে একটা ঘরে মারা গেছে। 

সবাই রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল। তাদের মনে হয় এটা কোনো সত্যি ঘটনা নয়। কোনো কিস্যাই হবে হয়তো। মরা মানুষটার জন্য তাদের চোখ থেকে জল ঝরে। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। 

শুধু বুড়ি ঠাম্মা জিজ্ঞেস করে, লাশটা কই? লাশটা আনলা না?

এবারে লোকটি গলাটা একটু খাদে নামিয়ে বলল, লাশটা বস্তিতেই আছে। বরফ আর চা পাতা দিয়ে ঢাকা আছে। পুলিশ ঘুরছে লাশের খোঁজে। মিলিটারি ঘুরছে। লাশ আনা যাবে না। 

একটু থেমে লোকটি আবার বলে, 

পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আনতে হবে। কাজটা সোজা না। টাকাকড়ি লাগবে। এইজন্য আমি আসছি। টাকাকড়ির ব্যবস্থা করেন। দেরী করা যাবে না। দেরি করলেও পুলিশ টের পেয়ে যাবে। লাশটা নিয়ে যাবে। কোথায় মাটি চাপা দেবে– কেউ জানবেও না। অথবা শিয়াল কুকুরের ভোগে যাবে। 

শুনে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মীরারানীর শ্বাশুড়ি কেঁদে ওঠেন। মাথা ঝাঁকিয়ে বলে ওঠেন, আমার অসীত। আমার অসীত। 

মীরারানী তাকে ধরে বিছানার উপরে বসায়। জড়িয়ে ধরে রাখে। তার কান্না শুনে নিশীথ ঘুম ভেঙ্গে উঠে আসে। মায়ের কাছে এসে বলে, কানতেছ কেনো। অসীত গাজাভাং খায়। কোনোদিন মিটিং মিছিলে যায় নাই। সে কেনো ছাত্রমিছিলে মরে যাবে? কাইন্দো না। ট্যাকাপয়সা ধান্ধায় নিজের মরার খবর দিয়া লোক পাঠাইছে। এর আগেও এইরকম তিনবার করছে। টাকা নিছে। কিন্তু মরে নাই। এইবারও মরে নাই। আমি দেখতেছি। 

বলে নিশিথ উঠোনে এলো। লোকটিকে ধমক মতো দিতে যাবে। ঠিক তখনই নিশিথকে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার একটি সংবাদপত্র দেখায় লোকটি। পত্রিকাটি আজকের। লেখা–

১৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৪। ছাত্র মিছিলে সামরিক জান্তার ট্রাক : নিহত ২। আহত বহু। 

একটি বড় ছবি। ছবিতে ট্রাক, ছত্রভঙ্গ ছাত্র, পুলিশ লাশ ছিনিয়ে নিতে ব্যস্ত। 

নিচে তিন কলামে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ। 

এই খবর আর ছবিটি দেখে আর কোনো কথা বলে না নিশিথ। হাটু ভেঙে বসে পড়ে। তার কাছে ছুটে আসে বুড়ি ঠাম্মা মানুষটি। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, 

কান্দিস না রে নিশীত। অসীত ছেলেটা ভালো ছিল। তোর এখন অনেক দায়িত্ব। ছেলেটারে আনার ব্যবস্থা কর। 

উঠোনের লোকগুলো শুরুতে বেশ হৈচৈ করে ওঠে। এভাবে ট্রাক উঠিয়ে ছাত্র মেরে ফেলার ব্যাপারে ক্ষুব্ধ হয়। মনে হয় এক্ষুণি লাঠি হাতে রাস্তায় নেমে পড়বে। তছনচ করে ফেলবে সরকারি অফিস আদালত। এই যখন অবস্থা সবচেয়ে উত্তেজিত লোকটি তার পাছায় একটি বিষ পিঁপড়ের কামড় টের পায়। সেখানে খাঁজুনি দিতে গিয়ে টের পায় সেটা পিঁপড়ের কামড় নয়–একটি কঞ্চির আগার খোঁচা। খোঁচাটি দিয়েছে পাচুর বাপে। তাকে ইশারায় কাছে আসতে বলে। তার কানে কানে বলে, বাপজান তুমি যে বেশি বেশি ফাল পাড়তেছ, মিলিটারি কী জিনিস বুঝতি পারতেছ? হেরা না পারে এমন কোনো কাজ নাই। আয়ুব খানের মিলিটারি তোনার ঠাকুরদার কান কাইটা দিছিল শোনো নাই? ইয়াহিয়ার মিলিটারি তোমার মামাবাড়ির লোকজন্রেপাখির মতো গুলি করে মানুষ মারছিল ভুইল্যা গেছ? পঁচাত্তুরে শ্যাখ সাহেবরে পরিবার শুদ্ধা মাইরা ফেলল দেখো নাই? যতদিন খুশি ক্ষমতা দখল করে পারে। তাগো কথাই আইন। 

তখন উত্তেজিত লোকটি থামে। মিইয়ে যায়। জিজ্ঞেস, তাইলে?

–তাইলে আরো আছে। পাচুর বাপে বলে, লাশ লুকোছাপা করে আনতে হবে। পুলিশ খবর পেলেই নিয়ে যাবে। তারপর ধরো যে, এ বাড়ির লোকজনরে ধরে নেবে। আর তোমরা যারা ফাল পাড়তেছ তোমরাও রেহাই পাবা না। তোমাগোও পিঠমোড়া দিয়া বাইন্ধা নেবে। তারপর ধরো ডাইরেক্ট গুলি– চাইলে ব্যায়ানেট মেরেও ফিনিস করতে পারে। আর যদি কাউরে কাউরে না মারে তবে তারে হাতপা ভাইণহগা যাবজ্জীবন জেলে দেবে। হেরা যা কিছু তাই করতে পারে। তাগো কথাই আইন। 

একথার পরে উঠোন থেকে একে একে সবাই চলে যায়। উঠো এ শুধু পড়ে আছে কুকুরটি। বাতাসে তার লেজটি সামান্য নড়ে। কানটাও একটু কেঁপে ওঠে হয়তো। আগন্তক লোকটিকেও আর দেখা যায় বা। হতে পারে লোকটি উঠোনে ছিল না। হয়তো আদৌ এ বাড়িতে আসেনি। এ শহরেই বোধ হয় তাকে কেউ আসতেই দেখেনি। 

অশ্বত্থগাছ থেকে একটা কালো কাক উড়ে আসে। কুকুরটির কাছে আসে। তার কানের লতিতে কয়েকটি ঠোক্কর দেয়। আর তক্ষুণি কুকুরটি গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। কাকটিকে তাড়া করে। কাকটি কা কা রবে উড়ে যায়। সেটা শুনে মা মানুষটি বৌটিকে ধরে কেঁপে ওঠে। আর কুকুরটি হঠাৎ করে রাস্তার দিকে চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে ছুটে যায়। 

এই ফাঁকে বাড়ির মধ্যে কে একজন ঢুকে পড়ে হুট করে। তাকে ঘিরেই কালু কুকুরটি আহ্লাদে সোহাগে কুঁই কুঁই করে তার গা ঘষতে থাকে। 

জানালা দিয়ে সে দৃশ্যটি মা মানুষটি অথবা মীরারানী বৌটি দেখেছে কিনা বোঝা যায় না। তবে সেই কে একজন সোজা ঘরে আসে। শিস দিয়ে ওঠে। সেটা শুনে মীরারানী আঁতকে ওঠে। মা মানুষটি বিছানা থেকে উঠে বসে। চেচিয়ে ওঠে, তুই বাঁইচা আছিস অসীত। 

অসীত হাসে। ঘাড় থেকে ব্যাগটা নামায়। বিছানা থেকে উঠে এসে মা মানুষটি অসীতকে জড়িয়ে ধরে। বলে, তুই বাঁইচা না থাকলি আমি বাঁচি

অসীত মায়ের কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে নেয়। তার এখন সিগারেটের তিয়াস লেগেছে। পকেটে হাত দিয়ে প্যাকেট বের করতে গেলে বেশ কয়েকটা টাকা নোট নিচে পড়ে যায়। সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বলে, আমি মরি নাই। কিন্তু কেউ কেউ তো মরছে। 

একথা শোনে কি শোনে নাই বোঝা যায় না। বোঝা গেলেও সেকথাতে কান দেওয়ার বোধ পায় না। বৌমানুষটিকে নিয়ে রান্নাঘরে যায় মা মানুষটি। তার অসীত এসেছে। তারজন্য এখনি ভালোমন্দ রান্না করতে হবে। 

রান্নাবান্না শেষ। খাওয়াদাওয়াও শেষ। বৌটি এটোকাঁটা তুলে ফেলেছে। থালাবাসন কোষণ ধুয়েমুছে তুলে রেখেছে। মীরারানী আয়নার সামবে দাঁড়িয়ে মুখে ক্রিম মাখছে। জানালার দিকে মুখ বাড়িয়ে চেয়ে আছে মা মানুষটি আকাশে অর্দ্ধেক চাঁদ উঠেছে। উঠোনের পাশে হাসনা হেনা ফুল ফুটেছে। তার ঘ্রাণ ভেসে আসছে। 

সেই আধো অন্ধকারে নিশীথ আর অসীত– দুই ভাই দিশি মদ খেয়ে টলতে টলতে ফিরছে। বিড়বিড় করে কীসব বকছে। তাদের পিছু পিছু হাওয়া ঘুরে ঘুরে আসছে।

এরমধ্যে তাদের কানে আসে একটি কান্নার শব্দ। তারা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। অন্ধকারে কান পেতে শোনে। তাদের প্রায় অন্ধ মা কাঁদছে। কাঁদছে ছেলে হারানো শোকের কান্নাটি। তার নিজের ছেলের জন্য নয়। অন্য কোনো মরা ছেলের জন্য। মরা ছেলের মায়ের কান্নাটি আজ এই রাতে কাঁদতে হচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ