সব দেশের একটা যুগ আছে যাকে বলা হয় অন্ধকার যুগ, আর একটি আছে যাকে বলা হয় আলোকের যুগ। বাংলাদেশে অধিকন্তু একটা আছে যা আনাড়ির তোলা ফটোগ্রাফের মতো গভীর অন্ধকার ও উজ্জ্বল আলোকের আকাঙ্ক্ষাহীন মিলনের যুগ। সেই যুগের গল্প একটা বলছি :
অভিমন্যু বসাকের ছেলে গোকুল বাপের ব্যবসায়ে উন্নতি যতটা করলে অবনতি তার চাইতে কম করেনি। অভিমন্যুর ছিল আটপৌরে ঠেঁটি আর বচকানা কাপড়ের ব্যাবসা, পয়সা যা পেত তাতে দিন চলে যেত, এমনকি শেষ পর্যন্ত সে তাঁতিবউয়ের নামে একটা শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করে গেছে। যতদিন পারা যায় গোকুল কাঁধে লাল গামছা দুলিয়ে খুশবু দেওয়া পান খেয়ে নিছক ঘুরে বেড়ানো ছাড়া কিছু করল না। বাপের শ্রাদ্ধশান্তি চুকে গেলে সে যন্তরপাতিগুলি নিজের মতো করে গুছিয়ে নিল; লোকে অবাক হলো দেখে, যে গোকুল অপদার্থ হিসাবে বিখ্যাত হয়েছে সে বাপের আসনে বসে বাপের মতো ঠেঁটি আর বচকানা বুনে যাচ্ছে যেন কতদিনকার অভ্যাস।
লোকে বলে পরিবর্তন তার পরে যেটা হলো তার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল, কাজেই বাপের শোক গা-সহা হতেই গোকুল একদিন তাঁতঘরে সব উলটেপালটে ভেঙেচুরে ফেলল যখন, তখন তারা আদৌ অবাক হলো না। তবু গোকুল তাদের অবাক করল। তিন গুরুবার পার হয়ে যাবার পরে চারের বারে গোকুল বিকেলবেলায় কচি কলার পাতায় কী একটা মুড়ে নিয়ে গ্রামের জমিদারবাড়ির দিকে রওনা হলো। সে জমিদারের কাছে গেল না, গিন্নিমার কাছে গেল না, সোজা গিয়ে উপস্থিত কাজলার (দিঘি) ঘাটে যেখানে জমিদারের নতুন আনা ব্যাটার বউ আর নতুন বিয়ে হওয়া মেয়ে ইশারায় স্বামীর গল্প করছে। গোকুল যখন ফিরে এলো তখন তার হাতে ব্যাটাবউয়ের হাতের দুগাছা রুলি। এই হচ্ছে গোকুলের মসলিন বুনবার প্রথম কথা। গঞ্জে পাঠাবার মতো সরেস জিনিস তার তাঁতে উৎরাত না, বিশেষ করে ফুলের কাজগুলোতে সোনার আঁশ খাটাতে সে পারত না, বড়োজোর শাদা সুতোর বুটি উঠত; আর বহরে সেগুলো শাজাদির দরবারি শাড়ি হতো না, কাজেই রাত্রিতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে কয়েকটি মুহূর্ত ছাড়া বড়ো বেশি কারো চোখে পড়ত না তার কারিগরি; বড়োজোর সকালে কোনো স্বামী দেখতে পেত, রাত্রির শুকনো মালাগাছির সঙ্গে বিছানায় পড়ে আছে মাকড়সার শাদা জালির মতো কী একটা।
গোকুল মাঝারি গোছের গুণী কিন্তু বড়োরকমের খেয়ালি ছিল। বড়ো গুণীর বড়ো খেয়ালে যা ঘটে খেয়াল মিটবার পর তার জের থাকে না। কিন্তু মাঝারি গুণী বড়ো খেয়াল ধরলে, কিম্বা মেজো গুণী মেজো খেয়ালে হাত বাড়ালে খেয়ালের জের অত সহজে মেটে না। সাধারণ ঘরের মেয়ে একরাতে মসলিনের সাত পাক পরলে সকালে বিছানা ছাড়বার সময়ে স্বামীকে না জানিয়ে বিছানার একপাশে আলগোছে মসলিন খুলে রেখে যেতে পারে না, এও তেমনি আরকি। গোকুল তার খেয়ালে জড়িয়ে পড়ল।
শীতের গোড়ায় ইদিল-শাহিতে পরগণার হাট বসত একমাসের জন্য। সব হাটেই সেকালে নানাধরনের পণ্য আসত, পরগণার হাটে কতগুলি বেশি দামি জিনিস আসত। সেসবের জন্য এ হাটের একটা দিক আলাদা করা থাকত। অন্যসব দোকানের পসরা ফুরিয়ে যাবার পর হাটের এদিকে ভিড় লাগত। জমিদারেরা নিজে আসতেন, এমনকি উজিররাও কেউ কেউ আসতেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এদিকে বাঁদি-বান্দার দোকান। টাকা দিয়ে বান্দা পাওয়া যেত জোয়ান, বুদ্ধিমান, কৌশলী, পাঠান, মোবলা, খোজা, হিন্দু যার যেরকম চাই। বাঁদিও পাওয়া যেত মুলতানি, গুজরাটি, আফগানি, শাদা, গোলাপি, শ্যামলা, কখনো বসরা থেকেও আসত। এসব দোকানের বর্ণনা ইতিহাস যা দিয়েছে তার চাইতে ভালো বলা যায় না। আনারকলি, নুরজাহান এসব দোকানের বেসাতি।
গোকুল মসলিন ক-খানা বেচে ফেলেছে, দোকান ছেড়ে সে মেলায় ঘুরপাক খেয়ে বেড়াচ্ছে কী কিনি কী কিনি ভাব। অন্য যে দু-একজন গুণী এসেছে তারাও ঘুরছে। কিন্তু হাটের একটা দিকে সে কিছুতেই ভিড় ঠেলে এগোতে পারছে না। লাঠি বল্লম নিয়ে এক এক দল লাঠিয়াল তো আছেই, খোলা কিরিচ হাতে পাহাড়ের মতো উঁচু ঘোড়ায় চেপে ঝকঝকে সাঁজোয়া পরা সিপাইও আছে কয়েকদলে। গোকুল ভাবল, বোধহয় রাজা মহারাজেরা কেনাকাটা করে এখানে। কিন্তু ভয়ে কৌতূহল চাপা যায় না। মেলার শেষদিন এসে গেল, গ্রামের সঙ্গীরা চলে গেল কিন্তু গোকুলের যাওয়া হলো না। ওদিকের সব দোকান উঠে গেছে, এদিকেরও দু-একটা মাত্র অবশিষ্ট। প্রথমে সিপাইরা গেছে, তার পরে গেল লাঠিয়ালরা। একদিন গোকুল দেখল এবার এগোনো যায়।
একটা মাত্র দোকানই খোলা ছিল, দোকান ভেঙে চলে যাবে বলে একটা চাকর গালিচা পর্দা জড়ো করে গাঁটরি বাঁধছে। কেউ তাকে কোনো প্রশ্ন করল না, অবশেষে সাহসে ভর করে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কীসের দোকান গো?’
বুড়ো দোকানি ফুরসি টানতে টানতে বলল, ‘মাল তো নেই বাপু, আর তুমি কিনবেই বা কী?’
‘যা হয় কিছু, খালি হাতে মেলা থেকে ফিরব?’
‘তা দেখো, বাপু, এদিকে এসো। আমার দুর্নাম গেয়ে বেড়িও না, ভালো মাল নেই, বেছে নিয়ে যাবার পর না পছন্দ এক-আধটা আছে।’ এই বলে ঝানু দোকানি দোকানের ওঁচা ভাঙা মাল হাতখালি করবার জন্য যেকোনো দামে ক্রেতাকে গছানোর ভঙ্গিতে গোকুলকে ডেকে নিল।
পর্দা তুলে গোকুল দেখল কোনো মাল নেই, একটি মেয়ে শুধু বসে আছে, মেয়ে নয়, মেয়ের কাঠামো যেন, শুধু হাড়গুলো দেখা যায় সারা গায়ের শ্যামল চামড়ার নিচে। গোকুল বুঝল কীসের দোকান এটা, কিন্তু হঠাৎ সে বলে বসল, ‘আমি কিনব।’
কেন বলল একথা গোকুল সেদিনও বলতে পারেনি, কোনোদিনই বলতে পারবে না। তার একার সংসারে ঝি-বাঁদির কী বা কাজ। গ্রামের লোকেরা বলে সে খেয়ালে এ কাজ করেছিল। মসলিন বিক্রির টাকা বুড়োর হাতে গুঁজে দিয়ে গোকুল বলল, ‘আমার কেনা হলো।’
পথে দুর্বল রোগা মেয়েটার দিকে চেয়ে চেয়ে কষ্ট যত না হলো তার চাইতে বেশি হলো রাগ। সে যে ঠকেছে, গ্রামের লোকরা আর একবার তাকে বোকা তাঁতি বলবে এ বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ হয়েছে। সমস্ত শরীরে হাড়গুলো নড়বড় করছে। আধময়লা ডুরে ঠেঁটি পরবার ধরনটাই বা কী। চোয়ালের হাড়গুলোর নিচে চোখ ডুবে গেছে, কাঁধের হাড়ের জোড়া পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে। কঙ্কালই হোক, কঙ্কালের গড়নের মধ্যেও একটা ছন্দ থাকা উচিত। যেন কোমর নেই এত সরু জায়গাটা, গোকুল ভাবছিল মচ করে একটা শব্দ হবে, তার পর হু-টুকরো হয়ে যাবে মেয়েটি। সে বললে, ‘আস্তে চলো, বাপু।’ তার মনে হতে লাগল, মুচিরা মাঝে মাঝে যেমন বুড়ো গরু হাঁটিয়ে নিয়ে যায় রাস্তা দিয়ে এও যেন তেমনি। হাতে করে তুলে ফেলে দেবার মতো হলে সে ছুড়ে ফেলে দিত তার বোকামির নিশানা কারো চোখে না পড়ে এমন জায়গায়।
পথেঘাটে বেরুলে লোকে ঠাট্টা করবে এই ভয়ে গোকুল ঘরে বসে তাঁত বোনে, আরকিছু কাজ যাতে হয় সে উদ্দেশ্যে মেয়েটাকে তাড়াতাড়ি সবল করে তোলার জন্য যখনতখন তাকে ধমকে ধমকে খাওয়ায়। মেয়েটা কাঁদে আর খায়, আর মাঝে মাঝে রোদে রাখা লাটাই ঘরে তোলে, ঘরের লাটাই রোদ্দুরে দেয়। গোকুল তার দিকে চেয়েও দেখে না। চোখের কোনায় যদি হঠাৎ কখনো পড়ে, সারা শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে : কী বিশ্রী, কী বিশ্রী।
মানুষ যেমন হঠাৎ একদিন মরতে পারে, তেমনি হঠাৎ একদিন বাঁচতেও পারে।
ভাদ্রমাস। সন্ধ্যার পর থেকে পৃথিবী ভাসিয়ে নিয়ে যাবার মতো বর্ষা নেমেছে। খাওয়াদাওয়া সেরে গোকুল ঘরে বসে প্রদীপের আলোয় হিসাব দেখছে। আজকাল সে বুড়িয়ে গেছে যেন, বাঁদিটাকে কিনে যে লোকসান হয়েছে তাই উশুল করতে গিয়ে সেই যে সে টাকাপয়সার হিসাবে নেমেছে ক্রমশই তাতে জড়িয়ে পড়ছে।
মেয়েটি চট পেতে বারান্দায় শোয়। কদিনের বৃষ্টিতে মাটির দাওয়া কাদা কাদা, তবু তারই মধ্যে সে শুয়ে থাকে। বৃষ্টির তোড় বেড়ে গেলে ক্রমে দেওয়ালের কাছে সরে আসে। সারা শরীর জলে ভিজে যায়, হাঁটু পর্যন্ত কাদা মেখে ঘুমের আশা ছেড়ে কোনো কোনো রাত্রিতে সে দাড়িয়ে কাটায়।
গোকুলের চোখে তন্দ্রা এসেছিল। পরপর তিন-চারবার প্রবল বজ্র গর্জনের সঙ্গে ঝাঁঝাঁ করে বৃষ্টি নামল। বারান্দার দিকের জানলা দিয়েও বৃষ্টির ছাট এসে গোকুলের গায়ে লাগছিল। সেটা বন্ধ করার জন্য উঠে এগিয়ে যেতেই তার কানে কান্নার শব্দ এলো। কে বা কাঁদছে, ভয় পেয়ে ছেলেমানুষের মতো, অসহায় অব্যক্ত কান্না। অদ্ভুত লাগল গোকুলের। অথচ তেমন লাগবার কথা নয়, বাড়িতে আর একটি প্রানি আছে, এই তিমির ঘন দুর্যোগের রাতে বাইরে বৃষ্টির নিরাশ্রয় ধারার মধ্যে। বাঁদি কাঁদে এমন করে মানুষের মতো?
দরজা খুলে দিল গোকুল তবু নড়ে না বাঁদি। অন্ধকারের মধ্যে নজর ঠেলে দিয়ে গোকুলের লজ্জা বোধ হলো। ঘরে ঝুলানো সকালে তাঁত থেকে নামানো শাড়িখানা হাত বাড়িয়ে বাঁদির দিকে এগিয়ে দিয়ে গোকুল ঘরের অন্ধকারে সরে গেল। সেখান থেকে হুকুম করলে বাঁদিকে ঘরের ভিতরে আসতে।
বিছানায় বসে সে ভাবতে লাগল কী বিড়ম্বনায় সে পড়েছে খেয়াল চরিতার্থ করতে গিয়ে। মানুষ, হোক সে বাঁদি, এমন নির্বোধ হয় কী করে? লাথি আর মিষ্টি কথার তফাত বোঝে না। অবশ্য গোকুল পরখ করে দেখেনি, লাথির অপমান বুঝতে হলে খানিকটা বুদ্ধি থাকা দরকার। খিদে পেলে যে খায় না, খিদে না থাকলেও খাও বললেই যে খায়, গোবর ঘেঁটে হাত ধোবার ইচ্ছা হয় না যার, পায়ের নখ উলটে গিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলেও যাকে বলে দিতে হয় হাত দিয়ে চেপে ধরে রক্ত বন্ধ করো সে যে কী পরিমাণ নির্বোধ। শুধু নির্বোধ নয় নির্বাকও।
গোকুল রাগ করে বলল, ‘কাপড় পরেছ, তবে ঘরে আসছ না কেন? ঘরে এসে দরজা দাও, ঘর ভিজে গেল জলে। কী আপদ!’
বাঁদি ঘরে গিয়ে দরজা দিল।
গোকুল রাগ চড়িয়ে বলল, ‘এবার ওই কোণটায় শোও, শুয়ে চোখ বোজো, চোখ বুজে ঘুমাও। আরও বলে দিতে হবে?’
বাঁদি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল, অন্ধকারেও মনে হলো কী যেন বলতে চায় সে।
গোকুল বলল, ‘যাও, শোওগে যাও।’ কিন্তু এ কথার পরও বাঁদি যখন নড়ল না বরং হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল দরজার পাশে গোকুলের মনে হলো বাড়ির কুকুরটির মতো বাঁদিটিও তার। উঠে গিয়ে প্রদীপ তুলে সে দেখল বাঁদির চোখ দিয়ে জল পড়ছে। একটা মিষ্টি কথা বললে তার প্রভুত্ব বোধ হয় খর্ব হবে না, বললে সে, ‘কেঁদো না, বাপু, সবার জীবনই সুখের হয় না।’
বাঁদি উঠে দাঁড়াল। প্রদীপের আলো তার সর্বাঙ্গে পড়েছে। সবজে মোটা মসলিনের অন্তরালে বাঁদিকে দেখে গোকুল নির্বাক হয়ে নিজের থুতনি চুলকাতে লাগল। হাড়ের কাঠামোর উপরে মেদমাংস লেগেছে এ খানিকটা গোকুল প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু কী বিশ্রী কী বিশ্রী করে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া অভ্যাস হয়ে গেছে বলে সে কোনো দিনই এ পরিবর্তনের আভাস পায়নি। বক্ষের বৃত্তাভাস, নিতম্বের বিস্তৃতি, ঊরুর মসৃণতা, আর সব ছাপিয়ে তার চোখ দুটি।
গোকুল কিছু ভেবে না পেয়ে বাঁদির হাত ধরে বলল, ‘ভয় নেই তোমার।’ তার মনে হলো এত করুণ, এত কিশোর! এ কী কখনো ভাবা গেছে এ এত অল্পবয়সি। গোকুলের মনে হলো এত স্নেহ দিতে পারে একে তবু না হয় স্নেহের শেষ, না হয় তা জানানো। বিছানায় বসে গোকুল তাকে পাশে বসাল। বারেবারে বলল, ‘কাঁদিসনে, কাঁদিসনে।’ কোথা থেকে সাহস পেয়ে বাঁদি দুহাতে গোকুলকে আঁকড়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠল।
সকালে তাঁতঘরে গিয়ে গোকুল প্রথমে কিছুক্ষণ এত সুক্ষ্ম কাজ করল যা জীবনে করেনি। মানুষের শরীর যে এত তৃপ্ত হতে পারে কে জানত? শিরা-উপশিরাগুলির শূন্যতা পূর্ণ হয়ে সেগুলি এত স্নিগ্ধ হয়েছে যে মনে হচ্ছে শ্বেত চন্দন মাখা গায়ে ভোরের হাওয়া লাগছে। মনের খানিকটা অংশজুড়ে (গোকুলের মনে হলো বুকে) যে শুভ্রতা কমনীয় হয়ে উঠছিল, স্নিগ্ধ হয়ে উঠছিল; তার একবার অনুভব হলো সেটা শুভ্র ঊরুদেশের ছায়া। ঘরে ফিরে এসে সে দেখল তার শয্যায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে বাঁদি। রাত্রির স্বপ্নের সঙ্গে দিনের আলোর মিল দেখে সে অবাক হলো একটু। গোকুল ফিরে গেল খানিকটা বাদে আবার ফিরে আসবার জন্য।
গোকুলের তাঁতঘর থেকে দিবারাত্রি গান শোনা যায়, যে গান গলানিরপেক্ষ, সুরনিরপেক্ষ, চাষি হলুদে ধান কাটতে যে গান গায় কতকটা তেমনি।
অল্পবয়স যতদিন থাকে মানুষ প্রবীণ গৃহস্থের অনুকরণ করতে ভালোবাসে, যেমন ছোটো ছোটো মেয়েরা করে খেলাঘরে। গৃহকর্তা হয়ে একদিন রাত্রিতে গোকুল বাঁদির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘শোন বলি তোকে। একটা জিনিস আমাদের নেই। একটা ছেলে না হলে যেন চলছে না, তাই নয়। বড়ো খালি খালি, শুধু দুজন।’ বাঁদি বড়ো বড়ো চোখ মেলে চেয়ে রইল মাত্র।
দু-চারদিন বাদে গোকুল কথাটা আবার বললে তাকে, বাঁদি শিউরে উঠে বললে, ‘না।’
‘নয় কেন?’
বাঁদি গোকুলের কাছে সরে এসে থরথর করে কেঁপে উঠল।
কথাটা গোকুল ভুলল না। কখনো বাঁদি না শুনবার ভান করে অন্যদিকে চেয়ে থাকে, কখনো গোকুলের মুখের দিকে চেয়ে নির্বাক মিনতি করে।
বাঁদির ছোটোখাটো শরীরটার মধ্যে একটা ছোটো মন আছে সেটা গোকুলের গলা শুনলে আড়ষ্ট হয়ে যায়। দোকানির তাঁবুতে যত মেয়ে ছিল সবার চাইতে সে ছিল ভীরু। মানুষ দেখলে তার জিভ জড়িয়ে আসে, কথা ফোটে না, স্তম্ভিত হয়ে যায় ভিতরটা।
এক রাত্রিতে বাঁদির করুণ দৃষ্টিতে মন ভিজল না গোকুলের, সে পাশ ফিরে শুয়ে রইল। বাঁদি জানাতে চায় গোকুলকে সুখী করতে না পেরে সে দুঃখী, সেটুকু জানানোর জন্য বাঁদি শব্দ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। গোকুল ধমক দিয়ে উঠল, ‘কী আপদ ঘুমাতে দেবে না।’
সারা রাত বাঁদি বসে রইল, সারা রাত তার চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল। নিজের উপরেও রাগ হচ্ছিল তার।
নিজের ভুল বুঝতে পেরে গোকুল পরেরদিন রাগ করল না। শুধু বলল, ‘আমার মনে হয়, ও তুই পারবিনে, সব মেয়ে পারে না।’
মিষ্টি কথায় বাঁদি অভিমান করে পাশ ফিরে রইল। সামান্যমাত্র, বেশি করতে সে ভয় পায়।
একদিন গোকুল নরম করে বলল, ‘এই দেখ কী এনেছি, এইটে হাতে বেঁধে দিই আয়, সিদ্ধি-থানের মাটি আছে এতে, দেখি তার পরে কী হয়।’
বাঁদি উঠে বসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘হবে?’
‘হ্যাঁ রে হ্যাঁ।’
কিছুদিন পরে বাঁদি গোকুলকে নিজে থেকে বলল, ‘ফকির এসেছে ও গাঁয়ের মাঠে, যাব?’
‘যাবি কেন! ও বুঝেছি। তা তোর বুঝি ভরসা নেই কবচে। কিন্তু কী করে যাবি? সে নাকি সন্ধ্যার পরে একা একা এলোচুলে নতুন শাড়ি পরে যেতে হয়। ভয় করবে রে। ও মাঠে রাতের বেলা গাঁয়ের লোক যেতে ভয় পায়৷ তা আমিও না হয় কিছুদূর সঙ্গে সঙ্গে যেতে পারি।’
‘না। যেতে হয় না।’
‘তাই বলেছে ওরা? যাস তবে তাই।’
বাঁদি গিয়েছিল। নতুন শাড়ি পরে, কপালে খয়ের-টিপ এঁকে, চোখে কাজলের রেখা দিয়ে। যেরকম লোকে বলেছিল ঠিক তেমনি করে এলোচুলে সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হলে সে ফকিরের কাছে গিয়েছিল। যদিও বাড়ি থেকে সাত পা যাবার আগেই সে ভয়ে ঘামে নেয়ে উঠেছিল।
ভোরবেলার একটু আগে সে ফিরে এলো। গোকুল আলো নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। সে বাঁদিকে দেখে চমকে উঠল। কোথায় খয়েরের টিপ, কোথায় চোখের কাজল। পরিক্লান্ত, সর্বহারা দৃষ্টি।
আশঙ্কার সঙ্গে কিছুটা পরিহাস মিশিয়ে গোকুল বলল, ‘ডাকাতের হাতে পড়েছিলি নাকি রে?’
‘না।’
‘ভয় না হয় নাই পেলি, পেয়েছিস কি না আমি জানছি। আহাহা পড়ে গিয়েছিলি সাঁকো থেকে। ঠিক তাই, ঠোঁট কেটে গেছে, এই তো কাপড়ও ভিজে।’
‘না।’
‘রাগ করেছে পাগলি। সত্যি রে আমার জন্যে এত কষ্ট হলো তোর।’
‘না।’
গোকুল বাঁদির হাত ধরে ঘরে নিয়ে এলো; নতুন গামছা দিয়ে হাতমুখ মুছিয়ে শাড়ি পালটিয়ে বিছানায় বসাল তাকে৷
‘আমি জানি। অভিমান হওয়া তোর অন্যায় নয়। আমাকে সুখী করার জনে তুই যে সাহস দেখালি, যে কষ্ট করলি তার পর তোকে প্রবোধ দেওয়া যায় না। তুই বলেই পেরেছিস। আর কেউ তাঁতির জন্মে এতটা করত না।’
‘না, না।’
বাঁদি দু-তিন মাস কথা বলল না, ভালো করে রাঁধল না, খেল না, চুল বাঁধল না। শুধু আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে দিন কাটাল। গোকুল দূরে দূরে থেকে ভাবল, অভিমান করবেই তো বাঁদি, সে কী সোজা কথা রাত করে ওই ভয়ের মধ্যে যাওয়া।
একদিন পাড়া থেকে বেড়িয়ে ফিরে গোকুল বলল, ‘শুনেছিস, তাঁতিবউ, তোর সেই ফকিরটা মরে গেছে। গলায় বাঘে না কীসে কামড়েছিল, তার ঘা-তেই দু-তিন মাস ভুগে ভুগে মারা গেল। ভেবেছিলাম একদিন ভালো করে শিন্নি দিয়ে আসব, হলো না তা।’
বাঁদি দপ করে জ্বলে উঠল, ‘গোরে দেয়নি বোধহয়, যাও যাও, এখনো দিয়ে এসো শিন্নি।’
‘রাগ করলি তুই? দেখ তো কত বড়ো দয়া করেছে ফকির আমাদের। মন্তরে ফল হতেও পারে তো।’
চৌকাঠ চেপে ধরে বাঁদি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেন তার নিজের স্বরের তীব্রতার প্রত্যুত্তরে গোকুলের রোষের আশঙ্কায় তার মুখ বিবর্ণ হয়েছে।
কিন্তু গোকুল রাগ করল না। এমন হয় সংসারে, অনুগৃহিতার একটমাত্র আত্মদানের ফলে তার স্থান অনুগ্রহিতার সমপর্যায়ে উঠে যায়। গোকুল অপ্রতিভ হয়ে পালিয়ে গেল।
একদিন বাঁদি কথা বলল। নিজে থেকে গোকুলকে ডেকে লজ্জায় মুখ লাল করে বলল, ‘হবে, পাবে তুমি এতদিনে।’
তার পর একটু কাঁদল বাঁদি। সারা মুখ বিকৃত হয়ে দুর্বার লবণাক্ত অশ্রুর বন্যা নেমে এলো।
গোকুল বলল, ‘কাঁদ কাঁদ। আনন্দে কান্না পায়।’
তাঁতিদের মধ্যে যারা গোকুলকে খাতির করত তার ওস্তাদির জন্য তারা এলো! ও পাড়া থেকে জোলাদের রহিম বুড়ো এলো জনকয়েক সাকরেদ নিয়ে; যে দোকান থেকে মাঝে মাঝে গোকুলের মসলিন বিক্রি হয় ধনীদের মধ্যে এলো সে।
রাঙা পাড় কোরা ঠেঁটি পরে বাঁদি (এখন সে তাঁতিবউ) বসেছে রকে। কোলে ছোট্ট ফুটফুটে, টুলটুলে একটা ছেলে। গোকুল সকলের সামনে জোড়হাত করে দাঁড়াচ্ছে। সকলে এগিয়ে গিয়ে আশীর্বাদ করছে। গোকুল কারো কথা শুনল না, রহিমবুড়োর পায়ের ধুলো নিয়ে ছেলের মাথায় বারবার মাখিয়ে দিয়ে বলল, ‘দোয়া কোরো, চাচা মিঞা, তোমার মতো হাত হয়।’ একমুখ হেসে বুড়ো বলল, ‘হবে রে হবে, বাপের ব্যাটা হবে।’
সকলে চলে গেলে গোকুল ঘরে গিয়ে বসল। শোবার ঘরের ওদিকটায় একখানা নতুন কাঁঠাল কাঠের চৌকি পড়েছে— সোনার মতো রঙ তার। একরাশ রঙিন কাঁথার ভাঁজ স্তরে স্তরে সাজানো। গোকুল পাড়ার অনেককে বানাতে দিয়েছিল, আজ নিয়ে এসেছে। তাঁতিবউ তখনও বাইরে বসে ছেলে কোলে করে। গোকুল ডাকল, ‘ঘরে এসো বউ, খোকনমণির ঠান্ডা লাগবে।’
তাঁতিবউ হাসে, তাঁতিবউ কথাও বলে।
একদিন সে ছেলে শুইয়ে এসে বসল গোকুলের পাশে। ‘খুশি হয়েছ তুমি?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমাকে এখন আর তেমন করে মনে পড়বে না, তাই নয়।’
‘বাস রে কত কথা শিখেছিস তুই।’
তাঁতিবউ হঠাৎ যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল, বলল, ‘তুমি খুশি হলেই হলো।’
দিন যায়, রাত্রি যায়। গোকুল ছোটো চৌকিখানার কাছে ঘোরে আর ছেলেকে দেখে আর ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচায়, ‘বউ দেখসে দুধ তুলছে।’ কখনো বলে, ‘দেওয়ালা কাটছে দেখে যা রে, দেখে যা। কখনো নিজেই রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে বলে, ‘একটা কথা বলি, হাসবি না। খোকা আমাকে চেনে। আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়ে।’
রাত্রিতেও ওই একই কথা হয়। গোকুল বলে, ‘এই তো উঠে বসবে, চাঁদির একটা গোট বানিয়ে দেব। কিন্তু তোর ছেলে কী ভদ্রলোক ভেবেছিস? ফোকলা মুখের নালে নালে বুক ভরে রাখবে।’
সোহাগের বুক থেকে তাঁতিবউ অনুযোগ করে, ‘দিনরাত তোমার ওরই কথা।’ গোকুল বলে, ‘যার জন্যে ওকে পেলাম সে বুঝি ফ্যালনা।
চাঁদির গোট গড়াল গোকুল, ছেলে কিন্তু উঠে বসবার কোনো লক্ষণই দেখাল না। পাঁচ মাস গেল, সাত মাস গেল, বছর ঘুরে এলো, ছেলে বাড়ল না পর্যন্ত। দেখলে মনে হয় যেন কত কালের বুড়ো, হাসে না পর্যন্ত।
গোকুল বউকে ডেকে বলে, ‘এ কী হলো রে?’
তাঁতিবউ প্রবোধ দেওয়ার সুরে বলে, ‘সেরে যাবে বড়ো হলে দেখো।’
রাতে ছেলে ঘুমায় না। কী একটা কষ্টে সারা রাত কাঁদে, সারা রাত কাতরায়। তাঁতিবউ বাইরে নিয়ে পায়চারি করে বেড়ায়। তাঁতিও উঠে আসে।
তাঁতিবউ বলে, ‘এ কী হলো ছেলে?’
তাঁতি বলে, ‘কপাল।’
ওরা এলো। কবরেজ হেকিম এলো। চিকিৎসা হলো কিন্তু সবাই যেন ছেলের ভ্রুকুটি দেখে ফিরে যায়। শেষে অনেক ধরনা দিয়ে অনেক কষ্টে গোকুল সিদ্ধস্থানের ঠাকুরানিকে নিয়ে এলো। অনেক কথা, অনেক মন্ত্র, অনেক তুক সারা সকাল, সারা দুপুর চলল। সারা দিন না খেয়ে আগুনের কাছে ঠায় বসে থেকে তখন গোকুলের মাথা ঝাঁঝাঁ করছে, তাঁতিবউ ঢলে পড়েছে, দেওয়ালের গায়ে। সন্ধ্যা লাগা লাগা সময়ে সিদ্ধা মুখ খুলে বলল, ‘তুই বউ বদলা, গোকুল। এ বউয়ের রিষ্টি যোগ আছে। এর কাছে ভালো ছেলে তুই সাতজন্মেও পাবি না।’
গোকুল বোধ করি ঝিমিয়ে পড়েছিল, প্রথমবারে তার কানে যায়নি কথাগুলো। সিদ্ধা স্পষ্ট করে বলবার জন্য আবার বলল বউ বদলানোর কথা। এবার লাল চোখ মেলে গোকুল সিদ্ধার দিকে চাইল, তার পর ক্ষিপ্তের মতো চেঁচিয়ে উঠল, ‘বেরো, বেরো। ভণ্ডামি করার জায়গা পাওনি।’
সিদ্ধা চলে গেল। সারা দিনে স্নান-খাওয়া হয়নি তবু সে রাত্রিতে খাওয়ার জন্য কেউ উঠল না। গোকুল যজ্ঞস্থান থেকে একটু সরে এসে মাটিতেই শুয়ে পড়ল। চূড়ান্ত আশাভঙ্গের এমন মূর্তি আর দেখা যায় না। তাঁতিবউ মাটির মূর্তির মতো বসে রইল। ছেলেটা রাত্রিতে কতবার কাঁদল, কেউ উঠেও দেখল না।
ব্যাপারটা গোকুলের দৃষ্টিতে ধরা পড়ল। প্রথমে সে নিজের মন নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তাই যা দেরি হয়েছে— তাঁতিবউ আবার বাক্হীনা হয়ে পড়েছে। দিনকে দিন যেন সে বোকা হয়ে যাচ্ছে। যেন সেই আগের পীড়াটাই তার ফিরে এসেছে। তাঁতি একদিন ডেকে বলল, ‘তুই কি আবার আগের মতো শুধু বোকা হয়ে থাকবি, শুধু কাঁদবি নাকি?’
তাঁতিবউ একটু হেসে পাখাটা নিয়ে বাতাস করতে লাগল।
‘সারা রাত বসে বসে বাতাস করবি নাকি? তার চাইতে ঘুমো না হয়। তোর মনও তো ভালো নেই। শুয়ে থাক আমার পাশে।’
তাঁতিবউ চুপ করে শুয়ে পড়ল৷
গোকুল বলল, ‘কেমন যেন আগের মতো, তোর নিজের ইচ্ছা বলে যেন কিছু নেই, শুতে বললাম আর টুপ করে শুয়ে পড়লি।’
তাঁতিবউ শত অনুরোধেও মুখ তুলল না; গোকুলের বুকে মুখ গুঁজে প্রাণপণে দুহাত দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে রইল।
দিনকে দিন তাঁতিবউ শুকিয়ে যাচ্ছে। গালের হাড় উঁচু হয়ে উঠে চোখ দুটিকে আগের চাইতে বিস্তৃত করে দিয়েছে। চলে যেন না চললে নয়, বলে যেন না বললে নয়৷
একদিন গোকুলের মাথায় খুন চেপে গেল, রাগের মাথায় সে চিৎকার করে উঠল, ‘নিকুচি করি তোর চোখের, কথা বলিস না কেন? জিভ ক্ষয়ে গেছে? চুলের মুঠি ধরে বের করে দেব পাজি কোথাকার।’
তার পর কোঁচার খোঁটে চোখ মুছতে মুছতে নিজেই বেরিয়ে যায়।
এক রাত্রিতে গোকুল শেষ চেষ্টা করবার জন্য তাঁতিবউকে ডেকে নিল। মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে তাকে কোলে করে বসল। দুহাতে মুখ তুলে ধরে অনেকক্ষণ ওর চোখের দিকে চেয়ে থাকল। তার পরে বলল, ‘অন্য বউদের মতো কথা বলতে তুই জানিস না, তা জানি। তবু যেমন বলতিস তুই নিজের তৈরি একটা-দুটো কথা তেমনি বল, বলতে হবে তোকে। বল আমাকে, সত্যি করে বল, আর ভালো লাগে না আমাকে?’
‘লাগে।’
‘লাগে তো? তবে কেন অমন করিস? এ ঘর সংসার কি তোর নয়?’ তাঁতিবউয়ের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
গোকুল ব্যাকুল হয়ে বলল, ‘বল, যা বলতে চাচ্ছিস বল।’
তাঁতিবউ বলল, ‘বউ বদলাও।’
প্রথমে অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে তার পর হোহো করে হেসে উঠল, খুব হাসির কথা যেমন বারবার আবৃত্তি করে তেমনি করে গোকুল বলতে লাগল, ‘বউ বদলা, বউ বদলা...ঘুমা তুই, বদলাতে হয় কি না সে আমি জানি। এই ভেবে বুঝি দিনকে দিন বোকা হয়ে যাচ্ছিস।’
আর একবার কবরেজ, গুনিন ওঝা নিয়ে মেতে উঠল গোকুল। একে পায় তো ওকে ছাড়ে, ওর খ্যাতি শোনে তো ছুটে যায়, ওর একটু দুর্নাম শোনে তো ছাড়িয়ে দেয় ওকে। ছেলেটার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে আর বউকে ডেকে বলে, ‘একটু উন্নতি হয়েছে, না রে?’ বউ সাড়া দেয় না; সাড়া না দিলেও সে নিজেই বুঝতে পারে উন্নতি কিছুমাত্র হয়নি।
এমনি করে ছেলেকে দেখতে দেখতে একদিন গোকুলের খুন চেপে গেল মাথায় আবার। ‘হারামজাদা পাজি, ভাগাড়ের শকুন, বাঁদরের বাচ্চা কোথাকার। যেমন দেবতা তার বরও তেমনি। অমন মরকুটে ফকির না হলে এমন ফল হয় তার মন্তরে।’
ক্ষুদ্র প্রাণীটির জ্বালাময় নিদ্রাহীন আলোঅন্ধকারের অভিজ্ঞতার হয়তো সেদিনই শেষ হয়ে যেত, যদি নিজের কথাগুলি কানে যেতে কানে আঙুল দিয়ে গোকুল ছুটে না পালাত৷
সারা দিন এদিকওদিক কাটিয়ে গোকুল সন্ধ্যার পরে ফিরে এলো। একটুখানি জোছনা উঠেছে সেদিন। উঠানে দাঁড়াতেই তাঁতিবউকে দেখতে পাওয়া গেল। জোছনার এক ফালির মাঝখানে সে বসে আছে, শান্তস্থির পটের ছবির মতো। স্নিগ্ধতার আশ্বাসে পায়ে পায়ে গিয়ে গোকুল বসল তার পাশে। সকালের তাণ্ডবের জন্য তার অনুতাপের অবধি নেই।
‘ও বউ, কথা বল, তোর পায়ে ধরি। আমার দোষ— সব, বুঝতে পেরেছি। তোর দিকে আমি চেয়েও দেখিনি।’
‘কী বলব বলো।’
‘কিছু কি তোর বলবার নেই? আমি কাছে এলোেই তোর এত কষ্ট? আচ্ছা আমি যাই।’
‘না যাসনে। আজ একটা কথা বলব তোমাকে। ও কোনোদিনই ভালো হবে না। ওর দোষ নয়, তোমার দোষ নয়। বোধহয়—’
‘কী বোধহয়?’
‘বোধহয় আমার রিষ্টিযোগ আছে।’ কথাটা বলতে গিয়ে অস্ফুট কান্নায় তার ঠোঁটদুটি কেঁপে উঠল।
কথাটা নতুন নয়। অনেক আড়ম্বর করে, এর চাইতে অনেক দৃঢ়স্বরে সিদ্ধা বলেছিল। কিন্তু বাক্বিহীনার স্বরে এমন সব আশা নষ্ট হওয়ার সুর ছিল যে গোকুল আহতের মতো খাড়া হয়ে বসল।
‘বলিস কী রে?’
‘হ্যাঁ সত্যি। ওরা বলে— আমার মনে হয়...’
‘ওরা ভুয়া দেয়। তা হলে আর আমি জানতাম না?’
‘না জানতে না। আমাকে ছেড়ে দিতে হবে, যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাব।’
‘তুই চলে যাবি?’
‘হ্যাঁ।’ তাঁতিবউ উঠে দাঁড়াল যেন সে তখনই যাত্রা শুরু করবে।
পরদিন সকালে উঠে গোকুলকে দেখা গেল না, তার পরদিনও না, তার পরও না। তাঁতিবউ বড়ো কান্নাই কাঁদল। ছ-দিন সে উঠল না, রাঁধল না, খেল না। মাঝে মাঝে শুকিয়ে ওঠা স্তনটা শিশুর মুখে গুঁজে দিয়ে তার কান্না থামানোর চেষ্টা করে। অনাহারের অবসাদে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে তাকে তাও যেন সে বুঝতে পারে না। গোকুলের মুখ মনে পড়ে আর সবকিছু অন্ধকার হয়ে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে৷
কিন্তু দুঃখে পাথর হয়ে যেতে যেতে তাকে একসময়ে নড়ে উঠতে হলো। পেটের ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছে বলেই রান্নাঘরের দরজা খুলতে হলো তাকে। কিন্তু গোকুল নেই, কে তাকে বলবে রান্না করতে যেতে, কখন কী করতে হবে। অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া শিশুর মতো ভয়ে নিচুস্বরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল সে।
দুঃখের গভীরতা যখন বেড়ে যায় তখন সে আঁআঁ করে কাঁদে। এক একদিন সন্ধ্যায় বর্ষা নামে। বর্ষার শব্দের মধ্যে তার বোবাকান্নার শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। হাটের থেকে ফিরতে দেরি হয়ে গেছে এমন দু-একজন তার কান্না শুনে তাড়াতাড়ি হেঁটে গোকুলের বাড়িটা পার হয়ে যায়৷
তারা বলাবলি করে কোনো দিন, ‘গোকুলের বাঁদিটা বুঝি। গোকুল গেছে বিয়ে করতে শুনলাম। তা হবে। বেচারার বড়ো কষ্ট। একা একা ভয় ভয় করে বোধহয়।’
গোকুলের নাম শুনে তাঁতিবউ উঠে যায় ভালো করে শুনবার জন্য। শুনতে পায়— গোকুল গেছে বিয়ে করতে।
আকস্মিক আঘাত পাবার মতো একটা অস্ফুট শব্দ করে তাঁতিবউ সরে আসে জানলা থেকে।
এক-একদিন সন্ধ্যাবেলায় গা ধুয়ে সে গোকুলের দেওয়া ভালো শাড়িগুলো বের করে পরে। কপালে টিপ আঁকে, বিনুনি করে পিঠে ঝুলিয়ে দেয় চুল। খোঁপা বাঁধে না, গোকুল পছন্দ করত না। তার পর বারান্দায় গিয়ে বসে প্রতীক্ষায়। গোকুল হাটে যাবার সময়ে এমনি করতে বলে যেত তাকে। কাজ করতে করতে থেমে গিয়ে সে ভাবে— গোকুল কোন কাজটা কীরকম করে করতে বলে দিয়েছিল। ঠিক তাই করে সে।
কোনো কোনো দিন সে ভাবে শুয়ে শুয়ে, যদি কোনো দেবতা বর দিতে তাকে! এমনকি হয় না কোনো গুনিন এসে দুহাতে তুলে একটা সন্তান তাকে দিয়ে যায়, একরাশ ফুলের মধ্যে ফুলের চাইতেও সুন্দর একটা ছেলে। দুহাত ভরে নেয় সে তা হলে। বুকের মধ্যে টনটন করে ওঠে তার। ঘুমন্ত রুগ্ণ কঙ্কালসার ছেলেটাকে তুলে নিয়ে তার মুখে স্তন গুঁজে দেয়। কিন্তু সেও যদি ফকিরের মতো হয়। কথাটা মনে হতেই তাঁতিবউ আড়ষ্ট হয়ে যায়, দম বন্ধ হয়ে আসে, গা ঘিনঘিন করে ওঠে। ছেলেটাকে দুম করে বিছানায় ফেলে দিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। মরেছে মরেছে, বেশ হয়েছে। বাঘের কামড়ে গলা ফুটো হয়ে মরেছে৷ তাঁতির বউয়ের চোখদুটি শ্বাপদহিংসায় চকচক করে ওঠে। রক্তে মুখ ভরে উঠল ভেবে— থু-থু করে উঠল তাঁতিবউ। না দরকার নেই। কোনো গুণীর কাছে সে বর চায় না। শুধু গোকুল ফিরে আসুক। সে যদি বউ নিয়ে আসে, তাও আসুক।
তবু এক-একদিন স্বপ্নে দেখে সে একরাশ ফুলের মধ্যে ফুলের চাইতেও সুন্দর একটি ছেলেকে।
রাত্রির উঠোনে তাকাতে তার ভয় করে, তবু খুট করে একটু শব্দ হলেই সে উঠে যায় দরজার কাছে। মাঝরাতে উঠে বসে একদিন তার বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। যদি তাঁতি ফিরে গিয়ে থাকে তার সাড়া না পেয়ে। সেদিন থেকে সে দরজা খুলে রাখল। বিছানায় শুয়ে সে সারা রাত ঘুমোতে পারল না। দরজা বন্ধ ধরে গোকুলের পাশে শুয়েও যার ভয় যায় না, সে-ই আজ দরজা খুলে রেখেছে।
একদিন একটা ব্যাপার ঘটে গেল। গোকুলের প্রত্যাশায় বসে থেকে থেকে মাঝরাতে ঘুমে গা এলিয়ে এসেছে, বসে বসে ঢুলছে তাঁতিবউ— এমন সময়ে উঠোনে পায়ের শব্দ হলো যেন। তাঁতিবউয়ের মনে হলো সে বলবে—এসো, আমি তোমার জন্যে জেগে আছি দেখো। আজই শুধু নয়। পাছে ফিরে যাও বলে প্রদীপ জ্বেলে রেখেছি, দরজা খুলে রেখেছি। কিন্তু কথা বলা হলো না। হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে উঠে এসে দম বন্ধ করে দিল যেন। মনে হলো কাঁদতে না পারলে সে মরে যাবে, তবু কাঁদল না। দেখবে সে প্রথম মুহূর্তেই তার তাঁতিকে, পোড়া চোখ বারবার করে মুছতে লাগল।
কিন্তু পায়ের শব্দ যখন একেবারে তার পাশে এসে থামল তখন সে মুখ তুলতেও পারল না। একটা সুন্দর সুবাস আসছে, তাঁতিবউ ভাবল সুখে ছিল গোকুল তাই। কিন্তু অভিমান সে করবে না, মান করা তার সাজে না—কী আছে তার গরবী হওয়ার।
মুখ তুলে তাঁতিবউ বিস্ময়ে অভিনবত্বে দিশেহারা হয়ে গেল। স্বপ্নের মধ্যে যেন সে ভাবল— তুমি দেবতা, তুমি এলে। আমার দুঃখ, তাঁতির দুঃখ, ওই ছেলেটির দুঃখ সব মিলে তোমাকে টেনে এনেছে। তাই এত সুবাস, তাই এত সুন্দর তুমি। তোমার মুখের দিকে চাইবার সাহস নেই আমার। তুমি তো আমার মনের কথা জানো।
অনভ্যস্ত কথা বলার পরিশ্রমেই যেন তাঁতিবউ হাঁপাতে লাগল। ‘শোন, তাঁতিবউ, গোকুল ফিরবে না। তুই এত দুঃখ করবি কেন? আর গোকুল যদি ফেরেই কখনো যা দিয়ে তোকে সে কিনেছে তার চাইতে দশগুণ আমি তাকে দিয়ে দেব। বুঝতে পেরেছিস আমার কথা? আজই নয়— চিনিস তো আমাকে, রাজবাড়িতে দেখেছিসও বোধহয়।’
দেবমূর্তি সাপ হয়ে কামড়ালেও তাঁতিবউ এতটা শিউরে উঠত না। পলকে দূরে সরে গিয়ে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পৃথিবী তখনও পায়ের তলায় দুলছে। তীব্র রূঢ় দৃষ্টিতে আগন্তুকের মুখের দিকে চেয়ে রাগ করে কী বলতে গেল সে, কিন্তু অসীম ঘৃণায় সে বারবার বলল, ‘ছি ছি তোমাকে দেবতা বলেছি, ছি ছি ছি!’
‘শোন, তাঁতিবউ ভেবে দেখ। সময় নে।’
‘ছি ছি ছি ছি।’
আগন্তুক কখন চলে গেল, কে তাকে তাড়িয়ে দিল এসব কিছু মনে নেই তাঁতিবউয়ের৷ প্রথম সাধারণ বোধ ফিরে আসতেই ভয়ের একটা আর্তশব্দ করে উঠে গিয়ে দরজার খিলগুলো এঁটে দিল সে।
এর বোধহয় প্রয়োজন ছিল। এমন বেহুঁশ হয়ে, এমন কোমল প্রাণ নিয়ে যারা চলে, তারা না পারে নিজে বাঁচতে না পারে অন্যকে প্রাণ দিতে। ভয় যতক্ষণ না আসে ততক্ষণ তার আশঙ্কা এমন আড়ষ্ট করে রাখে যে নিজেকে পিঁপড়ের মতো তুচ্ছ মনে হয়। ভয় এসে চলে গেলে আশঙ্কাটা কমে যায়, কিছুটা আত্মবিশ্বাসও আসে।
প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে তাঁতিবউকে তার উঠোনের পৃথিবীর বাইরে পা দিতে হয়েছে। হঠাৎ কারো কথা শুনলে যার প্রাণসুদ্ধ আড়ষ্ট হয়ে যেত এখন সে হাটে যায়। অপরিচিত দোকানির সঙ্গে দামদস্তুর করতে হয়। পয়সা উপার্জনের ফিকির সে নিজেই বার করেছে। জোলারা আসে তার কাটা সুতো নিতে। পাকা কারবারির মতো সে বাকিতে মাল দেয় না, কথার খেলাপ করে না।
কখনো কখনো সমবয়সি মেয়েদের সঙ্গে গোকুলকে নিয়েও আলাপ হয়। মেয়েদের কাছে সে জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করে এরকম অবস্থা হলে তাদের স্বামীরা কী করত। কেউ বলে— ফিরবে একদিন, এই রূপ ফেলে কেউ থাকতে পারে। সেদিন রাত্রিতে গোকুলের দেওয়া মসলিন পরে আরশি ধরে নিজেকে দেখে তার অবাক লাগে— তা কি হয়, এর জন্য কখনো কেউ ফেরে যদি এতদিনের এত কান্না তাকে ফেরাতে না পেরে থাকে। অন্যদিন কেউ বলে— দেখ, কোথায় আবার বিয়েশাদি করেছে। সেদিন রাত্রিতে আরশির সামনে বসে সে ভাবে— কিছুই তো বদলায়নি। যেদিন প্রথম গোকুল তাকে বলেছিল— তোকে না হলে আমার চলবে না, সেদিনকার মতোই তো সব আছে। সে ভাবে এসবের জন্যই দায়ী সে। গোকুলকে সে নিজে ঠেলে বার করে দিয়েছে বাড়ি থেকে। কিন্তু সে তো তখন বুঝতে পারেনি তাঁতি আর কাউকে বিয়ে করলে কত কষ্ট। আর কী বোকা ছিল সে। গোকুল কথা বলতে যত অনুরোধ করত তাকে, তখন সে নির্বাক হয়ে যেত। এখন যখন মেয়েরা বলে রাত্রিতে কে কী বলেছে স্বামীকে তখন সে শোনে আর অবাক হয়ে যায়— এদের চাইতে অনেক মিষ্টি কথাই তো গোকুলকে সে বলতে পারত, গোকুলের কাছে গেলে মনেও হতো।
তার ছেলেটা এখন হামা টানতে শিখেছে। হোক অনেক দেরিতে তবু শিখেছে তো! পাড়ার সব ছেলেমেয়েগুলি এমন কিছু সুন্দর নয়, সবলও নয় সবগুলি। গোকুল এলে এসব সে বুঝিয়ে বলবে, গোকুল তো বোকা নয়, সে বুঝবে। সুন্দর ছেলেমেয়েও আছে। এই তো সেদিন গাজনের মেলা থেকে সন্ধ্যার একটু আগে কয়েকজন সাথির সঙ্গে ফিরতে ফিরতে দুটি ছোটো ছোটো ছেলেকে দেখে সে থমকে দাঁড়িয়েছিল।
কার ছেলে গো? নির্নিমেষে তাকিয়ে থেকেও সাধ মেটে না তার। ঠিক এমনি চেয়েছিল গোকুল। এগিয়ে গিয়ে ছেলেদুটির সঙ্গের ঝি-টিকে জিজ্ঞাসাও করেছিল সে। কিন্তু নাম শুনবার পর তার মনে হলো যেন দুঃস্বপ্ন দেখছে। রক্তহীন মুখে তাড়াতাড়ি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সে।
সেদিনকার রাত্রির কথা মনে পড়ল। তেমনি চোখ, এখনি যেন তেমনি ক্ষুধাতুর হয়ে জ্বলে উঠবে। কিন্তু সত্যি দেবশিশুর মতো দেখায় ছেলেদুটিকে। সহযাত্রীর প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, ‘কী যেন লাগল পায়ে।’
কিন্তু কী আশ্চর্য মানুষের মন। সেখানে একটা ক্লেদাক্ত আবিল সম্ভাবনা কী করে বাসা বাঁধল কখন। তাকে অস্বীকার করার জন্য তাঁতিবউ সারা পথ সারা মন দিয়ে আবৃত্তি করতে লাগল— চাই না, চাই না, ছি ছি ছি। বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ ধরে সে স্নান করল।
একদিন গোকুল ফিরে এলো। তাঁতিবউ বসে ঘর ঝাঁট দিচ্ছিল, এমন সময়ে গোকুল এসে দাঁড়াল তার পিঠের কাছে। তাঁতিবউ উঠে দাঁড়াল, কাঁদল না, বোকার মতো চেয়ে থাকল না, একটা জলচৌকি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘বসো, হাত ধুয়ে আসি।’
হাত ধুয়ে আসতে একটু দেরি হলো। কুয়োর পাড়ে দাঁড়িয়ে হয়তো বা একটু কেঁদেছিল সে, অনেকদিনের অভ্যাস তো। মুখে চোখে জ্বল দিয়ে ফিরে এসে পাখা নিয়ে তাঁতির পাশে বসে বাতাস করতে করতে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় ছিলে এতদিন, মুখ শুকিয়ে গেছে কেন? খাওয়াদাওয়া ভালো হতো না?’
কিছুক্ষণ পরে বলল, ‘ভালো মন আমার, এতদিন পরে এলে প্রণাম করতেও ভুলে গেছি।’
নিচু হয়ে তাঁতির ধুলোভরা পা বুকের পরে চেপে ধরল। গোকুল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে, অন্ত খুঁজে পায় না।
তাঁতিকে সেধে সেধে খাইয়ে ধরে নিয়ে এসে বসল সে, যেন তার বাড়িতে গোকুল অতিথি। একসময়ে হাসতে হাসতে সে বলল, ‘আমারই জিত হলো দেখ। কই পারল ডাকিনীরা ধরে রাখতে আমার তাঁতিকে?’ তাঁতি মুখ নিচু করে থাকে। দুহাত দিয়ে তার মুখ তুলে ধরে তাঁতিবউ যেমন গোকুল এককালে তার ধরত।
কাজ করতে করতে ফিরে এসে তাঁতিবউ বলে, ‘কিন্তু ওরা কী লোক গো!’
‘কারা?’
‘তোমার সেই ডাকিনীরা যারা তোমাকে ধরে রেখেছিল। তারা কী শুধু ছলাই জানে? পুরুষটাকে কি খেতেও দিতে নেই?’
রাত্রিতে খাওয়াদাওয়ার পাট চুকলে দেরি করে তাঁতিবউ ঘরে এলো। গোকুল দেখে অবাক— মসলিন পরেছে তাঁতিবউ, চোখে কাজল। অথচ এসবের জন্য অনুনয় বিনয় করে করে শেষ পর্যন্ত রাগারাগি করেছে এককালে। তাঁতিবউ মুচকি হেসে গোকুলের কোলে গিয়ে বসল, নিজে সেধে মুখের পরে মুখ নামিয়ে আনল।
‘এ কী গা পুড়ে যাচ্ছে যেন, জ্বর হয়েছে তোমার?’
‘হয়।’
‘রোজ হয় জ্বর? কী সর্বনাশ। কী করে হলো?’
‘জানিনে, রোজই হয়, বড়ো কষ্ট হয় রে।’
তাঁতিবউ লজ্জায় যেন মরে গেল, সজ্জা তার গায়ে পুড়ে উঠল। মসলিন ছেড়ে ঠেঁটি পরে সে ফিরে এলো বিছানায়। তাঁতিকে নিজের পাশে শুইয়ে বলল, ‘কষ্ট হচ্ছে মাথায়?’
‘হ্যাঁ।’
তাঁতিবউ ভেবে পায় না কী করবে। বুকের মধ্যে তাঁতির মাথাটা টেনে এনে বলল, ‘এখানে চোখ বুজে থাক, ঘুমিয়ে পড়বি।
‘আমি কি বাঁচব না বউ’, গোকুল ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করে।
ছোটো ছেলের মতো তাঁতিকে টেনে নিয়ে তাঁতিবউ বলে, ‘ষাট, ষাট।’
একটু হাসি পায় গোকুলের, বলে, ‘তুই যেন মা হলি। আমি সেরে উঠব। তোর কাছে থাকলে সেরে উঠব।’
কবরেজের বাড়ি হাঁটাহাটি করে ওষুধ এনে দেয় তাঁতিবউ, সারা দিন চোখের আড়াল করতে পারে না তাঁতিকে। অবোধ শিশুর মতো আঁকড়ে ধরে রাখে বুকের কাছে। কিন্তু জ্বর তবু কমল না, সন্ধ্যা হতেই জ্বর আসে। হাড্ডিসার হয়ে গেছে তাঁতি। তাঁতিবউ ভেবে পায় না— কী করে এমন হলো, কীসে সারে।
মাঝে মাঝে মনে হয় তার মনের দুঃখেই এমন গা পুড়ে যায়। গত দিনগুলির কথা মনে পড়ে। তাঁতির কোনো সাধই সে পুরণ করতে পারেনি। ভাবে, তাঁতি যদি নাই বাঁচে?
একদিন রাত্রিতে ঘুম ভেঙে তাঁতি দেখল বউ বসে বসে নিঃশব্দে কাঁদছে। ‘কাঁদছিস তুই?’
‘দুর, কই না, কাঁদব কেন?’
তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ফেলে তাঁতিবউ। বলে, ‘ঘুমাও লক্ষ্মীটি, আমি হাত বুলিয়ে দিই।’
‘কত তো দিলি।’
‘সে কি বেশি কথা নাকি? তোর তো কোনো সাধই মিটল না আমাকে দিয়ে।’
‘সব মিটেছে এতদিনে।’
তাঁতিবউয়ের ঠোঁট কাঁপল একটা ছেলে চেয়েছিল, তাও পারলাম না দিতে। নীরবতার ফাঁকে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ল।
তাঁতিবউ ভাবে— এর চাইতে অনেক ভালো হতো যদি গোকুল আগেকার মতো গঞ্জনা দিত তাকে। গোকুলের প্রভাহীন চোখদুটির দিকে চেয়ে চেয়ে সে ভাবে চোখের চারিদিকের ওই কালো ও যেন গোকুলের মনের ছাপ, সেখানে আশা নেই, শুধু অন্ধকার। শুধু একটা মুক অভিযোগ। সংসার করার সামান্য সাধও মেটেনি। গোকুল মুখ ফুটে তো বলেই না, জিজ্ঞাসা করলেও অস্বীকার করে পাছে তার মনে ব্যথা লাগে। সে এত ভালো বলেই না এত কষ্ট তার জন্য তাঁতিবউয়ের।
চার-পাঁচদিন খুব বেশি জ্বর হওয়ার পর সে রাত্রিতে গোকুলের জ্বর কম। ‘আজ ঘুমাতে পারব, তুইও ঘুমিয়ে নে একটু’—এই বলে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু তাঁতিবউয়ের ঘুম এলো না।
বাইরে ভাদ্রমাসের আকাশ থেকে টুপটুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। থেকে থেকে বাতাসের সঙ্গে ঝরঝর করেও পড়ছে। ওপাশের বিছানায় ছেলেটা কেঁদে উঠল। গোকুলের মুঠি থেকে আঁচল ছাড়িয়ে নিয়ে তাঁতিবউ উঠে দাঁড়াল। ছেলেটাকে চাপড়ে ঘুম পাড়িয়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। একটা সুস্থ-সবল ছেলে কেন তার কোলে এলো না? গাজনতলার হাটে দেখা ছেলেদের মতো একটা পেলে গোকুল হয়তো বাঁচবার জোর পেত। এত নিবিড় করে সে গোকুলকে সুখী করতে চায় তবু কেন পারবে না সে। তাঁবুর অন্ধকারে গোকুলকে দেখবার প্রথম দিন থেকে সবগুলো দিনের ছবি একটার পর একটা যেন বাইরের নিবিড় অন্ধকারের গায়ে ফুটে উঠতে থাকে। কত সাহস তার হয়েছিল যেদিন অন্ধকারের আড়ালে সে ফকিরের কাছে গিয়েছিল মন্তর আনতে। সে কি তার সাহস— সে তো প্রাণপণে গোকুলকে সুখী করার চেষ্টা। তার পর একদিন গোকুল চলে গেল। গোকুলের জন্য প্রতীক্ষার দিবারাত্রিগুলির কথা ভাবতে গিয়েই মনে হলো তার সেই রাত্রির কথা যার স্মৃতিতে পৃথিবী ঘৃণায় ভরে গিয়েছিল। ছি ছি, লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু কী অদ্ভুত মানুষের মন : গাজনতলার হাটে দেবশিশুর মতো ছেলেদুটিকে দেখবার পর তাদের পরিচয় পাবার পর মুহূর্তের জন্য যে সম্ভাবনার কল্পনাতে ঘৃণায় শিউরে উঠেছিল তার মন, আজ তেমনি সম্ভাবনার ইঙ্গিতটিই তাকে দিশেহারা করে দিল। ছি ছি ছি, তবু তেমনি ফুটে উঠতে লাগল কল্পনাটা।
কোথা থেকে কী হয়ে গেল। অন্ধকারের বুকে ভবিষ্যতে যা ঘটবে তা কি এমন করে চোখে দেখবার মতো হয়ে ফুটে ওঠে? যেন ভবিষ্যতের ঘটনাগুলোর কিছু ইতিমধ্যে ঘটে গেছে, বাকিটুকু ঘটবেই। ভবিষ্যতের তাঁতিবউ যেন অন্ধকারের গায়ে ফুটে উঠেছে।
জানলা থেকে ফিরে এসে তাঁতিবউ ঠেঁটি পালটে মসলিন পরল, কপালে টিপ দিল, চোখে আঁকল কাজল। আবার জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের বুকে ফুটে ওঠা ভবিষ্যতের ওই অর্ধপরিচিত মেয়েটিকে দেখবার চেষ্টা করল। রুক্ষ ভাস্বর রিক্ততায় সে যেন জ্বলতে জ্বলতে এগিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের মধ্যে।
ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল তাঁতিবউ। ঠান্ডা জলো হাওয়া ঝরঝর করে উঠল উঠোনের পারের আমগাছটার মধ্যে। তাঁতিবউ উঠোন পার হলো, সদর পার হলো, সদরের দরজা ঠেলে বন্ধ করে দাঁড়াল পথে। অন্ধকারে সামনে পিছনে একাকার হয়ে গেছে। সামনে তবু নজর চলে। পিছনের যে দরজাটা এইমাত্র সে বন্ধ করে দিল হাতড়েও সেটাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। গাঢ় অন্ধকারে আর সব অনুভূতি যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে, একটা অনির্দিষ্ট প্রাবল্যে উদরের অন্তগুলো সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে বারেবারে।
জমিদার বাড়ির বাগান পার হয়ে এলো তাঁতিবউ। গ্রামের বউ-ঝিদের কৌতূহল ও আতঙ্কের গল্প শুনে শুনে সে জানে কোথায় সে ঘরটি। প্রতিবার পা ফেলতে সারা গায়ের স্নায়ুগুলো রিনরিন করে উঠছে। রুদ্ধ দরজার ফাঁকে, আধখোলা জানলায় একটু আলো চোখে পড়ল। দরজা ধরে দম নিতে লাগল তাঁতিবউ। তার একবার মনে হয়েছিল কেঁদে ফেলবে সে। একটা অস্ফুট অর্ধজান্তব আকুতি যেন দরজায় করাঘাত করল তার মনের মধ্যে। কী করে দরজা খুলে গেল তাঁতিবউয়ের মনে নেই। প্রবল প্রতিরোধে হৃৎপিণ্ডকে ঠেলে উঠতে না দিয়ে ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল সে।
বর্ষণক্ষান্ত আকাশে ভোরের পাখি ডেকে ওঠার আগে সে ফিরে এলো। ঘরে তখনও প্রদীপটি জলছে, যেমন সে জ্বেলে রেখে গিয়েছিল। ছেলেটি এখনই জেগে উঠবে। তার আগে একটু বিশ্রাম করতে হবে। স্নায়ুগ্রন্থিগুলো অন্তত একটু স্নিগ্ধ করতে হবে। কিন্তু গোকুলের মুখখানি দেখবার লোভ হলো তার। ঘুমটা আজ ভালোই হচ্ছে গোকুলের। কয়েক বিন্দু স্বেদ যেন দেখা দিয়েছে, আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিল তাঁতিবউ। এবার আবার কান্না পাচ্ছে। কিন্তু কাঁদলেও সময় নষ্ট হবে খানিকটা। সকলেরই বিশ্রাম নেবার অধিকার আছে পৃথিবীতে, তারও আছে।
মাটিতে শুয়ে দেখতে দেখতে তাঁতিবউ ঘুমিয়ে পড়ল।


0 মন্তব্যসমূহ