আমি খুব সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার দেখি। এই খুনটুন, রক্তারক্তি। ভালো প্ল্যান পেলে ভবিষ্যতে খুন করব। এক নয়, একাধিক। সিরিয়াল কিলিং। সারা শহর কেঁপে যাবে। খবরের কাগজে কাগজে, টিভির চ্যানেলে আমার খোঁজ চলবে, বাসে, অফিসে, চায়ের ঠেকে কথা হবে। মানুষ ভয় পাবে। মানুষ আতঙ্কে থাকবে। আবার চিন্তাও করবে— কে হতে পারে সম্ভাব্য খুনি? কেমন হতে পারে? ধরা তো পড়বেই, কিন্তু কবে?
রাবার স্ট্যাম্প আর ইঙ্কপ্যাডের সামনে একটা সাদা কাগজ রেখে দেখুন, যে পারবে সে-ই এসে মনের সুখে কটা ছাপ্পা মেরে যাবে। ঠিক তেমনই প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমবে। কিন্তু উত্তর নেই কারও কাছে। পুলিশের ঘুম ছুটে যাবে।
কে সেই খুনি— ঢ্যাং টা না না, কুঁই কুঁই... লে লে মজা...।
তখন আমি মায়ের কাছে গিয়ে, মাকে ওষুধ দিতে দিতে বলব, টিভিতে কী ছাইপাঁশ দেখো? একদম দেখবে না। তখন মা আমার কথা জানবে না। বলবে— রাখ ছেমরি!
থাক, তখনকার কথা থাক। এখন মা কী করছে দেখি—
মা এখন টিভিতে চোখ সেঁটে বসে আছে— ওই ছেলেটাকে দেখছে, যে মেয়েটাকে মেরে, কেটে টুকরো টুকরো করে ফ্রিজে লুকিয়ে রেখেছিল।
তোমার এসব রক্তারক্তি খুনোখুনি দেখতে ভালো লাগে মা? আমি সহ্যই করতে পারি না।
মা ছেলেটার চোখ দেখে বলল—জন্মখুনি! অর চক্ষু দেখছস—ঘোলামারা!
আমি আয়নায় নিজের চক্ষু দেখছিলাম! চোখ! ঘোলা মারা কি? একদম নয়।
মাকে আমি যে কথাগুলো বললাম, সেটা কিন্তু আমার মনের কথা। সত্যিই আমি রক্ত সহ্য করতে পারি না। রক্ত দেখলেই আমার বমি পায়। ভয় ভয় লাগে। গা হাত পা ঠান্ডা মেরে যায়। সারা শরীর শিরশির করে। চোখে মুখে জল দিতে হয়।
বাজারে যখন মুরগি কাটে— আমি তাকাই না। অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি। আমি সব সময় কেটে রাখা মাংস কিনি, আমার জন্য, আমার সামনে একটা মুরগি গলা কাটবে কেমন যেন সহ্য হয় না।
তবু আমি একটা ভালো প্ল্যানের অপেক্ষায় আছি— খুনের প্ল্যান। খুন আমি করবই করব। আমার প্রচুর রাগ। প্রচণ্ড! আমার ব্রহ্মতালু তেতে আছে। এত রাগের জন্য আমার হাত পায়ের চেটো জ্বালা জ্বালা করে। চোখের ভেতর কড়কড় করে।
একবার একটা পুরনো পত্রিকার পাতায় একটা নাটকের নাম দেখেছিল। নামটা আমার হেব্বি পছন্দ হয়েছিল— ‘মরবে ইঁদুর বেচারা’।
তবে মরুক ইঁদুর বেচারা।
আমি কিন্তু কোনওদিন একটা ইঁদুরও মারিনি। ইঁদুর-কল পেতে যা শিকার করেছি, সেগুলো না মেরে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসেছি।
ভন্টু আমাকে বলেছিল, ‘ছেড়ে না দিয়ে একটা কাজ করতে পারতিস, ওদের জলে ডুবিয়ে মারতে পারতিস।’
আমি পারিনি।
তবে ভন্টু একবার আমার হাত থেকে ইঁদুর-কলটা ছিনতাই করেছিল। কলটা ছিনিয়ে নিয়েই গঙ্গার দিকে দৌড় দিল। আমিও ওকে তাড়া করলাম। কিন্তু ভন্টুর সঙ্গে আমি পারব কেন? ও খুব জোরে দৌড়ায়। কিন্তু গঙ্গা পর্যন্ত ও দৌড়ে গেল না। মাইতিদের পুকুরের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। তারপর কল খুলে অদ্ভুত কায়দায় ইঁদুরটা জলে ছুঁড়ে দিল। জলে পড়ে ইঁদুরটা সাঁতরে চলল। শুধু ওর মাথাটা দেখতে পাচ্ছি— ও পাড়ের দিকে এগিয়ে আসছে। তখনই ভন্টু একটা ঢিল ছুঁড়ল, আবার একটা ঢিল। জলে ঢিল পড়তেই ইঁদুরটা দিক পালটে অন্য দিকে চলে গেল।
বেশ একটা হইহই ব্যাপার। খুব মজা হচ্ছিল। কিন্তু বাধ সাধল মাইতিদের বড় ছেলে। সে এসে ভন্টুর কান মলে দিল— বলল, ‘এই পুকুরে আর যদি কোনওদিন ইঁদুর ফেলতে দেখি তোকেও আমি জলে ফেলব।’ আর আমাকে বলল, ‘অ্যাই মেয়ে, তোর এই ছেলেদের সঙ্গে কী রে— যা, যা, ধিঙ্গি কোথাকার। কতগুলো ছেলে জুটিয়ে সারাদিন ধিঙ্গিপনা করে বেড়াচ্ছিস!’
মাইতিদের শুঁটকো-বউটা আরও এককাঠি সরেস, বলল, ‘এই বয়েসে মেয়েরা কোলে ছেলে ধরে, আর এ মাগি ইঁদুর ধরে বেড়াচ্ছে।’
আমি মাইতি বউয়ের কথা শুনে কোনও উত্তর করলাম না। আমি এমনিতেই চুপচাপ, কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলি না। কথা বলতে ভালো লাগে না। আমার তখন বারো বছর বয়েস— এই বয়েসে কোন মেয়ের ছেলে হয়?
আমি ভন্টুকে বললাম, ‘শোন, এবার ইঁদুর পড়লে তুই নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় ছাড়বি, আমি দেখব, কত সাঁতার কাটতে পারে।’
দু’দিন পরে আবার একটা ইঁদুর পড়েছিল কলে। আমি সেটা ভন্টুকে দিয়েছিলাম। ভন্টু গঙ্গায় ইঁদুর ফেলল— ইঁদুরটা একটু সাঁতরেই একটা ভেসে যাওয়া কাঠের ওপর উঠে বসল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে দু তিনবার গা ঝাড়া দিল, একটা পা তুলে বার বার আমাকে দেখাচ্ছিল।
ভন্টু বলল, ‘ইঁদুরটা তোকে লাথি দেখাচ্ছ!’
আমি বিড়বিড় করলাম, ‘হারামিটার এত সাহস— বেঁচে গেল!’
তারপর থেকে সেই কলটায় আর ইঁদুর পড়ত না। হয়তো, ওরা কলটাকে চিনে গিয়েছিল। অথবা ওই কল নিয়ে এত কলকলানি হচ্ছিল যে মা ওটা রাতেই বন্ধ করে দিত। কারণ, আমি সবসময় দেখতাম কলটা বন্ধ হয়ে গেছে। এটা ইঁদুররা করতে পারবে না, মানুষ পারবে। আর সেটা মা-ই করে। কারণ, কলে ইঁদুর পড়লে বাবা খুশি হত। নইলে ইঁদুরের দল দোকানের ভেতর ঢুকে আলুর বস্তা কাটত। মুখের সামনে যা পেত তাই কেটে খেয়ে পরখ করত— খাওয়া যায় কি না? ফলে বাবা বেশ অসুবিধায় পড়েছিল। কিন্তু কলে আর ইঁদুর পড়ে না। কলটা একদিন মা ওপরে কোথাও তুলে রাখল। কিন্তু বাবার দোকানে ইঁদুরের দৌরাত্ম্য কমল না। তখন মা ইঁদুরদের সঙ্গে একটা অলিখিত চুক্তি করল। মা রোজ রাতে দোকানের মেঝেতে পাঁচ-ছটা বিস্কুট দিত, ওরা এসে সেই বিস্কুট খেত, আর বস্তা কাটত না।
সে এক ছেলেবেলা ছিল! তারপরই তো সব ধাঁ ধাঁ করে পালটে গেল। এখানকার জমি জায়গার দাম হয়ে গেল আকাশছোঁয়া। আমাদের বেশ কিছু জমি-জায়গা ছিল, বাবা বিক্রিবাটা করে দিল। আমরা দমদমে চলে এলাম। সেখানেই আমার কলেজ, পরে ইউনিভারসিটি। এই চাকরি। ততদিনে আমি জীবনানন্দ দাশ পড়ে ফেলেছি — ধরা যাক দু একটা ইঁদুর এবার!
না, জীবনে আর একটা ইঁদুরও ধরিনি, কোলে ছেলেও ধরিনি—।
কোলে ছেলে ধরা সুযোগ হয়েছিল, কিন্তু বিয়েটা টিকল না। বরটা বর্বর! না, ঠিক মারধর করত না, মদ খেয়ে ঝামেলা করত না। কিন্তু আমাদের সেক্সচুয়াল লাইফ নিয়ে আমার একটা গা ঘিনঘিনে ব্যাপার তৈরি হয়েছিল। ওরাল সেক্স। ওরাল মানে চুমাচাটির মতো নিরীহ ব্যাপার নয়। মুখমৈথুন। ব্যাপারটা আমার পছন্দ ছিল না। রাত হলেই গা গুলিয়ে উঠত।
তারপর অ্যানাল সেক্স। পায়ুসঙ্গম। আমি অ্যালাউ করতাম না। কিন্তু ও আমাকে ঠিক উলটে দিত। কিছুতেই আপত্তি শুনত না। গায়ের জোরে ওই ষণ্ডার সঙ্গে আমি পারব কেন?
আমরা বড়ই বিপরীতধর্মী ছিলাম, বিয়েটা টিকল না। দিনের বেলা মানুষটা খারাপ ছিল না, তবে রাতে বড্ড পালটে যেত। খুব নোংরা নোংরা কথা বলত, আমার কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করত...। আমার সুখ নেই, রাগ বাড়ত।
কী মনে হচ্ছে আমি ঠান্ডা! ফ্রিজড! আমার বর তাই বলত। আপনি নতুন কিছু ভাবছেন না। যাক গে যাক বরের কথা... আমি আমার কথা বলি। আমার না হাতে হাত দিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করত। আমি কিন্তু ওকে ভালোবাসতাম। না, না, আর বর নয়। আমি আমি আপনার পাশের বাড়ির মেয়ে। ডিভোর্সি। তার বাইরে আলাদা কিছু নই। একদমই তাদের মতোই আমি। একটা চাকরি করি। আবৃত্তি করি। আমি স্টকে প্রেমের কবিতা নেই, সব বিদ্রোহের কবিতা, রাগের কবিতা। রক্ত গরম করার কবিতা। আমি রোজ ফেসবুকে নিজের ছবি পোস্ট করি। এই খাচ্ছি, এই বেড়াচ্ছি, এই মঞ্চে। এই সিনেমা দেখতে গেলাম। এই চা খাচ্ছি। বই পড়ছি। সেলেব হলেই তাঁর জন্মদিনে তাঁর সঙ্গে ছবি দিয়ে ভালো ভালো কথা লিখি। কেউ মারা গেলেই তাঁদের সঙ্গে নিজের একটা ছবি দিয়ে— কিছু শোকবার্তা।
হাটে মাঠে ঘাটে ছুটে ছুটে গিয়ে ছবি তুলে রাখা— মানুষ আজ আছে কাল নেই। ছবি কাজে লেগে যাবে। একদম আপনার চেনা মেয়ে। এই মানুষটাকে আপনি চেনেন। পুরোপুরি না-চিনলেও একটু বলে দিলেই ঠিক চিনে নিতে পারবেন। যেন আপনার পাশের বাড়িতেই থাকে। অথবা, পাশের বাড়িতে না থাকলেও তার পাশের বাড়িতে নিশ্চয়ই আছে। যদি তাও না থাকে, তবে সে আপনার ফোনের ওপারেই আছে। সে হল আমি। হ্যাঁ আমি—
এ আমি কেমন আমি, যে নিজেকে চেনাতে চাইছি।
চেনাতে চাইছি, যে আমি একজন কিলার। আপনাকে খুন করব। আবারও বলি, রক্তারক্তি আমি পছন্দ করি না। রক্তে আমার বমি পায়। আপনার রক্ত আমার কাছে মুখমৈথুন কিংবা পায়ুসঙ্গমের মতোই।
সেইসঙ্গে আপনাকে দেখলেও আমার বমি পায়, এই যে আপনি দেখতে ভালো, কিন্তু আপনার বউ সুন্দরী নয়। আপনি কেন কালো কুচ্ছিত মেয়েকে বিয়ে করলেন? টাকার জন্য? না, ঘরে বউ রেখে বাইরে খেলবেন? তাহলে আপনি আমার টার্গেট।
বা,...
আপনার বয়েস বেড়েছে, কিন্তু তেমন বুড়ো হননি। এত কচি কচি মেয়েদের সঙ্গে হুটোপুটি করবেন, বয়েস তো ধরে রাখতেই হবে। নইলে ওরা যে লাথি মারবে—আপনি ডেঞ্জারাস! আপনাকে খতম করতেই হবে।
এছাড়া,...
আপনি একটু নাম করছেন। কথা কম বলছেন। মানে আপনি ঘ্যাম নিচ্ছেন। তাহলেও আপনাকে আমার হাতে মরতে হবে।
কিংবা,...
আপনার পয়সা হয়েছে, পয়সাজনিত অহঙ্কার হয়েছে। আপনাকে আমিই ধ্বংস করব।
এছাড়া...
আপনি যদি কোনওভাবে আমার পথে পড়েন।
অথবা...
আমার প্রিয় বা পছন্দের লোকের রাস্তা কাটেন। আমি আপনার সর্বনাশ করবই, করব।
তাছাড়া,
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট— আপনাকে যদি আমি পছন্দ করি। সেক্ষেত্রে আমি খুব পজেসিভ। আপনার চাল ভুল হলে, আমার সঙ্গে আপনার তাল না মিললে, আপনার গালে রোদ, মাথায় বৃষ্টি পড়লে, আপনি কারও সঙ্গে দাঁড়িয়ে হাসলে, এবং কেউ আপনাকে দেখে হাসলে— সেদিনই আপনার শেষদিন।
আপনি মদ খেলে, অথবা না-খেলে। আপনার ছবি কেউ তুললে, অথবা না-তুলবে। আপনাকে ডাকলে, অথবা না-ডাকলে। আপনার জন্য মৃত্যুবান রেডি।
আমি একজন সাইকোপ্যাথ কিলার। এটা আমি জানি। আপনিও জেনে রাখুন।
আমি সে অর্থে একটাও খুন করিনি, তবে তার প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন টার্গেট বাছাই পর্ব চলছে। আপনার মুক্তি নেই। ভালো প্ল্যান পেলে অবশ্যই খুন করব। এক নয় একাধিক। সিরিয়াল কিলিং। সারা শহর কেঁপে যাবে। হাড়ে ঠকঠকানি, ভয় ধরিয়ে দেব। আপনি আতঙ্কে ইঁদুর। পুলিশ দুঃশ্চিন্তায় ইঁদুর।
দুই
—মা ওষুধ খাও। কেন এসব দেখো। ছিঃ তোমার না বয়েস হয়েছে!
মাকে ওষুধ দিতে দিতে আমি কথাগুলো বললাম। তবে মা শোনার পাত্রী নন, ট্যাবলেটটা জলের সঙ্গে গলার ভেতর চালান করে দিয়ে বললেন, ‘তর কাম তুই কর।’
আমার কাজ কী? আজ অফিস ছুটি। আমি কোলের ওপর ল্যাপটপ টেনে বসে পড়লাম। আজ সুজনবাবুর বাপের শ্রাদ্ধ করব। বুড়োর সাজ দেখেছ? লাল প্যান্ট কালো টিশার্ট! মুখটা চকচক করছে— নির্ঘাত ফেশিয়াল করে।
ফেসবুক খুললাম। যে অ্যাকাউন্টটা খুললাম, সেখানে আমার নাম পলি পাল। এটা ফেক অ্যাকাউন্ট। আমার এমন আরও তিনটে অ্যাকাউন্ট আছে। মোট চারটে ফেক। একটা অরিজিনাল।
পলি পাল হাজির হল সুজন কুণ্ডুর ছবির লতায়। লেটেস্ট ছবিটার নীচে পলি পাল লিখল— বুড়ো ভাম! মেঘে মেঘে তো অনেক বয়েসে হয়েছে। এবার নিজেকে সংযত করুন। নইলে যৌনরোগে আক্রান্ত হবেন।
কথাগুলো লিখে চুপ করে বসে থাকলাম। ওয়েট, ওয়েট, ওয়েট অ্যান্ড সি।
বেশ কিছুক্ষণ পরে উত্তর এল, ‘আপনি এসব কী লিখেছেন? ভদ্রভাষায় কথা বলুন।’
লিখলাম, ‘দেব ফাঁস করে। মধ্যরাতে মেয়েদের মেসেজ করার সময় মনে থাকে না কার্তিক ঠাকুর! মেয়ে মানেই কি আপনার— ড্যাস ড্যাস উপকরণ!’
কথাগুলো লিখে আমি পলি পাল থেকে বেরিয়ে এলাম। নে দৌড়া— আহা, যদি পলি পালের কথাবার্তাগুলো সুজনবাবুর বউ মেয়ের চোখে পড়ে খেলা জমে যাবে। জমে ক্ষীর হয়ে যাবে। এখন পক্ষে বিপক্ষে অনেক চলবে...।
মা টিভিতে সদ্য হওয়া একটা খুনের খবর দেখতে দেখতে বলল— কী করছস মনা?
আমি চিৎকার করলাম— খুন করব। এখন ইঁদুর ধরছি!
‘থো তর খুন! করিস ত হারাডাদিন ঝগড়া। প্যাঁচালপাড়া বন্ধ কইর রে, প্যাঁচালপাড়া বন্ধ কইর—। মানষের সঙ্গে ট্যাঁসটেসানি কথা ছাড়।’
আমি গরম জল বসালাম। ব্ল্যাক কফি।
আজ সারাদিন ধরে প্যাঁচাল করব, প্যাঁচাল দেখব। ক্যাচাল বাধাব। সুজনবাবু কতটা কেঁউ কেঁউ করতে পারে! ওর লোকজন এখন নেমে পড়বে, আমার থুড়ি পলি পালের শ্রাদ্ধ-শান্তি করবে।
আমার আর তিনটে ফেক অ্যাকাউন্ট থেকে পলি পালকে সাপোর্ট দেব। লাগ, লাগ, লাগ...
দেখি অনিন্দ্যদাকে একটা ফোন করি, ওনার নজরে না এলে একটু খোঁচাই।
অনিন্দ্যদা আমার ওয়েলউইশার! আমি লোকটাকে অনেক বুঝিয়েছি— আমার ওয়েলউইশার হয়েই থাকা বাবা। কিন্তু মালটার খুব ছুঁকছুঁকানি। এই রুবিনা তো এই জপমালা, এই কথাকলি তো এই ভারতী। মাতাল, মালখোর, লুচ্চা। পেটে কথা থাকে না। তবু অনিন্দ্যদা আমার—
ফোন করলাম, ‘অনিন্দ্যদা দেখলেন, আপনাদের পলি পাল তো সুজনবাবুকে ধুইয়ে দিল।’
‘এই পলি পাল মেয়েটা কে বলত, ফেক অ্যাকাউন্ট মনে হয়। হঠাৎ হঠাৎ উদয় হয়ে এমন কথা ছুঁড়ে দেয়—।’
‘ও দেখেছেন তাহলে।’
‘হ্যাঁ, না দেখার কী আছে?’
‘আমি ভাবছি পলি পালের হয়ে লিখব, মেয়েটাকে সবাই যেভাবে যা তা করছে।’
‘না, না, তুই এসবের মধ্যে জড়াস না। তারপর কার রাগ কার ওপর এসে পড়ে। কী দরকার, তুই মন দিয়ে তোর কাজ কর।’
‘দেখুন, আমি কাউকে ভয় পাই না, আমি কারও ধার ধারি না, আমি আপনাদের মতো তেলবাজ নই। একটা মেয়েকে অমন করে সবাই অ্যাটাক করবে কেন? মেয়েটা খারাপ কিছু লেখেনি, যা সত্যি তাই লিখেছে।’
অনিন্দ্য শান্ত গলায় বলল, ‘তোর কথা বলা হয়ে গেছে। এবার আমি বলি, তুই কাউকে ভয় পাস না, ভালো কথা। কাউকে তেল দিস না, অতি উত্তম কথা। কিন্তু অন্য সবাই ভয় পায়, তেল দেয়, এটা জানলি কী করে? মানে, তুই ছাড়া সবাই এক ব্রাকেটের তাই তো!’
‘হ্যাঁ, তাছাড়া আবার কী?’
‘তোকে নিয়ে আর পারি না। এখনও সময় আছে, পাগলামিটা ছাড়। এই করে করে তুই একা হচ্ছিস, আরও একা হবি। শোন, দেখতে গেলে, ঠক বাছতে গাঁ উজার হবে যাবে। তাই পজেটিভ হ। ভালো থাকবি— নইলে দিন দিন একা হবি।’
‘একা হলে হব— আমি আপনাদের মতো দল পাকাই না, গ্রুপবাজি করি না। আপনার গুরু অশোকেন্দু ভট্টাচার্যের গ্রুপের লোকজন, কী করে আমি জানি না। ওরা আমাকে আটকেছে— আমি ওদের ছাড়ব না। যে বা যারা আমাকে আটকেছে তারা মরার সময় জল পাবে না।’
‘তুই আবার পাগলামি করছিস। আচ্ছা, অশোকেন্দুবাবু তোকে ভালো করে চেনে? বড়জোর তোর নামের সঙ্গে পরিচয়। হয়তো, আলাপ পরিচয়ও সামান্য। উনি কেন তোর ক্ষতি করবেন? কী লাভ ওনার?’
‘ওনার কী লাভ উনি জানেন। উনি মরার সময় জল পাবেন না।’
‘ভালো, তুই তোর কালির ঝুড়ি নিয়ে বসে থাক। শুরু করলি সুজনবাবুকে দিয়ে। তারপর আমার শ্রাদ্ধ করলি, ভীতু তেলবাজ, ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। এখন এসেছি অশোকেন্দুবাবুতে এসে ঠেকেছিস— আর কিছুক্ষণ ফোন ধরে থাকলে না জানি কত দূর যাবি। তবু তোকে বলি, তুই ভালো মানুষ, যথেষ্ট ভালো মেয়ে, সৎ, পরিশ্রমী কিন্তু তুই বড় নেগেটিভ। মানুষকে এত অবিশ্বাস করিস না। ইগো, ইগো তোকে শেষ করে দেবে। রাখি রে, ভালো থাক, থুড়ি নিন্দেতে থাক। চালিয়ে যা।’
অনিন্দ্যদার আমার ফোন রেখে দিল। বড্ড অহংকার হয়েছে লোকটার। আমার ইগো দেখছে। দুদিন বড় স্টেজে কবিতা পড়ে— দাঁড়াও দেখাচ্ছি।
আজই ওর সত্তানাশ করব।
ফোন করলাম মৌলিকে— কী রে তোর অনিন্দ্য স্যার তো তোকে খুব লাভ ইমোজি দিচ্ছে। ব্যাপার কী?
—আমাকে উনি স্নেহ করেন।
—উনি স্নেহ করেন না! স্নেহ টেহ উনি বোঝেন? উনি কত মেয়ের সর্বনাশ করেছে জানিস?
— আচ্ছা দিদি তোমাকে একটা কথা বলব?
—বল।
—দিদি তুমি তো খুব সুন্দরী। সত্যিই সুন্দর। আর সবাই জানে তোমার সঙ্গে অনিন্দ্যদার বেশ ভাব আছে। অনিন্দ্যদা তোমার সঙ্গে শুয়েছে? তোমারও সর্বনাশ করেছে?
—আমার সঙ্গে সাহস পাবে না।
—কেন তুমি বাঘ, না ভালুক? তুমি এত সুন্দরী— তোমার সঙ্গে না শুয়ে অন্য জায়গায় গেল— এটা আমার ঠিক বিশ্বাস হল না। তুমি আটকাতে পারলে না।
—আমি ওসব ব্যাটাছেলেকে কাছে ঘেঁষতে দিই না। আমি তোর ভালোর জন্য বললাম, শুনলে শুনবি—।
ওদিক থেকে মা আবার চিৎকার করছে, কার পিছনে শলা দিচ্ছস মে ছেমরি?
জবাব দিলাম না, মাথার ভেতর দপ দপ করছে, ওই অনিন্দ্য আমাকে পাগল ঠাওরেছে। ফোন করলেই বলে— শান্ত থাক। ঝগড়া করিস না। একটু পজেটিভ হ। লোকটার নামে বছর কয়েক আগে রাষ্ট্র করে দিয়েছিলাম—চরিত্রহীন ব্যাটাছেলে বলে। কিন্তু কেউ আমার নামটা জানিয়ে দিল। সবাই ওনাকে আমার নাম বলে দিল। তাতে আমার তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি। আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি, আত্মার আত্মীয় টাত্মীয় বলে ক্ষমা টমা চেয়ে নিয়েছি। সম্পর্কটা স্বাভাবিক হচ্ছিল, উনি আবার জ্ঞান দিলেন। ঠিক আছে দাঁড়াও, এবার তোমাকে নিকেশ করব। গঙ্গায় ভাসানো ইঁদুরের মতো তোমার অবস্থা করব অনিন্দ্যদা। আর পাড় পাবে না তুমি। একটা কাঠের টুকরো জোগাড় করো— সেখানে উঠেই চুপ করে তোমাকে বসে থাকতে হবে।
মৌলি বলল, ‘তুমি আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না দিদি।’
‘না, না, করব না। আসলে উনি একজনকে বলেছেন— তুই হচ্ছিস পাক্কা ছেনাল। তুই নাকি জলে নামবি বেণী ভেজাবি না। আর উনি তোর বেণী ভিজিয়ে ছাড়বেন।’
‘কাকে বলেছেন?’
‘তোদের দুজনেরই পরিচিত একজনকে, আমি তার নাম বলে দিতে পারি, তুই যদি আমাকে না জড়াস—।’
‘কার নাম বলো—।’
‘বলব? ক্লু দিচ্ছি— তেঁতুল পাতা নজন, যদি হও—ড্যাস।’
‘সুজন।’
‘দেখ আমি কারও নাম বলিনি। নামটা তুই বলেছিস—।’
‘হ্যাঁ, ওইজন্যই তো সুজনবাবুর নামে আজ এফবিতে একজন কী যা তা লিখে দিল—।’
‘না, রে আমি এসবের মধ্যে নেই, শুধু অনিন্দ্যস্যারের নাম বলল, তাই তোকে সাবধান করলাম।’
‘সুজনবাবু মিথ্যে কথা বলেছেন— অনিন্দ্যদা এটা বলতেই পারে না, আমি বিশ্বাস করি না।’
‘বাপ্পা তোর তো অনিন্দ্যদার প্রতি খুব প্রেম। প্রেম একদম উদলে উঠছে—।’
আমি মৌলিকে মানব-বোমা বানাতাম। কিন্তু মা এমন চিৎকার করছে, আমাকে থামতেই হল। তবে আমি থামব না, অনিন্দ্য আর মৌলির প্রেমকাহানি— এবার মিসাইল করে ছুঁড়ব—।
মা আবার চিৎকার করছে— এই বুড়ি থামবে না। এই বুড়িকে থামাতে হবে।
এই বুড়ি ছোটবেলায় আমার ইঁদুর-মারা কলটা রোজ রাতে বন্ধ করে দিত। কলে আর ইঁদুরই পরত না, এখনও তাই করছে। একে আজকের মতো থামানোর ব্যবস্থা করতেই হবে। ঝটপট নেট থেকে কটা ছবি ডাউনলোড করলাম। তারপর মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
মা চোখ পাকিয়ে বলল, ‘আবার তুই ঝগড়া করছস?’
বললাম, ‘তুমি আমাকে কী ভাবো? ভাবো আমি পাগল? ভাবো, আমি সবার সঙ্গে ঝগড়া করি। আমি ঝগড়া করে করে সব সম্পর্ক শেষ করে দিচ্ছি, একা হচ্ছি, এই ভাব তো? আমি ঝগড়া করছি না, প্রতিবাদ করছি। কেন করছি তাহলে দেখো— এগুলো দেখো—’
বলে, মায়ের চোখের সামনে নেট থেকে ডাউনলোড করা ছবিগুলো খুলে দিলাম, পর পর—।
মা বিস্মিত গলায় বলল, ‘এ গুলান কী?’
‘কী চিনতে পারছ না? না চেনার কী আছে? এগুলো পুরুষাঙ্গ। আর এটা— এটা হল কৃত্রিম পুরুষাঙ্গ— ডিলডো। এক শুয়োরের বাচ্চা এই ছবিগুলো পাঠিয়ে আমাকে লিখেছে— পুরুষ পেলে না তো জীবনে, এবার এটা ব্যবহার করো।’
আমার কথা শুনে মায়ের গলার ভেতর কফ আটকে গেল। চোখ বড় বড়! আহা রে!
আমি বললাম, ‘বলো, বলো, আমি কী করব? পুরুষ পেলাম না বলে, ওর কথা শুনে ডিলডো ব্যবহার করব? নাকি, ওই ঢ্যামনার বাচ্চার ওটা কেটে নিয়ে আসব? বলো— বলো— আমি শুধু শুধু ঝগড়া করি— প্রতিবাদ করব না। মেয়ে বলে পড়ে পড়ে মার খাব—’
মা কী বলবে, বলার মতো কোনও কথা কি আছে মায়ের মুখে?
মায়ের দিকে তাকালাম—মাকে সেই গঙ্গায় ফেলা ইঁদুরের মতো লাগল— বেচারা মা, হাবুডুবু খাচ্ছে আর সাঁতার কাটছে। হয়তো এক টুকরো কাঠও খুঁজছে— যদি পায়!
মরবে ইঁদুর বেচারা!
যাই বাবা! এখন আমি শান্তিতে সারাদিনের জন্য ঝগড়ার ঝাঁপি খুলে বসি— ধরা যাক দু একটা ইঁদুর এবার।
লেখক পরিচিতি:
জয়ন্ত দে ভারতীয় কথাসাহিত্যিক। পশ্চিমবঙ্গে বসবাস। ত্রিশের অধিক বইয়ের রচয়িতা। ম্যাজেশিয়ান ও এক নারী, আত্মজন, অন্নপূর্ণা, দশচক্র, মৃত, না জীবিত ইত্যাদি তাঁর উল্লেযোগ্য রচনা।


2 মন্তব্যসমূহ
এক নেগেটিভ মানুষের মনন খনন করা হয়েছে অত্যন্ত গভীরে গিয়ে।
উত্তরমুছুনজাস্ট ফাটাফাটি।
উত্তরমুছুন