না আমি আসতে চাইনি। আমার ছোট্ট মেয়েটির বয়েস মাত্র তিন এবং ওর মায়ের বয়েস তেইশ। তার চোখের পাপড়িগুলো কালো ও লম্বা। তার মুখে বেলুচিস্তানের পাহাড়েদের সৌন্দর্য, ত্বক মসৃন এবং বুকে বেলুচিস্তানী যুগল বেদানা, সুমিষ্ট ও সুন্দর।
আমি আজ মারা যাবো। চোখে আমার মেয়ের মুখ, তার মায়ের মুখ আর আমার মায়ের মুখগুলো ভাসছে। আমি একজোড়া অপূর্ব সুন্দর স্তন দেখতে পাচ্ছি,আমি সেই স্তনে মুখ দিয়ে ভেসে আছি। তা আমার মায়ের, না আমার মেয়ের মায়ের আমি বুঝতে পারছি না। সেখান থেকে ঝর ঝর ঝরছে দুধ, সাদা ও সুন্দর! না, দুধ কই, রক্ত, আমি রক্ত পান করছি, তারপর সেই রক্ত আমার চোখ ও নাক দিয়ে ঝরছে।
আমার খুব শীত লাগছে। কত ঘণ্টা হলো জলে ডুবে আছি মনে নেই, শুধু নাক বের করে আছি শ্বাস নেবার জন্য। আমার ক্ষুধা পেয়েছে। আমি আজ মারা যাবো। ওই তো ওরা আমাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে জলে-ডোবা ধানের ক্ষেতে।
আমাদের দলটি এখানে পাঠানো হয় দুসপ্তাহ আগে এবং বলা হয় এখানে মুক্তিদের উৎপাত খুবই বেশি। কিছুদিন আগে শান্তি কমিটির প্রভাবশালী খলিল শিকদার খুন হয়েছে। ১৯৭১ সাল, ওরা বলে মুক্তিযুদ্ধ, আমরা জানি এ নেহায়েতই পাকিস্তান ভাঙার ভারতীয় ষড়যন্ত্র। আমদের দলটি এখানে এসেই গ্রামে গ্রামে হানা দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে থাকে। একদিন ক্যাম্পে নিয়ে আসে একদল যুবতী মেয়েকে, তাদের বলাৎকার করা হয় উপুর্যপরি। আমাকে ১৫ বছরের একটি মেয়েকে দেয়া হয়। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বুক কেঁপে ওঠে, চোখে ভেসে ওঠে আমার মেয়ের মায়ের মুখ, আমি কতদিন তাকে দেখিনি, কতদিন পাইনি তার স্নেহ পরশ, অথচ কল্পনাও করতে পারিনি তাকে এই মেয়ের স্থানে এমন পরিবেশে, শত্রু সৈন্যের ধর্ষণ ক্যাম্পে। জলে ভরে আসে আমার চোখ। না, আমি সৈন্য, আমি শত্রু, আমার দুর্বলতার কথা কে বিশ্বাস করবে? কে বিশ্বাস করবে যে আমি সেই মেয়েকে স্পর্শ করিনি, কলংকিত করিনি। কিন্তু তা বলে সে রেহাই পায়নি, আমারই কমান্ডার তাকে ধরে নিয়ে গেছে।
মুক্তিদের খুঁজতে গিয়ে আমরা গ্রামকে গ্রাম ধ্বংস করেছি, ওরাও আমাদের রেখেছে সদা সন্ত্রস্ত। দু’দিন আগে স্থানীয় রাজাকারের মাধ্যমে এক বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর খোঁজ পেয়ে আমাদের একটা দল খাল দিয়ে নৌকোয় করে যাচ্ছিল তাদের ধরতে। কিন্তু অতর্কিতে মুক্তিরা ঝাপিয়ে পড়ে। চারিদিক থেকে গুলি আসে বৃষ্টির মত। কয়েকজন সেখানেই মারা যায়, আহত হয় নয় জন। সে সংবাদ পৌঁছার সাথে সাথে ঢাকার থেকে নতুন ফোর্স পাঠানো হয় প্রতিশোধ নিতে। ২ লঞ্চ ভরে আমাদের দলটি বেরিয়ে পড়ে। সৈন্য ছিল অনেক, মেশিন গান, হেভি অস্ত্র আর তুমুল আত্মবিশ্বাস। আমরা মুক্তিদের আস্তানা তছনছ করে দেবো। দুটো লঞ্চের ছাদেই ছিল এল এমজি তাক করা এবং দুজন সুবেদারই ছিল অতি দক্ষ। আমি ছিলাম পেছনের লঞ্চে। ব্রাশ ফায়ার, মর্টার ও শেল মেরে খালের দুই পাড়ের সমস্ত ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে আমাদের লঞ্চ দুটো এগিয়ে যাচ্ছিল বিপুল বিক্রমে।
হাটের কাছাকাছি আসতেই মুক্তিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে চারিদিক থেকে, মুহুর্মুহু গুলি চলতে থাকে। ওদের স্নাইপার আমাদের লঞ্চের এল এমজির দ্বায়িত্বে থাকা সুবেদারকে হত্যা করে মুহূর্তের মধ্যেই।
আগের লঞ্চের সুবেদার এল এমজি এবং আরও দশ বারো জনকে নিয়ে জলে ঝাঁপ দেয়, সেখান থেকে ব্রাশ ফায়ার করতে থাকে। মুক্তিবাহিনীর ছোঁড়া উপুর্যপরি গ্রেনেডের আঘাতে লঞ্চের ছাদ উড়ে যায়। আমরা লঞ্চের নীচ থেকে গুলি ছুড়তে থাকি। সেই জাহান্নামে সময় চলে অনন্তকাল। প্রায় ২৮ ঘণ্টার গোলাগুলি শেষে সম্পূর্ণ পরাজিত ও বিপর্যস্ত আমরা। ৬০/৭০ জনকে ওরা ধরে নিয়ে যায়, কয়েকজন জলে লুকিয়ে থাকি বিলের মধ্যে। ওরা সেই বিল চষে বেড়াচ্ছে। কাউকে জল থেকে তুলে নেয়ার কসরত না করে বৈঠা ও লগি দিয়ে পিটিয়ে মেরে সেখানেই ফেলে যাচ্ছে।
আমি এখনও বেঁচে আছি, কিন্তু শুধুই সময়ের ব্যাপার। আমাকে ওরা খুঁজে না পেলেও আমি মারা যাবো। আমি কোনো মানুষ নই, আমি শত্রু। আমি ওদের মানুষ না ভেবে হত্যা করতে এসেছি। ওরা কি আমাকে ছেড়ে দেবে? কেন দেবে? যুদ্ধে সবাই অমানুষ, যে আগে গুলিটি ছুড়তে পারে, সেই কেবল আশা করতে পারে বেঁচে থেকে মানুষে উত্তীর্ণ হবার এবং নিজের মত করে ঘটনার বর্ণনা দিতে বা নিজের মত করে ইতিহাস লিখতে।
আমি বেলুচিস্তান থেকে এসেছি। আসতে বাধ্য করা হয়েছে। কেউ প্রশ্ন করেনি আমি এখানে আসতে চাই কিনা। আমার জীবন মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে আমাকে বাদ দিয়ে।
যাদের আমরা নেতা হিসেবে মানি তারাই আমাদের জীবনের মালিক। আমাকে হয় মারতে হবে, নয় মরতে হবে। তৃতীয় কোনো পথ খোলা রাখা হয়নি।
আমার পিতা বৃদ্ধ, মা চলা-ফেরা করতে পারে না। আমি এই জলা-জংলায় মশায় অভ্যস্ত নই। ওরা শিখিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা সত্যিকারের মুসলমান নয়। ওদের মধ্যে হিন্দুয়ানী বেশী। মুসলমান হিসাবে ইসলাম রক্ষা করতে এই দেশে আসা আমার দায়িত্ব। আল্লাহ নবীর ধর্ম, সবচাইতে পবিত্র ধর্ম। সেই ধর্ম রক্ষা করতে গিয়ে যদি মানুষ হত্যা করতে হয়, তাতে কোনো পাপ নেই। আর শত্রু শত্রুই, মানুষ নয়। যখন ধর্ম ও মানবতা বিপরীতে দাঁড়ায় তখন ধর্মকে বেছে নিতে হয়, কারণ ধর্ম হলো আল্লাহর সৃষ্টি আর মানবিকতা-মানুষের ।
আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। আল্লাহ খুব সামান্য জ্ঞান দিয়ে পাঠিয়েছেন। আমি ধর্মপালন করি, নামাজ রোজা করি, মসজিদে যাই, জাকাত ফেতরা দিই। ধর্মযুদ্ধ করতে অন্য দেশে যেতে আমার ইচ্ছা হয়নি কোনোদিন। না-গাজী না-শহীদ, কোনোটাই আমার পছন্দ নয়। কিন্তু আমি একজন সিপাই, অতি সাধারণ ও তুচ্ছ, সিঁড়ির শেষতম ধাপ। আমার ওপরে আদেশের ভার, তা বইতে হবে মুখ বুজে, কোনও প্রশ্ন বা ভালো-মন্দ বিচার না করে। আমাকে কে রেহাই দেবে হাই-কমান্ডের হাত থেকে? আমি না করতে পারি না, পালিয়ে যেতে পারি না, ওরা আমাকে ট্রাইবুনালে তুলবে, দেশদ্রোহী প্রমাণ করে ফাঁসিতে ঝোলাবে।
আমি আমার দেশকে ভালোবাসি। বেলুচিস্তানের পাহাড় পর্বত, মাটি উপত্যকা, গাছপালা, নদীর চেয়ে সুন্দর কোনো দেশ নেই। আমার দেশের আঙুর, নাশপাতি, আখরোট, বেদানাই আমার ক্ষুধার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আমার বোধ কে বুঝবে? কে শুনবে আমার কথা? এখানে আমি ঘৃণ্য, ঘাতক ও শত্রু এবং স্বদেশে নাম না-জানা শহীদের তালিকাবদ্ধ হবো কিছুক্ষণের মধ্যেই। অথচ আমার একটি নাম আছে, আমি বেলুচিস্তানের দিলদার খান, আমার মেয়ের তিন বছর বয়েস, আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি, আমি শহীদ হতে চাই না, এটা অন্যায়, অন্যায় আমাকে এইভাবে মেরে ফেলা!
এর আগে কোনোদিন আমি এই দেশে আসিনি। শুধু শুনেছি এই দেশের মানুষ ভালো নয়, শেখ মুজিব পাকিস্থানের শত্রু, ভারতের চর। আমি বিশ্বাস করেছি। কেন করবো না? কেউ আমার দেশকে ধ্বংস করুক আমি তো তা চাইতে পারি না। অবশ্যই যে দেশবিরোধী তার শাস্তি চেয়েছি, কিন্তু সেই শাস্তি দেয়ার দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিতে চাইনি। অতি সাধারণের সাধারণ একজন আমি, নরম মখমলের মত এক রমনীর স্বামী, আর পুতুলের মত ছোট্ট একটি মেয়ের বাপ। রাষ্ট্র, রাজনীতি, যুদ্ধ আমার জীবনের কোনো প্রয়োজনীয় অংশ নয়।
আমার শীত লাগছে। ক্ষুধার কথা এখন আর মনে নেই। আমি মুক্তিদের নৌকার বৈঠার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সেই বৈঠার আন্দোলনে জলে যে ঢেউ উঠছে তা এসে লাগছে আমার মুখে। আমার অস্বস্তি লাগছে। জলে ডুবে আছি কত ঘণ্টা, এখন আর মনে নেই। আমি ধান গাছগুলো দুলতে দেখছি, ওদের কথা শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু বুঝতে পারছি না। ওরা আমারই দেশের মানুষ কিন্তু আমরা একে অন্যের ভাষা বুঝি না, সংস্কৃতি বুঝি না, একে অন্যকে শ্রদ্ধা করি না। আমরা শত্রু, একজন আর একজনকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত। অথচ আমাদের একই সংবিধানে সংরক্ষিত সমান অধিকার। কেন আমি বেলুচিস্তানের দিলদার খান এই দেশে অস্ত্র হাতে এসেছি? আমার বাঙালির সাথে কিসের বিরোধ? কেন একজন মানুষকে আর একজন মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে এমনভাবে, যখন একজনের আরেকজনকে হত্যা করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না? যে দেশপ্রেম অন্যের অধিকারকে পদাঘাত করে সেই দেশপ্রেম দিয়ে কী হয়?
মাত্র দু'মাস আগে এই দেশে এসেছি। বৃষ্টি আর বৃষ্টি, আকাশ কালো করে থাকে। মনে হয় যেন বুকের ভেতরে ওই কালো আকাশ পাখা ভিজে থম্ করে আছে। প্রথম অপারেশনে যখন যাই, বলা হলো একটি মসজিদে মুক্তিরা পালিয়ে আছে। খুব উৎসাহ নিয়ে মসজিদ ঘেরাও করে ফেলি, কিন্ত বুকের ভিতরে কী এক কালো সাপ পিঠের শীতল স্পর্শ দিয়ে যায়, দেখি আছরের নামাজের শেষে দশ বারোজন মুসল্লি লুঙ্গি, পাঞ্জাবি ও টুপি পরা, কেউ কেউ আমার পিতার বয়সী, একজন পঙ্গু! আমার চোয়াল ঝুলে পড়ে বিস্ময়ে। এই কি শত্রু? ইয়া আল্লাহ! তুমি আমাকে সুদূর বেলুচিস্তান থেকে এতদূরে এনেছো এই জন্য? এই মসজিদে মানুষ মেরে ঈমানের পরীক্ষা করতে?
আদেশ হল রাইফেল তাক করে ফায়ার করার। আমি কোনোদিন মানুষের দিকে ফায়ার করিনি। বিরাট দল আমাদের, মুসুল্লিদের চেয়ে প্রায় দুইগুণ বেশি। সবার হাতে তাক করা রাইফেল। ফায়ার করতে গিয়ে আমার হাত কেঁপে উঠলো, চোখ বন্ধ হয়ে গেল, সবগুলো মানুষ ধপ করে পড়ে মরে গেলো। একটি গুলি মসজিদের মিম্বরটিকে ঝাঁঝরা করে দিলো। ছিন্ন ভিন্ন মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো পবিত্র কোরান শরীফ। যে মসজিদে আমার পিতা আল্লাহর উপাসনা করে, যে মসজিদে আমি জুম্মা পড়তে যাই, ঠিক তেমনি একটি মসজিদে মানুষ হত্যা ও কোরান শরীফের অবমাননা করে আমার যাত্রা শুরু হয় এই দেশে।
সেদিন সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। সারারাত আমি ছটফট করেছি। সারারাত স্বপ্ন দেখেছি পিতাকে। সে নামাজ পড়তে যাচ্ছে আমাদের গ্রামের মসজিদে, আর কারা যেন পিছু পিছু খুব সন্তর্পণে ফলো করছে তাকে। খাকি পোষাক, মাথায় আর্মি হেলমেট, রাইফেল তাক করা তার দিকে, অথচ পিতা টেরই পাচ্ছে না, সে নিশ্চিন্তে হাতে তসবি গুণতে গুণতে এগিয়ে যাচ্ছে মসজিদের দিকে, আর ছায়ারা এগিয়ে আসছে সেই মসজিদ ঘিরে ফেলতে।
এই দু’মাসে প্রতিটা বুলেট আমি ছুঁড়েছি, ছুঁড়েছি আমার বিবেককে বিদীর্ণ করে, যেন আমার মায়ের দিকে, আমার পিতা, স্ত্রী ও কন্যার দিকে! আর প্রতিটি আর্তনাদে আমি শুনেছি, তাদেরই কণ্ঠনিঃসৃত চিৎকার।
অনেক দিন অনেক রাত ভেবেছি পালিয়ে যাবো। কিন্তু পর মুহুর্তেই উন্মোচিত হয়েছে সত্য। কোথায় পালাবো? আমি এদেশের ভাষা জানি না। আমি এদের শত্রু। হ্যাঁ, আমার মা আছে, বাবা আছে, স্ত্রী আছে, কন্যা আছে। কিন্তু শত্রুর একটিই অবয়ব- শত্রু। তার অন্য কোনো মুখ নেই, পরিচয় নেই, বোধ নেই। ধ্বংস - একমাত্র ধ্বংসই তার গন্তব্য ।
কে আমাকে আশ্রয় দেবে? কেন দেবে? এখানে লক্ষ কোটি মানুষের ভীড়ে মিশে হারিয়ে যাবার কোনো পথ নেই। আমি আর্মির ইউনিফর্ম খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারি কিন্তু যে মুহুর্তে আমি মুখ খুলবো, ওরা তৎক্ষনাৎ আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে বদ্ধভূমিতে। শত্রুর বদ্ধভূমি বিশাল পৃথিবীর চেয়েও বড়। আমাকে হত্যা করবে, সাধারণ মানুষই করবে, কোনো মুক্তিযোদ্ধার প্রয়োজন হবে না। কারণ, আমরা তাই করে চলেছি এই দেশে। নিরীহ সাধারণ মানুষ, যারা আমার পিতার মত, মাতার মত, ভাই-বোন, স্ত্রী ও কন্যার মত এবং বস্তুত অবিকল আমারই মত, তাদের হত্যা করে চলেছি নির্বিচারে। আমরা এক অনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত আছি। এবং এই জাহান্নমে বেঁচে থাকার কোনো পথ নেই। যে পিঁপড়ে বা যে কেঁচো মাটিতে হামাগুড়ি দেয়, আমি তারও চেয়ে সামান্য। সারাটা জীবন মিথ্যার জগতে বাস করেছি, ভেবেছি বেলুচিস্তানে আমার নাড়ির বন্ধন, পাকিস্থান আমার দেশ, কিন্তু এই মৃত্যু-মুহূর্তে বুঝতে পারছি আমি মানুষ যে দেশ থাকবে? সৈন্য তো অবয়বহীন মেশিন, যার ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত, আল্লাহর দ্বারা নয়, মানুষের দ্বারা। সৈন্যের স্বদেশ-বধ্যভূমি।
ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি নেমেছে। আকাশের কালো রং ঘুটঘুটে হয়ে গেছে, বিদ্যুতের তীক্ষ্ণ ছুরি কেটে চিরে দিচ্ছে আকাশের বুক। এইতো ওরা চলে এসেছে। আমাকে দেখতে পেয়ে হৈ চৈ করে উঠেছে, নৌকার গলুইটি তীরের বেগে ছুটে আসছে আমার মত সমস্ত শরীর ভেজানো ধানগাছগুলোর মধ্য দিয়ে। গলুইয়ে বৈঠা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে, কী অসম্ভব পরিচিত তার চেহারাটি, অবিকল ১৫ বছর বয়সের সেই মেয়েটির মুখ যেন! আসমান ঢেকে দিয়েছে
তার হাতের বৈঠা এবং তীব্র গতিতে তা নেমে আসছে আমার মাথার দিকে, আমার মাথাটি এখনই ভেঙে চৌচির হয়ে যাবে, যেমন ভেঙে যায় মানুষের বিশ্বাস, মানুষের স্বপ্ন ও সুখের সংসার। আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করছি, কিন্তু বাংলার ধানক্ষেতের মমতা ও উদারতা তো আমার জন্য নয়। আমি একজন দখলদার, হোক তা আমার ইচ্ছার বা বিবেকের বিরুদ্ধে। শত্রু কোনোদিন মানুষ হতে পারে না, তার তিন বছরের একটি সন্তান থাকলেও না।
লেখক পরিচিতি:
শাহাব আহমেদ
একজন বাংলাদেশি কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দশটির মতো। উল্লেখযোগ্য বই: লেনিন গ্রাদের চিঠি, লেনিনগ্রাদ থেকে ককেশিয়া, দশ দিগম্বর একজন সাধক ইত্যাদি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বসবাস করছেন।


0 মন্তব্যসমূহ