দেবর্ষি সারগীর গল্প : এগারোজন অন্বেষক



এগারোজন লোক গোষ্ঠী থেকে বহিষ্কৃত হল। অথবা পালিয়ে গেল, কারণ অন্যেরা যেভাবে হিংস্র দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়েছিল তাতে তারা আর মুখ তোলারই সাহস পায়নি। কিছু না বলে তারা বিকেলের গভীর অরণ্যের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং প্রথম রাতটা গাছে কাটিয়ে পরদিন একটা গুহার সন্ধান পায়। গুহাটার মুখ মাটি থেকে আট হাত উঁচু, ফলে কোনও পশু ওটায় কখনও আশ্রয় নিতে পারেনি । ওটায় কোনও দুর্গন্ধ ছিল না, তবে গভীর অন্ধকার ছিল, আর ছিল বড় বড় মাকড়সার সোনালি জাল, যা ঢোকার সময় তাদের চোখেমুখে জড়িয়ে যায়। গোষ্ঠী থেকে তাদের বিতাড়িত হওয়া বা পালিয়ে আসার কারণ এই যে তারা কেউই ঠিকমতো শিকার করতে পারত না। এই ব্যর্থতা যত না শারীরিক শক্তির অভাবের জন্য, তার চেয়ে বেশি মানসিক উদ্যমের অভাবের জন্য। দৌড়তে বা চিৎকার করতে তাদের ঠিক ভাল লাগত না। চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করত বা শুয়ে থাকতে। বস্তুত তারা সকলে যে রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল সেটা চিন্তা। গোষ্ঠীর অন্যেরা তাই মনে করত, এবং তারা নিজেরাও। তারা নিজেরা অবশ্য নিছক মনে করত বা ধারণা করত তা নয়, তারা রোগটাকে অনুভব করত, নিজেদের রক্তমাংসে, ক্লান্ত মস্তিষ্কে, ঘুম ও স্বপ্নে কিংবা নিদ্রাহীনতায়, এবং খাদ্য, সুখ ও ভোগ সম্পর্কে অসহায় উদাসীনতায়। এগারোজন যে একইসঙ্গে রোগটায় আক্রান্ত হয় তা নয়। প্রথমে ধরেছিল একজনকে, সে ওটা সংক্রামিত করে অন্যদের ভেতর। গোষ্ঠীর অন্যেরা যে তাদের তাড়াবার সিদ্ধান্ত নেয় তার কারণ তারা এরকম ভয়ও পেয়েছিল যে দেরি করলে বাকিরাও সংক্রামিত হতে পারে। এ কথা ভেবে সবাই অবাক হয়েছিল যে এই রোগ শুধু মানুষকেই আক্রমণ করে ।

অন্যদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে তারা যে একসঙ্গে সুখ ও শাস্তিতে বাস করতে লাগল তা নয়, কারণ এখানেও প্রত্যেকে নিজের মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে একা একা যুদ্ধ করছিল। অথচ একটা ঐক্যও তৈরি হয়েছিল তাদের ভেতর। কারণ প্রত্যেকেরই যন্ত্রণার তো একই উৎস। তারা সবাই যেন একইরকম দুরারোগ্য অসুখে ভুগছে। পরস্পরের সঙ্গে বিশেষ কথা বলে না। কেউ কথা বলার চেষ্টা করলে অন্যজন খেপে যায়। একটু স্বস্তি পায় পরিপূর্ণ নৈঃসঙ্গেই, যে অবস্থায় মানুষকে সঙ্গ দেয় শুধু তার নিজেরই চেতনা। একা হবার জন্য কেউ কেউ গুহা থেকে নিচে নেমে জঙ্গল বা একটু দূরে অবস্থিত একটা খরস্রোত নদীর তীরে ঘুরে বেড়ায়। ক্লান্ত হয়ে পড়লে সবাই পাশাপাশি শুয়ে থাকে, চোখ বন্ধ করে, যাতে অন্যের উপস্থিতি ভুলে থাকা যায়। খায় গাছের ফলমূল ও মধু। এবং নদী থেকে ধরা মাছ, কচ্ছপ ও শামুক। খিদে পেলেও অনেক সময় কিছুই খায় না ৷ কোনও অচেনা শিকারি দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ এই চিন্তাপীড়িত গোষ্ঠীর ভেতর ঢুকে পড়লে অবাক হয়ে যায়। স্তব্ধ হয়ে দূর থেকে সে লক্ষ্য করে কালো, দীর্ঘকায়, চুলদাড়িহীন, পাথুরে দৃষ্টির মানুষেরা শুয়ে বা বসে ঝিমোচ্ছে, একটুও না নড়ে, সাদা সূর্য লাল না হওয়া পর্যন্ত প্রায় একইভাবে, যেন তারা মানুষের শরীর নয়, নানা ভঙ্গির স্থির ছায়াপিণ্ড শুধু, যাদের সঙ্গে মানুষের শরীরের অলৌকিক মিল আছে।

টলতে টলতে একজন গুহার বাইরে বেরিয়ে এল। গত কয়েকদিন ধরে সে চিন্তা করার চেয়ে ঘুমোচ্ছে বেশি, কারণ তার মনে হয়েছে ঘুমের ভেতর যেহেতু মাথা নিজেই যথেষ্ট চিন্তা করে তাই চেষ্টা করে আর চিন্তা করার দরকার নেই । নিজের অবিরাম ঘুমের ভেতর সে একবার নিজেকে বেগুনিবর্ণ আকাশ থেকে নিচের দিকে পড়ে যেতে দেখল এবং একবার ওপরের দিকে উঠে যেতে। আর একবার সে নিজেকে দেখেছিল একটা শিলাখণ্ডে প্রস্তরীভূত হয়ে যেতে। শিলাটার ভেতর থেকে সে প্রাণপণে চিৎকার করছে কিন্তু বাইরে কেউই শুনতে পাচ্ছে না। স্বপ্নটা দেখার পর তার মনে হয়েছে প্রতিটি শিলা, প্রতিটি পাহাড়ের ভেতরেই হয়ত বন্দী হয়ে আছে একজন মানুষ বা একটা গোটা গোষ্ঠী, যারা অনন্তকাল ধরে ব্যর্থ চিৎকার করে চলেছে। ক্রমশ সে বুঝতে পারে স্বপ্নের বাস্তবতা ও জাগ্রত অবস্থার বাস্তবতা--এ দুটো আলাদা, যদিও প্রথমটা তৈরি হয় দ্বিতীয়টা থেকেই। স্বপ্নের বাস্তবতা যেন মনের নিছক বিশ্রাম, যা মন উপভোগ করে নিজের সঙ্গে যেমন খুশি খেলা করে। স্বপ্ন মনের বিশ্রাম। নিজের এই উপলব্ধির কথা সে একদিন অন্যদের বলল। কিন্তু তাদের বিশ্বাস হল না কথাটা। শুধু তাই নয়, একজনের তো মনে হল যে আসল জীবনটা হচ্ছে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখাটাই। আর মাঝেমাঝে যে জেগে উঠতে হয় সেটা নিছক খাবার খেতে। তার মতে, মানুষ ভুলক্রমে উলটোভাবে বাঁচছে। বেশি জেগে আর কম ঘুমিয়ে। এ নিয়ে তাদের ভেতর তর্কবিতর্ক শুরু হল, তারপর চিৎকার ও চেঁচামেচি এবং সবশেষে হাতাহাতি। ক্লান্ত হয়ে সবাই আবার চুপ করে শুয়ে বা বসে থাকল। প্রত্যেকের মুখ দুঃখী, বিষণ্ণ, কারণ চিন্তার চাপা অঙ্গার প্রত্যেকের মাথার ভেতর নিরন্তর জ্বলছে। যা জ্বললে খেতে ভাল লাগে না, ঘুমোতে ভাল লাগে না, ঘুম থেকে জেগে উঠতে ইচ্ছে করে না, কথা বলতে ইচ্ছে করে না, এবং মারামারি করতেও না। বিকেলের সূর্য রক্তবর্ণ হতে হতে আজকের মতো মৃত্যুবরণ করছে। অরণ্যের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে বহুদূর থেকে ভেসে এল নরনারীর তীক্ষ্ণ চিৎকার। ওটা সূর্যের কাছে তাদের প্রাত্যহিক প্রার্থনা, যাতে সূর্য পরদিন আবার জন্মগ্রহণ করে। তাদের ধারণা তারা রোজ প্রার্থনা করে বলেই সূর্যটা রোজ ওঠে। প্রার্থনার আর্তনাদ শেষ হতেই কোথাও একপাল নেকড়ে ডেকে উঠল। মাথার ভেতর অনন্ত আঁচ নিয়ে তারা গুহার ভেতর চুপ করে বসে থাকে, আর পরস্পরের প্রতি হঠাৎ অনুভব করে অসহায়, বিষণ্ন মায়া। আর ভালবাসা। একজন চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ে গুহার অন্ধকার মেঝেয় শুয়ে পড়ল। চিন্তা তার আর সহ্য হচ্ছিল না ।


দুই

তারা সবাই আক্রান্ত হয়েছিল জীবন ও জগৎ সম্পর্কে অসংখ্য মৌল প্রশ্নে। মানুষের সংজ্ঞা যদি এই হয় যে মানুষ এমন কিছু প্রশ্ন নিয়ে জন্মায় যাদের সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর সে কখনওই পাবে না, তাহলে তাদের যন্ত্রণাদায়ক মানসিক অবস্থাকে খুব অস্বাভাবিক কিছু বলা যায় না। তবে যন্ত্রণা সহ্যাতীত হলে মানুষ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার চেয়ে বেশি করে ভাবে প্রশ্নগুলো আদৌ তার ভেতর কেন জন্মাল সেটা নিয়ে। মানুষ তখন বাঘ, পাখি, মাটির গভীরের পোকা বা পাহাড়ের মতো চিন্তাহীন ও সুখী জীবন কামনা করে। কিংবা কামনা করে রক্তমাংসের উষ্ণ মাথার চেয়ে খুলির শান্ত, শুভ্র অমরতা। আত্মহত্যার ইচ্ছা যে তাদের কারও ভেতর জাগেনি তা নয়। জগৎ যে জন্মেছে কোনও স্বর্ণডিম্ব থেকে, বা আগুন থেকে, বা মাটির নিচ থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসা কোনও রামধনু রঙের প্রকান্ড সাপের চলাফেরার দাগের সাহায্যে, বা মহাশূন্যে একখণ্ড সোনালি চুলের মতো ভেসে যাওয়া কারও একখণ্ড ইচ্ছাতরঙ্গের সাহায্যে : এসব নিয়ে তারা যে ভাবেনি তা নয়, কিন্তু সন্তুষ্ট হয়নি। যদিও আপাতত সোনালি চুলের ধারণাটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। কিন্তু কার ওই সোনালি চুল? ইচ্ছাতরঙ্গটা কার? এত বড় পাহাড় কি শুধু কারও ইচ্ছা? সূর্যটা কি শুধু কারও ইচ্ছা? সে নিজেও কি শুধু কারও ইচ্ছা? এ মতবাদ তাদের একজনের পছন্দ হয়নি এই ভয়ে যে তার মতে যার ইচ্ছার ভেতর তার অস্তিত্ব টিকে আছে সে যদি কোনও কারণে একটু ঘুমিয়ে পড়ে বা কারও সঙ্গে ঝগড়া করে মন অস্থির করে ফেলে এবং তার ফলে তাকে আবার মনে আনতে ভুলে যায়, তবে সে তো একনিমেষে অদৃশ্য হয়ে যাবে। অন্যেরাও ভাবনাটায় ভীত হল, তবু মজা করার জন্য মন্তব্য করল যে সেরকম হলে সে কিন্তু মারা যাবে না, হঠাৎ অদৃশ্যই হয়ে যাবে; হঠাৎ নিভে যাওয়া আগুনের মতো। নিভে যাওয়া আগুন যে হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায় কেউ জানে না। কিংবা সে অদৃশ্য হয়ে যাবে তার নিজেরই কোনও ভুলে যাওয়া স্মৃতির মতো। একটা গাছ যে আদপে ভূমি ও আকাশের মাঝে একটা অসমাপ্ত সেতুই সেটা তারা বিশ্বাস করে। জগতের একটা পাথরও আসলে একটা ধাপ, কারণ পাথরটার ওপর দাঁড়ালে আকাশের দিকেই আরও একটু এগিয়ে যাওয়া যায়। উদ্ভট বলে মনে হলেও তারা এই ভাবনায় আশ্চর্য আনন্দ অনুভব করে যে একটা বাঘ আসলে একটুকরো চলমান আগুনই। মানুষের শরীর থেকে নির্গত ছায়াটা যে তার আত্মা সেটা আর তারা বিশ্বাস করে না, কারণ একবার এক মৃতদেহকে রোদে দাঁড় করিয়ে তারা লক্ষ্য করে ওটার শরীর থেকেও ছায়া বেরোচ্ছে। বৃত্তকে তারা মহত্তম প্রতীক বা চিহ্ন বলে আবিষ্কার করেছে। কারণ একমাত্র বৃত্তেরই কোনও আরম্ভ বা শেষ নেই, কিংবা বৃত্ত যেখান দিয়ে শুরু হয় আবার সেখানেই শেষ হয়। ফলে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তারা হতবুদ্ধিকর চোখে তাকিয়ে থাকে। প্রাণ নামক শক্তি এবং শরীরের কাঠামোর মধ্যে যে একটা তফাত আছে সেটা তারা বুঝতে পারে কারও অক্ষত, নিখুঁত মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে। মৃত লোকটার শরীরের সমস্ত কলকব্জা তো ভেতরেই আছে, তারা ভাবে। তাহলেও সে নড়ছে না কেন? কখনও হতাশা, কখনও স্বস্তির সঙ্গে তারা এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে জীবন শেষ বিচারে একটা হতবুদ্ধিকর খেলাই, এক সময় যার কোনও স্মৃতিই কোথাও থাকবে না।

কিন্তু এই সমস্ত ভাবনা ও উপলব্ধি তাদের ক্ষণস্থায়ী শান্তি দিলেও তারা শেষপর্যন্ত সুখী হয়নি, কারণ অসহায়তার সঙ্গে তারা লক্ষ্য করল প্রতিটি উত্তরই একটা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তাদের মনে হতে লাগল সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পরও হয়ত দেখা যাবে একটা উত্তরহীন প্রশ্ন অন্ধকারে ঢাকা কোনও ভয়ঙ্কর খাদের মতো হাঁ করে তাকিয়ে আছে। তাদের একজন খুব বিভীষিকার ভেতর দিয়ে লক্ষ্য করল জগতের প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি ক্রিয়া বা ঘটনাকে জড়িয়ে অসংখ্য প্রশ্ন মনের ভেতর কাজ করে। এবং সে কয়েকদিন ধরে এরকম চিন্তায় ক্লিষ্ট হল যে মোরগের ঝুঁটি লাল হল কেন, বা প্রাণীর খিদে পায় কেন, বা জল তরল কেন, বা গাছের ফল নিচের দিকে পড়ে কেন, বা কোনও কোনও চিতার শুধু একটা চোখের কোণ দিয়ে একটা গভীর কালো দাগ ঠোঁট পর্যন্ত নেমে যায় কেন। লোকটাকে শান্ত করার চেষ্টা করে অন্যেরা মন্তব্য করল সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জোগাড় করা শেষপর্যন্ত শয়তানের পক্ষেই সম্ভব, মানুষের পক্ষে নয় । এবং হতাশায় ভুগতে ভুগতে তারা সিদ্ধান্ত নিল তাদের প্রধান চিন্তা হওয়া উচিত মনের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর খোঁজা নয়, মনের ভেতর আদৌ কেন প্রশ্ন জাগে সেটারই সমাধান করা। তারপর থেকে তারা সবাই এই জটিলতর প্রশ্নের উত্তর পেতেই দিনরাত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে তাদের মানসিক অবস্থা খুব অসহায় ও ক্লিষ্ট হয়ে গেল। কয়েকদিনের মধ্যেই সবাই রোগা হয়ে গেল। এবং একদিন গোষ্ঠী থেকে বহিষ্কৃত হল।


তিন

‘অন্যেরা আমাদের চেয়ে সুখী,' একজন বলল ।

খুব ভোরে উঠে সে নদীর দিকে চলেছে মাছ বা শামুক ধরবে বলে, যদিও কয়েকদিন ধরে কিছু খেলেই তার বমি হয়। কিছু না খেলেই সে বেশি ভাল থাকে।

'হ্যাঁ। এবং তুমি নিজে আমাদের চেয়ে সুখী,' একজন জবাব দিল, গুহামুখের একপাশে একটা কালো গাছের মতো দাঁড়িয়ে। এই লোকটা গত একুশ দিন ধরে সারারাত ঘুমোয়নি। গুহা থেকে সবাই বেরিয়ে গেলেও সে দিনরাত একা একা গুহার অন্ধকারে পড়ে থাকে। সূর্যের আলো তার আর সহ্য হয় না। তাছাড়া, সে জানে, অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না বলে চিন্তা করতে সুবিধে হয়। তার মাঝেমাঝে মনে হয় গভীরভাবে চিন্তা করার ব্যাপারে চোখ একটা বাধা, শব্দ শোনা যায় বলে কানও একটা বাধা। ফলে সে মাঝেমাঝে চোখ বন্ধ করে এবং কানে আঙুল ঢুকিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করে। এই অবস্থায় সে একদিন, নক্ষত্রহীন মধ্যরাতে, এক মুহূর্তের জন্য বিশুদ্ধ চেতনায় ডুব দিয়েছিল এবং আতঙ্কে সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ও কান থেকে হাত সরিয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করতে করতে নিজের স্বাভাবিক অস্তিত্বে ফেরার চেষ্টা করেছিল।

'তুমি নিজে আমাদের চেয়ে সুখী।'

গুহা থেকে নিচে নামতে থাকা আগের লোকটাকে সে আবার বলল।

'কারণ লুকিয়ে থাকা মাছ বা শামুক ধরার সময় অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও চিন্তার যন্ত্রণা তুমি ভুলে থাকবে। তোমার মন তো তখন মাছ বা শামুকের ওপর নিবদ্ধ থাকবে।"

যাকে বলা হল তার পছন্দ হল না মন্তব্যটা, কারণ তার মতে সে-ই তাদের ভেতর সবচেয়ে অসুখী। কিছু না বলে সে ঘৃণা ও ক্রোধে ভরা দৃষ্টিতে চোখ বোজা লোকটার দিকে তাকিয়ে নিচে নেমে গেল। কিছুক্ষণ পর বাকি দশজন লোকের ভেতর এই নিয়ে তর্ক শুরু হল কে তাদের মধ্যে সবচেয়ে অসুখী। নিজের নিজের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে প্রত্যেকেই অবিশ্রান্ত চেঁচামেচি শুরু করল। একটা বাদুড় ভোরের দিকে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। চেঁচামেচি শুনে তাদের মাথার প্রকাণ্ড ডানার বাতাস ছড়িয়ে ওটা ঘুরপাক খেতে লাগল এবং ওটাকে ধরার চেষ্টার পাঁচজন হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে হাত ওপরে তুলে উল্লসিত চিৎকার করতে লাগল। এরকম করার মধ্যে হয়ত বেশ একটা সুখ ও আনন্দ পাওয়া যাচ্ছে ভেবে বাকিরাও উঠে দাঁড়ায়, আর হাত তুলে চিৎকার করতে থাকে। বাদুড়টা পাক দিয়ে দিয়ে উড়তে লাগল । কিছুক্ষণ ওরকম নাচানাচি করার পর বিষণ্ণ, দুঃখী, চিন্তাক্লিষ্ট মানুষগুলোর মনে হল তারা যা করছে সেটা নিরর্থক, ওতে কোনও স্থায়ী সুখ নেই, এরকম করাটা সময়ের অপচয় এবং তাদের মুল সমস্যার তাতে কোনও সমাধান হবে না। একে একে সবাই বসে পড়ল আবার। বা শুয়ে পড়ল। শান্ত হয়ে গুহার একটা দেওয়াল আঁকড়ে নিশ্চিন্তে ঝুলে থাকে বাদুরটা।

গুহার ঠিক নিচে বাঁদিকে একটা বিপজ্জনক উতরাই, যার কিনারায় একটা মসৃণ ও গোলাকার পাথর পড়ে আছে। একদিন তাদের একজন পাথরটার ওপর খাদের দিকে পা ঝুলিয়ে বসল এবং বসে থাকতে থাকতে তার মনে হল এভাবে বসে আরও ভাল করে চিন্তা করা যায়। উপলব্ধিটা সে অন্যদের কাছে গোপন রাখল। এবং সারাদিন একা একা ওটায় বসে চিন্তা করতে লাগল। একবার তার মনে হল চিন্তা করার সময় ডান হাতের মুঠোটা চিবুকে আর বাঁ-হাতটা হাঁটুর ওপর রাখলে আরও ভাল করে চিন্তা করা যায়। কিংবা মাঝেমাঝে হাঁটুদুটো খাড়া করে মুড়ে চিবুকটা হাঁটুর ফাঁকে ঢুকিয়ে রাখলে। তাকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে অন্যেরা অবাক হয়ে গেলেও বিশেষ গুরুত্ব দিত না। তবে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয় যেদিন, এক দুপুরে, তারা শোনে পাথরটায় বসে থাকতে থাকতে লোকটা আপনমনে কথা বলছে। সে বলছিল তার ভেতর এত প্রশ্ন আদৌ কেন জাগে, তার উত্তর সে যেন পাচ্ছে। এখনও পুরোপুরি না পেলেও শিগগির খুব স্পষ্ট করে পাবে। তার কথা শুনে অন্যেরা হতভম্ব ও ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে এবং অনুমান করে পাথরে ওরকম বিচিত্র ভঙ্গিতে বসার ফলেই লোকটার পক্ষে উত্তর পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। জাদুকরি পাথরটায় বসার জন্য তাদের ভেতর মারামারি শুরু হয়ে গেল। পাথর ছেড়ে লোকটা উঠতে রাজি হচ্ছিল না বলে তারা তাকে ঠেলে উতরাইয়ের দিকে গড়িয়ে দিল। ঠেলাঠেলির ফলে আরও কয়েকজন খাদে গড়িয়ে পড়ে। তাদের ভেতর যার শরীরে তখনও কিছু শক্তি ও তেজ অবশিষ্ট ছিল সে সবাইকে হুমকি দিয়ে ঘোষণা করল পাথরটার ওপর সেই বসবে। এরপর সে ওটার ওপর উঠে বসে আগের লোকটার ভঙ্গিতে ডান হাতটা চিবুকে রেখে চিন্তা করতে লাগল । কিন্তু বাঁ-হাতটা যে কোথায় রাখা উচিত সে ভুলে যায়। চিৎকার করে সে আগের লোকটার কাছে জানতে চাইল বাঁ-হাতটা সে কোথায় রাখবে। আগের লোকটা ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে শুধু তার দিকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না। অন্যেরাও তার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। তারপর কয়েকজন মিলে তাকে ঠেলে দিল নিচের দিকে এবং পাথরে বসার জন্য নিজেদের ভেতর ঠেলাঠেলি করতে লাগল। ক্রমে ক্রুদ্ধ হয়ে সবাই একে অপরকে তাড়া করা শুরু করে। দৌড়তে দৌড়তে পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তারা। তিনদিন তিনরাত বিচ্ছিন্ন থেকে তারা আবার মিলিত হয় এক অগভীর গিরিখাতের ভেতর, সূর্য তখন লাল হতে শুরু করেছে, এবং গিরিখাতটার ভেতর একটা মেয়ে একা কাঠ কুড়োচ্ছে।

মেয়েটাকে তারা চেনে। যে গোষ্ঠীতে তারা থাকত মেয়েটা সেখানকারই একটা লোকের স্ত্রী। তার খোলা বুকে ঝুলছে ঝিনুকের মালা। কোমরে জড়ানো বাঁশপাতার পোশাকে সেলাই করা আছে দুটো বাঘনখ, যা তার বিয়ের প্রতীক ।

এগারোজন লোক তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তাদের সবাইকে মেয়েটাও চেনে, ফলে তাদের দিকে তাকিয়ে সে হাসল, তারপর কাঠ কুড়োনোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। লোকগুলো পরস্পরের দিকে মুক দৃষ্টিতে একপলক তাকায়, তারপর মেয়েটার দিকে। তাদের নাকমুখ থেকে দ্রুত শ্বাস পড়ছিল।

'তোমাকে ছোঁয়া পাপ, কারণ তুমি পরের স্ত্রী,' একজন মেয়েটার উদ্দেশে বলল। ‘কিন্তু আমরা বড় দুঃখী।'

সাপের ফণার মতো তীব্রগতিতে মেয়েটা নিজের ভীত মুখটা সোজা করে তুলল।

'চিন্তায় চিন্তায় আমরা শেষ হয় গিয়েছি,' আর একজন বলল। 'তোমাকে ছুঁলেও যে চিন্তা থেকে মুক্তি পাব তা নয়। তবু এক মুহূর্তের জন্য তো ওটা ভুলব । আমরা ভাবব সারাজীবন ওই একটা মুহূর্তই আমরা বেঁচেছিলাম।'

‘তোমার ওপর জোর করা পাপ,’ আর একজন বলল। ‘তাই তোমার কাছে আমরা প্রার্থনা করছি একটা মূহুর্তের জন্য অন্তত একটু শান্তি দাও। কিংবা আমাদের মাথার ভেতরের জ্বলন্ত অঙ্গারগুলো একটু নিভিয়ে দাও।'

'তুমি কি জানো ওই অঙ্গার নেভাতে?' একজন একটু এগিয়ে গিয়ে খুব ব্যাকুলতার সঙ্গে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে। নিশ্চয়ই জানো। অথবা এরকম আগুন মাথার ভেতর না জ্বালিয়ে কীভাবে মুখে বাঁচতে হয় সেই রহস্যটা জানো। নইলে তুমি কী করে এত সুখে বেঁচে আছ? একটু বলে দাও আমাদের ! আমরা কথা দিচ্ছি, ওটা জানলে আমাদের হাত তোমাকে ছুঁয়ে নিজেদের কলঙ্কিত করবে না।’

সবাই নতজানু হয়ে মেয়েটার সামনে বসে পড়ে। চারপাশ নিস্তব্ধ। পাতার ওপর শব্দ করে একটা নীল গিরিগিটি হেঁটে গেল।

হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার তুলে মেয়েটা দৌড় দিতেই লোকগুলো তার ওপর শাস্ত নেকড়ের পালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মেয়েটাকে তারা যখন ছাড়ে তখন লাল সূর্যটা সেদিনের মতো মৃত্যুবরণ করেছে এবং খুব দূরে যথারীতি সূর্যের উদ্দেশে প্রাত্যহিক প্রার্থনাটা হচ্ছে। সবাই খুব ক্লান্ত। গিরিখাতটার উঁচু ঘাস ও ঝরা পাতার ওপর তারা শুয়েছিল।

একটু পরেই আকাশে উঠল পূর্ণিমার চাঁদ। সবাই নিখুঁত বৃত্তটার দিকে তাকায় হতবুদ্ধিকর দৃষ্টিতে। তারা জানে, যে অপরাধ তারা করেছে তার জন্য প্রত্যেককেই মৃত্যুদণ্ড পেতে হবে। খাদটার ভেতর একটা নরখুলি চাঁদের আলোয় চিকচিক করছিল। একজন উঠে গিয়ে মাটিমাখা খুলিটা তুলে আঙুল দিয়ে ওটার কোটর পরিষ্কার করতে লাগল, তারপর ওটা নিজেদের মাঝখানে রেখে দিল। সবাই স্থিরদৃষ্টিতে খুলিটার দিকে তাকিয়ে, যেন ওটার তাপহীন সুখ ও শাস্তির প্রতি তারা ঈর্ষা বোধ করছে। কিংবা ওই খুলিটার সুখ ও শান্তি যে তাদের প্রত্যেকের ভেতরেই নিহিত আছে সেটা ভেবে স্বস্তি অনুভব করছে। অনেকদিন পর একটু স্বস্তির স্বাদ পেল তারা। আসলে প্রত্যেকেই দ্রুত নিজের মৃত্যু কামনা করছিল।

‘এত জানার ইচ্ছা কেন? এত জানার ইচ্ছা কেন? এই যন্ত্রণা থেকে কি আমাদের মুক্তি নেই? '

চিৎকার করে কথাগুলো বলে ডুকরে কেঁদে উঠল একজন। কেঁদে তার ভাল লাগছিল, কারণ এর আগে অনেক চেষ্টা করেও সে কাঁদতে পারেনি। সংক্রামিত হয়ে অন্যেরাও কাঁদল। একটু শান্ত, নির্ভার ও সুখী হয়ে তারা যখন নিশ্চলভাবে বসেছিল বা শুয়েছিল, তাদের চোখ তখন বন্ধ এবং কানে কোনও শব্দ ঢুকছিল না। ওইরকম নিরুদ্বিগ্ন, চিন্তাহীন, সমর্পিত মুহূর্তে তাদের চেতনা যেন হঠাৎ একটুকরো জলের ধারার মতো পাক দিয়ে নিজেরই ভেতর নেমে গেল এবং প্রত্যেকেই শুনতে পেল, 'না, মুক্তি নেই। কারণ তোমাদের জন্মই তো অনন্ত জ্ঞান থেকে। তাই পরিপূর্ণ জ্ঞানী হয়ে আবার উৎসে ফিরে না আসা পর্যন্ত মুক্তি নেই।‘

চমকে উঠে চোখ খুলে ফেলে সবাই। প্রত্যেকেই স্বীকার করে তাদের ভেতর বাস করা কেউ যেন এক্ষুনি কিছু বলেছে। তারা যে একই কথা শুনেছে প্রত্যেকেই বুঝতে পারল।

প্রশান্ত পূর্ণিমায় ভাসছে আকাশ। একটা অভগ্ন, তৃপ্ত চৈতন্যের মতো লোকগুলো যখন পরস্পরকে জড়িয়ে শুয়েছিল, তাদের গলার ওপর নেমে আসে এগারোটা কুড়োলের কোপ। মরতে অবশ্য তাদের দুঃখ হচ্ছিল না। নিজেদের পাপের জন্যও দুঃখ হচ্ছিল না। তারা কষ্ট পাচ্ছিল শুধু এ কথা ভেবে যে গোষ্ঠীর লোকেদের তারা কিছু বলত, যা বলার সময় তারা আর পেল না। ফলে জগতে কেউই জানল না তাদের কথা।

শুধু ঈশ্বরই সুখী ও নিশ্চিন্ত হলেন। লীলা আরও দীর্ঘায়িত হবে ভেবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ