১।
পুল-কার না আসায় শান্তাই রিকুকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য রিকুকে দেখভালের জন্য শান্তাকে কাজে রাখেনি ঐশী। মনা জন্মানোর পর থেকেই সে একজন আয়া খুঁজছিল। আয়া সেন্টার থেকে খোঁজখবরও নিয়েছিল। এদিকে মেটারনিটি লিভ তার শেষ হয়ে আসছে। সে বুঝতে পারছিল একা আয়ার হাতে ঐটুকু মেয়েকে ছেড়ে কাজে ফেরা তার পক্ষে সম্ভব না। সারাক্ষণ চিন্তায় থাকবে। সঞ্জীবকে এসবে জড়িয়ে কাজ নেই। ডিমনিটাইজেশন আর লকডাউনের পর থেকেই তার কাজের চাপ দ্বিগুন হয়ে গিয়েছে। ব্যাঙ্কের হয়ে সারাক্ষণ ঋণ-খেলাপিদের ধাওয়া করে বেড়াচ্ছে। সারা দক্ষিণ ২৪ পরগণা এখন তার দ্বায়িত্বে। নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। তবে আয়ার সমস্যাটার সমাধান করল সে-ই।
শান্তা তার পিসতুতো বোন। অভাবী সংসারে বড়ো হয়েছে। পিসেমশাই একটা লেদ-কারখানায় কাজ করত। বিয়ের পর শান্তার অভাব আরো বেড়ে গিয়েছিল। বর শুধু গরীব নয়; নেশাড়ুও। ফলে মার খেতে খেতে একদিন সে আবার বাপের কাছে ফিরে এলো। বাপ মেয়েকে ঘরে তুলতে চায়নি। স্বামীর ঘরে ফেরত পাঠাতে চাইছিল। এই সুযোগটাই নিল সঞ্জীব। ঐশীকে বলল, নিজেদের আত্মীয়। সারাক্ষণ এখানেই থাকবে। কোনো পিছুটান নেই। এর থেকে বিশ্বস্ত লোক পাবে কোথায়?
ঐশী জিজ্ঞেস করেছিল, মাইনে কতো বলেছ?
সঞ্জীব চালাকির সুরে বলল, বারো ঘন্টা আয়া রাখার থেকে অনেকটাই সস্তা। এদিকে ২৪ ঘন্টা সার্ভিস পাচ্ছ।
ঐশী সঞ্জীবের চালাকিতে বিরক্ত হল, আহ, বলবে তো কতো? পাঁচ?
সঞ্জীব সোফা থেকে উঠে পড়ে বলল, সাড়ে চার।
- ওহ। ঐশী ভেবে বলল, কিন্তু খাওয়াদাওয়া তো আমাদের সঙ্গেই করবে।
- সারাদিন এখানেই থাকবে। আর খেতে কী বাইরে যাবে?
- না, সেকথা বলছি না। ঐশী নিজেকে সামলে নিল। সে বুঝতে পারল যতই গরীব হোক শান্তা, আসলে তো সে সঞ্জীবের বোনই। বলল, শোবে কোথায়?
এবার সঞ্জীব হেসে ফেলল, সেটা তুমিই দেখে নিও।
শান্তার কাছে একটা সস্তার কি-প্যাড মোবাইল আছে। কালেভদ্রে সেটায় কোনো ফোন আসে। আজকে রিকুকে নিয়ে বাসে ওঠবার পরেই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে লেখা উঠছে - বাবা। যে লোকটা তাকে ঠাঁই দেয়নি, তার ফোন ধরার কোনো ইচ্ছা ছিল না শান্তার। সে ফোনটা কেটে দিল। রিকু পাশে বসে দেখছিল। জিজ্ঞেস করল, ফোন ধরলে না কেন?
কী জবাব দেবে এইটুকু বাচ্চাটাকে? শান্তা ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকল। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন এলো। এবার রিকুর দিকে তাকিয়ে সে ফোনটা ধরেই ফেলল। ওপ্রান্তে বাবা নয়, মা রয়েছে। মা জানাল তার বাবার অবস্থা খুবই খারাপ। সে যেন এখুনি সেখানে যায়। শান্তার সেই সুযোগ নেই। আগে রিকুকে স্কুলে নিয়ে যেতে হবে। ঐশী কিছু লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছে। সেগুলো কিনে আবার রিকুকে নিয়ে বাড়ি পৌছুতে হবে।
রিকু পাশে বসে প্রায় সবটাই শুনে ফেলেছিল। জিজ্ঞেস করল, শান্তাদি তুমি তোমার বাবাকে দেখতে যাবে না।
শান্তা কম কথা বলা মানুষ। জানাল, না।
- কেন?
- এখন যাব না। তোকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আমাকে স্পেনসারে যেতে হবে।
- আমার স্কুল তো ১২টায় ছুটি। তারমধ্যে ঘুরে এসো।
শান্তা রিকুর কথা শুনে হেসে ফেলল।
বাস থেকে নামার সময় রিকু বলল, কিন্তু এখন না গেলে যদি দেরি হয়ে যায়?
- দেরি হয়ে যায় মানে?
- মানে ততক্ষণে যদি তোমার বাবা মারা যায়!
শান্তা থেমে গিয়ে বড়ো চোখ দেখাল রিকুকে।
রিকু বিজ্ঞের মতো বলল, না, মানে আমি ঐটা বলতে চাইনি। কিন্তু যদি ওরকম হয়? এক কাজ করো, এখুনি তোমাদের বাড়িতে চলে যাই।
- আর স্কুল?
- সেদিন তো তুমি আমাকে নিয়ে ঐ দাদার সঙ্গে দেখা করতে গেলে। আমি কি মাকে কিছু বলেছি?
এমন বস্তির ভেতর দিয়ে রিকু আগে কখনো হাঁটেনি। দু-দিকে সারিসারি একই রকম ঘর। খোলা নর্দমা। সেখান থেকে নোংরা গন্ধ বেরোচ্ছে। টাইমকলে জলের জন্য লম্বা লাইন। তিন-চারজন ছেলে প্রায় ন্যাংটো হয়ে হাঁটছে। তাদের প্রত্যেকেরই পেট ফোলা, মুখের তুলনায় মাথাটা বড়ো।
এক কামড়ার ঘর শান্তাদের। একটা আলমারি, দেয়ালে টাঙানো আয়না আর সিঙ্গেল খাটে শুয়ে আছে শান্তার বাবা। লোকটা খালি গায়ে লুঙ্গি পরে শুয়ে শুয়ে হাঁপাচ্ছে। শান্তার মা চামচে করে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেটা খেতে পারছে না।
ভাঙা চেয়ারটিতে কোনোরকমে বসল রিকু। শান্তা তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
লোকটা শান্তার মাকে কী যেন ইশারা করল। শান্তার মা বিরক্ত হয়ে বারান্দা থেকে একখানা ছেঁড়া কাপড় নিয়ে এলো। পরনের লুঙ্গিটা একটানে খুলে ফেলল। রিকুর সামনে একটা কঙ্কালসার উলঙ্গ বৃদ্ধ। শান্তার মা চাদরের ভেজা জায়গাটার উপর ছেঁড়া কাপড়টা বিছিয়ে গায়ে একখানা পাতলা কাপড় চাপিয়ে দিল। লুঙ্গিটা মেঝেতেই পড়ে রইল।
শান্তা ফিরে দেখল রিকু তার কানটা বাবার মুখের কাছে নিয়ে গিয়েছে। শান্তার বাবা ফিসফিসিয়ে কী যেন বলছে। মেয়েকে দেখেই চুপ করে গেল। রিকু সোজা হয়ে দাঁড়াতে অদ্ভুত সুরে হাসতে লাগল। বেশ স্পষ্ট শোনা গেল সেই হাসির আওয়াজ। এই অসুস্থ, মৃতপ্রায় ব্যাক্তিটি কীভাবে এমন করে হাসতে পারে, কেনই বা হাসছে - বুঝতে পারল না রিকু। তার ভয় করতে শুরু করে দিল।
বাড়ি ফিরে রিকু দু-বার বমি করল। গায়ে বেশ জ্বর।
২।
শান্তার বাবা মারা গেল দু-দিন পরেই। তা নিয়ে অবশ্য শান্তাকে দুঃখ করতে দেখা যায়নি। ঘণ্টাতিনেকের জন্য বাড়িতে গিয়েছিল। লাশ শ্মশানে নিয়ে যাবার আগেই ফিরে এসেছিল। ফিরে স্নান সেরে মনাকে সামলে ছিল আগের মতোই। তা দেখে ঐশী সঞ্জীবকে বলেছিল, তোমার বোনের তো কোনো ইমোশনই নেই। দেখে বোঝা যাচ্ছে না বাবা মারা গিয়েছে।
সঞ্জীব অফিস থেকে ফিরে সবে বিছানায় গা এলিয়েছিল। বলল, কঠিন লাইফ তো। মানুষকে ইমোশনলেস করে দেয়।
- তাবলে এরম?
সঞ্জীব কথা ঘোরালো, একটা পেগ বানিয়ে দাও না!
রিকুর জ্বর কমলেও খাবারে অরুচিটা থেকেই গেল। খেতে গেলেই সে শান্তার বাবার হাসিটা শুনতে পায়। যেন এক রুগ্ন অতিমানব খিলখিল করে হাসছে। রিকু খেতে পারে না।
সঞ্জীবের ফিরতে দেরি হয় বলে ঘুম থেকে ওঠে খানিকটা পরে। ঐশী নিউজপেপার পড়তে পড়তে ব্রেকফাস্ট সারে। তখন অনিচ্ছা সত্বেহ মায়ের সঙ্গে খেতে বসতে হয় রিকুকে। বেশিরভাগ দিন সে কোনো রকমে মুখে কিছু পুরেই উঠে পড়ে। বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর কোমোডের ভেতর মুখ নামিয়ে গলায় আঙুল দিয়ে সমস্ত খাবার উগরে দেয়। প্রথম প্রথম বমি করার সময় একটু-আধটু আওয়াজ হত। এখন সে প্রায় নিঃশব্দে বমি করতে শিখে গেছে।
সেদিন প্রিন্সিপালের ডাক পড়ল সঙ্গীব আর ঐশীর।
- কী করেছিস?
রিকু কোনো জবাব দিল না। চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল। ঘরের ভেতর সে আবার খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। সমস্ত জানালা বন্ধ। কিন্তু হঠাৎ দমকা হাওয়ায় তার খাতার পাতাগুলো উলোপালোট হতে শুরু করল। তারপর সেই এক বিচ্ছিরি পেচ্ছাপের গন্ধ। পেটে কিছু নেই। তবু সে বাথরুমে ঢুকে গলায় আঙুল ঢুকিয়ে দিল। তেঁতো থুতু ছাড়া কিছুই উঠল না। তাও খানিক শান্তি পেল রিকু। ঐশী ডাকলেও আর দরজা খুলল না।
স্কুলের লম্বা করিডর। প্রিন্সিপালের রুমের সামনের চেয়ারে বসে রয়েছে রিকু। প্রিন্সিপালের রুমের দরজা বন্ধ। ভেতরে রয়েছে ঐশী আর সঞ্জীব।
প্রিন্সিপাল বললেন, আপনারা ছেলেটির পেছনে কতোটুকু সময় দেন?
সঞ্জীব আর ঐশী কিছুই বুঝতে পারছিল না। প্রিন্সিপালের পাশের চেয়ারে বসে রয়েছেন রিকুদের ক্লাস-টিচার। ওরা তাঁর দিকে তাকাল।
প্রিন্সিপাল আবার বললেন, ওর মধ্যে কিছু পরিবর্তন আপনারা লক্ষ করেছেন?
সঞ্জীব অবাক। পরিবর্তন?
- হ্যাঁ। সেটাই জিজ্ঞেস করছি। ওর মধ্যে কোনোকিছু অস্বাভিকতা লক্ষ করেননি?
- অস্বাভাবিকতা?
ঐশী বলল, ও তো প্রতিবছর র্যাঙ্ক করে। কোনোদিন কোনো কমপ্লেইন কারোর কাছ থেকে পাইনি। কীরকম অস্বাভাবিকতার কথা বলছেন? সাইকোলজিকাল কোনো সমস্যা?
ক্লাস-টিচার বললেন, মাসখানেক ধরে ওকে খুবই অমনোযোগী দেখাচ্ছে। ক্লাসের মধ্যে কী ঘটছে সেই সম্পর্কে ওর যেন কোনো আগ্রহ নেই। আপনারা যদি ওর ক্লাস-ওয়ার্কের খাতাটাও দেখতেন, তাহলেই বুঝতে পারতেন। যে ছেলে ম্যাথসে নাইন্টির নিচে নম্বর পেত না। সে এখন সাধারণ যোগ-বিয়োগ ভুল করছে।
ঐশীর কিছু বলার নেই। চুপ করে গেল।
প্রিন্সিপাল বললেন, শুধু এইটা বলবার জন্য আপনাদের এখানে ডাকা হয়নি।
- তাহলে? সঞ্জীব চমকে উঠল।
প্রিন্সিপাল একটা চার্ট দেখিয়ে বললেন, গত একমাসের মধ্যে আপনার ছেলের ওজন কমে গিয়েছে সাড়ে সাত কেজি। গতকাল হেলথ চেক-আপের সময় ও ক্লাসের মধ্যে বেঞ্চের তলায় লুকিয়ে পড়েছিল। কিছুতেই ওয়েট মেশিনের ওপর দাঁড়াতে চাইছিল না। শেষে ওকে জোর করে দাঁড় করানো হয়েছিল।
প্রিন্সিপাল থামলে ক্লাস-টিচার শুরু করলেন, শুধু তাই না। আমি ওর ক্লাসের অন্যান্যদের জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছি ও রোজই টিফিন ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসে। মাঝে মাঝেই ওয়াশরুমে যায়। সেখানে অনেকেই ওকে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করতে দেখেছে।
প্রন্সিপালের রুম থেকে বেরিয়ে ঐশী দেখল রিকু যেন কী এক আতঙ্কে মুখ নীচু করে বসে রয়েছে। কিছুতেই মুখ তুলে চাইছে না। কেঁপে কেঁপে উঠছে।
খানিকপর সে খেয়াল করল সামনেই একটা ছেলে আপেল কামড়ে খাচ্ছে। রিকু বুঝি ছেলেটার খাওয়া দেখেই ভয় পেয়েছে। ছেলেটাও বুঝে ফেলেছে রিকু ভয়ের কারন। তাই সে বেশি বেশি দেখিয়ে আপেলে কামড় বসাচ্ছে। আপেল চিবোতে চিবোতে হাসছে।
ঐশী ছেলেকে জড়িয়ে ধরতেই বুঝতে পারল রিকু কতোটা রোগা হয়ে গিয়েছে। সঞ্জীব ছেলেকে কোলে তুলে গাড়ির দিকে যাচ্ছিল। রিকু বাবার পিঠেই বমি করে ফেলল।
ডাঃ চ্যাটার্জি কলকাতা শহরের একজন বিশিষ্ট গ্যাস্ট্রো-এন্টারোলজিস্ট। তাঁর এপোয়েন্টমেন্ট পাওয়াই মুশকিলের। যা-হোক সঞ্জীব তার এক বন্ধুর মারফত সেই কাজটা করে ফেলেছে।
ডাঃ চ্যাটার্জি বেশ খুঁটিয়ে রিকুকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেন। রিকু বেড থেকে একা উঠতে পারছিল না। তার মাথা ঘুরছিল। ঐশী তাকে ধরে ধরে চেয়ারে বসালো।
ডাঃ চ্যাটার্জি বললেন, একুউট ম্যাল-নিউট্রিশনে ভুগছে। একদম ক্লাসিক এক্সাম্পেল। খেয়াল করে দেখবেন ওর পেটটা ক্রমশ ফুলে উঠছে। এখন তো ও সাধারণ অবস্থাতেই হাঁপিয়ে উঠছে। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে বেশ কিছুকাল ছিলাম। তখন এই ধরণের বাচ্চা প্রতিদিন বেশ কয়েকটা করে দেখতে হত। তবে ওরা প্রত্যেকেই বিলো-প্রভার্টি লেভেলের। সাধারণত এই রোগ তো গরীবদের। দীর্ঘদিন ঠিকমতো খেতে না পেলে বাচ্চারা ম্যাল-নিউট্রিশনে ভোগে। আমি ভাবছি আপনাদের মতো ফ্যামিলিতে এই রোগ এলো কীভাবে? আপনারা কি বাচ্চাটির খাবারের দিকে একদম নজর রাখেন না?
ঐশী কোনোরকমে বলল, আসলে আমরা দুজনাই তো কাজে...
কথাটা শেষ করতে দিলেন না ডাঃ চ্যাটার্জি। বললেন, এটা কোনো অজুহাত হতে পারে না।
সঞ্জীব জিজ্ঞেস করল, এখন, মানে এখন কী করা যায়।
ডাঃ চ্যাটার্জি জিজ্ঞেস করলেন, ওর কি কিছুদিন আগে জ্বর কিংবা অন্যকিছু হয়েছিল।
ঐশী রিকুর জ্বরের কথাটা জানাল।
ডাঃ চ্যাটার্জি বললেন, এখন স্কুল একদম বন্ধ। টোটাল বেডরেস্ট। তবে আমি একটা এন্ডোস্কপি করতে চাই। কিছু ব্লাড-টেস্ট লিখে দিলাম। আর ও এখন যা খেতে চায় সেটাই খেতে দিন। আপনারা সামনের সপ্তাহে রিপোর্টগুলো নিয়ে আসুন।
রক্তে কোনো দোষ পাওয়া গেল না।
রিকুকে একটা বেডে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। নার্স ওকে গাল হা করতে বলল। রিকু হা করতে তার গালে স্প্রে দিয়ে দেওয়া হল। নার্স বলল, তোমার গাল দিয়ে আমরা একটা নল ঢুকিয়ে দেখব তোমার পেটের ভেতর কোনো সমস্যা আছে কী না। এই স্প্রেটার জন্য জিভ একটু তেঁতো হয়ে যাবে, কিন্তু তোমার কোনো কষ্ট হবে না। ভয় লাগছে?
রিকু দু-দিকে মাথা নাড়ল।
নার্স ডাঃ চ্যাটার্জিকে বলল, স্যার রেডি।
খাদ্যনালী দিয়ে বেশ মোটা একটা নল ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে পাকস্থলি অব্ধি। ডাঃ চ্যাটার্জি নলটাকে কখনো সামন্য উপরে তুলে, আবার কখনো একদম নীচে নামিয়ে মনিটরে চোখ রাখছিলেন।
নার্স চোখ বন্ধ করে থাকতে বলেছিল রিকুকে। রিকু কিন্তু মাথা খানিকটা বেঁকিয়ে নিজেই মনিটরে চোখ রাখল। মনিটরের সাদাকালো পর্দায় সে তার নিজের খাদ্যনালী, পাকস্থলি দেখছিল। পেটের ভেতর যেন কীসের প্যাঁচ। সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গের আশপাশ অন্ধকার। গাঢ় অন্ধকার।
ডাঃ চ্যাটার্জি অভ্যস্ত হাতে নলটা বার করে নিতেই সে হেসে উঠল। যে ছেলে কথা বলতে গেলেই হাঁপিয়ে উঠত, সে এখন স্পষ্ট খিলখিল করে হাসছে। রিকুর হাসিটা ঠিক শান্তার বাবার মতোই।
ডাঃ চ্যাটার্জির কোনো পরামর্শই কাজে দিল না। রিকু কিছুই খেতে চায় না। এমনকি জলও। তার ঠোঁট শুকিয়ে গিয়ে ফেটে গিয়েছে। ফাটা ফাটা ঠোঁট দিয়ে মাঝে মাঝেই রক্ত বেরোয়। তখন ভেজা তুলো দিয়ে ঠোঁটটা ভিজিয়ে দেয় ঐশী।
একদিন তার রাগ এসে পড়ল শান্তার উপর। রিকু আজকাল অন্যকে খেতে দেখেও ভয়ে কুঁকড়ে যায়। সঞ্জীব আর ঐশীর খাওয়াও তাই উঠেছে প্রায়। মনাকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে তবে সে ছেলের কাছে আসে। সে ছেলের অসুখের জন্য ১৫দিন স্কুল থেকে ছুটি নিয়েছিল। এখন ছুটিটা আবার এক্সটেন্ড করছে চাইছে।
দুপুরে ছেলেকে খাটে শুইয়ে নিচে নেমে এসেছিল ঐশী। সে শুনতে পেল রান্নাঘর থেকে শান্তা গুনগুন করে সুর ভাঁজছে। বাড়িতে একটা ছেলে মরতে বসেছে তাতেও শান্তার কোনো হেলদোল নেই।
সে রান্নাঘরে ঢুকে অবাক। শান্তা্র থালায় ভাতের ঢিবি। মাছের ঝোল দিয়ে সে বড়ো বড়ো গ্রাস তুলছে মুখে। আয়েসে গান গাইছে। খাওয়া ছাড়া এই মুহুর্তে সারা দুনিয়া তার কাছে শূন্য।
ঐশী চেঁচিয়ে উঠল, এই কী করছিস তুই?
পেছনে ঐশী চলে এসেছে বুঝতে পারেনি শান্তা। সে থালাটা সরিয়ে রাখতে গেল। ঐশী আবার চেঁচিয়ে উঠল, তোর আসা থেকেই আমার ছেলেটার এই অবস্থা হয়েছে। কী করেছিস ওকে? কিছু খাইয়ে দিসনি তো?
- কী খাওয়াব দিদি।
- বিষ খাইয়ে দিসনি ওকে!
বৌদির মুখে এমন অপবাদ শুনে শান্তা চোখ ছলছল করে উঠল।
- আর দিদি বলে কাঁদতে হবে না। ঐশী এবার একটু গলা নামিয়ে বলল, বলে দে'না ওকে তুই কী করেছিস? কিছু খাইয়ে দিয়েছিস? বল না। এখনো তো সময় আছে। কী খাইয়ে দিয়েছিস বললে ডাক্তাররা নিশ্চয় কিছু ব্যবস্থা করে দেবে। তোর টাকা চাই? আমার উপর তোর খুব হিংসা না?
শান্তা মাথা নীচু করে নিল। বলল, দিদি আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি।
ঐশীর আবার মাথা গরম হয়ে গেল। ঠাঁসিয়ে থাপ্পড় কষাল শান্তার চোয়ালে। শান্তার মাথাটা ঠুকে গেল মাইক্রোয়েভের কোণায়। সামান্য রক্ত বেরলো।
শান্তা আঁচলে রক্তটা মুছে বলল, দিদি একটা কথা বলব?
- আবার কী বলবি বেয়াদপ।
- রিকু তো স্বাভাবিকই রয়েছে। তোমরা অযথা চিন্তা করছ। আমাদের পাড়ায় গিয়ে দেখো এরম কতো ছেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কথাটা বলেই শান্তা বিচ্ছিরিভাবে হাসল। তারপর ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেল।
ডাঃ চ্যাটার্জি একজন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছেও পাঠিয়ে ছিল ওদের। রিকুকে কাউন্সিলিং করা হল। কিন্তু তাতেও তেমন কাজ হল না।
রাতের বেলা। নিচ থেকে কীসের যেন আওয়াজ আসছে। সঞ্জীব সন্তর্পনে উঠে সিঁড়ি দিয়ে নিচে তাকাতেই দেখল ডাইনিং টেবিলে বসে ফ্রিজ থেকে পাউরুটি, চকোলেট, কেক বার করে গোগ্রাসে গিলছে রিকু। ঐশীও উঠে পড়েছিল। কিছু বলতে গেলেই সঞ্জীব তাকে চুপ করিয়ে দিল।
কেক, পাউরুটি, চকোলেট, কাচা ডিম সব চটকে নিয়ে মুখে পুরছে রিকু। সে কিছুই চিবোচ্ছে না। সটান গিলে নিচ্ছে। যেন কতো বছর ধরে খেতে পায়নি ছেলেটা। ছেলেটা যেন মানুষ না। না খেয়ে খেয়ে কীভাবে খেতে হয় সেটাই ভুলে গিয়েছে।
আনন্দে ঐশী সঞ্জীবকে জড়িয়ে ধরেছিল। আর ঠিক তখনই রিকু গলার ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে সবটা টেবিলেই উগরে দিল। উগরে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই সে প্রচন্ড জোরে হেসে উঠল। তারপর জ্ঞান হারাল বোধহয়।
ডাঃ চ্যাটার্জির অধীনেই রিকুকে এডমিট করানো হল। ডাক্তার চ্যাটার্জি বললেন, আপাতত রাইস টিউব দিয়ে খাওয়নোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে যেটা সন্দেহ করেছিলাম সেটার ইঙ্গিত ইতোমধ্যে পাচ্ছি। ক্রিয়েটিনিন বেশ হাই। কিডনিতে এফেক্ট পড়েছে। এছাড়া অন্যনান্য অর্গানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। আগামীকাল একটা এমআরআই করব।
ডাঃ চ্যা্টার্জি যখন কথা বলছিলেন ঠিক সেইসময় কেবিন থেকে নার্সের চীৎকার শোনা গেল। তারা দৌড়ে গিয়ে দেখল রিকু হাত দিয়ে রাইস-টিউব বার করার চেষ্টা করছে। মুখ আর নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে নামছে।
দৃশ্যটা দেখতে পেল না ঐশী। সে বাইরে বেরিয়ে গেল।
ডাঃ চ্যাটার্জি আবার রাইস-টিউবটা খুলে নিলেন। এবার রিকুর হাত দুটো-বেধে রাইস-টিউব ঢোকানো হবে। সঞ্জীবও বাইরে বেরিয়ে আসছিল। আচমকা সে খিলখিল হাসির শব্দ পেল। মানুষ না, যেন এক অতিমানব ধ্বংসলীলা চালানোর মাঝে খিলখিল করে হেসে উঠছে।
তারপর সবকিছু শান্ত। নিস্তেজ। রিকু মারা গেল।
৩।
সবকটা প্যান্টই ঢোলা হয়ে গিয়েছে। কোনোদিন যে এই প্যান্টগুলো তার কোমরের খাপে ঠিকঠাক এঁটে যেত, এখন যেন সেটাই বিশ্বাস হয় না। বেল্ট কোথায়? সোফার তলা, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, চেয়ার সরিয়েও তা পাওয়া গেল না। তার প্যান্টটা কোমর থেকে হাঁটুতে নেমে গিয়েছে। আন্ডার-ওয়ার পরেনি। এই অবস্থাতেই সে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক খুঁজে চলেছে বেল্ট।
তাকে দেখে হেসে উঠল ঐশী। সে সিঁড়িতে বসে রয়েছে। পরনে শুধুই একখানা শায়া। উর্ধ্বাঙ্গে কোনো কাপড় নেই।
ঐশী সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারছিল না। এখন দাঁড়ালেই তার পা কাঁপে। কোনোমতে বসে বসে সিঁড়ি থেকে নেমে মেঝেয় নিজেকে হেঁচড়ে হেঁচড়ে আলনার কাছে গেল। সেখানে থেকে একখানা ফিতে নিয়ে সঞ্জীবকে দেখিয়ে বলল, এইটা।
একটা শব্দ উচ্চারণ করেই হাঁপিয়ে উঠল সে।
সঞ্জীব ফিতে দিয়ে প্যান্টটা বেঁধে নিল।
দীর্ঘদিন পর কলকাতার রাস্তায় আবার হাঁটছিল সঞ্জীব। তার কোনো উদ্দেশ্য নেই। এমনিই হাঁটছিল। বচ্চনের ধাবার সামনে দিয়ে যাবার সময় রান্নার তীব্র গন্ধ তাকে নাকে এলো। গা গুলিয়ে গেল তার। জোম্যাটোর ডেলিভারি বয়রা বাস-অটোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। ফুটপাথে রোলের দোকান। ফুচকা বিক্রি হচ্ছে। কয়েকজন কলেজের ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে ফুচকা খাচ্ছে। কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল সঞ্জীব। আশপাশে দেখল কেউ আছে কীনা। নিশ্চিন্ত হবার পর গলায় আঙুল দিয়ে বমি করল। দিনে বেশ কয়েকবার গলায় আঙুল দিয়ে বমি করতে হয় তাকে। গলার ভেতরটা বুঝি ছলে গিয়েছে। থুতুর সঙ্গে বেশ খানিকটা কাঁচা রক্ত উঠে এলো। রক্তের নোনতা স্বাদটা জিভে ছড়িয়ে পড়তেই তার মুখ বিগড়ে গেল। এখন গলা খাঁকারি দিলে গলাটা খচখচ করে ওঠে। মনে হয় গলায় বুঝি মাছের কাঁটা ফুটে আছে। মাছের প্রসঙ্গ মনে উঠতেই সে আঁশটে গন্ধ পেল। কাছেই লেক-মার্কেট। সে সেদিকে গিয়ে দেখল বেশ জমজমাট বাজার বসেছে। সবুজ-হলুদ ক্যাপ্সিকাম, লেটুস পাতা, লাউ, কুমড়ো...আরও কত কী! লোকজন বাজার করছে। খাদ্যদ্রব্য কিনতে পেরে তারা যেন কী খুশি। লেক-মলের পেছনেই মাছের মার্কেট। ভেতরটা ঢুকল না সঞ্জীব। সে মনে মনেই বলল, ছ্যাঃ। নোংরা...নোংরা চারদিকে।
সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। সাদার্ন এভিনিউ-র ফুটপাথ ধরে হাঁটছিল সে। এখানে ফুটপাথে বেশ কয়েকটা পরিবার বাস করে। একটা বাচ্চা ভাঙা তিন চাকার সাইকেল চালাচ্ছে। স্টোভ জ্বালিয়ে তার মা রান্না চাপিয়েছে। সঞ্জীব নাকে রুমাল চেপে ধরল। একজন লোক অঘোরে ঘুমোচ্ছে। তার চোখের পাতায় মাছি বসেছে। তাতেও তার কোনো হেলদোল নেই। কী মনে হতে সঞ্জীব লোকটার কপালে হাত দিল। লোকটার গা অস্বাভিক রকমের ঠান্ডা। সে চমকে উঠেছিল। মারা গেছে নাকি? তখনি সে বুঝল তাকে যেন কেউ ডাকছে। সে তাকিয়ে দেখল মহিলাটা স্টোভের আগুন কমিয়ে দিয়ে তাকে হাতের ইশারায় ওদিকে যেতে বলছে। সঞ্জীব গেলে মহিলাটি বলল, আজ প্রচুর টেনেছে। যেতে পারবে না। ওকে নিয়ে যাও।
দূরে পুরনো বাড়ির গাড়িবারান্দার নিচে বসে বিড়ি টানছিল কম বয়েসি ছেলেটি। মহিলাটি বলল, ও যাবে।
আর ওখানে দাঁড়াল না সঞ্জীব। রাস্তা পেরিয়ে অন্য ফুটে উঠে পড়ল।
ঘরে লাইট জ্বালায়নি ঐশী। সঞ্জীব নিজেও লাইট জ্বালালো না। অস্পষ্ট আলোয় সে দেখতে পেল সোফায় শুয়ে রয়েছে ঐশী। ধারালো নখ দিয়ে নিজের চামড়া ছিঁড়ে ফেলছে। বেশ কিছুদিন হল তার গায়ে র্যাশ বেরিয়েছে। প্রথমে গলার দিকে লাল লাল ছোপ দেখা গিয়েছিল। এখন সারা গায়েই তা ছিড়িয়েছে। সঞ্জীব ঘরে ঢুকতেই ঐশী ইশারায় তার পিঠ চুলকে দিতে বলল। সঞ্জীব যত জোরেই আঁচড় কাটলো, ঐশী বলতে লাগল, আরও জোরে...আরও জোরে...
সঞ্জীব উঠে পড়ল। রান্নাঘরের বেসিনের পাশে রাখা থাকে স্টিল-স্ক্রাবার। সে সেটা নিয়ে এলে ঐশী ঠিক বাচ্চা মেয়ের মতো নিজের পিঠটা এগিয়ে দিল।
প্রথমে আসতে আসতে ঘষছিল সঞ্জীব। ঐশী দু-দিকে মাথা নাড়ল। এবার সে গায়ের জোরে ঐশীর পিঠ স্টিল-স্ক্রাবার দিয়ে ঘষে দিতে লাগল। ঐশীর মুখে হাসি ফিরে এসেছে। তার পিঠের চামড়া উঠে যাচ্ছে। চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। সারা পিঠ লাল রক্তে দগদগ করছে যেন। সঞ্জীব নিজেও দুর্বল। তাছাড়া আজকে বেশ কিছুক্ষণ হেঁটেছিল। সে আর ঘষতে পারছিল না। ঐশীকে জড়িয়ে বসে থাকল সোফায়। তার টি-শার্টে ঐশীর পিঠের রক্ত মিশে যেতে থাকল।
ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এসেছিল সঞ্জীবের। হঠাৎ কী মনে পড়ায় সে তড়িঘড়ি উঠে পড়ল। ঐশীকে প্রায় টানতে টানতে বাথরুমে নিয়ে গেল। ঐশীর মুখটা কোমোডের উপর ঝুঁকিয়ে সে প্রতিদিকার মতো গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করিয়ে দিল। বমি করে মেঝেতেই লুটিয়ে পড়েছিল ঐশী। সঞ্জীব আবার তাকে তুলল। এবার নিজের গালটা হাঁ করে ঐশীর সামনে নিয়ে গেল। ঐশী তার আঙুল সঞ্জীবের গলার ভেতর ঢুকিয়ে উপর-নীচ ঠেলতে থাকল। বমি হচ্ছে না সঞ্জীবের। তার চোখ লাল হয়ে উঠছে। ঐশী দুটো আঙুল দিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছিল। এবার সে তিনটে আঙুল তার গলার অনেকটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। ওয়াক শব্দ হল মাত্র। ঐশী আঙুলগুলো বের করতে দেখল তার আঙুলগুলো সঞ্জীবের গলার রক্তে ভিজে গিয়েছে।
আবার সোফায় ফিরে গেল তারা।
রাত গভীর হয়েছে। আশপাশের সবকটা ঘরের লাইট নিভে গিয়েছে। একটা কুকুর বেশ কিছুক্ষণ ধরে চেঁচাচ্ছিল। সেটাও এখন থেমে গেছে।
আচমকা ঘরের সবকটা লাইট জ্বলে উঠল। এতো আলো কতোদিন দেখেনি সঞ্জীব। সে তাকাতে পারছিল। ঐশী চোখের উপর আঙুল তুলে রেখেছে। ধীরে ধীরে একটা অবয়ব স্পষ্ট হল। অবয়বটি শান্তার। তার হাতে একটা জ্যান্ত মাছ ছটফট করছে।
সে এগিয়ে এসে সঞ্জীবকে বলল, দাদা, খিদে পায়নি তোমার?
মাছের আঁশটে গন্ধে বসে থাকতে পারছিল না সঞ্জীব।
ঐশী কোনোমতে শান্তাকে বলল, খুনী! তুই খুনী।
ঐশীর কথা শুনে হেসে ফেলল শান্তা।
সে সঞ্জীবকে ধমক দিতে সঞ্জীব চুপ করে গেল।
শান্তা বলল, গাল হা করো দাদা।
সঞ্জীব দুহাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল। ঐশী চেঁচাতে পারছে না। তার গলা দিয়ে শুধু শাঁ-শাঁ শব্দ বেরোচ্ছে।
শান্তা আবার শাসানী দিল, মুখ খোল দাদা। আমি কিন্তু দুবার বলব না।
শান্তার ধমক শুনে সঞ্জীব গাল হা করল।
শান্তা বলল, এইটুকু হা করলে অতোবড়ো মাছটা ঢুকবে কীভাবে?
শান্তা এদিক-ওদিক কী যেন খুঁজল। ড্রয়ার থেকে স্ক্রু-ড্রাইভারটা বের করে বলল, এটাতে হবে।
ঐশী আতঙ্কে সোফা থেকে নেমে হেঁচড়ে হেঁচড়ে পালাতে যাচ্ছিল।
তাকে পেছন থেকে ডাকল শান্তা। ঐশী তাকাতেই স্ক্রু-ড্রাইভারটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, এটাতে হবে না বৌদি?
শান্তা স্ক্রু-ড্রাইভারটা সঞ্জীবের মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দুই চোয়ালের মাঝখানে গিঁথে দিল। চোয়ালের হাড় ভেদ করে স্ক্রু-ড্রাইভারের অগ্রভাগ অনেকটাই ঢুকে গেল ভেতরে।
মাছটা তখনো লাফাচ্ছিল টেবিলে। সে মাছটাকে চেপে ধরে সঞ্জীবের মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে থাকল। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে সঞ্জীবের মুখ দিয়ে। মাছটার লেজটুকু তখনো বাইরে। সেটা শান্তার দুই হাতের মধ্যে ঝাপটা দিতে দিতে শেষপর্যন্ত পুরোটাই ঢুকে গেল।
বেশিদূর যেতে পারেনি ঐশী। সিঁড়ি কাছটায় যেতে পেরেছিল মাত্র। শান্তা তার কাছে গিয়ে বসল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বলল, ভয় পাচ্ছ কেন বৌদি। এটাতো নর্ম্যাল।
ঐশী এতোটাই শুকিয়ে গিয়েছে যে তাকে কোলে তুলতে বিশেষ বেগ পেতে হল না শান্তার। সে ঐশীকে সঞ্জীবের পাশে বসাল। তারপর ধীর গলায় বলল, তোমার জন্য মাছের ঝোল রেঁধেছি। একটু বসো, নিয়ে আসছি।
থালাতে ভাত, বাটিতে মাছের ঝোল আর গ্লাসে জল ভরে নিয়ে এলো শান্তা। সে নিজে ভাতের সঙ্গে ঝোল মাখিয়ে ঐশীর মুখের সামনে ধরল। ঐশী খাবারটা মুখে নিল বটে তবে গিলতে পারল না। কতোদিন কোনোকিছু খায়নি সে। কীভাবে খেতে হয় সেটাই বুঝি ভুলে গেছে। শান্তা বুঝতে পেরেছিল। সে একটুখানি ভাত নিজে মুখে নিয়ে কীভাবে খেতে হবে তা দেখাল ঐশীকে।
ঐশীর জন্য আবার গ্রাস তুলেছে শান্তা। এবার সে গুনগুন করে গান ধরেছে। এই গানটাই সেদিন রান্নাঘরে গাইছিল সে - ঐশীর মনে পড়ল।
গ্রাসটা মুখে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল ঐশী। মুখ নাড়তে ভুলে গিয়েছে সে। ভাবলেশহীন মুখে শুধু শান্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
শান্তা গুনগুন থামিয়ে ঐশীকে ইশারা করল। ঐশী ঢোঁক গিলল। কিন্তু বেশীক্ষণ খাবারটা শরীরে রাখতে পারল না। পুরোটাই উগরে দিল থালায়।
শান্তা উঠে পড়ল। ঐশী ভয়ে কাঁপছে। সেদিকে তাকিয়ে শান্তা মুচকি হেসে চলে গেল।
ঘরের ভেতর থেকে দীর্ঘদিন কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। গত দুই-তিন দিন ধরে তীব্র কটু গন্ধ বেরোচ্ছে। প্রতিবেশিরা পুলিশে খরর দিয়েছিল। পুলিশ দরজা ভেঙে দেখল ঐশী আর সঞ্জীব সোফায় এলিয়ে পড়ে রয়েছে। দুজনার গায়েই কোনো কাপড় নেই। ঐশীর সারা গায়ে আঁচড়ের দাগ। তবে তারা এখনো জীবিত। গোঁ-গোঁ আওয়াজ করছে।
গন্ধটা আসছিল উপরতলা থেকে। পুলিশ বেডরুমের দরজা খুলতেই তীব্র গন্ধে নাকে রুমাল চাপা দিল। দোলনাটা একটা কাপড় দিয়ে ঢাকা। কাপড় সরাতেই দেখা গেল মনার পচা-গলা দেহ। বাচ্চাটির নাক দিয়ে, কানের ফুটো দিয়ে কিলবিল করে কৃমির মতো লার্ভা বেরিয়ে আসছে।
৪।
মনার দেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছিল। কোনো আঘাতের চিহ্ন মেলেনি। অপুষ্টিজনিত কারনেই বাচ্চাটির মৃত্যু ঘটেছে - রিপোর্টে এমনি মন্তব্য করা হয়েছিল।
সঞ্জীব আর ঐশীকে ডাঃ চ্যাটার্জির আন্ডারেই ভর্তি করানো হয়েছে। তাদের হাত বেডের সঙ্গে বাঁধা। রাইসটিউবে খাবার দেওয়া হচ্ছে। হাতে সেলাইনের সুচ ফোটানো।
কয়েকদিনের মধ্যেই সঞ্জীব আর ঐশীর দ্রুত উন্নতি লক্ষ করা গেল। ভর্তির সময় ঐশীর ওজন ছিল ৩২। সঞ্জীবের ৪৩। এখন দেখলেই বোঝা যায় তারা সুস্থতার দিকে এগোচ্ছে।
ডাঃ চ্যাটার্জি ভেবেছিলেন আরও কিছুদিন তাদের এইভাবে রাখতে হবে। কিন্তু তিনি বুঝেছেন এদের আসল সমস্যাটা তো শরীরে্র নয়, মনের। এখন যত দ্রুত স্বাভাবিক ডায়েটে নিয়ে আসা যায়, ততই মঙ্গল। এই অবস্থায় একজন সাইক্রিয়াটিস্ট কীই বা করবেন!
নিজের রুমে বসে স্যান্ডুইসে কামড় দিতে গিয়ে একটা বিচ্ছিরি ভাবনা তার মাথায় ঢুকল। তিনি স্যান্ডুইসটা রেখে দিলেন। ম্যালনিউট্রিশন কি কোনোভাবে কন্টাজিয়াস হতে পারে? মানে বসন্ত, কলেরার মতো ছোঁয়াচে? চমকে উঠলেন ডাক্তার চ্যাটার্জি। স্যান্ডুইসটাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করলেন – কী হয়েছে আমার? এইসব আনসাইন্টিফিক কোশ্চেন নিয়ে কেন মাথা ঘামাচ্ছি!
তিনি একটু রিস্ক নিয়েই রাইসটিউটা রিমুভ করলেন। তখনো সেলাইন চলছিল। রাতে সেমি-সলিড খাবার দেওয়া হয়েছিল – দু-জনাই দু-চামচের মতো খেতে পারল।
সঞ্জীব আর ওইশী দুজনাই এখন উঠে বসতে পারে। তারা পুলিশের সঙ্গেও কথা বলেছে। একজন সাইক্রিয়াটিস্ট প্রতিদিন এসে ঘন্টাখানেক ধরে কাউন্সিলিং করেন। ঐশী আর সঞ্জীব তাদের সাধ্যমতো সাহায্যই করে।
সঞ্জীবের বাবা-মা দু-জনাই গত হয়েছেন বেশ কিছুকাল আগে। ঐশীর বাবা এসেছেন মেয়ে-জামাইকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করতে। ঐশীর বাড়ি জলপাইগুড়ি। হাসপাতাল থেকে তারা সোজা উত্তরবঙ্গে চলে যাবে।
কতোদিন পর আবার নিজের ঘরে ফিরে এলো ঐশী। তাদের ঘরটি বেশ বড়ো। সামনে উঠোন। কিন্তু সদর দরজায় সবসময় চাবি দেওয়া। চাবিটি ঐশীর বাবা নিজের কাছেই রেখেছেন।
ঐশীদের ঘটনাটা বেশ কিছুদিন প্রাইম-টাইমে চলেছিল। তাই পাড়াপ্রতিবেশিদের উৎসাহের শেষ নেই। কিন্তু কারোকেই বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি বাইরে কোনো কাজে বেরোলে ঐশীর বাবা চাবিটা নিজের সঙ্গেই নিয়ে যান। তখন বাড়ির ভেতরে সকলেই বন্দী অবস্থায় থাকে।
কোজাগরী চাঁদ উঠেছে আকাশে। সেই চাঁদের আলো জানালা দিয়ে সঞ্জীবের মুখে এসে পড়েছে। পাশ ফিরে সঞ্জীবকেই দেখছিল ঐশী। সঞ্জীবকে এতো সুন্দর কখনোই তার মনে হয়নি। সে নিজের মনেই গুনগুন করে গান গেয়ে উঠল। সঞ্জীব চোখ খুললে বলল, ছাদে যাবে?
ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। চাঁদের আলোয় সারা দিগন্ত যেন ভেসে যাচ্ছে। আলো তো নয়, যেন বৃষ্টি। এক অলৌকিক আলোর বৃষ্টি নেমে এসেছে পৃথীপৃষ্ঠে।
সে সঞ্জীবকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। আচমকা কে যেন ডাকল, বৌদি!
তারা পেছন ফিরে দেখে শান্তা দাঁড়িয়ে রয়েছে। শান্তা বলল, বৌদি আমাকে তোমরা ভুল বুঝো না। রিকু তো আমার ছেলের মতো। আমি কোনোদিন ওকে বিষ দিতে পারি?
কোনো কথাই বলতে পারছিল না ঐশী।
শান্তা এবার সঞ্জীবকে ডাকল, দাদা, তুমি তো আমাকে ছোটোবেলা থেকে জানো। আমাদের বাড়িতেও তো তুমি গিয়েছিলে ক'বার। ওখানে দেখোনি হাড় জিরজিরে পেটফোলা বাচ্চাদের ঘুরতে? যা হয়েছে, তা তো স্বাভাবিক। রিকুর মৃত্যুটাও স্বাভাবিক। মনার মৃত্যুটাও স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক কিছু দুনিয়ায় ঘটে নাকি আর!
শান্তা তাদের কাছে এসে দাঁড়াল।
চাঁদের আলোর নিচে তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঐশীদের বাড়ির কাছে কোন জঙ্গল নেই। তবু তারা খেয়াল করল ঘন জঙ্গল এগিয়ে আসছে। কতোদিনকার পুরনো গাছ, জীবজন্তু নিয়ে জঙ্গল এগিয়ে আসছে।
শান্তা বলল, যাবে?
- কোথায়?
জঙ্গলের সব জায়গায় চাঁদের আলো সমানভাবে পড়েনি। বড়ো বড়ো গাছগুলো মুঠি পাকিয়ে অন্ধকারকে চেপে রেখেছে। সেইসব জায়গাগুলোয় কতো কতো মানুষের অবয়ব। কাছে গেলেই তারা খিলখিল করে হেসে উঠছে। কোথায় দেখেছে এইসব হাড় জিরজিরে মানুষগুলোকে? কলকাতায়? ফুটপাথে? বস্তির ভেতর? কোথাও বেড়াতে যাবার সময় অচেনা রাস্তার ধারে?
একটি বাচ্চা সঞ্জীবের হাত ধরে টানল। জিজ্ঞেস করল, তুমি তো সেই লোকটা।
সঞ্জীব অবাক!
- কে?
- আমাকে মনে পড়ছে না? সেই যে ফুটপাথে আমার বাবা শুয়েছিল। আর তুমি তার কপালে হাত দিয়ে দেখছিলে লোকটা বেঁচে আছে কী না। তখন তো আমি সাইকেল চালাতে চালাতে তোমাকে দেখছিলাম।
সঞ্জীব বাচ্চাটাকে টেনে যেদিকে খানিকটা আলো রয়েছে সেখানে নিয়ে যায়। সে লক্ষ করে বাচ্চাটির বুকের চামড়া ভেদ করে পাঁজর বেরিয়ে আসছে যেন। চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। মুখের তুলনায় মাথাটি অস্বাভাবিক রকমের বড়ো।
হঠাৎ ঐশীর চীৎকার শুনতে পেল সঞ্জীব।
- রিকু... মনা...
সঞ্জীব কাছে যেতে ঐশী বলল, আমি এখুনি ওদের দেখেছি। রিকুকে দেখেছি। মনাকে দেখেছি।
- রিকু...মনা...
ঐশী আবার চেঁচাতে শুরু করে দিল। সে বাচ্চা দুটোর সন্ধানে গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। ঐশীকে সামলে রাখতে পারছিল না সঞ্জীব। সে যেতে যেতে বারবার বিভিন্ন লোকের গায়ে ধাক্কা খেতে থাকল। একজায়গায় গিয়ে দেখল থালাবাটি বাজিয়ে বাজিয়ে বাচ্চারা ছুটে চলেছে। সে অস্পষ্ট দেখতে পেল বাচ্চারা যেন ঐশীকেই ধাওয়া করছে।
- ঐশী...
কোন উত্তর পেল না সঞ্জীব।
- রিকু... মনা...
সঞ্জীব দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ পড়ে গেল। তখনো থালাবাটি বাজানোর শব্দ থামেনি। দূর থেকে দামামার মতো থালা-বাসন বাজিয়েই চলেছে বাচ্চারা।
লেখক পরিচিতি:
সাদিক হোসেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গেরএকজন বাঙালি লেখক ও গ্রাফিক ডিজাইনার। তিনি ১৯৮১ সালের ১১ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার মহেশতলায় জন্মগ্রহণ করেন।[ তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ:সম্মোহন, গিয়াস আলির প্রেম ও তার নিজস্ব সময়, রিফিউজি ক্যাম্প, হারুর মহাভারত। উপন্যাস: মোমেন ও মোমেনা।


1 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ হয়ে উঠতে পারতো। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দিশেহারায় হারিয়ে গেলো গল্পটা। লেখককে আরো শক্তিশালী যুগদার্শননিক হয়ে উঠতে হবে।
উত্তরমুছুন