মোস্তাক শরীফের গল্প : মায়া

সেই দুপুর থেকে পানাপুকুরের পাড়ে একঠায় বসে আছে বুড়ো জিতেন মণ্ডল।

তেজ নেই আজ সূর্যের আলোয়। গাছের ফাঁকফোকর গলে আসা ম্যাটমেটে রোদ ফেলে দেয়া খুঁদকুড়োর মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বুড়োর আশেপাশে। একটা মাছ-- মৃগেলই হবে-- পুকুর থেকে ঝাঁপ দিয়ে বুড়োর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে থেকে থেকে। যোগেনের কুকুরটা পাশের বাড়ির রণেনদের খেঁকিটার সঙ্গে খামোখাই গায়ে পড়ে ঝামেলা বাঁধানোর চেষ্টা করছে। পুকুরের পূবপারে হিজল গাছের ডাল থেকে একটা ধূসর মাথা হট্টিটি সেই কখন থেকে একঘেয়ে গলায় ডাকছে।
বুড়োর অবশ্য নজর নেই কিছুর দিকে। সাদা চুলে ভর্তি মাথাটাকে ভাঁজ করা দুই হাঁটুর ওপর রেখে জরিপ করছে চারদিক। দুপুরবেলা চিতল মাছ আর সজনে ডাটার তরকারি দিয়ে ভরপেট খেয়েছে, ঝিমুনিমতো এসেছে এখন, তবে চোখ কান সজাগ। ঢিলেঢালা একটা ফতুয়া আর লুঙ্গি পরেছে। সেই জোয়ানকালে বৌ সরলার হাতে বানানো ফতুয়া। সরলা চলে গেছে আজ একুশ বছর, ফতুয়াটা এখনও নতুনের মতো।

চৈত্র মাসের মাঝামাঝি এখন। তবে গরম এখনও সেভাবে পড়তে শুরু করেনি। বৃষ্টিও হচ্ছে মাঝেমাঝে। পানাপুকুরের পাড় পেরোলে যতদূর চোখে পড়ে বিরান ধানক্ষেত। দুপুরের ¤øান আলো বিশাল এক নকশী কাঁথার মতো বিছিয়ে আছে মাঠভর, সূর্যটা যখন হঠাৎ মেঘে ঢেকে যাচ্ছে, আদিগন্ত বিস্তৃত সেই নকশী কাঁথার রঙও পাল্টে হয়ে যাচ্ছে মেটে-ধূসর।

প্রতিদিন এই এক রুটিন। সকালবেলা দু মুঠো ভাত খেয়ে পুকুরপাড়ে এসে বসে বুড়ো। সামনের রাস্তা দিয়ে যে-ই যায়, দু-হাঁটুর ফাঁক থেকে মাথাটা তুলে হাঁক দেয়-- ‘কী রে গনশা? কনে গেছিলি?’ কিংবা ‘সতু নাকি রে, হাটে যাচ্ছিস?’ আশেপাশের দু-চার গ্রামে এমন কেউ নেই যাকে চেনে না বুড়ো, যদিও বয়সের কারণে মাঝে মাঝে ভুলভাল হয়ে যায় এখন। হয়তো ফজলুকে বলে বসল, ‘কী রে মোতালিব, কনে যাস?’ কিংবা হারাধনকে বলে বসল, ‘কী রে নারান, হাট থেকে ফিরলি?’

সবাই যে বুড়োর কথার জবাব দেয় তা নয়। বেশির ভাগই হেলাফেলায় একবার তাকিয়ে চলে যায়। জবাব দেয়ার-- এমনকি তাকানোরও গরজ দেখায় না, এমনও আছে কেউ কেউ। একটা সময় ছিল, জবাব না পেলে ভারি রাগ হতো বুড়োর। দু-চারটা গালিই হয়তো দিয়ে দিত গলা উঁচিয়ে। সে দিন গেছে। এখন আর জবাব পাবার জন্য ডাকে না বুড়ো। কেউ সত্যি সত্যি জবাব দিয়ে দিলে সেটাই যেন ভারি বিস্ময়ের ব্যাপার হবে।

আজ ক’দিন হলো হাঁকডাক ছেড়ে দিয়েছে জিতেন মন্ডল। চুপসে গেছে একদম। ঝিমানো মোরগের মতো বসে থাকে পুকুরপাড়ে, আর কী যেন বকতে থাকে বিড়বিড় করে। দশ বছরের নাতি রঞ্জিত ঠাকুর্দার মুখের কাছে কান নিয়ে মাঝে মাঝে বোঝার চেষ্টা করে কী বলছে বুড়ো, বুঝতে পারে না ছাইভস্ম কিছুই।

হঠাৎ ঝটকা দিয়ে মাথা উঁচু করে বুড়ো, ঘোলাটে চোখে তাকায় রাস্তার দিকে। ‘ও মাস্টার, মাস্টার!’ গলা উঁচিয়ে ডাক পাড়ে।

পথচলতি মানুষটা থমকে দাঁড়ায়। তারপর ছাতা বন্ধ করতে করতে এগিয়ে আসে বুড়োর দিকে। ‘কী ব্যাপার? কেমন আছো খুড়া?’

বহুদিন পর তার ডাকে সাড়া দিয়ে কাছে এগিয়ে এল কেউ। এক ধরনের তৃপ্তি খেলা করে বুড়োর চেহারায়। ‘কনে থেকে আসছ?’

‘ইস্কুল থেকে।’

‘ইস্কুল খোলা?’ বুড়োর গলায় বিস্ময়।

‘উঁহু। এদিকে এট্টা কাজ ছিল।’

‘মাস্টার,’ বুড়ো একটু ইতস্তত করে, ‘যোগেনের সঙ্গে কথাবার্তা হয় তোমার?’

‘যোগেন? তোমার ছেলে?’ সুবল মাস্টারকে বিস্মিত দেখায়। ‘কোন ব্যাপারে কও তো?’

‘এই যে, ইন্ডিয়ার বিষয়ে। কিছু বলেছে তোমায়?’

এদিক ওদিক মাথা নাড়ে সুবল মাস্টার। ‘আমায় কিছু বলেনি। তবে নরেশ আর বিধুর কাছে শুনেছি। সব তো গুছিয়ে ফেলেছে সে। আফজল মিঞার কাছে বাড়ি বিক্রির কথাও নাকি পাকা।’

বুড়োর চেহারা থেকে এক ফুঁয়ে যেন সব আলো নিভে যায়। ‘অ,’ মৃদু গলায় বলে।

‘মন খারাপ করো না খুড়া,’ সুবল মাস্টার বলে। ‘তোমরা তো একা না। অনেকেই চলে যাচ্ছে।’

‘তুমি? তুমি কী ভাবতিছ?’

মাথা নাড়ে মাস্টার। ‘আমি যাচ্ছি না খুড়া। যদ্দিন পারি থাকবো।’

‘তালি যোগেন ক্যান যাতি চায় বলো তো? তোমার মতো থাকতি পারে না ক্যান?’ বুড়োর গলায় আর্তি।

ঝুঁকে বুড়োর ঘাড়ে হাত রাখে সুবল মাস্টার। ‘এ নিয়ে ছেলের সাথে ঝামেলা করো না খুড়া। যা অবস্থা, সুযোগ থাকতে চইলে যাওয়াই ভালো।’

‘এই এক কথাতো শুনতেই আছি কেবল। পাকিস্তান হলে এই হবে, ওই হবে। দু’ বছর তো হয়ে গেল। কই কেউ তো আইসে বলে নাই, তুই হিঁদু, ইন্ডিয়া চলে যা?’

বুড়োর বলার ভঙ্গিতে হাসে মাস্টার। ‘আজ বলেনি, কালতো বলতে পারে। যোগেন ঠান্ডা মাথার ছেলে। ও যা বলে শোনো।’

বুড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ছেলের কথা শোনা ছাড়া উপায় আছে? ভরণপোষণ সবই তো তার হাতে। সে কথা অবশ্য মাস্টারকে বলে না। বিড়বিড় করে শুধু বলে, ‘তুমিতো যাচ্ছ না মাস্টার। তুমি তো রয়েই যাচ্ছ।’

মাস্টার আর কথা বাড়ায় না। মাথার ওপর ছাতাটা মেলে পা বাড়ায় বাড়ির পথে। দু হাঁটুর মাঝে ফের মাথা গুঁজে জিতেন মণ্ডল। কুকুরদুটোর মধ্যে ঝামেলা শেষমেষ লেগেই গেছে। একটা আরেকটার গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে দাঁত মুখ খিঁচে, দুটোর ঘেউ ঘেউ চিৎকারে কান পাতা দায়। রণেনদের ওদিক থেকে তীরবেগে ছুটে এল একটা ছেলে, কুশলই বোধ হয়, রণেনের বড় ছেলে; একটা আধলা ইট হাতে। ছুড়ে মারল কুকুরদুটোর দিকে-- কোনটার গায়ে পড়ল বোঝা গেল না, তবে রণেভঙ্গ দিয়ে দু-দিকে পালাল প্রাণী দুটো।

ঘোলাটে চোখে ব্যাপারটা দেখল জিতেন মণ্ডল। উঠে দাঁড়াল কষ্টেসৃষ্টে, তারপর অশীতিপর শরীরটাকে ঠেলে ঠেলে রওনা দিল ভেতরবাড়ির দিকে।

যোগেন বাড়ি ফিরল সন্ধ্যার পর।

নারিকেলবাড়িয়া বাজারে মুদিদোকান আছে যোগেনের। করিৎকর্মা ছেলে। অল্প ক’বছরে জমিয়ে ফেলেছিল। কম কথার মানুষ সে, রাগসাগও তেমন একটা নেই, তারপরও ছেলের সামনে কেমন যেন চুপসে থাকে জিতেন মণ্ডল। গা থেকে ফতুয়াটা খুলে রশিতে টাঙ্গিয়ে রাখছিল যোগেন, গলা খাঁকারি দিয়ে ছেলের মনোযোগ আকর্ষণ করল বুড়ো। ‘সুবল মাস্টারের সঙ্গে কথা হলো আজ।’

বাবার দিকে আড়চোখে তাকাল যোগেন। কোনো মন্তব্য করল না।

ফের গলা খাঁকারি দিল বুড়ো। ‘ক’ল বাড়িটা নাকি বিক্কিরি করে ফেলেছিস?’

আধো অন্ধকারে যোগেনের মুখের ভাব বোঝা গেল না। হুঁ জাতীয় একটা শব্দ করল মুখ দিয়ে।

‘আরেট্টু অপেক্ষা করতে পারলি না?’

ঘরের দাওয়ায় উবু হয়ে বসে কথা বলছিল জিতেন মণ্ডল। যোগেন দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কীজন্য অপেক্ষা করব বলতে পারো?’

‘নিজের ঘর-বাড়ি-দ্যাশ সব ছেইড়েছুইড়ে ধুম করে চইলে যাবো?’

ঘরের বেড়ায় গুঁজে রাখা একটা হাতপাখা নিল যোগেন। পা দিয়ে একটা পিঁড়ি টেনে বাবার কাছাকাছি বসল। তারপর পাখা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘তোমারে কতবার বলব, এই দ্যাশ আর আমাগের দ্যাশ নাই। এই দ্যাশ এখন মিঞাগের। হিঁদুর দেশ ইন্ডিয়া।’

‘তাই বলে সব হিঁদু এই দ্যাশ ছেড়ে চইলে যাবে?’

‘যাবে,’ সবজান্তার ভঙ্গিতে বলল যোগেন।

‘সুবল মাস্টার তো যাবে না। আমাকে তো তাই বলল।’

‘দুই চারজন থাকতে পারে। তবে থাকলে ভুল করবে।’

‘ক্যান ভুল করবে আমাকে বোঝা।’

যোগেনের চেহারায় বিরক্তির ছাপ পড়ে। গত ক’দিনে এ নিয়ে বাপের সঙ্গে প্রচুর কথা হয়েছে তার। গোঁয়ারগোবিন্দ বাপকে বোঝানো তার কর্ম নয়, বুঝেছে। তবু ধৈর্য ধরে বলে, ‘নোয়াখালীর দাঙ্গার কথা শুনিছ? কোলকাতা? কত মানুষ মারা গ্যাছে জানো? হিঁদু আর মোছলমান একসঙ্গে থাকতি পারবে না। বিটিসরা ব্যবস্তা কইরে গেছে। হিঁদুর দ্যাশ ইন্ডিয়া, মোছলমানদের দ্যাশ পাকিস্তান।’

‘তাই বইলে সব মোছলমান ইন্ডিয়া থেকে চইলে আসবে? সব হিঁদু এই দ্যাশ থেকে চইলে যাবে? তা কি হয়?’

‘হয় কি হয় না তাতো জানি না। আমরা হিঁদু। আমাগের একটা দ্যাশ হয়েছে, সেই দ্যাশে চইলে যাব। এটাই কথা।’

‘এতদিন তোর দ্যাশ ছিল না?’ উত্তেজিত হয়ে পড়ায় খ্যানখ্যানে শোনায় বুড়োর গলা। ‘তোর বাপ-ঠাকুদ্দার দ্যাশ, যেইখানে তোর নাড়ি পোতা, যেইখানে তোর জম্মো -- এইটা পরদ্যাশ হয়ে গেল?’

উঠে দাঁড়াল যোগেন। ‘তোমাকে বোঝানো আমার কম্মো না। ফালতু কথা বইলে লাভ নেই। বৈশাখের পহেলা তারিখে আমরা ইন্ডিয়া চলে যাব। এটাই আসল কথা।’ বলে আর ওখানে দাঁড়ায় না, হাতপাখা নাড়তে নাড়তে ভেতরে চলে যায়।

কতক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকে বুড়ো, তারপর টলতে টলতে রান্নাঘরের দিকে এগোয়, যোগেনের বৌ মাধবী যেখানে ধোঁয়ায় চোখ লাল করে কড়াইতে কিছু একটা ভাজছিল। শ্বশুরকে আসতে দেখে মাথায় কাপড় টানে মাধবী। স্বামীর মতোই অল্পকথার মানুষ সেও। অল্পবয়সে বৌ হয়ে এসেছে। বিয়ের বছরখানেকের মতো শাশুড়িকে পেয়েছিল, শাশুড়ির মৃত্যুর পর গোটা সংসারের ভার চেপেছে কাঁধে। দু’সন্তানকে তো বটেই, আলাভোলা শ্বশুরকেও দেখে রাখতে হয়।

একটা পিঁড়ি টেনে বসে জিতেন মণ্ডল। খানিক উশখুশ করে তারপর বলে, ‘এইটে কোনো কথা ক’তো মাধবী। আমার এতদিনের দ্যাশ আসলে আমার নয়? এইটে কোনো কথা?’

মাধবী কোনো জবাব দেয় না। স্বামী-শ্বশুরের চাপানউতোর ক’দিন ধরেই শুনছে, ইন্ডিয়া না পাকিস্তান কোনটা তাদের জন্য ভালো হবে তা নিয়ে বিশেষ মাথাব্যাথা নেই তার। খুলনার ফুলতলায় বাপের বাড়ি তার, বাপ-মা কেউ নেই। ভাইয়েরাও খবর নেয় না। যোগেন যেখানে যাবে সেটাই তার বাড়ি। এর বাইরে বিশেষ কোনো ভাবনা নেই তার।

কিছু একটা না বললে শ্বশুর মন খারাপ করবে এ ভাবনা থেকে সে বলে, ‘সমস্যা কী বাবা? ইন্ডিয়া হলে ইন্ডিয়া। বরং ভালোই থাকবো আমরা।’

কোটরাগত চোখের ভেতর থেকে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে মাধবীকে নিরীক্ষণ করে জিতেন মণ্ডল। তারপর, শোনা যায় কি যায় না এমন গলায় বলে, ‘মিনু? মিনুরে রাইখে চলে যাবি?’

মুখ নিচু করে উনুনে ফুঁ দিচ্ছিল মাধবী, হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। মুখ তুলে তাকায় শ্বশুরের দিকে, আগুনের আঁচে টকটকে লাল হয়ে আছে চেহারা। বুড়োও নিশ্চুপ। তাকিয়ে আছে উঠানের শেষ মাথায় জোড়া আমগাছের গোড়ায় যেখানে ঘাপটি মেরে আছে ঘন অন্ধকার।

শ্বশুরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে ফের উনুনের দিকে তাকায় মাধবী। কিন্তু রান্নার উৎসাহ যেন হারিয়ে ফেলেছে হঠাৎ করে।

‘আমরা যদি চলে যাই, মিনুটা একা হয়ে যাবে,’ স্বগতোক্তির মত করে বলে বুড়ো।

মাধবীর চেহারা থমথম করছে। বুড়ো ইতস্তত করে, তারপর উঠে দাঁড়ায়, কাঁপা কাঁপা পায়ে উঠোন পেরিয়ে এগোয় বাইরের দিকে।

সন্ধ্যা নেমেছে বেশ আগেই। ক্ষয়াটে চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে। আজ হাওয়ার বেগ বড় বেশি, এলোমেলো, উথালপাথাল হাওয়া ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক, বাড়ির পশ্চিম সীমানা ঘিরে রাখা বাশঝাঁড়ে বাধা পেয়ে করুণ কান্নার শব্দ তুলছে। ঘোরগ্রস্ত মানুষের মতো পানাপুকুরের ধার দিয়ে এগোয় জিতেন মণ্ডল, হোঁচট খেয়ে খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নেয় কয়েকবার। পুকুরের দক্ষিণ কোনায় ঝোপঝাড়ে ঢাকা উঁচুমতো একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। নিবিষ্ট চোখে তাকায় ঝোপগুলোর দিকে, যেখানে বছরপাঁচেক আগে আগুনে জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়ে গেছে ছোট্ট একটা শরীর।

বুড়োর নাতনি মিনতি, যোগেনের ছোট মেয়ে। বুড়োর নিজের কোনো মেয়ে নেই, যোগেনের পর তিন তিনটি মেয়ে হয়েছিল, একটাও বাঁচেনি। মিনতির জন্মের পর আনন্দে আটখানা হয়েছিল তাই। মনে হলো তার বিবর্ণ জীবনে একটুখানি রঙ লাগল। নাতনিটাও ছিল বড় ন্যাওটা। ‘দাদু’ ছাড়া কিছু বুঝত না। সেই ছোটবেলা থেকেই তার খাওয়া-পরা সব বুড়োর হাতে। মাধবী অনুযোগ করত, বলত, ‘তোর তালি বাপ-মা কিছু লাগবে না, তাই তো?’

‘লাগবে না,’ ঠোঁট উল্টে বলত মিনতি।

সেই মিনতি, লাউডগার মতো তিরতির করে বেড়ে ওঠা মিনতি, বয়স তেরো পেরোতেই কী এক অসুখে পড়ল ধরতেই পারল না কেউ। ভীষণ জ্বর, মাস চলে গেল তবু নামার নাম নেই। আড়পাড়ায় বরুণ ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল বুড়ো আর যোগেন। ডাক্তার নাড়ি টিপে দেখল, হা করিয়ে দেখল, তারপর কয়েকটা ওষুধ লিখে দিয়ে বিদায় করে দিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। একসময় আর নড়ারও শক্তি থাকল না মেয়েটার, শুকিয়ে হাড্ডিসার।

তারপর একদিন, দিনটার কথা স্পষ্ট মনে আছে বুড়োর। দুুপরে মায়ের হাতে ভাত খেয়েছিল মেয়েটা, কাতলা মাছ আর পটলের ঝোল দিয়ে। বহুদিন পর একটু পেট ভরে খাওয়া। দেখে বুকের মধ্যে নিভতে বসা আশাটা মিটিমিটি জ্বলতে শুরু করেছিল বুড়োর। ভাত খেয়ে ঘুমোচ্ছিল মিনতি, দাওয়ায় বসে ছিল বুড়ো, ঝিমুনিমতো এসেছিল খানিকটা। এর মধ্যেই কেমন একটা ঘড়ঘড় শব্দ, চোখ খুলতেই মিনতিকে দেখল। হা করে আছে মেয়েটা, বড় বড় হয়ে আছে চোখ দুটো, কেউ গলা টিপে ধরলে যেমন হয়। পড়ি কি মরি করে ছুটে গিয়েছিল বুড়ো, তার হাঁকডাক শুনে ছুটে এসেছিল মাধবী। মিনতির চোখদুটো ঠিকরে বের হয়ে আসতে চাইছিল কোটর থেকে, গলায় ঘড়ঘড় শব্দটা আরো জোরালো।

‘ও মা, ও মিনু,’ মাধবী পাগলের মতো চিৎকার করছিল।

তারপর, বাতাস থেমে যাওয়ার পর আছাড়ি-বিছাড়ি করা ঝরাপাতা যেমন স্থির হয়ে যায় তেমনি স্থির হয়ে গেল মিনতি। বুকফাটা আর্তনাদ করে তখন মেয়েকে জাপটে ধরেছে মাধবী, আর পাথরের মতো নিশ্চল, ঠায় দাঁড়িয়ে বুড়ো তাকিয়েছিল মিনতির দিকে।

পুকুরপারে, ঠিক এ জায়গাটাতেই মিনতিকে দাহ করেছিল তারা। যোগেন যখন মেয়ের মুখাগ্নি করছিল, এবং পরমুহূর্তে আগুনের সহস্র হাত যখন মিনতির ছোট শরীরটাকে আঁকড়ে ধরছিল এবং সমবেত মানুষ যখন হরিবোল ধ্বনিতে মুখরিত করে তুলছিল চারদিক, বুড়ো তখনও ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে তাকিয়েছিল। জগতের নির্মম এক সত্য যেন দুর্বোধ্যতার চাদর সরিয়ে ক্রমশ তার সামনে উদ্ভাসিত হচ্ছিল আর পানাপুকুরের ধারে আগুনের উৎসবের মধ্যে পৃথিবীটা হয়ে যাচ্ছিল নিঃসঙ্গ এক প্রান্তর।

‘মিনু, তোরে এহেনে রাহে আমরা কেমন করে যাব বল দিকিনি?’ সন্ধ্যার বোবা অন্ধকারকে সাক্ষী রেখে বিড়বিড় করে বলে জিতেন মণ্ডল।

আট বছর আগের কথা। কোথায় ধুয়েমুছে গেছে মিনুর দেহভস্ম! মিনতিবালা মণ্ডল নামে কোনো একজন মানুষ যে ছিল সেই স্মৃতিই যেন ভুলতে বসেছে সবাই। কেবল অশীতিপর এক বৃদ্ধেরই যেন দায় তেরো বছরের সেই অমল কিশোরীকে মনে রাখার।

হাওয়া বইছে শণশণ। বাঁশঝাড়ের সতর্ক পাহারাও তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। অন্ধকারে গা মিশিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বুড়ো। কালিগোলা অন্ধকারে তার শণের মতো সাদা চুল আবছা দেখা যায়। থিরথির করে কাঁপে বাতাসের ঝাপটায়। বুড়োকে দেখায় নিঃসঙ্গ এক প্রেতের মতো।

যোগেনের দুই ছেলে, রঞ্জিত আর সুজিত। ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার সময় যত এগোতে থাকে বছর বারোর রঞ্জিত আর তার দু’ বছরের ছোট সুজিতের আনন্দ ততই বাড়তে থাকে। ঠাকুর্দাকেও তাদের উৎসাহের ভাগিদার করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে দু’ ভাই। কিন্তু কোলকাতা শহরের নানা চাকচিক্যের কথা ঠাকুর্দার কাছে বর্ণনা করতে গেলেই বুড়ো কেন তেতো মুখ করে ‘যা ভাগ’ বলে দাঁত খিচুনি দেয় কিছুতেই বুঝতে পারে না তারা। নারিকেলবাড়িয়ার পাট চুকানোর সময় যত এগিয়ে আসছে বুড়ো ততই যেন কেমনধারা হয়ে যাচ্ছে। খাইয়ে বলে সুনাম আছে তার, জোয়ান-মর্দদের মতো না হলেও, আশি বছর বয়সের তুলনায় যা খায় অনেকেরই চোখ টাটায়। কিন্তু ইদানিং খাবার যেন মুখে রুচছে না। নেড়েচেড়ে উঠে যাচ্ছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সাধারণত খেতে বসে এদিক সেদিক তাকায় না যোগেন, কিন্তু সেও লক্ষ করল ব্যাপারটা।

‘কী ব্যাপার বাবা, শরীর খারাপ নাকি?’ খেতে বসে একদিন বলল সে।

‘উঁহু।’

যোগেন ধীরেসুস্থে খাওয়া শেষ করে। তারপর দাওয়ায় গিয়ে কুলকুচো করে ফিরে এসে নরম গলায় বলে, ‘আর দিনদশেক আছে কিন্তু মাত্তর। পহেলা তারিখেই যাচ্ছি আমরা।’

বুড়ো কিছু বলে না। মাথা নিচু করে বসে থাকে।

‘জামালের গরুগাড়ি ঠিক করিছি। দুডো গাড়ি লাগবে। একটাতে মালপত্তর নিয়ে আমি, বাকিটায় তোমরা সবাই।’

বুড়ো নিশ্চুপ।

যোগেন আর কথা বাড়ায় না। উঠে চলে যায়। বুড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

মাধবী চুপচাপ লক্ষ করছিল সব। ‘এভাবে না খায়ে থাকলি আপনি অসুস্থ হয়ে যাবানি বাবা,’ মৃদু গলায় বলে সে।

তবু কথা ফোটে না বুড়োর মুখে। বাসনটা একপাশে সরিয়ে রেখে হাত ধুয়ে উঠে পড়ে। কাঁপা কাঁপা পায়ে বাইরের দিকে এগোয়। আজ সূর্যটা বড় খেপে আছে, সমানে আগুন ঢালছে। পুকুরপারে ছায়ামতো একটা জায়গা দেখে বসে বুড়ো। চারদিক কেমন শুনশান। দিনমান কু-কু করে চারদিক মাতিয়ে রাখা পাখিগুলোও কেমন ভ্যাবদা মেরে আছে। সামনের রাস্তা, তার ওপারে ন্যাড়া জমি, মরা খাল-- অসহায়ের মতো পড়ে থেকে রোদে জ্বলছে সব। অতৃপ্ত চেহারা নিয়ে সব কিছু পরখ করে বুড়ো। এ গ্রামের প্রতিটি ইঞ্চি হাতের তালুর মতোই চেনা, চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে কোথায় কার বাড়ি, কোন বাড়িতে ক’টা ঘর। কেবল নারিকেলবাড়িয়া কেন, পূবে হরিশপুর, অনন্তরামপুর, দেয়াডাঙ্গা, পশ্চিমে খানপুর, চন্দ্রপাড়া, মঙ্গলপৈতা, উত্তরে চিত্রা পার হয়ে শরুশুনা, বুনাগাতি, গঙ্গারামপুর, দক্ষিণে সীমাখালী, কলাতলী, বেতালপাড়া-- কোথায় পা পড়েনি! কাজে অকাজে কত মানুষের সঙ্গে পরিচয়, ভাগাভাগি করে বিড়ি খাওয়া থেকে শুরু করে রাত জেগে যাত্রাপালা দেখা। কখনও ভাবারও ইচ্ছে হয়নি কে হিন্দু কে মুসলমান। এখন কোথায় কোন গোরা সাহেব নাকি একটা কাগজের মধ্যে দাগ টেনে বলে দিয়েছে-- ওটা হিন্দুদের দেশ আর এটা মুসলমানদের। চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে তাই গিয়ে ঘর বাঁধতে হবে কোথায় কোন বির্ভুঁইয়ে, মানে হয়!

রোদের আঁচে না কেন কে জানে, বুড়োর চোখ জ্বলে, বুকের মধ্যে ধপধপ শব্দ হয়। যেন কোদাল দিয়ে এলোপাথাড়ি মাটি কোপাচ্ছে কেউ। কেশফুলের মতো খরখরে সাদা চুলে হাত বোলায় বুড়ো। চোখ চলে যায় ঐ দূরে স্তূপীকৃত মাটি আর ঝোপঝাড়ের দিকে। দেখে কে বলবে মাত্রই আট বছর আগে ওখানে মিনতিবালা মণ্ডলের দেহভস্ম কালো ধোঁয়া আর বাতাসের ঘূর্ণির সঙ্গে মিশে পাক খেতে খেতে আকাশে মিলিয়ে গেছে? আগুনে পুড়িয়ে বা মাটিতে পুঁতে ফেললেই কি একটা মানুষের সব কিছু নিঃশেষ হয়ে যায়? সমস্ত কিছু? মানতে পারে না জিতেন মণ্ডল। তার বরং মনে হয় সেই মানুষটার কিছু একটা-- সে জানে না কী-- তবে কিছু একটা ঠিকই রয়ে যায়। কাঁঠালের আঠার মতো। বুড়োর মনে হয়, পুকুরপাড়ে ঐ ছোট্ট জায়গায় মিনুর কিছু একটা ঠিকই রয়ে গেছে। এমন কিছু যাকে ওখান থেকে কেউ সরাতে পারবে না। ওদিকে তাকিয়ে জিতেন মণ্ডলের মনে হতে থাকে, মিনু যেন ঝোপের ভেতর থেকে তার বেণী বাঁধা ইষৎ লালচে চুলে ভর্তি মাথাটা বের করে তাকিয়ে আছে, আর চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করছে, ‘ইটি কোনো কথা হলো? আমারে নিবা না তোমাগের সঙ্গে?’

চোখ পিটপিট করে তাকায় জিতেন মণ্ডল। গরম হাওয়া ভাপের মতো এসে হামলে পড়ে তার শরীরে। বুড়োর মনে হয় এই বুঝি ঝোপের ভেতর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসবে মিনু, তার হাত ধরে টানতে টানতে বলবে, ‘এসো দাদু, এট্টা জিনিস দেখাই তোমারে। দেখবা, আসো।’

বুড়ো টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়। এলোমেলো পা ফেলে রওনা দেয় ভেতরবাড়ির দিকে। প্রতিবার পা ফেলতে কেঁপে উঠছে গোটা শরীর।

চৈত্রের শেষ ক’টা দিন অঝোর বৃষ্টি হতে থাকে। শেষ কবে এমন বৃষ্টি হয়েছে মনে পড়ে না জিতেন মণ্ডলের। যোগেনের মুখ ভার, চেহারায় চিন্তার ছাপ। এভাবে বৃষ্টি হতে থাকলে রাস্তার দফারফা হয়ে যাবে, গরুগাড়ি তো দূরের কথা, হেঁটেও যাওয়া যাওয়ার উপায় থাকবে না। চৈত্র মাসের শেষদিন সকালেই মেঘের আড়াল থেকে রেগেমেগে বেরিয়ে এল সূর্য, আগুন ঢালতে শুরু করল। যোগেনের মুখ থেকে চিন্তার রেখা খানিকটা কমে এল। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল সে, বহু কিছু জোগাড়যন্ত্র করা বাকি।

দুপুর অব্দি একবারও বিছানা ছাড়ল না জিতেন মণ্ডল। মাধবী চিন্তিত মুখে কয়েকবার দেখে গেল, কপালে হাত দিয়ে দেখল জ্বর আছে কিনা। তার চাপাচাপিতে দুপুরবেলা দু মুঠো খেল বুড়ো। তারপর ফের শুয়ে থাকল চোখ বন্ধ করে।

যোগেন ফিরতে ফিরতে বিকেল। সারাদিন রোদে ঘোরাঘুরি করে তামাটে হয়ে গেছে চেহারাটা। বাপকে শুয়ে থাকতে দেখেও কোনো মন্তব্য করল না। হাপুসহুপুস করে একপেট খেয়ে ফের বেরিয়ে গেল।

সন্ধ্যা নামল। চারদিক নিস্তব্ধ, কেবল বাইরে ঝিঁঝিঁপোকার দল ক্লান্তিহীনভাবে কোরাস গেয়ে যাচ্ছে। একটা ব্যাঙের প্রলম্বিত, করুণ ডাক শোনা গেল। নিশ্চয়ই ধরা পড়েছে সুযোগসন্ধানী কোনো সাপের চতুর চোয়ালে। উঠে বসল বুড়ো।

‘ও মাধবী, এট্টুখানি মুড়ি হবে?’

বাটিভর্তি মুড়ি নিয়ে এল মাধবী। চিন্তিত চোখে জরিপ করল শ্বশুরকে। ‘শরীর ঠিক আছে তো আপনার?’

‘শরীর ঠিক আছে। কখন রওনা হচ্চি কাল?’

‘আপনার ছেলেতো বলল যত শিগ্গিরি পারা যায়।’

বুড়ো কোনো মন্তব্য করল না। মুড়ি চিবানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

সারারাত মড়ার মতো ঘুমোলো বুড়ো। শেষরাতের দিকে ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামল। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙল বুড়োর। পাশে রঞ্জিত ঘুমে কাদা হয়ে আছে। যোগেনের নাক ডাকার ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ আসছে পাশের ঘর থেকে। সন্তর্পণে উঠে বসল বুড়ো। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দরজা খুলল। আকাশে মিহিন বেগুনি আলো ফুটতে শুরু করেছে, তবে ভালোমতো ঠাহর করা যাচ্ছে না সব কিছু। একটা থলে গুছিয়ে রেখেছিল কাল রাতে, ওটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এল বুড়ো, টলতে টলতে এগোলো বাহিরবাড়ির দিকে।

শেষরাতের বৃষ্টিতে এখানে ওখানে কাদা জমে আছে। পুকুরে শ্যাওলার ঘন সবুজ আস্তরণ ভেদ করে ঠোকর দিচ্ছে কয়েকটা অস্থির মাছ। আলোর চেয়ে এখনও অন্ধকারই বেশি চারদিকে। সন্তর্পণে পা ফেলে পুকুরের কোনায় এসে পৌঁছাল বুড়ো। কাঁপা কাঁপা হাতে একটা ফতুয়া বের করল থলে থেকে। যথেষ্ট নতুন ফতুয়াটা, গেল বছর বাঘারপাড়া থেকে কিনে দিয়েছিল যোগেন। ঘিয়ে রঙের মধ্যে সবুজ চেক। ঝুঁকে ফতুয়াটাকে বৃষ্টিতে ভিজে নেতিয়ে থাকা ঝোপের মধ্যে গুঁজে দিল বুড়ো। এমনভাবে, যাতে বাইরে থেকে চোখে না পড়ে।

‘মিনু, তোর জন্যি এটি রাইখে গেলাম। দাদুরে মনে করবি এই দেখে। করবি না?’

হাতের তেলোতে চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল বুড়ো। তারপর ধীর, ক্লান্ত পায়ে ফিরে চলল বাড়ির দিকে। পুকুরপাড়ের হিজল গাছটাতে ধূসর মাথা সেই হট্টিটি তখন ডাকতে শুরু করেছে, কুঁই, কুঁই...

জামাল মিঞার যে কথা সেই কাজ। ছ’টা না বাজতেই দুটো গরুর গাড়ি নিয়ে এসে হাজির। মালপত্র গাড়িতে তুলতে বেশিক্ষণ লাগল না। রঞ্জিত আর সুজিতের সদ্য ঘুমভাঙা চোখে আনন্দের চেয়ে বিষাদই এখন বেশি। ঘর, আঙিনা এসবের দিকে ঘুরে ঘুরে চাইছে। যোগেন আর মাধবী ব্যস্ত চোখে শেষবারের মতো জরিপ করে নিচ্ছে সবকিছু। মালপত্রসহ যোগেন উঠল একটা গাড়িতে, বাকিটাতে আর সবাই।

‘হৈ হ্যাট হ্যাট,’ গরুর পিঠে চাপড় মেরে তাড়া দিল জামাল। ক্যাঁচ কোচ শব্দ করে চলতে শুরু করল গাড়ি।

পানাপুকুর পেরিয়ে যখন সামনের কাচা রাস্তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে গরুগাড়ি, শেষবারের মতো শ্মশানের দিকে তাকাল জিতেন মণ্ডল। ফ্যাকাসে আলোয় ঝোপগুলোকে কালচে দেখাচ্ছে, মৃদুমন্দ বাতাসে নড়ছে ওগুলো।

চাকার প্রতিটি ঘূর্ণনের সঙ্গে কেঁপে উঠছে শরীর, দুলছে। দুলতে দুলতে পেছনে ফেলে আসা রাস্তার দিকে তাকাল বুড়ো। কাদামাখা রাস্তায় গভীর ছাপ বসাচ্ছে গরুগাড়ির চাকা, যেন ছোট্ট একটা নালা। চাকা সরে যেতেই আশপাশ থেকে জল এসে মুহূর্তে ভর্তি করে দিচ্ছে সেটি। সম্মোহিতের মতো সেদিকে তাকিয়ে থাকল বুড়ো। জলের চিকন একটি ধারা গাল বেয়ে গলার দিকে নামছে তার। গরুগাড়ির চাকার বানানো নালাগুলোর জলে ভর্তি হওয়া দেখায় মগ্ন বুড়ো গালের শীর্ণ সেই ধারার দিকে খেয়ালও করল না।



লেখক পরিচিতি:
মোস্তাক শরীফ, জন্ম ১৯৭৪ সালে ফেনীতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর। বর্তমানে একই বিভাগের অধ্যাপক। লেখালেখির সূচনা বিশশতকের নব্বইয়ের দশকে। গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ মিলিয়ে প্রকাশিত বই উনত্রিশটি। বাতিঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছে ইতিহাসভিত্তিক বই ইতিহাসের মোড় ফেরা, ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস নেফারতিতি এবং দুটি অনূদিত উপন্যাস সিলভিয়া প্লাথের দ্য বেল জার ও অ্যালিস ওয়াকারের দ্য কালার পার্পল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ