সৈয়দ শামসুল হক
'নিশীথে’— রবীন্দ্রনাথের এই ছোট গল্প, বাংলা ১৩০১ সনের মাঘ মাসে রচিত; এর নির্মাণ আমাদের নিয়ে যায় কিছু বিস্ময় এবং আবিষ্কারের ভেতরে।
অতিপ্রাকৃত উপাদান নিয়ে বাংলা ভাষায় গল্প, যাকে আমরা সাধারণভাবে বলি ভূতের গল্প, ভয়ের গল্প, বহুদিন থেকেই প্রচলিত ছিল লোকমুখে; বস্তুতপক্ষে, অতিপ্রাকৃত গল্প রচনা মানুষের সাধারণ একটি সামাজিক প্রতিভা; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের আগে আমাদের আর কোনো লেখক সাহিত্যের জন্যে এই বিশেষ উপাদানটি হাতে নিয়েছেন বলে জানা নেই। রবীন্দ্রনাথ যদিও 'নিশীথে'র বছর দুয়েক আগে লিখে ফেলেছেন 'কঙ্কাল', যেখানে অতিপ্রাকৃত উপাদান নিয়ে তাঁর প্রথম নাড়াচাড়া, কিন্তু ভয়ের চেয়ে স্মিত কৌতূহলই সেখানে বরং বেশি কাজ করেছে, এবং 'কঙ্কাল'-এর পরের বছর 'জীবিত ও মৃত', যেখানে তাঁর অসামান্য পরীক্ষাটি, যে, বাস্তবতার ষোলো আনা ভেতরে থেকেও অতিপ্রাকৃত এক আবহ রচনা করা যায় কীভাবে; বলা যায়, ‘নিথীথে'ই তিনি লিখলেন আমাদের সাহিত্যের প্রথম অতিপ্রাকৃত গল্পটি সত্যিকার অর্থে। এখনই আমরা জেনে রাখি না কেন, যে, এর মাত্র ছ'মাসের মাথায়, ১৩০২ সনের শ্রাবণ মাসে, ভাবতে ভালো লাগে বৃষ্টিমথিত কোনো রাতে, , রবীন্দ্রনাথ লিখবেন, আগামী একশো বছরের জন্যে তো বটেই, তারও বেশি কিনা কে জানে, বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ অতিপ্রাকৃত গল্পটি — ‘ক্ষুধিত পাষাণ'।
কিন্তু 'নিশীথে'র সূত্রে যে আবিষ্কারের কথা বলেছি তা এ সবে নয়, এ নিতান্তই তথ্য; তথ্য নয়, সম্পূর্ণ অন্য স্তরে এ আবিষ্কারটিতে আমরা পা রাখব। তবে তার জন্যে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, তার আগে 'নিশীথে'র বিস্ময় ও প্রশ্নগুলোর দিকে চোখ ফেরাতে হবে।
বিস্ময় তো নামেই; রবীন্দ্রনাথ তাঁর দীর্ঘ জীবনে যে নব্বইটি ছোটগল্প লিখেছেন তার কোনোটির সঙ্গে আমাদের হাতের এই গল্পটির নাম মেলে না— 'নিশীথে'। যেমন মনে আসে, তাঁর কিছু গল্পের নাম উচ্চারণ করা যাক— ঘাটের কথা, মুক্তির উপায়, দান-প্রতিদান, ইচ্ছাপূরণ, নষ্টনীড়, স্ত্রীর পত্র, অতিথি, আপদ, মণিহারা, মানভঞ্জন, কাবুলিওয়ালা। না, 'নিশীথে'র সঙ্গে এরা মেলে না; রবীন্দ্রনাথের সব গল্পের নাম একদিকে, এ গল্পের নাম আরেক দিকে, একা; তাঁর নব্বইটি গল্পের নামের তালিকার দিকে তাকিয়ে আমরা এবার আরো একটি সংবাদ পাই— একমাত্র তাঁর 'নিশীথে' ছাড়া আর কোনো গল্পের নাম এ-কার দিয়ে শেষ হয় নি। তাঁর পূর্ববর্তী বঙ্কিমচন্দ্রের কোনো গল্প বা উপন্যাসের নাম এ-কারান্ত নয়; আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি, 'নিশীথে'র পূর্ব পর্যন্ত গোটা বাংলা সাহিত্যেই এরকম এ-কারান্ত একটি শব্দ নিয়ে কোনো গল্প বা উপন্যাসের নাম নেই; আমাদের আরো বিস্ময়, 'নিশীথে'র পরেও বহুদিন পর্যন্ত এটিও তাঁর কলমে একটিই মাত্র উদাহরণ। আমাদের কারো কারো হয়তো মনে পড়বে, রবীন্দ্রনাথ নিজে আর একবার মাত্র তাঁর একটি কথার নাম এ-কারান্ত দিয়ে রেখেছিলেন— 'ঘরে বাইরে'; এই নামে আভিধানিক অর্থের চেয়ে কোনো পরিস্থিতিযুগলকেই বেশি প্রকাশ করছে; খুব মনোযোগ না করলে এ-কার দুটি ভালো করে শোনাও যায় না; কিন্তু 'নিশীথে'র বেলায় ঐ একই এ-কার ধাতব ধ্বনির মতো বেজে ওঠে, যেনবা ঘড়ির ঘন্টাধ্বনি, এই ধ্বনি আমাদের শরীরের ওপর দিয়ে বহে যায়, গল্পের জন্যে আমরা প্রস্তুত হয়ে উঠি।
গল্পটি সামান্যকথায় এই যে, এক ব্যক্তি তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে জ্যোৎস্নার ভেতরে বলেছিলেন, 'তোমার ভালোবাসা আমি কোনোকালে ভুলিব না।' কথাটি শুনে তাঁর স্ত্রী হেসে উঠেছিলেন। সেই স্ত্রী যখন মৃত্যুর দিন গুনছেন, এক সন্ধ্যায়, স্বামী তাঁর শয্যাপাশে, এক যুবতী এসে দরোজায় দাঁড়ায়। এই যুবতী সম্পর্কে স্বামীটির দুর্বলতা গড়ে উঠেছিল, স্ত্রী যখন অপরিচিতাকে দেখে চমকে প্রশ্ন করলেন, 'ও কে ?' স্বামী অপরাধ গোপনের তাৎক্ষণিক চেষ্টায় বলে ফেললেন, 'আমি চিনি না।' পর মুহূর্তেই অবশ্য তিনি সত্যি কথাটা বলেছেন, 'ওঃ, আমাদের ডাক্তার বাবুর কন্যা।' কিন্তু এই উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই এ গল্পের যাবত প্রস্তুতি সমাপ্ত হয়ে গেল, এখন বাকি রইল শুধু শস্যচ্ছেদন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামীটি ওই ডাক্তার বাবুর কন্যাকে বিয়ে করেন, কিন্তু একটি হাসি তাকে তাড়া করে ফেরে, একটি প্রশ্ন-- ‘ও কে ? ও কে ? ও কে গো ?' তাঁর হৃদযন্ত্রের ধ্বনির চেয়েও বিকট হয়ে বাজে; তাঁর জীবন থেকে সুখ, স্বস্তি, সাহস আশাহীনভাবে বিদায় নেয়।
গল্পের নাম দেবার যে অভ্যেস আমরা লক্ষ করি রবীন্দ্রনাথে, আমাদের আপত্তি করবার কিছুই থাকতো না যদি তিনি এ গল্পের নাম দিতেন, তাঁরই অন্য কিছু গল্পের নাম ধার করছি, ‘জীবিত ও মৃত’—বটেই তো, 'নিশীথে' গল্পে জীবিত ও মৃতের টানাপোড়েন; কিংবা ‘প্রতিহিংসা'— আমরা এরও যৌক্তিকতা খুঁজে পেতাম; ‘নষ্টনীড়’—এছাড়া আর কী তবে ? 'কর্মফল'— তাও নিতান্ত মন্দ হতো না, কাজ চলে যেতো; অথবা 'নিশীথে'র একেবারে কাছাকাছি 'একরাত্রি'; কিংবা শুধুই 'নিশীথ'।
কিন্তু ‘নিশীথে’? আমরা চমকে উঠি। যেন ১৩০১ সনের নয়, আরো পরের, যাকে আমরা তিরিশের দশক বলি যেন সেই দশকের কোনো গল্প; যেন রবীন্দ্রনাথ নন, তাঁর পরের কোনো লেখকের লেখা গল্পের এটি নাম। বাংলা ছোট গল্পে রবীন্দ্রনাথের পরেই যাঁর নাম বিপুল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করি, সেই প্রেমেন্দ্র মিত্রেরই কোনো গল্পের নাম হতে পারতো 'নিশীথে'; লেখার চল্লিশ বছর পরেও এ নাম রবীন্দ্রনাথের অনুজ এক লেখকের কলমে এতটুকু বেমানান হতো না। তবে কি আমরা বলবো, কাল ডিঙিয়ে গল্পের এহেন নামকরণ নিতান্ত আকস্মিক? যিনি আমাদের ভাষায় লেখার এতবড় একজন কারিগর, তাঁর লেখায় কোনো কিছু দৈববশে, খেয়ালবশে, বিনা অভিপ্রায়ে আসবে, এ হতেই পারে না।
রবীন্দ্রনাথেরই অন্য কোনো গল্পের সঙ্গে যখন এই গল্পটির নামের কোনো আত্মীয়তা নেই, তখন নিশ্চয়ই আমরা জানবো এর কারণ আছে; আমরা সেই অভাবিত অপূর্বতার কারণ খুঁজবো আর কোথাও নয়, এই গল্পেরই ভেতরে।
এই গল্পের দ্বিতীয় বিস্ময় এর প্রথম তিনটি বাক্য। আড়াইটে বলা সঙ্গত; কারণ তৃতীয় বাক্যটি অসম্পূর্ণ রাখা হয়েছে। পড়া যাক।
'ডাক্তার। ডাক্তার।’
'জ্বালাতন করিল। এই অর্ধেক রাত্রে—'
গল্প শুরু হয়েছে সংলাপ দিয়ে; আমরা লক্ষ করবো, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সারা জীবনের নব্বইটি ছোট গল্পের ভেতরে এই 'নিশীথে'র দীর্ঘ কুড়ি বছর পরে লেখা আর মাত্র একটি গল্প 'শেষের রাত্রি' শুরু করেছেন সংলাপ দিয়ে। আর একটু এগিয়ে লক্ষ করব, ‘শেষের রাত্রি'র উদাহরণ সত্ত্বেও, ‘নিশীথে' সংলাপ দিয়ে শুরু হবার ক্ষেত্রে অনন্য, কারণ, এখানে বক্তার কোনো ইঙ্গিত অবিলম্বে দেয়া হয় নি, দেহহীন একটি উচ্চারণ হিসেবে সংলাপটি এসেছে। তৃতীয় যে বাক্যটি অসমাপ্ত রাখা হয়েছে— 'এই অর্ধেক রাত্রে 'যা কিনা ডাক্তার ভদ্রলোকটিরই স্বগতোক্তি, আমাদের কৌতূহলী করে তোলে যে, কে ডাকছে। এবং আমরা সংবাদ পেয়ে যাই— 'চোখ মেলিয়া দেখি আমাদের জমিদার দক্ষিণাচরণবাবু। ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া পিঠভাঙা চৌকিটা টানিয়া আনিয়া তাঁহাকে বসিতে দিলাম এবং উদ্বিগ্নভাবে তাঁহার মুখের দিকে চাহিলাম। ঘড়িতে দেখি, তখন রাত্রি আড়াইটা।' আমরা জানতে চাই রবীন্দ্রনাথ কোন ফললাভের আশায় সংলাপ দিয়ে গল্প শুরু করবার মতো তাঁর অভ্যেসের বাইরে প্রায় নজিরহীন একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, যার নজিরও গোটা রবীন্দ্র কথাসাহিত্যে হাতে গোনা দু'চারটের বেশি পাওয়া যায় না।
আসলে রবীন্দ্রনাথ যখন এই গল্পের বীজ হাতে নিয়েছিলেন, তিনি বুঝেছিলেন এর চরিত্রগুলো বাস্তব, ঘটনা বাস্তব, সমস্যা বাস্তব, কিন্তু গল্পটির আসল ক্ষেত্র কল্পনা— দক্ষিণাচরণবাবুর, এবং একমাত্র তাঁরই করোটির অভ্যন্তরে সে কল্পনা স্মরণ করা যাক গল্পের একেবারে শেষ দিকে এ গল্পের দীর্ঘতম বাক্যটি দক্ষিণাচরণবাবু পদ্মার বুকে রাতের পাখির ঝাঁক উড়ে যাবার শব্দ শুনেছেন, আগেও একবার এরকম শব্দ তিনি শুনেছিলেন, তখন তাঁর মনে হয়েছিল ওটা তাঁর মৃত পত্নীর 'মর্মভেদী হাসি কি অভ্রভেদী হাহাকার; এবার সেই 'হাহা করিয়া একটা হাসি' তাঁর বর্ণনায়, ‘পদ্মা পার হইল, পদ্মার চর পার হইল, তাহার পরবর্তী সমস্ত সুষুপ্ত দেশ গ্রাম নগর পার হইয়া গেল— যেন তাহা চিরকাল ধরিয়া দেশদেশান্তর পার হইয়া ক্রমশ ক্ষীণ ক্ষীণতর ক্ষীণতম হইয়া অসীম সুদূরে চলিয়া যাইতেছে; ক্রমে যেন তাহা জন্ম মৃত্যুর দেশ ছাড়াইয়া গেল; ক্রমে তাহা যেন সূচির অগ্রভাগের ন্যায় ক্ষীণতম হইয়া আসিল; এত ক্ষীণ শব্দ কখনো শুনি নাই, কল্পনা করি নাই; আমার মাথার মধ্যে যেন অনন্ত আকাশ রহিয়াছে এবং সেই শব্দ যতই দূরে যাইতেছে কিছুতেই আমার মস্তিষ্কের সীমা ছাড়াইতে পারিতেছে না; অবশেষে যখন একান্ত অসহ্য হইয়া আসিল তখন ভাবিলাম, আলো নিবাইয়া না দিলে ঘুমাইতে পারিব না'। আমরা বিশেষভাবে লক্ষ করবো এই কথাটি, 'আমার মাথার মধ্যে যেন অনন্ত আকাশ রহিয়াছে’— এবং তাহলেই উপলব্ধি করতে পারবো রবীন্দ্রনাথকে এ গল্পের জন্যে কোন সমস্যায় পড়তে হয়েছিলো।
সমস্যাটি এই ছিলো, সংক্ষেপে— মাথার ভেতরে অনন্ত যে আকাশ, তার সঙ্গে জীবনের বাস্তবতার দূরত্ব বিনাশ করা। যে-গল্প করোটির ভেতরে ঘটছে, যে-গল্প আসলেই হাত দিয়ে ধরাছোঁয়া যাচ্ছে না, সেই গল্পটিকে পেশী দেয়া যায় কী উপায়ে এই ছিলো রবীন্দ্রনাথের নির্ণয় করে নেবার সমস্যা। যে-কোনো সৃষ্টিশীল লেখককেই লেখার আগে এই একটি কাজ করে নিতে হয়— কারিগরি দিকটি ভেবে নিতে হয়; এবং যে সিদ্ধান্তই তিনি নিন না কেন তা ব্যাকরণ দিয়ে বোঝা যাবে না, নিয়মের গজকাঠি ফেলে মাপা যাবে না, সিদ্ধান্তটি ঠিক ছিল কিনা জানতে হলে পুরো লেখাটাই লিখে ফেলতে হবে। রবীন্দ্রনাথ, আমরা জানি না, 'নিশীথে'র কারিগরি দিক ভাবতে কতটা সময় নিয়েছিলেন, কিন্তু গল্পটি পড়ে এবং পরীক্ষা করে এখন আমরা জানি তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল যে, এ গল্প তিনি লিখবেন তাঁর অন্যান্য গল্পের চেয়ে অনেক বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য করে— যেনবা, একালে হলে বলা যেতো, সবাক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের মতো করে। বস্তুতপক্ষে আমরা 'নিশীথে'র বাক্যের পর বাক্যে, অনুচ্ছেদের পর অনুচ্ছেদে দেখি, রবীন্দ্রনাথ কীভাবে সমস্ত কিছুই দৃষ্টিগ্রাহ্য, প্রত্যক্ষ, আকারসম্পন্ন করে তুলতে চাইছেন। যেমন চোখে পড়ে তেমন কিছু বাক্য আমরা দেখি না কেন ? ‘তাঁহার সমস্ত প্রেম, সমস্ত হৃদয়, সমস্ত যত্ন দিয়া আমার এই অযোগ্য প্রাণটাকে যেন বক্ষের শিশুর মতো দুই হস্তে ঝাঁপিয়া ঢাকিয়া ছিলেন।’ এবং 'তরুতলের ঝিল্লিধ্বনি যেন অনন্ত গগনবক্ষচ্যুত নিঃশব্দতার নিম্নপ্রান্তে একটি শব্দের সরু পাড় বুনিয়া দিতেছে।' এবং 'এমন সময় অন্ধকার ঝাউ গাছের শিখরদেশে যেন আগুন ধরিয়া উঠিল।' এবং 'তখন মনে হইত, চারিদিকে সমস্ত অন্ধকার ভরিয়া ঘন হাসি জমা হইয়া রহিয়াছে।' এবং 'গ্রামের আমবাগানগুলি এই রাক্ষসী নদীর নিতান্ত মুখের কাছে জোড়হস্তে দাঁড়াইয়া কাঁপিতেছে; পদ্মা ঘুমের ঘোরে এক-একবার পাশ ফিরিতেছে।'আমরা লক্ষ করবো, রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্যান্য গল্পের তুলনায় আরো কিছু অধিক এগিয়ে কীভাবে আমাদের সমুখে চিত্রের পর চিত্র রচনা করে চলেছেন, বিমূর্তকে মূর্তরূপ দেবার চেষ্টা করছেন।
করোটির ভেতরের গল্পকে এরকম দৃষ্টিগ্রাহ্য চিত্র এবং প্রত্যক্ষ বাস্তবতার শরীরে প্রকাশ করা— হঠাৎ মনে হতে পারে এর ভেতরে পরস্পর বিরোধিতা আছে; কিন্তু ইনি রবীন্দ্রনাথ, এবং আকাশ ও ভূমির একই সমতলে অবস্থান তাঁর পক্ষেই সম্ভব। সবাক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের কথা বলেছি, কতটা দৃষ্টিগ্রাহ্য করে এই গল্পটিকে রবীন্দ্রনাথ নির্মাণ করতে চেয়েছেন বোঝাতে। দেখা যাক চিত্রনাট্যের চোখ দিয়েই এ গল্পের প্রথম কয়েকটি বাক্য। অবিকল চিত্রনাট্যের ভঙ্গিতেই শুরু করা হয়েছে গল্পটি,
প্রথম শট— ঘুমিয়ে আছে ডাক্তার, তার ওপরে নেপথ্য ডাক, 'ডাক্তার। ডাক্তার। সে বড় বিরক্তি নিয়ে চোখ মেলে, যার ভাষারূপ 'জ্বালাতন করিল,' একই শটে সে পাশ ফেরে, পিছিয়ে আসে ক্যামেরা, বিছানার পাশে টেবিল ঘড়ি একটুখানি দেখা যায়, ডাক্তার চোখ মেলে তাকায়।
দ্বিতীয় শট— ডাক্তারের দৃষ্টিকোণ থেকে— জমিদারবাবু দাঁড়িয়ে আছেন।
তৃতীয় শট — ডাক্তার ধড়ফড় করে উঠে বসে, জমিদারকে বসতে দেয়, ডাক্তার আড়চোখে ঘড়ির দিকে তাকায়। চতুর্থ শট-- ঘড়িতে আড়াইটে বাজে ।
--------------------------------------------------------
'নিশীথে' গল্পটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এভাবে চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে, কান দিয়ে শোনা হয়েছে; যেনবা সবাক চলচ্চিত্রের আগেই রবীন্দ্রনাথের হাতে চিত্রনাট্যের পূর্বাভাষ এই রচনায়; আমরা লক্ষ করি, কীভাবে কখনো চিত্র, কখনো ধ্বনি, কখনো আবার চিত্র ও ধ্বনি একই সঙ্গে, এবং শেষ পর্যন্ত শুধু ধ্বনি এই গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ধ্বনির শেষ প্রধান কাজটি — 'সেই গভীর রাত্রে নিস্তব্ধ বোটের মধ্যে আমার গোলাকার ঘড়িটাও সজীব হইয়া উঠিয়া তাহার ঘণ্টার কাঁটা মনোরমার দিকে প্রসারিত করিয়া শেলফের উপর হইতে তালে তালে বলিতে লাগিল, 'ও কে, ও কে গো। ও কে, ও কে, ও কে গো।' আমরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাই, আমরা ঘড়ির শব্দের সঙ্গে, প্রথমা স্ত্রীর ব্যাকুল প্রশ্নটির এবং দক্ষিণাচরণবাবুর হৃদস্পন্দনের এক শব্দ-মিশ্রণ শ্রবণ করে উঠি, বস্তুতপক্ষে কিছুক্ষণের জন্যে আমাদের কাছে এই ধ্বনিস্পন্দন জগতের একমাত্র স্পন্দন হয়ে ওঠে। এবং এরপর যখন রবীন্দ্রনাথ আমাদের ফিরিয়ে আনেন আমাদের ভেতরে, দক্ষিণাচরণবাবুকে ডাক্তারের সমুখে, দেখুন কীভাবে ধাপে ধাপে কাজটি সম্পাদন করেন তিনি। 'আমি তাহাকে স্পর্শ করিয়া কহিলাম, 'একটু জল খান।' এমন সময় হঠাৎ আমার কেরোসিনের শিখাটা দপ দপ করিতে করিতে নিবিয়া গেল। হঠাৎ দেখিতে পাইলাম, বাহিরে আলো হইয়াছে । কাক ডাকিয়া উঠিল। দোয়েল শিশ দিতে লাগিল। আমার বাড়ির সম্মুখবর্তী পথে একটা মহিষের গাড়ির ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ জাগিয়া উঠিল।' ধাপগুলো হিসেব করি কেরোসিনের বাতি নিভে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তার চেয়ে জোরালো আলো, দিনের প্রথম আলোয় ঘর জেগে উঠল । তখন জানালার বাইরে লেখক আমাদের নিয়ে গেলেন উর্ধ্ব আকাশে, যেখানে দিনের উৎস, তারপর একটু নিচে, কাক ডাকতে ডাকতে উড়ে যাচ্ছে, আরো নিচে চোখ রাখছি এবার – দোয়েল, এবং আরো নিচে, এখন মাটিতে পৌঁছে গেছি আমরা— মহিষের গাড়ি ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে চলেছে। এই যে চিত্র এবং ধ্বনির ব্যবহার, এ ছিলো রবীন্দ্রনাথের কারিগরি সিদ্ধান্ত এই গল্পটির জন্যে।
তাঁর দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত ছিলো, বাস্তবতার শরীরে এ গল্প ধরাবেন। তাই লক্ষ করি, মাথার মধ্যে সেই অনন্ত আকাশ, একটি ধ্বনির কিছুতেই 'মস্তিষ্কের সীমা' ছাড়াতে না পারা এবং জগতের অন্তঃস্থল পর্যন্ত 'ওকে, ও কে গো'-র অভিঘাত শোনা, এই উন্মত্ততার ভেতরে ঠেলে দেবার পূর্ব পর্যন্ত খোচা দিয়ে আমাদের জাগিয়ে রাখবার জন্যে রবীন্দ্রনাথ এ গল্পটিকে মাঝপথে তিন তিনবার থামিয়ে দিয়েছেন। আমরা স্মরণ করতে পারব, 'ক্ষুধিত পাষাণ' গল্পে বক্তা সেই যে একবার গল্প শুরু করলেন, যখন থামলেন তখন রবীন্দ্রনাথেরও গল্প শেষ; একইভাবে টানা শেষ হয়েছে 'মণিহারা'; কিন্তু 'নিশীথে' এর ব্যতিক্রম, গল্পের বক্তা দক্ষিণাচরণবাবু তিনবার থেমেছেন গল্প বলতে গিয়ে। এবং এই তিনবারই যে কারণ দেখিয়ে গল্প থামানো হয়েছে, আমাদের প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে— দরকার ছিল কি ? প্রথমবার যেখানে গল্প থামানো হয়েছে, থামিয়ে যে-অনুচ্ছেদটি রচনা করা হয়েছে তা কার্যত আমাদের কিছুই বলে না। 'এইখানে দক্ষিণাবাবু হঠাৎ থমকিয়া চুপ করিলেন। সন্দিগ্ধভাবে আমার মুখের দিকে চাহিলেন, তাহার পর দুই হাতের মধ্যে মাখা রাখিয়া ভাবিতে লাগিলেন। আমিও চুপ করিয়া রহিলাম। কুলুঙ্গিতে কেরোসিন মিটমিট করিয়া জ্বলিতে লাগিল এবং নিস্তব্ধ ঘরে মশার ভনভন শব্দ সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল। হঠাৎ মৌন ভঙ্গ করিয়া দক্ষিণাবাবু বলিতে আরম্ভ করিলেন— 'এই অংশটি বাদ দিয়ে আমরা যদি পড়ি তাহলে গল্পের এই জায়গাটা দাঁড়ায় এরকম— 'ডাক্তার বলিল, 'একবার বায়ু পরিবর্তন করিয়া দেখিলে ভালো হয়।' আমি স্ত্রীকে লইয়া এলাহাবাদে গেলাম। সেখানে হারান ডাক্তার আমার স্ত্রীকে চিকিৎসা করিতে লাগিলেন। ' আমরা কি ধরতে পারি যে 'এলাহাবাদে গেলাম' আর 'সেখানে হারান ডাক্তার'- এর মাঝখানে ছিল ছেদ এবং ওপরে উদ্ধৃত অনুচ্ছেদটি ?
দ্বিতীয়বার যেখানে গল্পে বাধা দেয়া হয়েছে, সেখানেও যে ছোট্ট অনুচ্ছেদ রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন তা না থাকলে এবং গল্প একটানে এগিয়ে গেলে ক্ষতি ছিলো না বলেই আবারো আমাদের মনে হবে। তৃতীয়বার যেখানে গল্পে বাধা দেয়া হয়েছে, সেখানে ছোট্ট একটা কথা উঠতে পারে যে, স্ত্রীর মৃত্যুর পর দক্ষিণাবাবুর দ্বিতীয় বিয়ে করার মাঝখানে একটু সময় দেয়া দরকার, তাই গল্পে ছেদ আনবার কৌশল প্রয়োগ করতে হয়েছে। কিন্তু এ যুক্তি টেকে না, কারণ, আগের দু'বার যদি টানা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতো গল্প, তাহলে এখানেও রবীন্দ্রনাথ একটি কোনো বাক্য দক্ষিণাবাবুর মুখে বসিয়ে দিয়ে তরতর করে এগিয়ে যেতে পারতেন; হয়তো একটি সম্পূর্ণ বাক্যেরও দরকার হতো না, বাক্যাংশই যথেষ্ট হতো, যেমন— 'কিছু দিন পর', তিনি লিখতে পারতেন 'কিছুদিন পর মনোরমাকে বিবাহ করিয়া দেশে ফিরিলাম। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অভিপ্রায় ছিলো, শেষ অভিঘাতের জন্য আমাদের প্রস্তুত করা, বারবার বাস্তবে ফিরিয়ে এনে আমাদের শেষ ধাক্কাটি দেওয়া।
গল্পে তৃতীয়বার বাধা দেবার জায়গাটি হচ্ছে— 'ডাক্তার যখন ফিরিলেন, তখন জীবনের সঙ্গে সঙ্গে আমার স্ত্রীর সকল যন্ত্রণার অবসান হইয়াছে।' এরপর দক্ষিণাচরণবাবু জল খেলেন; এবং এভাবেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের জানিয়ে দিলেন, আমরা দক্ষিণাচরণবাবুর মুখে গল্প শুনছিলাম; রবীন্দ্রনাথ যেন গল্প থামিয়ে আমাদের আশ্বস্ত করলেন যে, এ গল্পের শোক তাপ পাপ কৌতূহল যদি আমাদের মনে কিছুমাত্র সঞ্চারিত হয়েও থাকে, আমরা তবু নিরাপদেই অদগ্ধ অবস্থায় আমাদের বাস্তবে ফিরে আসতে পারব। এরপর যখন রবীন্দ্রনাথ আবার গল্প শুরু করবেন, একেবারে শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর থামবেন না এবং এতক্ষণ ধরে তিনি যে পুঙ্খানপুঙ্খ বর্ণনা, চিত্রের পর চিত্র, রচনা করে আসছিলেন এবার তার সঙ্গে যোগ করবেন নতুন এক মাত্রা- ধ্বনি এবং ভয়াবহভাবে মথিত মিশ্রিত ওই এক ধ্বনি দিয়েই তিনি শেষ করবেন গল্প। ‘নিশীথে’র এই শেষ পর্বে রবীন্দ্রনাথ শুরুতেই গোটা চারেক বাক্যে কয়েকটি দরকারী তথ্য দিয়ে শিল্পের ইন্দ্রজাল দ্রুত সৃষ্টি করতে থাকবেন এভাবে— 'একদিন প্রথম শরতের সন্ধ্যায় মনোরমাকে লইয়া আমাদের বরানগরের বাগানে বেড়াইতেছি। ছমছমে অন্ধকার হইয়া আসিয়াছে। পাখিদের বাসায় ডানা ঝাড়িবার শব্দটুকুও নাই । কেবল বেড়াইবার পথের দুই ধারে ঘন ছায়াবৃত ঝাউগাছ বাতাসে সশব্দে কাঁপিতেছিল।' লক্ষ করবো, রবীন্দ্রনাথ এখন আমাদের প্রস্তুত করছেন পরিণতির জন্যে, ক্ষেত্র তৈরি করছেন, লিখছেন এ গল্পে এই প্রথম ছমছমে অন্ধকার', আমাদের কান তৈরি করছেন 'পাখিদের ডানা ঝাড়ার শব্দ' বলে, কারণ, আজ, এই সন্ধ্যাবেলাতেই 'ঝাউগাছের শিখরদেশে' আগুন ধরিয়ে চাঁদ ওঠাবেন তিনি, দক্ষিণাচরণবাবুকে দিয়ে বলাবেন— 'মনোরমা, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না, কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে আমি কোনো কালে ভুলিতে পারিব না।' অতঃপর দক্ষিণাচরণবাবুকে দিয়ে ডাক্তারের মারফত আমাদের বলাবেন— 'কথাটা বলিবামাত্র চমকিয়া উঠিলাম; মনে পড়িল ঠিক এই কথাটা আর একদিন আর কাহাকেও বলিয়াছি । এবং সেই মুহূর্তেই বকুল গাছের শাখার উপর দিয়া, ঝাউগাছের মাথার উপর দিয়া, কৃষ্ণপক্ষের পীতবর্ণ ভাঙা চাঁদের নিচে দিয়া গঙ্গার পূর্বপার হইতে গঙ্গার সুদূর পশ্চিমপার পর্যন্ত হাহাহাহাহাহা করিয়া অতি দ্রুতবেগে একটা হাসি বহিয়া গেল।' আমাদের আর সন্দেহ থাকে না, রবীন্দ্রনাথ যে 'পাখির ডানা ঝাড়ার শব্দ' বা তার অনুপস্থিতি একটু আগে উল্লেখ করেছিলেন তা ছিলো গভীরভাবে পরিকল্পিত, কারণ, পাখিদের দিয়েই তো তিনি এবার এক বিপর্যস্ত মনের সঙ্কেত আমাদের দিতে থাকবেন। দেখতে পাবো, এরপর আবার, পদ্মার চরে জ্যোৎস্নার ভেতরে মনোরমার মুখ চুম্বন করবার সঙ্গে সঙ্গে— 'গম্ভীরস্বরে বলিয়া উঠিল, 'ও কে ? ও কে ? ও কে ? ' আমি চমকিয়া উঠিলাম, আমার স্ত্রীও কাঁপিয়া উঠিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই আমরা দুইজনেই বুঝিলাম, এই শব্দ মানুষিক নহে, অমানুষিকও নহে— চরবিহারী জলচর পাখির ডাক।' আমাদের মনে পড়বে, গল্প শেষ হয়ে যাবার পর, রবীন্দ্রনাথ যখন আমাদের জাগিয়ে তোলেন, আমাদেরই ভেতর আবার ফিরিয়ে আনেন আমাদের, তখন যে চারটি চিত্র ও ধ্বনি তিনি প্রয়োগ করে, বাক্যটি আমি কিছু আগেই উদ্ধৃত করেছি, তার দুটিই পাখিদের।
আমরা এখন উপলব্ধি করতে পারছি, গল্পের কারিগর হিসেবে কী ছিলো রবীন্দ্রনাথের অভিপ্রায়; তিনি চেয়েছেন, করোটির ভেতরে গল্পটিকে বলবেন আপাতদৃষ্টে উল্টো এক ভঙ্গি ও আঙ্গিকে এবং এভাবে বাস্তবের গায়ে কল্পনার ও কল্পনার গায়ে বাস্তবের চাপড় মারতে মারতে, পাঠককে ডানে বাঁয়ে অবিরাম ধাক্কা দিতে দিতে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তাই তিনি চিত্রনাট্যের পূর্বাভাষ সম্বলিত চোখ ও কান ব্যবহার করেছেন, অপ্রত্যাশিত ও নজিরবিহীনভাবে সংলাপ দিয়ে গল্প শুরু করেছেন, গল্প ঘন করে তুলেও মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছেন তিন তিন বার, গল্পের চারটি অংশের প্রথম তিনটি পর্যন্ত আমাদের তিনি রেখেছেন ভূমির স্তরে, তৃতীয় অংশ পর্যন্ত আমাদের তিনি এমন বিভ্রান্ত রেখেছেন যেন আমরা যে-গল্প শুনছি তার উপাদানগুলো যেমন বাস্তব, পরিণতিও হবে তেমনই বাস্তব— দ্বিতীয় বিয়ে মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। এতক্ষণে আমরা প্রস্তুত হয়েছি একটি আবিষ্কারের জন্যে; সেই যে আমরা শুরুতে বলেছিলাম গল্পের নাম নিয়ে কিছু কথা; 'নিশীথে' নামের এই অভাবিত অপূর্বতার কারণটি এখন আমরা আবিষ্কার করতে চেষ্টা করবো।
গল্পের নায়ক দক্ষিণাচরণ, তিনি জমিদার; রবীন্দ্রনাথ তাঁকে কল্পনা করেছেন সংবেদনশীল একজন মানুষ হিসেবেই কেবল নয়, সংস্কৃতিবান ব্যক্তি হিসেবেও। দক্ষিণাচরণের নিজের কথাতেই, 'কাব্যশাস্ত্রটা ভালো করিয়া অধ্যয়ন করিয়াছিলাম।' আমরা দেখি, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থাতেও তিনি কালিদাসের শ্লোক স্মৃতি থেকে নির্ভুল উদ্ধৃত করতে পারেন। আমরা প্রমাণ পাই, জীবনের কঠিন সত্য এই ব্যক্তিটির কাছে খুব স্পষ্ট ছিলো না; বরং তাঁর প্রথমা স্ত্রী তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন; স্মরণ হয় আমাদের, দক্ষিণাচরণ যখন তাঁর প্রথমা স্ত্রীকে এ গল্পের শুরুর দিকে বলেছিলেন, 'তোমার ভালোবাসা আমি কোনোকালেই ভুলিব না' তখন এর শূন্যগর্ভতা চোখে পড়েছিলো তাঁর স্ত্রীর এবং কথাটি শুনে তিনি হেসে উঠেছিলেন। আমরা আরো লক্ষ করবো, দক্ষিণাচরণ লম্পট নন; স্ত্রী বর্তমানেও তিনি যে অন্য যুবতীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, সে কখন ? যখন এই আরোগ্য-আশাহীন সেবাকার্যে আমি মনে মনে পরিশ্রান্ত হইয়া গিয়াছিলাম। সেই তখন। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা এবং কারো কারো ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে জানি, মৃত্যুর সমুখে দিনের পর দিন বসে থাকা যায় না, চোখের ওপর উদ্যত স্তম্ভিত মৃত্যু রাতের পর রাত অবলোকন করা যায় না— এই হচ্ছে সর্বকালের সর্বদেশের জীবনের কঠিন সত্য। আমরা আরো স্মরণ করবো, দক্ষিণাচরণ যে-কালের মানুষ তখনকার মূল্যবোধ, জীবন যাপন ও সামাজিক আচরণের কথা। আমরা দেখতে পাবো, 'নিশীথে'র কালে এবং সমাজে, পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ে তো গ্লানিকর নয়ই, স্ত্রীবর্তমানে রক্ষিতাপোষণ ও বারবনিতাগমন পর্যন্ত চিত্তের ও সমাজের সুস্থতা নষ্ট করতো না।
এবার আমরা স্পষ্ট করে বলতে পারি, দক্ষিণাচরণ এমন কিছু করেন নি যার জন্যে সমাজ তাঁকে তিরস্কার করবে, নিজে তিনি নিজের কাছে খাটো হবেন, তাঁর রাতের ঘুম হরে যাবে। আমরা স্বীকার করে নিতে পারি, দক্ষিণাচরণ তাঁর স্ত্রী- বর্তমানে মনোরমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে, স্ত্রীর মৃত্যুর পর মনোরমাকে বিয়ে করে, তাঁর কালের বিচারে খুব সাধারণ একটি ঘটনার ভেতর দিয়েই গেছেন। কিন্তু গল্পের দক্ষিণাচরণকে আমরা দেখেছি, তিনি পাপবোধে জর্জরিত, গ্লানিতে নিমজ্জিত, অনুতাপে দগ্ধ এবং শোবার ঘরে মনোরমাকে নিদ্রিত রেখে, জমিদার হিসেবে নিজের অবস্থান ও মর্যাদা ভুলে, তাঁরই বেতন-ভোগী পল্লীর এক চিকিৎসকের কাছে রাত আড়াইটেয় ছুটে গেছেন— না, কোনো ওষুধের জন্যে নয়, অন্তরের গোপনতম পাপটি স্বীকার করে চিকিৎসিত তথা অনুশোচনা থেকে কিছু পরিমাণে হলেও মুক্ত হতে। গল্পের শেষ ব্যাক্যটিতে আমরা যে পড়ি, ‘সেইদিনই অর্ধরাত্রে আবার আমার দ্বারে আসিয়া ঘা পড়িল, ‘ডাক্তার। ডাক্তার। -- আমরা জানি, আজো তিনি ওষুধের জন্যে নয়, স্বীকারোক্তির জন্যেই এসেছেন; কিন্তু আমাদের শঙ্কা এই, চিরদিনের মতো নিজের কাছে নিজে তিনি ধিকৃত হয়ে থাকবেন, পাপবোধ এ জীবনে তাঁকে আর ত্যাগ করবে না। হোন না তিনি সংবেদনশীল ও কালিদাসের কাব্যরসিক, এই পরিস্থিতি ও পরিণতি তাঁর কালের একজন বড় মানুষের পক্ষে অচিন্তিত এবং অপ্রত্যাশিত।
আমরা এখন সনাক্ত করতে পারছি, দক্ষিণাচরণের মানসিক এই প্রতিক্রিয়া আদৌ তাঁর স্বকালের নয়, এটা আরো অন্তত দুটি প্রজন্মের পরের মানুষের প্রতিক্রিয়া। তাই ‘নিশীথে'র সামাজিক পটভূমি এবং রচিত গল্পটির আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যে এখন আমরা বলতে পারি, কালের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকা একটি গল্প লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পটির আঙ্গিকেই দূর ভবিষ্যতের পূর্বাভাষ দিয়েছেন— সবাক চলচ্চিত্রের বহু আগেই এ গল্পে তিনি ব্যবহার করেছেন চিত্রনাট্যের চোখ এবং এর নামকরণে তিরিশ দশকের কলম। বলতে পারি, বিষয় এবং আঙ্গিকের এমন চমকপ্রদ সমাহার রবীন্দ্রনাথের আর কোনো গল্পে আমি দেখি নি।


0 মন্তব্যসমূহ