অনেকে এসেছিল কথা বলার জন্য। বাছাই করা শ্রোতা, সংখ্যায় তারাও অনেক।বিষয় নির্দিষ্ট ছিল, অবস্থা বুঝে যখন যেমন, পরিস্থিতি যেদিকে গড়াবে, কথা সেই গড়ানো ঢাল বেয়ে,অথবা উল্টো দিকের খাড়াই ধরে, এরকমই নিয়ম,এরকমই হয়ে আসছিল, আগে থেকে কিছু ঠিক করা ছিল না। যারা শুনতে এসেছিল, ইচ্ছেমত শোনার সুযোগ ছিল। ভালো নালাগলে বা অপছন্দ হলেও কান বন্ধ করার ব্যবস্থা ছিল না। ইচ্ছেমতো নিজের কান খোলা বা বন্ধ করার কোন সুযোগ ছিল না।
অনেক কিছুই ছিল,আবার অনেক কিছুই ছিল না।অনেক মানুষ ছিল, আবার অনেক মানুষ ছিল না।যারা ছিল, অনেকদিন ধরে ছিল, যেমন মকরধ্বজ। যারা কথা বলবে, মকরধ্বজ তাদের একজন। সে উন্নয়ন নিয়ে কথা বলে। এ বিষয়ে তার বিস্তর পড়াশোনা। অম্বুজাক্ষ এসেছে মকরধ্বজের কথা শুনতে। উন্নয়ন সম্পর্কে সে প্রচুর কথা শুনেছে। শ্রোতা হিসেবে এ বিষয়ে সে বিশেষজ্ঞ।
ল্যাংড়ার হাতে একটা সব্জি কাটার ছুরি।কথা পছন্দ না হলে গলা কেটে দেওয়াই তার কাজ।এই কাজের জন্য দীর্ঘদিন তাকে জল্লাদ বলা হত। এখন সে সমাজসেবী। একটু আগেই ধর্ম আচরণ নিয়ে কথা বলার সময় কথাপ্রসঙ্গে জল্লাদ শব্দটা উচ্চারণ করায় ল্যাংড়া তার গলা কেটে ফেলেছিল। ল্যাংড়ার অসহিষ্ণুতা, আর সহ্য করতে না পারার ক্ষমতার জন্য সে
খাতির পায়,তাকে ভয়ে এবং ঘৃণায় সকলেই মান্যিগন্যি করে।তার গলা কাটার পদ্ধতি এতটাই অভিনব, ধড় থেকে মাথা আলাদা হলেও মৃত্যু হয় না। শুধুমাত্র হাতে অথবা কাঁধে ইচ্ছেমত মাথা বহন করতে হয়।।সুস্থ স্বাভাবিক জীবনেও অসুবিধা হয় না।
কিন্তু গুলি পিস্তলের যুগে মাথা কাটার বিষয়টা নিয়ে আপত্তির কথা একজন বলছিল। কাটা মাথার ভার বহন করে বেঁচে থাকা কষ্টকর। বিকল্প ব্যবস্থা চালু হলে ল্যাংড়ার গুরুত্ব বাড়বে না কমবে ঠিক করতে না পেরে লোকটার গলা না কেটে দৌড়াদৌড়ি করছিল। মকরধ্বজ অনেকদিন ধরে উন্নয়নের কথা বলে আসছে, ঠিক যেমন অম্বুজাক্ষ ওই
কথাগুলো শুনে আসছে। যারা হাতে কলমে উন্নয়নের কাজ করে,নকশা বানায়, এর জন্য কোথা থেকে টাকা আসবে তার পরিকল্পনা করে, মকরধ্বজের কথা তারা শোনে না।সেই কবে থেকে, তারা মাঠে ঘাটে জঙ্গলে পাহাড়ে নদী-সমুদ্রে উদয়াস্ত বড় বড় প্রজেক্ট তৈরিতে ব্যস্ত। উন্নয়নের নানা মডেল, সবই মানুষের কল্যাণে, মানুষের জন্য।বছরের পর বছর এই কাজ করে করে তারা পারদর্শী ও অভিজ্ঞ হয়েছিল, পাশাপাশি জন্মেছিল প্রচুর আত্মবিশ্বাস, যে কারণে তারা মনে করত, অন্যের কথা শোনা স্রেফ সময় নষ্ট করা। মকরধ্বজকে তারা চিনত না। মকরধ্বজ কী বলল শোনার দায় ছিল না তাদের। মকরধ্বজ নিজেও সেকথা জানত।তবু এই একই বিষয় নিয়ে সে কথা বলত, তাকে কথা বলে যেতে হত, এবং এই কাজটি সে করে চলেছ অনেকদিন ধরে।
অম্বুজাক্ষ শ্রোতা হিসেবে প্রবীন এবং সহিষ্ণু। ঝড়,বন্যা,দুর্ভিক্ষ, মহামারিতেও সে অতি বিশ্বস্ত শ্রোতা। উন্নয়ন সম্পর্কিত কথা শুনে শুনে তার মধ্যে অবিচলিত থাকার অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। এটা ছিল একটা প্রক্রিয়া এবং এর অন্তর্গত হয়ে
ওঠা ছিল জরুরি। উত্তেজক, অভিনব বা একঘেয়ে, বস্তাপচা পুনরাবৃত্তিতেও মতপ্রকাশ না করার অতি বিরল ক্ষমতা শ্রোতাদের অর্জন করতে হত। এর ফলে শ্রোতারা খুব যে নিরাপদ ছিল বলা যাবে না। তাদের সবসময় একপ্রকার অ্যাসিড টেস্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হত। ল্যাংড়ার নজর শ্রোতাদের উপর ঘুরে বেড়াত। শ্রোতাকে কথা বলতে নেই এটাই নিয়ম, যা থেকে বিচ্যুতি মানেই ল্যাংড়ার হাতে মাথা খোয়ানোর ভয়।
ধর্ম নিয়েও অনেকে অনেক কথা বলে আসছিল। দর্শন নিয়ে কেউ কেউ.। ব্রম্ভান্ড, সভ্যতা,যুদ্ধ, এসব নিয়ে কথা চলছিল তো চলছিল। শ্রোতারাও এতদিনের অভ্যাসে শুনেই যাছিল।
বেশ কিছুদিন ধরেই ধর্ম নিয়ে অনেক বেশি কথা হচ্ছিল। সেখানে যারা শ্রোতা তাদের অধিকাংশের হাতে বা কাঁধে মাথা। এখানে লেংড়াদের সংখ্যাও অনেক বেশি, সবার উপর আলাদা করে নজর রাখার বন্দোবস্ত। নতুন নতুন অনেকে আসছিল ধর্ম নিয়ে কথা বলতে, তাদের সংখ্যাও বাড়ছিল। কথার ছক পালটে যাচ্ছিল। এতদিনের অভ্যস্ত কান সেসব কথা শোনার সময় না বুঝে এদিক ওদিক তাকানো বা নড়াচড়া করছিল। সদা সতর্ক ল্যাংড়াদের হাতে অনেক শ্রোতার মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেছিল।
শ্রোতাদের অসুবিধা একটাই, তাদের মাথা বহন করতে হচ্ছিল। তবে বহন ক্ষমতাজন্মগত হওয়ায় সকলেই মেনে নিয়েছিল।
সমস্যা একটাই, মকরধ্বজ ছাড়া উন্নয়ন নিয়ে কথা বলার মানুষেরা কেউ ছিল না। অম্বুজাক্ষ ছাড়া সেকথা শোনার অপেক্ষায় ছিল না কেউ। সেই সব মানুষেরা যারা উন্নয়ন নিয়ে কথা বলত ও সেই কথা শুনত, ধর্ম নিয়ে কথা বলার লোকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ।ধর্মের উত্তেজনা উন্নয়নে ছিল না, শ্রোতারা উন্নয়নের কথা শুনত গভীর আগ্রহ নিয়ে। ধর্মের কথায় তারা উসখুস করে, ফলে মাথা কাটার সুযোগ বেশি। মাথা না থাকলে চোখও থাকে না,ফলে চোখে চোখ রাখা ব্যাপারটা কমিয়ে ফেলা গেছিল। একা মকরধ্বজকে দিয়ে উন্নয়ন নিয়ে কথা বলানো অর্থহীন এই বিবেচনায় উন্নয়ন আর ধর্মকে একই ছাদের তলায় নিয়ে আসা হয়েছিল। মকরধ্বজ পড়েছিল মহাফাঁপড়ে। সে কিছুতেই উন্নয়ন ছেড়ে ধর্মে যেতে পারে না।ধর্ম প্রসঙ্গ এলেই সে উন্নয়নে ঢুকে পড়ে। হাসপাতাল, রাস্তাঘাট,বিদ্যুত,ইস্কুল তৈরির কথা বলে যায়।সে যা বলছিল অম্বুজাক্ষরের অভ্যাসে তা ছিল একশ শতাংশ সঠিক, কিন্ত পরিবেশ বদলে যাওয়ায় সে মাথা নাড়িয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। ফলে অম্বুজাক্ষর ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দিল লেংড়া বাহিনী। বাঁ হাতে মাথা আর ডানহাতে তার চোখের জল মোছাতে মোছাতে সেদিন ভাগ্যকে সে অভিশাপ দিয়েছিল।
অম্বুজাক্ষকে দেখে নিজের পরিণতি সম্পর্কে মকরধ্বজের ভয় ও ভাবনা বেড়ে গেল।লেংড়াদের কাজ কারবার অনেক দেখেও, যেন দেখেনি কিছুই, এতদিন এভাবেই চলছিল। তাছাড়া উন্নয়ন নিয়ে কথা বলা ছিল তার একচেটিয়া অধিকার—পড়াশোনা করে, তত্ত্বকথা আয়ত্ত করে মকরধ্বজ কতদিন হয়ে গেল, একাই কথা বলে গেছে।
আমি একজন সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া নিজের সম্পর্কে কখনও বিশেষ কিছু ভাবিনি-- মকরধ্বজ একমনে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল-- আমি কী করব? ধর্ম আর উন্নয়ন হাত ধরাধরি করে এগোচ্ছে, এর মাঝখানে আমি। ভাবতে ভাবতে অম্বুজাক্ষর বাড়িরকাছাকাছি সে চলে এসেছিল। আজ রাতেই সিদ্ধান্তটা নিতে হবে। অম্বুজাক্ষকে প্রথম প্রশ্ন ছিল, মাথা বহন করতে কেমন লাগছে?
মাথা থাকা এবং না থাকার মধ্যে জীবন যাপনের অসুবিধা কিছুই প্রায় নেই।শারীরবৃত্তিয় কাজকর্ম আগের মতই যথাযথ।মাথা উঁচু করে বাঁচার আক্ষেপ যদি না থাকে এটা একটা চমৎকার ব্যবস্থা।এর জন্য যা ক্ষতিপূরণ এবং ভাতা পাওয়া যাবে একজন মানুষ স্বচ্ছন্দে তার পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে পারবে।আর মাথা বহন করা, সে তো অভ্যাস! মকরধ্বজ বলল, লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা স্বাভাবিক নিয়মে মারা গেছে, তাদের তো এই গ্লানি সহ্য করতে হয়নি।
প্রথম কটা দিন গ্লানিবোধ আমারও ছিল।তারপর সব সয়ে গেছে।
উন্নয়নের কথা বলার সময় শেষদিকে সহযাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া হলেও, একা একাই মকরধ্বজ কথা বলেছে দীর্ঘদিন। অম্বুজাক্ষ একমাত্র শ্রোতা ছিল।তবু সে হাল ছাড়েনি, শ্রোতা অম্বুজাক্ষর উপর তার আস্থা ছিল।কিন্তু মাথা ছাড়া বেঁচে
থাকা অসম্ভব, অথচ ধর্মের পথে উন্নয়নকে মিলাতে না পারলে…
মকরধ্বজ সেই প্রথম টের পেয়েছিল, এতদিন সে একটা স্বপ্নকে লালন করেছে।দিনের পর দিন নানান তত্ত্বকথা উচ্চারণ করতে করতে একসময় সেও কথাগুলো বিশ্বাস করে ফেলেছে। সেই বিশ্বাস এই প্রথম তাকে জীবন সম্পর্কে
প্রশ্ন করতে প্ররোচিত করল।
আমার পক্ষে হাতে বা কাঁধে মাথা বহন করে বেঁচে থাকা অসম্ভব।
অম্বুজাক্ষ সেদিন তার মত মাথাহীন যারা বেঁচে আছে তাদের নাম বলেছিল। তাদের অনেকেই মকরধ্বজের পরিচিত। তারাও পন্ডিত, সুভদ্র, সুশীল। তারা অম্বুজাক্ষর মতোই বেঁচে আছে!
উন্নয়নের হাজার হাজার প্রজেক্টে যারা কাজ করে চলেছে তাদের কাউকে সে চেনে না।ধর্ম নিয়ে হল্লাকারিদের সে চেনে না।এরা কেউ তার শত্রু নয়,এদের কোন ক্ষতি সে করেনি।তবু এক বিচিত্র অবস্থার শিকার সে।
কথা বলতে বলতে রাত নেমে এসেছিল। পরের দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত একটানা কথা বলার সময় একবারও ধর্মের কথা উচ্চারণ করেনি মকরধ্বজ। টানা তিনঘন্টা সে কথা বলেছে। তার এতদিনের শিক্ষা সম্বল করে উন্নয়নের সঙ্গে মানব কল্যাণ জুড়ে দিয়ে সে কথা বলে গেছে । লেংড়ার শানানো ছুরিটা তার চোখের সামনে নাচছিল।
গভীর রাতে মকরধ্বজ তার প্রিয় নদীর পাশে এসে দাঁড়াল।তার হাত বহন করছিল তারই মাথা।কেউ যা কখনো করেনি,হাত থেকে মাথাটা ছুরে দিয়েছিল নদীর জলে।
নদীতীরে মকরধ্বজের মৃত ধড় পড়েছিল।


5 মন্তব্যসমূহ
গল্প বলার এক নতুন শিল্প। অথচ বিষয়ের দিক থেকে নতুন না হলেও যেভাবে গল্পটা বলা হল পাঠকের কাছে তার ধরনে বিষয়টা নতুন মনে হল। যেন চিরায়ত একটা বিষয়কে শান দিয়ে ল্যাঙড়ার হাতে মাথা কাটা যাওয়ার মতো বিষয়টা কাটা গেছে নতুনভাবে বলা হল তার ফলে এমন রাজনৈতিক বিষয় নতুন করে সেজে উঠল। এটা পাশাপাশি সামাজিক প্রেক্ষাপটে লেখা গল্পও। পাশাপাশি আবার সাধারণ আমজনতার গল্প। পরিণতির গল্প। রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার গল্প, রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত সমাজের চিত্র। শেষমেষ চূড়ান্ত পরিণতি মৃত্যুর ভিতর দিয়ে গল্পটা পাঠকের ব্যক্তিগত হয়ে উঠল। পাঠক তখন নিজের বিচার নিজে করছেন। চূড়ান্ত ব্যক্তিগত হয়েও গল্পটা রাজনৈতিক হয়ে থাকল।
উত্তরমুছুনশুভ লক্ষণ যে তপনকরদার ন্যারেটিভ ইদানিং আলোচনায় আসছে। আমি দৃঢ় ভাবে এই মত পোষণ করি যে তপনকরদা যাত্রালগ্ন থেকেই আলাদা। তিনি যে সময়ে লিখতে শুরু করেন তখন বাংলায় আঁকাড়া বাস্তবতার জয়যাত্রা। যেন অনেক কিছু সমাধান হয়ে গেছে। যেন আর একটু এগোলেই সুচেতনার সূর্য উঠবে। কিন্তু সুচেতনার আলো প্রায়শই যে চাঁদ মাফিক হয় এটা বুঝেছিলেন তপনকরদা কয়েক দশক আগেই। এমন আলো যা মৃদু আর সে মৃদু আলোয় যে ন্যারেটিভ বর্ষায় তা বাস্তবতার প্রতিসরিত এক সূক্ষ্ম সমান্তরাল ন্যারেটিভ বানাতে থাকে অনবরত। এই প্রবণতা কী জীবনানন্দ কথিত কারুবাসনা তাড়িত জেনেটিক ? না হলে এতটা সময় পরেও তপনকরদা অন্তর্গত ন্যরেটিভ স্টাইল ধরে রাখলেন কী করে ? জানি না।
উত্তরমুছুননবনিরীক্ষার ফল। এঁর গল্প আগে পড়িনি বলে আক্ষেপ হচ্ছে।
মুছুনdebasissarkar3369@gmail. com
উত্তরমুছুন"অত:পর তাহারা বিবাহ করিল ও সুখে বসবাস করিতে লাগিল । " circular form of story telling এখানে নেই । বাঁ হাতে আপনার মাথা নিয়ে ডানহাতে মাথটির চোখের জল মোছাবেন নাকি মাথাটা ছুঁড়ে ফেলে দেবেন সে স্বাধীনতা আপনার লেখক গল্প শুরু করবেন লেখকই গল্প শেষ করবেন সে মৌরসি পাট্টা লেখক এর হাতে আর নেই চোখের জল মোছাবেন
মুছুন