পর্ব- ৪
কাশ্মীর বেড়িয়ে ষোলোশো কুড়ির অক্টোবরে শাহী বহর লাহোরের পথে রওনা দিল। শাজাহানের চতুর্থ সন্তান শাহ সুজাকে জাহাঙ্গীর কাছ ছাড়া করেননি । ছোট্টো শাহজাদার মৃগী রোগের কথা আমরা জেনেছি। কাশ্মীরেই ডাল লেকের ধারের শাহী প্রাসাদে এক পর্দা দেওয়া গবাক্ষ থেকে শিশু সুজা ছুট্টে এসে পনেরো ফুট নীচে পড়ে যান। নীচে তখন এক নোকর জড়ো করে রাখা ফরাস পাতছিল। ভাগ্যক্রমে শাহাজাদা খানিকটা ফরাসে, খানিকটা লোকটির ওপর পড়েন। ধরাধরি করে ফরাস সমেত সুজাকে প্রাসাদে নিয়ে আসা হল, তিনি তখন এত দুর্বল যে কথা বলতে পারছেন না।
জাহাঙ্গীর লিখছেন , '' অনেকক্ষণ ওকে জড়িয়ে ধরে বসে আল্লাহর দোয়া মাঙছিলাম। '' জ্যোতিষী জটিক রাই বললেন, '' এ বেঁচে যাবে কিন্তু হারেমের এক বেগমকে কিছুদিনের মধ্যে পরমেশ্বর ডেকে নেবেন। '' ঘটনাচক্রে কিছুদিনের মধ্যেই জাহাঙ্গীরের বয়স্কা বেগম সালিহা বানু মারা গেলে বাদশাহ খুব মুষড়ে পড়লেন। জ্যোতিষ বিশ্বাসে ভরপুর এসব কথা জাহাঙ্গীর লিখে রেখেছেন যার মধ্যে অনেক তথ্যের পরতও আছে। বেগম কাশ্মীরেই মারা যান কিনা পরিষ্কার হচ্ছে না। ফেরার দুর্গম পথের চড়াই উৎরাইয়ে বাদশাহের শ্বাসকষ্ট হয়েছিল।নভেম্বর মাসে বাদশাহ লাহোরে পৌঁছে ভালো খবর পেলেন , শাজাহান দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধের ফাঁকে কাংড়ার বিদ্রোহী রাজাকে হারিয়ে তাঁর রাজপ্রাসাদ কব্জা করেছেন। ডিসেম্বরে খবর আসছে দাক্ষিণাত্যে শত্রু ফৌজ খেত খালিহান জ্বালিয়ে দিয়েছে , মোঘল বাহিনী লড়েও রসদের অভাবে পিছু হটেছে।ওই মাসেই শাহজাহান অল্প কদিনের জন্য লাহোরে আসছেন। মনে হয় খাস দরবারে দাক্ষিণাত্য পরিস্থিতি নিয়ে মিটিং হয়। বাদশাহের শ্বাস কষ্ট বাড়ছে , কে তখ্তে বসবে তাঁর পর ? শাজাহান পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। যতদূর সম্ভব শ্বশুর আসফ খান তাঁকে জানিয়ে দিচ্ছেন সব। নূর জাহান কী করছেন , কার সঙ্গে লাডলি বেগমের বিয়ে হবে ? তেনামেনা করে শেষ পর্যন্ত নেহাতই নাবালক অনভিজ্ঞ শাহজাদা শাহরিয়ারের সঙ্গেই বিয়ে ঠিক করলেন নূর জাহান। উনি ঠিক করা মানে জাহাঙ্গীরেরও সায়। বাদশাহের সায় মানে ঘটনা আর সে ঘিরে প্রচুর অন্য সম্ভাবনা। লাহোর ছাড়ার আগেই ইদমদ উদ দৌলা গিয়াস বেগের প্রাসাদে তাঁর নাতনি লাডলি বেগমের সঙ্গে শাহজাদা শাহরিয়ারের বিয়ের সাচিক - আশীর্বাদী উপহার হিসেবে নগদ এক লাখ টাকা আর মূল্যবান জিনিষ পাঠাচ্ছেন বাদশাহ । কথা পাক্কা, যা কথারও জন্ম দেয়।
------ এটা কী ঠিক করলেন আব্বুজান !
------ কেন ?
------ আবার বলছ -কেন ?
------ কেন বলবো না ?
------ বলবে না কারণ আমার নাম শাজাহান।
------ শাহাজাদা শাহজাহান।
------ শাহেনশা শাহজাহান।
------ কবে থেকে ?
------ খুব শিগ্রী……
------ কী ?
------ খুব শিগ্রী শুরু হবে।
------ এটা কী ঠিক করলেন আব্বুজান !
------ কেন ?
------ আবার বলছ -কেন ?
------ কেন বলবো না ?
------ বলবে না কারণ আমার নাম শাজাহান।
------ শাহাজাদা শাহজাহান।
------ শাহেনশা শাহজাহান।
------ কবে থেকে ?
------ খুব শিগ্রী……
------ কী ?
------ খুব শিগ্রী শুরু হবে।
------ কী ?
------ হবে। একরকম .......
------ কী ?
------ বলতে পার জং ...
------ জং ! কার বিরুদ্ধে ?
------ নাইনসাফির বিরুদ্ধে।
----- জং ?
----- হ্যাঁ।
------ কোথায় ?
------ কোথায় নয় ? দাক্ষিণাত্যে , সুবে বাংলায় , আগ্রার আশপাশ।
------ সে তো ভয়ানক ব্যাপার ! ফিতনা !
------ বলতে পার।
------ আমি বলার কে ?
------ তাহলে দেখ। দেখতে থাক। শাহাজাদা শাহরিয়ার কিছুতেই বসবে না।
------ কোথায় ?
----- তখ্তে। কিছুতেই না।
----- খুসরুর কি হবে ? অন্ধ শাহাজাদা।
----- দেখবে।
----- সব কি দেখতে পাব ?
----- তাহলে শুন। তাতে তো বাধা নেই। ----- তা নেই বটে।
------ তাহলে শুনতে থাক।
------ শুনব ?
------ দেখতে না পেলে শুনবে।
নূর জাহান - শাজাহান রেষারেষি চরমে পৌঁছয়। যদিও বাইরে তার প্রকাশ নেই। একরাশ দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ষোলোশো কুড়ির ডিসেম্বরের ষোলো তারিখ আবার দাক্ষিণাত্য যুদ্ধাভিযানে যাচ্ছেন শাজাহান, তাঁকে প্রচুর উপহারে সম্মানিত করা হচ্ছে বাদশাহর তরফে , নূর জাহানের দেওয়া এক হাতিতে সওয়ার হচ্ছেন তিনি।মুমতাজ কি তাঁর সঙ্গে বা বাচ্চারা ? সেই দিনই জাহাঙ্গীর আর নূর জাহান সদলবলে আগ্রায় চললেন লাহোরের বিশ্রাম সেরে। ষোলোশো একুশের ফেব্রুয়ারিতে তাঁরা রাজধানী আগ্রা পৌঁছচ্ছেন। মার্চের শেষে নূর জাহান ও আগের পক্ষের বর দুদ্ধর্ষ যোদ্ধা এক সময়ের বাংলার মোঘল সুবেদার আলি কুলি বেগ উরফে শের আফগানের মেয়ে লাডলি বেগমের সঙ্গে শাহাজাদা শাহরিয়ারের বিয়ের আসর বসছে গিয়াস বেগ ও আসফ খানের মহলে। শাহজাদার মা কে ছিলেন জানা যায় না। ওই অনুষ্ঠানে মুমতাজের উপস্থিতির কথা বলছেন নূরের জীবনীকার ইতিহাসবিদ রুবি লাল। তাহলে কি মুমতাজ ছেলেমেয়েদের নিয়ে আগ্রায় থেকে গিয়েছিলেন বিয়ের জন্য বা তাঁর গর্ভাবস্থার জন্যও হতে পারে কি ? কারণ শাজাহান তো চলে গেছেন দাক্ষিণাত্যে, ওই অনুষ্ঠানে তাঁর থাকারও উল্লেখ নেই।তাছাড়া ওই বিয়েটা তাঁর একেবারেই নাপসন্দ। প্রচুর ধুমধাম করে গুচ্ছের টাকা উড়িয়ে , বৈভব আর ক্ষমতার প্রদর্শণ ছিল মুঘল শাহাজাদাদের বিয়ের বৈশিষ্ট্য। এ সংক্রান্ত ছবি থেকে ওসবের রোশনাইয়ের রং আর বাজি তৈরিতে ওস্তাদ আতিশবাজদের বাজির আওয়াজ আসছে। তখন হয়তো মহামারী চলছে হয়তো বা শস্যহানি ও তৎজনিত দুর্ভিক্ষ যার ছবিও নেই , নেই নির্দিষ্ট তারিখনামা , ইতিহাস বেত্তান্ত। মেয়ে পক্ষের অনুষ্ঠানের পর আর এক আয়োজন হল হল নূর জাহানের প্রিয় বাগান, এখনকার নাম রামবাগ, যা তখন ছিল বাগ ই নূর আফসান বা আলোকময় উদ্যানে আর শাহজাদা শাহরিয়ারকে প্রচুর উপহার, উপঢৌকন দিয়ে তখ্তের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে সামনে আনলেন স্বয়ং বেগম ।বরং জাহাঙ্গীর একটু অন্য ভাবে ভাবছিলেন, গোটা মোঘল দরবারও তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল শাহাজাদা খুররাম - শাহাজাদা শাজাহানের ওপর।তাঁদের বিবেচনা ছিল একটু অন্য। শাহাজাদা খুসরু স্বয়ং আকবরের প্রিয়পাত্র হয়েও মোঘল ক্ষমতার রাজনীতিতে সফল হননি। ষোলোশো ছয়ে তিনি বার কয়েক বিদ্রোহ করলেন বাবা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে , চেষ্টা করলেন অনেকের সঙ্গে হাত মেলাতে কিন্তু সেসব কোন হিসেবই মেলেনি। শিখ গুরু অর্জুন সিংহ খুসরুর প্রতি সদয় হওয়ার অভিযোগে প্রাণ হারান। জাহাঙ্গীর নিজে শিখ গুরুর মৃত্যুদণ্ডের দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারে লিখেছেন।শেষ বারের বিদ্রোহে একমাসের মধ্যে ধরা পড়েন খুসরু।তিনি চরম শাস্তি পেয়ে প্রায়ান্ধ আর নজরবন্দী হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বাগে রাখতে শাজাহান তাঁকে দাক্ষিণাত্যে নিয়ে গেছেন দরবার থেকে দূরে থাকার জামিন হিসেবে আর সেটা মানতে হয়েছিল বাদশাহকে কারণটা আর কিছু নয় দাক্ষিণাত্যে সেনাভিযানে শাহজাদার দক্ষতা, অপরিহার্যতা, সারা দরবারও তা মানতে বাধ্য। ক্ষমতার খেলায় অনেক এগিয়ে শাজাহানই। নূর জাহান না মানলেও সবাই মানছে।
শাহাজাদা শাহরিয়ারের গুরুত্ব, ধন সম্পদ , প্রতিপত্তি বাড়াতে তাঁর মহলের দায়িত্ব দেওয়া হল নূর জাহানের কাছের লোক মোঘল দরবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শরিফ উল মূলককে, হিসেব রাখার লোক, খাজাঞ্চি করা হল অভিজ্ঞদের। আসফ খান সব খবর পৌঁছে দিচ্ছেন শাজাহানকে। সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে নজর রাখছেন তিনি। উত্তর আফগানিস্তান সহ উজবেগিস্থান , কিরগিজিস্থান , তাজিকিস্থান , তুর্কমেনিস্থান নিয়ে গঠিত ছিল তুরান। সেই তুরানের সঙ্গে মোঘলদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না সেখানের উজবেগ রাজা ইমাম কুলিকে জাহাঙ্গীর শিশুকামী বলে বিদ্রুপ করায়। তুরানের রাজমাতা সম্পর্ক ভালো করার প্রস্তাব পাঠান , বশ্যতার আভাসও ছিল। নূর জাহানকে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল করতে দেখা যাচ্ছে।পারস্যের শিয়া সাফাভিদদের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে পাশের সুন্নি রাজ্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক দরকার ছিল।শাজাহানের উপস্থিতিতেও দাক্ষিণাত্যের পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল না, মালিক অম্বর অধরা। জাহাঙ্গীর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক হাকিম ব্যর্থ হলেও নূর জাহানের কড়া নজরদারিতে মদ কমিয়ে ভালো হয়ে ওঠেন। নূরের মা আসমত বেগম মারা গেলেন ষোলোশো একুশের সেপ্টেম্বর। শাহী বহর হরিদ্বারে চলল গরম এড়াতে। বেগমের মৃত্যুর শোক সামলাতে না পেরে গিয়াস বেগ অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছেন ষোলোশো বাইশের সাতাশে জানুয়ারী। তাঁকে এমনি ওমনি ইদমদ উদ দৌলা বা রাজস্তম্ভ বলা হতো না , পুরো সাম্রাজ্যের ক্ষমতার রাশ ছিল আকবরেরও একান্ত আস্থাভাজন এই উজিরের হাতে। তাঁর মৃত্যুর পর যোগ্য বড় ছেলে আসফ খানের বদলে সমস্ত শাহী দায়ভার দেওয়া হচ্ছে নূর জাহানকে। এক স্থায়ী চিড় ধরলো মোঘল ক্ষমতাবৃত্তে। শাজাহান-আসফ জুড়ি অচ্ছেদ্য হয়ে গেল। নূর জাহান আদেশ দিচ্ছেন মা বাবার বিখ্যাত সমাধি সৌধ নির্মাণের , যা বানাতে লেগেছিল ছ বছর। ঠিক এসময়ই দ্রুতগামী কোন বিশেষ বার্তাবাহক এক জরুরি বার্তা নিয়ে আসে শাহেনশার কাছে।আর সবাই জানে শাহেনশার কাছে মানে নূর জাহানেরও কাছে।
----- খবর এসেছে।
----- কিসের ?
----- সে বলা বড় মুশকিল , কিসের।
----- পাঠাল কে বলবে তো ?
----- অবশ্যই বলব।
----- তা হলে চটপট বল।
----- পাঠিয়েছেন শাহাজাদা শাজাহান।
----- কী আছে তাতে ?
----- মৃত্যুর খবর।
----- কার ?
----- মারা গেলেন শাহাজাদা খুসরু।
----- মারা গেলেন না মারা হল ?
----- সেকি খবরে থাকে !
----- থাকে না ?
----- না। খবর শুধু খবরই হয়।
----- মানে ?
----- বুঝলে না ?
----- না।
----- যে পাঠায় সে যা বলে সেটাই খবর।
----- কে পাঠায় ?
----- বললাম না শাহাজাদা শাজাহান পাঠিয়েছেন।
----- তা, কী পাঠালেন তিনি ?
----- পেটের ব্যথায় মারা গেছেন শাহাজাদা খুসরু- মান বাইয়ের ছেলে ,জাহাঙ্গীরের প্রথম সন্তান।কঠিন আন্ত্রিক রোগে মারা গেছেন । লেখা আছে খবরে ।
----- যুদ্ধে নয় ?
------ না যুদ্ধে নয়।
------ এতো বড় যোদ্ধা ছিলেন , যুদ্ধে নয় ?
------ ভুলে গেছ সব।
------ ভুলে গেছি ?
------ খুসরুর বিদ্রোহের কথা ভূলে গেছ ?
------ বিদ্রোহ , হ্যাঁ তা বটে।
----- যুদ্ধ কী করে করবেন , তিনি তো ভালো করে দেখতেই পান না , বাদশাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে , ধরা পড়লে , প্রায়ান্ধ করা হল তাঁকে। ভুলে গেছ ?
----- প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।
----- এবার পুরোটা ভুলবে।
----- আদেশের মতো শোনাচ্ছে !
----- আদেশ কী করে হবে , ফরমান ? শাহেনশা নিজেই তো বিশ্বাস করেন না।
----- কাকে ?
----- শাহাজাদা শাজাহানকে।
----- তাতে তো সত্যি আটকাচ্ছে না। মৃত্যুর মতো সত্যি।
----- ঠিক। শাহাজাদা খুসরু মৃত। এটাই সত্যি।
----- তাঁর দেহ আগ্রায় আনা হচ্ছে , তারপর তা যাবে ইলাহাবাদে- শাহাজাদা খুসরুর সমাধি সৌধে।
----- পথে কাতারে কাতারে প্রজা শ্রদ্ধা জানাবে। ----- কোন পথে ? কোন কোন পথে ?
----- আগ্রায় , ইলাহাবাদে যাত্রা পথে।
----- কোথায়, কোথায় ?
----- দাক্ষিণাত্য থেকে আসার পথে। ইলাহাবাদে যাবার পথে। তিনি শুয়ে আছেন খুসরু বাগে তাঁর মা মান বাই - মানভাবতী বাই - শা বেগমের পাশে। দিদি সুলতান উন্নিসার পাশে। জায়গাটা খুসরু বাগ। ইলাহাবাদ উরফে প্রয়াগরাজে। এখনো মানুষ যায় সমাধিতে , ফুল দেয়, গোলাপও থাকে তাতে ।
----- দেয় ?
----- এখনো।
শাহাজাদা খুসরুর মৃত্যুর খবরে মোঘল দরবারে চাঞ্চল্য দেখা দিল। হারেমের বয়স্ক বেগমরাও অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছিলেন বলে ভাবা যেতে পারে কারণ শাজাহানের সঙ্গে খুসরুকে দাক্ষিণাত্যে ছাড়তে তাঁরা যথেষ্ট গররাজি ছিলেন। অনেকেরই ধারণা বদ্ধমূল হল যে এটা একটা ষড়যন্ত্র যার নাটের গুরু শাজাহান। পথের কাঁটা সরাতে খুসরুকে মেরেছেন তিনিই। জাহাঙ্গীর ফরমান জারি করলেন আগ্রার কাছে ঢোলপুরের কেল্লা আর জায়গির শাহাজাদা শাহজাহানের থেকে বাজেয়াপ্ত করে শাহাজাদা শাহরিয়ারকে দিতে। এই কেল্লা আর জায়গির উদ্ধার করতে দাক্ষিণাত্য থেকে সৈন্য পাঠাচ্ছেন শাজাহান। তারা প্রবল বাধার মুখে পড়েও কেল্লার দখল নিয়ে আবার জায়গিরে শাজাহানের কতৃত্ব পুনপ্রতিষ্ঠা করছে। এই লড়াইটা কোন সাধারণ রেষারেষি ছিল না। এ ভয়ংকর যুদ্ধ হয় তাতে উভয়পক্ষের অনেক সৈন্য মারা পড়ে। নূর জাহান রাগে ফেটে পড়লেন। জাহাঙ্গীর ভাবছিলেন আবুল ফজলের কাটা মাথার কথা। -----আবুল ফজল ?
----- হ্যাঁ আবুল ফজল ইবন মুবারক।
----- পৃথিবীর প্রথম গেজেট রচনাকার। রাজনৈতিক অর্থনীতির আদি গ্রন্থ আইন ই আকবরী প্রণেতা। প্রাক পুঁজিবাদী মোঘল অর্থনীতিতেও যে টাকার সঞ্চালন প্রবল ছিল তা নথিভুক্ত করেছিলেন আবুল ফজল নিখুঁত তরিকায়। সেই সমৃদ্ধি, টাকার প্রবল সঞ্চালনকে উৎসাহ দিতে আর বিপুল রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে যে শাসন নীতিমালা তৈরি করতে হয় তার মুলে আছে সুল ই কুল - বহু বৈচিত্র্যপূর্ণ ইন্দো - পারসিক সমাজে , সামাজিক -ধর্মীয় সহনের কার্যক্রম রচনা।
----- সে তো আকবরের সৃষ্টি।
----- শুধু আকবরের কেন বাবর-হুমায়ূনের পর থেকে গোটা মোঘল সালতানাতের সময়কালে অর্থনীতির সমৃদ্ধি আর টাকার সঞ্চালনের ব্যবস্থার ওপর যে রাজস্ব আদায় আর উপচে পড়া কোষাগার সে ওই সুল ই কুলের সহনের কার্যক্রম নির্ভর। শান্তি , স্থিতি আর সমৃদ্ধি যে পাশাপাশি বয়।
----- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সুল ই কুলের পক্ষে ছিলেন ?
-----ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সমৃদ্ধ অর্থনীতির আর বর্ধিত রাজস্ব আদায়ের বিপক্ষে ? -----ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সুল ই কুলের পক্ষে ছিলেন ?
-----ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি মোঘল রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের পক্ষে ছিলেন ?
---- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সুল ই কুলের পক্ষে ছিলেন ?
---- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি স্থায়ীত্বের বিপক্ষে ছিলেন ?
---- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সুল ই কুলের পক্ষে ছিলেন ?
----- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি.......
----- এতো প্রশ্ন কেন ?
----- এতো প্রশ্নের জন্ম কেন ?
------ প্রশ্ন থেকে প্রশ্নের জন্ম হয়।
------ আবুল ফজলের কাটা মাথার কী হল ?
জাহাঙ্গীর বাদশাহ হননি, তখনো তিনি শাহাজাদা । বাবা আকবরের বিরুদ্ধে একরকম বিদ্রোহ ঘোষণা করে ইলাহাবাদে কেল্লা বানিয়ে একদিকে আগ্রার দিকে অন্য দিকে সুবে বাংলার দিকে নজর রাখেন। আকবরের স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠা জাহাঙ্গীরের প্রথম সন্তান খুসরু মাত্র সাত বছরেই পাঁচ হাজারি মনসব পান , বড় হলে তা বেড়ে বেড়ে দশ হাজারি হল সঙ্গে আরো কিছু শাহী সম্মান যা সে সময় জাহাঙ্গীরও পেতেন না। আকবরের কাছেই থাকতেন তিনি, ব্যাপারটা একদমই পছন্দের ছিল না জাহাঙ্গীরের। তার ওপর ছোট ভাই দানিয়েলের সঙ্গে তীব্র রেষারেষি। পনেরোশো নিরানব্বই সালে একবার তো বাবার দাক্ষিণাত্য অভিযানের সুযোগে আগ্রা দখল করতে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর।শেষে আকবরের মা হামিদা বানু বেগমের ধমক খেয়ে ইলাহাবাদে ফেরেন। ষোলোশো একেও আরেকবার এরকম ইচ্ছে জেগে ছিল তাঁর, বেরিয়ে পড়েও আকবরের সামনাসামনি হবার ভয়ে আবার ফিরে এলেন। ষোলোশো দুয়ে বড় ছেলের সঙ্গে মিটমাট করতে আকবর তাঁর সবচেয়ে কাছের কর্মচারী আবুল ফজলকে ইলাহাবাদ পাঠালেন। জাহাঙ্গীর ভাবলেন উল্টোটা । আলোচনা করে গিয়ে আবুল ফজল তাঁর বিরুদ্ধে যদি কড়া ব্যবস্থা নেবার বুদ্ধি দেন শাহেনশাকে ? ওরচা রাজা বীর সিং বুন্দেলার সঙ্গে তখন মোঘলদের ঝামেলা চলছিল। জাহাঙ্গীরের সঙ্গে হাত মেলালেন তিনি। তোপ-বন্দুকবাজি -তলোয়ারে নাদান, কালি কলমের বাদশাহ আবুল ফজল বেচারা মোঘল দরবারের নিয়মে মাত্র একশো সওয়ারি মনসবদার , নেহাতই অরক্ষিত। দুধর্ষ ওরচা রাজার ঘোড়সওয়াররা পথেই তাঁকে পাকড়াও করে আর মাথা কেটে সেসময়ের প্রথায় জাহাঙ্গীরের কাছে ভেট দেয়। এর ছবি সম্ভবত নেই থাকলে অন্য এরকম কাটা মাথা ছবির মতো তাঁর কাটা মাথার পাগড়ীটাও রংচঙে হতো নিশ্চিত। তাই জাহাঙ্গীর আবুল ফজলের কাটা মাথার কথার সঙ্গে তার ছোট বয়েসের বিদ্রোহের কথা তো ভাববেনই যা যুদ্ধকুশলী মোঘল শাহাজাদাদের পুরনো অভ্যেস । শাজাহান আর এমন কী করেছে ? আরো ভাববেন হতভাগ্য শাহাজাদা খুসরুর কথা যাঁকে তিনি বরাবর মন থেকে ঘৃণা করে এসেছেন । এসময় উত্তরপশ্চিম সীমান্তে পারস্যের সাফাভিদ সম্রাট গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র কান্দাহার দখলের পরিকল্পনা করছিলেন। সবদিক ভেবে, সম্ভবত নূর জাহানের সঙ্গে গভীর শলা পরামর্শ করেই অনেকটা মোলায়েম করে জাহাঙ্গীর ফরমান দিলেন -জোর করে কেড়ে নেওয়া জমি শাজাহান ফিরিয়ে দেবেন আর কান্দাহারে সেনা পাঠাবেন । শাজাহান অস্বীকার করলেন। জাহাঙ্গীর খুবই দুঃখ পেলেন। একান্ত অনুগত আবুল ফজলের মৃত্যুতে একই রকম দুঃখ পান আকবর। কদিন নাকি কথা বলতে পারেন না। তারপর সাম্রাজ্যের ভিড়েরা তাঁকে ঘিরে ধরে - বিমাতা সুলতানা সালিমা বেগমকে পাঠাচ্ছেন জাহাঙ্গীরকে ফিরিয়ে আনতে। ফিরে আসছেন জাহাঙ্গীর। ভাই শাহাজাদা দানিয়ালের সঙ্গে তুমুল বিবাদে জড়াচ্ছেন। সিসোদিয়াদের বাগে আনতে মেওয়ার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করছেন - ঠিক যেমন করলেন শাজাহান কান্দাহার যেতে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য শাহাজাদা সেলিমই জাহাঙ্গীর হয়ে তখ্তে বসলেন। কোথাও অবশ্য জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ -অভিমান লিপিবদ্ধ করেননি আকবর। জাহাঙ্গীর তা করবেন না আবার তার শ্বাসকষ্ট শুরু হবে-তিনি লিখতে থাকবেন ,' কোন কষ্টের কথাই বা লিখি ?' ঘোড়া ছুটিয়ে এই গরমে এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন, বজ্জাত ছেলেকে ধরে আনতে বেরবেন কি ? নিজেকে প্রশ্ন করছেন তিনি। শাজাহানকে বেদৌলত ঘোষণা করে ফরমান জারি করছেন জাহাঙ্গীর। বাগী শাহাজাদা খুসরুর পরিণতি হচ্ছে শাজাহানের ? খুসরুর বিদ্রোহতেই মোঘলদের তখ্ত ইয়া তাবুত - হয় তখ্তে নয় কবরে পরিণতির শুরুয়াত হল। একের পর এক , একের বিরুদ্ধে দুই , দুয়ের বিরুদ্ধে এক অথবা তিনকে লড়ে যেতে দেখা যাবেই। শাহাজাদাদের এই নতুন নতুন বিদ্রোহে সাম্রাজ্য এগোয়। নতুন বন্ধু পায় নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র। পুরোনোরা নির্বিশেষে সরে না। সবক শেখে , শেখানো হয় গুটিকয়েককেই। যোগের ভাগটা বেশি হলে তবেই না রাজত্ব সুন্দরতর কায়েম হবে। এই কায়েম রাখার স্বার্থেই সব বিদ্রোহের অভিমুখ চালিত হয়। শাজাহানের বিদ্রোহের কি একই পরিণতি ? তখ্তে ? না তাবুতে ?
এই সুযোগে নূর জাহান শাহাজাদা শাহরিয়ারকে কান্দাহারের গড় রাখতে অভিযানের সেনানায়ক করার প্রস্তাব করেন। জাহাঙ্গীরের রাজি হওয়া ছাড়া গতি কী ? এখন থেকে শাহাজাদা শাহরিয়ার হলেন ইকবালমন্দ - সৌভাগ্যবান। বাড়ানো হয় তাঁর পদমর্যাদা, শাজাহানকে আগে বিলি করা আরো জায়গির শাহরিয়ারকে দিয়ে দেবার আদেশ হল। অভিজ্ঞ সেপাইসালাররা যোগ দেন তাঁর বাহিনীতে। ইতিমধ্যে লাডলি বেগম গর্ভবতী হয়েছেন। নূর জাহান উৎফুল্ল, শহারিয়েরের তখ্তে বসা সময়ের অপেক্ষা। এই সব মোঘল দরবারের একটা অংশ ভালো চোখে দেখেনি। ইতিহাসকার ভাককরি কান্দাহারের যুদ্ধ পরিস্থিতি , শাজাহানের বিদ্রোহ আর ক্ষমতার নতুন বিন্যাসের জন্য নূর জাহানের সব কিছুর জন্যই 'বদমাশিকে ' দায়ী করলেন । যথেষ্ট রাজনীতি কুশলী , রসজ্ঞ আর উদারচেতা হলেও এক নারীর এই ক্ষমতায়ন পছন্দ করেননি তিনি। পারস্যের সাফাভিদ সম্রাট শাহ আব্বাসের কান্দাহার আক্রমণ আর শাজাহানের বিদ্রোহের ফলে মোঘল সাম্রাজ্যে অনেক অদলবদল হল। বিশ্বস্ত লোকেদের পদোন্নতি করে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পাঠানো হল। খুসরুর ছেলে দিওয়ার বক্সকে কিছুদিনের মধ্যেই গুজরাটের সুবেদার করা হচ্ছে।শাহরিয়ার এক বড় ফৌজের নেতৃত্ব দিয়ে আগ্রা ছেড়ে যাবেন কান্দাহারে ।
এবার শাজাহানের বিদ্রোহ দমনের প্রস্তুতি নিতে হয়। শাজাহানের শশুর হওয়ার কারণে নিজের ভাই আসফ খানকেও আর ভরসা করতে পারছিলেন না নূর জাহান। নূর জাহানের নিজের আর তাঁর পরিবারের ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন না বাদশাহের বিশ্বস্ত সিপাহসালার মহবত খান তবু আসফকে পাঙ্গা নিতে তাঁকে কাবুল থেকে আগ্রায় আসতে বললেন বেগম। তাছাড়া মহবত খান খুসরুর মারা যাবার জন্য শাজাহানের ওপর চটে ছিলেন যদি তাঁকে শাহরিয়ারের হাত শক্ত করতে কাজে লাগানো যায়।মহবত ওতো সহজে ভোলার পাত্র নন। তিনি প্রকাশ্যে নূর জাহান আর তাঁর পরিবারের বিরোধী। ভাবলেন এটার পেছনে মোঘল দরবারের খোরসানি বা ইরানিদের চাল আছে। হয়তো আসফকে দিয়ে তাঁকে খতম করার মতলব করছেন নূর জাহান। তখনো মহবত জাহাঙ্গীরের একান্ত অনুগত ছিলেনতিনি নূর জাহানকে লেখেন যে আসফ খানকে বাংলায় পাঠাতে হবে আর শাহী খাজাঞ্চি মুতামাদ খান যেহেতু শাজাহানের সঙ্গে শাহেনশা বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাঁকেও শাস্তি দিতে হবে তবেই তিনি আগ্রায় আসবেন। আসফকে আগ্রার তোষাখানা থেকে কিছু মণিমুক্তো নিয়ে লাহোরে যাবার দায়িত্ব দেওয়া হয় আর মুতামাদকে খাজাঞ্চির পদ থেকে সরিয়ে জাহাঙ্গীরনামায় লেখালেখির কাজ দেওয়া হয়। জাহাঙ্গীর মহবতকে আসফ সম্পর্কে আশ্বস্ত করলেন। আগ্রায় এসে বাদশাহের কাছ থেকে শাজাহানের সঙ্গে লড়াইয়ের দায়িত্ব বুঝে নিলেন মহবত খান। তাঁর পদমর্যাদা বাড়িয়ে পাঁচ বা ছ হাজারি মনসব দেওয়া হল। মুঘল দরবারে অভিজাতরা কে যে কখন বাদশাহের ওপর বিরূপ হচ্ছেন তা বোঝার জো ছিল না। একমাত্র শাহাজাদারা বিদ্রোহী হয়ে উঠলেই টের পাওয়া যেত কে কে বিদ্রোহে যোগদান করলেন। তখন আবার বিশ্বাসভঙ্গের জন্য ক্ষমতাবৃত্তে রদবদল হতো। শাজাহান বেশ কিছু রাজপুরুষের আনুকূল্য পান। তার মধ্যে বুরহানপুরের দায়িত্বে থাকা অভিজ্ঞ সেপাইসালার পণ্ডিত খান আব্দুল রহিম খান ই খানান ছিলেন। এর কারণ হয়ত তাঁর নাতনি আকবরাবাদী বেগমের সঙ্গে শাজাহানের বৈবাহিক সম্পর্ক। হয়ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ প্রস্তুতির তোড়জোড় দেখে বেশ কিছু মোঘল অভিজাত শাজাহানের সঙ্গে হাত মেলানোর কিছুদিনের মধ্যেই আবার জাহাঙ্গীরের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন।
একদিকে কান্দাহারের লড়াই অন্য দিকে সাম্রাজ্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী শাহজাদার সঙ্গে বেগম নূর জাহানের মধুর সম্পর্কের চিরতরে সমাপ্তি , জাহাঙ্গীরকে নিতান্তই বাধ্য করেছিল শাজাহান দমন অভিযানে সায় দিতে। খুবই মনোকষ্টের ব্যাপার ছিল এই সায় দেওয়া । জাহাঙ্গীর মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন তাঁর অবর্তমানে শাজাহান আর নূর জাহানের যুগ্ম শাসন চলুক। কিন্তু এই মনোগত ইচ্ছেরা স্বপ্নবপন করলেও তৈমুর ঐতিহ্যে ভঙ্গুর প্রমাণিত হল। শাজাহান আর নূর জাহান হয়ে উঠলেন পরস্পর বৈরী,খুবই বৈরী । তৎকালীন ইতিহাসকার ভাককরি তাঁর দাখিরাতুল খাওয়ানিন বইতে আবারো অভিযোগ করছেন যে রাজদ্রোহের এই আগুন আসলে জ্বালিয়ে ছিলেন নূর জাহান আর তাঁর অনুগত সেপাইসালার খান ই আব্দুল জাহান লোধি , শরিফ উল মুলক , বিশ্বস্ত অপর লিঙ্গের প্রধানদ্বয় জাওয়াহির আর নাদিম , মেয়ে লাডলির সহযোগে। এ বিষয়ে আরো বলছেন আধুনিক ইতিহাসকার ফারুখি বলছেন, এই বিদ্রোহ চলাকালীন শাজাহান বিমাতা নূর জাহানকে ক্ষমতালোভী বলে অভিযোগ করেন।একজন নারীকে কী করে এত বাড় বাড়তে দেন জাহাঙ্গীর!, আরো আক্ষেপ ছিল তাঁর। পরবর্তী কালে শাজাহানের সব সরকারি তারিখে এই বাবা- ছেলের দ্বন্ধের নাটের গুরু করা হয় নূর জাহানকে , ফিতনার আগুন জ্বালানোর ভয়ঙ্কর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে এক নারীর অতি তৎপরতা। যেমনটা করেছিলেন প্রথম খলিফা কন্যা পয়গম্বরের স্ত্রী আয়েশা, চতুর্থ খলিফা আর পয়গম্বরের জামাই পরম যোদ্ধা আলির খেলাপ লড়তে গিয়ে। সপ্তম শতকে আয়েশার নেতৃত্বে লড়াই হয়েছিল ব্যাটেল অফ ক্যামেলে। ইসলামে এটাই হলো ফিতনার , অগ্নি প্রজ্জলনকারী অশান্ত গৃহযুদ্ধনামার প্রথম লিখন। তবে সে যুদ্ধে আয়েশার সমালোচক শিয়া সম্প্রদায় যেমন আছে , তেমনি তাঁর ঐতিহাসিক অনুগামী আছেন সুন্নিরা। নূর জাহানের পক্ষে কে কে দাঁড়াবেন আসন্ন গৃহযুদ্ধে ? একথা একমাত্র জাহাঙ্গীরেরই ভাবার কথা -সহ শাসকের ধারণাটা যে তাঁরই। অনেকদিন পর , আজ থেকে সে মাত্র তিন দশকই হবে বটে ,নারীর দৃষ্টিতে দেখার শুরুয়াত ইতিহাসকে। এই গৃহযুদ্ধের মধ্যেও তাই নূর জাহান অবলোকন চলে , চলতেই থাকে তীক্ষ্ণতায়।
(অতিরিক্ত তথ্য সূত্র : Empress : The Astonishing Reign of Noor Jahan by Ruby Lal )
------ হবে। একরকম .......
------ কী ?
------ বলতে পার জং ...
------ জং ! কার বিরুদ্ধে ?
------ নাইনসাফির বিরুদ্ধে।
----- জং ?
----- হ্যাঁ।
------ কোথায় ?
------ কোথায় নয় ? দাক্ষিণাত্যে , সুবে বাংলায় , আগ্রার আশপাশ।
------ সে তো ভয়ানক ব্যাপার ! ফিতনা !
------ বলতে পার।
------ আমি বলার কে ?
------ তাহলে দেখ। দেখতে থাক। শাহাজাদা শাহরিয়ার কিছুতেই বসবে না।
------ কোথায় ?
----- তখ্তে। কিছুতেই না।
----- খুসরুর কি হবে ? অন্ধ শাহাজাদা।
----- দেখবে।
----- সব কি দেখতে পাব ?
----- তাহলে শুন। তাতে তো বাধা নেই। ----- তা নেই বটে।
------ তাহলে শুনতে থাক।
------ শুনব ?
------ দেখতে না পেলে শুনবে।
নূর জাহান - শাজাহান রেষারেষি চরমে পৌঁছয়। যদিও বাইরে তার প্রকাশ নেই। একরাশ দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ষোলোশো কুড়ির ডিসেম্বরের ষোলো তারিখ আবার দাক্ষিণাত্য যুদ্ধাভিযানে যাচ্ছেন শাজাহান, তাঁকে প্রচুর উপহারে সম্মানিত করা হচ্ছে বাদশাহর তরফে , নূর জাহানের দেওয়া এক হাতিতে সওয়ার হচ্ছেন তিনি।মুমতাজ কি তাঁর সঙ্গে বা বাচ্চারা ? সেই দিনই জাহাঙ্গীর আর নূর জাহান সদলবলে আগ্রায় চললেন লাহোরের বিশ্রাম সেরে। ষোলোশো একুশের ফেব্রুয়ারিতে তাঁরা রাজধানী আগ্রা পৌঁছচ্ছেন। মার্চের শেষে নূর জাহান ও আগের পক্ষের বর দুদ্ধর্ষ যোদ্ধা এক সময়ের বাংলার মোঘল সুবেদার আলি কুলি বেগ উরফে শের আফগানের মেয়ে লাডলি বেগমের সঙ্গে শাহাজাদা শাহরিয়ারের বিয়ের আসর বসছে গিয়াস বেগ ও আসফ খানের মহলে। শাহজাদার মা কে ছিলেন জানা যায় না। ওই অনুষ্ঠানে মুমতাজের উপস্থিতির কথা বলছেন নূরের জীবনীকার ইতিহাসবিদ রুবি লাল। তাহলে কি মুমতাজ ছেলেমেয়েদের নিয়ে আগ্রায় থেকে গিয়েছিলেন বিয়ের জন্য বা তাঁর গর্ভাবস্থার জন্যও হতে পারে কি ? কারণ শাজাহান তো চলে গেছেন দাক্ষিণাত্যে, ওই অনুষ্ঠানে তাঁর থাকারও উল্লেখ নেই।তাছাড়া ওই বিয়েটা তাঁর একেবারেই নাপসন্দ। প্রচুর ধুমধাম করে গুচ্ছের টাকা উড়িয়ে , বৈভব আর ক্ষমতার প্রদর্শণ ছিল মুঘল শাহাজাদাদের বিয়ের বৈশিষ্ট্য। এ সংক্রান্ত ছবি থেকে ওসবের রোশনাইয়ের রং আর বাজি তৈরিতে ওস্তাদ আতিশবাজদের বাজির আওয়াজ আসছে। তখন হয়তো মহামারী চলছে হয়তো বা শস্যহানি ও তৎজনিত দুর্ভিক্ষ যার ছবিও নেই , নেই নির্দিষ্ট তারিখনামা , ইতিহাস বেত্তান্ত। মেয়ে পক্ষের অনুষ্ঠানের পর আর এক আয়োজন হল হল নূর জাহানের প্রিয় বাগান, এখনকার নাম রামবাগ, যা তখন ছিল বাগ ই নূর আফসান বা আলোকময় উদ্যানে আর শাহজাদা শাহরিয়ারকে প্রচুর উপহার, উপঢৌকন দিয়ে তখ্তের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে সামনে আনলেন স্বয়ং বেগম ।বরং জাহাঙ্গীর একটু অন্য ভাবে ভাবছিলেন, গোটা মোঘল দরবারও তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল শাহাজাদা খুররাম - শাহাজাদা শাজাহানের ওপর।তাঁদের বিবেচনা ছিল একটু অন্য। শাহাজাদা খুসরু স্বয়ং আকবরের প্রিয়পাত্র হয়েও মোঘল ক্ষমতার রাজনীতিতে সফল হননি। ষোলোশো ছয়ে তিনি বার কয়েক বিদ্রোহ করলেন বাবা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে , চেষ্টা করলেন অনেকের সঙ্গে হাত মেলাতে কিন্তু সেসব কোন হিসেবই মেলেনি। শিখ গুরু অর্জুন সিংহ খুসরুর প্রতি সদয় হওয়ার অভিযোগে প্রাণ হারান। জাহাঙ্গীর নিজে শিখ গুরুর মৃত্যুদণ্ডের দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারে লিখেছেন।শেষ বারের বিদ্রোহে একমাসের মধ্যে ধরা পড়েন খুসরু।তিনি চরম শাস্তি পেয়ে প্রায়ান্ধ আর নজরবন্দী হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বাগে রাখতে শাজাহান তাঁকে দাক্ষিণাত্যে নিয়ে গেছেন দরবার থেকে দূরে থাকার জামিন হিসেবে আর সেটা মানতে হয়েছিল বাদশাহকে কারণটা আর কিছু নয় দাক্ষিণাত্যে সেনাভিযানে শাহজাদার দক্ষতা, অপরিহার্যতা, সারা দরবারও তা মানতে বাধ্য। ক্ষমতার খেলায় অনেক এগিয়ে শাজাহানই। নূর জাহান না মানলেও সবাই মানছে।
শাহাজাদা শাহরিয়ারের গুরুত্ব, ধন সম্পদ , প্রতিপত্তি বাড়াতে তাঁর মহলের দায়িত্ব দেওয়া হল নূর জাহানের কাছের লোক মোঘল দরবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শরিফ উল মূলককে, হিসেব রাখার লোক, খাজাঞ্চি করা হল অভিজ্ঞদের। আসফ খান সব খবর পৌঁছে দিচ্ছেন শাজাহানকে। সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে নজর রাখছেন তিনি। উত্তর আফগানিস্তান সহ উজবেগিস্থান , কিরগিজিস্থান , তাজিকিস্থান , তুর্কমেনিস্থান নিয়ে গঠিত ছিল তুরান। সেই তুরানের সঙ্গে মোঘলদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না সেখানের উজবেগ রাজা ইমাম কুলিকে জাহাঙ্গীর শিশুকামী বলে বিদ্রুপ করায়। তুরানের রাজমাতা সম্পর্ক ভালো করার প্রস্তাব পাঠান , বশ্যতার আভাসও ছিল। নূর জাহানকে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল করতে দেখা যাচ্ছে।পারস্যের শিয়া সাফাভিদদের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে পাশের সুন্নি রাজ্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক দরকার ছিল।শাজাহানের উপস্থিতিতেও দাক্ষিণাত্যের পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল না, মালিক অম্বর অধরা। জাহাঙ্গীর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক হাকিম ব্যর্থ হলেও নূর জাহানের কড়া নজরদারিতে মদ কমিয়ে ভালো হয়ে ওঠেন। নূরের মা আসমত বেগম মারা গেলেন ষোলোশো একুশের সেপ্টেম্বর। শাহী বহর হরিদ্বারে চলল গরম এড়াতে। বেগমের মৃত্যুর শোক সামলাতে না পেরে গিয়াস বেগ অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছেন ষোলোশো বাইশের সাতাশে জানুয়ারী। তাঁকে এমনি ওমনি ইদমদ উদ দৌলা বা রাজস্তম্ভ বলা হতো না , পুরো সাম্রাজ্যের ক্ষমতার রাশ ছিল আকবরেরও একান্ত আস্থাভাজন এই উজিরের হাতে। তাঁর মৃত্যুর পর যোগ্য বড় ছেলে আসফ খানের বদলে সমস্ত শাহী দায়ভার দেওয়া হচ্ছে নূর জাহানকে। এক স্থায়ী চিড় ধরলো মোঘল ক্ষমতাবৃত্তে। শাজাহান-আসফ জুড়ি অচ্ছেদ্য হয়ে গেল। নূর জাহান আদেশ দিচ্ছেন মা বাবার বিখ্যাত সমাধি সৌধ নির্মাণের , যা বানাতে লেগেছিল ছ বছর। ঠিক এসময়ই দ্রুতগামী কোন বিশেষ বার্তাবাহক এক জরুরি বার্তা নিয়ে আসে শাহেনশার কাছে।আর সবাই জানে শাহেনশার কাছে মানে নূর জাহানেরও কাছে।
----- খবর এসেছে।
----- কিসের ?
----- সে বলা বড় মুশকিল , কিসের।
----- পাঠাল কে বলবে তো ?
----- অবশ্যই বলব।
----- তা হলে চটপট বল।
----- পাঠিয়েছেন শাহাজাদা শাজাহান।
----- কী আছে তাতে ?
----- মৃত্যুর খবর।
----- কার ?
----- মারা গেলেন শাহাজাদা খুসরু।
----- মারা গেলেন না মারা হল ?
----- সেকি খবরে থাকে !
----- থাকে না ?
----- না। খবর শুধু খবরই হয়।
----- মানে ?
----- বুঝলে না ?
----- না।
----- যে পাঠায় সে যা বলে সেটাই খবর।
----- কে পাঠায় ?
----- বললাম না শাহাজাদা শাজাহান পাঠিয়েছেন।
----- তা, কী পাঠালেন তিনি ?
----- পেটের ব্যথায় মারা গেছেন শাহাজাদা খুসরু- মান বাইয়ের ছেলে ,জাহাঙ্গীরের প্রথম সন্তান।কঠিন আন্ত্রিক রোগে মারা গেছেন । লেখা আছে খবরে ।
----- যুদ্ধে নয় ?
------ না যুদ্ধে নয়।
------ এতো বড় যোদ্ধা ছিলেন , যুদ্ধে নয় ?
------ ভুলে গেছ সব।
------ ভুলে গেছি ?
------ খুসরুর বিদ্রোহের কথা ভূলে গেছ ?
------ বিদ্রোহ , হ্যাঁ তা বটে।
----- যুদ্ধ কী করে করবেন , তিনি তো ভালো করে দেখতেই পান না , বাদশাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে , ধরা পড়লে , প্রায়ান্ধ করা হল তাঁকে। ভুলে গেছ ?
----- প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।
----- এবার পুরোটা ভুলবে।
----- আদেশের মতো শোনাচ্ছে !
----- আদেশ কী করে হবে , ফরমান ? শাহেনশা নিজেই তো বিশ্বাস করেন না।
----- কাকে ?
----- শাহাজাদা শাজাহানকে।
----- তাতে তো সত্যি আটকাচ্ছে না। মৃত্যুর মতো সত্যি।
----- ঠিক। শাহাজাদা খুসরু মৃত। এটাই সত্যি।
----- তাঁর দেহ আগ্রায় আনা হচ্ছে , তারপর তা যাবে ইলাহাবাদে- শাহাজাদা খুসরুর সমাধি সৌধে।
----- পথে কাতারে কাতারে প্রজা শ্রদ্ধা জানাবে। ----- কোন পথে ? কোন কোন পথে ?
----- আগ্রায় , ইলাহাবাদে যাত্রা পথে।
----- কোথায়, কোথায় ?
----- দাক্ষিণাত্য থেকে আসার পথে। ইলাহাবাদে যাবার পথে। তিনি শুয়ে আছেন খুসরু বাগে তাঁর মা মান বাই - মানভাবতী বাই - শা বেগমের পাশে। দিদি সুলতান উন্নিসার পাশে। জায়গাটা খুসরু বাগ। ইলাহাবাদ উরফে প্রয়াগরাজে। এখনো মানুষ যায় সমাধিতে , ফুল দেয়, গোলাপও থাকে তাতে ।
----- দেয় ?
----- এখনো।
শাহাজাদা খুসরুর মৃত্যুর খবরে মোঘল দরবারে চাঞ্চল্য দেখা দিল। হারেমের বয়স্ক বেগমরাও অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছিলেন বলে ভাবা যেতে পারে কারণ শাজাহানের সঙ্গে খুসরুকে দাক্ষিণাত্যে ছাড়তে তাঁরা যথেষ্ট গররাজি ছিলেন। অনেকেরই ধারণা বদ্ধমূল হল যে এটা একটা ষড়যন্ত্র যার নাটের গুরু শাজাহান। পথের কাঁটা সরাতে খুসরুকে মেরেছেন তিনিই। জাহাঙ্গীর ফরমান জারি করলেন আগ্রার কাছে ঢোলপুরের কেল্লা আর জায়গির শাহাজাদা শাহজাহানের থেকে বাজেয়াপ্ত করে শাহাজাদা শাহরিয়ারকে দিতে। এই কেল্লা আর জায়গির উদ্ধার করতে দাক্ষিণাত্য থেকে সৈন্য পাঠাচ্ছেন শাজাহান। তারা প্রবল বাধার মুখে পড়েও কেল্লার দখল নিয়ে আবার জায়গিরে শাজাহানের কতৃত্ব পুনপ্রতিষ্ঠা করছে। এই লড়াইটা কোন সাধারণ রেষারেষি ছিল না। এ ভয়ংকর যুদ্ধ হয় তাতে উভয়পক্ষের অনেক সৈন্য মারা পড়ে। নূর জাহান রাগে ফেটে পড়লেন। জাহাঙ্গীর ভাবছিলেন আবুল ফজলের কাটা মাথার কথা। -----আবুল ফজল ?
----- হ্যাঁ আবুল ফজল ইবন মুবারক।
----- পৃথিবীর প্রথম গেজেট রচনাকার। রাজনৈতিক অর্থনীতির আদি গ্রন্থ আইন ই আকবরী প্রণেতা। প্রাক পুঁজিবাদী মোঘল অর্থনীতিতেও যে টাকার সঞ্চালন প্রবল ছিল তা নথিভুক্ত করেছিলেন আবুল ফজল নিখুঁত তরিকায়। সেই সমৃদ্ধি, টাকার প্রবল সঞ্চালনকে উৎসাহ দিতে আর বিপুল রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে যে শাসন নীতিমালা তৈরি করতে হয় তার মুলে আছে সুল ই কুল - বহু বৈচিত্র্যপূর্ণ ইন্দো - পারসিক সমাজে , সামাজিক -ধর্মীয় সহনের কার্যক্রম রচনা।
----- সে তো আকবরের সৃষ্টি।
----- শুধু আকবরের কেন বাবর-হুমায়ূনের পর থেকে গোটা মোঘল সালতানাতের সময়কালে অর্থনীতির সমৃদ্ধি আর টাকার সঞ্চালনের ব্যবস্থার ওপর যে রাজস্ব আদায় আর উপচে পড়া কোষাগার সে ওই সুল ই কুলের সহনের কার্যক্রম নির্ভর। শান্তি , স্থিতি আর সমৃদ্ধি যে পাশাপাশি বয়।
----- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সুল ই কুলের পক্ষে ছিলেন ?
-----ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সমৃদ্ধ অর্থনীতির আর বর্ধিত রাজস্ব আদায়ের বিপক্ষে ? -----ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সুল ই কুলের পক্ষে ছিলেন ?
-----ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি মোঘল রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের পক্ষে ছিলেন ?
---- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সুল ই কুলের পক্ষে ছিলেন ?
---- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি স্থায়ীত্বের বিপক্ষে ছিলেন ?
---- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি সুল ই কুলের পক্ষে ছিলেন ?
----- ঔরঙ্গজেব আলমগীর কি.......
----- এতো প্রশ্ন কেন ?
----- এতো প্রশ্নের জন্ম কেন ?
------ প্রশ্ন থেকে প্রশ্নের জন্ম হয়।
------ আবুল ফজলের কাটা মাথার কী হল ?
জাহাঙ্গীর বাদশাহ হননি, তখনো তিনি শাহাজাদা । বাবা আকবরের বিরুদ্ধে একরকম বিদ্রোহ ঘোষণা করে ইলাহাবাদে কেল্লা বানিয়ে একদিকে আগ্রার দিকে অন্য দিকে সুবে বাংলার দিকে নজর রাখেন। আকবরের স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠা জাহাঙ্গীরের প্রথম সন্তান খুসরু মাত্র সাত বছরেই পাঁচ হাজারি মনসব পান , বড় হলে তা বেড়ে বেড়ে দশ হাজারি হল সঙ্গে আরো কিছু শাহী সম্মান যা সে সময় জাহাঙ্গীরও পেতেন না। আকবরের কাছেই থাকতেন তিনি, ব্যাপারটা একদমই পছন্দের ছিল না জাহাঙ্গীরের। তার ওপর ছোট ভাই দানিয়েলের সঙ্গে তীব্র রেষারেষি। পনেরোশো নিরানব্বই সালে একবার তো বাবার দাক্ষিণাত্য অভিযানের সুযোগে আগ্রা দখল করতে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর।শেষে আকবরের মা হামিদা বানু বেগমের ধমক খেয়ে ইলাহাবাদে ফেরেন। ষোলোশো একেও আরেকবার এরকম ইচ্ছে জেগে ছিল তাঁর, বেরিয়ে পড়েও আকবরের সামনাসামনি হবার ভয়ে আবার ফিরে এলেন। ষোলোশো দুয়ে বড় ছেলের সঙ্গে মিটমাট করতে আকবর তাঁর সবচেয়ে কাছের কর্মচারী আবুল ফজলকে ইলাহাবাদ পাঠালেন। জাহাঙ্গীর ভাবলেন উল্টোটা । আলোচনা করে গিয়ে আবুল ফজল তাঁর বিরুদ্ধে যদি কড়া ব্যবস্থা নেবার বুদ্ধি দেন শাহেনশাকে ? ওরচা রাজা বীর সিং বুন্দেলার সঙ্গে তখন মোঘলদের ঝামেলা চলছিল। জাহাঙ্গীরের সঙ্গে হাত মেলালেন তিনি। তোপ-বন্দুকবাজি -তলোয়ারে নাদান, কালি কলমের বাদশাহ আবুল ফজল বেচারা মোঘল দরবারের নিয়মে মাত্র একশো সওয়ারি মনসবদার , নেহাতই অরক্ষিত। দুধর্ষ ওরচা রাজার ঘোড়সওয়াররা পথেই তাঁকে পাকড়াও করে আর মাথা কেটে সেসময়ের প্রথায় জাহাঙ্গীরের কাছে ভেট দেয়। এর ছবি সম্ভবত নেই থাকলে অন্য এরকম কাটা মাথা ছবির মতো তাঁর কাটা মাথার পাগড়ীটাও রংচঙে হতো নিশ্চিত। তাই জাহাঙ্গীর আবুল ফজলের কাটা মাথার কথার সঙ্গে তার ছোট বয়েসের বিদ্রোহের কথা তো ভাববেনই যা যুদ্ধকুশলী মোঘল শাহাজাদাদের পুরনো অভ্যেস । শাজাহান আর এমন কী করেছে ? আরো ভাববেন হতভাগ্য শাহাজাদা খুসরুর কথা যাঁকে তিনি বরাবর মন থেকে ঘৃণা করে এসেছেন । এসময় উত্তরপশ্চিম সীমান্তে পারস্যের সাফাভিদ সম্রাট গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র কান্দাহার দখলের পরিকল্পনা করছিলেন। সবদিক ভেবে, সম্ভবত নূর জাহানের সঙ্গে গভীর শলা পরামর্শ করেই অনেকটা মোলায়েম করে জাহাঙ্গীর ফরমান দিলেন -জোর করে কেড়ে নেওয়া জমি শাজাহান ফিরিয়ে দেবেন আর কান্দাহারে সেনা পাঠাবেন । শাজাহান অস্বীকার করলেন। জাহাঙ্গীর খুবই দুঃখ পেলেন। একান্ত অনুগত আবুল ফজলের মৃত্যুতে একই রকম দুঃখ পান আকবর। কদিন নাকি কথা বলতে পারেন না। তারপর সাম্রাজ্যের ভিড়েরা তাঁকে ঘিরে ধরে - বিমাতা সুলতানা সালিমা বেগমকে পাঠাচ্ছেন জাহাঙ্গীরকে ফিরিয়ে আনতে। ফিরে আসছেন জাহাঙ্গীর। ভাই শাহাজাদা দানিয়ালের সঙ্গে তুমুল বিবাদে জড়াচ্ছেন। সিসোদিয়াদের বাগে আনতে মেওয়ার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করছেন - ঠিক যেমন করলেন শাজাহান কান্দাহার যেতে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য শাহাজাদা সেলিমই জাহাঙ্গীর হয়ে তখ্তে বসলেন। কোথাও অবশ্য জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ -অভিমান লিপিবদ্ধ করেননি আকবর। জাহাঙ্গীর তা করবেন না আবার তার শ্বাসকষ্ট শুরু হবে-তিনি লিখতে থাকবেন ,' কোন কষ্টের কথাই বা লিখি ?' ঘোড়া ছুটিয়ে এই গরমে এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন, বজ্জাত ছেলেকে ধরে আনতে বেরবেন কি ? নিজেকে প্রশ্ন করছেন তিনি। শাজাহানকে বেদৌলত ঘোষণা করে ফরমান জারি করছেন জাহাঙ্গীর। বাগী শাহাজাদা খুসরুর পরিণতি হচ্ছে শাজাহানের ? খুসরুর বিদ্রোহতেই মোঘলদের তখ্ত ইয়া তাবুত - হয় তখ্তে নয় কবরে পরিণতির শুরুয়াত হল। একের পর এক , একের বিরুদ্ধে দুই , দুয়ের বিরুদ্ধে এক অথবা তিনকে লড়ে যেতে দেখা যাবেই। শাহাজাদাদের এই নতুন নতুন বিদ্রোহে সাম্রাজ্য এগোয়। নতুন বন্ধু পায় নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র। পুরোনোরা নির্বিশেষে সরে না। সবক শেখে , শেখানো হয় গুটিকয়েককেই। যোগের ভাগটা বেশি হলে তবেই না রাজত্ব সুন্দরতর কায়েম হবে। এই কায়েম রাখার স্বার্থেই সব বিদ্রোহের অভিমুখ চালিত হয়। শাজাহানের বিদ্রোহের কি একই পরিণতি ? তখ্তে ? না তাবুতে ?
এই সুযোগে নূর জাহান শাহাজাদা শাহরিয়ারকে কান্দাহারের গড় রাখতে অভিযানের সেনানায়ক করার প্রস্তাব করেন। জাহাঙ্গীরের রাজি হওয়া ছাড়া গতি কী ? এখন থেকে শাহাজাদা শাহরিয়ার হলেন ইকবালমন্দ - সৌভাগ্যবান। বাড়ানো হয় তাঁর পদমর্যাদা, শাজাহানকে আগে বিলি করা আরো জায়গির শাহরিয়ারকে দিয়ে দেবার আদেশ হল। অভিজ্ঞ সেপাইসালাররা যোগ দেন তাঁর বাহিনীতে। ইতিমধ্যে লাডলি বেগম গর্ভবতী হয়েছেন। নূর জাহান উৎফুল্ল, শহারিয়েরের তখ্তে বসা সময়ের অপেক্ষা। এই সব মোঘল দরবারের একটা অংশ ভালো চোখে দেখেনি। ইতিহাসকার ভাককরি কান্দাহারের যুদ্ধ পরিস্থিতি , শাজাহানের বিদ্রোহ আর ক্ষমতার নতুন বিন্যাসের জন্য নূর জাহানের সব কিছুর জন্যই 'বদমাশিকে ' দায়ী করলেন । যথেষ্ট রাজনীতি কুশলী , রসজ্ঞ আর উদারচেতা হলেও এক নারীর এই ক্ষমতায়ন পছন্দ করেননি তিনি। পারস্যের সাফাভিদ সম্রাট শাহ আব্বাসের কান্দাহার আক্রমণ আর শাজাহানের বিদ্রোহের ফলে মোঘল সাম্রাজ্যে অনেক অদলবদল হল। বিশ্বস্ত লোকেদের পদোন্নতি করে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পাঠানো হল। খুসরুর ছেলে দিওয়ার বক্সকে কিছুদিনের মধ্যেই গুজরাটের সুবেদার করা হচ্ছে।শাহরিয়ার এক বড় ফৌজের নেতৃত্ব দিয়ে আগ্রা ছেড়ে যাবেন কান্দাহারে ।
এবার শাজাহানের বিদ্রোহ দমনের প্রস্তুতি নিতে হয়। শাজাহানের শশুর হওয়ার কারণে নিজের ভাই আসফ খানকেও আর ভরসা করতে পারছিলেন না নূর জাহান। নূর জাহানের নিজের আর তাঁর পরিবারের ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন না বাদশাহের বিশ্বস্ত সিপাহসালার মহবত খান তবু আসফকে পাঙ্গা নিতে তাঁকে কাবুল থেকে আগ্রায় আসতে বললেন বেগম। তাছাড়া মহবত খান খুসরুর মারা যাবার জন্য শাজাহানের ওপর চটে ছিলেন যদি তাঁকে শাহরিয়ারের হাত শক্ত করতে কাজে লাগানো যায়।মহবত ওতো সহজে ভোলার পাত্র নন। তিনি প্রকাশ্যে নূর জাহান আর তাঁর পরিবারের বিরোধী। ভাবলেন এটার পেছনে মোঘল দরবারের খোরসানি বা ইরানিদের চাল আছে। হয়তো আসফকে দিয়ে তাঁকে খতম করার মতলব করছেন নূর জাহান। তখনো মহবত জাহাঙ্গীরের একান্ত অনুগত ছিলেনতিনি নূর জাহানকে লেখেন যে আসফ খানকে বাংলায় পাঠাতে হবে আর শাহী খাজাঞ্চি মুতামাদ খান যেহেতু শাজাহানের সঙ্গে শাহেনশা বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাঁকেও শাস্তি দিতে হবে তবেই তিনি আগ্রায় আসবেন। আসফকে আগ্রার তোষাখানা থেকে কিছু মণিমুক্তো নিয়ে লাহোরে যাবার দায়িত্ব দেওয়া হয় আর মুতামাদকে খাজাঞ্চির পদ থেকে সরিয়ে জাহাঙ্গীরনামায় লেখালেখির কাজ দেওয়া হয়। জাহাঙ্গীর মহবতকে আসফ সম্পর্কে আশ্বস্ত করলেন। আগ্রায় এসে বাদশাহের কাছ থেকে শাজাহানের সঙ্গে লড়াইয়ের দায়িত্ব বুঝে নিলেন মহবত খান। তাঁর পদমর্যাদা বাড়িয়ে পাঁচ বা ছ হাজারি মনসব দেওয়া হল। মুঘল দরবারে অভিজাতরা কে যে কখন বাদশাহের ওপর বিরূপ হচ্ছেন তা বোঝার জো ছিল না। একমাত্র শাহাজাদারা বিদ্রোহী হয়ে উঠলেই টের পাওয়া যেত কে কে বিদ্রোহে যোগদান করলেন। তখন আবার বিশ্বাসভঙ্গের জন্য ক্ষমতাবৃত্তে রদবদল হতো। শাজাহান বেশ কিছু রাজপুরুষের আনুকূল্য পান। তার মধ্যে বুরহানপুরের দায়িত্বে থাকা অভিজ্ঞ সেপাইসালার পণ্ডিত খান আব্দুল রহিম খান ই খানান ছিলেন। এর কারণ হয়ত তাঁর নাতনি আকবরাবাদী বেগমের সঙ্গে শাজাহানের বৈবাহিক সম্পর্ক। হয়ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ প্রস্তুতির তোড়জোড় দেখে বেশ কিছু মোঘল অভিজাত শাজাহানের সঙ্গে হাত মেলানোর কিছুদিনের মধ্যেই আবার জাহাঙ্গীরের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন।
একদিকে কান্দাহারের লড়াই অন্য দিকে সাম্রাজ্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী শাহজাদার সঙ্গে বেগম নূর জাহানের মধুর সম্পর্কের চিরতরে সমাপ্তি , জাহাঙ্গীরকে নিতান্তই বাধ্য করেছিল শাজাহান দমন অভিযানে সায় দিতে। খুবই মনোকষ্টের ব্যাপার ছিল এই সায় দেওয়া । জাহাঙ্গীর মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন তাঁর অবর্তমানে শাজাহান আর নূর জাহানের যুগ্ম শাসন চলুক। কিন্তু এই মনোগত ইচ্ছেরা স্বপ্নবপন করলেও তৈমুর ঐতিহ্যে ভঙ্গুর প্রমাণিত হল। শাজাহান আর নূর জাহান হয়ে উঠলেন পরস্পর বৈরী,খুবই বৈরী । তৎকালীন ইতিহাসকার ভাককরি তাঁর দাখিরাতুল খাওয়ানিন বইতে আবারো অভিযোগ করছেন যে রাজদ্রোহের এই আগুন আসলে জ্বালিয়ে ছিলেন নূর জাহান আর তাঁর অনুগত সেপাইসালার খান ই আব্দুল জাহান লোধি , শরিফ উল মুলক , বিশ্বস্ত অপর লিঙ্গের প্রধানদ্বয় জাওয়াহির আর নাদিম , মেয়ে লাডলির সহযোগে। এ বিষয়ে আরো বলছেন আধুনিক ইতিহাসকার ফারুখি বলছেন, এই বিদ্রোহ চলাকালীন শাজাহান বিমাতা নূর জাহানকে ক্ষমতালোভী বলে অভিযোগ করেন।একজন নারীকে কী করে এত বাড় বাড়তে দেন জাহাঙ্গীর!, আরো আক্ষেপ ছিল তাঁর। পরবর্তী কালে শাজাহানের সব সরকারি তারিখে এই বাবা- ছেলের দ্বন্ধের নাটের গুরু করা হয় নূর জাহানকে , ফিতনার আগুন জ্বালানোর ভয়ঙ্কর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে এক নারীর অতি তৎপরতা। যেমনটা করেছিলেন প্রথম খলিফা কন্যা পয়গম্বরের স্ত্রী আয়েশা, চতুর্থ খলিফা আর পয়গম্বরের জামাই পরম যোদ্ধা আলির খেলাপ লড়তে গিয়ে। সপ্তম শতকে আয়েশার নেতৃত্বে লড়াই হয়েছিল ব্যাটেল অফ ক্যামেলে। ইসলামে এটাই হলো ফিতনার , অগ্নি প্রজ্জলনকারী অশান্ত গৃহযুদ্ধনামার প্রথম লিখন। তবে সে যুদ্ধে আয়েশার সমালোচক শিয়া সম্প্রদায় যেমন আছে , তেমনি তাঁর ঐতিহাসিক অনুগামী আছেন সুন্নিরা। নূর জাহানের পক্ষে কে কে দাঁড়াবেন আসন্ন গৃহযুদ্ধে ? একথা একমাত্র জাহাঙ্গীরেরই ভাবার কথা -সহ শাসকের ধারণাটা যে তাঁরই। অনেকদিন পর , আজ থেকে সে মাত্র তিন দশকই হবে বটে ,নারীর দৃষ্টিতে দেখার শুরুয়াত ইতিহাসকে। এই গৃহযুদ্ধের মধ্যেও তাই নূর জাহান অবলোকন চলে , চলতেই থাকে তীক্ষ্ণতায়।
(অতিরিক্ত তথ্য সূত্র : Empress : The Astonishing Reign of Noor Jahan by Ruby Lal )


0 মন্তব্যসমূহ