বাংলা গদ্যে দেবর্ষিয় কোনও পূর্বসূরি আছেন কিনা, সে এক ভাববার বিষয়। এমনকি বিশ্বসাহিত্যেও এ ধরণের লেখা খুব বিরল। দেবর্ষি লুইস ক্যারোলের মতো রূপকথা লেখেন না। কাফকার প্যারাবলগুলির সঙ্গে তাঁর মিল পাওয়া যেতে পারে। স্যাঁৎ- একসুপেরির ‘ছোট্ট রাজকুমার' যেমন আখ্যানের মোড়কে ঢাকা দার্শনিক রচনা, দেবর্ষির রচনাও অনেকটা সেরকমই। তবে সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া যেতে পারে খলিল জিব্রানের সঙ্গে। দেবর্ষিকে বাংলা সাহিত্যের খলিল জিব্রান বলা যায়। জিব্রানের মতোই দেবর্ষি শুধুমাত্র আখ্যান রচয়িতাই নন, চিত্রশিল্পীও। জিব্রানের মতো তিনিও জানেন, “আজ পর্যন্ত মানুষ তো আদপে ঘুরেফিরে দু-তিনটে বিষয় নিয়েই আলোচনা করে এসেছে।’
জিব্রানের মতো দেবর্ষির গল্পগুলিরও কেন্দ্রে রয়েছে একটিই রহস্যময় শব্দ : 'ঈশ্বর'। মানুষের জীবনে নানাভাবে ঈশ্বরের তাৎপর্যকে খুঁজে দেখতে চেয়েছেন দেবর্ষি । এ ব্যাপারে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তাঁর যদি কোনও পূর্বসুরি থাকে, তবে তিনি আর কেউ মন, সকলেরই যিনি পূর্বসূরি সেই একমাত্র এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সারাজীবন ঈশ্বর এবং তার তাৎপর্য নিয়ে ভেবেছেন রবীন্দ্রনাথ। সমকালীন সামাজিক, দার্শনিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ কখনও ঈশ্বরকে বিস্মৃত হননি। এ ব্যাপারে বিশ্বসাহিত্যে তাঁর সঙ্গে একমাত্র আর একজন ঈশ্বর-তাড়িত লেখকেরই তুলনা চলতে পারে । তিনি ফিওদর দস্তয়েভস্কি। পরবর্তীকালে অবশ্য কাফকা, রিলকে, হিমেনেথ বা জিদ এ নিয়ে বহু ভাবনাচিন্তা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের পর যে কোনও কারণেই হোক ঈশ্বরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি আর কোনও বাঙালি লেখক সেভাবে স্পর্শ করেননি। সাহিত্যে আবার যিনি ঈশ্বরকে ফিরিয়ে আনলেন, তিনি দেবর্ষি সারগী। আমাদের দেশে আর কোনও লেখককেই তাঁর মতো এরকম ঈশ্বর-তাড়িত বলা যায় না। ঈশ্বর নিয়ে এত স্বচ্ছ ভাবনাচিন্তাই বা আর কার আছে?
প্রশ্ন হল, ঈশ্বর বলতে কী বোঝেন দেবর্ষি? 'নিষিদ্ধ ধর্ম', 'সার্থকতা', ‘শেষ ধাপ’, শয়তান', 'প্রার্থনা বিষয়ক কিছু ভাবনা বা একটি গল্প' ইত্যাদি গল্পে এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন তিনি। তাঁর মতে, মানুষ নিজের ইচ্ছা ব্যতিরেকে জন্মায়। কিন্তু সে তার সংক্ষিপ্ত অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে একমাত্র তখনই, যদি জগতে ঈশ্বর বলে কিছু থাকেন। ঈশ্বর না থাকলে গোটা জগৎ, প্রাণের জন্ম ও মৃত্যু সবই অর্থহীন হয়ে যায় ।
ঈশ্বর হয়ত দুঃখকষ্ট থেকে আমাদের উদ্ধার করেন না, যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেন না, আমাদের শতসহস্র বাসনাকেও পূরণ করেন না। কিন্তু ঈশ্বর সেই সত্তা, যা এই জগতকে, আমাদের বেঁচে থাকাকে (তা সে যত অকিঞ্চিৎকর ও দুঃখেরই হোক না কেন), এমনকি আমাদের মৃত্যুকেও অর্থ প্রদান করে। মানুষের পক্ষে ধ্বংস বা মৃত্যু ততটা ভীতিজনক নয়, যতটা ভীতিজনক এই বোধ যে সে একটা ঈশ্বরবিহীন জগতে বাস করছে। এই বোধ যুদ্ধের চেয়েও ভয়ঙ্কর। কারণ ঈশ্বর না থাকলে সব কিছুই অর্থহীন হয়ে যাবে। শান্তিও তখন স্বস্তি জাগানোর পরিবর্তে আতঙ্কই জাগিয়ে তুলবে। খুব তৃপ্তিদায়ক হবে না ওই শান্তি।
মানুষ ঈশ্বরকে বিশ্বাস করবে না অবিশ্বাস করবে, সেটা তার ব্যাপার। কারণ, দেবর্ষি এক জায়গায় বলছেন, জন্মের পর থেকেই ঈশ্বর মানুষকে অজস্র স্বাধীনতা দিয়েছেন। এর মধ্যে স্বয়ং ঈশ্বরকেই অবিশ্বাস করার স্বাধীনতাটাও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে জাঁ পল সার্ত্রয়ের অস্তিবাদী দর্শনের কথা আমাদের মনে পড়তে পারে। এই দর্শনের সার কথা ছিল, নিষ্ক্রিয়ভাবে থাকলে হবে না, পৃথিবীতে বাঁচতে হলে সিদ্ধান্তের সাহায্যে সচেতনভাবে জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। আর এই যুক্ত হওয়ার জন্য চাই স্বাধীন ও নিজস্ব একটি নির্বাচন, অর্থাৎ নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। আর যে সিদ্ধান্তই সে নিক, নিজের কৃতকর্মের ফল যাই হোক, তার দায়িত্বভার নিজেকেই বহন করতে হবে। অনুতাপ, প্রায়শ্চিত বা দুর্বল বিবেক-বুদ্ধির দ্বারা নিজের কৃতকর্মকে অস্বীকার বা প্রত্যাহার করা যাবে না। অস্তিবাদীরা তাই ঈশ্বরকে প্রতিস্থাপিত করতে চান মানুষের নির্বাচন দিয়ে। তাঁরা বিশ্বাস করেন, মানুষ ব্যক্তিগত নির্বাচনের ঝুঁকি থেকে নিস্তার পেতেই ঈশ্বরের সর্বশক্তিমান সত্তাকে আবিস্কার করেছে।
দেবর্ষি সারগীর ঈশ্বর আর অস্তিবাদীদের ঈশ্বর স্পষ্টতই ভিন্ন। প্রথম ক্ষেত্রে ঈশ্বর যেখানে অপরিহার্য, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ঈশ্বর সেখানে পরিত্যাজ্য। কিন্তু স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টির সঙ্গে অস্তিবাদী ভাবনার সাদৃশ্য রয়েছে, যদিও দেবর্ষির ক্ষেত্রে মানুষকে এই স্বাধীনতাও স্বয়ং ঈশ্বরই দিয়েছেন। এর ফলশ্রুতিতে দুটি ভিন্ন সম্ভাবনার উদ্ভব হচ্ছে। এই দুটি সম্ভাবনাকে কি অস্তিবাদীদের ‘গুড ফেইথ' আর 'ব্যাড ফেইথ' দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়? অস্তিবাদের টুলস বা উপকরণগুলি ব্যবহার করেই কী দেবর্ষি একটি স্বতন্ত্র ডিসকোর্সের জন্ম দিতে চান? যদি চান, তাহলে তার সামগ্রিক রূপরেখাটি কেমন ?
দেবর্ষির মতে, ঈশ্বরকে বিশ্বাস করাই হল 'শুভ ফেইথ'। কারণ এই বিশ্বাসই জগৎ ও জীবনের নিরন্তর অর্থহীনতার মধ্যে অর্থ খোঁজার স্পৃহাকে জাগিয়ে রাখে। প্রাণ বুদবুদের মতোই অস্থায়ী। জগতের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি দৃশ্য অস্থায়ী। আমাদের প্রতিদিনের এত স্বপ্ন, এত সুখ, এত বেদনা, এত সৃষ্টি শেষপর্যন্ত কোথাও সঞ্চিত হচ্ছে না। সবই কি তাহলে হারিয়ে যায়? মৃত্যুতেই কি তাহলে সব কিছুর শেষ? এর উত্তর খুঁজতে গিয়েই দেবর্ষি আশ্রয় নেন ঈশ্বরের। তিনি বলেন, সবই বেঁচে থাকে। টিকে থাকে। কোথায়? ঈশ্বরের স্মৃতিতে। 'জলকবিতা', 'ধ্বংসদর্শন', 'আত্মহত্যা', 'এগারোজন অন্বেষক, নিত্য' প্রভৃতি গল্পে এই ঈশ্বরের স্মৃতির কথাই বলেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তাঁর নিজস্ব যুক্তিও আছে। ঈশ্বর থাকা মানে যেহেতু জগতে সব কিছুই অর্থময়, তাহলে জগতের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি বস্তু, এমনকি একটা ইটের টুকরোরও তাৎপর্য আছে। কিন্তু জগৎ থেকে সব কিছুই একে একে হারিয়ে যায়। একদিন একটা কিছু ছিল, এবং একদিন ওটার চূড়ান্ত বিলুপ্তি ঘটবে, এটার মতো অর্থহীন আর কী হতে পারে ? আবার কোনও একটা কিছুই নিরর্থক হওয়া মানে তো ঈশ্বরেরই নিরর্থক হয়ে যাওয়া। কীভাবে এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব ? সম্ভব, যদি চূড়ান্ত বিলুপ্তি বলে কিছু না থাকে। সব কিছুই, এমনকি এই জগতটাও হয়ত একদিন হারিয়ে যাবে, কিন্তু টিকে থাকবে কারও মনে। এই মন ঈশ্বরের। জগতটাই তাঁর মগজ, তাঁর সমস্ত স্মৃতির আধার। যে কবির কবিতা কেউ পড়ে না, সেই কবিতা মনে মনে রচিত হওয়ার সময়ই পঠিত হয়ে যায়। যে মুখ মানুষের নিজস্বতম, মৃত্যুর পরও তা অক্ষয় হয়ে থাকে। চূড়ান্ত ধ্বংসের পরও কেউ অনুভব করতে পারে তার হাত-পা-মুখ-কান নেই, সে অদৃশ্য ও অস্পৃশ্য, অথচ টিকে আছে। এভাবেই ঈশ্বরের অনন্ত স্মৃতিতে সবই টিকে থাকে, অক্ষয় হয়ে থাকে।
এ ছাড়া দেবর্ষির গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে বারবার আসে এমন একজন মানুষ যার রয়েছে ‘সত্যিকারের কৌতূহল ও জ্ঞানতৃষ্ণা এবং গভীর বেদনাবোধ।” এই মানুষটি জানে, ঈশ্বরের জন্য কোনও উপাসনালয় নির্মাণ করার দরকার নেই। উপাসনালয় থাক শুধুমাত্র অনুপম স্থাপত্যশিল্প হিসেবে। ঈশ্বরকে পেতে কোনও দীর্ঘ, জটিল, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার দরকার নেই। কোনও তীর্থস্থানে যাওয়ার দরকার নেই। যা দরকার সেটা হল শুধু এটুকু স্মরণ করা যে জগতে তিনি আছেন। শুধু এটুকু স্মরণ করলেই তাঁকে পুজো করা হয়ে যায়, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়, শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয়ে যায়, জীবন ও জগৎ একটা অর্থ পেয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এমনকি সব সময় তাঁকে স্মরণ করারও দরকার নেই! শুধু জীবনে অন্তত একবার এটা গভীরভাবে উপলব্ধি করলেই যথেষ্ট যে জগতে ঈশ্বর আছেন। একমাত্র তাহলেই প্রতিটি মানুষ নিজেই এক একটা উপাসনালয় হয়ে উঠবে। সেই উপাসনালয়, যার মধ্যে কোনও বিগ্রহ নেই, আছে শুধু এই উপলব্ধি যে ঈশ্বর আছেন।
আর পাঠক যা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করবেন সেটা হল, দেবর্ষির গল্পে কিছু কিছু মোটিফ বা অবচেতনীয় চিহ্ন, প্রতীক ও আবহ ঘুরেফিরে আসে। এসবও নিছক বর্ণনা, অনুষঙ্গ বা ডিটেলিং নয়---ওদের ভেতরও ইঙ্গিত আছে গূঢ় দার্শনিক চিন্তার। যেমন তাঁর লেখায় প্রায়ই আসে : প্রাচীন নগর বা শূন্য বাড়ি, যাদের ভেতর আছে ভারি, অনড় দেওয়াল, উঁচু সিলিং, অসংখ্য ঘর, আয়না, বিশাল দীর্ঘ ঘুরে যাওয়া বারান্দা। বা আসে নীরব উপাসনালয় । বা সরু দীর্ঘ জটিল গভীর অলিগলি, যাদের দুপাশে খুব উঁচু পাথরের দেওয়াল। অতলান্ত কুঁয়ো, যার জল স্পর্শ করা যায় না এবং যার গোল দেওয়াল জুড়ে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত লোহার আংটা বসানো, যে আংটা ধরে ধরে অনন্তকাল নিচে নেমে যাওয়া যায়। এ ছাড়া আসে দীর্ঘ দালান, প্রশস্ত ও নিঃশব্দ হলঘর, জটিল করিডর, বাড়ির মাঝখানে খোলা ছায়াময় উঠোন, যা ছাড়া একটা বাড়িকে ভাবাই যায় না, সারি সারি অলঙ্কৃত থাম, আকাশছোঁয়া স্তম্ভ, যাদের মাথায় এক সময় ছাদ ছিল, গভীর তামাটে ইটের ভাঙা পাঁচিল, অর্ধবৃত্তাকার বা পাক দিয়ে ওঠা ভারি শ্বেতপাথরের রহস্যময় সিঁড়ি, যার অসংখ্য ধাপ গুনতে গেলে জেব্রার ডোরা গোনার মতো ধাঁধা লেগে যায় ('একটা ভাল বাড়িতে নানা জায়গায় এবং নানারকম অনেক সিঁড়ি থাকে' / নিত্য), লাইব্রেরি, যার চারপাশে উঁচু উঁচু কাঠের আলমারিতে দুর্লভ বই, জাদুঘর এবং সেখানকার প্রাচীন ছোরা ও অস্ত্রের সংগ্রহ, জলভর্তি পাথুরে চৌবাচ্চা ও জলাধার, জটিল জ্যামিতিক নকশা আঁকা মেঝে, দেওয়ালে টাঙ্গানো সার সার মুখোশ, মুদ্রা লিপি ও তরোয়াল, বন্ধ দেওয়াল ঘড়ি, পুরনো ভারি দরজা, প্রাচীন কলম, লেখাপড়ার কালো ডেপায়া টেবিল, প্রিয় জানলা, টালি দেওয়া চিলেকোঠার ঘর...
এখন প্রশ্নগুলো পরপর সাজানো যাক। কেন নগর? ‘নগরীটার পরিকল্পনার মধ্যে একটাই কেন্দ্রীয় ভাবনা কাজ করেছিল। সেটা হল, স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে তারা ব্রহ্মাণ্ডেরই নানা বৈচিত্র্য রহস্য ও জটিলতার একটু আভাস দেবে, যাতে এখানে থাকা মানুষদের ভেতর সব সময় এই বোধ জাগ্রত থাকে যে তারা আসলে ব্রহ্মাণ্ডেরই অধিবাসী। কোনও একটা সংক্ষিপ্ত বা বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের নয়।’ / স্বপ্নভ্রমণ
কেন প্রাচীন? ‘প্রাচীন স্মৃতি প্রত্যেকের মাথাতেই নিদ্রিত আছে... আমার মাথায় ওটা কোনওভাবে জেগে উঠেছে।'/ অদৃশ্য পর্যায়।
কেন সিঁড়ি। ‘সিঁড়ি শুধু ওপরের দিকেই নিয়ে যায় না, ওটা নিচে নামতেও সাহায্য করে।... নিজের ভেতর একটা সিঁড়ির অস্তিত্ব বা অনস্তিত্বই ঈশ্বরদ্রষ্টার সঙ্গে সাধারণ মানুষের তফাতটা সুচিত করে। ঈশ্বরদ্রষ্টার বুকের ভেতর নিচে নামার জন্য একটা সীমাহীন সিঁড়ি আছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অনাবিষ্কৃত। যা লক্ষ্য করার মতো, এখানকার সিঁড়িগুলো পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে কোনও একটা সিঁড়ি দিয়ে যে কোনও আর একটা সিঁড়িতে ওঠা বা নামা যায়। কিছু সিঁড়ি সরাসরি রাস্তা থেকে উঠে বাড়ির ভেতরে গিয়েছে। এবং পরস্পরের সঙ্গে মিশেছে বৃক্ষের কাণ্ড থেকে ছড়ানো ডালপালার মতো।' / 'স্বপ্নভ্রমণ
কেন স্তম্ভ? ‘স্তম্ভ সততই মনে আনে আকাশের কথা, আর আকাশ ঈশ্বরের
কথা।’ / স্বপ্নভ্রমণ
কেন লাইব্রেরি, বই? 'এক একটা বই এক একটা মৃত মানুষ, যাকে ছুঁলেই নিঃশব্দে কথা বলতে শুরু করে।’ / স্বপ্নভ্রমণ
কেন জটিল অলিগলি ? 'পাথরে তৈরি এমন সব দীর্ঘ গলি আছে এখানে, যার ভেতর দিয়ে হাঁটলে মনে হবে কোনও জটিল জিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে হাঁটছি।' / অপেক্ষা
কেন আয়না? ‘গোটা জগতটা একটা আয়না, যার ভেতর তাকিয়ে আমি (ঈশ্বর) নিজেকেই দেখি । } ঈশ্বরের আকাঙ্ক্ষা
বা, আয়নায় কিছুক্ষণের জন্য প্রতিবিম্বিত হওয়া, তারপর চিরকালের জন্য মিলিয়ে যাওয়া : জীবন ও মৃত্যুকে এভাবেও ভাবা যায় ।' / জড়ায়ু
কেন বাড়ি? ‘শূন্যতাকে চারপাশ থেকে বন্দী করে তৈরি হওয়া এক একটা বাড়ি যেন এক একটা বিশিষ্ট গ্রহ। কোনও দুটো বাড়ির ভেতরের দৃশ্য একরকম হয় না!’ / নিত্য
বা, ‘মাঝেমাঝে আমার মনে হত আমার সৃষ্ট সরল, গোলাকার, শূন্য গ্রহগুলোর চেয়ে মানুষের তৈরি একটা বাড়ি বেশি বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষক। অন্তত এই একটা বিষয়ে মানুষ আমার চেয়ে বেশি জটিল চিন্তাশক্তির অধিকারী।' / শয়তান
কেন সিলিং? ‘সিলিংগুলোকে মনে হয় আকাশের মতো উঁচু। এবং আকাশের চেয়েও বেশি বৈচিত্র্যময়।' { নিষিদ্ধ ধর্ম
কেন থাম? ‘দুপাশে থামের পর থাম, যেন অমরতার আকাঙ্ক্ষায় কিছু ভিখিরি পরপর দাঁড়িয়ে।' / ঈশ্বরের প্রতিনিধি
শুধু এই নয়, দেবর্ষি সারগীর আশ্চর্য জগতে রয়েছে আরও বহু কিছু। যেমন : বাঁকুড়ার গ্রাম থেকে আনা আড়াইশো বছরের পুরনো টেরাকোটার ঘড়া, মুঘল আমলের স্বর্ণমুদ্রা, রুপোর গিরগিটি, সোনার ষাঁড়, পানপাতা ও গুহার স্থাপত্য, গুপ্তযুগের নকশা, আফগানিস্তানের স্থাপত্য, বৌদ্ধবাড়ি, মিশরীয় পিরামিডের ত্রিভুজ, ইকুয়াডোরের মুখোশ, মেসোপটেমিয়ার শিলালিপি, জাপানের নাসুনাহারার জঙ্গল থেকে পাওয়া-পোড়ামাটির গোল পেয়ালা, হাঙ্গেরির ব্রোঞ্জের কুড়ুল, নাইজেরিয়া থেকে আনা কাঠের মুখোশ, সাপের চামড়া ও পাখির পালকের তৈরি মুকুট, মেহগিনি কাঠের পালঙ্ক, পারস্যের গালিচা, বেলজিয়ামের আয়না, মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর, ইংল্যাণ্ডের কাঠের পালঙ্ক, সিরামিকের ডিশ, যার গায়ে অজানা ভাষায় নকশা করা লিপি, রোম ও পারস্যের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত গম্বুজের চূড়া, যার দেওয়ালের জটিল নকশায় গণিত ও জ্যামিতির প্রভাব, ধাতুর নানা অলঙ্কারে মোড়া পালকি কিংবা হাজার হাজার বছর পুরনো পাথুরে বর্শা।
নাগরিক জীবনের পাশাপাশি নগর-বহির্ভূত জীবনও আসে তাঁর গল্পে। থাকে আদিম গুহা, অরণ্য, পাহাড় । এবং আদিম বা গৃহপালিত অজস্র পশুপাখির সরব ও মুক্ত উপস্থিতি । আমরা দেখি কুণ্ডলী-পাকানো সবুজ বা ধূসর অজগর, পরস্পরকে জড়িয়ে শান্তভাবে পড়ে থাকা অসংখ্য সাদা সাপ, এমন প্রজাপতি যাদের গা থেকে রঙিন ছায়া মাটিতে পড়ে, চলমান আগুনের মতো বাঘ, সেই ময়ূর যাদের রুপোলি পাখনায় পড়ে গাছের সবুজ নীলাকাশ ও রঙিন ফুলের প্রতিবিম্ব, কিংবা একপাল সিংহী, যারা নদীর বিচ্ছিন্ন তরঙ্গের মতো থিরথির পেশী দুলিয়ে হেঁটে যায় ।
গত কয়েক দশক ধরে বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্পে নতুন ধরণের খোঁজ চলছে। বাংলা সাহিত্যের ভূগোল নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবন ছাড়িয়ে ক্রমেই শাখাপ্রশাখা বিস্তার করছে বৃহত্তর ভারতবর্ষে, এ যাবৎ অনুচ্চারিত বহু অনিবার্য প্রশ্নকেও তুলে ধরছে। কিন্তু দেবর্ষি সারগী যে ডিসকোর্সের কথা বলেন, যে জগৎ নির্মাণ করেন, তা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তার কোনও পূর্বসূরি বা উত্তরসূরি নেই। এই লেখকের গল্প বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এ যাবৎ অনাবিষ্কৃত, বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ এক আশ্চর্ষ সম্পদ বলে গণ্য হতে পারে।


0 মন্তব্যসমূহ