স্মৃতি ভদ্র'র গল্প : অসুখ


সম্প্রতি মিজান সাহেব অদ্ভুত এক অসুখ বাঁধিয়েছেন। অসুখটা এতই অদ্ভুত যে সেটা কাউকে বলতে পর্যন্ত পারছেন না। বললে হয় তাকে কেউ বিশ্বাস করবে না অথবা নির্ঘাত তাকে বাতিল মানুষের খাতায় ফেলে দেবে। আর তারচেয়েও বড় কথা হলো এই অসুখের জন্য মিজান সাহেব অদ্ভুত সব সমস্যায় পড়ছেন। সেসব সমস্যার সমাধান না করতে পারলে নিজেকে মোটামুটি সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে হবে মিজান সাহেবকে।

হ্যাঁ, সমস্যাটা বড়ই বিচিত্র।ধরা যাক, কারো সাথে তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে কথা বলা শুরু করেছেন আচমকা শুরু হয়ে যায় তাঁর মাথাব্যথা। কপালের দু’পাশের রগ দুটো হটাৎ করে দপদপ করে ফুলে ওঠে। আর এরপরই ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। মূলত এই অদ্ভুত ঘটনাটাই মিজান সাহেবের সদ্য বাঁধানো রোগ। বাকী ওসব মাথা ব্যথা, রগ ফুলে ওঠা সেসব তো উপসর্গ। তাই উপসর্গগুলোকে তিনি পাত্তা না দিয়ে সেসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা যাওবা চালিয়ে যেতে পারেন কিন্তু যখন অদ্ভুত ব্যপারটা ঘটে তখন তাঁর মুখের শব্দ হারিয়ে যায়। কথা থামিয়ে তিনি নির্বাক হয়ে পড়েন। এসব ঘটে চলেছে বেশ কিছুদিন।

শুরুতে অবশ্য কদাচিৎ দেখা দিতো অসুখটা। বলতে গেলে মাসে একবার কি দু’বার। কিন্তু আজকাল তো দিনের মধ্যেই তিন চারবার অসুখটা হানা দেয়। তাই শুরুতে যখন কথা বলতে বলতে তিনি আচমকা থেমে যেতেন কিংবা কোনো আলোচনার মধ্যে মিজান সাহেব কথা থামিয়ে নিস্পলক তাকিয়ে থাকতেন, তখন অনেকেই ভাবতেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত মিজান সাহেব মনে হয় অবসাদে ভুগছেন। কিন্তু আজকাল যখন তাঁর নিস্পলক চাহনির জায়গায় বিস্ফরিতো চাহনি দেখা যাচ্ছে, তখন সবাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছেন শুধু অবসাদ নয় মিজান সাহেবের গুরুতর কোনো সমস্যা হয়েছে। সে সমস্যার জন্য তাঁর অতি সত্বর চিকিৎসা প্রয়োজন। এই কথা আড়ালে আবডালে সবাই বললেও সামনে বলার সাহস কারো নেই। বুঝিয়ে শুনিয়ে মিজান সাহেবকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার সাহসটুকুও হয় না কারো।

সাধারণত মিজান সাহেবের পরিবারের লোকেদের এই দায়িত্বখানা নেবার কথা। পরিবার বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে মিজান সাহেবের স্ত্রী আর একমাত্র পুত্র সন্তান। এছাড়া বর্ধিত পরিবারে আছে মিজান সাহেবের ছোট ভাই আর বড় বোন। তবে নিজের পরিবার কিংবা বর্ধিত পরিবারের কারো পক্ষেই মিজান সাহেবকে বোঝানো সম্ভব নয়।

আর এই অসম্ভবের কারণও খুব সুস্পষ্ট। বর্ধিত পরিবারসহ নিজের পরিবার সব জায়গাতে মিজান সাহেবই সর্বেসর্বা। যদিও পরিবারের বড় নয়, মেজো ভাই তিনি। বড় তাঁর বোন রাহেলা খাতুন। দু’জনের বয়সের ভেদও বেশ। প্রায় আট বছরের রাহেলা খাতুনের কোলেপিঠেই বড় হয়েছেন মিজান সাহেব। হিসেব অনুযায়ী আম্মা-আব্বা মারা যাবার পর রাহেলা খাতুন মিজান সাহেবের অভিভাবক হবার কথা ছিল। কিন্তু মিজান সাহেব আব্বা-আম্মা মারা যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি। সেসবের আগেই সকল হিসেব উল্টে দিয়ে তিনি বড় বোন রাহেলা খাতুনসহ পরিবারের সকলের অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন।

এমন কিছু একটা যে ঘটবে তা মনে হয় মিজান সাহেবের ছোটবেলাতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ছোটোবেলা থেকে প্রচন্ড একরোখা মিজান সাহেব কোনোকিছুতে বাঁধা পেলে কিংবা তাঁর কথার অন্যথা হলে চিৎকার চেঁচামেচি করে সবাইকে অস্থির করে তুলতেন। এছাড়াও আরও একটি বদ অভ্যাস ছিল তাঁর। যখন তখন যাকে তাকে দুমদাম কিল বসিয়ে দেওয়া। হ্যাঁ, সেখানেও কারণ থাকতো একটাই, তা হলো তাঁর কথার অন্যথা হওয়া বা না শোনা। সেই কিলের হাত থেকে বড় বোন রাহেলা বেগমও রক্ষা পেতেন না। যে বোন ছোট্ট মিজান সাহেবকে দিনরাত আগলে রাখতেন, গোছল করাতেন, খাইয়ে দিতেন, স্কুলে নিয়ে যেতেন সেই বোন যদি কোনো কথা অমান্য করতেন তাহলেই পিঠে পড়তো দমাদম কিল।

এখানে প্রশ্ন আসতেই পারে ছোট্ট ভাইয়ের কথা অমান্য করার মানে কি? ছোট ভাই আবদার করতে পারে, কোনোকিছুর জন্য ঘ্যানঘ্যান করতে পারে। সেই আবদার না রাখতে পারাকে অমান্য বলা, এ আসলে অতিশয়োক্তি। এখানে পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো মিজান সাহেব বোল ফোঁটার দিন থেকেই স্বাবলম্বী। তিনি কোনোকিছুর জন্য অবদার করতেন না, ছিনিয়ে নিতেন। শুধু তাই নয় তাঁর একরোখা স্বভাবটাও ছিল একটু অন্যরকম। ধরা যাক, আমগাছের সবুজ পাতাকে তিনি বললেন কালো পাতা এতে সবাই হেসে উঠে তাঁর ভুল শুধরে দেবে; এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু না, তিনি কালো বলেছেন সবাইকে সেটাই মেনে নিতে হবে, শুধু তাই নয় সবাইকে বলতে হবে মিজান সাহেবই ঠিক বলেছেন,

আম গাছের পাতা আসলে কালো…

এর অন্যথা কেউ বললেই মিজান সাহেব তাদের ওপর চড়াও হতেন সেই বালকবেলা থেকেই। সঙ্গে থাকতো দমাদম কিলও। কে আর চায় সেই চন্ডাল ছোট্ট মিজান সাহেবের হাতে কিল খেতে। তাছাড়া সে চন্ডাল কান্ডকারখানাকে অনেকে বালক বয়সের দস্যিপনা মনে করেও এড়িয়ে যেতেন। তবে রাহেলা খাতুনের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ শিশু মিজান সাহেবের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে তিনি। তাই দমাদম কিলের প্রাপ্তিও রাহেলা খাতুনের ছিল সবচেয়ে বেশী।

এজন্য বলা চলে সেই ছোট্ট বয়স থেকেই মিজান সাহেব বয়স/সময়/ কাল সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিজেকে রাখার একটা প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিলেন। আর সে প্রক্রিয়ার তাঁর ছোটো ভাই আসাদুল ইসলামের একটা অংশ হয়ে ওঠা যেন অনিবার্যই ছিল।

আসাদুল ইসলাম জন্মসূত্রেই মাথার ওপরে চারজন অবিভাবক নিয়ে জন্মেছিলেন। আম্মা-আব্বা, দশ বছরের বড় বোন তো ছিলই এমনকি দুই বছরের বড় ভাইটিও বেশ ডঙ্কা বাজিয়ে তাঁর অবিভাবকত্ব দাবী করতেন। তাই আসাদুল ইসলাম জন্ম থেকেই মিজান সাহেবের শাসণের অধীন। তবে এই শাসন মাঝেমধ্যেই মাত্রা ছাড়িয়ে যেত পরিস্থিতির কারণে। আসাদুল ইসলাম জন্ম নেবার কালেই তাঁদের আম্মা মালেহা খাতুন রোগশয্যা নেন। রোগা-পটকা মালেহা খাতুন সারাজীবনই একটু কমজোরি ছিলেন। এরসাথে শেষ গর্ভাবস্থায় দেখা দিলো মারাত্মক রক্তশূন্যতা। সেই কমজোরি রক্তশূন্য রাহেলা খাতুন প্রায় মরতে বসলেন আসাদুল ইসলামকে জন্মদানের সময়।

শোনা যায়, অনভিজ্ঞ দাইয়ের হাতে পরেছিলেন মালেহা খাতুন সেসময়। সময়ের আগে টেনেহিঁচড়ে বাচ্চাকে বের করতে গিয়ে গর্ভফুল ছিঁড়ে থেকে গিয়েছিলো মাহেলা খাতুনের শরীরে। তা থেকেই রক্তক্ষরণ। যতক্ষণ না রক্তের অভাবে জ্ঞান হারিয়ে মাহেলা খাতুন প্রায় জীবনের ইতি টানতে না বসেছিলেন ততক্ষণ সরকারি হাসপাতালে তাঁকে নেওয়া হয়নি। একথা শুনে মনে হতে পারে মাহেলা খাতুনের স্বামী মানুষটি খুব নির্দয় ছিল নিশ্চয়, নতুবা রক্তের ওমন গঙ্গা যমুনা দেখেও কি করে একজন মানুষকে হাসপাতালে না নিয়ে ঘরে রাখা যায়।

আপাতদৃষ্টিতে সোলায়মান ইসলাম মানে মালেহা খাতুনের হাট্টাগাট্টা স্বামীকে একটু কর্কশ মনে হলেও মানুষটি আদতে খারাপ ছিলেন না। তবে খারাপ ছিল তাঁর সময়টা।

কয়েকবারের চেষ্টায় বি.এ. পাশ করা সোলাইমান সাহেব শহরের একটা স্পিনিং মিলে চাকুরী করতেন। হিসাবের খাতা দেখাশোনার কাজ। তবে খালাতো বোন মালেহা খাতুনের সাথে সাথে বিয়ে করার সময় কিন্তু এই চাকুরীখানা তাঁর ছিল না। পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন তাই দুই বাড়ির তরফ থেকেই তারা ছিলেন ত্যাজ্য। তার ঊপর তিন বার বিয়ে ফেল করে টিউশনের টাকায় বলতে গেলে অভাব অনটনেই সংসার চলছিলো তাঁর। অবশেষে চারবারের বেলায় বি.এ. পাশ করতেই সোলাইমান ইসলামের ছাত্রের বাবা এই চাকরির অফার দেন তাকে। ঠিক যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। স্পিনিং মিলের হিসাবের খাতায় যেন সোলাইমান ইসলামের সংসারকে সত্যিকারের একটা চেহারা দিয়েছিলো,যে চেহারায় মধ্যবিত্তের পরিপাটি ভাব না থাকলেও দারিদ্রের ঝুল কালিও যেন সেখানে ছিল না একটুও।

তাই চাকরিটা সোলাইমান ইসলাম খুব মন দিয়ে করতেন। স্পিনিং মিলের হিসেবের খাতার অংক না মিলিয়ে তিনি কখনো ঘরে ফিরতেন না।

হ্যাঁ, ঘর শব্দটাই এক্ষেত্রে যুৎসই হবে। সোলাইমান ইসলাম যেদিন মালেহা খাতুনকে বিয়ে করেছেন সেদিন থেকেই বাড়ি শব্দটির সাথে আড়ি হয়ে গিয়েছিলো তাঁদের। দুই বাড়ি থেকে সম্পর্কচ্যূত হয়ে সেদিন যখন স্বামী-স্ত্রী রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন সোলাইমান ইসলামের কোনো এক পুরোনো বন্ধু খুঁজেপেতে একটা এক ঘরের টিনশেড বাসায় তুলে দিয়েছিলো। সেই ঘরের বারান্দায় ছিল তোলা উনুনের রান্নার ব্যবস্থা। তবে ঘর দুয়ার যাই হোক না কেন সামনের এক টুকরো উঠোন ছিল সোলাইমান ইসলাম আর মালেহা খাতুনের সংসারের একমাত্র সম্পত্তি। তাই স্পিনিং মিলের হিসেবের খাতায় অংক মিলিয়ে ক্লান্ত সোলাইমান ইসলাম যেন সেই উঠোনের টানেই ঘরে ফিরতেন।

তবে শুধু উঠোনের টানেই কেন ঘরে ফিরবেন সোলাইমান ইসলাম? তাই সেই একরত্তি ঘরখানাও হালকা-পাতলা গড়নের মালেহা খাতুন প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে সাজাতে শুরু করলেন। সংসারের টাকা বাঁচিয়ে কিনতে শুরু করলেন সুখস্বপ্নের সব অনুসঙ্গ। সোলাইমান ইসলামও কম যান না। মিল থেকে ফেরার পথে হালুয়াকারের দোকান থেকে জিলিপী কেনেন, আবার কখনো খলিফাপট্টি থেকে ভয়েলের থান থেকে মিষ্টি গোলাপি রঙের বারো গিরা কাপড় কেনেন। ঠিক যেন আত্মীয়হীন শহরের বুকে তাঁরা একান্তে দু’জন সাঁতার কাটেন মায়ার সমুদ্রে।

আর সেই সমুদ্রমন্থনেই একদিন ভেসে এলো রাহেলা বেগমের জন্মক্ষণ। যাকে আদর করে সোলাইমান ইসলাম ডাকতেন খুকি। খুকি জন্ম নেবার পরপরই সংসারের পালেও লাগলো উজানের হাওয়া। যে ছোট ছোট সুখের জন্য মালেহা খাতুনকে বাজারের খরচ বাঁচাতে হতো সেসব খুব সহজেই ঘরে আসতে শুরু হলো। খুকুর জন্য লাল লেসের জামা আসে, রঙিন কট সুতার দোলনা আসে, দুধ খাবার কাঁসার বাটি আর পেতলের ঝিনুক আসে। শুধু তাই নয় ঘরে চারপায়া খাট আসে, বসার জন্য সেগুন কাঠের ক’খানা চেয়ার আসে আর আসে একজোরা সোনার বরইফুল কানের দুল, যা ওঠে খুকুর মায়ের কানে।

না, না, এসব আনন্দ আসলে হাওয়াই ভেসে আসেনি। সে সময় চাকুরিতে পদোন্নতি হয়ে প্রধান হিসাবরক্ষক হন সোলাইমান ইসলাম। আসলে তাঁর একনিষ্ঠ কাজের উপহার ছিল এটি।

কথায় আছে না সুসময়ের একগুণ অসময়ের দশগুণ! না, না, গল্পের এই পর্যায়ে সোলাইমান ইসলামের জীবনে অসময়ের কোন উঁকিঝুকি ছিল না। বরং জীবনের নাওয়ে সেসময় সুখের ঢেঊয়ের ছন্দোবদ্ধ ছোঁয়া আড়াই মানুষের সংসারটাকে এগিয়ে নিচ্ছিলো একটু একটু করে।

খুকু তখন হামাগুড়ি ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো একদিন। কী আনন্দ মালেহা খাতুনের! ক’দিন পড়েই খুকু হাঁটবে, তাই কোমড়ে বিছা পড়াতে হবে। ঝুমঝুম করে খুকু এদিক যাবে ওদিক যাবে, আওয়াজেই ঠাওরে নেবে মালেহা খাতুন খুকুর গতিবিধি।

আসলে সোলাইমান ইসলামের জন্য যেদিন সবাইকে ছেড়ে এসেছিলো মালেহা খাতুন সেদিন থেকে তিনি আসলে ছিলেন ভেতরে ভেতরে ছিলেন খুব একা। খুকুর তুলতুলে হাত দুটোর সোহাগী আহ্লাদ সেই একাকিত্বকে এক ধাক্কায় হারিয়ে দিয়েছিলো তখন।আর তাঁর এই উচ্ছলতায় প্রাণ জুড়াতো সোলাইমান ইসলামেরও।

ছোট্ট তুলতুলে হাতের খুকু বড় হতে থাকলো একটু একটু করে। খুকুর চুলে তখন দুই বিনুনি, খুকু স্কুলে যায়। মালেহা খাতুনের মতো অবিকল দেখতে ফ্রক পড়া খুকু একদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে মাকে না পেয়ে কান্নাকাটি জুড়তেই সোলাইমান ইসলাম একখানা কাঠি লজেন্স হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন,

বড় খুকু চলো মায়ের কাছে যাই…

সেটাই ছিল প্রথম দিন মাকে খোঁজা শুরু হবার। এরপর থেকে সারাজীবন রাহেলা বেগম মাকে খুঁজেই গেছেন কিন্তু ঠিকঠাক কাছে পাননি। তবে তা নিয়ে শান্তশিষ্ট রাহেলা বেগমের জীবনে কোনো আক্ষেপ ছিল কীনা তা কারো জানা নেই। আর সেদিন যখন আব্বার হাত ধরে দাই বুবুর বাড়িতে গিয়ে কাপড়ের পোটলায় জড়ানো টুলটুলে ছোট ভাইকে দেখতে পেলো তখন তো সব ভুলে রাহেলা বেগম হয়ে উঠেছিলেন বড় বুবু। আদতে কয়েক বছরের বড় মিজানের বুবু সারাজীবনের জন্য সেদিন পেয়ে গিয়েছিলো সন্তানসম এক ভাইকে। তবে বুবু যতই সন্তানের মতো ভাইকে লালন করুক না কেন শাসনের ভারটুকু কখনই নিতে পারেনি। তাই একরোখা মিজান সাহেব সেই ছোট্টবেলা থেকেই বুবুকে শাসন করার একচ্ছত্র অধিকারের জায়গা কব্জা করে বারবার বুঝিয়ে দিয়ে এসেছেন যে শাসন শব্দটি একমাত্র তাঁর নিজের করায়ত্ত।

তবে শাসন বা লালন যাই হোক না কেন রাহেলা বেগম সারাজীবন মিজান সাহেবকে সবরকম প্রশ্রয় দিয়ে এসেছেন। আর সে প্রশ্রয়ের একমাত্র কারণ ছিল আপত্য স্নেহ। না, না তখনো মিজান সাহেবের মায়ের ভূমিকায় তাঁকে অবতীর্ণ হতে হয়নি, নির্ভেজাল বুবুই ছিলেন তিনি। যদিও বাঙালীসুলভ মাতৃত্ববোধ মালেহা খাতুনকে ততদিনে ছেলে সন্তানের প্রতি খানিক পক্ষপাতপদুষ্ট করে তুলেছিলো, তবে তা রাহেলা বেগমকে বড় বুবু হতে একবিন্দুও বাঁধা দেয়নি। আর তাই ভাইকে কোলে নেবার প্রথম মুহূর্ত থেকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন দায়িত্বশীল এক বড় বোন। এই যেমন: ভাই কাঁদছে অনবরত কেঁদেই চলছে, কিছুতেই কান্না থামছে না ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের সকল খেলনা নিয়ে হাজির হতেন রাহেলা বেগম। তাতেও যদি ভাইয়ের কান্না না থামতো তখন নিজের সব খেলনা হারিয়ে নি:স্ব রাহেলা বেগম ভাইয়ের মাথায় হাত বুলাতেন আর কাঁদতে থাকতেন।

বড় খুকু তুই কেন কাঁদছিস…

বাবার কথায় রাহেলা বেগমের কান্নায় ফিক উঠতো,

ভাইয়ের কত কষ্ট হচ্ছে আব্বা!

স্নেহময়ী সেই মেয়েটার প্রতি সোলাইমান ইসলামের টান আরও বেড়ে যেতো তখন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন,

আমাদের অবর্তমানে তুই-ই মিজানের মুরুব্বী…

মুরুব্বী বলা যায় কীনা জানি না তবে রাহেলা বেগম ভাইয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য আব্বা-আম্মার অনুপস্থিতির অপেক্ষা করেননি। তাই তো মিজান সাহেবের প্রথম ঈদে সোলাইমান ইসলাম বাড়ির সবার জন্য নতুন কাপড় নিয়ে এলেও রাহেলা খাতুন নিজের মাটির ব্যাংকখানা এগিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর দিকে,

ভাইয়ের জন্য পাঞ্জাবী কিনতে যাবো আব্বা…

রাহেলা বেগমের এই স্নেহশীল মনটাকেই আসলে বাজি ধরেছিলেন মিজান সাহেব একটু বড় হতেই। যেদিন থেকে বড় বুবুর নরম অন্তরের সন্ধান পেয়েছিলেন সেদিন থেকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ছিনতাইকারী।

এখানে ছিনতাইকারী শব্দটিকে অতিশয্য মনে কারণ নেই মোটেও।

এমনিতেই একটু বড় হতেই ভাইকে নিজের সবকিছু দিয়ে দিতেন রাহেলা বেগম। তা হতে পারে নিজের পাতের খাবার কিংবা পছন্দের কোনো জিনিস। তাই না চাইতেই সব পাওয়াতে অভ্যস্ত শিশু মিজান সাহেব ভেবেই নিয়েছিলেন পৃথিবীতে ইচ্ছা হলেই সবকিছু পাওয়া যায়। পৃথিবী বলতে কিন্তু তাঁদের ওই ছোট্ট পরিবারটিকেই মিজান সাহেব তখন অব্দি বুঝতেন। তাই সেখানে তাঁর আধিপত্য থাকবে এটা সহজেই অনুমেয়। হিসাব যেখানে এতো সহজ সেখানেও শিশু মিজান সাহেব গন্ডগোল করে ফেলতেন। এই যেমন: বড় বুবুর নতুন খেলনাটা, পাতের বড় মাছের টুকরোটা, আব্বার এনে দেওয়া নতুন কাঠপেন্সিলটা সবকিছু শিশু মিজান সাহেবের হাতেই উঠে আসতো চাইবার আগেই। তবুও এসবের পরেও এক টুকরো মিহিদানা হোক কিংবা রাহেলা বেগমের খুব পছন্দের মাটির পুতুলটা—- – সেসব না পেলে শিশু মিজান সাহেব বুবুর হাত খামচে সেসব করায়ত্ত করতেন।

কেড়ে নেবার এই অভ্যাসটা অবশ্য কোনোদিনই মিজান সাহেবকে ছেড়ে যায়নি।

আর কেড়ে নেবার এই অভ্যাস দিয়েই মনে হয় রাহেলা বেগমকেও খুব সন্দর্পণে করায়ত্ত করে নিয়েছিলেন মিজান সাহেব সারাজীবনের জন্য। তাই আতুরঘরের দিন থেকে ছোট্ট ভাইয়ের আজন্ম বুবু হয়ে ওঠা রাহেলা বেগম নিজের সন্তান-সংসার হয়ে যাবার পরেও সম্পর্কের আধিপত্য থেকে বের হয়ে যাননি এক মুহুর্তের জন্যও।

আর মালেহা খাতুন তৃতীয়বারের মতো সন্তানসম্ভবা হওয়ার সময় তো সেই সম্পর্কের সাথে জুড়ে গেলো কর্তব্য শব্দটি।

তখন শিশু মিজান বয়স দুয়েকের হবে। একমাত্র ছেলে সন্তান হবার সুবাধে পরিবারের বাকী তিন সদস্যের মনোযোগ পুরোটাই তাঁর কব্জায় ছিল তখন। তবে সে মনোযোগের ভাগ থেকে হঠাৎ করেই একটি অংশ বাদ পড়ে গেলো। হঠাৎ করেই অসুস্থ পড়লেন মালেহা খাতুন একদিন। এমনিতেই সারাজীবনের রোগা মালেহা খাতুন হ্ঠাৎ করেই রুচি হারিয়ে আরও শীর্ণকায় হয়ে পড়লেন। তারসাথে যুক্ত হয়েছিলো বমির ধকল। সবমিলিয়ে মালেহা খাতুন হয়ে পড়েন শয্যাশায়ী। ডাক্তার, বদ্যি কোনোকিছুই তাঁকে শয্যা থেকে তুলতে অপারগ। ঠিক এমন সময়েই আবিষ্কার হলো মালেহা খাতুন তৃতীয়বারের মতো সন্তানসম্ভবা। সংসারের নতুন সন্তান আসার সম্ভাবনা সবাইকে যতটা না উদ্বলিত করলো তারচেয়ে অনেকবেশী উদ্বেগী করে তুললো মালেহা খাতুনের স্বাস্থ্যের অবস্থা দেখে। সেই সময় শিশু মিজানের সকল দায়িত্ব বড় বুবু রাহেলা বেগমের কাছে আসবে এটাই তো স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতার পথ ধরেই শিশু মিজান সাহেব হয়ে উঠেছিলেন বড় বুবু রাহেলা বেগমের এক কর্তব্যের নাম।

ঠিক এখান থেকেই শুরু হয়েছিলো সোলাইমান ইসলাম আর মালেহা খাতুনের সংসারের ছন্দপতন।

তখন সন্তানসম্ভবা মালেহা বেগম পূর্ণ সময়ের গর্ভবতী। টিঙটিঙে শরীরে বেখাপ্পা বিশাল পেট নিয়ে একটু আধটু নড়াচড়া করতে শুরু করেছিলেন। কারণ তার আগের পুরো সময় তাঁকে বিছানা ধরেই পড়ে থাকতে হয়েছে দূর্বলতা আর বমির জন্য সেই রোগ বিছানা ছাড়ার সুযোগ আসতেই মালেহা বেগম বেশ তৎপর হয়ে উঠলেন। কারইবা ভালো লাগে চোখের সামনে অগোছালো সংসার দেখেও শুয়ে থাকতে। তাই বমি বন্ধ হলেও দূর্বল শরীর নিয়েই তিনি সংসারের কাজ থেকে স্বামী আর মেয়েকে রেহাই দিতে চাইলেন।

হ্যাঁ, তখন অব্দি অফিসে যাবার আগে সোলাইমান ইসলাম ভাত আর তরকারি কোনোরকমে ফুটিয়ে যেতেন। আর রাহেলা বেগমকে তো শিশু মিজান সাহেবকে গোসল করানো থেকে শুরু করে খেলতে নিয়ে যাওয়া সব করতে হতো। সংসারের কাজ করতে গিয়ে সোলাইমান ইসলামের অফিসের কাজে জমছিলো বাকীর পাহাড়। অন্যদিকে রাহেলা বেগম একরোখা শিশু মিজানের কাছে হচ্ছিলো নাস্তানাবুদ। এসবে ইতি টাইতেই বমির ধকল বন্ধ হতেই মালেহা খাতুন বিছানা ছাড়লেন।

কিন্তু কথায় আছে না সময়ের একফোঁড় অসময়ের দশফোঁড়। সময় আসলে তখন অন্যকিছু পরিকল্পনা করছিলো সেই সংসারের জন্য। তাই দূর্বল মালেহা বেগম বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই ধাক্কা এলো স্পিনিং মিল থেকে। চালু স্পিনিং মিল বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে একদিন বন্ধ হয়ে গেলো। চাকরি হারালেন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সোলাইমান ইসলাম। সেই ধাক্কায় নিজের এক আধটু সোনা বিক্রি করে, জমানো টাকা খরচ করে যতটুকুওবা মালেহা খাতুন শক্ত থাকার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু এরপরের ধাক্কাটি তাঁকে আরোও অসহায় করে তুলেছিলো। চাকরির খোঁজে পাগলের মতো দিগবিদিক দৌঁড়ে বেড়ানো সোলাইমান ইসলাম হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে গেলেন। আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব কারোও কাছে খোঁজ পাওয়া গেলো না তাঁর। এমনকি পুরোনো সহকর্মীও কেউ খোঁজ দিতে পারছিলো না তাঁর। মানুষটা যেন হাওয়াই মিলিয়ে গেলো।

যে মানুষটির হাত ধরে মালেহা খাতুন ঘর ছেড়েছিলো সেদিন সেই মানুষটি তাকে হঠাৎ করে ছেড়ে কোথায় চলে গেলো? এই প্রশ্নের এলো প্রায় পনেরো দিন পর একটা হলুদ খামের ভেতরে এলোমেলো কতগুলো শব্দ হয়ে। শব্দগুলো যতটা এলেমেলো তারচেয়ে অনেকবেশী এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো মালেহা খাতুনের চোখ পড়তেই,

“সোলাইমান ইসলাম বগুড়ার সদর হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এক্সিডেন্ট করেছেন। চিঠিখানা সঠিক ঠিকানায় পৌঁছালে আত্মীয়দের যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।”

কেন গিয়েছিলেন সোলাইমান ইসলাম বগুড়ায়? কীভাবে এক্সিডেন্ট করলেন তিনি? কে চিঠি লিখেছে? সোলাইমান ইসলাম কেন সরাসরি মালেহা খাতুনকে চিঠ লিখলেন না?

প্রশ্নগুলো জটিল গর্ভাবস্থায় থাকা মালেহা খাতুনকে একটা শেষ ধাক্কা দিলো। সেই ধাক্কা এলো সময়ের আগেই প্রচন্ড রক্তক্ষরণের মধ্যে দিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া হয়ে। আর সেই চিকিৎসাহীন রক্তক্ষরণ মালেহা খাতুনকে চিরদিনের মতো রুগ্ন করে দিলো। হয়তো দাইয়ের বাড়ি না নিয়ে শুরুতেই শহরের হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি কিছুটা উপশম পেতেন। কিন্তু তা তো সম্ভব হয়নি। সেসময় সোলাইমান ইসলাম এক্সিডেন্ট করে পড়ে ছিলেন বাড়ি থেকে অনেকদূর কোনো এক হাসপাতালে। রক্তক্ষরণে জ্ঞানহীন মালেহা খাতুনকে দাই বাড়ির লোকেরাই শেষমেশ হাসপাতালে নিয়েছিলো।

এরপর পঙ্গু হয়ে সোলাইমান ইসলাম যখন বাড়ি ফিরলেন ততদিনে রুগ্ন ক্লিষ্ট মালেহা খাতুন একটা টিঙটিঙে দেহের ছেলে সন্তান নিয়ে বাড়ির বিছানায় জায়গা করে নিয়েছেন।

এরপরের গল্পটা খুব অনুমেয়। বলতে গেলে রোগক্লিষ্ট বাবা-মায়ের তিন সন্তান মোটামুটি হাওয়াই ভেসেই বড় হতে থাকে। এরমধ্যে যেটুকু যত্ন তা শিশু মিজান সাহেবই পেতেন বড় বুবুর কল্যাণে। আর মালেহা খাতুন কোনোরকম টেনেহিঁচড়ে বড় করলেন ছোট ছেলেকে।

পঙ্গু সোলাইমান ইসলামের সংসারটাও পঙ্গু হয়ে গেলো তখন উপার্জনের উপায় হারিয়ে। স্পিনিং মিলের হিসাবরক্ষককে সেই সময় হয়ে যেতে হলো মুদি দোকানের সহকারী। সদ্য ঝকঝকে হয়ে ওঠা মালেহা খাতুনের সাজানো ঘরে জমা শুরু হলো অনটনের ধুলো। সেই ধুলোয় একটু একটু করে হারিয়ে গেলো সুখসময়ের সকল সৌখিন উপঢৌকন। অভাবের কংকালসার চেহারা নিয়ে সংসারটা আস্তে আস্তে হয়ে উঠতে থাকলো অনিয়মের গুদামঘর।

আর ঠিক এই জায়গা থেকেই শুরু হলো মিজান সাহেবের আধিপত্যের গল্প। বড় বুবুকে কিল ঘুষি মেরে নিজের প্রতি অনুগত করতে শিশু মিজান সাহেবের যতটা সময় লেগেছিলো টিঙটিঙে ছোটভাইয়ের ক্ষেত্রে সময় লেগেছিলো তারচেয়ে অনেক কম।এমনিতে বয়সে কম তার উপর কমজোরি শরীরের শিশু আসাদুল ইসলাম ভয় হোক কিংবা আতঙ্কে প্রায় বিনা বাক্যব্যয়ে বড় ভাইয়ের সবকিছুতে সায় দিয়ে যেতেন। তাই বিনা বাঁধায় মিজান সাহেব সেই শিশু বয়স থেকেই আসাদুল ইসলামের অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন।

শাসন করা, কেড়ে খাওয়া, কারণে অকারণে দুমদাম কিল বসিয়ে দেওয়া এসবকিছুর বাইরে যে জিনিসটি আলাদা করে চোখে পড়তো তা হলো মিজান সাহেবের ইচ্ছা অনুযায়ী ছোট ভাই আসাদুল ইসলামকে সবকিছু করতে হবে, এমন সমন আরোপ করা।

দিনে দিনে এই অভ্যাসই মিজান সাহেবের ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে লাগলো।

কখনো বড় বুবু তো কখনো ছোট ভাইয়ের জীবনে নিজের ইচ্ছা আরোপ করতে করতে মিজান সাহেব অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন অদ্ভুত এক স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে। আর কৈশোর পেরোতে পেরোতে তিনি হয়ে উঠলেন শাসনহীন পরিবারের একমাত্র একনায়ক। পঙ্গু বাবা আর চিররুগ্ন মায়ের পরিবারে অভাব অনটনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উগ্র মেজাজের একরোখা কিশোর মিজান সাহেব সেই অনটনে পিষ্ট হবেন কেন? তাই সেই অনটনের চক্রবূহ্য ভাঙতে নিজেই হয়ে উঠলেন উপার্জনক্ষম। ছাত্র হিসেবে মোটামুটি মেধাবী ছিলেন তিনি। তাই নিজের থেকে নীচু ক্লাশের ছাত্র পড়িয়ে শুরু হলো কিশোর মিজান সাহেবের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। নিজেকে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তিনি আসলে পুরো সংসারটাকে নিজের করোতলে নিয়ে এলেন খুব সহজেই। বড় বুবু আর ছোট ভাই ছাড়াও মা-বাবাও তখন কিশোর মিজান সাহেবের অধিনস্ত হয়ে গেলেন বিনাবাক্যে।

আর ঠিক এখান থেকেই মিজান সাহেব শুরু করেছিলেন সকলের জীবন থেকে স্বাধীনতা হরণ করে নেবার চর্চা।

এই শুরু কখনই শেষের মুখ দেখেনি। বরং দিনে দিনে তা হয়েছে আরোও আগ্রাসী। বড় বুবুর বিয়ে হোক কিংবা ছোট ভাইয়ের পড়াশুনা সবকিছুতেই প্রতিফলিত হয়েছে মিজান সাহেবের ইচ্ছার প্রতিফলন। তাই নিজের চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী একজন মানুষকে মুখ বুঝে বিয়ে করেছেন রাহেলা বেগম আর আসাদুল ইসলামকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পড়তে হয়েছে মফস্বলের কলেজে। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে এদের সংসারেও মিজান সাহেবের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। যার কারণ একটাই ‘অর্থ’।

হ্যাঁ, মিজান সাহেবের ছোটবেলা থেকেই কেড়ে নেওয়ার অভ্যাসটা বড় হতে হতে পরিণত হয়েছে অনৈতিকতায়। তাই কোনোরকমে জোটানো একটা দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিকে মিজান সাহেব পরিণত করে নিয়েছিলেন স্বচ্ছলতার একমাত্র চাবি। সেই চাবিতে মিজান সাহেব পুরো চাকরি জীবনে খুলে গেছে সকল বিলাসী জীবনের তালা। সেই বিলাসিতা থেকে কিছু ভাগ বড় বুবুর অভাবী সংসারে আর ছোট ভাইয়ের অচল সংসারে দিয়ে চালিয়ে গেছেন নিজের মর্জি।

তবে নিজের সংসারে কিন্তু একদম ভিন্ন মানুষ মিজান সাহেব। নিজের স্ত্রী আর একমাত্র সন্তানের কাছে মিজান সাহেব পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ। সহযোগিতা, সদ্ভাব , স্নেহ, দায়িত্ব, ভালোবাসা—মূলত একজন ভালো মানুষের ভেতর যা যা খুঁজে পাওয়া যায় তার সবই মিজান সাহেবের ভেতর প্রকট হয় যখন তিনি নিজের সংসারে থাকেন।

তাই একরোখা জেদি বিশ্রী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে একদমই ওয়াকিবহাল নয় তাঁর স্ত্রী ও সন্তান। তবে এরমানে এটা দাঁড় করানো ঠিক হবে না যে মিজান সাহেবের সংসারে তাঁর নিজের মর্জি চলে না। বরং এক্ষেত্রে ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। মিজান সাহেবের স্ত্রী আর একমাত্র সন্তান তাঁর ভালোমানুষির প্রতি এতোটাই শ্রদ্ধাবনত যে অপেক্ষায় থাকে মিজান সাহেবের আদেশ বা উপদেশের। এতে মিজান সাহেব মনে মনে খুশি হলেও হতে পারেন, তবে সবসময়ই ঠোঁটে একটা অপ্রস্তুত হাসি ঝুলিয়ে বলেন,

আহা, এটাও কি আমাকে জিজ্ঞেস করে করতে হবে?

আর ঠিক এই সদ্ভাবযুক্ত উক্তিগুলোই মিজান সাহেবকে তাঁর সংসারে আরোও বলিষ্ঠ ভূমিকা দান করে। তবে আর যাইহোক একটি জায়গাতে মিজান সাহেবের অবস্থান খুব পরিষ্কার। তা হলো একমাত্র সন্তান ফাহিম ইসলামের ক্ষেত্রে। তিনি ভেতরে কিংবা বাইরে সবসময়ই খুব আধুনিক পিতা। নিজের মর্জি বা নিজের দেখিয়ে দেওয়া পৃথিবীর অংশ হতে তিনি কখনই বাধ্য করেন না ফাহিমকে।

মিজান সাহেব আসলে চান তাঁর একমাত্র সন্তান পৃথিবীর কারো মর্জিতে নয়, বরং নিজের মর্জিতে পৃথিবী চালাক।

আর এখানেই ঘটে যায় বিড়ম্বনা।

এই বিড়ম্বনায় মূল ভূমিকা রাখে মিজান সাহেবের সদ্য হওয়া অসুখটা। যে অসুখটা আজকাল তাঁকে অদ্ভুত সমস্যায় ফেলছে। তবে যতদিন পর্যন্ত সমস্যাগুলো বাড়ির বাইরে ঘটছিলো ততদিন মিজান সাহেব মোটামুটি সামলে নিচ্ছিলেন কিন্তু যেদিন থেকে বাড়ির ভেতরে ঘটা শুরু হলো সেদিন থেকে তাঁর অস্থিরতা বেড়ে গেছে বহুগুণ।

এই তো সেদিন তিনি স্ত্রীর সাথে কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ভালোই চলছিলো সবকিছু। কিন্তু হ্ঠাৎ করে মিজান সাহেবের কপালের দুপাশের রগ দপদপ করে উঠলো। এরপর শুরু হলো মাথায় যন্ত্রণা, সাথে চোখ জ্বলা। সেই জ্বলাপোড়া থামাতে গিয়ে চোখ কুঁচকে আসছিলো মিজান সাহেবের বারবার। তবুও স্বাভাবিক থাকবার চেষ্টায় চোখ দুটো পুরোপুরি খুলে রাখতে গিয়েই তাঁর দৃষ্টি পড়লো নিজের স্ত্রীর ওপর। চমকে উঠলেন মিজান সাহেব। অবিকল নিজের মুখখানা তিনি দেখতে পেলেন স্ত্রীর মুখে। সেই মিজান সাহেবের মুখ নিয়ে তাঁর স্ত্রী শুধু মাথা নেড়ে সায় দিয়ে যাচ্ছিলেন সব কথায়।

না, এমন তো হবার কথা ছিল না। কেন অদ্ভুত কান্ডটা নিজের ঘরেও ঘটতে শুরু করলো? কাকে বলবে এই সমস্যার কথা? কে মিজান সাহেবকে এই অসুখ সারিয়ে দেবে? এসব ভাবনায় এলোমেলো হয়ে যেতে যেতে আরেকটা ভয় চেপে ধরলো তাঁকে,

যদি ফাহিমের মুখেও তিনি নিজের চেহারা দেখতে পান!

আর সহ্য করতে পারলেন না তিনি। সেদিন জীবনে প্রথমবারের মতো চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি স্ত্রীর ওপর,

থামো…সবসময় আমার কথায় সায় কেন দাও? নিজের কি কোনোই বিবেকবুদ্ধি নেই তোমার…

সেই কথাতেও যখন মিজান সাহেবের চেহারা নিয়েই তাঁর স্ত্রী বলে উঠলেন,

ঠিক বলেছো…আমারও এই একই প্রশ্ন নিজেকে!

ভয় আর আতঙ্কে তখন মিজান সাহেব ভয়াবহ কান্ড ঘটিয়ে ফেললেন। স্ত্রীর মুখে বসানো নিজের চাহারায় ঠাটিয়ে চড় মেরে বসলেন।

সেই ঘটনায় হতবিম্ব সবাই। সবাই বুঝে গেলেন মিজান সাহেবের কোনো মনোরোগ হয়েছে। তাঁকে নিতে হবে কোনো বিশেষজ্ঞের কাছে। কিন্তু এই কথাটা মিজান সাহেব মানতে নারাজ। না, কিছু হয়নি তাঁর। শুধু অবসরকালীন অলসতায় মস্তিষ্ক ভুলভাল দেখছে। তিনি যাবেন না কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। কেউ বোঝাতে পারছে না তাঁকে।

কেন বুঝবে মিজান সাহেব? কারণ ভেতরে ভেতরে তিনি জানেন এবং মানেন তাঁর কোনো পাগলের ডাক্তারের প্রয়োজন নেই। এটার কারণ একটাই, সবার মুখে নিজের চেহারা দেখতে পেলেও নিজের একমাত্র সন্তান ফাহিমের মুখটা এখনো ফাহিমের আছে। যেটা মুলত মিজান সাহেবের জীবনে একমাত্র চাওয়া।

কিন্তু ওই যে কথায় আছে না যেমন রুয়ে তেমন ফলে। তাই খুব বেশী সময় অপেক্ষা করতে হবে না মিজান সাহেবের। কিছুক্ষণ পরেই মিজান সাহেব ফাহিমকে তার ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে জিজ্ঞেস করবেন। ফাহিম কোথায় পড়াশোনা করতে চায়, দেশে থাকবে নাকী বিদেশে যাবে—এইসব আর কি। আর এসব প্রশ্নে উত্তরহীন ফাহিম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে বাবার দিকে যেন বাবা বলে দেন কি করতে হবে তাকে। আর ঠিক সেই মুহুর্তে নিজের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাবেন তিনি ফাহিমের মুখে।

এরপর কি হবে?

আমাদের মনে হয় ভালো কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ঠিকানা খুঁজে রাখা দরকার এখনই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. গল্পের কোনো আগামাথা কিছুই খুঁজে পেলাম না। অত্যন্ত একঘেঁয়ে, অযৌক্তিক, অকারণ দীর্ঘ বর্ণনাতে নেই কোনো সাহিত্যিক মুন্সীয়ানা, ভাষাকৌশলের ব্যবহার কিংবা কোনো চমক। গল্পপাঠে অমর মিত্রের মতো লেখকের গল্প পড়ে অদ্ভুত আনন্দ আর ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়েছি, কুলদা রায়ের গল্প পড়েও বিমোহিত হয়েছি। সেসবের সাথে এমন গল্প(!) এখানে ঠাঁই পায় দেখে একটু বিস্মিতই হলাম!

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. আপনার মন্তব্য শিরে ধার্য করে নিলাম...
      স্মৃতি ভদ্র

      মুছুন