শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প : রাখাল কড়াই


চাকবেড়ের মোড় থেকে বাস চন্দনেশ্বরের বাজারের দিকে ঘুরে গেল । ভাঙ্গড় যাবে। চারদিকে ধানক্ষেত। তার ভেতর রোগা পিচ-রাস্তা বেয়ে চার চাকার রাজহাঁস ছুটে যাচ্ছে। ক্ষীরোদ পাকড়াশি বাস-রাস্তা থেকে নেমে খাল পাড়ে উঠে হন হন করে হাঁটা ধরল। হাতে পাকানো বাসের টিকিট। এখন বিদ্যেধরীর বাদা মাড়িয়ে গরাণবেড়ে পৌঁছে দুপুরের আগেই লোকজন ডাকতে হবে।

খবর যতদূর, জিনিস নাকি সরেস - ঘরে রেখে রস মেরে নিলে পিঁড়ি চাই পিঁড়ি, জানলা দরজা কপাট সব হবে। বাদার গাছ, চার মানুষেও বেড় পায় না—হোক না তেঁতুল। শাল সেগুনের কারবারে কে দাঁড়াবে ? বৌবাজার, শেয়ালদার ক'খানা বাছাই ঘর বাদে সব দোকানই জাম- জামরুল-তেঁতুলে ছেয়ে গেছে। ভাল পালিশের চেকনাইয়ে কত মিটসেফ, আলনা, আলমারি, ইজিচেয়ার দিব্যি বাজারে চলে যাচ্ছে। এই ডামাডোলে ক্ষীরোদ এমন সরেস তেঁতুল কাঠের খোঁজ পেয়ে লোভ সামলাতে পারেনি । লোকজনের ভরসা না করে নিজেই বেরিয়ে পড়েছে। শ্রীমানি মার্কেটের ধারে ধারে ক'ঘর কবিরাজের দোকান। নানান জায়গার লোক শেকড়বাকড়, লতা-পাতা বেচতে আসে। হরনাথ তর্কভূষণ বৃহৎ গুগগুল ও চ্যাবন- প্রাশের বয়ম রাখবে বলে গত শ্রাবণে গাব্দামত পাঁচ তাকের এক আলমারি নিয়েছিল। পরশু সেই টাকার তাগাদায় গিয়ে এই গাছের সন্ধান।

কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীটের ওপর বাপকেলে দোকান। তর্কভূষণ ইলেকট্রিকের ধার ধারে না। হ্যারিকেনের সামনে বাঁদুরে টুপি কম্ফটার বালাপোষ চাপিয়ে দশাসই লাশ একেবারে সাক্ষাৎ যম সেজে বসে। চার কিস্তিতে আলমারির দাম শোধ হওয়ার কথা—দশ বারেও অর্ধেক উঠিয়ে আনতে পারেনি ক্ষীরোদ। শিষ উঠে হ্যারিকেন কেবল কালি ওগলাচ্ছে। কম্ফটারের আলগা গেরোর ভেতর দিয়ে এক খাবলা পাকা দাড়ির সাদা ছোপ । আধ ঘন্টা বসেও টাকার কথাটা পাড়তে পারেনি। পা নামাতেই মেঝের ড্যাম্প কোমর অবধি উঠে এসেছিল পরশু। ভাল জ্বালা ! এই ড্যাম্পের হাত থেকে ভাল ভাল বটিকা, পাচন বাচানোর জন্যেই হরনাথ হাত ধরে আলমারি চেয়েছিল একটা। এখন টাকার কথা তুললেই বলে, শীতটা ভাল করে পাকুক—শ্লেষ্মা ধাতের সব রুগী এই তর্কভূষণের দোরে এসে লাইন দেবে। তখন নাকি আলমারির দাম শুধে আগাম সুদ্ধ চার পেয়ার চেয়ারের অর্ডার দেবে হরনাথ ।

আগের অবস্থা থাকলে ক্ষীরোদ দু'খানা চেয়ার অমনি করে দিত কবিরাজকে। বুড়ো আর বেশীদিন নেই। ঠিক তখনই ফুটপাত থেকে মুসকো মত একটা লোক সোজা হ্যারিকেনের সামনে উঠে এসেছিল । গায়ে জড়ানো কাপড়ের খুঁট টেবিলে আলগা করে দিল লোকটা। দেড়পো আধসের ট্যাংরার চেয়েও লম্বা লম্বা তেঁতুল, 'এনেছি— এ কটার বেশি হল না–’

হাত পাঁচেক লম্বা, মাথার চুল অনেকটাই শাদা, কুঁজো হয়ে দাঁড়ানোয় পেটের গৌদলে দিব্যি একটা ধামা বসিয়ে দেওয়া যায়।

তর্কভূষণ টুপির ভেতর থেকেই বলল, 'এর চেয়ে বড় পেলে না ?'

‘থাকবে না কেন ? পাবার যো আছে—গাছতলায় পড়তেই বেদেদের শোর এসে চেঁচে পুঁছে খেয়ে যাবে–’

একটা তেঁতুল হ্যারিকেনের সামনে তুলে ধরে কবিরাজ গন্ধ নিল নাকে, 'বাড়ন কমে গেছে বোধহয় ---'

‘তোমার বাপের আমল থেকে দে যাচ্ছি—কতকেলে গাছ,এবারে ছোট হয়ে আসছে।”

ক্ষীরোদ আর থাকতে পারেনি, ‘কত কালের গাছ ?”

‘তা ধরুন আমাদের সাত পুরুষ ওর ডালে পুড়েছে—এখন জুড়ে দেখুন।’

মনে মনে হিসেব করতে যাচ্ছিল ক্ষীরোদ। লোকটা সব গুলিয়ে দিল, 'এ তেঁতুল তো খেতি পারিনে আমরা—বিষ ! একবার খেলিই এর তারপর ভুল বকে কালঘুম——একদম ঢলে পড়তি হবেনে!”

হরনাথ একটা তেঁতুল ভেঙ্গে তখনও গন্ধ শুকছে ।

ক্ষীরোদের মুখ দেখে কী দয়া হল লোকটার। বলল, 'এ আপনার জঙ্গুলে তেঁতুল। ঠাকুর্দার ঠাকুর্দার বাপ জঙ্গল হাসিল করে গরাণবেড়ের মুলুক বসায়—সেই ইস্তক গাছটা আছে। কী শোভা ছিল আগে ছোটবেলায় গা ভরে এমন ঝুলে থাকত—'

'না গায়েন, রস কষে গেছে—এ তেঁতুলে আমার হবে না। নিয়ে যাও ও তুমি--'

লোকটা হ্যারিকেন বরাবর সিধে দাঁড়িয়ে গেল, 'তা হবে না কবিরাজ । কত আজে বাজে লতা পাতা কিনছ দিনভর—আর গাছের এমন আদত ফল নে ফিরে যেতি হবে?'

'দরকার না থাকলে যেতে হবে।'

‘এতটা পথ ভেঙ্গে এলুম--'

‘সে তুমি ফি বারই বল । দরকার না থাকলে কাহাতক কিনি বলতো গায়েন ? এমন নয় যে, ঘরে রেখে টক রেঁধে খাব !’

'পোকায় এবার ধান পাট সব শুকিয়ে পুড়িয়ে জেরবার করেছে। নয়ত আসতুম না—নাও রেখে দাও, খরার দিন কাজে দেবে— ‘

লোকটা নিজে নিজেই সামনের আলমারির খোলা তাকে একটা করে তেঁতুল তুলে সাজিয়ে রাখছিল।

‘নোংরা করো না । ঝামেলা ভাল লাগে না গায়েন — হরনাথ উঠে দাঁড়িয়েছিল, আবার চেয়ারে বসল । গায়েন কাপড়ের খুঁটে তেঁতুল তুলে নিয়ে ফুটপাথে নেমে গেল ।

ভীষণ শীত পড়েছে, মুলোর দর এখনও নামছে না—এইসব ধানাই পানাই বলে টাকার কথা না পেড়েই কোন গতিকে ক্ষীরোদ রাস্তায় নেমে পড়ল। তেঁতুল নিয়ে দু' দুটো হুমদো বুড়ো যা করছিল, চোখে দেখা যায় না। ফুটপাথের তেলেভাজা দোকানীর তোলা উনুনের ধোঁয়া ফুঁড়ে শাদা রঙের লম্বাই চওড়াই গায়েন হুস হাস এগোচ্ছে। পরনের কাপড়ের খানিকটা গায়ে । ক্ষীরোদ একরকম দৌড়েই ধরে ফেলল, ‘কতদূর যাওয়া হবে ?’

রাস টেনে দাঁড়াল লোকটা, 'কোথায় দেখিচি বলুন তো ?'

'কবিরাজের দোকানে—এই মাত্তর !'

দুই থাবা দিয়ে ক্ষীরোদের হাত ধরল।

জানলার রডের পারা আঙ্গুলগুলো আর একটু লম্বা হলে তার কনুই ধরে ফেলত।

‘বুড়োর বাপ থাকতে তেঁতুল, অর্জুন ছাল কত কি দে আসতুম’-- একটু থেমে বলল, 'আগে কত রুগী বসে থাকত—হরনাথই বা করবে কি ! ’

ক্ষীরোদের হাত ছেড়ে দিয়ে চলতে শুরু করে দিয়েছে। ক্ষীরোদ দৌড়তে লাগল । ‘ন'টা আটান্ন না ধরলে বাস পাব নি। এত আঁধার —এখন আর দু' কোশ একা হাটতি ভাল লাগে না।'

ক্ষীরোদ আর ভূমিকা করার সময় পেলে না, 'অনেকদিনের গাছ—'

দমকে বেরিয়ে যাবার আগে গায়েন আবার থামল, 'কোন গাছ?’

ফুটপাথে কথা বলা যায় না। লোকজন বন্ধনেই কোনো সময়, ‘তাই তো বলছিলেন গায়েন মশায়--সাতপুরুষের-–’

একদম থেমে গেল গায়েন, 'ওঃ! আমাগে গড়াণবেড়ের—সে মশায় বড় অগড়ের গাছ--তার অগড়ের কথা কত বলব—'

‘যদি বলেন তো একবার দেখে আসি— ‘

‘যাবেন ? গড়াণবেড়ে যাবেন ?'

'খুব ! সকাল সকাল গিয়ে ঘুরে আসব । কালই সকালে–’

‘কাল নয়—আট গাড়ি খড় নে খালিশপুর যেতি হবে–-পরশু আসুন— ভোরের ট্রেনে চড়ে বাসুলিডেঙ্গা নাববেন, চাকবেড়ের মোড়ে আমায় পাবেন --না দেখলি হাক পাড়বেন নীলাম্বর গায়েন বলে –’

পরশু আর কথা বলতে পারেনি গায়েন । না ছুটলে ন'টা আটান্নো মিস্ হয়ে যেতো।

সে রাতেই গোলায় ফিরে ক্ষীরোদ তিনখানা বড় করাত ভাড়া নিয়েছে । গরাণবেড়ের লোকজন লাগিয়ে তিনদিনে কুড়োলে কুড়োলে পুরো গাছটা খানকয়েক গরুর গাড়িতে চাপিয়ে নিতে হবে। বাসুলিডাঙ্গা থেকে রেল বুক করে দিলে পরদিনই চিৎপুর ইয়ার্ডে মাল ডেলিভারি। তারপর কয়েক ক্ষেপে লরিতে পুরো গাছটা গোলায় । তখন ভাড়ার করাতে চেরাই, প্লেন, পালিশ । অতকেলে গাছ—মোদ্দা কত হাজার সিএফটিতে দাঁড়াবে! মনে মনে হিসেব কষতে গিয়ে সব অঙ্ক গুলিয়ে গেছে। এসব কাগজ-কলম ছাড়া জুৎ হয় না। হাঁক দিতে হল না—বরং কানের কাছে গিয়ে আস্তে ডাক দিল ক্ষীরোদ, — গায়েন মশাই, ও নীলাম্বর গায়েন–’

একটু নড়ে চড়ে উঠে দাঁড়াল লোকটা। খালপাড় থেকেই দেখতে পেয়েছে ক্ষীরোদ। পুকুরপাড়ে তুলে দেওয়া শুকনো কচুরিপানার ডাই জুড়ে মা-শুদ্ধ পাঁচ-ছ'টা কুকুরছানা রোদ পোহাচ্ছে। তাদেরই দু'টোকে কোলে নিয়ে গায়েন ঝিম মেরে বসে।

‘এসে গেছেন। ভাবলুম বেলাবেলি বেইরি আসতে দেরি হবে আপনার, তাই অঘোরের ঘরে বসতিই এই কাণ্ড–।’ ভগ্‌ ভগ্‌ করে গন্ধ আসছে । সারা মুখে জোর গোটা আটেক দাঁত। তার ভেতর দিয়েই হেসে বলল গায়েন, ‘অঘোর বেটে মুকুজ্যেদের চর-হাসিল দশ বিঘে খালি জমি কিনল ৷ ওদের হয়ে অনেক খুনখারাবি করেছি—মুকুজ্যেরা তাই আমাকে দেখেই তিন হাজারের ভেতর সবটা জায়গা অঘোরকে লিখে দিলে। বেটে অঘোর সকালবেলাই তাই এসব ছাইপাশ গিলিয়ে দিলে–’

আল ধরে ধরে গায়েন এগোচ্ছে—ক্ষীরোদ খানিক দৌড়ে তাকে ধরল ৷ দুই ছেলে নিয়ে এক চাষী পান্তা পেড়ে বসেছে। একটা উঁচু ঢিবিতে পাল্লা খাটিয়ে মাঠের ধান মাঠেই বিক্রী হয়ে যাচ্ছে। সেকথা বলতে গায়েন তিরিক্ষি হয়ে উঠল, 'লিভির ভয়ে পিচ রাস্তায় ধান নে যাবার পথ নেই— চৌকি বসেছে—'

খানিক জায়গা জুড়ে ধানগাছ সব খাক্। এসব জায়গায় বর্ষার মুখে মুখে বিষপোকার ঝাঁক উড়ে গেছে—ধান দূরে থাক, ভাল খড়ও পাওয়া যাবে না।

পথ ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে গায়েন নিচু হয়ে ঘাসের চেয়েও সবুজ খুদে খুদে বরবটি তুলে ক্ষীরোদের হাতে দিল, ‘ভেঙ্গে মুখে দিন— রাখাল কড়াই, বয়েসকালে গরু চরাতে এসে ক্ষিধের চোটে এসব কত খেয়েছি—শুকিয়ে নিলি ভাল ডাল হয় – '

‘গরু ছিল বুঝি–’

‘হেলে গরুই বেশি--একাই বিঘেটাক দিন ভরে চষে ফেলেছি কত। সন্ধোবেলা চরানির মাঠ ঢেকে রেখে দিতুম—রাত থাকতি জোচ্ছনায় সেখানে ছেড়ে দিয়ে বসে থাকতুম, ভোর হলিই হালে জুতে– '

'সাপটাপ–'

‘কোথায় ? আজকাল আর দেখিনে – '

ক্ষীরোদ কিন্তু সাবধানে পা ফেলে এগোতে লাগল । এমন দশ বিশ হাজার বিঘের মাঠে যে কোন জায়গা থেকেই সাপ উঠে আসতে পারে ।

‘আছে দু’একটা—খুব রাত না হলি বেরোয় না। ভয়ানক বিষধর। তবে, আগে অনেক ছেল। সত্তর আশিটে কেউটে আমিই সাবাড় করিছি—’

‘লাঠি দিয়ে—'

‘লাঠি কোথায় ! এই হাত দে–' গায়েন দাঁড়িয়ে গেল ।

আর কত দূর গরাণবেড়ে। অনেকক্ষণ বসতবাড়ির পরিষ্কার ঢিবি জায়গায় দাঁড়ানো হয়নি। নিশ্চয় সেখানে সাপ থাকে না ।

'এখন যেখানে দাঁড়িয়ে– তার মাথায় অন্তত ষাট হাত জল ছেল– বিদ্যেধরীর জল, নৌকো এ জায়গায় এলি পয়সা ছুঁড়ে দিতুম --

’এখানে? নদী ?’

‘এ জায়গা তো মধ্যিখান --তিন মাইল চওড়া বুক ছেল, আমিই চাল বোঝাই দে ধোসারহাট ঘুরে চেতলার আঢ্যিদের গোলায় কালীগঙ্গা ধরে নৌকো পৌঁছে দিতুম । ওই যে বাবলার ঝাড়–রশি দশেক হবে, ওসব গাছ ত বছর সাতের—নদী ফুরে আসার মুখি পাখিদের কাণ্ড ৷'

ক্ষীরোদের আর কিছু বলতে হল না অনেকক্ষণ। নীলাম্বর আগে আগে হাঁহাটছে। পেছনে ক্ষীরোদ, সামনে কেউ নেই । সেই ফাঁকার দিকে তাকিয়ে নীলাম্বর কথা বলছে। উলটো দিক থেকে বাতাস এসে তার কিছু শব্দ তালগোল পাকিয়ে দিচ্ছে। ক্ষীরোদ খানিকটা শুনতে পেল—তাকেও পথ দেখে পা চালাতে হচ্ছে।

‘বিদ্যেধরীর বুক জেগে উঠতি দু'পাশে লাঠালাঠি শুরু হয়ে গেল। যার জমির লাগোয়া চর ওঠে সেই রাজা-- দুশো পাঁচশো বিঘে হামেশাই অনেকের ক্ষেতের গা দিয়ে জেগে গেল। কিন্তু দখলে রাখা চাই । আর লাঠালাঠি।’এখানটায় থেমে গায়েন দু'হাতে তালি দিয়ে হেসে উঠল ।

ক্ষীরোদ মানে না বুঝেও সঙ্গে সঙ্গে হাসল । গাছটা নীলাম্বরদের। ‘আমি তখন বড় গুণ্ডো। বুকে বুকে খাড়াই গুতো মেরে মাল খেলি-- যার লাগে তার চড়চড় করে আওয়াজ হয়- -আমি দাঁড়াইনে, ফেড়ে বেইরে যাই। মুকুজ্যেদের বড় তরফ ডেকে নে বললে, নারাণপুরের কাছে পাঁচ হাজার বিঘের চরটা দখল করে দিলি একশো বিঘে জায়গা লিখে দেবে–'

'তা দেছেলে–হোসেনপুরের মোড়লদের বড় ছেলেটাকে কেটে ফেললাম। জোয়ান বয়েস, রক্তের রঙ কী—জমি দখলে এমন কত হলো—' গায়েন থেমে থেকে মাঠের মাঝখানে এক জায়গায় আঙ্গুল দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে রূপশাল ধান দেখিছেন ওখানটায়—ঠিক ওই খাক্‌ মত জায়গাটায় খুনটো করি—’

ধান আছে—ভেতরের দুধ পোকার বিষে শুকিয়ে খাক্‌। এতক্ষণ দু'জনে গরুর গাড়ির লিক্ ধরে এগোচ্ছিল। এবারে গায়েনের সঙ্গে মাঠে নামল ক্ষীরোদ।

‘খুনটা হয়ে যাওয়ার পর মন মুষড়ে গেল—কিন্তু তখন ছেলেরা ছোট, আমার ফাঁসি হলে ওদের দেখতো কে ? মাঠের মধ্যি বসেই মোড়লদের, ছেলেটাকে ল্যাজা দে এতটুকুন টুকরো টুকরো করে চৌদিক ছড়িয়ে দেলাম —আর কী শকুন ! তিন দিনের ভেতর—সব সাফ !

‘তারপর একশো বিঘে নে কি করব ? আর কি মাটি ! ধান ছড়িয়ে দি তো ধান বেরোয়—এই তার গোছ—কিন্তু মুসকিল দেখা দেল সাপ নে । যেখানে কোপাও নরম মাটি পেয়ে সাতদিনের ভেতর গোখরো তার ছানা পোনা নে হাজির । গোটা কয়েক মারার পর আমাকে দেখলি ওরা গর্তে গিয়ে লুকোতো। আমি লেজ ধরে টানতুম—উল্টো টানে গায়ের মাংস খাবলা খাবলা উঠি যেত । সে অবস্থায় মাথার ওপর পাক দে ছুঁড়ে দিতুম -- তারপর বাচ্চারাই পিটে মারত ৷'

'গরাণবেড়ে আর কতদূর ?'

'এসে গিছি।'

নদীর বুকের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আগেকার পাড়ে এসে উঠতে আরও আধ ঘন্টা লাগল । সেখানেই মার খাওয়া নদীটাকে পাওয়া গেল। খানা কেটে দেওয়া ড্রেনের চেয়েও সরু—জলের ছিটে ফোঁটাও নেই, দু'ধারে কিছু বুনো ফুল ফোটে।

‘এই নদী গিয়েই আমাদের সব্বনাশের শুরু। নদীও গেল-মাছ গেল,

ব্যবসা গেল—'

এত গাছ, আড়াল আবডাল নেই – শুধু মাঠ, হামেশাই দশ বিশ বিঘের দিঘি—তাতে পলক পড়ে না এমন শালুকের পুরু চাদর, বাতাস একটু- থামতেই শুকনো বকুলের ভারি গন্ধ। ক্ষীরোদ একটিপ নস্যি নিয়ে ফেলল ।

‘দেখতি পাচ্ছেন ?"

দক্ষিণে তাকিয়ে ক্ষীরোদ থমকে দাঁড়াল। আকাশের সবখানি জুড়ে সবুজ একটা মাথা উঠে গেছে। পাতার চেহারা অন্য তেঁতুলের চেয়ে কিছু আলাদা। এক একখানা ডালে শেয়ালদার আধখানা প্ল্যাটফর্ম জুড়ে যাবে। এ কেটে নিয়ে গরুর গাড়িতে চাপাতে কম করেও মাস খানেক চলে যাবে ।


'পিঁপড়ে হয়নি গাছে? পোকা?’

‘নালসের ডিম আছে ঝুড়ি ঝুড়ি। পোকামাকড় নেই একদম। একটুও ঘুণ ধরেনি–’

গাছের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ক্ষীরোদ নীলাম্বরের সঙ্গে এক উঠোন লোকের মধ্যে এসে পড়ল। জনা ষোল ধান ঝাড়ছে। ইটের চেয়েও কঠিন মাটির দাওয়ায় এক তে-মাথা বুড়োর পাশে খেজুর পাতার চ্যাটাইতে বসতে হল। পরামাণিক বুড়োর গালে ফটকিরি বুলিয়ে ক্ষীরোদের থুতনী ধরে ফেলল ।

'কামিয়ে নিন্——আপনারা শহরগঞ্জের মানুষ –’ নীলাম্বর নিজেই পরামাণিকের বাক্স এগিয়ে দিল ।

গাল বাড়িয়ে দিয়ে ক্ষীরোদ সামনেই আবার তেঁতুলগাছটা দেখতে পেল । গোড়ায় একটা ভাঙ্গা টিউবওয়েল ।

'জল ওঠে না ?'

‘অনেক টাকা দে বসাই। দু'বছর না ঘুরতি বালি ঢুকে বন্ধ হয়ে গেল—’

‘কত ফুট?”

‘সাতশো সাড়ে সাতশো—জল এখানে অনেক নীচে—' সেই বুড়ো এক লাফে মাটিতে নেমে বলল, 'সোঁদরবনের মাটি তো—'

‘তাই বুঝি।’

'লোলাম্বর তখন ছোট। ওর বাপ আর আমি দেখিছি – আমাদের খুড়ো মশাই লাঙল টানতে পারতেন না। লাঙ্গলের ফলা মাটিতে ঢোকেই না। ঢুকলিও গুচ্ছের শেকড়বাকড় আটকে যায়—’

'কী রকম ?”

‘তল্লাট ভরে তো শুধু গাছই ছেল। খুড়োমশাইর বাপ কত গাছ সাবাড় করে লোকজন বসায়। ওই লাউ মাচার নীচি রোজ সন্ধ্যেবেলা বাঘ এসে বসি থাকত। পুকুর দেখিছেন--ওর ভিতর থিকি ওই ঘরের সামনে গাছের গুড়ি বেইরেছে—আঁধারের চেয়েও কালো ।”

'বাঘ লোক খেত না ?'

‘খেত। তবে আমাদের কাউকি খায়নি। খুড়োমশায়ের বাপের জন্যি–’

এক গাল কামানো হয়ে গেছে ক্ষীরোদের। এমন সময় গাঁয়ের চৌকিদার এল। খালি গায়ে লুঙ্গির ওপর পেতলের তকমা বেলট্‌ ঝুলছে। চেঁচিয়ে বলে গেল, দশদিনের ভেতর 'ক' 'খ' 'গ' 'ঘ' শ্রেণীর রেশন কার্ডের জন্য নাম লেখাতে হবে।

নীলাম্বর বুড়োকে দেখিয়ে বলল, 'খুড়োমশায়ের বিয়ের পর রেল লাইন বসিছে ইদিকে। ওনাদের খুড়োর বাপ বড় তেজি ছেলেন । বাঘ টাঘ তারি সমঝে চলত– '

ক্ষীরোদ পরামাণিকের হাত থেকে মুখখানা বাইরে এনে নীলাম্বরের খুড়োর দিকে তাকাল। বুড়ো খুড়ো এবারে সব ভেঙ্গে বলল, 'আমাদের খুড়োমশায়ের বাপের লেজ ছেল--'

নীলাম্বর বলল, 'হ্যাঁ, সত্যি ছেল। তিনি এ গাছ থিকি ও গাছে লাফাতি পারতেন—নিজিরই শোরের খোয়াড় ছেল। পাকাবাড়ির মেঝেয় চড় মেরে দাওয়া ফাটিয়ে দেতেন। শেষ বয়সে দাঁত পড়ে যাওয়ায় কড়া চাপানোই থাকত। আধপোড়া শোরের মাংস গিলি গিলি খেতেন ।

–লাউ মাচার নীচে একবার এক বাঘ এসি ওনার হাতে প্রাণটা দেলে। এক মুগুরের ঘায়ে বাঘের মাথা ফাঁক–’

'কতদিন বেঁচে ছিলেন–’

‘লোকে বলে দু'শো বছর—তবে অত নয়'—একটু থেমে নীলাম্বর বলল, 'তিনি কবে মরলেন কেউ তা দেখেনি ।'

‘মানে ?”

‘শেষ বয়সে নাকি একা একাই করাতি নদী পার হয়ে সোঁদরবনের দিকে হেঁটে চলে গেছেন– আর ফেরেননি।’

নীলাম্বরের খুড়ো বলল, 'আমরা তখন ছোট। লোলাম্বরের বাপ ওই তেঁতুলগাছের একখানা বড় ডাল কেটে গুছিয়ে রেখিছে। খুড়ো মশায়ের বাপের শরীরটা হেলে গেছে কিছুকাল। মরলিই লাস চিতেয় দিতে হবে। ছেলে পেলে মাগ কবে কাবার হয়ে গেছে। মুয়ে আগুন দেবার জন্মি আমরা, নাতিরা টিকে আছি—একদিন সকালে উঠি দেখি আর নেই। দুপুরের দিকি দূর গাঁয়ের রাখালরা খবরটা দেলে, পোড়ো গায়েনকে তারা ডোঙ্গায় চাপি সোঁদরবনের খাল ধরি এগুতে দেখিছে—সেই শেষ খবর।’

একটা ডাব কেটে নীলাম্বর ক্ষীরোদের হাতে তুলে দিল, ‘এই আমাগে অগড়ের তেঁতুলগাছ । খুড়ো মশায়দের খুড়োর বাপ ছাড়া সবাই ও গাছের ডালে পুড়িছে। আমার মেজদি পুড়িছে, শৈলাদি পুড়িছে – আজকাল পাখিরা আর বসে না, আগে ঝাঁক ধরে ওই তেঁতুল ঠুকরে তলায় ঢলে পড়ি থাকত।'

যাকে নিয়ে এত কথা, ক্ষীরোদ দেখল, এমন বাতাসে মগডালে তার কিছু পাতা শুধু কাঁপছে। ধানকাটা মাঠে নীলাম্বরের বড় ছেলে লাঙ্গল দিচ্ছে। কড়াই বুনবে। দূর রাস্তা দিয়ে বাস যাচ্ছে, গাছপালা বলে দেখা গেল না, ক্ষীরোদ শব্দ শুনতে পেয়ে উঠে দাঁড়াল, 'এমন অমঙ্গুলে গাছ রেখে কি করবে– গায়েন যদি দিতে, নিয়ে যেতাম' – কথাটা গোড়াতেই এর চেয়ে আর খোলসা করে বলা যায় না ।

‘এত বড় গাছ কি প্রকারে নেবেন' -- কিছু অবাক হয়েছে নীলাম্বরের খুড়ো, ‘আমার এই বয়সে কত ঝড় দেখলাম ওকে নিতে এল—নড়াতিই পারলো না।'

'লোকজন এসে নিয়ে যাবে। দশটা কুড়োেল লাগালেই ভাগে ভাগে মাটিতে শুয়ে পড়বে। নায্য দর যা তাই দেব।’

‘আপনি কেটে নে যাবেন? খুড়োর মাঝখান থেকেই নীলাম্বর জানতে চাইল, 'দর কী রকম –’

‘বাজার যা তাই—একটা পয়সাও ঠকাবো না। তবে গাছও কতকালের দেখতে হবে—ওতে কি আর কিছু আছে!' এ কথাটা একেবারে মিথ্যে-- কেননা, অমন কাঠে কিছু না থাকলে কোথায় আছে—তাই ক্ষীরোদের গলা একটু কেঁপে গেল ।

'আপনার কী কাজে লাগবে ?”

'বিশেষ কোন কাজে নয়—তবে, আপত্তি না থাকলে চেরাই করে নিমতলার গোলায় পাঠিয়ে দিতাম'—ক্ষীরোদের চোখের সামনে এখন দশ হাজার ইজিচেয়ার, পঞ্চাশ হাজার পিলসুজ, এক লক্ষ পিড়ি নাচছে ।

নীলাম্বর গাছটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পরামানিক উঠোন পেরিয়ে গেল। বুড়ো খুড়ো বলল, 'লোলাম্বর হয়নি। বিদ্যেধরীর বুক বেয়ে আমাদের খুড়ো মশায়ের বাপ কোণাকুণি পাড়ি দেতেন রেতের বেলা— তখন জোচ্ছনায় এ গাছের পেল্লয় ভরি আঁধারের দিকে চেয়ে পাড়ে ফিরি আসতেন।'

হাতের একখানা পাকানো কাগজ কথা বলতে বলতে সোজা করে ধরল, “এই যে চৌকো ঘর দেখিছেন—এগুলো বাড়ি, এই যে রেখার মাথায় চিকে দেওয়া ছবি--এ হল বৃক্ষ--এই আমাদের তেঁতুলগাছ—'

‘সেটেলমেন্ট ম্যাপ?”

‘উনত্রিশ সনের---তখনকার সেটেলমেন্ট সাহেবের সই দেখিছেন নীচি, ' বলতে বলতে খুড়ো ধান কাটা মাঠে শুকনো বাবলার ঝাড়টা আঙ্গুল দিয়ে দেখাল, ‘সোত্ কম বলে ওইখেনটায় সাহেবের বোট বাঁধা থাকতো — তিনিই আমাগে খুড়ো মশায়ের বাপের ছবি তোলেন। কত টাকা দিতি চাইল সাহেব—পোড়ো গায়েন তবু তার লেজ দেখায়নি—'

‘এমনিতে পোড়ো গায়েন রাতবিরেতে রাস্তা পার হত হেসে খেলে– দিনি দিনি কিন্তু রোদ বাড়লিই কানা, ছায়া বেছে নে বসি পড়ত ওই তেঁতুল তলায়, পিঁপড়ে কামড়ালি ধরতি পারত না। ঝাঁক ধরি কামড়ালি তবে উঠে গে তেঁতুল গাছে গা ঘষত——তখন শুকনো ছালবাকল খসি পড়ত। বৃক্ষের আদুল জায়গায় কী মোলায়েম করে হাত বুলে দেত পোড়ো গায়েন

তখন ।'

ম্যাপখানা মেলে ধরল ক্ষীরোদের চোখের সামনে, 'কেমন চওড়া নদী ছেল দেখিছেন,' বুড়ো ম্যাপের ওপরে একটা চ্যাটালো ড্রেনের গা দিয়ে আঙ্গুল টেনে আনল। ক্ষীরোদ ধানকাটা মাঠে তাকিয়ে ফেলেছে। রোদের আলো কাৎ হয়ে পড়ে। ন্যাড়া মাঠের এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে গরুর ছোট ছোট ছায়া। তার ভেতর দিয়ে নীলাম্বর হেঁটে আসছে। পেছনে জনা পাঁচেক লোক। তাদের দু'জনের কাঁধে দু'টো কুড়োল ৷

বুড়ো বলছিল, ‘এই পেল্লয় নদী সাঁতরে পোড়ো গায়েন পান্তার সঙ্গে ওই তেঁতুল জল খেয়ি ঘুম লাগাতো। বেলাবেলি উঠতি চরের মাটিতে গর্ত করে ধান গুঁজে দেত, তখন ত আর লাঙ্গল চলতো না। দু' হাত শেকড়বাকড়–’

লোকজন সুদ্ধ নীলাম্বরকে ঢুকতে দেখে বুড়োর কথা কেঁপে গেল—

‘ও তুমি দর ঠিক করে ফেল ক্ষীরোদবাবু—এ গাছ আমরা রাখব না—'

নীলাম্বরকে থামিয়ে দিল বুড়ো, 'বেচে দিবি ? আমায় পোড়াবি কি দিয়ে–’

‘সে আরও গাছ আছে। বাবলাগুলো কি হবে?’

‘তা বলে পোড়ো গায়েনের তেঁতুলতলা থাকবে না——অমন ছায়া রোদ- এসে হাট করে দেবে '

'তা দিক্‌ খুড়ো। এবার তো ধানের হালচাল দেখি মাথা ঘোরে । শ্রাবণ ভাদ্রে টান ধরলি এতগুলো পেট তো আর তেঁতুল গিলে চলবে না—’ এবার দাঁড়ানো লোকগুলোকে ধমকালো নীলাম্বর, ‘নে নে তোরা হাত লাগা—কোথায় কোপাবে দেখে দাও—'।

‘দর ঠিক হোক ।’

‘বেশি কথা কয়ে কাজ কি ? না হোক্‌ তিনশো বছরের গাছ হবে— তিনশোটা টাকা দিয়ো–’

এতক্ষণে খুড়োর মুখে কথা এল, 'আমার ভাগ আমি বেচবো না—'

'বাগড়া দিয়ো না খুড়ো—আটকুড়ো লোক তুমি, আমরাই তোমাকে দেখব—এতকাল দেখিনি?’

নীলাম্বরের কথায় কান দিল না, 'আমার স' পাঁচ অংশ--ও আমি বেচব না।”

নীলাম্বর গোঁজ খেয়ে দাঁড়ালো। পেটের খোঁদল বাতাসে ভরে গেছে। মাঠময় গরু ফিরছে—শুকনো ধুলোয় মাটির ওপরের আধ হাত ধোঁয়া হয়ে গেছে। নীলাম্বরের বড় ছেলের বৌ হবে, একগলা ঘোমটা দিয়ে ক্ষীরোদের জন্যে ভাতের থালা নিয়ে দাঁড়ানো ।

‘তোমার অংশের গুষ্টি মারি। এ সোঁদরবনের গাছ—যে নেয় তার। নে নে তোরা হাত লাগা এইবেলা।' এবার কিন্তু পাঁচজন নয়--লোকগুলোর মোটে একজন কুড়োল কাঁধে উঠে দাঁড়ালো ।

‘পোড়ো গায়েন ফিরে এলি কি দেখাবি লোলাম্বর ?' গলা ঘড়ঘড় হয়ে উঠতে একদলা কাশি ফেলে দিল খুড়ো।

‘তিনখানা একশো টাকার নোট। তোমার পোড়ো গায়েন আর ফিরবে নি।'

কী খেয়াল হতে নীলাম্বর হেসে উঠল, 'কোন পথ দে আসবে শুনি? আড়াইশো তিনশো বছরের বুড়ো তো হেঁটে আসতে পারবে নি। নৌকোয় আসবে—করাতি, বিদ্যেধরীর বুক শুকিয়ে কাঠ !'

এ সব কথার ভেতর দিয়ে বুড়ো শুধু বলল, 'ঠিক ফিরে আসবে রে। এবেলা দুষিসনে।

কথাটায় কী ছিল। তেঁতুল গাছটার সামনেই জুতসই একখানা হাওয়া চৌদিকের অনেকটা ধুলো হুস করে শূন্যে তুলে দিয়েই ফেলে দিল । সংগে সংগে কয়েকটা বড় তেঁতুল শব্দ করে তলায় পড়ল। দাঁড়ানো লোকটা কাঁধ থেকে কুড়োল নামিয়ে ফেলেছে। সবার সঙ্গে ক্ষীরোদও গাছতলায় তাকালো। পরিষ্কার জায়গাটুকুর ওপর খানিক ঢলা-রোদ চৌকো হয়ে পড়ে। তার বাইরেটা পাতলা অন্ধকার । সেখানে গাছটা দাঁড়ানো । এতগুলো লোকের সামনে গুঁড়ি থেকে একটা কালো জিনিস নেমে এল– রোদে পড়তেই সবার আগে নীলাম্বর হেসে উঠল, 'খড়িচোচ!’

বেশ লম্বা । সাপটা তেঁতুলগুলোর ওপর দিয়ে রোদের বাইরে নেমে এল। অবেলায় আর ভাত খেতে পারল না ক্ষীরোদ । থালা ঘেঁটে ঠেসে জল খেয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। আঁচানোর জন্যেই পুকুরে যাচ্ছিল । এমন সময় নীলাম্বর বলল, 'মেয়েরা মাছ ধুতে পুকুরে নামলিই দু'টো এসে জ্বালাত রোজ। একটাকে কোচে গেঁখি ফেলিছি। –এইটে তাহলে গাছে উঠে

বসে ছেল।'

উঠোনের কোণে দাঁড়িয়ে মুখ ধুয়ে নিল ক্ষীরোদ। খুড়ো-ভাইপোর এখন যা অবস্থা তাতে গাছের দর নিয়ে একটু চাপ দিলেই নীলাম্বর আড়াইশো কী স’দুশোয় রফা করে নিত। যোগাড়যন্তর করে ডেকে আনা পাঁচ পাঁচটা লোক কুড়োলসুদ্ধ উঠোন ছেড়ে মাঠে নেমেছে। ক্যাচকোচ করতে করতে ধানবোঝাই একটা গো-গাড়ি এসে হাজির হল । সামনের গোয়ালে বৌরা ধোঁয়া দিচ্ছে, মশার ঝাঁক সেখান থেকে বেরিয়ে উঠোনের মাথায় এক জায়গায় চাক বেঁধে উড়তে আরম্ভ করেছে । আজ আর গাছ কাটার কথা ভাবাই যায় না। ক্ষীরোদ ধুলো ঝেড়ে পাম্পসুতে পা গলালো। সন্ধ্যের বাতাসে গেয়োবনের নরম ডাল পালা মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে। ধান মাড়ানোর বলদটার পাক খাওয়া থামেনি — খুঁটি আলগা দেখে নীলাম্বর উঠে গিয়ে এঁটে দিল।

'এখন যাবেন কি ? আমরা পোড়ো গায়েনের বাড়ির লোক, জেনেগুনে আপনাকে ছাড়তি পারিনে–' বলতে বলতে নীলাম্বরের কাকা এগিয়ে এল। কালচে অন্ধকারে বুড়ো উঠোনে– ওপরের দাওয়ায় ক্ষীরোদ । খুড়ো প্রায় লুফে ধরে ফেলল তাকে। জামার নীচের ফতুয়ার ঘড়ি-পকেটে সাড়ে তিনশো টাকা গজ গজ করছে। খুড়োর মুখ দেখে ভাল বোধ হল না ক্ষীরোদের। এই গাছ, পোড়ো গায়েনের ফেলে যাওয়া বিদ্বোধণীর শুকনো বাদা, চাকা, খোলা গরুর গাড়ির ধড় ---এখান থেকে বৌবাজার-শেয়ালদায় কাঠগোলায় কোনদিন ফেরা যাবে না আর। খানিক আগে তবু কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর দূর রাস্তায় বাসের হর্ন, ঘড় ঘড় আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল । এইমাত্র পোড়ো গায়েন এক চড়ে সব শব্দ বদ্ধ করে দিয়েছে। বাদার মাথায় পোকায় কাটা আধখানা চাঁদ উঠতেই নীলাম্বর তার খুড়োকে বোঝানো ছেড়ে দিল । এতক্ষণ কত রকমে পথে আনার চেষ্টা চলছিল ক্ষীরোদের সামনে । তিনশো টাকার মধ্যে কী বাবদ কত যাবে তার ফিরিস্তিও দিচ্ছিল নীলাম্বর। খুড়ো উল্টো দাওয়ায় ভোম্ মেরে বসে। হ্যা না কিছুই বলে না। ধরা-জ্যোৎস্নায় ক্ষীরোদ শুধু পাঁচ হাত ছায়াটাকে উঠোনময় চক্কর খেতে দেখল। এতক্ষণে বাদার গর্ত থেকে লাল কাঁকড়ার কোটি ছানা বাইরের ঠাণ্ডায় উঠে এসেছে।

‘তবে খুড়ো খতেন দেখাও—কার কত অংশ বুঝে নেব।’

খুড়ো দাওয়া ছেড়ে রাগে রাগে উঁচু ঘরটায় ঢুকলো, ‘লম্ফ নে এসে দেখে যা—মালিক খতেনে আমার স’পাঁচ আনা অংশ–তোর বোন শৈলর ছেলেপেলেরা ভাগ বসালি ও গাছে তোর দু'আনাই নেই—'

গুলতিতে টান দিলেও এত জোরে গুরুল ছুটে যায় না। নীলাম্বর মাথায় ঠোক্কর খেতে খেতে অন্ধকার ঘরে ঢুকে গেল। তারপর খুড়োর কয়েকটা কথা বাইরের দাওয়া অব্দি পৌঁছে শুধু একটা লম্বা চীৎকার হয়ে গেল শেষে । তাও বেশিক্ষণ থাকল না। মেহগনির প্রথম পালিশেও গন্ধ উঠেই এমন উবে যায়। খুব ভারি নিঃশ্বাসে ঘরের অন্ধকার মাড়াই হচ্ছে প্রায় । থেকো পুরনো লোকাল ইঞ্জিনটা ভোরের ট্রেন টেনে বাসুলিডাঙ্গা এসে মাড়ি, দাঁত সব টলে ফেলে নীল ধোঁয়াটে নিঃশ্বাস ফেলছিল আজ সকালে।


পাম্পসু ক্ষীরোদের পায়েই ছিল। নদীর ফেলে যাওয়া মাটি শেষবারের মত জল চুয়ে নিয়ে পাথর হয়ে আছে। জুতো জোড়া বগলে রয়েছে অনেকক্ষণ। পায়ের নীচে কড়া ফেড়ে যাচ্ছে—তবু না দৌড়ে নিস্তার নেই । রশি দশেক দূরের বাবলার ঝাড়টা পেরোবার সময় এমন একটানা মাঠে এক-পোচড়া ভূষোকালি্র চেয়ে বেশি কিছু লাগল না তার। ওই জায়গাটায় সেটেলমেন্ট সাহেবের বোট বাঁধা থাকত। ফাঁকা দেখে চাঁদ অনেক উঁচুতে উঠে এসেছে। দৌড়োনোর ঝোঁকে একবার নীলাম্বরের গলা হাকড়ানি পেছু-ডাক ছুটে আসছে বুঝতে পেরেছিল। ল্যাজা দিয়ে পুরো একটা মানুষ সাইজে আনে কী করে। এখন দেখে শুনে পথ ঠিক করে নিতে হবে । ওই তো রূপশাল ধানের মাঠ। বোধহয় তাই। সবই একরকম লাগছে । উপরে তাকাতে ক্ষীরোদ চাঁদের কিছু উনিশ-বিশ বুঝতে পারল না । পোকা এবার ধানের দফা শেষ করেছে। বর্ষার মুখে মুখে আরও কম টাকা নিয়ে নীলাম্বরের উঠোনে এসে দাঁড়ালে ভাইপো সুদ্ধ বুড়ো খুড়ো আজ সন্ধ্যের পরেও টিকে থাকলে কাঁধে কুড়োল নেবে ঠিক। মগডালের রসালো কাঠে হলুদ রঙের পিংড়ি বানিয়ে ক্ষীরোদ তখন রথের মেলা ছয়লাপ করে

ছাড়বে।

হঠাৎ মাঠ নাবি নিতে থমকে দাঁড়াল । এ যে নেবেই যাচ্ছে। বাদা জুড়ে ঠাণ্ডা হাওয়া উঠল, বিদ্যেধরী শুকোতে শুকোতে করাতি মুছে গেছে। বর্ষার জল দাঁড়ালে বেরোতে চায় না। সেই বাদা ডিঙ্গিয়ে পোড়ো গায়েনকে নাকি ফিরতে দেখেছে নীলাম্বরের বড় ছেলে। যত্ত তেড়েল গেজেল !

উল্টে পড়ল ক্ষীরোদ । পা ঠিক জায়গায় রাখতে পারেনি। পাম্পসু কুড়িয়ে উঠতে গিয়ে বসে পড়ল। করাতি-বিদ্যেধরীর শুকনো জল হু হু করে ফিরে আসছে। রূপো রঙের। পড়ি মরি উঠতে গেল। হাটুর কল-কব্জায় জং ধরে আছে কতদিন। পাম্পসু পড়ে গেল হাত থেকে। হামা টানার কায়দায় বুক ভরে দম নিয়ে ছিটকে বেরোবার চেষ্টা করল ক্ষীরোদ। দৌড় ত দূরের কথা—দাঁড়ানোর মত এমন চেনা জিনিসটাই কিছুতে হল না । হচ্ছে না। হাঁটুই খোলে না । যখন এখানে এভাবে থাকতেই হবে — তখন আর পাম্পসু খুঁজে লাভ নেই বুঝে যেখানে ছিল ঠিক সেখানেই ক্ষীরোদ একটুও না নড়ে বসে গেল। কোথাও অন্ধকারের ছিটেফোঁটাও নেই । বাদা ভর্তি জ্যোৎস্না। ডোঙায় চড়ে পোড়ো গায়েন ইচ্ছে করলেই ফিরতে

পারে এখন ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ