নিবেদিতা আইচের গল্প : শূন্যপুরের দিকে বা মোহনায়


ফ্রকের কোঁচড়ে কিছু আছে ওর? খুব যত্ন করে আঁকড়ে ধরে বুঝে শুনে পা ফেলছে সে। এমন ভঙ্গি যেন জল টের না পায় তাকে কেউ আলগোছে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
আমি ওর নাম ধরে ডাক দিই। একবার, দুইবার, তিনবার।
হাঁটুজল চারদিকে।

হঠাৎ কী হলো জানিনা। সে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে এগোতে লাগল এবার। ছল ছল। ছলাৎ ছলাৎ। ওর হাত দুটো এখনো কোচড় সামলাচ্ছে। কোঁচড়ের ভেতর থেকে ছোটো ছোটো আঙুলের নড়াচড়া বোঝা যাচ্ছে এখন।

আমি ওকে ছুঁতে চাই। আর সে প্রায় দ্বিগুণ গতিতে এগিয়ে যায়৷ একটু অন্যমনস্ক হতে না হতেই দেখি আমার হাত ধরে সে ডাকছে। আমার ভয় পাওয়া চোখ মুখ দেখে ঝিরি গা দুলিয়ে হাসে আর বলে- কী রে, ভাত খাবি না? মা ডাকছে।

আমি রীতিমতো সংগ্রাম করি জলের মধ্যে হেঁটে চলা মেয়েটার কাছে যেতে। কিন্তু না কিছুতেই আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুলো, না ওর নাগাল পেলাম।

ঝিরি হাত ধরে ডাকছে। চল, ভাত খাবি চল। বেড়ালটা মুখ দিল, এক্ষুনি চল।

আমি ওর হাত ধরে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করি।

আর আমাদের পিছু নেয় দৈত্য মতো এক ঢেউ।

তারপর আর কী হল আমার আর মনে নেই। চোখ মেলে টের পাই অ্যালার্মটা বেজে বেজে থেমে গেছে অনেকক্ষণ হল। আরো কিছুটা সময় গড়াগড়ি দিয়ে একসময় বিছানা ছাড়লাম।

দুদিন হল অনেকটা বন্দি দশায় আছি। জলাবদ্ধ শহর৷ মাঝে মাঝে পাওয়ার সাপ্লাই থাকছে না। এতে অবশ্য খুব বেশি বেকায়দা হয়নি আমার। অন্তত পাঁচ ছদিন চলার জন্য অল্প স্বল্প রসদ ঘরে আছে। এক হাড়ি খিচুড়ি ফ্রিজে তোলা আছে৷ তাই আজ আমার রান্নার ঝক্কিও নেই। সাপ্তাহিক বন্ধের সাথে একদিন বাড়তি ছুটি এই বাজে আবহাওয়ায় বাঁচিয়ে দিয়েছে আমাকে। সারাদিন নিজের মতো থাকা যাবে ভেবে বড় আরাম লাগে আমার।

উপকূলে এখনো দশ নম্বর বিপদ সংকেত। ঝিরি একটা ছোট্ট ভিডিও দিয়েছে। খোঁপা ভেঙ্গে চুল পিঠময় ছড়িয়ে পড়ার স্লো-মো তে 'আভি না যাও ছোড় কার’ বাজছে। তুমুল হাওয়ায় ওর মুখ ঢেকে গেছে চুলের রাজ্যে। তবু ওর কাজল লেপ্টে থাকা চোখমুখ আমি স্পষ্ট দেখতে পাই।

ঝিরি বাড়ি যেতে তাড়া দেয়। শুধু সে নয়, বাগান, পুকুরপাড়, উঠান ঘিরে অপেক্ষায় থাকা দুপুরমণি, অরবড়ই আর সীতা রঞ্জনেরা শুনেছি আমার দেরি দেখে মুখ ভার করে আছে।

আমি ছোট্ট করে বলি- যাব।

আর ওকে শরীরের যত্ন নেবার গুরুত্ব বলি। পিচ্ছিল উঠান আর থৈথৈ পুকুরসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করি।

সে বলে- জানি জানি।

আমি সময়ের হিসেব করি।

ঝিরি হেসে জানায়- সাত মাস।

আরো বলে এবার যেন ভেবে ভেবে ডায়েরিতে সুন্দর কিছু নাম লিখে রাখি। অনাগত শিশুটির জন্য এ লিস্ট যেন এবার অবশ্যই সঙ্গে করে নিয়ে যাই।

আমি হ্যাঁ সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়াই!
ঝিরি জানেনা কোথাও যাবার ভাবনাটাই আমার গায়ে কেমন কাঁটা ধরায় আজকাল। শুরুর দিকে, সজল চলে যাবার পর আমার মনে হতো হয়ত একা থাকার ভয়ে আমি আধমরা হয়ে যাব। কিন্তু সময় যেতে যেতে টের পেলাম আমি বোধ হয় একটা শেকড় ছড়িয়ে বসা গাছ হয়ে গেছি। জলজ বাদাবনের এক গাছ। শুধু ওপরে ভাসমান শ্বাসমূল নিয়ে নোনা জীবনটাকে নিয়ে স্থির হয়ে থাকাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য।

তবে গতকালকের ফোনালাপের কথা মনে পড়তেই আমার মনে হচ্ছে সত্যিই কোথাও চলে যাই। আর দরজায় এসে ফিরে যাক সে। আমি জানি যে আসবে সে সেই পুরনো ঘ্যানঘ্যানে আবদার নিয়েই হাজির হবে এ বাসায়। তাকে আসতে বলার অনুমতি দিয়ে নিজের বোকামিতে নিজের প্রতি এখন আমার বীতশ্রদ্ধ লাগছে।

সত্যি বলতে অনেকদিন সজলের বাড়ির কারুর কোনো রকম সাড়াশব্দ না পেয়ে খানিকটা স্বস্তিবোধ করেছি আমি। তারপর বিপদ-আপদের কথা ভেবে কদিন একটু দুশ্চিন্তা হয়েছে। তারপর সব ভুলে নিজের কাজ নিয়ে, হাজারটা চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় ও বাড়ির কথা আমি ভুলেই গিয়েছি।

মাসুদ এলো সকালবেলাতেই। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গত কয়েকমাসের খবরাখবর দিতে শুরু করল সে। আমি চেষ্টা করছি চোখেমুখে মনোযোগ ফুটিয়ে রাখার। ওর মায়ের অসুখটা বেড়েছে। রক্তে বাড়াবাড়ি রকমের চিনি। পায়ে পানি এসেছে আবার। চোখের অপারেশন আটকে আছে। এসবের সঙ্গে বাড়তি বিপদ মৃত ভাইয়ের ধার দেনা শোধ করার চিন্তা। লোন দু’তিন লাখ টাকার কম নয়। বাড়ির পেছনের দিকে নতুন রাস্তা হয়েছে। এবার চাইলে জমিটা বিক্রি করা যেতে পারে। লোন শোধ করেও অর্ধেকের বেশি টাকা হাতে থাকবে।দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটছে তার।

শব্দ করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে অনর্গল সত্য বা মিথ্যা বলে যায় মাসুদ। আমি টের পাই আমার ভেতরে দমবন্ধ ভাবটা ফিরে আসছে। ওর হাতে বাদামি বেল্টের ঘড়ি। পায়ের নখে কাদা। আমি ওকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। গলির মুখে প্রায় হাঁটু অব্দি পানি এখনো, সেই পানিতে প্যান্টের পা গুটিয়ে হেঁটে হেঁটে এসেছে এসব আমাকে শোনাবে বলে।

নতুন সোফা, ভাবি?

কথা বলতে বলতে সে এদিক ওদিক, চার দেয়ালে চোখ বুলায়। এ বাসায় ওর বহুবার আসা হয়েছে। তবু প্রতিবারই ওর কৌতূহলের শেষ থাকে না।

সমুদ্রের ছবিটা দেখে হাসি হাসি মুখে তাকায় মাসুদ। সজলও এমন চোখ ছোটো করে হাসতো।

চেহারায় বেশ খানিকটা মিল ওদের কিন্তু স্বভাবে দু'ভাই একেবারে দুই মেরুর মানুষ। সজলের সঙ্গে আমার পরিচয় আর বছর চারেকের সংসার চলা কালে এটুকু বুঝেছি মানুষটি নিঃসন্দেহে এমন ঘোরপ্যাঁচের ছিল না।

আমি কেজো গলায় বলি- এবার তুমি এসো। আমার বেরুতে হবে, মাসুদ।

সে অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। একটু ইতস্তত করে প্লেট থেকে দুটো বিস্কুট নেয়।

হয়ত ওকে দুপুরে খেয়ে যেতে বলতে পারতাম। একটা ডিম ভাজা হলেই তৃপ্তি করে খেয়ে নিত। সজল বলতো- ডিমভাজা আর খিচুড়ি ও বাড়িতে ছুটির দিনের প্রিয় মেন্যু ছিল।

সজল আরো বলতো- কিছু মানুষের স্বভাব জোঁকের মতোন। সুযোগ পেলে আর ছাড়তে চায় না। আমার মনে হয় মানুষ মাত্রই জোঁক, শুধু জেঁকে ধরার জন্য নির্দিষ্ট কারুর দরকার হয় তার।

আমার সমস্যাটা অদ্ভুত। কেউ জেঁকে ধরা তো দূর এ ঘরে দ্বিতীয় কারো সঙ্গ আমার এখন একেবারে সহ্য হয় না। সজল চলে যাবার পর থেকে একা থাকার অভ্যাসটা এত প্রিয় হয়ে উঠেছে, কারো আসবার খবরেও আমার আজকাল বুক ধুকপুক শুরু হয়ে যায়।

মাসুদের পিছু পিছু গিয়ে দরজায় দাঁড়াই আমি, খিল তুলে দেবার অপেক্ষায় থাকি।

বৃষ্টিটা হাওয়ায় উড়ছে। সে ছাতা আনেনি। হাতের হলুদ ফাইলটা হয়ত মাথা বাঁচাবে ওর। মাথা বাঁচুক না বাঁচুক, প্যান্টটা আবার আগের মতো গুটিয়ে নিচ্ছে সে।

-ভাবি, একবার বাড়ি এসো। যত যাই বলো আম্মা কিন্তু তোমাকে মনে মনে পছন্দই করে। সেদিনও বললো মেয়েটাকে কতদিন দেখি না! আম্মা খুশি হবে তোমাকে দেখে।

মাসুদের মুখটা এবার সত্যিই রোগা দেখায়। ট্রাভেল এজেন্সির চাকরিটা আছে ওর? নাকি নতুন কিছু করছে? জিজ্ঞেস করব ভেবেও করলাম না। বছর ঘুরতেই কাজ বদলাবার স্বভাব দেখেছি ওর।

-জানো, আম্মা তো চায় তুমি আবার বিয়ে বসো…

ও হাসছে। ওর চোখ দুটো ছোটো হয়ে গেছে।

গল্প থামার লক্ষণ না দেখতে পেয়ে হাতের ইশারায় ওকে থামতে বলি।

দাঁতে দাঁত চেপে বলি -মাসুদ, জমিটা এবার বেচে দাও। আমার আপত্তি নেই। লোন শোধের পর যা থাকে রেখে দিয়ো তুমি।

কয়েক সেকেন্ড সময় নেয় সে। তারপর অনেকটা স্বগতোক্তির স্বরে বলে-আম্মা ঠিকই বলে...তুমি মানুষটা অন্যরকম।

শোনো, শোনো…মাঝপথে বলি আমি -জমি বিক্রির আগে আমারও একটা শর্ত আছে!

মাসুদের কথা শেষ হয় না। ভ্রুজোড়া কুঁচকে যায়৷ হাসিটাও কিছুটা মলিন দেখায়। মাথার ভেতর দ্বিধা দ্বন্দ্বের ঝড়। ওর ইতস্তত ভঙ্গি দেখে আমি ভেতরে ভেতরে বেশ খানিকটা আনন্দ বোধ করি। বুঝতে পারি মানুষকে বিব্রত করা অনেক বড় শোধবোধের এক সহজতম উপায়।

এই আনন্দের রেশ কেটে যায় দ্রুত। ঘেমো দিন শেষ হয় আর সন্ধ্যাটা কেমন ঝুপ করে নামে। শুধু হাঁটুর ভাঁজে গুঁজে রাখা যে অবসন্ন একজোড়া জলরাশি, মনে হয় তার গতিপথের কোনো শেষ নেই। বাসি জ্বরের মতো বিশ্রী একটা অনুভূতি নিয়ে ঘুরে বেড়াই আমি। গায়ে কাঁথা জড়াই, পরের সেকেন্ডেই ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে দিই। যদিও বাইরে এখন বল্গাহীন ঘোড়ার মতো হাওয়ার ওড়াউড়ি। এই চলিষ্ণু দৃশ্য দেখতে দেখতে শরীর জুড়িয়ে আসে। চোখ ভেঙে ঘুম নামে। যেন গতজন্মের ক্লান্তির রেশ নিয়ে এখনো হেঁটে চলেছি আমি। কোথায় চলেছি জানা নেই। হয়ত শূন্যপুরের দিকে বা মোহনায়। যেতে যেতে ঘুমে চায় চোখ জড়াতে, গতজন্মের অপরিশোধিত ঘুম।

ঘুম জড়ানো চোখে দেখি ঘড়ির কাঁটা জেগে আছে। আমার হাতে কিছুটা বেঢপ দেখায় ঘড়িটা। প্রথমবার বেতন পেয়ে সজলকে উপহার দিয়েছিলাম।পরিচয়ের শুরুর দিকের কথা, তখনো আমরা হাত ধরিনি পরষ্পরের। ঘড়ি হারিয়ে ফেলে বেচারা ভীষণ অপরাধবোধে ভুগেছিল। আর আমি ওকে বলেছি- তোমার সময় অসময়ের বিচার থাকবে না,দেখে নিয়ো। আজকাল মনে হয় তখন যদি জানতাম আমার বলা কথাটা এমন সত্যিই হয়ে যাবে!

ঘুমের ভেতরে ছটফট করি। বুঝতে পারি স্বপ্নটা ফিরে আসছে। আমি এবার ঝিরির মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাই।আমি বুঝতে পারি ঝিরি আবার আমার নাগাল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ওর মাথার চুল হাঁটু ছাড়িয়ে আলপথে মিশে যাচ্ছে। আমি ওর পিছু পিছু ছুটছি। ওর ফ্রকের কোঁচড়ে যে সদ্যোজাত শিশু, তার অপার্থিব হাসির শব্দে সজল ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠেছে। গাঢ় স্বরে সে আমাকে প্রশ্ন করে- ওর দোলনাটা কোথায়? বাবুর দোলনাটা কোথায়?

আমি দেখি সেই ঢেউটা আবার ছুটে আসছে আমাদের দিকে। আমি কারো হাত ধরতে চাইছি। কিন্তু সজলের মুখ, ঝিরির চুলের রাশি, শিশুটির হাসির শব্দ সব ঢেকে যাচ্ছে সেই ঢেউয়ের তোড়ে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ