তাস ভালো লাগে না ব'লেই যে সে খেলে না, এমন নয়। যে-কাজই করুক না কেন, সেই কাজের মধ্যে সে তার মৃত্যুকে আহ্বান জানায়। মৃত্যুকে সে হরতন, চিড়িতন, ইস্কাপন অথবা রুইতনের সাহেবের টুপিতে লুকিয়ে থাকতে দিতে চায় না। রিয়াজুল বিছানার দিকে তাকায়। ঘুমোবার কথা ধারণাতেও আসে না। অথচ, বিছানাটিকে দেখে। যদি শোয়, তাহলে তার মৃত্যুও শোবে। বিছানায় তার স্ত্রী। জীবিত; কিন্তু, মৃত্যুর শূনানীল আলো তার স্ত্রীর সারা শরীরে। ফলে, আকাশের সীমাহীনতাকে সে বিছানায় প্রত্যক্ষ করে। আমি যদি ঘুমোই, তবে আকাশের উড্ডীন পাখিদের চঞ্চলতা থেকে যাবে আমার ঘুমের পালক সাদায়৷ তারা কোথাও যেতে চাইছে না, চাইছে মৃত্যুর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে। চাইছে ঘন ও ঘিঞ্জি বাজারের মধ্যে নিঃশঙ্কচিত্তে ঢুকে যেতে।
রবিবার দোকান বন্ধের পর সোমবার আবার খুলতে হয়। বোলপুর থেকে পপুলার, অনিমা, চপলা আসে। আমেদপুর থেকে একা জয়দুর্গা আর শেষদুপুরে সিউড়ী থেকে আসে গৌরী। গৌরী দেয় বেঙ্গল হেলথ, কিছুটা গ্ল্যাক্সো আর বায়ার আর সামান্য ইউনিক। বায়োলজিক্যাল ইভান্স-ও দেয় কিছু কিছু। আশ্চর্য লাগে পপুলারকে দেখলে। কখনো ঠিকমতো সাপ্লাই দিতে পারে না। ক্লোরোমাইসেটিন ক্যাপসুল আড়াইশো আছে তো পাঁচশো নেই। আর সিরাপ—সে তো ফার্স্ট বয়। সারা ক্লাসে মাত্র একটিই। তাকে নিভৃতে পাবে শুধু তার প্রাইভেট টিউটর! এদিকে সালফা বোলাস, তুমি কি ইন্দিরা গান্ধির মতো প্রিয়াঙ্কা-রাহুলের ডিনার টেবিলেই চিরকাল স্মিত হাসবে? ভালো লাগে না। বিরক্তিকর। যা নেই, তা দিয়ে ব্যবসা করি কী করে? আমি কি রাজনীতিবিদ! খুচরো-খাচরা টাকাগুলি গুণতে গুণতে রিয়াজুল বক্বক্ করে।
সোমবার পেমেন্টের ধাক্কাটা সামলানো বেশ কঠিন। সন্ধ্যায় ক্যাশে বিশেষ কিছু থাকেও না। দু-চারটি দু-টাকার লালচে চড়ুই, পাঁচ টাকার টিয়া কয়েকটি, দশটাকার ঘুঘু একটি কি দুটি। ব্যস্। সন্ধ্যার একটু আগেই আকাশ ভেঙে পড়ে। আর, আকাশ ভেঙে পড়লেই রিয়াজুলের শুধু স্ত্রীর কথাই মনে পড়ে। কেননা ভাঙা আকাশ থেকে দোমড়ানো মোচড়ানো সূর্যকে দ্রুত গতিতে নেমে যেতে দেখা যায়৷ যদি-ও চাঁদ অথবা তারাগুলিকে খালি চোখে দেখা যায় না, তবু তাদের ঝরে-পড়ার আতঙ্কে আকাশের টুকরোগুলি ঝলসে ওঠে।
নিমাইদা পাশের মুদির দোকানে এসময় ক্যাশ মিলিয়ে নেয়। বেশ কিছু একশো টাকার চওড়া চওড়া নোট, বাবার কাঁধের মতো, নিমাইদা থুতু দিয়ে গোণে। আবার, বাক্সের খোপের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। নিমাইদার মুদির দোকান, সুদের কারবার আর পাড়ার মাতব্বর হিসেবে নিমাইদার খাতির খুব। কেননা, সত্যি-সত্যিই নিমাইদার একটি ভুঁড়ি হাত-কাটা গেঞ্জির তলায় ঘামে জ্যাবজ্যাব করে৷ হৃদয়, অনেক বড়ো বড়ো ভুঁড়ি দেখেছ তুমি। কিন্তু, নিমাইদার মতো এতো খোলাখুলিভাবে আর কোনো ভুড়ি রিয়াজুল দেখেনি। কেননা নিমাইদার পাশেই তার ছোট্ট একটি ছা পুষতে না পারার মতো ওষুধের দোকান। সারাদিনের খদ্দের আনাগোনায় পার্থক্যটা তো ধরা পড়েই। কিন্তু, সন্ধ্যের পর এই যে ক্যাশ গোণা—এতেই ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে যায়। নিজের সামান্য কয়েকটি টাকা গোণার সময় নিমাইদার রাশিকৃত টাকার ছবিটা দেখতে দেখতে শ্রদ্ধায় রিয়াজুলের মাথাটা নুয়ে পড়ে। নিমাইদা বিরাট। নিমাইদা অসামান্য। নিমাইদাই এ-তল্লাটের আসল ব্যাবসাদার। এইসব বিশ্বাস করতে করতে রিয়াজুল একসময় দোকান বন্ধ করে।
বাঁশ গাছের ডগা নুয়ে পড়েছে। পাতাগুলি সরসর করছে। সরু রাস্তা টর্চের আলোয় কেটে কেটে বেরিয়ে আসছে। আর চতুর্দিকের ভাঙ্গ। আকাশের ফাঁক-ফোকর দিয়ে রিয়াজুল একটা ভৌতিক সাইকেলে চড়ে বাড়ি ফিরছে রাত আটটা কি সাড়ে আটটার দিকে বামপন্থী ধুসরতায়।
মঙ্গলবারের কথা বলা যায় না। কেননা, মঙ্গলবারই হচ্ছে হাটবার। কাঁধে বাঁক নিয়ে গুচ্ছের পুঁইশাক পেরিয়ে যায়। কচু আর বেগুন-আলুর দম-ফাটা গড়াগড়ি৷ কেউ হয়তো একটি দুর্লভ লাউ কাঁধে নিয়ে হাটে চলেছে। কারো কাঁধে এক কাঁদি কাঁচকলা। হাতে একটি-কি-দুটি মোচা ঝুলছে সামান্য পয়সার প্রত্যাশায়। সবাই চলেছে ওপাড়ার মহাপ্রভুতলার হাটের দিকে।
দোকান থেকেই এসব দেখা যায়। আশ-পাশের গাঁগুলিতে কী কী ফসল হয়েছে, তাও বোঝা যায় এই দোকানে বসেই। সারাদিনের হাট! সপ্তাহে মাত্র দু-দিন। মঙ্গল আর শনি। তবে হাটের কথা রিয়াজুল ভালো জানে না। জানে ছোটো কুষ্টিকুরির আহম্মদ চাষি। প্রত্যেক হাটেই সে কিছু-না-কিছু নিয়ে আসবে। তাই রিয়াজুল এখন কাতরকণ্ঠে বলতে চায়, ‘বলো ভাই আহম্মদ, হাটের সরল ভিড়ের কথা তুমি আমাদের শোনাও। দরদামের খুচরো মন কষাকষির ঝনাৎকার তুমি শুনিয়ে দাও তোমার নাইট স্কুলের লন্ঠন-কাঁপা স্বাক্ষরতায়। নাহলে আমি তো তোমার কাঁচা লঙ্কার চার আনার ছোটো ছোটো সবুজ ভাগগুলিতে খয়েরি সংস্কৃতঘেষা ভুল ইংরেজি ধুলো ছড়াতে থাকব। আর, বন্ধুদের দেখাবে তোমার ওই ধূলিমলিন কাঁচা লঙ্কাগুলিকে, যা একদিন ছিল সত্যিই সবুজ আর ঝালে-ভরা আর একটু বাঁকাও ছিল তারা বাংলার সরল গ্রামগুলির মতো।
আর, একান্তই যদি তুমি না বলতে পার, তাহলে যে-হাতদুটি ধুলো ছড়াবার জন্যে নিশপিশ করছে, বেঁকে যাচ্ছে শুকনো আঙুলগুলো, সেই হাত নিয়ে আমি কী করব তুমি বলে দাও।’
লট্ লট্ সৰ্বাসিড, ভিটাজাইম আসে মঙ্গলবার। হেমফার আর এ্যালপ্রোভিটা আসে কিছু কিছু। আর সর্বাসিড এলেই প্রণববাবুর কথা মনে পড়ে রিয়াজুলের। ভদ্রলোক ভারি ভালো। কলকাতায় তাঁর দাদা থাকেন। তিনি কবি। এবং তিনিই একমাত্র সাহিত্যের পাড়ার দিকের জানালা! প্রণববাবু এসে চা খান। চা খেয়ে সিগ্রেট টানতে টানতে বলেন, ‘জানেন তো, দাদা আমেরিকা গেছেন? ওঃ, এবার দেশে যা কবিতা লিখেছেন না! একেবারে পাতা-জোড়া লেখা৷ মশাই, উনি কি আর আমার-আপনার মতো হেলাফেলা?’ বা, কোনোবার কাউন্টারে দু-একটি ফিজিসিয়ান স্যামপেল রেখে দিয়ে বলেন, ‘এই যে রিয়াজুলবাবু, দাদা এসেছেন। ওঃ, গিয়ে যা বিদেশি মাল খেলাম না! মশাই, ও দেশটাই আলাদা৷’ রিয়াজুল যখন শোনে, তখন প্রণববাবুর দিকে তাকানো যায় না। পোড়-খাওয়া বাবার চোখ নিয়ে তাঁকে সাবধানে দেখতে হয়। শিশুর সরল কাশবনে চাঁদ ওঠে। পাখি গান গায়। আর বুনো হাঁসেরা বালির চরে শুধু ডিম পাড়ে সারারাত, শারদ পূর্ণিমায়।
বুধে বাণিজ্য। এদিন পাশের মেডিসিন হাউস বন্ধ থাকে। নতুন বিয়ে হয়েছে প্রবীরের। হয়তো সিনেমা-ফিনেমা যায়৷ ফলে, বুধবারে একেকদিন কেলেঙ্কারি ভিড় হয়। ডানদিকে, একটু এগোলেই পশু হাসপাতাল। সেখান থেকে গোরু-ছাগলের প্রেসক্রিপসন আসে। আর বাঁ-দিক থেকে আসে মানব কুলরক্ষণকারী প্রেসক্রিপসন। এ-চায় লিব্রাক্স তো ও চায় স্টেকলিন বোলাস। পুরুবাবুর গোরুর শিং ভেঙেছে, শিশিরবাবুর মায়ের আন্ত্রিক, হাশিমবাবুর প্রেসার উন্নতিমূখর তো ভরতের পেটের ব্যথা রামনাম ভুলিয়ে দিচ্ছে। রিয়াজুলকে খুব সাবধানে থাকতে হয়। বামপন্থী ওষুধগুলি আগে দিতে গেলেই গোরু ছাগলের মালিকরা বিরক্ত হয়। আবার, দক্ষিণপন্থী পেনডিসটিন-এস. এইচ দিতে যাচ্ছে যখন, তখন বামপন্থী প্রেসক্রিপসনগুলি সিউড়ির দিকে উড়ে যেতে চায়। ফলে, রিয়াজুলকে দক্ষ ও নিপুণ হাতে কাজ সারতে হয়। মাথা ঠান্ডা রেখে। সর্বজীবে দয়া রাখতে হয়। না-হলে পয়সা হয় না। যেকোনো খদ্দের দেখলেই রিয়াজুল মনে মনে হেদিয়ে ওঠে: ওগো, তোমারই ভাষার নীচে নীচে বসে আছি। বসে বসে দেখছি, চারদিকে শুধুই পয়সা।
যেখানটায় রিয়াজুল বসে, তার সামনে কাউন্টার। কাউন্টারের ওধারে খদ্দেরদের পৃথিবী। এপারে সে। তার পেছনের আলমারিগুলিতে তাকে তাকে নানান ওষুধ। ওষুধগুলিকে সে আড়াল করে বসে। এই আড়াল আমি তুলে নেব, যদি পয়সা পাই— মোটামুটি এই ছক করেই দোকানটি সাজানো।
বুধবারে বোলপুর থেকে ইস্ট অ্যান্ড আসে। কী আনে না সে! দেশের বিখ্যাত বারো-তেরোটি কোম্পানির যাবতীয় ওষুধ তার গুদামে। যা চাইবে, হাজির। আর আসে সিউড়ির বি.বি.এস.। মানে বি.বি.এসের অরুণ। দুঃখী দুঃখী মুখ। ই.পি. ফোর্ট। তিনটি ট্যাবলেট। আসল কাজটি অনেক সময় করে দেয়। কত অসতর্ক স্বামীর করুণ গলা রিয়াজুল কাউন্টারের এপারে বসে শুনেছে। কত নববিবাহিতা বধূর হাতের পেশীতে ফুঁড়েছে মেন্স্ট্রোজেন ফোর্ট। চব্বিশ ঘণ্টা অন্তর দুটি দিলে কাম ফতে। এত তেলতেলে যে বাইশ নম্বর নিডল-ছাড়া যেতেই চায় না। তবু, তারা যায়। তারপর লাথি মেরে মেরে দরজার খিল ভেঙে সদলবলে বেরিয়ে পড়ে অপরিণত পৃথিবীর কাঁচা অন্ধকারে।
গোঁসাইদাকে দেখা যায়, এরকম ইনজেকশন দেবার ঠিক আগের মুহূর্তে সিরিঞ্জটাকে কপালে ঠেকিয়ে নিতে। মা, তুমি অভাগাকে ক্ষমা করে দিয়ো। মা, তুমি এই পাতককে রক্ষা কোরো। আমার সামনে যে মহা-পাতকিনী বসে আছে, মা, তুমি বালিকাজ্ঞানে একে ছেড়ে দিয়ো না। বরং, একে তুমি তোমার ভূমণ্ডলের স্ফীতকায়া নদীগুলি দেখাও। দেখাও যে, অদূরেই ভীষণদর্শন সমুদ্র মুখ-ব্যাদান করে আছে। মা, তুমি পর্বত-চূড়ার শুভ্রতা একে দান করো। তোমার মেঘমণ্ডলের ঈষৎ অবকাশে যে-ক্ষীণ চন্দ্রকিরণ ক্ষ্যাপা নীরদবরণের ধুলিধূসরিত গালে এসে পড়ে, তার মর্মকথা তুমি একে নিভৃতে শোনাবে— এই আশ্বাস অন্তত আজ দাও, মা।
বেস্পতিবারে অনেক ধার্মিক হিন্দু চট করে ওষুধ-ফষুধ খেতে চায় না। বিশেষ কাতে না-পড়লে। ফলে, বাজারও মন্দা যায় একটু। কেননা, সংখ্যায় হিন্দুরাই আজও যথেষ্ট বেশি। আবার পুরন্দরপুরের অনাথ কাকা সবসময় কীরকম গা বাঁচিয়ে চলেন। ওঃ, আর এ-দেশে টেঁকা যায় না। মুসলমান! বটেও তাই। মসজিদে মসজিদে মাইক। মাইকে দিনে পাঁচবার আযান। হঠাৎ করে এত আওয়াজ বেড়ে গেল কী করে? পাড়ায় পাড়ায় এত চব্বিশ প্রহর হরিনামের ফুল ফুটল কী করে? দোকানে বসে রিয়াজুল খদ্দেরের জন্যে অপেক্ষা করে আর আশ্চর্য হয়। স্যান্টিভেনির লাল টুপিটিকে দেখে। গায়ের জামা খুলে উলঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মাথায় লাল টুপি একটা চাপানো হয়েছে বটে। দাম অবশ্য সেই একই! ছাব্বিশ টাকা আটান্ন পয়সা প্রিন্ট।
যখন দোকানে আর কেউ থাকে না, রিয়াজুল একা থাকে, আর থাকে চারিদিকের নানান শেলফ, আর শেলফে ঠাসা থাকে নানান ওষুধের শিশি আর বোতল, তখন ওই চক্চকে লাল টুপির দিকে তাকিয়ে শেলফের অন্তর্লীন পিঁপড়েরা পেনসিল টর্চের সরু আলোর মতো ঘুরে ঘুরে গায় সেই নিভৃত গান:
স্যান্টিভেনি, ও স্যান্টিভেনি
সেই গভীর শিকড়ওলা ছুরির মতো
তুমি হবে কি সবার মনে সঞ্জীবনী?
স্যান্টিভেনি, ও স্যান্টিভেনি
তুমি আমার দেশের দিকে একটু তাকাও
সে রয়েছে গাঁথা ওই মোষের শিঙে
চলো, সবাই ধরি, তাকে মাটিতে নামাও
দেখ, রক্তে ভাসছে তার দোয়েল ফিঙে
এসো, গভীর শিকড়ওলা ছুরির মতো
তুমি হও হে সবার মনে সঞ্জীবনী
স্যান্টিভেনি, ও স্যান্টিভেনি...
ধ্যান্ডেরি। মুসলমানদের শালা পয়সা কম। দামি ওষুধ তারা কিনবে কী করে? কপাল ভালো যে, আজকাল আর হিন্দুরা তেমন বেস্পতিবারটা পালন করে না। এদিকে মুসলমানরা উলটোপালটা খায় বেশি। গোরু বেশি খায় বলে কৃমিটাও বেশি হয় তাদের। আবার হিন্দুরা কম খায় বলে তারাও অ্যাসিডে ভোগে খুব। অথচ, পেটের অসুখের ওষুধের আজকাল এত দাম। একটা দেড়শো মিলিগ্রাম ব়্যানিটিডিন ট্যাবলেটের গড়পড়তা দামই তো আড়াই টাকা। তিনমাস খাও। ফলে হিন্দুরাই বা যায় কোথায়? এরকম টানাপোড়েনে গুরুবারটি কোনোক্রমে পার হব হব করে। কিন্তু, তার আগেই আনসারুল, আর অভয়দা চলে আসে। ফলে, কিছুটা স্থলপথে ও কিছুটা জলেপথে শেষবেলাটা টেনেটুনে অতিক্রান্ত হয়। অভয়দা কারমিনেটিভের ঢেউয়ে দুলতে দুলতে বিড়বিড় করে, ‘তারাত্তারা, শক্তি দে মা।
শুক্রবারের কথা না-বলাই ভালো। সকাল থেকেই মুসলমানরা চট করে বেরোতে চায় না। একেবারে জুম্মার নামাজ পড়ে খেয়ে-দেয়ে সেই বিকেলের দিকে যা-হাবার হবে। তাহলে এবার সকাল থেকে রিয়াজুলদের বসে থাকতে হয়। আর, একা হিন্দুর ভরসায় ব্যাবসাও চলে না। মহামুশকিল। এদিকে পার্টিও এদিন কম না। শুক্রবার আবার সিউড়ির অনিমা আসে। গীতা তো কাল এসেছিল। জগদীশ দু-একবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু, রিয়াজুলরা আর বিপদ বাড়াতে চায়নি। এমনিতেই তো দুটো মুখার্জী— সিউড়ি আর সাঁইথিয়ার। আমেদপুর থেকে আসে সেন। সেন যদি আনে ভেনটোরলিন তো অনিমা আনে ব্রিকারেক্স। এছাড়া বোলপুরের ফেয়ারডিল তো আসেই। নায়কোচিত বাপী ঘোষাল।
এদিন সামনের মাটির ভাঁড়, খুরি, কলসি, হাঁড়ি আর শালপাতার দোকানটি বেশ মুখর থাকে। সাঁওতাল মেয়েরা শালপাতা নিয়ে আসে বেচতে। দোকানের ছোকরা মালিক নন্তু আজ খুব ব্যস্ত। বিকেলে যাবে ভাগলপুর। সঙ্গে দামি ব্রিফকেস। ভাগলপুর থেকে নিয়ে আসবে ব্রিফকেস-ঠাসা আস্লী গাঁজা। দু-শো টাকা কিলো। এখানে সাপ্লাই রেট পাবে পাক্কা ছ-শো। আঙুলের ডগায় দাদা, চার-শো টাকা ঝুলছে। বিশ্বাস না হয়, চলুন সঙ্গে। দেখিয়ে দেব শালা ফাঁকা মাঠে চাটাই পেতে ধানের গাদার মতো গাঁজা। কাঁটা খাটিয়ে ওজন হচ্ছে। পয়সা ফেলুন, মাল নিন। নস্তুর নাম তখন সাহেনশা। দোকানে নস্তু, খাতায় নীলকান্ত। ভাগলপুরে যাবার রাস্তায় কী— কেউ জানে না। সেই নন্তু এখন নিরীহ শালপাতা কিনতে ব্যস্ত।
নন্তুর পাশে ভূদেবের সেলুন। মালিক ভূদেব ভাণ্ডারী, সঙ্গী মুন্না। দেওঘরের ওদিকে বাড়ি। জন্ম এখানেই। ‘বম্বে হেয়ার কাটিং সেলুন’ বোর্ডটি নীচু খড়ের চালায় কিছুটা ঢেকে আছে। সবই পাওয়া যায়। ক্রিম, লোশন, ম্যাসাজ। এমনকী চুল-করারও সাজ সরঞ্জাম রেখেছে আমাদের ভূদের। তার গর্ব হচ্ছে হিন্দি ভাষা, যে-ভাষায় তার বাবা ও মাকে কখনো কথা বলতে হয়নি। কেননা, ওই দেওঘর অঞ্চলের স্থানীয় ভাষাই তাদের কাছে যথেষ্ট ছিল। মাঝে মাঝে ঠাকুরপুকুরে স্নান করার সময় রিয়াজুলের সঙ্গে ভূদেবের দেখা হয়।
পুকুরঘাটে আর যাদের সঙ্গে দেখা হয়, তাদের একজন নিখিল সেন। রোগা সিড়িঙ্গে যক্ষারোগগ্রস্ত এক প্রাইমারি টিচার। ওজন মাত্র ছাব্বিশ কিলো। স্ত্রী অন্তত বাহাত্তর কিলো ওজন নিয়ে ব্লকে কী-একটা কাজ করেন। বাড়িতে বেশ কয়েকটি মাইক সেট রয়েছে। বড়ো ছেলে কলেজ থেকে সদ্য বেরিয়ে সেগুলো ভাড়ায় বাজায়। ফাঁকে নিখিলবাবুও। ছোটো ছেলে বি.এ. পড়ছে। অর্থাৎ, তাঁর ভাষায়, বেকার। তাই তাকে একটা ছোটোখাটো গ্যারাজ করে দিয়েছেন নিখিলবাবু।
খড়ের মতো সরু হাতে লাইফবয় ঘষতে ঘষতে নিখিলবাবু বলেছিলেন, হাতে কোনো কাজ নেই। চুপচাপ বসে কি আর আমাদের মতো লোক খেতে পাই মশাই? আর, আজকালকার কলেজে পড়াটা কি আর কোনো কাজ হল বলুন? ও তো বসেই থাকা।’
আর উনি সকাল ছ-টায় স্কুলে বেরিয়ে যান৷ ফেরেন এগারোটার মধ্যে। ‘তারপর সারাটা দিন ঠায় বসে থাকা সম্ভব? তাই এই হোটেলটা খুলে ফেললাম। তাছাড়া, আপনার বউদি তো কাজে বেরোয় সেই সাড়ে দশটা-এগারোটায়। পালা করে ঠিক চালিয়ে নেব।’ এই ভাঁজ করে নিখিলবাবুরা এখন একটা ধাবার মালিক। বউদি সন্ধ্যেবেলায় পাঞ্জাবি ট্রাক-ড্রাইভারের গ্লাসে মাল ঢেলে দেন না সত্যি, তবে ঘুরে ঘুরে তদারকিটা করতেই হয়। এছাড়া বেশ কিছু সিলিং ও টেবিল ফ্যান রয়েছে ওঁদের, যেগুলো ঘোর গরমকালে ওঁরা ভাড়ায় খাটান। ‘এটা করতাম না। বড্ড পাজি ব্যাবসা, বুঝলেন রিয়াজুলবাবু। তব্যে, আমার একটা ঘর খালি পড়েছিল আর বন্ধু-বান্ধবরাও জবরদস্তি করছিল বলে নেমে পড়লাম। তা, আপনাদের পাঁচজনের আশীর্বাদে এখন আমার সাঁইত্রিশটা পাখা অন্যের বাড়িতে ঘুরছে।
এহেন নির্ঝঞ্ঝাট নিখিলবাবুর সঙ্গে রিয়াজুল স্নান করে। আর, এদেরই ফাঁকফোকর দিয়ে স্নান করে কেতো, জয়দেব, মুংলা, রঘু, দুধনাথদা ও আরও অনেক নাম-না-জানা ড্রাইভার, ক্লিনার, মুটে-মজুর। রেডিয়ো মেকানিক মাধবও আসে এই ঘাটে। ভিটা, হুইল, হামাম, লিরিল, সরষের তেল, রেক্সোনা। লাইফবয় এখানে স্বাস্থ্যও এখানে। পদ্মপাতায় ঢাকা শ্রীদেবীর গোপন চাবিটি রেখেছে কেউ।
তবে, পুকুরঘাট থেকেও নিমাইদার তিনতলার মাথাটা দেখা যায়। নতুন। ঝকঝক করছে। বাস্তবিক, ছোট্ট গঞ্জটির বেশির ভাগ জায়গা থেকেই বাড়িটি দেখতে পাওয়া যায়।
নিমাইদার বাড়িতে টেপরেকর্ডার কখনো আস্তে চলে না। নিমাইদার বাড়ির টিভির আওয়াজও নীচের রাস্তা থেকে প্রায় পরিস্কার শোনা যায়। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তায় ঝুঁকে উনি ডিমসেদ্ধ খান সকালে। বাঁ-হাতে কাচের বড়ো গ্লাস-ভরতি দুধ। উনিও স্নান করেন এই ঘাটে। কড়া করে সরষের তেল মেখে। বাঁ-হাতের থ্যালথেলে অনামিকায় একটি সোনার মোটা আংটি দেখিয়ে কয়েকদিন আগে বলেছিলেন, ‘বন্ধক নিতে হল রে। সেকমপুরের নিত্য-ছোঁড়া কিছুতেই ছাড়লে না।’
আজ শনিবার। সপ্তাহের শেষ হাট। আজ আবার একটা বামপন্থী জমায়েত আছে। প্রথমে মিছিল, তারপর জনসভা। এগুলো সাধারণত হাটবারেই হয়। বিশেষ করে শনিবারের হাটের দিন। কেননা, হাটবার বলে এমনিতেই প্রচুর লোক আশপাশের গাঁ-গ্রাম থেকে বাজারে আসে। তার ওপর শনিবারের অফিস বলে কথা, কখন বসে কখন ওঠে কেউ কি বলতে পারে! ফলে জমায়েতের একটা বাড়তি সুবিধা থাকেই।
মিছিলগুলি সবসময়ই পরিচালনা যাঁরা করেন, তাঁরা প্রাইমারি টিচার। আজ একটা বিশেষ দিন। জেলা থেকে নেতা আসছেন। মজুরিবৃদ্ধি আন্দোলন, ত্রিপুরার গণহত্যা, কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণের জন্যে উন্নয়ন আটকে যাচ্ছে— মোট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু একসঙ্গে আজকের জমায়েতের বিষয়। ফেস্টুন গত দু-দিন ধরে লেখা। ফ্ল্যাগ সেলাই হচ্ছে, আঁকাও চলছে দ্রুত হাতে। শিল্পী, নিমাইদা! একমেবাদ্বিতীয়ম্। হাতের লেখাটি ছেলেবেলা থেকেই সুন্দর। রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকীর বছরে হস্তলিপিটি ভালো প্রচার পায়। তার ফলশ্রুতি সাইনবোর্ডের দোকান। সেখান থেকে আস্তে আস্তে মুদির দোকান, মহাজনী কারবার খুলে ফেললেও ফাঁকতালে সাইনবোর্ড লেখাও চলছিল খারাপ নয়। দীর্ঘদিন সংস্কৃতি-চর্চার বোর্ড-ফেস্টুন তৈরির পর যুক্তফ্রন্টের সময় এল এস.ইউ.সি-র স্লোগান। উত্তাল লেখালেখির পর নকশাল আন্দোলনের গুপ্তলিপির বছরগুলিকে কোনোমতে অতিক্রম করে একেবারে নব-কংগ্রেসের চওড়া-চওড়া গাইবাছুর একসঙ্গে এঁকে ফেলেছিলেন। সেখান থেকে দু-এক লাইন জনতা লিখে আবার হাতের ছবি। এখন সেই একই হাতের সাহায্যে ভোট দিন বাঁচতে, তারা হাতুড়ি কাস্তে।
হাটবার বলে সব দোকানেই কম-বেশি ভিড় থাকে। ওষুধের দোকানেও থাকে একটু। কোনোমতে সামনের খদ্দেরগুলিকে বিদেয় করে রিয়াজুল দোকান বন্ধ করে যাচ্ছে জমায়েত কেমন হয়েছে দেখতে; জেলার নেতার চুম্বক বক্তব্য একটুখানি শুনতে। রাস্তায় নিমাইদার সঙ্গে দেখা। ছেলেকে দোকানে বসিয়ে রাস্তায় ঘুরছেন।
‘কী, নিমাইদা, আপনি এখনও যাননি?’
ধুতির ওপর হাফ-হাতা শার্ট। দুই পকেটে হাত-ভরার ফলে জামার সামনের দিকটায় টান পড়েছে। ফলে ভুঁড়িটি উঠে এসেছে জামার একেবারে সারফেসে। হাসতে হাসতে বললেন, ‘দোকান বন্ধ 'রে দিলি? ধ্যেৎ, হাটবারে খদ্দের ঘুরে যাবে রে।’
পাশে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘কে এসেছে বল্ তো?”
এই ধরনের কথা বলতে বলতে ওরা চলে এসেছে ব্লক ময়দানে। হাজার তিন-চার লোক ময়দানে গিজগিজ করছে। কয়েক-শো লাল পতাকা। তাতে দলের প্রতীক আঁকা। স্বপ্নসম্ভব এক মুক্তাঞ্চলের ছবি যেন। শুকনো, রুক্ষ, কালো কালো হাতে ধরে আছে তাদের সংগ্রামের হাতিয়ার। এগুলো কিছু কিছু এঁকেছে দলের একনিষ্ঠ কর্মীরা। গ্রামের ক্ষেত-মজুররা। কিছু এঁকেছে পাড়ার সৌখিন ছেলেরা। কিন্তু, বেশির ভাগই এঁকেছেন নিমাইদা নিজে। ভালো পয়সাও পেয়েছেন এর জন্যে।
রিয়াজুলের হাতে বেশি সময় ছিল না। কেননা আজ হাটবার। দোকান বন্ধ রাখা ঠিক নয়। সন্ধ্যেবেলা পার্টিকে পেমেন্ট দিতে হবে: মিটিং থেকে চলে আসার সময় রিয়াজুল দেখেছিল সেই দু-একটি পতাকা, যাতে কাস্তেটা ভালো আঁকা হয়নি। একটু বেঁকে গেছে, তোবড়ানো মতো হয়েছে। যা কোনোমতেই হুবহু ছবির মতো হতে চায়নি। বরং, তাতে কাস্তের আদিম রূপটিকেই ধরতে চাওয়া হয়েছে যেন-বা।
দু-একটি বিখ্যাত ডাক্তারের প্রেসক্রিপসনে যেরকম মৌলিকতা ফুটে ওঠে, তার দোকানের পেছনের বাঁশঝাড়ের যে-বুনো মৌলিকতা পুকুরের নিথর জলে ঝুঁকে পড়তে চায়, সেই রকম কিছু একটা ওই মোটা বেঢপগোছের কাস্তেগুলিতে রয়েছে দেখে রিয়াজুল আর জেলা থেকে আসা পেশাদার নেতার বক্তব্য শোনার জন্যে দাঁড়াতে চাইল না। দূর গ্রাম থেকে আসা সেইসব কালো কালো, রুক্ষ হাতের আঙুলগুলিকে সে চিন্তার স্পষ্টতায় নিয়ে আস্তে আস্তে দোকানের দিকে এগোতে থাকল।
আগামীকাল রবিবার। আগামীকাল রিয়াজুলের দোকান বন্ধের দিন।

1 মন্তব্যসমূহ
ভালো লাগল
উত্তরমুছুন