মাঝরাতের আকাশ রক্তিমাভ। ভূমি থেকে দাপিয়ে ওঠা আগুনশিষ মাথাটা হাওয়ায় সামান্য নুয়ে পরমুহূর্তেই চারপাশটায় লকলকে জিভ ছড়িয়ে দেয়। সমস্ত শক্তিতে পেটের ভেতর টেনে নেয় গরম গরম টিনের চাল, বাঁশের বেড়া, মাটির দেয়াল, খড়ের গাদা আর যা কিছু চেটে খাওয়ার যোগ্য। প্রবল তাপ প্রবাহে খোলা প্রান্তরের জমাট অন্ধকার গলে যায়। ধূমল রং বোঝা যায় না। আগুনের ঢেউ গ্রামান্তরে ধেয়ে গেলে শুধু থাকে কালো আর লালের বিস্তার।
বহুদূর বিস্তৃত ধানক্ষেত পেরিয়ে প্রশস্ত গোমতীর ওপার থেকেও এই ঝলক দেখা যায়। আশেপাশের ঘুমিয়ে পড়া জনপদ জেগে ওঠে। জ্বলন্ত বাড়িঘর ছেড়ে আরো দূরে দৃষ্টি এগিয়ে দিলে আগুনের আভায় ধানক্ষেত দৃশ্যমান। মানুষপরিকল্পিত এই আগুনের বিপরীতে ছায়া পড়ে। এক চলমান ছায়া কিছু দূর হেঁটে জোড়া তালগাছের নিচে থমকে দাঁড়ায়। বোঝা যায় ছায়াটি দীর্ঘকায় পুরুষের। পরনে পাঞ্জাবী। চোখে চশমা। গরম হাওয়া এসে ছায়াশরীরের চুল নাড়িয়ে দেয়। ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট হয়। ছায়ার ঠোঁট নড়ে। কিন্তু কিছু শোনা যায় না। ছায়ামানব আকাশে দেখে আগুনের শিষ। নিচে নরকের তাড়ন-তর্জন। দূর দিগন্তে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মানুষ ছুটছে। এই নরকের ব্যাপ্তি কতদূর কেউ জানে না।
হরিদাস চন্দ্রও বুঝতে পারে না প্রায় মধ্যরাতে পৃথিবীতে ক্যানো কালসূত্র নরক ভেঙে পড়ে আর গোবিন্দপুরের পঁচিশ ঘর মানুষ আচমকা নরকে নিক্ষিপ্ত হয়ে আগুনের ধাওয়ায় পুড়তে পুড়তে দৌড়ায়। দৌড়াতে দৌড়াতে ধানক্ষেতে নেমে যায়। হরিদাস চন্দ্র কলাগাছের পেছনে লুকায়। কলাপাতা বেয়ে যখন জোছনাভেজা শিশির গড়ায়, দুই হাঁটুর ওপর দুটো কনুই রেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। বসে বসে হাঁফায়। কেটে যাওয়া পায়ের তলা থেকে রক্ত গড়ায়। হরিদাস টের পায় না। ধোঁয়ার দমকে কাশি ছিটকে বেরিয়ে এলে মলিন ধূতির কাপড়ে মুখ চেপে ধরে। এক ফোঁটা শব্দও যেন ছিটকে বেরিয়ে না যায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে শিবানীর খোঁজ লাগায়। মেয়েটা তার পাশেই ছিলো। এই ঘোরঘুট্টি অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। চোখের দড়িবাঁধা চশমাটা না থাকায় অন্ধকারের মধ্যে হরিদাস প্রায় অন্ধ হয়েই আছে।
বারো মাস হাঁপানিতে ভুগে বয়সের আগেই বুড়োটে মেরে গেছে হরিদাস। শরীরের সাথে মাথাটাও বিকল হয়েছে। গুছিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে পারে না। এই তো প্রতিমা ভাসান দিলো। বছর বছর দুর্গা আসে আর গোমতীর জলে ভেসে যায়। প্রতিবছরই ভাঙাভাঙির খবর পায় হরিদাস। এবার ভাংচুরের মধ্যেই নমো নমো করে বছরকার পূজাপর্ব শেষ হলো। দশমীর আগেই বিসর্জন। সেই ছোটোকালে শিউলিফোটার দিন থেকেই মনে হতো- মা আসছে। তারপর পোদ্দার বাড়িতে চোখের সামনে একটু একটু করে মায়ের আদল ফুটে ওঠা। শরীরের কাঠামোয় রঙের পোঁচ পড়লেই হরিদাস আমোদে ভেসে যেতো। অসুরবিনাশী অপরূপ তেজস্বী দুর্গা ঠাকুরকে দেখে পরম ভক্তিতে নুয়ে পড়তো। দুই পাশে কার্তিক গনেশ লক্ষ্মী সরস্বতীকে নিয়ে বর্ণাঢ্য সাজসজ্জায় মমতাময়ীর দিকে তাকিয়ে আপনা থেকেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতো- যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা। ঢোলের বাজনা শুনে তখন শিরায় শিরায় আনন্দের টান। বোধন মানে শুনেছিলো জাগরণ। জাগরণ মানে অবশ্য হরিদাস জানে না। না জেনে বুঝেই হাওয়ায় ঢোল-খরতালের শব্দ আর ধূপের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। বোধনের পরই বিসর্জন। সূর্যাস্তের জলে প্রতিমার রঙ আর মাটি গলে গোমতীর জলে মিশে যায়। বাঁশ-কাঠ-খড়ের কাঠামোর সত্যতা জেনেও হরিদাসের মন খারাপ হতো। এবার বিসর্জনযাত্রায় ঢাকের বাদ্য ছিলো না। কাপড়ে মোড়া প্রতিমার সঙ্গে ট্রাকের ওপর দুজন পুলিশ কনস্টেবল দেখে বিষাদ নয় বরং দুশ্চিন্তাই বেশি হয়েছে হরিদাসের। অবিরাম বয়ে যাওয়া গোমতীর শুরু আর শেষ কই কে জানে! সেকালের মিঠাই-মণ্ডা-নাড়ুর মিঠে স্বাদ নিয়ে গোমতীর জল শেষতক কোনও এক মহাসাগরের জলে মিশে যায়। হরিদাসের অনুভবে শুধু ঢেউ উছলায়। সেই বেলার স্বাদ-গন্ধ ধুয়ে মুছে গেছে। ঢাকের চড়াচ্চড়... চড়াচ্... চড়... শব্দ আর রঙবাহার ফিকে হতে হতে অপসৃতই বলা যায়।
সন্ধ্যার আকাশে দুটো তারা ফুটেছে কি ফোটেনি এমন সময় বিড়ি টানতে টানতে এসব দুর্গতির কথা ভাবছিলো হরিদাস। ততক্ষণে ভিড় বাড়ছে সজলদের বাড়ির উঠানে। এসব খবর হরিদাস জানে না। জানার কথাও না।
মাটির উনুনের ধোঁয়ায় বসে বাপের জন্য আদা-চা বানায় শিবানী। ঠাণ্ডা লেগে হরিদাসের কাশের দমক বেড়েছে। আশ্বিনের শেষে হিমহিম সন্ধ্যা। তবু স্বেদবিন্দু ঝিকমিক করে শিবানীর কপালে। নাকের ডগায়। তাপস দা’র ছেলে সুখনের বুকেও ঠাণ্ডা বসে গেছে। গায়ে গায়ে জ্বর। পূজার চারদিন রোদ মাথায় নিয়ে ছেলেটা টো টো করে ঘুরে বেড়িয়েছে। সুখনের মা রত্না সারাদিন কাজের তালেই থাকে। ইদানিং ভরাশরীর নিয়ে ছেলের পিছু ছুটতে পারে না। তাপসের চেহারাটা জলের ওপর ছায়ার মতো শিবানীর চোখে ভাসে। সেই অবয়ব সরিয়ে দিতেই টিনের মগে চা ঢালে শিবানী। পাশে লাকড়িপোড়া কালিঝুলিমাখা পাতিলে ভাতের ফ্যান উথলায়। পাতিল নামিয়ে এক হাতে কুপি আরেক হাতে চায়ের মগ নিয়ে ঘরে ঢোকে শিবানী।
হরিদাসের বুকে কফ জমে গেছে। বাপের জন্য গরম সরিষার তেল-রসুন নিয়ে আসে শিবানী। বুকে মালিশ করে। তেমন উপশম হয় না যদিও। শিবানী নিজের ঘরে এসে চুলে সুরভিত জবাকুসুম তেল মাখে। চুল টেনে সামনে এনে বিনুনি গাঁথে। বুকের ওপর থেকে বেণি দুলিয়ে দেয় পিঠের ওপর। মুখে গলায় বগলে টেলকম পাউডার লাগায়। তাপস দা’র দোকান থেকে পাউডারটা কিনেছিলো গত মাসে। বেলি ফুলের মতো কী সুন্দর বাসনা! ওড়নার আলতো ঘষায় বাড়তি পাউডার গালে-গলায় মিশে যায়।
এক মুহূর্তের জন্য শিবানীর হাত থেমে যায় দূর থেকে ভেসে আসা শব্দে। কিসের শব্দ বোঝা যায় না যদিও। টিনের দেয়ালে ভেদ করে ওপাশের ছাড়া ছাড়া কথাবার্তা আর চিৎকারের শব্দ ঠিক মতো ঘরে ঢুকতে পারে না। শব্দ বাড়তেই থাকে। হৈ-হল্লা শুরু হয়ে গেলে তোষকের তলে রাখা কয়েকটা টাকা হাতে নেয় শিবানী। গুঁজে রাখে সেলোয়ারের খুঁটে আর এক প্যাকেট বিস্কুট বাঁধে ওড়নার প্রান্তে। বুকের ওপর দিয়ে ওড়না ঘুরিয়ে বাম কাঁধের ওপর ফেলে দেয়। শিবানী নড়ে উঠলেই বিস্কুটসহ ওড়না দোলে। পিঠের ওপর টোকা দেয় ফ্রুটি বিস্কুট। এক ফুঁয়ে কুপি নেভায় শিবানী।
বাপের হাত ধরে উঠানে পা ফেলতেই বাড়ির পেছন দিক থেকে নরকের এক খাবলা আগুন টিনের চালে উড়ে এসে পড়ে। চিৎকার কান্নাকাটি আর অসংলগ্ন ডাকাডাকির মধ্যে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকে বাপ-মেয়ে। অন্ধকারে বারবার হোঁচট খায়। আগুন দেখে আশেপাশের গ্রামের হাজার হাজার মানুষ গোবিন্দপুরে চলে আসে। কেউ কারো দিকে তাকায় না। তাকালেও অন্ধকারে কাউকে চেনা যায় না। ধাওয়া-পালটা ধাওয়ায় যে যেদিকে পারে ছোটে। দাঙ্গা পুলিশের শটগান ফাঁকা গুলি ছুঁড়লে কান চেপে দৌড়ায় শিবানী। ইট বিছানো রাস্তায় আছাড় খেয়ে গড়িয়ে পড়ে। প্যাকেটের ভেতর বিস্কুট গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়। ওড়না আটকে থাকে কাঁটাঝোপের ডালে। উঁচু রাস্তা থেকে অচেতন শরীর গড়াতে গড়াতে গোমতীর উত্তরপারে জংলায় পেঁচিয়ে যায়। ধানক্ষেতে পৌঁছানোর আগেই বাপের সাথে বিচ্ছিন্ন শিবানী।
তাপস কুমার সাহা সহসা ঘটনাটা বুঝতে পারে না। গোবিন্দপুর বাজারে তাপসের মনিহারী দোকান। অষ্টমীর দিন অঞ্জলি দিয়ে এসে দোকান খুলতে বেলা হয়ে যায়। জমজমাট বাজার কেমন থম ধরে আছে। তাপস যখন দোকানের শাটার তুলছে, আশেপাশের দোকানের শাটার নামছে। চাঞ্চল্য বলতে এটুকুই। শাটারের কর্কশ ধাতব শব্দে থমথমে চারপাশটা ভীতিকর হয়ে যায়। অথচ গতকালও তাপসের দোকান থেকে বাজারফেরত মানুষ আলতা, সিঁদুর, শাঁখা-নোয়া কিনে নিয়ে গেছে। বাড়িতে নাড়ু বানানো হবে তাই দু’টা নারকেল নিতে এসেছিলো দুলাল। বিকালে হঠাৎ শিবানীকে দোকানে দেখে তাপস অবাক হয়েছিলো।
শিবানী কাল এসেছিলো নকুলদানা আর বাতাসা নিতে। অষ্টমীতে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে অঞ্জলির সময় পড়ে যাওয়ায় সপ্তমীর বিকালেই শিবানীকে আসতে হয়েছে। অষ্টমীর সকালে নতুন শাড়ি পরবে শিবানী। উপোস করে দেবীর চরণে ফুল-বেলপাতার অঞ্জলি দেবে। মণ্ডপ থেকে ফিরে লুচি, নিরামিষ আর সুজির হালুয়া বানাবে। সকালে অঞ্জলি তারপর কুমারী পূজা। রাতে সন্ধি পূজা হবে অষ্টমী-নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে। পূজার শেষ চারদিন শিবানীর ব্যস্ততার শেষ নেই।
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে শিবানীর বানানো সকালের সেই লুচি-নিরামিষ তাপসের পেটের ভেতর ভয়ে হজম হয়ে যায়। শুকনো গলা কয়েকবার ঢোঁক গিলেও স্বাভাবিক হয় না। জিভটাও শুকনো। তবুও অভ্যাসবশত কিংবা আতঙ্কে- খরখরে ঠোঁট চাটে তাপস। সেখানে হালুয়ার এতোটুকু মিষ্টতা লেগে নেই। মনি সাহা দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বলে যায় জলদি বাড়ি ফিরে যেতে। ভাঙাভাঙি শুরু হয়ে গেছে। কোথায় কী ভাঙা শুরু হয়েছে তাপস এর কিছু বোঝে না। শুধু বোঝে দু-এক বছর পর পর পূজার সময়ে দশভূজার হাত ভেঙে মাটিতে লুটায়। কখনও দুর্গার মাথা উড়ে যায়। মাথা থাকলেও আগুনের হল্কায় মুখ পুড়িয়ে কালি মেখে এবড়োথেবড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
পাঁজরের হাড় কাঁপিয়ে তাপসের হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করে। বাজার এখন প্রায় ফাঁকা। কারো মুখে রা নেই। যে যার মতো ভেগে যাচ্ছে। পুলিশের জিপের চাকা শুধু একপাক ধূলা ওড়ালো। তাপস আর দাঁড়ায় না। বাড়ি ফেরার পথে ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ারের বাড়ির উঠানে ভিড় দেখে সেদিকে এগিয়ে যায়। সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
কুনু দিন এমন শুনছি না মূর্তির হাডুর উপরে কেউ কোরান শরীফ রাহে- চেয়ারম্যানের গলায় মোক্ষম কথাটা শুনে ফেলে তাপস। সারাদেশে মন্দিরে, ঘরে, দোকানে আগুন আর আগুন। বায়ুতাড়িত আগুনে কী অবলীলায় মানুষ পুড়ে যায়! মরে যায় জনা দশেক। অথচ কে যে কোথায়, কিভাবে ধর্ম অবমাননা করে, কেনো করে আর সেই জেরে সারা দেশে মন্দির পোড়ে, প্রতিমা চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়-- সে কথা কেউ জানে না। ব্যাপারটা এতো সহজও না। আলুপোড়া খাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কেউ ধূপধোঁয়ার আড়ালেই থেকে যায়। অবমাননার অকুস্থল গোবিন্দপুর না হলেও দায়সারা গোছের পূজা শেষ হয়। এইবার পূজাডা জমলো না- আক্ষেপ করে গোবিন্দপুরের হিন্দু-মুসলমান।
নিরাপত্তা জোরদার হয় তবু বিসর্জনের সময় আর ঢাক বাজে না। ঢাকের পর্দাটাও নাকি কুপিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছে হাসান মিয়ার দলবল। প্রবীণরা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন- কলিযুগে সবই সম্ভব! আরো কত কী সম্ভব হয়েছিলো ‘কলি’র আগে হয়তো সেই দ্বাপরযুগে। প্রাক-দেশভাগের সেই যুগে- পৃথিবীতে যখন অর্ধেক পাপ, অর্ধেক পূণ্য- পূর্বপুরুষের ব্যক্তিগত অসম্মানটুকু আজও হাসান মিয়ার রক্তে প্রবাহিত। মুখার্জী বাড়িতে যেদিন চিনামাটির বাসনের বদলে কলাপাতাই লুচি-নিরামিষ ধারণ করেছিলো। শত বছরের ব্যপ্তি পেরিয়ে সেই তাচ্ছিল্য বুঝি বা প্রতিফলিত হয়েছিলো ঢাকের পর্দায়।
ভাসানের পরদিন মায়াময় বিকালে আসন্ন হেমন্তের আভা ছড়িয়ে পড়েছে আমনের জমিতে। স্থির হয়ে আছে গোমতীর জল। দোকান থেকে বেরিয়ে দুলালের সাথে চায়ের দোকানে যায় তাপস। শান্ত বিকালে আবার উত্তেজনার আঁচ বাড়ে। তাপস দেখে পুলিশসহ চেয়ারম্যান সাহেব সজলদের বাড়ির দিকে যায়। সঙ্গে জামে মসজিদের ইমাম সাহেব। একই সময়ে সজল দাশের খোঁজে বহু লোক আসে- রিকশা করে, ভ্যানে চড়ে। শত শত লোক লাঠি হাতে আসতেই থাকে।
সজল ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরীফ নিয়ে কী যেন লিখেছে। কী যে লিখেছে সেটা ঠিকঠাক কেউ বলতে পারে না। কিন্তু কিছু লিখেছে এমন শোনা যায়। কেউ বলে ছবি দিয়েছে। ভুয়া আইডির ধর্ম অবমাননার সেই পোস্টে নাকি সজল মন্তব্য করেছে। এলাকার কিছু মানুষের মোবাইল ফোনে ফোনে সেই পোস্ট কমেন্টসহ ঘুরপাক খায়। লাঠিসোঁটা হাতে নিয়ে সজলদের বাড়ি ঘিরে থাকে চেনা-অচেনা মানুষের মুখ। উঠান ভরে যায় অগণিত মানুষে। পেয়ারা গাছের নিচে শুয়ে থাকা হাড়সর্বস্ব নেড়িটা পর্যন্ত শুয়ে থাকার জায়গা না পেয়ে উঠে চলে যায়। পুলিশ এসে সজলদের বাড়ি ঘেরাও করে পাহারা দেয়।
সেই ভিড় থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাপস আর দুলাল দেখে দুই দলের বাদানুবাদ। দীর্ঘ সময় ধরে কথা কাটাকাটির পর উত্তেজিত জনতাকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে চেয়ারম্যান আর ইমাম সাহেব। এসপি কথা দেন সজলকে খুঁজে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই ভিড়ে সজল দাশকে দেখা যায় না। বিকালের আগেই সজল বাপ-মাসহ পালিয়ে গেছে।
রাতে ইলিশের মাথা দিয়ে কচুর মুখি খেতে খেতে এই ঘটনা বোঝার চেষ্টা করে তাপস। অবমাননা শব্দটার বাজার খুব গরম। দেখা যায় অবমাননাগুলো আসলে রটনা। ক্ষমতা আর প্রভাবের জটিল সমীকরণে রটে যায় ফোনে ফোনে। বোঝার আগেই ঘোলা জল আরো ঘোলা হয়ে যায়। তবু পেটে ক্ষুধা বাড়ে। রত্না পাতে ধোঁয়া ওঠা ভাত তুলে দেয়। সুখনের জ্বর নেই। এখন ঘুমে ঢুলছে। সাত মাসের গর্ভ নিয়ে এমনিতেই রত্নার কাজকর্মে ঢিলেঢালা ভাব। ইলিশ মাছের ঝোলে ভাত মাখিয়ে ছেলেটার মুখে তুলে দিতেও আলস্য। মাছের কাঁটায় মনযোগ আটকে ছিলো তাপসের। তাই হৈ হৈ শব্দটা কানের পর্দা পর্যন্ত যায় না। পাতে ভাত মাখাতে মাখাতে তাপস বলে- একটা পোলারে ট্যাহার বস্তা হাতে লইয়া মন্দির থাইক্যা বাইর অইতে দেখছি। এডিরে পুলিশে ধরে না।
দোকানের ক্যাশবাক্সের ওপর হাসান মিয়ার চোখ। সবই টের পায় তাপস। রত্না এসব কথা শুনে অবাক হয় না। এই দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে তার জন্মগ্রহণ, বেড়ে ওঠা। আতঙ্কের মধ্যেই বিয়ে হওয়া, ছেলে বিয়ানো। হয়তো মৃত্যুও। রত্নার মন ভালো নেই। এবার বিজয়া দশমীতে ঢাকের বাদ্য ছিলো না। সিঁদুর উৎসব আর ধুনুচি নাচ ছাড়াই দুর্গা মা কৈলাসে ফিরে গেছেন। সবকিছুই স্বাভাবিক হয়ে যাবে কয়েক দিনের মধ্যে। গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে অগ্রহণীয় যা কিছু। রত্না অজান্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলে- কালীপূজার সময় কিতা হয় কেডায় জানে? মন্দির আবার ভাঙব!
‘তাপসদা, তাপসদা’ বলে দুলাল যখন ডাকে, মাছের মাথাটা তখন প্রায় শেষের দিকে। কাঠের দরজায় জোড়ে কড়া নাড়ার শব্দে ইলিশের কাঁটা চোষা থামায় তাপস। দরজা খুলে দুলালের আতঙ্কিত চেহারা দেখে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। দুর্যোগের আভাস পায়। যা বোঝার বুঝে ফেলে। কাঁপা কাঁপা স্বরে দুলাল বলে- আমনেরা ঘরের ভিতরেত্তে বাইরন। হাজার হাজার মুসলমান এগুল আইতাছে। বৌদি আর সুখনরে লইয়া ভাগেন। কোবাকুবি শুরু হইছে।
কস কী! আবার কিয়ের গণ্ডগোল লাগলো?
মোবাইলে ভিডিও ছাড়ছে। ভিডিওতে কইতাছে মন্দিরের ভিত্রে দুইজন মুসলমানরে নাকি পিডাইয়া মাইরা লাইছে।
এমন মিছা কতা কেডায় কইল?
কইছে ফরিদালি। হেতেই ভিডিও ছাড়ছে। হেতারা সবাই লাঠি, ছুরি, রড হাতো লইয়া আইতাছে।
মন্টু কই?
হে ব্যাডায় মন্দিরে গিয়া ঢুকছে। কয় হালারা মন্দির তো আগেই ভাঙছে আর ঢুকতো না।
কই যামু অহন? তুই লগে ল।
মনিরে খবর দিয়া তার বাদে যামু। আপনে দেরি কইরেন না।
বিকালে শান্ত-অশান্ত দুই পক্ষের যে বাদানুবাদ দেখেছিলো তাপস আর দুলাল, বুঝে কিংবা না-বুঝে ফরিদালি সেটা নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভ করেছিলো। সেই লাইভের জেরে রাধাগোবিন্দ মন্দিরের প্রতিমা টুকরো টুকরো হয়ে যায়। পুলিশ সজলদের বাড়িতে আছে জানার পরও মন্দিরের সিন্দুক ভেঙে লুট হয়ে যায় ভক্তদের দানের টাকা। মনি সাহা আর মন্টু পোদ্দারের বাড়িতেও এক দফা ভাঙচুর হয়ে যায়। তর্কাতর্কির লাইভ দেখে উদ্দাম ভাঙাভাঙির পর দুজন মুসলমানের কল্পিত মৃত্যুর কথা শুনে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে সেটা গোবিন্দপুর জানে। জন্ম থেকে এই অব্দি কয়েকবারই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে তাপসদের। যে ঘর ওরা ফেলে যায়, সে ঘরে আর ফিরতে পারে না। জন্মকুণ্ডলীতে বরদানের সাথে এমন অভিশাপেরও বুঝি যোগ থাকে! একটা আতঙ্ক ঘাড়ের ওপর ভর করে থাকে সারাক্ষণ। এ যেন দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা হাতে অদৃশ্য তাজা বিস্ফোরক নিয়ে ঘোরা। সে বিস্ফোরক যে কোনো সময় ভূমি থেকে আকাশ পর্যন্ত ধ্বংস করে দিতে পারে অথচ এক মুহূর্ত আগেও এর বিন্দুমাত্র আভাস পাওয়া যায় না। সেই মহাবিপর্যয় ঘটে গেছে বুঝতে পেরে পাতের মাছভাতের ওপরই হাত ধুয়ে ফেলে তাপস। টাকা ঢুকিয়ে রাখে লুঙ্গির খুঁটে। পিরানের পকেটে মোবাইল ফোন ঢোকায়। তাপস লক্ষ্য করেছে- আগুনের সাথে মোবাইলের সম্পর্ক আছে। মোবাইল ফোন আগুন লাগায় অথচ আগুন জ্বলে উঠলে ফোনের নেটওয়ার্কের তিন দাগ মুছে যায়।
রত্না আর ছেলেটাকে নিয়ে সামনের দিকে যাওয়ার উপায় নেই। শব্দ আসছে দক্ষিণ থেকে। ছেলে কোলে নিয়ে উত্তর দিকে হাঁটতে থাকে তাপস। হাঁটতে হাঁটতে আলপথে নেমে যায়। রত্নার হাঁটার গতি বারবার ধীর হয়ে যায়। চোখ নরম হয়ে ছলছল করে। ছেলের চোখ থেকে ঘুম উধাও। ভয় পেয়ে কেঁদে উঠলে সুখনের মুখ চেপে ধরে তাপস। ততক্ষণে তাপসের বাড়িতে জ্যারিকেন থেকে পেট্রোল ছড়ানো হয়ে গেলে আগুনের শিখা লাফিয়ে ওঠে। আকাশটাকে পুড়িয়ে দিতে চায়। আশেপাশের ঘরগুলোও দাউদাউ জ্বলে। বিকট ভাংচুরের শব্দ মিলে যায় হৈ-হল্লার সাথে। প্রাণ হাতে গোবিন্দপুরের মানুষ দৌড়তে থাকে গন্তব্য কোথায় না জেনেই।
দুলালের জন্য দুশ্চিন্তা হয় তাপসের। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কে কোথায় লুকিয়ে আছে বোঝা যায় না। দুলাল কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না এইসব সংশয়ের মধ্যে একদল বিষপিঁপড়া তাপসের পায়ে কুটকুট করে কামড়ায়। গাছের আড়াল থেকে ডান দিকে সরে যায় তাপস। ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে পা থেকে পিঁপড়া ঝাড়ে। রত্না বুনোমশা তাড়ায়। মধ্যরাতের শীতের বাতাসে কেঁপে ওঠে। নিচু স্বরে কাঁদে সুর করে। অবাধ আকাশের নিচে শোকপ্রকাশের সুরেলা শব্দ প্রেতিনীর অতৃপ্ত আত্মার কান্নায় মতো ভূতুড়ে হয়ে ওঠে। গলা শুকিয়ে আসে রত্নার। এক কলস ঠাণ্ডা জল শুষে নিতে পারলে কলিজার তৃষ্ণা হয়তো মিটতো। রত্নার গলায় খেদ আর হতাশা একাকার হয়ে কান্নার মতোই শোনায়- আমরার ঘরবাড়ি সব শ্যাষ। এই দ্যাশো আর থায়ন যাইত না।
তাপসের গলা দিয়ে স্বর আসে না। কি যেন বলতে গিয়ে ভাষা খুঁজে পায় না।
ছায়ামানব তাপসের কানে মন্ত্র দেয়- ভোরের আর বেশি দেরি নাই। এই কালরাত জলদি শেষ হবে। মনে সাহস রাখো। হাওয়ার এই ফিসফিসানি শুনে তাপসের বুকে ভয়ের পাঁচিল চুইয়ে মিহিধারায় সাহস নামে। সহজ হয় তাপস। আড়ষ্ট গলায় স্বর ফোটে- আগো বেডি, মাইত্তো না! ঠাউররে ডাকো।
-ইতান মানু না। হিন্দুরার নাম শুনলে জবো কইরা লাইবো। এই দ্যাশো আর থাকতাম না।
-বেইন্নালা তোমরারে পলাশগঞ্জ রাইখ্যা আমু। একজনরে বারিত থাকতে হইব।
দুজনই জানে থাকার মতো বাড়িঘর অবশিষ্ট নেই। তবু তাপসের গোবিন্দপুর থাকা দরকার। দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে সংকটনাশিনীকে স্মরণ করে রত্না। বিড়বিড় করে বলে- দুগ্গা দুগ্গা...! সকাল সকাল প্রাণটা হাতে নিয়ে বাপের বাড়ি পৌঁছাতে পারলে এই যাত্রা হয়তো তারা বেঁচে যাবে। তলপেটের ভেতর একটা ঢেউ ডান থেকে বাঁ দিকে চলে যায়। পেটে হাত রাখে রত্না। অজাতকের গায়ে স্নেহস্পর্শ বুলিয়ে দেয়।
অনেকটুকু জায়গা জুড়ে বাঁশঝাড়ের ছায়া। সেই ছায়ার ভেতর ছায়াশরীর হেঁটে গেলে আর আলাদা করা যায় না। বাঁশঝাড় পেরিয়ে গেলে চলমান ছায়াটিকে ফের দেখা যায়। ধোঁয়াবাষ্প আচ্ছন্ন গোবিন্দপুর। আগুনের ধূমল উদ্গিরণের সাথে টিয়ারশেলের ধোঁয়া মিশে পোড়া গন্ধ ভাসে। ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে ফের কষ্ট হয় ছায়ামানবের। প্রতিমা আর মণ্ডপের আগুন হিন্দুর ঘরের চালেও লাগে। তারপর ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। হাসান মিয়া এই আগুনদৃশ্য লাইভ প্রচার করে। মানুষ লাইভ দেখে। লাইভে শুনতে পায়- মুসলমানের বাড়িতে আগুন লাগাইয়া দিছে। আল্লাহ মুসলমানগো বাঁচাও। মুহুর্মুহু কমেন্ট পড়তে থাকে লাইভে। দফায় দফায় শেয়ার হয়ে যায় লাইভ পোস্ট।
ছায়ামানব দেখছে- এভাবেই হিন্দুর ঘরে লাগানো আগুন কাল্পনিকভাবে মুসলমানের ঘরের আগুনে পরিণত হয়। আগুন ভাইরাল হয়ে গেলে ময়নারচর, হাকিমপাড়া, দক্ষিণপাড়া, সাজিদপুরসহ গ্রাম-গ্রামান্তরের চাষী, জেলে, মুটে, মজুর ধেয়ে আসে গোবিন্দপুরের দিকে। শুধু গোবিন্দপুরই নয় আশেপাশের গ্রামগুলোও পুড়ে যায়। পুড়ে যায় বাড়ি-ঘর, খাট-পালং, কাঁথা-বিছানা। লুট হয়ে যায় চাল-ডাল, টাকা-পয়সা। তুলে রাখা একরত্তি সোনা। গোয়ালে গরু নেই। লাঙ্গল-জোয়াল নেই। রান্নাঘরে হাঁড়িপাতিল নেই। থোকা থোকা সাদা ফুরুস ফুলের মতো কয়েক দলা ভাত পড়ে আছে ছাইয়ের ওপর। চারদিকে ছড়ানো ছিটানো ভাঙা আসবাবের টুকরা। দুয়েকটা আধপোড়া বাড়ির গায়ে শুধু ভাঙা দরজা লেগে আছে।
দমকলের গাড়ি সাইরেন বাজায়। গ্রাম জুড়ে টহল দেয় পুলিশ, র্যাব আর বিজেবি। ছায়ামানব দেখে অবিশ্বাস আর বিভেদে এভাবেই ঐক্য নস্যাৎ হয়ে যায়। এদেশের মানুষ তার বলে যাওয়া কথাগুলো ভুলে গেছে। বাঙালি জাতির দ্বিধাবিভক্তির এই অশুভ শক্তি একদিনে জন্ম নেয়নি। ভাঙনের খেলায় বারবার লাভের গুড় খেয়ে যায় বাইরের মানুষ। বাংলার হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই। যূথবদ্ধ হয়েই তাদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হবে। অথচ মানুষ এখন স্বজনের মুখোমুখি। ছায়ামূর্তি ব্যাথিত হয়।
ধানক্ষেতে রাতের আকাশের নিচে লুকিয়ে থাকা মানুষের চোখেমুখে লেপ্টে আছে মৃত্যুর আতঙ্ক। হাত-পা কিংবা সারা শরীর ঝলসে যাওয়া মানুষগুলো এমন কি জ্বলনটুকুও টের পায় না। একরাতে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার বোধটুকুও নেই। চেতনে অবচেতনে শুধুই মৃত্যুভয়ের আচ্ছন্নতা। একাত্তরে যে জাতি জেগে উঠেছিলো সেই জাতি নিজের বুকে কথিত অবমাননার ছুরি চালিয়ে আজ আত্মঘাতী। পুড়িয়ে দেয় সদ্ভাব-সম্প্রীতি আর সেই ধোঁয়ায় ছায়ামানবের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
তাপসের পেট যখন ভারমুক্ত হচ্ছে, গোমতীপারের জংলা নড়ে ওঠে। সেদিকে তাকিয়ে কিছু ঠাহর করার চেষ্টা করে তাপস। পেশাবের চাপ কমাতেই এদিকে আড়াল খুঁজে নিয়েছে। জংলার দিকে জায়গাটা ফাঁকা। প্যাককাদা আর জোঁকের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যায় তাপস। সোঁদা গন্ধ নাকে ঝাপট মারে।
অনেকটা দূর থেকে জ্যান্ত না মৃতদেহ ঠাহর করা যায় না। মেঘভাঙা জোছনায় মানবী শরীরের রেখা অস্পস্টতা থেকে স্পষ্টতর। কাছাকাছি গিয়ে তাপস দেখে লতাপাতায় পেঁচিয়ে রয়েছে শিবানী। কাদামাখা। চেতনা নেই। ঠিক অচেতনও না। কলাগাছের নিচে বসে হরিদাস কাকা বলেছিলো বটে শিবানীকে খুঁজে পাচ্ছে না। হাসান মিয়ার চোখ পড়েছিলো শিবানীর ওপর। তুলে নিয়ে গেছে- এই ধারণাটা ভুল হওয়ায় স্বস্তি পায় তাপস। লতাপাতা ছাড়াতে গিয়ে তাপসের হাতের কাদামাটি শিবানীর গায়ে লেগে যায়। আধাচেতনে তাপসকে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে শিবানী। সেই যে সে গড়িয়ে পড়ছে। এখনো পড়েই যাচ্ছে। তলিয়ে যাওয়ার অনুভব থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্যই যেন দু’হাতে কাউকে জাপটে ধরার চেষ্টা।
এতোটা কাছে শিবানী, ট্যালকম পাউডারের গন্ধের সাথে শিবানীর নিঃশ্বাস মিশে তাপসের রোমকূপের গোড়ায় গোড়ায় স্পর্শ করে। বুকের ভেতর গোমতীর পেটের শোল উজিয়ে এসে লেজের ঝাপট মারে। কোন অতল থেকে এমন মীন উঠে এসে ঘাই দিয়ে যায় কে জানে! জোছনায় মাখামাখি হয়ে দুজনে লেপ্টে থাকে। একের স্তন অন্যের পাঁজরে জুড়ে যায়। শ্বাস আর নিঃশ্বাসে ওঠা-নামা করে। নিঃশব্দে কেঁপে ওঠে তাপসের পাঁজরের হাড়। আগুনের জাঁকালো লকলকে জিভ এতোটা দূর থেকেও দেখা যায়। গোমতীরপারে আগুন-জোছনার যুগলবন্দীতে কী অসম্ভব এই রাত্রিবাস!
ভোররাতে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। মেঘ থেকে চাঁদ সরে গেলে জোছনা লুটিয়ে পড়ে গোবিন্দপুরে। বিস্তীর্ণ গোমতী থেকে ঝিরিঝিরি হাওয়া ভেসে আসে। কুয়াশাবাহিত হাওয়ায় শিরশিরিয়ে ওঠে ধানের শিষ। ছায়ামানব দেখে রাতের খোলা আকাশের নিচে ধানক্ষেতের আড়ালে এখানে ওখানে গাছতলায় লুকিয়ে আছে অগণন মানুষ। শিশুরা কেঁদে কেঁদে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। বৃদ্ধরা ক্লান্তিতে ঝিমায়। নারী-পুরুষের ঘুমহীন সতর্ক দৃষ্টি এখন ঘুমঘুম। যদিও শুকনোপাতা পড়ার শব্দে চমকে ওঠে ওরা। মনুষ্যলোকে অসম্ভব এই দৃশ্যকল্পের সামনে দাঁড়িয়ে ছায়ামানব বেদনার্ত হয়। এ শুধু গোবিন্দপুরের আগুন নয়। সারাদেশ ঝলসে যাচ্ছে আগুনের খাবলায়।
হরিদাস চন্দ্রের চোখে ঘুম নেই। জেগে আছে তাপস কুমার সাহা। জ্ঞান ফিরে এলে গোমতীর পাড়ে বাঁশের মাচায় হেলান দিয়ে বসে থাকে শিবানী। ওর শরীরের কাদা শুকিয়ে টানটান। রত্না ঝুঁকে ঘুমন্ত ছেলের চুলে হাত বোলায়। ক্ষয়াটে শাখা, পলা আর নোয়ায় ঘষা লেগে মৃদু শব্দ জাগে। রাতচরা পাখির ডানার ঝাপটা আর বিলাপে ছমছম করে চারপাশ। মানুষ আর দেবতার মাঝে সংযোগ তৈরি করে আগুন। আগুনের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের বসতভিটার আহুতি দেবতাদের কাছে পৌঁছে যায়। তারা নিজেরাও ঝলসে অগ্নিশুদ্ধ হয়ে একদিন স্বর্গরাজ্যে চলে যাবে নিশ্চিত। চারপাশে সেই হোমমন্ত্রই উচ্চারিত- ওঁ অগ্নয়ে স্বাহা... ছায়ামানব ফিসফিসিয়ে তাপসকে ভরসা দেয়। শিশির ভেজা একমুঠো মাটি হাতে নিয়ে বসে থাকে তাপস। বুক ভরে যায় মাটির সোঁদা গন্ধে। এই জমি তার আপন। এই পোড়াদেশ ছেড়ে তাপসের আর চলে যাওয়া হয়ে ওঠে না।
ধোঁয়া উগরে উগরে আগুন নিভে গেছে। ভোরের মৃদু আলোয় ঘোলাটে চারপাশটা একটু একটু করে স্পষ্ট। রাস্তার ওপর রিকশা, সাইকেল কিছুই দেখা যায় না। একটা সবজি বোঝাই ভ্যান ভুল করে যেন গোবিন্দপুরের ইট বিছানো লাল পথের ওপর দিয়ে চলে যায়। নদীপথেই পলাশগঞ্জ যেতে হবে। তাপস গোমতীর দিকে হাঁটা দেয়।
মিহি কুয়াশা ভাসে গোমতীর ওপর। ছায়াশরীর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় ধোঁয়াশার অস্পষ্টতায়। ঘাটে নৌকা বাঁধা। নৌকার মাঝি আসছে।
লেখক পরিচিতি: ইশরাত তানিয়ার জন্ম ঢাকায়, ৬ নভেম্বর ১৯৮০সালে। কথাসাহিত্যিক ও প্রবন্ধসাহিত্যিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে পিএইচডি করেছেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৬টি
কবিতার বই
নেমেছ ইচ্ছে নিরিবিলি (২০১৬)
গল্পবই
বীজপুরুষ (২০১৮)
মদ এক স্বর্ণাভ শিশির (২০২০)
মেলো ইয়েলো, শিউলিগাছ আর বারান্দা হচ্ছে (২০২১)
গল্পটা ছাইয়ের এমন কি ডিমের কুসুমের (২০২৩)
সম্পাদনা
আলাপের অ্যাম্ফিথিয়েটারে (২০২০)


0 মন্তব্যসমূহ