আলাউদ্দিন আল আজাদের গল্প : ঈশ্বরের পলায়ন


একটা মিহিন শিসধ্বনি বাঁশঝাড়ের কিনার ঘেঁষে নতুন তরজার বেড়ার ফাঁকে বারবার এসে বিঁধছে।

আজ আষাঢ়ী পূর্ণিমা; সন্ধের সময়েই নিশ্চয় সােনার থালার মতাে পূর্ণচাদ উঠছিলাে, কিছুই দেখা যায় নি; বিকেল থেকে ধোঁয়াটে মেঘের আবরণে সারা আকাশ ছেয়ে আছে। এই রাতদুপুর শেষে তার আভা। এদিকে, গাছ-গাছড়ায় ছাওয়া মাঝেমাঝে ঘরবাড়ি এবং মাঝে-মাঝে খামারের অংশ, যেখানে হাইজং ধানকাটা শেষ। চাষীরা জমিতে এখন চাষ দিচ্ছে। বৃষ্টি হয় প্রায়ই; তার ধারাজল আলবেষ্টনীর মধ্যে ধরে রাখে আবার রােয়া ধানচারা লাগাবার জন্য। উঁচু জায়গাগুলােতে গালিচার মতাে হালকা সবুজ জালা খেত। এখান থেকে কিছু পূর্ব দিয়ে চওড়া খালের মতাে নিচু জমির খাত উত্তর-দক্ষিণে এঁকেবেঁকে কুকুরমারা গ্রামের কাছে কাজল বিলে গিয়ে মিশেছে, যার মধ্যে এখন চক চক করছে বর্ষার পানি। গাবগাছে থেকে-থেকে প্যাঁচার ডাক, তেঁতুলগাছে নিশাচর পাখির পাখা ঝাড়া; নিঝুম শান্ত প্রকৃতি, কিন্তু একটা অজানা আতংক যেন এই নির্জনতার মধ্যে পক্ষচ্ছায়া বিস্তার করে আছে।

ঘরের পেছনে শুকনাে পাতায় পায়ের আওয়াজ এবং যেন বা নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস, তাও একজনের নয়। চমকে উঠলাে। হাতভরে তড়াক করে উঠে বসে মেঝেতে বিছানাে পাটির ওপরে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লাে। আঙুল টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে বেড়ার ফাঁকে চোখ রেখে তাকালে অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়। কালাে-কালাে, গােবদাগাবদা তিনটা লােক; একজন রামদা উঁচিয়ে আছে। হা, ঈশ্বর!
ঈশ্বর পালাচ্ছে। হাতিয়ার-ফাতিয়ার, যন্তরের বাক্স, কাপড়ের গাঁটরি, চিঁড়াগুড়ের পাতিল যেখানে যা আছে, থাক্‌; ঝাঁপের ওধারে বুড়িমা যশােদা এবং এধারে রেবতী, যার কোলের কাছে তিন বছরের ছােট্ট কন্যা শিউলি– ওরা ঘুমুচ্ছে, ঘুমাক ওরা। পালাচ্ছে ঈশ্বর।

ঈশ্বর পালাচ্ছে। তার আত্মারাম শুকিয়ে গেছে, একেকবার থর থর করে ভিতর থেকে কাঁপুনি উঠতে চায়; কিন্তু তা সামলাতে-সামলাতে খুব সাবধানী আঙুলের চাপে নিঃশব্দে কপাটের খিলটা খােলে এবং ঠাণ্ডা মাটিতে খালি পা ফেলে ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাে। ঈশ্বর পালাচ্ছে।

বাড়ির সামনে কলাগাছের ঝােপড়া, উত্তরে আম-কাঁঠাল-লিচুগাছ। দক্ষিণ খােলা। আবছায়ায় দ্রুত উঠোন পেরিয়ে গাছের আড়ালে পথের মােড়ে এসে থামলাে।

ঈশ্বর পালাচ্ছে; কিন্তু এই দূরে আসার পর একটা গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাে পৈতৃক বসতবাটিটার দিকে, যা কিছুকাল আগে জবু জবু হতে হতে লেপটে পড়ে গিয়েছিলাে এবং এখন টিনের চাল, বাঁশের বেড়া দেয়া একটা নতুন বাড়ি।

ওই তাে, তিনটে মনুষ্যমূর্তি দক্ষিণ ঘুরে সামনে এসেছে এবং এতােরাতে ঘরের দরােজা খােলা। দেখেই যেন মনে হয়, থমকে দাঁড়িয়েছে। তাদের ফিস্ ফিস্ অনুচ্চ সংলাপ।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র সূত্রধর, সাং মাহমুদাবাদ, পােস্ট অপিস নারায়ণপুর, থানা রায়পুরা, জিলা ঢাকা। এই ঠিকানাটা ঠিক। কালাে কালিতে যন্ত্রের বাক্সের ভেতরে লেখা আছে, এবং হয়তাে বুকের পাষাণেও, নইলে অন্য দশজনের মতাে ভুলেও তাে যেতে পারতাে। বারে বারে এইখানেই ফিরে আসার প্রয়ােজন ছিলাে না। মাত্র দিনচারেক আগে আবার ফিরে এসেছিলাে ঈশ্বর, মাথায় যন্ত্রের বাক্সটা এবং তার উপরে জিনিসপত্রের একটা বােচকা। ফিরে এসেছিলাে, কিন্তু এবার কুমিল্লা থেকে নয়, আগরতলা থেকে নয়। ফিরে এসেছিলাে এবার নারায়ণগঞ্জ থেকে, প্রায় তিনমাস একটানা কাজকর্ম করার পর। জায়গায়-জায়গায় ছুতারমিস্ত্রী হিসেবে তার পরিচয় যেমন আছে, সুনামও আছে।

তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন ভগবানচন্দ্র সূত্রধর। তাঁর এমনই হাতযশ ছিলাে যে, ভাওয়ালরাজ নাকি তাঁকে পালঙ্ক বানাতে ডেকে নিয়েছিলেন। তাঁর ঠাকুরদা নারায়ণচন্দ্র সূত্রধর। তাঁর হাতের তৈরি মাইলের কোনাে জুড়ি ছিলাে না। এতদঞ্চলে পাল ও সাহাদের প্রত্যেক বাড়িতেই একটা-দু'টো করে ছিলাে; কিন্তু উল্লেখযােগ্য হলাে, প্রত্যেকটির লতাপাতা অলঙ্করণ থাকতাে আলাদা এবং চমকপ্রদ।

তার পিতা নবীনচন্দ্র সূত্রধর। তিনি অবশ্য নিত্যব্যবহার্য ছােট-খাটো জিনিসপত্রের জন্য বিশেষ বিখ্যাত ছিলেন। যেমন; খড়ম, পিঁড়ি, জলচৌকি, কাঠের তাগাড়, ছােটবড় লাটিম। তাঁর তৈরি ভােমা লাটিম থেকে যে সুর বেরুত তা না-কি ছিলাে যেমন মধুর তেমনি মর্মস্পর্শী; দূর থেকে শুনলেও চেনা যেতাে।

পিতৃপুরুষদের ছিলাে সূক্ষ্ম কারুকাজ ও ঐশ্বর্য; কিন্তু ঈশ্বর একেবারে সাদামাটা মাটির সমান।
আজকাল কৃষকসমাজ পুরােনাে লাঙল দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং কাঠের দুর্মূল্য, পয়সাওয়ালা বেপারীরাও নৌকা তৈরি করাচ্ছে না। নিজে গাছ কিনে যে টুকটাক ছােটখাটো এটা-সেটা বানিয়ে আড়ঙে বেচবে, তাও সম্ভব নয়।

জালালাবাদের কুটুমবাড়িতে নেমন্তন্নে এসেছিলাে সুখময় সাহা, যখন সে ওখানে চৌকি বানাবার কাজ করছিলাে; সেই সূত্রে পরিচয়। নারায়ণগঞ্জে তার গদী। আন্তরিকভাবেই যেতে বলেছিলাে, এবং বছর দুই আগে যখন প্রথম যায়, যথেষ্ট খাতির-যত্ন করেছে। তার উঠতি ব্যবসা; কিন্তু এখনাে দালানে হাত দিতে পারে নি।

বাপ-পিতামহের আমলের টিনের ঘরগুলােকেই মেরামত করে কাজ চালাচ্ছে। সেবার দিয়েছিলাে দরােজার চৌকাঠ ও জানালার ফ্রেম তৈরির কাজ।
এবার একটি বড় পালঙ্ক ও দুটো আলমারি বানিয়েছে।

কোমরের গাঁটে হাজারখানেক টাকা। তিনমাসের প্রবাস শেষে বেশ ফুর্তির সঙ্গে লােকাল ট্রেন থেকে ঠেলাঠেলি করে নেমেছিলাে শ্রীনিধি ইস্টিশনে। ইস্টিশনে, রেললাইনের আশেপাশে ও খামার জুড়ে বর্ষার পানি।

ছােট বােঝা, তবু মাথায় নেয়া ছাড়া উপায় ছিলাে না; টিকিটটা গেটের মুখে কালেক্টরের হাতে দিয়ে আবার পূর্বদিকে আসে। সাবধানে ক্রস করে রেললাইনের পাশের পায়ে হাঁটা পথ ধরে চলতে লাগলাে।

পিরিজকান্দি গ্রাম হয়ে লক্ষ্মীপুর পেরিয়ে নারায়ণপুর, এটা ডিস্ট্রিক বাের্ডের পুরােনাে সড়ক। পিরিজকান্দি বাজারে রিকশা পাওয়া যায়। হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, পিরিজকান্দি বাজার থেকে রিকশা করেই যাবে সরাসরি এবং নারায়ণপুর পৌছার পর ওখানে কিছুক্ষণ জিরিয়ে মেলা দেবে নিজের গ্রামের দিকে। নারায়ণপুরে এখনাে দু’তিন ঘর পরিচিত আছে; তার ফেরার খবর দেয়ার জন্যও অন্তত একজায়গায় দেখা করে যাওয়া প্রয়ােজন। জিতেন্দ্রের ওষুধের দোকানে বসে একছিলিম তামাক খেয়ে গেলেই যথেষ্ট। পিরিজকান্দি বাজারে পৌছে ছাপড়ার দোকানে টুলে বসে এককাপ চা পান করলাে। জলদি জলদি বাড়ি ফেরাই এখন আসল ভাবনা। কন্যার জন্য একটা জামা ও পুতুল এনেছে। রেবতীর জন্য একটা বাবুরহাটি শাড়ি এবং সুবাসিত তেলের শিশি ও সিঁদুর। একটা কাপড় এনেছে মায়ের জন্যও। এই বৃষ্টির দিনে না জানি কতাে কষ্ট হচ্ছে ওদের! ঝকর ঝকর করে রিকশা এগিয়ে চলেছে আর ঈশ্বরের মাথায় নানা চিন্তা খেলা করছে, যেগুলাে একটি বিষয়ে এসে ঠেকে তা হলাে, কালকেই ঘর মেরামতের কাজ ধরতে হবে।

প্রায় দু'ঘণ্টা পরে আশৈশব চেনা শীতল মাটির পথে পা ফেলে হেঁটে যেতে বিচিত্র আবেগ ও অনুভূতিতে ভেতরটা আলােড়িত হচ্ছিলাে। সংসারখরচের পয়সা বিশেষ দিতে পারে নি, রেবতী বােধ হয় শুকিয়ে গেছে; অথচ রঙ শ্যামলা হলেও, সে কতাে স্বাস্থ্যবতী ও সুন্দরী ছিলাে। বাপের বাড়ি বেলাবাে, ওরাও ছুতার-পরিবার; কিন্তু পঁচাত্তরের আগস্টের পর বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে, এখন আছে নাকি কোলকাতার কাছে শ্রীরামপুরে। চিঠিপত্রও লেখে না। রেবতী মাঝে মাঝে কাঁদতাে, কিন্তু এতাে দুর্বল না ঈশ্বর, ঈশ্বরের মন নিজের জন্মভূমি ছেড়ে সে যাবে না।

কতাে পরিচিত এই পল্লীপথ, গাছপালা! দক্ষিণে মিঞাবাড়ির আখবাগান ছাড়িয়ে এলে ওই যে শাদা শাদা ফুটফুটে কাঁঠালিচাঁপার ফুল, তাদের বাড়িরই পূর্ব প্রান্তে। মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে ঠোটের কোণে, ঈশ্বর আরাে জোরে পা চালিয়ে দিলাে।

তাদের উত্তরসীমানায়, ঈশ্বরের চোখে পড়লাে, ননীগােপালের দু’চালা ছনের ঘরটা; একেক ধাক্কায় সবাই যেতে যেতে শেষ ইস্তক অশীতিপর পিসিমা সাবিত্রী দাস ছিলেন; একটা বাঁকা মনকাঁটা ডালের লাঠি ভর করে এবাড়ি-ওবাড়ি করা অনেককালের একটা পরিচিত দৃশ্য। কবে তাঁর বিয়ে হয়েছিলাে, তাঁর সংসার ছিলাে; সে যেন পুরাকাহিনী।

কিন্তু অতাে সব মনে করার সময় ছিলাে না; ঈশ্বর চলার গতি বাড়িয়ে ওবাড়ির কাছে এসে পড়তেই দেখলাে দক্ষিণধারে শিউলিতলায় একটা চেয়ারে বসে ফর্সি হুঁকার নলে টান দিতে দিতে গল্পগুজব করছে আনসার আলী, তার সামনে টুলে বসা কয়েকজন পাড়া-প্রতিবেশী। একটু দূরে রাস্তায় ওকে দেখামাত্র হৈ চৈ করে দাঁড়িয়ে পড়লাে, হাত বাড়িয়ে বললাে, এই যে ঈশ্বর! আইছাে তুমি। আও, আও। তােমার লাইগ্যা আমরা অনেকদিন ধইরা অপেক্ষা করতাছি। আইয়া পড়ছাে, ভালা করছাে ঈশ্বর।

কিন্তু ঈশ্বর তখন সাড়াও দিচ্ছে না, কথাও বলছে না; হাতিয়ারের বাক্স মাথায় বজ্রাহতের মতাে স্থির। সে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। এই তাে তাদের ভিটি! চেনা যায়। কিন্তু ঘরটি কোথায়? তার চিহ্নও নেই; সে জায়গায় একটা চকচকে টিনের ঘর।

আনসারদা! বিড় বিড় উচ্চারণ করে ঈশ্বর, আনসারদা! আমার—আমার—

ঈশ্বর! দেখছাে ঈশ্বর কী করতাছে ? হা হা হা! মাথায় কদমছাট চুল, পােক্ত কাঁধ, গাট্টাগােট্টা চেহারার রৌদ্র পােড়া আনাসার শরীর ঝাঁকিয়ে হাসতে হাসতে যেন সস্নেহে বললাে, ঈশ্বর! নিজের বাড়িটাও চিনতে পারতাছস না ?
আনসারদা! আনসারদা!
হ, চিনবে ক্যামনে? আগের তাে কিছু নাই— সব নতুন, সব নতুন! তারপর গলা বাড়িয়ে হাঁক ছাড়ে, ও দিদিমণি রেবতী! কই তুমি? জলদি বাইর অও। দ্যাহ ক্যাডা আইছে!
আনসারদা! আনসারদা!

আরে ব ব একটু বইয়া জিরাইয়া ল। বাড়িৎ যহন আইছস দ্যাহা অইবোে নিশ্চয়ই। তাড়াহুড়াের কী আছে ? অহন তাে রাইত না! নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলাে। তারপর বললাে, আমি জানি কী কইবা তুমি ঈশ্বর। ঈশ্বর, তাের বয়স কম অইছে না। কিন্তু ঈশ্বর, আমি কইয়াম তুই একটু বেখেয়াল। তাের পরিবার তাে প্রায় মারা গেছিলাে, তুই যাওয়ার কিছুকাল পরে ওই যে বৈশাখ মাসের শেষে তুফান অইছিলাে। ঘরটা হুড়মুড় কইরা ভাইঙা পড়ে। এদিকে তাের খবর নাই- রেবতী অর বুড়ী শাশুড়িডারে লইয়া কাইন্দা পড়লাে। ঘরটা আমি তুইল্যা দিছি। ভবিষ্যতে ট্যাহা অইলে ফেরত দিয়া দিস।

তখন ঠোট কাঁপছিলাে ঈশ্বরের। শিরার ভেতর দিয়ে কেমন একটা ঠাণ্ডা প্রবাহ বয়ে চলছিলাে। ঈশ্বর কোনাে উত্তর দিতে পারলাে না। স্তব্ধমুখে পা বাড়িয়ে হাঁটতে লাগলাে। এবং যখন উঠান পেরিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছে তখন সিল্কের নীল-গােলাপী একটা শাড়ি পরনে রেবতী বাইরে এলাে।

এ কি রেবতী না অন্য কেউ ? হা রেবতীই তাে। ধীরস্থির, খাদ্যেস্নানে পরিতৃপ্ত যুবতী গাভীর মতাে স্বাস্থ্যবতী। চাউনিতে গভীরতা এবং শ্যামল রঙ গালে-গ্রীবায় মসৃণ চিকচিকে আভা।

রেবু! রেবতী! ওকে দেখতে দেখতে হঠাৎ সম্বােধন করে দ্রুতপায়ে ঘরে গিয়ে উঠলাে। সরে যায় রেবতী। জলদি মাথা থেকে বােঝাটা নামালাে ঈশ্বর, রেবতীর সামনে দাঁড়ালাে, ওর দুই কাঁধ ধরে অচেনা লােকের মতাে আবার বললাে, রেবতী!

রেবতীর মুখ নিচু, সে চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ; তারপর বললাে, অতাে অস্থির অইছাে ক্যান ? তিনমাস পরে আইছ, জিরাইয়া লও।

তােমার কোনাে কষ্ট অয় নাই তাে রেবতী ? বােকার মতাে জিজ্ঞেস করলাে ঈশ্বর। শিউলি কাছে এলে ওকে কোলে তুলে নিলাে। মা যশােদা বাগের কাছে, গুটলির মতাে উঠে বসেছে, পুত্রকে দেখে নিজে নিজে বললাে, পােড়া কপাইল্যা!

ঈশ্বর পালাচ্ছে। আজ দুপুররাতের পর ঈশ্বর পালাবার সময় গাছের আড়ালে থমকে দাঁড়িয়ে আরাে দেখতে পেলাে, ফিসফাস কথা বলার পর তিনজনের একজন বারান্দায় টর্চের আলাে ফেলে ঘরের ভেতরে গেলাে। বাইরে দু’জন, হাতে উঁচানো মারাত্মক অস্ত্র। সে লােকটা ঈশ্বরকে খুঁজতে গেছে নিশ্চয়ই; ছেড়া শার্টের কলার চেপে ধরে বাইরে টেনে নিয়ে আসবে এবং তার মুখটা গামছায় আঁট করে বেঁধে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাবে কাজলবিলের ধারে। সেখানে হাত-পা বাঁধবে, তাকে পেড়ে ফেলবে শক্ত মাটির জায়গাটার ওপর। তারপর তিনজনে মিলে কোপাতে থাকবে বুকে, গলায়, মাথায়, এমন কি, চকচকে ধারালাে ছুরি চালিয়ে পেটের উজরিটা বার করে ফেলতে পারে। এবং মস্তকটাও করতে পারে বিচ্ছিন্ন। তার দেহের ছিন্নবিচ্ছিন্ন অংশগুলাে ছড়িয়ে থাকবে না; ওরা সেগুলাে বাঁধবে একপ্রস্থ। এক ঝটকায় দু-তিন পা পিছিয়ে গেলাে। থামলাে আবার। সেই লােকটা একবার মাত্র টর্চের আলাে ফেলে বাইরে এলাে, এবং তার সঙ্গে খােলা-চুল রেবতী, আঁচলটা কাঁধের উপর দিয়ে নিয়ে তার প্রান্ত পেটের কাছে ধরে আছে।

ওরা চলতে শুরু করলাে। ঘরের উত্তরে গাছতলা দিয়ে ননীগােপালদের উঠানের দিকে যায়। আরেকটা আবছায়া মূর্তি, সিগারেট টানার আগুনটা বারে বারে দেখা যাচ্ছে।

ঈশ্বর কাঁপছে। গাছের আড়াল ছেড়ে চুপি চুপি এক দৌড়ে ননীগােপালের বাড়ির কাছে বাঁশঝাড়ের কোণে চলে আসে। ঈশ্বর তাকিয়ে দেখছে, রেবতী এগিয়ে যেতে পাঞ্জাবীলুঙি পরা আনসার সিগারেটের টুকরােটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তাকে আদর করে দু’হাতে ধরলাে। তারপর আর দেরি না করে তাকে নিয়ে ননীগােপালদের ছনের ঘরটার ভেতরে প্রবেশ করে। সেখানেও একটা চৌকি আছে, এবং নিশ্চয় বিছানাও।

আচমকা ঈশ্বরের মনে হলাে সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠবে, যা শুনতে পেয়ে এমন গভীর রাতেও ঘুম থেকে জেগে ছুটে আসবে সবাই। উত্তরপাড়া থেকে, দক্ষিণপাড়া থেকে, পূর্বপাড়া থেকে, পশ্চিমপাড়া থেকে। কয়েকটি মশাল হাতে ওরা কাছে এলে সে চেঁচিয়ে বর্ণনা করবে এবং ওরা গিয়ে হাতে-নাতে ধরে ফেলবে বকধার্মিক ব্যভিচারী গুণ্ডা আনসার আলীকে। আনসার প্রচুর টাকাপয়সা নিয়ে আমিরাত থেকে ফিরেছে এবং ওর ছােট দু'ভাই কাজ করছে ওখানে, তাতে এই অজপাড়াগাঁয়েও নিজের বাড়িতে দালান তুলছে, একটা মসজিদও তৈরি করবে কিন্তু অন্যায় অন্যায়ই, গ্রামের কেউ তা সমর্থন করবে না।

ঈশ্বর একটু গোঁ গোঁ করলাে, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনাে শব্দ বেরুলাে না।

এমন সময় দেখতে পেলাে, রামদাটা উঁচিয়ে ধরে আস্তে আস্তে হেঁটে এদিকে আসছে ওরা; দু’জন বিড়ি টানছে।

ঈশ্বরের বৌকে আনসারের কোলে তুলে দিয়ে নিশ্চয় এখন ওরা ঈশ্বরকে খুঁজতে আসছে। হা ঈশ্বর!

ঈশ্বর তাকালাে; তারপর দৌড় দিলাে। বাঁশঝাড় ছাড়িয়ে এসে আমতলা, আমতলা থেকে নায়েব আলীর পুকুরপাড় হয়ে ছুটতে লাগলাে।

আকাশের ধোয়াটে আবরণ যেন আরেকটু ভারি হয়ে আসে; পূর্ণিমার চাঁদ দেখা যাওয়া দূরে থাকুক, এখন সত্যিই অন্ধকার নেমে আসছে। বিশাল পাহাড়ের মতাে একটা কালােমেঘ ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, তাতে আরাে গাঢ়তার ছােপ। ঈশ্বর পালাচ্ছে; তুড়ি দৌড়ে ছুটতে ছুটতে মাঝে মাঝে থামে, একটু হাঁফ ছাড়ে, তারপর আবার দৌড়তে থাকে। খামারের বেশির ভাগ ভেজা ও নরম; একজায়গায় টাল সামলাতে না পারলে জমির কাদাজলে এক পা ডুবে গেলাে। আলের ওপর দু'হাতের ভরে সেখান থেকে উঠলাে। আবার পালাচ্ছে ঈশ্বর। ঈশ্বর পালাচ্ছে। খামার ঘুরে বিলের কাছে; বিল ঘুরে নারায়ণপুর বাজারের পথ, যেখানে দু’টি তালগাছ। ঈশ্বর একবার অনুভব করে, তাকে বােধ হয় আন্ধাউলি, মানে নিশিতে পেয়েছে; কারণ ছুটতে ছুটতে দু’বার ডিস্ট্রিক্ট বাের্ডের রাস্তার কাছ হয়ে আগের জায়গায় ফিরে এসেছে। ঈশ্বর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভীষণ হাঁফায়, তারপর মাটি-লেপটে বসে পড়ে। ও হাে, এটা তাে বটগাছ। বটগাছ না ভূতের আখড়া ? কিন্তু না, ঈশ্বরের মনে হলাে। ভূতপ্রেত হাস্যকর। নিজেই ভূতের চেয়ে বড়, ভূতের চেয়ে শক্তিমান।

আশ্চর্য! বটগাছটা কাজলবিলের পথের ধারেই তার বাড়ির থেকে বেশি দূরে নয়। ভীষণ ক্লান্তিতে চোখ বুজে থাকার সময়ে মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাে। একসময় পাখপাখালির কলকাকলি; সে চোখ কচলিয়ে তাকিয়ে দেখে একঝাক পাহাড়ী হাঁস উড়ে যাচ্ছে। সে শুয়ে আছে বটগাছের দুটো বড় বড় শিকড়ের মাঝখানে। আস্তেআস্তে চোখের পাতার উপরে ভােরের সূর্যের আলাের মনােরম ছোঁয়া; যেন হালকা পাখির পালকের নরম তুলিতে মমতার প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছে। প্রায় সারারাত ঘুমায় নি; অনেক ঘুম তার চোখের মধ্যে। সে আবার চোখ বোঁজে।

কতক্ষণ পরে বলতে পারবে না, একসময় রেশমীচুড়ির রিনিঠিনি মধুর রােল; ঈশ্বর চট করে চোখ খুললাে। সামনে তাকিয়ে দেখলাে, সুন্দর স্বাস্থ্যবতী শ্যামল একটি যুবতী মেয়ে, কাজলবিলের ভােরবেলায় ডুবিয়ে স্নান করে বাড়ি ফেরার পথে কলসী কাখে ভেজা কাপড়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। ঈশ্বর দেখলাে, রেবতী। ভেজা শাড়ির তলা থেকে ওর সুডৌল উন্নত স্তনের দু’টি কালাে বোটা বেরিয়ে পড়েছিলাে; ওর ঠোটেমুখে যেন গভীর পরিতৃপ্তির কোমল ছায়া লেগে আছে।
ঈশ্বর আপন মনেই যেন উচ্চারণ করে, রেবতী।

রেবতী থমকে দাঁড়িয়ে ছিলাে, নড়ে উঠলাে; ঈশ্বরের মুখের দিকে একবার চেয়ে দেখলাে এবং চোখের কোণ থেকে একটা ছােট্ট কটাক্ষ হেনে ঘাসে ছাওয়া পথে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাে।
ঈশ্বর গাছের গুঁড়িতে একটু উঁচু হয়ে মাথাটা এলিয়ে দেয় এবং ঝিম মেরে পড়ে থাকে। এমন সময় কাছে পায়ের শব্দ, সে চোখ মেলে তাকালাে; দেখে দুই কাঁধের ওপর দিয়ে গামছা এবং বাঁ হাতের উপরে মাদ্রাজী লুঙি, আনসার আলী নিমড়ালে দাঁত মাজছে তার কাছে দাঁড়িয়ে, গােসল করতে কাজলবিলে যাওয়ার পথে, হ্যাঁ, এই তাে ঠিক। কী মনে পড়তেই সে তড়াক করে উঠে দাঁড়ালাে, এবং হাত জোড় করে কাতর স্বরে বলতে লাগলাে, আমারে মাইরাে না আনসারদা, আমারে হত্যা কইরাে না। আমারে পলাইয়া যাইতে দ্যাও। আমি পলাইতেছি।।

মুখ ভরে-ওঠা একরাশ থুথু থােক করে ফেললাে খাদের দিকে। আনসার যেন সস্নেহে হেসে উঠলাে, বললাে ঈশ্বরকে, শহর-বন্দর কইরা তােরও মাথা খুলছে। আমি খুব খুশি গত রাইতেও তাে পলাইয়া আছিলি, পলাইয়া যাইবার দরকার কী ? এভাবেই তুই থাক্। গেরাম ছাইড়া যাইবি না ঈশ্বর। খালি চোখ বুইজা থাহিস্‌। ঈশ্বর, তােরে আমার খুব প্রয়ােজন আছে।

বলতে বলতে আপন মনে হাে হাে করে হাসতে হাসতে কাজলবিলের দিকে চলতে থাকে আনসার। ঈশ্বর থ মেরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। কোথায় যাবে ঈশ্বর, বাড়িতে না বড়রাস্তায়, বুঝতে পারলাে না। ওই দূরে, গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, উঠানে টানানাে মােটা দড়ির উপরে ভেজা শাড়িটা মেলে ঝুলিয়ে দিচ্ছে রেবতী, শুকোবার জন্য। এখন বেশ রােদ আছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ