দোকানের সামনেটায় ঝাঁট আর জল ছড়া দিয়ে যুগলকে সকাল আর রাত একটা লোকহাসানি কাজ করতে হয়। আঙুলের ফাঁকে ধূপটা গুঁজে তাকে হেঁটে যেতে হয় বিশ বাইশ পাউড়ি। রাস্তার বাঁ হাতি শিবলিঙ্গের সাদা ধবধবে থানে। চাখরখানেক উঁচু বাঁধানো থানের সাইডে গেঁথে দেয় ধূপটা। এই এক কাহিনী, রাস্তার বাস টোটো সাইকেল বাইক আর আরও হাজার চোখ দেখে দেখে প্রাচীন আর সনাতন হয়ে গেছে। কেউ তার কাছ থেকে কথা লুকিয়ে রাখে না। সামনেই বলে ফেলে,
--শালা পাগলাচদা আর কারে কয়!
যুগলের কান পচে গেছে এইসব শুনে শুনে। তার জ্বালা কেউ বুঝবে না। মনে মনে চাট্টি গজগজ করে সে যা বলে, সেই বলার মাঝে কোনো ফাঁক নেই। কোনো অতি বলা নেই। কিন্ত সেই কথাগুলো তার ভেতরেই রাখতে চায় সে। যে ভয় থেকে তার এই ভাবনা আসে, সে কথা পাঁচজনের সামনে বলে দিলে তার মরে যেতে আর কতক্ষণ! আগুনকে যে সে ভয় পায়, সে কথা এক আগুনকে ছাড়া আর কাউকে জানানোর মত মূর্খ সে নয়। অগত্যা দুর্যোধন তার উরুযুগলে হাত চেপে দৌড় লাগাচ্ছে প্রতিদিনের জীবনের দিকে। আরো কিছুদিন মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে চেয়ে যুগল আগুনের ভয় লুকিয়ে রাখতে চায়।
পান বিড়ি সিগারেট আর খুচরো না থাকলে নিষ্পাপ মুখে কয়েকটা চকলেট ধরিয়ে দেওয়ার জন্য চার-পাঁচটা প্লাস্টিকের জার – এই নিয়ে হাত তিনেকের চওড়া একটা গুমটি। মানুষের পিছুটান যেমন মায়া রেখে যায়, গুমটির পেছন লাগোয়া তেমন একটা ঘর। একটা মানুষের শোয়ার মাপের। পাটকাঠির ছাউনি। পাটকাঠির দেওয়াল।
যুগলের যত ভয়, এই ঘুমিয়ে থাকার জায়গাটা নিয়েই। এমনিতে এই এলাকায় তার কোনো শত্রু নেই। কিন্তু বলা তো যায় না! কবে কখন হয়তো খদ্দেরের মুখের ওপর ঝামটা দিয়েছে কিংবা বাকি পড়ে থাকা লোককে পান না দিয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছে! এমনকি অতি সাধারণ কোনো ব্যাপারেও সে যেন একটু বেশিই সাবধানে চলে! কিছুই না, শুধু বিড়ি কিংবা সিগারেটের শেষতক যতটুকু ধোঁয়া নেওয়া যায়, নিয়ে হয়তো ফেলে দিল যুগলের ঘুমের দেওয়ালে! ব্যাস, আর কী চাই! এই বয়স – এই শরীর! মাটিতে গর্ত খুঁড়ে অক্ষত থেকে পরের দিন সকালে বীর অর্জুন! একা যুগল নিশ্চিত জানে, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ছাই হয়ে যাবে সে।
কিন্তু তার এই ভয়ের কথাটা কাউকে বলা যায় না। কেবল নিশ্চিন্তে নিরাপদে ঘুমোবে বলে সারাদিন আগুনের কথা ভেবে ভেবে মানুষকে তোয়াজ করে চলে। কোঁকড়ানো তেল চিটে চুল। কান ঝাঁপিয়ে থাকে। মাঝবয়সী মেদ আর মেদের ভাঁজ যুগলকে সাধারণ করে রেখেছে। অসাধারণ কেবল তার চোখদুটো। তীক্ষ্ম সতর্ক। যেন ছেচল্লিশ সালের অলিগলিতে ঘাপটি মেরে থাকা ভীত আর ভেদী দৃষ্টি! মুখে হাসি রেখে শুধু এই চোখগুলো দিয়েই তাকে বুঝে নিতে হয়, কার চোখ কী বলতে চায়।
একটা সিগারেট দেখি…
মুখে হাসি নিয়েই ছিল যুগল। অথচ সকাল থেকে পান পাতাগুলোতে জল ছড়াতে ভুলে গেছে! একটু সময় নিয়ে বাঁ হাতটা নুইয়ে ময়লা আয়রন থিতানো বোতলটা তুলল। ছিপিটা একটু লুজ করে হাল্কা হাসি ছিটিয়ে দিল সে--
এখিনে নতুন?
হ্যাঁ, কালকেই এসছি।
থাকার জন্যে!
হ্যাঁ।
নিচের দিকে না তাকিয়েই আন্দাজে বোতলটা রাখল যুগল। চোখের আড়াল হলেই একটা অঘটন ঘটে যেতে কতক্ষণ!
এই বাজারে দিন দিন এমন কত নতুন নতুন লোকের যাতায়াত লেগেই থাকে। বিক্রি যে বাড়েনি তা নয় কিন্তু যুগলের ভয়টা ত অমূলক নয়! মনে মনে সে প্রায়ই বলে,
"এই শালা মারানির লটারির দোকানটা!"
দশ-বার খানা মানুষের মাথা সহজে গিলে ফেলতে পারে এমন একটা বিরাট ছাতার তলায় টেবিল পাতা আছে। কালীঠাকুরের ফটো আর জবা ফুলের সামনে লাইন দিয়ে বিছানো আছে লটারির টিকিট। গাছি গাছি ধূপের ধোঁয়া দেওয়া যেন রীতিমত একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেমন ধোঁয়ায় ভরে গেলে ভাগ্যান্বেষীরা নির্লজ্জায় ভাগ্যটা এদিক সেদিক করে ফেলতে আসে। যুগলও ওখানে যায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। দেখে বোঝার চেষ্টা করে। বিক্রি হয়ে যাওয়া টিকিট আর জিতে যাওয়া সংখ্যাগুলো মেলায়। এক আধবার যেন বোঝা শোনার শেষ অব্দি পৌঁছে গেছে সে, এরকম ভেবে কয়েকটা টিকিট কেটেও ফেলে। তারপর সামনে যাকেই পায়, বলে,
"আমানকের শালা, পাথরচাপা কপাল।"
এক দুঃখে অপরকে টানতে পারার মধ্যে যে কষ্টের লাঘব আছে, এতদিন পানের উপর খিঁচ দিয়ে দিয়ে বুঝে গেছে যুগল। তার ভয় হয়, কেউ নিজের ভাগ্যের উপর ক্ষেপে গিয়ে যদি তার এই প্যাকাটির সুখটাকেও জ্বালিয়ে দেয়!
তার সামান্য কয়েকটা রোজগার আর একমাত্র যাহোক তাহােক একটা জীবনের ভয় তাকে কেবল ওই লটারির স্টলটা নিয়েই বলতে অনুমতি দেয়।
এমনিতে কেউ সিগারেট চাইলে তাকে অনেক সময় ধরে খুঁটিয়ে নাড়িয়ে দেখে নেয় যুগল। তাই এখন পানে জল ছড়ানোর ভিজা হাতটা ছিঁড়া ন্যাকড়ায় মুছে আড় অথচ তীক্ষ্ম চোখে দেখে নিচ্ছে আগন্তুককে। আর খুব সন্দেহজনক কাউকে যে কথাটা সে বারবার শোনাতে চায়, বলেই ফেলে
"এইযে খালটা দেখঠ! এখিনে একবার গান্ধীজি আসথল। এখনও নাকি আইসে…"
ব'লে পশ্চিমমুখো গুমটির বাঁ পাশের ছিপছিপে জলের খালটা দেখিয়ে দেয়। সিগারেটটা আগন্তুকের হাতে ধরানোর আগে যেন একটা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দিল যুগল। আর এদিকে ব্যস্ততার ভান করে আগন্তুককে নজরেই রেখে গেল সর্বসময়। অর্ধেক পুড়ে যাওয়া সিগারেট হাতে নিয়ে বাজারের উত্তর দিকটাতে হেঁটে গেল যে, অন্য দোকান থেকে আবার একটা সিগারেট কিনে ফুঁকতে ফুঁকতে যুগলের ঘুমে ঢুকে যেতে কতক্ষণ!
বলে তো ফেলল, কিন্তু এখন আবার প্রতিবারের মত যুগলের মাথায় কিছু সময় ঘর বেঁধে থাকবে গান্ধীজির আগমনের ভাবনাটা। এই একটা মাত্র ঠুটো অস্ত্রে সত্যিই কাউকে আটকানো যায় কিনা সে জানে না, তবে আতঙ্ক সারা গায়ে চারিয়ে গেলে কথাগুলো আপনিই তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে।
সুবল মাস্টারের মা দেখেছিলেন, গোটা নৌকাটা পশ্চিমের লাল রোদে একদম রক্তাক্ত হয়ে ছিল। আর তারই মাঝে ধেপে যাওয়া একটা মানুষ! ওরকম অক্লান্ত দাঁড়িয়ে থাকা পা-গুলোর পাশে ছিল একটা ছাগল। এলাকার বেশিরভাগ লোক, যারা খালের ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল শুধু নাকি ওই ছাগলটা দেখার জন্যই, হাঁ কেড়ে রয়ে যায়! ছাগলটা তাদের ঘরে ঘরের ছাগলের মতই! সাদা ধপধপে নয়! সারা গায়ের লোমে লোমে কাদা আর নেড়ি চিটে আছে! থাকার মধ্যে শুধু একটা টনটনে ছাঁদ!
অমনি খালপাড়ে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে থাকা লোক ঘরে ফিরে একে অন্যের ছাগলকে আদর করে কোলে তুলে নিতে চাইল! শেষ দেখা দেখল, গান্ধীজি তাদের সকলের দিকে জোড়হাত করে হাসিমুখে চেয়ে আছে। আর বিকেলের রক্তমাখা রোদ মুখে নিয়ে সে ভেসে যাচ্ছে পশ্চিমের স্রোত ঠেলে। পেছনে পড়ে আছে ভরা খালের শান্ত সহজ জল।
সেই কবে সুবল মাস্টার যুগলকে গল্পটা শুনিয়েছিল। মাস্টারের পাকা ঘর, সরকারি বেতন বলে সেসব কথা তেমন মনে নেই কিন্তু যুগলের পাই টু পাই মনে আছে। মনে রাখতে হয়েছে।
এখন কেউ কেউ ভরা বাজারে চিল্লিয়ে যুগলের সাথে মজা করে,
"তোর গান্ধীজি আসেঠে বে! তুই বারাউনি!"
কীসের যেন তালে থাকে যুগল! দৌড়ে বেরিয়েও যায়। সন্ধ্যার মুখের সময় বলেই হয়ত! খালের উপর আড়াআড়ি পোলটার কাছে আসতেই সে মনে মনে বলে ফেলে, প্রতিবার --
ধুস, সুবল মাস্টারের মা-ই ত কবে মরে ভূত হয়ে গেছে!
তবুও গেল। মজা পেতে চাওয়া লোকগুলো ত তাকে দেখছে! অন্তত তারা একটু মজা লুটুক। নাহলে আবার বলবে--
"যুগলাটা ত দিন দিন বেশ ধাঁদু হয়ে যাচ্ছে! কে বলে, মালটা হাবা!"
ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে এমনি এমনি খালটা বরাবর পূর্ব দিকে তাকিয়ে থাকবে। দেখবে আর কী! এখন এমনকি যুগলও খাল দেখতে গেলে খাল তো দেখে না! খাল মরে গেছে। হেজে হেজে রোগা। জল ছিপছিপে হয়ে কচুরিপানা ঢেকে গেছে তাতে। ওই স্থির একরকমের জিনিসটা মানুষের চোখ টানবে কেন? খাল দেখতে গেলে প্রথমেই যুগলের চোখে পড়বে কেউ না কেউ খাল-পাড়ের রাস্তা ধরে খালি গায়ে বাইক চালিয়ে ধান জমি থেকে ফিরছে। পেছনে সারের খালি বস্তা বাঁধা। কিংবা কোনো উঠকো ছেলে পাড়ের জুন ঘাসের আড়ালে বসে, যদিও তেমন আড়াল পাবে কোথায়, বসে বিড়ি নাহলে গাঁজা টানছে।
আর ইদানীং তাকে অবাক করে কচুরিপানাগুলো। এর আগেও তার নজরে পড়েছে, আজও। ছিপছিপে জল পেয়ে কচুরিপানার নীল ফুলগুলো কেমন লকলকিয়ে ফুটে থাকে! ঠিক এমন সময়টাতেই ফোটে! তারপর সারারাত নিশ্চই ওরা জেগে থেকে মানুষের ঘুমের ঘোর দেখে! অথচ সকালে বেমালুম ভ্যানিশ!
-- দেখ্যা আলু?
মজারু কতগুলো লোক যেন এতক্ষন যুগলেরই আশায় দাঁড়িয়ে বসে ছিল। যুগলও প্রতিদিন প্রতিবারের মত এক কথা বলবে, বলতে বলতে অমায়িক হাসবে --
"হাঁ।"
--ধুস শালা, পানা কাট্যে কাট্যে তোর গান্ধী বুড়ার নৌকা আসবে!
হাসতে হাসতে গুমটির ভিতর ঢুকে যায় যুগল। এইসব হাসিগুলোর ভেতরে একটা প্রশ্নই বারবার থেকে যায় তার, দিনের বেলা ফুলগুলার কুনো চিহ্ন থাকেনি কেন! সবাইকে জিজ্ঞাসাও করতে পারে না। সুবল মাস্টারের কাছে জানা যেতে পারে। কিন্তু আজকাল মাস্টারকে আর বাজারে দেখতে পাওয়া যায় না।
মাস্টারের দকান নাই -- ঝাঁপ বন্ধ হবার ভয়ও নাই। চাষও করতে হয়নি যে -- কাউকে কিছু কইলে জল বন্ধ হয়্যা যাবে। পাকাঘরের খামারেউ কোথাউ প্যাকাটি রয়নি -- মাস্টারের কীসের চিন্তা!
নাকি মাস্টারেরও ভয় করে! অন্ধকার আলো কোনো সময়ই-- হ্যাঁ বেশ কদিন হল মাস্টারকে বাজারে দেখা যায়নি!
এখানে বাঁচার চেয়ে মরা অনেক সহজ বলে -- এইসব আর এইসব ভয়ে চিন্তায় ভাবনায় যুগলের দিনগুলো তবু দিব্য কাটে। ধূপ গাড়া শিবের থান, গান্ধীকথা আর হাসি মুখের সাত-পাঁচ হীন সাবধানতা তাকে টিকিয়ে রেখেছে এখনও।
বর্ষা এলে খালের জল বাড়ে। জলের সঙ্গে সঙ্গে উঁচু হয় কচুরিপানা আর তাদের অন্ধকারিক রঙিন ফুল। শীতকাল এলে মানুষের পোশাক আরো ভারী হয়। পোশাকের ভেতরে শরীর ছাড়াও আর কিছু আছে কিনা বুঝতে বেগ পেতে হয় যুগলকে।
লটারির দোকানটায় বিক্রি বাটা বেড়েছে, এই বয়সে ভাগ্যকে না পরীক্ষা করলেও চলে কিন্তু
পাঁচজনের সঙ্গে মিলেমিশে রইতে হবে ত!
শুধু একটা ব্যাপারে যুগলকে মুহুর্মুহু সাবধান থাকতে হয় --
কাউকে কিছু কওয়া যাবেনি...
এরই মাঝে একদিন যুগল মনতুলা করে সুবল মাস্টারের ঘরে গিয়েছিল।
--নবীন কালকে পান দিয়া আসেনি। সোউটা লিতে আসথিলি। ভাবলি, একটু দেখা করিয়া যাই।
সুবল মাস্টার তাকে বসতে দিয়েছিল। কথায় কথায় আসল কথাটা পাড়ল যুগল।
মুখে একটু হাসি মাখিয়ে মাস্টার বলল,
"ভালো কাজের জন্য অন্ধকারের দরকার পড়ে রে …"
যুগল এই উত্তর বুঝল না। এরকম হেঁয়ালি শোনার জন্য ত সে মাস্টারের কাছে আসেনি! যেহেতু খাল আর নৌকায় ক'রে আসা গান্ধীজির সেই চিরসত্যিটা তাকে বিশ্বাস করতে হয়। লোককে বিশ্বাস করানোর মত করে যাকে বলতে হয়, খাল ঢেকে রাখা ফুলগুলোর রহস্য সে জানবে না!
বাবার একটা ষাঁড় ছিল। বাবার দুটো ষাঁড় আছে। বাবার অজস্র ষাঁড় হবে। পালা করে তাদের মত করে তারা বাজারের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। কবে কার বুদ্ধি ধরেছিল, অনেক সুবিধা আছে হিসাব করে থলথলে গলকম্বল থেকে নধর পাছা অব্দি এঁকে দিল ভোট প্রচারের বিজ্ঞাপন। কখনো দলের প্রতীক, কোনো ইস্যুর পর ইস্যু আঁকা থাকে সারা দেহে। ঘুরে বেড়ায় ধর্মের ষাঁড়েরা। রাস্তা বাস টোটো দোকান থেকে মানুষের পর মানুষ হামলে পড়ে। অথচ কাছে যাওয়ার সাহস নেই। সবার চোখে মুখে অবাক লোভ। কেউ কেউ নাকি এসব দেখে ঘরে গিয়ে বউয়ের কাছে ষাঁড় হয়ে শব্দ তোলে। চলাফেরার আর কালো শিং নাড়ানোর অভ্যাস করে। যেহেতু ষাঁড়গুলো বাবার, ভক্তিভরে মাথা নোয়ায় কত লোক-- বউয়েরা তাদের মরদের কাছে।
এই এই দিনগুলোতে যুগলের হাত সরে না। ভয়ে ভয়ে ষাঁড়প্রণাম সেরে খদ্দের ছাড়ে। চুন দিয়ে অনেকক্ষণ পাতায় পাতায় ঘষে। এক্ষুণি যেন আগুন তার প্যাকাটির ঘুমে ছাই ঢেলে দেবে। বাবার ষাঁড়েদের হেঁটে যাওয়া যে রেশ রেখে যায়, মানুষের যে ষাঁড়ের মত হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছে, তার একটা নমুনা রেখে যেতে তারা হয়তো যুগলের দোকানটাকেই টার্গেট করবে! বাবার প্রসাদ নিয়ে প্রমাণ তো করতে হবে, তারাও বাবার পরম ভক্ত।
আর কত সাবধানে থাকতে পারে একটা মানুষ! প্রতিদিন নতুন নতুন আতংকের জন্ম নিয়ে মানুষ কেমন ছোঁয়াঁচে হয়ে যায়! যুগলের মতই নাকি বাজারে ঘুরে বেড়ানো কারো কারো গাঁটের ব্যথাটা সারা গায়ে ছড়িয়ে গেছে। এইটুকু দোকানে গ্যাঁট হয়ে সারাদিন বসে থাকার অজুহাতে যুগল, হাঁটু মুড়ে ষাঁড় হতে গিয়ে বাবলা -- গাঁটের ব্যথা আরো কতজনের। এমনকি লটারির দোকানি একদিন বলেই ফেলল,
"যুগলদা পায়ের ব্যথাটা আমাকেউ দিয়া দিল!"
সেদিন বিকেলে লটারির স্টলে গান বাজছে জোরে জোরে আর স্টলটা ছুটছে জলের মত --
"দূরে রব কত আপন বলেরও ছলে…"
লোকের লোকের মুখে মাইঝি দেখা আলোর মৃদুতা। একটা একটা অনেক বিস্ফোরণ খেয়ে গেল তারা। রাস্তার ধারে একটা পুরানো ঘরের নির্মাণকাল ঠাটিয়ে আছে ১৯৪-। শেষের সংখ্যাটা উড়ে গেছে ইতিহাস নিয়ে। সজনে খাড়ার মত একা ঝুলছে একটা আকাশ। মার মার কাট কাট লাল বাতাস মহিলা যাত্রীদের মুখ কুঁচকে দিচ্ছে। আর হঠাৎ করে যেমন উদয় হয়, তেমনই গম্ভীর আবির্ভাব ঘটল একটা এঁড়িয়ার। উপচে পড়া চোখ আজ আর একটা নতুন প্রতীক খুঁজে পেল। চলন্ত ষাঁড়টার গা ধরে এঁকে বেঁকে বসে আছে একটা ছবি। পুরুষ না স্ত্রীলোক-- ষাঁড়ের দাবনার অস্থির ভাঁজ কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না। কেউ কেউ শুধু আঁচ করে বলতে পারল,
"ছবিটা মনে হয়, সুবল মাস্টারের মায়ের। আমানকের এলাকার সবচাইতে পষ্ট গান্ধীস্মৃতি মনে রাখার মানুষ।
আবার কেউ কেবল চশমার একটা ডাটি বোঝা যায়, এমন অজুহাত দিয়ে বলে ফেলল,
বুঝাই যায়ঠে, এটা গান্ধীজি।"
কিন্তু নিমেষের মধ্যে সব লোক কেমন মুষড়ে গেল, যখন তারা একটু ভাবার সময় পেল যে, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী -- প্রধানমন্ত্রীও চশমা পরেন।
একে একে সবাই বুঝতে পারল, গলার কত্ত সামনেই আঁত থাকে।


3 মন্তব্যসমূহ
আপনার গল্পে এত আঁকবাঁক, মোচড় আছে, পড়তে পড়তে ধাক্কা খেলাম হোঁচট খেলাম। গভীর চিন্তন,অর্ন্তভেদী দৃষ্টি ফেলে তুলে এনেছেন সমাজের অসারত্ব,অন্তঃসারশূন্যতা।আজকাল অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টি ষাঁড়ের গায়ে লেপ্টে আছে।
উত্তরমুছুনখুব ভাল গল্প
উত্তরমুছুননির্মাণরীতির মুনশিয়ানা মুগ্ধ করে !
উত্তরমুছুন