বই নিয়ে আলোচনা : সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প--দেখা-অদেখার অনাবিষ্কৃত এক ছায়া



বই- দেখা অদেখার গল্প

লেখক- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
প্রকশনী- অন্যপ্রকাশ
প্রকাশকাল- ২০২২

আমাদের বাস্তব জীবনের দুটো দিকই হয়তো বিদ্যমান, তা হলো- দেখা কিংবা অদেখা। এর ভেতরে বাস করা, কখনও ঘাপটি মেরে থাকা আবার কখনও সত্যিকারের ছায়ারূপে আবির্ভূত হওয়া, এরকম ছায়ার উপস্থিতি পাওয়া যায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ২০২২ বইমেলার সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পগ্রন্থ ‘দেখা অদেখার গল্প’ বইতে।

বইয়ের একেকটি গল্প নিয়ে আলাপ করার আগে অনাবিস্কৃত ছায়া সম্পর্কে ধারণা দেয়া যায়। প্রথম গল্পটার নাম ‘ফুলি’। এক শব্দের নামে তেমন স্পষ্ট কিছুর আভাস নেই। কোন গ্রামীন কিশোরী মেয়ের নামও হতে পারে আবার ফুলি ট্রেইলার নামে কোন দর্জির দোকানও থাকতে পারে। গল্প আমাদের ধীরে ধীরে জানায়, ফুলি মুলত একটি গাভীর নাম। যে কিনা কিছুদিন আগে বাছুরকে হারিয়ে অবসাদগ্রস্থ হয়ে চোখ বুজে থাকে। গল্পের নায়ক ফজলু গাভীটিকে গোসল করাতে করাতে ভাবে, মানুষের মত গরুও আদতে অবসাদে ভোগে কিনা। ছোটবেলায় বেড়াতে যাবার সময় চলন্ত বাসের উপর পাহাড় ভেঙে পড়ার যে স্মৃতির ছায়া ফজলুকে তাড়িয়ে বেড়ায়, গরু আদতে কি চোখ বুজে নিজের বাছুরের সেই ছায়া দেখতে পায় কিনা, তা ফজলুকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। খানিক সময়ের জন্য ফজলু নামক মানব আর ফুলি নামের গৃহপালিত গরুর মধ্যে সূক্ষ্ম এক স্মৃতির বন্ধন যখন তৈরি করা হয়েছে, তখন সেখানে তাকালে বোঝা যায় সেটি মুলত স্মৃতির একটি ছায়া। যেই ছায়াকে হয়তোবা আবিস্কার করা হয়নি এখনও। এমনকি গল্পের একদম শেষ দিকে, যখন সন্ত্রাসী ক্যাডারের ছত্রছায়ায় থেকেও সত্যি সত্যি পুলিশের মুখোমুখি হতে হয় ফজলুকে, তখনও পুলিশের বন্দুকের উঁচু করে রাখা নল আর ফজলু- এই দুয়ের মাঝে জেগে উঠে একটি গরু সদৃশ সত্যিকারের কিছু, যা মুলত ফুলির ছায়া ব্যতীত আর কিছুই নয়। ছায়াকে সঙ্গী করে ফেরা গল্প এই বইতে শুধু এটিই নয়।

তাহলে চলুন অনাবিস্কৃত ছায়ার আরেকটা গল্প বলা যাক। গল্পটার নাম ‘রঙিন দরজা’। খুব সাধারণ একটা জীবনের গল্প। সারাজীবন খেটেখুটে মানুষ করা ছেলে এখন আর খোঁজ নেয় না। কিংবা ছোট মেয়ের বাড়িতে পরিবার সমেত উপস্থিত হলে তারা রাগ করে। এরকম ‘না পাওয়া’ জীবন নিয়ে একটা ইলেক্ট্রিক দোকান চালিয়ে যায় মোকসেদ আলী। তার দোকানে কাজ করা বিপ্লব নামের ছেলেটা বেশ ভালো আঁকিয়ে। সন্ধ্যার পর মোকসেদ আলীর স্কুলের সময়কার বন্ধুরা আসে আড্ডা দিতে। জীবন নিয়ে তাদেরকে বড্ড হতাশ বলেই মনে হয়। গল্প এভাবে যে এগোচ্ছে, যা মোকসেদ আলীর আপাত দুঃখ নিয়ে গল্পটি আবর্তিত হচ্ছে বলে মনে হলেও, বিপ্লব নামের ছেলেটির আঁকাআঁকির দক্ষতা গল্পকে অন্য দিকে মোড় নেবার খানিকটা ইশারা থেকে যায়। খুব দ্রুতই গল্পের মুল ছায়ার আগমনের দৃশ্য এসে উপস্থিত হয়। দোকান ঝাড়-মোছ করার পর ভেতরের এক দরজার উপর বিপ্লব দারুণ কিছু আঁকে এবং ভাবে যে, হয়তোবা তাদের মালিক মোকসেদ আলী এটা দেখে ধমক দিতে পারেন। কিন্তু মোকসেদ আলী ধমক দেন না; বরং দরজার উপর আঁকা ছবির দিকে শুধু তাকিয়ে থাকেন। এমনকি বহুদিন ধরে শয্যাশায়ী স্ত্রী আলেয়াকে তিনি জানান, তার আর শুয়ে থাকতে হবে না; বরং তাকে হাত ধরে হাটিয়ে দেখতে নিয়ে যাবেন দোকান, যেখানের দরজার থেমে আছে কোন এক জীবনের জলচ্ছাস।

কিন্তু সন্ধ্যা বেলায় বরাবরের মত যখন মোকসেদ আলীর বন্ধুরা আসে, কেউ কেউ ক্রাচে ভর করে দরজার দিকে তাকিয়ে ভেতরের গুদাম ঘরে প্রবেশ করে, ধীরে ধীরে সবাই সেখানে ঢুকে পরে। বাইরে থেকে বিপ্লবের মনে চলতে থাকে বিভিন্ন দোলাচল। কিন্তু গুদাম ঘরের মত কোন অন্ধকারচ্ছন্ন জায়গায় ঢোকার জন্য মোকসেদ আলীর বয়স্ক বন্ধুদের ভেতরের ছায়া এতদিন যে দ্বার খুঁজছিলো, বিপ্লব এঁকে সেই দরজাই তৈরি করেছে মাত্র। যার মধ্যে প্রবেশ করে বয়ঃপ্রাপ্ত মোকসেদ আলীর বন্ধুরা ছায়া বনে যায় মুহুর্তেই।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখা ‘দেখা অদেখার গল্প’ নামের এই বইতে ভাষার নান্দনিকতার বেশ কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি উদাহরণ দিয়ে আবার অনাবিস্কৃত ছায়ার দিকে মুখ ফেরানো যেতে পারে। ‘বুলবুলি’ নামের গল্পটি শুরু হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ শব্দের বিশাল বাক্য দিয়ে। গল্প আরেকটু এগোলে এরকম বাক্যের আরও দেখা পাওয়া যায়। যেমন, গল্পকার এই গল্পে লিখছেন- ‘তারপরেও চার-পাঁচ কথায় একটা ইশারা দিয়ে দেখা যাকঃ ওপরতলার একগুঁইয়েমি আর বিশ্ব ঐতিহ্য নিয়ে আদিখ্যেতা, মাত্র স্কুলে নাম লেখানো মেয়েটার জ্বর এবং ঢাকা থেকে ফোনে কয়েকবার কাতর কণ্ঠে তার ‘বাবা তুমি না এলে জ্বর সারবে না’ ইত্যাদি শোনা, হাফসা বানুর মুখে তাঁর মতো নানির অসহায় মুখটি ভেসে ওঠা- যে নানি অল্পবয়সে বিধবা হয়ে ঝাঁসির রাণির মতো যুদ্ধ করে হাকিমের মা আর মামাকে মানুষ করলেন অথচ ওই মামাই বিয়ে করে বাড়িতে নতুন মামি নিয়ে আসার ছ’মাসের মাথায় এক কাপড়ে নানির বিদায় হওয়া- জাতিসংঘের সংস্কৃতি অনুদান কীভাবে কোথায় খরচ হবে, কারা নাটমণ্ডলের ইটের কার্বন ডেটিং করতে প্যারিস যাবেন তা নিয়ে রেষারেষি শুরু হয়ে যাওয়া, বিদেশ থেকে উন্নত খননযন্ত্র কেনার কাণ্ড বাঁধিয়ে অনেকের আগেই গুছিয়ে নেওয়া, এবং এরকম আরও অনেক সাতপাঁচ ভাবনা।‘

১২০ শব্দের বিশাল এই বাক্যের মত, যাকে বলা যায় অনেকগুলো ছোট বাক্য মিলিয়ে লেখা বড় একটি বাক্য, বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন লেখক যেমন উইলিয়াম ফকনার বা আমাদের অঞ্চলের শহীদুল জহির ব্যবহার করতেন। এটি যে শুধুই বাক্যের আকার নয়; বরং একটি জীবনকে ঘিরে বিশাল ঘটনাগুলোর আবর্তন এবং একটি ব্যপ্তির মধ্যে আটকে থাকা ব্যক্তির জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।

দেখা অদেখার গল্প বইয়ের চরিত্রদের ব্যক্তিত্ব শিক্ষিতও বটে। গ্রামীন ধনী কোন লোকের বাড়ির পুকুর কাটতে গিয়ে যখন প্রাচীন আমলের কোন পাথর পাওয়া যায়, যার উপর খোদাই করে লেখা অজানা ভাষার কিছু। সেটি পড়তে পারার মত শিক্ষিত চরিত্র আছে গ্রামের মাদ্রাসাতেই। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের এই বইয়ের গল্পের চরিত্ররা হুমায়ূন আহমেদ পড়ে। এমনকি ‘ভুবনপুরের প্রজাপতি’ গল্পে ছেলে রাজুকে তার বাবা কাফকার গল্প শোনান৷

গল্পগুলোর ভাষার আচরণের সঙ্গে চিত্রকলার খানিকটা সাদৃশ্য আছে। ধরা যাক, যেসব অঙ্কিত চিত্র অবয়বধর্মী হয়, সেগুলো দর্শক খুব স্বাভাবিক ভাবেই উপরের অবয়ব দেখে এর একটি গোছানো দৃশ্য কল্পনা করে নিতে পারে। কিন্তু অবয়বের আড়ালে ভেতরের যে চিত্র সেখানে সাধারণত থাকে প্রতীকি বা চিত্রকলার ভিন্ন ভাষার ব্যবহার। আদতে এই যে একটি ছবির দুটো ভিন্ন দিক, যেই দিকটিই দর্শক আবিস্কার করুন না কেন, মুলত ছবির ভাষার শক্তিকেই প্রকাশ করে। তবে ছবির অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গূঢ় ভাষা ছবিটিকে শিল্প হিসেবে আরও বেশি টেকসই করে তোলে সময়ের নিরিখে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সমালোচনাধর্মী লেখাগুলো বেশি পরিচিত হলেও কথাসাহিত্যে তিনি যেই ন্যারাটিভ ব্যবহার করেন তা খানিকটা চিত্রকলার এরূপ ভাষার মতই। বিশেষ করে এই বইয়ের প্রায় সবগুলো গল্পেই এরকম ন্যারাশন দেখতে পাওয়া যায়। যেহেতু পাঠকের আবহ ও পরিবেশের উপর অনেক সময় গল্পের পাঠ প্রতিক্রিয়া পাল্টে যায়, সেহেতু গল্পের অবয়ব কিংবা নিম্নতলের অন্য গল্প- এই দুইয়ে মিলে পাঠকের পাঠ অভিজ্ঞতাকে বেশ সুখকর করে তোলে। সবচেয়ে বড় কথা, গল্প বলার জন্য যতটুকু আশপাশের দৃশ্য নির্মান করা প্রয়োজন, সেটুকু পরিমিত ভাবে তৈরি করার একটি প্রবণতাও দেখা যায় বইতে। এই ব্যাপারটিকেও খানিকটা চিত্রকলার ক্যানভাসের সঙ্গে তুলনা করা চলে। ছোটগল্পের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে পাঠক বুঝতে পারবে, গল্প শেষ হলেও আখ্যানটি শেষ হয়নি। অথবা যেই দৃশ্যকল্পের মধ্য থেকে খানিক অংশটা গল্প হিসেবে বলা হলো, তার বাইরেও রয়ে গেছে অনেক কিছু, যেমনি মনে হয় একটা বিশাল কলেবরের দৃশ্য থেকে ক্যানভাসে আটকে দেয়া হয়েছে ছোট একটি দৃশ্য।

তবে পুরো বইজুড়ে এখন পর্যন্ত আবিস্কার না হওয়া একটা ছায়ার যে চলাফেরা, তা খানিকটা প্রকাশিত হয়ে যায় ‘মোহর’ নামক গল্পে। মাছ ধরায় নেশাতুর হারুন সাহেব এবং তার বন্ধু জুয়েল, যে কিনা মাছ মারার জন্য পরিবারের সঙ্গে তৈরি করেছিলো দূরত্ব, এবং তার জীবন অবসান ঘটেছিলো ধানমন্ডি লেকে মাছ ধরার পর পানিতে ভেসে ওঠা লাশ দিয়ে। মৃত্যুর পরেও হারুন সাহেব যখন মাছ ধরে তখনও তার পাশে জুয়েলের ছায়া বসে থাকে। একটু-আধটু প্রশ্নের উত্তর দেয়। জীবিত থাকতেই বিচ্ছেদ ঘটা স্ত্রীর বর্তমান অবস্থা শুনে অভিমান করে ছায়া। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার এই ছায়ার হাহাকার এই প্রশ্ন রেখে যায়, দেখা কিংবা অদেখার মাঝেও থাকতে পারে আরেকটা জগত, যার ইশারা তোমরা জীবিত থাকা অবস্থায় দেখতে পাওনা। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এই বইয়ের গল্পের খাতিরে, হাত দিয়েছেন ঠিক তেমনই কোন অন্ধকার জগতে, যেখানে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার স্থানে আটকে আছে কোন নাভীশ্বাস।









একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ