আজম ভাই, ঘুমাল্যা নাকি ! আজম ভাই , ও আজম ভাই … !
কাকমারি চর যেতে চোখে পড়ে বিশাল মাঠ । মাঠঘেষা মেটে রাস্তার একপাশে ছোট্ট মোড় । মোড়ের শরীর জুড়ে বেশ কয়েকটা দোকান, রাস্তার একপাশ দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাথাতুলে দাঁড়িয়ে আছে । স্থানীয় মানুষের একমাত্র সান্ধ্য আড্ডার জায়গা । রাতের কালো সাঁঝের স্তিমিত আলোকে ঢেকে ফেলার আগেই বিলের বুক ছুঁয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে শীতল বাতাস শনশনিয়ে ধেয়ে আসতে শুরু করলে বাজার জেগে ওঠে । দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা আকাশে বাঁধা পেয়ে ফরফরে হাওয়ার এ যেন এক মজাদার মোহনা । সে মজা নিতেই আড্ডা প্রিয় মানুষ জমায়েত হয় ; বিশেষত চায়ের দোকানগুলোতে । একপ্রান্তে আজম শেখের সাজানো গোছানো ছোট্ট দোকান । দোকানের সারা দেওয়াল জুড়ে চোখ ধাঁধানো সাদা সাদা কাপড়ের বাণ্ডিল । সামনের দিকে কাচের সেলফ জুড়ে ছোটো ছোটো কাচের শিশিভর্তি নানান সুগন্ধি, থরে থরে সাজান । এসব দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। অথচ এতো কিছু জিনিস সাজিয়ে যে আয়োজন তা কেবল মৃত মানুষের জন্য ! কোন গ্রামে কোন মানুষ মরবে সেদিকে তাকিয়েই পসরা নিয়ে বসে থাকে আজম । ডাকাডাকির আওয়াজ শুনে এবার আজম ধুমমুস করে উঠে বসে, বসেই লুঙ্গির বহর গুছিয়ে নেয়। সত্যি সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। জড়ান গলায় জানতে চায় , কেডা মল্ল গো?
এমন কথা শুনে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই । আজম জানে, একমাত্র মৃত মানুষের আত্মীয়স্বজনই তার কাছে আসে । তাদের সাথেই আজমের আত্মীয়তা, রুটিরুজির সম্পর্ক । এ চত্তরে সাহেবনগর, ধনিরামপুর, খয়েরতলা, বামনাবাদ, চর কাকমারি , নতুনপাড়া, নবীনগ্রাম, রমাকান্তপুর বিশেষ করে পদ্মার ভাঙ্গনে বিধ্বস্ত হয়ে উঠে আসা মানুষের গড়ে তোলা যত গ্রাম আছে, সেসব গ্রামের যত মানুষ মরে , তাদের অন্তিমকালের কাপড়ের যোগান আজমকেই দি্তে হয়। কাফনের সাথে আতর, গোলাপজল, সুরমা, আগরবাতি দাফনের সাতসতের । তাই রাত নেই, দিন নেই, ডাক পড়লেই ছুটে আসতে হয় । দোকান খুলে দাফনের সামগ্রী সাজিয়েগুছিয়ে দিয়ে তবেই নিস্তার । কখনও কখনও মানুষের আবদারে কাফন কেটে দাফনানোর উপযোগীও করে দিতে হয় । পুরুষ মানুষের জন্য লুঙ্গির মতো একখন্ড, জামার মতো এক খন্ড এবং পুরো শরীরটা ঢেকে জড়িয়ে বাঁধার জন্য চাদরের মতো এক খন্ড, মোট তিনটি ভাগে কাফন ভাগ করতে হয়। স্ত্রী মানুষের জন্য একই ভাবে তিনটি পার্টে কাফন কাটা হয়, তবে অতিরিক্ত একটি খন্ড মাথায় হিজাবের মতো করে পরিয়ে দেওয়া হয় । মৃত্যুর পরেও নারীর আব্রু বজায় রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা আরকি। বিগত কয়েকদিন তার মনের অবস্থা ভালো নয়; আজ বিকেলের পরে শরীরটা কেমন ঝিমিয়ে আসে তাই আজম নিজেকে এলিয়ে দেয় । কিন্তু এমন অসময়ে ঘুমে আচ্ছন্ন থাকতে দেখে আগন্তুক বলে ওঠে, ভাই এখুন ঘুমাছেন ক্যানে ? মগরবের নমাজ পহড়বেন ন্যা?
--- আরে ভাই চোখদুট্যা জুড়্যা আস্যাছিল ! এটুধান গড়া মারতে যায়েই কাজ মার্যাছে । আবার জানতে চায়, মল্লডা কে?
--- ওই আমাহের গিরামের ভুট্ট পাগোল।
--- কেহু হয় নাকি পরিতিবেশি?
--- কেহু লয়, ওই পরিতিবেশি । কী করব, ছুড়ার বাপ নাই, মা বুঢ়ি, কেহু নাই । মরে পড়ে থাকবে ! তাই ক’জুনা চান্দাপড়তা তুলে দাফুনের হিল্লে করতে আনু।
--- হ হ , বেশ কর্যাছো , মুসলমানের বাড়ির মরা ! তাছাড়া মূর্দা বেশিক্ষণ ফেল্যা রাখা শরীয়তে মানা । কথা বলতে বলতে আজম হাত চালায় । কীকরে মল্ল ভাই ? ছুড়া বিহ্যা করেছিল ন্যা ? অপ্রাসঙ্গিক নানান কথা বলতে বলতে মূর্দাকে দাফনের সমস্ত অলঙ্কার পরিপাটি করে প্যাকেটে ভরে দেয় । আগন্তুক চলে যায় । আজম দু’হাতের পাঞ্জাবির কাপড় গুটাতে গুটাতে রাস্তার কলের দিকে হাঁটা দেয়।
নামায শেষে জায়নামায জড়াতে জড়াতে কয়েকজন মানুষের কথার আওয়াজ ভেসে আসে । ওরা চরের মাঝপাড়া থেকে এসেছে । আজম জানতে চায়, কে মল্ল ? আগন্তুকদের একজন ভারি গলায় জানায়, বড়োভাই।
--- কী হয়েছিল?
--- বেনস্টোক কর্যাছিল!
আজম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, আগন্তুকের চোখমুখ কেমন ভাসা ভাসা, খানিকটা ফোলা । খুব কান্নাকাটি করে এসেছে মনে হয়্ ! কাঁদবেই তো; বড়ো ভাই বাপের সমান, আজম আপনমনে বিড়বিড় করে । মনে পড়ে, বহু বছর আগে তার বড়ো ভাইও মরে গিয়েছে । ভাবির সাথে ঝামেলা করে গলায় দড়ি নিয়েছিল । আজম সেইরাতে ঘুমাতে পারেনি । ছোটবেলায় বাপ-মায়ের মরার কথা তার তেমন মনে পড়ে না , মনে পড়ে কেবল বড়ো ভাইয়ের কথা । ভাই বুকে পিঠে করে মানুষ করেছে, খাইয়ে দিয়েছে । কতদিন রাত জেগে হাওয়া করে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে । সেই ভাই ভাবির সাথে ঝগড়া করে ছোটো ভাইদের কথা ভুলে গিয়ে নিজেকে শান্তি দিল ! হঠাৎ আজমের বুকের মধ্যে হুহু করে উঠে , সে আর কিছু বলতে পারে না । কাফনের বহর কেটে দিতে গিয়েই ফসফস করে কেঁদে ওঠে । আগন্তুক হতবাক হয়ে যায় , ভাই মরেছে তার, আজম দোকানী কাঁদে ক্যানে!
মূর্দার পোশাকই তো আজমের জীবনের অলঙ্কার । সারাদিন নতুন কাফনের ভাঁজ খুলতে খুলতে , আঁতর সুরমা ঘাটতে ঘাটতে জীবনটায় পালটে গিয়েছে । মাঝে মাঝে আজমের মনে হয়, সেও বুঝি মূর্দা । মৃত মানুষের সাথে তার কোনও তফাৎ নেই । পৃথিবীর যত জ্যান্ত মুসলমান আছে, দিনরাত চোখের সামনে পয় পয় করে ঘুরে বেড়াতে দেখে তার মনে হয়; সবার কাফন সে যেন আগলে রেখেছে, কেবল মরার অপেক্ষা। এই জীবনে কত মানুষকে দাফন হতে দেখল ! মা,বাপ, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশি । এই তো কয়েকমাস হল, পাঁচ বছরের এক ফুটফুটে শিশু জলে ডুবে মরল, তাকেও তো সাদা কাপড়ে জড়িয়ে ন্যাকড়া জড়ানো পুতুলের মতোই মাটিতে শুইয়ে দিয়ে আসতে হল, বাপ-মা পাড়া প্রতিবেশির এতো শোক সব ধুয়েমুছে আল্লাহ নিয়ে নিল । কই ওর বাড়ির কেউ তো আর বাচ্চাটার কথা কিছু বলছে না ! জীবিত মানুষ কেবল মায়া , মরে গেলে আল্লাহ সবুর দেয় । কত কী আজ ভাবে আজম । ভাবতে ভাবতে রাত হয়ে যায়, অনেক রাত । হঠাৎ মনে পড়ে নিজের ছেলেটার কথা । বুকের মধ্যে কেমন মোচড় দেয় । সারাজীবন দুঃখের সাথে লড়াই করতে গিয়েই বয়স শেষ । শেষ বয়সে ভাইবোনদের চাপে বিয়ে করতে হল । বছর দশেক ভালোই চলছিল, কিন্তু মরা গাছে রস না থাকলে ফল আসে কোত্থেকে ! বউ থাকল না তার সাথে ! তাঁর কথা না ভাবুক ওইটুকুন বাচ্চার কথাও ভাবল না ! মাকে ছেড়ে ওইটুকু রক্তের দলা থাকবে কীকরে ! একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে আজম, কেমন ফস করে । বুকে জমে থাকা বেদনার জল যেন বাস্পভূত হয়ে বেরিয়ে আসে বাতাসকে পালকি করে । ছেলের কথা ভেবেই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়। চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায় । চাচার বাড়িতে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে; পেটের মধ্যে কেমন দুঃশ্চিন্তার বাতাস জমে ওঠে । দোকানের ঝাপ ঠেলে সোজা বাড়ির পথে হাঁটা দেয়।
নিজহাতে বাড়ির কাজ করে ,রান্না করে ছেলেকে খাইয়ে দিয়ে দোকানে আসে । ছেলেকে ভালো করে সাবধান করে , ওখানে যাস ন্যা, ওটা করিস ন্যা । চাচার বাড়িতে থাকবি । দুপুরে সময় করে বাড়ি ফিরে আজম । স্নান সেরে, নামায পড়ে, ছেলেকে নিয়ে খেতে বসে । বাপ- মা হারা বাচ্চারা তাড়াতাড়ি পরিণত হয়ে ওঠে । আজমের বাচ্চাটাও দু’দিনে মাকে ছাড়া একরকম ধাতস্থ হয়ে উঠে । বাপ রেঁধে রেখে গেলে, নিজে নাওয়া খাওয়া সেরে স্কুল যেতে শিখে । প্রকৃতি তো নিজের খামতি রাখতে চায় না, অবসর পেলেই সব শূন্যস্থান পূর্ণ করে নেয় ; তাই হয়তো আজম আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে । নামায ,দোকান আর কলিজার টুকরো ছেলে ছাড়া তার আর কিছুই মনে থাকে না । সময়ও থেমে থাকে না।
দোকানে বসে গ্রীষ্মের দুপুরে ধু ধু করা মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকলে আজমের মন কেমন উদাস হয়ে আসে । মাঠ পেরিয়ে চর, চরের শুকনো সাদা বালি খাড়া রোদের আলিঙ্গনে রূপোর মতো চকচক করে । চরের গা ছুঁয়ে চলে গিয়েছে পদ্মা । পদ্মার ওপারে বাংলাদেশ । বড়ো মাঠের কোল জুড়ে এবছরও প্রচুর পাট ফলেছে । সবুজ পাট খেত ছুঁয়ে ছুঁয়ে চোখ চলে যায় ওপারে । হঠাৎ মনে পড়ে, গতবছর এই সময়ে সামিমা পালিয়ে গিয়ে ওপারে ঘর বেঁধেছে ! ইচ্ছে করে , ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসে, সামিমা, আমি তোমার কাছে কী দোষ কর্যাছি ? এতদিনের সম্পর্ক তুমি ভু্ল্যা যেতে পারল্যা ? আমাকে তুমার মুনে পড়ে ন্যা ! কোলের ছেলেডার কথাও মুনে পড়ে ন্যা ! এতটা পাষাণ হতে পারল্যা সামিমা ? কিন্তু পারে না ; একটা নদী কত সীমারেখা টেনে দিয়েছে , যা চোখ পাতলে দেখা যায়, তা সহজে ছোঁয়া যায় না । এইসময় আজমের চোখদুটো কেমন চিকচিক করে আসে । চারপাশ অস্পষ্ট লাগে । কারও ডাকে আজম চমকে ওঠে, সে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল বুঝে পায় না ! পদ্মার পানি বাতাসে গা ভাসিয়েছে , চোখ মোছে আজম। শেষপাড়ায় একজন মারা গিয়েছে , নতুন বউ ; স্বামীর সাথে ঝগড়া করে বিষ খেয়েছিল। দাফনের সরঞ্জাম দিয়ে ওদের বিদায় করে । বেলা পড়ে এসেছে , সামনের পাটখেতগুলোতে বিকেলের ছায়া পড়ে কেমন কালচে হয়ে উঠেছে । আজ তার মনে হয়, বউটা না পালিয়ে যদি মরে যেত তাও মনকে সান্ত্বনা দিতে পারত, ছেলেকে বোঝাতে পারত । বড়ো হলে ছেলে ভাব্বে, বাপ কাপুরুষ!
মাঝে মাঝে মনে হয় , সে কত নিষ্ঠুর ! সেকি মানুষের কেবল মরণ চায় ! নাকি সব জীবিত মানুষের মরণের ঠিকা নিয়ে বসে আছে ! এলাকার সব মানুষ মরে গেলে আরও আরও কাফনের যোগান দেবে । মরলেই পয়সা , না মরলে পেটে হাত বুলাতে হবে । আল্লাহর দিন আল্লাহ চালায়। সারামূলুকের প্রত্যেকটা জীবের রিজিকের মালিক আল্লাহ , ভাবে আর আজম দাঁড়িতে হাতের আঙ্গুলের চিরুনি করে । হঠাৎ দাড়ির গোছে আঙুল যেন আঁটকে যায়, দোকানের সামনে একটা পুলিসের গাড়ি এসে দাঁড়ায় । গাড়ি থেকে নামে আটদশজন বি এস এফ । বর্ডার এলাকা হওয়ায় পাশে বি এস এফ ক্যাম্প । কিন্তু এভাবে তার দোকানে আসার কারণ কী ! আজম স্তম্ভিত হয়ে যায় , ভয়ে , আশঙ্কায় শরীর-মন যেন অবস হয়ে পড়ে । এইসময় ছেলে সামনে এসে দাঁড়ায়। আজম এক লাফে বাইরে আসে , জানতে চায়, কী হল বাপ ? ছেলে কিছু বলার আগেই একজন বি এস এফ জওয়ান বলে ওঠেন, ছেলেকে একা একা ছাড়বেন না , আপনার ছেলে পাচার হয়ে যাচ্ছিল । আরও জানান, বর্ডার এলাকা জানার পরেও বেবুঝ থাকবেন না । বলেই জওয়ান উঠে বসে গাড়িতে।তারপর ঘড়ঘড় আওয়াজ তুলে হল্লাগাড়িটা লম্বা পাট খেতের বাঁকে আড়াল হয়ে যায়।
আজম ছেলেকে কিছুই বলতে পারে না । কিন্তু বুঝতে পারে ছেলে ভয় পেয়েছে; তাই ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে একপা একপা করে সামনের একটা মিস্টির দোকানে গিয়ে ওঠে । চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে জানতে চায়, কী খাবা আব্বু ? দোকানে ঢুকে গামলা ভর্তি মিস্টি দেখে ছেলে আহ্লাদে গদ্গদ হয়, জানায় কালো মিস্টি খাবে । খাওয়া হলে বাপছেলে বাড়ির পথে রওনা দেয়। সেদিন আজম সারাবিকেল ছেলের সাথে সময় কাটায়, গল্প করে , খেলা করে । বাপ ছেলে হাসাহাসি করে । ছেলে একসময় বাপের কোলে চেপে বসে, জানতে চায়,
--- আব্বা, মা কুন্ঠে পাল্যা গেলছে ?
এমন অদ্ভূত কথা শুনে আজম কেঁপে ওঠে । এই ভয়টায় তো সে দিনে রাতে মনের কোনও এক কোণে পুষে এসেছে । প্রথমদিকে মায়ের কথা জানতে চায়লে নানির বাড়ি গিয়েছে বলে বোঝাত, কিন্তু এখন ! আর কী বলে বোঝাবে ! কোন পাজি এইটুকু ছেলের মাথায় ওই বিষ ঢাল্ল তা ভেবেই তার মন ফুপিয়ে ওঠে । আজম ছেলেকে আরও জাঁপটে ধরে বুকের খাঁজে, জানায়, আব্বু তুমার মা নানির বাড়ি গেলছে আগেও বুল্যাছি ! বুলিনি ? ছেলে বাপের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে, তাহালে ওরা মায়ের কাছে যাতে দিল না ক্যানে ? বাপ চমকে ওঠে । সে ছেলেকে জানিয়েছিল , তার মা নদীর ওপারে নানির বাড়ি গিয়েছে । তা শুনেই কি ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করছিল ! কে নিয়ে যাচ্ছিল ! ভেবে পায় না । আজম মনের কোণে জমে ওঠা অনেক কথার আজ সমাধান করতে চায় । তবু পারে কি!
সন্ধ্যার পরে সেদিন আর দোকানে যায় না । ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে গিয়ে আজ কত স্মৃতি মনের দালানে উঁকি মেরে যায় । ছোটবেলার কথা, স্কুলজীবনের কথা, বড়ো ভাইয়ের কথা, সামিমার কথা । কেন আজ তার মনে হয়, এপৃথিবী সুখের কদর জানে, দুঃখী মানুষের পাশে কেউ থাকে না, থাকতে চায়ও না। ছোট্ট বাড়িতে বাপ-ছেলেতে কী করে , কী খায় কেউ তো চোখের দেখাটাও দেখে যায় না ! কেউ খোঁজটুকুও নেয় না ! তার একচিলতে খোকার কথা কারও মনে পড়ে না ! সামিমা কোথায় আছে একবার যদি জানতে পারত, হাতেপায়ে ধরে হলেও একটিবার ছেলের সাথে দেখা করিয়ে দিত । একটা বছর পেরিয়ে গেল, ছেলেটা মাকে দেখেনি । মা থেকেও নেই ; মুখে না বললে কী হবে, আজম তো জানে ছেলেটা মায়ের জন্য ভীতরে ভীতরে দিনকে দিন কীভাবে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে ! মাকে কাছে পাওয়ার জন্য ওইটুকু বুক নিশপিশ করছে । হঠাৎ ঘুমে তলিয়ে যাওয়া ছেলে মা বলে ডুকরে ওঠে , আজম আরও কাছে টেনে নেয় । ছেলেও বাপের বুকের গভীরে যেন ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করে , তবু মায়ের বুকের কোমল নদীতে হারিয়ে যাওয়ার স্বাদ পায় না । আজম মনে মনে আল্লাহকে ডাকে, সামিমাকে ডাকে , সামিমা তুমার কোলের মানিককে একটা বার দেখ্যা যাও ! একসময় তার নিজেরও চোখ জড়িয়ে আসে । সেও ঘুমের মধ্যে ভুল বকে, অনেকদিন আগে বলা কথা আওড়ায়; সামিমা, ছেলে কান্দে ক্যানে ? অক্যা দুধ দ্যাওধিনি । তারপর আবার ঘুমে তলিয়ে যায়।
ফজরের আজানে আজমের চোখ খুলে আসে । ভোরের শান্ত পরিবেশেও মনটা কেমন ভারি ভারি লাগে । গতকাল থেকে কিছুই খায়নি । কোন কিছুই ভালো লাগে না । মনে মনে আজ আল্লাহকে দোষারোপ করে , নামাযের প্রতি কেমন রাগ চাপে । “ আস সালাতু খায়রুল মিনাননাহ…” আজানের শেষ ডাক শুনেও আজম আজ ওঠে না । শিশুদের মতো বিছানায় লেপ্টে শুয়ে থাকে । ভোরের আঁধার নিজেকে গুটিয়ে নিলে ক’জন মানুষ আসে , ডাকাডাকি করে । খয়েরতলা গ্রামের একজন মানুষ মরেছে । আজম জানায় আজ দোকান খুলবে না । আগন্তুকরা অবাক হয়ে তাকাতাকি করে । জানতে চায়, আমরা কি ঘণ্টা খানিক পরে আসব ভাই ? না, আজ দুকান খুলবোই না , বলেই আজম পাশ ফিরে শয় । আগুন্তুকেরা বিব্রতবোধ করে , বুঝে উঠতে পারে না লোকটা কী বলতে চায়ছে । কয়েক মিনিট নীরব থেকে একজন রাগে বলে ওঠে , মানুষ মরেছে আর আপনি কাফন না দিয়ে ঘুমাচ্ছেন ! পরে আসব বুলছি তো পাকামো করছেন ? আপনি কি মাঙনা মাল দেন নাকি ? টাকা দিব মাল লিব , মরা মানুষকে লিয়ে তামাশা কীসের গো ? বুলেন কিছু টাকা বেশি লিবেন । আজম ঝাপিয়ে উঠে বসে, চোখমুখ লাল করে বলে , আমার দুকান আমি খুলব ন্যা । মাল বেঁচব ন্যা , তুমি কী বুলছ ! কথা তো ঠিক, ওর দোকান ও খুলবে কী না ওর ব্যাপার । তবু আগন্তুকরা রাগে গরগর করতে করতে বেরিয়ে যায় । এও বলে, শালা মুখে দাড়ি র্যাখে ব্যাবহার দেখেছ ! শালা মোনাফেক ! ওর দুকান লাটে উঠবে বুল্যা দিনু!
আজম আজীবন দুঃখী মানুষের পাশে থেকে এসেছে । মানুষের দুঃসময় হল আল্লার ফিতনা । দুর্দিন দিয়ে আল্লাহ নাকি পরীক্ষা করে , মানুষের ইমান মাপে । তাই বেকায়দায় পড়া মানুষকে সাহায্য করে নেকির শরিক হতে হয় । আজ সব যেন তালগোল পাকিয়ে যায়। কতদিন কত লোকের দাফনের জিনিস সে বিনা পয়সায় দেয় । এলাকার যত হাজী,গাজী, মাস্টার, ডাক্তার, চোর,ডাকাত, ধনী, গরীব কত লোকের জীবনের শেষ কাপড়ের যোগান দিতে হয় তাকে । এক কাফনের বহর থেকে কেটে কেটে কত মানুষের দাফন হয় । আসলে মরার পর মানুষের জাত থাকে না । তাই মোওলানার কবরের পাশে জালিমের কবর থাকে , সেখানে কোন নিয়ম ,কোন বাঁধা চলে না । আজম মনে করে, এ জগৎ আল্লার ঈশারায় চলে , কার ভাগ্যে কী যে লিখা থাকে কেউ জানে না । হঠাৎ দূরের মসজিদের মাইকে শোনা যায় , খয়েরতলা গ্রামের মুনসুর হাজী ইন্তেকাল করেছেন, ইন্না লিল্লা হি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিওন । তাঁর জানাজার নামায জোহরবাদ হবে ইনশাল্লাহ । আজম কান খাড়া করে শোনে, শুনে চমকে ওঠে । মুনসুর হাজী ! গতকাল জোহরে নামায পড়েছে এক সাথে, আর আজ জোহরে তার জানাজা ! সে এ কী করল , হাজী সাহেব তাকে এতো ভালো বাসতেন, তার দাফনের সামগ্রী আজম দিল না ! ছি ছি ! ওই অবস্থাতেই তৌবা তৌবা করতে করতে দোকানের দিকে ছুটল।
মুনসুর হাজীর বাড়ির সামনে লোকারণ্য । এলাকার পরিচিত মুখ । ফজরের নামাজে গিয়ে মসজিদে ইন্তেকাল করায় খবর রাষ্ট্র হতে সময় লাগেনি । সবাই একমুঠো মাটি দেওয়ার জন্য অপেক্ষায় প্রমাদ গুনছে । হাজী মানুষ, জীবনে কত নেকি করেছে , এতো মানুষের জানাজার দোয়া, এতো মানুষের হাতের মাটি পাবে ! আজম ভাবে । হাতে দাফনের সবকিছু, নিজের দোকান থেকে আনা । কিন্তু বড়ো দেরি হয়ে গিয়েছে ! অন্য দোকান থেকে কাপড় এনে কাফনানোর কাজ শুরু হয়েছে । ও সকালে যা ব্যবহার করল ! কোন মুখে কাফন আনার কথা বলবে ! বলবে, হাজীসাহেব আমাকে কাফনাতে বুল্যা গেলছে ! আজম কোনও কথা বলতে পারে না , এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে । ভাবে, এতো আয়োজন, এতো আড়ম্বর পেলে আজম মৃত্যুকে সাদরে বুকে টেনে নেবে ! নিজেরও মরণের কথা ভাবতেই নিরাশ্রয় ছেলের কথা মনে পড়ে, ! আঁতকে ওঠে, তার ছেলের কী হবে ! সারারাত জ্বরে ভুল বকেছে ছেলে । ছেলে কী করছে ! আর এক মুহূর্ত থামে না , বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করে।
বাড়ি ফিরে ছেলেকে দেখতে পায় না । জ্বরের ছেলে, না খেয়ে , বাপকে না পেয়ে কোথায় গেল ! আজম ভাবে । ছেলের নাম ধরে জোরে জোরে ডাকে । পাশের বাড়িগুলো খুঁজে পাড়ায় বেরিয়ে পড়ে, সারাপাড়া হন্যে হয়ে খোঁজে। ছোট্ট বাজার, মেঠোপথ, সাদা বালির চর, নাঃ কোত্থাও নেই । দুপুর গড়িয়ে সূর্য টাল খেয়েছে পশ্চিমাকাশে । কিছুক্ষণ পরেই মুনসুর হাজির জানাজা । নিজের ভুলে একজন ভালো মানুষের জানাজার শরিক হতে পারল না । গ্রামের মানুষ তাকে একঘোরে করে দেবে । কীসব আবোলতাবোল বিড়বিড় করে আর ছেলেকে খোঁজে । বিকেলের পরে প্রবল ঝড়বৃষ্টি নামে । ভিজতে ভিজতে নবীনগ্রামের ভীতর দিয়ে আসার সময় খবর পায়, স্থানীয় মানুষ ছয়-সাত বছরের একটা বাচ্চাকে পদ্মারধারে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে । সারাদিন ছোটাছুটির পরে, বৃষ্টিতে ভিজে হঠাৎ আজমের শরীরটা কেমন জ্বর জ্বর করে । মনে হল আর একধাপও হাঁটতে পারবে না।
অনেক কষ্টে পদ্মার ধারে এসে দাঁড়ায় । বিকেলের বাতাস কালি মাখতে শুরু করেছে । তার নিজেকে কেমন উন্মাদ লাগে, পাট খেতের আলে থপাস করে বসে পড়ে । ভেজা গা, তারওপর জ্বর, ঠাণ্ডা বাতাসে শরীরটা শীতশীত করে । খেয়াল করে, প্যাকেটটা এখনও হাতেই রয়ে গিয়েছে ; মুনসুর হাজির জন্য কাটা কাফন নিজের গায়ে জড়িয়ে নেয় । নিঝঝুম চারপাশ থেকে শনশন শব্দে ধেয়ে আসা হাওয়া আজমকে আরও মুষড়ে দিতে থাকে । মনে পড়ে বিয়ের পরে বউকে নিয়ে এই পদ্মার ধারে একদিন ঘুরতে এসেছিল । বউ ওপারটা দেখিয়ে বলেছিল, ওপারে ঘর বাঁধতে বড্ড শখ হয় । এইসময়, সাঁঝের অস্পষ্ট আলোয় একটা নৌকো দেখা যায় । আজমের মনে হয় সামিমা ছেলেকে বুকে জাপটে ধরে বসে আছে তাতে । আসতে আসতে নৌকো সরে যাচ্ছে দূরে , অনেক দূরে । আজমের নাগালের বাইরে । আজম ছটপট করে , কিন্তু ওদের থামাতে পারছে না, চিৎকার করছে, খোকা, খোকা , বাপ আমার দিকে তাকা একবার। ছেলে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে বাপকে আড়াল করে । দূরে মসজিদে মাইকের আওয়াজে চেতন আসে আজমের ; ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে সে কোথায় এসে বসেছে ! পাঁজরঘেরা বেলুনটা অদ্ভূতভাবে হুহু করে ওঠে ! দূরের মসজিদে মাইকে আবার ঘোষণা হয়, রাস্তার মোড়ে কেউ একজন মারা গিয়েছে , মুখ চেনা যাচ্ছে না । আজমের আর কিছুই মনে পড়ে না, কেবল ভাবে, মানুষ মরেছে , মানুষ । কাফন কেটে দিতে হবে । মাঠের আল ধরে উন্মাদের মতো হাঁটতে শুরু করে।


7 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ গ।। প্রকৃতি ও গল্পে জীবন্ত হয়ে ওঠেছে। আর কিছু লাইন তো হৃদয় ছুঁয়ে গেল 'এ পৃথিবী সুখের কদর জানে কিন্তু দুঃখী মানুষের পাশে কেউ থাকেনা। ' 'যা ছোখ পাতলে দেখা যায় কিন্তু সহজে ছোঁয়া যায়না। '
উত্তরমুছুনঅসাধারণ গল্প।
মুছুনগল্প পড়ে জানানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
মুছুনঅনেক দিন পরে একটা অসাধারণ চরিত্রকেন্দ্রিক ছোটো গল্প পড়লাম। আমার খুব পছন্দের বিষয় ছোটো গল্প, যার মধ্যে বড়ো হাতের ছোঁয়া দেখতে পেলাম।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ, ভালো থেকো। সঙ্গে থেকো।
মুছুন
উত্তরমুছুনঅসাধারণ একটি গল্প পাঠ করলাম। গল্পকারের মুন্সিয়ানা গল্প বুননের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আস্বাদন করলাম।
ভালো থাকুন শ্রদ্ধেয়
মুছুন