একটু আগেই ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছিল সোহানা। সে জানতো না আকরাম এত তাড়াতাড়ি অফিস শেষ করে এসেই বলবে ,‘চলো ,তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। অনেক কষ্টে সিরিয়াল পেয়েছি। এখানে অনেক রোগীর ভীড়ে। একমাস আগেই নাকি সিরিয়াল নিতে হয়। তোমার নয় নাম্বার। অনেক কষ্টে ম্যানেজ করেছি। তাড়াতাড়ি রেডী হয়ে নাও।’ এক টানে কথাগুলি বলে যায় আকরাম। যদিও এই কথাগুলিই আরও অনেক অনেকবার আকরামের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে একইভাবে। অফিস থেকে তাড়াহুড়ো করে এসে উদ্ভ্রান্তের মতো।
‘তুমিতো আমায় আগে বলোনি। আমি ড্রাইভার ছেড়ে দিয়েছি।’
‘অসুবিধা নেই। একটুখানি পথ । আমরা রিকশায় যাব! তাছাড়া অনেকদিন তোমায় নিয়ে রিকশায় ঘোরা হয়না।’
আকরামের দিকে তাকিয়ে সোনিয়া ভাবল,
গত তিন বছরে আকরাম ঢাকা শহরের খ্যাতিমান সব গাইনোলজিষ্টের কাছে ওকে নিয়ে গেছে। সোনিয়া জানে এবারও কোন ভাল খবর কিছুতেই আসবেনা। তবু আকরাম কিছুতেই অস্থির হয়না। খুব ধৈর্য্যের সাথে লাইনে বসে থাকে ,কখনও কখনও ঘন্টার পর ঘন্টা। কেমন ইনোসেন্ট ভাব ওর মধ্যে। সংসারে যখন আর ভাল লাগার কিছইু নেই ,তখনও কেমন নিজ থেকেই মনে করে নিল রিকশায় চড়ার কথা। সোনিয়া জানে, আকরামের ভালবাসায় কোন খাদ নেই।তবু এক অপার নিঃসঙ্গতার ব্যাথায় সোনিয়া নিজে নিজেই ঢলে পরে।
সত্যিই ওরা অনেকদিন ধরে রিকশায় করে ঘোরে না। রিকশায় ঘুরে বেড়ানোটা একসময় নিয়মিত ছিল। আংটি পরানোর পর বিয়ের আগে ওরা তিনমাস প্রেম করেছিল । হ্যাঁ, ঠিক ঠিক তিন মাসেরই প্রেম। আর সেই প্রেমের সময়টায় রোদে --বৃষ্টিতে --ছায়ায় অনেক ঘুরেছে ওরা রিকশায় চড়ে। আকরামের সান্নিধ্যেই হঠাৎ করে বসন্ত এসেছিল ,যখন সোনিয়া ভাবত চারদিকে কেবলই দিশাহীন কুয়াশা। আলো --অন্ধকারের দ্বন্দ্বে এক বিরাট খাদের ভিতর পড়ে গিয়েছিল জীবনের প্রথম দিকেই। প্রথম যেদিন সে আকরামের সাথে রিকশায় করে ঘুরেছিল ,সে দিনটি ছিল শুক্রবারের বিকেল। ওরা চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে গিয়েছিল। লোকজনের খুব ভীড় ছিল পুরো উদ্যান জুড়ে। তবু সন্ধ্যার একটু আগে আগে একটা নিরিবিলি জায়গা ওরা পেয়ে গিয়েছিল। আর এমন রোমান্টিক সময়েও সোনিয়া তার নিজের অতীতের কিছুই লুকাতে চায়নি। আকরামকে সে সবই খুলে বলেছিল।
আব্বুর বদলীর চাকরীর কারণে সোনিয়ার জীবনের একটা গুরূত্বপূর্ণ সময় কেটেছিল খুলনায়। খুলনায় থাকা অবস্থায়ই হঠাৎ আব্বু চলে গেল নরওয়েতে এক বছরের ট্রেণিংয়ে। সোনিয়ার ভাই ছিলনা, আর বড় বোনটি তখন চিটাগং মেডিকেলে পড়ত। সোনিয়ার বয়স তখন আঠারো। আবেগে ভেসে যাবার বয়স। ইন্টার পরীক্ষার প্রন্তুতির সময়টায় সে কোচিংয়ে যেত। আর তখনই একটা প্রেম হয়েছিল তার সহপাঠি দিলারার বড়ভাই সজলের সাথে। সর্ম্পকটার মধ্যে এতটাই সে ডুবে গিয়েছিল যে বিনিময়ে পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছিল খুব খারাপ। সজল লেদার টেকনোলজীর শেষ বর্ষের ছাত্র ছিল। শ্যামলা রঙ,নীল জিনস আর কাল টি শার্ট , চোখে হাই --পাওয়ার চশমা ,ভিতরে চোখ দুটো ভাসা আর তীক্ষ্ণ -- কোমল। সজলের সাথে একটা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক হতেই পারত। সোনিয়ার আব্বু --আম্মুও হয়ত আপত্তি করতনা। তখনও মোবাইল ফোনের এতটা চল ছিলনা। সজলের এক বন্ধু চিঠি চালাচালি করত। তখন বয়সটা ছিল ভারি আবেগের।চারদিকে কেবলই গোলাপ গন্ধ। জীবনের সহজ আর সুন্দর দিকগুলোই নিবিড় ভাবে স্বপ্নিল হয়ে থাকতো চোখে--মুখে। কখনও ভাবেনি কোন এক বিপদসীমার মাঝে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছিল সে। সহপাঠি দিলারা একটুও টের পায়নি বিষয়টা। কিছু না জেনেই সে একদিন সোনিয়ার ভুলটা ভাঙ্গিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ততদিনে সোনিয়ার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। কোচিং থেকে সে দুদিন সজলের মেসে গিয়েছিল। আর বয়সের আবেগে ডুবেও গিয়েছিল অনভিজ্ঞ শরীরী অন্ধকারে। তার একবারও মনে হয়নি সজল ড্রাগ এডিক্টেড। সজলের সান্নিধ্যে এতটাই আনন্দে আত্মহারা ছিল যে ,কোন নোনতা অবিশ্বাস তাকে আতঙ্কিত করেনি।বরং সজলের মধ্যে এতটাই বুদ্ধিদীপ্ততা ছিল যে সোনিয়ার কখনই মনে হয়নি কোন আশঙ্কার কথা। তাই নিজের দিক থেকে সতর্ক ছিলনা খুব একটা। তার নিজের দিক থেকে স্বপ্নগুলো ছিল দারূন রঙিন।
দিলারাই একদিন দুঃখ করে বলেছিল,‘জানিস,এই মাসে আমার কোচিংয়ের টাকাটা আলমারী থেকে চুরি হয়ে গেছে। আর আমি তো জানিই যে সজল ভাইয়া ছাড়া কেউ একাজ করেনি। সে ড্রাগ নেয় বলে বাসা থেকে সবসময় টাকা চুরি হয়ে যায়। আমার ভাইটা খুব অল্প দিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেল রে। আমরা এত চেষ্টা করেও ফেরাতে পারলাম না। ’ দিলারার এসব কথা শুনে সোনিয়ার মাথা ভোঁ ভোঁ করল কিছুক্ষণ। তবু সে বিশ্বাস করতে পারলো না। সোনিয়া ছুটে গিয়েছিল সজলের মেসে। এভাবে হুট করে ছেলেদের মেসে যাওয়া ঠিক না,তা জেনেও সে দৌড়ে গিয়েছিল। আর প্রচন্ড ঝগড়া করেছিল এসব কথার রেশ ধরে। সজল অস্বীকার করেনি। বাজপোড়া গাছের মতন বিধ্বস্ত হয়ে ছিল। আর সোনিয়ার মনে হয়েছিল, তার নিজের ভিতর থেকে বের হওয়া বীভৎস চীৎকারে ফেটে পড়বে পৃথিবী।
ইন্টার পরীক্ষার মাত্র পনেরো দিন বাকি। এই সময় সজল আত্মহত্যা করল। সজলের চরিত্রের অধঃপতন যেমন তাকে রাগিয়ে দিয়েছিল তার আত্মহত্যার খবরে সোনিয়া ভীষণ ভাবে বিষন্নতায় আক্রান্ত হল। তার চোখ দিয়ে অনর্গল জল পড়ত। সজল ড্রাগ নেয় জানার পর সোনিয়া কোন সর্ম্পকই রাখেনি ,তবু সজলের ভাবনা তাকে নিয়মিত গ্রাস করে ফেলত। ভাবনা তো আর যুক্তি মেনে আসেনা। সোনিয়ার বাবা নরওয়ের ট্রেনিং থেকে ফিরে এসে দেখল মেয়ে খুবই অসুস্থ। বেডসীটে পরীক্ষা দিয়েছিল সোনিয়া। যাকে নিয়ে পরিবারের সবার আশা ছিল সে কোনরকমে টেনেটুনে সেকেন্ড ডিভিশনে ইন্টার পাশ করল। ইউনিভার্সিটিতে চান্স হলো না । শেষপযর্ন্ত নীলক্ষেতে আইসি এম এতে পড়ল। কিন্তু সেখানে খুব মনযোগের সাথে খেটে খুটে পড়েছিল সোনিয়া, চেয়েছিল জীবনের ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতে। ততদিনে পরিবারের অনেকেই ওর প্রতি বিরক্ত ছিল। ওর প্রতি ভরসা ছিলনা অভিভাবকদের। সোনিয়াও তাদের এসব ভাব--ভঙ্গিকে সহজ ভাবেই নিয়েছিল, কারণ ওর ইন্টারের খারাপ রেজাল্টের পাশাপাশি অন্য সব কান্ড--কারখানা সবাইকেই আশাহত করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আই সি এমে তে খুব ভাল রেজাল্টের কারণে পাশ করার সাথে সাথেই চাকরী হয়ে গিয়েছিল ঢাকায় একটা মালটিন্যাশানাল কোম্পানীতে। স্যালারিও বেশ ভাল। আকরাম ওর সিনিয়র সহকর্মী ছিল। নিজের ঘোরে ডুবে থাকা সোনিয়াকে কখন কিভাবে আকরাম পছন্দ করে ফেলেছিল ,সোনিয়ার জানা নেই। বিয়ের সম্বন্ধটা আসে পারিবারিকভাবেই । আকরামের পরিবারের পক্ষ থেকে। পরবর্তীতে দুই পরিবারের মিলিত সিদ্ধান্তেই বিয়েটা হয়।
যেদিন আকরামের সাথে প্রথম বেড়াতে যায় ,সোনিয়ার ভিতর প্রবল কুন্ঠা ছিল। আর কুন্ঠা থাকাই ছিল স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন সে ছিল শামুকের মতো,নিজের খোলের ভিতর। তাছাড়া নিজের জীবনের পঁচা ঘায়ের যন্ত্রণাটা তাকে কুরে কুরে খেত। সজলের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা ওকে আর তেমন ভাবে স্বাভাবিক হতে দেয়নি। মুখের সম্পর্ক ছিল সবার সঙ্গেই ,কিন্তু মনের সম্পর্ক আর কারো সঙ্গেই গড়ে ওঠেনি। সেখানে আকরাম ওকে নিজেই পছন্দ করে পারিবারিক ভাবে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। আর তাই সোনিয়া তার সুশ্রী--সুন্দর মুখের আড়ালে থাকা সত্যগুলোকে একেবারেই আড়াল করতে চায়নি। প্রকৃত ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায় ,আকরাম ছিল একেবারে তাই। সেই প্রথম দিন থেকেই আকরাম হয়ে উঠল সোনিয়ার আজীবনের বন্ধু। তার বার্নিশকরা আলকাতরার মতো গায়ের রং,খাড়া নাক,দীর্ঘ দেহ,পাজামা--পাঞ্জাবি , চমৎকার করে কথা বলার পারদর্শীতা সব মিলিয়ে সোনিয়াকে দিয়েছিল স্বস্তি,সান্ত¡না আর আশ্রয়।
সোনিয়ার ভীষণ ভয় ছিল নিজেকে নিয়ে। তার সবসময়ই মনে হয়েছিল আকরামকে সে সুখী করতে পারবেনা। কিন্তু বিয়ের পর তিনটি বছর দারূণ ভাবে সুখী ছিল ওরা। সোনিয়ার শাশুরিও বেশীর ভাগ সময় সোনিয়ার সাথেই থাকত। তবু কখনও মনোমালিন্য হয়নি। সোনিয়ার স্বাধীনতায় কোনদিন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি তার শাশুড়ি মা। এমনকি আকরাম ভুলেও কখনও সোনিয়ার অতীতের প্রসঙ্গ নিয়ে কোন অশান্তি করেনি। যখন--তখন রিকশায় সোনিয়াকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করত আকরাম। গাড়ি কেনার পরও প্রায়ই ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে নিজেই চালিয়ে নিত গাড়ি। রাতের দিকে লং ড্রাইভে শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যেত ওরা। তখন সোনিয়ার মনে হত সত্যিকারের ভালবাসার স্বাদ সে পেয়েছে আকরামের কাছ থেকেই। যদিও অতীতের ভালবাসার রক্তাক্ত দিকটা তার পাঁজরের হাড়গোড়কে খেয়ে নিত অনেক সময়।
আকরামের দিকে অপলক তাকিয়ে তন্ময় হয়ে এসবই ভাবছিল সোনিয়া।
আরে! দেখছ কী! তৈরী হয়ে নাও! বললাম না,তোমার নয় নাম্বার সিরিয়াল!
চমকে উঠে সোনিয়া। এইতো এখনই হয়ে যাব।
আকরামের কথার পর চট করেই শাড়িটা বদলে নেয় সোনিয়া। বাসা থেকে বের হয়ে রিকশায় উঠেই দেখতে পেল মেঘলা আকাশটাকে। আর দেখতে দেখতেই হঠাৎ নেমে এল বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি হবার কোন আভাসই ছিলনা। দুদিন ধরে গরম পড়ছে বেশ। রাস্তার লোকজন হঠাৎ বৃষ্টির চমকে যার যার মত ছুটাছুটি করতে লাগল নিরাপদ জায়গায় গা বাঁচাবার জন্য। রিকশাওয়ালার কাছে কোন পর্দা ছিলনা, তাই একটু একটু ভিজে যাচ্ছিল ওরা দুজনে। সোনিয়ার বেশ ভাল লিাগছিল এই বৃষ্টি। দীর্ঘ বিষণ্ন দিনের ক্লান্তির পর নেমেছিল এই বৃষ্টি।
আকরাম রিকশাচালককে তাড়া দিচ্ছিল আর বৃষ্টির উপর খুব বিরক্ত হচ্ছিল। যেন এই অসময়ে বৃষ্টি নামল তার যাবার তাড়া আছে বলেই।
সোনিয়া মুখটিপে হাসছিল । তারপর বলল ,আজ তো আমি ভেবেই নিয়েছি ডাক্তারের কাছে যাবনা। আমার ভীষণ ভয় করছে। জানইতো ডাক্তারের বিষয়ে কী রকম তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে আমার! সত্যিই আমার খুব ভয় করছে । বৃষ্টির তোড়ে এক দমকা হাওয়া এসে আর একটু ভিজিয়ে দিল ওদের দুজনকে। অনেকদিন পর আকরামের ও ভালো লাগছিল এই সান্নিধ্য,এই বৃষ্টি,অনেক পুরানোকে নতুন করে দেখা।
তবু একবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত সোনিয়া,‘আমার তাই মনে হয়। ’ একটু থেমে থেমে বলল আকরাম।
‘কিচ্ছু লাভ হবেনা আকরাম। আমার শরীরে যে সমস্যাটা আছে তা থেকে সত্যিই মুক্তি নেই আমার। আমি ইন্টারনেট ঘেটে দেখেছি ,যাদের এই রকম সমস্যা আছে তাদের মা হবার সম্ভাবনা খুবই কম। আমি কিছুতেই ক্ষমা করতে পারিনা সেই ডাক্তারকে যে আমার প্রথম সšতানটিকে আমার চোখের সামনে মরতে দিল। বিশ্বাস কর আকরাম,আমি তখন বেডে,নার্সরা আমাকে টাট্কা রক্তের ভিতর থেকে পরিষ্কার করছে,আর আমি দেখতে পাচ্ছি আমার পাঁচ মাসের শিশুটি ট্রের মধ্যে অক্সিজেনের অভাবে নীল হয়ে যাচ্ছে। আমি কতবার বললাম আপনারা ম্যাডামকে বলুন,ওকে এখনি ইনকিউবিটরে রাখতে হবে! ওকে বাঁচাতে হবে! আমি কত অনুনয় করলাম। নার্সদের শুধু একই কথা,আমরা ওনার ওর্ডার ছাড়া কিচ্ছু করতে পারবনা। ম্যাডাম এখন অপারেশনের রুমে আছে। আর আমি অসহায় ভাবে দেখতে থাকলাম একঘন্টার মধ্যে আমার বাচ্চা আমার চোখের সামনে মরে গেল। কীসের থেকে কী হয়ে গেল! যখন আমি চেকআপে ছিলাম আমি অনেকবার বলতে চেয়েছি আমার সমস্যাগুলো। কিন্তু উনি কিচ্ছু না শুনেই প্রেসক্রাইব করে ফেলত। যদি প্রথম থেকেই আমি বেডরেষ্টে থাকতাম , যদি প্রথম থেকেই ইউটেরাসের এই সমস্যাটির জন্য ব্যবস্থা নেয়া হত তাহলে কখনও এমন হতনা আকরাম! কী সুন্দর একটা ফুটফুটে শিশু থাকত আমার! মনে পড়ে,একদিন ফজরের নামাজের পর তুমি বলেছিলে,সোনিয়া ,আমাদের মেয়ে হবে। আমিও যেন জেনেই নিয়েছিলাম আমার মেয়েই হবে। আমি ওর নাম রেখেছিলাম নওশিন। আর সত্যি সত্যিই মেয়ে হলো। কী করে আমি ভুলব ? তুমি ভুলতে পার আকরাম? ট্রের ভিতরে নীল হতে হতে আমার মেয়েটা চোখের সামনে মরে গেল! তারপর ওর জানাজা হল। খুব সুন্দর জায়গা দেখে আমরা তাকে কবর দিলাম। এই সব দুঃসময়গুলো আমি কী করে ভুলব আকরাম! ’ জান আমি ঘুমের মধ্যেও ঝুমঝুমির শব্দ শুনি! কতদিন ভাল করে অফিস করতে পারছিনা। নিজের ভিতরে এক অপরাধবোধ আমাকে বিকলাঙ্গ করে দিচ্ছে। উহ। এত শূন্যতা! তুমি আমায় ভালবেসে সব দিয়েছ,আমি তোমায় কিছুই দিতে পারলামনা আকরাম!
কাঁদতে কাঁদতে সোনিয়ার স্বরটা বন্ধ হয়ে আসতে চায়। বৃষ্টি--বাতাসে ওরা প্রায় ভিজেই গেছে। দুজনের চোখেই জল। বৃষ্টি জলটুকু আড়াল করে দিয়েছে।
২.
এরপর গত কয়েক বছরে সোনিয়া আকরামের অনুরোধে আরও অনেকবার ডাক্তারের কাছে গেছে। কোন লাভ হয়নি। মাঝে মাঝে আকরামের গলা জড়িয়ে ধরে সোনিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেছে ,বলতে পারো আমার পাপটা কী! আমার কেন এমন হল? কেঁদে কেঁদে বুকের পাথরটাকে ক্ষয়ে ফেলতে চেয়েছে। আকরামের গভীর ভালবাসার মাঝেও সোনিয়ার জীবনের একটি অংশে মরূভুমি রয়েই গেছে। একটা গভীর দুঃখ অন্তরে পুষে রাখতে রাখতে চারদিকের সবকিছুর উপরই সোনিয়ার আজকাল ভারী অভিমান হয়। মাঝে মাঝে শরীরটা কেমন হঠাৎ হঠাৎ ঘেমে ওঠে। জোরে কথা বললে কাঁপতে থাকে সারা শরীর। সোনিয়ার বড় বোনটি নিউরো সার্জেন্ট। আজকাল সেই তাকে দেখাশোনা করে, নার্ভের ওষুধপত্রও দেয়।
এক বিকেলে সোনিয়ার জন্মদিনের এক সপ্তাহ আগে সোনিয়ার বড় বোন হঠাৎ করেই আকরামকে প্রস্তাব করল,আকরাম ,সোনিয়ার শরীরটা ভাল থাকছেনা। চল ,আমরা সবাই মিলে কক্সবাজার থেকে ঘুরে আসি। এতে সবারই একটু ভাল লাগবে। এখন অফ সীজন। ভীড়ও কম। আকরাম খুব খুশী মনেই যাবার আয়োজন করল। ঢাকা থেকে পরিবারের অনেকে মিলে বেশ মজা করতে করতেই গেল ওরা।
সমুদ্রের নীলের দিকে তাকিয়ে কেমন তন্ময় হয়ে থাকল সোনিয়া। অনেকে এদিক --ওদিক বেড়াতে গেল। শপিং করল। আকরামও গেল ওদের সাথে। সোনিয়া গেলনা। কীসের টানে ভূতগ্রস্থের মত পড়ে থাকল সমুদ্রের পাড়ে দু-তিনদিন। সমুদ্রের নীল আর ঝাউয়ের বাতাস মিলে এক তুমুল শূন্যতার জালে আটকে পড়ল সোনিয়া। প্রতিদিন ভোরেই সূর্যওঠার দৃশ্যটা উপভোগ করার জন্য একাই চলে যেত সমুদ্রের কাছে। আকরাম বলেছিল যাবার সময় আমায় নিয়ে যেও। একা যেওনা। কী জানি কেমন করে সে একটু একটু করে এগিয়ে গিয়েছিল সমুদ্রের দিকে। কাউকে না জানিয়ে।একদিন ভোরে সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পরে লোকজনের তুমুল হৈ--চৈ। ছুটে এল অনেকে । আকরাম চেয়ে দেখল অবিরাম স্রোতের পাশে একটা শরীর। সোনিয়ার! হ্যাঁ, এটা সোনিয়ারই! মৃতদেহ! না ,এখনও বেঁচে আছে! সবুজ সালোয়ার --সবুজ কামিজ--গোলাপী ওড়না। সমুদ্র তাকে ভাসিয়ে নিল! কী করে! তবে কী আত্মহত্যা! আত্মহত্যা নয়! কী জানি! আপন মনে বিড়বিড় করে আকরাম। তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়।
সমুদ্রের স্রোত তখনও দূর থেকে ভেসে আসা তীব্র হুইসেলের মত সোনিয়ার মাথার মধ্যে ঝমঝম করছিল। সেই স্রোত নিঃশব্দে আঁচড়ে তৈরি করে নিয়েছিল অন্য এক মৃত্যুর রূপ। অতল জলের ভিতর পাক খেয়ে খেয়ে ধেয়ে আসছিল মৃত্যু। নাসিং হোমের বেডে চোখ মেলে তাকিয়ে সোনিয়া দেখল সব প্রিয়জনদের মুখ। তখনও এই প্রিয় দৃশ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকছে তার জীবনের অতলে পড়ে থাকা সব মৃত্যু দৃশ্য। মাথার মধ্যে বারবার হানা দেয়া সেই দৃশ্যকে সোনিয়া আর দেখতে চায়না। জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকেছে সকালের মিষ্টি আলো। তার জন্মদিনের ফুলগুলো টেবিলের উপর সাজানো। ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে সোনিয়ার মনে হল তার যেটুকু আনন্দময় জীবন আছে তা নিয়েই সে ঢুকে যাচ্ছে বর্ণময় পৃথিবীর মধ্যে।রঙের পিপাসায় ভরে উঠেছে তার বুক।


0 মন্তব্যসমূহ