ওয়ালিদ প্রত্যয়ের গল্প : হাত


সুতরাং; এতো সাজগোজের কারণঃ তিনি আজ ডান হাতের সাথে দেখা করতে যাবেন। কেটে নেওয়ার কয়দিন হলো? সপ্তাহ খানেক? বছর দুই হবে মনে হয়। এখন ব্যথা কৈ, ঘা’ও শুকিয়েছে, প্রথম কয়েকদিন বুঝা যেতো হাতটা নেই এখন তাও বুঝা যায় না; লাগে যেনো জন্ম থেকেই এমন। এক দুই সপ্তাহে এই বোধ আসা সম্ভব? বছর দুই-ই হবে। ব্যথায় তারিখ মনে নাই।

তিনি পেশায় লেখক, নেশায় জুয়াড়ি, ঘেঁষায় রমণী। দুনিয়ার সব লেখক এক পোশাক পরে ঘুরেন— আলবৎ মিথ্যা; তাঁর আলমারি নেই কিন্তু শার্ট প্যান্ট অনেক আছে— কয়েকটা হ্যাঙ্গারে, কয়েকটা বিছানায়, চেয়ারে, তাঁর শরীরে দুইটা। অনেক বেছে শাদা শার্ট একদম আয়রন ভাঙা, ভিত্রে শাদা স্যান্ডো, কালো জাঙ্গিয়ার উপরে নেভিব্লু সুতি ঢোলা প্যান্ট পরার পর আয়নায় নিজেকে দেখা গেলো; তিনি বুঝলেন যে, তিনি জানেন না— বিয়ে বাড়িতে টেবিল আনার পর সাজানো হয় কীভাবে, কে সাজায়, সিদ্ধান্তটা দেয় কে?— আমরা দুইটা টেবিল লম্বালম্বি রাখবো, বাকিগুলা পাশাপাশি, এই এই জায়গায় বসবে স্ট্যান্ড ফ্যান। এমন মানুষ কোথায় পাওয়া যায়? শার্টটা প্যান্টের ভিতর গুঁজে দিবো নাকি ছাড়া থাক? হাতা ফোল্ড করে রাখা যাক কনুই পর্যন্ত, নাকি? না, গুঁজেই দিই, বয়সে যুবক হতাম, ভিন্ন কথা, দে ক্যান টেক চ্যালেঞ্জেস্‌, আমি গুঁজে দিবো আর শার্টের উপর পরবো ওভারকোট। বাইরে আবহাওয়া ক্যামোন? তিনি আয়না ছাড়েন, জানালা ধরেন, বাইরে তাকান— আকাশের দিকে তাকিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে হাত বের করে আবহাওয়া বুঝা গেলো না যখন, তিনি মানুষের দিকে তাকালেন। কে কী পরেছে? পরোটার দোকানদার সারাজীবন শালার এক স্যান্ডো আর চেক মুছে গেছে লুঙি পরে কাটালো, ভ্যানের উপর জলছিটানো সবজি রেখে আসলাইম্মা পরোটার দোকানের সামনে যায়া পরোটা ভাজা দেখতেছে; কান্ধে মাফলার, গায়ে হাফস্লিভ ডোরাকাটা উল। আরো কয়েকটা কেইস স্টাডি পেলে ভালো হতো, মানুষ নাই, হাতে সময়ও নাই। পাঁচ আঙুলে পোশাক পরা মুসিবত, দুই বছরের প্রাকটিসে শার্টের বোতাম লাগানো শেখা গেছে, জিপারটাই ঝামেলা, নীচে টেনে না ধরলে উপরে ওঠানো যায় না। বাইরের আবহাওয়া ঠান্ডা-ঠান্ডা ছাড়া আরেকটা কারণে গায়ে ওভারকোট জড়ানো উচিৎ, তিনি ভাবলেন, খোলা চেইন ঢাকবে অন্তত। কোটটা বিছানায় মেলে রাখলেন, হাতা দুইটা দুই দিকে ছড়ানো, বোতাম খোলা দুই বুকের মধ্যেও রাখলেন বিস্তর জায়গা, (অগ্নিমিত্রার কথা মনে পড়লো) তারপর চিৎ হয়ে শুইলেন কোটটার উপরে, প্রথমে কব্জিহীন ডান হাত তারপর পাঁচ আঙুলসমেত বাম হাত ড্রেনে চলা পোকার মতো হাতা গলে বেরিয়ে এলো। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ডান হাতাটা ঝুলছে, দূর থেকে দেখলে হাত যে কিছুটা আছে বুঝা যায় না। বিছানা, বইয়ের তাক, দুই হাজার আট সালের মডেল কম্পিউটার রাখা টেবিল, চেয়ার আর মেঝে ভর্তি বিস্কুটের প্যাকেট সিগারেটের পাছা পানি ভর্তি কোকের বোতলের মাঝে যতটুকু হাঁটার জায়গা, সেখানেই তিনি কোট পরে মিনিট খানেক হাঁটলেন। কমফোরটেবল। হাতটা দেখা যাচ্ছে না, কোটের ঝুলে খোলা জিপারটাও ঢাকা গেছে। মাথায় আচড়ানোর মতো চুল নাই, চশমা একটাই, পারফিউম আছে অনেকদিন আগের— মেয়াদ আছে কিনা কে জানে। সুগন্ধি দরকার, সামান্য হাঁটলেই বগল ঘেমে যাবে, বড় বড় লোম ঘাম গড়ায়ে পড়তে দিবে না। তিনি নাপিতের কাছে বগল কাটাতে শরম পান, আর একহাতে দুই বগল কাটা অসম্ভব।

ফের আয়নার সামনে দাঁড়ালেন সুদর্শন রোমান-বাঙালী পুরুষ। আসলে যা, নিজেকে আয়নায় তারচেয়ে কয় গুণ সুন্দর লাগে? আট? না আড়াই? এখন নিজেকে আড়াই দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল থাকবে ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি মাথায় অর্ধকেশ বগলভরা লোম প্রেমব্যর্থ একটা চিকন কব্জিকাটা-শরীর। আট দিয়ে ভাগ করলে কিছুই থাকবে না। না কাম, না ঘাম, না স্মরণীয় কোনো চাহনি। কয়েক ফোঁটা অক্ষর থাকবে শুধু। সুতরাং, আট দিয়েই নিজেকে ভাগ করে সাজগোজ শেষ করা যাক। জুতা পরলেই যবনিকা।

হাত কাটার পর আর ফিতায়ালা জুতা কেনা হয়নি, পৃথিবীতে যে এতো কাজ আছে দুই হাত না থাকলে করা যায় না আগে বুঝেননি। তালা লাগাতেও কষ্ট। অবশ্য খুলতে সমস্যা হয় না; পোশাকের মতোই। পোশাক কি তালা? তালা কি পোশাক? প্রতিদিন নিজেরে নাকি ঘরের দরজায় তালা মেরে বের হই? দরজায় তালার চাবি আমার কাছে; আমারটা কার কাছে? ভাবতে ভাবতে ভাবলেন না, এমন শিশুসুলভ ফিলোসফিক্যাল থটকে প্রশ্রয় দেওয়ার মানুষ তিনি নন; এখন আরো জরুরি বিষয়— আমাকে ক্যামোন দেখাচ্ছে? নিজের হাতের সাথে এতোদিন পর দেখা হবে, উপহার তো নিতে পারবো না কিছুই, অন্তত সুশ্রী হয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক। যদি মায়ের মতো নারীর মতো সে বলে বসে, ‘একটু ফ্রেশ হয়ে থাকতে পারিস না/পারো না? এটলিস্ট দিনে দুই বেলা ঠিকঠাক ব্রাশ? সিগারেটটা ছাড়/ছাড়ো।’ মাপ্রেমিকার শাসন আমলে না নিলেও নিজের হাতের আবদার ফেলে দেওয়ার সাহস কি তার এখনো হয়েছে?

ক্রমেই প্যান্টের বাম পকেট ভারি হয়ে ওঠে— মোবাইল (মডেল ভুলে গেছি। আগে ভালো ছবি উঠতো; এখন ওঠে না), চাবি (গোছা না, একটাই। এক বাড়ি এক চাবি প্রকল্প), টিস্যু (কখনো ব্যবহার করা হয় না। সাবানের সাথে ফ্রি দিয়েছে বলে রাখা, টিস্যুতে জেসমিন ফুলের গন্ধ। মুখ মুছলে মনে হয় পাপড়ি দিয়ে মুখ মুছতেছি), একটা কলম (আগে হতো, এখন আর ব্যবহৃত হয় না। তবুও; সাথে রাখা— হঠাৎ বুক চিনচিন করলে যেনো হেড খুলে ইনজাকশনের মতো বিঁধিয়ে দেওয়া যায়)। ওজনে বা ভারে তিনি বাম দিকে কাত হয়ে থাকেন। সোজা হতে গেলেই টান লাগে, তালা বন্ধ করার আগে তিনি কিছুক্ষণ কপাট ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

সমস্ত বেলা সন্ধ্যার মতো ঝিম ধরে থাকে ইদানিং। সন্ধ্যা মনে হলেও এখন সকাল। দশটা বাজতে আরো বিশ মিনিট দরকার; হাতের সাথে মিটাপ এগারোটায়। দূরত্ব কম না, হেঁটে গেলে এক ঘন্টা, রিক্সায় পঞ্চাশ মিনিট। হাঁটাই সুন্দর; ওয়াকিং ইজ বিউটি। যুদ্ধ শেষে হাঁটার নমুনা দেখেই বুঝা যায় যোদ্ধা পরাজিত না জয়ী। হাঁটার গতি দেখলে অনুমান করতে পারি প্রেমিকা কখন বাড়ি ফিরতে চায়। মা হাঁটতেন গাধার মতো, বাবা হাঁটতেন যেনো রোমান্টিক পুরুষ অথচ কখনো কাউরে ভালোবাইসা ফেলছি বলতে পারেন নাই। আমার হাঁটা সুন্দর; অগ্নিমিত্রা বলেছিলো। অথচ ওরা পা না কেটে হাত কেটে নিয়ে গেলো। পা কাটলে আমি বেশি বেকায়দায় পড়তাম, টয়লেটে নিয়ে যেতো কে? বাড়িতে আগুন লাগলে দৌঁড় দিতাম কীভাবে? হাত কেটেছে বলাটা অবশ্য বাড়াবাড়ি, মূলতঃ কেটেছে কব্জি। ডান হাতের কব্জি, কব্জির সাথে চলে গেছে আঙুল, যা দিয়ে তিনি লিখতেন। শুধু লেখাই, আর কিছু না। ছোট থাকতে ডান তর্জনী দিয়ে নাক খুটতেন, ভাগ্য সহায় মা শাসন করে (দুই একবার চড় থাপ্পড় দিয়ে) কাজটা বাম তর্জনীতে করতে শিখিয়েছিলেন। তথাপি, লেখা বৈ ডান হাতের জন্য আর কোনো কাজ অবশিষ্ট রইলো না। তা লেখাটাই বা কদ্দুর হলো? অক্ষরে অক্ষরে বান দিলে একটা ছোটোখাটো পাহাড় ডিঙানো যাবে? ৬৯টা ছোটগল্প (৬৮তম গল্পটা লেখার পর আরেকটা লিখতে ইচ্ছা হলো কিন্তু সংখ্যাটা ৭০ করতে ইচ্ছা করলো না), তিনটা উপন্যাস (প্রকাশিত; কাম্যুর প্রতি টিবিউট, তিনে তিন), একটা প্রবন্ধের বই (১৩টা প্রবন্ধ, সবগুলাই হতাশাগ্রস্থ, চলন্ত ট্রাকের তলে ঝাপ দিতে প্রস্তুত), একটা কবিতা (লিখেছি অনেক, হয়েছে একটা। অন্তত আমি তাই মনে করি। বিজ্ঞরা ওটাকেও বাতিল করে দিতে পারেন এই ভয়ে প্রকাশ করি নাই।) এইটুকু লেখার পর থেমে গেলে হাতটা বেঁচে যেতো; অথচ ব্যথায় তারিখ মনে নেই-এর দিনটায় প্রয়োজনীয় আড্ডার আসর থেকে চুল পর্যন্ত লাঁ সাওতালা গিলে পিসিতে গদার চালিয়ে একটা সিগারেট ধরায়া ভাত বসানো বাদ দিয়ে নিজে চেয়ারে বসে সিয়াম রুপালি ফন্টে না-গল্প না-পোয়েম না-প্রবন্ধ রকম একটা অপ্রয়োজনীয় লেখা লিখে ফেললেন। তাঁর ভাল্লাগলো। প্রকাশ করতেও অসুবিধা হলো না। প্রবন্ধের বইটার সূচিপত্র ঘাঁটলে ৬ নং। প্রায় পঁচিশ বছরে মারধর খেয়ে যা বুঝেছেন, মোস্টলি পাবলিশাররা লেখকের প্রতি তাদের দয়াটা বই প্রকাশ পর্যন্তই রাখতে চান, পড়া পর্যন্ত বাড়াতে চান না। সম্পাদকের পদ বাংলা থেকে উঠে গেছে। প্রুফ রিডাররা দাড়ি কমা স্পেস আর ক্যামোন বানানটা কেমন করা ছাড়া ফারদার কষ্ট করবে না। সেহেতু, লেট দেয়ার বি লাইট।

চেহারা-সুরতে যথেষ্ঠ দুঃখভাব আনার জন্য তিনি ঘটনাটা মনে মনে আওড়াতে চেষ্টা করলেন। বেলা দশ মিনিট কম দশটায় রাস্তায় লোকজন থাকে না। সকালকে দেখলে মনে হয় আলোমাখা মধ্যরাতের প্রতিবিম্ব। গরম ঠান্ডার প্রোপোরশনাল মিশ্রণে শীমেইল ওয়েদারে তিনি হাঁটছেন; এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না যাকে জিজ্ঞেস করা যায়— আমাকে ক্যামোন দেখাচ্ছে বা চেহারায় উপযুক্ত দুঃখ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কি-না! একটার পর একটা ইজিবাইক স্মৃতির মতো পাশ দিয়ে হুশ করে চলে যায়, কেউ কেউ ডাক পাওয়ার আশায় তাকিয়ে থাকে। শহরে রিকশা নেই, যদি থাকতো— নিশ্চয়ই সেই যুবককালে দেখা এপিজে কালামের মতো ধবধবে শাদা ঘাড়-চুলের রিকশায়ালা পাশে এসে দাঁড়াতেন; তাকে কখনো হাঁটতে দেখি নাই, হয়তো রিকশা চালাচ্ছেন নয় যাত্রীসিটে বসে চালকাসনে পা তুলে এপিজে কালামের মতো ধবধবে শাদা ঘাড়-চুলে বুলাচ্ছেন ডান হাতের আঙুল। তিনি কীভাবে হাঁটতেন, রিং অব ফায়ারের মধ্য দিয়ে হাঁইটা যাওয়া দূতের মতো?

তিনি ভাবলেন— যাদের এখনো কব্জি আছে— ঐযে সব ডাল কেটে শুধু শরীরটা বাকি এমন আহত ন্যাংটা গাছের মতো ভিক্ষুক, হামস্যা মুদ্রায় বুড়ো-তর্জনী রাজহাঁসের চঞ্চু করে ঠোঁটে গিভ মি মোকা মাখলো কিংবা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সময়ে বা অসময়ে প্রিয় বা অপ্রিয়’র তৃষ্ণা নিবারণের জন্য চেইন টেনে সোনালি মরু পিঠের উপর ক্লান্ত শুয়ে থাকা উটের মতো তিনটা তিল দেখালো যে মেয়েটা, এক হাতে ম্যাচিস অন্য হাতে বাতাস ঢেকে মোনাজাতের মুদ্রায় যে কর্মকর্তা সিগারেট জ্বালাচ্ছে, ভিজা ভিজা কুচকি চুলকানোর সময় হোটেলের বাবুর্চি কড়াইয়ে পাম্প তেল ঢালার মতো ঢেলে দিচ্ছে সমস্ত সাংসারিক রাগ। তাদের সবাইকে আমার হিংসা। যত লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রাস্তা দোকান নর্দমা বিল্ডিং জুড়ে, হাঁটতে হাঁটতে যাদের দেখা যাচ্ছে, ইচ্ছে হয় তাদের ডেকে বলি— পৃথিবীতে কতো কাজ আছে দু’হাত না থাকলে হয় না— এই সহজ সত্যটা কি তোমরা জানো?

তবে তিনি ডান হাতে যে কাজটাই শুধু করতেন, মানে লেখাটা, সেটাতেও হাত পাকাতে পারলেন কৈ? এলাকার যত বন্ধু ছিলো যৌবনে, তাদের কেউই— সে শিক্ষক, সে দোকানদার, সে সাধু, সে বাটপার যে হোক— কেউই সাহিত্যের ধার ধারে না; তারা রবীন্দ্রনাথের নাম শুনেছে পাঠ্যবইয়ের চাপাচাপিতে, যাদের সামনে সাত্রের কোনো বাণী নিজের বলে সহজেই চালিয়ে নেওয়া যায়, তাদের সাথে যেকোনো নভেম্বরের সন্ধ্যায় বাঁশি ঘুরাতে ঘুরাতে তাকে প্রায়ই বলতে শোনা গেছে, ‘আমার আগের বইগুলা গার্বেজ। কিন্তু এখন যেইটা লিখতেছি…’ বলার সময় পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসে গালে প্রসারিত হওয়া মাংসে ফোলা ফোলা তার চেহারাটা অন্ধকারে দেখা যেতো না। লেখকদের কাছাকাছি যতবার যাওয়া হয়েছে, মিনিট বিশেক গল্প করলেই হাপানি ওঠে যেনো ভেতর থেকে একটা ‘আমি’ বের হয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সেই ‘আমি’র চলে যাওয়াটা খুবই দৃঢ় এবং তাতে স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। শামসের সাফি যেদিন বলেছিলো, ‘আপনি এবার রোমান্টিক কিছু ট্রাই করেন,’ ওর কন্ঠে উপদেশ মিশ্রিত উপহাস, তিনি ক্লিয়ারলি বুঝলেন, বলতে চাইলেন, ‘যা লিখছি ভাল্লাগছে না?’ তখন নিশ্চয়ই সাফি থতমতের খপ্পরে পড়ে বলতে-চাচ্ছি না-কিন্তু-বলতে-হচ্ছে রকম আমার লেখার দুই একটা প্রশংসা করতে বাধ্য হতো। কিন্তু তিনি কথাটা বলতে পারলেন না ক্যানো? শামসের সাফির বইয়ের মুদ্রণ সংখ্যার ভারে নাকি ওর গায়ে স্কাই ব্লু আরমানির দাপটে তিনি চুপ হয়ে গেলেন? ঢাকা টু কলকাতা সাহিত্য সভা করতে করতে চেহারায় লেপ্টে থাকা ক্লান্তির উজ্জ্বলতা রুমাল দিয়ে আরো গাঢ় করতে করতে শামসের সাফি ঘোষণা করলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ মাখন ঘি খাওয়া মানুষ। ডিভানে বসে শেষের কবিতা লেখা যায়। ওঁর একটা লেখা দেখান ঠ্যালায়ালা, ময়লায়ালাদের নিয়ে লিখেছে।’ এই স্ট্যাটমেন্ট শোনার পরে যখন ‘আমি’টা দৌঁড়ে অনেকদূরে চলে গেলো, মাথা নীচু করে উপযুক্ত উত্তরটা মুখের মধ্যেই জাবর কাটলেন কিন্তু কিচ্ছু বলতে পারলেন না, তিনি আঁতকে উঠে ভাবলেন— আমি কি কাপুরুষ? আমি বোধহয় কেঁচো, চক্ষুবিহীন কীট। অথবা এও তো হতে পারে, এও হওয়া অসম্ভব নয় যে— মনে মনে বহুবার বুকার পেলেও, কমোডে বসে সিগারেটে টান দিতে দিতে বিশ্বসেরা গণমাধ্যমে আধা ইংরেজিতে সাক্ষাৎকারের প্রাকটিস করলেও, মস্তিষ্কে সুক্ষ্ম কাঁটা বিঁধে থাকার মতো তিনিও হয়তো জানেন, আদতে কিছুই লিখতে পারেননি। অলস জীবনে এমন কোনো রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটেইনি যাকে উপাদান করে তিনি লিখতে পারতেন ফ্যান্টাসি নারীর সাথে যৌনতা করার মতো অভিনব কোনো লেখা। কিংবা ঘটেছে। তিনি দেখেননি। তিনি তো কেঁচো।

শামসের সাফির সামনে বা আরো যারা যারা আছেন, তাদের সাথে কথা বলার সময় এই কারণেই কি চুপ করে থাকা? চুপ করে থাকাই যদি হয় জন্মগত বৈশিষ্ট্য, তবে ফেরার পথে আড্ডার পুরো চিত্র নিজের দিকে টেনে নিজেকে সম্রাটের আসনে বসিয়ে বাকিদের প্রজা কল্পনা করা ক্যানো? যদি চুপ করে থাকাই হয় আমার একমাত্র ক্ষমতা, তবে ক্যানো এমন দৃশ্যপট আমার চোখে ভেসে ওঠে যেখানে আমিই প্রধান বক্তা আর সামনে হাজার হাজার অনুগত শ্রোতা বসে আছে?

অথচ তারা আমার হাত কেটে নিলো। হাত বলতে কব্জি, আঙুল থেকে আট ইঞ্চি উপরে। তিনি জানতেন না, একমাত্র প্রবন্ধের বইটার ৬ নং লেখাটা কে পড়লো, মামলা ঠুকে দিলো কে? যেখানে দেশের কেউই লেখা পড়ে না সেখানে দেশদ্রোহীর তকমা দিয়ে মাত্র এক ট্রায়ালেই বিচারক এতো উপকারী একটা সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেন? রায় অনুযায়ী বইটার সমস্ত কপি বাজেয়াপ্ত করা হলো। যারা যারা কিনেছিলেন, খুঁজে খুঁজে প্রত্যেকের কাছ থেকে পয়সা ফেরত না দিয়েই বইটা কেড়ে নেওয়া হলো। এই অনুসন্ধানে জানা গেলো, যা আমার কখনোই জানা পসিবল ছিলো না, যা জানার ইচ্ছাও আমার কোনোকালে হয় নাই, বইটা বিক্রি হয়েছিলো ৫৭ কপি। ১৮’শ শব্দের একটা লেখার জন্য জনৈক লেখকের হাত কেটে নেওয়া হচ্ছে, সাহিত্যপাড়া থেকে শুরু করে বেশ্যাপাড়া পর্যন্ত খবরটা ছড়িয়ে পড়লো শিশিভাঙা তেলের মতো। আহ্‌, সেইসব দিনরাত্রি! ৫৪ বছর পর এলাকার সবাই চিনলো তাকে, ভাত খাওয়ার সময় ঘনঘন হেঁচকি উঠলো, ছোটবেলায় মা বলতেন, ‘কেউ তোর নাম নিতেছে। আলহামদুলিল্লা ক!’ কব্জি কেটে নেওয়ার পর আলহামদুলিল্লা বলতে হয়েছে শ’খানেক বার। সাহিত্য-কেয়ার-না-করা বন্ধুরাও বুঝলো তিনি আসলেই কিছু লিখেছেন। এতোদিন পুরোটা ফাপড় মেরে চালিয়ে নেননি। শামসের সাফিও বুঝেছিলো হয়তো। সাহিত্যের কাছে এরচেয়ে বেশি কোনোদিন কিছু আবদার ছিলো না। এই মনোযোগের জন্যই তো এত এত পৃষ্ঠার অপচয়। কিন্তু তিনি দেখলেন, আচমকা তাঁর বাড়ির চারদিকে টেবিল টেনিস বলের মতো মানুষের চোখ, অজস্র চোখ, চোখের সমুদ্দুর, লিচু গাছে ঝুলে আছে থোকা থোকা চোখ, ঘুমের মধ্যে তাঁর চোখ ভেদ করে অন্য চোখ ঢুকে যাচ্ছে নাকের ফুটা কান, ফাঁক করে রাখা ঠোঁট লোমশ পাছা সমস্ত ছিদ্র দিয়েই হুড়মুড় করে তারপর পিঁপড়ারা যেভাবে ভারী খাবার দলবদ্ধ মাথায় তুলে নিয়ে যায় সেভাবেই চোখগুলো তাকে বহন করে নিয়ে এলো এক সীমাহীন ময়দানের সামনে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ চোখ-ছাড়া মানুষ, হঠাৎ আকাশ এমন কালো হয়ে গেলো কেউ বিশ্বাস করবে না এর রঙ আসলে নীল, বৃষ্টির চেয়ে ক্ষিপ্রভাবে আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির মতো ফোঁটায় ফোঁটায় চোখ, মাটিতে আছড়ে পড়ছে মানুষগুলোর উপরে পড়ছে কিন্তু চোখ না থাকায় কেউ নিজের চোখটা খুঁজে নিতে পারছে না। তিনি ভয় পেয়ে গেছিলেন। কারাগারের অহংকারী দেওয়াল দেখা যাচ্ছে। লাগোয়া ওয়াচ-টাওয়ারটা সৈনিকহীন ফাঁকা। হাঁটার সময়টা এতকিছু ভাবার ফাঁকে মূল ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করার অবসর পেলেন না। সারাটা জীবন কাটলো এইরকম অবহেলায়, কখন কি ভাবতে হয় এই সহজ সাধনাটা রপ্ত হয়নি। কারাগারের মেইন গেইট দিয়ে ঢোকার সময় গলা প্যাঁচিয়ে কোমড় পর্যন্ত শুয়ে থাকা শীতল সাপটা একটু নড়ে উঠলো, তাঁর শীত শীত লাগলো।

গেইটের কাছে স্বাস্থ্যহীন প্রহরী, খোলা হোটেলের সামনে বসে থাকা কুকুরের মতো কয়েকজন সাক্ষাৎ প্রার্থী মানুষ, যেদিকেই পাঁচ ফিট চওড়া রাস্তাটা গেছে দুই পাশে মেপে মেপে বড় হওয়া সুপারি গাছের সারি—সবকিছু গল্পের বর্ণনায় বলা যেত কিন্তু আমার হাতে সময় নাই। এগারোটা বাজতে মাত্র আড়াই মিনিট। তাকে অবশ্য অপেক্ষা করতে হবে না, উকিল ব্যবস্থা করে রেখেছে। অনেক চর্চা করে সুন্দর একটা সই বানিয়েছিলেন— এখন আর সেটারও প্রয়োজন হয় না, সবখানে বাম হাতের বুড়ো আঙুলের সই। তাছাড়া তাকে কে চেনে না? তিনি লোকাল সেলিব্রেটি; হেঁটে যাচ্ছেন আর একটা সুপারি গাছ পাশের গাছটাকে খোঁচা মেরে তাকে দেখিয়ে দিচ্ছে— ‘চিনেছিস?’ সবাই চেনে।

এর আগে নিজের হাতের সাথে একবার দেখা করতে এসেছিলেন। রায় হওয়ার পরেরদিন। হাতটার সাথে আরো অনেক আসামি ছিলো, অন্যান্য সাক্ষাৎ প্রার্থীদের ক্রমাগত ধাক্কাধাক্কি সামলে ঠিক মতো কথা বলা হয়নি সেবার। আজ অন্য ব্যবস্থা। ফাঁকা রুম থাকবে, দুইটা চেয়ার থাকবে, এক গেলাস পানি থাকবে টেবিলে। বিশ মিনিট কথা বলার সুযোগ, এই বিশ মিনিটে অন্য কেউ ঘরে প্রবেশ করতে পারবে না। তবে নিরাপত্তার খাতিরে ও সময়ের মধ্যে যেনো তিনি হাতের সাহায্য আরেকটা লেখা লিখে ফেলতে না পারেন তাই সাথে দেওয়া হবে না কোনো কাগজ এবং সার্বক্ষণিক ক্যামেরা চালু থাকবে তাতে সংযুক্ত সাউন্ড রেকর্ডারে রেকর্ড হবে তাদের মধ্যকার কথোপকথন। তিনি সব মেনে নিয়েছেন।

উকিলের সাথে দেখা হলো ঘরটার সামনে। লোকটার শারীরিক সাইজ এমন— ল’য়ারের ইউনিফর্ম পড়লে পেঙ্গুইনের মতো লাগে, লম্বা দুইটা ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে মেঝে যেনো আইস বার্গ— পিছলে পিছলে হেঁটে কাছে এসে জানালো ঠিক কতটুকু বেরিয়ার মেইন্টেইন করে আমার বাকচিৎ করা উচিৎ। এও জানালো, আসামি আধঘন্টা আগে থেকেই ঘরে এসে বসে আছে।

দরজার দুই পাশে দুইজন হ্যাংলা পুলিশ দাঁড়ানো। কাঁধে ঝোলানো বন্দুকের ওজন তাদের সমবেত ওজনের তুলনায় বেশিই মনে হচ্ছে, তবুও তারা ইউক্যালিপটাস গাছ হয়ে একদম সোজা দাঁড়িয়ে। ঘরে ঢোকার সময় পুলিশ দুইজন একসাথে বলে উঠলেন, ‘আপনি বাম দিকে হেলে আছেন। পকেটে যা আছে, রেখে যান।’

আমার পকেটে কী ছিলো? মোবাইলটা বের করতেই সাথে ছিটকে বের হয়ে অগণিত কথোপকথন ডার্টি টেক্সট কাম দুঃখসংবাদ দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়লো করিডোরে, চাবিটার অঙ্গে অঙ্গে লেগে আছে হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড, বের হলো অগ্নিমিত্রার ডান কানের দুল (আরেকটা কোথায়? ডান পকেটে? বের করা যাবে না), মাকে লেখা বাবার একটা পাঠ অযোগ্য চিঠি আর কয়েকজন নারীর ভাঁজ করা চামড়া তাতে জেসমিনের ঘ্রাণ। কলম বের করতেই নিব থেকে ফোটায় ফোটায় ঝরে পড়ছে হিবিজিবি কেটে দেওয়া কোটি কোটি বাক্য, না জন্মানোর বেদনা অভিযোগ আক্ষেপ অভিশাপে আমার বুকের বাম পাশ চিনচিন করে ওঠে কিন্তু কলম ফেরত দিতে হলো, বুকে বিঁধানোর সুযোগ মিললো না। ‘আর কিছু আছে?’ পুলিশদ্বয় একত্রে অনুসন্ধানী। নেই। যেতে পারি।

দরজা ধাক্কা দিলেই হাতটার সাথে দেখা হবে ভাবতেই পিঠের মাঝ বরাবর শুয়ে থাকা সাপটা আবার নড়ে উঠলো, আমার শীত শীত লাগলো। মনে হলো— আমার শরীরের ভেতর সবটাই জল, বেসামাল, সঙ্গমরত তনয়ার চিৎ হয়ে থাকা স্তনের মতো সেই জলে তাল রেখে ঢেউ জাগে, কখনো উপরে কখনো নীচে— এই মনে হয়ে পড়ে গেলাম। দরজা আর মেঝের অন্তর্বতী ফাঁক দিয়ে আমার জল-জল শরীর কোনো আওয়াজ না করে ঘরে ঢুকলো, পেছন থেকে কেউ দরজা টেনে দিলো, কাপড় দিয়ে বন্ধ করে দিলো নীচের ফাঁকা জায়গাটুকুও, ঘরে জানালা নাই, ভেন্টিলেটর নাই, যেনোবা চাইলেও নির্ধারিত সময়ের আগে আমার পালানোর কোনো পথ খোলা রাখলো না।

চোখ থেকে জলের নহর সরে যাওয়া পর প্রথমে ব্লার পরে আবছা পরে একটু স্পষ্ট আমার হাতটাকে দেখতে পাই, সপ্তাহখানেক কিংবা বছর দুই পর। টেবিলের উপর আঙুল রেখে চেয়ারে বসে আছে। সে স্লো মোশনে আমার দিকে তাকায়, ক্যামেরার পেছনে থাকা ডিরেক্টর আমাকে নির্দেশনা দিচ্ছেন— ‘তুমিও ধীরে তাকাও, আস্তে আস্তে হাঁটো, এখুনি কথা বোলো না কেউ……’ একটা রিইউনিয়ন দৃশ্য, এডিটিং এ ব্যাকগ্রাউন্ডে বসিয়ে দেওয়া হবে মুনলাইট সোনাটা। আমি ধীরেই তাকাই, দেখি— ওর’ও ঘা শুকিয়েছে, চামড়া কুঁচকে গেছে, নখ আর বড়ো হয় নাই, হলুদ হয়ে গেছে শুধু, নখের ভেতর কালো ময়লা, ঘর জুড়ে একটা পোড়া পোড়া গন্ধ। আমি যতটা সতর্ক ছিলাম, আমাকে নিয়ে, আমার সাজপোশাক নিয়ে, হাতের মধ্যে সেটার বিন্দুমাত্র ছটা নেই। ঘায়ের গন্ধে আমার ঘামের গন্ধ কোথায় হারিয়ে গেলো!

চেয়ার টেনে বসি। কথা কে শুরু করবে কোনো নির্দেশনা ডিরেক্টর দিচ্ছেন না। যেনো তিনিও আমাদের ডায়লগগুলো লেখেন নাই, তিনি শুধু দেখছেন, তিনি শুধু অবজার্ভার। আমি অনেককিছু বলতে চাইলাম, মনে মনে— ‘ক্যামোন আছো? এরা ঠিকঠাক খেতে দেয়? ঘুম হয়?’ মুখে বললাম, ‘আর কয়দিন?’

কফধরা কন্ঠে হাত কথা বলে, ‘হয়তো আগামীকাল।’

‘ফাঁসি?’

‘গলা নেই।’

‘আবার কুড়াল?’

‘না। আগুন।’

নিরবতা। পোড়া পোড়া গন্ধটা তীব্র হচ্ছে। আগুন কি জ্বালিয়েই রেখেছে? আগামীকাল আসতে তো আগামীকাল পর্যন্ত সময় আছে, এত তাড়া কিসের? লজ্জা ভাঙানোর জন্য আমি বলতে হলো, লজ্জা ভাঙানোর জন্য যা বলা দরকার, আমি বললাম, ‘আমাকে ক্যামোন দেখাচ্ছে?’

সে নজর করে আমাকে দেখলো, বলল, ‘তোমার মতো।’ জিজ্ঞেস করলো, ‘একা একা কাপড় পরা যাচ্ছে?’

বললাম, ‘জিপার খোলা।’

হাত হাসলো, হাসি থামিয়ে বলল, ‘এক সময়— বন্ধ করতে চাইতে না, এখন চাও, পারছো না।’

‘অক্ষমতা?’

‘না। অবিচার। লেখার জন্য মগজ না কেটে হাত কাটার মতো।’

‘অভিযোগ?’

নিরবতা। ‘এসব বাদ দিলে হয় না? হাতে সময় কৈ?’ কে বললো কথাটা? যেই বলুক, দুই পক্ষের সম্মতি আছে। সুতরাং স্মৃতি-রোমান্থন? ‘হ্যাঁ, স্মৃতির জাবর কাটা যায়। মনে পড়ে? ব্যাকস্টেজ?’ আমাদের একসাথে হাসি পায়। একটা শূন্য হাসি, আনন্দ নাই, বেদনা নাই। বলি, ‘স্টেজের চেয়ে ব্যাকস্টেজের কথাই বেশি মনে পড়ে।’

‘বার মনে আছে?’

‘বিষাদবতিবার?’

‘আরো লোকজন ছিলো?’

‘অনেক। কিন্তু ওদের দেখা যাচ্ছিলো না। দেখা যাচ্ছিলো শুধু…’

‘?’

‘অগ্নিমিত্রাকে।’

‘স্পষ্ট?’

‘হ্যাঁ।’

‘দূরে ছিলো?’

‘হ্যাঁ।’

‘যখন কাছে গেলাম আমরা…’

‘তখন ঝাপসা। আর দেখতে পাইনি।’

বিষ্যুদবারে কলেজের ফাংশন, আমার লেখা নাটক মঞ্চস্থ হবে, আমি সেই কলেজের ছাত্র ছিলাম না, লেখা ছাড়া আর কোনো ভূমিকা নাই আমার, নির্দেশনা দিয়েছিলেন তরুণ পরিচালক সেলিম আল দ্বীন, নাটকের নাম ‘ফুলকি।’ হোয়াট আ কোইন্সিডেন্স! ফুলকির মঞ্চায়ন দেখতে গিয়ে দেখা হলো অগ্নির সাথে। ব্যাকস্টেজে। সেলিম পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ওর এক্সপ্রেশন ভালো। যখন তাকায়, মনে হয় চোখ কথা বলতেছে।’ অগ্নি আমার দিকে তাকিয়েছিলো, চোখে কথা বলেনি, বলেছে ঠোঁটে, ‘আপনি নাটকটা লিখেছেন অথচ একদিন’ও রিহার্সেল দেখতে এলেন না?’ আসা উচিৎ ছিলো। আমি বলতে চেয়েছিলাম, ‘আমায় ক্ষমা করো।’

যে শাড়িটা পরেছিলো, শাড়িটা যেনো সুতায় না— অগ্নিমিত্রার শরীরের শিরা উপশিরা আর কোষ দিয়ে মেপে মেপে বোনা। সবুজ শাড়ি। আর পাড়ের লাল টানটা কি রক্ত? অগ্নির যৌবনের প্রমাণ? কেনো আমি আগে রিহার্সেল দেখতে আসিনি?

ব্যাকস্টেজ থেকেই পুরো নাটকটা দেখলাম, অগ্নির চোখ বা বুক দেখতে পেলাম না। শুধু পিঠ, পিঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম, মনে হলো তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছি। এই কি প্রেম? নাকি স্রেফ যৌনতা? অগ্নি কী ভালোবাসে? ফুল না ফুলগাছ?

‘নাটকের এন্ডিংটা একদম মনমতো হয়নি। এভাবে শেষ করেছেন ক্যানো?’ নাটক শেষে বলেছিলো। আমি বললাম, ‘ঠিকানাটা?’

‘ক্যানো?’

বলি, ‘আরেকবার যদি লিখি— যদি মনমতো; পাঠাতে হবে না?’

‘ওর হাতে দিলেই হবে।’ বলে সেলিমকে দেখিয়ে দেয়। অগ্নি না বুঝলেও সেলিম বুঝতে পারে, সিগারেট ধরানোর জন্য আগুন খুঁজতে এদিক ওদিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমার টাইম নাই।’

অগ্নি খোঁপার বাধন খুলছে, চোখ থেকে খুলে নিচ্ছে নকল পাপড়ি, শাড়ি থেকে একটা একটা সেফটিপিন খুলে নিজেকে আলগা করছে, কানের দুল খুলতে খুলতে অন্যদিকে তাকিয়ে বলেছিলো, ‘চৌরঙ্গি থেকে ডান দিকে পঁচিশ পা। কৃষ্ণচূড়া আছে যে বাড়িটায় প্রতি বিষ্যুদবার গান শিখতে যাই। লিখে রাখুন। নাকি মনে থাকবে?’ আমার মনে ছিলো, যে নাটক মঞ্চস্থ হয়ে গেছে, তাও তিনবার লিখে নিয়ে গেছি, প্রতিবার আলাদা সমাপ্তি। একবারও অগ্নির মনমতো হলো না। আমি চাচ্ছিলাম যেনো কোনোদিন না হয়। চতুর্থবারে সে বলেছে, ‘এটা আর পড়বো না। অন্যকিছু পড়বো। গান বা কবিতা…’ আমি বলি, ‘চিঠি?’

অগ্নি বলেছে, ‘যদি ঠিক চিঠির মতো হয়।’

জিজ্ঞেস করি, ‘উত্তর?’

‘মনমতো হলে।’ অগ্নি কোঁকড়ানো চুলে একটা কৃষ্ণচূড়া গুঁজে নেয়, তাকে রাধা রাধা লাগে। অগ্নির জ্বর হতো খুব, গালে ব্রণ উঠতো, এতো রাত জাগে ক্যানো মেয়েটা? চিঠি লিখেছি কত হিশাব করিনি। সাত কি আট! কৃষ্ণচূড়া বাড়িটা থেকে পঁচিশ পা আগে, চৌরঙ্গী সিনেমা হল (বাইশ বছর আগে উঠে গেছে, দালান ভাঙেনি। পেশাব ধরলে মানুষজন ওখানে যায়), ওটার মূল ফটকের সামনে তেলেভাজার দোকানে শীতের সন্ধ্যায় দুইটা আলু দুইটা রসুন বিট লবণ ছাড়া অর্ডার করে আমি অগ্নির দিকে তাকাই না, চোখ রাস্তায় দিয়ে রাখি। শুধু চোখটাই অন্যদিকে, শরীরের বাকি সব অরগ্যান যথা কান ঘ্রাণ কোষ সবকিছু অগ্নির দিকেই ঝুকে থাকে, এই বুঝি নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটা কিছু একটা বলে ফেললো। একসময় বলে, ‘আপনার লেখা বুঝতে ডিকশনারি লাগে। ক্যামোন যেনো খাপছাড়া।’

‘ভাই নেন,’ উচ্চমাধ্যমিক গাইডের দুইটা ছিঁড়া পৃষ্ঠায় দুইটা আলু দুইটা রসুন হাতে নিয়ে আমি বলেছি, ‘কিচ্ছু বুঝা যায়নি?’

‘একটা জিনিস বুঝেছি,’ ভাঙা আলুর-চপের পূর্ণ ধোঁয়া অগ্নির মুখে মেঘের মতো হুড়োহুড়ি করে, ওর জিভ শব্দ উচ্চারণের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পায় না, সব কথা আধো আধো লাগে, ‘যেটা বুঝছি— আপনি নারী বিষয়ে অজ্ঞ।’ (একটু থেমে) ‘না…না,’ চপ গিলে ফেললে ওর মুখের মেঘ কেটে যায়, স্পষ্ট বলে, ‘আপনি আসলে নারী বিষয়ে অন্ধ।’

‘অন্ধত্ব দূরীকরণে উপায়?’ আমি জানতে চাই। নারী কিছু বলে না।

অগ্নিমিত্রা আমাকে ভালোবাসেনি।

‘ভালো যে বাসেনি— কীভাবে যেনো বুঝেছিলাম আমরা?’ হাত এমনভাবে প্রশ্নটা করে বসলো, এমন ভঙ্গিতে যে দুইজনই উত্তরটা জানি তবুও আরেকবার শুনতে চাওয়া! ফের ব্যাকস্টেজ, অগ্নির রিহার্সেল, আমরা দেখতে গিয়েছিলাম। নজরুলের উপর লেখা নাটক, অগ্নি নার্গিসের ভূমিকায়। নজরুলের পাট করছে যে ছোকরা, বয়েস উনিশ বিশের বেশি না, মাথায় ঝাঁকড়া উইগ পরে গম্ভীর বসে আছে, চোখ ঘুমন্ত এবং নিস্তজ, গায়ে কয়েক ছটাক মাংস; শাদা পাঞ্জাবি পরা, দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাঞ্জাবিটা চলমান হ্যাংগারে ঝুলছে। কন্ঠ শোনার সুযোগ পাইনি, পেলে হয়তো আমার এই ধারণা পোক্ত হতো যে, নাট্যকর্মীরা কিংবা সবাই ভাবে নজরুল হওয়ার একমাত্র পন্থা মাথায় ঝাঁকড়া চুল।

রিহার্সেলের বিরতিতে নার্গিস আমার পাশে এসে বসলো; ব্যাকস্টেজে; ওর গালে গলায় ঘাড়ে আর আঁচলের রাস্তাটা বাদে যেটুকু বুক দেখা যায়— সবখানে হরিণের চামড়ার মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। খোঁপা করা চুল ছেড়ে ঝাঁড়া দেওয়ায় কয়েকটা ফোঁটা আমার মুখে এসে পড়লে আমার জ্ঞান ফিরে এবং আমি অগ্নিকে দেখতে পাই। পরিচয়ের পর থেকে কম তো দেখা হলো না। সকালে দেখা হয়েছে, সন্ধ্যায় দেখা হয়েছে, নদীতে দেখেছি, ফুটপাথে দেখেছি; অথচ সেদিনের মতো জল ভেজা আগুন আগে তো দেখিনি। নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য উপরের দিকে তাকালে দূর্গার মতো বাঁকা ভাঁজ পরা অগ্নির গ্রীবায় জমাট বিন্দু জল দেখে আমার গলা কাঠ হয়ে আসে। ‘রিহার্সেল ক্যামোন দেখলেন?’ অগ্নির প্রশ্নের জবাব দিতে আমার জিভে আলস্য ভর করে আসে, ওর উন্মুক্ত দেহাংশসমূহ, যথা— গাল গ্রীবা ঘাড় বুক পেট সব ভেজা, বৈশ্বিক উষ্ণতাকে প্রণাম জানানো ছাড়া আমার ভেতর আর কোনো দৃশ্য খেলা করে না।

‘আমরা কী করেছিলাম?’ হাত জিজ্ঞেস করে। আমরা ছুঁয়েছিলাম, ওর গাল গ্রীবা ঘাড় বুক পেট সব ভেজা, রিহার্সেলে আসা আর সমস্ত মানুষের অন্ধত্বকে প্রণাম জানিয়ে আমরা স্পর্শ করেছিলাম অনন্ত নোনা মেয়েমানুষকে।

‘আর অগ্নির চোখ?’

‘বুজে এসেছিলো।’

‘অগ্নির হাত?’

‘আমার হাতকে পথ দেখাচ্ছিলো।’

‘মানে আমাকে?’

‘মানে আমাদের।’

স্পর্শে নিষেধ ছিলো না, নিষেধ ছিলো না চুমুতেও, হাঁটতে হাঁটতে ভাঙ্গা রাস্তায় পা পড়ে যাওয়ার ছলনায় খপ করে হাত ধরে ফেললেও কোনো ভয় ছিলো না, একটু সন্ধ্যা সন্ধ্যা হলে শুধু ‘বাবা রাগ করবে’ ছাড়া অভিযোগ ছিলো না। সেই সময়ে আমরা লিখেছিলাম ‘ধোঁয়ার দেহ ধোও’ শীর্ষক একখানা বড়গল্প। গল্পটা পড়ে অগ্নির মন্তব্য ছিলো— ‘গল্পের নায়িকা আমি হলেও— আমি তো এমন না!’ আমি জিজ্ঞেস করেছি— ‘তুমি ক্যামোন?’

‘আমি—’ অগ্নি থামে, অগ্নি ভাবে, আমরা ক্যামোন বলতে গেলে আমাদের ভাবতে হয়, ‘নায়িকার যে চঞ্চলতা, প্রেমিকের সাথে মধ্যরাতে কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখতে নদী পার হয়ে গেলো, দুষ্ট লোক ঘিরে ধরলে নায়িকাই আগে প্রতিবাদ নিয়ে এগিয়ে গেলো— আমি তো এমন না।’ অগ্নির পজে আমরা কয়েক বাতাস নিঃশ্বাস শুনি, সে ফের বলে, ‘আমার সংসার ভালো লাগে, দুপুরবেলা আমাকে ক্যানো দস্তইয়েভস্কি পড়তে হবে? আমি সুনীল নিয়েই থাকতে চাই। ঝুঁকি নিয়ে মধ্যরাতে কৃষ্ণচূড়ার চেয়ে বিছানার শান্ত জীবন আমার কাছে শ্রেয়।’

আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, ‘অথচ আধা চাঁদের আলোয় লাল কৃষ্ণচূড়া ক্যামোন লাগে, দেখবে না? সুন্দর দেখতে হলে কিছুটা অসুন্দর মাড়াতে তো হয়-ই!’

‘সুন্দরের প্যারামিটার আছে?’ অগ্নি বলে, ‘পৃথিবীতে কতো সুন্দর! সব দেখে শেষ করতে পারবো না। এক সুন্দরের ওপর আরেক সুন্দর। এই মই শেষ হবে না। আমি ঠিক কোথায় গিয়ে থামতে চাই এটা কে নির্ধারণ করে দেবে?’

‘সব দেখতে পাবো না বলে যতটুকু দেখা যাবে তাও চোখ বন্ধ করে রাখবো?’

জবাবে অগ্নিমিত্রার কন্ঠ শীতল হয়ে আসে, মূহুর্মূহু পলক ফেলতে ফেলতে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বিছানা সুন্দর না? দুইটা ঘর, একটা বারান্দা, বাবা মা সন্তান প্রতিরাতে একসাথে ডিনার— এসব সুন্দর না?’

বাড়ি ফিরে এসে নিজের শরীরটাকে ধোঁয়ার মনে হতে থাকে, যে ধোঁয়া কেউ বৈয়ামে বন্দি করে রেখেছে সেই সুলাইমানের কাল; সেই থেকে না-খাওয়া, ক্ষুধার্ত পেটে মস্তিষ্ক বেশি কাজ করে— ছোটোবেলায় রোজার গুরুত্ব বুঝাতে মক্তবের হুজুরমশাই বলেছেন। আমিও নিউরনদের ছোটাছুটি বুঝতে পারছি, পেছন থেকে কেউ বলছে— দে ছুট! ছুটে পালানোর জন্যই তো কাগজের আশ্রয় নেওয়া, বারবার, প্রতিবার; এবারও। আমাদের স্পষ্ট মনে আছে সেদিন রাতে ডায়েরির পাতায় আমরা কী লিখেছিলাম—

১৬ই এপ্রিল, ২০০২
রাতঃ ১টা ৩৬মিনিট

‘অমাবস্যা হওয়ার পরেও যথেষ্ট আলো আছে। তবে অমাবস্যার আলোর অসুবিধা হলো, এই আলোতে যা যা দেখা যায় মনে হয় ভ্রম। বারবার সন্দেহ হয়— জিনিসটা আসলেই দেখতে পাচ্ছি তো? নাকি অন্ধকারের ট্রিক? তখন ছুঁয়ে দেখি, শারীরিক অস্তিত্ব ঠাহর করার জন্য। যা বুঝবার জন্য স্পর্শ করতে হয়, ফিজিক্যাল একশান নিতে হয় তার প্রতি আমার আজন্ম লোভ। আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করি না, হাতকে করি। শিশুর গাল কিংবা বিড়ালের নমনীয়তা চোখে অনুভব করা যায়? ছুঁইতে হয়। দূর থেকে দেখা উঁচু পাহাড়ের ঝর্ণার কাছে যেতে ইচ্ছে হয়, ইচ্ছে হয় অবগাহনের। পাহাড়ের তীক্ষ্মতা, বিপদসংকুলতা আমাকে আটকে রাখতে পারে? তীব্র সুন্দরের দিকে বেশিক্ষণ কি তাকিয়ে থাকা যায়? চোখ ধাঁধিয়ে গেলে আমি ক্যানো অন্য সুন্দরের দিকে ছুটবো না?

অগ্নি আমাকে ভালোবাসেনি (বাক্যটা লিখে কেটে দেওয়া); পরিবর্তে লেখা— অগ্নি কিছুদিন পর আমাকে আর ভালোবাসবে না।

রাতঃ ১টা ৪১মিনিট’

লিখেই তিনি পালালেন। অগ্নিমিত্রা সারাটা জীবন মায়ের রান্নার মতো মুখে লেগে রইলো।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ দুইজন ভেতরে এসে জানালেন, ‘ফাইভ মিনিটস্‌ লেফট!’

আমি হাতের দিকে তাকালাম, হাত আমার দিকে। এতোক্ষণ পর বোধ এলো আমি তো স্মৃতি বিছড়াতে আসিনি। না, বিদায় জানাতেও না। আমার আসার কোনো কারণ নেই, যাওয়ার কোনো কারণ নেই, আমার থাকার কোনো কারণ নেই। ফাইভ মিনিটস্‌ ইজ ইটারনিটি।

‘আমাকে স্পর্শ করো।’ করলাম। হিম, জীর্ণ, খসখসে, অথচ আরেকটু জোর দিয়ে ছুঁলেই চামড়া উঠে আসবে। বেশিক্ষণ স্পর্শ করে থাকা গেলো না। নিজেকে কতক্ষণ ছুঁয়ে থাকা যায়? ফাইভ মিনিটস্‌? ইটারনিটি?

লেখা ব্যতিত রোমন্থন করার মতো আমাদের আর কিছুই নেই, এই এক জীবনে! তাই যদি হাতকে জিজ্ঞেস করা আমার অপরাধ হবে না নিশ্চয়ই, ‘ওই সময়টুকু তুমি ইঞ্জয় করেছো?’

‘ব্যথাও পেয়েছি। আঙুল টনটন করেছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, আমার যন্ত্রণা তোমার মগজের চেয়ে বেশি ছিলো না। এখনো মগজ ব্যথা করে?’

‘আগের মতো না। এখন যেদিকেই তাকাই, দেখি বস্তু। প্রাণহীন সব এদিক ওদিক পড়ে আছে।’

‘বাকি চার মিনিট তের সেকেন্ডে আমরা এমন কিছু করতে পারি যা অনেকদিন করা হয়নি বা কোনোদিন করিনি!’

‘লেখা বাদ। অনেক হয়েছে। বেকার সব কাগজপত্র। কোথাও গিয়ে দাঁড়াতে পারলাম না, বসতেও বলল না কেউ।’

‘শামসের সাফিকে চড় মারতে চাও?’

‘কোনোদিন চাইনি।’

‘সাহস ছিলো না?’

‘ইচ্ছে ছিলো না।’

‘তোমার কি মনে আছে, একদিন সন্ধ্যাবেলা রেল স্টেশনে ট্রেনে উঠতে গিয়ে একজন বৃদ্ধ পড়ে গেলেন, আমরা কাছেই ছিলাম, তুমি আমাকে ওর দিকে বাড়িয়ে দাওনি। শিশুর হাত ফসকে উড়ে যাওয়া বেলুন চাইলেই আমরা নাগাল পেতাম, তুমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলে।’

‘আমার মন ভালো ছিলো না।’

‘এখন ভালো?’

‘এখনও না।’

‘মন খারাপ কোরো না। ওরা তোমার মগজ কেটে নেয়নি, চোখ উপড়ে ফেলেনি, যা যা তোমাকে বাকি জীবন ব্যথা দিতে সক্ষম সবই উপস্থিত। তোমার দুঃখ থাকার কথা না। তোমার সেলিব্রেট করা উচিৎ। আমাদের সেলিব্রেট করা উচিৎ!’

‘কিন্তু যে লেখার জন্য তোমাকে কেটে নেওয়া হলো, তা নিয়ে আমরা একটা বাক্যও ব্যয় করবো না?’

‘না।’

‘সেলিব্রেট করবো কীভাবে?’

‘খুঁজে বের করি। আমাদের শেষ দ্বৈত-কাজ।’

তিনি ভেবে পান না, এমন কী কাজ যা সমস্ত স্বাভাবিক মানুষ করেছে কিন্তু তিনি করেননি! হে মাননীয় মানুষেরা, আপনারা কী বলতে পারবেন কী আমি আমার হাত দ্বারা করিনি যা আপনারা করেছেন? আমি কী মেয়েমানুষ ধরিনি? শ্যঁৎ করে ফেলিনি কি নাকের সর্দি? যখন মুষ্ঠিবদ্ধ হওয়ার কথা ছিলো, সেইসব অন্ধকার দিনরাত্রিতে, আমার হাত শক্ত হয়েছে। ফুল ছেঁড়ার সময় হয়েছে কোমল। আমিও তো জানতাম কী পরিমাণ চাপে ক্যামোন সুর প্রেমিকার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। আমি জলস্পর্শ করেছি, স্থল নেড়ে দেখছি, রঙ মেখেছি, চোখের পাতা খুলেছি ঘষে ঘষে, পিঠের যতদূর যায় ততদূর নিয়ে গেছি হাতের আঙুল। মাননীয় মানুষ, আপনারা আমাকে একটা কাজ দেখান যা আমি করিনি। ঘরের পোড়া ঘ্রাণটা ক্রমেই বাড়ছে, একটা শেষ কাজ করার চিন্তায় আমার চোখ বুঁজে আসে, মগজ ব্যথা করে। চার দেওয়ালকে মনে হয় পুরো দুনিয়া, আশেপাশে এতো শরীর ক্যানো? এই তো দেওয়ালে দেওয়ালে হেলান দিয়ে আছে আমার যাযাবর পিতা, সংসারী মা, আগুনভেজা অগ্নিমিত্রা, আমার শৈশবের বন্ধুরা, সাহিত্য-পাত্তা-না-দেওয়া যৌবনের তাস সঙ্গী, কতো কতো অক্ষর, চোখবিহীন কোটি কোটি মানুষ। সবাই অপেক্ষা করে আছে একজন লেখকের হাতের সাথে অন্তিম মোলাকাতের সাক্ষী হওয়ার জন্য। আমার চোখ বুঁজে আসে। কাটা হাতটার নড়াচড়া টের পাই। অর্ধেক চোখে দেখতে পাই, আঙুলে বিলি কেটে কেটে সে আমার দিকে এগিয়ে আসছে, খুব কষ্ট হচ্ছে, তবুও আসছে, মোৎজার্টের সুরে সুরে আঙুল নাচছে ওর, আমার ঊরুর উপর উঠে আগাচ্ছে, সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে শেলতীব্রতায়, যেনো কতোদিনের অপরিচিত স্পর্শ আমাকে জাগিয়ে তুলছে না, বরং নিয়ে যাচ্ছে কখনো দেখিনি এমন গহ্বরে, আমার হাতটা এগিয়ে যাচ্ছে খোলা জিপারের দিকে, ভেতরে ঢুকছে, খুঁজছে, আমি তাকে বাঁধা দিচ্ছি না।

দুনিয়াভরা চোখবিহীন মানুষ দেখুক— আধা আলো আন্ধারের ঘরে নিজের হাতের সাথে মৈথুন করছেন একজন ব্যর্থ লেখক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ