দীপেন ভট্টাচার্যের গল্প : এক হাজার ছয় শ আঠারো নম্বর সীলমোহর


বিষুবীয় আবহাওয়া ছিল সেই শহরে। শত অনিচ্ছা নিয়েও রঙ-ওঠা ট্রেনের বগিগুলো ভাঙ্গা-চোরা প্ল্যাটফর্মে ঢুকছিল। গ্রীষ্মের গুমোটে, প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরোনো হতচ্ছাড়া ডিজেল ইঞ্জিনটি মাত্র তিনটি বগিকে টেনে তখন ঘর্মাক্ত অবসন্ন। জানালা দিয়ে দেখছিলাম অবহেলিত স্টেশনটিকে, ট্রেনের মন্দন গতি আমার চিন্তার গতি বাড়িয়ে দেয় – কাজটা কি ঠিক হলো? আমার ভ্রমণ তালিকায় শুধু মাত্র এই শহরটিই বাকি আছে – এক হাজার ছয় শ আঠারোতম। পাসপোর্টে শুধু এই শহরের সীলমোহরটিই নেই, সেটি পেলে সবকিছু পূর্ণাঙ্গ হবে, যে আকাঙ্ক্ষায় বেঁচেছি, সমস্ত নিরাশা অতিক্রম করে এই দেশ-কালে আমার অস্তিত্বের ক্ষণকালের স্থায়িত্বকে মূল্যবান করতে চেয়েছি, সেটির হয়তো একটি যথাযথ পরিণতি হবে। এটা এক ধরনের উন্মাদনা বটে, জীবনের পরিণত ষাটটি বছর এর জন্য ব্যয় করেছি, কিন্তু আজ যখন আমার সূর্য প্রদক্ষিণের সংখ্যাটি পঁচাত্তরের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে তখন এই শহরটিতে আসা কতখানি যুক্তিযুক্ত সেটি ভাবছিলাম। প্রায় দেড় শতক আগে গড়া, বিস্মৃত এক প্ল্যাটফর্মে, ট্রেনটির গতি তখন শ্লথ হচ্ছিল।

আমাকে সতর্ক করা হয়েছিল, তাই গত পঞ্চাশটি বছর ধরে যতবার এই শহরটিকে গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করেছি ততবারই পিছিয়েছি। দু দিন আগে, রাতের ট্রেনটি ধরার আগে, আমার ভগ্নি-কন্যা এসেছিল আমাকে নিবৃত্ত করতে। আমার সহদোরা-সন্তান একজন প্রতিষ্ঠিত গবেষক, সে আমাকে কখনো ‘মামা’ বলে ডাকেনি, বলেছিল, ‘সাধারণ জীবনকে তুমি সহ্য করতে পারো না, অসাধারণত্বের খোঁজে এতগুলো বছর পার করলে, তোমার সংগ্রহের খাতায় এখন অগুন্তি ডাকটিকিট, আর একটি টিকিট সেখানে না বসালেও চলবে।’ 
ওকে চা বানিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, ‘তোর কি মনে হয় না কী হতে পারতো?’ 
চামচটা দিয়ে চায়ের মধ্যে দলা মধুটাকে ভেঙে ছড়িয়ে দিতে দিতে ওর ঠোঁটের কোনা প্রশ্রয়ের হাসিতে বেঁকেছিল, বলেছিল, ‘তুমি অশোধনযোগ্য রয়ে গেলে।’

ট্রেনটি পুরোপুরি থামলে দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। সর্বসাকুল্যে দশজন যাত্রী হয়তো নামল। এই শেষ স্টেশন। তাদের নিয়ে যেতে কেউ আসেনি, যত দ্রুত তারা নামল, তত দ্রুতই তারা প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্তর্হিত হলো। আমার নামা দ্রুত হলো না, সামনে গুমোট বায়ু স্থবির হয়ে আমার পা দুটোকে পাদানিতে নামতে দিচ্ছিল না। পেছন থেকে বন্ধুটি বলে উঠল, ‘দাঁড়িয়ে আছ কেন? নেমে যাও। এতখানি যখন এসেছি এখন তো আর ফিরে যাওয়া যাবে না।’ 
‘কেন ফিরে যাওয়া যাবে না?’ অস্ফূট স্বরে আমার ঠোঁট নড়ে, ‘এই ট্রেনেই তো ফিরে যাওয়া সম্ভব, আর তুমি কেন এলে আমার সাথে?’ শেষের কথাগুলো শব্দ হয়ে বন্ধুর কানে পৌঁছায়। ‘আবার একই কথা! সব দায় দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে? আমার বয়স কি তোমার থেকে কম হলো?’

বন্ধুর ভর্ৎসনা আমাকে হাল্কা করতে পারে না। এটা আমারই ভুল, আমারই অপরিণামদর্শীতা, ওকে আমার নিয়ে আসা উচিত হয়নি। আমার শেষ শহরটিতে সে আমাকে সঙ্গ দিতে চেয়েছে, আমি না করেছিলাম, সে মানেনি। সে না মানলেও আমার শক্ত থাকা উচিত ছিল। ট্রেনের বাঁশি বাজে, যাত্রীদের নেমে যেতে বলছে, প্ল্যাটফর্মে আমার অনিচ্ছুক পা পড়ে। তখনই সাদা পোশাক পরা একজনের উদয়, এই মানুষটি এতক্ষণ কোথায় ছিল? সে প্রশ্ন করে, তার শহরের ভাষায়, আমার বুঝতে অসুবিধা হয়, মনে হলো সে বলছে, ‘আপনারা এই শহরে থাকেন?’ 

‘না’ বলা মাত্রই সে আমাদের স্টেশনের ভগ্নপ্রায় মূল ভবনটিতে নিয়ে যায়, সেখানে উর্দি-পরা, কাঁধে ঝালর আর বুকে কয়েকটি তারা ঝুলিয়ে একজন পুরুষ বসা, খুব মনোযোগ দিয়ে কী যেন দেখছিল। মনে হলো সেনাবাহিনির উঁচু পদের একজন।

প্ল্যাটফর্মের লোকটি কাঁধে ঝালর-পরা কর্মকর্তার পাশে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে গেল। তিন-চার মিনিট ধরে সেই কর্মকর্তা আমাদের উপস্থিতি অগ্রাহ্য করতে থাকল। দেখলাম সে একটা নক্সা দেখছে, কীসের নক্সা বোঝা গেল না। টেবিলের সামনে দুটো চেয়ার, তাতে বসবো কিনা বুঝতে পারছিলাম না। আমাদের ট্রেনটি চার ঘন্টা পরে ফেরার পথে রওনা দেবে, সেই সময় ফিরে যাওয়াই উত্তম মনে করলাম। আমি নিশ্চিত আমার বন্ধুও একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল। অবশেষে গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম, ‘হ্যালো, স্যার!’ ঝালর সাথে সাথেই মাথা তুলল না, ত্রিশ সেকেন্ড যাবার পরে আমাদের দিকে না তাকিয়েই হাত তুলে সামনের চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করল। আমরা বসলাম। চোখে পড়ল ঝালরের বুকে লাগানো ছোট নামফলকটি – তাতে শুধু লেখা ‘ক্যাপ্টেন’। তার পেছনে দেয়ালের ওপর আর এক ঝালর-পরা পুরুষের বিশাল তৈলচিত্র। বন্ধুটি ফিসফিস করে বলল, ‘জেনেরাল।’

বাইরের গরম খোলা দরজা দিয়ে ঢুকছিল, মাথার ওপর শত-অব্দ বয়সী একটি বৈদ্যুতিক পাখা ক্যাঁচম্যাঁচ করে ঘুরছে, তার চক্রাকার চলন বাতাসকে ঠাণ্ডা করার বৃথা চেষ্টায় ছিল। ক্যাপ্টেনটি আমাদের দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘পাসপোর্ট?’ 
গলা যতটা সম্ভব মিহি করে বললাম, ‘আমরা আর আপনাদের শহরে ঢুকতে চাই না, ফিরতি ট্রেনেই চলে যাব।’ 
আমার কথা সে বুঝতে পারে না, অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করে, তারপর তার ভাষাতে উত্তর দেয়। আমি যে সবটুকু বুঝতে পারলাম এমন নয়, মনে হলো সে বলছে, ‘ফিরতি ট্রেনেই চলে যাবে? এ্যাঁ!’ তারপর মাথা তুলে আমার দিকে তাকায়, সারা মুখমণ্ডল ব্যাঙ্গে ভরপুর। তীক্ষ্ণ চোখ, তীক্ষ্ণ নাসা, সুচালু গোঁফ ঠোঁট ছাড়িয়ে ঈষৎ বিস্তৃত। ‘কী মনে হয় তোমাদের? এই স্টেশনটি শহরের বাইরে?’ সে যে আমাদের ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করছে তাতে আমার সন্দেহ থাকে না। প্রথমেই ‘তুমি’ সম্বোধনে ঘাবড়ে গিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে তার হাতে দুটো পাসপোর্ট তুলে দিলাম। ‘ওহ, আর একটা ব্যাপার, তোমাদের ফোনদুটো?’ আমাদের ফোনগুলোও তাকে দিলাম। এই শহরে আসার পর থেকে ওগুলো অবশ্য কাজ করছে না।

পাসপোর্ট দুটো সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল, সেখানে দেখার বিশেষ কিছু নেই, কিন্তু বুঝে নিলাম এই ঘর থেকে আমাদের বের হওয়া সহজ হবে না। এবার সে যে ভাষায় কথা বলল তা আমার পরিচিত, ‘তা তুমি দেখছি অনেক শহরে গেছ?’ পাসপোর্ট থেকে মুখ না তুলেই সে জিজ্ঞেস করে। 
‘হ্যাঁ।’ 
‘কেন?’ 
‘এটা আমার একটা শখ বলতে পারেন।’ 
‘শখ?’ 
‘আজ্ঞে।’

আবার অনেকক্ষণ সব চুপচাপ। পাখার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা মনে হয় বেড়ে যায়, সেটার হালকা হাওয়া বন্ধুটির কপাল বেয়ে ঘাম ঝরা আটকাল না। বাইরে ট্রেন চলার শব্দ পেলাম, মনে হয় আমাদের ট্রেনটি গেল তেল ভরতে। এই শহরে তেল কীভাবে আসে? এবার ক্যাপ্টেন বলে, ‘তোমাদের তো এই শহরে ঢোকার অনুমতি নেই।’ 
অনুমতি নেই? মানে ভিসা নেই? এই শহরে আসতে কোনো সরকারি অনুমতি লাগে না বলেই আমি জানি, ট্রেনে ওঠার সময় কনডাকটরকে পাসপোর্ট দেখিয়েছি, এই বিষয়টা নিশ্চিত করেছি।

‘কনডাকটর কিছু জানে না, তোমাদের এখানে ফোন করে আসা উচিত ছিল,’ ক্যাপ্টেনের গলার স্বর নিস্পৃহ, ফোন যে করা যেত না সেটা সে জানে ভাল ভাবেই। 
‘ঠিক আছে,’ দ্রুত বলি, ‘আমরা আর ঢুকবো না, এই ট্রেনেই উঠে যাবো।’ 
‘ব্যাপারটা এতো সহজ নয়,’ ক্যাপ্টেন চেয়ার পেছনে ঠেলে দিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে বসে, একটা সিগারেট ধরায়, আলস্য ভঙ্গীতে কুন্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। ‘তোমরা তো এখানে, তাই না? এখানে – এই শহরে। এখান থেকে বের হতে হলে অনুমতি লাগবে, একজিট ভিসা বলে যাকে। সেটার জন্য আবেদন পত্র জমা দিতে হবে। ছবি লাগবে, কয়েক শ টাকা। আর একটা চিঠি, তাতে বিস্তারিত লিখতে হবে কেন একজিট ভিসা দরকার।’

সিগারেটের ধোঁয়াটা ঘরটাকে অন্ধকার করে দিতে থাকে। ওপরের পাখাটির বাতাস সেই ঘনীভূত ধোঁয়াকে হাল্কা করতে পারে না। ‘আপনি কী বলছেন?’ আমার কপালের বাঁ পাশের রগটি দপদপ করতে থাকে, ডান হাত দিয়ে সেটিকে ছুঁই। আমার প্রশ্নের উত্তর দেয় না ক্যাপ্টেন, টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কম্প্যুটার বার করে সেটার ডালাটা খোলে। কয়েকটা বোতামে চাপ দেবার পরে বলে, ‘তোমাদের পরিচয়টা আমার নিশ্চিত করতে হবে।’ 
বললাম, ‘আমার নামে অনুসন্ধান দিলেই সব পাবেন। ভ্রমণের ওপর আমার বেশ কয়েকটা বই আছে। বহু শহরের কাহিনি।’ 
ক্যাপ্টেন উত্তর দেয় না। পাখার ক্যাঁচক্যাঁচ ক্যাঁচক্যাঁচ অসহ্য হয়ে ওঠে। আমার হাতঘড়িটা মনে হয় বন্ধ হয়ে গেছে। তারপর, মনে হল প্রায় আধ ঘন্টা পরে, ক্যাপ্টেন কথা বলে, শুধু আমাকে উদ্দেশ্য করে, ‘তোমাকে দেখি একটি কোম্পানি স্ম্পন্সর করে, এই কোম্পানি যে আমাদেরকে তাদের জিনিসপত্র পাঠায় না তা কি জানো?’ 
না, জানি না, আর এই কোম্পানি বহু আগে একটি শহরে যাবার জন্য আমাকে মাত্র গুটিকয়েক টাকা দিয়েছিল, সেই কোম্পানির নামটাও ভুলে গিয়েছি।

সেই সাদা পোশাক পরা লোকটি ঘরে ঢোকে, ক্যাপ্টেন তার দিকে চেয়ে মাথা নাড়ায়। সাদা-পোশাক আমাদের বলে, ‘আপনাদের পাশের ঘরে যেতে হবে।’ 
‘কেন, পাশের ঘরে কেন? আমরা বাইরে প্ল্যাটফর্মে ফিরে যেতে চাই।’ 
ক্যাপ্টেন টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা পিস্তল বের করে আনে, টেবিলের ওপর রাখে। আমার বন্ধুটি থরথর করে কাঁপে। আমি আর কিছু না বলে উঠে যাই, বন্ধু আমার পেছনে আসে। সাদা-পোশাক আমাদের পাশের একটি কামরায় নিয়ে যায়, সেখানে কোনো চেয়ার ছিল না, আমাদেরকে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে আটকে দেয়। ঘরজুড়ে একটা ভ্যাপসা গন্ধ প্রথমেই আমাদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়, মাটিতে বসে পড়ি। আতঙ্কিত উত্তেজনা আমাদের ক্লান্ত করে দিয়েছিল, বসে থাকতে থাকতেই দুজনে ঘুমিয়ে পড়ি।

সাদা-পোশাক আমাদের জাগিয়ে দেয়, দেখি একটা টিমটিমে বাতি জ্বলছে, সেটা একটা তার দিয়ে সিলিং থেকে ঝোলানো। রাত হয়ে গেছে, গরমটা একটু কমে এসেছে। ক্যাপ্টেন ডেকেছে। ঘুম চোখে ঘর থেকে বের হই, ক্যাপ্টেন এখনো সেই টেবিলে, সামনে সেই নক্সার কাগজ। এই মানুষটির কি নাওয়া-খাওয়া নেই, নাকি বিদেশীদের টর্চার করা তার পেশা? এবার আমাদের সে সাথে সাথেই বসতে বলে। কিছুটা যন্ত্রচালিতর মতো বসি, এখান থেকে বের হওয়া কি যাবে আর কখনো? 
‘তোমাদের একজিট ভিসা আমি দিতে পারি, কিন্তু তার আগে একটা কাজ করতে হবে।’

ক্যাপ্টেন বলে, ‘আমাদের শহরের কেন্দ্রে, কেন্দ্রের কেন্দ্রস্থলে একটি বাড়ি আছে, এটি আমাদের বিশ্বাসের কেন্দ্র। আমাদের যা ইতিহাস তা ওই বাড়িটিতেই আছে, কিন্তু সেখানে আমাদের ঢোকা নিষিদ্ধ, আমাদের সমস্ত বিশ্বাস ওই বাড়ির ভেতরের গুপ্ত জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।’

রাত্রির একটা আলাদা চরিত্র আছে। আমি এমন চমকপ্রদ শহরে গেছি যেখানে সন্ধ্যা হলে নদীতে প্রদীপ ভাসিয়ে দেয়া হতো, ধারে বসে সেই স্রোতে ভাসমান প্রদীপের সারি আর ওই পাড়ের মৃদু আলোয় সজ্জিত কুটিরগুলো মনকে অবোধ্য আবেগে ভরিয়ে দিত। মনে হতো এই শহরের রহস্য আমার কাছে অনুদ্ঘাটিত থাকবে, তবু রহস্যের স্বাদ রয়ে যাবে। কিন্তু এক হাজার ছয় শ আঠারো নম্বরের অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র এই ট্রেন স্টেশনটির, সেটি সুখকর নয়, তা আমাকে একটি বোধহীন শুষ্ক কাঠে পরিণত করছে, আর আমার সঙ্গীকে কী করছে তা শুধু কল্পনা করতে পারি। শুষ্ক কাঠকে ক্যাপ্টেনের ‘গুপ্ত জ্ঞান’ কথাটির রহস্য আর্দ্র করতে পারে না।

‘সেই বাড়িটির মাথায় একটি ঘড়ি আছে, বড় চক্রাকার তার অবয়ব, দুটি কাঁটা – ঘন্টা আর মিনিটের। সেই ঘড়িটি মাসখানেক হলো বন্ধ হয়ে গেছে। ঘড়িটিকে বাইরে থেকে দম দেয়া যায়, প্রতি তিন দিন অন্তর, কিন্তু সমস্যা তা নয়। একটা হাতল ঘুরিয়ে সেটা করতে হয়, হাতল আর ঘুরছে না, অর্থাৎ ঘড়ির দম পুরোই আছে, সমস্যা ভেতরে। ওদিকে আমাদের, এই শহরের নাগরিকদের, অধিকার নেই সেখানে প্রবেশ করার। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে তুমি ঘড়ি নিয়ে একটি উপন্যাস লিখেছ।’ আমার অস্ফূট উত্তর ছিল, ‘ঘড়ি নিয়ে নয়, একটি শহরের ঘড়িনির্মাতাদের নিয়ে।’

ক্যাপ্টেন আমার উত্তর শোনে না, ‘আমাদের অনেক প্রকৌশলী আছে, কিন্তু তারা ওই স্থাপনায় প্রবেশ করতে পারবে না, কিন্তু তুমি পারবে, তোমাকে ওই ঘড়িটা ঠিক করতে হবে।’ 

‘আপনি বোধহয় আমার উত্তরটা শোনেননি, আমি ঘড়ির কলকব্জা ঠিক করতে পারি না।’ 
‘পারো বা না পারো এটাই তোমাদের এই শহর ছাড়ার একমাত্র উপায়।’ 
এবার বুঝলাম ক্যাপ্টেন একটা ঘড়ির কলকব্জার নক্সা দেখছে।

বহু বছর আগে আমি এক শহরে গিয়েছিলাম, তিন শ চৌদ্দ নম্বর ছিল সেটি আমার ভ্রমণ তালিকায়। ঘড়ির জন্য বিখ্যাত ছিল সেটি। পেন্ডুলামের ঘড়ি। কয়েকটা ভারকে হাত দিয়ে ওপরে উঠিয়ে দেওয়া হয়, তারপর মাধ্যাকর্ষণে সেই ভারগুলো নিচে পড়তে থাকে, সেই পতনকে নিয়ন্ত্রণ করত ভার্জ ও ফলিয়েট নামে এক ধরনের ইন্টারেস্টিং পদ্ধতি। সেই পতন ঘড়ির কাঁটাকে ঘোরাতো।

‘ভার্জ আর ফলিয়েট!’ ক্যাপ্টেনের কথা ভেসে আসে দূর থেকে, ‘সাথে গিয়ার চক্রকে পেন্ডুলাম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এস্কেপমেন্ট পদ্ধতি – এসব তোমার বইতেই লেখা আছে, এইমাত্র আন্তর্জালে পড়লাম। আমাদের শহরের ভাগ্য ভাল বলতে হবে, তুমিই ওই বাড়িতে ঢোকার যোগ্য ব্যক্তি।’ 
‘আপনি ভুল করছেন, আমি প্রকৌশলী নই, ঘড়ি নিয়ে ভাসা ভাসা ওপর থেকে লেখা আর ঘড়ির খুঁটি-নাটি জানা এক জিনিস নয়।’ 
‘আমার সঙ্গে তর্ক করে কোন লাভ নেই, এটি তোমাদের জন্য একমাত্র সুযোগ।’

‘একবার ঢোকালে আপনি কি আমাকে বের হতে দেবেন?’ 
‘আমার কথায় বিশ্বাস করা ছাড়া তোমার উপায় কী? কাল উৎসবের দিন, নাগরিকেরা বাড়িটির চারদিকে সকাল থেকে অবস্থান নেবে, ওই সময়ে ঘড়ি যদি চলতে শুরু করে তারা বুঝবে আমাদের বিশ্বাস ব্যবস্থা অটুট আছে। তুমি ঘড়ি ঠিক করে রাত পর্যন্ত সেই বাড়িতে অপেক্ষা করবে যতক্ষণ না সব নাগরিকেরা চত্বর ছেড়ে চলে যায়, তারপর আমি তোমাকে বের করবো।’

‘আর যদি ঘড়ি ঠিক না করতে পারি?’ 
ক্যাপ্টেন সময় নেয় উত্তর দিতে। ‘আমি নিশ্চিত তুমি ঘড়িটি ঠিক করতে পারবে,’ ক্যাপ্টেনের উত্তর আমাদেরকে এক অন্ধকার কুয়োতে নিক্ষেপ করে।

এরপর খুব দ্রুতই আমাদের দুজনকে একটা গাড়িতে ওঠানো হয়। আমরা দুজন পেছনের সিটে, সাদা-পোশাক আর ক্যাপ্টেন সামনে। রাতের অন্ধকারে এক হাজার ছয় শ আঠারো নম্বর শহরটি দেখি – কিছু বিথীকা, কিছু অলি, কিছু চতুষ্পথ, দু একজন পথচারী, কিছু অট্টালিকা, কিছু ঘুমন্ত বাস্তুহীন, কিছু সরব কুকুর। কয়েকটি চত্বর, সেখানে জেনেরালের বড় ছবি। গাড়ি চলে শহরপথে, আতঙ্কের গন্ধ উঠে আসে বদ্ধ গৃহগুলির ঘেরা দেয়াল বেয়ে। আমি অস্তিত্ববাদী, শেষ রাতটির বাস্তবতাকে নিঃশ্বাস নিয়ে গ্রহণ করি, যেটুকু সময় রয়েছে সেটুকুকে ব্যবহার করতে চাই পূর্ণভাবে। যাত্রা যেন শেষ না হয় তার জন্য মহাবিশ্বের হস্তক্ষেপ কামনা করি, যেন বিশাল ভূমিকম্পে এক হাজার ছয় শ আঠারো মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। না, এটা বেশি হয়ে গেল! হয়তো বজ্রপাত, অথবা গাড়ি বিকল, সেটা বরং ভালো, তবে আমার অভিজ্ঞতা হলো এসব ক্ষেত্রে কোনো ইচ্ছাই, কোনো প্রার্থনাই পূরন হয়না।

একটি ছোট চত্বরে একটি সাধারণ দোতলা বাড়ি, তার সামনে গাড়ি দাঁড়ায়। নিচে একটি মাত্র ছোট মাপের দরজা, তার সামনে দু জন সান্ত্রী দাঁড়ানো। দরজাটির সামনে লোহার গরাদ দেয়া আরো একটি নিরাপত্তা দরজা। পাশে একটা বাক্স, মনে হয় ঘড়ির দম ওখানেই দেয়া হয়। নিচে বা ওপরের তলায় কোনো জানালা নেই, নিরেট দেয়াল, ওপরে দেয়ালে সাঁটা একটা বড় গোলাকৃতি ঘড়ি। ঘন্টা আর মিনিটের কাঁটা। বাড়িটা একটা ক্যাটক্যাটে হলুদ রঙের, এটিই শহরের প্রাণকেন্দ্র, নগরবাসীর বিশ্বাসের স্থল। হতে পারে হলুদ তাদের জন্য পবিত্র। ক্যাপ্টেন সাদা-পোশাককে ইশারা করে, সে সান্ত্রীদের চলে যেতে বলে। আমাদের দিকে অন্তত তিনটি রাস্তা এসে পড়েছে চত্বরে, বাড়িটির অন্য দিকে মনে হয় আরো কয়েকটি রাস্তা আছে। চত্বরে একটি মানুষও নেই, শুধু একটা গাড়ি পার্ক করা, সান্ত্রী দু জন সেটাতে উঠে চলে গেল। ক্যাপ্টেন পকেট থেকে একটা বড় লোহার চাবি বের করে, এগিয়ে গিয়ে গরাদের ওপর ঝোলানো তালাটা খুলতে চায়। তালায় চাবি ঘুরতে চায় না। সাদা-পোশাক একটা বড় বাক্স নিয়ে আসে, সেখান থেকে একটা হাতুড়ি বের হয়, একটা আঘাতেই তালাটা ভেঙে মাটিতে পড়ে যায়। গরাদ পার হয়ে ক্যাপ্টেন মূল দরজার তালায় চাবি ঢোকায়, সেই তালাটি খুলতে অসুবিধা হয় না। সে বলে, ‘এবার সব আপনার ওপর নির্ভর করছে। জেনেরালও আপনার ওপর ভরসা করছেন। এই বাড়ির ভেতর কী আছে তা আমরা জানি না। আপনি ঘড়িটা ঠিক করে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন, কাল এই সময়ে এসে আপনাকে আমি নিয়ে যাব। আর এটি আপনার জন্য খাবার, এর মধ্যে জলও আছে। আর এই টর্চটা সাথে রাখবেন।’ 

ক্যাপ্টেন আমাকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করে। সাদা-পোশাক একটা ব্যাগ এগিয়ে দেয়, আমি যন্ত্রচালিতর মত সেটা ধরি, বলি, ‘আমাকে ওই হাতুড়িটা দিন, আর একটা স্ক্রু ড্রাইভার আর সাঁড়াশি লাগবে।’ 
সাদা-পোশাক বাক্স থেকে জিনিসগুলো আমাকে দেয়, আমি সেগুলো খাবারের ব্যাগে ঢোকাই।

আমার সঙ্গী শুধু কাঁদতে বাকি রেখেছে, সে আমার হাত ধরে। ক্যাপ্টেনকে বলি, ‘আমার যাই হোক না, আমার বন্ধুকে কালকের ট্রেনে উঠিয়ে দেবেন।’ বন্ধু বলে ওঠে, ‘আমি তোমাকে ছাড়া এই শহর ছাড়ব না।’ ক্যাপ্টেনকে বলি, ‘ঠিক আছে, কাল যদি না হয় তো পরশু অবশ্যই, আমার এই কথাটা রাখুন।’ ক্যাপ্টেন আমার পিঠ চাপড়ায়, ‘আপনি চিন্তা করবেন না, ওনাকে আমরা ঠিক পাঠিয়ে দেব।’ ‘পাঠিয়ে দেব’ কথাটা আমার পছন্দ হয় না, এরা কি এত কিছুর পরে আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে? তাদের আশা-ভরসার কেন্দ্রে একজন মানুষ প্রবেশ করেছে, সে জেনে যাবে পবিত্র গোপন তথ্য, ‘গুপ্ত জ্ঞান’, তাকে কেন ছেড়ে দেবে? না, আমাকে তারা ছাড়বে না, কিন্তু আমার বন্ধুকে বাঁচাতে হবে।

ক্যাপ্টনকে বলি, ‘আমার বন্ধু বাইরের কাউকে এই ঘটনা বলবে না, আপনি ওকে বাঁচতে দিন।’ বন্ধুর চোখ দিয়ে জল গড়ায়, আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরি, সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। উদাসীন মহাবিশ্বকে বলি বন্ধুটিকে এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিতে। দরজার দিকে এগোই। 
ক্যাপ্টেন বলে, ‘এবার আমরা তিনজন পেছন ফিরে দাঁড়াব, ভেতরে কী আছে তা আমরা দেখতে চাই না। আপনি ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দেবেন, আমি বাইরে থেকে তালা লাগাবো।’

আকাশের দিকে তাকাই, এই অক্ষাংশে এখন হেমন্ত, হেমন্তের তারারা আমার পরিচিত, তাদেরকে বিদায় জানাই। ওরা তিনজন আমার দিকে পেছন ফিরলে ক্যাটক্যাটে হলুদ রঙের দরজাটায় ধাক্কা দিই, সেটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে খুলে যায়। ভেতর থেকে কয়েক শতাব্দীর বাতাস একটা অজানা নিরপেক্ষ গন্ধকে আমার শরীরে মাখিয়ে দিয়ে বাইরের চত্বরে বের হয়ে যায়, আমি শিউরে উঠি, মুক্ত বাতাস যেন বদ্ধ অশরীরী আত্মাদের বহন করে নিয়ে গেল।

এক হাজার ছয় শ আঠারো নম্বর সীলমোহর পেতে এই শহরে আসা। এটি দিয়ে আমার পাসপোর্টটিকে পূর্ণাঙ্গ করবো ভেবেছিলাম, জীবনের শেষ উদ্দেশ্য, জীবনকে অর্থময় করতে শেষ প্রাপ্তি। হয়তো এরকমই হবার কথা ছিল, মহাবিশ্বে নাকি স্বাধীন চিন্তা বা ফ্রি উইল বলে কিছু নেই, যা কিছু করি না কেন সব হয় বংশগতিবিদ্যা, নয় শিক্ষা বা পারিপার্শ্বিক প্রভাব, অথবা অজানা কোনো স্থিতিমাপকের প্রভাবে। আমি এটা যে বিশ্বাস করি এমন নয়, আসলে ঠিক কীসে যে বিশ্বাস করি জানি না, কিন্তু মনে হলো এই শহরের আসার সিদ্ধান্তটি যদৃচ্ছ দৈবচয়ন নয়, কিন্তু চৌকাঠ পার হতে হতে মনে হয় এসব চিন্তা আমার হঠকারিতাকেই ন্যায্যতা দেবার প্রচেষ্টা।

একটি শূন্য বড় ঘর, মাকড়শার জালের মধ্য দিয়ে টর্চের আলো ফেলে দোতলার সিঁড়িটা খুঁজে পাই। পুরোনো দিনের সাধারণ একটি সিঁড়ি, বারোটা ধাপ, তারপর ১৮০ ডিগ্রি ঘুরেছে, আবার বারোটা ধাপ। দোতলায় উঠে একটা করিডর, তার দুদিকে দুটো করে ঘর, মোট চারটা। যেদিকে ঘড়িটা আছে সেদিকের ঘরটায় ঢুকি, এটি তুলনামূলকভাবে বেশ বড়। একদিকে সিংহাসনের মতো একটা বড় চেয়ার, কাপড় দিয়ে ঢাকা। এক সময়ে কাপড়টা হয়তো সাদা ছিল, ধুলোকালিতে সেটি এখন মলিন ধূসর। কিন্তু যেখানে ঘড়ি থাকার কথা সেখানে নিরেট দেয়াল। সেই দেয়ালটিতে কান পাতি, একটা শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যায়। হাতুড়ি দিয়ে দেয়ালে আঘাত করি, একটা চাপা নিচু কম্পাঙ্কে আওয়াজ শুনি। তার মানে ও’পাশে আর একটি দেয়াল আছে, মধ্যে আছে ফাঁকা জায়গা। ঘড়িটা নিশ্চয় দ্বিতীয় দেয়ালটির পরে আছে, কিন্তু এদিকের দেয়ালের ও’পাশে যাবার কোনো রাস্তা খুঁজে পাই না। দেয়াল না ভেঙে ঘড়িটির কাছে যাবার উপায় নেই। আমার কাছে যে হাতুড়িটা আছে সেটা দিয়ে হয়তো ভাঙা যেতে পারে, কিন্তু বড় মুগুর হলে ভাল হত, অথবা শাবল। এই বাড়ির কোথাও কি তা পাওয়া যাবে? এই বাড়ির কি কোনো বেসমেন্ট আছে? সেখানে কি ওসব থাকতে পারে?

খাবারের ব্যাগটা ওখানে রেখে নিচে নামি, আর একটা সিঁড়ি খুঁজে পাই আরো নিচে নামার। আরো নিচে নামি, বেসমেন্টে। সেখানে একটা তালা-দেয়া বদ্ধ দরজা, হাতুড়ি দিয়ে তালা ভাঙি। দরজা খুললে গুমোট বদ্ধ একটা অদ্ভুত অচেনা গন্ধ আমাকে অবশ করে দেয়।

ঘন অন্ধকার, টর্চের আলোয় দরজার সামনে একটা ছোট চাতালের মতো জায়গা দেখা যায়, কিন্তু চাতালটা বিস্তৃত নয়, একটু দূরে গিয়ে একটা খাদে শেষ হয়ে গেছে। মাকড়শার জাল ভেদ করে সেই চাতালের শেষে গিয়ে নিচে আলো ফেলি। নিচের গভীরতা বেশি ছিল না, হয়তো মিটার তিনেক, সেখানে শুয়ে ছিল একটি মানুষের কঙ্কাল। এখানে যে কঙ্কাল থাকবে সেটা আমার অনেক আশঙ্কার মধ্যে ছিল। কঙ্কালকে আমি ভয় পাই না, মৃত কেউ এখন পর্যন্ত সরাসরি আমার ক্ষতি করেনি। তবুও এর পরের মুহুর্তটি ছিল ভীতিকর, হৃৎপিণ্ডকে একসাথে গভীর শীতলতায় যেমন তা নিমজ্জিত করল, একইসাথে তার গতিকে বাড়াল – ধকধক, ধকধক, ধকধক। আমার কব্জির সামান্য চলনে টর্চের আলো নিচে একটি বৃত্তচাপ রচনা করে, তার আলোয় ধরা পরে একটি নয়, দুটি নয় – একের পর এক শায়িত কঙ্কাল। টর্চের আলো সেই খাদের প্রস্থ যেমন নির্ণয় করতে পারল না, দৈর্ঘ্যও পারল না। সেই দৈর্ঘ্য সেই প্রস্থ জুড়ে ছিল কঙ্কাল, হতে পারো কয়েক শ, হতে পারে কয়েক হাজার। নিজেকে শান্ত করতে চাতালে বসি, টর্চটা নেভাতে সাহস হলো না। আবার টর্চের আলো অন্ধকারে এমন একটা বৃত্ত রচনা করছিল যার পরিধির বাইরে অন্ধকার হয়ে উঠেছিল গাঢ় থেকে গাঢ়তর, সেখানে যেন শত সহস্র অশরীরী আত্মা জোট বেঁধে বাইরের জগৎ থেকে আসা এই আমিকে দেখতে চাইল।

না এতদূর যখন এসেছি তখন শেষটা দেখতে হবে। উঠে দাঁড়াই, চাতালের একদিকে একটা ছোট সিঁড়ি নিচে নেমেছে। নিচে নেমে সেই কঙ্কাল সমুদ্রের তটে দাঁড়াই। এরা একসময় পোশাক পরিহিত ছিল, এখন সেই পোশাক প্রায় অন্তর্হিত, ইঁদুর, কীট অথবা নেহাতই সময়ের এনট্রোপির শিকার। নিকট পর্যবেক্ষণে বুঝলাম এদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি, কারুর হাত নেই, অথবা পা, অথবা মাথাটা, অথবা কারুর শুধু খুলিটাই আছে। অস্ত্রের আঘাত বর্তমান। এক ঐতিহাসিক কার্যক্রম, হতে পারে যুদ্ধ, কিংবা গণহত্যা, এক লাগামহীম নিপীড়ণ। অথবা এরাই ছিল আক্রমণকারী, এদের শবদেহের ওপর স্থাপিত হয়েছে এই পীতভবন, অথবা এই পীতভবনকেই বেছে নেয়া হয়েছে এক ভয়াবহ সংঘর্ষের ফলাফল বহন করার জন্য, এক পৈশাচিক ক্রুরতাকে ভোলানোর জন্য। এক হাজার ছয় শ আঠারো নম্বর শহরের নাগরিকেরা হয়তো জানে এই ইতিহাস, হয়তো জানে না। দুটোর যেটাই হোক সেই ইতিহাসকে বিস্মৃত করতেই এই ভবনে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

কঙ্কাল সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে সম্মোহিত হতে থাকি, মনে হয় এরা ফিসফিস করে ডাকছে, তাদের সাথে শুয়ে থাকতে। না, এই সম্মোহন ভাঙতে হবে, এখানে শাবল নেই, মুগুর নেই। ভুলতে হবে এই দৃশ্য, আমার কাজ শেষ করতে হবে। কঙ্কালদের ডাক অগ্রাহ্য করে, তাদের অদৃশ্য হাতের হিউমেরাস, আলনা, কারপাস, মেটাকারপাস হাড় এড়িয়ে, তাদের আঙুলের কচি ফেলাঞ্জ টুকরোগুলোকে মন থেকে মুছে ফেলতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠি। প্রথম তলায়, তারপর দোতলায়। এখন ভাঙতে হবে দেয়াল।

আশ্চর্য, হাতুড়ির কয়েক ঘায়েই ভেঙে গেলে একটা অংশ, বুঝলাম ইঁটের দেয়াল নয়, কাঠের বেড়ার ওপর পলেস্তরা দেয়া, দুটো বেড়া, মধ্যে ফাঁকা। প্রথম বেড়াটা ভেঙে পরেরটাও ভাঙি, ঘড়িটাকে আড়াল করতে এই ফাঁকা দেয়ালটা গড়া। ঘড়ির পেছন দিকটা চোখে পড়ে, মিটার দুয়েক সমান হবে ঘড়ির চক্রের ব্যাস, আমার থেকে কিছুটা উঁচু, সেটার পেছনে কলকব্জা, পেন্ডুলাম। পেন্ডুলামটি নড়ছে না। দেখলাম যে ভারি ওজনটা এস্কেপমেন্ট কৌশলের অংশ এবং যেটি পেন্ডুলামকে সক্রিয় রাখে সেটা উঁচুতেই আছে, অর্থাৎ নাগরিকেরা বাইরে থেকে ঘড়িটার দম দিতে পেরেছে। তার মানে কোনো একটা গিয়ার কাজ করছে না। সমস্যাটা খুঁজে পেতে দেরি হলো না, দুটি গিয়ার চক্রের মধ্যে একটি ইঁদুরের মৃতদেহ, বেশি দিন হয়নি মনে হয়। আশ্চর্য হলাম যে সেটি এখনো প্রায় অক্ষতই আছে, ব্যাক্টেরিয়ার কাজ পুরোদমে শুরু হয়নি। বেচারা ইঁদুর, নিজে মরল, একটা পুরো শহরের বিশ্বাসের ভিত নড়িয়ে দিল। সাঁড়াশি দিয়ে সহজেই ইঁদুরটা সরিয়ে দেয়া যায়, দিলেই ঘড়ি চলতে শুরু করবে। সেটা করলে কি ক্যাপ্টেন আমাকে বের হতে দেবে?

ভাঙা দেয়ালটা পার হয়ে বড় ঘরটায় ফিরে আসি, ভোর হচ্ছে। এই ঘরের জানালাগুলো পুরোপুরি আলো-নিরোধক নয়, সেগুলোর ফাঁক বেয়ে চলমান সূর্যরশ্মি ঘরের ধূলিকণার চলনকে মূর্ত করতে থাকে। আর একটু পরেই চত্বরে লোক সমাগম শুরু হবে, উৎসবের প্রথম দিন। মেঝেতে বসি, জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলোতে হাত রাখি, বাইরের পৃথিবীর উষ্ণতা অনুভব করি। ক্যাপ্টেন দুটি শব্দ উচ্চারণ করেছিল – গুপ্ত জ্ঞান। এই বাড়ির গুপ্ত জ্ঞানের সন্ধান আমি পেয়েছি, আমাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো কারণই ক্যাপ্টেনের নেই। আজ রাতে সে আমাকে বার করে নিয়ে গুম করবে, আমার বন্ধুকেও।

মিনিট দশেক বসে থাকার পর উঠি, ফিরে যাই ঘড়ির কাছে। এস্কেপমেন্ট যন্ত্রের ভারী ওজনটা দড়ি থেকে খুলে নিচে নামিয়ে রাখি, দড়ি টেনে হাল্কা ওজনটা ওপরে উঠিয়ে এনে সেখানে ভারি ওজনটা লাগিয়ে দিই, আর হাল্কা ওজনটা ভারি ওজনের জায়গায়। ওজন দুটির জায়গা বদল হয়। গিয়ারের জায়গায় গিয়ে সাঁড়াশিটা দিয়ে ইঁদুরটাকে ফেলে দিই। গিয়ার নড়ে ওঠে, এস্কেপমেন্টের বাহুদুটোও নড়ে, পেন্ডুলাম মুক্তি পেয়ে দুলতে শুরু করে। টক টক টক শব্দ করে এস্কেপেমেন্ট। ফিরে আসি বড় ঘরটাতে, এবার আমার অপেক্ষার পালা। ব্যাগ থেকে ক্যাপ্টেনের দেয়া পাঁউরুটি তুলে নিয়ে চাবাই, জল খাই। ক্লান্তিতে চোখ জড়িয়ে আসে, ঘুমিয়ে পড়ি।

বাইরে বিরাট কোলাহলে ঘুম ভাঙে। মানুষ চত্বরে জড়ো হয়েছে, তারা চিৎকার করছে, ঘড়ি উল্টোদিকে চলছে। সময়কে উল্টোদিকে বইতে দেখ তাঁরা আতঙ্কিত, তাদের চিৎকার ভয়ার্ত। আমি দেরি করি না, হাতুড়িটা নিয়ে ভাঙা দেয়াল পার হই, ঘড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সব জামা কাপড় খুলে ফেলি। আমি এখন নগ্ন, প্রাগৈতিহাসিক, প্রথম। হাতুড়ি দিয়ে ঘড়ির একপাশের দেয়াল ভাঙতে শুরু করি। বুম বুম বুম। ঝরে পড়ে পলেস্তারা, ভেঙে পড়ে ইঁট। বাইরে শোরগোল স্তিমিত হয়ে যায়। যতক্ষণ না মানুষ-সমান একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি না হয় ততক্ষণ নিজেকে লুকিয়ে রাখি, তারপর পুবদিকের সূর্যের আলোয় বেরিয়ে আসি। জনতা বিস্মিত নির্বাক হয়ে দেখে আমার আত্মপ্রকাশ, তাদের পবিত্র ভবন থেকে বেরিয়ে আসে এক নগ্ন মানুষ, এক নগ্ন ঐশ্বরিক দূত যে সময়কে বিপরীতে প্রবাহিত করেছে। তারা বলে, ‘সে এসেছে, সে ফিরে এসেছে।’ অনেকেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।

চত্বরের এক কোনায় দেখতে পাই ক্যাপ্টেনকে, তার পেছনে আমার বন্ধু। দেখতে পাই ক্যাপ্টেনের ডান হাতটা ধীরে ধীরে তার মাথার ওপরে উঠছে, হাতের পিস্তলটা আমার দিকে তাক করা, ট্রিগারের ওপর আঙুল। দেখতে পাই আমার বন্ধু চিৎকার করে জনতার দৃষ্টি ক্যাপ্টেনের দিকে আকৃষ্ট করছে, জনতা ক্যাপ্টেনের ওপর চড়াও হচ্ছে, ক্যাপ্টেন মাটিতে পড়ে যাচ্ছে জনতার সম্মিলিত মুষ্ঠাঘাতে, পদাঘাতে। অনুভব করি আমার মাঝে এক নতুন শক্তি, এই ভবনকে আমিই পূত-পবিত্র করেছি। পরক্ষণেই নিজের আত্ম-অহমিকা আত্মশ্লাঘা আমাকে লজ্জিত করে, আমার জীবনের উদ্দেশ্য পাসপোর্টে এক হাজার ছয় শ আঠারো নম্বর সীলটি পাওয়া, স্বর্গীয় দূত হওয়া নয়। কিন্তু এর মধ্যে আর একটি ডাক আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না, বেসমেন্ট থেকে হাজারো কঙ্কালের আহ্বান ভেসে আসে, ‘এসো, আমাদের মধ্যে এসে শুয়ে থাকো।’

নিচে নেমে আসি, ক্ষণিকের জন্য বেসমেন্টের হাতছানি উপেক্ষা করে, হাতুড়ি দিয়ে দরজা ভাঙতে যাই, বাইরে বন্ধুর চিৎকার শুনি, তার কাছে চাবি আছে (ক্যাপ্টেনের জন্য মায়া হয়)। বন্ধু দরজা খুলে দেয়, আমি তার পেছনের জনতাকে হাত দিয়ে ভেতরে আসতে বলি, তারা ভেতরে ঢুকতে সাহস করে না, তবু দ্বিধা কাটিয়ে বেশ কয়েকজন সাড়া দেয়। খোলা দরজা দিয়ে সূর্যের আলো ঢোকে। তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাই নিচের চাতালে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাই আরো নিচে, দাঁড়িয়ে থাকি কঙ্কাল সমুদ্রে। সহস্র অস্থিপাঁজর অংসফলক করোটির অতীতকে মূর্ত করে টর্চের আলোর বৃত্তে উদ্ভাসিত থাকি নগ্ন পরিণত আমি। ওপরে চাতালের পর্বত মালভূমিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে এক হাজার ছয় শ আঠারো নম্বর শহরের নাগরিকেরা। বিস্মিত আতঙ্কে তাদের স্মৃতি ফিরে আসতে শুরু করে, ফিরে আসতে শুরু করে তাদের আত্মপরিচয়, তাদের ত্যাজ্য ইতিহাস।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ