অনুবাদঃ সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’-এর পর, অরুন্ধতি রায় বছর কুড়ি কোনো নতুন বই প্রকাশ করেননি। ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। মাঝের দশকগুলোতে যদিও কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন বাঁধ, মানুষের প্রতিসরণ এবং গণতন্ত্র বিষয়ে, যেগুলো আউটলুক, ফ্রন্টলাইন এবং গার্ডিয়ান ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল— একত্র করলে যেগুলোকে উপন্যাসের চাইতেও বড়ো আকার নেবে। প্রবন্ধগুলোর অধিকাংশই ‘মাই সেডিটিয়াস হার্ট’ নামে ২০১৯ সালের সংকলনে প্রকাশিত। ফুটনোট সমেত। কমবেশি হাজার পৃষ্ঠা আয়তন। এক বছরের মধ্যে ‘আজাদি’ নামে আরেকটি প্রবন্ধ সঙ্কলন প্রকাশিত হয় তাঁর, নয়টি নতুন প্রবন্ধ রয়েছে সেখানে।
সেই দুটি দশককে ফাঁকা মনে করলে, কিংবা তাঁর প্রবন্ধ-সাহিত্য আর গদ্য-সাহিত্যের মধ্যে বিরাট ফারাক রয়েছে ধরে নিলে, তাঁর লেখালেখির প্রতি অবিচার হবে সত্যিই। যখন তিনি নিজেকে ‘রাইটার-অ্যাক্টিভিস্ট’ হিসেবে বর্ণিত হতে দেখেছিলেন একবিংশ শতকে তাঁরই দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকার পাতায়, স্বীকার করেছিলেন, শব্দটি তাকে বেশ আঘাত করেছে (এবং ‘একটি সোফা-কাম-বেড’ জাতীয় অনুভূতিও হয়েছে)। তাঁর প্রবন্ধগুলো উপন্যাসের জন্য দেয়াল না হয়ে বরং মধ্যেকার সেতু হিসেবে কাজ করে। তাঁর লেখনির বিষয় এবং সমস্ত অভিযোগ সব সময়েই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। কার কত ক্ষমতা রয়েছে (কেনই বা রয়েছে), কীভাবে তা ব্যবহৃত হয় (এবং অপব্যবহার করা হয়), কীভাবে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতার কেউ বা কারা জেগে ওঠে স্বল্প ক্ষমতা নিয়েই— এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে সৌন্দর্য এবং আনন্দ খুঁজে নিতে কীভাবে। ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ একটিমাত্র পরিবারকে কেন্দ্র করে লেখা উপন্যাস, ভেবে দেখুন ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ বইতে কিন্তু তাও একটি বড়ো পরিসর রয়েছে, তবে যে সমস্ত প্রশ্নের উত্থাপন ঘটেছে এবং যে বিষয়গুলোর সম্যক অনুসন্ধান করা হয়েছে সেই উপন্যাসে, সেটি বরং অনেক বেশি ‘রাজনৈতিক লেখা’ তাঁর যেকোনো প্রবন্ধের চাইতে। প্রবন্ধগুলো অনেকটাই কাহিনির মতো সুচারু এবং সুন্দর করে লেখা। কাহিনির মতোই শুদ্ধতা নিয়ে সংশয়, সাম্যতার অভাব, এবং সুন্দর একটি গল্প রয়েছে সেগুলোতে।
অরুন্ধতি ১৯৫৯ সালে ভারতের উত্তর-পূর্বের শিলং-প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বড়ো হয়েছেন কেরালার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে। ১৯৭৬ সালে নিউ দিল্লীতে প্ল্যানিং এবং আর্কিটেকচার স্কুলে ভর্তি হন, এবং তারপর থেকে ওখানেই থাকতে শুরু করেন। পেশাগতভাবে স্থাপত্যবিদ হতে চাননি তিনি। (সেই স্কুল এবং তার ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রচলিত উদ্ভট মুখের ভাষা পর্যন্ত দেখানো হয়েছিল সেই ছবিটাতে, যেখানে অ্যানি ওই ব্যাপারগুলো নিয়েই পড়ে রয়েছে, তিনি আমাকে বলেছিলেন যে এখন সেই ছবিটি প্রতি বছর প্রদর্শিত হয় নবীনদের জন্য)। এযাবৎ অনেক সাহিত্য-সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে পেয়েছিলেন ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’-এর জন্য বুকার পুরষ্কার। ল্যাননান মুক্ত-সংস্কৃতি পুরষ্কার, সিডনি শান্তি পুরষ্কার, লেখালেখির অতি বিশিষ্টতার জন্য নরমান মেইলার পুরষ্কার, এবং ২০১৭ সালে মাহমুদ দারউইশ পুরষ্কার। তাঁর গর্ব হওয়ার ছিল এই দীর্ঘ তালিকার জন্য, কারণ ওঁকে অনেকেই পথের কাঁটা বলে মনে করতেন। তিনি আমাকে এও বলেছিলেন, ২০০০ সালে বিশ্ব জল-সংস্থার মহাসম্মেলনে এক বিশিষ্ট ভদ্রলোক বক্তৃতায় বলেছিলেন, আমি জল নিয়ে লিখি আমাকে টাকা দেওয়া হয় বলে। এদিকে নিজের বক্তৃতার শুরুতেই তিনি বললেন, ‘আমার নাম অরুন্ধতি, আর আমি জল নিয়ে লেখালেখি করি, কারণ আমাকে অনেক টাকা দেওয়া হয় না বলে।’
আমরা ২০১৯ সালের শুরুতে তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলাম পরপর তিনটে সকালে। তিনি তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা করার জন্য। ব্যক্তিগত জীবনেও দেখলাম সেই এক, একই আবেগ আর সবসময়েই একটা হুড়োহুড়ি ব্যাপার রয়েছে তাঁর। কিন্তু তাঁর রসিক হৃদয়টির প্রশংসা না করে উপায় নেই, খুব বড়ো মনের মানুষ একজন, সব সময়েই যেন জানাতে চান তার সঙ্গের লোকটিকে— এখন ঠিক তিনি কি দেখছেন, বা ভাবছেন।
প্রশ্নকর্তাঃ
আপনার বই পড়ার অভ্যাসের ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন কি?
অরুন্ধতিঃ
যখন কেরালায় বড়ো হচ্ছিলাম, মাথাটাকে ঠিকঠাক পুষ্টি দেওয়ার জন্য একদিকে ছিল ইংরেজি, আরেক দিকে মালায়ালম। প্রচুর পড়েছি শেকসপিয়ার এবং কিপলিং-এর লেখা। বিশ্বের সবচাইতে সুন্দর কাব্যিক ভাষা, সেইসঙ্গে অসুন্দর রাজনীতি। যদিও সেগুলো কীভাবে কি হতো, একেবারেই বুঝতে পারতাম না তখন, …কিন্তু আমি ওঁদের দ্বারা খুবই প্রভাবিত হয়েছিলাম। এঁদের পর আমাকে প্রভাবিত করেছেন সবচাইতে বেশি— জেমস ব্যাল্ডউইন, টোনি মরিসন, মায়া আনগেলো, জন বার্গার, জয়েস, নবোকভ। প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় লেখকদের তালিকা তৈরি করা যে কি দুঃসাধ্য কাজ! এদের সকলের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ, সেইসঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী, যৌনতাবাদী, বন্ধুবান্ধব আর প্রেমিকরা, অত্যাচারী এবং বিপ্লবী— প্রত্যেকের কাছেই। একজন লেখকের সকলের কাছেই কিছু না কিছু শেখার আছে। কারণ আমার পড়াশোনা প্রায়ই মিসেস ডালওয়ে থেকে সরে গিয়ে কোনও এক বছরের পঞ্জিকৃত নাগরিকদের জাতীয়-তালিকার দিকে চলে যেতে পারে। যেমন আসামে বিশ লক্ষ লোক এক তালিকার কারণে ফেঁসে গিয়েছে, নাগরিক অধিকার নিয়ে অন্যভাবে ভাবা হচ্ছে।
যে উপন্যাসটা সম্প্রতি পড়ে আপ্লুত হয়েছি আমি, সেটি হল ভাসিলি গ্রসমানের ‘লাভ অ্যান্ড ফেট’, একেবারে সাংঘাতিক— দুঃসাহসিক একটা ব্যাপার। সঙ্গে চরিত্রগুলোর বিরাট ব্যাপ্তি এবং সেরকমই কাহিনির পট। একটা পরাবাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে দেখানো হচ্ছে, ভোলগা নদী জ্বলছে। জলের ওপর গ্যাসোলিন ভাসছে, আর আগুনের স্পর্শে জ্বলে উঠছে, মনে হচ্ছে আস্ত নদী আগুনে জ্বলছে। বিভ্রমের উপস্থাপনা। স্তালিনগ্রাদে যুদ্ধ লেগেছিল যখন, সেরকমই ঘটেছিল। পাণ্ডুলিপিটাকে গ্রেপ্তার করেছিল সোভিয়েত-রাজ, যেন সেটি নিজেই এক ব্যক্তিসত্তা। আরেকটা ভালো বই পড়লাম, গিওর্জিও বাসিনির লেখা ‘দ্য গার্ডেন অফ ফিঞ্জি কনতিনিজ’, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেকার পটভূমিকায় লেখা। যখন ইতালির অনেক ইহুদী আসলে ফ্যাসিস্ট-পার্টির সদস্য ছিল। ফিনজি কোনতিনিরা ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত এবং বিত্তবান ইহুদী-পরিবার যাদের বাড়িতে বিরাট খোলা মাঠ ছিল, টেনিস কোর্ট ছিল। হলোকস্টের আগে, এক আগন্তুক এসে ওঠে ওদের বাড়িতে, বাড়ির এক মেয়ের সঙ্গে তার প্রেম হয়, ওদের প্রেম নিয়েই গল্প। পুরো বাগান বা বাড়ির খোলা অংশে যেন একরকমের স্থিরতা জাঁকিয়ে বসেছিল, যা যা ঘটে চলেছে সেগুলোকে যেন ইচ্ছে করেই ঘটছে বলে ভাবা হচ্ছিল না, এমনকি অন্ধকার ঘনিয়ে এলেও না। সেগুলো ছিল হাড় হিম করা, একেবারেই সাম্প্রতিক। ফিনজি কোনতিনিদের সবাই একদিন মারা গেল। মনে করে দেখুন, স্তালিনের সময়ে রাশিয়ায় যা ঘটেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইয়োরোপে যা যা ঘটেছিল— এগুলোর পড়া আজও চলছে, বর্তমান সময়কে বোঝার অন্যতম পথ হল বই পড়া। চমৎকৃত হয়েছিলাম, যখন জেনেছিলাম, স্তালিন যাদেরকে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠাতেন, মারা যাবার আগে তারা চিৎকার করে বলতেন— স্তালিন দীর্ঘজীবি হউন! আবার যাদেরকে লেবার-ক্যাম্পে বা গুলাগে পাঠানো হয়েছিল, স্তালিনের মৃত্যুর খবরে সকলেই কান্নাকাটি করেছিলেন। জার্মানির সাধারণ মানুষ কখনো হিটলারের বিরোধিতা করেননি। এমনকি যুদ্ধ লেগে শহরগুলো ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবার পরেও তা বদলায়নি। মানুষের মনস্তত্ত্বের হদিশ খুঁজে বেড়াই আমি ইয়ান কেরশ-র লেখা হিটলারের জীবনীতে, নাদেসদা মান্দেলস্তামের স্মৃতিকথায়, রাশিয়ান কবি ওসিপ মান্দেলস্তামের স্ত্রী ছিলেন তিনি, ওসিপকে আসলে স্তালিনই খুন করেন। আর পড়ি, আন্না আখমাতোভা আর ভারলামের কোলাইমা-কাহিনিগুলো।
প্রশ্নকর্তাঃ
সবই যে রাশিয়ান।
অরুন্ধতিঃ
(হাসি) হ্যাঁ, এখনও পর্যন্ত, রাশিয়ানই সবচেয়ে বেশি। ওঁরা খুব সরসভাবেই পাঠককে একটা বিশাল ন্যারেটিভের জগতে নিয়ে যেতে পারেন। এবং, অবশ্যই চেখভ, যিনি এই পদ্ধতিতেই পাঠককে আণুবীক্ষণিক জগতে নিয়ে যান। ওঁদের একই পথে চলার বদলে বারবার অভিমুখ পাল্টে দেওয়ার ব্যাপারটা আমি খুবই উপভোগ করি। কিন্তু এখন ট্রাফিক-কন্ট্রোল অনেক বেশি কঠোর, গলিগুলোও যেন সরু, দমচাপা। লেখক, পাঠক, সক্কলে যেন কথা বলাবলির ব্যাপারে সারাক্ষণ ভয়ে তটস্থ। ওপর-নীচ, আগেপিছে, সব দিক দিয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ভারতে, সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপ ব্যাপারটা রাস্তায় লোক নামিয়ে দিয়েই ষোলোকলায় পূরণ করানো হয়, সরকার ছাড়া আর কারও এতে দায় থাকে না। আমরা ধীরে ধীরে এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল অচলাবস্থার দিকে এগোচ্ছি।
প্রশ্নকর্তাঃ
আপনার লেখালেখি কখনো আণুবীক্ষণিক জগতের দিকে যেতে চায়নি? নাকি ছোটগল্প— নিজের ছাঁচ ভেঙে আচমকাই উপন্যাসের দিকে নিজের মুখটা পাল্টে নিয়েছে?
অরুন্ধতিঃ
বহু বছর হল, আমি শুধুই উপন্যাসের জগতে ডুবে থাকতাম। এর চাইতে বেশি কিছু নিয়ে বেঁচে থাকার মতো সময় আমার ছিল না। অনেক লেখক এতে খুব কষ্টও পান, কিন্তু আমার ভালো লেগেছে। সেই বিশ্বের অংশ-বিশেষ হয়ে থেকে যাওয়া, ভারসাম্যহীন এক বিশ্বে থাকা, যেন একটি প্রার্থনার মধ্যে থেকে যাওয়ার মতোই— যেটি উৎপাদিত বস্তুর থেকে বিচ্ছিন্ন, বা বস্তুটার সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার শেষ, এমনকি বস্তুটারও শেষ অবস্থা। একটা উপন্যাস থেকে নির্মিত বিশ্ব কতটা সাংঘাতিক— না, কিনা একটা বস্তু। মাপ করবেন আপনারা আমাকে।
প্রশ্নকর্তাঃ
কিন্তু সেই উৎপাদিত বস্তুটি কি? আপনার মতে উপন্যাস জিনিসটা আসলে কি?
অরুন্ধতিঃ
আমার মনে হয়, এত সরলরৈখিক আর গৃহপোষিত হয়ে যাওয়ার কারণে উপন্যাস নিজের বিপদ নিজেই ডেকে এনেছে। আপনি যদি ভাসিলি গ্রসমান কিংবা অন্যান্য রাশিয়ান উপন্যাস পড়েন, দেখবেন ওই লেখাগুলো বন্য, এবং পোষ মানানোর মতো নয়, কিন্তু এখন সাহিত্যকে নানান প্যাকেজে নামাঙ্কিত করে বিক্রি করার প্রচেষ্টা চলছে, —সেটি রোমান্স, নাকি থ্রিলার, নাকি পুরোপুরি বাণিজ্যিক কিছু একটা? বইয়ের শেলভের কোন তাকে সেটিকে রাখা উচিত? এখনকার দিনে এম-এফ-এ উপন্যাস বলেও একটা কি যেন এসেছে, যেটা সুন্দর একটা মেশিনে উৎপাদিত বস্তু। যার কিনারাগুলো সুন্দর মসৃণ। অধ্যায়ের সংখ্যা থেকে চরিত্রের সংখ্যা, সবই খুব কায়দা করে ঠিক করে ফেলা— আমি বলছি, পুরুষ-ঔপন্যাসিকদের লেখায় তাও এর থেকে একটু হলেও বিচ্যুতি ঘটতে দেখবেন। তাঁরা খুব সহজেই একটা বড়ো ক্যানভাসে প্রবেশ করে যান। নারীদের ক্ষেত্রে দেখুন, প্রশ্ন তুলবে— উপন্যাসটায় কটা চরিত্র আছে? লেখাটা কি একটু বেশিই রাজনৈতিক হয়ে গেল না? মনে হয় জিগ্যেস করি ওঁদের, ওয়ান হান্ডরেড ইয়ারস অফ সলিচিউড বা ওয়ার অ্যান্ড পীস উপন্যাসে কটা চরিত্র ছিল মনে পড়ে? কখনো আমার মনে হয়, নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকা এই যে শ্রেণীটা, সাংস্কৃতিক জগতের রাজা-মহারাজারা যারা এই সময়ের সাহিত্য-সংস্কৃতির একমাত্র বিচারক, তাঁরা সবিশেষ ভীত যেকোনো ধরনের সত্য, গভীর কোনো অমিংমাসিত রাজনীতিকে সাহিত্যের মাধ্যমে তুলে ধরতে, ব্যাপারটা তার ওপর আমাদের শিক্ষাতত্ত্বকেও অমান্য করছে। আমরা সেই ধরনের বিশ্বকে নিয়েই লেখালেখির প্রত্যাশী, যে বিশ্বে সভ্যতার অগ্রগতি, আলোকিতকরণ, সবই আগে থাকতে অনুমোদিত হয়ে এসেছে। কিন্তু আমার মনে হয় পরিবর্তন আসছে। তরুণ কবি এবং লেখকেরা স্পর্ধা দেখিয়েছেন অনেকেই, সব দেশ থেকেই, সারা বিশ্ব জুড়ে।
প্রশ্নকর্তাঃ
মেশিনে উৎপাদিত বস্তু— ব্যাপারটা বেশ আকর্ষণীয়, এটি যদিও লেখকের ক্ষেত্রে তিনি কোন বিষয়ে কতটা গভীরে প্রবেশ করতে ‘অনুমোদিত’ হবেন, সেটির একটি সীমা নির্দেশ করে দেয়, এমনকি একটি বইতে কোন কোন বিষয় থাকতে পারে— সেটিও ঠিক করে দেয়, —যেমন কোনো পারিবারিক কাহিনিতে কখনো রাজনীতি প্রবেশ করবে না, বা তার উল্টোটাও। ‘মিনিস্ট্রি’ বইতে আপনি তিলো-র প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘সে তার পৃথক থেকে যাওয়া বিশ্বগুলোকে পৃথক করে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল’, ব্যাপারটা মনে হয় আপনার কাজের ক্ষেত্রেও একইরকম, উপন্যাসের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি একাধিক প্রজন্মের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য।
অরুন্ধতিঃ
একজন ঔপন্যাসিক কখনোই পৃথক পৃথক জগত সৃষ্টি করতে পারেন না। আপনার কাজই হল, সবগুলো জগতকে চুরমার করে মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়া। লেখাপড়ার বিশ্ব, সাংবাদিকতার বিশ্ব, এন-জি-ও-এর বিশ্ব, এরা সবসময়েই একেকটি পৃথক বিশ্ব হিসেবে দেখাতে চায়, —যেমন এটা একটা আবহাওয়া পরিবর্তনের কাগজপত্র, এই ঘরে বসে যেমন আমরা হিন্দু-জাতীয়তাবাদ নিয়ে আলোচনা করছি, ওই ঘরটা হচ্ছে যুদ্ধ এবং শান্তির প্রশাসন-গৃহ, অমুকটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির, তমুকটা হল পরিবেশ দপ্তরের অনুদানের, আবার এই ঘরে বসেই আমরা মানুষের জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ইত্যাদি অস্তিত্ব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি। কখনো-কখনো আমি যখন বেশ খারাপ মেজাজে থাকি, তখন মনে হয়, ব্যাপারটার সঙ্গে যেন অনুদানের শ্রেণী-বিভাজনেরও মিল রয়েছে। কিন্তু ব্যাপারগুলোকে ঠিকঠাক বুঝতে হলে, একদম ভেতর থেকে অনুধাবন করতে চাইলে, ভেতরের খেলাগুলোকে ধরে ধরে এগোতে হবে। কাশ্মীর-সমস্যার প্রকৃত স্বরূপ জানতে হলে যেমন শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর গতিপ্রকৃতি জানলেই চলবে না, জানতে হবে— জায়গাটির ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদের হিসেব, নদনদীগুলোর সম্বন্ধেও জানতে হবে। যখন ওড়িশার কোনো জায়গায় দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসাত্মক ঝামেলা শুরু হয়, ওদের ঝামেলার ইতিহাস ছাড়াও জানতে হবে, নিকটবর্তী বক্সাইট পাহাড়ের গল্প, যেখানে এই মুহূর্তে খনিজ উত্তোলন করা হচ্ছে। ভারতের অর্থনীতি কীভাবে কাজ করে, তা জানতে হলে অর্থনীতির অধ্যয়নই যথেষ্ট নয়। ব্যাপারটাকে জাতিভেদের প্রিজমের মধ্যে দিয়ে দেখা উচিত। আপনার দরকার একসাথে অনেকগুলো চোখ, যেগুলো আপনার মাথাটাকে চক্রাকারে ঘিরে থাকবে, আর আপনার ত্বকের ঝাঁঝরি দিয়ে সব কিছু আপনার মাথায় প্রবেশ করবে। অন্তত আমি, এই ধরনের ঔপন্যাসিকই হতে চেয়েছিলাম। এটাই আমার জীবনের ট্র্যাজেডি বা রক্তমাংস বলা যেতে পারে। ব্যাপারটা আমার জীবনটাকে একদিন টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল, পরে আবার সেগুলোকে আঠার সাহায্যে যেন জুড়েও দিয়েছিল। আবার কখনো এও মনে হয়, আমার হয়তো অন্য কেউই হওয়ার ছিল, ভিন্ন এক ব্যক্তি।
প্রশ্নকর্তাঃ
আপনার সাহিত্যে অনুপুঙ্খের বর্ণনা আবার সাধারণ বর্ণনা— সুন্দরভাবে পাওয়া যায়, যেমন আপনি বললেন, সব কিছুকে একসঙ্গে করে দেখানো, কিংবা কাছে এনে বা দূর থেকে দেখানো, সবই।
অরুন্ধতিঃ
আমার ক্ষেত্রে সেটি অত গুরুতর কিছু নয়, কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে ভারতের মধ্যে বাস করে যাওয়া মানুষজনদের ব্যাপারগুলোকে আরও রপ্ত করতে হবে। যে দেশে আশা করা হয়, প্রতিটি মানুষ জাতিভেদের বেড়াজালের মধ্যেই চিরকাল বেঁচে থাকবে, সেইসঙ্গে থাকবে বর্ণ, ধর্ম, এসবের শাসন। যেকোনো সময়ে ‘মান-হত্যা’ বা ধর্মত্যাগের কারণে সব কিছুই নীচে নেমে যেতে পারে। আপনি যদি বেড়াজালের বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেন একবার, তবে আপনি ভেতরে থেকেও একজন বহিরাগত হয়ে উঠবেন— আমার মতো।
ব্যাপারটা আমাকে একটু বিশদে বলতে দিন। এমন নয় যে আমি শোষিত এবং দীর্ঘকাল ধরে অত্যাচারিত কোনো সমাজ থেকে উঠে এসেছি। বিপরীতে বরং বলা চলে— আমার মা ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশের কন্যা, কেরালার সিরিয়ান ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিটির সঙ্গে তিনি সংযুক্ত ছিলেন, ‘গড অফ স্মল থিংস’-এর আম্মুর মতোই। আমার বাবা, আমার মদ্যপ বাবা, যিনি আমার দু-বছর বয়সে আমার মাকে ছেড়ে চলে যান, এসেছিলেন দেশের আরেক প্রান্ত থেকে, তার নাম বাংলা। তাঁর পরিবার ছিল পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ, কিন্তু তাঁরা প্রাচীন খ্রিস্টান ছিলেন না। মাত্র গত তিন প্রজন্ম ধরে, আমার প্রপিতামহ, পিতামহ, ও আমার বাবা, খ্রিস্টান হয়েছিলেন। আমার এক তুতো-ভাই আছে যিনি ইসলাম-ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, আরেকজন করেছিলেন ইহুদী ধর্ম। আমার বাবাকে খ্রিস্টানদের কবরখানায় সমাধিস্থ করা হয়েছিল, জায়গাটার নাম বারুরি, দিল্লীর একেবারে প্রান্তে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, আমার মা, যিনি ধর্ম এবং সমাজের বাইরে গিয়ে বিবাহ করেন এবং কিছুদিন পরেই বিবাহবিচ্ছিন্না হন, সিরিয়ান ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিটি বলেই দিয়েছে তাঁকে ওঁদের কবরখানায় সমাধিস্থ করা যাবে না। আমার মা যদিও সেটি চান না। এতসব সত্ত্বেও, কেরালায় নিজের সমাজের কারণে এত ঝামেলা পোহানো সত্ত্বেও তিনি আজও কেরালাতেই আছেন, এখনও বেঁচে তিন, চাকরিও করছেন। কিন্তু আমি দিল্লীতে পালিয়ে এসেছিলাম। ওখানে আমি আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশোনা করি, এবং আজ আমি আমার জন্য সম্পূর্ণ এক নতুন ব্যক্তিগত বিশ্বের নির্মাণ ঘটাতে পেরেছি, —এখন আমি একজন লেখক, সঙ্গে কোনো লোকজন ছাড়াই। আমার লেখালেখিই আমার জন্য এক নতুন গোষ্ঠী তৈরি করে দিয়েছে, …যেটি আমার কাছে পাসপোর্টের মতো। যার জোরে আমি আজ এখানে-ওখানে চলে যেতে পারি, নয়তো আমি সব ক্ষেত্রে উষ্ণ অভ্যর্থনা নাও পেতে পারতাম— আসামের ব্রহ্মপুত্রের দ্বীপগুলো যেমন, ওখানে রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জিকরণের কারণে অনেক লোক আটকা পড়ে আছে, কিংবা ভয়ানক হিংসার শিকার হওয়া কাশ্মীরের কোনো উপত্যকায়, যেখানে আমার অনেক প্রিয় বন্ধু থাকে এবং চাকরি করে, অথবা মধ্য-ভারতের গহন জঙ্গলে, যেখানে এখনও গেরিলা-যুদ্ধ চলছে। ওইসব জায়গায় আমি এই জন্যেই যেতে চাই, কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত আমি নিজে না গিয়ে পৌঁছোচ্ছি, ওখানকার লোকজনের সঙ্গে কথা না বলছি, ওদের বিশ্বের পরিগঠন এবং বৈচিত্র্যবোধ, স্বকীয়তা এবং সেইসঙ্গে সার্বজনিনতা, এবং প্রায় পাগল করে দেওয়া এক পৃথিবী আমার জানার বাইরে থেকে যাবে— যাকে নিয়ে আমি লিখতে চলেছি। নিজের পুরনো বোঝাবুঝিগুলো যখন নতুন কিছু বুঝে নেওয়ার আমন্ত্রণ পায়, সেটাই হচ্ছে একজন লেখকের জন্য সবচাইতে বড়ো পুরস্কার, সেটি কিন্তু কোনো সাংবাদিকসুলভ মানসিকতার নয়, কারণ আমি কখনোই নিরপেক্ষতার দাবীদার নই। প্রভূত সময় আমি শুধু গাড়িতে চেপে চক্কর কেটে বেড়িয়েছি ওসব অঞ্চলে এমন সব লোকের সঙ্গে, যারা ওই অঞ্চলগুলোকে চেনেন, জানেন ওখানকার মানুষজনদের, তাদের গাঁ, প্রকৃতি-পরিবেশ, সবই তাদের জানা, ঠিক যেন নিজেকেই দেখাচ্ছেন তাঁরা, …এঁরা সব আমার লোক, সে যেকোনো ভাবেই হোক না কেন। এটি যেন সবরকম শাসনাধীন অঞ্চলের বাইরে, যেন সরোবরের বুকে ফুটে থাকা লিলি-ফুলের পাপড়িতে পা ফেলে ফেলে আমরা এগোচ্ছি, না হলে, স্রোতস্বিনী কোনো নদীর ওপর ফেলে রাখা পাথরের ওপর পা ফেলছি আমরা। আবার এমনও হতে পারে, ওইসব লিলি-ফুলের পাপড়ি আর শক্ত পাথরগুলোই আমরা। এরাই আমার সবরকম বোঝাবুঝির ভাসমান দ্বীপ— এরাই আমার লেখালেখির মানুষ, এদের নিয়েই আমার লেখা নির্মিত হতে থাকে।
প্রশ্নকর্তাঃ
জীবনের একেকটি অংশ আপনি একেক জগতে কাটিয়েছেন, কিংবা কাটাতে হয়েছে, যেমন— দিল্লীতে, এতে বিভিন্ন ভাষার মুখোমুখি হয়েছেন আপনি। ভাষা আপনার লেখালেখিতে সবসময়েই সচেতনভাবে ক্রিয়াশীল থেকে গিয়েছে, যেমন হিন্দি, ইংরেজি, উর্দু, মালায়ালম, কাশ্মীরি, দেখা গেছে ‘মিনিস্ট্রি’-তে ডঃ আজাদ ভারতীয় তেলেগু, ইংরেজি, উর্দু চিঠিগুলোকে অনুবাদ করছেন। লোকে একে অপরের জন্য অনুবাদ করছেন, নাকি এক অপরকে অনুবাদ করছেন, নাকি শুধুই এটি ‘একে অপরের জন্য’ ব্যাপার?
অরুন্ধতিঃ
যখন আমি লিখি, আমি অনুবাদও করে যাই। যখনই আমি ইংরেজিতে কিছু লিখি আমার মস্তিষ্ক সচল হতে শুরু করে দেয়, যা মুসার ক্ষেত্রে উর্দু বলে ভাবা যেতে পারে। আবার যেমন, আমি তেলেগু জানি না, কিন্তু আমি জানি তেলেগুভাষীরা কেমন করে ইংরেজি বলে, আমি এও জানি— মালায়ালিরা কিরকম ইংরেজি বলে। (হাসি) আমার কাছে, ইংরেজি হচ্ছে একটা রাবার-ব্যান্ড, আমাকে ওই ভাষাটা নিয়ে আমার মতোই করে যেতে হবে অন্যান্য ভাষাগুলোতেও যেমন করা হচ্ছে।
প্রশ্নকর্তাঃ
আপনি ইংরেজি এবং মালায়ালম, এই দুই ভাষার সান্নিধ্যেই বেড়ে উঠেছেন, সত্যি তো?
অরুন্ধতিঃ
আগেই বলেছি, আমার মা হচ্ছেন কেরালার, যেখানে আমরা মালায়ালম বলি, আবার আমার বাবা হচ্ছেন বাঙালি, ওখানে ওঁরা বাংলা বলেন। আবার আমার জন্ম শিলং-এ, তখন ওই জায়গাটা আসামেরই অংশ ছিল, এখন মেঘালয় নামে স্বতন্ত্র রাজ্য হয়েছে। আমার জন্মের পর থেকে বাবা-মা একসঙ্গে থাকত না, যখন তারা ঝগড়া করত আমাকে চা-বাগানের শ্রমিকদের কুটিরে রেখে আসা হতো, যেখানে শ্রমিকেরা নিজেদের ভাষায় কথা বলত, বাগানকে বলত বাগানিয়া। ওঁরা হচ্ছেন আদিবাসী, একেবারে আদিম জনমানুষ, যাদেরকে ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় থেকে আনানো হয়েছিল অনেককাল আগে, নিষ্ঠুরভাবে ওঁদেরকে শোষণ করা হচ্ছে, আজকে পর্যন্ত। এরপর আমার বাবা-মার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে গেলে আমি উটি চলে আসি, যেখানে লোকজন কথা বলত তামিলে। আমার মনে হয়, ওটাই প্রথম ভাষা, যেটা আমি শিখি। এরপর, আমার শৈশবের দিনগুলোতে একটু একটু করে আমি হিন্দি, ইংরেজি, এবং মালায়ালম শিখি।
প্রশ্নকর্তাঃ
কেরালায় যে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন, সেটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল, নাকি মালায়ালম?
অরুন্ধতিঃ
শুরুর দিকে, যখন আমি আয়েমেনেমে বড়ো হচ্ছিলাম, আমি স্কুলে যেতাম না, তবে মালায়ালমে কথা বলতাম। আমার মা যেদিন নিজের একটা স্কুল খুললেন, যেটা এখনও চলছে, আমি সেখানেই পড়াশোনা শুরু করি, এবং সেখানে একটা কঠিন শাস্তি দেওয়ারও চল ছিল। যদি কেউ ইংরেজি না বলে মালায়ালম বলে ফেলে— তাকে ‘আই উইল স্পিক ইংলিশ’ কথাটা লিখতে হতো একশোবার। কখনো পাঁচশো বার। যদিও এটার চল শুধুমাত্র মায়ের স্কুলেই ছিল না। তবে এখন শুনছি বুনিয়াদি ক্লাসগুলো মালায়ালমেই চলছে। এরপর আমাকে যে বোর্ডিং-স্কুলে পাঠানো হয়, ওখানেও প্রধান ভাষা ছিল ইংরেজি।
প্রশ্নকর্তাঃ
আপনি তাহলে আপনার সাহিত্যের ‘রাজভাষা’ বা রাজনৈতিক-ভাষার প্রতি যথেষ্টই নজর রাখেন— ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’-এ পুলিশের সেই তালিকা, ‘মিনিস্ট্রি’-তে আনজুম ‘হিজরা’ শব্দটা ব্যবহার করলেও সাঈদা নিজের মতো করে শব্দ বসিয়ে নিচ্ছিল, যেমন এম-টি-এফ এবং এফ-টি-এম এবং সঠিক-লিঙ্গ-নির্ধারিত, তকমা দিয়ে যাচ্ছিল ‘ছোঁয়া যায় না এমন’ কিংবা ‘তফশিলি জাতি’, এসব।
অরুন্ধতিঃ
ব্যাপারটা নিয়ে আমি যত ভাবি, ততই উপলব্ধি করি— এটা আমার জন্য কতটা জরুরি। সাধারণের ভাষাতে প্রথম সতর্কবার্তা পেয়ে, ব্যক্তিগত ভাষায় তারপর অনুসন্ধান শুরু করা। নয়ের দশকে যখন পরমাণু-পরীক্ষা ঘটানো হল, উদাহরণ হিসেবেই ধরা যাক, দেখা গেল— দেশের সাধারণের মুখের ভাষাই তারপর থেকে বদলে গিয়েছে, এবং সেটা ভারতে অনুমোদিত হল রীতিমতো।
সত্যিটা ছিল, এরপর থেকে ভারত নিজেকে ‘পরমাণু-শক্তিধর’ দেশ হিসেবে জাহির করতে শুরু করল, সঙ্গে আরও কিছু ব্যাপার উঠে আসতে শুরু করে, যেমন আগ্রাসী হিন্দু-জাতীয়তাবাদ, ‘আসল’ এবং ‘প্রকৃত’ ভারতীয় হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে যা একান্ত জরুরি হয়ে উঠছিল। ধর্ম-ভিত্তিক সংখ্যালঘুদের নতুন করে কলঙ্কিত চোখে দেখতে চাওয়াটাও মেনে নিল সকলে, বিশেষত মুসলিমদের। প্রকাশ্যে ইসলাম-বিদ্বেষ অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। ভাষার এই প্রতিসরণটাই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল— দ্য এন্ড অফ ইম্যাজিনেশন, ভারতের পরমাণু-পরীক্ষা নিয়ে লেখা আমার প্রবন্ধ। এরপর আমি যখন নর্মদা-উপত্যকায় যাই, বাঁধ-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে লেখালেখি শুরু করি, দেখি ওখানকার ভাষা একেবারে আলাদা। লোকে নিজেদেরকে ‘প্রযুক্তি-কবলিত মানুষ’ বলে চিহ্নিত করে সেখানে। জানতে চায়, আপনি কী প্রযুক্তি-কবলিত মানুষ? না, আমি নই। আমার নাম কোনো তালিকায় নেই। এখন আসামে, রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জিকরণের তালিকার কারণে, নতুন নতুন সব কথার চল হয়েছে। একেবারে দূরের দ্বীপের মৎস্যজীবী মানুষেরা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছেন প্রচুর। যেমন ডাউটফুল ভোটার, ডিক্লেয়ার্ড ফরেইনার, এবং জেনুইন সিটিজেন, এবং সেইসঙ্গে তারা অত্যন্ত ভীত কি করে তারা এতসব কাগজপত্র যোগাড় করবে? তবে দীর্ঘকাল ধরে কাশ্মীর সেনা-অধ্যুষিত হওয়ার কারণে ওখানকার মুখের কথাও বদলে গিয়েছে। যার থেকেই ‘মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এর তিলো-র কাশ্মীরি থেকে ইংরেজি অভিধানের উদ্ভব। তফশিলিদেরও নিজস্ব ভাষা রয়েছে, রয়েছে গা-ঘিনঘিনে তার ঐতিহ্যময় ব্যবহার, আপত্তিজনক পরিভাষা পর্যন্ত। স্বদেশী ভাষাগুলোতে শূদ্র এবং দলিত মেয়েদেরকে এবং জনসাধারণকে অত্যন্ত অসম্মানজনক যেসব শব্দে উল্লেখ করা হয়, সেগুলোও কিন্তু ওদের ভাষার থেকেই প্রাধান্য পেয়েছে।
আমার থেকে এতসব ব্যাখ্যা শুনে কেমন লাগল? আমার জন্য, আমার গল্প, জীবন নিজেই। একটা গল্প বলে যাওয়ার মানে গল্পটা নিজেই সেটা। আর যে ভাষায় গল্পটা বলা হল, সেটা কিন্তু অন্য আরেকটা গল্প। কারণ, পৃথিবীর এই প্রান্তটিতে কিন্তু ভাষা এক মহাসমুদ্র, যা ভাষামাছের ঝাঁক আর শব্দমাছে পরিপূর্ণ আজও।
প্রশ্নকর্তাঃ
আমার মনে পড়ে, কোনো একটা প্রবন্ধে আপনি বলেছিলেন— ‘ভাষা হচ্ছে আমার চিন্তার ত্বক’?
অরুন্ধতিঃ
ওটা কোনো প্রবন্ধ ছিল না, ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ নিয়ে কোথাও একটা আলোচনা হচ্ছিল, সেখানেই হয়তো বলে থাকতে পারি। অনেক সময়েই যে ভাষা সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসে, বা যে ভাষাকে সাহিত্যের জন্য বিবেচনা করা হয় থাকে, লোকে তাকে বিশেষ কিছু ভেবে বসে। আমার ক্ষেত্রে, ব্যাপারটা একেবারেই সেরকম কিছু নয়। ভাষা জৈবিকভাবেই উৎপন্ন হয়, একটা গল্পকে বলতে, যে গল্পটা বলা দরকার। এটা আমার কাছে একটা অডিয়ো ট্র্যাকের মতো, প্রায় সঙ্গীত যেন। যখন আমি লিখি, খুব বেশি লিখি না, তারপর কাটাকুটি করি আর সব ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিই। আমি শুনতেই যেন বেশি ভালোবাসি। এতে উদ্দীপনা আসে, আর কাটাকুটিও কম হয়। সম্প্রতি আলমারি ঘেঁটে ‘আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এর পাণ্ডুলিপির কিছু পাতা, কিছু অংশ আমি খুঁজে পেয়েছিলাম। আট বছর আগে সেসব লেখা। কিন্তু পাতার পর পাতা, আস্ত অনুচ্ছেদ, কিছুই বদল হয়নি। বাক্য আর অনুচ্ছেদগুলো যেন একেকটা রঙিন সুতো, এখন তাদেরকে নিয়ে একটা কাপড় বোনা যেতে পারে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
প্রশ্নকর্তাঃ
এই উদ্দীপনা— বিষয়ে কিছু বলতে পারেন কি?
অরুন্ধতিঃ
বলছি, …ধরা যাক, ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যটি যেমন ছিল, সেটা যদিও বইটার আসল শুরু নয়, সেটা ছিল দুজন সাত বছর বয়সী যমজের ছবি ছোট্ট একটা আকাশি-নীল শহরের প্রাঙ্গনে, যখন সূর্যের আলো শহরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ঝলসে দিচ্ছিল, বিজ্ঞাপনের ছোট্ট ছোট্ট হোর্ডিংগুলো ছাদ আর আলসে বেয়ে গলে গলে নেমে আসতে গিয়ে আটকে গেল একটা লেভেল ক্রসিং-এ, ঠিক তখন সেই জায়গাটা ঘিরে কমিউনিস্টরা বিরাট জমায়েত করে বিক্ষোভ করছিল। ‘মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এর মূল চিন্তাটুকুও কিন্তু সেই একই সময়ে জন্ম নিয়েছিল— একটি পরিত্যক্ত শিশুকন্যা গভীর রাতে রাস্তার একধার ধরে হেঁটে আসছে, দিল্লী শহরের যে জায়গাটার নাম যন্তর-মন্তর, সে এমন একটি জায়গা, যেখানে দুনিয়ার সমস্ত প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, আন্দোলন, ওখানে এসেই শেষ হয়। এ মা— এতদিনে ব্যাপারটা আমি অনুধাবন করতে পারছি কথা বলতে বলতে— শিশুদেরকে আমি রাজনৈতিক আন্দোলনে জুড়ে দিয়েছি! প্রতিরোধ আর বিশৃঙ্খলার মাঝে কিছু একটা যেন জন্ম নিল... যদি আমি উদ্দীপনার কথা বলি, তবে আসলে আমি সেই হঠাৎ দেখা দেওয়া বাচ্চাটির কথাই বলতে চেয়েছি, অথবা সেই লেভেল ক্রসিং-এর বাচ্চা দুটো, কিন্তু সবকিছুর চারপাশ দিয়ে ঝিনুকের খোলার ভেতর থেকে মূল গল্পের নিঃসরণ ক্রমাগত ঘটে যেতে থাকে, স্তরে স্তরে। দুটো উপন্যাসের ক্ষেত্রেই, ওই অধ্যায়গুলো শুরুর অধ্যায় নয়। কিন্তু ওই দুটো অধ্যায়ই কোনোভাবে উপন্যাস দুটোর স্নায়ুকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এটাকেই আমি উদ্দীপনা বলতে চাই।
প্রশ্নকর্তাঃ
অনেক সময়েই আপনার লেখাতে দেখা গেছে কবরখানাতে বিপ্লব ঘটছে, ওসব জায়গাগুলোতে একটু হলেও অস্বাভাবিকতা কিংবা অপ্রত্যাশিত কিছু ব্যাপারও ঘটে যাচ্ছে, এমনকি রূপকের ক্ষেত্রেও। ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’-এর শুরুতে আপনি দেখিয়েছিলেন একটা বাড়িতে বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু বাগানে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্যটিকে আপনি সাংঘাতিক এক রূপকের মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছেন— পৃথিবীকে যেন বন্দুক দিয়ে কর্ষিত করা হচ্ছে। ‘মিনিস্ট্রি’ বইতেও লিখেছিলেন বন্দুকের ক্ষত প্রসঙ্গে ‘যেন একটি ফুটফুটে গোলাপের মতো’, ব্যাপারগুলো যেমনটা প্রত্যাশিত থাকে, তার ঠিক উল্টো করেই সেগুলো যেন আমাদের সামনে ধরা দিচ্ছে, যুদ্ধ আর শান্তির মতো।
অরুন্ধতিঃ
আমি কখনোই এভাবে ভেবে দেখিনি আপনি যে বিষয়গুলোকে উল্লেখ করলেন এখন, …পরপর দুটি রূপকের সমাপতন। তবে হ্যাঁ, সব কিছুরই আসলটুকু খুব অল্প সময়ের জন্যেই বাইরে বেরিয়ে আসে, আমাদের কাজই হল প্রচারের আলগা ত্বকটুকু তার শরীর থেকে ছাড়িয়ে নিয়েই তাকে দেখতে হবে, …শান্তি, প্রেম, মৃত্যু, বৃষ্টি, সূর্যালোক, এগুলো সবই স্বাভাবিকতার ধারণা, আবার মাতৃত্ব, পরিবার, এগুলো আমার বোধ, …আমার জন্যেই, ব্যক্তিগত স্তরে, পরিবার জিনিসটাই যে বড়ো সাংঘাতিক। রীতিমতো ভীতিপ্রদ। আমার সমস্তরকমের ভাঙন ওখানেই জন্ম নিয়েছে। যখনই আমি দেখি কোনো বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছে খুব সুখী একটা পরিবার সুন্দর এক বাড়িতে পরম শান্তিতে বসবাস করছে, আমার মনে অশান্তির পূর্বাভাষ জাগে। আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে গভীর বন্ধুত্ব আর মহৎ প্রেম, কোনো রক্তরেখা নয়, ‘পরিবার’ নয়।
অন্যদিকে, কাশ্মীরের মতো জায়গায় কি ঘটছে যদি দেখা যায়, —সেখানকার মানুষের ওপর শুধুই নির্যাতন, দেখা যাবে পরিবার জিনিসটাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাথা তুলে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। শেষ সম্বল ওটাই, ভারতীয় সেনারা সব অধিকার করে নিলেও ‘পরিবার’-এর জোরটুকু ধ্বংস করতে পারেনি। যখনই আমি ওখানে যাই, নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলি আমি। এতটা ‘পরিবার’-এর প্রতি আনুগত্য আর প্রশ্নাতীত পারিবারিক বন্ধন দেখলে নিজেকে বিভ্রান্ত লাগে। যদিও ওই পরিবারগুলোর ভাগ্যে যা ঘটার প্রতিনিয়ত তা-ই ঘটছে, এমনকি …ওখানকার লোককে যখন কিছু একটার মোকাবিলা করতে হয়, যা তাদেরকে প্রায়ই করতে হয়, তাতে ওদের ওপর যে চাপ আসে, ওরা নুয়ে পড়ে না, হেলে পড়ে না।
তবে কবরখানায় বিপ্লব ব্যাপারটা রূপক অর্থে নয়, আক্ষরিক অর্থেই। ‘দ্য মিনিস্ট্রি’-এর এটাই থিম। কাশ্মীরের কবরখানাটা সেখানেই, যখন মুসা তার মৃত কন্যা মিস জেবীন-কে চিঠিতে লিখছে, এখন মৃতরা সব জীবিত আর জীবিত মানুষগুলো ক্রমাগত মৃত সাজতে চেষ্টা করে চলেছে। আর দিল্লীর কবরখানা সেখানেই, যেখানে আনজুম তার জন্নত গেস্ট হাউজ— স্বর্গ গেস্ট হাউজ তৈরি করে ফেলেছে। যেখানে প্রতিটা ঘরই একেকটি কবরের সঙ্গে সংযুক্ত। যেখানে মৃত আর জীবিত মানুষের ফারাক করা দুষ্কর। আপনি যদি খুব মনোযোগ সহকারে দেখতে চান— কে ওখানে থাকে, কে বেঁচে আছে, কে ওখানে মারা গেছে, কাকে কবর দেওয়া হল, কেমন প্রার্থনার চল আছে সেখানে, …দেখবেন সবই আসলে বিপ্লব।
তাই একটা সাবধানবাণী শোনানো যেতে পারে এক্ষেত্রে, আমার উপন্যাসে কখনোই আশা করবেন না যে কবরখানা শুধুই মৃত মানুষে ভরে আছে, কিংবা একটা পরিবারের সবগুলো মানুষই জীবিত মানুষ। আর আমার উপন্যাসের থেকে নির্মিত সিনেমা সবগুলো হলে খুব করে চলছে।
প্রশ্নকর্তাঃ
যদি দেখা যায় আপনার উপন্যাসের প্লট নিয়ে গভীর আলোচনা করছেন আপনি— সেটি কিন্তু বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। অথচ আপনার দুটো বই-ই খুব সুন্দর, আনন্দঘন এবং সব দিক দিয়েই পরিপূর্ণ, এবং দুটো বই-ই খুব আনন্দপূর্ণ মুহূর্তে এসে পরিসমাপ্তি পাচ্ছে। এই ব্যাপারটাও আরেক ধরনের দুশ্চিন্তামূলক আলোচনা হয়ে উঠতে পারত, যা আমি অনেকক্ষণ ধরেই ভাবছিলাম।
অরুন্ধতিঃ
এই দুশ্চিন্তাটুকু আমাদের আগেকার আলোচনার একটি অংশ বিশেষ, গলির বদল, রূপকধর্মী ট্র্যাফিক কন্ট্রোল, একেবারে মনুষ্যজগতের নয়, কিন্তু মানুষের মনস্তত্ত্বের, …গভীর ব্যক্তিগত সব ব্যাপার, অনুভূতি, আলো এবং আঁধারি, আকুলতা, প্রেম, এবং হারিয়ে যাওয়া। ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’-এ আমি যেখানটাতে কথাকলি নিয়ে বলেছি, কথাকলি হচ্ছে কেরালার এক ধরনের নাচ— অতি বিশিষ্ট শিল্প, কাব্যিক গড়নে গল্প বলে যাওয়ার চল রয়েছে এই নৃত্যশিল্পে, আমার মনে হয়, এই প্রাচীন নৃত্যশিল্পই আমার গল্প বলে যাওয়ার সবচাইতে বড়ো অনুপ্রেরণা। একজন কথাকলি-শিল্পীই আপনাকে দেখিয়ে দিতে পারেন কি করে এক বিন্দু দুঃখের মাঝে আনন্দ জেগে থাকে, কীভাবে সাফল্যের সমুদ্রের গভীরে একটি লজ্জার মাছ লুকিয়ে থাকে। ‘দ্য এন্ড অফ ইম্যাজিনেশন’-এ লেখকের তরফে একটা ইশ্তেহার ছিল— ‘সবচাইতে দুঃখের জায়গাতেই আনন্দ খুঁজে নাও, সৌন্দর্য নিয়ে মিথ্যাচার করা ব্যক্তিকেই সুন্দরের অনুভব করাও’। আমার প্রায়ই মনে হয়, ভারতীয় মেয়েদের জন্য আনন্দের বোধ জিনিসটা একটা অস্ত্রের মতো। কারণ আমরা আনন্দের মধ্যে থাকব, এমন কখনোই চাওয়া হয় না। আমরা আত্ম-নিবেদন করব, জীবন নিয়ে ভুগব, সেবা করে যাব, এমনটাই প্রত্যাশা করা হয়ে থাকে। আমি যখন কেরালায় বড়ো হচ্ছিলাম— মা ছিলেন একেবারে তিক্ত মনের মানুষ, পুরুষ এবং আরও নানাবিধ কারণে। কিন্তু ওঁর গড়া স্কুলটি ছিল খুব খোলামেলা পরিবেশের। নারীদের, অর্থাৎ সেই স্কুলের মেয়েদেরকে কোনোভাবেই ছেলেদের তুলনায় ছোট করে ভাবতে শেখানো হয়নি। আপনি তাদের হেঁটে আসার ভঙ্গি লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন, বা তাদের আত্মপ্রকাশের ধরন, তারা কিন্তু আজও একইরকম প্রত্যয় নিয়ে চলে।
প্রশ্নকর্তাঃ
ওটা কো-এড স্কুল ছিল, তাই তো?
অরুন্ধতিঃ
হ্যাঁ, ওটা কো-এড স্কুল ছিল, যা ছিল— সবরকম চিন্তার বাইরে। মা যখন স্কুলটি খুললেন ওরকম একটা ছোট্ট শহরে, চারদিকে ছি ছি পড়ে গিয়েছিল। আমি ওখানেই পড়েছি, শুরুর থেকেই, এরপর যদিও অন্য একটা কো-এড স্কুলেও পড়েছি, ষোলো-সতেরো বছর বয়সে আমি বাড়ি ছাড়ি, কলেজে ভর্তি হই, এরপর আর ফিরে যাইনি। নারীকে সবসময়েই অনুগ্রহের পাত্র হিসেবে দেখানো— ব্যাপারটা কিছুতেই আমি মেনে নিতে পারব না। এটা আমার মধ্যে বরাবরই ছিল, আমি পাগলের মতো সর্বত্র আনন্দ খুঁজে বেড়াতাম। স্বেচ্ছায় আমি কখনোই দুঃখকষ্টের মধ্যে যাব না। আমি জানি আমাকেও দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হবে, কিন্তু সেটি অন্যের ইচ্ছায় নয়, অন্যের চাওয়াতে হবে না। আমি কেরালার যে অঞ্চল থেকে উঠে এসেছি— তার ধ্যান-ধারণা আর সাবেকিয়ানার কথা জানি না কীভাবে বর্ণনা করব। আমি বলতে চাইছি, আমার মতো কেউই ছিল না, একজনও ছিল না সেই সময়ে ওই শহরে— যখন আমি বড়ো হয়ে উঠছি। আমার কাছের লোকজনের মধ্যেও কেউ ছিল না। শুধু আমার বাবা-মায়ের কারণেই আমি জানতাম— প্রথাগত বিয়ে ব্যাপারটা আমার জন্য দিগন্তের কোথাও লেখা নেই। ‘আত্ম-সম্মান আছে এমন কোনো খ্রিষ্টান ছেলে ওকে কখনোই বিয়ে করবে না।’ —এমন ফিসফাস শোনা যেত সব জায়গাতেই। সুতরাং, অনেকটা পরিমাণ দুঃখ এবং তিক্ততা অনেক আগে থাকতেই আমার জন্য লিখে রাখা হচ্ছিল। কিন্তু আমি অন্যভাবে ভেবেছি বরাবর, …না, আমি দুঃখের মধ্যে থাকব না। আমি প্রকৃত আনন্দের মধ্যেই থাকতে চাই। যা আমার জন্য প্রায় সেনাবাহিনীর উদ্দীপনার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেটা কাজে করে দেখাতে, আপনাকে এমন অনেক শর্তকে জীবন থেকে অনায়াসে ছেঁটে দিতে হবে, যেগুলো আপনার চারপাশে ঘুরতে থাকা লোকজনের থেকেই এসেছে। ব্যাপারটা আমি একেবারে কম বয়স থেকেই শুরু করি, এমনকি পরেও এই নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু বেশ কিছু বছর হল, নিজের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করছে আমার, ক্ষমা চাওয়ার মতো মনে হয় খানিকটা, অসোয়াস্তিও হয় একটু, মনে হয় আমার কাজ আমাকে আজ এ কোথায় টেনে এনেছে— অতিরিক্ত খ্যাতি, অতিরিক্ত অর্থ আজ আমার, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সুন্দর একটা ফ্ল্যাট, সব কিছুই আমার তুলনায় অনেকটাই বেশি বেশি। রক-স্টার কিংবা সিনেমা-স্টার না হয়েও অনেকটাই বেশি। অপরাধবোধ জিনিসটাই খুব নড়বড়ে একটা আবেগ। এসব আমার অনেকদিন আগেই ঝেড়ে ফেলার ছিল, যেভাবে স্নানের পর ভেজা কুকুর গা-ঝাড়া দিয়ে তার লোমের আড়ালে জমে থাকা জলটুকু ফেলে দেয়।
আসল প্রশ্ন হল, নিজের যা আছে সেসব নিয়ে আপনি করবেনটা কি? কোন গল্পটা আপনি বলবেন? কীভাবে বলবেন? এত টাকা দিয়েই বা কি করবেন? কীভাবে তাকে ব্যবহার করবেন? কীভাবে ঘোরাবেন?
আনন্দ হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী। হ্যাঁ, সেটাই। আমার জন্য আনন্দ হল— আমি এক্ষেত্রে ফেসবুকের থেকে পাওয়া ভুলভাল কোনো আনন্দের কথা বলতে চাইছি না। আমার কাছে আনন্দ হল একটা অনুভূতি, মনের বিশেষ এক অবস্থা, কিন্তু কখনো সেটাকেও আমি অনেকক্ষণ ধরে রাখতে চাই। কারণ লোকে দেখতে চায় আমি খারাপ আছি, কাতরাচ্ছি। এই কারণে আমার লেখায় হাসাহাসি সবচাইতে বেশি জায়গা পেয়ে এসেছে।
প্রশ্নকর্তাঃ
এই ধরনের আনন্দ, তার স্থায়িত্ব, সব কিছুই পরিস্ফুট হয় চারপাশের নানান রসিকতাপূর্ণ এবং সেইসঙ্গে অদ্ভুত ঘটনার মধ্যে দিয়ে। আপনার লেখাতেও ব্যাপারগুলো ভীষণরকম আছে, কতটা সচেতনভাবে এই নিয়ে ভাবেন আপনি?
অরুন্ধতিঃ
এসব নিয়ে কখনো সচেতনভাবে ভাবি না, কারণ আমি এর মধ্যেই বাস করি। আমি দেখতে পাই, সব কিছু আমাকেই ঘিরে রয়েছে, সবসময়েই রয়েছে। বস্তার-অরণ্যে চলতে থাকা গেরিলা-যুদ্ধের মাঝে জেগে ওঠে প্রচণ্ড অট্টহাসি, ওখানে ওরা একে অপরকে সকালবেলায় যখন শুভেচ্ছা জানায়, জানে না, সন্ধ্যেবেলা আর দেখা হবে কি না। কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও কবরখানা-হাস্যরস অত্যন্ত জরুরি, শুধু নিজের কানটিকে ওদের মুখের সঙ্গে একই সুরে বাঁধার অপেক্ষা, ওদের সঙ্গে এক হওয়ার অপেক্ষা, দেখবেন— ওরা প্রচণ্ড ভুলভাল বকে, প্রচণ্ড হাস্যকর।
প্রশ্নকর্তাঃ
কেরালা থেকে দিল্লী চলে যাওয়াটা কেমন ছিল? একইসঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, ভাষার পরিবর্তন।
অরুন্ধতিঃ
হ্যাঁ সেটাই। কিন্তু ব্যাপারটা খুবই সুন্দর ছিল। সেই সময়ে আমার মায়ের সঙ্গে সম্পর্কটা খুবই জটিলতায় পৌঁছে গিয়েছিল। আমার মা ছিলেন মহাকাব্যিক। তিনি ছিলেন একাধারে আমার স্রষ্টা এবং ধ্বংসকারী, মহাকাব্যিক অর্থেই এই শব্দগুলোকে ব্যবহার করছি আমি। তিনি ছিলেন কঠিন শ্বাসকষ্টের রোগী, যে কারণে বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে আমি ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতাম। তিনি প্রায়ই বলতেন, আমি মরে যাব, তখন তুমি কি করবে? তোমাকে রাস্তায় রাস্তায় জীবন কাটাতে হবে। অনুভব করতাম, আমার নিঃশ্বাসটাও যেন মা-র ফুসফুস থেকেই বেরোচ্ছে। তাঁর হাঁপরের মতো নিঃশ্বাসের রেশটুকু নিয়েই যেন আমি বেঁচে থাকতাম। সত্যি সত্যিই আমার মনে হতো, মা মারা গেলে, আমিও মরে যাব। খুবই ভীতু বাচ্চা ছিলাম আমি। কিন্তু দেখুন, এখন তাঁর সাতাশি বছর বয়স! কিন্তু তিনি যেন একটা লোহার দণ্ড আমার মেরুদণ্ডের ভেতরে লাগিয়ে দিয়েছেন, যেটা আমার আজকের এই আমি হয়ে ওঠার প্রারম্ভিক কাজগুলো সেরে দিয়েছে। তিনিই সেইজন, যিনি আমাদের মধ্যেকার সামাজিক দুরত্বটুকুকে নিতান্ত তাচ্ছিল্যে পরিণত করেছেন। তিনিই সেইজন, যিনি আমার মনে ত্বক নিয়ে কোনো অস্বস্তিকর অনুভূতি জন্মানোর সুযোগ দেননি, —পরিবারের সকলের মতোই আমার রং ছিল কালো। বুঝতেই পারছেন সাংঘাতিক অপরাধ। তিনি মনে করতেন আমিই তাঁর একমাত্র পুতুল— যদিও আমি কোনোকালেও পুতুল-পুতুল ছিলাম না, তবু একমাত্র পুতুল, এবং কালো-পুতুল। এরপর যখন বালিকা থেকে একদিন নারী হতে লাগলাম, দেখলাম, মা আমার ওপর ভীষণই ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। এরপর বছরের পর বছর ধরে প্রচণ্ড ঝামেলা চলতে লাগল।
ষোলো বছর বয়সে আমি দিল্লী চলে আসি, সেটা ১৯৭৬ সাল, আর্কিটেকচার-স্কুলে ভর্তি হই। আমাকে এভাবে বাঁচানোর জন্য দিল্লীকে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। যদিও অসহ্য পর্যায়ের দূষণ আরও অতি সাংঘাতিক সব ব্যাপার ছিল সেখানে। কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে একটা বিরাট পরিবর্তন এসেছিল জীবনে, যা আমার কাছে স্বাধীনতার সুগন্ধের মতো ছিল। সেকেন্ড ইয়ারে উঠতে না উঠতেই আমি বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিই। কলেজের সূত্র ধরেই একটা কাজ জুটিয়েছিলাম, আর্কিটেকচারাল ড্রাফ্টসম্যানের। আমারই এক সহপাঠীর সঙ্গে একসঙ্গে থাকতাম, আমার প্রথম বয়ফ্রেন্ড। আমি ছিলাম অত্যন্ত অসভ্য, পাথরের মতো শক্ত, এবং বল্গাহীন। কোনো অভিভাবক ছিল না। বাড়ির থেকেও টাকা নিতাম না। ইঁদুরের মতো জীবন কাটাতাম, এমনকি সেও হয়তো নয়। কিন্তু আমি আনন্দে ভরপুর থাকতাম সেই সময়ে।
প্রশ্নকর্তাঃ
দিল্লী নিয়েই কোনো একটা প্রবন্ধে আপনি জানতে চেয়েছিলেন, ওখানে আর কি বা করার আছে— ঘরে বসে থাকা গুণ্ডা হয়ে যাওয়া ছাড়া?
অরুন্ধতিঃ
হ্যাঁ, চেয়েছিলাম!
প্রশ্নকর্তাঃ
সেই একই প্রবন্ধে আপনি বলেছিলেন, আপনি সেসব লোককে খুঁজে বেড়ান যাদের আপনি ভালোবাসতে পারবেন, অথবা যারা আপনাকে আগে ভালোবেসেছিল। ‘মিনিস্ট্রি’-তেও ব্যাপারটা সুন্দরভাবে বেরিয়ে এসেছে, তিলো যখন বলছে যে সে তার নিজের লোকজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং কীভাবে সে খুঁজছে, খুব স্বল্প সময়ের জন্য হলেও, তখন সে আর মুসা দুজনে দুজনের নিজের লোক হয়ে উঠেছিল। নিজের জন্য জায়গা খোঁজার সাথে সাথে— নিজের লোকজনদেরকে কি করে খুঁজে বের করেন আপনি?
অরুন্ধতিঃ
আমি আমার লোকজনদেরকে নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে খুঁজে পাই। আমার লেখার মধ্যে দিয়ে, যেসব সিনেমায় আমি কাজ করেছি, সেসবের মাধ্যমে। এই পথে আমি জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুদেরকে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু একেবারে প্রথম যে জন, তাকে আমি পেয়েছিলাম আর্কিটেকচার স্কুলে ভর্তি হবার পর। ওটা দারুণ এক মজার জায়গা ছিল। দেশের সব জায়গা থেকে লোকে পড়তে আসত সেখানে। আমাদের মধ্যে কত বিভিন্ন সব ভাষাতে কথাবার্তা চলত। ওখানে আপনি নিজের পছন্দের লোকটিকে ঠিক খুঁজে পেতে পারেন, নেশা করার সঙ্গী, বা ছবি আঁকার সঙ্গী, সব কিছুই। সকলেই ছিল তরুণ এবং মুক্ত মানসিকতার। আপনি মনে করতেই পারেন এটাই আপনার আসল সমাজ। (হাসি) জানেন, আগে ওই স্কুলে মেয়ে বলতে সেরকম ছিলই না। আমরাই এলাম, আমরা চার-পাঁচজন মাত্র মেয়েই ছিলাম ত্রিশ-চল্লিশ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে। মেয়েদের হোস্টেল বলেও কিছু ছিল না, তাই ছেলেদের হোস্টেলের একটা অংশ কেটে নেওয়া হল, যদিও ওরা আমাদেরকে বিশেষ পাত্তা দিত না। তবু সেই সময়টা নিজের থেকেই হয়ে গিয়েছিল— আমাদের নৈরাজ্যবাদ, বন্য স্বাধীনতার সময়। আমরা সবসময়েই কাজ করতাম, দিন রাত। জায়গাটা ছিল একটা যাচ্ছেতাই, ভাঙাচোরা, ধোঁয়ায় ভরতি, নোংরা একটা জায়গা। কাছেই একটা কয়লার কারখানা ছিল, সাদা নতুন কাগজ ড্রইং-বোর্ডে পাতার কিছুক্ষণ পর সেটা নিজের থেকেই কালো হয়ে যেত।
প্রশ্নকর্তাঃ
হায় ভগবান।
অরুন্ধতিঃ
সত্যিই সাংঘাতিক জায়গা ছিল। কিন্তু সব কিছুর জন্যেই সেটি ছিল সুন্দরভাবে মুক্ত। সকলেই তাদের নিজেদেরকে ভুলে গিয়েছিল। যখন ছোট ছিলাম, মনে হতো লোকে বোধহয় আমাকে সঠিকভাবে শাসন করতে ভুলে গিয়েছে। আমি অন্য শিক্ষাধারায় বেড়ে উঠেছিলাম, সেই সময়ে হয়তো কারোরই নিয়মকানুন মেনে আমাকে শাসন করার মতো সময় হাতে ছিল না। আর্কিটেকচার-স্কুলটাও ছিল প্রায় অনেকটা সেরকমই, আমি সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই বড়ো হয়ে উঠেছি।
আমার এক আত্মীয়র কথা মনে পড়ছে। সম্পর্কে তিনি ছিলেন আমার একরকমের জ্যাঠামশাই, সরকারি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, প্রায়ই আমাকে দেখতে আসতেন। ভালোবেসে নয়। নানা মজার এবং রসালো জিনিসের খোঁজে আসতেন, যেগুলো সংগ্রহ করে তিনি বাড়ি গিয়ে জমিয়ে কু-কথা বলতে পারবেন, যা একেবারেই ঠিক কাজ নয়। আমি কখনোই ওঁকে খারাপ কিছু বলিনি। একদিন তিনি হোস্টেলে এসে হাজির, আর আমিও নেমে এসেছিলাম। তিনি ছিলেন সেই ধরনের লোক, যারা মেয়েদের পিঠে হাত রেখেই বলে ওঠে— এ কি, তুমি দেখছি ব্রা পরনি। তিনি হোস্টেলের চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন, ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে লনে বসে, আড্ডা মারছে, সিগারেট খাচ্ছে, তিনি ছিছিক্কার শুরু করে দিলেন। আমাকে বললেন, তুমি কি এখানে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ না? আমি বললাম, আমাদের কোনো সীমা নেই। আমি জানতাম, আমার উচ্চারণ করা প্রতিটি শব্দ এখন বাড়ি ফেরার নামে কফিনটার একেকটা পেরেকে পরিণত হতে চলেছে। সবগুলো বাক্যই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলবে। এরপর তিনি বললেন, তোমাদের ওয়ার্ডেন কোথায়? আমি বললাম, আমাদের কোনো ওয়ার্ডেন নেই। উনি জানতে চাইলেন, রাতে কোন সময়ে বাড়ি ফেরা হয় তোমাদের? আমি জানালাম, আমাদের ফেরা বলে কিছু নেই। অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে তিনি এরপর ফিরে যান। আর আসেননি।
আমার সম্পর্কগুলোকে আমিই জ্বালিয়েছি। কাজটা খুব কঠিন ছিল না, কারণ ততদিনে আমি আমার বন্ধুদের পেয়ে গেছি। ভারতের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা খুবই প্রাসঙ্গিক, যদি আপনি আমার মতো কেউ একজন হন, বে-লাইনে চলে যাওয়া কেউ হন, আপনি নিজের থেকেই আরও স্বাধীনতা অর্জন করবেন। নিজের একটা জায়গাও তৈরি হয়ে যাবে।
প্রশ্নকর্তাঃ
‘ইহার জন্য তবে কোনো আশার আলো রহিল না’—
অরুন্ধতিঃ
আছে, কিন্তু খারাপ পথে নয়। যে আইন রয়েছে— সেসব শ্বাসরোধকারী, মানুষকে দমিয়ে দেওয়া, কখনো হয়তো বা কেউ কেউ এর থেকে পালাতে পারে। দৃশ্যমান খ্যাপামির কারণেই হয়তো। কিন্তু সব সত্ত্বেও নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন করাটা সবার আগে দরকার। নয়তো আপনাকে পিষে ফেলা হবে, আপনি শেষ হয়ে যাবেন।
প্রশ্নকর্তাঃ
আপনি নিজের জীবনে এমন অনেক কিছুই প্রবেশ করিয়েছেন— দৃশ্যমান খ্যাপামির থেকে শুরু করে সব কিছুই। আপনার একেবারে শুরুর দিককার লেখাতেই সেসব রয়েছে, যেমন— অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ান’স।
অরুন্ধতিঃ
আসলে প্রথম যে লেখাটা লিখেছিলাম, যেটা ছাপা হয়েছিল, …(হাসি) সেটাতে আমাদের কয়েক বন্ধুর কথা ছিল, আমার আর আমার স্বামী প্রদীপের। সে ছিল বন্যজীবন নিয়ে সিনেমার নির্মাতা। ওরা বন্ধুরা কয়েকজন মিলে গণ্ডারের ওপর তখন সিনেমা তৈরি করছিল। কিছু গণ্ডারের স্থানান্তকরণ হচ্ছিল সেই সময়ে, নেপাল আর আসামের জাতীয় উদ্যান থেকে। আধুনিক একটা অভয়ারণ্য খোলা হয়েছিল তখন, নাম ছিল দুধওয়া, দিল্লী হয়ে গণ্ডারেরা ওই অরণ্যেই যাচ্ছিল। গণ্ডারদের প্রথম দলটা একটা রাশিয়ান এয়ারক্র্যাফটে চেপে দিল্লীতে এসেছিল। তাদের চেহারা বিশাল, পাঁচটা বড়ো ট্রাকে তাদেরকে তোলা হয়েছিল। গণ্ডারদের বিরাট কনভয়টা দিল্লীর ধুলোমাখা রাস্তা ধরে রওনা দিল গন্তব্যের পথে। এই দলিল-চিত্রটির নেপথ্য-ভাষ্যটি আমার লেখা, বলা যেতে পারে— কীভাবে গণ্ডারেরা ফিরে এল। ব্যাপারটার মধ্যে অনেক কিছুই ছিল। যেমন গণ্ডারদের পাশেপাশে ড্রাইভ করে যাওয়া। মাঝেমাঝেই থেমে যেতে হচ্ছিল, ওদের গায়ে ঠাণ্ডা জল ছেটানোর জন্য, যাতে ওদের গরম না লাগে। ট্রাকের ফাঁকফোকর দিয়ে গাঁয়ের লোকেরা উঁকিঝুঁকি মারছিল, তারা গণ্ডারদের দেহের খুব সামান্য অংশই দেখতে পাচ্ছিল। নিজেদের কল্পনা মতো ভয়ানক কোনো দানবিক জন্তু ভেবে তারা শিহরিত হচ্ছিল। কাছাকাছি এক উদ্যানে পৌঁছনোর পর, গণ্ডারদের সপ্তাহ খানেকের জন্য ওখানে ছেড়ে দেওয়া হল, পরে হয়তো অন্য কোথাও তারা যাবে। শেষ পর্যন্ত ওদেরকে বনে ঘুরে বেড়াতে দেখে খুবই ভালো লেগেছিল।
প্রশ্নকর্তাঃ
আমার একটা জিজ্ঞাস্য আছে— গণ্ডারেরা কি আজও ওখানে আছে?
অরুন্ধতিঃ
হ্যাঁ আছে, ওদের কয়েকজন এখনও আছে। ওরা ঘুরতে ঘুরতে আজও নেপালের চারণভুমির দিকে চলে যায়, আবার ফিরেও আসে।
প্রশ্নকর্তাঃ
অ্যানি-র ওপর কাজ করার সময় এই ব্যাপারগুলোকে কীভাবে দেখেছিলেন? ওটা এমনই একটা সিনেমা, যার চিত্রনাট্য ছিল গতানুগতিকতার বাইরে, যখন আপনি কাজ করেছিলেন। অনেক কায়দা ছিল সেখানে, যেমন একটা গরু হেঁটে চলেছে এমনভাবে যেন ইনকাম-ট্যাক্স জমা দিতে যাচ্ছে।
অরুন্ধতিঃ
হ্যাঁ, এরই মধ্যে জীবনের একটা অধ্যায় আমরা লাফিয়ে পার হয়ে এসেছি, যেখানে প্রদীপ কৃষেণের সঙ্গে আমার দেখা হয় এবং আমরা প্রেমে পড়ি— এখন আমরা আলাদা থাকি যদিও। আমাকে দেখে ও একবার জিগ্যেস করেছিল আমি সিনেমায় অভিনয় করব কি না, যে সিনেমাটা ও তখন তৈরি করছে— ম্যাসি সাহিব। আমি রাজি হয়ে যাই, কারণ অভিনয়ের চাইতেও সিনেমা কি করে তৈরি করা হয়, সেসব জানতেই আমার অদম্য কৌতূহল ছিল। আমার স্নাতক হওয়ার পরেপরেই এসব ঘটে। এরপর আমি চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করি। আমাদের প্রথম প্রোজেক্ট ছিল টেলিভিশনের জন্য ২৬ পর্বের একটা সিরিজ। দু-বছরের জন্য। শুটিং যখন মাঝামাঝি প্রায়, হঠাৎ প্রোডাকশন কোম্পানিটা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা বিফল মনোরথ হয়ে রয়ে গেলাম। আটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, ভারতের টিভির ইতিহাসে নতুন কিছু ঘটল যেন। দূরদর্শন, ভারত সরকারের নিজস্ব টিভি— পাল্টাতে শুরু করে। প্রতি শনিবার করে দূরদর্শন একটা করে সিনেমা দেখাত, আর সারা দেশের লোক বসে সেই একটাই সিনেমা দেখত। কারণ তখন একটাই মাত্র টিভি চ্যানেল ছিল। সেও সরকারি চ্যানেল, সেই সময়ে আমরা ভাবতাম, বিশ্বের সবচাইতে খারাপ একটা কিছু। কে বা তখন ভাবতে পেরেছিল, আজ যে দুঃস্বপ্নের মধ্যে আমরা বেঁচে আছি, চারশোরও বেশি কর্পোরেট চ্যানেল প্রতিনিয়ত ধর্ম-ভিত্তিক হিংসা আর ভুয়ো-সংবাদ প্রচার করে চলেছে।
যাই হোক, আবার দূরদর্শনে ফিরে আসা যাক। নতুন সর্বেসর্বা ছিলেন উদার মনের, যথেষ্টই খোলামেলা এক আমলা। আমরা কোনোমতে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাই, এবং একটা ফিল্ম তৈরির প্রস্তাব দিই। দূরদর্শন স্বপ্নে যত দূর ভাবতে পারে, তার চাইতেও অনেকটা উল্টো পথের ছিল সেই ফিল্মের গল্প। তা তিনি বললেন, লেখো। আমাকে লিখে দেখাও। আমি তৎক্ষণাৎ বসে পড়ি, এবং একটা চিত্রনাট্য লিখে তাঁর হাতে তুলে দিই, সেটাই হল— অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ান’স। আমাদের সেই আর্কিটেকচার-স্কুল নিয়ে লেখা। অ্যানি সেখানকার এক ছাত্র, আনন্দ গ্রোভার, নিজের পঞ্চম বর্ষের পরীক্ষা সে দিচ্ছে এই নিয়ে চতুর্থবার। এই ফিল্মের ভাষা ছিল একেবারে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথ্যের মতো, সেই মতে গিভিং ইট দোজ ওয়ান’স— এর মানে হল, একই নোংরা কাজটা আবার করা। এটা এমনই এক ভাষায় করা হয়েছিল যা সিনেমা বা সাহিত্যে আগে ব্যবহৃত হয়নি। এটাও উল্লেখযোগ্য যে, ফিল্মের খরচপাতির জন্য অতি সামান্য কিছু টাকা হলেও তখন দূরদর্শন আমাদের দিয়েছিল। অসম্ভব হলেও সত্যি, আপনি জানেন, সামান্য টাকাতেই ছবিটা হয়েছিল। মাত্র কয়েক হাজার ডলারে ছবিটা নির্মিত হয়। টাইটেল-কার্ডগুলো ছিল কাগজের, আমার হাতে আঁকা। কিন্তু ছবিটার দৈন্যদশা যেন কীভাবে হলেও দেশের মানুষের দৈন্যদশার একেবারে সার্থক পরিপূরক হয়ে উঠেছিল, যা একত্রে আরও দীনহীন চেতনার জন্ম দিতে পেরেছিল। পরিচালনা করেছিল প্রদীপ। আমার লেখা, নকশাকর্ম আমার, এমনকি অভিনয়েও আমি। লাখে লাখে লোক সিনেমাটা দেখেছিল টিভিতে, কোনো এক শনিবার সন্ধ্যেয়, কারণ তাদের জন্য আর কোনো সিনেমা ছিল না! এটাই কিন্তু বাস্তব। একটা মাত্র শো, তার লাখ-লাখ দর্শক। আজও আমার কাছে এমন অনেকেই আসেন, বলতে চান— কীভাবে পরিবারের সকলে মিলে টিভির সামনে গ্যাঁট হয়ে বসে যেতেন শনিবারের সন্ধ্যে থেকে। ছবিটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল সেই বিভাগে, যা আমার সবচেয়ে প্রিয়, অন্যান্য ভাষার সেরা ছবি হিসেবে। যে ভাষাগুলো সংবিধানের বিভাগ-আটের অন্তর্ভুক্ত, সেখানেই রয়েছে আমার প্রিয় ভাষা— ইংরেজি।
প্রশ্নকর্তাঃ
আমার মনে হয় এরপর আরও একটা সিনেমা হয়েছিল, যতদূর সম্ভব।
অরুন্ধতিঃ
ইলেকট্রিক মুন। ইংল্যান্ডের চ্যানেল ফোর টিভি যেটা করিয়েছিল। মধ্য-ভারতের জঙ্গলের ভেতর একটা লজে সিনেমাটা হয়, কিপলিং-এর দেশে, যেখানে ভারতের একটি অসৎ রাজসিক পরিবার বিদেশি পর্যটকদের নানান জালি অভিজ্ঞতা বিক্রি করছিল। আপনি জানেন হয়তো সেগুলো কি, বাঘ আর মন্দির ঘুরিয়ে দেখানো। আমরা মজা করে বলতাম, জোচ্চোর মহারাজার পর্যটন-বিভাগ। পাঁচমারি নামে একটা জায়গায় শুটিং হয়েছিল। প্রদীপের পরিচালনায়। এরও লেখা এবং নকশা আমারই করা। সেই সময়ে, এই ধরনের ‘রাজসিক-ছবি’ অনেকগুলোই তৈরি হচ্ছিল। সেসব ছবির ক্ষেত্রে দেখা যেত রাঘববোয়ালেরা, প্রযোজকেরা, সকলেই প্রায় শ্বেতাঙ্গ। চাটুকারেরা হতো ভারতীয়। ঔপনিবেশিক সময়ের পুরনো সমীকরণগুলো অবিকল একইরকম রয়ে গিয়েছিল। আমাদের ছবির ক্ষেত্রে, হঠাৎই সব পাল্টে যায়। পুরো ব্যাপারটাই হয়ে উঠেছিল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, কারণ আমার চিত্রনাট্যটি কোনোভাবে বাস্তব জীবনের জন্য সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভারতীয় আর শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে সবরকম যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, ওই ব্যাপারটা জোরদারভাবে বেরিয়ে আসাতে।
ব্যাপারটা ছিল বেশ কঠিন, এবং কষ্টদায়ক। শুধু বুঝে নেওয়ার ছিল কি ঘটে গেল। নিজেকেই এসব কিছু বোঝাতে আমি এরপর ওই বিষয়ে লিখতে শুরু করি। একটা নিবন্ধে পরিণত হয় যেটা— ‘ইন এ প্রপার লাইট’ শিরোনামে। ওখানে একটাই অভিযোগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল— ‘তোমরা ভারতকে প্রকৃত আলোর সামনে এনে দেখাচ্ছ না’, যদিও শেষ পর্যন্ত সব শিল্পকর্মেরই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে ভারতীয় পর্যটন-মন্ত্রকের স্বপক্ষে প্রচার করে যাওয়া। আমি ওটার একটা প্রিন্ট-আউট বের করে টেবিলের এককোণে ফেলে রেখেছিলাম। একদিন আমাদের শুটিং দেখতে এসেছিলেন ‘সানডে’ পত্রিকার সম্পাদক বীর সংভি। উনি আমার পরিচিত ছিলেন না, কিন্তু আমাদেরই এক বন্ধু, যে অ্যানি-তে আমাদের সঙ্গে কাজ করেছিল, সেই মেয়েটি ছিল ওঁর চেনা। মেয়েটি তখন আমাদের সঙ্গেই ছিল। ওরা দুজনে ডিনারে বেরিয়েছিলেন, তারপর ভদ্রলোক আবার ফিরেও এসেছিলেন মেয়েটিকে বাড়ি ছেড়ে আসার জন্য। ওর জন্য তিনি যখন অপেক্ষা করছিলেন, সেই সময়ে তাঁর চোখে পড়ে যায় আমার প্রিন্ট-আউট-টা। কার লেখা এটা? আমি কি একটা ছাপতে পারি? তিনি জানতে চেয়েছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, অবশ্যই ছাপতে পারেন, কিন্তু একটুও বদল না করে। তিনি কথা দিলেন, আমার লেখাকে এতটুকুও স্পর্শ করবেন না। তিনিই হয়ে গেলেন আমার প্রথম প্রকাশক। ওটাই ছিল আমার লেখা প্রথম প্রবন্ধ। এরপর আমি লিখি ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান রেপ ট্রিক’— নামে ধারাবাহিক প্রবন্ধগুচ্ছ, যেগুলো ‘ব্যান্ডিট কুইন’ সিনেমার প্রসঙ্গে লেখা হয়েছিল, ওগুলোও ছাপা হয় ‘সানডে’-তে। এর মধ্যে যদিও আমি ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ নিয়ে কাজ করতে শুরু করে দিয়েছি, একটু অলসভাবে, পরীক্ষামূলক ভাবে।
প্রশ্নকর্তাঃ
অর্থাৎ আমরা এখন কথা বলছি উনিশশো …চুরানব্বই নিয়ে, তাই তো? গদ্য-সাহিত্যে চলে আসার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অরুন্ধতিঃ
খুবই সুন্দর, আমার জন্যে। চিত্রনাট্য আমাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে। শিখিয়ে দিয়েছে গতি। আমাকে শিখিয়েছে অর্থনীতি এবং সংলাপ। যে সময়ে আমি ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ লিখতে শুরু করি, আমি শুধুই ‘এক্সটেরিয়রঃ ডে, রিভার’ লিখতে চাইনি। আমি সেই নদীটাকে লিখতে চেয়েছিলাম, ওকে বর্ণনা করতে চেয়েছিলাম। আপনাদের বলতে চেয়েছিলাম সে এখন কি ভাবছে, ওর ওপর চাঁদের আলো এসে পড়লে ওকে কেমন দেখাচ্ছে।
এটা যেন চিত্রনাট্য লেখার বাধ্যবাধকতাগুলোর থেকে ভেঙে বেরিয়ে আসা, সেইসঙ্গে সিনেমার ক্ষেত্রে যে সমস্ত আপোস ক্রমাগত করে যেতে হয়, সেগুলোর থেকেও মুক্তি। কারণ সিনেমার সবরকমের শিল্পোত্তীর্ণ ব্যাপার ভালো মতন জনসংযোগ এবং সেইসঙ্গে মোটা টাকা না থাকলে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয় না, আর টাকার ক্ষেত্রে প্রযোজকের ক্রমাগত ঘাড়ের ওপর দীর্ঘশ্বাস ফেলার ব্যাপারটা তো রয়েই যায়। মাধ্যম হিসেবে সিনেমা হচ্ছে সত্যিই চমকপ্রদ, যা আমার কাছে অশেষ ক্লান্তিকর বলে মনে হয়েছে নিজেকে বারবার লোকের সামনে বোঝাতে গিয়ে। আমার মতে, উপন্যাস হচ্ছে শুধুই নিজের সঙ্গে নিজের ক্রমাগত আপোস করে যাওয়া, যতক্ষণ না পর্যন্ত সেটি অন্য কারও হাতে গিয়ে উঠছে। সিনেমায় কাজ করার পর, আমি যে নির্জনতা খুঁজে নেওয়ার সিদ্ধান্ত করি, সেটি বেশ পছন্দ হয়ে যায় আমার, এবং ধীরে ধীরে সব কিছুর প্রতি নিরাসক্ত হয়ে উঠতে থাকি। আপনার হয়তো কোনো গরুকে হাঁটানোর পরিকল্পনা ছিল অতীতে, কিন্তু গরুর জন্য যথার্থ বাজেট ছিল না! অথচ আপনি একটু আগেই বললেন— ট্র্যাফিক-লাইটের সামনে দিয়ে একটা গরু এমনভাবে হেঁটে চলেছে যেন ইনকাম-ট্যাক্স জমা দিতে যাচ্ছে। এসব একেবারেই ফালতু, অহেতুক দুষ্টুমির মনোবৃত্তি জেগে ওঠা একটা চিত্রনাট্যের ভেতরে। এটা বরং উপন্যাসের জন্য বেশি যথাযথ। কিন্তু, …শশ! আজকের ভারতে গরু নিয়ে কিছু কথা বলার আগে খুবই সাবধান হওয়া কর্তব্য, …এখনও আমি জানি না, একটা গরুর ক্ষেত্রে ইনকাম-ট্যাক্স জমা দেওয়াটা কতটা পবিত্র এবং কতটা রাষ্ট্রবিরোধী ব্যাপার। সম্ভবত সেরকমই। গরু আজ মানুষের মনের সুরের একেবারে কেন্দ্রে বসে আছে, বিশেষ করে মুসলিম আর দলিতদের, যাদেরকে বিনা বিচারেই মেরে দেওয়া হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে।
প্রশ্নকর্তাঃ
লেখার পদ্ধতিটা ঠিক কেমন হয়, বইয়ের ক্ষেত্রে?
অরুন্ধতিঃ
যখন আমি ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ লিখতে শুরু করি, আমার মনে হয়েছিল, অ্যানি’র মতো একটা সিনেমা যদি একেবারেই কিনারার কিছু হতে পারে, উপন্যাস বরং আরও কিনারার দিকে এগিয়ে থাকুক। এই ধরনের খানিক স্বাধীনতাও ছিল ওই ক্ষেত্রে। ‘ইলেকট্রিক মুন’-এর চিত্রনাট্য লিখে আমি কিছু টাকা পেয়েছিলাম, চুক্তিপত্রে সইসাবুদ হওয়ার পর, ওরা পাউন্ডে টাকা দিয়েছিল, এবং হঠাৎই ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। আমরা তাজ্জব বলে গেলাম। এখানে একটা পার্টিও দেওয়া হল। এরপর আমার হাতে খুব সামান্য টাকাই পড়েছিল যা দিয়ে আমি বই লেখার জন্য কিছুটা হলেও সময় কিনতে পারি। জানেন তো, একটা ধারণা আছে না— সব কিছুই আসলে স্বাধীনতার একেকটা রূপ, ওটা এক্ষেত্রে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক।
লেখালেখি জিনিসটা আসলে খুব গোপন একটা কাজ করে যাওয়ার মতো। প্রদীপের পৈতৃক বাড়ির ছাদের দুটো ঘরের একটায় আমরা থাকতাম। সকাল থেকে খুব বেশি হলে বেলা দুটো পর্যন্ত আমাদের মধ্যে সংযোগ থাকত, তারপরেই আমি একটা ঘরে ঢুকে তালা দিয়ে দিতাম। কাউকেই আমি বলতাম না, কি লিখছি। নিজেকেও চিনতে পারতাম না। একটা অধ্যায় লিখতে শুরু করেছিলাম যেখানে একটা আকাশি-নীল রঙের শহরের প্রান্ত আচমকাই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে একটা লেভেল ক্রসিং-এর সামনে। সেই আমার ভেসে যাওয়া। আশ্চর্য হই এই ভেবে যে, যখন আশি বছর বয়স হবে, ওটা তখনও সেই একইভাবে থমকে থাকবে ওই বেফালতু লেভেল ক্রসিং-এ, আর আমিও ব্যাপারটা নিয়ে লিখতেই থাকব।
আমার মনে হয়, আমার ভেতর যে আর্কিটেক্ট রয়েছে, সে সবসময়েই কোনো না কোনো গঠন খুঁজে বেড়ায়, একটা নতুন কিছুকে গড়ে তোলার জন্যে। আমিও খুঁজেছি, তবে জানতাম না কি খুঁজে পাওয়ার ছিল। এরপর হঠাৎ করেই, যখন লেখাটা দু-বছর হল সবে এগিয়েছে, আমার সামনে পুরো জিনিসটাই ছবির মতো ফুটে উঠল। এমনকি, আমি একটা ছবিও এঁকে নিয়েছিলাম কীভাবে পুরো গল্পটা একটা গোটা দিনের গল্প বলছে, আর অন্যান্য গল্পগুলো অনেক অনেক লম্বা সময়ের কথা বলছে। এটা বেশ তালে তালেই হচ্ছিল। একটা ভৌতিক ড্রামের শব্দ, যেটাকে আমার মেপে নেওয়ার ছিল। তারপর একদিন আমি ওকে দেখতে পেলাম। একটা কাঠামো। তাকে এঁকেও ফেললাম, পুরনো খামের পেছনে। একটা ট্যাক-বোর্ডে সেটা আটকে দিলাম। বিরাট করে নিশ্চিন্তে হওয়া গেল। লেভেল ক্রসিং উঠে গেল, গাড়িগুলো আবার এপার-ওপার করতে শুরু করে দিল।
প্রশ্নকর্তাঃ
চিন্তা করতেই বেশ অন্যরকম লাগছে— ছবি এঁকে নিয়ে লেখা ব্যাপারটা। লেখার গড়ন বা কাঠামোর প্রস্তুতিতে আপনার আর্কিটেকচারের প্রশিক্ষণ কি আজও একইরকম কার্যকরী বলে আপনি মনে করেন? আমরা চিরকাল শুনে এসেছি লেখকদের খসড়া-লেখার কথা, কিন্তু এই ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা।
অরুন্ধতিঃ
হ্যাঁ, ব্যাপারটা খসড়া করা আর নকশা করার যে ফারাক, সেরকমই। আর্কিটেকচার আজও আমার চিন্তাপদ্ধতির কেন্দ্রে রয়ে গিয়েছে।
প্রশ্নকর্তাঃ
‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ লিখে ফেলাটা মনে হচ্ছে প্রায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সেরকম কোনও প্রেরণার কথা মনে পড়ে, কিংবা এখনকার?
অরুন্ধতিঃ
কেউ নেই। একজনও না। আমার লেখা আমারই জন্য, একেবারেই আমার, নিজেকে নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আমার লেখা নিজে তার যুক্তিবোধ খুঁজে নেয়, নিজের অনুপ্রেরণা খুঁজে নেয়। যখনই প্রথম বাক্যটা লিখে ফেলি, এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটা সে-ই নিয়ে নেয়। তার নিজস্ব অনুপ্রেরণা আছে, রয়েছে নিজস্ব গতিবেগ, লেখাটা পুরোপুরি তারই হয়ে যায়।
প্রশ্নকর্তাঃ
নয়ের দশকে ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ লেখা, তার কুড়ি বছর বাদে ‘মিনিস্ট্রি’ লেখা, এর মধ্যে এই ব্যাপারগুলো বদলে যায়নি তো? আরও ভাবছিলাম, কাহিনি আর প্রবন্ধ-সাহিত্যের ফারাকের ক্ষেত্রে, আপনি বলেছিলেন, প্রবন্ধ-সাহিত্যের ক্ষেত্রে নিজেকে ‘অকস্মাৎ অনেকটা বেশি দুমড়েমুচড়ে নিয়ে’— তবেই লেখেন। যা আপনার ভাষায় নিজের থেকে বেরিয়ে এসে নৃত্য করার মতোই।
অরুন্ধতিঃ
আসলে, বাজে ভাবে বললেও, বলতে হয়— বদলায়নি। এটা আসলে প্রবৃত্তির ব্যাপার। কখনো মনে হয়, এতে বোধহয় আত্মা-টাত্মার হাত আছে। এই কিছুক্ষণ আগে, আমার সাহিত্য-সংবাহক ডেভিড গডউইন ফোন করে জানতে চাইল, লেখালেখি কেমন চলছে? আমি বললাম, তুমি তো জানো ডেভিড, আমি লিখি না, প্রতীক্ষা করি।
এটা একদিক দিয়ে সত্যি। কেউ একজন, একটা আত্মা, বা একটা ভূত, একটা দুষ্টুমি, আমার কাছে আসে, আমার কানে ফিসফিস করতে থাকে। নয়তো আমার গা বেয়ে উঠে আমার পেটে ঘুষি চালাতে থাকে। সাধারণত কাহিনির ক্ষেত্রে ফিসফাস চলে বেশি, অথচ প্রবন্ধের ক্ষেত্রে আমাকে উত্যক্ত করে ছাড়া হয়। প্রবন্ধ লেখার সময় অস্থির হয়ে যাই। কিন্তু শান্ত মনে থাকলেও, কাহিনি লেখার সময়ে আমি কিন্তু একেবারে পাগল!
প্রশ্নকর্তাঃ
কথাকলি সম্বন্ধে কিছু প্রশ্ন রেখে আজ শেষ করতে চাই। ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’-এ এসথা এবং রাহেল যখন মন্দিরে যেত, কথাকলি-র ভূমিকা ছিল বিশেষ। এটি এক ধরনের গল্প বলে যাওয়া, কিংবা গল্পের উপস্থাপনা। কি করে এই ব্যাপারটা আপনি খুঁজে পেলেন?
অরুন্ধতিঃ
আয়েমেনেমে থাকতে পুরো জনবসতিটাই কথাকলি-শিল্পীদের ছিল। ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ উপন্যাসে আমি যাকে মাথায় রেখে কথাকলি-র বর্ণনা করেছিলাম, তাঁকে চিনতাম একেবারে ছোটবেলা থেকে। আপনার-আমার কল্পনার সবচাইতে সুন্দর পুরুষ ছিলেন তিনি। তিনিই আমাকে বলেছিলেন, যখন ছোট ছিলেন তিনি, স্বপ্ন দেখতেন একজন কথাকলি শিল্পী হবেন, কিন্তু তাঁর পরিবারে ছিল খুব দারিদ্র্য। তাঁর মা তাঁকে নিয়ে যান এক শিক্ষকের কাছে, জানেন তো, যাকে বলা হয় ‘গুরু’। এক বৃষ্টির দিনে সেই রোগাভোগা বালক আর তার মা গুরুর বাড়ি পৌঁছোল। ওঁরা একটা গাছের নীচে আশ্রয় নিয়েছিল কোনোমতে, ছাতাও ছিল না। গুরু-কে সম্মানবাবদ যে টাকা কটা দেওয়ার কথা— অর্থাৎ যাকে বলে ‘গুরু-দক্ষিণা’ সেও ওঁদের সঙ্গে নেই। ‘গুরু-দক্ষিণা’ হচ্ছে একরকম সাম্মানিক অর্থ, যা গুরু-কে দেওয়ার চল রয়েছে তাঁর ‘শিষ্য’, অর্থাৎ ছাত্র হওয়ার সময়ে। বিনিময়ে সেই গুরু যা যা জানেন, সবই তাঁর শিষ্য-কে শিখিয়ে যাবেন। সেই শিষ্য-এর দেখাশোনা করবেন। গুরু তাঁর মা-কে একধারে ডাকলেন, তাঁর হাতে পাঁচটি টাকা তুলে দিলেন, সে কত আর হবে, আমি জানি না, …কয়েক সেন্টের মতো হবে হয়তো, এবং বললেন— এই পাঁচটা টাকা তুমি আমাকে আবার ফিরিয়ে দাও। এটাই হবে ‘গুরু-দক্ষিণা’। উদারতার সেই মধুরতম মুহূর্ত থেকে আমার দেখা সেই মহোত্তম গল্প-বলিয়ে মানুষটার প্রথাগত শিক্ষা শুরু হয়ে গেল।
আমার মতে, যা আমি দেখি তা নিজের ভেতরে নিয়ে নিই। জুড়ে দিই নিজের সঙ্গে। তারপর ইচ্ছেমতো চালাই সেটিকে, গল্প বলার জন্য। এটাও অদ্ভুত যে একজন লেখকের জন্য সবচাইতে বড়ো অনুপ্রেরণা কিন্তু নাচ। তবু এটা সত্যি। কথা মানে গল্প, আর কলি মানে ক্রীড়া। কথাকলি নাচের ক্ষেত্রে, একজন নৃত্যশিল্পীর গোটা শরীরটাই আস্ত একটা গল্প হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু তিনি শরীর দিয়ে গল্পটিকে ধরে রাখেন, এক্ষুনি বলে দেবার গল্প নয় বলেই। প্রবল পরাক্রমী রাজা শুধু তার শরীরের মধ্যে দিয়েই রুগ্ন নিঃস্ব হয়ে যেতে পারেন এক মিনিটেরও কম সময়ে। একজন কথাকলি শিল্পী অতি সূক্ষ্ম সব শারীরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিজেকে বারবার বদলাতে পারেন। হয়ে যেতে পারেন তিনি আকাশ, কিংবা রথ, প্রেমিক, হরিণ, বনের ভেতরে লাফিয়ে বেড়ানো বানর। হিংস্র রাজা, তার উপেক্ষিতা মহিষী, সব কিছুই। খুব ভালো লাগে আমার। যেন নিজের শরীর দিয়ে লেখা। আমার ত্বক, চুল, চোখ, সব কিছু দিয়ে। আমার সবসময়েই মনে হয়েছে কোনো লেখকের শারীরিক কসরত করার ক্ষমতা না থাকলে, সাহিত্যের পাতায় সে এক নিঃশ্বাসে বড়ো বড়ো লাফগুলো দিতে পারবে না। এগোনোর প্রচেষ্টাটাই আসল। এগোনোর সামর্থ্য, শুধু মহাকাব্য থেকে ব্যক্তিগত কাব্য পর্যন্ত নয়, সেইসঙ্গে হাস্যরস থেকে মর্মস্পর্শী হয়ে হৃদয়-বিদারক হয়ে দুর্বোধ্য হয়ে অশ্লীল হয়ে— এই পথের সব কিছুই আমার কাছে একইরকম গুরুত্বপূর্ণ। অনেকসময়েই আমাদের চোখে পড়ে যায় খুব সুন্দর কোনো মর্মস্পর্শী লেখা, কিন্তু তাতে একটুও হাস্যরস নেই, অশ্লীলতা নেই। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি সব কিছুকে নিয়েই লিখতে চাই। আমার লেখাকে একসঙ্গে সব কিছু হয়ে উঠতে হবে— হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভাষায় যেন একটা রাগ, যে উদারা, মুদারা, তারা, সব পর্দার সব সুরকে একসঙ্গে নিয়ে এগোতে চাইছে।
প্রশ্নকর্তাঃ
সামর্থ্য— এই প্রসঙ্গে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলছেন। একজন নৃত্যশিল্পীর জন্য যা— শারীরিক সামর্থ্য।
অরুন্ধতিঃ
কিন্তু আমার মতে, এটি একজন লেখকের জন্যেও একইরকম গুরুতর। আপনি যদি দৌড়বীর হতে চান, রূপকের দৃষ্টিতে হলেও একজন নৃত্যশিল্পী যেমন শরীর ভাসিয়ে দিতে পারেন— সেই কায়দা আপনাকে আয়ত্ত করতে হবে। বিনা আয়াসে এবং শৈল্পিকভাবে হাত-পা নাড়াচাড়া করায় অভ্যস্ত হতে হবে। অন্যথায় লিখতে লিখতে মাঝেমাঝেই নিজের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে হতে পারে। আমি সব সময়েই মনে করি, কিছু কিছু বড়ো লেখক ছিলেন যারা পাঠকের স্মৃতিতে শুধু নিজের আলোকময়তার কারণেই রয়ে গিয়েছেন, যা তার লিখে রেখে যাওয়া স্মৃতির বিশ্বের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলে রাখে। আবার কেউ কেউ থেকে যান তাদের মহত্বের জন্য নয়, যে বিশ্ব দিয়ে তাঁরা পাঠককে জাদুমুগ্ধ করে রেখেছেন, শুধু তারই জোরে। আমি এই ধরনের লেখক হতে চাই। যে বিশ্ব আমি লিখি, যে বিশ্ব আমি সৃষ্টি করি, আমি সেখানেই থেকে যেতে চাই। আমার কাহিনির মধ্যে থেকে যেতে চাই। একটা কবরখানায় থাকতে চাই আমি, জন্নত গেস্ট হাউজের কোনো একটা ঘরে। আমার নিজের কবরের সঙ্গে। আসলে, আমি এখনই সেসব করি।
অনুবাদক পরিচিতিঃ সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত - গল্পকার, বাচিক শিল্পী, দূরদর্শনের সঞ্চালিকা। কলকাতায় থাকেন।



1 মন্তব্যসমূহ
সাক্ষাৎকারটি পড়লাম। ঋদ্ধ হলাম।
উত্তরমুছুন