রতনকে ঠিক এই পিলারটার কাছেই দাঁড়াতে বলেছিল আমিনুর অথচ এখন এই বিপুল জনরাশির মধ্যে ছেলেটাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না সে। ও কি এখনো আসেনি তাহলে? মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই, সেই কখন থেকে কল করবার চেষ্টা করে করে পারছে না। সামনের হাজার হাজার মানুষের মধ্যে রতনের টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না। অথচ এক ঘণ্টা আগেও কথা হয়েছে, ওর মতো সেও তখন পথে ছিল! আজকের এই দিনটার জন্য কি কম দিনের প্রতীক্ষা ওদের? সেই কবে, ওদের ছোটবেলায় একদিনের জন্য দেখা হয়েছিল তারপর গত তিন বছর ধরে শুধু পরিকল্পনাই করে চলেছে দু’জনে, দেখা করার সুযোগ করে উঠতে পারছে না। অথচ আজ যখন দেখা করবার সব ঠিক করা, তখনও নির্ধারিত জায়গায় রতনকে খুঁজে পাচ্ছে না সে। আমিনুর আবারও এই ভিড়ের মধ্যে আতিপাতি করে খুঁজতে থাকে রতনের মুখ। আচ্ছা, আসতে গিয়ে ছেলেটার কিছু হলো না তো!
সামনের দিগন্তবিস্তৃত কাঁটাতারের আগল আর তার ওপাশে অগনিত অপরিচিত মুখ ছাপিয়ে রতনের দেখা মেলে না কোথাও। গায়ের ওপর কেউ একজন হুড়মুড়িয়ে পড়তে পড়তে পড়ল না। আমিনুর সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছেলেটাকে চিনতে পারে না। ছেলেটা খুবই বিব্রত মুখে তাকিয়ে স্যরি বলে ভিড় ঠেলে চলে যায় উত্তরদিকে, হয়তো তার সঙ্গে যে দেখা করতে আসার কথা, সে এসে গেছে বলে থামার সময় নেই। আমিনুর নিজেও পা চালিয়ে ওদিকেই যায়। কে জানে, রতন হয়তো ভিড় ঠেলে এতদুর আসতে পারেনি, কাছাকাছি ওদিকে থাকতে পারে। তবে ওকে না পেলে বেশিদূর যাওয়া যাবে না, কে জানে ও হয়তো একটু পরে এখানেই চলে আসবে। সামনের লাল-নীল-কালো-হলদে রঙের ভিড় দু’হাতে সরিয়ে আমিনুর এগোতে থাকে। কারও হাতের কনুই ওর হাতে লাগে তো ওর পা আটকে যায় কারও জুতার পেছনে। ইশ! কত যে মানুষ! ওদের পাড়ার হেমন্ত কাকু আর রাধা কাকিমাও এসেছে এখানে, ভারতে বিয়ে দেবার পর তাদের মেয়ে রানুদির সঙ্গে তাদের গত চার বছরে একবারও দেখা হয়নি, তাই ছুঁয়ে দেখতে না পারলেও একবার রানুদিকে চোখের দেখা দেখতে এসেছে তারা। বুড়াবুড়ি থেকে আজগর মামাও এসেছে তার ভাগনে রুবাইয়ের সঙ্গে একবার দেখা করতে। এখানে আসবার পর অবশ্য তারা একেক দিকে ছিটকে গেছে নিজেদের প্রিয় মানুষের নাগাল পেতে।
আমিনুরের কান জুড়ে আছড়ে পড়তে থাকে অগনন কথার ঢেউ। কারও খটখটে হাসির শব্দ চাপা পড়ে যাচ্ছে কারও উথলে ওঠা কান্নার ফোঁপানিতে। এ এক আশ্চর্য মিলন মেলা! বছরের প্রথম সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে অমরখানার এই এলাকাটা একজন দু’জন করে মানুষে ভরে যেতে থাকে শুধু বেড়ার ওপারে থাকা প্রিয়জনদের একটিবার চোখের দেখা দেখবে বলে। অবশ্য সকাল সাড়ে দশ এগারোটার আগে পিলারের কাছে ঘেঁষতে দেয়া হয় না কাউকে। এই মানুষগুলোর বড় অংশই কোনোদিন পাসপোর্ট করে সীমান্তের ওপারে যেতে পারবে না, কথাটা সত্যি ওপাশের জনারণ্যে থাকা মানুষগুলোর জন্যও। তাই মোবাইলের ভিডিও কলের বাইরে ্একটিবার নিজের চোখে রক্তমাংসের মানুষগুলোকে দেখার জন্য ছুটে ছুটে বহু দূর দূরান্ত থেকে আসে তারা। এখানকার নো-ম্যানস-ল্যান্ড নামের জায়গা ঘিরে এত মানুষের সমাগম হয় বছরে এই একটি দিনই। এপাশে বিজিবি, পুলিশ আর ওপাশে বিএসএফ এদিন সতর্ক পাহারায় থাকলেও কাউকে আঘাত করার দরকার পড়ে না তাদের। এই মানুষগুলোর হৃদয়ের আর্তি বুঝতে পেরে তাদেরই কোনো পূর্বতন কর্মকর্তা উদ্যোগ নিয়ে প্রায় এক যুগ আগে থেকে এদের এভাবে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
আমিনুর ভালো করে কাঁটাতারের অন্য পারে খেয়াল করে। এপার আর ওপারের মধ্যে পার্থক্যটা আসলে কোথায়? মাঝখানের এই পিলার আর তীক্ষè তারের দঙ্গল থেকে ওই তো একটু দূরে দুপাশেই খেতজোড়া কালচে সবুজ সারি সারি চা গাছ। চা গাছের বাইরে যে মাটি, তাও দুই দেশেই একইরকম রুক্ষ, পাথুরে, পথের ওপরের ধুলিও সেই একইরকম। এমনকী পিলারের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো মানুষগুলোর চেহারা সুরত, কথাবার্তা সবই অবিকল এক। তাদের কান্না-হাসির দমকেও কোনো তফাত নেই একদম। এই মানুষগুলো এই মাটির মতোই একই রক্তের শুধু মানুষের তৈরি এক বেড়াজালের জন্য তারা ছিটকে চলে গেছে আলোকবর্ষ দূরে।
এখানে আসবে বলে সেই কোন সকালে আমিনুররা রওনা দিয়েছে ডাহুকপাড়ের রওশনপুর নামের গ্রাম থেকে। আজকের জন্যই অফিস থেকে পহেলা বৈশাখের ছুটির সঙ্গে আরও একদিনের বাড়তি ছুটি নিয়ে কাল বাড়ি এসেছে সে। সরকারি অফিসগুলোতেও আজকাল ছুটির ভীষণ কড়াকড়ি। রতনও কোচবিহার থেকে কাল জলপাইগুড়িতে ওর বড় পিসির বাড়িতে এসেছে আজ ওর সঙ্গে দেখা করবার জন্য। দেখাটা এবার না করলেই নয়, রতনের বাবা রণদীপ মামার শরীর খুব খারাপ, বছরখানেক থেকেই পুরো বিছানায় শোয়া, রতন জানিয়েছে বাবার অবস্থা বেশি ভালো নয়। জিনিসটা তাই এবারই পৌঁছে দেয়াটা খুবই জরুরি। আমিনুরের পিঠে ঝোলানো ব্যাগে অতি যত্নে প্যাকেটে মোড়ানো জিনিসটা রণদীপ মামার কাছে যাবার পর তার কেমন লাগবে ভাবতেই গা শিরশির করে ওঠে ওর। কিন্তু যার কাছে জিনিসটা বুঝিয়ে দেবে বলে এত দূর ছুটে আসা, সেই রতনটা এখন কোথায়?
প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে আমিনুর মোবাইলটা বের করে আরেকবার, নেটের ন-এরও দেখা নেই এখনো। কী একটা বিপদ যে হলো! মোবাইলটা যথাস্থানে রেখে ও আবার চার নম্বর সাব পিলারটার কাছে ফিরে আসে। না, সেখানে রতন অর্থাৎ রত্নাংশু রায়ের দেখা নেই এখন পর্যন্ত। তার বদলে বিভিন্ন বয়সী অনেকগুলো নারী পুরুষে ভরে আছে জায়গাটা। আমিনুর নিজের ব্যাগে রাখা পাউরুটি আর একটা সাগরকলা বের করে খেয়ে নেয়, এখানে দেরি হবে ভেবে আসার পরপরই খাবারটা কিনে রেখেছিল। এত জন সমাগম উপলক্ষে টুকটাক খাবারের দোকান, বেলুন আর খেলনার দোকান চলে এসেছে। বড় বড় ঝানু ব্যবসায়ীদের মতো এই অজপাড়াগায়ের ছোট ছোট দোকানিরাও এখন জেনে গেছে কখন কোথায় কীসের ব্যবসা করতে হয়।
রোদটা বাড়তে বাড়তে রীতিমতো জেল্লা দিচ্ছে এখন আর তাতে ঘামে ভিজে গেছে আমিনুরের চুল, কপাল, পরনের শার্ট। ব্যাগের সাইড পকেটে রাখা পানির বোতলটা বের করে ঢকঢক করে অর্ধেকটা পানি খেয়ে নিয়ে আবার চারপাশে চোখ বুলায় সে। জায়গাটা রীতিমতো একটা মেলায় পরিণত হয়েছে। আমিনুর খেয়াল করে পরম মমতাজড়ানো কত জিনিস কাঁটাতারের এপাশ থেকে ওপাশে যাচ্ছে আবার ওপার থেকে এপাশে চলে আসছে। কেউ ছুঁড়ে ছুঁড়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে-নিচ্ছে নানারকম জিনিস, কেউবা কাঁটাতারের ফাঁক গলে হাতেহাতে বুঝিয়ে দিচ্ছে সেগুলো। গাছের কাঁচা আম, পাকা মালভোগ কলা, বিস্কুট-চানাচুর, চিতই-পাকান-নুনাস পিঠা, বড় ফ্রেম করা ছবি থেকে হরিণ বিড়ি পর্যন্ত কেমন পাসপোর্ট ভিসা ছাড়্ইা পার হয়ে যাচ্ছে কাঁটাতারের বিধিনিষেধ। ভাগ্যিস ওরা মানুষ নয়- ভাবে আমিনুর, মানুষ হলে পাসপোর্ট ভিসা এনওসি জিওর চক্করে পড়ে বছরের পর বছর সীমানার এপারেই আটকে যেত ওরা। ওর জিও হতে হতে আটকে গেল পর পর দুই বার, নাহলে হয়তো এই নীল মলাটের বহু পুরনো ডায়েরিটা ও আরও দু’বছর আগে নিজেই রণদীপ মামার হাতে পৌঁছে দিতে পারত। সরকারি চাকুরির সবচেয়ে ঝামেলার জিনিস ওর কাছে মনে হয় এই বহির্বাংলাদেশ গমনের প্রক্রিয়া, খটোমটো নামটার মতোই খটোমটো লম্বা সব ধাপ পেরিয়ে তবে মানুষ সরকারি আদেশ নামের অতি আকাঙিক্ষত কাগজটা পেতে পারে।
যার কাছে ডায়েরিটা পৌঁছে দেবার এত তাড়া, সেই রণদীপ রায় কিন্তু এখনো এ বিষয়ে বিন্দু বিসর্গ জানেন না। ব্যাপারটা আমিনুর আর রতনের কাছে এক গোপন চুক্তির মতোই সযত্ন গোপন বিষয়। আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে, মাকে নিয়ে যখন রীতিমতো যমে-মানুষে টানাটানি, সেই তখন মায়ের আলমারির ভেতর মায়ের বিয়ের শাড়ির ভাঁজে এই ডায়েরিটার খোঁজ পেয়েছিল সে। বোধহয় মায়ের কাছে সেই জায়গাটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আর সুরক্ষিত স্থান বলে মনে হয়েছিল। তার জীবদ্দশায় তার আলমারিতে হাত দিত না কেউই। নিজের কিশোরীবেলার প্রথম প্রেমিক রণদীপ রায়কে আরমিনা খাতুনের লেখা চিঠির পর চিঠির একটা সংকলন আসলে এই ম্লান হয়ে আসা নীল মলাটের ডায়েরিটা। আমিনুর, আশরাফির মা আর বুড়াবুড়ি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের জাঁদরেল হেডমাস্টার আরশাদ প্রধানের স্ত্রীর বাইরেও মায়ের যে আরেকটা পরিচয় আছে সেটা আমিনুর আবিষ্কার করেছিল এই ডায়েরিটা পড়তে গিয়ে। মা অনেক অনেক বছর ধরে চিঠিগুলো লিখে গেছে, তার বিয়ের আগে থেকে আশরাফি বড়ো হয়ে ওঠা পর্যন্ত চিঠি আছে ডায়েরিটায়, তারিখগুলো খেয়াল করেছে সে। ডায়েরিটা সবার থেকে আড়াল করতে মাকে কত চিন্তাই না করতে হয়েছে সারাটা জীবন!
মা তখন তৃতীয়বার স্ট্রোক করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি, দুই দিন হাসপাতালে থেকে সেদিন সকালবেলা বাড়ি ফিরেছিল সে, সন্ধ্যার বাসে আবার রংপুর ফিরে যাবার তাড়া ছিল আমিনুরের। গ্যাসের চুলায় ভাত আর মাছের ঝোল চাপিয়ে আলমারি থেকে মায়ের কিছু কাপড়চোপড় আর টাকা নেবার জন্য আলমারিটা খুলেছিল। কী মনে করে মায়ের বিয়ের শাড়িটা খুলে দেখতে গিয়েছিল সে- ডায়েরিটা পেয়েছিল তখনই। কৌতূহল বশে ডায়েরিটা খুলে প্রথম চিঠিটা পড়ে ফেলেছিল সে, হয়তো সম্বোধনের জন্যই পড়তে তেমন সংকোচ লাগেনি সেদিন। মায়ের ডায়েরি জুড়ে প্রত্যেক চিঠির সম্বোধনে লেখা ‘প্রিয় পৃথিবী’! তিন পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা প্রথম চিঠিটার মধ্যেই আমিনুর অবশ্য পেয়ে গিয়েছিল পৃথিবী নামক গ্রহের আসল পরিচয়, রণদীপ রায়! মায়ের কাছে তার রণো’দার কথা কত শুনেছে ওরা সারাজীবনে, সেই রণো মামা, খুব ছোটবেলায় অল্প সময়ের জন্য মানুষটাকে একবার দেখেওছিল সে! কিশোরীবেলার সেই প্রেমিক হয়তো সারাজীবন জুড়েই মায়ের পৃথিবী হয়ে ছিল, কে জানে! আমিনুর বাকি চিঠিগুলো পড়েনি, ডায়েরিটা যথাস্থানে রেখে মাছের ঝোল ভাত টিফিন ক্যারিয়ারে নিয়ে সে হাসপাতালে ফিরেছিল সেদিন। মাকে কিছু জিজ্ঞেস করবার ফুরসত মেলেনি কারণ মা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেনি সেবার। তবে মায়ের লাশ বাড়ি আনবার পরপরই ডায়েরিটা সন্তর্পণে লুকিয়ে ফেলেছিল সে। সেটা অন্য কারও হাতে পড়ুক, মৃত মায়ের বহু বছর আগে হাওয়ায় মিলানো সম্পর্কটাকে কেউ খারাপভাবে দেখুক, এটা চায়নি সে। ডায়েরিটা তারপর নিয়ে চলে গিয়েছিল ঢাকায়, নিজের কাছে। এতদিন ধরে মায়ের মতোই আদরে আর সযত্ন সতর্কতায় ডায়েরিটা আগলে রেখেছে সে। যেমন বুকের ভেতর আগলে রেখেছে আরমিনা নামের এক উচ্ছ¡ল কিশোরী আর তার প্রিয় ডাহুক দিনের স্মৃতিগুলো। ডাহুক মায়ের প্রিয় ছিল আজীবন, আমিনুর কতবার দেখেছে মা সময় নেই অসময় নেই বাড়ির পেছনদিকে নদীর পাড়ে প্রধানবাড়ির বাঁধানো ঘাঁটের সিঁড়িতে বসে থাকত চুপচাপ, কেউ ডাকলেও সেখান থেকে উঠতে চাইত না।
সেবার ঢাকায় ফিরে আতিপাতি করে খুঁজে ফেসবুকে রতনকে খুঁজে বের করেছে সে। এই খুঁজে বের করতে কম বেগ পেতে হয়নি অবশ্য তবু সব কষ্ট শেষে রতনকে পেয়েই তার সঙ্গে কথা বলে ফেলেছিল আমিনুর। রতন প্রথমে খুবই অবাক হয়েছিল ডায়েরির কথাটা শুনে। আরমিনা আন্টির কথা অনেক শুনেছে সে, এমনকী বাবা-মা’র সঙ্গে সেই ছোট্টকালে পঞ্চগড়ে যখন গিয়েছিল, আরমিনা আন্টিদের বাড়িতেও একদিনের জন্য গিয়েছিল ওরা। তারপর কিছুদিন বারবার বলতে বলতে রতনকে ডায়েরিটা রণো মামার কাছে পৌঁছে দেবার ব্যাপারে রাজি করিয়ে ফেলেছিল সে। মায়ের লেখা চিঠিগুলো দিনশেষে সেগুলোর প্রকৃত প্রাপকের কাছেই নিশ্চিন্তে থাকুক, সেটাই যে আমিনুরের একমাত্র চাওয়া সেটা বুঝতে পেরেছিল রতন। এই ডায়েরি নিয়ে কথা বলতে বলতেই এক সময় খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে ওরা। আমিনুর যেমন দুই দুবার দাপ্তরিক অনুমতি না পাওয়ায় কাঁটাতারের ওপারের মাটিতে পা রাখতে পারেনি আজও, রতনও তেমনই সংসার আর চাকুরির ঝক্কি সামলে আজ অবধি আসতে পারল না এপারে। অবশেষে আজ এই হাজার হাজার মানুষের মধ্যে ওরা মূলত সেকারণেই জন্য ছুটে এসেছে বহু দূর থেকে। কিন্তু এখন রতনটা সত্যি কোথায় আছে বুঝতে পারে না সে।
এই গণগণে সূর্যের নিচে গাদাগাদি মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে মাথার তালু ফেটে যাবে মনে হচ্ছে। আশেপাশে একটা বড় গাছ নেই যে তার তলায় গিয়ে দাঁড়াবে। মানুষের ভিড় বাঁচিয়ে পিলার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে তীক্ষè নজরে কাঁটাতারের অন্য পাশে তাকিয়ে থাকে সে। এক মাঝবয়েসি মহিলা হাউমাউ করে কেঁদেই চলেছে, এপাশে মনে হয় তার বাপ-মা, দুই বুড়োবুড়ি, তারাও প্রায় ডুকরে কাঁদছে। কান্নার তোড়ে কোনো কথাই বলতে পারছে না কেউই। কতদিন পর তাদের দেখা হয়েছে কে জানে! আমিনুরের একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। একই জমির মধ্যে একটা লাইন টেনে দিয়ে সেই বহু আগে কী সহজেই না ভাগ করে দেয়া হয়েছিল মানুষ, তাদের ঘরবাড়ি আর রক্তের বিন্যাসকে! বাপ-মা ছোটভাইকে ফেলে কতজন শুধু নিজের জীবনটা সম্বল করে নিয়ে চলে গিয়েছিল সীমানার ওপাশে! কতজন এপারে ওপারে বিনিময় করে গেছে নিজেদের ঘর বাড়ি জমি পুকুর সবকিছু, হয়তো তাদের এতটুকু চাওয়া ছিল তারা চলে গিয়ে যারা আসবে তারা যেন একটু ভালো রাখে তাদের জমিনটুকু! কে জানে! কতজনের দেশ ছাড়ার কত গল্প! সেই কবে, সেই উনিশশো ছেষট্টি সালে যেমন করে দীঘল বেণির কাজল চোখের আরমিনা খাতুনকে ডাহুকের জলে বিসর্জন দিয়ে বাবা-মার সঙ্গে দেশ ছেড়েছিল রণদীপ রায়! আর সেই কাজল চোখের মেয়েকে সারা জীবন কড়া শাসনে রাখবে বলে পুরো গোষ্ঠী সঙ্গে করে এ পাশে এসে হাজির হয়েছিল আরশাদ আলী প্রধান!
আমিনুরের দীর্ঘশ্বাস পড়ে। সেই দীর্ঘশ্বাসে হাহাকার তুলে পালিয়ে যায় এতদিনে মাটিতে মিশে যাওয়া মায়ের সেই কবেকার দু’চোখ ভরা প্রেম। ওর বুকজোড়া কষ্টবাতাস ওর চেয়েও বয়সে ছোট এক শ্যামল কিশোরী আরমিনার দুই বেণির ঘূর্ণিতে পাক খেয়ে খেয়ে ওর চারপাশে ওড়ে। বহুবার মনে হওয়া কথাটা সেই ঘূর্ণিপাক কেটে কেটে আজ আবার ফিস ফিস করে ওর কানে- সেই কোন কালে দেশটা যদি ভাগ না হতো, রণো মামারা সপরিবারে চলে না যেত কোচবিহার আর বাবার বাপ-দাদারা যদি না আসত এই রওশনপুরে, তাহলে আমিনুর রহমান প্রধানের কোনো অস্তিত হয়তো আজ থাকত না ত্রিভুবনের কোনোখানে।
আমিনুরের থেকে দুই হাত সামনেই এক ছোট্ট শিশু চিৎকার করে করে ডাকছে- মাসি, ও মাসি। সেই চিৎকারের উত্তরে সীমানার ওপাশ থেকে তার মাসি খয়েররাঙা দাঁত নিয়ে হেসে লুটোপাটি খাচ্ছে। এখনকার এত কোলাহল, ভিড়বাট্টা, চিৎকার, ফিসফাস, কান্না-হাসির রোল সব কেমন মায়া লাগে ওর। তার মনে হয়, এই পৃথিবী কী অসীম মায়ায় ঘেরা অথচ মায়া নেই কেবল মানুষের মনে! মায়া নেই বলেই কেমন একই মাটির বুক চিড়ে উঠে যায় সীমানাপিলার আর তাতে আরও জগদ্দল হয়ে চেপে বসে কাঁটাতারের দঙ্গল। মায়া নেই বলেই আজ মানুষের বেঁধে দেয়া তারের এপারে ওপারে দাঁড়ানো মানুষগুলোর নিজেদের ছুঁয়ে দেখবার অধিকারটুকু কেড়ে নিয়ে ভূত হয়ে গেছে কোনো এক নররাক্ষস।
আরেকবার মোবাইল বের করে হাতে নেয় সে, বারোটা বেজে গেছে প্রায়। যাক বাবা, এতক্ষণে নেট এসেছে! এত মানুষের ভিড়ে নেট কাজ করবে কিনা কে জানে তবু তার দেখা পেয়ে আমিনুরের আনন্দ হয়। হোয়্যাটসঅ্যাপে রতনের নাম বের করে সে, কল করার কোনো সুযোগ নেই, রতনের নামের ডানপাশের ছোট্ট কালো বৃত্তটা সবেগে ঘূর্ণায়মান। ক্লান্ত, বিরক্ত আর উদ্বিগ্ন আমিনুর এবার মোবাইলটা প্যান্টের পকেটে রাখতে গিয়ে শুনতে পায় এক আনন্দিত চিৎকার- অমিইইইইইইইইইই...
সেই ডাকে অমির বুকে ডাহুকের কালো জল হঠাৎ কলকল করে ওঠে। চমকে উঠে সামনে তাকায় সে, ভিড়ের মধ্যেও আলাদা করে খুঁজে পাওয়া যায় যাকে, সেই পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি উচ্চতার রতন! মায়ের পর পৃথিবীতে এই একজনই কেবল তাকে অমি ডাকে!


1 মন্তব্যসমূহ
এত অজস্র নিদাঘ দিন পাড়ি দিয়েও মানুষের সাথে মানুষের এই আত্মিক টান যেন না ফুরায় কখনো।
উত্তরমুছুন