বাড়িতে নতুন ঝি এল কাজ করতে। বাবারে দেখতে যেন আমাদের গাঁয়ের নেড়ি। যেমন চলাফেরা তেমনি কথাবার্তা। ব্যাটা ছেলেদের কানকাটা-- তাকে দেখে বলত পাড়ার মেয়েরা। কিন্তু সবাই আবার ভালোও বাসত। কারণ তার দুরন্তপনা বা ডানপিট মেতে এক ধরনের সরলতা ছিল-- রাগ লাগলেও, কোথায় আবার ভালো লাগত।
আজকের ঝিয়ের কথা বলতে গিয়ে আমার ছোটবেলাকার নেড়ির কথা যখন এসেই গেল তখন তার কথা না বললেই নয়। কারণ পরে প্রকাশ পাবে যে তার চাল-চলনে, কাজকর্মে বা কথাবার্তায় নেড়ির মিল পাওয়া যায়। নেড়ি তিন ভায়ের এক বোন, ফর্সা রং--হ্যাঁ বেশ টকটকে ফর্সাই বলা যায়। রংটা মায়ের, স্বভাবটা কার যে বলা কঠিন। বাপ না ভাইরা কেউ তার মতো নয়। তারা বেশ সাদামাটা আর বাবা নেড়িকে তার দুর্দান্তপনার জন্যে কিছুই বলে না। একটা আশ্চর্য বিষয় এটা। গ্রামের মানুষরা সাধারণত মেয়েদের ব্যাপারে খুবই খবরদারি করে থাকে। কিন্তু নেড়ির বাপ মেয়েকে তেমন কিছু বলত তো নাই-ই বরং বকাঝকা না করে আমস্করাই দিয়ে থাকে।
একদিন বেলা দশটার দিকে আমি আস্তানার পাশের রাস্তাটা পার হয়ে পাঠশালার দিকে যেতে দিয়ে দেখি-- নেড়ি বড় একটা বাঁশের ডগা-- তাতে একটা আঁকশি বাঁধা--ঘাড়ে নিয়ে হটহটিয়ে হিন্দুপাড়া থেকে আসছে। কাঁচা কদবেলের ভাঙা অংশ তার হাতে, মুখেও কিছু অংশ। তার ঠোঁট দুটো কটুশিটা কাঁচা কদবেল খাওয়ার কারণে সাদা হয়ে গেছে-- কাঁউ কাঁউ করে চিবোচ্ছে কাঁচা কদবেল। আমাকে দেখে হেসে বললে, ‘খাবি? লে ক্যানে।’ আমি আস্তে আস্তে ঘাড় নারি। ‘কী? খাবি না? খেতে হবে তোকে, নাইলে পাকাব্যাল আনলে চাইলেও পাবি না, বলে দেলোম।’ সুতরাং হাতটা বাড়িয়ে দিতেই হয়। কারণ কিছুদিন পরে ও ঠিক পাকা সুগন্ধী কতবেল পেড়ে আনবে-- আমি জানি। হাত পাতি। ও দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে ওর হাতের কদবেল থেকে একটা অংশ ভেঙে আমার হাতে দেয়। আমি খাবো কি খাবো না ভাবছি। নেড়ি বুঝতে পেরে চোখ রাঙায়-- ‘খেলি? কি দেখছিস কি? খা, বলছি নাইলে এমন ধরা ধরবো ত্যাকোন বুঝতে পারবি, খা, বলছি।’ নেড়ি আমার সামনে এসে দুই পা ফাঁক করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ায়। তার ঠোঁটের দুপাশের কশে কদবেলের সাদা ছোট ছোট অংশ লেগে আছে, দাঁতেও। আমি ভয়ে ভয়ে দাঁতে কাটি কদবেল। ওমনি তার মুখে ঝিলিক দেয় হাসি-- ‘এই তো বেশ, এবার গিলে ফ্যাল।’ গিলতে গিয়ে গলায় আটকে যায়-- খক্্ খক্্ করে কাশি এসে হঠাৎ করে পানির সঙ্গে বেলের টুকরো দুটি মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। খি-খি-খি হাসি আর ধরে না মুখে, খিক্্ খিক্্ খিক্্ হাসি ফুরোচ্ছে না। তারপরেই সে গান গেয়ে ওঠে,
‘বড় লোকের বিটিলো
লম্বা লম্বা চুল
তোর খোঁপায় বেঁধে দুবো...
ঠিক এই সময় নেড়ির বাপে গলা শোনা গেল- ‘এই, এখানে কি হেচে কি?’
এ্যায় নেড়ি, তু সকাল বেলায় কোথা গেইছিলি? কয়েত তলায়। ক্যানে শুধুইতো-- মাকে বলে গ্যালোম না? ত্যাকোন তুমিও সেখানে ছিলে শোনো নাই? কয়েত তলা কোতা রে?’
‘ক্যানে, বাউরি পাড়ায় ঢোল পুকুরের পাড়ে।’
‘অ, তা কয়েত পাড়তে বাটরি পাড়ার খেতে হলো ক্যানে র্যা?
‘মোচয়ান পাড়ায় তোমার বাপ ব্যালগাছ লাগায় নাই ক্যানে? তুমুও তো লাগাও নাই। মতো সব উদবকুনি বসে বসে। ব্যালের গায়ে ল্যাকা আছে বাউরিকয়েত আর বাউরিরা বুঝি মানুষ লয়? বসে বসে হুঁকো খেচো, খাও। আমার সাথে লাগতে এসো না-- বলে দেলোম।’
‘বাড়ি ঘেচিস, যা তো।’
‘তাইতো সেচি, তুমিই কতা তুললে।’
সে বাড়ির দিকে ঘটঘটিয়ে হাঁটা শুরু করলে। সেই সময় নেড়ির বড়ভাই ভাদুর গলা শোনা গেল কিক কিক হাসির সঙ্গে, ‘তুমি বাপচী নেড়িকে আর পেসসর (প্রশ্রয়) দিয়ো না, তাইলে ওর বিয়ে যা আর হবে না। বুড়ো বাপ মুখ থেকে হুঁকো সরিয়ে থেঁকিয়ে উঠলো, ‘আমি পেসসয় দি, বেশ করি, তোর বাপের কি?’ বিয়ে হোক আর না হোক, আমি বুঝবে। তোকে ভাবতে হবে না বুইলি? আমি আর দাঁড়াই না, পাঠশালায় দৌড় দি। আজ এইটুকুর ওপর দিয়ে গেল কিন্তু মাঝে-মধ্যেই পাঠশালায় যাতায়াতের পথে তার হাতে প্রায়ই ধরা পড়ে যাই কাকে ভুল বাক্যে আমরা বলি, ধরা খাই। এরমধ্যে একদিন পাঠশালা থেকে বাড়ি আসছি-- ধরা পড়ে গেলাম।
‘এ্যাই দাঁড়া বলচি। চ’ আজ তোদের জামগোড়েয় ডাঁর (দাঁড়=ছিপ) ফেলো রম্ভা (কলা) তলায় বসে। তু আমার সাথে থাকবি নাইলে আমাকে একা কেউ দেখলে বকবে-- ডাঁর ফেলতে দেবে না। দাঁড়া একটু, আমি কুঁচে (কোচা) গুড়ি ডাঁর লিয়ে আসি। পালবি না, খবরদার। তাইলে এমন ধরা ধরবো। তখন বুঝবি মজা য্যামন সিন্দুকে ভরনো।’
‘সিন্দুকে ভরবে? তোমাদের সিন্দুক আছে?’
‘নাই আবার, কি মনে করিম কি তোরা। এ্যাই, ম্যালা মাউরি বকাবি না- চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক। আমি যাবো আর আসবো। বাড়ির দিকে দস্যির মতো ছুটলো।
কলাতলায় বসে ছিপটা ফেলেই নেড়ি আমাকে বললে। দু, একটা ট্যালাকাঠি (দেশেলাই) আনতে পারিস? যা তো-- একটা ট্যানাকাঠি নিয়ে আয়।
‘ট্যালাকাঠি নিয়ে কি করবে?
‘কি করবো? এও আন তাপ্পর দেখবি কি করবো। কলাগাছের শুকনো পাতাগুলো ঝুলছে-- ওতে আগুন দেব। দেখবি কি রকম করে জ্বলবে।’
‘না, না না, ওরি বাবারে-- জামুরের ঘরের চালে লাগবে তারপর সারা পাড়া-- আমি বাড়িতে যাই। তুমি মাছ ধর।’ নেড়ি হি-হি করে হাসতে হাসতে বলে, এই, যেথিস কোথা? ইদিকে আয়। শোন শোন-- আগুন লাগবো, ক্ষেপেচিস লিকিন তু?’ ছিপ টিপ, ফেলে ছুটে এসে আমাকে ধরে। আচ্ছা বেশ তোকে ট্যালাকাঠি আনতে হবে না-- একটু বদনা লিয়ে আয়গা যা আর ঐ সথে সরাই চোখ এড়িয়ে একটো ট্যালাকাঠির বাক্স শুদ্ধ আনবি-বাস যা।’
‘ট্যালাকাঠি জ্বালিয়ে কি করবে আগে বলো।’ একটা ছোট্ট জিনিস জ্বালিয়ে মজা করবো।’
‘ঠিক তো?’
‘একদম ঠিক।’
আমি মন ভারি করে বাড়ির দিকে গিয়ে রান্নার চালায় ঢুকলাম। মা চাচিরা খুব ব্যস্ত, ফুপু এখন এখানে নেই আমি শেষপর্যন্ত সবারই চোখ এড়িয়ে তাক থেকে দেশেলাই বাক্স চুরি করতে পারলাম চুলোর পাশে এবং একটা বদনাও ছিল।
সক্ষম হলাম। প্রায় ছুটতে ছুটতে উঠোন পাড় হয় খিরকির দরজার পৌঁছলাম। কলাতলায় গিয়ে নেড়ির হাতে ট্যালাকাঠির বাক্সটা ধরিয়ে দিলাম। নেড়ি মহাখুশি হয়ে বললে-- ‘এই তো চাই, চুরিতে বেশ পাকা হাত রে তোর’ বলেই নেড়ি কোঁচড় থেকে একটা বিড়ি বের করে ঠোঁটে চেপে ধরলে তারপর ঠাস করে দেশেলই জ্বালিয়ে বিড়িটাকে ধরালে। তারপর নাক দিয়ে মুখ দিয়ে অনেক ধোঁয়া ছাড়লো বললে, ‘তু বেশ লক্ষ্মী। -- তা আয় একটা টান দে।’ ইতিমধ্যে একটা মাগুর উঠলো ছিপে তাকে বঁড়শি থেকে খুলে বদনার ভিতর চালান করে দিলে।
‘আয়, লে টান দে।’
আমি ভয়ে ভয়ে বলি, ‘আমি কখনো খাই নাই তো তুমি খাও।’
‘এ্যাই, খেতে হবে-- যা বলছি কর, নাইলে এমন ধরা ধরব... আর বলতে হয় না। আমি ভয়ে ভয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে বিড়িটা নিয়ে ঠোঁঠে লাগিয়ে টানবার চেষ্টা করতেই সাঁৎ করে খানিকটা ধোঁয়া গলার মধ্য ঢুকে গিয়ে এমন একটা কাশির না বমির দমক এল যে কিছু বোঝবার আগেই কেশে নাকমুখ বন্ধ হয়ে বোধহয় চোখ উল্টিয়ে গেছিল। নেড়ি নিজেই তখন শশব্যস্ত হয়ে আমাকে কোলে টেনে নেয় এবং মাথায় চাপড় দিতে থাকে। আমি কিছটা কফ উগরে একটু সামলে উঠতেই কিক্্ কিক্্ করে হাসি শুনতে পেলাম। নেড়ি বলছে তখন-- ‘বিড়িতে একটো টান দিয়ে কি করচে দ্যাখ দিকিনি’-- ঘি-ঘি ঘি-- হাসি থামছে না।
‘এখন চুপ করে আমার পাশে বসে মাছ ধরা দ্যাখ। এখানে মনে হয় সবই মাগুর মাছ। খুব গিচে রে। ঐ দ্যাক, আমার কলকাঠি ডুবল।’ কথা শেষ করবার আগেই ঘ্যাঁচ করে টান দিতেই একটা মাগুর তুললে। এরপর টপাটপ মাছে উঠতে লাগলে ছিপে। আসলে এই দুপুর রোদে কলাগাছের ছায়ায়, ঠান্ডায় মাছেরা বোধহয় জড়ো হয়ছে। নেড়ি এখন কোনো কথা বলে না সে বেশ উৎফুল্ল-- আপন মনে মাছ ধরে। এক সময় আকাশপানে তাকিয়ে সূর্য দেখার চেষ্টা করলে তারপর বললে, ‘আজ আর লয়, দোপর পেরিয়ে খেতে লেগেছে। চ, এইবার উঠি।’ সে ছিপের সূতো গুটিয়ে উঠে পড়লো। ঘাটের মাথায় দাঁড়িয়ে বললে।
‘লে বদনা থেকে মাছগুলো পল, ক’টা মাছ ধরা পড়লে দ্যাখ। চক, দুই, তিন চার-- এগারোটা। তুই ছটা লে আমাকে পাঁচটা দে।’
‘তা কেন? তুমি সবটাই নিয়ে যাও, আমি নেব ক্যানে?
‘এ্যাই ম্যালা মাইরি বকানি না, দোপর পেরিয়ে যেচে, যা বলি তাই কর-- আমাকে পাঁচটা আমার কাপড়ের খুঁটি বেঁধে দে; আর তু ছটা লিয়ে যা।’
‘তাহলে তুমি ছটা নাও, আমাকে পাঁচটা দাও।’ গেল গেল সাদা চোখদুটো কটকটিয়ে আমার দিকে তুললে, যা বললম তা করলি। না ধরবো তোকে?’ আমি সভয়ে পাঁচটা মাছ তার কাপড়ের খুঁটে বেঁধে দিয়ে তার মুখের দিকে তাকাতেই কি বললে জানো? তোদের পুকুরের মাছ তো, ইটো ল্যাজ্জো হয় যে তোকে বেশিটা দেয়া। ‘আজ তাহলে এই পর্যন্ত-- বুঝলি?’ পাঁচটা মাছ নিয়ে বাড়ির রাস্তায় খটখটিয়ে দৌড়ুল। এইবার আমি পড়লাম মহামুশকিলে। মাছগুলো আমি এখন কি করবো? রান্নাঘরে মাছ রাখলেই কি যে হয় আবার কে জানে। ভয়ে ভয়ে একটা ঝাকুড়িতে মাছগুলো ঢালতেই বড় চাচি বললে, ‘অ, তুমি তাইলে এতক্ষণ এই করছিলে? তা বেশ করেচো, মাছ ধরেচো। এখন তোমার বাপ জানতে না পারলে হয়-- বিটিছেলের মাছধরা।’
আমার মুখ শুকিয়ে চামচিকি-- আমি কি করব? নেড়ি যদি সত্যি সত্যি ধরে সিন্দুকে ভরে-- তখন কি হবে?
এইবার নেড়ি-সংবাদ শেষ করি। গত হয়ে গেছে বছর। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের খুলনায় এসে সাক্ষাৎ পেলাম আর এক রকমের নেড়ির। এখন সেই কথাটা বলি-- আমাদের বড় বউমা নতুন মেয়েটাকে দেখে বলে, ‘তোমার নাম কি?’ ঝটপট উত্তর, নাম নিয়া কি করবা? কারো বিটি কইর্যা ডাকবা।’
তাই আবার হয় নাকি?-- তোকে সবাই কি বলে ডাকে? তোর মা বাপ তোর নাম রাখেনি?’
আমার মা বাপেরে আমি দেহিছি নাহি? চাচার বাড়িতি মানুষ হইছি। চাচি মোরে হতচ্ছাড়ি কইরা ডাকতো। গাঁয়ের লোকেরাও তাই কইতো।’
‘এ আবার কি জিনিস এসে জুটলোরে বাবা?’
বউমা আর কিছু না বলে বললে, ‘তুই এখন ঐ কলঘরে যা। না ধুয়ে আয়, ভাত খা তারপর তোর সব কথা শুনব। বাড়ির কাজ কাম সব করতে পারবি তো?’
‘বাড়ির কি কাম। আমি তো বাড়ির কাম কখনো করিনি।’
‘ওমা, তবে করতিস কি-- এতবড় ধাড়ি মেয়ে তুই?’
‘মাঠে গরু চড়াইতাম, চাচার ছেলে নাই।’ ‘কী-কী বললি, মাঠে গরু চড়াই-তিস আর এখন তুই বাড়ির কাজ করতে আসছিস?’
‘শিখায়া নিবা-- সব পারবো পারবা নে।’
‘বলে কি?’ বউমা একটু চেঁচিয়ে ওঠে।’
‘চিল্লিয়ান ক্যান? আমার বুদ্ধি আছে, আমি ঠিক শিখি নিতে পারবা নে।’
বউমা এবার হেসে বলে, আচ্ছা, সে দেখা যাবে, এখন গা ধুয়ে একটু পরিষ্কার হয়ে আয়।’
মেয়েটি কলতলার দিকে চলে গেল।
একটু পরেই কল চাপার শব্দ শোনা গেল। -- মনে হলো কলটা ভেঙ পড়বে কারণ হ্যাচাং হ্যাচাং শব্দটা এমন দ্রুত এবং জোরালা যে বাড়ির যে সেখানে ছিল সেখান থকে কলতলায় ছুটে এল-- দেখল যে একটা মেয়ে কলটিপে পানি তুলছে। বালতি ছাপিয়ে ফ্যানা আর পানি গড়িয়ে পড়ছে চারপাশে তবু কলচাপা থামছে না। বাড়ির কাজের বড় ছেলেটা ‘কে রে তুই, থাক, বালতি ভরে গেছে দেখতে পাসনি ‘হ্যাচাং হ্যাচাং করে এত জোরে কেউ টিউকল চাপে?’ মেয়েটি মুখফিরিয়ে একবার তাকাল তারপর বললে, ‘দ্যাকতিছো না, গা ধুতি হবে, তা পানি না হলি গা ধোয়া যায়?’
‘তুই কেরে-- ট্যাকোঁর ট্যাকোর করি কথা কয়?’ ‘কও কি তুমি? আমার কথা তোমার খারাপ লাগলি তুমি যাত দিনি এহান থেহে? আমি গা ধোবো।’ বউমা গলা তুলে বলে রান্নাঘর থেকে, ‘এই রেজাক, ওকে কিছু বলবার দরকার নাই, গাঁয়ের সরল মেয়ে এসেছে কাজ করতে-- শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়ে রাখতে পারলে-- থাকবে। তোরা এখন যা তো এখান থেকে। সবাই চলে গেলে তার গা ধোয়া শুরু হলো। ভরা বালতি দুহাত দিয়ে মাথার ওপর তুলে দড়াম করে হড়াম করে সব পানিটা মাথায় ঢেলে দিয়ে চোক পিটপিট করে তাকালো তারপর আর এক বালতি পানি নিয়ে ঐ একই পদ্ধতিতে হড়াম করে মাথায় ঢেলে দিলে। তারপর ঘেরা জায়গায় ঢুকে কোন রকমে গা মুছে শাড়ি জড়ালো গায়ে। কানের মাঝে ধুলোর ভেজা আস্তরণ লেগে রইলো, রইলো নাকের। কানের পাশের ধুলোময়লা চুল আলুঝালু-- টপ টপ করে পানি পড়ছে চুল থেকে। কিরে তুই গাধুলি তা গা ঘষলি না? যেখানকার ময়লা সেখানেই ভিজে দাঁড়িয়ে রইলো, চুল থেকে পানি ঝরছে-- ভালো করে মোছ।’ বলতেই সে বললে, আমার দিকি তোমার এত দেখা লাগে না, ভাত দ্যাও দিনি, খিদা লাগছে।’ তারপর সে শাড়ির আঁচলটা দিয়ে মাথায় দু একবার ঘষে নিলে।
‘ঐ পিঁড়িখানা নিয়ে বোস।’
তার ভাত খাওয়া দেখলে যে কারুর মনে হবে-- এমন করেও খাওয় যায়! মুখে ভাত দিয়েই সে কোঁৎ করে গিলে দিচ্ছে না চিবিয়ে। তারপর তরকারি চিবুতে লাগলো-- তা মনে হচ্ছে ছাগলে পাকুরপাতা খাচ্ছে।
‘এই ভালো করে আস্তে আস্তে খা, ও রকম করে কেউ খায় নাকি?
তাড়াতাড়ি খাতি হলি এইরাম করেই তো খাতি হয়।’
‘তোকে তো আমরা তাড়াতাড়ি খেতে বলিনি। থাকগে, খা আস্তে আস্তে।’
রাতের বেলায় চুলোয় ভাত, ফুটছে। বউমা বললে এই, ভাতটা হয়েছে নাকি দেখতো।’
‘কি করে দ্যাখপো? গরমে হাত পড়বে না নে?’ ‘ভাত দেখতে হাত পুড়বে কেন? এই দেখ, এমনি করে ভাত টিপে দেখতে হয়।’ বউ মা লাকুড়ির ডগায় ক’টা ভাত তুলে টিপে দেখায়।’ ভাত তো হয়ে গেছে এখন মাড় গালতে হবে। আয় তো তোকে দেখিয়ে দি। এইনে ধরুনীর কাপড়। জ্বাল কমিয়ে দে। দুপাশে এই এমনি করে ধর। তারপর হাঁড়িটা এইখানে রাখ, এবার ঢাকনাটা হাঁড়ির মুখে রাখ তারপর এই এমনি করে ধরে ভাতের হাঁড়ি আস্তে আস্তে নীচু কর এই মাটির গামলাটার ওপর। পারবি তো?’ ‘তুমি দেখায়ে দিলে তা পারবো না কেন? দ্যাত আমাকে’-- বলে অনায়াসে ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ি মাড় গালবার জায়গায় বসালে তারপর ঢাকনাটা হাঁড়ির মুখে ঢাকা দিয়ে হাঁড়ি কাত করেছে এমনি মাড় সমেত ভাত হড়হড় করে পড়তে লাগলো।
‘কি রে, ঢাকনাটা টাইট করে... বলতে না বলতে হাঁড়িসমেত ভাত উপুড় হলো মাড়ের গামলায় এবং গামলা ছাপিয়ে মেঝোয় গড়াতে লাগল আর মেয়েটা দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে বলতে লাগলো--‘আমারে করতি দিলা ক্যান, আমি কি কখনো ভাত রাঁধিছি? আমি তো কয়েছি আমি মাঠে চাচার গরু চড়াতাম-- চাচার পুত নাই তো।’
বউমা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তাছাড়া তখন আর কিই বা করার ছিল!
পরের দিন সকালে বউমা মেয়েটাকে ডেকে বললে, ‘যা তো আমার ঘরটা একটু ঝাঁটমাট দিয়ে আয়, ওটাতো পারবি?’ ‘তা পারবো। চাচার গোয়াল ঝাঁট দিয়ে পোশকার করতাম না? ঘর ঝাঁট দিতে খুব পারব নে।’ সে ঘরে ঢুকল। বউমা রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে ফিরে এসে তার ঘরে একবার উঁকি দিয়েই আঁৎকে উঠলো-- ও কি করিছিস তুই? এটা আমার ঘর, না পাগলের মাথা? একি জিনিসপত্র হলুস্থুল করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে করছিস কি তুই?’
নতুন কাজের মেয়েটাও সমান গলা তুলে বললে, চেঁচাতিছো ক্যান? ঝাঁট দিতি কয়েছো তা ঝাঁটই তো দিতেছি-- জিনিস নড়াচড়া না করলি ঘর পোষ্কার হবি কি করি?’
তাবলে তুই আমার ড্রেসিং টেবিলের টুল উল্টিয়ে চারপা উপরে তুলে-- তারপর স্যুটকেসের ওপর থেকে ফাইল, খাতাপত্র নামাবি? শিগগির যেখানকার জিনিস যেখান ছিল তেমনি করে রাখ। ‘উরিবয়সে আমি পারবো না নে। ওসব তুমি গুছোয়ে নেবা। সারাদিন তুমি রান্না ছাড়া আর তো কিছুই কর না। সারাদিন তুমি করবা টা কি? ‘এ মা, এ বলে কি? তোর আস্পদ্দা তো কম নয়।’ ‘ল্যাজ্য কথা ক’লি তোমাগির আখ হয়।’
বউমা একেবারে বোকা বনে গিয়ে হ্যাঁ করে তাকিয়ে থাকে।-- তারপর ভাবে-- এ কাজের মেয়ে না কেরে বাবা। এখন একে বাড়ি থেকে বের করবো কি করে? এ মেয়ে রাখা যাবে না। কিন্তু মেয়েটাকে দেখে যে মনে হয় গাঁয়ের সহজ-সরল মেয়ে-- অন্য রকম। কেমন মায়াও লাগে!
বউ সরে আসে-- যা করছে করুক গে। পরে ওকে দিয়েই ঠিকঠাক করে নেব। ও তো বলেই দিয়েছে শিখিয়ে দিলে পারবে। খানিক পরে বউমা তাকে কাছে ডাকে-- ‘এই তোকে কি বলে ডাকবো? তোর নামটা বল।
‘বলিলাম না ত্যাকোন? হাতচ্ছাড়ি।’
‘এতো ভারি মুসকিল দেখি। আচ্ছা, আমরা তোকে সাদেকা বলে ডাকবো।’
‘না না না ছাদেকা মাদেকা না। ঠিক আছে, রানি কয়্যা ডাকবা? ‘ও বাব্বা হতচ্ছাড়ি থেকে একেবারে রানি? তুই বলছিস? ঠিক আছে তাই ডাকব এখন থেকে। যেমন করে তোকে সব কাজ শেখাব তেমনি করে কাজ করবি তো শিখবি তো মন দিয়ে?
‘হ্যাঁ, তা আবার শিখবো না? না শিখলি চলবি? তোমরা খাতি দেবা, পরতি দেবা তা কাজ কাম না করলি হবে কি করি? শিখব, শিখব সব শিখব।’
তিনদিন হলো মেয়েটা আছে। দেখিয়ে দিলেও কোনো কাজই সে ঠিকমতো ধরতে পারে না। বোঝা যায় সে ছোটবেলা থেকে এসব কাজ করে তো নাই-ই মনে হয় এসব কাজের সঙ্গে পরিচয়ও নাই। এমন আনাড়ি। একদিন বললে, তুমাগির গোয়াল-বাড়ি ক’নে, সে বুঝি অনেকদূরে, সেহানে রাখাল বাগাল রাহিছো না? আমারে সেহানে কাজে পাঠাও না-- দেখবা কেমন যত্ন করি গোয়াল পোষ্কার করি-- গরুদিন যত্ন করি। তাই দ্যাও।
এ মেয়ে বলে কি? বোধ হয় তার সরলতা সবারই মন কেড়েছে। বউমা হালছাড়ে না। বলে, ‘ঠিক আছে, আমার সাথে রান্নাঘরে চল, একটা শক্তির কাজ করে দে।’
মহাখুশি হয়ে রানি বললে, ‘সেই ভালো, চল শক্তি লাগে এমন কাজ আমি খুব করতে পারি।’
রান্নাঘরের বারান্দায় রাখা পাটার ওপর গরুর গোস্তের বড় একটা টুকরো রেখে বউমা বললে, গোস্তটা একটু থেঁতলে দে তো নোড়া দিয়ে।’
‘দিতিছি’ বলে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা কোমড়ে জড়িয়ে নোড়াটা দু’হাতে মাথার ওপর তুলে নিচু হয়ে দিলে একখান বাড়ি। গোস্তটা ছিটকে গ্রিলের ফাঁক গলে চারুতলার নিচে নর্দমা দেখতে গেল আর পাটাখানা মাঝখান বরাবর দুখানা আর রানি তাই দেখে ঘে ঘে করে হাসছে আর বলছে ‘কাণ্ড দেহিছো ভাবী? হে-হে- দ্যাহো কাণ্ড।’
বউমা কাজটা করতে দিয়ে ঘরের ভিতর আর একটা রান্নার সরঞ্জাম করছিল। ব্যাপারটা দেখে হঠাৎ বলে উঠলো-- এ্যাই, তুই এক্ষুনি বেরো বাড়ি থেকে।’ রাগে তার মুখখানি টকটকে লাল।-- ‘বেরুলি? তোকে আর আমার লাগবে না।’
রানি তখনো খিক খিক করে হাসছে আর বলছে ‘আমার কি দোষ? তুমিই না বললে শক্তির কাজ। তা শক্তির কাজ করতি গেলি ও রকম তো একটু হতেই পারে। আগ করতিছো ক্যান?
বউমা বললে, তোকে দরকার নেই আমার। তোর ব্যাগ নিয়ে তুই বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে। বাপরে, বাপ আপদ ঝুটেছে বটে।’
সত্যি তুমি আমারে চলি যাতি কচ্ছো?’
হ্যাঁ, হ্যাঁ ক’বার বলবো?’
হট হট হেঁটে গিয়ে রানি ব্যাগ হাতে এসে দাঁড়াল।
‘ব্যাগ খোল দেখব।’
হ্যাথো, নিইলাম দুতিন খানা জিনিস তা তুমি এ্যাকোন দিলি দাও, না দিলি কাড়ি রাখো।’
ব্যাগ থেকে বেরুলো একবার মাত্র ব্যবহার করা দামি একখানা মনিপুরী শাড়ি, জামদানি-ওড়না আর অ.ঈ চালাবার রিমোট কন্ট্রোল করার ছোট প্লাস্টিকের যন্ত্রখানা। বউমা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলো ‘তুই চোরও।’
‘চুরি করলাম কই? ঐখানে ঝুলতিছিলো আমি সকলের সামনেই তো ভাঁজ করে আমার ব্যাগে ভরিলাম, কেই তো কিছু কয় নাই। তবে হ্যাঁ, মোবাইলখান আমি বসার ঘরে পাইছি, কেউ ব্যবহার করে না দেখি ভাবিলাম আমার তো মোবাইল নাই তাই এখানা নিইছি। তা তুমি কাড়িনে রাখো না নিজির ঘরে, আমি যাতিছি।’ তারপর গলা নরম করে বলে, মোবাইলখানা আমারে দেবা, না শাড়ি রাখবা?
‘ওটা মোবাইল না। দাঁড়া’ বলে বউমা ঘরে ঢুকে একখানা দামি রঙিন শাড়ি তার ব্যাগে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘যা এখন।’
ব্যাগ ঘাড়ে গট গটিয়ে হেঁটে প্রায় রানির মতোই সে বেরিয়ে গেল।
বউমা তার রেখে যাওয়া জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। চোখে তার টলটলে জল।


0 মন্তব্যসমূহ