অনুবাদ : বিপ্লব বিশ্বাস

প্যাচপেচে গরমে বেঞ্চের ওপরের সমস্ত ফুলন্ত চারা অবিরাম নেতিয়ে পড়ল। তারা এই বুঝে দিনভর সেইসব চারাগাছের গোড়ায় জল দেয়নি যে রোদ- পোড়া জল শেকড়ের ক্ষতিই করবে শুধু। তারা একে অপরকে দারুণভাবে বোঝাতে চেষ্টা করল যে খসে পড়া ফুলেরও একান্ত নিজস্ব সৌন্দর্য আছে; কিন্তু ভিতর ভিতর তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, আশা করল, কেউ না কেউ এসে বুদ্ধি দেবে কীভাবে গা-জ্বলা রোদের হাত থেকে টবে রাখা ফুলগুলিকে বাঁচানো যায়।

‘আমি আর ও সবের ধার ধারি না। এই চারাগুলো বহু বছর আছে, সে সব থেকে প্রচুর বীজও পাওয়া গেছে।’

‘শোনো, তোমাকে বলি, তুমি যে বীজগুলি দিয়েছিলে তা থেকে আমার ওখানে আলাদা রঙের ফুল ফুটেছে ; আর কখনোই তাদের রং পালটায়নি।’

গলিপথের বুড়িরা তাদের বালতি সব জলে ভরার আগেই সূর্য ডোবার অপেক্ষা করছিল। প্রথমে তারা ডাবু হাতা দিয়ে জল তুলে গরম বেঞ্চের ওপর ও পরে চারাগাছগুলির গোড়ায় ঢালছিল। নেতিয়ে পড়া ফুলগুলো জড়ো করা মৃত্যুবাস ছাড়ছিল যা ওপরপানে উঠে বাতাস ভেদ করছিল, সঙ্গে ছিল গরম জলের গন্ধ।

প্রত্যেকেই কেমন যেন ধোঁকা খেয়ে গেল কেননা বুড়িরা তাদের টবের চারাগুলো গরমে ভাজাভাজা হচ্ছিল বলে খুবই কাতর হয়ে ছিল, আবার তাদের বাঁচানোর জন্য কোনও উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না বলে ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছিল। অল্পবয়সীরা যুক্তি দিল, হয় চারাগুলোকে ঘরের ভিতর কোনও ছায়াঘেরা মাটির প্রবেশপথে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হোক কিংবা ওগুলিকে পর্দার আড়ালে রাখা হোক; কিন্তু মনে হল না, বুড়িদের কেউ এই পরামর্শ নিতে প্রস্তুত। তাদের যুক্তি হল, পথচলতি মানুষেরা ফুলদল দেখে যদি বাহবাই দিতে না পারল তাহলে ফুলগাছ রেখে কী লাভ!

‘এতে ভালো কিছু হবে না, আর এই রোদের তাপকেও এড়ানো যাবে না।’

‘এমনকি ফুলদানিতেও কেটে কেটে রাখা যাবে না। ওদের আয়ু ফুরিয়ে আসছে।’

ছায়াতে বসে বুড়িরা নিজেদের মধ্যে গল্পগাছা করছিল আর এ ওর পানে তাকিয়ে মাথা নাড়ছিল যেন তপ্ত-শাদা রোদের তেজে নেতিয়ে পড়া ফুলেদের দেখে তারা বেশ মজা পাচ্ছিল।

এই তাপপ্রবাহ চলাকালীন মাঝামাঝি সময়ে গলিপথের কোণের বাড়িটাকে পুরো ধ্বংস করে রাস্তা চওড়া করার পরিকল্পিত কাজ শুরু হল। ওই বাড়িটার আশপাশেই বুড়িরা বাস করত।

এই প্রকল্পের বিষয়ে গুজব ছড়াচ্ছিল বেশ কিছুদিন থেকেই কিন্তু ওই বাড়ির বাসিন্দারা যখন জানল, সরকারি তরফে এই কাজ নির্দিষ্ট হয়ে গেছে এবং এতে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা ঘনঘন আলোচনায় বসতে লাগল। তখনও পর্যন্ত বুড়িরা জানে না এই বাড়ি ধসিয়ে ফেলার পরিবর্তে সেখানকার বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তারা শুধু এটুকুই জানত, এই প্রকল্পের কাজ কোণের ওই বাড়িটা থেকে এগিয়ে তারা যেখানে থাকে প্রায় সেই অবধি যাবে। প্রথমেই একটা জান্তব খনক এসে বাড়িটির দেওয়াল থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত কামড়ে ধরবে ও তাকে কাঁপিয়ে গুঁড়িয়ে দেবে ; তারপর একটা বুলডোজার এসে সেই বাড়ির ভগ্নাবশেষ সব চেঁছেপুঁছে নিয়ে যাবে। যেহেতু সভায় বসে অল্পবয়সীরা সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করছিল, বুড়িদের তাই অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। ভাঙা বাড়িটা থেকে ধুলোবৃষ্টি ছড়িয়ে পড়লে তারা ন্যাকড়াকানি জলে ভিজিয়ে একে একে গাছের পাতাগুলো মুছে দিচ্ছিল।

কোণের বাড়িটার ভগ্নদশা এমন পর্যায়েই পৌঁছেছিল যে কর্মরত লোকেরা যদি মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে তাকে গায়ের জোরে টানত তবে এমনিতেই তা ভেঙে পড়ত। ওইসব দানবীয় লোহা-ইস্পাতের যন্ত্রপাতি এনে এমন হইচই ফেলে দেবার দরকারই হত না। দেওয়ালগুলো তো এই পড়ে কি সেই পড়ে যেন তাদের ভিতরে সব মোটা মোটা ছ্যাঁদা হয়ে গেছে; ছাদটাও মাঝখানে ঝুলে পড়েছে, যেন নিজের ভারই আর বইতে পারছে না। বাড়িটা আদ্দিকালের। একমাত্র ওই বুড়িরাই স্মরণ করতে পারে, ওই বাড়ির ছাদ সেই সময়ে তৈরি যখন মিউচুয়াল ক্রেডিট ইউনিয়ন নতুন টালির ছাদ করার জন্য অর্থসাহায্য দিয়েছিল।

তার আগে বাড়িটার ছাদ ছিল দেবদারু গাছের শক্ত ছাল দিয়ে ছাওয়া। প্রাচীন কালে যখন এই অঞ্চলে প্রচুর কাঠ পাওয়া যেত তখন একজোড়া ছাদ- টালির দামে প্রচুর পরিমাণে দেবদারু গাছের ছাল পাওয়া যেত। শুধু হাতের নাগালে পাওয়া উপাদানের যথাযথ ব্যবহার জানতে হত। কাঠের সঙ্গে গাছের ছালের টুকরোগুলিকে মাঝখান দিয়ে সেলাই করে দেওয়া হত আর কাঠ যখন বুড়িয়ে খুলে যেত তখন শিশুর মাথার আকারের আলগা পাথর দিয়ে বেঁধে তাকে ধরে রাখা হত। এই কোণের বাড়িটাও তেমনই দেখতে লাগত।

সেই সময়ের মধ্যে বাজারে সস্তার টালি এসে গেছে আর পাহাড় থেকে কাঠের গুঁড়ি আসাও বন্ধ হয়ে গেছে; ছাল কদাচিৎ পাওয়া যায় আর পেলেও তা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। কেউ একজন ছাদে টালি লাগানোর পরামর্শ দিয়েছিল, তার দাবি ছিল তাতে ছাদ বেশ সুন্দর দেখায়। স্থানীয় বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে একটি ক্রেডিট ইউনিয়ন স্থাপন করল কেননা কেউই নিজেদের সামর্থ্যে বাড়ির ছাদে টালি বসাতে পারত না।

ঘটনাচক্রে এদেরই একজন যে এই ক্রেডিট ইউনিয়ন থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছিল সে-ই ওই কোণের বাড়িটার দখলদার। সে ছাদের দেবদারু গাছের ছাল পালটে টালি বসিয়েছিল। বছরকয় বাদে ছাদ ধসতে শুরু করল কেননা ওই ছাদ দেবদারু গাছের ছালের পক্ষেই ঠিক ছিল আর যা অতিরিক্ত ওজন সইতে পারল না। টালিগুলো ছাদের এখান ওখান থেকে খসে পড়ল, মাড়ি থেকে দাঁত পড়ে যাওয়ার মতো ফাঁক তৈরি করল; আর অন্যান্য জায়গায় যেখানে টালি সব ঢিলেঢালা হচ্ছিল সেখানে পাখিরা বাসা বাঁধছিল ও ঘাস গজাচ্ছিল। এক সময় বাড়িটিতে কেউই আর বাস করত না, তাতে করে ভেঙে পড়া ত্বরান্বিত হল। খনক-দাঁতের এক দুটি কামড়ানিতেই বাড়িটি নিজের ওপরেই ধসে পড়ল, চুপিসারে, যেন আঘাতের অপেক্ষাতেই ছিল এতদিন।

এমনকি যদিও বাড়িটা একটা খোল বই কিছু ছিল না, প্রত্যেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল একে গুঁড়িয়ে দিলে ধুলো আর ঝুলকালির মেঘ ঘনিয়ে আসবে যেহেতু বাড়িটা দীর্ঘকাল ওই কোণটিতে খাড়িয়ে ছিল। কিন্তু তা এমনভাবেই ভেঙে পড়ল, মনে হল যেন বাড়িটা কোনওকালেই সেখানে ছিল না।

আর একবার যখন ওই বাড়ি ধূলিসাৎ হয়ে গেল, যথেষ্ট খুলে গেল আটকে থাকা দৃষ্টিপথও। একটা আবর্জনা বইবার গাড়ি ওই জায়গায় আগুপিছু করতে লাগল - বাতিল তক্তা-টক্তা, কাঠের খাম্বা বয়ে নিয়ে যেতে লাগল দাহনযন্ত্রের কাছে, পোড়াবার জন্য। তারপর কর্মীরা যখন উঁচু- নিচু মাটিসব সমান করতে শুরু করল তখনই একটা গুজব ছড়াল : বাড়িটার গোপন ভাঁড়ার ঘরের মাটির মেঝেতে সম্ভবত এক বিশাল আলু গুদামের গর্তে পরিষ্কার একটা মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে। মনে হল রোদের তীব্রতার মাঝে এই গুজবের বুড়বুড়ি উঠছে। যারা এটা রটাল আর যাদের কানে গেল, উভয়েই চুপ মেরে থাকল। কেউই পুলিশ ডাকল না। তারা কঙ্কালকে ওই গর্তেই রেখে কর্মীদের বলল তারা যেন মাটি দিয়ে জায়গাটা ভরাট করে বুলডোজার চালিয়ে সমান করে দেয়। যাই হোক, কঙ্কালের হাড়গোড় বেশ পুরনো। আর যেহেতু ওই ভাঙাভুঙির কাজের বরাত পেয়েছিল গলিপথেরই একজন, তারা সঠিক জানত, ওই বাড়িতে কী ধরনের লোকজন বাস করত।

পুলিশকে খবর দিয়ে তদন্তের হইচই ফেলে দেওয়ার পরিবর্তে ওই ঠিকাদার জেনে-বুঝে ঠিক করল, ওই কঙ্কালের হাড়গোড় যেমনটি ছিল তেমনি রেখেই জায়গাটা বুজিয়ে দেবে। বুড়িরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিসানি জুড়ে দিল, প্রশ্ন তুলল, শুধু কিছু হাড়গোড় পাওয়া গেছে বলেই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার কোনও মানে হয় না। তার চেয়ে বেশি তাদের যা ভাবনায় ফেলে দিল তা হল এরপর গাছেদের ওপর বাড়তি বিকেলের রোদ পড়ে তাদের আরও ক্ষতি করবে কেননা ওই কোণের বাড়িটার অস্তিত্ব আর না থাকায় ছায়ার আড়াল আর তারা পাবে না।

তার ভাগ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ছড়িয়ে পড়া এক টুকরো কাগজ যেন।

মস্তান জুকিচি মেয়েটিকে দেখেছিল নানটো শহরে যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়। তাদেরই একদল এই আইসে শহরে এসে পড়েছিল যখন তারা দূরবর্তী মিয়াগাওয়া গ্রামে এক কাঠ-গুঁড়ি কাটার শিবিরে কাজ করছিল। সেই শিবিরে সবই জুকিচির মনের মতো চলছিল। টাকাপয়সা ভালোই পেত আর জুয়া খেলেও ভালোই কামিয়েছিল। এখন যখন তার হাতে প্রচুর অর্থ যা জীবনে আগে দেখেনি, তার মনে হল তার নিজস্ব শহুরে বাতাস গোঁয়ারের মতো তাকে ডাকছে যেহেতু তারা পরিযায়ী পাখিদের মতো এক শিবির থেকে আর এক শিবিরে গুঁতো খেয়ে খেয়ে চলছিল।

সে জানত একবার ঘরে ফিরে গেলে করার মতো কিছুই থাকবে না। দিনভর গলিপথের বুড়ির দল বাইরে রোদে বসে বকবক করেই যাবে। হয়তো মাথা খাটিয়ে তারা কোনও কাজে এগোতে চাইবে কিন্তু কখনোই তা পারবে না ; কিংবা অপরের হুকুম-হাকাম শুনে ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসবে। আর কে-ই বা ফালতু ছাগলের বাচ্চাগুলোকে বাইরে নিয়ে যাবে? ছায়ার নিচে বসেও তারা গরমে ফুটতে লাগল, কুত্তাগুলোর পিছনে ধাওয়া করল আর একে অপরের দিকে লাঠি দোলাতে লাগল। শহরটা ছিল এরকমই।

পরবর্তী লগিং শিবিরে যাওয়ার আগে জুকিচি ও অন্যান্যরা মিলে ঠিক করল তারা একটা নৌকা করে আইসের পুরনো বন্দর পেরিয়ে সেই দ্বীপের দিকে যাবে যেখানে পরিবহনকারী জাহাজগুলি অনুকূল বাতাসের অপেক্ষায় নোঙর গেঁড়ে আছে। তারা তখনও নৌকোটি ছাড়ার অপেক্ষায় ছিল যখন জুকিচির নজরে এল কিছু মহিলা আসা যাওয়া করছে, ঠান্ডায় কাঁধ ঝুঁকে পড়েছে আর এই দৃশ্য দেখে নববর্ষের দিনের তার শহরের উৎসবের কথা মনে পড়ে গেল।

সেই রাত্রে বন্ধুরা মিলে যখন মদ্যপানের উদ্দেশে বেরুল, জুকিচির সঙ্গে বন্ধুদের ঝামেলা বেধে গেল। পরদিন সকালে সরাইখানায় তাদেরই একজন বলল, তাদের এই ঝামেলা মিটিয়ে আগের মতো সহজ হওয়া উচিত, কিন্তু জুকিচি মাথা ঢেকে লেপের নিচেই শুয়ে রইল। সে এতটাই সাবলীল বোধ করছিল যে নড়তে চাইছিল না।

‘বন্ধুরা, তোমরা যাও। আমি এখানেই থেকে যাচ্ছি’, সে বলল।

বন্ধুরা তার সঙ্গে রসিকতা করতে চেষ্টা করল, ‘আরে ধুর, চলো তো। তোমাকে ছাড়া বড্ড ভ্যাদভেদে লাগবে।’

এতে জুকিচির নড়ার ইচ্ছা আরও কমে গেল। এক বন্ধু হাল ছেড়ে দিয়েও জুকিচির গা থেকে লেপটা সরিয়ে নিতে গেল, কিন্তু সে লেপের মাথার দিকটা চেপে ধরল আর তক্ষুনি আর একজন পায়ের দিক থেকে লেপটা তুলে ধরল।

‘আরে আয় তো চুতমারানি। এখান থেকে যেতে চাইছ না কেন, বুঝিনি ভেবেছ? গত রাতের বেশ্যা মাগিটাকে খুব মনে ধরেছে,না?’

শ্রমিক বন্ধুরা জুকিচির শরীরের নিচের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে জোর হাসিতে ফেটে পড়ল। শেষ পর্যন্ত তারা ঠাট্টা - ইয়ার্কি বন্ধ করে বেরিয়ে গেল, কোথায় যাচ্ছে তাও বলে গেল: প্রথমে নদীপথে পাহাড়মুখে উঠবে, আর সেখানেও যদি মন না বসে, আরও দূরে মনমতো জায়গার সন্ধান করবে।

দুপুর গড়ালে জুকিচি সরাইখানা ছেড়ে বেরুল, নানটোর ইতিউতি ঘুরে বেড়াতে লাগল। এই শহরের প্রতিটি জিনিসই বেশ ঘরোয়া কিন্তু কেমন যেন আলাদা ধরনের। সে তপ্তদিনের রাস্তার কুকুরের মতো হেঁটেই চলল।

একটি মেয়ে কুয়োর ধারে গামলায় জল নিয়ে কাচা -কাচি করছিল। সেই কুয়োর পাশে অতি বাড়ন্ত ঝোপঝাড়ের মতো এক টুকরো জায়গায় ছোট্ট চন্দ্রমল্লিকার গাছ লম্বাটে হয়ে বেড়ে উঠেছে। মাটিতে ছড়িয়ে জেলেদের লন্ঠন। এক পরিত্যক্ত জেলেদের গ্রামের এ এক শাদামাটা বিকেলের ছবি, কিন্তু মেয়েটি যেভাবে নড়াচড়া করছিল তাতে বেখাপ্পা মনে হল। থেমে গিয়ে জুকিচি মেয়েটির পানে একভাবে তাকিয়ে রইল।

পাছা থেবড়ে বসে সে হাতড়ে পাম্পের হাতল ধরতে চাইছিল। তারপর তা খুঁজে পেয়ে সে দাঁড়িয়ে পাম্প করে কুয়ো থেকে জল তুলতে লাগল। পাইপ বেয়ে জল ওপরে আসছে কি না তা পরখ করার জন্য সে হাত বাড়াল আর তখনই পাম্পের হাতলে চাপ দিয়ে ফের মাটিতে ফেলে দিল।

মেয়েটির মুখশ্রী বেশ মিষ্টি আর তার দেহের কোমল মাংস থেকে নারীসুলভ সুবাস বেরিয়ে আসছিল; কিন্তু সে ছিল অন্ধ।

মেয়েটির এই দশা জুকিচিকে বেশ নাড়িয়ে দিল।

সে তৎক্ষণাৎ তার সঙ্গে কথা বলল আর পাম্পের হাতলটি তুলে তাকে দিল। প্রাথমিকভাবে সে হকচকিয়ে গেল কিন্তু যখন সে বুঝল যে মানুষটি একজন পথচলতি অচেনা যে দয়া করে তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তাকে কোনও আঘাত সে দেবে না, সে তখন থেমে থেমে তার কথা বলতে লাগল।

দুদিন পর জুকিচি মেয়েটিকে নিয়ে নিজের শহরে ফিরল। দীর্ঘকাল যাবৎ কোণের ওই বাড়িটা খালি পড়ে ছিল। এর শেষ দখলদার ছিল কেনকিচি নামের এক নামকরা চোর। একের পর এক পাগলাটে ফন্দি এঁটে সে বাড়ির চেহারাই বদলে দিয়েছিল - এক দেওয়ালে গর্ত খুঁড়ে পালানোর পথ করে রেখেছিল, আবার এক নকল দেওয়ালের পিছনে গোপন গুদামঘর বানিয়ে রেখেছিল। মেয়েটিকে সঙ্গে আনার পর সে বন্ধু আর অনুগামীদের সহায়তায় জায়গাটা আগাগোড়া পরিষ্কার করল।

মেয়েটি বড়ো ঘরের এক কোণে বসেছিল, দেখে মনে হচ্ছিল প্রদর্শন স্ট্যান্ডে লাগানো কোনও পুতুল সম্রাজ্ঞী। সে কান খাড়িয়ে বুঝতে চাইছিল, মস্তান জুকিচির মূল স্বভাবটা যখন সে চারদিকের মজা- খোঁজা যুবকদের চিবুকে টুসকি মেরে হুকুম-হাকাম করছিল। আশপাশে কোনও শব্দ হলে বা কারও গলা শোনা গেলে সে সেদিকেই ঘুরে যাচ্ছিল আর জুকিচি যখন তার সঙ্গে কথা বলল, সে তাকে বলল, ‘আমাকে এটা করতে দাও।’ সেদিন ও পরের দিনগুলিতেও মদে মশগুল হল সব। এভাবে পাঁচটা দিন পেরিয়ে গেলে জুকিচির খেয়াল হল, বাড়িতে সে আর মেয়েটি ছাড়া আর কেউ নেই। তার বোধ হল, মেয়েটার প্রতি সে কখনোই অতিরিক্ত সদয় হতে পারে না। অন্ধকার বাড়িটিতে মেয়েটির মতোই তার চোখও যখন অন্ধ, মেয়েটার শরীরের নরম মাংস আর নির্গত সুবাস তার ভিতরে চাগিয়ে ওঠা কামনাকে প্রশমিত করেছে। মেয়েটির তৃপ্তিদানকারী অমৃতের উৎসে মুখ গুঁজে ও তার নিজের ফুরোনো কামনার স্রোতে মিশে গিয়ে সে মেয়েটির পানে মুখ তুলল যখন মেয়েটি তাকে বুঝিয়ে দিল যে যথেষ্ট হয়েছে। কীভাবে, জুকিচি যখন তা বলতে মেয়েটিকে উসকালো, চোখে না দেখতে পেয়েও সে কি বাঁচতে পারে?

‘ও কিচ্ছু না, সে উত্তরে বলল,‘ আমি এভাবেই জন্মেছি।’

জুকিচি তাকে কামনা করুক, এ ব্যাপারে সে যখন অসহিষ্ণু হয়ে পড়ল, সে তখন নিজে থেকেই এগিয়ে এল। দিনের ভাগে তার দিকে তাকিয়ে থেকেই জুকিচি তৃপ্ত থেকেছে। যেভাবে অন্ধ মেয়েটি চলাফেরা করছিল, জুকিচির মনে হল সে একটা ডানা- ছাঁটা সুন্দর পাখি। যেভাবে মেয়েটি একটা থাম ছুঁয়ে ফেলার আগে অবধি এগোচ্ছিল, তারপর তার কাঠের চটিতে পা গলিয়ে রান্নাঘরের নোংরা মেঝেতে হেঁটে বাসনপত্র ধোবার জন্য বেসিনে যাচ্ছিল কিংবা সে যখন বাড়িটি ঝাঁটঝুট দিয়ে পরিষ্কার করছিল, জুকিচির মনে হচ্ছিল সুন্দর পাখিটি যেন তার সর্বাঙ্গে ঠুকরিয়ে তাকে আনন্দ দিতে চাইছে।

মেয়েটি যখন কোনও থামে ধাক্কা খাচ্ছিল বা সদরদোরে হোঁচট খেয়ে পড়ছিল, তাকে মনে হচ্ছিল খাঁচা বন্দি পাখি যেন ছাঁটা ডানা দিয়ে খাঁচার লোহাবেড়ায় আঘাত করে তার বন্দিদশার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছিল। জুকিচি তখন তাকে চেপে ধরে জানতে চাইছিল, আঘাতে সে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে কি না। যখন মেয়েটির কোনও ক্ষতস্থান থেকে রক্ত গড়াতে দেখল, সে তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে দিল যতক্ষণ না যন্ত্রণা কমে আসে। জুকিচির বাহুবদ্ধ অবস্থায় যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে মেয়েটি উত্তর করত, ‘আমি ঠিক আছি। আমার লাগেনি তেমন।’ জুকিচির সামান্য স্পর্শ বা আলিঙ্গনে সে গভীর তৃপ্তির শ্বাস ফেলত যেন শুধু সেই সব মুহূর্তে সে তার মাত্রাজ্ঞান ভুলতে পারে। জুকিচির বাহুবদ্ধ অবস্থায় উলঙ্গ হলে তার দেহের চামড়ায় ঘামের গুটি ফুটে উঠত, আর জুকিচি তার আনন্দের শীৎকার শুনতে পেত ; তখন তার মনে হত ভিতর থেকে পশুটা বেরিয়ে এসে মেয়েটার সর্বাঙ্গে জান্তব টুসকি মেরে তাকে তছনছ করবেই।

সব সময় জুকিচির প্রচুর বন্ধুবান্ধব থাকত তাই যখন দিনের ভাগে সে আর মেয়েটি একান্তে জড়াজড়ি করে থাকত আর হঠাৎ বন্ধুরা হাজির হত, জুকিচি আরও তাকে জাপটে ধরত, তার অন্ধতার সুযোগ নিয়ে। সুন্দর পালকের গর্বে গর্বিত পাখি - মালিকের মতো জুকিচি মেয়েটিকে নিয়ে জাহির করতে খুবই আগ্রহী ছিল। সে তাকে উলঙ্গ করে নানান ভঙ্গিমায় তার সঙ্গে যৌন সংগম করতে চেপে ধরত, এমনকি তার দুটো পা আর পাছা এমনভাবে তুলে ধরত যাতে বন্ধুরা দেখতে পায়। শুধু দেখে তৃপ্ত না হয়ে বন্ধুরা তাদের নিম্নাঙ্গের দিকে ইশারা করে তাদের সুযোগ দিতে বলত কেননা অন্য কেউ তার সঙ্গে সংগম করছে তা মেয়েটা কীভাবে বুঝবে? জুকিচি কিন্তু তাদের ঘেঁষতে দিত না। মেয়েটি জুকিচির সঙ্গে মিলন রত অবস্থায় কিছুই খেয়াল করত না; কিন্তু পরে সে জিজ্ঞেস করত, ‘কে ওখানে?’ যেন অন্যদের উপস্থিতি সে ক্ষীণভাবে হলেও শুঁকে নিয়েছে। তাকে আরও জাপটে ধরে জুকিচি কানের কাছে ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেছে, ‘ কই, কেউ নেই তো। শুধু আমরাই দুজন।’ যদিও কী ঘটছিল তা ঠিকই অনুমান করেছিল তবুও মেয়েটি মাথা নাড়িয়ে তা মেনে নিয়ে জুকিচির গালের সঙ্গে নিজের গাল চেপে ধরল, মনে হল সে নিবিড় নিরাপত্তা বোধ করছে যখন সে দিনমানের জগতে তার খেয়াল রাখার জন্য জুকিচির ওপর পূর্ণ বিশ্বাসে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। ফিসফাস সোহাগের পর জুকিচি সত্যের দোহাই দিয়ে তাকে বলল, সে জীবনে যত নারী সংসর্গ করেছে তার মধ্যে এ-ই শ্রেষ্ঠ ; সে আরও বলল, অন্ধতা তাকে আপামর নারীদের মাঝে বিশেষ করে তুলেছে। এরপর সে বন্ধুদের আকার - ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয় যে তাদের চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। তারা চলে গেলে একরাশ অন্ধকারের মাঝে জুকিচি যখন বুঝল সে আর মেয়েটি ছাড়া আর কেউ নেই, তার দৃষ্টিই তার কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়াল।

একবার যখন নানটো থেকে আসা এই অন্ধ মেয়েটির সঙ্গে কোণের বাড়িটায় নতুন জীবন শুরু করেছে, জুকিচি আর কখনোই কাজে বেরোয়নি। কাঠ-কাটা শিবির থেকে তার যা আয় হয়েছে আর জুয়া খেলে যে প্রচুর পরিমাণ অর্থ জিতেছে, তা দিয়ে বন্ধুদের জন্য এক লম্বা মস্তি- পার্টি দিয়েছে, ভাত গাঁজানো চোলাই দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করেছে। দিনরাত কোণের বাড়িটা থেকে মদ্যপ যুবাদের চিৎকৃত হল্লা ও ভ্রূক্ষেপহীন যুবতীর কাঁপা কাঁপা অট্টহাসি ঘরের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এক দঙ্গল দুবৃত্ত সামান্যতম কাজকাম না করে মদ-মাতাল হয়ে হুল্লোড় করে কাটানো ওই গলিপথের মানুষজনের কাছে আপদ হয়ে দাঁড়াল।

ওই সময়ের মধ্যে ওই গলিতে এমন কোনও মানুষ ছিল না যে জুকিচির অন্ধ মেয়েটিকে চিনত না। দুঃসহ জীবন সত্ত্বেও মেয়েটা যে ওইভাবে জোর হাসতে পারত তা দেখে সকলে খুবই অবাক হত। তারা বলাবলি করত, মেয়েটি নিশ্চয় জুকিচি সম্পর্কে ছিল উন্মাদ আর জুকিচিও অবশ্যই মেয়েটির সঙ্গে অবিশ্বাস্যরকম ভালো ব্যবহার করত; কিন্তু যখনই জুকিচির এই শাকরেদরা হাজির হত, তারা এক মাইল দূর থেকে ঝামেলা, উৎপাত মালুম করতে পারত। তাই তারা মেয়েটির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপে আগ্রহী হত না।

কার্যত অন্ধ মেয়েটির সঙ্গে আলাপ জমানোর কোনও সুযোগই তারা পেত না। সে যখন কুয়ো থেকে জল নিতে আসত, বা কাচাকাচি করতে, জুকিচি অবধারিত সঙ্গে থাকত, বালতি বা গামলা বয়ে এনে মেয়েটির কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাশে থেকে অপেক্ষা করত। তাদের মনে হত যেন জুকিচি মেয়েটির রোজকার কাজের ভার নিজেই নেবে ; কিন্তু মেয়েটি বাধা দিয়ে বলত, ছেলেদের এইসব কাজ করতে নেই, সে সব সময় নিজে এভাবেই এই সকল কাজ করে এসেছে। শুনে মনে হত, সে গলিপথের স্ত্রী-পুরুষদের রুদ্ধশ্বাস দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকাটা আঁচ করতে পেরেছে।

সে গামলায় জল ভরে সাবানের ফেনা তুলে কাপড়জামা কাচল,তারপর সে সব ধুয়ে চিপে নিল। স্পষ্টভাবে অন্যান্যদের তথা নিজেকে দেখাতে চাইল যে সে জুকিচির রক্ষিতা,একমাত্র তারই। এতে জুকিচির মধ্যে এক অদ্ভুত অস্বস্তি বোধ হতে লাগল। তাকে অনায়াসেই ছুঁতে পারে এমন নিকটে দাঁড়িয়ে সে মেয়েটির প্রতিটি কাজের ওপর ঝুঁকে পড়ছিল। বাস্তবিকই মেয়েটির চেহারায় যেন পুতুল সম্রাজ্ঞীর মুখটি বসানো। সে প্রকৃত সম্ভ্রমের সঙ্গে চলাফেরা করছিল - আর যখন পাম্প করে জল তুলছিল, মৃদু হাঁফাচ্ছিল, তারপর পাছে থেবড়ে বসে ফেনা ভর্তি হাতে কাপড়জামা কাচছিল তখন তার মাঝ থেকে এক কামোদ্দীপক আভাস ফুটে বেরুচ্ছিল। কাছাকাছি কোনও আওয়াজ শুনে মোরগের মতো মাথা ঘুরিয়ে সে কোনওরূপ অন্ধতাজনিত বিষণ্ণতার প্রকাশ ঘটায়নি বরং জুকিচির কাছে অনেক বেশি প্রিয়পাত্রী করে তুলেছে নিজেকে। এ জগতে বেঁচে থাকা যে কোনও দৃষ্টিহীন প্রাণীর চাইতে তার অন্ধতা বিষয়ে বিন্দুমাত্র যন্ত্রণার প্রমাণ সে রাখেনি।

তাকে দেখে দেখে জুকিচি দেহজুড়ে ব্যথা অনুভব করতে থাকে। এটা পরিষ্কার যে মেয়েটির ভাবনাচিন্তা তার থেকে আলাদা। তার সঙ্গে সংসার পাতার কোনও ইচ্ছেই তার নেই। নিজস্ব ঘর ছেড়ে উড়ে এসে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো পরিযায়ী পাখির মতো সে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় সরে সরে গেছে, যেখানে পয়সাকড়ি ভালো মিলেছে সেখানে থিতু হয়েছে, যেখানে তার বন্ধুরা থেকেছে আর সম্ভব হলে, যেখানে সহজেই সে এই মেয়েটির কাছে পৌঁছেছে সেখানেও রয়ে গেছে। তারপর যথেষ্ট টাকাপয়সা জুটে গেলে সে কাজকাম ছেড়ে কিছুই না করে দিন কাটিয়েছে।

গৃহস্থালি বসিয়ে সংসার জমানোর কোনও ইচ্ছা না থাকায় জুকিচি মেয়েটিকে নিয়ে তার নিজের শহরে বাস করতে এসেছিল কেননা তার মধ্যে এক শিকড়হীনতার তাড়না কাজ করছিল; যখনই কোনও একটা কাজ শেষ করত, হাতে ওড়ানোর জন্য বেশ কিছু টাকাপয়সা থাকত আর পরবর্তী কাজের খোঁজে যেত তখনই এই ভাবনা তার ভিতরে বুড়বুড়ি কাটত। কিন্তু একবার যখন এই অন্ধ মেয়েটি তার সঙ্গে জুটে গেল, সে তার মধ্যেকার শেকড়হীনতার ভাবনাকে প্রবল স্বস্তিতে বদলে দিল।

যেভাবে মেয়েটি চলাফেরা করত - অন্ধ দৃষ্টি ঘোরাত, কিছু ছুঁতে হাতদুটো নাড়াত, যেভাবে খাবার হাতড়ে তাকে খেতে দিত - তা সব তাকে ভিতর থেকে জাগিয়ে সরাসরি তার পুরুষত্বকে প্রশ্ন করত ঠিক যখন সে মেয়েটির নগ্ন দেহ স্পর্শ করত। মেয়েটি তার ওপর আস্থা রেখেছিল, আরামে তাকে জড়িয়ে ধরত, আর জুকিচিও তাকে কামনা করত।

তবুও জুকিচির মনে হত, তার টাকাপয়সা ফুরিয়ে গেলে তাদের এই বন্ধনও টুটে যাবে। ডানা ছাঁটা পাখির মতো মেয়েটি ঘরের ভিতরেই থাকে, জুকিচির সঙ্গিনী হিসেবে তার সেবা-টেবা করে, জুকিচির বন্ধুরা এলে তাদের সঙ্গে মেলামেশা করে এবং মদ্যপানের সময় তার জোর হাসিতে আনন্দ ছড়িয়ে রাখে। সেই যুবাদের কথাবার্তা তার কথার সঙ্গে মিলে গিয়ে ঘরের বাইরে উপচে পড়ে - অশুভ আওয়াজে তা গলিপথে ছিটকে নামে। দিন যত পেরোয় জুকিচি আর ওই মেয়েটি উভয়েই বুঝতে পারে তাদের শেষ ঘনিয়ে এসেছে। বন্ধুদের জন্য উন্মত্ত পার্টি দিয়ে জুকিচি জুয়া আর পরিশ্রম থেকে অর্জিত সমস্ত অর্থই ফুরিয়ে ফেলেছে। টাকাপয়সা উড়ে গেলে সে কাঠ কারখানায় যায়, বড়ো বড়ো গুঁড়ি পালা দেওয়ায় কাজে লেগে পড়ে। সেদিন থেকে জুকিচি সারাদিন বাড়ির বাইরে।

গলিপথের বাসিন্দারা লক্ষ করে মেয়েটা একা, কুয়ো থেকে জল তুলে ঘরে নিয়ে যায়, সারাটা পথ জল ছিটোতে ছিটোতে। সেখানকার মহিলারা কুয়োর চারদিকে জড়ো হয়ে প্রচুর নোংরা পোশাক কাচে, তাদের লন্ড্রি ব্যাবসার খাতিরে যখন তারা দেখে, মেয়েটি বালতি এনে তার জামাকাপড় কাচতে লেগে যায়। সে বুঝতে পারে না, এক পড়শি পাশে সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দিয়েছে, নয়তো পাইপ থেকে জল সরাসরি বালতিতে না ফেলতে পেরে সে পড়শিদের গা ভিজিয়ে দেবে।

গলিপথের মহিলারা চুপচাপ তাকে লক্ষ করত। তার সঙ্গে কথা না বলার জন্য একে অপরকে নিষেধ করত, হয় সহানুভূতিতে নয়তো সমালোচনার জন্য। একজন অন্ধ মেয়ের পক্ষে স্বাভাবিক মেয়ের মতো আচরণ করা সম্ভব ছিল না বিশেষত এমন এক জায়গায় যা জন্মসূত্রে তার নিজের নয়।

জুকিচি সন্ধ্যায় ঘরে ফিরল। স্নানের গামলা ভরতে মেয়েটি যথেষ্ট খেটেছে কিন্তু সে জল গরম না করেই রেখে দিয়েছে কেননা তার কথায় আগুনকে তার খুব ভয়। জুকিচি নিজেই জল গরম করে স্নান করল, মেয়েটিকেও স্নান করতে সাহায্য করল। তখন এমন অনুভূতি হচ্ছিল যেন তারা নবদম্পতি। কিন্তু জুকিচি জানত, তার ঝকঝকে পরিষ্কার জামাকাপড় আর রাতের তৈরি খাবার মেয়েটির বিশেষ প্রচেষ্টার ফল। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করলে তার হাতে যথেষ্ট অর্থ আসে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে বুঝতে পারে, তাদের এই নতুন সম্পর্ক টিকবে না।

মেয়েটির অক্লান্ত পরিশ্রমে জুকিচি কষ্ট পেত। অন্ধকার বাড়িটিতে সে তার উৎফুল্ল শীৎকার শুনত আর তাকে এমনভাবে আদর করত যেন তার সামনে হাঁটু মুড়ে পুজো করছে, কিন্তু সে এটাও জানত যে তার ভিতরের মানুষটাও অন্ধ। দুর্ভেদ্য অন্ধকারের মাঝে পাক খেয়ে নেমে এই অন্ধ মানুষটা এক শক্ত পিণ্ডে পরিণত হত যা তাকে জোর করে ওপরপানে ঠেলত, উত্তাপে গলে গিয়ে মিশে যেত। যদি শুধু সে নিজে শারীরিকভাবে অন্ধ হতে পারত, যেভাবে তার আঙুলগুলো, চামড়া ও দুই পায়ের ফাঁকের যন্ত্রটা অন্ধ হয়ে ছিল! অন্ধকার চিরে মেয়েটি জুকিচিকে ঢেকে ফেলে চিৎকার করে উঠল যেন শেষ পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

খুব একটা পরের কথা নয়, গলিপথের বাসিন্দারা জুকিচির অনুপস্থিতিতেও মেয়েটার চিৎকৃত অট্টহাসি শুনতে পেত। কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, ভয়ে ভয়ে তারা দূর থেকে তা লক্ষ রাখত।

সকালে কাজের জন্য বেরিয়ে যাওয়া আর সন্ধ্যায় ফিরে আসা জুকিচি সব সময় যেমন থাকে তেমনই রইল। কিন্তু কেউ তাকে খবর দিল, দিনের ভাগে সে বাড়ি না থাকলে তার বন্ধুরা আসা যাওয়া করছিল। একদিন যখন মেয়েটির কাঁপা কাঁপা গলা বেয়ে উৎফুল্ল শীৎকার বাড়ি থেকে চলকে আসছিল, গলিপথের বাসিন্দারা কান খাড়িয়ে শুনে বুঝতে পারল যে ওই মেয়েই ইন্দ্রিয়সুখের আতিশয্যে চীৎকার করে উঠছিল। সে অবশ্যই তখন জুকিচির বন্ধুদের সঙ্গে সঙ্গমে মত্ত ছিল।

গলিপথের লোকজন কিছু একটা অশুভ আঁচ পাচ্ছিল। কোনও মেয়ে যখন পরপুরুষের সঙ্গে আশনাইতে মাতে, সাধারণত তার পুরুষটি তাকে কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকে। কিন্তু এই অন্ধ মেয়েটির ক্ষেত্রে ধারণা করা যায় যে তার ওপর জোরজবরদস্তি করা হচ্ছিল এমনকি সে একজন স্বেচ্ছাকৃত সঙ্গিনী হলেও। খুব সহজেই একজন লালসালিপ্ত পুরুষ ধাওয়া করে তাকে পেড়ে ফেলতে পারে এবং যেহেতু মেয়েটিকে বেঁধে রাখা বা ছুরি মারার ভয় দেখানো হলে সে পালাতে অক্ষম, মাত্র একটা শব্দেই সেই পুরুষ তাকে আয়ত্তে আনতে পারে। জুকিচি যদি বুঝে ফেলে যে মেয়েটির কোনও নাঙ আছে, সে তাহলে একটা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসবে। মেয়েটির অন্ধতার সুযোগ নিয়ে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য বন্ধুদের সে যারপরনাই ঘৃণা করবে আর তারপর সে কঠোর প্রতিহিংসায় ফেটে পড়বে। দাঁত চেপে, শ্বাস আটকে গলিপথের বাসিন্দারা কখন বিপর্যয় এসে আছড়ে পড়ে সেই অপেক্ষায় থাকল।

এরপর থেকে তারা জুকিচিকে আর সেখানে দেখতে পেল না। সবাই ভাবল, সে নিশ্চয়ই কোনও ভালো কাজের সন্ধান পেয়ে কিছুদিনের জন্য বাইরে গেছে। প্রতিদিন অবধারিতভাবে দুপুরের খানিক পরে ওই বাড়ি থেকে মেয়েটির চিৎকৃত হাসি উপচে পড়ে। সেই সময়কালে বাড়ির পাশে মেয়েটি কিছু ছোটো আকারের চন্দ্রমল্লিকা ফুলের চারা পুঁতেছিল। কোত্থেকে সেগুলো জোগাড় করেছিল, কেউই জানত না। তারা মেয়েটিকে আসলে যা বলতে চাইত তা হল, জুকিচি যখন তার গোপন নাঙের কথা জানতে পেরেছে তখন তার ভয়ংকর পরিণতি ঘনিয়ে আসছে ; কিন্তু তা না বলে তারা বলত, ‘ তমি ফুলগাছ লাগিয়েছ - কী সুন্দর একটি কাজ!’

যারা অ্যাদ্দিন ধরে জুকিচি আর মেয়েটাকে লক্ষ করে এসেছে তারা সম্ভবত এই প্রথম মেয়েটিকে কথাগুলো বলল।

‘আমি তো ওদের রং দেখতে পাই না, তবে ওরা মিষ্টি গন্ধ ছড়ায়।’ কথাটা যে বলেছিল তার দিকে ঘোরার আগে ভুল দিকে তাকিয়ে মেয়েটি উত্তর করল।

জুকিচি আর কখনোই ফিরে আসেনি। মেয়েটার অট্টহাসি অবিরাম বয়ে যেতে থাকল। যখন ছোট্ট চন্দ্রমল্লিকাগুলি পাপড়ি মেলে ফুটে উঠল ও তার সুবাসে গলিপথ ভাসিয়ে দিল,সেখানকার বুড়ি ও অন্যান্যরা অনুযোগ জানাল যে এতে তাদের মাথা ধরে যাচ্ছে ; মনে হচ্ছে তা যেন জুকিচি আর মেয়েটার সঙ্গমের কড়া কটু -বাস।



লেখক পরিচিতিঃ


নাকাগামি কেনজি ( ১৯৪৬ - ১৯৯২) জাপানি উপন্যাসকার ও প্রবন্ধকার। তিনিই প্রথম ও এখনও পর্যন্ত একমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানি লেখক যিনি নিজেকে প্রকাশ্যে বুরাকুমিন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি ছিলেন সহিংস ও বহিষ্কৃত গোষ্ঠীর একজন সদস্য। তাঁর লেখায় পশ্চিম জাপানের বুরাকুমিন সম্প্রদায়ে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামরত পুরুষ ও মহিলাদের তীব্র জীবন - অভিজ্ঞতাকে প্রকটিত করে। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসসমূহের মধ্যে রয়েছে ‘ মিসাকি’ ( দ্য কেপ) যেটি ১৯৭৬ সালে আকুতাগাওয়া পুরস্কার পেয়েছিল, আর আছে ‘ কারেকিনাদা’ ( দ্য সি অফ উইদার্ড ট্রিজ) যা ১৯৭৭ সালে মাইনিচি এবং গেইজুৎসু, উভয় সাহিত্য পুরস্কারই জিতেছিল। গত শতকের আটের দশকে জাপানি সাহিত্য জগতে তিনি ছিলেন এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। একজন সমালোচক বলেছিলেন, নাকাগামি ছিলেন গেটৌ-এর প্রথম লেখক যিনি এই বস্তিজীবনকে মূল ধারায় নিয়ে আসেন এবং অর্থনৈতিক অলৌকিকতার শেষ সম্পর্কে কাল্পনিকভাবে বলার চেষ্টা করেছেন। খ্যাতির শীর্ষে থাকাকালীন মাত্র ছেচল্লিশ বছর বয়সে তিনি কিডনি ক্যানসারে মারা যান। বর্তমান অনূদিত গল্পটি কাঁচা শারীরিকতা, কামোদ্দীপনা, পুরুষালিতা তথা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার এক নাশকতামূলক আখ্যান।