ইসরাত জাহানের গল্প : অজগর



আমাদের গেস্টরুমে লাগোয়া বারান্দায়, বাবা একটি অজগর সাপ পোষেন। কথাটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? কিন্তু এটাই সত্যি। মানুষের তো হাজারটা শখ! বাবার শখ অজগর পোষা। আমাদের ঘরে একটি অজগর আছে। তবে সেই অজগর তেড়ে আসেনা। কাউকে কামড়ায় না। করিম চাচা দিন-রাত মিলিয়ে ১০টি মুরগী দেয়। অজগরটি সেই মুরগীগুলো খেয়েদেয়ে হাতিঘোড়া-বজরাপানসি ভাবতে ভাবতে হয়তো ঘুমিয়ে পড়ে। আমাদের দেখার সুযোগ হয় না।

আমি কলেজে যাই, ভাইয়া ভার্সিটিতে আর মা ক্লাবে। আমাদের দিনগুলো আমাদের নিয়মে কেটে যায়। বাবাকে আমাদের বিশেষ প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র টাকার প্রয়োজন ছাড়া। আর বাবা! সারাক্ষণ তদবির, বদলি এই সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত। আমি সবাইকে বলি আমার বাবা একজন উচ্চপদস্থ কর্মকতা। আসলে বাবার যে নিদিষ্ট কোন চাকরি বা কাজ নাই, সেটা আমাদের বাসার তিনজন ছাড়া আরো কিছু মানুষ জানে। নিদিষ্ট কোন কাজ না থাকলেও বাবা সারাদিন কাজের তাড়ায় থাকেন। কাজের তাড়া বা ছোটাছুটির কারণে বাবার এন্তার অর্থ। আমাদের পরিবার এখন রাজা-বাদশাদের মতো চলে-- সামাজে মাথা উঁচু করে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আমরা টাকা খরচ করি। যারা বাবাকে দিয়ে নানারকম কাজ করিয়ে নেয়, তারা বাবাকে আদর করে 'তদবির ভাই' বলে ডাকে। আড়ালে 'ধান্দাবাজ' 'বাটপার' বলে গালি দেয়। তবে যারা উপকৃত হয়, তারা আবার বেশ সমাদর করে। অবশ্য সেটা বেশীদিনের জন্য না।

শীত শেষে শহরের মানুষগুলো মাফলার ছেড়ে ফিনফিনে পাঞ্জাবী পরে। জারুল, কৃষ্ণচূড়া, সোনালু ফুলের প্রেমে আকুল হয়ে কপোত-কপোতীরা শহরের এমাথা ওমাথা ঘুরে বেড়ায়। একটা সময় গাছগুলো ন্যাড়া হয়ে বিরহী প্রহর কাটিয়ে আবারও সতেজ হয়ে ওঠে কোকিলের ডাকে। শুধু আমার বাবার কোন পরিবর্তন হয় না। রোজ সকালে বাসা থেকে বের হয় একটি ব্রিফকেস হাতে, ফেরেও ওভাবে। মাঝেমধ্যে করিম চাচা আসে ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে। হয়তো অজগরের খাবার। আমাদের বাড়িতে প্রয়োজন ছাড়া কেউ আসে না। তাই এই সর্প প্রেমের কথা আশপাশের কেউ জানেনা। আমরাও বেশি সময় বারে থাকি। লাগামহীন জীবন, ঘরে ফিরে আসি সেই রাতে। সারাদিন এই বাড়িতে থাকে শুধু অজগর সাপটি। বাবার আয়ের সাথে অজগরের দৈর্ঘ্য-ব্যাসার্ধ পৌনঃপুনিক হারে বাড়তে থাকে। আমরা নিম্নবিত্তের সঙ্গীন লেবাসটা উষ্ঠে ফেলে অল্পসময়ের ভেতরে উচ্চবিত্তের সিঁড়িতে যে পা রেখেছি,সেটা অনেকে ব্যঙ্গ করে বলে আমাদের আঁড়ালে। হয়তো এই অজগর সাপটার আশীর্বাদে । বাবা আগে বিভিন্ন জায়গায় ট্যান্ডার দিতে যেত। এখন বাবার কাছে লোকজন ট্যান্ডারের কাগজপত্র রেখে যায়। চাকরির জন্য কাগজপত্র রেখে যায়। বাবার তদবিরে সেই কাজগুলো তারা পায়।

ইদানীং বাবার মন মেজাজ খারাপ। বুঝতে পারি উনার মনোপলির দিন শেষের দিকে। তাকে সাহায্যকারী অনেক উজির-নাজির এখন আলিগেপলির দিকে ঝুঁকেছেন। ভাগবাটোয়ারা নিয়ে যে বড় আকারে সমস্যা শুরু হয়েছে তা আমি বুঝতে পারি আকালপক্কতার কারণে। বাবাও ততদিনে অজগরটার মতো পেট মোটা হয়ে উঠেছে। সব এখন একাই খেতে চায়। ওদিকে অজগরটা নিয়ে আমরা পরেছি মহা বিপাকে। শরীর দৈর্ঘ্য ও স্বাস্থ্য বেড়ে যাওয়ায় ওটাকে এখন পুরো গেস্টরুমটাই ছেড়ে দিতে হয়েছে। তারপরও মাঝরাতে মাঝেমধ্যে দরজা ভেঙে বের হতে চায়।

হঠাৎ গভীর রাতে করিম চাচার কাছে বাবার আস্থাভাজন এক উজিরের ফোন আসে। জানায় 'পুলিশ নাকি আমাদের সাপ পোষার কথা জেনে ফেলেছেন। বেআইনি ভাবে সাপ রাখার অপরাধে বাবার বড় রকম ক্ষতি হতে পারে। তাই আমাদের পরিবারের সবাইকে গা ঢাকা দিতে হবে কিছুদিনের জন্য। খবরটা শোনার সাথে সাথে বাবা সিদ্ধান্ত নেয় অজগরটাকে কেটে ব্যাগ বন্দী করে নিয়ে পালাবে। এতোদিনের লালন পালন করা জিনিষটাকে ছেড়ে যেতে মন টানে না বাবার। বুঝতে পারি বাবা মায়া নামক রোগে আক্রান্ত। হিংসুটেরা ওটাকে লোভ বলে। মায়ের চিৎকার, আমার কান্না বাবাকে সেদিন থামাতে পারে না। বাবা আর করিম চাচা দা, বটি, চাকু সমেত গেস্ট রুমে ঢুকে পড়ে৷ বাহিরে অপেক্ষা করি আমরা তিনজন ভয়ে কম্পিত মানুষ। ঘন্টাখানিক পরে বাবা ও করিম চাচা পাঁচটি লাগেজ সহ বের হয়ে আসে। দুজনের চোখে মুখে বিজয়ের হাসি। বাবা এসে আমাদেরকে একটা করে অজগরের লাগেজ দেয়। গভীর রাতে গোপনে একটি ভাঙাচোরা মাইক্রোবাস এসে দাড়ায় আমাদের পাঁচ লক্ষ টাকা দামী গেটের সামনে। আমি আমার ছোটখাটো স্টাইলিস্ট জামা কাপড় ফেলে বিশাল কালো বোরখায় নিজেকে জড়িয়ে যাত্রা শুরু করি নিরুদ্দেশের পথে। আমার বি এম ডাব্লিউ গাড়িটার জন্য মায়া হয়। এক সপ্তাহ আগে কেনা তো তাই।

কিছুদুরে যাবার পরে শুরু হয় বাবা আর মায়ের অযথা ঝগড়া। বিপদে যে সম্পর্কের সংকট শুরু তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই সেই মুহূর্তে। সেই সময় টের পাই আমাদের পিছু নিয়েছে পুলিশের একটা গাড়ি। আশপাশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে সেই গাড়ির আওয়াজ! খুলনার কাছাকাছি আসার আগেই সুযোগ বুঝে বাবা ও করিম চাচা মাইক্রোবাস থেকে নেমে পড়ে। বাবা বাবা বলে চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করে। নিরুপায় আমি সামনের দিকে তাকিয়ে থাকি অশ্রুসিক্ত নয়নে। আরো কিছু দূর যাবার পরে আমাদের তিনজনকে বর্ডারের কাছাকাছি নামিয়ে দেয়া হয়। মায়ের তাড়ায় দ্রুত পা ফেলার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার উচ্চতা ও স্বাস্থ্য লাগেজটা ভার টেনে নেয়ার জন্য উপযুক্তি না হওয়ায় পিছিয়ে পড়ি ওদের কাছ থেকে। কিছুসময় পরে দুরত্ব আরো বেড়ে যাওয়ায় হারিয়ে ফেলি ওদের। রাতের আঁধারে ক্লান্ত আমি ঘুমিয়ে পড়ি খড় ফেলে রাখা মাঠে লাগেজের উপরে।

আমার ঘুম ভাঙে অনেক লোকজনের চিৎকার ও কথোপকথনে। দেখতে পাই কিছু মানুষ দিকশূন্যভাবে আমার দিকে ছুটে আসছে। উঠে দাঁড়াতেই রক্তের ধারাটা পায়ে কাছে পৌঁছে যায়। ততক্ষণ কিছু মানুষ আমাকে ঘিরে ফেলেছে। তাদের চিৎকারে আমার কানদুটো কিছু সময়ে জন্য অকেজো হয়ে যায়। তবে মুখভঙ্গি দেখে বুঝতে পারি লোকগুলো লাগেজ খুলতে বলেছে। আমি সাপের কথা অস্বীকার করার আগেই একজন জোর করে খুলে ফেলে অজগরের খন্ডাংশ রাখা লাগেজটা। সবাই হাস্য -চিৎকার করে ওঠে।

ছানাবড়া দৃষ্টিতে লোকজন লাগেজের ভেতরে চোখ রাখে। আমিও রাখি। বোবাকালা হয়ে যাই। হঠাৎ তলদেশ থেকে উঠে আসে তীব্র এক ব্যাথা। কুঁকড়ো মাথা নত করতেই দেখি রক্তের ধারা। আর আমি রক্তে উৎস খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারি আমার গহীন থেকে বেরিয়ে আসছে চরম আনন্দের টুকরো টুকরো পাপ। কিছু মানুষের থেকে মুখ বেরিয়ে আসে কিছু বিস্মিত অনুরণন। কয়েকজন মানুষকে দেখি ফোনে আমার ছবি তুলছে আর ফিসফিস করে বলছে, বেনাপোলে বর্ডারে কাছে দেশী ও বৈদেশিক মুদ্রাসহ এক বোরখা পরিহিতা তরুণী আটক...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ