উপল মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক উপন্যাস: আলমগীর



পর্ব: ৬

ষোলোশো তেইশের শেষ থেকে চব্বিশের প্রথম দিকটা মহবত খান কি বসে ছিলেন ? শাহাজাদা পারভেজ কি আবার আওয়ারা, মৌজ মস্ত হয়ে গেলেন ? সুবে বাংলায় যতক্ষণ ঘাঁটি গেড়ে ছিলেন শাজাহান ততক্ষণ শাহী ফৌজকে দাক্ষিণাত্যে শাহজাদার বিদ্রোহের ফলে হারানো কেল্লা আবার কব্জা করতে আর যেসব অভিজাতদের ফেরান যায় তাঁদের নিজের ঘরে ফেরাতে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল। যারা ফিরবে না তারা তো কবেই চলে গেছে শাহজাদার সঙ্গে। তবে তাদের সংখ্যা এমনকি ? আর বেশি হবেই বা কী করে ?মোঘল জাগিরদারদের খাজনা পাওয়ার হক দিচ্ছে ফরমান। যখন শাহাজাদা সেপাই লস্কর তোপ ,কামান আর হাতির দঙ্গল নিয়ে নাকের ডগায় তখন তিনিই ফরমান আর যুদ্ধে হেরে গিয়ে পালালে জাগিরদার কী করে? সে তার খাজনা আদায়ের হক ঠিকঠাক রাখতে আবার শাহী শিবিরে হাজিরা দিল।
মহবত খান সালামতের পুরনো দুশমন মালিক অম্বরের সঙ্গেও কথা চালাচ্ছেন।

----- সেকি !

----- অবাক হচ্ছ ?

----- হব না !

----- খামোখা অবাকই বা হবে কেন ?

----- ছবিটার কথা ভুলে গেলে ?

----- কোন ছবিটার কথা বলছ ?

----- যে ছবি আঁকলেন আবুল হাসান।

------ সেই আবুল হাসান , যুগের বিস্ময় , যিনি আঁকেন নূর জাহানের ছবি ?

----- আর কে আঁকতে পারবে !

----- কী আছে ওই ছবিতে আছেন বাদশাহ জাহাঙ্গীর।

----- আর ?

----- বাদশাহের রং ফর্সা , নূর জাহানের রং ফর্সা।

----- আবুল হাসান কি ফর্সা ?

----- অবশ্যই। দাক্ষিণাত্যের ভাষায় ওরা সবাই ছিলেন পশ্চিমা , পশ্চিম দেশের মানুষজন।

----- আর দাক্ষিণাত্যের মানুষজন , কী তাদের গায়ের রং ?

----- কালো।

----- মালিক অম্বরের ?

----- কালো।

----- শাহজির ?

----- কালো।

----- ছত্রপতি শিবাজির ?

----- কালো।

----- ছত্রপতি সম্ভাজির ?

----- কালো।

----- সবার কালো ?

----- দাক্ষিণাত্যের সবাই কালো মোঘল শাহীর চোখে।

----- আর শিল্পীর চোখে - শিল্পীশ্রেষ্ঠ আবুল হাসানের চোখে ?

----- আবুল হাসানের আঁকা ছবিতে ফর্সা বাদশাহ জাহাঙ্গীর দাঁড়িয়ে আছেন এক গোলাকৃতি পৃথিবীর ওপর পা তুলে - সম্রাটের পা , হাতে তীর ধনুক -বিশেষ ধরণে বেঁকা মোঘল ধনুক যার ছিলা থেকে নিক্ষেপ হবে তীর,তীব্র গতিতে যাবে।

----- কোথায় ?

----- সামনে।

----- কোথায় ?

----- এক দীর্ঘ বর্শায় গাঁথা , কাটা , কালো ,মালিক অম্বরের মাথার পানে।

----- আর ছিন্ন মাথা কালো মালিক অম্বরের ধড় ?

----- ছবিতে শুধু কাটা মাথার দিকেই বাদশাহ বাঁকা ধনু তাক করে আছেন। ওই কাটা মাথা ঘিরে আছে জ্যান্ত আর মৃত পেঁচারা। অন্ধকারের দোসর কালো মালিক অম্বরের দোসর পেঁচারা। ফর্সা বাদশাহের মাথার চারপাশে দিব্য আলোর বলয়। ষোলোশো ষোলোতে এঁকে ছিলেন আবুল হাসান।

----- সত্যি মাথা কাটা গিয়েছিল ?

----- ধুস। উল্টে মোঘলদের মাথাব্যথা ধরিয়ে দিয়েছিলেন আহমদনগর সুলতানশাহীর পেশওয়া বা প্রধানমন্ত্রী কালো মালিক অম্বর আর তার কালো কালো মারাঠা দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার আর হাবশি সেনার দল।

------ পেশওয়া ?

-----হ্যাঁ। দীর্ঘ ইতিহাস।

----- কিসের ?

----- মারাঠা আর হাবশি সেনার যূথবদ্ধতার ?

-----কোন পক্ষে ? কার বিরুদ্ধে ?

----- দাক্ষিণাত্যের সুলতানদের পক্ষে আর মোঘলদের বিরুদ্ধে।

----- কেমন ?

----- দীর্ঘ সে লড়াই ?

----- দীর্ঘ ?

----- হ্যাঁ। সে সময়ের দাক্ষিণাত্যের সুলতানরা আবিসিনিয়া-এখনকার ইথিওপিয়া থেকে আনতেন যুদ্ধ দাসদের। সেরকমই এসেছিলেন চাপু , পরে যাঁর নাম হবে মালিক অম্বর।তাঁকে কিনলেন আহমদনগরের পেশওয়া চেঙ্গিজ খান। পেশওয়ার মৃত্যুতে মুক্তি পান মালিক অম্বর।

----- তারপর ?

----- কিছুদিন নানান সুলতান শাহীর ফৌজে কাজ , মোঘল ফৌজের সঙ্গে লড়ে অবশেষে…..

----- থামলে !

------ নাবালক ,দুর্বল আহমদনগর সুলতান মুর্তাজা নিজাম শাহ -দুই কে সামনে রেখে পেশওয়া হয়ে শাসন চালাতে শুরু করলেন। মোঘল সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে দাক্ষিণাত্যের প্রতিরোধের মুখ ছিলেন তিনি।

----- নাবালক সুলতান সাবালক হলেন না ?

----- হলেনই তো।

----- মেনে নিলেন ?

----- তা কখনো হয় ?

----- কী হয় তবে ?

----- নিজের মেয়ের সঙ্গে সুলতানের বিয়ে দিয়েছিলেন অম্বর। সুলতানের এক পশ্চিমা , পারসিক আগের পক্ষ ছিল , রং ফর্সা , টুকটুকে ....

----- আবার রঙের কথা !

----- গোটাটাই তো রঙের কথা কালো বনাম ধলা আর চামড়ার তলায় লাল লাল রক্ত। মুক্তি সমতা ভ্রাতৃত্বের রক্ত।

----- ঠিকই, যা দেখা যাবে না এমন গণতন্ত্রের রক্ত।

----- আসলে সুলতান বড় হয়ে উঠে মালিক অম্বরের কর্তৃত্ব মানেন না। তুমুল পারিবারিক অশান্তি -আগের পক্ষের বউ মালিক অম্বরের মেয়েকে যৌন কর্মী -কালো ক্রীতদাসের মেয়ে বলে গালি দিচ্ছেন।

----- কালো ক্রীতদাসের মেয়ে!

----- কালো ক্রীতদাসের মেয়ে ।

---- আবার…….

----- বারবার। মালিক অম্বরের কাছে খবর যাচ্ছে , নির্দেশ দিচ্ছেন , বিষ দিয়ে সুলতান আর ফর্সা বউকে ওপরে পাঠিয়ে সুলতানের পাঁচ বছরের নাবালক ছেলেকে তখ্তে বসাচ্ছেন সুলতান বুরহান -তিন নামে , নিজে ষোলোশো থেকে ষোলোশো ছাব্বিশ আমৃত্যু আহমদনগরের পেশওয়া রইলেন। মারাঠা সর্দার মালোজি ছিলেন তাঁর ডান হাত। ষোলোশো কুড়িতে মারা গেলেন মালোজি। পুনে অঞ্চল সহ তাঁর জাগির গেল শাহজি ভোঁসলের হাতে।

----- কোন শাহজি ?

----- ঠিকই ধরেছ , ছত্রপতি শিবাজির বাবা।

----- তাই ?

----- হ্যাঁ , তাই। শুধু তাই নয় বাদশাহের অসুস্থতায় জাহাঙ্গীরনামার ভারপ্রাপ্ত নথিকার মুতামদ খান কী বলেন ?

----- কী ?

----- মালিক অম্বরকে ক্রীতদাস বলেও যোগ্যতম বিচারবুদ্ধির অধিকারী শাসক, অনন্যসাধারণ বলছেন তিনি।

----- কোথায় ?

------ ওই যে বললাম জাহাঙ্গীরনামায়। ফার্সিতে কাজাকি বা শ্বাপদসুলভ দ্রুততায় আক্রমণ পরিচালনায় মালিক অম্বরের দক্ষতা স্বীকার করছেন তিনি ।

----- গেরিলা কায়দায় ?

----- তাও বলতে পারো , তবে ......

----- তবে কী ?

----- স্থানীয় ভাষায় একে বলে বর্গীগিরি -লিখেছেন মুতামদ খান ।

----- বর্গীগিরি ?

----- হ্যাঁ, বর্গীগিরি, মোঘল সামরিকশাস্ত্রে গেরিলা যুদ্ধ কৌশলের পরিভাষা হয়ে দাঁড়াল তা।

বাস্তব জীবনে মালিক অম্বরকে কোনমতে বাগে আনতে না পেরে জাহাঙ্গীর তীব্র ঘৃণা পোষণ করতেন তাঁর প্রতি, এসব কাটা মাথা টাথা ছবিতে আঁকালেও দেখা যাচ্ছে বাদশাহের প্রধান সেপাইসালার মহবত খান সন্ধি প্রস্তাব করছেন আহমদনগরের পেশওয়ার কাছে, চাইছেন সেনা সাহায্য। তাতে জাহাঙ্গীর আর নূর জাহানের সম্মতি ছিল নিশ্চয়ই। মালিক অম্বর শর্ত দিচ্ছেন আহমদনগরে নাক গলাতে পারবে না শাহী ফৌজ। চুক্তি হল না, তাই রাজনৈতিক - সামরিক ভারসাম্য পক্ষে আনতে বিজাপুরের সুলতানের সঙ্গে চুক্তি করলেন মহবত খান।

সুবে বাংলার রাজধানী দুর্গম ঢাকা অবধি উজিয়ে গিয়ে শাহজাদা শাজাহানকে ঘেরাবন্দি করার কোন উৎসাহ দেখায়নি মোঘল দরবার , হয়ত অপেক্ষায় ছিল কখন আগ্রার দিকে এগোবেন তিনি। নিজের বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা থেকে জাহাঙ্গীর জানতেন এই এগোনোটা অবশ্যাম্ভাবী। তাই সুবে বাংলায় কব্জা জমিয়ে যুদ্ধের রীতিমতো প্রস্তুতি নিয়ে কোনদিকে এগোবেন শাজাহান সেটা তীক্ষ্ণ নজর করেন জাহাঙ্গীর। হলও তাই, জলপথে বাংলার জমিদার আর পর্তুগিজদের দেওয়া নৌকোয় ইলাহাবাদ রওনা দিলেন শাহাজাদা। যেই শাজাহান গঙ্গার পাড়ে ইলাহাবাদ কেল্লা দখল করে ,সব জলযান বাজেয়াপ্ত করছেন বাদশাহের টনক নড়ল। নিশ্চয়ই এক গোপন সলা হয় আর মহবত নির্দেশ পেলেন বিদ্রোহী শাহজাদার মুখোমুখি হবার।

তড়িঘড়ি বিশ্বস্ত কাউকে দাক্ষিণাত্যের দায়িত্বভার ছেড়ে পারভেজ -মহবত বাহিনী উত্তর-পূর্ব দিকে এগোল। ঠিক শাজাহানের বাহিনীর মুখোমুখি গঙ্গার অপর পারে দাঁড়িয়ে গেল শাহী ফৌজ আর সেখানেই তাঁবু পড়ল। নূর জাহান আর জাহাঙ্গীর তখন কাশ্মীরে , সব খবর যাচ্ছে বাদশাহের কাছে।

শাহী বাহিনীর বিশাল সমাবেশ দেখে শাজাহানের সালাহকাররা প্রমাদ গোনে, তুল্যমূল্য হিসেব শুরু হয়ে গেল। তিনি নিজেও জেনানা -পরিবার সরিয়ে দিচ্ছেন নিরাপদ দূরত্বে ,রোহতাস কেল্লায়। তারপর বারাণসীর পাঁচাত্তর মাইল দূরে ফৌজ নিয়ে যাচ্ছেন। পারভেজ আর মহবত তাঁর ফৌজকে নিয়ে এসে ফেলছে যমুনার পাহাড়ি উপনদী ঠৌঁসের পাড়ে। শাহী বাহিনীতে তখন চল্লিশ হাজার দক্ষ ঘোড়সোয়ার আর পদাতিক লস্কর আর শাহজাদার বাহিনীতে সাত হাজারের মতো ঘোড়সোয়ার। নিশ্চয়ই যুদ্ধে হাতিরও ব্যবহার হয়েছিল। শাজাহানও বাংলা থেকে হাতি এনেছিলেন কি জলপথে ? তবে নির্ধারক হয় বিখ্যাত মোঘল ভারী তোপ যা শাহী ফৌজের হাতে অনেক বেশি ছিল। তোপের বিশাল গোলার আঘাতে আর চারদিক থেকে ঘোড়সওয়ার বাহিনীর আক্রমণে প্রথমে শাজাহানের সেনা সমাবেশের বাঁ দিকটা উড়ে গেল। তিনি নিজে শ পাঁচেক সওয়ার নিয়ে ডান পাশ দিয়ে লড়ে গেলেন সমানে সমানে , দুপক্ষেরই বিশাল ক্ষতি হয়। বিদ্রোহী সেপাইসালাদের কাটা মাথা পেশ করা হতে থাকে শাহাজাদা পারভেজের কাছে। একটা মাস্কেটের গুলি সোজা এসে মারল শাজাহানের মাথায়। তিনি মরলেন না বটে কিন্তু ঘায়েল হয়ে পুরো বেদম। সওয়াররা তাঁকে নিয়ে ফিরছে শিবিরে আর শাজাহান বার্তা পাঠাচ্ছেন সেপাইসালার আব্দুল্লাহ খানের কাছে। মরতে দমতক লড়াইয়ের আদেশ শুনে অভিজ্ঞ সেপাইসালার ফিরফিরতি পরামর্শ দেন পালানোর।ইতিমধ্যে শাহী ঘোড়সওয়াররা শিবিরের হাতায় ঢুকে পড়ায় শাজাহানেরও আর ভাবার সময় নেই, তিনি এক নোকরের ঘাড়ে হেলান দিয়েই হয়তো পালিয়ে ছিলেন, ঘোড়ায় চড়ে লাগাম ধরার ক্ষমতা থাকার কথাও নয় , সঙ্গে ছত্রভঙ্গ বাহিনী। বিদ্রোহীদের অনেকেই লড়াইয়ের আগে বা পরপরেই শাহী শিবিরে যোগদান করেছিল, অনেকে মারাও গেল। এই লড়াইটা ঠৌঁসের যুদ্ধ বলে লিপিবদ্ধ আছে , হয়েছিল ষোলোশো চব্বিশের অক্টোবরে।তবে ফিরিঙ্গিরা ঠিক মতো উচ্চারণ করতে পারত না বলে একে টনসের যুদ্ধ (Battle of Tons) বলে চালিয়ে দিয়েছিল। এরকম কাণ্ড ওরা অনেক করে আমাদের ভগবান -আল্লাহ সব উল্টে দিয়ে চলে যায়। সেই থেকে এমনকি উত্তর ঔপনিবেশিক ইতিহাসকাররাও এই ভুলের পথেই গমন করেন কেন কে জানে !

সেসময় মুমতাজ গর্ভবতী। তিনি যে কয়েক মাস পর ডিসেম্বরেই শাহাজাদা মুরাদের জন্ম দিচ্ছেন সে তো আগেই জানা গেছে। হ্যাঁ , অনেক দূর সেই রোহতাস কেল্লায়।যুদ্ধ এমনই চিজ যে তার কামানের আওয়াজ থেকে যত দূর যাওয়া যায় ততোই তা আরো পরিষ্কার শোনা যেতে থাকে। বিশেষ করে সে লড়াই যদি হয় আব্বুজানের ফিরে আসা বা না আসার কথা তবে কামান না হয় নাই হল , শুখনো পাতার ওপর দিয়ে নিজের হেঁটে হেঁটে যাওয়ার শব্দে কেঁপে উঠবে শিশু। তারপর খেলার সাথীদের ডাকে সে চমকে উঠবে। রোহতাস কেল্লায় রয়েছেন ঔরঙ্গজেব আর তাঁর ভাইবোন সহ অনেক শিশুরা। যে যার ধাত্রী মাতার কোলে, তাঁর গায়ের গন্ধের নিশ্চিন্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে সে শিশু।হয়তো বা কখনো খানিকটা অপরিচিত , খানিক পরিচিত আর একটা গন্ধ তার ঘুম ভাঙাবে। সে চোখ মেলে দেখে আম্মিজান বেগম মুমতাজ এসে দাঁড়িয়েছেন চৌকির পাশটায়। অপলকে চেয়েছিলেন মুমতাজ ঔরঙ্গজেবের দিকে , দারা শুকোহর দিকে , জাহানারার দিকে , রোশেনারা আর হয়তো বা সুজার দিকে। তাঁরা সেটা দেখতে পেয়েছিলেন কি ? তবে একটা দীর্ঘশ্বাস যে বেরিয়ে এসে রোহতাসের কেল্লাকে আকূল করে এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকে না। সে নিঃশ্বাস ছিল মুমতাজ মহলের। পাত্থর আর বলে উঠবে না। জানা যাবে না বিদ্রোহের বছরগুলোতে শিশুদের দেখভাল , শিক্ষাদীক্ষার সব সুচারু বন্দোবস্ত লাটে উঠেছিল কিনা। সে সংক্রান্ত কোন তথ্যও জানা যায় না।

জানা যাচ্ছে না মুমতাজ ও জেনানার অন্য মহিলাদের ভোগান্তির ইতিহাস। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে এ কেল্লা সে, কেল্লা করে বেড়ানো সংক্রান্ত নারীর একান্ত অনুযোগ, তখ্তে বসার তাড়ায় মুখটি বুজে থাকে। ঘুরে মরে কেল্লারই এ কোনে , সে কোনে। তারিখ বা ইতিহাস যাই হোক এ আবেগ ক্ষরণের লিপি কই ?

আহত শাজাহান কোথায় পালিয়ে গেলেন ? জোস গমন্স মোঘল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে কয়েকটা ক্ষমতাঞ্চল চিহ্নিত করেছেন ভূপ্রাকৃতিক আর পরিকাঠামোগত শর্ত বিচার করে, এগুলো হল যথাক্রমে বাংলা, আগ্রা-রাজস্থান-লাহোর , মালওয়া -খান্দেশ আর কাবুল। লোকবল , অর্থবল , মানুষ ও পশুখাদ্যের অপর্যাপ্ত সরবরাহের ছাড়াও, যুদ্ধের হাতি ঘোড়ার যোগানে এই অঞ্চলগুলোর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এই কয়েকটার ওপর আধিপত্য রাখলে হুকুমত জারি থাকে। শাহাজাদাদের বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এর এক বা একাধিক অঞ্চল।শাহাজাদা শাজাহানের বিদ্রোহের এলাকা নির্বাচন বেশ জটিল। প্রথমে মালওয়া -খান্দেশ , তারপর আগ্রা হয়ে আবার মালওয়া -খান্দেশে ফিরে , গোলকোন্ডায় গিয়ে সেখান থেকে সুবে বাংলায় শক্তিসঞ্চয় করে ইলাহাবাদে পরাজিত হয়ে আবার বাংলার দিকেই মুখ ফিরিয়ে ছিলেন তিনি।নাথান মির্জা লিখেছেন শাজাহান সপরিবারে আকবরনগরে ছিলেন চব্বিশ দিন। জায়গাটা এখনকার বিহারের ভাগলপুরে। শাহজাদা তাঁর বাহিনীকে আবার সংহত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন কিন্তু পারভেজ-মহবতের শাহী ফৌজ চলে এল দ্রুত , দেখল শাজাহান আবার চলে গেছেন গোলকোন্ডায়। সুবে বাংলার আফগান আর জমিদাররা ঝেঁটিয়ে শাহজাদা শাজাহানের বিদ্রোহে সামিল হয়ে ছিল। আঁতাত গড়ার পুরোনো মোঘল কায়দায় তাদের ওপর বলপ্রয়োগ না করে, দলে টেনে নিয়ে ,পুরষ্কার দিয়ে কাছের লোক করা হল। ওড়িশার জমিদাররাও সময় নষ্ট না করে আবার শাহী দরবারে পেশকস দিয়ে দায় মুক্ত হয়।খুব কারুর মাথা কাটাই পড়েনি। শাহজাদাদের বিদ্রোহে একান্ত অনুগত কিছু দাবার বোড়ের প্রাণ যায় আর দিনের শেষে দেখা যায় সালতানাত আরো সহযোগী পায় , শক্তিশালী হতে থাকে। বিদ্রোহেরই তৈরি করা জমিনে নতুন আঁতাতের বাগিচা বিছানো হচ্ছিল। পারভেজ-মহবত খান বাহিনী পরাজিত শাহজাদার পিছু নিল না। ধরেই নেওয়া যায় জাহাঙ্গীরের বারণ ছিল। বিদ্রোহ করা তখ্তের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী মোঘল শাহজাদার পক্ষে এমন কিছু গর্হিত কাজ নয়, নিয়ন্ত্রণে থাকলেই হল । মুমতাজ আর শাজাহানের গোটা জেনানা পড়ে রয়েছে রোহতাসে। আগেই জানা গেছে অসুস্থ সুজা জাহাঙ্গীর আর নূর জাহানের প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাঁর কথা জাহাঙ্গীর আলাদা করে লিখেওছেন। শাজাহানের বিদ্রোহের ক্রান্তিকালে তিনি কি রোহতাস কেল্লায় মুমতাজের সঙ্গে ছিলেন ? না শাহী দরবারের ছত্রছায়ায় আলাদা ছিলেন ?

এরপর আর কোন উপায় না দেখে শাজাহান মালিক অম্বরের দ্বারস্থ হচ্ছেন। মোঘল -বিজাপুর আঁতাতের বিরুদ্ধে শাজাহান-অম্বর আঁতাত গড়ে উঠল। অম্বরের হাবশি সেপাইসালার ইয়াকুব খান দশ হাজার সওয়ার নিয়ে বুরহানপুর শহরের পাশে লালবাগ অঞ্চলে শাজাহানের শিবিরে চলে এলেন। দুপাশ থেকে আক্রান্ত হচ্ছে বুরহানপুর।

ষোলোশো পঁচিশের অক্টোবরে জাহাঙ্গীর আর নূর জাহান সহ গোটা শাহী বহর তখন কাশ্মীরে, একটা বার্তা পৌঁছল দরবারে।

----- শাহাজাদা শাজাহান অসুস্থ।

----- গুলির আঘাত ?

----- জানা যাচ্ছে না।

----- শাহাজাদা অসুস্থ -এটাই জানা যায়।

----- কী করে ?

----- খত এসেছে।

----- কে পাঠিয়েছে ?

----- বুঝতে পার না ?

----- কিছুই বুঝি না।

----- শোন তাহলে।

----- শুনছি বহু বছর ধরে , এ শাহাজাদা ,ও শাহাজাদা সবার কথাই শুনছি।

----- লিখছেন শাহাজাদা খুররাম থুড়ি শাজাহান।

----- কী ?

----- তিনি অসুস্থ , ভগ্নমনোরথ , পরিবারের জন্য চিন্তিত।

----- কোথায় তাঁর পরিবার ?

----- সম্ভবত রোহতাস কেল্লায় ঘেরাবন্দি হয়ে আছে মুমতাজ মহল সহ গোটা জেনানা।

----- আর শাহাজাদা ? তিনি কোথায় ?

----- মালওয়া-খান্দেশ অঞ্চলে।

----- মান্ডুর কেল্লায় ?

----- মনে হয় না।

----- তবে ?

----- মনে হয় আসিরগড় কেল্লায়।

----- ঠিক বলতে পারছ না ?

----- ঠিক জানতে পারছি না।

----- আর কী লিখেছেন ?

----- তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।

----- কেন ?

----- বোঝো না ?

----- ক্ষমতার ভাষা বুঝি না কোনো দিন।

----- শুনবে ?

----- শুনব।

----- শাহাজাদা শাজাহান জানালেন তিনি বিদ্রোহের জন্য ক্ষমা চান , চান পরিবারের নিরাপত্তা।

----- শেষ হল বিদ্রোহের ?

----- জানি না।

----- জান না ?

----- না , ক্ষমতার ভাষা ......

----- তুমিও !

----- আমিও। -----সেকি !

----- হ্যাঁ।

এরপর বেশ কিছুদিন সম্ভবত নানান সলাপরামর্শ , টানাপোড়েন চলে। কাশ্মীর থেকে শাহী বহরের ফেরার ব্যস্ততাও থাকতে পারে বা জাহাঙ্গীরের অসুস্থতা। কে শাহাজাদার চিঠির উত্তর দিচ্ছেন জাহাঙ্গীর নিজে না নূর জাহান এ নিয়ে প্রখ্যাত ইতিহাসকাররা একেক রকম লিখেছেন। এটা হতে পারে ভিন্ন সূত্রের ওপর নির্ভরতার জন্য অথবা ব্যাখ্যার ভিন্নতায় কেউ বলছেন বাদশাহ নিজেই ,কেউবা বলছেন নুরজাহান। তবে উত্তরটা সুবিদিত আর সর্বজনগ্রাহ্য। ষোলোশো ছাব্বিশের প্রথমে লেখা হচ্ছে যে আনুগত্যের প্রমাণ হিসেবে কয়েকটা কেল্লা ফিরিয়ে দিতে হবে শাহাজাদাকে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রোহতাস আর আসিরগড় কেল্লা।আরো লেখা হচ্ছে , আনুগত্যের প্রমাণ হিসেবে দুই ছেলে দারা শুকোহ আর ঔরঙ্গজেবকেও দরবারের হেপাজতে পাঠাবেন শাহাজাদা শাজাহানকে।

---- শাজাহান বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নিলেন কি ?

---- হ্যাঁ ।

---- আর মুমতাজ ! তাঁর মনের অবস্থা !

----- মুমতাজ মহলের কথা বলছ ?

---- কী ছিল মুমতাজের মনের অবস্থা ?

---- জানি না কারণ জানায় নি !

---- তবে কী জানা গেল ?

---- জানা গেল ষোলোশো ছাব্বিশের মে মাসে…..

---- কী ?

---- দারা আর ঔরঙ্গজেব, দুই শিশুকে, লাহোরে নূর জাহানের তত্ত্বাবধানে পাঠানো হল। শান্তি স্থাপিত হয়।

-----------------
অতিরিক্ত তথ্যসূত্র : Muhal Warfare, Indian Frontiers and High Roads to Empire 1500-1700 , Jos Gommons


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ