কথাসাহিত্যিক জয়ন্ত দের জন্ম ১৯৬৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার কুর্চিবেড়িয়া গ্রামে। ছেলেরবেলার পুরোটা সময়টা কাটে কালীঘাটে। আগাগোড়া তিনি কলকাতা শহরের মানুষ। তিনি সাপ্তাহিক বর্তমান ম্যাগাজিনের সম্পাদক এবং দৈনিক বর্তমান পত্রিকায় কাজ করেছেন। সোমেনচন্দ স্মৃতি পুরস্কার, গল্পমালা পুরস্কার, নমিতা চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২৩ সালে তিনি অন্নপূর্ণা উপন্যাসের জন্য বঙ্কিম পুরস্কার পেয়েছেন।
লেখালেখির শুরু কবিতা দিয়ে। ধারাবাহিকভাবে গদ্য লিখতে শুরু করেন ১৯৯৫ সাল নাগাদ।
পেণ্ডুলাম গল্প লিখে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। পেশাগত কারণে নানা ধরনের ভ্রমণ, বিচিত্র মানুষজন ও রকমারি অভিজ্ঞতা বারবার উঠে আসে তাঁর লেখায়।
সাম্প্রতিক যেসব কথাসাহিত্যিক সাহিত্যে বহুবিস্তারময় আধুনিকতাকে পল্লবিত করেছেন জয়ন্ত দে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন। বিভূতিভূষণের মতো নিবিড় দৃষ্টিতে তিনি দেখেছেন--গ্রাম নয়, এই নগরকে। তিনি খুব বেশি কথা বলেন না তাঁর লেখায়, তবে অল্প কথায় নিখুঁত চিত্রটি ফুটিয়ে তোলেন। সম্পর্কের নানা দিক প্রকাশ করতে প্রায় অচেনা রং-তুলি তিনি ব্যবহার করেন।
তাঁর উপন্যাসগুলি হিজড়া মানুষ, র্যাগিং, শক্তি ও দুর্নীতি, কুম্ভ মেলা ইত্যাদি নিয়ে বিস্তৃত ধারণা নিয়ে আসে। তিনি সহিংসতা ঘৃণা করেন। প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ স্পৃহার মত বিষয়গুলি কল্পনা এবং লেখনীযাদু দিয়ে বদলে দিতে চান।
গল্পপাঠ ওয়েবজিনের জন্য জয়ন্ত দে'র এই সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন শুভদীপ বড়ুয়া। জয়ন্ত দে'র বঙ্কিম পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস অন্নপূর্ণা উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেনও শুভদীপ বড়ুয়া।
এই আয়োজনটির অনুঘটক সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত।
শুভদীপ বড়ুয়া :
আপনার সম্প্রতি বঙ্কিম পুরস্কার প্রাপ্ত উপন্যাস ‘অন্নপূর্ণা’ পাঠক মহলে যথেষ্টই সমাদৃত। এই উপন্যাস লেখার নেপথ্যে আপনার প্রেরণা কী ছিল? আপনার পারিপার্শ্ব, আপনার সময়, আপনার জীবন-দর্শন, কীভাবে প্রভাবিত করেছে ‘অন্নপূর্ণা’-র সৃষ্টিকে?
জয়ন্ত দে :
অন্নপূর্ণা উপন্যাসটি আমি দু-বছর একটি শারদীয়ায় দুই পর্বে লিখেছিলাম। উপন্যাসটি বঙ্কিম পুরস্কার পায়। উপন্যাসটি একটা মেয়ের জীবন অনুসরণ করে সময়কে দেখানো। যে সময়ের কথা আমি বলছি, যখন বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে, তারা সরকার চালাচ্ছে, কিন্তু কোনো একটা জায়গায় যেন দ্বিধা তৈরি হয়েছে। ঠিক কী করবে, একটা দিশাহীনতার মধ্যে ভুগছে। সরকার তাদের, পুলিশ তাদের, আবার কারখানার শ্রমিক ইউনিয়নও তাদের। নিজেদের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন।
পাশাপাশি তখনও কিন্তু বিভিন্নভাবে কলকাতা শহরের গা ঘেঁষে জমি দখল করে কলোনি বসছে। ৭১-এর পরে যারা এসেছে, প্রচুর মানুষ তখনও কলকাতা চারপাশে বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এই সময় জন্ম নেওয়া একটা মেয়েকে ধরেই আমার কাহিনি তৈরি হয়েছে। আপাতভাবে দেখলে মনে হবে এই মেয়েটি আমার কাহিনির প্রেরণা, যার নাম অন্য অন্নপূর্ণা। তার জীবন সংগ্রাম। অন্নপূর্ণা একটি জীবন্ত চরিত্র। আমি শুধু তার সঙ্গে হেঁটেছি। হেঁটে দেখার চেষ্টা করেছি এবং সেই সঙ্গেই দেখেছি, যে বামপন্থীরা খেটে খাওয়া মানুষকে আশা দিয়ে তারা এসেছিল, সেই তারাই মানুষের হাত ছেড়ে কীভাবে দিশাহীন ভাবে অন্য পথে ঘুরে যাচ্ছে। বলতে পারেন অন্নপূর্ণা কিছুটা ছিন্নমূল মানুষের কাহিনি। ঠিক তেমনি ছিন্নমূল এক দর্শনেরও কাহিনি, দিশাহীন এক দর্শন।
শুভদীপ বড়ুয়া :
আপনার পরিবার, ছেলেবেলা, এবং লেখক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি সম্বন্ধে কিছু বলুন। জীবনে এমন বিশেষ কোনও বাঁক এসেছিল কী— যেদিন আপনি মনে করলেন, আপনার কবি (আপনি প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন) বা লেখকই হওয়ার ছিল?
জয়ন্ত দে :
আমার ছেলেবেলা কেটেছে কালীঘাটে। যদি দেখেন, তাহলে কালীঘাটের একটা অদ্ভুত ভূগোল আছে। মনে করুন এদিকে পটুয়াপাড়া, যেখানে ঠাকুর তৈরি হচ্ছে। তারপর ট্রাম লাইন পার হলেন ডান দিকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল রেড লাইট এলাকা। আরেকটু এগিয়ে গেলে বাজার আর একটু এগোলে কালীঘাট মন্দির তারপর পার হলে পরে শ্মশান। মানে জন্ম থেকে মৃত্যু। এরই পাশাপাশি চলেছে টালিনালা, আমরা যাকে বলি গঙ্গা। এই মন্দিরের কাছাকাছি আমাদের বাড়ি ছিল। রাস্তা পার হলে জেলগ্রাউন্ড খেলার জায়গা। অনেক সময়ই কালীঘাট মন্দিরের চাতালও আমাদের খেলার জায়গা হয়ে উঠতো।
আলাদা করে লেখার জন্য কোনো প্রস্তুতি এই পর্বে আমার ছিল না। আর পাঁচ জন যেমন বই পড়ে। ফুটবল খেলা আর গল্পের বই পড়া, সেটুকুই ছিল।
এখান থেকে আমরা চলে আসি টালিগঞ্জ বা বেহালার একটা জায়গা, হরিদেবপুরে। হরিদেবপুরের খুব ভেতর দিকে আমরা বাড়ি করে থাকতে শুরু করি। সেখানকার বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আমার ঠিক মন বসত না। ওই সময় লেখার একটা জায়গা তৈরি হয়। ওখানে এই হরিদেবপুরের ওই জায়গায় আমার কয়েকজন লেখক বন্ধু জুটে যায়, যারা সাহিত্য চর্চা করতো। এবং একটি পত্রিকা ‘আমুখ’ প্রকাশিত হতো। আমি বলতে পারি এই এঁদের সাহচর্যেই আমার সম্পূর্ণভাবে লেখালেখি শুরু। প্রথম দিকে কবিতা-ই লিখতাম এবং যখন কবিতা লেখা শুরু করি আমাদের পত্রিকা ছাপা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে কবিতা পড়ার জন্য ডাকে, আমার ডাক আসছে। এই সময়টাই আমি পুরোপুরি কবিতা লিখেছি কবিতা নিয়েই থাকতাম কিন্তু আমি পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তাম। এরকমই একটি পত্রিকা যার নাম ‘ম্যানুফেস্ট’, তাঁদের সূত্র ধরে আমি ‘বর্তমান’ কাগজে চাকরি করতে যাই। সেটা ১৯৮৮ সাল। এই পর্বে আমার দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ৯২ সালে যখন বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়, ওই দাঙ্গার সময় আমার একটা মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়। আমার মনে হয় আমি আর কবিতা লিখতে পারছি না। মানে আমার বলার কথাগুলো আর কবিতায় বা কাব্য ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে না। তার আগে আমি দু-একটা গল্প লিখেছিলাম— ‘বর্তমান’, ‘যুগান্তর’ এই ধরনের কাগজে ছাপা হয়েছিল। কিন্তু ৯২ সালের পর ৯৩ সালে আমি একটা গল্প লিখি, গল্পটার নাম ‘পেন্ডুলাম’। গল্পটা বেশ কয়েকটা প্রতিষ্ঠিত কাগজে দিয়েছিলাম, সেখানে গল্পটি ছাপা হয় না। গল্পটির ‘তীব্র কুঠার’ পত্রিকায় ছাপা হয় । পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন বীরেন শাসমল। এই গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমি অনেক লেখক-পাঠকের এবং অবশ্যই সম্পাদকের নজরে পড়ি। তাঁরা আমাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে লেখার সুযোগ দেন। প্রতিক্ষণ থেকে ২০০০ সালে আমার প্রথম গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়।
শুভদীপ বড়ুয়া :
অনেক লেখকের মতো আপনার ব্যক্তি-জীবনও আপনার সৃষ্টিকে কমবেশি প্রভাবিত করেছে নিশ্চয়ই। নিজেকে কীভাবে দেখেন সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে? বা দেখাতে চান? বলতে চাইছি, আপনার সৃষ্টি করা উপন্যাস এবং ছোটগল্পে আপনি বা আপনার নিজের জীবন কতটুকু উপস্থিত?
জয়ন্ত দে :
আমি নিজের সম্পর্কে বলতে পারি, আমার লেখার মূল উপাদান কিন্তু অভিজ্ঞতা এবং জীবন ভেঙে লেখা। ব্যক্তি অভিজ্ঞতাই আমার লেখার প্রেরণা। আগে অভিজ্ঞতাকে রাখি তারপর সেখানে কল্পনা এসে মেশে। আমার সব লেখাই প্রায় বাস্তব থেকে শুরু হয়। পরপর চারটি উপন্যাসের কথা আমি বলতে পারি, যেমন ‘নতজানু’ উপন্যাসটা আমার কালীঘাটের জীবন, সেখানকার মানুষজন, কালীঘাট নিয়েই লেখা। আর দুটো উপন্যাস ‘সাদা পোস্টার কালো করোটি’ ও ‘রক্তাক্ত জন্মদিন’ এই উপন্যাস দুটো আমার ব্যক্তিগত জায়গার অভিজ্ঞতা। একদম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে নিয়ে লেখা প্রথম দিকের আর একটা উপন্যাস ‘ভয় ভয়’। উপন্যাসটা হরিদেবপুরে মস্তান প্রোমোটার— তাদের নিয়ে লেখা। আমি যেমন সাধু সঙ্গ করেছি, তেমনই মস্তান লুম্পেনদের সঙ্গ করেছি। জীবনে ভাঁড়ার অনেক। তেমন আর লিখতে পারলাম কই?
শুভদীপ বড়ুয়া :
কখন তাগিদ বোধ করেন— কোনো একটি বিষয় নিয়ে, কিংবা বিশেষ কোনো সময়কে ঘিরে, কিংবা একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে এবার একটি উপন্যাস লেখা প্রয়োজন। সেই তাগিদ কী সরাসরি রাজনৈতিক, বা সামাজিক, নাকি নিছকই কল্পনাশক্তির জোরে একটি উপন্যাস লেখা শুরু হয়ে যায়?
জয়ন্ত দে :
এটার কোনো ফরম্যাট নেই। কোনো সময় কোনো ঘটনার অভিঘাত থেকেও লেখা শুরু হয়। আবার কোনো সময় একজন ব্যক্তি মানুষ, তার উপস্থিতি, তার কথা, তার যাপিত জীবন লেখার দিকে টেনে নিয়ে যায়। তবে কঠিন বাস্তব আমার লেখাকে প্রাণিত করে। হ্যাঁ, অনেক সময় আবার কল্পনা দিয়েও উপন্যাস শুরু করি। কিন্তু সেই কল্পনার সঙ্গে কোথাও কোথাও বাস্তব থাকে না।
এক প্রাক্তন রাজনৈতিক মস্তানের মৃত্যুর কথা ‘মৃত্যুর স্বাদ’ লিখেছিলাম, মুখে শোনা বাস্তব থেকে। আবার সম্পূর্ণই কাল্পনিক উপন্যাস ‘রৌদ্রময়ের ছিন্ন শির’।
শুভদীপ বড়ুয়া :
একজন লেখক হন তাঁর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ— কথাটাতে কতটুকু বিশ্বাস রয়েছে আপনার?
জয়ন্ত দে :
দেখুন লিখে সমাজ পরিবর্তন হয় এই বিশ্বাস আমার নেই। কিন্তু লেখকের একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। এমন কিছু লিখি না, যেখানে সামাজিক ভেদাভেদ তৈরি হয়, কোনো সম্প্রদায়কে বা কোনো জায়গা থেকে ‘লড়াই’- কে আঘাত করা হয়।
শুভদীপ বড়ুয়া :
লেখকের জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে আপনার মতামত কী? প্রশ্নটি যদিও খুবই সেকেলে এবং বহু-উত্থাপিত, তবু বলি, একজন লেখকের জনপ্রিয়তা এবং লেখার সাংস্কৃতিক গুনমান— এই দুয়ের মধ্যে বিরোধ অনুভব করেছেন কী কখনো?
জয়ন্ত দে :
লেখকের জনপ্রিয়তা কীভাবে হবে সেটা সত্যি কথা বলতে গিয়ে— এতদিন লিখেও বুঝতে পারিনি।
অনেক সময় দেখেছি খুব ভালো লেখার, মানে যে লেখাটার সম্বন্ধে হয়তো প্রচুর মানুষ বলছে ভালো লেখা কিন্তু সেই বই হয়তো তেমন বিক্রি হয় না। অথচ তার পাশাপাশি খুব খারাপ লেখা সবাই বলছে অথচ সেই বইও দেখছি অনেক অনেক বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
আমাদের এখানে একটা ‘হাউস’ বলে ব্যাপার রয়েছে। জনপ্রিয় একটা হাউস-এর লেখকদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। সেটা আগাগোড়াই দেওয়া হয় কিন্তু পরবর্তী সময় সেটা পাল্টে গেছে। ফেসবুক এবং তার গোষ্ঠীবদ্ধ কিছু লেখকেরও জনপ্রিয়তা রয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই তাঁদের লেখা যেমনই হোক, তাঁদের লেখা বিক্রি হয়। তাঁরা এক ধরনের পাঠক তৈরি করেছেন। আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখন লেখা পড়া হয় না, লেখক পড়া হয়। লেখকদের ফ্যান-ফলোয়ার তাঁদের বই কেনেন, তাঁদের বই নিয়ে লাফালাফি নাচানাচি করেন, ব্যাস এটুকুই। ভালো লেখা খারাপ লেখা নয়, এখন আমার লেখক আর তোমার লেখক। প্রচার, মিথ্যাচার, সব রাঙতা মোড়ক। এমনও দেখেছি, কোনও পাঠক স্কুল-পাঠ্য বইয়ে গল্প পড়েছিলেন। তারপর এতদিন পরে সেই দাদা-লেখক বা দিদি-লেখকের সম্পর্ক ধরে বই কিনছেন। লেখক জনপ্রিয়তার স্বাদ পাচ্ছেন।
শুভদীপ বড়ুয়া :
ট্র্যাভেলগ বা ভ্রমণ-বৃত্তান্ত লিখতে আপনি পারদর্শী। আপনার কুম্ভ-মেলার ভ্রমণ-বৃত্তান্ত বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। ভবিষ্যতে সেরকম কোনো ট্র্যাভেলগ লেখার পরিকল্পনা রয়েছে কী?
জয়ন্ত দে :
কুম্ভমেলা নিয়ে আমার যে লেখাটা আছে ‘পূর্ণকুম্ভে কল্পবাস’, সেটা ঠিক ভ্রমণ নয়। বরং সেটা মানব ভ্রমণ। আধুনিক কুম্ভ কেমন, কুম্ভের আধুনিক রূপ কেমন হতে পারে, হাইটেক কুম্ভ কোন জায়গায় গেছে, তার মানুষ বদলে যাওয়া, তার ভেতরকার রাজনীতি, তার সিস্টেম, এই সমস্ত লেখা। আমি যে উধাউ-কে নিয়ে লিখি সেটা হচ্ছে, যেমন ‘আত্মজন’, সেটাও মানব ভ্রমণ। ধারাবাহিকভাবে একটা সংবাদপত্রে লিখেছিলাম। সেই ভ্রমণটা কিন্তু একটা গ্রাম, জনপদ আর মানুষ ভ্রমণ। আমাকে প্রকৃতির মধ্যে মানুষকেই বেশি টানে। মানুষ ছাড়া প্রকৃতি আমার কাছে ঠিক যেন পরিস্ফুটিত হয় না।
শুভদীপ বড়ুয়া :
আপনার প্রিয় লেখক কে? বা কারা? জীবনে এমন কোনো উপন্যাস কী পড়েছেন? যেটি পড়ে আপনার মনে হয়েছিল— এই উপন্যাস যদি আমি লিখতে পারতাম!
জয়ন্ত দে :
একজন নয়, প্রিয় লেখক অনেকজন। প্রথম দুজনকে যদি সামনে এগিয়ে রাখি তাহলে অবশ্যই তারাশঙ্কর আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর সতীনাথ, মানিক আছেন। পড়তে পড়তে যখন আসি, এক একটা জায়গায় একেক জনকে বিশালাকার লাগে। পর্বতের মতো। সমুদ্রের মতো।
আর সত্যি বলতে কি বেশিরভাগ ভালো উপন্যাস পড়ে আমার মনে হয়, এই উপন্যাসটা আমি লিখতে পারতাম না। সাত জন্মেও না। আমি চমৎকৃত হই।
বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর— ওই মাস্টারদের কথা বাদ দিন, আমি যদি মাস্টারদের পরের লেখকদেরও কথা বলি, তাহলেও বলব আমি কিন্তু পারতাম না। আমার এঁদের সবার কাছেই প্রায় ছাত্রের মতো শিখি। এমনকি সমসাময়িক লেখকদের কাছেও।
শুভদীপ বড়ুয়া :
সাহিত্য ছাড়া অন্য কোনও শিল্প-মাধ্যম যেমন ধরুন সঙ্গীত, নাটক, চলচ্চিত্র, ইত্যাদি আপনাকে কীভাবে লেখার প্রেরণা দেয়?
জয়ন্ত দে :
আমাকে নাটক খুব প্রাণিত করে। যখন একটা নাটক দেখি তার সমস্ত কিছু একসঙ্গে একই সুরে বাজে, যেমন অভিনয়, তেমন লাইট সাউন্ড মঞ্চ, সমস্ত কিছু কত কম অনুষঙ্গের মধ্যে দিয়ে সারা হয়। দেখুন বাড়তি যেন কিছুই নেই। নাটকে খুব পরিমিত ব্যাপারের মধ্যে দিয়ে, পরিমিত কতগুলো বিষয়ের মধ্যে দিয়ে একটা টোটাল জায়গাকে তোলা হয়।
আমি কিন্তু আমার উপন্যাস ভাবনাটা এই জায়গায় রাখি। সব কিছুই যতটা কম দিয়ে একটা জায়গাকে ধরে ফেলা। আমার নিজের কথা বলার থাকে না। আমি যদি এখন লিখি নায়িকা চুল ঠিক করছে, এই আকাশে মেঘের দিকে দেখছে, আমি পাতার পর পাতার প্রকৃতির বর্ণনা দিলাম, রূপের বর্ণনা দিলাম, তারপর আবার দুই লাইন কথা বললাম, এমন ভাবি না। বরং সেখানে স্কেচ করে এগিয়ে যাই। চলচ্চিত্র মাধ্যমে অনেক সময় এই পরিসর থাকতে পারে। নাটকে নেই। সেখানে কাহিনির আর কথার অভিঘাত থাকে।
আমার নিজের মনে হয়, আমি নাটক থেকে অনেক বেশি প্রেরণা পাই, আমার উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে। কত অল্প কথায় কত অল্প কিছুতে কাহিনি জীবন ছুঁয়ে ফেলা যায়।
শুভদীপ বড়ুয়া :
এখন বৈদ্যুতিন জগতে বিভিন্ন সমাজ-মাধ্যম রয়েছে, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে তাঁর বক্তব্য রাখতে পারছেন, বা সাহিত্য রচনারও সুযোগ পাচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, এই ধরনের সমাজ-মাধ্যম, যেমন ধরুন ফেসবুকে লিখে লিখেই জনপ্রিয় লেখক হয়ে উঠছেন আজকাল অনেকেই। এক্ষেত্রে কী সাহিত্যের ভালো হচ্ছে, নাকি ক্ষতি হচ্ছে? আপনি কি মনে করেন?
জয়ন্ত দে :
সম্প্রতি আমার বেশ কয়েকজন লেখকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, যারা সমাজ-মাধ্যমে লিখেই বেশ বিখ্যাত। তাঁদের বই বেরোলেই ৫০০ কপি করে বিক্রি হয়ে যায় এবং বেশ জনপ্রিয়তা দেখেছি পাশাপাশি। কিন্তু খুবই দুর্ভাগ্যের কথা তাঁদের বই যখন পড়তে শুরু করেছি তখন দেখেছি যে এক পাতা দুই পাতার বেশি পড়া যাচ্ছে না। তাঁরা ফেসবুক আর বিভিন্ন সমাজ-মাধ্যমে লিখে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাঁদের একটা পাঠক-গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তাঁরা লিখে তাঁদের পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন, ভালো লাগে।
যাঁরা অনেক সময় বিষয়ভিত্তিক লিখছেন তাঁদের কথা আলাদা। কিন্তু যাঁরা গল্প উপন্যাস লিখছেন তাঁদের দেখেছি ওই ভূত রহস্য অলৌকিকতা, ব্যাস। বাজারের দাবি মেটাচ্ছেন!
আমার কাছে, দুই ধরনের লেখা— ভালো লেখা, আর অপাঠ্য লেখা। ফেসবুক না প্রিন্ট, ব্যাপারটা আলাদা নয়। ভালো না হলে তার পাঠকও বেশিদিন থাকবে না।
শুভদীপ বড়ুয়া :
এখন কী কোনও বড়ো উপন্যাস লিখছেন ‘অন্নপূর্ণা’-র মতো? সেটি সম্পর্কে কিছু বলুন।
জয়ন্ত দে :
আমার বড়ো উপন্যাস বলতে তিনটে। প্রথম লেখা ‘নতজানু’ লিখেছিলাম। তারপর ‘আত্মজন’ লিখেছিলাম, পরে ‘অন্নপূর্ণা’ লিখেছি। এইরকম বড়ো উপন্যাস এই মুহূর্তে আমার কিছু ভাবনায় নেই, তবে একটা বিষয় আছে, কিন্তু সেটার জন্য একটু পড়াশোনা হোমওয়ার্ক করা দরকার। সেটাই করছি। জানি না কবে লিখতে পারব।
আসলে বড়ো উপন্যাস লিখতে গেলে আমার নিজের মনে হয় পাঠকের সঙ্গে তো তঞ্চকতা বা প্রবঞ্চনা করে লাভ নেই, পাতার পর পাতা লিখে কী লাভ। আর সবচেয়ে বড়ো কথা— লেখা তো নিজের আনন্দ। প্রকাশক বা পাঠক পরে। লেখার আগে যদি নিজেকে না বলতে পারি, ‘অন্যরকম লেখা’, ‘আগে কেউ লেখেননি’ এ বিশ্বাস না থাকলে লিখব কী করে। গদ্য লেখা পরিশ্রমের কাজ।
আমি একটা বিষয় পড়ছি, ভাবছি, বিষয়টাকে আমি এভাবে দেখছি, এইভাবে করলাম, এটা বাস্তব, এটা কল্পনা, এটা আমার কথা, আমার দর্শন, এত কিছু নিয়ে একটা বড়ো লেখা তৈরি হয়।
শুভদীপ বড়ুয়া :
আপনাকে শেষ প্রশ্ন। বাংলা-সাহিত্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
জয়ন্ত দে :
এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো যোগ্যতা আমার নেই। বাংলা সাহিত্য তার নিজের জোরেই থাকবে। অন্য কোনো জোরই কোনো দেশের ভাষা বা সাহিত্যকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। আমি মনে করি, যা ভালো লেখা তা থাকবে, আর যা এই সময়ে ঢাক বাজানো হচ্ছে, শিঙা ফোঁকা হচ্ছে, তা বাজার। ভালো লেখা ঠিক থাকবে এবং ভালো লেখার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য থাকবে।
অন্নপূর্ণা: কিছু প্রাসঙ্গিক কথাঃ
আলোচনা করেছেনঃ শুভদীপ বড়ুয়া
আমেরিকান ঔপন্যাসিক হ্যারল্ড ব্রডকী (১৯৩০-১৯৯৬) তাঁর এক ছোটগল্পে লিখেছিলেন, ‘মেয়েটিকে সূর্যের আলোয় দাঁড়াতে দেখে মনে হল মার্ক্সবাদের মরণ ঘনিয়ে এসেছে।’ —কথাটাকে আজকের পৃথিবীতে হয়তো নতুন করে স্মরণ করা কিংবা যাচাইয়ের সেরকম প্রয়োজন নেই, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে একটিবারের জন্য হলেও ভেবে দেখার আছে। ব্রডকী’র গল্পটিতে একটি খুবই অল্প বয়সী ছেলের যখন একটি মেয়েকে দেখে ভালো লেগে যায়, সোনালি চুলের সেই সুন্দর মেয়েটি উজ্জ্বল রোদের নীচে খোলাচুলে দাঁড়িয়েছিল, কোনও অদ্ভুত কারণে সেই ছেলেটির মনে মার্ক্সবাদ এবং কমিউনিজমের অবিনশ্বরতা নিয়ে সংশয় জেগে ওঠে। আসলে মার্ক্সবাদ পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সবরকম সংশয়ের ঊর্ধ্বে থাকা যে আবেগহীন যুক্তিবাদী-তাত্ত্বিক এবং একইসঙ্গে অতিরিক্ত সক্রিয় মনের বীজটি মানুষের ভেতর বপন করতে চেয়েছিল, সেটি ‘সন্দেহবাদী’ মনে পরিণত হতে শুরু করে সাতের দশকের শুরুর থেকে। সমাজতন্ত্র, সেইসঙ্গে কমিউনিজমে বিশ্বাস রেখে চলা মানুষের মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠতে থাকে, এই সমাজ-ব্যবস্থার প্রকৃত রূপটি কি? নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ভেতরে থেকে কি আদৌ ক্ষমতার পতন ঘটানো সম্ভব? অতিরিক্ত নজরদারি-ব্যবস্থা, নিরন্তর সতর্কতা, এবং রাজ-সিংহাসন থেকে পথের ধুলো পর্যন্ত সর্বত্র গুপ্তচর বৃত্তের অদৃশ্য পরিধি পেরিয়ে— এই দুর্ভেদ্য দুর্গের শেষ পরিণতি তবে কি?
হ্যারল্ড ব্রডকী’র গল্পের মেয়েটির বিপরীতে একটি মেয়েকে যদি কল্পনা করা যায়, পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু পরিবারে যার জন্ম, নিম্নবিত্ত বললেও আতিশয্য থেকে যাবে, তীব্র দারিদ্র্যের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষে অল্প বয়স থেকেই পোড়া ইটের মতো কঠিন হয়ে যাওয়া সেই মেয়েটি বলছে— ‘একসময় আমি পকাদার দোকানের আলো ছেড়ে যেদিন পার্টি অফিসে ঠাঁই নিলাম, সেদিন থেকে পকাদা আমাকে ভয় পায়।’
ওপরে লিখিত পংক্তিটি জয়ন্ত দে’র ‘অন্নপূর্ণা’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয়-চরিত্র ‘সেই মেয়েটি’ —যার নামেই উপন্যাসের নাম, এবং এটি তারই ভাষ্য। জনৈক পকা-দা’র দোকানে সে কিশোরী বয়সে যেত আলোর সামনে দাঁড়াবে বলে। পকা-দা দোকানের ভেতর তার সঙ্গে নানান কু-আচরণ করা শুরু করলে সে ঠিক করে পকা-দা’কে পার্টি’র ভয় দেখাবে। সে এরই মধ্যে জেনে গিয়েছে, কলকাতা’র দক্ষিণ-শহরতলির বিস্তীর্ণ উদ্বাস্তু কলোনি অঞ্চলে, বিশেষ করে বৃহত্তর যাদবপুর এবং তাদের টালিগঞ্জের খালপাড়ে, পার্টি’ই প্রথম এবং একমাত্র শেষ কথা। পার্টি যার সঙ্গে রয়েছে, তাকে কিন্তু সকলেই ভয় পায়। সমীহ করে চলতে শুরু করে নিজের থেকেই। সেই পার্টি হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল শাসন করার সঙ্গে সঙ্গে যে পার্টি— কমিউনিজমের মহাতীর্থ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও নিজেদেরকে সবরকম সংশয় এবং সন্দেহের ঊর্ধ্বে রেখে মাথা উঁচু করে টিকে গিয়েছিল আরও দুটি দশক। জয়ন্ত দে তাঁর ‘অন্নপূর্ণা’ উপন্যাসে পশ্চিমবঙ্গের ৩৪ বছরের কমিউনিস্ট শাসনের একটি উল্লেখযোগ্য সময়কে, বিশেষত আট এবং নয়ের দশকের শাসনকালকে একটি সার্থক তথ্যচিত্রের চাইতেও বিশদে লিখতে সক্ষম হয়েছেন। সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট শাসনে গৃহস্থের জমিজমার পরিমাণ থেকে শুরু করে কার বাড়ির মেয়ে কোন বাড়ির ছেলের সঙ্গে প্রেম করছে— সমস্ত কিছুতেই যখন নাক গলাচ্ছে ‘লোকাল কমিটি’ নামে আধিভৌতিক একদল মানুষ, যারা শুধুমাত্র পার্টি-অফিসে বসে থেকেই কিছু না কিছু পরিমাণ অর্থ রোজগার করে জীবন অতিবাহিত করছে, যাদেরকে কেউ কখনো চাকরি বা ব্যবসা করতে দেখেনি— সেই মানুষগুলোর পার্টি’র প্রতি ‘ভালোবাসা’ এবং বলবান পেশীর দাপটেই দীর্ঘকাল নিজেদেরকে সমস্ত সংশয়ের বাইরে রেখে দিতে পেরেছিল পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট শাসকেরা। কিন্তু উপন্যাস ‘অন্নপূর্ণা’ শুধুই কমিউনিস্ট-শাসনের ইতিহাস নয়। প্রাণ বাঁচাতে ভারতে চলে আসা ছিন্নমূল মানুষের করুণ কাহিনি। যাদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গ, তথা কলকাতা’র শহরতলি এলাকায় কলোনি গড়ে উঠেছিল একের পর এক। আবার অনেক কলোনি ছিল জবরদখল। পার্টি, পুলিশ, এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে উদ্বাস্তুদের নিয়ে বিবেকবর্জিত অমানবিক রাজনীতি বিস্তৃতভাবে চিত্রিত হয়েছে ‘অন্নপূর্ণা’ উপন্যাসে। জবরদখল বা ‘বে-আইনি’ কলোনি থেকে উদ্বাস্তুদের উচ্ছেদ করার সূচনাপর্বে সেই কলোনি’র প্রতিটি উদ্বাস্তু নারী-পুরুষকে চাপের মুখে কমিউনিস্ট-পার্টি তথা শাসক-দলে নাম লেখাতে বাধ্য করা হতো। তবেই সেই কলোনি’তে তাদের অতি কষ্টে গড়ে তোলা এক চিলতে বাসগৃহটি কোনোমতে টিকে থাকার প্রতিশ্রুতি পেত। পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে উদ্বাস্তু-রাজনীতির তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়াগুলো প্রত্যক্ষভাবে পরিস্ফুট হয়েছে এই উপন্যাসে। কীভাবে পুলিশ এবং পার্টি’র ক্যাডারবাহিনীর সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই করে উদ্বাস্তুদের ‘অধিকৃত’ জমিটুকুকে আইনি বা ‘অর্জিত’ জমিতে রূপান্তরিত করা গিয়েছে। কীভাবে একের পর এক ‘জবরদখল’ কলোনি সরকারি খাতায় বৈধতা লাভ করেছে।
“পরের দিন দুপুরে পুলিশ এল। কোর্ট থেকে লোক এল। তারা বাঁশ পুঁতে টিনের বোর্ড লাগিয়ে বলে গেল কোর্টের হুকুম চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জমি খালি করে দিতে হবে। বোর্ডের ওপর কোর্টের নম্বর, জমির অনেক অনেক কাগজ আঠা দিয়ে সাঁটা।
ওরা চলে যেতেই মেয়েরা বোর্ড উল্টে ফেলে দিল।
খোকনদা বলল, ‘ওই বোর্ডে কাল কলোনির একটা নাম লিখে দিতে হবে।’
আমি খোকনদাকে বললাম, ‘কী নাম খোকনদা—বিজয়গড়?’
খোকনদা আমার মাথায় হাত বোলাল, বলল, ‘দূর বোকা! বিজয়গড় তো আছে।’
আসলে ততদিনে আমি পার্টি অফিস থেকে জেনে গেছি, ৫১ সালে বিজয়গড় হওয়ার রোমহর্ষক কাহিনি। আমি আঙুল গুনি আজাদগড়, গান্ধী কলোনি, নেহরু কলোনি, শ্যামা কলোনি, শ্রীকলোনি, পল্লিশ্রী, বাপুজিনগর, নবনগর, বিক্রমগড়, বাঘাযতীন…। খুব চিন্তায় পড়ি কী নাম হবে খোকনদা?”
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অন্নপূর্ণা-র সঙ্গে আরও নারী-চরিত্র রয়েছেন এই উপন্যাসে। কিন্তু তাঁরা কেউই শিল্পী বা লেখকের নজরবন্দী থাকতে থাকতে অহেতুক সুন্দরী কিংবা কল্পনাবিলাসে ভর করে বায়বীয় হয়ে যাননি। জয়ন্ত দে’র উপন্যাসের নারীরা শক্তির প্রতীক। তাঁরা একত্রে রুখে দিতে পারেন পুলিশের অত্যাচার, কিংবা নতুন একটি কলোনি’র প্রতিষ্ঠার কালে যাদের ভূমিকা হয়ে উঠতে পারে পুরুষের চাইতেও সক্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। অত্যন্ত রুক্ষ এবং সেইসঙ্গে সীমাহীন দারিদ্র্য-কবলিত উদ্বাস্তুজীবনের সঙ্গে ক্রমাগত লড়াইয়ে উপন্যাসের প্রায় প্রতিটি নারী চরিত্রই যেন উত্তীর্ণ হয়েছে দেবীর ভূমিকায়। বিশেষ করে প্রধান চরিত্র অন্নপূর্ণা— যাকে কেউ ভয় দেখাতে চাইলে, বা অপমান-লাঞ্ছনা করতে চেষ্টা করলে সে কাঁদে না। ভয়ও পায় না। এমনকি কাউকে নালিশও জানায় না। তার মাথায় ঘুরতে থাকে— কখন সে ওই লোকটিকে মারবে, কিংবা মাথা ফাটাবে, নয়তো তাকে প্রচণ্ড জোরে কামড়ে দেবে। এতটা নির্ভীক, সৎ, লড়াকু মনের, এবং সেইসঙ্গে দুঃসাহসী নারী-চরিত্র বহুকাল পর দেখা দিল বাংলা সাহিত্যের পটভূমিতে। জয়ন্ত দে তাঁর ‘অন্নপূর্ণা’-কে সযত্নে এঁকেছেন আধুনিক সাহিত্যের ভাবরীতি অনুসারে। কোথাও তার রূপের বর্ণনা নেই, নেই কোনো প্রেমপূর্বক সৌন্দর্যের প্রকাশ, পাঠক অন্নপূর্ণা-কে বারংবার আবিষ্কার করবেন উপন্যাসের কাহিনির সঙ্গে এগোতে এগোতে, এবং এক স্বয়ংসম্পূর্ণ নারী প্রতিভাত হবেন গল্পের শেষে। পাঠক শুরুর থেকে জানবেন, অন্নপূর্ণার ছিল দীর্ঘ চুল, যে চুলের মুঠি ধরে তার মা তাকে ছোটবেলায় নির্দয়ভাবে প্রহার করত। তার ছিল হৃদপিণ্ডের জটিল রোগ, যার থেকে সে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত হতে থাকে। আর ছিল রাগ, ন্যায়নীতি এবং মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যায় এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কম বয়স থেকেই উদ্বাস্তু জীবনের নানান শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তায় ভুগত অন্নপূর্ণা। রেগে যেত প্রায়ই। সবচাইতে রেগে যেত কাউকে অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করতে দেখলে। কিন্তু কাহিনির শেষ পর্বে অন্নপূর্ণা যখন যুবতী, যে কমিউনিস্ট পার্টি’র সঙ্গে প্রায় শৈশব থেকে অস্তিত্বের জন্য লড়তে হয়েছে তাকে— তখন সেই পার্টি’রই সে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা। পার্টিকর্মী, এমনকি বন্ধুজনেরাও তাকে ‘কমরেড’ বলে সম্বোধন করছে। সেই অন্নপূর্ণা’কে একদিন অনিচ্ছাসত্ত্বেও বড়োসড় আপোস করে ফেলতে হল। না হলে হয়তো তাদের জমিটুকু শেষরক্ষা পেত না। এই কারণেই জয়ন্ত দে নির্মিত ‘অন্নপূর্ণা’ চরিত্রটি অত্যন্ত আধুনিক এবং বাস্তবসম্মত একটি চরিত্র। ধ্রুপদী সাহিত্যের নারীচরিত্র নয় একেবারেই।
অন্নপূর্ণা চরিত্রটিতে আধুনিক নারীর একাধিক বৈশিষ্ট্যের অভিনিবেশ ঘটেছে। সে অতিরিক্ত জেদি এবং যথেষ্ট রাগী হলেও— সে বড়ো একটা উদার বা উদাসীন নয়। বাস্তব জীবনের ছোটবড়ো সবরকমের ‘পাওয়া’-গুলোকে তার পাওয়া চাই। সেইসঙ্গে অল্প বয়স থেকেই তার জানা হয়ে গিয়েছে— অতি সামান্য অধিকারটুকু পর্যন্ত লড়াই করে ছিনিয়ে নিতে হয়, চোখের জল কিংবা ভাবালুতার মূল্য নেই তাদের উদ্বাস্তু-জীবনে। তাই শৈশব এবং কৈশোরে বাবা আর মায়ের থেকে পাওয়া সুরক্ষাটুকুর বাইরে পা রাখার পর থেকেই সে আরও বড়ো এবং সংগঠিত সুরক্ষার জন্যেই নিজেকে অনেকের মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছে। সমগ্রের সুরক্ষাকেই নিজের সুরক্ষা বলে মনে করেছে। সংখ্যাগুরু কমিউনিস্ট পার্টি, অর্থাৎ শাসকদলে ধীরে ধীরে নিজেকে যুক্ত করেছে। উপন্যাসটি তাই শুধুমাত্র একটি উদ্বাস্তু-পরিবারের মেয়ের একাকী লড়াইয়ের কাহিনিও নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের সুদীর্ঘ কমিউনিস্ট শাসনের ইতিহাসে ছিন্নমূল মানুষকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে তারপর তাকে ধীরে ধীরে পার্টি’তে যোগ দিতে বাধ্য করানোর প্রক্রিয়ার একটি অতি বাস্তবনিষ্ঠ বিবরণও অবশ্য করেই। সেইসঙ্গে রয়েছে কলকাতা-শহরতলির উদ্বাস্তু কলোনি’র জনমানুষের মানসজগতের অভ্যন্তরে সুস্পষ্ট আলোকসম্পাত। সব হারিয়ে আসার পরেও কীভাবে ভিন্ন দেশে, নতুন জমিতে, নতুন জীবনটুকু ভিত্তি করেই নতুন অস্তিত্ব গড়ে ওঠে, গড়ে ওঠে আবার নতুন একটি ‘আমি’ —সেসব চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে উপন্যাসের বিভিন্ন নারী এবং পুরুষ চরিত্রের মধ্যে দিয়ে।
তাই এই আলোচনার শুরুতে ব্রডকী’র লেখা গল্পে আলোর নীচে এসে দাঁড়ানো মেয়েটিকে দেখে কারও মনে যদি কমিউনিজমের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় জাগে, জয়ন্ত দে’র ‘অন্নপূর্ণা’ পড়লে বরং পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টি’কে চিরন্তন বা অবিনশ্বর বলে মনে হতে পারে নিঃসন্দেহে। ক্ষমতার দুর্ভেদ্য এক সংগঠিত রূপ এই উপন্যাসে প্রকাশ পেয়েছে, সেইসঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন অথচ অদৃশ্য এক নজরদারির বৃত্তের মধ্যে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের ওষ্ঠাগত হয়ে আসা জীবনের চালচিত্র যেন এই উপন্যাস। যদিও ক্ষমতার সামনে ক্রমাগত আপোস করতে করতে ক্ষয়ে আসা মানুষের মূল্যবোধ এবং বিবেকের পতন যুগে যুগে লিখিত হয়েছে বিশ্ব-সাহিত্যে। এমনকি আজও তার ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু সাহিত্যিক কখনো ভেঙে পড়েন সেই পতনের সামনে, নয়তো তাঁর কলমে গর্জে ওঠে প্রতিবাদ। না হলে সাহিত্যিকের একমাত্র সম্বল— প্রহসন। সেরকমই একটি চমৎকার প্রহসন-অংশ নীচে তুলে দেওয়া হল জয়ন্ত দে’র ‘অন্নপূর্ণা’ উপন্যাস থেকেঃ-
‘প্রসূন বলল, পার্টি ক্ষমতায় এসে যে ভূমি সংস্কার করেছিল, তাতে নাকি ওর ঠাকুর্দার জমি জায়গা হাতছাড়া হয়ে গেছে। তারপর, ওর দাদা সরকারি কর্মচারী। কোঅর্ডিনেশন না করার জন্য নিত্যদিন অফিসে হেনস্তা হচ্ছিল। ইদানীং তাকে বালুরঘাটে বদলি করে দিয়েছে। সেই পরিবারের ছেলে হয়ে প্রসূন এসএফআই করবে! একে বলে ত্র্যহস্পর্শ।
এই সব রাগ এসে পড়েছে প্রসূনের ওপর। ওর বাবা বলে দিয়েছেন, কলেজে সিপিএম করবে, বাড়ি এসে মাগুর মাছের ঝোল-ভাত খাবে, তা হবে না। হাঁড়ির ভাত খেতে হলে পার্টি ছেড়ে আসতে হবে।
বেচারা প্রসূন জ্যোতি বসুকে ছাড়তে পারছে না। বেঁটে জ্যোতি বসু আর ঢ্যাঙা অমিতাভ বচ্চন—ওর দুই হিরো। জ্যোতি বসুর নাম যখনই প্রধানমন্ত্রীর জন্য উঠেছিল, তখনই নাকি প্রসূন বুঝে গিয়েছিল পার্টি জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেবে না। আর শোলেতে অমিতাভ বচ্চন যখন মাউথ অরগান বাজাচ্ছিল আর বিধবা জয়া হাভেলির একটার পর একটা আলো নেভাচ্ছিল, তখনও নাকি প্রসূন বুঝে গিয়েছিল গুরুর আলো নিভে যাবে। গুরু বাঁচবে না।’
আলোচনা প্রসঙ্গেঃ-
অন্নপূর্ণা
জয়ন্ত দে
দে’জ পাবলিশিং
প্রথম প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২০২২
শুভদীপ বড়ুয়া - যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর স্নাতক। সাহিত্যে প্রবেশ 'সন্দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত 'চাকা' (১৯৯৩) গল্পের মাধ্যমে। বিভিন্ন পত্রিকায় লিখেছেন প্রায় শতাধিক ছোটগল্গ, প্রবন্ধ এবং অনুবাদ সাহিত্য। প্রকাশিত বই 'আলোকবিদ্ধ অন্ধকার' (২০০০) একটি অনুগল্পের সংকলন। 'নিঃশব্দ পাহাড়' লেখকের প্রথম বড় উপন্যাস, যার রচনাকাল ২০০১ থেকে ২০১৪। উপন্যাসটি তিন খণ্ডে সমাপ্ত।




0 মন্তব্যসমূহ