আনসার উদ্দিনের গল্প: সজলধারা



আমাদের এদিককার জলে খুব আয়রন। আয়রন মানে যে লোহা তা গাঁয়ের অধিকাংশ লোক জানে না। জল লোহা ? সে আবার কী? লোহার পাইপ বসিয়ে মাটির তলা থেকে জল তোলা হয়। সেই জল আমরা খাই, কাপড় কাচি! গোরু-মোষের পাতনায় ঢেলে দিই! ওজু করি, হাত-পা ধুই। কারও দাঁতকপাটি লাগলে মাথায় ঢালি, দাঁতে ঢালি না। সত্যি এটাই যে, জল না হলে আমাদের চলে না। জলের আর-এক নাম হল জীবন। এই কথাটা সেই কবে থেকে শুনে আসছি। খুব কম জল ব্যবহার করে বেশি উপকার পাওয়া যায় জলপট্টি বা পানিপট্টিতে। জ্বরের সময় সামান্য একটুকরো ন্যাকড়া ভিজিয়ে কপালে রাখলে কী যে আরাম!

যখন জ্বরে মানুষ কাহিল হয়ে পড়ে সে অবস্থায় সামান্য আরামও অনেকখানি। যেহেতু আমরা এ-বাংলার মোছলমান, সে-কারণে জলপট্টি না বলে পানিপট্টি বলি। মুখে যাই বলি না কেন আসলে সেই একই সুখময় অনুভূতি। কিন্তু সমস্যা হল জলের মধ্যে দ্রবীভূত আয়রন নিয়ে। বাড়ির মেয়েছেলেরাও বলছে কলের পানিতে এত আয়রন যে কাচাকাচি করতে করতে কাপড়-জামা হলদে হয়ে যাচ্ছে। হাতে-পায়ের নখগুলো হলদে পোড়া। কলশিতে দশ-বিশ মিনিট রাখলে তলায় সাদা রং-এর গাদ জমছে। পেটে খেলে কী হবে তা নিয়ে মানুষের বড়ো ভাবনা। এই তো ক-বছর আগে আমাদের পাড়ার মজনু মল্লিকের মেয়েকে দেখতে এসেছিল দহকুলা থেকে। একটা মোটরবাইকে ছেলে, ছেলের বোনাই আর বাবা এসেছিল। ছেলের বাবা আবার সেকেলে মানুষ। চাষবাস বোঝে। হাট থেকে বেছে বেছে চাষের বলদ কেনার অভিজ্ঞতা আছে। বাড়ির বউ আর হাটের গোরু পই পই করে দেখে নিতে হয়। গোরু অবলা কথা বলতে পারে না। নাম, বাপ-মা'র নাম গাঁয়ের নাম, মালিকের নাম এসব জিজ্ঞেস করা অবান্তর। মালিকের কাছ থেকে কেনে গোরুর দালাল। এদের কথা বিশ্বাস করা যায় না। অতএব দেখেশুনে কেনো। হাঁটিয়ে দেখ, পিঠে থাবা মেরে দেখ, কাঁধে লাঙল টানা ঘাঁটা আছে কিনা দেখতে হয়। বয়স কত তা দাঁত দেখলে বোঝা যায়। হাটের গোরুকে দাঁত দেখি তো বললে নিজে থেকে দাঁত দেখায় না। মাথা বগলের মধ্যে চেপে ধরে মাড়ি উদোম করে দেখে নিতে হয়। এ বড়ো কসরতের কাজ। মজনু মল্লিকের মেয়েকে দহকুলার ছেলের বাবার পছন্দ হয়েছিল। না, হাটের গোরুর মতো পিঠে থাবা মেরে দেখতে হয়নি। কিন্তু গোরু কেনা স্বভাব যাবে কোথায়! শেষমেশ বলে উঠল মা, তোমার দাঁত দেখাও দিকিন?

এরকম কথা বললে কোনো বিবাহযোগ্য মেয়ে লোক-কুটুম্বের সামনে দাঁত দেখাতে পারে? কেবল একটু মুচকি হেসেছিল। ওই সামান্য হাসিতেই ব্যাপারটা তেলেগুড়ে হয়ে গেল। ছেলের বাবার পছন্দের মেয়ে হঠাৎ অপছন্দ হয়ে গেল। মেয়ের দাঁত হলদে পড়া। আইবুড়ো মেয়ের দাঁত দিয়ে পারা ঝলকাবে, তা না -

মজনু মল্লিকের মেয়েকে পছন্দ হয়েছিল ছেলেরও। দেখার সময় চোখেমুখে হাসি-হাসি ভাব ফুটে উঠেছিল। এখন সেসব হাসি-হাসি ভাব মিলিয়ে গেল। দুঃখ হল তার। রাগ হল বাবার ওপর। এইজন্য হাটের গোরু কেনা লোককে মেয়ে দেখাতে আনতে নেই। আর-একবার বিবেচনা করে দেখার কথা বলতেই ছেলের বাবা বলল, দাঁতে আয়রন।

আগে যখন মানুষ কুয়ো ইঁদারার জল খেয়েছে তখন আয়রন কথাটা কেউ কোনোদিন উচ্চারণ করেনি। ক-দিন পরে হয়তো আর্সেনিকের কথা উঠবে। আমাদের নদিয়া-মুর্শিদাবাদের মাটিতে আর্সেনিকের প্রভাব খুব বেশি। এতে নাকি শরীরের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। গা হাত-পা চুলকায়। সারা গায়ে ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। ডাক্তারবাবুকে এসব দাগ দেখাতে দেখাতে নীচের কাপড় ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে যায় মানুষের, মেয়েমানুষের ।

চারিদিকে আর্সেনিকের গল্প শুনতে শুনতে আমাদেরও কেমন ভয়-ভয় হয়। কী হবে ছেলেমেয়ে নিয়ে? সামান্য দাঁতে আয়রন ধরায় ছেলের বাবা হড়পে গেল। এরপর যদি গালে-মুখে আর্সেনিকের কালো কালো দাগ ফুটে ওঠে! হাসপাতাল থেকে ডাক্তারবাবুরা এসে বলেছে, জল ফুটিয়ে খাও।

আমাদের পাড়ার নিচারণ বেওয়া ফুটন্ত জল খেয়ে বিপত্তি বাড়াল। পরে অবশ্য ওই ডাক্তাররাই বলল, ফোটানো জল ঠান্ডা করে খাও। হাসপাতালের বাবুরা একমুখে কতরকম যে কথা বলে! ঠান্ডা করে যখন খাব তখন অনর্থক কাঠখড় পুড়িয়ে ফোটানোর কী দরকার! আগে কত কুয়োর জল খেয়েছি। পুকুর-পুষ্করিণীর জল আঁজলা ভরে খেয়েছি। কই তখন তো আয়রন, আর্সেনিকের গল্প শুনিনি! আহা কী মিষ্টি ছিল সেই জল! জান জুড়োয়, পিরান জুড়োয়!

পানীয় জল নিয়ে যখন এমন একটা দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটছে, তখন হঠাৎ করে সজলধারা প্রকল্প চালু হল। পথের ধারে মাটি খুঁড়ে পাইপ বসল। পাইপ বসল বটে, আসল কল বসার জন্য জায়গা পাওয়া মুশকিল হল। কোথায় বসানো যায়, কোথায় বসানো যায় করে পাড়ায় ক-দিন ধরে গোলযোগ হল। দফায় দফায় মিটিং বসল। এমন জায়গায় বসবে যাতে পাড়ার সবাই ঘড়া, বালতি বোঝাই করে পানি নিতে পারে। পানি যেমন নেবে, তেমনি বাড়তি পানি কোথায় যাবে সেটাও তো ভাবতে হবে। সে হিসাবে পুবপাড়ার কালো কাসেমের বাড়ির সামনের জায়গাটা সকলের পছন্দের। সবাই ভেবেছিল কালো কাসেম আপত্তি করবে। কারণ পানি খাবে পাড়ার লোক, সে কেন একা জায়গা দেবে? তবু দিল। কারণ বউয়ের কোমরে ব্যথা। ভিনপাড়া থেকে ঘড়া ভরতি পানি আনতে মাজা, পিঠ শুলিয়ে যায়। পাশেই আছে ছোট্ট ডোবা। অনেকটা গোরুর চোখের মতো। ডোবা ছোটো-বড়ো যাই হোক, পথ কাদা হবে না। কারও বউ আছাড় খেয়ে বেইজ্জতি হবে না। অতএব কল বসবে কালো কাসেমের বাড়ির সামনে। আতাগাছের তলায়। পাকা আতা মাথায় খসে পড়লে মরণের কোনো ভয় নেই, যে ভয় থাকে তালগাছে। সে-কারণে সুবদ্দির বাড়ির সামনে থেকে এতদূর অবধি টেনে আনা হল।

কল বসবে পানীয় জলের। টাইমে টাইমে পানি আসবে। সে কারণে কলের নাম টাইম কল। হ্যান্ডেল চাপতে হবে না। বিশুদ্ধ পানি। খেলে গ্যাস, আমাশা হবে না। ছোটোদের কৃমি, অজীর্ণ হবে না, মেয়েদের সাদা স্রাব হবে না।

তাই নাকি?

কালো কাসেমের বাড়ির পাঁজরে দিনু দফাদারের বাড়ি। সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে টাইম কলের মিস্ত্রি পথ খোঁড়াখুঁড়ি করে পাইপ বসাচ্ছে। এতে বড়ো আশা জাগছে দিনু দফাদারের বউয়ের। টাইম কলের পানি খাবে বলে বুকে ছাতিফাটা তেষ্টা নিয়ে বসে আছে ঘরে। বউয়ের অবস্থা দেখে দিনু মাঝে মাঝে তাগাদা দিচ্ছে মিস্ত্রি-মজুরদের। মজনু মল্লিকও কল বসানো দেখছে বটে তবে তার মনটা বিষণ্ণতায় ভরে উঠছে। আর ক-দিন আগে কল বসালে মেয়ের দাঁত দিয়ে পারা ঝলকাত। বিয়ে হত দহকুলায়। পছন্দের মেয়ে হলদে পড়া দাঁত দেখে অপছন্দ হল লোক-কুটুমের। আমাদের পাড়ার খোদ্দারচাচা পরহেজগার। দিনের মধ্যে পাঁচবার নামাজ পড়ে। কখনও আস্তে কখনও জোরে, কখনও-বা নিঃশব্দে। তখন শুধু ঠোঁট নড়ে। যারা নামাজের এসব হালহকিকত বোঝে না তারা হয়েতো ভাববে খোদ্দারচাচা আপন মনে কাউকে গালমন্দ করছে।

আমাদের হাদিছে কাউকে গালমন্দ করার সুযোগ নেই। যা হাদিছে নেই তা কেন খোদ্দারচাচা করতে যাবে? টাইম কল বসবে শুনে চাচা বেশ চনমনে হয়ে উঠল। কিন্তু যেই শুনল তিনবার সময় মেপে পানি আসবে, তখনই মনটা কুঁচকে গেল। দাড়িতে হাত পাকিয়ে বলে উঠল আর দু-বার পানি দিলে টাইম কলের পানিতে কেমন অজু হয়ে যায়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া যায়।

খোদ্দারচাচা খারাপ কিছু বলেনি দিনের মধ্যে পাঁচবার নামাজ পাঠ। কিন্তু পানি আসবে তিনবার। আর দু-বার কীভাবে নামাজ হবে? নামাজ পড়তে গেলে ওজুর পানি চাই। পানি আর-একটি ক্ষেত্রে বড়ো জরুরি, তা হল আগুন নেভানো। কালো চাচা, ঘরে আগুন লাগলে কাসেম একবার জিজ্ঞাসা করেছিল খোদ্দারচাচাকে--

পানি দিয়ে আগে আগুন নেভাব, না নামাজের জন্য ওজু বানাব? প্রশ্ন কানে পৌঁছানোর আগেই খোদ্দারচাচা বলে উঠল কেন, ওজু বানাব। সবার আগে ইবাদত। বুঝলি খ্যাপা। ওজুর পানিতে ঘরের আগুন নেভানোর চেয়ে দোজখের আগুন নেভানো আরও জরুরি।

ধর্মকথা যে-ই বলুক তা নিয়ে তর্ক করতে নেই। করলে পাপ হয়। দোজখের আগুন জমকে ওঠে। সে কারণে সব মানুষ চুপ থাকে। চুপ হয়ে যায় কালো কাসেম। এতে খোদ্দার চাচার মুখে কথা মান্যতা পেয়ে যায়। তা যাই হোক ওসব তর্ক-কথায় কাজ নেই। টাইম কল এসেছে পাড়ায়। জোর কাজ চলছে। সকেট জুড়ে একটার পর একটা পাইপ জোড়া দেওয়া হচ্ছে। দিনু দফাদারের বউ টাইম কলের পানি খাবে বলে এখনও তাকিয়ে রয়েছে হা-পিত্যেশে। আচ্ছা জান বটে মেয়েছেলেটার। দিনু সবাইকে বলে রেখেছে টাইম কলের পেত্থম পানিটা যেন আমার বউকে দেওয়া হয় তা না হলে বুকের ছাতি ফেটে মরে যাবে। নাও নাও মিস্ত্রি, তাড়াতাড়ি করো। অহেতুক চোখ টিপে ফাঁপা পাইপের মধ্যে নজর চালাতে হবে না।

মিস্ত্রিদের থেকে দিনুর তৎপরতা খুব বেশি। সে সকেট এগিয়ে দেয়। পাইপ কাটা ব্লেড এগিয়ে দেয়। আঠার কৌটো, নাট-বোল্ট সবই এগিয়ে দেয়। এসব করতে করতে পুবের সূর্য পশ্চিমে গড়ানি খায়। টাইম কল বসে গেল কালো কাসেমের বাড়ির সামনে। আতা গাছের নীচে। এখন মাঘ মাস। গাছের ডালে আতা ঝুলছে। কাঁচা আতা। কারও মাথায় পড়বে তেমন সম্ভাবনা নেই। দিনু কাতর গলায় বলল-- মিস্ত্রি কল তো বসল, পানি বেরুচ্ছে কই?

টাকমাথার একজন মিস্ত্রি বলে উঠল, তোমার কি কিছু উঠেছে? সেই থেকে পানি-পানি করছ? এই যে কল বসল এটা কী কল বলে জানো?

উত্তরটা জানা আছে বলে টাকমাথার মিস্ত্রির কথার ঠেস তাকে বিশেষ কাবু করতে পারল না। বলল – টাইম কল তাই না ?

ঠিক তাই, টাইম কল। তা পানির আসার টাইম হোক।

ক-টায় টাইম, মিস্ত্রি?

বিকেল চারটেয়।

চারটে বাজতে এখনও আধ ঘণ্টা বাকি। এই আধ-ঘণ্টার মধ্যে অনেক মিনিট আছে সেকেন্ড আছে। গাঁয়ের মানুষ অত সেকেন্ড, মিনিট বোঝে না। দিনু দফাদার তার তৃষ্ণার্ত বউকে টাইম কলের সামনে বসিয়ে দিয়েছে। খোদ্দারচাচা ওই পানিতে ওজু করবে বলে পা-দুটো কলের মুখে এগিয়ে দিয়েছে। এখন দেখা যাক টাইম কলের পানি সবার আগে দিনু দফাদারের বউয়ের মুখে পড়ে, না খোদ্দারচাচার পায়ের ওপর গড়ানি খায়। কালো কাসেম বলল চাচা, আগে মানুষের মুখ, না পা।

খোদ্দারচাচা বললে, নামাজি মানুষের পা বেনামাজির মুখের থেকে ভালো।

আগে ওজু তারপর খাওয়া।

কলমিস্ত্রির দল খোদ্দারচাচার কথায় আপত্তি জানাল। বলল--

মুরুব্বি, সরকার অনেক টাকাপয়সা খরচ করে ট্যাপকল বসাচ্ছে জল খাবার জন্য। ওজুর জন্য নয়। গঙ্গা থেকে পাম্প করে এই জল তোলা হচ্ছে। এই প্রকল্পকে বলে সজলধারা, বুঝলে? গঙ্গা নদীর কথা শুনে খোদ্দারচাচার মুখ দুমড়ে গেল। বলল, হ্যাঁ গো মিস্ত্রি, এ পানি পাতাল থেকে আসছে না? বলি মাটির তলা থেকি?

না মুরুব্বি, গঙ্গা থেকে পাম্প করে তোলা হচ্ছে। তারপর শোধন হচ্ছে। বুঝলে?

শোধন হলেও তো গঙ্গার পানি, না কী বলো?

মিস্ত্রির দল একযোগে বলে উঠল, গঙ্গার পানি তো বটেই। গঙ্গা না হয়ে ছোটোখাটো নদী হলে দু-দিনের মধ্যে শুকিয়ে যাবে।

কথা বলতে বলতে টাইম কলের মুখ দিয়ে ফস্ করে জলের ধারা বেরিয়ে এল। খোদ্দারচাচা লাফিয়ে সরে এল। এতে সুবিধা হল দিনু দফাদারের বউয়ের। টাইম কলের জল প্রথম তার মুখে পড়ল। তেষ্টায় ফেটে যাওয়া কলজে ঠান্ডা হল। মানুষ ঘড়া, বালতি নিয়ে লাইন লাগাল। কালো কাসেমের বউ বাড়ির সামনে থেকে টুক করে জল ভরে আনে। সেই জলে ভাত রান্না। ধবধবে সাদা ভাত। এতটাই সাদা যে খাওয়ার আগে কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা। বাড়ির সামনে ট্যাপকল বলেই সুবিধা তার। নইলে অন্য জায়গা থেকে জল আনতে মাজার ব্যথার শূল টাটানি বেড়ে যেত বউয়ের। এখন বুঝতে পারছে টিউকল আর ট্যাপকলের কত তফাত। একটাতে দু-হাত দিয়ে চাপতে হয়, চেপে চেপে পাতাল থেকে টেনে তুলতে হয়, আর ট্যাপকলের জল কলকলিয়ে বেরিয়ে আসছে আপনা-আপনি। অবশিষ্ট জল সরু নালা দিয়ে এঁকিয়ে-বেঁকিয়ে নেমে যাচ্ছে পাশের গর্ত-গাবার দিকে। পাড়ার মেয়েমানুষের দল তিনবেলা ঘড়িমাপা সময় বুঝে ঘড়া বালতি বোতল ভরে জল নিচ্ছে। মজনু মল্লিকের বউও নেয়। নেয় আর ভাবে এই কল যদি আগে বসত তাহলে মেয়ের দাঁতে আয়রন জমে হলদে হয়ে যেত না। মেয়ে দহকুলাতে কদরে বিক্রি হয়ে যেত। এখন সেই মেয়ে ঢকঢক করে ট্যাপকলের জল খায় আর আয়নায় দাঁত বিছিয়ে দেখে, দেখে আর ভাবে কবে যে এই হলদে পড়া দাঁত থেকে ধারা ঝলকাবে!

সজলধারা প্রকল্প পাড়াময় সাড়া জাগালেও খোদ্দারচাচাকে নিয়ে সমস্যা দেখা দিল। তাকে কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না এই পানি পান করা কোনো দোষের নয়। যে মানুষটা এই পানীয় জলে দিনের মধ্যে পাঁচবার ওজু করার কথা ভেবেছিল, সেই মানুষটা সজলধারার জল দেখে দাঁতকপাটি মেরে বসে আছে। কারণ ওই জল আসছে গঙ্গা থেকে। গঙ্গা হিন্দুদের দেবতা। হিন্দুরা গঙ্গা পুজো করে, মড়া ভাসায়। সেই জল খেলে ওজু নষ্ট, ইমান নষ্ট। সরকার নাকি মোছলমানদের ইমান নষ্ট করার জন্য এমন ফাঁদ পেতেছে। এক ফোঁটা গঙ্গাজল গলায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাকি নামাজ রোজা সব বরবাদ হয়ে যাবে।

তাই নাকি?

ব্যাপারটা নিয়ে পাড়ায় গোলযোগ দেখা দিল। হতে পারে সরকারি চক্রান্ত। দেশটার নাম হিন্দুস্থান। গাঁয়ের আর-এক ইমানদার মানুষ আবদুল্লা ফরাজি বললে আমরা মুসলমান। ইমান বাঁচানো বড়ো দায় বেরাদরনে ইসলাম।

-

শুধু খোদ্দারচাচা বা আবদুল্লা ফরাজি নয় গাঁয়ের বড়ো মাতব্বর শাহেনশা হাজিও ঘোষণা দিল না জেনে না বুঝে সজলধারার পানি পান করা যাবে না।

কালো কাসেম বলল, ওই পানি খেয়ে আমার গ্যাস-অম্বল কেটে গিয়েছে। নিচারণ বেওয়া বললে, আমাশা থেকে মুক্তি পেয়েছি গো। কামাল বললে, বউয়ের ছিরাপের দোষ কেটে গেল। সুবুদ্দি বলল, ট্যাপ কলের পানি খেলে ভালো দাস্ত হয়। ছিরাপ মানে স্রাব। এসব হল মেয়েদের গোপন ব্যাধি।

সজলধারার সাফাই দিতে গিয়ে কামাল বউয়ের গোপন জায়গার খবর দিয়ে ফেলল। এতে করে পাড়ার মেয়ে মদ্দের দল বউটাকে নিয়ে কুকুর ছেঁড়া করতে লাগল। লজ্জায় বউটা আর পাড়ায় মুখ দেখাতে পারে না। সে গাল পাড়ে কামালকে • সব্বনেশে মিসে, উজ-বুঝ নেই, কোথায় কী বলতে হয় জানে না। এখন মানুষে চৌদ্দ নাড়ি দুয়ে দেচ্ছে হাসি-মশকরায়।

কামাল কুপিত হয়ে বললে- - তুমি বললে বলে আমি মানুষের মাঝে জানানদারি করলাম। আমি তো আর হাতগড়া করে বলিনি। কালো কাসেম তো বলল তার গ্যাস-অম্বল ভালো হওয়ার কথা। ওর বেলা কিছু হল না, শুধু আমার বেলা—

কামালের বউ বললে, ছিরাপের কথা বলতে গেলে কেন? মেয়েমানুষের গোপন রোগ, জান না?

কামাল বললে, সবার বউয়ের রোগ আছে। শরীল আছে বলে রোগ আছে। অনেকে অনেক রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি পেয়েছে। কেউ বলে, কেউ বলে না। আমি বললাম। এ দুনিয়ায় দেখছি সত্যি কথাটাও বলা যাবে না।

কথাটা বলে কামাল ফাঁপড়ে পড়ে গেল। তার চেয়েও ফাঁপড়ে পড়ে গেল পাড়ার লোক। সজলধারার জল খাওয়া যাবে কী যাবে না তা নিয়ে মজলিশ বসবে।

সব কিছু হাদিস-কোরানের আলোয় ব্যাখ্যা করা হবে। গাঁয়ে বড়ো বড়ো আলেম উলেমার দল হাজির হবে। তারপর ফতোয়া। এতদিন খেতে হত দু-পাইপের টিউকলের পানি। আবার কি সেই দু-পাইপেই ফিরে যেতে হবে?

টিউকলের জল খাওয়ার কথা উঠতেই মানুষের মন দুমড়ে গেল। ক-দিন ধরে সজলধারার জল খেয়ে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। এখন আবার ফিরে যেতে হবে সেই লোহার হ্যান্ডেলে। খোদ্দারচাচার পোয়াতি পুত-বউ কল চাপতে পারছে না। এই জলে চাচা অজু বানাবে, নামাজ পড়বে। কালো কাসেম ইমান নষ্টের ভয়ে টিউকলের জল কানাই ডাক্তারের ওষুধ গেলা করে গিলছে। নিচারণ বেওয়ার সাতকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। তারও ইমান নষ্ট হবার ভয় ধরেছে। স্বাদহীন কলের আয়রন যুক্ত জল পান করতে করতে মোল্লা-মৌলবিদের গাল পাড়ছে।

ইমান হারানোর ভয়ে সবাই ট্যাপকল থেকে সরে এসেছে। কালো কাসেমের আতাগাছের নীচে ট্যাপকল একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঘড়া বালতি বোতল নিয়ে কেউ জলের জন্য লাইন দিচ্ছে না। এতদিনে আতাগাছের আতায় রং ধরেছে। পাখিতে ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। আধ-খাওয়া আতার ভেতর থেকে কালো কালো বিচি বেরিয়ে এসেছে। সজলধারার ট্যাপকল চলছে। কলের মুখ থেকে তীব্র বেগে জল গড়িয়ে পড়ছে। সরু নালা বেয়ে সেই জল অবলীলায় নেমে যাচ্ছে পাশের ডোবায়। এখানে ভন মশা ওড়ে, মাছি ওড়ে। দিনের মধ্যে তিনবার নিয়ম করে সজলধারার ট্যাপকলের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা জলে পুষ্ট হয় কালো কাসেমের ডোবা। কারও ঘড়া, বালতির ঠং ঠং আওয়াজ কেঁপে ওঠে না কলতলা। একমাত্র মজনু মল্লিকের মেয়ে সমস্ত সামাজিক ও ধর্মীয় বাধানিষেধ অগ্রাহ্য করে কলশি ভরতি জল নিয়ে যায়। তার বিশ্বাস সামনে ফাগুন মাস। নতুন করে বিয়ের সম্বন্ধ আসবে। তার আগেই যদি হলদে পড়া দাঁতে পারা ঝলকায়!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ