![]() |
ক্যারি বারাকা
অনুবাদ :এলহাম হোসেন
নগুগি ওয়া থিয়োং’ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে উড়োজাহাজে চেপে উড়াল দিলাম আর্ভিনের পথে। এর আগের কয়েক সপ্তাহ কাটিয়েছি শীতল ঝড়ো হাওয়ায় জবুথবু আইওয়াতে। ক্যালিফোর্নিয়ার রৌদ্রজ্জ্বল আর উঞ্চ আবহাওয়া আমার কাছে প্রশান্তিদায়ক ঠেকছিল। ট্যাক্সি ক্যাবের পেছনের আসনে চুপচাপ বসে জানালা দিয়ে আমেরিকার বিশাল বিশাল সব ট্রাক পাশ দিয়ে সাঁ সাঁ করে চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখছিলাম। মাঝে মাঝে সমূদ্রের জলের উৎকট অম্লীয় গন্ধ নাকে অস্বস্তি তৈরি করছিল।
কেনিয়ার সাহিত্যের দানবীয় ব্যক্তিত্ব নগুগি। আমার মতো কেনীয় লেখকদের উপর তাঁর প্রভাব বিশাল। ঔপনিবেশিক শাসনামলের শেষের দিকে, অর্থাৎ ১৯৫০ ও ১৯৬০- এর দশকে চিনুয়া আচেবে ও ওলে সোয়িংকার মতো তিনিও সাহিত্যাঙ্গনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন। ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে আফ্রিকার যে বিচ্যুতি ঘটেছিল, তার চিত্রায়ণে আচেবে যদি অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হন, আফ্রিকার ঐতিহ্য ও পশ্চিমা ‘স্বাধীনতার ধারণার’ সংঘাত উপস্থাপনার জন্য তীক্ষ্ণ প্রতিভাসম্পন্ন ওলে সোয়িংকা যদি চেষ্টা করে থাকেন, তবে সেক্ষেত্রে নগুগি হলেন অকুতোভয় যোদ্ধা। তাঁর লেখা একেবারে সোজাসাপটা, আর তাঁর বইগুলোর প্রত্যেকটি এক একটি অস্ত্রের মতো। এ অস্ত্র তাক করা প্রথমতঃ ঔপনিবেশিকদের দিকে, তারপর স্বাধীনতাত্তোর কেনিয়ার অভিজাত শাসকগোষ্ঠীর দিকে।
আমার বয়স যখন ছয় কি সাত, তখন আমি প্রথম আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরী থেকে ধার করে নগুগির লেখা একটি শিশুতোষ গ্রন্থ পাঠ করি। যখন আমার বয়স দশ তখন দ্য ট্রায়াল অব দেদান কিমাথি’র ছেঁড়া একটা কপির সন্ধান পাই। বইটি পেয়েছিলাম আমার ঠাকুরদার ব্যক্তিগত বইয়ের তাকে। এটি একটি নাটক। মিসেরে গিথী মুগোর সঙ্গে লিখেছিলেন নগুগি। বইটি বার বার পড়ি। কেনিয়ার স্বাধীনতা-আন্দোলনের নেতা কিমাথি ঔপনিবেশিক বিচারালয়ের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। তাঁদের আদৌ বিচার করার অধিকার আছে কি-না, তা জানতে চান। (কিমাথি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৭ সালে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।) হাই স্কুলের পুরোটা জুড়ে আমি নগুগির রচনা পড়েছি। কেনিয়ার সব ছাত্রই অবশ্য তাই করে। আমার মামা যিনি একজন পুরোদস্তুর লেখাপড়ার লোক, তিনি নগুগিকে নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। কিশোর বয়সে বইটি পড়েছিলাম। তবে ভালোভাবে বুঝতে পারি নি। ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিকে নগুগি নাইরোবী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্য বিভাগ বাদ দেওয়ার দাবীতে যে বিপ্লব করেছিলেন, বইটি সে-বিষয়ে লেখা। ইংরেজি সাহিত্যের জায়গায় তিনি চেয়েছিলেন আফ্রিকার সংস্কৃতি ও কথ্যসাহিত্য। এর এক দশক পরে নগুগি ইংরেজিতে উপন্যাস লেখা ছেড়ে দিলেন। তার পরিবর্তে যে ভাষার মধ্যে তিনি বড় হয়েছেন সেই ভাষা, অর্থাৎ গিকুয়ু ভাষায় তিনি লিখতে শুরু করেন। আমি আফ্রিকার সাহিত্যের পক্ষের যোদ্ধা নগুগির প্রেমে পড়ে যাই। নাইরোবী বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নগুগি যার জন্য যুদ্ধ করেছেন আমি সেটি নিয়েই পড়াশুনা করতে মনস্থির করেছিলাম। সেখানে ২০১০ এর দশকের গোড়ার দিকে নগুগির আরো উপন্যাস ও আরো নাটক যোগ হয়েছে, সেগুলোর উপর আরো লেখালেখি জরুরি।
নগুগির জীবনের বেশিরভাগ জুড়ে আছে বিংশ শতাব্দী। ঠিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁর জন্ম (১৯৩৮)। তখনও কেনিয়া ব্রিটিশ উপনিবেশ। স্বাধীনতা যুদ্ধের যখন দামামা বেজে চলেছে, তখন তিনি শৈশব ও কৈশর অতিবাহিত করছেন। সারা আফ্রিকা জুড়ে যখন রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক উত্থানপর্ব চলছে তখন তিনি উগান্ডায় যান বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ গ্রহণ করতে। ১৯৬২ সালে উগান্ডা এবং ১৯৬৩ সালে কেনিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। এরপর মানুষের স্বাধীনতার আগের আশা-আকাঙ্ক্ষা হয়ে যায় স্বাধীনতাত্তোর আফ্রিকায় তা তিনি স্বচক্ষে অবলোকন করেন। আঁতকে ওঠেন। লেখালেখির জন্য কেনিয়ার সরকার তাঁকে জেলে নিক্ষেপ করে। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি তাঁর লেখালেখি এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। প্রথমে কেনিয়ায়, পরে নির্বাসিত হওয়ার পর লন্ডনে সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রে। এখানেই গত ত্রিশ বছর অধ্যাপনা করেন। তিনি শুধু ঔপন্যাসিক নন, উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক হিসেবেও ঢেড় পরিচিতি রয়েছে তাঁর। ১৯৮৬ সালে তাঁর প্রবন্ধ-সংকলন ডিকলোনাইজ়িং দ্য মাইন্ড গ্রন্থটি প্রকাশ হয়। প্রাক্তন উপনিবেশগুলোর উপর ইংরেজি ও ফরাসী ভাষার আধিপত্যকে আক্রমণ করে লেখা গ্রন্থটি। সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্য এটি। এখন তো প্রায় প্রতি বছরই ভবিষ্যতবাণী করা একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে যে, এ বছর নগুগি নোবেল পুরস্কার পাবেন। তিনি এ পুরস্কার না পাওয়ার জন্য আমাদের আফসোস করাটাও একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
আসল কথা হলো- ক্যালিফোর্নিয়ায় নগুগির বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে নার্ভাস বোধ করলাম। স্বাভাবিকভাবেই নার্ভস হলে যা যা ঘটে, যেমন- হাত কাঁপা, হাতের তালু ঘামতে থাকা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি শুরু হলো। আমার পরিকল্পনা-- এই কিংবদন্তী লেখক যাঁর বয়স এখন ৮৪ বছর এবং যিনি জীবনের অন্তিম পর্যায়ে প্রবেশ করেছেন, তাঁর একটি প্রোফাইল তৈরি করা।
নগুগি বললেন, আমি আর্ভিনে থাকাকালীন যেন তাঁর সঙ্গে অবস্থান করি। তাঁর শরীরের অবস্থা বেশ খারাপ। তাঁকে সার্জারী করাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে থাকলে তাঁর সঙ্গে কথা বলা সহজ হবে। বেশ অদ্ভূত এক ব্যবস্থা। সাংবাদিকতার যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আমি মানতে চাই, তার সঙ্গে এই পরিস্থিতি যায় না। তবে তাঁর কাছ থেকে আমি যতটা সম্ভব বেশি সময় চাচ্ছিলাম। আমার যুক্তি হলো, আমি এ কাজ পেশাদারিত্ব নিয়ে করতে চাই। গ্যারেজে গাড়ি রেখে হেঁটেই তাঁর লাল ইটের তৈরি বাংলোতে ঢুকে কোরিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে কলিংবেলের সুইস চাপলাম।
আগে কখনও নগুগির সঙ্গে দেখা হয়নি। শুধু একবার তাঁকে দেখেছিলাম ২০১৭ সালে নাইরোবীতে। একটি অনুবাদ প্রকল্প উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। এখন সেই তিনিই আমার সামনে। ঘটনাক্রমে বললেন, গত বছর তিনি নোবেল পাবেন বলে আশা করে সাংবাদিকরা কিভাবে তাঁর বাসার বাইরে সকাল থেকে ভিড় করেছিল। যখন তিনি পেলেন না, তখন তিনি এবং তাঁর স্ত্রী সাংবাদিকদের চা খাইয়ে শান্তনা দিয়েছিলেন। আজকে তিনি শার্ট, ট্রাউর্জাস, চটি সেন্ডেল এবং বাথরোব পরে আছেন। “বেশ, কি মনে করে আমার বাসায় সকাল ৯টায় এসেছেন, বলুন?” আমাকে তাঁর ডাইনিং টেবিলে ডেকে নিয়ে গেলেন। ওখানে বসে কিছু কাজ করছিলেন তিনি। চারপাশে চমৎকার অফ হোয়াইট রং করা দেয়াল। সোফা, চেয়ার, বিছানার চাদর একই রংয়ের। ধূসর। সবকিছু পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। আহামরি কোন ভাব নেই।
আলাপচারিতা শুরু করার পূর্বে, তিনি বললেন, তাঁর আমার ব্যাপারে আরোও কিছু জানা প্রয়োজন। আমার তাঁর সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তিনি জানতে চান। আমার লেখালেখি সম্বন্ধে তিনি বলতে বললেন। কাজেই, যে প্রবন্ধগুলো লিখেছি সেগুলো নিয়ে আমি তাঁকে বললাম। যে উপন্যাসটা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে কাজ করছি সেটির ব্যাপারেও তিনি জানতে চাইলেন। “আপনার মতোই উপন্যাসটি ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে,” আমি উত্তর দিলাম। আশা করলাম, এভাবে বললে তিনি হয়ত বুঝবেন যে, আমরা একই বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখছি। এতে অবশ্য তিনি এ কথার পীঠে কোন কথা বললেন না। তার পরিবর্তে তিনি বরং জানতে চাইলেন, লেখালেখি থেকে জীবন চালানোর মতো পয়সা আসে কি-না। বললাম, আসে। “বেশ তো, ঠিক আছে,” তিনি বললেন। “এ কাজে আমি কখনও সফল হতে পারিনি।”
কলিংবেল বেজে উঠলে আমাদের আলাপচারিতায় ছেঁদ পড়লো। দু’জন লোক ভেতরে ঢুকলো। এরা ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করে, তাঁর জন্য রান্না-বান্না ও কেনাকাটা করে। তিনি বললেন, কয়েক ঘন্টার মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী আসবেন তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগুগির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। ১৯৯৫ সালে তাঁর প্রস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়ে। যদিও ডাক্তাররা বলেছিলেন, তিনি আর মাস তিনেক বাঁচবেন, তবুও তিনি সে ধকল কেটে উঠেছেন। ২০১৯ সালে তাঁর ট্রিপল বাইপাস হার্ট সার্জারী করা হয়। ঠিক ঐ একই সময়ে তাঁর কিডনিও বিকল হয়। ঐ একই সমস্যায় তাঁর এক ভাই মারা যান। যখন তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষৎ হয়, তখন তিনি তেমন একটা বাড়ির বাইরে যেতে পারেন না। প্রতি সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করতে হয়। “অসুস্থতার কারণে আমি আর বের হতে পারি না। আপনাকেই আমার কাছে আসতে হবে। আমি তো রাজা,” হাসতে হাসতে বললেন।
নগুগির অতীতটা জুড়ে রয়েছে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। তবে এখন আমেরিকার এক শহরতলীতে একটা ভদ্রচিৎ জীবন-যাপন করছেন। ২০০২ সাল থেকে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। ওখানে তাঁর স্ত্রী নিজেরিও কাজ করেন। তাঁর নয়জন ছেলে-মেয়ে। প্রথম পক্ষের ছয়জন। আছে অনেকগুলো নাতিপুতিও। প্রতিদিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি গল্পগুজব করেন। সারাটা দিন বাড়িতে কাটান। বই পড়েন, গল্প করেন, ফোন ধরেন এবং বাড়ির বাবুর্চি ও পরিচ্ছন্নকর্মীর কাছ থেকে স্প্যানিস ভাষা শেখেন। প্রতি কয়েক মাস পর পর তিনি একটা না একটা পুরস্কার পান।
ফোন বেজে উঠলে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ফোন ধরলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার শিক্ষাবিদদের একটি গ্রæপের সঙ্গে তাঁর ভিডিও কলে যুক্ত হবার কথা ছিল। ওদের সঙ্গে বিউপনিবেশায়ন নিয়ে কথা বলতে হবে। নগুগি তাঁর সহকারীকে বললেন, তিনি লগ ইন করতে অপারগ। “তবে আমার সঙ্গে একজন তরুণ আছেন,” তিনি বললেন। “ওর নাম বারাকা। ও আমাকে সাহায্য করতে পারবে।” এ কথা বলে ফোনটা আমার হাতে দিলেন। কাজটা আমাকে করতেই হবে। বুদ্ধিমান বলে কথা। ৮৪ বছর বয়সী এক জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে প্রযুক্তি বুঝতে সাহায্য করছি। যখন ওরা কথা বলছিলেন তখন তিনি আমার কাছে একটা ন্যাপকিন চাইলেন। কপাল থেকে ঘাম মুছে ফেললেন। “ক্যালিফোর্নিয়ায় খুব গরম পড়েছে,” নগুগি শিক্ষাবিদদের বললেন। “ভাববেন না যে, আপনাদের প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে গিয়ে ঘামছি।”
অস্বাভাবিকতার স্বাভাবিকিকরণ
ভিডিও কল শেষ করার পর নগুগিকে একটি গান বাজিয়ে শুনালাম। ২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনের কয়েক মাস পরে গানটি কেনিয়ায় খুব হিট করে। গানের শিরোনাম ‘ভাইডা’। লুনিয়োর ভাষায় গাওয়া। এটি অবশ্য নগুগিরও ভাষা নয়, আমারও নয়। কিন্তু গান শুনতে শুনতে তিনি শীঘ্রই শরীর দোলাতে লাগলেন। মাথা ঝাঁকাতে লাগলেন। তবে চেয়ারে হেলান দিয়ে। বললেন, তাঁর সময় আফ্রিকার ভাষার কোন গান জাতীয়ভাবে হিট করতো না। “আমাদের সময় রেডিওতে আফ্রিকার স্থানীয় ভাষায় কোন গান শুরু হলে সুইচ বন্ধ করে দেওয়া হতো। সে--সময় জিমি রোর্জাস--এর গান শোনার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে এমন অবস্থাকে তিনি ‘অস্বাভাবিকতার স্বাভাবিকিকরণ’ বলে মনে করতেন। ঔপনিবেশিতদের ভাষা ছিনিয়ে নিয়ে তদস্থলে বিদেশী ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
“তাহলে কেনীয় ইংরেজি বা নাইজেরীয় ইংরেজি তাহলে কী?” আমি জানতে চাইলাম। “এগুলো কি স্থানীয় ভাষা নয়?”
তিনি আমার দিকে সবিস্ময়ে তাকালেন। “এটা দাসে পরিণত হওয়া মানুষের দাসত্বের স্থানীয় ভার্সন নিয়ে খুশি হওয়ার মতো বিষয়,” তিনি বললেন। “ইংরেজি আফ্রিকার ভাষা নয়। ফরাসীও নয়। স্প্যানিস নয়। কেনীয় ও নাইজেরীয় ইংরেজি একটা স্টুপিড বিষয়। অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিক করার এটা একটা দৃষ্টান্ত। উপনিবেশিতরা ঔপনিবেশিকদের ভাষা নিজের বলে দাবী করা তো দাসত্ব বরণে সফলতারই প্রতীক। ব্যাপারটি বেশ বিব্রতকর।”
তাঁর কথাগুলো শুনে মাথা নত করে বসে রইলাম। ভাবতে লাগলাম, আমি যেহেতু ইংরেজিতে লিখি, তাই আমার ব্যাপারে তিনি কী যে ভাবেন, তা কে জানে। আমি একজন কেনীয় লেখক। একটা ব্রিটিশ সংবাদপত্রের জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এসেছি। আমিও কি তাহলে দাসদের একজন?
লিমুরু, যেখান থেকে সবকিছুর শুরু
কয়েক বছর আগে এক সকালে নগুগির জন্মস্থানের কাছাকাছি এক স্থানে আমি হাঁটছিলাম। ওখানেই নগুগি বেড়ে উঠেছেন। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবী থেকে জায়গাটি ১৮ মাইল দূরে। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছিল চোখেমুখে। আর বুটের তলায় লাল চটচটে মাটি কামড়ে ধরেছিল। আমার গাইড থামলো। বললো, “দেখুন, এই জায়গাটা ছিল আমার দাদার।” আমাদের চারপাশে ছেঁটে দেওয়া সারি সারি চা গাছ। অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। চা-পাতা সংগ্রহের সময় এসে গেছে। ওর কাছে জানতে চাইলাম, কখনও ওরা এই জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিল কিনা। বলল, হ্যাঁ। কিন্তু রাষ্ট্র-ক্ষমতা এতটাই শক্তিশালী যে, ওরা এর বিরুদ্ধে আসলে কিছুই করতে পারেনি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে কেনিয়ার মাটিই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ব্রিটেন কেনিয়াকে প্রটেক্টরেট বানানোর পর থেকেই এই অবস্থা। কেনিয়াকে মনে করা হতো বহিরাগতদের আবাসস্থল। এখানে ধনী ইউরোপীয়রা শিকার করত, খামার বানাত আর আফ্রিকার বুনো পরিবেশের মধ্যস্থলে স্বর্গরাজ্য রচনা করত। লিমুরুর মতো যে জায়গাগুলো আফ্রিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোতে ব্রিটিশরা চা ও কফি উৎপাদন করত। এই অর্থকারী ফসল দু’টো ব্রিটিশ প্রশাসনের খরচাপাতি চালাতে সাহায্য করত। নগুগির জন্ম এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে। ১৯৩৮ সালে। এই পরিবার কেনিয়ার সবচেয়ে বড় নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। নাম আজিকুয়ু। বর্তমানে কেনিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা বিশ ভাগ এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। ভূমিদস্যুদের খপ্পরে পড়ে এই পরিবার একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। নগুগির বাবা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। স্ত্রী ও ২৪ জন সন্তানের প্রতি রূঢ় আচরণ করেন। নগুগির মা ওয়ানজিকু ওয়া নগুগি সন্তানদের স্কুলে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৪০ এর দশক থেকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লেও তিনি বেশ ক্লেশ স্বীকার করে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠান।
ভূমি এবং স্বাধীনতাকামী সৈন্যবাহিনীর গল্প, ব্রিটিশরা যাকে বিকৃত করে মাউ মাউ নামে অভিহিত করে, সেটি আসলে নগুগির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব কাজের ভিত্তিভূমি। নগুগির পরিবারের কেউ কেউ লিমুরুতে এল এফ এ--এর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিরোধ-ব্যবস্থার অংশ ছিলেন। কেউ কেউ আবার ব্রিটিশদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। গুড ওয়ালেস নামে নগুগির বড় ভাই এটির সদস্য ছিলেন। কাবি নামে নগুগির আরেক ভাই যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশদের পক্ষে মায়ানমারে যুদ্ধ করেছিলেন, তিনি ব্রিটিশদের হয়ে এল এফ এ -এর বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন। তাঁর আরেক ভাই যার নাম তাম্বো, তিনি পুলিশদের তথ্যদানকারী হিসেবে একটি নিম্ন পদে কাজ করতেন। গিতোগো নামে তাঁর আরেক ভাই, যে ছিল বধির, তাকে লিমুরুতে এল এফ এ- এর সদস্যদের খোঁজে চিরুনি তল্লাশির সময় ব্রিটিশ পুলিশ পীঠে গুলি করে হত্যা করে। তাকে থামতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কানে শোনে না বলে না থামায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
একবার কিশোর বয়সে এমন অভিযান চলাকালে নগুগি ও তাঁর বন্ধু পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। দিনের বেলা স্থানীয় তথ্যদাতাদের মাথা সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকতো। এরা রাস্তায় ব্রিটিশ সৈনিকদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। আজিকুয়ু গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে যারা ব্রিটিশদের অনুগত তাদের দিয়ে একটি প্যারামিলিটারী গঠন করেছিল ব্রিটিশ প্রশাসন। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন জুনিয়র ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা। এই বাহিনী যাকে সন্দেহ করত তাকেই আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করত। তার বয়স যাই হোক না কেন। এদের সঙ্গে থাকা হুড পরা তথ্য সরবরাহকারীরা মাথা নেড়ে বলে দিতেন-- এরা এল এফ এ-এর সদস্য কি--না। নগুগির তৃতীয় উপন্যাস আ গ্রেইন অব হুইট--এ এমন তথ্য-সরবরাহকারীদের নিয়ে গল্প আছে। ব্রিটিশ অফিসাররা নগুগি ও তাঁর বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেন। যাওয়ার সময় তাঁদের আর পেছনে তাকানোর সাহস হয় না কারণ, পেছনে তাঁরা তখন গুলির শব্দ ও আর্তনাদ শোনেন। তথ্য সরবরাহকারীরা যাদের সনাক্ত করেছে এবং যারা জিজ্ঞাসাবাদের উত্তর দেয়নি, তাদের এভাবে হত্যা করা হয়।
সালটা ১৯৫৫। কয়েকমাস পরে এলিট বোর্ডিং স্কুল এলায়েন্স থেকে প্রথম সাময়িকী পরীক্ষা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে এসে নগুগি একটা দুঃখজনক বিষয় আবিষ্কার করেন। উল্লেখ্য যে, বৃত্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত এই স্কুলের বেতন মেটাতে নগুগির পারবিারকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। “বাড়ি ফিরে ব্যাগটা নামিয়ে চারপাশে তাকালাম,” নগুগি তাঁর স্মৃতিকথায় লেখেন। “ছাইরঙা পাতার গাছটি যেখানে লাগিয়েছিলাম, সেখানেই ছিল। কিন্তু ঝোপের ওপারে আমাদের বাড়িটি বিধ্বস্ত ও পোড়া এক ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে পড়ে রয়েছে। এখানে ওখানে মাটির ঢেলা, কাঠ, ঘাস পড়ে আছে। আমার মা’র কুঁড়ে ঘর আর আমার ভাইয়ের বাড়িটা যেগুলো লম্বা লম্বা পিলারের উপর স্থাপিত ছিল, সেগুলো একেবারে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনমাস আগে এলায়েন্স স্কুলে গিয়েছিলাম, এখন সেটি আর নেই।” ব্রিটিশরা পুরো গ্রাম ধ্বংস করে দিয়েছে। সব বাসিন্দাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে সুরক্ষিত একটি স্থানে যেখানে তাদের কাজকর্ম ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। কিন্তু সেটি প্রিজন ক্যাম্প ছিল না। কারণ, বাসিন্দারা বাইরে যেতে পারত। তবে নগুগি লিখেছেন, “বাস্তবিক উদ্দেশ্য প্রিজন ক্যাম্প, শরণার্থী ক্যাম্প ও জেলখানার বিভাজক লেখাগুলো এখানে একাকার হয়ে গিয়েছিল।” রাতের বেলা সৈনিকরা গ্রামবাসীদের টেনেহিচড়ে বাইরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করত। এল এফ এ -এর সদস্য বলে সন্দেহ হলে হত্যা করত।
জেম্স এবং নগুগি
নগুগির ক্যারিয়ার সুস্পষ্টভাবেই দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথম নগুগির লেখক হিসেবে জন্ম ১৯৫০ এর দশকে উগান্ডার ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা ছাপানোর মধ্য দিয়ে। এটি চলে ১৯৬০ এর দশক পর্যন্ত। তখনকার নগুগি জেম্স নগুগি নামেই পরিচিত ছিলেন। কখনও কখনও জেটি নগুগি নামেও পরিচিত ছিলেন। লিখতেন ইংরেজিতে। তাঁর উপন্যাসগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সমালোচনায় মুখর। সু²ভাবেই তিনি এ কাজ করতেন। তাঁর প্রধান চরিত্রগুলো ঔপনিবেশিকতার প্রভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত থাকতো। এরা ক্যালিবানের মতো পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে দেখতো যা দিয়ে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধ-প্রপঞ্চ নির্মাণ করা সম্ভব। এরা খ্রিস্টান ধর্মের বিরুদ্ধে ছিল না। এরা স্বপ্ন দেখতো স্থানীয় ঐতিহ্যকে উৎকৃষ্ট পশ্চিমা আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করার। তবে এরা এর বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। ১৯৭০ এর দশকে এসে নগুগির পুনঃজন্ম হয়। নগুগি তাঁর ইংরেজি নাম ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে লেখালেখির প্রথম ভাষা হিসেবে ইংরেজি ত্যাগ করেন। মার্কস ও ফানো গভীর পাঠের প্রভাবে তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, শ্রেণীভেদ, বৈষম্যমূলক শিক্ষা এবং সবকিছুর বিরুদ্ধে কলম ধরেন। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তাঁর পেটাল্স অব ব্লাড স্বাধীন কেনিয়ায় গর্জে ওঠা নব্য রাজনৈতিক অভিজাতদের তিনি আক্রমণ করেন। ‘নগুগি’ নামে যে উপন্যাসই তিনি প্রথম লেখেন এবং সর্বশেষ ইংরেজি ভাষায় লেখেন সেটিই এই পেটাল্স অব ব্লাড। এই উপন্যাসে তিনি দেখান, শিক্ষা আসলে মুক্তির চাবীকাঠি নয়। বরং শিক্ষিত অভিজাতরা সাধারণ কেনীয়দের ঠকায়। সাহিত্য সমালোচক নিকিল সাভাল বলেন, নগুগি তাঁর ক্যারিয়ারের মাঝামাঝিতে এসে কেনিয়ার বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে লিখতে শুরু করেন। এরা গল্ফ খেলে, মজা করে, অথচ এক সময় এরা ঔপনিবেশিকতাকে গালমন্দ করত।
জেমস নগুগি হিসেবে যখন লেখালেখি শুরু করেন তখন থেকেই নগুগি কোন শব্দ কোথায় প্রয়োগ করবেন এবং কোন বাক্য কিভাবে লিখবেন, তা নিয়ে গভীরভাবে পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন। জোসেফ কনরাড ছিলেন তাঁর আদর্শ। “আমি যখন লেখক হিসেবে তরুণ তখন তাঁর ভাষার উচ্চগুণ ও সাঙ্গীকীকতা আমাকে মুগ্ধ করত। লেখালেখিতে আটকালে হয় বিথোভেনের ফিফ্থ সিম্ফোনি শুনতাম, না হয় কনরাডের নস্ত্রোমো-র প্রথম দিকের পাতাগুলো পড়তাম,” পরবর্তীতে তিনি এমন সব কথা লিখেছিলেন। নগুগির মতে, তাঁর রাজনীতির কাছে স্টাইল গৌণ। তাঁর রচনাসমূহ পশ্চিমা ধর্ম, শিক্ষা, ভাষা ও স্বাধীনতাত্তোর কেনীয় রাজনৈতিক নেতাদের আক্রমণ করেছে। এই নেতারা সাধারণ জনতাকে প্রতারিত করেছে।
প্রথম নগুগি লিখেছেন A Grain of Wheat, আর দ্বিতীয় নগুগি কয়েক দশক পরে এটির পুনর্লিখন করেছেন। এই উপন্যাসের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে এল এফ এ যোদ্ধারা একজন ব্রিটিশ বাসিন্দাকে আক্রমণ করে ধর্ষণ করে। এই দৃশ্য কেবলমাত্র উপন্যাসটি প্রথম সংস্করণে দেখা যায়। দ্বিতীয় সংস্করণের থেকে এই দৃশ্য সরিয়ে ফেলা হয়। এল এফ এ যোদ্ধাদের কাজে-কর্মে অধিকতর মার্জিত হিসেবে দেখানো হয়। যখন নগুগিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কেন এই পরিমার্জন করেছেন তখন তিনি বললেন, “কেনিয়াতে একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলার এভাবে ধর্ষিত হওয়ার একটাও দৃষ্টান্ত নেই। একজন ইতিহাসবিদ বিষয়টি আমাকে ধরিয়ে দেন। আমি চাই না, আমার উপন্যাস কেনিয়ার মানুষদের সংগ্রামের ইতিহাসের বিষয়ে মিথ্যা কথা বলুক।”
ভাষা প্রশ্ন
নগুগিকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে দুপুরে লোক এসে হাজির হলো। চিকিৎসা-পদ্ধতির ব্যাপারে আমার কেমন এক ধরনের গা-ঘিনঘিনে ব্যাপার রয়েছে। সুঁচ দেখলে ভয় পাই। কাজেই, ওদের জায়গা করে দিতে সরে যেতে উদ্যত হলাম। নগুগি ঈশারা করলেন, বললেন, আমি চাইলে থেকে যেতে পারি। গা শিউরে উঠলো এই ভেবে যে, স্বাস্থ্যকর্মী এখন তাঁর সঙ্গে যা যা করবেন তার সবকিছু আমাকে দেখতে হবে। মহিলাটি একটা সিরিঞ্জ বের করলেন। নগুগি আমার সঙ্গে কথা বলে চললেন। উনি যা বলে গেলেন তার কিছুই আমার কানে ঢুকলো না। সামনে সিরিঞ্জ দেখে ভয়ে একেবারে জমে গেছি। মহিলার হাতে ডিজনির সেলাইয়ের ট্যাটু আঁকা ছিল। সেদিকে মনোযোগ দিলাম।
মহিলা চলে যাবার পর আরামে শ্বাস নিতে পারলাম। এরপর নগুগির সঙ্গে বসে দুপুরের খাবার খেলাম। নরম করে লবন ছাড়া চিকেন আর সবজি রান্না করা হয়েছে নগুগির জন্য। “এখন আমার শরীর এটুকুই নিতে পারে,” তিনি বললেন। খেতে খেতে আমরা আলাপ-আলোচনা চালিয়ে গেলাম। ঔপনিবেশিকতা, শিল্প ও ভাষা নিয়ে যে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, এই আলাপচারিতা অবশ্য তার বাইরে। খাবার সেরে তিনি তাঁর শোবার ঘরে চলে গেলেন। একটু ঝুঁকে পড়ার কারণে নগুগির উচ্চতা কয়েক ইঞ্চি কমে গেছে। পেছনে হাত ভাজ করে সামনের দিকে ঝুঁকে কষ্ট করে হেঁটে গেলেন। মাঝে মাঝে হাঁটার সময় লাঠিও ব্যবহার করেন। কালেভদ্রে ওয়াকার ব্যবহার করেন। এমব্রয়ডারী করা কলারযুক্ত প্রিন্টের শার্ট পরেন। ক্যাথেটারের সুবিধার্থে এটি তিনি সহজে খুলে ফেলতে পারেন।
নগুগি ধীরে ধীরে ভারী গলায় কথা বলেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন দেখা ইংরেজি ভাষার উচ্চারণের সঙ্গে মিশিয়ে গিকুয়ু ভাষায় তিনি কথা বলেন। ধীরে ধীরে। প্রায়ই বাক্যের শেষের শব্দটির উপর জোর দিয়ে শেষ করেন। যে মতামত তিনি গ্রহণ করতে পারেন না সেটি শোনার পর বলেন, “হায় ঈশ্বর!” রাগ না করেও যা তিনি পছন্দ করেন না, তা খারিজ করে দেন। আপনাকে থামিয়ে না দিয়েও তিনি তাঁর মতের ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিতে পারেন। তাড়াতাড়ি হাসতে পারেন। কোনকিছুকে হাস্যকর মনে হলে তিনি হাসেন। হাসার সময় দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকেন। মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলেন, “হায় ঈশ্বর!” কোনকিছুকে রসিকতা বলে মনে হলে তিনি হাত দু’টো মাথার উপর উঁচু করে ধরেন। তবে এ ধরনের নড়াচড়া তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। মাঝে মাঝে হাসতে হাসতে কাশি চলে আসে। এতে অনেকবার সার্জারী করার কারণে তাঁর পেটে যেসব সেলাই দেওয়া হয়েছে সেগুলোতে টান পড়লে তিনি বেশ ব্যাথ্যা অনুভব করেন।
কয়েক ঘন্টা আমরা টেবিলে কাটালাম। নগুগি আপাদমস্তক একজন অধ্যাপক। তিনি তাঁর প্রিয় বিষয়বস্তুর উপর কথা বলতে থাকেন। তাঁর প্রিয় বিষয়- ভাষা ও শ্রেণিভেদ। (“আমি বিশ্বটাকে নৃতাত্ত্বিকতার বা সাম্প্রদায়িকতার লেন্স দিয়ে দেখি না।” এক পর্যায়ে নগুগি আমাকে বললেন,“সাম্প্রদায়িকতার জন্ম হয় শ্রেণিবৈষম্য থেকে।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি ক্ল্যারেন টমাসের দৃষ্টান্ত দিলেন। “উনি আমার মতই কালো। কিন্তু তিনি যেসব আইন পাশ করেন, তার সবগুলো কালোদের বিরুদ্ধে। তবে কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যবিত্ত শ্রেণি নয়। কৃষ্ণাঙ্গ খেটে খাওয়া মানুষদের বিরুদ্ধে”।)
বাইরে তখন সাঁঝের অন্ধকার নেমে আসছে। ক্যালিফোর্নিয়ার নির্মম সূর্য পাটে নামতে শুরু করেছে। চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসছে। নগুগি টেবিল চাপড়ালেন। “গিকুয়ু ভাষায় একে মেঠা বলা হয়,” তিনি বললেন। এই শব্দ কোত্থেকে এসেছে, জানেন?
“কিশোয়াহিলি থেকে,” উত্তর দিলাম।
“কিশোয়াহিলি আবার কোত্থেকে নিয়েছে?”
“জানি না।”
“পর্তুগীজ ভাষা থেকে,” নগুগি বললেন।
“ভাষা তো এভাবেই কাজ করে। এরা একে অপরের কাছ থেকে রসদ ধার করে।”
“অনেকগুলো ফার্স্ট লেঙ্গুয়েজ থাকা কি সম্ভব?” জিজ্ঞেস করলাম।
“ইংরেজি, কিশোয়াহিলি, শেং ও ধলু- আমার ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ। যেহেতু আমি সবগুলো ভাষা স্থানীয় উচ্চারণে ব্যবহার করতে পারি।” নগুগি বললেন, “আমার মনে হয়, আপনি নিজের সঙ্গে মিথ্যাচার করছেন।”
ক্যারী নামের লোকটি
কেনিয়ায় অনেক লোকই তো তিনটি ভাষায় কথা বলে। তারা এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় যেতে পারে। এটি তো আত্মপরিচয়েরও অংশ। ইংরেজি আর সোয়াহিলি দাপ্তরিক ভাষা। স্কুলের ভাষা, বিচারালয়, রাজনীতির ভাষা। যদিও সোয়াহিলির তুলনায় প্রায়ই ইংরেজি বলা হয়। এটি শিক্ষাব্যবস্থারও প্রভূত্বকারী ভাষা। শেং ভাষাও রয়েছে। এটি শহুরে ভাষা, বিশেষ করে তরুণ--তরুণীদের ভাষা। সোয়াহিলি, ইংরেজি ও কেনিয়ার অন্যান্য ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে। আমি তিনটি ভাষায় কথা বলি। তবে ধলু ভাষাতেও কথা বলি। লু-ও নামের যে জনগোষ্ঠী থেকে আমার আগমন, এটি তারও ভাষা।
আমার জানা মতে, বেশিরভাগ আফ্রিকান লেখক ঔপনিবেশিকদের ভাষায় লেখেন। কিন্তু কোথাও দুই বা ততোধিক আফ্রিকান লেখক সমবেত হলেই তাঁরা প্রশ্ন করেন, আফ্রিকার ভাষাসমূহে লিখে তাঁদের ক্যারিয়ার তৈরি করা সম্ভব কিনা। এ ব্যাপারে আমি নগুগিকে জানালাম। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, তাঁকেও এমন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয় কি-না। তিনি বললেন, গিকুয়ু ভাষায় লিখতে তিনি স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে ছিল না। নগুগিই যে প্রথম গিকুয়ু ভাষায় সৃজনশীল রচনা লিখছেন, তা কিন্তু নয়। যা তাঁকে বিশেষভাবে আলাদা করেছে, তা হলো তাঁর ক্যারিয়ারের বিশাল ব্যাপ্তি। আফ্রিকান ভাষায় ফিরে আসার পূর্বেই তিনি ইংরেজি ভাষায় লিখে সাফল্য লাভ করেন।
পেটাল্স অব ব্লাড-এর পরে তিনি তাঁর সবগুলো উপন্যাস প্রথমে লেখেন গিকুয়ু ভাষায়। তারপর অনুবাদ করেন ইংরেজিতে। জানালেন, তাঁর প্রথম দু’টি ইংরেজি উপন্যাস গিকুয়ু ভাষায় অনুবাদ করছেন। বললাম, সম্প্রতি আমার পরিচিত একজনের বুক সেলফে তাঁর জেম্স নগুগি নামে ছাপানো বই দু’টি দেখেছি। “হায়, হায়! আমি খুব লজ্জিত,” তিনি বললেন। “কিন্তু মজার ব্যাপারটা হলো যখন আমি উপনিবেশিত কাউকে নিয়ে ঠাট্টা করি তখন জেমস নগুগিকে নিয়েও ঠাট্টা করতে পারি। তবে এতে অবশ্য কেউ কিছু মনে করেন না।”
নগুগি জানতে চাইলেন, আমার ইংরেজ নাম কী? বললাম, “ক্যারী।”
“ওহ, অবশ্যই এ নাম আপনার ত্যাগ করা উচিত”, তিনি বললেন। কেনিয়াতে যাদের নাম ক্যারি তাদের বেশিরভাগের নাম রাখা হয়েছে এডওয়ার্ড ক্যারি ফ্রান্সিসের নামানুসারে। কেনিয়ার ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থায় সম্ভবত তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। (তবে আমার নাম ক্যারির নামানুযায়ী রাখা হয়নি। একবার বাবা বলেছিলেন, আমার এ নাম রাখার কারণে তিনি অনুতপ্ত। কারণ, লোকজন সাধারণভাবে ও রকমই মনে করে।) ফ্রান্সিস ছিলেন ক্যাম্ব্রিজের গণিতশাস্ত্রের অধ্যাপক। ১৯২৮ সালে তিনি একাডেমিক ক্যারিয়ার ত্যাগ করে যোগ দেন একটি ব্রিটিশ মিশনারী সোসাইটিতে। এই মিশনারী সোসাইটি তাঁকে কেনিয়ায় পাঠায় শিক্ষক হিসেবে।
ফ্রান্সিস প্রথমে পশ্চিম কেনিয়ার মাসেনো স্কুলে পাঠদান করেন। ওখানে খুব শীঘ্রই তিনি প্রধান শিক্ষক হন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর ছাত্ররা অনুগত ও সুশৃংখল হিসেবে গড়ে উঠবে এবং পুরো ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করবে। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন ওগিংগা ওদিংগা। তিনি পরে গণিতশাস্ত্র পড়ানোর জন্য ফিরে আসেন। তাঁর স্মৃতিকথায় ওদিংগা তাঁর পুরাতন শিক্ষকের সঙ্গে দ্ব›েদ্বর কথা লিখেছেন। তিনি এখন তাঁর বস। ফ্রান্সিসের নিয়মকানুনের মধ্যে একটা ছিল যে, আফ্রিকান ছাত্র ও শিক্ষকগণ পাজামার পরিবর্তে শর্ট্স পরবে। ঔপনিবেশিক আমলের পদক্রম মনে করিয়ে দিতেই তাঁর এই ব্যবস্থা (ওদিংগা ফ্রান্সিসের এই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানালেন। সানডেগুলোতে তিনি স্যুট পরিধান করতেন।) আফ্রিকান টিচিং স্টাফদের কেবলমাত্র ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণির টিকিট কাটার অনুমোদন ছিল। ওদিংগা যখন তাঁর পরিবারের জন্য ট্রেনের দ্বিতীয় শ্রেণির টিকিট কাটলেন, তখন ফ্রান্সিস তাকে তিরস্কার করলেন। এতে ওদিংগা চাকুরি ছেড়ে দিলেন। এই দু’জনের মধ্যে আর কখনও বাক্যালাপ হয়নি। পরবর্তীতে কেনিয়া স্বাধীনতা লাভ করলে ওদিংগা স্বাধীন কেনিয়ার প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।
১৯৪০ সালে ফ্রান্সিস অ্যালায়েন্স স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। সেই পদে তিনি ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ছিলেন। অ্যালায়েন্স হলো লিমুরুর কাছে অবস্থিত ছেলেদের বোডিং স্কুল। এখানে যেসব কেনিয়দের ব্রিটিশরা তাদের সরকারের অংশ বানিয়ে নিতে চায়, তাদের ট্রেনিং দেওয়া হতো। ১৭ বছর বয়সে নগুগি এই স্কুলে ভর্তি হন। এখানকার ছাত্রদের ব্রিটিশদের নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে কিছুই জানতে দেওয়া হতো না। In the House of the Interpreter নামক স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে নগুগি লিখেছেন, অ্যালায়েন্স স্কুলে ছেলেদের বৃটিশ হয়ে উঠতে শেখানো হতো।
নগুগি ছিলেন অ্যালায়েন্স স্কুলের যোগ্য ছাত্র। তাঁর প্রথম লেখা ১৯৫৭ সালে স্কুলের ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। এই প্রবন্ধে জেটি নগুগি, ফর্ম-৩ এ ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার প্রশংসা করেন। খ্রিস্টধর্মের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একে তিনি “দ্য গ্রেস্টেট সিভিলাইজিং ইনফ্লুয়েন্স” বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, এটি গিকুয়ুকে ডাকিনিবিদ্যা হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। স্কুলের অ্যাসেম্বেলির সময় তিনি গাইতেন, হে ঈশ্বর, মহান রাণীকে রক্ষা করুন। অথচ তখন তাঁর ভাইবোনের মধ্যে কেউ কেউ ব্রিটিশ সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। নগুগির সঙ্গে ক্যারি ফ্রান্সিসের শেষ দেখা হয় ১৯৬৪ সালে। কেনিয়ার স্বাধীনতার এক বছর পর। তখন নগুগির প্রথম উপন্যাস বেরিয়েছে। তিনি স্কুলের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন। সেখানে ফ্রান্সিস নামের এক ছাত্রের সঙ্গে একই ডেস্কে তিনি বসেছিলেন। অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণের পর তিনি সাধারণ শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। নগুগির বক্তৃতা শুনেছিলেন। ছাত্রদের সঙ্গে তিনিও প্রশ্ন করেছিলেন। যিনি লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তাঁকে তিনি কী উপদেশ দেবেন? কল্পনা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দাবীর মধ্যে তিনি কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করেন?
এই স্মৃতিচারণে নগুগি হাসলেন। “ওটা ছিল ফ্রান্সিসের দ্বিধাদ্বন্দ্বর একটা অংশ,” তিনি বললেন। তিনি আফ্রিকান শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। কিন্তু তাঁর শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব ছাত্র তৈরি করা যারা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করবে না। তিনি ছাত্রদের সঙ্গে মাস্তানি করতেন। অথচ ছাত্রদের সঙ্গে বসে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তাঁর লেখার ব্যাপারে নগুগিকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন।
১৯৬৬ সালে ফ্রান্সিস মারা যান। অ্যালায়েন্স স্কুলের মাঠেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর অন্তুষ্টিক্রিয়ায় যাঁরা অংশ নেন তাঁরা সবাই কেনিয়ার প্রথম সারির রাজনীতিক। সংসদের পনের জনের মধ্যে ৯ জনই অ্যালায়েন্স স্কুলের ছাত্র ছিলেন। কেনিয়ার প্রথম এটর্নি জেনারেল, প্রথম সেন্ট্রাল ব্যাংক গভর্নর এবং প্রথম পুলিশ কমিশনার অ্যালায়েন্সের ছাত্র ছিলেন।
নগুগির কাছে জানতে চাইলাম, ভালো ঔপনিবেশিক বলে কি কিছু আছে? “হায় ঈশ্বর,” তিনি বলে উঠলেন। এমন কিছু নেই। ঔপনিবেশিকতাবাদ একটি ব্যবস্থা। আপনি বন্দুক বহন করছেন নাকি বাইবেল বহন করছেন-- তা কোন ব্যাপার নয়।” তিনি হাসলেন। “অবশ্যই যে ঔপনিবেশিক শাসক বাইবেল বহন করছেন তাকেই আমি মোকাবেলা করব। বন্দুকবাহীকে নয়। তবে শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে দু’জনের চরিত্র একই রকমের।”
সম্মেলন
১৯৫৯ সালে নগুগি উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় পৌঁছলেন। তিনি পূর্ব-আফ্রিকার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়তে গেলেন। কাম্পালা নগুগির চোখ খুলে দিলো। তার মতে, “কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত আধুনিক শহরের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ।” সে সময় এটি ছিল পূর্ব-আফ্রিকার সাহিত্য-রাজধানী। কাম্পালা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তিনি কৃতজ্ঞ, কারণ এটি আফ্রিকার লেখকদের প্রথম প্রজন্মের জন্ম দিয়েছে। নগুগির পাশাপাশি বিশিষ্ট সমালোচক পিটার নাজারেথ, কেনিয়ার কবি জোনাথান কারিয়ারা, উগান্ডার লেখক জন নাগেন্দা এবং পিও ও এলভানিয়া জিরিমুও ছিলেন সেখানে। পিও ও এলভিয়ানা জিরিমুর পরবর্তীতে বিয়ে হয়।
১৯৬২ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় একটি কনফারেন্সের আয়োজন করে। এটি শুধু নগুগির জন্য নয়, আফ্রিকার ভবিষ্যত লেখকদের জন্য একটি গঠনমূলক ভূমিকা রাখে। আফ্রিকার লেখকদের নিয়ে সেটিই ছিল প্রথম সুসংগঠিত কনফারেন্স। যে লেখকদের নিয়ে নগুগি খুব উত্তেজিত ছিলেন, যেমন চিনুয়া আচেবে, জন পেপার ক্লার্ক, এজকায়েল মুফাষলেলে (পরবর্তীতে তাঁকে এস্কিয়া বলে ডাকা হতো) তাঁদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ব্যাপারে নগুগি খুব উৎসাহী ছিলেন। আফ্রো-আমেরিকান কবি ল্যাংস্টন হিউয়েজও আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন এই সম্মেলনে। নগুগি তাঁর গাইড হিসেবে কাজ করতে পেরে খুবই আপ্লুত ছিলেন।
সন্ধ্যায় লেখকরা চলে যেতেন শহরে। সাহিত্য পত্রিকা ট্রানজ়িশন-এ কনফারেন্সের বর্ণনা দিয়ে নগেন্দা লিখেছেন, একরাতে তিনি এক লেখকের এক ভয়ঙ্কর গল্প-পাঠ শুনছিলেন। এক ঠাকুরদা তাঁর ছেলের কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিল। পরবর্তীতে সবাই গিয়েছিলেন কাম্পালার সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাব টপ লাইফে। ওই ক্লাবের লোকজন খুব শক্তভাবে পোষাক-আশাকের আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারটি মেনে চলতেন। পুরুষরা স্যুট পরতেন। নারীরা পরতেন সান্ধ্যকালীন পোশাক। উচ্চস্বরের কঙ্গোলিজ রাম্বা সঙ্গীত চলত সেখানে। জ্যাজও চলতো। নৃত্য-মঞ্চে লেখকরা জোড়ায় জোড়ায় নৃত্য করেন। সোয়িংকা ব্যান্ডের সঙ্গে গীটার বাজিয়ে এবং নৃত্য করে সবাইকে মুগ্ধ করেন। দিনের বেলা বিউপনিবেশায়ন বিষয়ক আলোচনা চলত লেখকদের মধ্যে। নতুন ভাবনাবিশ্বে আফ্রিকার সাহিত্য কেমন হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলত। শিল্পগুণ ঠিক রেখে লেখকরা কি রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে লেখতে পারেন? আফ্রিকান লেখা বলে আদৌ কি কিছু আছে? না-কি যা আছে, তাকে উগান্ডার সাহিত্য, ঘানার সাহিত্য, দক্ষিণ আফ্রিকার সাহিত্য বলতে হবে?
শুরু থেকেই কনফারেন্স ছিল বিতর্কে রমরমা। আসলে আয়োজনটি ছিল আফ্রিকার সাহিত্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করার চেষ্টা মাত্র। তারপরেও যেসব লেখক আফ্রিকান ভাষা, যেমন- সোয়াহিলি, ইগবো, জুলু, আমহেরিক ইত্যাদি ভাষায় লিখছেন, তাঁরা এই কনফারেন্সের বাইরে ছিলেন। সবচেয়ে ক্ষুব্ধ সমালোচনা করেন নাইজেরিয়ার সাহিত্য সমালোচক ওবি ওয়ালি।
ওবি ওয়ালি ট্রানজিশন পত্রিকায় ঘোষণা করেন, আফ্রিকান সাহিত্য কেবলমাত্র আফ্রিকার ভাষাতেই রচিত হতে হবে। তাঁর মতে, ঔপনিবেশিক ভাষায় রচিত যেকোন আফ্রিকান সাহিত্য খুব বেশি হলে ইউরোপীয় সাহিত্যের একটি অপ্রধান শাখা বলে বিবেচিত হতে পারে, আফ্রিকান সাহিত্য নয়।
ওয়ালি বলেন, ইয়োরুবা ভাষার কোন ছাত্রের সামনে তার ভাষায় রচিত কোন নাটক নেই। নাইজেরিয়ার সবচেয়ে প্রতিভাবান নাট্যকার ওলে সোয়িংকা ইয়োরুবা ভাষাকে তাঁর সাহিত্য রচনার উপযোগী ভাষা মনে করেন না।
ট্রানজিশনের পরবর্তী ইস্যুগুলোতে অনেকেই ওয়ালির এই মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। মোফাষলেলে বলেন, ইংরেজি ও ফরাসী ভাষাকে সমবেতভাবে শ্বেতাঙ্গ উৎপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে প্রপঞ্চ নির্মাণে ব্যবহার করা যেতে পারে। সোয়িংকা বেশ রূঢ়ভাবে লেখেন, “প্রত্যেক দিনই আমার মতামত নিয়ে আমি অনেক কিছু জানছি। এটা একটা অভিনব আবিষ্কার যে, আমি নাকি আমার কোন নাটক লেখার ক্ষেত্রেই ইয়োরুবা ভাষাকে যথোপযুক্ত মনে করিনি। কিন্তু ইগবোর ব্যাপারে কী বলবেন? আমাকে কি বলবেন, ওবি ওয়ালি আমার নাটক বা অন্যান্যদের কোন নাটক কি তিনি ইগবো ভাষায় বা যে ভাষার পক্ষে তিনি সাফাই গাইছেন সেই ভাষায় অনুবাদ করেছেন?”
নগুগি ওবি ওয়ালির সমালোচনার সঙ্গে লড়াই করেছেন। তিনি তাঁর তৃতীয় উপন্যাস আ গ্রেইন অব হুইট নিয়ে কাজ শুরু করেন। তারপর তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিলের বৃত্তি নিয়ে লীড্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। উদ্দেশ্য বারবাদোসের লেখক জর্জ ল্যামিং এর উপর গবেষণা। লীড্স-এর সময়, এমন কি পরবর্তীকালেও ওবি ওয়ালির মন্তব্য আমাকে তাড়া করে। এ কথা তিনি ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। “আমি একটা সমস্যায় পড়ে যাই। জানতাম, কার সম্বন্ধে লিখছি। তবে জানতাম না কাদের জন্য লিখছি।”
আজও ঐ সম্মেলনের স্মৃতিচারণ করে নগুগি তাঁর লেখক জীবনের উপর এই সম্মেলনের প্রভাব স্বীকার করেন কারণ, এই ভেন্যুতেই চিনুয়া আচেবের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত থিংস ফল এপার্ট উপন্যাসের তিনি আচেবের একজন অনেক বড় ভক্ত। নগুগি তাঁর উইপ নট চাইল্ড উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আচেবেকে দেখিয়েছিলেন। আচেবে পরে এই পাণ্ডুলিপি ব্রিটেনে তাঁর প্রকাশক উইলিয়াম হ্যানিম্যানের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আফ্রিকান রাইটার্স সিরিজের তালিকার সপ্তম স্থানে ছিল এই উপন্যাস। এই সিরিজ আন্তর্জাতিক পাঠক মহলকে আফ্রিকার সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
কয়েক বছর পরে আচেবের সঙ্গে নগুগির সম্পর্ক তিক্ত হয়ে পড়ে কারণ, নগুগি ভাষার ব্যাপারে ওবি ওয়ালির অবস্থান গ্রহণ করেন। ডি কলোনাইজিং দ্য মাইন্ড গ্রন্থে নগুগি আচেবেকে অভিযুক্ত করেছেন ইউরোপীয় ভাষাকে লেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। তিনি তাঁর সমালোচনা করেন। আচেবে বলেন, “ইংরেজি আসলে একটি গিফ্ট বা উপহার।” নগুগি বলেন, “আমি এতে একমত নই। তবে আমি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করিনি। ব্যক্তি ও লেখক হিসেবে আমি তাঁর প্রশংসা করি। তাঁর উপন্যাসের প্রশংসা করি। বুঝতে পারি, উনি আমার উপর ক্ষেপেছিলেন। তাঁর একটা বইয়ের প্রথম সংস্করণে তিনি আমাকে উদ্ধৃত করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় সংস্করণে সেটি পুরোপুরি বাদ দিয়েছিলেন।”
ইংরেজি ভাষার ব্যাপারটি নগুগিকে সবসময়ই তাড়া করেছে। “ভাষার ইস্যু বিবেচনায় না নিয়ে আমার প্রথম দিককার উপন্যাসগুলোর কথা আমি ভাবতেই পারি না,” তিনি বলেন। “আমি কিভাবে দেখাব যে, আমার আফ্রিকান চরিত্রগুলো একেবারে শুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলবে?”
“যখন আমি আমার প্রথম উপন্যাসটি লিখি, তখন যে ভাষা ব্যবহার করলাম তা তো আমার মা-ই বোঝে না। আমাকে স্কুলে পাঠিয়ে শিক্ষালাভের ব্যবস্থা করার জন্য পুরস্কার স্বরূপ এমন এক ভাষায় লিখলাম যে ভাষা আমার মা পড়তেও পারে না, লিখতেও পারে না।”
এবার তাঁর কণ্ঠ নরম হয়ে এলো। “হতে পারে, শুধু আমিই বিষয়টি নিয়ে এভাবে ভাবছি। হতে পারে, ভাষার ব্যাপারে আমার অবস্থান ভুল। একটু থেমে তারপর বললেন, “আমি মনে করি না যে, আমি ভুল করছি।”
স্তব্ধ স্বর, চেহারা হারিয়ে গেছে
পরে সে-রাতে আমরা তাঁর ক্যালিফোর্নিয়ার বাসার খাবার টেবিলে বসলাম। তিনি যে লেখকদের সঙ্গে ম্যাকারেরেতে পড়শুনা করেছেন, তাঁদের স্মৃতিচারণ করলেন। “আপনার জন্য তো ব্যাপারটি ইতিহাস হয়ে গেছে,” তিনি বললেন। “আমার কাছে এটি সেদিনের ব্যাপার।” এবার টেবিলে রাখা তাঁর ল্যাপটপের দিকে মনোযোগ দিলেন। গুগলে একের পর এক লেখকদের খুঁজলেন-- জন নগেন্দা, পীটার নাজারাত, জনাথন কারিয়ারা, পিউ এবং এলভানিয়া জিরিমু। এঁদের জীবন ও কর্ম সম্বন্ধে অল্পকিছু তথ্য পাওয়া যায়। বেদনায় আপ্লুত হয়ে মাথাটা নাড়লেন। তাঁর অনেক সমসাময়িক লেখক বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। ওদের লেখা আর ছাপা হয় না। ১৯৬০ এর দশকের ম্যাকারেরেতে সাক্ষাৎ হওয়া ওদের কথা মনে পড়ে। ওদের চোখে-মুখে ছিল প্রতিভার স্বাক্ষর। ওরা সবাই লেখক হতে চাইতেন। কয়েক সপ্তাহ পূর্বে এক বন্ধুকে আমি বলেছি, কারিয়ারার গল্পের মতো আর কারো গল্প আমাকে স্পর্শ করে না। ইউনিভার্সিটিতে আমি ওর কবিতা পড়েছি। উনি এখন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন।
কে ৬, ৭৭
পরের দিন সকালে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি নগুগি আগেই ঘুম থেকে উঠে গেছেন। খাবার টেবিলে বসে আছেন। তাঁর চারপাশটা কাগজে ঠাসা। ল্যাপটপ খোলা। তাঁর এক সন্তানের সঙ্গে কথা বলছেন। এরপর তাঁর আরেক সন্তানের কল রিসিভ করলেন। তারপর আরেক জনের। সবার সঙ্গে গিকুয়ু ভাষায় কথা বললেন। সকালের নাস্তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে টেবিলে বসলাম। জানতে চাইলেন, আজকে কী গল্প করা যায়? আমি কেনিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট জোমো কেনিয়াত্তার ব্যাপারে তাঁর কাছে জানতে চাইলাম। শৈশবে নগুগির কাছে কেনিয়াত্তা ছিলেন বীর পুরুষ। কারণ, তিনি গিকুয়ু ভূমি অধিকার নিয়ে সরব ছিলেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞার কথা পুরোপুরি ভুলে যান। চুরি হয়ে যাওয়া ভূমি উদ্ধার করে এর ন্যায্য মালিকদের ফেরত না দিয়ে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা নিজেদের আখের গোটাতে শুরু করে। নগুগি বলেন, কেনিয়াত্তা শুধু ঔপনিবেশিক প্রভুদের সরাতে চেয়েছিলেন, ঔপনিবেশিক ক্ষমতা-কাঠামোর পরিবর্তন চাননি। তিনি বলেন, “কালো জমির মালিক, কালো পুলিশ অফিসার এবং একটি কালো সরকার-- ছিল স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ।”
১৯৭৭ সালে নগুগি তাঁর জ্বালাময়ী উপন্যাস পেটাল্স অব ব্লাড প্রকাশ করেন। এই উপন্যাসের মাধ্যমে কেনিয়াত্তার সরকারের উপর নগ্নভাবে আঘাত হানেন নগুগি। ঐ একই বছর আরেকটি সাহিত্যকর্মের জন্য নগুগিকে বন্দী করা হয়। নগাহিকা নদিন্দা (যখন খুশি বিয়ে করব) নাটকটি তিনি রচনা করেন যৌথভাবে নগুগি ওয়া মিরির সঙ্গে। উপন্যাসের মত এখানেও তিনি আক্রমণ করেন শাসক শ্রেণিকে। তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল। আব্দুলরাজাক গুরনাহ লিখেছেন, “যেহেতু নাটকটি লিখেছিলেন গিকুয়ু ভাষায় এবং এটি সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিল, তাই এটি সরকারের জন্য ক্ষতিকর ছিল।”
কামিতির উচ্চ নিরাপত্তার জেলে আরোও ১৮ জন রাজবন্দীর সঙ্গে নগুগিকে আটকে রাখা হয়। তাঁর কারা-স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন: “এখানে আমার কোন নাম নেই। একটা ফাইলে আমার পরিচয় নির্দেশক শুধু একটি সংখ্যা রয়েছে: কে ৬, ৭৭।” ওখানেই টয়লেট পেপারে তিনি তাঁর উপন্যাস কাইতানি মুতারাবা-ইনি (ডেভিল অন দ্য ক্রস) উপন্যাস লেখেন। সেই লেখার ব্যাপারটি ছিল একটি জটিল প্রক্রিয়া:
কারণ, আমি তখন ইংরেজির উপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠছিলাম। গিকুয়ু ভাষায় লেখার কোন ঐতিহ্য বা উত্তরাধিকার ছিল না। কারাগারে ইংরেজদের মতো পোশাক পরা ছোটখাটো এক শয়তান আমার কাছে আসত। যেহেতু গিকুয়ু ভাষার লিপির কোন ঐতিহ্য ছিল না, তাই আমাকে শব্দভান্ডার তৈরি করতে হয়েছে। কিছু শব্দ যেমন-- সাম্রাজ্যবাদ- এর প্রতিশব্দ গিকুয়ু ভাষায় তৈরি করা সত্যিই কঠিন একটা বিষয় ছিল। কিন্তু সেই ছোট শয়তানটা এসে আমাকে বলত, ওহ কেন এত কঠোর চেষ্টা করছো? এই যে, আমি তো এখানে... গিকুয়ু ভাষার এক ধরনের তারল্য রয়েছে। যে বাক্য আমি লিখতাম, পরের দিন সকালে সেটি পড়তে গিয়ে দেখতাম এর অর্থ কেমন জানি বদলে গেছে। ছেড়ে দেওয়ার হাতছানিটা সবসময়ই ছিল। তবে আরেকটা কণ্ঠ আমাকে ভেতর থেকে সবসময়ই চেষ্টা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিত।
প্রাসাদের রাজা
পেশাগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই আমাকে নগুগির সঙ্গে থাকতে হয়েছিল। আমার লেখালেখির ক্যারিয়ারের খাতিরেই তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ট পরিচয় হওয়াটা দরকার। আমি কেনীয় এবং বয়সে যুবক। নগুগিও কেনীয় কিন্তু বয়সে জ্যেষ্ঠ। তাঁর বাড়িতে থাকতে এসে দেখলাম, আমাকে অন্যরকম একটা ভূমিকা নিতে হলো। তাঁকে সাহায্য করতে হয়। তাঁর যত্ন নিতে হয়। চাহিবামাত্রই যেমন দাদা বা নানাকে সাহায্য করতে হয়, ঠিক তেমন ব্যাপার। তাঁর সঙ্গে থাকার দ্বিতীয় দিনের সকাল ১১টায় নগুগি প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। তাঁর নার্স আসছেন তাঁকে নিতে। ডায়ালাইসিসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট রয়েছে আজ। তাঁর অসুস্থতার যে বিষয়টি তিনি খুব অপছন্দ করেন, তা হলো, তিনি অসুস্থ অবস্থায় এখন আর গাড়ি চালাতে পারেন না। বাড়ি থেকে বের হবার পূর্বে নগুগি আমাকে বাসার চাবি দিয়ে গেলেন। বললেন, “এখন আমার বাসার দায়িত্ব আপনার কাঁধে। অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে আবার দেখা হবে, চলি।”
এবার আমি বাসায় একেবারে একা। প্রাসাদের রাজা আমি। বাড়ির কোরিডোরে ঘুরে বেড়ালাম। শেল্ফে সাজানো বইগুলোতে হাত বুলালাম। ড্রয়িংরুমে বসে পিয়ানো বাজালাম। পেছনের বাগানেও গেলাম। তাঁর লাইব্রেরী থেকে একটি বই নিয়ে বাগানের ভেতর সূর্যটাকে সামনে রেখে একটি চেয়ারে বসলাম। পেছনে রান্নাঘরের জানালায় ভায়োলেট ফুল। রং ধূসর হয়ে গেছে। শুকিয়ে যাচ্ছে। বাগানের পেছনের দিকের গাছগুলো চমৎকার রূপে-রঙে লকলক করছে। বাগানভিলার উজ্জ্বল গোলাপী রং, লকলক করে বেড়ে ওঠা ডুমুরের সবুজ পাতা, উজ্জ্বল হলুদ রঙের ল্যান্টানাগুলো মনোহর দেখাচ্ছে। বাগান থেকে কয়েক মিটার দূরে ভূট্টার ক্ষেত। ভূট্টার ক্ষেত আর বাগানভিলা কেনিয়ায় খুব সাধারণ একটি দৃশ্য। ক্যালিফোর্নিয়ায় এক চিলতে কেনিয়া দেখে হঠাৎ আমার বাড়ির জন্য মন পোড়াতে শুরু করলো।
কার্নেগী হল
দুপুরে যখন নগুগি বাসায় ফিরলেন তখন আমি বসে পিয়ানো বাজাচ্ছিলাম। তিনি স্থির দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। এরপর নিজেই বাজাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তিন বছর আগে তিনি পিয়ানো বাজানো শুরু করেছেন। কারণ, সন্তানরা পিয়ানো ছেড়ে দেওয়ার পর তার স্ত্রী নিজেরী সঙ্গীত অনেক মিস করেন।
স্বরলিপি দেখে নগুগি গিগ্স পিয়ার গিণ্ট স্যুট থেকে মর্নিং মুড বাজালেন। বাজাতে শুরু করে শেষের বারে এসে ভুল করলেন। আবার চেষ্টা করলেন। বার বার চেষ্টা করলেন। বার বারই ভুল করলেন। অবশেষে অবশ্য সফল হলেন। “গ্রামি অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পরেও হয়ত এই লোকগুলো আবারও জানতে চেয়ে জিজ্ঞেস করবে, আপনি নোবেল পুরস্কারটা তাহলে কবে পাবেন।” মজা করে বললাম। ভাবলেশহীনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আসলে আমি চাই কার্নেগী হলে পিয়ানো বাজাতে।” বাতাসে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার জানতে চাওয়া উচিত। তবে দ্বিধায় পড়ে গেছি। কেনিয়ার সংস্কৃতিতে আপনার চাইতে যে ব্যক্তি বয়সে ষাট বছরের বড় তাঁর কাছে তাঁর বিয়ের ব্যাপারে জানতে চাইতে পারেন না। সম্ভবত নগুগি বিষয়টি আঁচ করতে পারলেন। এরপর ধীরে সুস্থে বললেন, “আমি জানি, আমাকে ব্যাচেলরের মতো দেখায়। আসলে কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়।” তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে তখন ডিভোর্সের কথা চলছিল। ডিভোর্সের পূর্বে তাঁরা উভয়ে ইউনিভার্সিটি হিল্সে বসবাস করতেন। জায়গাটা আর্ভিনেরই একটা অংশ। ওখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু সংখ্যক শিক্ষক থাকতেন। সমূদ্র সৈকতের ধারে। তিনি প্রায়ই প্রশান্ত মহাসাগরের ধারে গাড়ি চালিয়ে যেতেন। সে রকমই একবার গাড়ি চালাতে গিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক বই দ্য পার্ফেক্ট নাইন-এর ধারণা আসে। এখন তিনি সেই সমূদ্র থেকে অনেক দূরে একা থাকেন। গাড়ীও চালাতে পারেন না।
এবার ধীরে ধীরে সতর্কতার সঙ্গে তিনি খাবার টেবিলের কাছে এলেন। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেসব শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়েছে, নগুগি সেগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিয়েছেন। তবে স্মৃতিভ্রমের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন নি। “মাঝে মাঝে যখন ভাবি, এটি আবার কখন হলো রে বাবা তখন ভয় পাই,” তিনি বললেন। “আবার মনে হয়- হ্যাঁ ঠিকই তো আছে।”
সম্ভাবনাসমূহ
নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্র্থীদের তালিকা যখন দেখি, তখন আমাদের মনের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক করে। যারা বাজি ধরে তারা তাঁকে নিয়ে তেমন সুবিধা করতে পারে না। তাঁকে যে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে, সে-ব্যাপারে আমাদের আশঙ্কা রয়েছে।
ল্যান্ডব্রোক্স স্পোক্সম্যান, অক্টোবর ২০১০
আজ সকালে বাজির যে ঢেউ উঠেছে, তা যদি সত্য হয়, তাহলে নগুগি সোজা চলে যাবেন স্টকহোমে।
দ্য সেপ্টেম্বর ২০১৩
২০১৪ সালের নোবেল পুরস্কারের মাত্র তিনদিন আগে হারুকি মুরাকামী ও কেনীয় সাহিত্যিক নগুগি ওয়া থিয়োং’ও যৌথভাবে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন।
দ্য গার্ডিয়ান, অক্টোবর ২০১৪
জাপানী ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামী যিনি ল্যান্ডব্রোক্স-এর আগের পছন্দের তালিকায় ছিলেন, তাঁকে কেনীয় সাহিত্যিক নগুগি ওয়া থিয়োং’ও হটিয়ে দিয়েছেন।
দ্য গার্ডিয়ান, অক্টোবর ২০১৬
আবারো নগুগি ওয়া থিয়োং’ও সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীদের পছন্দের তালিকায়।
জোহানেস বার্গ রিভিউ অব বুক্স, অক্টোবর ২০০৭
২০১৯ সালে নগুগির নোবেল জয়ে ব্যর্থতা সবাইকে হতাশ করেছে।
বিবিসি নিউজ পিজিন, অক্টোবর ২০১৯
৮২ বছর বয়সী নগুগি এক দশক ধরে সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন। তবে এ বছর মনে হয় এই কেনীয় লেখকের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়বে। তাঁর সাহিত্যকর্ম ঔপনিবেশিকতা বিরোধী কৃষ্ণাঙ্গদের সংগ্রামের প্রতি বিশ্বের সব মানুষদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইম্স, অক্টোবর ২০২০
নগুগির ভক্তদের হৃদয় ভাঙ্গলো। ফরাসী লেখক এবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতলেন।
দ্য ডেইলি নেশন, অক্টোবর ২০২২
স্টকহোম উপসর্গ
কেবলমাত্র সুইডিশ একাডেমিই জানে, নগুগি কেন নোবেল পুরস্কার পাননি। সম্ভবত বুড়োদের মতো দেখতে তাঁর কোন দাড়ি নেই! অন্য দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের মতো। এঁদের একজন ওলে সোয়িংকা (১৯৮৬) এবং অপর জন আব্দুলরাজাক গুরনাহ (২০২১)। সম্ভবত তাঁর লেখা অত্যন্ত মৌলিক ও বিপ্লবী ধাঁচের। কিছুটা এ কারণেই তাঁর ডেভিল অন দ্য ক্রস উপন্যাসটি যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য প্রকাশক ছাপতে চাননি। নর্টনের এক সম্পাদক বলেছেন, “এটি রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসে অত্যন্ত বলিয়ান এবং ব্রেখটের রাজনৈতিক রূপালংঙ্কারে সজ্জিত একটি উপন্যাস। যারা মার্কসবাদী ভাবনায় সমৃদ্ধ এবং সমসাময়িক উন্নয়নের প্রতি সংবেদনশীল, তারা এর পাঠক।”
অন্যান্যরা বলেন, নগুগির অতিরিক্ত রাজনীতিঘেষা হওয়ার কারণে তাঁর লেখার সাহিত্যগুণ কমে গেছে। “গিকুয়ু ভাষায় লেখার সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে বিরাট মূল্য দিতে হয়েছে।” নাইজেরীয় সাহিত্য-সমালোচক আদেল ওয়ালে মাজা-পিয়ার্স লিখেছেন, “তাঁর ইংরেজি ভাষায় লেখা উপন্যাসগুলো শিল্পগুণের কারণে যে প্রশংসা লাভ করেছে, তা হারিয়ে গেছে সম্ভবত তাঁর সোজাসাপটা রাজনীতিঘনিষ্ঠতার কারণে।” উগান্ডার ঔপন্যাসিক জেনিফার মাকাম্বি আমাকে বলেছেন, “ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী বা স্বাধীনতাত্তোর কেনিয়ার হতাশা নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাসগুলো তাঁর খ্যাতি অক্ষুন্ন রাখলেও তাঁর নাটকগুলো তাঁকে পিছিয়ে দিয়েছে। এগুলো তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।”
২০২২ সালে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার ঠিক আগের দিন নগুগির কাছে জানতে চাইলাম, তিনি পুরস্কারের কথা ভাবছেন কিনা। তিনি বললেন, নাহ। যারা আফ্রিকার ভাষায় লেখেন তাঁদের ব্যাপারে নোবেল কমিটির আগ্রহ নেই। নোবেল পুরস্কার পাওয়াটা অপরিহার্য কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই পুরস্কার তাঁর জন্য বড় কোন তাৎপর্য বহন করে না। কিন্তু ২০২২ সালে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর তাঁর ছেলে মুকুমা ওয়া নগুগি বলেন, নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের নাম মূলত ইউরোপীয় সাহিত্য পুরস্কার হওয়া উচিত। তবে মাঝে মাঝে নোবেল কমিটি তার ইউরোপের বাইরের কতিপয় বন্ধুকেও এই পুরস্কার দেয়।
সার্জারী
সকালবেলা ছিল নগুগির সার্জারীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট। তৃতীয় দিনে এসে আমি এতক্ষণে দেরি করে ফেলেছি। আমরা খাবারের টেবিলে বসে গেলাম। লেখালেখি নিয়ে আমাদের আলোচনা এবার ভিন্ন পথ ধরলো। সার্জারীর প্রস্তুতি হিসেবে ডাক্তার তাঁকে কী কী নির্দেশনা দিয়েছেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। সার্জারীর ব্যাপারে নগুগি খুব উত্তেজিত। এই সার্জারী করা হলে তাঁর জন্য ডায়ালাইসিস করা সহজ হবে এবং কেনিয়া থেকে ঘুরে আসতে পারবেন। ২০১৯ সালের পর কেনিয়ায় আর যাননি তিনি। তিনি নিজেই তাঁর পেটে লাগানো ক্যাথেটারের ড্রেসিং বদলাচ্ছিলেন। আমি যখন সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম তখন বললেন, “আগামীকালের পর এটি আর লাগবে না।”
সার্জারীর পূর্বে করণীয় কাজের তালিকা পরীক্ষা করলাম। নগুগি তাঁর নাতি মিরিংগুকে সকাল সকাল একটি গাড়ী ঠিক করতে বললেন। তাঁর মেয়ে নগিনা থাকেন জর্জিয়ায়। তাঁকে ফোন করলেন। “এর পর যেকোন সময় আমি আটলান্টায় আসতে পারব,” তিনি আস্বস্ত করে বললেন।
সেদিন সকালে নগুগি বেশ আগেভাগে ঘুম থেকে উঠলেন। গোসলের পর চেষ্টা করলেন ড্রেসিং বদলানোর। হাত কাঁপছিল। তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেলাম। নগুগির নাতি ওখানেই ছিল। তখন ভোর পাঁচটা।
হাসপাতালে যাওয়ার জন্য যখন প্রস্তুত তখন নগুগি গান ধরলেন। ঐ গানটি অবশ্য তিনি জেলখানাতেও গাইতেন। “আমাকে ধুয়ে ফেল, বাবা। তাহলে আমি তুষার-শুভ্র হয়ে যাব।”
আন্ডারগ্রাউন্ড
পরিকল্পনা অনুযায়ী সার্জারী হলো। সার্জারীর পর আর হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই। সকাল এগারটায় তাঁর নাতি তাঁকে হুইল চেয়ারে করে বাসায় ফিরে নিয়ে এলো। নগুগি রোদ পোহানোর জন্য বাইরের আঙিনায় যেতে চাইলেন। কিন্তু মিরিংগু বারণ করলো। “শুয়ে বিশ্রাম করুন,” সে বলল। নগুগি তাঁর ঘরে গেলেন। আমাকে ডেকে নিলেন। বললেন, “আমাদের আরো কিছু কথা আছে।” তখন তাঁর ক্ষতস্থানে ব্যথা করছিল। বিছানায় শুয়ে তাঁর এক জামাতাকে ফোন দিলেন। তিনি পেশায় ডাক্তার। ফোন রাখলে তাঁর জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস চলতে লাগলো। ডান হাত দিয়ে পেট চেপে ধরেন। যেখানে সেলাই করা হয়েছে ঐ জায়গাটাই। বললেন, গতকাল যেখানে আলোচনা থামিয়েছিলেন, সেটা মনে করিয়ে দিন। এরপর তিনি ১৯৭০- এর দশকে যে আন্ডারগ্রাউন্ড আন্দোলন চলছিল, তাতে তাঁর অংশগ্রহণের ব্যাপারে বলতে লাগলেন।
১৯৭৪ সালে মার্কসবাদী-লেলিনবাদীদের সম্মেলন থেকে দ্য ডিসেম্বর টুয়েল্ভ মুভমেন্ট শুরু হয়। এতে যোগ দিতে হলে সদস্যদের খুব শৃংখলাবদ্ধ হতে হতো। উদাহরণ স্বরূপ, সময়ানুবর্তী না হওয়াই সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কারণ, “এটা তো জীবন-মরণ ব্যাপার,” নগুগি বললেন। ডিএমটির প্রধান কাজ ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ। খোলাখুলিভাবে সমালোচনামূলক সাহিত্য প্রকাশ করা. সরকার-বিরোধী লিফলেট ছাপানো, সেগুলো সারা দেশে বিলি করা ইত্যাদি। নগুগি বললেন, যে নাটকের জন্য তাকে জেলে যেতে হয়েছিল সেটি একটি ডিটিএম প্রকল্প ছিল। তিনি ও তাঁর সহ-লেখক উভয়েই লিমুরুর একটি কারাকক্ষে বন্দি ছিলেন।
১৯৭৮ সালে যখন কানিয়াত্তা মারা গেলেন তখন তাঁর জায়গায় আসলেন তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেনিয়েল আরাপ মই। জনসমর্থন পাওয়ার জন্য তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। নতুন প্রেসিডেন্ট নগুগি ও অন্যান্য রাজবন্দীদের মুক্তি দিলেন। কিন্তু শীঘ্রই কেনিয়াত্তার সরকারের মতই তাঁর সরকারও স্বৈরাচারী হয়ে উঠলো। ১৯৮২ সালে সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হলো। নগুগির কাছে জানতে চাইলাম, এতে ডিটিএম জড়িত ছিল কি না। “নাহ”, তিনি বললেন।। “ডিটিএম বিশ্বাস করতো, রাজনীতি বন্দুককে চালিত করে, বন্দুক রাজনীতিকে নয়।” তাঁদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের একমাত্র উপায় হলো জনসংশ্লিষ্টতা, সামরিক কর্মকাণ্ড নয়। সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে বিপুল সংখ্যক ডিটিএম সদস্যকে গ্রেফতার করা হলো। অনেকেই পালিয়ে গেলেন। সে-সময় নগুগি লন্ডনে ছিলেন। ডেভিল অন দ্য ক্রস প্রকাশনা-উৎসবে যোগ দিতে গিয়েছিলেন সেখানে। তাঁকে সাবধান করে দিয়ে বলা হলো, ফিরে এলে তাঁকে হত্যা করা হবে। কাজেই, পরের কয়েক বছর লন্ডনই হলো তাঁর বাড়ি। ১৯৮৬ সালে তিনি মাটিগারি প্রকাশ করলেন। এই সময় লন্ডনে বসে উপন্যাসটি লিখেছিলেন। উপন্যাসে দেখা যায়, মাটিগারি নামের এক ব্যক্তি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে লোকজনকে সংঘবদ্ধ করছে। এই প্রেসিডেন্ট মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছে। এই প্রেসিডেন্ট আসলে আরাপ মইয়েরই প্রতিরূপ। মই উপন্যাসের এই চরিত্রটিকে প্রকৃত ব্যক্তি মনে করে বসেন। তিনি এর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। যখন জানলেন, এ আসলে কাল্পনিক এক চরিত্র, তখন তিনি উপন্যাসটি বাজেয়াপ্ত করেন।
১৯৮৯ সালে নগুগি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতে করতে এক পর্যায়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় থিতু হন। ওখানে ২০০২ সালে আর্ভিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। একই বছর মই-এর শাসনের অবসান ঘটে। ২০০৮ সালে নগুগি প্রথমবারের মতো কেনিয়া ভ্রমণে যান। উদ্দেশ্য তাঁর উপন্যাস মুরোগি ওয়া কাগোগি (উইজার্ড অব দ্য ক্রো) এর প্রকাশনা।
দুই সপ্তাহের ভ্রমণে এসে একদল অস্ত্রধারীর হাতে তিনি ও তাঁর স্ত্রী আক্রান্ত হন। তাঁর স্ত্রী ধর্ষিত হন। “ওটা সাধারণ কোন ডাকাতির ঘটনা ছিল না।” নগুগি বলেন, “ওটা ছিল রাজনৈতিক ঘটনা। পরাজিত মই সরকারের লোকজন এবং নতুন সরকারের কিছু গুণ্ডা আমাকে অপদস্ত করার জন্য এ কাজ করেছে। অবশ্য শেষ করে দিতে চায়নি।”
তারপরেও তিনি কেনিয়া ফিরে গেছেন। তবে কেনিয়ার নাগরিকত্ব ধরে রেখেছেন। সেখানকার রাজনীতিরও খোঁজখবর রাখেন।
যখন তিনি আমাকে ডিটিএম-র গল্প শোনাচ্ছিলেন এবং লন্ডনে নির্বাসনের স্মৃতিচারণ করছিলেন তখন তিনি কাশি দিলেন। আর এ পর্যায়ে কাশি দেওয়া তাঁর জন্য খুবই কষ্টদায়ক। কাজেই, তাঁকে বিশ্রামের সুযোগ দিয়ে তাঁর ঘর থেকে বের হলাম।
ভাষা প্রশ্ন চলমান
কয়েকমাস আগেই নগুগির বাসা থেকে এসেছি। যতটা সম্ভব স্মৃতি থেকে তাঁর চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয় সরিয়ে রেখে চিন্তা করি, তাঁর ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড- এর সাফল্যের পরও তাঁর সৃজনশীল লেখনির জন্য স্থানীয় ভাষা ব্যবহারের পরামর্শ কীভাবে আজও অনাদৃত রয়ে গেছে। “ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড লেখার পর থেকে অনেকের মধ্যে সরাসরি বৈরিতা থেকে শুরু করে ভদ্রচিত আগ্রহও দেখেছি। কিন্তু বাস্তবে কোন পরিবর্তন দেখিনি,” ২০১৭ সালে তিনি কথাটি স্বীকার করে বলেন।
বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে যাঁরা লেখক, তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতায় ভাষার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি। ঘানার একজন নাট্যকার ইংরেজি ভাষা ত্যাগ করা যে অসম্ভব, তা জানিয়ে বলেন, তাঁর ভাষা দাগবানীতে খুব অল্পসংখ্যক লোক কথা বলে। এই ভাষায় যদি তিনি লেখেন তাহলে খুব অল্পসংখ্যক লোক তাঁর লেখা পড়বে। আবার সেই ভাষায় লেখা প্রকাশ করার মতো অবকাঠামোও নেই। যখন আমি নগুগির কথা বললাম তখন তিনি বললেন, “নগুগি তো নগুগিই। আপনি আমাকে নগুগির সঙ্গে তুলনা করতে পারেন না।”
এমনকি নগুগির নিজের ছেলেমেয়েরাও ইংরেজি ভাষায় লিখে তাঁদের ক্যারিয়ার গঠন করেছেন। তাঁর সন্তানদের চারজন – টী নগুগি, নন্দুকু ওয়া নগুগি, ওয়ানজিকু ওয়া নগুগি এবং মুকোমা ঔপন্যাসিক। শুধু টি নগুগি থাকেন কেনিয়ায়। বাকিরা থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে।
নগুগির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড বইটির বার্তা কি তাহলে ব্যর্থ হলো?
তিনি বললেন, “নাহ। সমস্যা হলো আফ্রিকার ভাষাগুলোর প্রতি সরকারের নেতিবাচক মনোভাব এবং আফ্রিকার ভাষায় লেখা ছাপাতে প্রকাশকদের অনীহা।”
নগুগির বইগুলো নিয়ে ভাবছি। তাঁর উপন্যাসের মূল চরিত্রগুলো পরিত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরা সমাজের মধ্যে ঐক্য আনার চেষ্টা করে। মৌলিক পরিবর্তন চায়। বিপ্লব করতে চায়। কিন্তু সবাই ব্যর্থ হয়। যাদের এরা বাঁচাতে চায়, সেই লোকগুলোই এদের পরিত্যাগ করে। এদের বেশিরভাগই খুন হয়। তাঁর লেখায় তাঁর প্রত্যক্ষ রাজনীতি সংশ্লিষ্ঠতা বোঝা যায়। তাঁর চরিত্রগুলোর মধ্যেও হতাশা বিরাজমান।
যেদিন সকালে বিদায় নিলাম সেদিন নগুগি আমাকে বললেন, “দলুয়ো ভাষায় লিখতে ভুলবেন না কিন্তু। আমি জানি, প্রথম প্রথম এ কাজ করা কঠিন। তবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।”
(দ্য গার্ডিয়ান, ১৩ জুন ২০২৩)


0 মন্তব্যসমূহ