সিঁড়িতে কয়েক জোড়া ভারি বুটের শব্দ একটু স্পষ্ট হতেই আদিল আনসারি ঘরের উত্তর পূর্ব দিকের দেয়ালের সাথে সেঁটে লাগানো বড় কাঠের আলমারির ভেতর দিয়ে পাশের অন্ধকার কুঠুরিতে ঢুকে পড়ে।
দেয়ালের ছোট্ট ফোকর দিয়ে ওপারে চলে যাবার পরপরই সে আলমারির পেছনে পাতলা কেরোসিন কাঠের চৌকোণা তক্তাটা চাপ দিয়ে জায়গা মতো বসিয়ে দেয়। এখন আলমারি খুলে ফেললেও হ্যাঙ্গারে ঝোলানো কাপড় চোপড়ের আড়ালে পেছনের গোপন দরজা কারো চোখে পড়ার কথা নয়। তবে কপাল খারাপ হলে কি হয় কে জানে! দিন তিনেক আগেও সে কি ভাবতে পেরেছিল তাকে কোনো দিন এই স্যাঁৎসেঁতে আলো বাতাসহীন চোরকুঠুরিতে ঢুকে লুকিয়ে থাকতে হবে!
দূরে বড় রাস্তায় আর্মি জিপের চলাচল এবং কাছাকাছি কোথাও কয়েক জোড়া বুটের শব্দ পাবার পর রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, সকালে বাড়িটা ছাড়তে হবে। কিন্তু ভোরের দিকে বাড়ির বাইরে হৈ চৈ আর ধুপধাপ পায়ের শব্দ শুনে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাইরে যাবার সাহস হয়নি। পেছন দিকে দোতলার বারান্দা থেকে পেয়ারা গাছে ডাল ধরে ঝুলে কিংবা সরাসরি লাফিয়ে পড়েও পালানো যেতো। কিন্তু সে ঝুঁকি নিতে চায়নি। বাড়ির পেছনেও হয়তো রাইফেল হাতে কেউ পাহারা দিচ্ছে। তারচেয়ে চোরকুঠরিতে ঢুকে দিনের বেলাটা চুপচাপ কাটিয়ে দেবার পর-- রাত নামলে বেরিয়ে পড়া যাবে। ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামে, আবার শীতের রাত গভীর হতেও বেশি সময় লাগে না। কাজেই ভয় কি!
শহরটা ছোট। উত্তর দক্ষিণে গোটা তিনেক আর পূর্ব পশ্চিমে একটি মাত্র বড় রাস্তা ছাড়া বাদবাকি সবটাই গলিঘুঁচি। লেন বাইলেন কানাগলি আর জঙ্গল জঞ্জালে পরিপূর্ণ পায়ে চলা পথের কোনো অভাব নেই। দোকান-পাট বাজার এবং ঘন বসতির পাড়াগুলো এড়িয়ে কোথায় কোন পথ দিয়ে বেরিয়ে গেলে আপততঃ একটা নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানো যাবে-- তা তার ভালোই জানা আছে। এখন শুধু ঘাপটি মেরে পড়ে থেকে সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা।
আদিল চোরকুঠুরিতে ঢুকে পড়ার অল্প কিছুক্ষণ পরেই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমে দরজায় কড়া নাড়া, তারপরে জোরে জোরে আঘাতের সাথে শোনা যায়, ‘আন্দার কোই হ্যায়? ইজ দেয়ার এনিবডি হোম?’
একটু বিরতি দিয়ে কোথাও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে কেউ একজন দরজায় জোরে ধাক্কা দেয়। তারপরেই একটা প্রচণ্ড লাথির সাথে দড়াম করে খুলে যায় কপাট। লাথির শব্দটা নিঃশব্দে পড়ে থাকা আদিল আনসারির বুকে এসে লাগে। না-- ঘরের দরজা ভেঙে ফেলায় তার কিছুই আসে যায় না। ছয় মাস আগেও এই শহরে এমন একটা চমৎকার দোতলা বাড়ির মালিক হবার কথা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। তবে গত কয়েক মাসে বাড়িটা সে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছিল। একটু কষ্ট তো হতেই পারে। তবে এখন ঘর দুয়ার, ধন দৌলত আঁকড়ে পড়ে থাকার চেয়ে জীবন বাঁচানোটা বেশি জরুরি। আল্লাহর দুনিয়ায় ভাগ্যের চাকা কেমন হুট করে উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে। আদিলের ঠোঁটের কোনায় একটু হাসি ফুটে উঠে আবার সাথে সাথে মিলিয়ে যায়।
আর্মির লোকগুলো প্রথমে ওপাশে বসার ঘর এবং সম্ভবত রান্নাঘর ঘুরে শোবার ঘরে এসে ঢোকে। তাদের হাঁটাচলা এবং কথোপকথন থেকে মনে হয় ওরা সংখ্যায় পাঁচ ছয়জন-- অন্তত দুজন নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথা বলছে। ওদের একজনের কথা শুনে চমকে ওঠে আদিল আনসারি। ভাঙা গলায় কেউ একজন তার বাঙালি সঙ্গীকে বলছে, ‘দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ-- পালালো কোন পথে?’
‘গত রাতেও তো আলো দেখা গেছে।’ অন্যজন বলে।
‘হোয়াট ডু ইউ সে? ইজ হি সাম ওয়ান মোস্ট ওয়ান্টেড?’ আর্মি অফিসারের গলা শোনা যায়।
‘ইয়েস উই থিংক সো-- হি ওয়াজ দ্য মেইন কালপ্রিট... আই মিন মাস্টার মাইন্ড অফ ম্যাসাকার ইন দিস এরিয়া। হি ইজ রেসপনসিবল ফর...’ শব্দ হাতড়ে অনেকটা সময় নিয়ে ইংরেজিতে উত্তর দেয় গলা ভাঙার লোকটি। কিন্তু তার শেষের কথাগুলো আর শোনা যায় না। কিছু নীরবতার পরে আবার যার গলা শোনা যায় তাকেই অফিসার বলে মনে হয় আদিলের।
‘কোনে কোনে মে ঢুন্ডো-- আশপাশ ছান মারো কোই ভাগ না পায়ে--’ ক্রুদ্ধ অফিসারের আদেশের পরে আবার ধুপধাপ শব্দ শোনা যায়। সেপাইরা খাটের তলা, বারান্দা বাথরুম, রান্নাঘরের জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করে দেখে। একজন আলমারির পাল্লা খুলে কাপড় চোপড় নাড়া দিয়ে আবার পাল্লাটা বন্ধ করে দেয়। আবারও কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ ধিরে ধিরে শোবার ঘর থেকে ড্রইংরুম হয়ে সিঁড়ি দিয়ে মিলিয়ে যায়। তারপর আর কোথাও কোনো শব্দ শোনা যায় না। অনেকটা সময় নিঃসাড় পড়ে থাকার পরে উঠে বসে আদিল। হয়তো ওরা সদলবলে নেমে চলে গেছে। কিন্তু সে জানে, দিনের বেলা এখান থেকে বেরোবার ঝুঁকি নেয়া চলবে না।
চারিদিকের নৈঃশব্দের মধ্যে আদিল আনসারি এবার তার সাময়িক আবাসের দিকে ফিরে তাকায়। একটা আড়াই হাত বাই ছয় হাত স্যাঁৎসেঁতে ঘর। জানালা দরজা কিছুই নেই-- না একটু ভুল হলো। উত্তর দিকের দেয়ালে-- আদিলের মতো লম্বা মানুষেরও মাথা থেকে উপরে ছোট্ট জানালার মতো একটা কিছু ছিল। সেটা কার্ডবোর্ড দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পশ্চিম দিকের দেয়ালের ও পাশেই শোবার ঘর-- সেই দেয়ালে একটা এবড়ো থেবড়ো ফোকর কাটা। দেয়ালের বিভিন্ন জায়গা থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। হয়তো ফোকর কাটার সময় ছেনি হাতুড়ির আঘাত সইতে না পেরে পাঁচ ইঞ্চির দুর্বল দেয়ালে নানা জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণের দেয়াল ঘেঁষে একটা কাঠের টুলের আস্তিত্ব বুঝতে পারলেও টুলের ওপরে কাচ দিয়ে ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা কার বা কিসের বোঝা যায় না।
ঘরের অন্ধকার এমনিতেই গা সওয়া হয়ে এসেছিল। বেলা একটু বাড়ার সাথে সাথে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়। ঘরের মেঝেতে একটা ভাঁজ করা পুরোনো কম্বল, গোটা দুয়েক চাদর বালিশ অগোছালো পড়ে আছে। সূর্য উপরে উঠে যাওয়ায় পুব দিকের ঘুলঘুলি দিয়েও খানিকটা আলো আসে। পশ্চিমের দেয়ালে ঝুলছে সত্তুরের নির্বাচনের একটা পোস্টার। আবারও হাসি পায় আদিবের-- এই চোরকুঠুরিতে ইলেকশানের পোস্টার লাগানোর মানে কি! কে কেন কখন এই পোস্টার দেয়ালে সেঁটে দিয়েছিল তা নিয়ে ভাবার আগেই সে এই ভেবে অবাক হয় এ বাড়িতে প্রায় তিনমাস ধরে বসবাস করেও প্রথম দিনের অপারেশনের পরে সে কোনো দিনও এই ঘরে ঢুকে দেখেনি। প্রথম দিনও তো সে নিজে এ ঘরে ঢোকার কষ্টটা করেনি-- ও পাশে শোবার ঘরে দাঁড়িয়ে হুকুম চালিয়েছে মাত্র। তবে সেদিন কি ভেবে সে আলমারির পেছনের মেকানিজমটা দেখে রেখেছিল, যা এখন কাজে লেগেছে।
ক্ষুধা ক্লান্তি কিছুই ছিল না, তারপরেও মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে সটান শুয়ে পড়ে আদিল। এখন শুধু সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা।
সময় সময়ের মতো বয়ে যেতে থাকে, কিন্তু ঘড়িতে সময় কতো হয়েছে বুঝতে পারে না সে। হাতের ঘড়িটা বিছানার পাশে টেবিলের ওপরেই খুলে রেখেছিল, এতোক্ষণে সেটা নিশ্চয়ই কোনো সেপাইয়ের পকেটে চালান হয়ে গেছে। পূর্ব দিকের ভেন্টিলিটার দিয়ে আসা এক চিলতে আলো ক্রমেই ম্লান হয়ে আসে। একটু পানি খেতে পারলে ভালো হতো, গলাটা শুকিয়ে এসেছে। পুরোপুরি সন্ধ্যা নামতে বেশি দেরি নেই। আদিল নিজেকে সান্ত¦না দেয়-- আর একটু পরেই দেয়ালের ফোকর গলে সে শোবার ঘরে ঢুকে যাবে। সেখানে টেবিলে কাচের জগে পানি আছে, না থাকলেও যতদূর মনে পড়ে রান্নাঘরে পিতলের কলসিটা ভরা আছে। আগের দিন বিকালে গুড্ডু ছেলেটা নিচের টিউবওয়েল থেকে কলসি ভরে উপরে রেখে গেছে। আর কিছু পরেই তো... কিন্তু হঠাৎ সে আবার সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনতে পায়। ওরা কি আবার ফিরে এসেছে? কিন্তু কেন?
শোবার ঘরের বাতি জ্বলে ওঠে। কাপড় চোপড়ে ঠাসা বন্ধ আলমারি আর কেরোসিন কাঠের আবরণ ভেদ করে একটা আলোর আভা দেখতে পায় আদিল। তার মনে পড়ে, বিছানার পাশের টেবিলে একটা ছোট টুকরিতে কিছু ফল ছিল। একটা কমলা বোধহয় সে আধা খাওয়া অবস্থায় ফেলে এসেছে। এ সব দেখেও তো ওদের সন্দেহ হতে পারে এখানে কেউ লুকিয়ে আছে। বাড়ির বাইরে উত্তর দিকের গলি থেকে ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে বেডরুমের জানালা ছাড়াও উত্তর দিকের দেয়ালে শেষ প্রান্তে একটা ছোট জানালার মতো আছে। কিন্তু আর্মিদের চোখে এ সব খুঁটিনাটি ধরা পড়েনি। ইন্ডিয়ান আর্মি বা পাকিস্তানের সেনাবাহিনি বলে কোনো কথা নেই। ওরা একটা ভিন্ন জাতের মানুষ-- সবগুলার মাথা মোটা। এখানে এই চোরকুঠুরিতে পাঁচজন মানুষ লুকিয়ে থাকতে পারে তা কি কোনো পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার মাথা থেকে বের হয়েছিল! আল বদরের দুর্ধর্ষ লিডার-- পাকিস্তান থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ পাওয়া আদিল আনসারিও ভাবতে পারেনি বিষয়টা। নূরুদ্দিন না নূরুল ইসলাম নামের এক বাঙালি ছোকরা রাজাকারের আবিষ্কার এই চোরকুঠুরি।
‘ফর দ্য টাইম বিং ইউ মে স্টে হিয়ার চৌহান... ইট লুকস্ ক্লিন এ্যান্ড সেফ এ্যানফ।’ সম্ভবত মেজর বা ক্যাপ্টেন র্যাংকের কেউ তার সমপর্যায়ের কোনো অফিসারের সাথে কথা বলছে। আদিবের বুকের রক্ত ছলকে ওঠে। একটু হাঁটা চলার পাশাপাশি অন্য জনের কথা শোনা যায়, ‘পসিবলি সাম বডি ওয়াজ স্টেইং হিহার ইভেন ইয়েস্টার ডে... হাউএভার...’ পরের কথাগুলো আর শোনা যায় না।
ওরা কি এই বাড়িটাকেই ক্যাম্প বানিয়ে ফেলেছে! তা যদি করেই থাকে অবাক হবার কিছু নেই। বাড়িটা তো ভালোই-- মফস্বল শহরে এমন দোতলা বাড়ি, মোজাইকের মেঝে; ঠিক এ্যাটচড্ না হলেও বারান্দায় বেরোলেই বাথরুম। এমন রেডিমেড ব্যবস্থা পেলে অস্থায়ী ক্যাম্প বা অফিস-- কমপক্ষে দু তিনজন অফিসারের থাকার ব্যবস্থা তো হতেই পারে। তবে সত্যি সত্যি ক্যাম্প বা অফিসার্স মেস বানিয়ে ফেললে সর্বনাশ। বেরোবার আর কোনো পথ থাকবে না।
উৎকণ্ঠায় আতঙ্কে শীতের রাতেও ঘামতে থাকে আদিল। নিঃশব্দে পুবের উত্তরের পশ্চিমের দেয়ালে হাতড়ায়। অন্ধকারে কিছুই চোখে পড়ে না। দক্ষিণের দেয়ালে পায়ের টোকা খেয়ে কাঠের টুলের উপর থেকে কাচের বাধানো ছবিটা মেঝেতে পড়ে যায়। ভীষণভাবে আঁতকে ওঠে সে। এই আওয়াজ যদি দেয়ালের ফোকর এবং আলমারির কাপড় চোপড়ের বাধা পেরিয়ে ওপারে পৌঁছায় তাহলে নির্ঘাত ধরা পড়ে যাবে-- আজই এই মুহূর্তে!
রাত খুব একটা গভীর হয়নি। দেয়ালে কান পেতেও আর পাশের ঘরে কথোপোকথন শুনতে পায় না আদিল। পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ। এখন কি বেরোনো যেতে পারে! না-- বরং আরও একটা রাত অপেক্ষা যায়। প্রায় সারা দিন ঘুমিয়ে আর ঘুম আসছিল না। পেটের ভেতরে ক্ষুধা তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। অজানা আশঙ্কা আর আকণ্ঠ পিপাসায় ছটফট করে সে। আবার দুই হাঁটু ভাঁজ করে কুণ্ডলি পাকিয়ে ঝিম ধরে কম্বলের উপরে পড়ে থাকে, দুর্গন্ধযুক্ত আঠালো বালিশে মুখ গুঁজে ঘুমাবার চেষ্টা করে। চোরকুঠুরির কাঁথা কম্বল, বিছানা বালিশ হয়তো এক সময় পরিস্কারই ছিল। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর-- তিন মাসের উপর্যুপরি বৃষ্টি আর বন্ধ ঘরের মেঝেতে পড়ে থেকে চিটচিটে হয়ে গেছে।
সত্যি সত্যি আদিল আবার কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল ঠিক ঠাহর করতে পারে না। ভোরবেলা দূরে কিছু কোলাহল আর তার সাথে গোলাগুলির শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। হঠাৎ করেই তার ভেতরে আশা জেগে ওঠে। গোলাগুলি এখনও চলছে-- তারমানে কি পাকিস্তানিরা ফিরে এসেছে-- নতুন করে লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলছে! মনের ভেতরে সুপ্ত আকাক্সক্ষা জেগে ওঠার সাথে সাথে সে ঝট করে উঠে বসে। বুঝতে পারে পাশের ঘরের বাতিটা নেভানো, কিন্তু দেয়ালে কান পেতে সিঁড়িতে আবারও পায়ের শব্দ শুনতে পায়। কিছুক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে কাটানোর পরে সে ঠিক করে উত্তরের জানালার কার্ডবোর্ড খুলে ফেলে ওপারের রাস্তার অবস্থাটা বুঝতে হবে। অতি সন্তর্পনে দক্ষিণের দেয়ালের পাশ থেকে কাঠের নড়বেড়ে টুলটা তুলে এনে উত্তরের জানালা বরাবর রাখে। এই প্রথম সে ভালো করে দেখতে পায় মেঝেতে পড়ে থাকা কাচের বাঁধানো ছবিটা সিদ্ধিদাতা গণেশের। শারীরিক এবং মানসিক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তার হাসি পায়। পূজারি ভক্তদের জানমাল কোনোটাই রক্ষা করতে না পেরে বেচারা গণেশ বাবাজি নিজেই এখন চোরকুঠুরিতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে! ছবিটা পা দিয়ে মাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে আদিলের। কিন্তু কাচ ভাঙার শব্দ হবার ভয়ে সে নিজেকে সম্বরণ করে।
কাঠের টুলের উপর দাঁড়িয়ে অনেকটা সময় নিয়ে দুই হাতের নখ ব্যবহার করে কখনো আঁচড়ে কখনো খুঁটে খুঁটে ছোট্ট জানালায় লাগানো কার্ডবোর্ডের ঢাকনাটা খুলে ফেলে। প্রায় নিঃশব্দেই কাজটা সারে সে। তারপর অতি সাবধানে মাথা উঁচু করে ওপারে দেখতে চেষ্টা করে। অপরিসর জানালার কাচে চোখ রেখে ধুলো ময়লার আস্তর ভেদ করে উত্তরের গলি এবং দূরে বড় রাস্তার অনেকটাই সে দেখতে পায়। কিন্তু কোথাও তেমন লোক চলাচল নেই। তবে কি শহরে এখন কারফিউ চলছে!
আবার হতাশা এসে আদিলের পুরো চেতনা গ্রাস করে ফেলে। প্রতি মুহূর্তে তার উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে এই চোরকুঠুরি থেকে কেমন করে মোহনলাল বাজলার ছোট ভাই শ্যামলাল, মোহনলালের দুই ছেলে বিনোদ আর বিজয়, বিনোদের বৌ আর একটি বারো চৌদ্দ বছর বয়সের কিশোরীকে বের করে এনেছিল। মেয়েটার নাম সে জানে না-- কিন্তু তার কথা এতোদিন পরে হঠাৎ করেই আদিলের কানে বাজে, তার কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়া আকুতি সে যেনো এই মুহূর্তে স্পষ্ট শুনতে পায়। নাহ-- ক্লান্ত, প্রায় বিধস্ত শরীরে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায় আদিল আনসারি। বদর বাহিনির নগর প্রধানের এ সব ভাবনা ভাবলে চলবে না, সে এ সব ভাবতেও চায় না। শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান, ইংরেজি উর্দু ও বাংলায় সমান দখল, পাকিস্তানে প্যারামিলিশিয়ার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আল বদরের একজন চৌকষ কমান্ডারের কোনো ভাবাবেগ মানায় না। সে পুরো পরিস্থিতি মূল্যায়ণ করে ঠাণ্ডা মাথায় নতুন পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে শুরু করে।
এখান থেকে বেরোতে পারলে খলিল হাজির বাড়ির পেছন দিয়ে, শিব মন্দিরের পাশের গলি-- না বরং ইসলামিয়া প্রিন্টিংপ্রেস, চণ্ডি ঘোষের পুকুর আর ভাঙাচোরা বাড়িগুলোর মাঝখানের সরু রাস্তাটা ধরে গোরস্তানের দেয়াল টপকে বিশ্বাস পাড়ার বটতলা পর্যন্ত সহজেই চলে যাওয়া যায়। সেখান থেকে বড় রাস্তা ধরে সামান্য এগিয়ে আকরামের বাড়িতে পৌঁছাতে পারলে... কিন্তু আকরামেরই বা কি অবস্থা কে জানে! বাঙালি হলেও জানিদোস্ত আলী আকরাম সবদিক সামলে চলা মানুষ। যুদ্ধের শুরুতেই নামের শেষে খান লাগিয়ে আলী আকরাম খান পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন বা মেজর সাহেবদের সাথে যেমন ঠিক তেমনি আওয়ামী লিগের স্থানীয় নেতাদের সাথে সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে চলেছে। শোনা যায় সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন ক্যাম্পেও তার লোকজন আছে। সরাসরি আলী আকরাম ছাড়াও আকরামের অনুরোধে কতজনের কত উপকারই তো আদিল করেছে। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের আপত্তি সত্ত্বেও আকরামের তদবিরে ইন্ডিয়ার বর্ডারে ধরা পড়া দুজন কম বয়েসি ছেলেকে সে ছাড়িয়ে এনেছিল। নিমকহারামগুলো ছাড়া পেয়ে আবার যুদ্ধে যোগ দিতে ওপারে চলে গেছে কিনা কে জানে! যাই হোক-- বিপদের সময় আকরাম নিশ্চয়ই এ সব কথা ভুলে যাবে না!
একটা দুপুর আর একটা বিকেল কোনো কোনো রকমে কাটতে পারলে সন্ধ্যার পরে বেরিয়ে পড়ার রিস্ক নিতেই হবে। দিনের আলোতে এই শহরে যে কেউ তাকে চিনে ফেলবে। এখানে আদিল আনসারির নামই হয়ে গেছে বেদিল বিহারি। কিন্তু এ অবস্থায় আর এক দুদিন থাকলে শুধু পানির অভাবেই শুকিয়ে মরতে হবে। চোরকুঠুরিতে ঢোকার আগে এক জগ পানি সাথে নিয়ে ঢুকবার কথা মনে হয়নি কেন! নিজেই নিজেকে ‘বাঞ্চোত’ বলে গালি দেয়। শুধু পানি নয়-- সামনে কি ঘটতে যাচ্ছে, তার জন্যে কেমন প্রস্তুতি নেয়া দরকার এ সবের অনেক কিছুই তো অনুমান করা দরকার ছিল। আসলে পাকিস্তানের বাহাদুর সেনাবাহিনি যে এতো তাড়াতাড়ি লেজ গুটিয়ে নিজেদের অবস্থান ছেড়ে পালাবে তা শুধু আদিল কেন, ভারতের সেনাবাহিনিও ভাবতে পারেনি। তেরো তারিখ দুপুরে যুদ্ধের পুরো পরিস্থিতি নিয়ে মেজর আলতাফের সাথে কথা হয়েছে। একটু চিন্তিত মনে হলেও আদিল আনসারির প্রশ্নের উত্তরে হারামজাদা বেশ জোর দিয়ে বলেছে,‘উই নেভার থিংক অফ রিট্রিট-- এ্যাট এনি কস্ট উই আর গোইং টু ফাইট ব্যাক টিল টু দ্য লাস্ট ড্রপ অফ আওয়ার ব্লাড।’
বাস্টার্ড যে তার দলবল নিয়ে রাতেই কেটে পড়বে তা কেউই জানতো না। সন্ধ্যা সাতটা সাড়ে সাতটার দিকে শান্তি কমিটির অফিসে জেনে এসেছিল ইন্ডিয়ান আর্মি বর্ডার ক্রস করে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পড়েছে। বন্ধু দারাশিকো এবং সহকর্মী গোলাম রসুল রাতেই শহর ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিল। আদিল ভেবেছিল রাতটা নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে অনেক দূরে ট্যাংকের শব্দ এবং কাছাকাছি অসংখ্য মানুষের কোলাহল শুনেছিল। এখন মনে পড়ছে হৈ চৈ-এর মধ্যে বোধহয় ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানটাও সে শুনছে। হয়তো এই শ্লোগানটা সে শুনতে চায়নি বলেই স্পষ্ট করে শুনতে পায়নি। কিন্তু বুঝে ফেলেছিল পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।
ক্ষুৎ পিপাসায় কাতর আদিল আনসারি সারাটা দিন খালি মেঝেতে পড়ে থাকে। অনেকগুলো দুঃস্বপ্ন দিয়ে ঘেরা একটা ঘোরের মধ্যে কাটে তার। কয়েকটা ঝাপসা দৃশ্য তার চোখের সামনে ভেসে ভেসে আসে, আবার খুব স্পষ্ট হবার আগেই মিলিয়ে যায়। শুধু মোহনলাল বাজলার বাড়ি নয়-- সে দেখতে পায় মনোরঞ্জন ডাক্তারের বাড়িতে লুটপাটের নেতৃত্ব দিচ্ছে সে... কালীচরণ চক্রবর্তীর বাড়িতে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে... সদরউদ্দিন হাজির বাড়ি থেকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে তার দুই ছেলে আর ছোট শালাকে চোখ বেঁধে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে... মোকসেদ মাস্টারের মেয়েটাকে জোর করে জিপে তুলে নিয়ে... কার কাছে দিয়ে এসেছিল? ক্যাপ্টেন ইমতিয়াজ... নাকি সগির আলি... ঠিক মনে পড়ে না।
সেপ্টেম্বরে বদর বাহিনি গড়ে তোলার আগে পর্যন্ত, অর্থাৎ পুরো জুলাই অগাস্ট অসংখ্য বাড়িঘর দোকান আড়ত গুদামে হামলা চালিয়েছে আদিল আনসারির দল। চিলেকোঠা, সিঁড়িঘর, প্যাকিং বাক্সের স্তুপ আর বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড় থেকে টেনে এনেছে দেশের ভেতরে আত্মগোপন করে থাকা নান বয়সের মানুষ, নারী ও শিশুদের। পরিবারের কর্তা-- বাবা অথবা বৃদ্ধ দাদু অনুনয় বিনুনয় করে বলেছেন, ‘টাকা পয়সা সোনদানা গয়না গাটি যা আছে তোমরা সব নিয়া যাও-- আমাক শুদ্ধা ধরে নিয়ে যাও, খালি আমার বৌ বেটি আর ছেলে মেয়েগুলার তোমরা কোনো ক্ষতি করো না বাবা...।’ নেয়ার সময় টাকা কিংবা সোনা-- কিছুই বাদ দেয়নি, কিন্তু শেষপর্যন্ত তাদের ছেড়ে দেবার প্রতিশ্রুতি রাখেনি তারা। হাসিমুখে সবকিছু আত্মসাৎ করার পরে সকলকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছে। নিজের হাতে গুলি না চালালেও ক্যাম্পে নিয়ে যাবার হুকুম দিয়েছে। এক দুদিন পরে নদীর ধারে কারও কারও লাশ পাওয়া গেছে। ধরে নিয়ে যাবার পর থেকে পুরোপুরি নিখোঁজ হয়ে গেছে কেউ কেউ।
অবচেতন অর্ধচেতনের মধ্যেও সে আলমারির পেছনে ফোকরের কাছে কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে ওপারের শব্দ। বুঝতে চেষ্টা করে কি ঘটে চলেছে দেয়ালের ওপারে। মাঝে মাঝেই ঘরে চলাফেরার শব্দ পায়, কখনো একটা দুটো শব্দের বেশি কিছুই শোনা যায় না।
সন্ধ্যার পরে আবারও বাতি জ্বলে ওঠে। কেউ একজন এসে আলমারির পাল্লা টেনে খোলে। কিছুক্ষণ কাপড় চোপড় নাড়াচাড়ার শব্দ পাওয়া যায়। একটা শীতল জলের প্রবাহ আতঙ্কিত আদিলের শিরদাঁড়া দিয়ে নিচে নামে। সে কান খাড়া করে পরবর্তী ঘটনার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে।
‘নেহি-- এ্যায়সা কোই খাস জিচ নেহি। ইউ কান্ট ইউজ এনি অফ দিজ...’ একটু পরে কণ্ঠ এবং পায়ের শব্দ দুইই মিলিয়ে যায়।
চোরকুঠুরির ফাঁদে আটকে পড়া আদিল আনসারি আবার কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল নাকি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল সে জানে না। সকালে তার তন্দ্রা ছুটে যাবার পরে চোখ মেলে দেখে পুব দেয়ালের ঘুলঘুলি দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়েছে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পোস্টারের উপর। নৌকার ছবিটার ঠিক উপরে দাঁড়িয়ে আছেন শেখ মুজিব। আলোয় উদ্ভাসিত তাঁর মুখ। উঠে দাঁড়াবার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছে আদিল। তবুও সে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যায় পশ্চিমের দেয়ালে, টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চায় পোস্টার। কিন্তু তার হাত শেখ মুজিবের পায়ের কাছেও পৌঁছায় না, তার আগেই সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়।
বাইরে হঠাৎ অসংখ্য মানুষের হৈ চৈ শোনা যায়। হতবিহ্বল আদিল কিছুক্ষণ মেঝেতে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকার পরে উঠতে চেষ্টা করে। দূরের আনন্দ কোলাহল ক্রমেই কাছে এগিয়ে আসতে থাকে। টেনে হিঁচড়ে শরীরের সবটুকু শক্তি একত্রিত করে নিজেকে সে উত্তরের জানালার কাছে দাঁড় করায়। এক হাতে জানালার কিনারা আর অন্য হাতে কাঠের টুলটা আঁকড়ে ধরে এক সময় অতি কষ্টে টুলের উপরে উঠে পড়ে। জানালার কাচে চোখ রেখে সে দেখে দূর থেকে একটা মিছিল ক্রমেই এগিয়ে আসছে। মিছিলের কণ্ঠস্বর মুহুর্মূহু গর্জে উঠছে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনিতে। আদিলের হৃদস্পন্দন দ্রুত বাড়তে থাকে। বিস্ময়ের সাথে সে দেখতে পায় সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের মাঝে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা পতাকা হাতে নিয়ে মিছিলের একবারে সামনে মোহনলাল বাজলার সেই কিশোরী নাতনি।
নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারে না আদিল আনসারি। একের পর এক মোকসেদ মাস্টারের মেয়ে শিউলি, স্ত্রী এবং ছোট ভাইসহ বিনোদ বাজলা, মনোরঞ্জন ডাক্তার, সদরউদ্দিন হাজির দুই ছেলে আর তাদের মুক্তিযোদ্ধা মামা জোর গলায় শ্লোগান দিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কাঠের নড়বড়ে টুলটা থেকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ার আগের মুহূর্তে সে দেখতে পায়-- পায়ের পাতায় মাটি স্পর্শ না করে কুয়াশার আবরণ সরিয়ে হাজার হাজার মানুষের মিছিল হাওয়ায় ভেসে ভেসে পাড়ি দিচ্ছে পরিচিত পথ।


0 মন্তব্যসমূহ