মার্গারেট মিচেলের ধারাবাহিক উপন্যাস: যেদিন গেছে ভেসে গেছে -- পর্ব ৩৬


বাংলা ভাষান্তরঃ উৎপল দাশগুপ্ত

(৩৬)

পূর্বরাগের পালা ঝটিকাগতিতে সেরে নিয়ে দু’সপ্তাহের মাথায় ও ফ্র্যাঙ্ককে বিয়ে করে ফেলল। ওঁর ক্রমবর্ধমান অনুরাগ দেখে লজ্জা লজ্জা মুখ করে ফ্র্যাঙ্ককে জানিয়ে দিল যে ওর পক্ষে প্রতীক্ষা করাটা আর সম্ভব হচ্ছে না। 

এই দুই সপ্তাহ ধরে রাতের পর রাত ঘরের ভেতরে স্কারলেটের অস্থির পায়চারির কথা অবশ্য ফ্র্যাঙ্ক জানেন না। ইশারা ইঙ্গিতগুলো ভদ্রলোকে এমন দেরি করে বোঝেন যে স্কারলেটের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল। ঈশ্বরের কাছে প্রাণপণে প্রার্থনা করে যাচ্ছিল যেন এই অসময়ে কোনোভাবেই ওঁর কাছে স্যুয়েলেনের চিঠি এসে হাজির না হয়। ভাগ্যিস ওর বোন একেবারেই চিঠি লিখিয়ে নয়, চিঠি পেতেই ও বেশি ভালবাসে – এর জন্য ঈশ্বরকে ও বারে বারে ধন্যবাদ জানাল। কিন্তু কে বলতে পারে, দুম করে একটা চিঠি হয়ত লিখেই ফেলল! এলেনের রঙচটা শালটা রাতের পোশাকের ওপর জড়িয়ে নিয়ে সুদীর্ঘ রাতগুলো ঠাণ্ডা মেঝের ওপর পদচারণা করতে করতে দুর্ভাবনাটা ওকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। ইতিমধ্যে উইলের খুব সংক্ষিপ্ত একটা চিঠি থেকে জানতে পেরেছে যে উইল্কারসন আবার টারাতে হানা দিয়েছিল, আর স্কারলেট অ্যাটলান্টা গেছে জানতে পেরে জোর করে ঢোকবার চেষ্টা করেছিল। তবে অ্যাশলে আর উইল ওকে ঘাড়ধাক্কা মেরে বের করে দিয়েছে। এই চিঠির কথাও ফ্র্যাঙ্ক জানেন না। বাড়তি খাজনা দেবার সময় যে ক্রমেই এগিয়ে আসছে, উইলের চিঠি পেয়ে সেটা ওর মনে নতুন করে অস্বস্তি জাগিয়ে তুলল। একটার পর একটা দিন চলে যাচ্ছে, মরিয়া হয়ে ভাবতে লাগল কোনোভাবে টুঁটি টিপে সময়কে যদি থামিয়ে দেওয়া যেত, বেশ হত।

কিন্তু মনের ভাব স্কারলেট এমন সুন্দরভাবে আড়াল করে রাখল, এমন নিখুঁত অভিনয় করে চলল যে ফ্র্যাঙ্ক সন্দেহ করবার কোনো সুযোগই পেলেন না। ওপরে ওপরে যা দেখতে পেলেন, সেটাই সরল মনে বিশ্বাস করলেন। চার্লস হ্যামিলটনের তরুণী, সুন্দরী, অসহায় বিধবা প্রতিদিন সন্ধেবেলা মিস পিটির বসার ঘরে ওঁকে সাদর অভ্যর্থনা করে বসান আর সপ্রশংস দৃষ্টিতে দমবন্ধ করে স্টোর নিয়ে ওঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা – করাতের মিলটা কিনতে পারলে ওঁর আয় কতটা বৃদ্ধি পাবে সেই সব কথা – শুনতে থাকেন। ওকে এসব কথা বলতে পেরে, স্যুয়েলেনের তথাকথিত বিশ্বাসভঙ্গে উনি যে আঘাত পেয়েছেন, সেই ক্ষতে প্রলেপ লাগে। স্যুয়েলেনের আচরণে উনি যারপরনাই কষ্ট পেয়েছিলেন, ওঁর পুরুষসুলভ অহমিকাকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছিল।  অকৃতদার, মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ, মহিলামহলে উনি যে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু নন, সেই ব্যাপারে উনি যথেষ্টই সচেতন।  তবুও উনি বেদনাবোধ করেছিলেন। বিশ্বাসভঙ্গের জন্য তিরস্কার করে স্যুয়েলেনকে উনি কোনও চিঠি লেখেননি, এরকম কিছু করার কথা ভাবতেই ওঁর সঙ্কোচ বোধ হয়েছিল। কিন্তু স্কারলেটের সঙ্গে কথা বলে উনি হৃদয়ের ভার লাঘব করতে পারতেন।   স্যুয়েলেনের সম্বন্ধে কোনো রকম কটূক্তি না করেই স্কারলেট বলত যে ওর বোন ওঁর সঙ্গে খুব অন্যায় করেছে। মেয়েদের কাছ থেকে এরকম আচরণ ওঁর একেবারেই প্রাপ্য নয়।  মেয়েরা খুবই ওঁর কদর করে।  

বেচারি মিসেজ় হ্যামিলটন – কী মিষ্টি চেহারা আর গাল থেকে গোলাপি আভা ঝরছে। নিজের দুর্ভাগ্যের কথা স্মরণ করে কখনো কখনো বিষণ্ণ হয়ে পড়েন, আবার ওঁর মন ভাল করার জন্য  মজার মজার গল্প বললে খুশিতে হেসে ওঠেন, সেই হাসিতে যেন মুক্তো ঝরে। সবুজ রঙের গাউনটা ম্যামি যত্ন করে পরিষ্কার করে দিয়েছে। ওটা পরে থাকায় ওঁর শরীরের ছিপছিপে গড়ন আর সরু কটিদেশ স্পষ্ট করে ফুটে উঠেছে। আর ওঁর কেশরাশি আর রুমাল থেকে সর্বদা যে সুরভি পাওয়া যায় সেটা প্রাণ জুড়িয়ে দেয়!  এমন মার্জিত রুচির সুন্দরী একজন মহিলা আজ কত নিঃসহায়, একলা হাতে বিশ্বসংসারের কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করে চলেছেন – ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! পরিস্থিতিটা যে কত কঠিন সেট ওঁর বোঝার ক্ষমতা নেই। ওঁকে নিরাপদ আশ্রয় দেবার জন্য স্বামী নেই, ভাই নেই, এমনকি ওঁর বাপিও ওঁকে সুরক্ষা দেবার অবস্থায় নেই। ফ্র্যাঙ্কের মনে মনে ভাবেন, একাকী একজন মহিলার পক্ষে  এই সংসারটা বড়ই কঠিন ঠাঁই। এই ধারণাটা ওঁর মনে দৃঢ় করে তোলার ব্যাপারে স্কারলেটও নীরবে উৎসাহ জোগাতে লাগল।  

প্রতিদিন সন্ধেবেলাই উনি এসে হাজির হতেন। পিটির বাড়ির আনন্দময় পরিবেশে উনি শান্তিলাভ করতেন। বিশেষ অতিথির সম্মান দিয়ে উষ্ণ হাসিতে অভ্যর্থনা জানিয়ে ম্যামি ওঁকে ভেতরে নিয়ে আসত। ওঁর জন্য ব্র্যান্ডি মেশানো কফি বানিয়ে আনত। ওঁর আর স্কারলেটের পাশে ঘুরঘুর করে ওঁর প্রতিটা কথা মন দিয়ে শুনত। মাঝে মধ্যে ব্যবসার তদারকিতে যাওয়ার সময় বিকেলবেলা স্কারলেটকে ওঁর জুড়িগাড়িতে বসিয়ে ঘোরাতে নিয়ে যেতেন। এই সব ভ্রমণের সময় স্কারলেটের বোকা বোকা প্রশ্ন শুনে অনাবিল আনন্দ লাভ করতেন – মনে করতেন এগুলো কেবল  “নারীসুলভ কৌতুহল” ছাড়া আর কিছুই না। ব্যবসার ব্যাপারে স্কারলেটের অপরিসীম অজ্ঞতা দেখে উনি হেসে ফেলতেন। স্কারলেটও হেসে ফেলে বলত, “আমার মত সরল সাদাসিধে মেয়ে পুরুষমানুষের ব্যবসার সমস্ত জটিলতা বুঝে ফেলবে, এটা নিশ্চয়ই আপনি আশা করেননি।”

উনি যে আসলে একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং বুদ্ধিমান পুরুষ, কিন্তু বিধাতা ওঁকে অন্যান্য পুরুষের তুলনায় কোমলতর হৃদয়ের অধিকারী করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন অসহায় মহিলাদের সহায় হবার জন্য, এই ধারণাটা স্কারলেট ওঁর মনে গড়ে উঠতে সাহায্য করল।  ওঁর সাদামাটা জীবনধারায় এই প্রথম কোনও মহিলা ওঁর চরিত্রের এই বিশেষ দিকটা নজর করলেন।

অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান হল। বিবাহের মণ্ডপে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে – কনের কোমল হাত ওঁর হাতে ধরা, কনের চোখ অর্ধনিমীলিত, চোখের পালকের ছায়া অর্ধচন্দ্রাকারে ওর গোলাপি গালের ওপর পড়েছে – ফ্র্যাঙ্ক এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না। জীবনে এই প্রথম অসাধারণ আর রোমাঞ্চকর কিছু একটা করে ফেলেছেন। উনি – ফ্র্যাঙ্ক কেনেডি – এই সুন্দরী মেয়েটিকে দু’হাতে ভূমি থেকে তুলে নিজের শক্তিশালী দুই বাহুর মধ্যে আশ্রয় দিতে পেরেছেন।  আবেশে হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।  

বিবাহের সময় কোনও আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব ওঁদের পাশে ছিলেন না। সাক্ষী হিসেবে অপরিচিত কিছু মানুষকে রাস্তা থেকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। স্কারলেট এই ব্যাপারে জেদ ধরে বসেছিল, ওঁকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নিতে হয়েছে। জোনসবোরো থেকে ওঁর বোন আর ভগ্নীপতি এলে ফ্র্যাঙ্কের ভাল লাগত।  মিস পিটির বৈঠকখানায় বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে কনের স্বাস্থ্যপান করা আর একটু হইচই, একটু আনন্দ করা।  কিন্তু স্কারলেটকে কিছুতেই রাজি করা গেল না, এমনকি মিস পিটিকেও ডাকতে দিল না।

“শুধুই আমরা দুজন, ফ্র্যাঙ্ক,” ওঁর হাত ধরে মিনতি করল। “যেন পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করছি – বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করা – কতদিনের শখ আমার! আমার মুখ চেয়ে এটা তুমি মেনে নাও, লক্ষ্মীটি।”

এই রকম প্রিয় সম্বোধন – বড় মিঠে ঠেকল ওঁর কানে।  মায়াভরা সবুজ দু’চোখে মুক্তোর মত অশ্রু টলটল করছে। মিনতিভরা চোখে ওঁর দিকে তাকিয়ে আছে। উনি মোহিত হয়ে পড়লেন। পুরুষমানুষকে তো বউয়ের জন্য কিছু কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়, তার ওপর আবার বিয়ে বলে কথা, এই ব্যাপার নিয়ে মেয়েদের মনে না জানি কত আবেগ জমে থাকে!  

সেই সব ভাল করে বুঝে ওঠার আগেই ওঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল।

* * *

ওর মিষ্টি আবদার ঠেলতে না পেরে ফ্র্যাঙ্ক তিনশ ডলার ওকে দিয়ে দিলেন। তবে ওর তাড়া দেখে একটু অবাকও হলেন। কিছুটা অনিচ্ছা নিয়েই টাকাটা দিলেন, কারণ করাতের মিলটা কেনবার স্বপ্নটা পিছিয়ে দিতে হবে। এদিকে স্কারলেটের পরিবার উচ্ছেদ হয়ে যাক, সেটাই বা কেমন করে মেনে নেন। এই হতাশা কেটে যেতে বেশি সময় অবশ্য লাগল না, যখন দেখলেন স্কারলেট ওর খুশি ধরে রাখতে পারছে না। ওঁর বদান্যতায় খুব কৃতার্থ বোধ করছে। এর আগে কোনো মেয়েকে ওঁর ওপর কৃতার্থ হতে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তাই মনে হল, টাকা খরচ করাটা বৃথা যায়নি।

কালবিলম্ব না করে স্কারলেট ম্যামিকে টারা পাঠিয়ে দিল। তিনটে উদ্দেশ্য। উইলের হাতে টাকাটা তুলে দেওয়া, বিয়ের কথাটা সবাইকে জানানো আর ওয়েডকে অ্যাটলান্টায় নিয়ে আসা। দুদিনের মধ্যে উইলের কাছ থেকে ছোট্ট একটা চিরকুট পেল। চিরকুটটা হাতছাড়া করল না। যতবারই ওটা পড়ে, ওর খুশি বেড়ে ওঠে। উইল জানিয়েছে যে খাজনা মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, খবরটা জানতে পেরেই জোনাস উইল্কারসন এসে ‘খুব বজ্জাতি করেছে’। তবে এখন পর্যন্ত নতুন করে কোনো হুমকি দেয়নি।  চিরকুটের শেষে উইল ওর সুখী জীবন কামনা করেছে। বাহুল্যবর্জিত, প্রথামাফিক বার্তা। অনুমোদন বা অননুমোদনের কোনো উল্লেখ নেই। স্কারলেট জানে যে উইল ঠিকই বুঝেছে,এই কাজটা করতে ও কেন বাধ্য হয়েছে, তাই কোনো দোষারোপ করেনি বা তারিফও।  কিন্তু অ্যাশলে কী ভাবল? খুব অস্বস্তি হচ্ছে ওর। এই সেদিন টারার ফলের বাগানে ওকে কত কথা বললাম, এখন আমার সম্বন্ধে ওর কী ধারণা হল?  

স্যুয়েলেনের কাছ থেকেও একটা চিঠি পেল। অজস্র বানান ভুলে ভরা, ছত্রে ছত্রে স্কারলেটের উদ্দেশ্যে বাছা বাছা গালি আর গরল উগরে দিয়েছে। কিন্তু চিঠিতে ওর চরিত্র নিয়ে মন্তব্যগুলো এতটাই সত্যি যে চিঠির লেখিকাকে স্কারলেট কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবে না।  তবে চিঠিটা পেয়েও ওর আনন্দে বিন্দুমাত্র ঘাটতি পড়ল না। টারা নিরাপদে আছে, অন্তত আপৎকালীন বিপদ তো কেটে গেছে।

এখন থেকে অ্যাটলান্টাই যে ওর স্থায়ী ঠিকানা হয়ে গেল, টারা নয়, এই কথাটা মেনে নিতে একটু কষ্ট হল। খাজনার টাকা জোগাড় করার মরিয়া তাগিদে, টারা এবং টারার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করে আছে, সেটুকু ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাববার অবকাশ পায়নি। এমনকি বিয়ের মুহূর্তেও এই কথাটা মনে আসেনি যে বাড়ির নিরাপত্তার স্বার্থেই ও সেই বাড়ি থেকে নিজেকে চিরনির্বাসিত করে ফেলল। সব কিছু মিটে যাওয়ার পর এখন বাড়ির জন্য খুব মন কেমন করছে। চেষ্টা করেও অনুভূতিটা মন থেকে সরিয়ে দিতে পারছে না। কিন্তু যা হবার তা তো হয়েই গেছে। একটা বাজি লাগিয়েছিল। বাজির শর্তটা ওকে মেনে নিতেই হবে। ফ্র্যাঙ্কের জন্যেই টারা বেঁচে গেছে, তার জন্য ওঁর প্রতি ও খুব কৃতজ্ঞ।  ওঁর প্রতি উষ্ণ অনুরাগে ওর মন ভরে গেল।  একই রকম উষ্ণতার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করল খুব ভাল বউ হবার চেষ্টা করবে, যাতে ওকে বিয়ে করা নিয়ে ফ্র্যাঙ্কের মনে কোনো গ্লানি যেন না থাকে।

অ্যাটলান্টার ভদ্রমহিলারা নিজেদের ব্যাপারে যেমন ওয়াকিবহাল থাকতেন, পাড়াপড়শিদের ব্যাপারেও তেমনই খোঁজখবর কিছু কম রাখতেন না, বরং সেই ব্যাপারে ওঁদের কৌতুহল ছিল অপরিসীম।  ওঁরা জানতেন যে ফ্র্যাঙ্ক কেনেডির সঙ্গে বেশ অনেক বছর ধরেই স্যুয়েলেন ও’হারার একটা ‘বোঝাপড়া’ ছিল। তাছাড়া ফ্র্যাঙ্ক সবাইকে ঠারে ঠারে জানিয়েও রেখেছিলেন যে শীতের শেষে খুব সম্ভব ওঁরা গাঁটছড়া বাঁধতে চলেছেন। ফলে হঠাৎ করে স্কারলেটের সঙ্গে চুপি চুপি বিয়ে হয়ে যাওয়া নিয়ে ওঁদের কথা চালাচালি, ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব আর গভীর সংশয়ের সৃষ্টি হবে, তা নিয়ে অবাক হবার কিছু নেই।  একান্ত অপারগ না হলে মিসেজ় মেরিওয়েদার কৌতুহল দমিয়ে রাখার পাত্রীই নন। তিনি একদিন ফ্র্যাঙ্ককে সরাসরি জিগ্যেসই করে ফেললেন যে এক বোনের কাছে বাগদান করেও অন্য বোনকে বিয়ে করে ফেলার মানেটা ঠিক কী। মিসেজ় এলসিংকে ঘটনাটা বলতে গিয়ে জানিয়েছিলেন যে ওঁর এই বেয়াড়া প্রশ্নের উত্তরে ফ্র্যাঙ্ক নাকি কেবল বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে ওঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মিসেজ় মেরিওয়েডারের মত সাহসী মানুষও এই ব্যাপারে স্কারলেটকে ঘাঁটাতে সাহস করেননি। আজকাল স্কারলেটকে দেখলেই একজন ভদ্র, নম্র মেয়ে বলে মনে হয়। তবে ওর চোখেমুখে পরম পরিতৃপ্তির একটা হাসি খেলা করে, সেটা নিয়েও লোকজনের মনে বিস্ময়ের শেষ নেই। তবে কিনা স্কারলেটের মেজাজ মর্জির কোনও ঠিকানা থাকে না, তাই ওকে না ঘাঁটানোই মঙ্গল।

কথা চালাচালি যে হচ্ছে, সেটা স্কারলেট ভালই বুঝতে পারে, তবে গ্রাহ্য করে না। একজন মানুষকে বিয়ে করার মধ্যে অনৈতিক কিছু তো আর নেই! টারা নিরাপদে আছে। যার যা খুশি বলুক। ভাবনা করার মত হাজারটা ব্যাপার ওর আছে, এসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর সময়ই নেই।  সবার প্রথমে যেটা প্রয়োজন সেটা হল ফ্র্যাঙ্ককে সুকৌশলে বোঝানো যে স্টোর থেকে আরও একটু টাকাকড়ির আমদানি হওয়া দরকার। জোনাস উইল্কারসন যেরকম ভয় ওকে পাইয়ে দিয়েছিল  তারপর ওর আর ফ্র্যাঙ্কের হাতে বাড়তি কিছু টাকা না রাখতে পারলে ও কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারবে না।  ধরা যাক সেরকম আপতকালীন পরিস্থিতি তৈরি হল না, কিন্তু পরের বছরের খাজনা দেবার জন্যেও তো টাকা জমাতে হবে, তার জন্যেও তো ফ্র্যাঙ্ককে বেশি করে উপার্জন করতে হবে। তাছাড়া ফ্র্যাঙ্কের সেই করাতের মিল কেনার ইচ্ছেটাও মন থেকে সরাতে পারছে না। করাতের মিল থেকে ফ্র্যাঙ্ক অনেক টাকা রোজগার করতে পারবেন। যে কেউই পারবেন, কারণ চেরাই কাঠের যা আগুন দাম এখন। একটু অস্থির বোধ করল। ফ্র্যাঙ্কের জমানো টাকাটা খাজনা দেওয়া আর মিল কেনা দুটোই একসাথে করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। যে করেই হোক স্টোর থেকে আরও বেশি অর্থ উপার্জন করতে হবে, এটা ও মনে মনে ঠিকই করে নিল। আর দেরি করলে চলবে না, যাতে অন্য কেউ হাত লাগানোর আগেই মিলটা ফ্র্যাঙ্ক কিনে নিতে পারেন। একেবারে জলের দরে পাওয়া যাচ্ছে মিলটা।

পুরুষমানুষ হলে মিলটা ও নিয়েই ছাড়ত, তার জন্য স্টোরটা বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করতে হলেও পিছিয়ে যেত না। বিয়ের পরের দিন কথাটা খুব কায়দা করে ফ্র্যাঙ্কের কাছে তুলল। ফ্র্যাঙ্ক হেসেছিলেন,  বলেছিলেন ব্যবসাপত্রের মত নীরস ব্যাপারে ওর ছোট্ট মিষ্টি মাথাটা না ঘামালেও চলবে। বন্ধক দেওয়া বলতে কী বোঝায় সেটা স্কারলেট জানে দেখে ফ্র্যাঙ্ক বেশ বিস্মিত হয়েছিলেন, মজাও পেয়েছিলেন। তবে এই মজা পাওয়াটা বেশিদিন টিকল না। বরং বিয়ের প্রথম দিকেই বেশ একটা ধাক্কা খেলেন। একদিন অসাবধানে ওকে বলে ফেলেছিলেন, ‘কয়েকজন মানুষ’ (অবশ্য তাঁদের কারোর নাম নেননি) স্টোর থেকে বাকিতে জিনিস কিনেছেন, কিছু অসুবিধে থাকায় এখনও টাকা মিটিয়ে দিতে পারেননি। তবে উনি এই সব পুরনো বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতদের কাছ থেকে তাগাদা দিয়ে টাকা আদায় করার কথা ভাবতেও পারেন না। স্কারলেটকে কথাটা বলা যে ভুল হয়ে গেছে, সেটা বুঝতে ফ্র্যাঙ্কের বেশি সময় লাগেনি, কারণ এই ব্যাপারে বারবার প্রশ্ন করে স্কারলেট ওঁকে অতিষ্ঠ করে তুলল। ছেলেমানুষ আবদারের ভঙ্গীতে জানতে চাইলেও, ওঁদের নাম আর কার কাছে কত টাকা বাকি সেটা জানার ব্যাপারে ওর কৌতুহল যে অপরিসীম সেটা চাপা রইল না। ফ্র্যাঙ্ক নানাভাবে জবাব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অস্বস্তিভরে কেশে, হাত পা নেড়ে উনি প্রসঙ্গান্তরে যাবার চেষ্টা করেন। আর বারেবারে ওর ছোট্ট মিষ্টি মাথার কথা তোলেন।

ধীরে ধীরে ওঁর বোধোদয় হল, ছোট্ট আর মিষ্টি হলে কী হবে, ‘হিসেবের ব্যাপারে’ ওই মাথাটা খুবই সেয়ানা।  বাস্তবিক, ওই মাথাটা ওঁর নিজের মাথার চাইতেও অনেক বেশি পরিষ্কার – অবাক তো হলেনই, অস্বস্তিকর একটা অনুভূতিও ওঁকে ঘিরে ধরল। তারপর যখন দেখলেন বড় বড় যোগ ও নিমেষে মুখে মুখে করে ফেলতে পারে, আর কাগজ কলম ছাড়া উনি তিন ঘরের বেশি যোগ করার কথা ভাবতেও পারেন না, তখন উনি একেবারে তড়িতাহত হয়ে পড়লেন। ভগ্নাংশ থাকলেও ওর কোনো অসুবিধেই হয় না।  ওঁর মনে হল মেয়েদের ভগ্নাংশ বোঝা বা ব্যবসাতে আগ্রহ থাকাটা খুবই অ-নারীসুলভ একটা ব্যাপার, আর দুর্ভাগ্যক্রমে কোনও মেয়ের যদি এই অ-নারীসুলভ বুদ্ধিমত্তা থাকে, তাহলে সেটা ওর চেপে রাখাই উচিত।  আজকাল ব্যবসাপত্র নিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলতে আর ভালই লাগে না, অথচ বিয়ের আগে এসব নিয়ে কথা বলতে ওঁর উৎসাহের কিছু কমতি ছিল না। উনি তখন ভাবতেন যে এসব বোঝা ওর কর্ম নয়, তাই ওকে সহজ ভাষায়  বুঝিয়ে বলে উনি খুব আনন্দ পেতেন। অথচ এখন দেখছে এই সব ও  রীতিমত ভাল করে বুঝতে পারে, তাই মনে মনে এটা নারীজাতির দ্বিচারিতা ভেবে পুরুষোচিত দম্ভ চরিতার্থ করার চেষ্টা করলেন।  মেয়েদেরও যে মস্তিষ্ক বলে কিছু থাকতে পারে সেটা আবিষ্কার করেও ওঁর পুরুষোচিত অহং আহতবোধ করল।  

বিবাহিত জীবনের ঠিক কত দিনের ভেতর ফ্র্যাঙ্ক স্কারলেটের ছলনা করে ওঁকে বিয়ে করে নেওয়ার ব্যাপারটা টের পেয়েছিলেন, সেটা কেউ জানে না। টোনি ফোনটেন যখন ব্যবসার কাজে অ্যাটলান্টায় এল, ওর জড়তাহীন স্বাভাবিক আচরণ দেখে হয়ত সত্যিটা উনি একটু একটু আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। হয়ত জোন্সবোরো থেকে ওঁর বোন চিঠি লিখে সরাসরি জানিয়ে থাকতে পারেন। এই বিয়ের খবর পেয়ে উনি খুবই বিস্মিত হয়েছিলেন।  স্যুয়েলেনের কাছ থেকে যে জানতে পারেননি, এটা জোর দিয়েই বলা যায়।  ও কখনোই ওঁকে কোনো চিঠি লেখেনি, আর খুব স্বাভাবিক কারণেই উনি চিঠি লিখে নিজের সাফাই গাইতে পারেননি। সাফাই গেয়েই বা কী লাভ, বিয়েটা তো হয়েই গেছে! স্যুয়েলেন যে কোনোদিনই আসল সত্যিটা জানতে পারবে না এটা ভেবেই উনি মরমে মরে গেছেন।  ও ভেবে যাবে যে উনিই নিষ্ঠুরভাবে কথার খেলাপ করেছেন। হয়ত সকলেই এই একই কথা ভাবছেন আর ওঁর সমালোচনা করছেন। খুব বিশ্রী একটা পরিস্থিতিতে পড়ে গেছেন। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবার কোনো উপায়ও ওঁর নেই। পুরুষমানুষ সামান্য এক নারীর জন্য জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছেন – বা একজন মহিলার মিথ্যে প্ররোচনায় ভুলে তাকে বিয়ে করে ফেলেছেন – এসব কথা কাউকে গিয়ে বলা যায় না!   

স্কারলেট হচ্ছে ওঁর স্ত্রী আর স্বামী হিসেবে স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে উনি অঙ্গীকারবদ্ধ।  তাছাড়া স্কারলেট যে ওঁকে ভালবেসে নয়, নিছক স্বার্থের খাতিরে বিয়ে করেছে, সেটাও উনি মন থেকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। ওঁর পুরুষোচিত অহমিকাও জিনিসটাকে এভাবে দেখতে প্রশ্রয় দেয় না। বরং স্কারলেট হঠাৎ ওঁর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, আর ওঁকে বিয়েতে রাজি করানোর জন্য মিথ্যে বলতেও পিছপা হয়নি, এটা ভাবতেই বেশি ভাল লাগে। পুরো ব্যাপারটাই খুব গোলমেলে।  ওঁর হাঁটুর বয়সি সুন্দরী, চালাকচতুর একজন মেয়ের কাছে উনি যে খুব আকর্ষণীয় একজন পাত্র নন, সেটা উনি ভালই বোঝেন।  কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক একজন খাঁটি ভদ্রলোক, তাই বিভ্রান্তিটা নিজের মধ্যেই রেখে দিলেন। স্কারলেট ওঁর স্ত্রী, তাই অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে ওকে অপমান উনি করতে পারবেন না। আর করেই কী লাভ, কোনও সুরাহা তো হবে না!

অবশ্য সুরাহা করবার জন্য ফ্র্যাঙ্ক যে খুব ব্যগ্র ছিলেন তাও নয়। ব্যাপারস্যাপার দেখে মনে হয়েছিল বিবাহিত জীবনে সুখের অভাব হবে না। স্কারলেট এমনিতে খুবই কমনীয়, প্রাণশক্তিতে ভরপুর, মার্জিত স্বভাবের মেয়ে – দোষের মধ্যে একটাই – বড়ই একগুঁয়ে।  বিবাহের কয়েক দিনের মধ্যেই ফ্র্যাঙ্ক বুঝে গেছিলেন যে ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে না গেলে জীবনটা বেশ হেসে খেলেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে, কিন্তু একবার যদি বাধা দেওয়া হয় –  নিজের মতে চলতে পারলে ও একেবারে শিশুর মত উচ্ছল, প্রাণ খুলে হাসবে, খুনসুটি করতে থাকবে, ওঁর হাঁটুর ওপর বসে দাঁড়ি ধরে টানাটানি করবে, আর ওঁকে দিয়ে বলাবে যে ওঁর বয়স কুড়ি বছর কমে গেছে। ওঁর যত্নআত্তির ব্যাপারে স্কারলেটের ভীষণ খেয়াল।  রাতে বাড়ি ফেরার পর ওঁর ভিজে জুতো আগুনে সেঁকে শুকিয়ে রাখবে। পা ভেজা থাকলে বা ঠাণ্ডা লাগিয়ে ফেললে সস্নেহ ভর্ৎসনা শুনতে হয় ওঁকে। উনি যে মুরগির গুর্দা খেতে ভালবাসেন বা কফিতে তিন চামচ চিনি খান সেসব ওর ঠিক মনে থাকে।  হ্যাঁ, যতক্ষণ ওর তালে তাল দিয়ে চলা হবে, ওর মত মিষ্টি স্বভাবের ঘরোয়া মেয়ে আর হয় না।

* * *

বিয়ের পর দু’সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই ফ্র্যাঙ্ক জ্বরে পড়লেন। ডঃ মীড ওঁকে বিছানা ছেড়ে উঠতে বারণ করে দিলেন। যুদ্ধের প্রথম বছরে ইনফ্লুয়েনজ়ায় আক্রান্ত হয়ে ওঁকে প্রায় দু’মাস হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল। ফলে মনের মধ্যে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবার ভয় ওঁর মনে ছিলই। তাই তিনটে কম্বলের তলায় ঘামতে ঘামতে, বেশ হৃষ্টচিত্তেই ম্যামি আর আন্ট পিটির প্রতি ঘন্টায় নিয়ে আসা গরম আরক পান করে ফেলতেন।

জ্বরটা ফ্র্যাঙ্ককে বেশ কিছুদিন ভোগাল। একটা একটা করে দিন যায়, ফ্র্যাঙ্ক তাঁর স্টোর নিয়ে উদ্বিগ্ন থেকে উদ্বিগ্নতর হয়ে পড়েন। কাউন্টারে বসা কর্মচারিকে স্টোরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে প্রতিদিন সন্ধেবেলা এসে সারাদিনের হিসেবপত্র বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু ফ্র্যাঙ্কের মন খুঁতখুঁত করত। স্কারলেট ওঁর এই অস্থিরতার সুযোগটাই খুঁজছিল। ওঁর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একদিন বলল, “সোনা, তুমি যদি এমন করে ছটফট কর, আমি যে শান্তি পাব না। তার চেয়ে আমি বরং একদিন শহরে গিয়ে সব দেখেশুনে আসি।”

ওঁর মৃদু আপত্তি হেসে উড়িয়ে দিয়ে ও গেল। বিবাহের পর তিন সপ্তাহ ধরে ওঁর হিসেবের খাতা দেখার জন্য আর আর ওঁর অর্থনৈতিক স্থিতি জানবার জন্য স্কারলেট ব্যাকুল হয়ে ছিল। কী ভাগ্যিস ওঁর শরীরটা খারাপ হয়েছিল!

ফাইভ পয়েন্টের কাছেই স্টোরটা।  পুরনো ইটের দেওয়ালটা ধোঁয়ায় কালো হয়ে গেছে, ছাদটা নতুন লাগানো হয়েছে, সেটা ঝকঝক করছে। কাঠের তক্তার শামিয়ানা দিয়ে রাস্তার ধার পর্যন্ত পায়ে চলার পথটা ঢেকে দেওয়া। লম্বা লম্বা লোহার স্তম্ভ দিয়ে ঠ্যাকনা দেওয়া, সেখানে ঘোড়া আর খচ্চর বাঁধা রয়েছে। ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচবার জন্য ওগুলো মাথা নীচু করে রেখেছে,  ছেঁড়াখোঁড়া কম্বল আর লেপ ওদের পিঠের ওপর ফেলা।  স্টোরের ভেতরটা অবিকল জোন্সবোরোর বুলার্ড স্টোরের মত। শুধু আগুনের পাশে বসার ব্যবস্থা আর তামাকের পিক ফেলার জন্য বালি ভরা পিকদানটা নেই। বুলার্ড স্টোরের চেয়ে প্রশস্ত জায়গা, তবে বেশ অন্ধকার। কাঠের শামিয়ানার শীতের দিনের আলো অনেকটাই আটকে দিয়েছে। তাই ভেতরটা বেশ অস্পষ্ট আর ঘোলাটে। পাশের দেওয়ালের ওপরের দিকের একটা ঘুলঘুলি থেকেই যা একটু আলো আসছে। মেঝের ওপর কাঠের গুঁড়ো ভিজে থকথক করছে। চারধারে ধুলোর রাজত্ব। স্টোরের সামনের দিকটা তবু একটু চলনসই গোছের।  কয়েকটা লম্বা লম্বা শেলফ মেঝে থেকে উঠে ওপরের আলোআঁধারিতে মিশে গেছে। সেখানে আনকোরা নতুন কাপড়ের গাঁঠ, চিনেমাটির সরঞ্জাম, রান্না করবার বাসনকোসন ইত্যাদি রাখা। কিন্তু ভেতরের দিকে পার্টিশনের পেছনের জায়গাটা জঞ্জাল হয়ে রয়েছে।  

ওখানকার মেঝে পাকা করা নেই।  মাটির ওপরেই নানা ধরণের সামগ্রী বিশৃঙ্খলভাবে ডাঁই করা আছে। আলোআঁধারিতেই দেখতে পেল বাক্স বাক্স জিনিসপত্র, কোদাল, ঘোড়ার জিন আর লাগাম, পাইন কাঠের সস্তা দামের কফিন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। আগে ব্যবহার হয়েছে এমন সব আসবাবপত্র – সস্তা দামের আঠা থেকে শুরু করে মেহগিনি আর রোজ়উডের সরঞ্জাম আধো-অন্ধকারে উঁকি মারছে, দামী কিন্তু জীর্ণ হয়ে যাওয়া ব্রোকেড বা ঘোড়ার কেশরের তৈরি গৃহসজ্জার সামগ্রী চারপাশের এই বিবর্ণতার মধ্যে বেখাপ্পাভাবে চিকচিক করছে।  চিনেমাটির বাটি, কলসি, আরও নানা জিনিস মাটির ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। চারটে দেওয়াল ঘিরে অনেকগুলো উঁচু উঁচু বাক্স রাখা। সেখানে এত অন্ধকার, স্কারলেটকে সরাসরি ল্যাম্পের আলো ফেলে দেখতে হচ্ছিল। বীজ, পেরেক, নাটবল্টু আর ছুতোরের যন্ত্রপাতিতে ভরা বাক্সগুলো।  

“ফ্র্যাঙ্কের মত এত খুঁতখুঁতে আর বুড়ি ঝি মার্কা চরিত্র – আরও একটু গুছোনো হবেন বলেই ভেবেছিলাম,” রুমাল দিয়ে হাতের ধুলো মুছতে মুছতে স্কারলেট ভাবল। “শুয়োরের খোঁয়াড় বানিয়ে রেখেছেন জায়গাটা।  স্টোর চালানোর জন্যে কী চমৎকার বন্দোবস্ত! এই জিনিসগুলোই যদি ধুলো ঝেড়ে সামনের দিকে রাখতেন, লোকে দেখতে পেত। অনেক তাড়াতাড়ি জিনিসগুলো বিক্রি করতে পারতেন!”  

আর জিনিসপত্রেরই যখন এই দশা বানিয়ে রেখেছেন, তাহলে হিসেবপত্রের দশা কী হতে পারে!

আলোটা হাতে তুলে নিতে নিতে ভাবল, এখন আমাকে হিসেবের খাতাগুলো দেখতে হবে। স্টোরের সামনের দিকে গেল। উইলি বলে যে ছেলেটা কাউন্টারে বসে, খুবই অনিচ্ছার সঙ্গে তাক থেকে ধুলো জমে থাকা মোটা লেজারটা নামিয়ে ওকে  দিল। বয়স অল্প হলে কী হয়, ওর মনেও ফ্র্যাঙ্কের মতই বদ্ধ ধারণা যে ব্যবসাপত্রে মেয়েদের কোনও জায়গাই নেই। স্কারলেট ওকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে খাবার খেতে বাইরে পাঠিয়ে দিল। ছেলেটা চলে যেতেই ও বেশ স্বস্তি বোধ করল।  ওর আপত্তিটা স্কারলেটের কাছে বিরক্তিকর ঠেকছিল।  আগুনের কাছে একটা ভাঙাচোরা চেয়ারে বসে লেজারটা কোলের ওপর মেলে নিল। রাতের খাবার সময় হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা। খদ্দেরদেরও দেখা নেই। স্টোরে স্কারলেট এখন একা।

ধীরে ধীরে পাতা ওল্টাতে লাগল। ফ্র্যাঙ্কের সুন্দর খুদে খুদে অক্ষরে টানা হাতে লেখা নামগুলো আর তাদের পাশে লেখা টাকাগুলো খুঁটিয়ে পড়তে লাগল। ঠিক যা ভেবেছে তাই। ফ্র্যাঙ্কের বিষয়বুদ্ধিহীনতার নতুন দৃষ্টান্ত পেয়ে ভুরু কোঁচ হয়ে গেল। অন্ততপক্ষে পাঁচশ ডলার আদায় না হয়ে পড়ে আছে, কয়েকটা আবার বেশ কয়েকমাসের পুরনোও – যাঁদের নামের পাশে বকেয়াগুলো লেখা, তাঁদের স্কারলেট খুব ভাল করেই চেনে – খুব পরিচিত নামের মধ্যে মেরিওয়েদার আর এলসিংদের নামও রয়েছে।  যেরকম তাচ্ছিল্য করে ফ্র্যাঙ্ক ‘কয়েকজন মানুষের’ বাকিতে কেনার কথা বলেছিলেন, স্কারলেট ভেবেই নিয়েছিল বকেয়াটা সামান্যই হবে। কিন্তু তাই বলে এত টাকা!

“দেওয়ার মুরোদ যদি না থাকে, তাহলে জিনিস কেনার এত শখ কেন?” বিরক্ত মনে স্কারলেট ভাবল। “আর ফ্র্যাঙ্কেরও বলিহারি বাপুর, যখন জেনেই গেছেন ওঁদের টাকা মেটানোর সামর্থ্য নেই, তখন সাধ করে ওঁদের মাল দেওয়া কেন? একটু জোর করলেই, এঁদের অনেকেই টাকা মিটিয়ে দিতে পারতেন। এলসিংরা তো অবশ্যই পারতেন – ফ্যানির জন্য সাটিনের নতুন পোশাক তো কিনতে পেরেছেন আর বিয়ের জন্য এত খরচাপাতি করতেও তো আটকায়নি! ফ্র্যাঙ্কের মনটা খুবই নরম, তাই লোকে ওঁকে ঠকায়। এর অর্ধেক টাকাও যদি উদ্ধার করতে পারতেন, করাতের মিলটা সহজেই কিনে নিতে পারতেন, আমার খাজনার টাকা মিটিয়ে দেওয়ার পরেও অসুবিধে হত না।”

তারপরেই মনে হল, “ধর, ফ্র্যাঙ্ক করাতের মিলটা চালানোর চেষ্টা করতে লাগেন! হে ভগবান! এই স্টোরটাকেই যদি উনি দানখয়রাতির জায়গা বানিয়ে ফেলতে পারেন, তাহলে মিল চালিয়ে অনেক টাকা কামাবার আশা কেমন করে করেন?  শেরিফ তো এক মাসের মধ্যে মিলের দখল নিয়ে নেবেন! আমি ওঁর থেকে ভাল স্টোর চালাতে পারব! আর একটা মিলও আমি ওঁর থেকে ভালই চালিয়ে নিতে পারব, যদিও কাঠ চেরাইয়ের ব্যবসা সম্বন্ধে আমার কিছুই জানা নেই!”

একজন মহিলাও যে একজন পুরুষমানুষের মতই কারবার চালিয়ে নিতে পারবে, হয়ত তার থেকেও ভাল চালাবে – এই ভাবনাটাই খুব চমকপ্রদ, খুবই ব্যতিক্রমী।  যে পরিবেশে স্কারলেট বেড়ে উঠেছে, সেখানে বরাবর শুনে এসেছে যে পুরুষমানুষ হল সবজান্তা, আর মেয়েদের মধ্যে বিন্দুমাত্র প্রতিভা নেই। এটা অবশ্য ঠিক, কথাটা যে পুরোপুরি সত্যি নয় সেটা অনেকদিন আগেই ও বুঝে গেছিল,  তবুও এই সুখের কল্পনাতেই ও এতদিন বিভোর হয়ে ছিল। এই অসাধারণ ভাবনাটাকে মূর্ত রূপ দেবার চেষ্টা করেনি।  ভারি খাতাটা কোলের ওপর খোলা, অবাক হয়ে মুখটা সামান্য খুলে গেছে, মনে মনে ভাবল, টারার কঠিন সময়ে ও তো একটা পুরুষমানুষের বোঝাই সামলেছে – আর বেশ যোগ্যতার সঙ্গেই সামলেছে।  ছোটবেলা থেকে ওকে বোঝানো হয়েছে, মেয়েরা নিজে নিজে কোনো কিছুই করে উঠতে পারে না, অথচ পুরুষের সাহায্য ছাড়াই তো প্ল্যান্টেশনটা সামলে এসেছে, অন্তত যতক্ষণ না উইল এল।  হ্যাঁ, আমার ধারণাটাই ঠিক, দুনিয়ার হেন কাজ নেই যা মেয়েরা পুরুষের সাহায্য ছাড়াই করতে না পারে – ওই বাচ্চা হওয়ার ব্যাপারটা ছাড়া! আর ঈশ্বর জানেন, সুস্থ মস্তিষ্কের কোনও মেয়েই দায়ে না পড়লে বাচ্চা চাইত না!।  

ও যে পুরুষমানুষের থেকে কোনও অংশেই কম নয়, এই ধারণাটা মাথায় আসতেই ওর খুব গর্ব হতে লাগল, খুব ইচ্ছে হতে লাগল এটা ও প্রমাণ করে দেয়, দেখিয়ে দেয় যে ও নিজেও ছেলেদের মতই টাকা রোজগার করতে পারে। যে টাকাটা ওর নিজের হবে, যার জন্য কোনও পুরুষমানুষের কাছেই হিসেব দেবার দায় থাকবে না।

“আমার কাছে যথেষ্ট টাকা থাকলে, মিলটা আমি নিজেই কিনে নিতাম,” বেশ চেঁচিয়েই কথাটা বলে উঠল। তারপরেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমি ওটার থেকে অনেক টাকা করতে পারতাম। আর ওখান থেকে ধারে একটা কাঠের টুকরোও বেরোতে দিতাম না।”

আবার দীর্ঘশ্বাস পড়ল। টাকাটা জোগাড় করার কোনোই সম্ভাবনা নেই, তাই ভাবনাটাকে বাতিল করে দেওয়া ছাড়া কোনও উপায়ই নেই। ফ্র্যাঙ্ককেই একটু উদ্যোগী হয়ে বকেয়া টাকা আদায় করে মিলটা কিনতে হবে।  মিলটা পেলে টাকা কামানোর ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে না। শুধু দরকার একটু পেশাদারী মনোভাবের – ওকেই কিছু উপায় করে ওঁর মধ্যে এই মনোভাবটা জাগিয়ে তুলতে হবে। স্টোরের মত করে চালালে চলবে না।

লেজারের পেছনের দিকের একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে অধমর্ণদের নামের তালিকা বানাতে আরম্ভ করল, যাঁরা অনেক মাস ধরে কোনো টাকা দেননি। বাড়ি পৌঁছেই ফ্র্যাঙ্কের কাছে কথাটা তুলতে হবে। ওঁকে বোঝাতে হবে, পুরনো বন্ধুবান্ধব হলেও টাকাটা ওঁদের মিটিয়ে দেওয়াটাই কর্তব্য। টাকাটা চাইতে ওঁর লজ্জা করলেও, কিছুই করার নেই।  হয়ত ফ্র্যাঙ্ক বিচলিত বোধ করবেন। মানুষটা একটু ভীরু স্বভাবের, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে ভালবাসেন। ভদ্রতাবোধ ওঁর এতই প্রবল যে টাকাটা মারা গেলেও কিছুতেই মুখ ফুটে চাইতে পারবেন না।

হয়ত বলবেন, টাকা না থাকলে ওঁরা দেবেন কী করে। কথাটা মিথ্যে নয়। দারিদ্র্যের ব্যাপারটা অজানা নয় ওর কাছে।  তবে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু গয়নাগাটি বাঁচিয়ে রেখেছেন, জমিজমাও রয়েছে। নগদের বদলে ফ্র্যাঙ্ক সেসবও নিতে পারেন।

কথাটা তোলার পর ফ্র্যাঙ্ক কী ভীষণ কাতর হয়ে পড়বেন, সেটা ও আন্দাজ করতে পারছে। বন্ধুদের কাছ থেকে গয়নাগাটি, জমিজমা নিয়ে নেব!  উনি কাতর হয়ে পড়লেও ওর কিছু করার নেই। ও বলেই দেবে, বন্ধুত্বের খাতিরে উনি গরিব হয়েই থাকতে চান তো থাকতে পারেন, ওর পক্ষে সম্ভব নয়।  একটু কাণ্ডজ্ঞান না থাকলে ফ্র্যাঙ্ক কিছুই করে উঠতে পারবেন না। কিন্তু করতে যে ওঁকে হবেই! ওঁকে দিয়ে অনেক টাকা রোজগার করাতেই হবে, নিজের উদ্যোগে না করতে চাইলে, ওঁর ওপর খবরদারি করতে হবে!

ব্যস্ত হয়ে কিছু লেখালেখি করছিল, ভুরু কোঁচ করে চোখ পাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে লিখছিল। সেই সময় সামনের দরজাটা খুলে গেল, আর এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া স্টোরে ঢুকে পড়ল।  লম্বা মতো একজন মানুষ নোংরা অগোছালো ঘরে ঢুকে নিঃশব্দ পদসঞ্চারে ওর সামনে এসে দাঁড়ালেন। স্কারলেট ঘাড় তুলে দেখল রেট বাটলার।   

ঝাঁ চকচকে নতুন পোশাক, ওভারকোট আর ততোধিক জবরদস্ত একটা স্কন্ধাবরণ চওড়া কাঁধের ওপর ফেলা – রীতিমতো রাজসিক আগমন।  ওঁর  চোখে যখন চোখ পড়ল দেখল উঁচু টুপিসহ আনত হয়ে ওকে ‘বাও’ করছেন আর অন্য হাতটা ধোপদুরস্ত শার্টের ওপর বিনয়ের সঙ্গে রাখা।  বাদামি ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ওঁর চকচকে সাদা দাঁতগুলো বেরিয়ে আর সাহসী চোখে ওকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করছেন।  

“প্রিয় – আমার প্রিয়তম মিসেজ় কেনেডি,” ওর দিকে অগ্রসর  হতে হতে বলে উঠলেন। “আমার প্রিয় – অন্তন্ত প্রিয় মিসেজ় কেনেডি!” তারপর অট্টহাস্য করে আনন্দে ফেটে পড়লেন।

প্রথমে তো ভূত দেখার মত চমকে উঠল স্কারলেট, তারপর তাড়াতাড়ি  টেবিলের তলা থেকে পা’টা নিজের দিকে টেনে নিয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে ওঁর দিকে শীতল দৃষ্টি হেনে তাকাল। 

“এখানে কী করছেন আপনি?”

“মিস পিটিপ্যাটের কাছে গিয়ে তোমার বিয়ের খবর পেলাম, তাই তাড়াতাড়ি তোমাকে অভিনন্দন জানাতে চলে এলাম।”

ওঁর হাতে নাকাল হওয়ার কথা মনে পড়ে যেতেই অপমানে চোখমুখ লাল হয়ে উঠল।

“কোন সাহসে আপনি আমার সামনে এসেছেন!” চেঁচিয়ে উঠল।

“আমার তো উল্টোটাই মনে হচ্ছে। তোমারই আমার সামনে দাঁড়ানোর সাহস হচ্ছে না!”

“আপনি – আপনি হচ্ছেন – এক নম্বরের – ”

“আমরা দুজনে কি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে পারি?” একগাল হেসে বললেন, বেহায়াপনা মেশানো হাসি, নিজের আচরণে বা ওকে অপমান করে লজ্জিত হবার কোনও চিহ্নই নেই। বাধ্য হয়ে স্কারলেটকেও হাসতে হল, শুকনো, অস্বাচ্ছন্দ্যের হাসি।

ওরা আপনাকে ফাঁসিতে ঝোলায়নি – খুবই দুর্ভাগ্যজনক!”

তুমি একা নও, আমার ধারণা, অনেকেই একই কথা ভাবছেন। ছাড় না ওসব কথা, স্কারলেট, একটু সহজ হও। তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, তুমি যেন একটা ছুঁচো গিলে ফেলেছ – তোমাকে মানাচ্ছে না। আমার করা সেই – কী বলব – সেই নির্দোষ রসিকতাটা – এতদিনে নিশ্চয়ই সেটা ভুলতে পেরেছ?”

“রসিকতা? হুঁহ্‌! জীবনে ভুলতে পারব না!”

“ঠিকই পারবে। আসলে তুমি যে এই রকম রাগ দেখানোর ভান করছ, তার কারণ তোমার মনে হচ্ছে এটাই দেখানো উচিত – আর এটাই তোমার পক্ষে সম্মানজনক। বসতে পারি?”

“না!”

পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে শরীর ডুবিয়ে দিয়ে উনি হেসে উঠলেন।

“শুনলাম, আমার জন্যে দু’সপ্তাহ অপেক্ষা করার তরও তোমার সয়নি,” ছদ্ম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন উনি। “কী চঞ্চলমতিই না হয় এই নারীজাতি!”

স্কারলেট কিছু জবাব দিল না দেখে উনি বলতে লাগলেন।

“আচ্ছা, স্কারলেট, আমাকে বল তো, দুজন বন্ধুর মধ্যে কথা হচ্ছে ধরে নাও – খুবই পুরনো আর গভীর বন্ধুত্বের খাতিরে – আমার জেল থেকে বেরনো পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা কি বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হত না? নাকি আমার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে বুড়ো ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া তোমার কাছে বেশি লোভনীয় বলে মনে হল?”

বরাবরের মতই ওঁর তামাশায় বিদ্ধ হয়ে স্কারলেটের মেজাজ চড়তে থাকল। ক্রোধ আর অট্টহাসির মধ্যে চিরন্তন লড়াই।

“হাস্যকর কথা বলবেন না।”

“কয়েকদিন ধরেই একটা কথা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে, সেই ব্যাপারে আমার কৌতুহল চরিতার্থ করতে তোমার আপত্তি আছে? একজন নয় – দু’দুজন মানুষকে তুমি বিয়ে করে  ফেললে – যাদের তুমি কখনোই ভালবাসনি বা বিন্দুমাত্র দুর্বলতা পোষণ করনি – একজন মেয়ে হিসেবে তোমার রুচিবোধে আটকালো না?  নাকি দক্ষিণের নারীজাতির সংবেদনশীলতা নিয়ে এতদিন যে সব কথা শুনে এসেছি – পুরোটাই ভ্রান্ত?”

“রেট!”

“বেশ, আমার জবাব পেয়ে গেলাম। চিরদিনই আমার মনে হয়েছে মেয়েদের মধ্যে এক ধরণের দৃঢ়তা আর সহনশীলতা আছে যা পুরুষমানুষের অজানা, যদিও ছোটবেলা থেকেই আমাকে শেখানো হয়েছে যে মেয়েরা খুব দুর্বল হয়, কোমল হয়, সংবেদনশীল হয়। ইউরোপীয় শিষ্টাচার বিধিতে স্বামী আর স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা থাকাটা আসলে রুচিবোধের অভাব বলেই ধরা হয়।  চরম রুচিবোধের অভাব বলতে পার। এই ব্যাপারে ইউরোপিয়ানদের ধারণাটাই যে সঠিক সেটা সব সময়েই আমার মনে হয়। বিয়েটা সুবিধের খাতিরে করতে হয় আর প্রেমটা আনন্দের জন্য। খুবই বিচক্ষণ ব্যবস্থা, কী বল? পেছনে ফেলে আসা দেশের সংস্কারের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক যে এতটা গভীর, আমার ধারণাই ছিল না।”

মুখের ওপর চেঁচিয়ে উঠে যদি বলে দেওয়া যেত – “সুবিধের খাতিরে আমি মোটেই বিয়ে করিনি!”, বেশ হত। দুঃখের কথা হল, রেট ঠিক জায়গাতেই ধরেছেন ওকে, আর নিজেকে নিষ্পাপ প্রমাণ করার জন্য ক্ষুণ্ণ হবার ভান করলেই উনি আরও চোখা চোখা হুল বেঁধানো মন্তব্য করে অপদস্থ করবেন।   

“কী সব আবোল তাবোল বকে চলেছেন?” প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য খুব শীতল গলায় বলল। তারপর জিগ্যেস করল, “জেল থেকে ছাড়া পেলেন কীভাবে?”

“ও এই কথা!” বেশ একটা হামবড়া ভাব দেখিয়ে জবাব দিলেন। “সে তেমন কোনো ব্যাপারই নয়। আজ সকালে ওরা আমাকে ছেড়ে দিল। খুব কায়দা করে ওয়াশিংটনের এক বন্ধুকে ফাঁসিয়ে দেবার ভয় দেখাতে শুরু করলাম – ফেডারাল সরকারে বেশ হোমরাচোমরা একজন।  মানুষ খুব ভাল – সাচ্চা ইউনিয়ন দেশপ্রেমিক – কনফেডারেসির জন্য বন্দুক আর হুপ-স্কার্ট ওর কাছ থেকেই কিনতাম কিনা। আমার দুরবস্থার কথা ওর কানে আসতেই  তড়ঘড়ি নিজের প্রভাব খাটাতে শুরু করল, তাই আমাকে ওরা ছেড়ে দিল। প্রভাব থাকাটাই আসল ব্যাপার, কথাটা মনে রেখো, স্কারলেট – কে দোষী আর কে নির্দোষ – সেটা তো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়।”

“বাজি রেখে বলতে পারি, আপনি নির্দোষ ছিলেন না।” 

“সত্যিই ছিলাম না। ঝামেলাটা যখন মিটেই গেছে, তখন খোলাখুলিই স্বীকার করতে বাধা নেই যে কেইনেরঅপরাধের তুলনায় আমার অপরাধ কিছু কম নয়। নিগারটাকে আমি সত্যিই খতম করে দিয়েছি। একজন ভদ্রমহিলার সঙ্গে বেয়াদবি করেছিল, এরকম পরিস্থিতিতে দক্ষিণের একজন ভদ্রলোকের আর কী করার থাকতে পারে?  স্বীকার যখন করেই নিচ্ছি, তাহলে এটাও স্বীকার করে নিই যে একজন ইয়াঙ্কি অশ্বারোহী জওয়ানের ওপরেও গুলি চালিয়ে দিয়েছিলাম, পানশালায় কিছু কথা কাটাকাটি হয়েছিল। অবশ্য সেই লঘু অপরাধের দায়টা আমার ঘাড়ে পড়েনি, তার জন্য আর কোনও বেচারা হয়ত ফাঁসির দড়িতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। বেশ কিছুদিন আগের কথা এসব।”

নিজের খুন করার কীর্তিগুলো এমন নির্বিকার চিত্তে বলে যাচ্ছিলেন যে স্কারলেটের রক্ত হিম হয়ে গেল। ধিক্কার জানানোর জন্য কিছু নীতিবাক্য ওর ঠোঁটের গোড়ায় এসেও গেছিল।  আর ঠিক তখনই টারার আঙ্গুরের ঝাড়ের তলায় মাটিতে শুয়ে থাকা ইয়াঙ্কিটার কথা মনে পড়ে গেল। পায়ের তলায় একটা আরশোলা চাপা পড়ে যাওয়ার চেয়ে বেশি বিবেকের দংশন ওই ইয়াঙ্কিকে মেরে ফেলা নিয়ে কোনোদিনই ওর হয়নি। রেটের তুলনায় ওর অপরাধ কোনো অংশে কম নয়, তাই রেটের বিচার করার অধিকার ও কোথা থেকে পাবে?

“আর এত কথাই যখন স্বীকার করে নিলাম, আরও একটা গোপন কথা তোমাকে বলতে চাই – কথাটা খুবই গোপন কিন্তু (মানে কথাটা যেন মিস পিটিপ্যাটের কানে না যায়!) – জানো, টাকাটা সত্যি সত্যি আমার আছে – লিভারপুলের একটা ব্যাঙ্কে – গোপনে, নিরাপদে!”

“কোন টাকা?”

“আরে, যে টাকার খবর টেনে বের করার জন্য ইয়াঙ্কিদের অত কৌতুহল। তুমি যে টাকাটা চেয়েছিলে, সেটা তোমাকে অপমান করব বলেই দিইনি – এই কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়, স্কারলেট। একটা চেক লিখে তোমাকে দিলেই ওরা খোঁজ পেয়ে যেত, তুমি একটা টাকাও পেতে কিনা সন্দেহ। আমার একমাত্র উপায় ছিল মুখে কুলুপ এঁটে থাকা। টাকাটা যে নিরাপদেই আছে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিতই ছিলাম বলতে পার। একবার যদি খোঁজ পেয়ে যেত, টাকাটা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করত। আমিও ছেড়ে দিতাম না। যুদ্ধের সময় যেসব ইয়াঙ্কি দেশপ্রেমিকরা আমাকে বুলেট আর যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছিল, সবার নাম ফাঁস করে দিতাম। ওদের মধ্যে অনেকেই এখন ওয়াশিংটনে উচ্চপদে আসীন – ফলে কেলেঙ্কারির একশেষ হত। বলতে পার আমার বিবেকের দায় উজাড় করে দেবার তর্জনের জন্যেই আমাকে জেল থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। আমি – ”

“অর্থাৎ আপনি বলতে চাইছেন – কনফেডারেটের সোনা আপনার কাছেই রয়েছে?”

“সবটুকু নয়। কী যে বল! পঞ্চাশজন লোক কী তারও বেশি হবে, যারা চোরা কারবার চালাত – অনেকটাই ওরা নাসাউ, ইংল্যান্ড আর কানাডাতে সরিয়ে ফেলেছিল। যেসব কনফেডারেটরা আমাদের মত অত চালাকচতুর ছিলেন না, জানতে পারলে আমাদের বদনাম করে দেবেন। আমার কাছে প্রায় পাঁচ লক্ষ ডলারের মত আছে। রাগের মাথায় দুম করে বিবাহবন্ধনে নিজেকে নতুন করে না জড়ালেই পারতে!”

পাঁচ লক্ষ ডলার। এমন বিশাল পরিমাণ টাকার কথা ভেবে স্কারলেটের শরীর খারাপ করতে লাগল। পৃথিবীর এই কঠিন দৈন্যদশার মধ্যেও এত টাকা আছে, ভাবতেও কষ্ট হয়। এত টাকা, এত বিশাল পরিমাণ টাকা, একজনের কাছে সেটা আছে, এমন একজনের কাছে যিনি ব্যাপারটাকে অত্যন্ত হালকা মেজাজে নিচ্ছেন, আর তাঁর প্রয়োজনও নেই এই পরিমাণ টাকার। আর অন্যদিকে ওর কাছে কী আছে? না একজন বয়স্ক, অসুস্থ স্বামী, এই নোংরা, অকিঞ্চিৎকর একটা স্টোর আর নির্মম একটা দুনিয়া। খুবই অন্যায় যে রেটের মত দুশ্চরিত্র লোক এত টাকার মালিক আর ও – যার কাঁধের ওপর এমন বিশাল বোঝা – সে আজ নিঃস্ব – কী অন্যায়! খুবই ঘৃণা করে সামনে বসে থাকা ওই মানুষটাকে, বাবুয়ানি করা পোশাকে উনি যেন ওকে ব্যঙ্গ করতে এসেছেন! ঠিক আছে, চাতুর্য্যের তারিফ করে ওঁকে তোল্লাই দেবে না কিছুতেই।  ওঁকে আঘাত করার জন্য মনে মনে চোখা চোখা শব্দবাণ হাতড়াতে লাগল।  

“তার মানে কনফেডারেটের টাকাটা নিজের কাছে রেখে দেওয়ার মধ্যে আপনি অন্যায় কিছু দেখছেন না? কিন্তু সহজ ভাষায় এটাকে চুরি ছাড়া আর কী বলা যায়? আর আপনি সেটা জানেন। আমি হলে মনের থেকে সায় পেতাম না।”

“হায়, হায়! আঙ্গুর ফল খুব টক, তাই না?” ভ্রূকুটি করে অবাক হওয়ার ভান করলেন। “তা চুরিটা কার কাছে থেকে করেছি, একটু শুনি?”

স্কারলেট চুপ করে গেল। ভাবতে বসল সত্যিই কার কাছ থেকে চুরিটা করা হয়েছে। বলতে গেলে উনি যা করেছেন, ফ্র্যাঙ্কও সেটাই করেছেন, তবে সেটা ছোট মাপের চুরি।

“এই টাকার অর্ধেক সৎ উপায়ে উপার্জন করেছি আমি,” উনি বলতে লাগলেন, “ইউনিয়ন দেশপ্রেমিকদের সহযোগিতায় – যারা ইউনিয়নকেই পেছন থেকে ছুরি মারবার বাসনায় আমাকে শতকরা একশ ভাগ মুনাফায় ওদের জিনিস বিক্রি করতে চেয়েছে – এটা আমার সেই সৎ উপায়ে উপার্জন করা টাকা। লড়াই আরম্ভ হওয়ার সময় আমি অল্প কিছু টাকা তুলোয় লগ্নী করেছিলাম – ব্রিটিশ মিলগুলো যখন তুলোর জন্য হাহাকার করছিল, আমি চড়া দামে ওদের সেই তুলো বিক্রি করেছি। কিছু টাকা এসেছে  খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ফাটকা খেলে। নিজের ঝুঁকির মুনাফা ইয়াঙ্কিদের কেন ওঠাতে দেব?  হ্যাঁ, বাদবাকিটা অবশ্যই কনফেডারেসির টাকা। অবরোধের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে কনফেডারেটের তুলো নিয়ে আমি লিভারপুলের বাজারে বিক্রি করেছি – আকাশছোঁয়া দামে। তুলোটা আমাকে বিশ্বাস করেই দেওয়া হয়েছিল, যাতে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে চামড়া, রাইফেল আর যন্ত্রপাতি কিনে ফিরি। আমিও বিশ্বস্তভাবে সেটাই করব বলে ঠিক করেছিলাম। আমার ওপর হুকুম ছিল যে টাকাটা সোনায় বদলে আমি ইংল্যান্ডের ব্যাঙ্কে নিজের নামে রাখার, যাতে ঋণযোগ্যতার অভাবে আমাকে অসুবিধেয় পড়তে না হয়। তোমার মনে থাকতে পারে, সেই সময় অবরোধ নিয়ে খুব কড়াকড়ি হল। আমার পণ্যতরী না কোনো কনফেডারেট বন্দরে লাগাতে পারলাম, না বের করে আনতে। ফলে টাকাটা ইংল্যান্ডের ব্যাঙ্কেই থেকে গেল।  আমি কী করতে পারতাম বলে মনে কর? বোকার মত সমস্ত সোনা ইংল্যান্ডের ব্যাঙ্ক থেকে তুলে নিয়ে উইলমিংডনে এসে হাজির হতাম? যাতে ইয়াঙ্কিরা সোনাগুলো হাতিয়ে নিতে পারে? অবরোধের কড়াকড়ি হওয়া – সেটা আমার দোষ?  আমাদের আদর্শের পতন ঘটা – সেটাও কি আমার দোষে? টাকাটার মালিক হল কনফেডারেসি, ভাল কথা, কিন্তু কনফেডারেসি তো আর নেই – অবশ্য সেটা বুঝে ওঠা তোমার কর্ম নয়।  তুমি শুধু কিছু রটনায় বিশ্বাস করবে। টাকাটা দেব কাকে? ইয়াঙ্কি সরকারকে? আমাকে লোকে চোর বলে ভাবুক – সেটা মোটেই আমার কাম্য নয়।”

পকেট থেকে চামড়ার একটা ব্যাগ বের করে, তার থেকে লম্বা একটা চুরুট বের করলেন। বেশ তারিফের ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ সেটার গন্ধ শুঁকলেন। আড়চোখে ছদ্ম দুশ্চিন্তা নিয়ে স্কারলেটকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন যেন ওর মতামতের ওপরেই ওঁর ভাগ্য নির্ধারণ হবে।   

প্লেগ হয়ে মরুন উনি, স্কারলেট ভাবল, সর্বদা উনি আমার চেয়ে এক পা এগিয়ে থাকেন। ওঁর যুক্তিগুলোতে কোথাও না কোথাও একটা ফাঁক থাকে, কিন্তু আমি কোনোভাবেই সেগুলো ধরতে পারি না।

“টাকাগুলো আপনি,” বেশ রাশভারি কণ্ঠে স্কারলেট বলল, “অভাবী মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারেন। কনফেডারেসি আর নেই, কিন্তু এমন অনেক কনফেডারেট তো আছেনই, যাঁদের পরিবারকে অনাহারে দিন গুজরান করতে হচ্ছে।”

মাথাটা পেছনে ছুঁড়ে, রুক্ষস্বরে হেসে উঠলেন।

“এই ধরণের ভণ্ডামী করার সময় তোমার আকর্ষণ অনেক বেড়ে যায়, অনেক বেশি অচেনা লাগে লাগে, আর কখনোই সেরকম লাগে না,” ওর কথা শুনে যে খুব আমোদ পেয়েছেন সেটা লুকোবার চেষ্টা না করেই বলে উঠলেন। “সদা সত্য বলবে, স্কারলেট। মিথ্যে কথা বলা তোমার আসে না। জানো তো আইরিশরা দুনিয়ার সব চাইতে আনাড়ি মিথ্যেবাদী? একটু মন খুলে কথা বল দেখি। প্রয়াত ভাগ্যহীন কনফেডারেসি নিয়ে সেরকম কোনো আবেগ তোমার কোনোদিনই ছিল না আর অনাহারে মৃতপ্রায় কনফেডারেটদের নিয়েও তোমার তেমন মাথাব্যথা নেই। সব টাকা যদি ওদের মধ্যে বিলিয়ে দিই, তাহলে তুমিই সরবে প্রতিবাদ করবে, যদি না সেই টাকার সিংহভাগ আমি তোমার নামে না লিখে শুরু করি।”

“চাই না আপনার টাকা,” স্কারলেট বলতে আরম্ভ করল। নিজেকে মহৎ প্রতিপন্ন করার চেষ্টায় গলায় যতটা সম্ভব বরফ ঢেলে।

“ও, চাও না! তাই নাকি? অথচ এর মধ্যেই আগেভাগেই সুযোগটা আঁকড়ে ধরার জন্য তোমার হাতের তালু চুলকোতে শুরু করেছে! একটা সিকিও যদি তোমার সামনে দোলাই, তুমি লাফ মেরে সেটা ছিনিয়ে নেবে।”

“দেখুন, আপনি যদি আমাকে অপমান করতে আর আমার দারিদ্র্য নিয়ে হাসাহাসি করার উদ্দেশ্যেই এসে থাকেন, তাহলে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি এখন আসুন,” স্কারলেট ঝাঁঝিয়ে বলল। কোলের ওপর থেকে ভারি লেজারটা সরিয়ে রাখল, উঠে দাঁড়িয়ে কথাটা বলে কথার ঝাঁঝটা আরও জোরদার করার চেষ্টা করল। উনি সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে ঝুঁকে ওকে ঠেলে আবার চেয়ারে বসিয়ে দিলেন।   

“সত্যি কথা শুনলেই তোমার এই যে মাথা গরম হয়ে যায় – এরকম আর কতদিন চলবে? আর পাঁচজনের ব্যাপারে সত্যি বলতে তো তোমার বাধে না, তাহলে তোমার ব্যাপারে কেউ সত্যি কথা বললে রেগে যাও কেন?  আমি তোমাকে মোটেই অপমান করছি না। অর্জনপ্রয়াসী হওয়াটা তো মহৎ গুণের মধ্যেই পড়ে।”

অর্জনপ্রয়াসী হওয়া ব্যাপারটা ঠিক কী, সেটা ওর জানা নেই, কিন্তু সেটাকে একটা গুণ বলায় রাগ কিছুটা কমল।

“এখানে দারিদ্র্য নিয়ে তোমাকে তাচ্ছিল্য করার জন্যে আসিনি, এসেছিলাম তোমাকের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের শুভ কামনা জানানোর জন্য। আচ্ছা, একটা কথা বলতো, তোমার এই চৌর্যবৃত্তি বোন স্যু কীভাবে নিল?”

“আমার কী?”

“এই যে তুমি ওর নাকের ডগা থেকে ফ্র্যাঙ্ককে চুরি করে নিলে।”

“আমি মোটেও – ”

“ঠিক আছে বাবা, আমরা আর ওই কথাটা নিয়ে মারামারি করব না। তা কী বলল ও?”

“কী আর বলবে?” স্কারলেট বলল। মিথ্যেটা ধরতে পেরে ওঁর দু’চোখ নেচে উঠল।

“আহা, নিঃস্বার্থপরতার পরাকাষ্ঠা! সে কথা যায়, এবার তোমার গরিবির কিস্‌সা শোনাও দেখি। জানার অধিকার যে আমার আছে, সেটা আশা করি তুমি অস্বীকার করবে না – বিশেষ করে জেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পরে – বেশিদিন আগের কথা তো নয়। ব্যাপারটা কী – যতটা আশা করেছিলে, ফ্র্যাঙ্কের তত টাকা নেই?”

বেয়াদবি করার সময় ওঁর মাত্রাজ্ঞান থাকে না। হয় সেটা মেনে নিতে হবে, আর নয়ত ওঁকে চলে যেতে বলতে হবে। কিন্তু এখন ওঁকে চলে যেতে বলার ইচ্ছে ওর নেই। ওঁর কথাগুলো হুলের মত বিঁধলেও, অস্বীকার তো আর করা যায় না। ও কী করেছে সেটা উনি জানেন, কেন করেছে সেটাও জানেন, তবু সেই জন্য ওকে  হীন চোখে দেখছেন বলে তো মনে হচ্ছে না। ওঁর প্রশ্নগুলো কাঠখোট্টা আর অপ্রীতিকর হলেও, একটা বন্ধুভাবাপন্ন আগ্রহ থেকেই করছেন।  উনিই একমাত্র মানুষ যাঁকে সত্যি কথাটা খুলে বলা যেতে পারে। বহুদিন হয়ে গেল, সত্যি কথাটা, ওর আসল উদ্দেশ্যটা কারোর কাছে খুলে বলতে পারেনি, ওঁকে বলতে পারলে একটু স্বস্তি পেতে পারে। কারোকে মনের কথা খুলে বলতে গেলেই সে অবধারিতভাবে বিস্মিত হয়েছে। রেটের সঙ্গে কথা বলার সঙ্গে কেবল একটা জিনিসেরই তুলনা চলে। একজোড়া আঁটসাঁট জুতো পরে অনেকক্ষণ নাচানাচি করার শেষে সেটা খুলে ফেলে আটপৌরে চপ্পলে পা গলালে যেমন হালকা লাগে, ঠিক সেই রকম।

“খাজনার টাকাটা কি জোগাড় করতে পারনি? নেকড়েরা এখনও টারার দুয়ার আগলে বসে আছে, এই কথা নিশ্চয়ই বলতে চাও না?” ওঁর গলার স্বরটা অন্যরকম এখন।  

মাথা তুলে ওঁর কালো চোখে চোখ রাখতেই ও মুহূর্তের জন্য বিস্মিত আর বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল।  অদ্ভুত এক ভাব ওঁর দু’চোখে। তারপরেই মিষ্টি করে হেসে ফেলল। অনেকদিন এভাবে ও হাসতে পারেনি। কী দুর্বৃত্ত মানুষ রে বাবা, আবার কখনো কখনো সহানুভূতিও দেখাতে পারেন! এখন বুঝতে পারছে ওঁর আসার আসল কারণটা ওকে জ্বালাতন করার জন্য মোটেই নয়, বরং যে টাকাটার জন্য ও হন্যে হয়ে ওঁর কাছে ছুটে গেছিল, সেটা ও পেয়েছে কিনা, সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে। বুঝতে পারছে, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরই কালবিলম্ব না করে ছুটে এসেছেন যাতে প্রয়োজন থাকলে টাকাটা ওকে ধার দিতে পারেন, অথচ ভাবটা এমন দেখাচ্ছেন যেন তাড়াহুড়োর কোনও ব্যাপারই নেই। তা সত্ত্বেও উনি ওকে জ্বালাতন করবেন, অপমান করবেন আর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলবেন, সেটা ওঁর উদ্দেশ্যই ছিল না। তাহলে কি উনি ওর ব্যাপারে সত্যিই ভাবেন অথচ কিছুতেই স্বীকার করতে চান না? নাকি ওঁর আর কোনও মতলব আছে?  সেটাই হবে, কিন্তু বলা যায় না, স্কারলেট ভাবল। মাঝে মাঝে এমন অদ্ভুত ব্যাপারস্যাপার করে বসেন না!

“নাহ্‌,” বলল ও, “না, নেকড়েরা আপাতত বিদায় নিয়েছে। আমি – আমি টাকাটা জোগাড় করতে পেরেছি।”

“কুস্তি-টুস্তি অনেক করতে হয়েছে সেই জন্য, কী বল? বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে পর্যন্ত নিজেকে সামলে রাখতে পেরেছিলে তো?”

স্কারলেট না হাসার চেষ্টা করল। ওর নিজের আচরণের কী নিখুঁত সারসংক্ষেপ! কিন্তু গালের টোল পড়াটা আটকাতে পারল না। উনি আবার বসে পড়লেন। লম্বা লম্বা ঠ্যাং দুটো আয়েস করে সামনে ছড়িয়ে দিলেন।

“বেশ কথা। এবার তোমার গরিবি নিয়ে কিছু বল।  ফ্র্যাঙ্ক নামের ওই দুর্বৃত্তটা কি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে রঙ চড়িয়ে কথা বলে তোমাকে বিপথে চালিত করেছে? একজন মহিলার অসহায়তার সুযোগ নেওয়ার জন্য লোকটাকে ভাল করে উত্তমমধ্যম দেওয়া উচিত। নাও, স্কারলেট, সব কিছু খুলে বল আমায়।  তোমার কোনো কথাই আমার কাছে গোপন নেই। এমনকি তোমার গোপনতম সত্যিটাই তো আমার জানা!”

“সত্যি রেট, আপনি খুব খারাপ একজন – জানি না সেটা কী! না, উনি আমাকে ঠিক বোকা বানাননি বটে, তবে – ” হঠাৎ মনে হল মনের বোঝা নামিয়ে ফেলতে পারলে হালকা লাগবে। “রেট, আসলে ফ্র্যাঙ্ক যদি বাজারে বাকি পড়ে থাকা টাকাগুলো উদ্ধার করার জন্য একটু সচেষ্ট হতেন, তাহলে আমার চিন্তা করার কোনো কারণই থাকত না। জানেন রেট, পঞ্চাশজন মানুষের কাছ থেকে উনি টাকা পান, কিন্তু উনি জোরাজুরি করতে রাজি নন। বড়ই লাজুক মানুষটা। উনি বলেন একজন ভদ্রলোক আরেকজন ভদ্রলোকের সঙ্গে এটা করতে পারেন না। টাকা ফেরত পেতে কত মাস যে লেগে যাবে কে জানে, আদৌ পাওয়া যাবে কিনা তাও জানি না।”

“এটা আর এমনকি বড় ব্যাপার? টাকাগুলো উদ্ধার না হলে কি তোমাদের খাওয়া জুটবে না?”

“তা ঠিক – কিন্তু কী জানেন, কিছু টাকা এখন হাতে থাকলে কাজে লাগানো যেত।” মিলটার কথা ভাবতে ভাবতে ওর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কে জানে, হয়ত –

“কিসের জন্য? আরও খাজনা দেবার আছে?”

“সেটা কি আপনি জিগ্যেস করতে পারেন?”

“পারি বৈকি, কারণ এই মুহূর্তে তুমি আমার কাছ থেকে ধার নেবার মতলব আঁটছ! আরে আমি এই সব ফন্দি-ফিকিরগুলো ভাল মতই জানি। তা তোমাকে ধার দিতে আমার আপত্তি নেই – আর হে আমার প্রিয় মিসেজ় কেনেডি, অল্প কিছুদিন আগে আপনি যে অত্যন্ত লোভনীয় জমানত আমাকে দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছিলেন, সেটা ছাড়াই দিতে রাজি আছি। অবশ্য আপনি যদি জোরাজূরি করেন, তাহলে আমি নাচার!”

“আপনার চাইতে অসভ্য – ”

“একেবারেই না। আমি তো তোমার মনের ভার হালকা করার চেষ্টা করেছি মাত্র। ওই ব্যাপারটা নিয়ে তোমার যে একটা সঙ্কোচ রয়ে গেছে, সেটা বুঝেই বলেছি।  সঙ্কোচটা তেমন কিছু নয় অবশ্য। আর তোমাকে ঋণ দিতে আমি রাজি আছি। কিন্তু তুমি সেটা কীভাবে খরচ করবে সেটাও আমি জানতে চাইব। জানার হক আমার যে আছে সেটা নিশ্চয়ই অস্বীকার করবে না। সুন্দর সুন্দর ফ্রক বা জুড়িগাড়ির পেছনে ওড়াতে চাও, আমার হার্দিক শুভকামনা রইল। কিন্তু যদি ভেবে থাক সেই টাকা দিয়ে অ্যাশলে উইল্কসের জন্য নতুন একজোড়া চুড়িদার কিনবে, তাহলে কিন্তু টাকা ধার দিতে আমাকে অস্বীকার করতেই হবে।”

কথাটা শুনে ওর গায়ে জ্বালা ধরে গেল, প্রচণ্ড রাগে অনেকক্ষণ ধরে মুখ থেকে কোনো কথাই সরল না।   

“অ্যাশলে উইল্কস আমার কাছ থেকে একটা পয়সাও নেয়নি কখনো! উপোস করে মরতে বসলেও, ওকে আমার কাছ থেকে একটা পয়সাও নেওয়াতে রাজি করাতে পারতাম না!  আপনি ওকে জানেনই না, কত গভীর ওর আত্মসম্মানবোধ, কত অহংকারী – আপনি বুঝতেও পারবেন না! অবশ্য আপনি যে ধরণের মানুষ, কী করেই বা বুঝবেন – ”

“একে অপরকে গালি দেবার ব্যাপারটা মুলতবী রাখলেই ভাল হয় না কী? আমি তোমাকে বেশ কিছু গালি দিতে পারি, সেই একই গালি আমার সম্বন্ধেও তোমার মনে এসে যাবে। একটা কথা তুমি ভুলে যাচ্ছ যে মিস পিটিপ্যাটের কাছ থেকে তোমার কোনো কার্যকলাপই জানতে আমার বাকি নেই, মনযোগী একজন শ্রোতা পেলেই হল, সরলা ভদ্রমহিলা মনের কথা উজাড় করে বলে দেন। আমি জানি যে রক আইল্যান্ড থেকে ফিরে আসার পর থেকেই অ্যাশলে টারাতে আছে। এটাও জানি যে ওর বউকেও ওখানে থাকতে দিতে হয়েছে, যদিও সেটা তোমার পক্ষে একটু চাপের হয়ে গেছে।”

“অ্যাশলে – ”

“আরে হ্যাঁ, জানি, জানি,” খুব অবহেলার সঙ্গে হাত নেড়ে ওকে থামালেন। “আমার মত পাপীতাপী মানুষের পক্ষে অ্যাশলের পবিত্র ভাবমূর্তি উপলব্ধি করা নিতান্তই পণ্ডশ্রম। তবে একথা ভুলে যেও না, টুয়েল্ভ ওকসে ওর সঙ্গে তোমার আবেগপ্রবণ দৃশ্যের আমি একজন কৌতুহলী দর্শক ছিলাম, আর কিছু কিছু ব্যাপার থেকে আমার ধারণা হয়েছে, ও এখনও খুব বেশি বদলে যায়নি। তুমিও বদলাওনি। যদি আমার ঠিক মত মনে থাকে, সেদিন ওর আচরণকে খুব কিছু পবিত্র বলে মনে করার কারণ ছিল না। এবং এখনও ওর আচরণকে ঠিক সেইভাবে পবিত্র বলা যাবে না। সপরিবারে ওখান থেকে বেরনোর চেষ্টা করছে না কেন? একটা কিছু কাজ জুটিয়ে নেবার চেষ্টা? টারাতে পড়ে না থাকার চেষ্টা? আমার খেয়াল বলেই ধরে নিতে পার এটা, কিন্তু ওর ভরণপোষণের জন্য আমি এক পয়সাও ঋণ দেব না। জানো বোধহয়, মহিলাদের আঁচল ধরা এই সব পুরুষমানুষদের অপ্রিয় একটা নামে ডাকা হয়?”  

“কোন সাহসে বলেন এসব কথা? আপনি জানেন কি, ও একটা খেতমজুর হয়ে কাজ করছে?” এত রাগ সত্ত্বেও, অ্যাশলে কাঠ ফালা করছে এই দৃশ্যটা মনে পড়তেই ওর বুক ব্যথায় কেঁদে উঠল।  

“আহা, সোনায় বাঁধিয়ে রাখার মত হাত! মাটি আর সারে মাখামাখি হয়ে সেই হাতের কী চেহারাই যে হয়েছে – ”

“ও – ”

“আরে বলার প্রয়োজন নেই, বুঝে ফেলেছি। ধরে নেওয়া যেতেই পারে, ওর পক্ষে যতটা ভাল করা সম্ভব, সেটা ও করছে। কিন্তু খুব বেশি সাহায্য কি হচ্ছে? শত চেষ্টা করেও একজন উইল্কসকে তুমি খেতমজুর বানিয়ে ফেলতে পারবে না – কিংবা আর কিছুই – যা কিছু কাজে লাগে। বিশুদ্ধভাবে শোভাবর্ধনকারী এক কূল। যাই হোক, মহান অ্যাশলের গুণকীর্তন আর আমার চাষাড়ে কথাবার্তা শুনে রোঁয়াগুলো যেরকম ফুলে উঠেছে, সেগুলো একটু নামাও।  তোমার মত কঠিন হৃদয় মহিলার মধ্যেও কী করে এরকম বিভ্রম এঁটে বসে থাকে, সেটা বুঝে ওঠা খুবই মুশকিল।  তা ঠিক কত টাকা তোমার দরকার, আর কেন দরকার?”

স্কারলেট জবাব দিল না দেখে উনি আবার জিগ্যেস করলেন –

“কিসের জন্য চাইছ তুমি টাকাটা? ভেবে দেখ, সত্যি কথাটা যদি আমাকে বলতে পার। মিথ্যে বললেও চলবে। বরং সেটাই বেশি ভাল হবে, কারণ আমি সত্যি কথাটা ঠিক খুঁজে বের করে ফেলব, আর ভেবে দেখ কী লজ্জাজনক হবে তখন ব্যাপারটা!  একটা কথা সব সময় মনে রেখো স্কারলেট। তুমি আমাকে অপছন্দ কর, মেজাজ দেখাও, ছল কপটতা কর আমার সঙ্গে – আমি সব মেনে নিতে রাজি আছি, কিন্তু মিথ্যে বোলো না, তোমার মুখে মিথ্যে শুনলে সেটা আমার বরদাস্ত হবে না। এবার বল টাকাটা কেন চাও?”

অ্যাশলেকে আক্রমণ করায় ও এত রেগে গেছিল যে ইচ্ছে করছিল ওঁর বিদ্রূপভরা মুখের ওপর থুতু ছিটিয়ে দেমাক দেখিয়ে বলে দেয় যে ওই টাকা নিতে ওর বয়েই গেছে। কথাটা প্রায় বলেই ফেলেছিল, কিন্তু টনটনে বাস্তববোধ ওকে আটকালো। কোনোমতে রাগটা গিলে ফেলে মুখেচোখে রাশভারি একটা হাবভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। উনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে দুই পা আগুনের দিকে ছড়িয়ে দিলেন।  

“সব চাইতে মজা কখন পাই জানো,” ফুট কাটলেন উনি, “যখন দেখি তোমার নীতিবোধ তোমার বাস্তববোধের সঙ্গে প্রবল মানসিক লড়াই চলেছে। হ্যাঁ, আমি জানি যে এই লড়াইতে শেষ পর্যন্ত তুমি তোমার বাস্তববোধকেই জিতিয়ে দেবে, তবে কোনো এক বিরল মুহূর্তে তোমার নীতিবোধকে জিততে দাও কিনা সেটা দেখার জন্যই দিন গুনছি।  আর সেটা দেখার পরেই আমি তল্পিতল্পা বেঁধে চিরদিনের জন্য অ্যাটলান্টা ছেড়ে চলে যাব। বেশিরভাগ মেয়ের ক্ষেত্রেই নীতিবোধটাই সব সময়ে জিতে যায় … যাই হোক কাজের কথায় ফিরি। কত টাকা চাও, কেন চাও?”

“ঠিক কত টাকা লাগবে, বুঝতে পারছি না,” গোমড়া মুখ করে বলল ও। “আসলে একটা করাতের কল কেনার ইচ্ছে – মনে হচ্ছে সস্তায় পেয়ে যাব। এছাড়া আমার দরকার দুটো ওয়াগন আর দুটো খচ্চর। খচ্চরগুলো এক নম্বরের হতে হবে। আর একটা ঘোড়া আর বগিগাড়ি – আমার নিজের ব্যবহারের জন্যে।”

“করাতের কল?”

“হুঁ, আর টাকাটা যদি ধার দেন – কলের অর্ধেক ভাগ আপনার।”

“করাতের কল নিয়ে আমি কী করব?”

“টাকা করবেন! এর থেকে বস্তা বস্তা টাকা করতে পারি আমরা। প্রস্তাবটা পছন্দ না হলে, ঋণের ওপর সুদ দিতে পারি  - আচ্ছা দেখা যাক, শতকরা কতটা সুদকে ঠিক বলা যেতে পারে?”

“শতকরা পঞ্চাশ পেলেই চলবে বলে মনে হয়।”

“পঞ্চাশ – ওহো – আপনি নির্ঘাত মস্করা করছেন! হাসা বন্ধ করুন না – ডাকাত নাকি আপনি? আমি ঠাট্টা করছি না, সত্যি সত্যি জানতে চাইছি।”

“আরে সেই জন্যেই তো হাসছি। ওই সুন্দর মুখটার পেছনে লুকিয়ে থাকা তোমার মাথার ভেতরে কী সব জটিল হিসেবনিকেশ চলছে, সেটা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে কিনা সেটা জানার বড় কৌতুহল হয়।”

“ভাল কথা, তা কী এসে যায়? এখন আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন রেট, তারপর আমাকে বলুন এটা আপনার কাছে লাভজনক ব্যবসা বলে মনে হয় কিনা। এই লোকটার কথা ফ্র্যাঙ্ক আমাকে বলেছেন, একটা করাতের কল আছে ওর, পীচট্রী রোড থেকে খানিকটা দূরে, বিক্রি করে দিতে চায় সেটা। তাড়াতাড়ি কিছু নগদ টাকার দরকার ওর, তাই সস্তায় দিতে রাজি।  কাছাকাছির মধ্যে খুব বেশি করাতের কল নেই, কিন্তু যে হারে নতুন করে বাড়ি বানানোর হিড়িক পড়েছে, মনে হচ্ছে চেরাই কাঠের দাম আকাশ ছোঁবে। লোকটা থেকে যাবে, আর মজুরির বিনিময়ে মিলটা চালাবে। ফ্র্যাঙ্কই এসব কথা বলেছেন আমায়। হাতে টাকা থাকলে উনি নিজেই কিনে নিতেন। মনে হয় আমাকে খাজনা মেটাতে যে টাকাটা দিয়েছেন, সেটা উনি এই মিলটা কেনার জন্যেই জমিয়েছিলেন।

“বেচারা ফ্র্যাঙ্ক! ওঁর নাকের ডগা থেকে মিলটা তুমিই কিনে নিয়েছ – কথাটা যখন বলবে – কী ভাববেন উনি? আর এটাই বা কীভাবে বোঝাবে যে টাকাটা আমার কাছ থেকেই পেয়েছ, সুনাম বিসর্জন না দিয়েই?”  

কথাটা স্কারলেট ভেবেই দেখেনি, মিল থেকে কত টাকা আমদানি হতে পারে, সেই স্বপ্নেই বিভোর হয়ে ছিল।

“কথাটা ওঁকে বলবই না।”

“টাকাটা যে রাস্তায় কুড়িয়ে পাওনি সেটা উনি ঠিকই আন্দাজ করে ফেলবেন।”

“আমি ওঁকে বলব – হ্যাঁ, ওঁকে বলব যে আমার হিরের দুলজোড়া আপনার কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। ওগুলো আপনাকে দিয়েই দেব। ওটাই হবে আমার জমা – কী যেন বেশ কথাটা বলেছিলেন।”

“তোমার ওই দুলজোড়া আমি নেব না।”

“ওগুলো আমার চাই না। পছন্দও করি না ওগুলো। সত্যি বলতে কী, ওগুলো আমার নয়ও।”

“তাহলে কার?”

চকিতে মনটা টারার সেই কাঠফাটা গরমের দুপুরে ফিরে গেল, স্তব্ধ হয়ে আছে চারপাশ, নীল ইউনিফর্ম পরা লোকটা হলের মেঝেতে আঁকাবাঁকা হয়ে লুটিয়ে পড়ে।

“আমার কাছে রাখা ছিল ওটা – যার জিনিস সে আর বেঁচে নেই। হ্যাঁ এখন ওগুলো আমারই। নিয়ে নিন। ওগুলো আমি চাই না। তার বদলে আমার কিছু টাকা চাই।”

“হায় কপাল!” অধৈর্যস্বরে উনি বলে উঠলেন। “টাকা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে তুমি কি চিন্তাই করতে পার না?”

“না, পারি না,” সত্যি কথাটাই বলে ফেলল। সবুজ চোখদুটো ওঁর চোখে রেখে। “আর যদি জানতেন আমাকে কী দুর্যোগের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, আপনিও পারতেন না। আমি বুঝে ফেলেছি যে একমাত্র  টাকাই হচ্ছে দুনিয়ার সব চাইতে জরুরি জিনিস। আর ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে বলছি, ভবিষ্যতে নতুন করে আবার নিঃস্ব হয়ে পড়ার ইচ্ছে আমার একেবারেই নেই।”

চড়া রোদ, পরিশ্রান্ত মাথার তলায় নরম লাল মাটি, টুয়েল্ভ ওকসের ধ্বংসাবশেষের পেছনের ক্যাবিন থেকে নিগার নিগার গন্ধ, এক এক করে  সব কথা ওর মনে পড়তে লাগল।  মনে পড়ল হতাশা মাখা হৃদয়ের আকুতি – “আমি আর কোনোদিনও ক্ষুধার্ত থাকব না। আমি আর কোনোদিনও ক্ষুধার্ত থাকব না।”

“একদিন না একদিন আমার টাকা হবে – অনেক অনেক টাকা। যা খাবার ইচ্ছে হবে আমি কিনতে পারব। সেদিন আমার খাবার টেবিলে শুকনো মটরশুঁটি আর ভুট্টাসেদ্ধ থাকবে না। আমার অনেক সুন্দর সুন্দর পোশাক থাকবে আর সবকটা পোশাকই হবে সিল্কের – ”

“সবকটা পোশাকই?”

“হ্যাঁ, সবকটা পোশাকই,” ওঁর ইঙ্গিতটা নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জা না পেয়েই, বলে দিল। “এত টাকা আমাকে করতে হবে যাতে টারাকে ছিনিয়ে নেবার চক্রান্ত ইয়াঙ্কিরা কোনোদিনই করতে পারবে না। নতুন করে টারার ছাদটা পাতব, গোলাঘরটা নতুন করে বানাব,  জমিতে লাঙ্গল টানার জন্য ভালো ভালো খচ্চর কিনব, তুলোর উৎপাদন এত বাড়িয়ে দেব যা কেউ কখনো কল্পনাই করেনি। ওয়েডকে বুঝতেই দেব না প্রয়োজনের জিনিসপত্রগুলো না পেলে কেমন লাগে। কোনোমতেই দেব না! যা পেতে ওর ইচ্ছে হবে সেটা ওর হাতের মুঠোয় থাকবে। আর আমার পরিবারের মানুষজন – ওঁরাও আর কখনও উপোস করে থাকবেন না। এই আমার অঙ্গীকার। এর প্রতিটা কথাই। আপনি বুঝতে পারবেন না, কারণ আপনি একজন আপাদমস্তক স্বার্থপর মানুষ। কার্পেটব্যাগারদের তাড়া আপনাকে খেতে হয়নি। গরম জামার অভাবে আপনাকে শীতে কাঁপতে হয়নি, কায়ক্লেশে, অনাহারে আপনাকে দিন কাটাতে হয়নি!”  

খুব শান্ত গলায় রেট বললেন – “কনফেডারেট বাহিনীতে আঁট মাস ছিলাম আমি। অনাহারে কাটানোর মত এর চাইতে ভাল জায়গা আর কিছুই হতে পারে না।”

“সেনাবাহিনীতে! বাহ্‌! খেত থেকে তুলো তোলা, আগাছা পরিষ্কার করা – এই সব তো আপনাকে করতে হয়নি। আপনি – আমার দিকে চেয়ে ওই বিদ্রূপের হাসিটা হাসবেন না বলে দিচ্ছি!”

ক্রমশ ওর গলা চড়তেই উনি আবার ওর হাতে হাত রাখলেন।

“তোমার দিকে চেয়ে আমি মোটেও বিদ্রূপের হাসি হাসছিলাম না। ওপর ওপর তোমাকে যেমন লাগে আসল মানুষটা তার থেকে যে কত আলাদা – সেটা দেখেই হাসছিলাম।  উইল্কসদের বারবেকিউতে তোমাকে যখন প্রথম দেখেছিলাম, সেই কথাটা মনে পরছিল। তোমার পরনে ছিল সবুজ রঙের একটা পোশাক, পায়ে সবুজ রঙের স্লিপার, প্রণয়ীকূল পরিবৃত – বেশ পরিতৃপ্ত দেখাচ্ছিল তোমাকে। আমি জোরের সঙ্গে বলতে পারি কত পেনিতে এক ডলার হয় সেটুকু ধারণাও তোমার ছিল না। কেবল একটাই চিন্তা তোমার মন জুড়ে ছিল সেদিন আর সেটা হল কীভাবে ফাঁদে ফেলবে অ্যাশ – ”

এক ঝটকায় স্কারলেট নিজেকে ওঁর কাছ থেকে সরিয়ে নিল।

“আমাদের দুজনকে যদি মানিয়ে চলতেই হয়, রেট, তাহলে অ্যাশলে উইল্কসকে নিয়ে কথা বলা আপনাকে বন্ধ করতেই হবে। এই ব্যাপারে আমাদের মতের মিল কোনোভাবেই হবে না, কারণ আপনি ওকে বুঝতেই পারবেন না।”

“মনে হয়, তুমি ওকে একেবারে বিলক্ষণ বুঝে ফেলেছ,” রেট বিষাক্ত গলায় বললেন। “না, স্কারলেট, আমি যদি তোমাকে আদতে ঋণ দিই, তাহলে অ্যাশলেকে নিয়ে আমার আলোচনা করার অধিকারও তোমাকে মেনে নিতে হবে। যেভাবে আমার ইচ্ছে হবে সেভাবে আলোচনা করব। আমার দেওয়া ঋণের সুদ পাওয়ার অধিকার আমি ছেড়ে দিচ্ছি, কিন্তু ওই অধিকারটা ছাড়ছি না। আর ওই তরুণ ভদ্রলোকটির অনেক ব্যাপারেই আমার অনেক কৌতুহল।”

“ওকে নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে আমি বাধ্য নই,” চটে-মটে স্কারলেট বলে উঠল।

“আহা, কে বলল বাধ্য নও? সিন্দুকের চাবিটা যে আমারই হাতে, বুঝলে না? তারপর একদিন যখন তুমি ধনী হয়ে যাবে, তুমিও একই কাজ অন্যদের সঙ্গে করতে পারবে … এটা তো বোঝাই যাচ্ছে, তোমার এখনও ওর ব্যাপারে দুর্বলতা – ”

“মোটেই না।”

“যেভাবে তুমি ওর পক্ষ নেবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছ – তার থেকেই বোঝা যায়। তুমি – ”

“আমার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে কেউ টিটকিরি মেরে কথা বলুক, সেটা আমার পছন্দ নয়।”

“যাকগে, আপাতত ওসব কথা ছাড়।  আচ্ছা, তোমার সম্বন্ধে ওর দুর্বলতা এখনও আগের মতই আছে, না রক আইল্যান্ড সব কিছু ভুলিয়ে ছেড়েছে? কিংবা হয়ত ওর স্ত্রীর মত একজন নারীরত্নের কদর করতে শিখেছে!”

মেলানির উল্লেখ হতেই স্কারলেট ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস নিতে লাগল। প্রায় চেঁচিয়ে উঠে আসল সত্যিটা ওঁকে শুনিয়ে দিতে ইচ্ছে করল।  স্রেফ আত্মমর্যাদার খাতিরেই অ্যাশলে এখনও মেলানির সঙ্গে বাঁধা পড়ে আছে।  বলার জন্য মুখ খুলে ফেলেছিল, তারপরেই বন্ধ করে ফেলল।

“বুঝলাম। তার মানে এখনও মিসেজ় উইল্কসের কদর বোঝার মত বুদ্ধি ওর হয়নি, তাই তো? আর বন্দিজীবনের কঠোরতাও তোমার প্রতি ওর আবেগের তীব্রতা কম করতে পারেনি?” 

“এই ব্যাপারে আলোচনা করার কোনও প্রয়োজন আমি বোধ করছি না।”

“আমি যে আলোচনা করতে চাইছি,” রেট বললেন। ওঁর গলায় একটা অচেনা কিন্তু মৃদু আভাস টের পেল, সেটা কী বুঝতে পারল না, কিন্তু আভাসটা ভাল ঠেকল না। “আর শুনে নাও, আলোচনা আমি করবই, আর জবাব তোমাকে দিতেই হবে। ও এখনও তোমাকে ভালবাসে?”

“যদি ভালবাসেই, তাতে কী এসে যায়?” স্কারলেট কোণঠাসা হয়ে গিয়ে মেজাজ হারাল। “ওকে নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে আমি রাজি নই, কারণ আপনি ওর ভালবাসার ধরণটা বুঝতেই পারবেন না। ভালবাসা বলতে আপনি বোঝেন – আপনি বোঝেন কেবল ওই ওয়াটলিং নামের মেয়েমানুষটার সঙ্গে আপনি যা করে থাকেন।”

“ওহ্‌,” খুব নরম গলায় রেট বলে উঠলেন। “তার মানে তুমি বলতে চাও শারীরিক লালসা চরিতার্থ করা ছাড়া আমার আর কোনও ক্ষমতাই নেই?”

“সেটা আপনার চেয়ে ভাল করে আর কে জানে?”

“আচ্ছা, এতক্ষণে এই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে তোমার কোথায় আপত্তি, সেটা বুঝতে পারলাম। আমার এই অশুচি হাত আর ঠোঁট ওর ভালবাসার পবিত্রতাকে মলিন করতে পারে।”

“হ্যাঁ, সেরকমই কিছু – বলতে পারেন।”

“এই পবিত্র ভালবাসার ব্যাপারে জানতে খুব আগ্রহ – ”

“নোংরামো করবেন না, রেট বাটলার। আপনার নোংরা মন নিয়ে যদি ভেবে থাকেন যে আমাদের দুজনের মধ্যে কোনও অবৈধ সম্পর্ক – ”

“আরে! এই সহজ কথাটা আমার মাথাতেই আসেনি, সত্যি বলছি। ঠিক এই জন্যেই আমার এত কৌতুহল। তা তোমাদের মধ্যে অবৈধ কোনও সম্পর্ক হল না কেন?”

“আপনি যদি ভেবে থাকেন যে অ্যাশলে – ”

“আচ্ছা, তার মানে তুমি নও, আসলে অ্যাশলেই পবিত্র থাকার লড়াইটা চালিয়ে গেছে। নাহ্‌, স্কারলেট, অত সহজে হার মেনে নিও না!”

অনিশ্চয়তা আর ধিক্কার নিয়ে স্কারলেট ওঁর অতল মসৃণ চোখের পানে চাইল।

“এই ব্যাপারে কথা বাড়িয়ে আর লাভ নেই। আপনার টাকার আমার আর কোনও প্রয়োজন নেই। তাই এবার বিদায় হোন।”

“কী যে বল, আমার টাকাটার তোমার খুব প্রয়োজন – আর কথা যখন এত দূর এগিয়েই গেছে, তখন বাড়াব না কেন? এমন নিষ্পাপ চরিত্রের নিষ্কলঙ্ক একজন মানুষকে নিয়ে আলোচনা করতে অসুবিধে কোথা – আমার তো মাথায় আসছে না। তুমি বলতে চাইছ অ্যাশলে তোমাকে ভালবাসে – তোমার মন, তোমার সত্তা, তোমার চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য, তাই তো?”

ওঁর কথাগুলো শুনে স্কারলেট রাগে ফুঁসতে লাগল। হ্যাঁ, অ্যাশলে ওকে এই সব কারণেই ভালবাসে, কেবল এই সব কারণেই।  আর ঠিক এই কারণেই জীবনটা দুঃসহনীয় হয়ে পড়েনি।  স্কারলেটের ভেতরে সুপ্ত থাকা কোমল প্রবৃত্তিগুলো একমাত্র অ্যাশলেই উপলব্ধি করতে পারে আর সেই জন্যই তো আত্মমর্যাবোধের সিমা অতিক্রম না করেও দূর থেকেই ওকে ভালবাসে।  অথচ রেট সম্পর্কটা এমনভাবে টানাটানি করে বের করে আনেন যে সেটার পবিত্রতা কলুষিত হয়ে যায়। মোলায়েম স্বরে বললেও ওঁর প্রতিটি কথার ভেতরে বিদ্রূপের একটা রেশ থেকেই যায়।

“এই আদর্শভ্রষ্ট দুনিয়ায় এখনও এই ধরণের প্রেম টিকে আছে সেটা ভেবেই কেন যেন আমার কৈশোরের কল্পনাবিলাসিতার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে,” উনি বলে চললেন। “তাহলে তোমার প্রতি ওর প্রেমে শারীরিক স্পর্শের কোনও স্থান নেই, ঠিক বলছি তো? তুমি যদি কুৎসিত হতে, বা তোমার ত্বক ফর্সা না হয়ে কালো হত, কিছুই এসে যেত না, তাই না? আর তোমার সবুজ রঙের ওই চোখদুটো – যে কোনও পুরুষকে তোমাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করার জন্য ব্যাকুল করে ফেলে – তারও কোনো মূল্য নেই? আর চলা ফেরার সময় তোমার ওই দোলায়মান নিতম্ব – নব্বইয়ের নিচে যে কোনও পুরুষকে যা মোহিত করতে পারে? আর তোমার ঠোঁটজোড়া – নাহ্‌, বেশি বললে   আবার আমার লালসাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়ে যাবে!  আচ্ছা, অ্যাশলে কি এসব কিছুই লক্ষ্য করে না? নাকি লক্ষ্য ঠিকই করে, কিন্তু মনে একটুও সাড়া জাগাতে পারে না?”

বাধাবাধনহীন হয়ে স্কারলেটের মন ফলের বাগানে সেই দিনটাতে ফিরে গেল, যখন অ্যাশলে ওকে বাহুবন্ধনে বেঁধে ফেলেছিল, ওর উত্তপ্ত ঠোঁট স্কারলেটের ঠোঁটের খুব কাছে চলে এসেছিল, মনে হচ্ছিল, অ্যাশলে এই বন্ধন থেকে ওকে কোনোদিনও মুক্তি দেবে না। স্মৃতিটা মনে পড়তেই ওর মুখ রাঙা হয়ে উঠল, এই রক্তিমাভা রেটের নজর এড়াল না।

“অতঃপর,” রেট বললেন, ওঁর কণ্ঠস্বর থেকে চাপা আক্রোশ ফুটে বেরোচ্ছে। “বুঝলাম। তোমার মনটাকেই শুধু অ্যাশলে ভালবাসে তাহলে।”

আমার জীবনের একমাত্র সুন্দর দিকটা নিয়ে কদর্য ইঙ্গিত করে সেটাকে দুষিত করে তোলার সাহস উনি পান কী করে?  অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায়, কৃতসংকল্প হয়ে ওর অমূল্য অবলম্বনকে ভেঙ্গে খান খান করে দিচ্ছেন, আর এই ফাঁকে যেসব কথা ওঁর জানবার ইচ্ছে সেগুলো অনায়াসে বের করে নিচ্ছেন।  

“হ্যাঁ, ও সেটাই ভালবাসে!” অ্যাশলের ঠোঁটের স্মৃতিটা মন থেকে সরিয়ে ফেলতে ফেলতে ও চেঁচিয়ে উঠল।

“প্রিয়তমে, মন বলে যে তোমার কোনও বস্তু আছে, এ কথাটাই বেচারা জানে না।  তোমার মনই যদি ওর আকর্ষণের মূল কেন্দ্র হয়, তাহলে কি এই প্রেমকে – কী বলব – ‘পবিত্র’ – রাখার জন্য ওকে এত লড়াই করতেই হত? তাই হলে ওর নিশ্চিন্ত থাকার অসুবিধে কোথায়? একজন মেয়ের মন, তার সত্তাকে ভালবেসেও একজন ভদ্রলোকের আত্মসম্মান বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয় না, বউয়ের বিশ্বাসভঙ্গ করাও হয় না। তবে তোমার শরীরের ওপর যদি ওর লোভ থেকে থাকে – যা ওর আছেই বলেই মনে হয় –  তাহলে অবশ্যই উইল্কস বংশের আত্মসম্মান রক্ষা করার ব্যাপারে ওকে খুবই সাবধান হতে হবে।  

“আপনার মনটা যেমন নোংরা, বাকি সকলকেও আপনি সেই রকমই ভাবেন!”

“আহা, তোমার শরীরটার ওপরে আমার যে লোভ য়াছে, সেটা তো আমি কখনোই গোপন করিনি – সেটাই যদি বলতে চেয়ে থাক। তবে ভাগ্য ভাল, আমার অত মর্যাদা-টর্যাদা নিয়ে ছুঁচিবাই নেই।  আমি যেটা চাই, সম্ভব হলে আমি সেটা নিয়েই নিই, তাই সাপই হোক বা নেউল, কারো সাথেই বিবাদ করি না।   কী যে মজাদার নরকে অ্যাশলেকে তুমি ঠেলে দিয়েছ, বলার নয়! বেচারার অবস্থা দেখে আমার কষ্টই হয়”।

“আ – আমি ওকে নরকে ঠেলে দিয়েছি?”

“অবশ্যই দিয়েছ! সর্বক্ষণ ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করছ, নিয়ত ওকে প্রলুব্ধ করছ, অথচ আমাদের এখানে যাকে মর্যাদাবোধ বলে চালানো হয় তার খাতিরে ওকে গভীর প্রেমকেও অস্বীকার করতে হচ্ছে।  এখন তো আমার মনে হয় বেচারার না রইল প্রেম, না রইল মর্যাদা – নিজেকে সান্ত্বনা দেবার মত কিছুই বাকি থাকল না!”

“ওর মধ্যে অবশ্যই প্রেম আছে – বলতে চাইছি, ও আমাকে ভালবাসে!”

“সত্যিই কি? তাহলে একটা কথার জবাব দাও দেখি, তাহলে আলোচনায় আজকের মত ইতি টানতে পারি। টাতারপর কাটা তুমি নিতেও পার বা নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলে দিতেও পার, আমার কিছুই এসে যায় না!”

রেট উঠে পড়লেন। আধখাওয়া চুরুটটা পিকদানে ছুঁড়ে ফেললেন। ওঁর চলাফেরার মধ্যে অনায়াস এক ক্ষিপ্রতা – ঠিক যেমন লক্ষ্য করেছিল অ্যাটলান্টা পড়বার রাতে – কেমন যেন অলক্ষুণে, খানিকটা ভীতিকরও। “যদি ও সত্যিই তোমাকে ভালবাসে, তাহলে খাজনার টাকা জোগাড় করার উদ্দেশ্যে তোমাকে অ্যাটলান্টা আসতে দিল কেন? যে মেয়েকে আমি ভালবাসি, তাকে এরকম কিছু করতে দেবার আগে, আমি – ”

“ও জানত না! ওর কোনো ধারণাই ছিল না যে আমি – ”

“তোমার কি মনে হয় না, জানাটা ওর উচিত ছিল?” কণ্ঠে যে হিংস্রভাবটা ফুটে উঠছিল, সেটা আড়াল করার কোনও চেষ্টাই করলেন না। “ও তোমাকে যতখানি ভালবাসে বলে তুমি আমাকে বলছ, তুমি মরিয়া হয়ে পড়লে কত দূর যেতে পার, সেটা কি ওর জানার কথা নয়? এখানে আসতে দেওয়ার চেয়ে ওর উচিত ছিল তোমাকে হত্যা করা। আর কার কাছে আসছ – না এত মানুষ থাকতে আমার মতন একজন লোকের কাছে! হে ভগবান!”

“কিন্তু ও সত্যিই জানত না!”

“বলে না দিলেও যদি ও বুঝতে না পারে, তাহলে তোমার সম্বন্ধে বা তোমার ওই চমৎকার মনের গতিবিধি  সম্বন্ধে কোনোদিনই কিছু জানতে পারবে না!”  

কী অন্যায্য ভাবনা ওঁর! অ্যাশলে যেন অন্তর্যামী! আর জানলেও অ্যাশলে যেন ওকে আটকে দিত! কিন্তু হঠাৎ ওর মনে হল সত্যিই তো, একটু চেষ্টা করলেই তো অ্যাশলে ওকে আটকাতে পারত! ফলের বাগানে মিনমিনে গলাতেও যদি একটু ভরসা পাওয়া যেত যে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলে যাবেই তাহলেই তো রেটের কাছে যাওয়ার কথা ওর মনেই আসত না! মিষ্টি করে দু’চারটে ভরসার কথা, এমনকি ট্রেনে ওঠার সময় একটা বিদায় চুম্বন – তাহলেই তো যাবার ইচ্ছেটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলরে পারত। অথচ ও কেবল মর্যাদা নিয়েই কথা বলে গেছে। কিন্তু – রেট কি ঠিক কথাই বলছেন? ওর মনের ইচ্ছেটা জানা কি অ্যাশলের উচিত ছিল?  অপ্রিয় ভাবনাটা তাড়াতাড়ি মন থেকে সরিয়ে ফেলল। না, না, ও এসব কিছু সন্দেহই করেনি। ও যে অনৈতিক কিছু করতে পারে সেটা অ্যাশলে ভাবতেই পারে না। সুক্ষ্মরুচিবোধসম্পন্ন অ্যাশলের কল্পনায় এই রকম নিম্নরুচির ভাবনা আসতেই পারে না। রেট আসলে আমার ভালবাসাকে বিকৃত করে দিতে চাইছেন। ওর জীবনের সর্বোত্তম প্রাপ্তিকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চাইছেন।  একদিন যখন স্টোরটা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে, মিলটাও তরতরিয়ে চলতে থাকবে, আর ওর অনেক টাকা হবে, তখন রেটকে এই অপমানের, এই দুর্ভোগের জন্য খেসারৎ দিতে বাধ্য করবে, কথাটা নির্দয়ভাবে ভেবে ফেলল।

ওকে ছাপিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন উনি, ওর দিকে তাকিয়ে আছেন, সামান্য মজা পেয়েছেন যেন। উত্তেজনার সেই আবেগটা আর ওঁর মধ্যে নেই।

ঈষৎ মাথা নাড়লেন উনি।

“বাস, এটুকুই? তোমার সহনশীলতা নিয়ে আমি এক ধরণের উদাসীন শ্রদ্ধা অনুভব করি, স্কারলেট, একসাথে অনেকগুলো লক্ষ্যভেদ করতে গিয়ে তোমার উদ্যম চুরমার হয়ে যাক, সেটা দেখতে আমার ভাল লাগবে না। টারার কথাই ভাব। একজন মানুষকে ব্যস্ত রাখার পক্ষে যথেষ্ট। তার ওপর ধর, তোমার অসুস্থ বাপি রয়েছেন। উনি তোমাকে খুব একটা সাহায্য করতে পারবেন বলে মনে হয় না। তারপর মেয়েরা আছে, আর ডার্কিরা। এখন তুমি আবার একজন স্বামীর এবং খুব সম্ভব মিস পিটিপ্যাটের দায়িত্বও নিয়ে ফেলেছ। অ্যাশলে উইল্কস আর ওর পরিবারকে বাদ দিলেও তোমার কাঁধে এখন অনেক বোঝা।”

“অ্যাশলে আমার বোঝা নয়। ও থাকাতে আমার সাহায্য – ”

“ভগবানের দোহাই,” খুব অধৈর্য হয়ে বললেন। “আর এটা নিয়ে কথা বাড়িও না, দয়া করে। ও কোনও সাহায্যেই আসে না। তোমার ঘাড়ে ও চেপে বসেছে, আর সহজে নামবেও না, কিংবা আর কারও ঘাড়ে চেপে বসবে, আমরণ। একটা সত্যি কথা বলি – আলোচনার বিষয় হিসেবে ওকে নিয়ে কথা বলতে আমার ক্লান্তি এসে যায় … ঠিক কত টাকা তোমার চাই?”

খারাপ খারাপ কথা ঠোঁটের ডগায় এসে গেছিল। এত অপমানের পরে, ওরই মুখ থেকে ওর পরম আদরের বিষয়গুলো টেনে হিঁচড়ে বাইরে এনে পায়ের তলায় পিষে ফেলার পরও উনি ভাবছেন যে ওঁর টাকা ও নেবে!

অবশ্য কথাগুলো বলবার আগেই নিজেকে সামলে নিল। ওঁর প্রস্তাবটা ঠুকরে দিয়ে ওঁকে স্টোর থেকে বেরিয়ে যেতে বললে, বেশ হয়! কিন্তু এই ধরণের বিলাসিতা কেবল সত্যিকারের ধনী আর নিরাপদ মানুষরাই করতে পারেন। যতদিন ও দরিদ্র থাকবে, হ্যাঁ, ঠিক ততদিনই, এই ধরণের জুলুম সহ্য করতেই হবে। কিন্তু একবার বড়লোক হয়ে গেলে – সত্যি কী স্বস্তির যে লাগে এরকম ভাবে ভাবলে! –  তখন ওর অপছন্দের ব্যাপারগুলো, কিছুতেই বরদাস্ত করবে না, যা পেতে ইচ্ছে হবে, তা  আদায় করেই ছাড়বে, এমনকি যারা ওকে তোষামোদ করে চলবে না, তাদের ও হাতে মাথা কাটবে।

ওদের মুখের ওপর জাহান্নামে যেতে বলে দেব, সব থেকে প্রথমে যাঁকে বলব, তিনি হলেন রেট বাটলার!  

কথাটা ভেবে এত আনন্দ হল যে ওর সবজে চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠল আর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। রেটও হেসে ফেললেন।

“তোমার বেশ একটা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আছে, স্কারলেট,” উনি বললেন। “বিশেষ করে যখন তুমি মনে মনে কোনও বদমাইশির মতলব ভাঁজতে থাক। আর শুধু তোমার গালের ওই টোল পড়াটা দেখতে পাওয়ার জন্যেই, যদি চাও, তোমাকে আমি বারো তেরোটা খচ্চর কিনে দিতে পারি!”

স্টোরে ঢোকবার দরজাটা খুলে গেল। একটা খড়কে দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে কাউন্টারের ছেলেটা ঢুকল। স্কারলেট দাঁড়িয়ে পড়ে শালটা গায়ে জড়িয়ে নিল, বনেটের ফিতেটাও শক্ত করে চিবুকের তলায় বেঁধে নিল। মনস্থির করে ফেলেছে।

“বিকেলের দিকে খুব ব্যস্ত আছেন নাকি? আমার সঙ্গে যেতে পারবেন এখন?” ও জানতে চাইল।

“কোথায়?”

“গাড়িতে করে আমাকে মিলে নিয়ে চলুন। ফ্র্যাঙ্ককে কথা দিয়েছি, একা একা গাড়ি চালিয়ে শহরের বাইরে যাব না।”

“মিলে – এরকম বৃষ্টির মধ্যে?”

“হ্যাঁ, মিলটা আমি এখুনি কিনে ফেলতে চাই – আপনার মত বদলে যাবার আগেই।”

উনি এমন অট্টহাস্য করে উঠলেন যে কাউন্টারের পেছনে ছেলেটা চমকে উঠল আর অবাক হয়ে ওঁকে দেখতে লাগল।

“তোমার যে বিয়ে হয়ে গেছে, সে কথাটা কি ভুলে গেলে? বাটলারের মতন একজন দুশ্চরিত্র লোক – যাকে ভদ্র সমাজে কেউ আমন্ত্রণ জানায় না –  তার সঙ্গে একই গাড়িতে মিসেজ় কেনেডি ভ্রমণ করছেন – সেটা কি একটু দৃষ্টিকটু  দেখায় না? তোমার সামাজিক খ্যাতির কী হবে সেটা কি ভুলে গেলে?”

“সামাজিক খ্যাতি, নিকুচি করেছে সামাজিক খ্যাতির! আপনি মত বদলে ফেলার আগেই কিংবা ফ্র্যাঙ্ক জেনে ফেলার আগেই, মিলটা আমি কিনে ফেলতে চাই। এত শত বাহানা বানাচ্ছেন কেন, রেট? নাহয় টিপটিপ করে একটু বৃষ্টিই পড়ছে? চলুন, এখুনি বেরিয়ে পড়া যাক।”

 

***

করাতের ওই কলটা! কথাটা নিয়ে যতবারই ভাবতে থাকেন, কাতরে ওঠেন। কেন যে ওই মিলটার কথা স্কারলেটকে বলতে গেছিলেন! কানের দুলজোড়া ক্যাপটেন বাটলারের কাছে (আর মানুষ পেল না!) বিক্রি করে ফেলাটা মোটেই সমীচীন হয়নি, আর মিলটা কেনার আগে, ওঁর সঙ্গে – নিজের স্বামীর সঙ্গে – একবার পরামর্শ করার দরকারটাও বোধ করল না! আর সবচাইতে খারাপ ব্যাপারটা হল, মিলটা চালানোর ভারটাও ওঁকে সঁপে দিল না! খুব খারাপ! যেন ওঁকে বা ওঁর বিচক্ষণতার ওপর ওর ভরসাই নেই!

ওঁর চেনা পরিচিত আর পাঁচটা লোকের মত ফ্র্যাঙ্কেরও বিশ্বাস, স্ত্রীকে সর্বদাই তার স্বামীর পাকা বুদ্ধির ওপর ভরসা করে চলা উচিত, কাটছাঁট না করে স্বামীর মতামত মেনে নেওয়া উচিত, নিজস্ব কোনো মতামত থাকাটাও ঠিক নয়। মহিলাদের ব্যাপারে কড়াকড়ি করা তাঁর বিলকুল না-পসন্দ। মেয়েদের অদ্ভুত হাস্যকর সব ব্যাপার-স্যাপার, তা ওদের হাস্যকর ছোটোখাটো আবদার যদি মেনেই নেওয়া হয়, তাহলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না, ওরাও খুশি থাকে। আসলে উনি এতই শান্ত আর নম্র স্বভাবের মানুষ যে স্ত্রীকে খুব বেশি আনন্দ থেকে বঞ্চিত করে রাখতে ইচ্ছেই করে না। নরমসরম একটা মেয়ের বোকা বোকা ছোটখাটো বায়নাগুলো মিটিয়ে দিতে আর মাঝে মধ্যে ওর নির্বুদ্ধিতা আর বেহিসেবিপনার জন্য মিষ্টি করে বকে দিতে ওঁর ভালই লাগে।  কিন্তু স্কারলেটের ধরণধারণ বড়ই সৃষ্টিছাড়া।

করাতের কলটাকেই ধরা যাক না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করা ওঁর নানা প্রশ্নের জবাবে যখন ও মিষ্টি হেসে বলে দিল যে মিলটা ওর নিজেরই চালানোর ইচ্ছে, উনি একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। কী বলল, না, “চেরাই কাঠের ব্যবসাটা নিজেই দেখব বলে ঠিক করেছি”। সেই মুহূর্তে যে আতঙ্ক বোধ করেছিলেন, সারা জীবন লেগে যাবে সেটা ভুলে যেতে। ব্যবসাটা নাকি নিজেই দেখবে! ভাবা যায়! সারা অ্যাটলান্টা শহর খুঁজলে একজন মহিলাকেও পাওয়া যাবে না যিনি ব্যবসা করেন! এমনকি, কোথাওই কোনো মহিলা ব্যবসা করছেন বলে ফ্র্যাঙ্কের কাছে খবর নেই।  ভাগ্য বিড়ম্বনার কারণে, এরকম কঠিন সময়ে, কোনো মহিলর যদি পরিবা্রের সাহায্যের জন্য অর্থোপার্জন করতে বাধ্যও হন, তাহলে সেটা মেয়েলি উপায়েই করে থাকেন – যেমন মিসেজ় মেরিওয়েদার বেকারি করেছেন, কিংবা মিসেজ় এলসিং আর ফ্যানির মত, চিনে মাটির বাসনে রঙ তুলির টান দিয়ে বা সেলাই করে বা কামরা ভাড়া দিচ্ছেন। মিসেজ় মীড একটা স্কুল খুলেছেন, মিসেজ় বনেল গানের তালিম দিচ্ছেন। রোজগার এঁরাও করছেন, মেয়েদের যেভাবে মানায় সেভাবেই করছেন, ঘরের চৌকাঠ তো এঁদের পেরোতে হয়নি!  কিন্তু ঘরের নিরাপত্তাবলয় পার করে, পুরুষমানুষের রুক্ষ দুনিয়ায় পা দিয়ে, তাঁদের সঙ্গে রেশারেশি করে, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে, পদে পদে অপমান আর  হাসির খোরাক হয়ে … বিশেষ করে যখন এসব করবার কোনো প্রয়োজনই নেই ওর! যখন ওর স্বামীই সব চাহিদা পূরণ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন!  

প্রথমে ফ্র্যাঙ্কের মনে আশা ছিল যে এসব নেহাতই তামাশা, স্কারলেট ওর পেছনে লাগার জন্যেই বলছে। যদিও তামাশাটা খুব রুচিসম্মত বলা যায় না।  কিন্তু স্কারলেট যে তামাশা করছে না, যা বলছে সেটাই করবে বলে বদ্ধপরিকর – সেই কথাটা হৃদয়ঙ্গম হতে বেশি সময় লাগল না ওঁর। করাতের কলটা নিজেই চালাতে লাগল। ওঁর আগেই ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে পীচট্রী স্ট্রীট ধরে গাড়ি নিয়ে যেতে শুরু করল, আর প্রায়ই ফেরে বেশ রাত করে, উনি স্টোর বন্ধ করে সাপারের জন্য আন্ট পিটির বাড়িতে ফিরে আসারও অনেক পরে।  জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এতটা লম্বা রাস্তা – কেবল আন্ট পিটারের ভরসায় পাড়ি দিত। ছাড়া পাওয়া নিগার আর বদমাশ ইয়াঙ্কিতে ভর্তি জঙ্গল, আন্ট পিটারও ওর এই যাতায়াত একেবারেই পছন্দ করত না। ফ্র্যাঙ্ক ওর সঙ্গে যেতে পারতেন না, স্টোর নিয়েই ওঁকে সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হত, কিন্তু ওঁর আপত্তি স্কারলেট কানেই তোলেনি, সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, “ওই ধান্ধাবাজ জনসনটার ওপর চোখ না রাখলে, ব্যাটা আমারই কাঠ চুরি করে বাইরে বেঁচে টাকাটা নিজের পকেটে ঢোকাবে। মিলটা চালানোর জন্য ভাল একটা লোক পেতে দাও আমাকে, তখন আর আমাকে অত ঘন ঘন যেতে হবে না। সেই সময়টা শহরে বসে আমি কাঠ বিক্রি করার কাজে লাগাতে পারব।”

শহরে বসে কাঠ বিক্রি করবে! এর চেয়ে খারাপ কিছু তো আর হতেই পারে না। কোনো কোনো দিন মিলে না গিয়ে শহরেই চেরাই কাঠের খুচরো বিক্রির দিকে নজর দিত। সেই সব দিন ফ্র্যাঙ্কের ইচ্ছে করত স্টোরের পেছনে একটা অন্ধকার জায়গায় লুকিয়ে থাকেন, যাতে কেউ তাঁর মুখ দেখতে না পায়। ওঁরই বউ চেরাই কাঠ খুচরো বিক্রি করছে!  

আর এদিকে স্কারলেটকে নিয়ে ভয়ানক সব কথাবার্তা চালাচালি হতে শুরু হয়ে গেল। ওঁকে নিয়েও হয়ত বলাবলি করছে, বউকে এই রকম অ-মহিলাসুলভ আচরণ করতে দেবার জন্য।

খদ্দেররা যখন কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বলত, “একটু আগেই মিসেজ় কেনেডিকে োমুক জায়গায় দেখলাম …”, লজ্জায় ওঁর মাথা হেঁট হয়ে যেত।  স্কারলেটের কার্যকলাপের বিস্তারিত বিবরণ ওঁকে শুনিয়েই ছাড়ত। নতুন যে হোটেলটার নির্মাণের কাজ চলছে সবার মুখে মুখে সেটারই কথা। টমি ওয়েলবার্ন অন্য একজন লোকের কাছ থেকে কিছু চেরাই কাঠ কিনছিল। স্কারলেট সেখানে পৌঁছে গিয়ে ষণ্ডামার্কা অদ্ভুতদর্শন সব আইরিশ রাজমিস্ত্রিদের ভিড়ের মধ্যেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে।  তারপর টমিকে উদ্দেশ্যে করে বলে যে ও ঠকে যাচ্ছে। ওর মিলের চেরাই কাঠ যে শুধু সস্তা তাই নয়, কাঠের মানও ভাল।  আর এটা প্রমাণ করার জন্য, মনে মনে বড় বড় যোগবিয়োগ করে টমিকে খরচের একটা আনুমানিক হিসেব তখন তখনই দিয়ে দেয়। একে তো এই সব অদ্ভুত অমার্জিত মজুরদের ভিড়ে ঢুকে পড়াটাই রীতিমত গর্হিত কাজ, তার ওপর আবার মেয়েমানুষ হয়েও মনে মনে জটিল হিসেব করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেওয়া – মানমর্যাদার আর কিছুই বাকি রইল না! ওর হিসেবটা মেনে নিয়ে টমি ওকে অর্ডার দেওয়ার  পরেও ওখান থেকে ওর চলে যাবার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না, বরং অনেকক্ষণ ধরে আইরিশ মজুরদের ফোরম্যান  জনি গ্যালাঘারের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেল।   বেঁটেখাটো মুস্ক একটা লোক, বাজারে বদনাম কম নেই লোকটার। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে শহরের মানুষের মুখে এই প্রসঙ্গ ছাড়া আর কোনো কথাই নেই।

এত কিছু সত্ত্বেও, মিল থেকে ও সত্যি সত্যিই অনেক টাকা রোজগার করছে। এরকম একটা অ-মহিলাসুলভ কাজ স্ত্রী যদি নিজের স্বামীর চেয়েও বেশি সাফল্যের সঙ্গে করে ফেলে, সেটা কোনও পুরুষমানুষই মেনে নিতে পারে না। আর সেই টাকাটা বা তার খানিকটা অন্তত স্টোরের প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য ওঁর হাতে তুলে দেওয়ার কোনো লক্ষণই নেই। বেশিরভাগ টাকাই টারাতে চলে যায়। সেই টাকা কিভাবে খরচ করতে হবে সেই ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ দিয়ে উইল বিনটিনকে একটার পর একটা চিঠি পাঠিয়ে চলে। তার ওপর ও ফ্র্যাঙ্ককে বলে দিয়েছে যে টারার মেরামতির কাজ কখনো যদি শেষ করতে পারে তাহলে উদ্বৃত্ত টাকাটা বন্ধকের ব্যবসায় বিনিয়োগ করার ইচ্ছে।

“হায়, হায়!” কথাটা ভাবলেই ফ্র্যাঙ্কের ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। বন্ধক বলতে কী বোঝায় সেটা তো একজন মেয়ের জানার কথাই নয়!

স্কারলেটের মাথায় এখন অনেক রকম পরিকল্পনা। আর প্রতিটা পরিকল্পনাই, ফ্র্যাঙ্কের মতে, আগের পরিকল্পনার থেকেও জঘন্যতর।  আগে যেখানে ওর গুদামটা ছিল – শেরম্যানের বাহিনী জ্বালিয়ে দেবার আগে – সেখানে একটা পানশালা নির্মাণের কথা বলল। এমন নয় যে ফ্র্যাঙ্ক মদ স্পর্শ করেন না, কিন্তু মতলবটা শুনেই উনি তীব্র কণ্ঠে প্রতিবাদ জানালেন।  পানশালার জন্য বাড়ি ভাড়া দেওয়া কেবল অসম্মানজনকই নয়, অমঙ্গলজনকও, প্রায় পতিতালয় খোলার মতই অমঙ্গলজনক।  ঠিক কী কারণে পেশাটা অসম্মানজনক সেটা ফ্র্যাঙ্ক ঠিক বোঝাতে পারলেন না, ওঁর ছেঁদো যুক্তিগুলো শুনে স্কারলেট বলে উঠল, “নিকুচি করেছে!”

“পানশালার জন্য যারা বাড়ি ভাড়া নেয়, তারা সব সময়েই ভাল ভাড়াটে হয়, আঙ্কল হেনরিই আমাকে বলেছেন,” স্কারলেট ফ্র্যাঙ্ককে বলল। “ওরা ঠিক ঠিক ভাড়া মিটিয়ে দেয়, আর আরেকটা কথা ভাব, ফ্র্যাঙ্ক, নিচু মানের কাঠ – যা আমার বিক্রি হয় না – তা দিয়ে একটা পানশালা সস্তায় আমি বানিয়ে ভাল টাকায় ভাড়া দিয়ে দিতে পারি। ভাড়ার টাকার সঙ্গে মিল আর বন্ধক থেকে উপার্জনের টাকা মিলিয়ে আরও কয়েকটা করাতের কল কিনে ফেলতে পারব।”

“সোনা, তোমার আর কোনও করাতের কল কেনার দরকারই নেই,” একেবারে দিশেহারা হয়ে ফ্র্যাঙ্ক বলে উঠলেন। “যে মিলটা এখন আছে, সেটাও বেচে দেওয়াই উচিত তোমার। এত ধকল যাচ্ছে তোমার – আর স্বাধীন নিগাররা – যাদের তুমি কাজে লাগিয়েছ – কী বিপদ যে নিজের জন্য ডেকে আনছ – ”

“ঠিকই বলেছ তুমি, স্বাধীন ডার্কিরা সত্যিই অপদার্থ,” স্কারলেট ওঁর সঙ্গে সহমত হল, কিন্তু ওঁর মিল বিক্রি করার ইশারাটা পুরোপুরি এড়িয়ে গেল। “মিস্টার জনসন তো বলেই থাকেন, প্রতিটা দিনের শুরুতেই উনি অনিশ্চয়তায় ভোগেন যে গোটা একটা দল নিয়ে কাজ করানো সম্ভব হবে কি না।  এই স্বাধীন ডার্কিদের ওপর তুমি কিছুতেই আর ভরসা রাখতে পারবে না।  এক কি দু’দিন কাজে এল, তারপর মজুরির টাকা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের টিকির দেখা পাওয়া যাবে না। এমনও হতে পারে যে একদিন হয়ত গোটা দলটাই ডুব মেরে দিল! যতই আমি বন্ধনমুক্তির কথাটা নিয়ে ভাবি, ততই আমার মনে হতে থাকে যে এর চাইতে বড় অপরাধ আর কিছুই হতে পারে না! ডার্কিদের উচ্ছন্নে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে! হাজারে হাজারে আছে, বেকার হয়ে বসে থাকে, আর কাজের খোঁজে যেগুলো মিলে আসে সেগুলো এতই অকর্মা আর অলস যে ওদের কাজে লাগানোর চাইতে না লাগানোতেই লাভ। ওদের ভালর জন্যই তুমি যদি ওদের একটু বকাবকি করেছ কি গায়ে হাত তুলেছ, ব্যাস ফ্রীডমেন’স ব্যুরো সঙ্গে সঙ্গে এসে তোমার ওপর চড়াও হবে!”

“সোনা, মিস্টার জনসনকে তুমি নিশ্চয়ই ওদের পেটানোর অনুমতি দাওনি – ”

“মাথা খারাপ নাকি তোমার?” স্কারলেট অধৈর্য হয়ে বলে উঠল। “এখুনি বললাম না, সেরকম কিছু করলে ইয়াঙ্কিরা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জেলে ভরে দেবে?”

“আমি জোরের সঙ্গে বলতে পারি, তোমার বাপি জীবনে কোনও ডার্কিকে আঘাত করেননি,” ফ্র্যাঙ্ক বললেন।

“না, মাত্র একবার করেছিলেন। আস্তাবলে কাজ করত ছেলেটা। সারাদিন শিকার করে ফেরার পর ওঁর ঘোড়াকে ভালমত দলাইমলাই করে দেয়নি। তখন ব্যাপারটা একেবারেই অন্য রকম ছিল। ছেড়ে দেওয়া নিগারদের ব্যাপারটা আলাদা, ভাল করে চাবুক মারলে ওদের ভাল বই খারাপ হবে না।”

বউয়ের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ফ্র্যাঙ্ক যত পরিচিত হয়ে উঠতে লাগলেন, ওর সৃষ্টিছাড়া পরিকল্পনার কথা যত শুনতে লাগলেন, ওঁর বিস্ময় ক্রমেই চরমে পৌঁছে যেতে লাগল। তবে ওঁর বিস্ময় কিছু কম হল না যখন দেখলেন যে বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ওর আচার ব্যবহারে কী আমূল পরিবর্তন এসে গেল।  যে শান্ত মধুর স্বভাবের মেয়েটিকে উনি স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তার সঙ্গে এই মেয়ের অনেক অমিল। যখন অনুরাগ পর্ব চলছিল, ওঁর মনে হয়েছিল যে মেয়েটির মধ্যে জীবন সম্বন্ধে নারীসুলভ এক অনভিজ্ঞতা রয়েছে, একাধারে ভীরু, অসহায় অথচ নারীসুলভ কমনীয়তায় ভরপুর। অথচ আজকের স্কারলেটের মধ্যে পুরুষসুলভ ভাবটাই বেশ প্রকট হয়ে উঠেছে। হাসলেই গালে টোল পড়ে যাওয়া, চোখেমুখে গোলাপি আভা, মনকাড়া হাসি – এসবের আড়ালে ওর সমস্ত আচরণ আর কার্যকলাপই ভীষণভাবে পুরুষোচিত। কথাবার্তায় পেশাদারী দৃড়তা, কোনও সিদ্ধান্ত নিতে বৃথা সময় নষ্ট করে না, কোনোরকম মেয়েলি ন্যাকামির ধারই ধারে না।  লক্ষ্য নিয়ে ওর মনে কোনও সংশয়ই নেই, আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য – ঠিক পুরুষদের মতই – মেয়েদের মত কোনও ঘোরপ্যাঁচের ধার ধারে না –  সব চাইতে সিধে রাস্তাটাই বেছে নেয়।

কর্তৃত্ব ফলাতে পছন্দ করেন, এমন অনেক মহিলাকে ফ্র্যাঙ্কও আগেও দেখেছেন। দক্ষিণের অন্যান্য শহরের মতই অ্যাটলান্টাতেও প্রবীণ বিত্তশালী বিধবা মহিলার অভাব নেই। সচরাচর কেউই এঁদের ঘাঁটাতে সাহস করেন না।  শক্তসমর্থ মিসেজ় মেরিওয়েদারের মত কর্তৃত্বশালী, কিংবা দুর্বল মিসেজ় এলসিং-এর মত উদ্ধত, কিংবা মিষ্টভাষী, পক্ককেশ মিসেজ় হোয়াইটিং-এর মত কৌশলী আত্মসর্বস্ব আর কাউকেই পাওয়া যাবে না। তবুও নিজের নিজের পথ মসৃণ করে তোলার জন্য এঁরা যেসব ফন্দিফিকিরের আশ্রয় নিয়েছেন, সেসব মেয়েলি ফন্দিফিকির ছাড়া অন্য কিছু বলা যাবে না। পুরুষমানুষদের কথায় ওঠা বসা না করলেও ওঁরা তাঁদের মতামতকে যাতে অসম্মান দেখানো না হয় সেই ব্যাপারে খেয়াল রেখেছেন।  যেন পুরুষমানুষদেরইদেখানো পথেই ওঁরা চলছেন, সেটুকু দেখানোর মত বিনয় ওঁদের আছে, আর সেটাই হল আসল কথা।  কিন্তু স্কারলেট নিজের ছাড়া আর কারোর দেখানো পথে চলতে রাজি নয়। এতটাই পুরুষালি ওর আচরণ যে শহরজুড়ে মুখরোচক কথাবার্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।  

“আর,” ফ্র্যাঙ্ক কাতর হয়ে ভাবলেন, “কে জানে আমাকে নিয়েও হয়ত বলাবলি করছে, ওকে এরকম অ-মেয়েসুলভ কাজ করতে বাধা দিতে না পারায়!”

সর্বোপরি, অন্য এক আপদ এসে জুটেছেন ওই বাটলার নামের মানুষটা। আন্ট পিটির বাড়িতে ওঁর ঘন ঘন হানা দেওয়ার চাইতে বেশি বিড়ম্বনার আর কিছুই হতে পারে না।  যুদ্ধের আগে ওঁর সঙ্গে ব্যবসা করে থাকলেও মানুষটাকে উনি আদৌ পছন্দ করেননি, কোনোদিনই। রেটকে টুয়েল্ভ ওকসে নিয়ে গিয়ে সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার দিনটার জন্য প্রায়ই নিজেকে গালমন্দ করেন। যুদ্ধের সময় কী রকম ঠাণ্ডা মাথায় ফাটকাবাজি চালিয়ে গেছেন, এই জন্যই তো মানুষটাকে উনি একদম দেখতে পারেন না!  সেনাবাহিনীতেও কস্মিনকালে নাম লেখাননি। কনফেডারেসির হয়ে রেটের আঁট মাসের লড়াই করার কথা একমাত্র স্কারলেটই জানে।  ওঁর জীবনের এই ‘লজ্জাজনক’ ইতিহাস যাতে ফাঁস না করে দেয়, তার জন্য স্কারলেটের কাছে সকাতর মিনতির ভান করেছিলেন।  তাছাড়া কনফেডারেটের সোনা আত্মসাৎ করে নেওয়ার জন্যেও রেটের ওপর ওঁর রাগ। অ্যাডমিরাল বুলকের মত সৎ মানুষরা একই রকম পরিস্থিতিতে পড়েও সরকারি মালখানায় হাজার হাজার ডলার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে ফ্র্যাঙ্কের পছন্দ করুন নাই করুন, রেটের ঘন ঘন যাতায়াত লেগেই রইল।

সাদা চোখে দেখলে মনে হবে উনি মিস পিটির সঙ্গে দেখা করতেই আসেন, আর বুড়িররও সেটাই বিশ্বাস করে নেন আর সবাইকে ফলাও করে বলতেও ওঁর বাধে না। তবে ফ্র্যাঙ্কের কেমন যেন সন্দেহ হয় যে রেটের আকর্ষণের কারণ মিস পিটি নন। ছোট্ট ওয়েড ওঁকে খুবই পছন্দ করে, ছেলেটা আর কারোর সঙ্গে সহজে মিশতে না পারলেও, রেটকে ‘আঙ্কল রেট’ বলে ডাকতে বাধে না।  ফ্র্যাঙ্কের কাছে এটা খুবই বিরক্তিকর মনে হয়।   ফ্র্যাঙ্ক এটাও কিছুতেই ভুলতে পারেন না, যুদ্ধের দিনগুলোতে স্কারলেটকে হামেশাই রেটের সঙ্গে ঘুরতে দেখা যেত, আর সেটা নিয়ে লোকে বিস্তর কানাঘুষো করতেও ছাড়েনি।  কে জানে আজকাল হয়ত লোকে আরও অনেক বেশি খারাপ কথা বলছে! মিল নিয়ে স্কারলেটের বাড়াবাড়ি নিয়ে খোলাখুলি ওঁদের মতামত জানিয়ে দিলেও, ফ্র্যাঙ্কের বন্ধুরা এই ব্যাপারটা নিয়ে ওঁর সামনে কোনও কথাই তোলার সাহস করেননি।    

ফ্র্যাঙ্কের সামনে এসব নিয়ে কথা তোলবার সাহস ওঁর কোনো বন্ধুই অবশ্য দেখাননি, যদিও মিল নিয়ে স্কারলেটের বাড়াবাড়ি নিয়ে ওঁকে কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়েননি ওঁরা কেউই।  আজকাল উনি আর স্কারলেট যে অনেক সামাজিক আমন্ত্রণ থেকেই ব্রাত্য থেকে যান, সেটাও উনি খেয়াল না করে পারলেন না।  ওঁদের সঙ্গে দেখা করতে আসা মানুষের সংখ্যাও ক্রমশই কমে আসতে থাকল। বেশিরভাগ প্রতিবেশিদের সঙ্গেই স্কারলেটের সদ্ভাব নেই, আর মিলের কাজ নিয়ে ব্যস্তও থাকত খুব। ফলে এই সব ব্যাপারে ও খুব একটা বিচলিত হয়নি। ফ্র্যাঙ্ক কিন্তু খুবই বিচলিত বোধ করতে লাগলেন।  

সারা জীবন ধরে ফ্র্যাঙ্ক একটা কথা মনে করে খুবই ভয়ে ভয়ে থাকেন – ‘পাড়াপড়শিরা কী বলবে?’  আর এদিকে নিজের বউই শোভন অশোভনের পরোয়া না করে একের পর এক কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে – ফ্র্যাঙ্ক খুবই অসহায় বোধ করেন।  ওঁর মনে হয় স্কারলেটের কাজগুলো কেউই মেনে নিতে পারছেন না, আর উনি ওকে এসব পুরুষালি কাজ করতে বাধা দিচ্ছেন না বলে সবাই ওঁকে অবজ্ঞার চোখে দেখছেন। যে সব কাণ্ড ও ঘটাচ্ছে, স্বামী হিসেবে সেগুলো করার অনুমতি ওঁর দেওয়ার কথা নয়, কিন্তু একবার যদি ওকে মানা করেন, বা তর্ক করেন, কিংবা সমালোচনাও করেন, তাহলে তার ঠ্যালা সামলানোই ওঁর পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়বে।

“হায়, হায়!” অসহায় হয়ে ভাবতে লাগলেন। “আমার দেখা আর পাঁচটা মেয়ের থেকে ও অনেক তাড়াতাড়ি জ্বলে ওঠে আর তার জের টানতে হয় বহুদিন ধরে!”

এমনকি দিনগুলো যখন হেসে খেলে চলতে থাকে, তখন ওঁর সঙ্গে খুনসুটি করা, গুনগুন করে গানের কলি ভাঁজতে থাকা, স্নেহশীলা বউ কী করে যে পলকের মধ্যে বদলে যেতে পারে, সেটা ভেবে উনি অবাক হয়ে যান। একবার বললেই হল, “সোনা, আমি যদি তুমি হতাম, তাহলে আমি – ” আর দেখতে হবে না, প্রলয় শুরু হয়ে যাবে।

ওর কালো ভুরুদুটো মুহূর্তের মধ্যে কপালের মাঝখানে এসে তেরছা করে জড়ো হয়ে যায়। ফ্র্যাঙ্ক ভয়ে জড়সড় হয়ে যান, ওঁর চেহারা দেখে সেটা বোঝাও যায়।  দুর্বাসা মুনির মত মেজাজ, আর রেগে গেলে বুনো বেড়ালের মত হিংস্র হয়ে ওঠে স্কারলেট। কাণ্ডজ্ঞান একেবারে লোপ পেয়ে যায়, যা ইচ্ছে তাই বলতে থাকে, তাতে কেউ যদি কষ্টও পায়, ও তার পরোয়া করে না। বাড়িটা একেবারে থমথমে হয়ে ওঠে। ফ্র্যাঙ্ক সকাল সকাল স্টোরে চলে যান, ফেরেনও অনেক রাতে। ভীরু খরগোশের মত পিটি হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের ঘরে পায়চারি করতে থাকেন। ওয়েড আর আঙ্কল পিটার আউটহাউসে গিয়ে ঢুকে পড়ে।  কুকি রান্নাঘর ছেড়ে বেরোয় না, এমনকি গলা চড়িয়ে ভগবানের নামকীর্তন করার কথা মনেও আনে না। একমাত্র ম্যামিই স্কারলেটের মেজাজের একদম পরোয়া করে না। জেরাল্ড ও’হারার মেজাজের সঙ্গে ওর বহু বছরের পরিচয়।  

স্কারলেট মোটেই বদমেজাজি হতে চাইত না, বরং ফ্র্যাঙ্কের লক্ষ্মীমন্ত স্বভাবের বউ হয়ে উঠতেই চাইত। ফ্র্যাঙ্ককে পছন্দও করে ও, আর টারার বিপদের সময় টাকাটা দিয়ে দিয়েছিলেন বলে একটা কৃতজ্ঞতাবোধও ছিল। কিন্তু এত ঘন ঘন, আর এত নানাভাবে উনি সহ্যের পরীক্ষা নিতে থাকেন, যে ওর মাথাটা একেবারে খারাপ হয়ে যায়।

বউকে যে শাসন করতে পারে না, তেমন মানুষকে শ্রদ্ধা করা ওর আসে না। আর যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে – সেটা ওর সাথেই হোক কি অন্য কারোর সাথে –  এমন ভীরু আর দ্বিধাগ্রস্ত লাগে ওঁকে, সে আর বলার নয়!  কিন্তু এসব মেনে নেওয়া যেতেই পারত, আর সুখে ঘরসংসার করা যেতেই পারত, কারণ অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান তো হয়েই গেছে। কেবল একটা ব্যাপারই ওকে খুব ভাবিয়ে তুলত – বিচক্ষণ ব্যবসায়ী ফ্র্যাঙ্ক তো ননই, এমনকি ও নিজেও যে একজন বিচক্ষণ ব্যবসায়ী হয়ে উঠুক, তাতেও ওঁর আপত্তি।

ঠিক যে আশঙ্কাটা ও করেছিল, বকেয়া টাকা আদায়েও ওঁর প্রবল আপত্তি। অতএব ওঁর পেছনে লেগে থাকতে হল। সে কাজটাও করতে লাগলেন একটা অপরাধী অপরাধী ভাব করে, আর অত্যন্ত গা-ছাড়া ভাবে।  এই অভিজ্ঞতা থেকেই স্কারলেট বুঝে গেল, টাকা রোজগারের উদ্যোগটা যদি নিজের হাতে তুলে না নেয়, তা নাহলে কেনেডি পরিবারের গ্রাসাচ্ছদনের বন্দোবস্তটাই শুধু হবে, ওর বড়লোক হবার স্বপ্নটা কোনোদিনই পূর্ণ হবে না। যা বুঝেছে, ফ্র্যাঙ্ক ওই অগোছালো ছোট্ট স্টোরটা নিয়েই জীবনটা হেসে খেলে কাটিয়ে দিতে পারলে আর কিছুই চান না।   উনি কিছুতেই বুঝতে চান না যে ওদের নিরাপত্তার ব্যাপারটা পাতলা একটা সুতোর ওপর বিপজ্জনকভাবে ঝুলে রয়েছে; এই দুঃসময়ে বেশি করে রোজগার করাটা যে কত জরুরি, সেটা বুঝতেই চাইছেন না। কোনো একটা বিপর্যয় ঘটলে একমাত্র টাকা থাকলেই সেই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা যাবে।

যুদ্ধের আগে, দিনকাল যখন এতটা কঠিন ছিল না, তখন হয়ত ফ্র্যাঙ্ককে একজন সফল ব্যবসায়ী বলা যেতে পারত। কিন্তু মানুষটা এতটাই প্রাচীনপন্থী আর সেই পুরনো চিন্তাভাবনা বর্জন না করার ব্যাপারে এতটাই একগুঁয়ে, যে বলার নয়! অথচ সেই পুরনো দিন, সেই পুরনো পন্থা, সেসব এখন অতীত।  এই কঠিন সময়ে বাঁচতে হলে যে লড়াই করে বাঁচতে হবে, এই বোধটা ওঁর মধ্যে একেবারেই তৈরি হয়নি।  হ্যাঁ, ওর নিজের মধ্যে সেই লড়াই করার মানসিকতাটা আছে, আর অবশ্যই ও সেই মানসিকতার সদ্ব্যবহার করবে। সেটা ফ্র্যাঙ্কের ভাল লাগুক চাই না লাগুক। অনেক টাকার দরকার ওদের, আর কঠোর পরিশ্রম করে ও সেই টাকা উপার্জন করছে। ফ্র্যাঙ্ক, অন্তত, ওর এই প্রয়াসে যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ান, কারণ ওর প্রয়াসের ফল তো হাতেনাতে মিলছে।

অনভিজ্ঞ হওয়ার ফলে, করাতের মিল চালানোর কাজটা খুব সহজ হচ্ছিল না। তাছাড়া একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ব্যাপারটাও আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। তাই রাত্রে যখন বাড়ি ফিরত, ক্লান্তির সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভাবনাতেও মেজাজটা ঠিক থাকত না। তারপর ফ্র্যাঙ্ক যখন গলা খাঁকারি দিয়ে বলতেন, “সোনা, আমি হলে এটা করতাম না,” কিংবা, “আমি  যদি তুমি হতাম তাহলে আমি ওটা করতাম না, সোনা,” তখন মেজাজ ঠিক রাখাটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ত, আর বেশিরভাগ সময়ে নিজেকে সামলাতেও পারত না। ধরা যাক উদ্যোগী হয়ে টাকা রোজগার করা ওঁর ক্ষমতায় কুলোয় না, তাই বলে সর্বদা ওর খুঁত ধরতে থাকবেন কেন?  আর এমন বোকার মত ঘ্যানঘ্যান করতে থাকেন!  এই দুর্দিনে যদি ও একটু-আধটু অ-মহিলাসুলভই না হয় হল, কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় তাতে?  বিশেষ করে যখন ওর ওই অ-মহিলাসুলভ করাতের কল থেকেই এত টাকা আসছে, যেটা ওদের খুব প্রয়োজন, ওর আর ওর পরিবারের জন্য, টারার জন্য, এমনকি ফ্র্যাঙ্কের জন্যেও!  

ফ্র্যাঙ্কের একমাত্র বাসনা একটু শান্তিতে, একটু স্বস্তিতে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া।  যে যুদ্ধে উনি প্রাণপাত করে লড়াই করেছেন সেই যুদ্ধ ওঁর শরীর ভেঙ্গে দিয়েছে, ওঁর ভাগ্য বিপর্যয় ঘটিয়েছে, ওঁকে একদম বুড়িয়ে দিয়েছে। তবে এসবের জন্য ওঁর মনে কোনো দুঃখ নেই, আর যুদ্ধের চার বছর পরে এমন একটা জীবন চেয়েছেন যেখানে শান্তি আর সহৃদয়তা বিরাজ করবে, ভালবাসার মানুষদের দ্বারা পরিবৃত থাকবেন, আর বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে সহানুভূতি পাবেন।  কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলেন গার্হস্থ্য শান্তি কামনা করলে তার জন্য মূল্য দিতে হবে, আর সেই মূল্যটা হল স্কারলেটের যখন যা কিছু করবার ইচ্ছে হবে তাতে বাধা না দিয়ে সেগুলো ওকে করতে দেওয়া। তাই যেহেতু নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হয় স্কারলেটের শর্তে রাজি হয়েই ওঁকে শান্তি কিনতে হচ্ছে।  কখনো কখনো এভাবে শান্তি কেনাটা সার্থক মনে হয় – শীতের বিকেলে যখন ও হাসিমুখে দরজাটা খুলে দেয়, কানের লতিতে, বা নাকের ডগায়, বা আরও উদ্ভটা জায়গায় চুমু খেয়ে ওঁর সঙ্গে দুষ্টুমি করে, লেপের উষ্ণতায় মাথা ঢুকিয়ে ওঁর কাঁধে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। স্কারলেটকে যদি নিজের মত চলতে দেওয়া যায়, তাহলে ওঁর সংসারজীবন যে অনন্ত সুখের হবে সেটা উনি বেশ বুঝতে পারেন। আবার কখনো মনে হয় এইভাবে শান্তি লাভ করাটা বড়ই খেলো, সব কিছুই যেন ওপর ওপর মনে হয়।  যে সব বিষয়কে উনি বিবাহিত জীবনযাত্রার অপরিহার্য অঙ্গ বলে মনে করে এসেছেন, সেই সব কিছুই তাঁকে বিসর্জন দিতে হচ্ছে, আর তার বিনিময়ে শান্তি কিনতে হচ্ছে।

“একজন নারীর বেশি নজর দেওয়া উচিত নিজের ঘর আর পরিবারের প্রতি, পুরুষমানুষদের মত বাইরে ছোটার দরকার নেই,” ফ্র্যাঙ্ক ভাবলেন। “আহা, যদি ওর একটা বাচ্চা-টাচ্চা থাকত – ”

বাচ্চার কথাটা মনে হতেই ওঁর মুখে হাসি ফুটল। একটা বাচ্চার কথা আজকাল ওঁর প্রায়ই মনে হয়। স্কারলেট অবশ্য সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে বাচ্চা ও চায় না, কিন্তু বাচ্চা চাওয়া না চাওয়া কি কারও মর্জির ওপর নির্ভর করে। অনেক মেয়েই বলে থাকে যে তার বাচ্চা চাই না, ফ্র্যাঙ্ক মনে করেন সে নেহাতই ভয় থেকে, বোকামি থেকে। স্কারলেটের একটা বাচ্চা যদি হয়, ও খুশিই হবে, আর অন্যান্য মেয়েদের মত ঘরে থেকেই সেই বাচ্চার যত্ন নেবে। তখন মিলটা বিক্রি করে ফেলতে ও বাধ্য হবে, ফলে সব সমস্যারও ইতি হবে। পরিপূর্ণ সুখী হওয়ার জন্য প্রত্যেক মেয়েরই বাচ্চা থাকাটা জরুরি। আর স্কারলেট যে ঠিক সুখী নয়, সেটা তো ফ্র্যাঙ্ক বুঝতেই পারেন। মহিলাদের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ হলেও, ফ্র্যাঙ্ক বুঝতে পারেন যে স্কারলেট মাঝে মধ্যে অসুখী হয়ে পড়ে।

কখনো কখনো রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে স্কারলেটের ফোঁপানোর শব্দ শুনতে পান, বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে ও। প্রথমবার যে রাতে খাটের ঝাঁকানিতে ঘুম ভেঙ্গে ওকে ফোঁপাতে দেখেন, ওকে জাগিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, “কী হয়েছে তোমার, সোনা?” স্কারলেট হাউ হাউ করে কেঁদে উঠে ঝাঁঝিয়ে বলেছিল, “আমাকে একটু একা থাকতে দাও, দয়া করে!”

ঠিকই, ওর খুশির জন্যেই একটা বাচ্চা আসার খুব দরকার, তাহলেই ফালতু ব্যাপারে ওর মাথা গলানোটা বন্ধ হবে। মাঝে মাঝে ফ্র্যাঙ্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবেন, উনি পুষেছেন গরম দেশের ঝলমলে একটা পাখি, অথচ কালো সুরেলা একটা কোকিল হলেই ওঁর চলে যেত। চলত না, দৌড়ত।

টীকাঃ

১ কেইন – বাইবেলের ‘বুক অফ জেনেসিস’-এর একটি চরিত্র। কেইন আর অ্যাবেল  ছিলেন অ্যাডাম আর ইভ-এর প্রথম দুই সন্তান। কেইন একজন কৃষক ছিলেন আর অ্যাবেল মেষপালক। ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে এঁরা দুজনেই নিজের নিজের পণ্য উৎসর্গ করেছিলেন। কেইনের উৎসর্গীকৃত পণ্যের তুলনায় অ্যাবেলের পণ্য ঈশ্বরের বেশি পছন্দ হয়েছিল। কেইন ঈর্ষাগ্রস্ত হয়ে অ্যাবেলকে হত্যা করেন। ঈশ্বর তাঁকে যাযাবরবৃত্তির সাজা দেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ