অন্যান্য সাধারণ দিনের মতোই এক দিন শহরটার উপকণ্ঠে গজিয়ে উঠল কারখানাটা। তার চিমনি থেকে গলগল করে বেরোতে থাকল ঘন কালো ধোঁয়া।
শহরের বাসিন্দারা একজায়াগায় হলে কথাবার্তা হতে থাকল এইরকম –
“হে ভগবান! কি হচ্ছে বলো দিকি ওখানে?’
“মনে হচ্ছে কারখানাই হবে ওটা। দেখছ না কতো ধোঁয়া বার করছে চিমনিটা!”
“বেশ, তাই না হয় হলো। কিন্তু কারখানাটা কিসের?”
“আরে, আমিও তো সেটাই ভাবছি”।
এ জাতীয় কথোপকথনের পর, একদিন কয়েকজন গুটিগুটি গেল সেই চত্বরে। বেড়ার ছোট্ট ফাঁকটা দিয়ে একজন উঁকি দিল চুপি চুপি।
“ওই ঠং ঠনাঠন আওয়াজটা কিসের হে?”
“ওই মেশিনটারই আওয়াজ মনে হয়। একটা বিরাট কালো মেশিন গো। গোল গোল ঘুরেই যাচ্ছে। কিন্তু তৈরিটা কী করছে?”
“নেমে এসো তো বাপু। আমায় একটু দেখতে দাও দিকি। হুঁ, এটা একটা মেশিন ঠিকই। আর বিশাল বড়োও বটে। ওহো! কিছু লোক কাজ করছে দেখছি”।
“কেমনধারা লোক?”
“সব মিলিয়ে তিনজন। বয়স্ক লোকটা বাবাই হবে। আর কমবয়েসী দুজন তার ছেলে নিশ্চয়ই”।
“হুমম। তার মানে একটা গোটা পরিবার”।
“সারা গায়ে তেলকালি মাখা। প্রাণপণ কাজ করছে ওরা”।
“কী তৈরি করছে বুঝতে পারলে?”
“উঁহু”।
এর পরের ফল এই হলো যে,কারখানার খবরটা সেদিনই মুখে মুখে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। মায়ের দল, কেনাকাটা ছেড়ে, বাবারা পার্কে ঘুরতে ঘুরতে, ভাইবোনেরা চায়ের দোকানে ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে – এই এক আলোচনাতেই মেতে রইলো।
“থালা বাসন - সেটাই হবে নিশ্চয়। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করো, তাহলে বলি। আমাদের শহরে এটা যোগান বেশ কম। জানোই তো তোমরা”।
“উঁহু, আমি কাস্তে আর নিড়ানির কথা ভাবছি। এই জাতীয় যন্তরগুলো প্রায় প্রতি বছরই খারাপ হয়ে যায়। বাগানের জন্য কিনতেই হয় প্রতিবার”।
“আমার মনে হয় ওটা রুটি তৈরির কারখানা। আমাদের একজন রুটিওয়ালা আছে বটে, কিন্তু পাউরুটি বানাতে দিন কাবার করে দেয়”।
পাউরুটিওয়ালার মত অবশ্য আলাদা – “না,না। রুটি নয়। ওটা নির্ঘাত কয়লার গুল তৈরি করছে। পাউরুটি তৈরি করতে এত ধোঁয়া বেরোয় না মোটেই”।
গুলওয়ালা সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ জানায় – “মোটেও গুল নয়। গন্ধটা একদমই গুল তৈরির নয়। ওটা হল গিয়ে ইট তৈরির কারখানা”।
“কাোনোমতেই ইট নয়” - ইটভাঁটার মালিক রাগে লাল হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। – “ওদের বাজারে ঢুকতে দিলে আমার বারোটা বেজে যাবে। কিছুতেই ইট হতে পারে না। হয়তো ওরা কাচের জিনিস বানাচ্ছে। ধরো গে, বোতল, গেলাস ...”
আলোচনা চলতেই থাকে। দিনের পর দিন পেরিয়ে যায়, কিন্তু কারখানা থেকে কোনো জিনিস তৈরি হয়ে বেরোয় না। এমন নয় যে, কারখানার লোকগুলো আলসে। বিরাট চিমনিটা দিয়ে গলগলিয়ে ধোঁয়া বেরোতেই থাকে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, তিন বাপব্যাটায় তেলকালিতে চুব্বুর হযে পাগলের মতো কাজ করে যাচ্ছে। ওই জায়গাটা যখনই পার হবে অবিশ্রান্ত মেশিনের ঠং ঠনাঠন আওয়াজ শুনতে পাবেই।
শহরের লোকগুলো বেড়ার ফাঁক দিয়ে যখনই উঁকি দেয়, আবাক বিস্ময়ে একটা কথাই বলে - “লোকগুলো বিশ্রাম করে কখন?”
“কী অসম্ভব পরিশ্রমী লোকজন সব!”
“জীবনেও কাউকে এতো কাজ করতে দেখিনি!”
“আমার ছেলেটাকে ডেকে এনে দেখাতে হয়!”
“আমার কর্তাটিকে বলবো, যাও একবার দেখে এসো গিয়ে। দেখে শেখ!”
এই শহরের মানুষজন কাজের চেয়ে আরাম করতে বেশি পছন্দ করে। আর করবে নাই বা কেন? তাদের উর্বর ক্ষেতে ফসল আপনি গজায়। তারা যত খেতে পারে, সমুদ্র তার চেয়ে অনেক বেশি মাছের যোগান দেয়। তুমি ইচ্ছে করলে খেটেখুটে অনেক পয়সা কামাতে পারো ঠিকই, কিন্তু খরচা করার মতো কিছু নেই এই শহরে।
কারখানাটা হবার পর, লোকজনের জীবন সম্বন্ধে ধারণা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। চিমনি থেকে সমানে বের হওয়া কালো ধোঁয়া, ক্রমশঃ সবাইকে ভারি বিচলিত করে তুলল। পাহড়ের ওপর থেকে শহরটাকে দেখলে মনে হতো সবুজ চাদর মুড়ি দিয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে বুঝি। আর ওই গাট্টাগোট্টা কারখানাটাকে মনে হয় এক কয়লার ইঞ্জিন – ধোঁয়া ছড়িয়ে ভটভট আওয়াজ করে মাঠ চিরে চলে যাচ্ছে!
“একেই বলে সাহসী!” – ছেলের দল ওপর থেকে দেখে বলাবলি করে।
“শক্তিশালী বলতে যা বোঝায়”- আরেকজনের চটজলদি উত্তর।
ইতিমধ্যে মা আর দিদির দল তাদের পিছনে হাত ধুয়ে পড়ে –
“জানিস, সাতটা বাজতে না বাজতেই কারখানা চালু হয়ে যায়?”
“সারাদিনে মাত্র দশ মিনিটের বিরতি”।
“অন্ধকার হবার পরেও কেমন আলো জ্বেলে কাজ করে ওরা!”
ছেলের দল নিজেদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করে। চেষ্টা করে ভোর ভোর উঠে পড়তে বা দেরি করে ঘুমোতে যেতে। কিন্তু তারপরেও তাদের হাতে করার মতো কিছু থাকে না। তার শহরে ব্যস্ত হয়ে ঘোরাঘুরির ভান করে। শেষে কারখানার বেড়ার ধারে থিতু হয়। পালা করে ফুটোয় চোখ রাখে, হিংসে মেশানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“ওদের চোখগুলো কী উজ্জ্বল, না রে?”
“দেখ কেমন ঘামছে। মুছে নেবার সময়টুকুও নেই!”
“হাতের কী জোর রে! অত ভারি হাতুড়িটা কেমন পালকের মতো উঠিয়ে নিল!”
কারখানা চলতেই থাকল। তবু কোনো জিনিস তৈরি হয়ে বাজারে এল না।
“ওরা কিন্তু কাজ করেই যাচ্ছে। কোনো দু্র্দান্ত জিনিস তৈরি করছে নিশ্চয়!”
“নিশ্চয়ই তাই। বিশাল মেশিনটা তো দেখ!”
শহরের লোকজনের কল্পনায় কারখানার উৎপাদন নানা আকার পেল। তার অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে কারখানার তৈরি জিনিস কেনার জন্য মনে মনে প্রস্তুত হলো।
“তবুও, তোমাদের মনে হচ্ছে না যে, চিমনিটা একটু বেশিই ধোঁয়া ছড়াচ্ছে?”
“ঠিকই বলেছ হে। আকাশটা কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে গেল!”
কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া বেরোতেই থাকল। শহরে ঘননীল আকাশের রঙ এখন ধূসর।
“বেচারিরা কীই বা করবে। অতবড় মেশিন!”
“আমি এটুকুই বলতে পারি ওরা প্রাণপণে যত তাড়াতাড়ি পারে জিনিসগুলো তৈরি করে ফেলার চেষ্টায় আছে”।
“ভালো কিছুই তৈরি করছে নিশ্চয়”।
“সে তো একশোবার”।
এক সকালে, যে ছেলেটি অনেকটা ভোরে উঠেছিল, বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চিলচিৎকার জুড়ল –
“দেখ সবাই! কারখানায় আজ দুটো চিমনি!”
যারা শুনতে পেল, তার চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এল। কারখানাটার ওপর সত্যিই দুটো বিশাল ধোঁয়ার স্তম্ভ ভোরের আকাশ কালো করে দিয়েছে! অলসগতিতে সেই ধোঁয়ার জাল শহরের ওপর একটা ভারি আস্তরণ তৈরি করছে। সেই ধোঁয়ায় কালো কুচির দল চিকচিক করছে।
“দারুণ ব্যাপার!”
“এই ধোঁয়া আমার ভিতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলছে”।
“নিশ্চয়ই ওরা উৎপাদনের শেষ পর্যায়ে পৌঁচেছে। তাই আরেকটা যন্ত্র এনেছে। ওরা তো জানে, আমরা কতটা আগ্রহে অপেক্ষা করছি, জিনিসগুলো দেখব বলে। তাই ওরাও তাড়াতাড়ি করছে”।
“কিন্তু, কী তৈরি হচ্ছে বলোতো?”
“চমকপ্রদ কিছু নিশ্চয়। এমন কিছু, যা আমাদের সত্যিকারের কাজে লাগবে”।
“মনে হয়, ঠিকই বলছ’।
এরপর থেকে প্রতিদিন দুটো চিমনি থেকে নিয়মিত ধোঁয়া বের হতে থাকল। এত পরিমাণে, যে লোকজনের চোখ খুলে চলাই মুসকিল। তাদের গলা ধরে গেল। মিনিটে মিনিটে কাশি। ধুয়ে শুকোতে দেওয়া কাপড়, পরণের জামা, এমনকি তাদের মুখ চোখও গুঁড়ো কয়লায় কালো হয়ে যেতে থাকল। তবুও তারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিল সেই জিনিসটার জন্য, যা সত্যিকারে বিশেষ কাজে লাগবে।
শেষ একদিন, অবশেষে তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। আর সহ্য করা যাচ্ছিল না। সকলে মিলে দল বেঁধে শহরের মেয়রের কাছে হাজির হলো।
“বুঝতে পারছি না, কী করা উচিত। দিন দিন ধোঁয়া খুব খারাপ হয়ে উঠছে। এই পরিশ্রমী মানুষগুলোর বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে খারাপ লাগছে, কিন্থু ওদের একবার জিজ্ঞাসা করা যায় না যে, ওরা কী বানাচ্ছে আর কতদিন লাগবে শেষ হতে?”
“আপনাদের বক্তব্য বুঝতে পারছি। যদি ওরা সত্যিই ভালো কিছু বানায়, তাহলে আরো কিছুদিন সহ্য করা যেতে পারে। তবু... ঠিক আছে চলুন গিয়ে দেখি, ওদের বক্তব্য কী’।
কাশতে কাশতে, আর হাত দিয়ে ধোঁয়া সরাতে সরাতে, মেয়রের নেতৃত্বে শহরের লোকেরা দল বেঁধে কারখানার দিকে রওনা দিল।
“কারখানার ভদ্রমহোদয়গণ, একটু শুনবেন?”
কারখানার প্রধান উজ্জ্বল হাসিমুখে বের হয়ে এলেন। তাঁর সারা গায়ে মুখে কালির প্রলেপ।
“আরে! মেয়র মশাই যে! আর শহরের ভদ্রজনেরাও এসেছেন দেখছি। কী ব্যাপার বলুন তো?”
“দেখুন, ব্যাপারটা হলো গিয়ে, এই শহরের মানুষজন জানতে চায়, আপনার কারখানায় উৎপাদিত দ্রব্য কবে পাওয়া যাবে?”
“তাই নাকি? আপনাদের জন্য তাহলে সুখবর আছে। অবশেষে জিনিসটি তৈরি হয়েছে”।
উল্লসিত ধ্বনির সঙ্গে কারখানার মালিকের পিছু পিছু শহরবাসীরা ভিতরে যায়। মালিক এবং তার ছেলেরা তাদের হাসিমুখে অভ্যর্থনা করল।
“এই দেখুন!”
তিনি আঙুল তুলে ঝলমলে ছোট মেশিনটির দিকে ইঙ্গিত করেন। বড় মেশিনের পাশে এটিকে শহরবাসী ফোকর দিয়ে আগেই দেখেছিল। মুক্তোর মতো ছোট দানার জিনিসগুলো একটি ফানেলের মতো আধারে টুপটুপিয়ে পড়ছে।
মালিকটি মেয়রের হাতে একটি দানা তুলে দিলেন। মেয়র তাঁর হাতের দিকে চেয়ে রইলেন।
“হুমম, কী এটা?”
“মুখে দিয়েই দেখুন। এটা কাশির সারাবার বড়ি”।
“কাশির বড়ি?”
শহরবাসীরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল আর একবার। কাশতে কাশতে তাদের এমন অবস্থা হয়েছে যে, এখন নিঃশ্বাস নিতেও তাদের কষ্ট হয়।
“অবশ্যই ভদ্রমহোদয় এবং মহোদয়াগণ, আমরা কাশির বড়ি তৈরি করি। একটু দাম বেশি বটে, কিন্তু ভীষণ কাজের”।
“তার মানে, আপনি সত্যিই একটি দারুণ জিনিস বানিয়েছেন”।
“হ্যাঁ, আর এখন এটি আপনাদের এখন খুবই দরকার’।
“আমি এক্ষুণি একটা নেব”।
হাসিমুখে মালিক আর দুই ছেলে বড়িগুলো হাতে মেলে ধরল। শহরের মানুষজন সাগ্রহে কিনতে থাকল। ওই কারখানার মধ্যেই। এই সময় মেয়র একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন করে বসলেন –
“মাপ করবেন কারখানার প্রধান মহাশয়, আমি এটুকু বুঝলাম যে ছোট মেশিনটি কাশির বড়ি তৈরি করে। কিন্তু এই বড় মেশিনটার কাজ কী? এটা নিশ্চয়ই আরও ভালো কিছু তৈরি করে? আমরা দুটো ধোঁয়ার স্তম্ভ দেখতে পাই তো”।
“ওহো, ওইটা?” জবাব দিলেন প্রধান মহাশয়। তাঁর মুখ তখনো হাসিতে উদ্ভাসিত – “ওটা তো কিছু তৈরি করে না”।
“কিচ্ছু না?”
“উঁহু, শুধুই ধোঁয়া। দেখুন, আমাদের দ্বিতীয় মেশিনটা তৈরি করতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল। তবে ঠিকভাবে ভাবলে বুঝতে পারবেন, একটার চেয়ে দুটো মেশিন অনেক বেশি ধোঁয়া ওগলাতে পারে”।
(ইংরেজি অনুবাদঃ ফ্যাকট্রি টাউন, অনুবাদঃ রবার্ট টাইলার)
লেখক পরিচিতিঃ
বেৎসুয়াকু মিনোরু (১৯৩৭-২০২০) যুদ্ধোত্তর জাপানের একজন অন্যতম নাট্যকার, ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক। উনি জাপানের গুপ্ত (আঙ্গুরা) নাট্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওঁর লেখায় যুদ্ধোত্তর জাপানের পরিস্থিতি এবং পারমাণবিক হলোকস্ট প্রসঙ্গে বারবার উঠে এসেছে।


0 মন্তব্যসমূহ