দেবর্ষি সারগীর গল্প : স্বপ্নভ্রমণ



স্বপ্নটার কথা ঠাকুর্দা রোজ এতবার বলতে থাকে যে আস্তে আস্তে ঠাকুর্দাকেই আমার কোনও স্বপ্নজগতের লোক বলে মনে হতে লাগল। যেন ঠাকুর্দা নয়, ঠাকুর্দাকে নিয়ে আমি কোনও স্বপ্ন দেখছি। আমার বয়স কুড়ি । কিন্তু তিয়াত্তর বছরের ঠাকুর্দা আমাকেই সব থেকে বড় বন্ধু বলে মনে করে। ঠাকুমা মারা গিয়েছে আড়াই বছর আগে। বাবা, জ্যাঠা ও কাকাদের নিয়ে আমরা একটা বড় যৌথ পরিবার। কয়েকবার ইউরোপ ঘুরে আসা এবং প্রচুর অর্থ রোজগার করা ঠাকুর্দাকে সবাই সমীহ করে। কিন্তু ঠাকুমার মৃত্যুর পর থেকে ঠাকুর্দা যেন পাল্টে গেল ৷ তারপর থেকে একা থাকা বেশি পছন্দ করে। নিজের ঘরে আরামকেদারায় বসে সাদাকালো চৌকো নকশার মেঝেয় পা রেখে একমনে চিন্তা করে। অনেক রাত পর্যন্ত নানারকম বই পড়ে। ঠাকুর্দার মতে এক একটা বই এক একটা মৃত মানুষ, যাকে ছুঁলেই নিঃশব্দে কথা বলতে শুরু করে ।

ঠাকুর্দার ঘরের আসবাব ও সাজসজ্জা বিদেশীদের মতো। দেওয়ালে প্রাচীন কাঠের উঁচু উঁচু ক্যাবিনেট ও প্রচুর ছবি। তিনটে কাঠের মুখোশ, যা তানজিনিয়া থেকে আনা। ঘরটা আমার খুব পছন্দ বলে ঠাকুর্দা সবাইকে বলে রেখেছে তার মৃত্যুর পর ঘরটা যেন আমাকে দেওয়া হয়। প্রথম যেদিন কথাটা বলেছিল, ভিজে চোখে হাসতে হাসতে আমি বলেছিলাম, 'আমি তোমার ঘর নয়, তোমাকে চাই।” ঠাকুর্দাও হেসেছিল। তারপর লম্বা লম্বা কালো শিক বসানো জানলার ভেতর দিয়ে বর্ষার মেঘের দিকে তাকিয়েছিল।

আজকাল আমি ঠাকুর্দার ঘরেই রাতে ঘুমোই। অনেক রাত পর্যন্ত দুজনে গল্প করি। ঠাকুর্দার মুখ থেকে দেশ-বিদেশের নানা গল্প শুনি। গম্ভীর, পুরুষালি গলায়। আমাদের বাড়ির সকলের চেয়ে ঠাকুর্দার শরীরস্বাস্থ্য ভাল। বিদেশী বৃদ্ধদের মতো। তবে কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে যায়। কারণ তখন স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে। তার চোখমুখ তখন পাল্টে যায়, কেমন কোমল, আনমনা হয়ে ওঠে, যেন এক্ষুনি কোনও পরাজয়ের সংবাদ শুনেছে বা

কোনও মূল্যবান কিছু হারিয়ে ফেলেছে। ঠাকুর্দাকে তখন দেখায় মরুভূমিতে থাকা কোনও দীর্ঘকায় মানুষের মতো। হাতে লাঠি। গায়ে হাঁটু পর্যন্ত কম্বল জড়ানো। তখন আমার মনে হয় ঠাকুর্দাকে নিয়ে আমিই যেন কোনও স্বপ্ন দেখছি।

'কাউকে বলিসনি তো?” উদ্বিগ্ন মুখে আমাকে জিজ্ঞেস করে।

আমি মাথা নাড়ালাম ।

'বলিস না। তা হলে ওরা আমাকে যেতে দেবে না।'

ঘরে রাত বারোটার স্তব্ধতা। শহরতলির আমাদের এই বাড়িটার সামনে প্রচুর গাছপালা দাঁড়িয়ে। মার্চের শুরু। একটা কোকিল ডেকে উঠল।

'গতকালও স্বপ্নটা দেখলাম,' জানলার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ঠাকুর্দা বলল। 'এবং আমি জানি আজ রাতেও দেখব। আমি যে ইচ্ছে করে দেখছি তা নয়, কারণ ইচ্ছেমতো স্বপ্ন দেখতে পারে শুধু দেবতারাই। আমার বেলায় স্বপ্নটাই ইচ্ছে করে বারবার আসছে।

স্বপ্নটা এই : আমাদের বাড়ির পেছনে যে দীর্ঘ নদী বয়ে গিয়েছে সেটা দিয়ে একটা নৌকো করে ঠাকুর্দা চলেছে। অনেক দূর যাওয়ার পর একটা গভীর জঙ্গল আসে। ওই জঙ্গলে আছে কিছু প্রাচীন গোলাকার বাড়ি, যাদের দরজাগুলো ঠাকুর্দা কখনওই স্পষ্ট করে স্বপ্নে দেখতে পায়নি। হয়ত, ঠাকুর্দা মন্তব্য করে, ওই বাড়িগুলো দরজা ছাড়াই। আমাদের খুলির মতো, যার ভেতর গোটা জগতই বাস করে, অথচ ভেতরে ঢোকার কোনও দরজা নেই। আর আছে আকাশছোঁয়া ভাঙা স্তম্ভ, যাদের মাথায় এক সময় ছাদ ছিল। কিন্ত স্তম্ভগুলো নিজেরাই এত আকর্ষক ও অর্থপূর্ণ যে ছাদের অভাব চোখেই পড়ে না। একটা অতলান্ত কুয়ো। ওটার ভেতরের আংটাগুলো দিয়ে অনন্তকাল নেমে গেলেও কুয়োটার জল স্পর্শ করা যায় না।

ঠাকুর্দা বলে ওখানে গেলে অদ্ভুত আনন্দ লাভ করবে। জীবনে আর কোনও কাজেই বা কোনও সাফল্যেই নাকি ওরকম আনন্দ পাওয়া যায় না। এ কারণেই আনন্দটা অদ্ভুত। বাকি জীবন ঠাকুর্দা ওখানেই থাকতে চায়। তার অনুরোধ, আমি যেন নৌকো করে তাকে সেখানে রেখে আসি। এবং কাউকেই কিছু না বলি। সবাই ভাববে ঠাকুর্দা হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে। আমাকে সঙ্গে যেতে বলার আর একটা কারণ হল, জায়গাটা চিনে রাখলে আমি মাঝেমাঝে সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে আসতে পারি।

‘ঠাকুমা নেই বলেই তোমার এরকম মনে হয়,' আমি বললাম। আগেও কথাটা বলেছি। ‘ঠাকুমাকে তুমি খুব ভালবাসতে।'

“বাসতাম,’ অনেকক্ষণ পরে ঠাকুর্দা বলে। 'এবং বেঁচে থাকলে তাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতাম। ভাল আমি সবাইকে বাসি। ঘেন্না করার মধ্যে সুখ পাইনি বলে আমি কাউকেই ঘেন্না করি না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ক্ষণ তৃপ্তিতে কাটানোর জন্য। জগতে জীবন যিনি সৃষ্টি করেছেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জীবন সৃষ্টি করার সময় ওটাই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। নইলে খামোখা প্রাণসৃষ্টির মতো উদ্ভট ও নিষ্ঠুর কাজ আর হতে পারে না। ফলে আমিও যথাসম্ভব তৃপ্তিতে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু একটু অশান্ত হয়ে গেলাম এখন - - জীবনের উপান্তে। নৌকো করে ওই জঙ্গলে গিয়ে অদ্ভুত আনন্দটা পাওয়ার লোভ আমার সুখ ও তৃপ্তি মনে হয় কখনওই ফিরিয়ে দেবে না।'

শক্তপোক্ত ঠাকুর্দার এরকম করুণ দশা আমাকে অবাক করে দিতে লাগল । মানুষকে এই প্রথম একটা দুর্জ্ঞেয় জীব বলে মনে হল আমার। হাসিখুশি, শক্তিশালী মনের অধিকারী মানুষটা কোনও দুঃখে ভেঙে পড়েনি। কাহিল হয়েছে কোনও অদ্ভুত আনন্দ পাওয়ার আকাঙক্ষায় ।

এক রাতে রাজি হলাম তাকে সেখানে নিয়ে যেতে। স্বপ্ন যে বাস্তবতা সৃষ্টি করে, বাস্তবে সেটা পাওয়া যায় না। আমি জানতাম ঠাকুর্দা কখনওই ওই জঙ্গল খুঁজে পাবে না। ফলে কোনও অদ্ভুত আনন্দও। তবু তাকে নিয়ে যাওয়া দরকার, যাতে স্বপ্নের মরীচিকা থেকে মুক্ত হয়ে আবার আগের মতো বাঁচতে পারে। কতদিন ঠাকুর্দাকে আগের মতো পাইনি। কতদিন তার সঙ্গে প্রাতঃভ্রমণে বেরোইনি। হাঁটার জন্য রোজ নতুন নতুন জায়গা বেছে নিত। হাঁটতে হাঁটতে কোনও মহীরূহ চোখে পড়লে দাঁড়িয়ে বলত, 'গাছটার ঠান্ডা, অন্ধকার স্নায়ুর ভেতর একটু শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।' আমাদের বাড়ির পেছনেই দীর্ঘ নদী। আমি সাঁতার জানি। নৌকো চালাতেও। রাত পৌনে একটার সময় কাউকে কিছু না বলে চুপিচুপি আমরা নেমে গেলাম ভারি, পাথুরে সিঁড়ি দিয়ে। একটা কোকিল ডাকছিল।

প্রকাণ্ড বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ঠাকুর্দা একপলক তাকাল। দু-চোখে কাতরতা। তারপর নিচু গলায় বলল, 'বাড়িটার নকশা করিয়েছিলাম যে ফরাসি স্থপতিকে দিয়ে, গতবছর সে মারা গিয়েছে। তোকে বলেছিলাম মনে হয়।'

এরপর হেসে ফেলল। মুখে অধীর প্রসন্নতা। আমার হাত ধরে বন্ধুর মতো হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘আমার ঘরটায় কিন্তু তুই থাকবি। আমি সবাইকে বলে রেখেছি।'

এই প্রথম কেমন একটা ভয় আমাকে হঠাৎ গ্রাস করল।

পাড়ে তিনটে নৌকো। মাঝিরা নেই। একটা নৌকোয় উঠে দড়ির বাঁধন খুলে দিলাম। এবং নৌকোটা যেন খাঁচা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসা পাখির মতো ভেসে গেল। লগি দিয়ে ঠেলতেই হল না।

আমরা এগোতে থাকলাম । ক্রমশ গাঢ়তর ঘুমের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো করে। আকাশে চাঁদ ছিল না। নক্ষত্রের আলোরা জল দেখাচ্ছিল। দু-পাশের দৃশ্যের দিকে ঠাকুর্দা অধীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এক সময় ঘরবাড়ি মিলিয়ে গেল। মাঠ এল। শস্যের খেত এল। এবং ভোরের দিকে একটা জঙ্গল। আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। কিন্তু ঠাকুর্দার মুখে হাসি।

‘এটাই সেই জঙ্গল,’ ঠাকুর্দা বলল। 'নৌকো ভেড়া।

নৌকো থেকে নেমে আমরা জঙ্গলে ঢুকলাম। আলো ফুটে উঠছিল। হৃদয়ের গভীরে কাটা কোনও দাগের মতো করে একটা সরু, সাদা রাস্তা চলে গিয়েছে ভেতরে। বুঝলাম এর আগেও লোকেরা এখানে এসেছে। গাছপালার ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় কয়েকটা বড় বড় পাখি ঘন পল্লবের আড়ালে বসে গভীর স্বরে ডাকতে লাগল। পাখির এরকম কন্ঠস্বর এর আগে আমি শুনিনি। ঠাকুর্দা আমার হাত ধরে এগিয়ে যেতে থাকে। তার চোখেমুখে বিস্ময় আর আচ্ছন্নতার অদ্ভুত মিশ্রণ। জঙ্গলটা শেষ হওয়ার পর এল ফাঁকা জায়গা, যা দেখতে কোনও লুপ্ত নগরীর মতো। ঠাকুর্দার স্বপ্নে দেখা দরজাহীন গোলাকার বাড়িগুলো ছিল । এবং এদিক-ওদিক দাঁড়িয়ে আকাশছোঁয়া স্তম্ভ, যারা এক সময় মাথার ওপর ছাদের ওজন ধারণ করত। আর ছিল একটা কুয়োও, যার ভেতরে আংটাগুলো সিঁড়ির মতো করে নিচে নেমে গিয়েছে সীমাহীনভাবে। ঠাকুর্দার স্বপ্নে উঁকি মারেনি(কিংবা মেরেছে কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর ঠাকুর্দা ওদের ভুলে গিয়েছে, যেভাবে আমরা আমাদের শৈশবের মুখ ভুলে যাই), এমন অনেক জিনিসও এখানে আছে। নানা আকৃতি ও নকশার অজস্র আধভাঙা বাড়ি। স্থাপত্যকলায় পারদর্শী ঠাকুর্দা সেগুলো সম্পর্কে অস্ফুটস্বরে আমার কাছে ব্যাখ্যা করতে লাগল। বোঝাল যে নানা যুগ ও দেশের অবিনশ্বর স্থাপত্যরীতির মিশ্রণে এই নগরীটা তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি, মাকড়সার জাল, পানপাতা ও গুহাও যেন এদের স্থাপত্য শিখিয়েছিল।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা দেখলাম গথিক স্তম্ভ, রোমানেস্ক খিলান, গুপ্তযুগের নকশা, আফগানিস্থানের স্থাপত্য, বৌদ্ধ বাড়ি, মিশরীয় পিরামিডের ত্রিভুজ। ঠাকুর্দা মন্তব্য করল উঁচু উঁচু স্তম্ভকে এখানকার লোকেরা বিশেষ গুরুত্ব দিত। তারা হয়ত ভাবত পরপর দাঁড়ানো প্রকাণ্ড স্তম্ভের সমাবেশ ছাড়া একটা বাড়িকে দেখায় যেন মাটি থেকে গজানো ইট পাথর ও কাদার একটা পিশু । এ ছাড়া স্তম্ভ সততই মনে আনে আকাশের কথা, আর আকাশ ঈশ্বরের কথা। স্তম্ভ ছাড়া আর যাকে এরা গুরুত্ব দিয়েছিল তা সিঁড়ি, যার গুরুত্ব প্রায় স্তম্ভের মতোই। বা তার চেয়েও বেশি, কারণ সিঁড়ি শুধু ওপরের দিকেই নিয়ে যায় না, এটা নিচে নামতেও সাহায্য করে ৷ আচ্ছন্ন, প্রায় স্বগতোক্তির গলায় ঠাকুর্দা উল্লেখ করল সেই কোনও আদিম মানবগোষ্ঠীর মতবাদের কথা, যারা বলত নিজের ভেতর একটা সিঁড়ির অস্তিত্ব বা অনস্তিত্বই ঈশ্বরদ্রষ্টার সঙ্গে সাধারণ মানুষের তফাতটা সূচিত করে। ঈশ্বরদ্রষ্টার বুকের ভেতর নিচে নামার জন্য একটা সীমাহীন সিঁড়ি আছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অনাবিষ্কৃত। যা লক্ষ্য করার মতো, এখানকার সিঁড়িগুলো পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে কোনও একটা সিঁড়ি দিয়ে যে কোনও আর একটা সিঁড়িতে ওঠা বা নামা যায়। কিছু সিঁড়ি সরাসরি রাস্তা থেকে উঠে বাড়ির ভেতর গিয়েছে। এবং পরস্পরের সঙ্গে মিশেছে বৃক্ষের কাণ্ড থেকে ছড়ানো ডালপালার মতো। রাস্তাগুলোও এঁকেবেঁকে যাওয়া নানা অলিগলির সমষ্টি। ঠাকুর্দা মন্তব্য করল নগরীটার পরিকল্পনার মধ্যে যেন একটাই কেন্দ্রীয় ভাবনা কাজ করেছিল। সেটা হল, স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে তারা ব্রহ্মাণ্ডেরই নানা বৈচিত্র্য, রহস্য ও জটিলতার একটু আভাস দেবে যাতে, এখানে থাকা মানুষদের ভেতর সব সময় এই বোধ জাগ্রত থাকে যে তারা আসলে ব্রহ্মাণ্ডেরই অধিবাসী। কোনও একটা সংক্ষিপ্ত বা বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের নয়। আর এখানকার বাড়িগুলোর ভারি, অনড় দেওয়াল, উঁচু সিলিঙ বা প্রশস্ত ছায়াময় উঠোন মনের ভেতর জাগায় নিশ্চিন্ততা, এমনকি অবিনশ্বরতার অনুভব। ওরা যেন আমাদের সময়চেতনা স্তব্ধ করে দেয়।

আমরা আরও এগিয়ে যেতে লাগলাম। কোনও লোকজন তখনও চোখে পড়েনি। এক জায়গায় একটা গাভী ঘাস চিবোচ্ছিল। কাছে গিয়ে ঠাকুর্দা ওটার গলকম্বলে হাত বোলাল। এবং অনেক দূরে, উঁচুনিচু টিবির মতো জায়গায়, একজোড়া বাঘকে দেখলাম ছোটাছুটি করে পরস্পরের সঙ্গে খেলছে। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমার হাত ধরে ঠাকুর্দা সামনের দিকে হাঁটতে লাগল । একটা বড় হলঘরের বাড়ি চোখে পড়তে আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। দরজা খোলাই ছিল ।

ভেতরে ঢুকে দেখি বেশ কিছু মানুষের মূর্তি, যারা নানা ভঙ্গিতে বসে আছে। ওগুলো পাথর ও ব্রোঞ্জের। একটা মূর্তি কালো পোড়া কাঠের। প্রত্যেকেই বসে আছে; মুখ প্রায় হাঁটুর কাছে নামিয়ে, কিংবা পেছনে বাঁকিয়ে সিলিঙের দিকে তুলে, কিংবা বাঁ-দিকে কাত করে বা ডানদিকে। কেউ কেউ বসে একেবারে সোজা ভঙ্গিতে। কারও কারও পাদুটো সামনে প্রসারিত। প্রত্যেকেরই চোখ বোজা ৷ কিন্তু সারা মুখে যেন স্তব্ধ হয়ে আছে আশ্চর্য আনন্দ। এবং মুখগুলো সব একইরকম দেখতে, যেন একটাই মানুষ নানা ভঙ্গিতে বসে আছে।

“এদের দেখাবে বলেই হয়ত আমার স্বপ্ন আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে,' ঠাকুর্দা বলল বিড়বিড় করে। দু-চোখে জলের আভাস। শরীরটা কাঁপছিল, আমি তার হাত ধরে বুঝলাম ।

ঘরটায় ঠাকুর্দা বসল। আমিও। বুঝতে পারলাম ঠাকুর্দার এই মুহূর্তে কোনও কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ফলে আমিও কিছু বলছিলাম না। ঘরটায় যখন ঢুকি তখন প্রায় দুপুর। আস্তে আস্তে সূর্যের আলো নরম হয়ে এল। ঠাকুর্দা তখনও চুপ করে বসে। একবার আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। হয়ত বাঘদুটো দেখতে। বাঘদুটোকে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। দূরে তাকিয়ে দেখি একটা উঁচু ঢিবির ওপর বসে দুজনেই বিশ্রাম নিচ্ছে। যেন দু-টুকরো আগুনের শিখা শান্তভাবে জ্বলছে। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এক জায়গায় একটা জলভর্তি পাথুরে চৌবাচ্চা। মুখ নিচু করতে নিজের পরিষ্কার প্রতিবিম্ব দেখলাম। আঁজলায় তুলে জল খেলাম। পাখিরা মাঝেমাঝে ডাকছিল কিন্তু কোনও লোকজন তখনও চোখে পড়েনি। পাথুরে রাস্তার ওপর ধুলোয় ঢাকা একটা স্বর্ণমুদ্রা পড়ে থাকতে দেখলাম। ওটার স্পর্শে এতদিনে ধুলোটাও যেন হলুদ হয়ে গিয়েছে। হাতে তুলে ধুলো মুছে ওটা আবার রেখে দিলাম রাস্তার ওপরেই। মাথার ওপর নানা সিঁড়ি এদিক-ওদিক - বয়ে গিয়েছে। আমি একবার একটা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আর একটা দিয়ে নিচে নেমে এলাম। ঠান্ডা ঝিরঝিরে বাতাসে কেমন আবিষ্ট লাগছিল আমার শরীরমন। অন্ধকার হয়ে আসছিল।

ঘরটায় ফিরে এলাম কিন্তু ঠাকুর্দা সেখানে বসে নেই। তাড়াতাড়ি বাইরে এসে খুঁজলাম। কিন্তু বাইরেও নেই। আমি ডাক দিলাম, যা কোনও পাখির ডাকের মতো শোনাল। হঠাৎ ভয়ের তীব্র স্রোত বয়ে গেল আমার বুকের ভেতর। ঘরটায় আবার ঢুকলাম। হঠাৎ আমার মনে হল ঠাকুর্দাও ওই মূর্তিগুলোর ভেতরে বসে, ওদের মতোই একটা মূর্তি হয়ে গিয়ে, কারণ মূর্তির সংখ্যা যেন আগের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে। গোধূলির যে স্তব্ধ আলো ঘরটায় ঢুকেছিল তাতে ওগুলোর মধ্যে ঠাকুর্দাকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রত্যেকের মুখই একইরকম দেখতে বলে কিছু - বুঝতে পারলাম না ।

কোনও আশ্চর্য কারণে ভয় আর পাচ্ছিলাম না। তবে কান্না পাচ্ছিল। সারারাত ঘরটার অন্ধকারে বসে আমি ঠাকুর্দার কথা ভাবলাম। আমার মায়ের কথা, যাকে আমি ভালবাসি। সেই মেয়েটার কথা, যে আমাকে ভালবাসে। কিন্তু ঠাকুর্দাকে হারিয়ে আমার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল না।

সোনার স্রোতের মতো সকালের আলো ঘরটায় আছড়াল। ওই আলো মূর্তিগুলোর চোখেমুখেও। ফিরে গিয়ে বাড়ির সবাইকে সব ঘটনা বলে ঠাকুর্দাকে খুঁজতে ওদের এখানে নিয়ে আসা উচিত ভেবে নদীর দিকে হাঁটতে লাগলাম । দূর থেকে চোখে পড়ল নৌকোটা আস্তে আস্তে দুলছে।

'দাঁড়া, আমিও যাব।'

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ঠাকুর্দা ।

আমার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে গেল। ঠাকুর্দা এসে আমার হাত ধরল ।

বুঝতে পেরেছি, ঠাকুর্দা বলল, কেমন আচ্ছন্ন কন্ঠস্বরে, যেন কথা বলতে পারছে না, বা বলছে অতলান্ত কুয়োটার ভেতর থেকে। কিছু না বলে আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। ‘বুঝতে পেরেছি অদ্ভুত আনন্দটা পেতে এখানে আর না থাকলেও চলবে। ওটা বাড়িতে থেকেও পেতে পারি। বা পৃথিবীর যে কোনও জায়গায়।'

আমি কোনও প্রশ্ন করলাম না। চোখের জল মুছে হাসলাম। ঠাকুর্দাও হাসল । পরস্পরের হাত ধরে আমরা হাঁটতে থাকলাম নৌকোটার দিকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ