মৃণাল শতপথীর গল্পঃ গহন




বারো বছরের বালক জাদুকরের খোঁজ কেউ জানে না। তাঁকে শেষ দেখা গিয়েছিল চালতাবেড়া গ্রামে। শীত পড়ার সময় থেকে মকর সংক্রান্তির মেলা পর্যন্ত জঙ্গল মহালের নিখোঁজ গাঁয়ে ঘুরে তিনি ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়ান। চালতাবেড়া গ্রাম কোথায় জানা নেই। ঘুঁটবনী, তালড্যাংরা, চুয়াবনী, ডাঙাপাড়া, কুড়চিবনী…পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা ও ওড়িশা সীমান্তে বয়ে চলা সুবিশাল খাতের সুবর্ণরেখা, তার ওপারে ঘননীল হয়ে থাকা বিস্তীর্ণ অরণ্যের কোথাও। নদীর পাড় ধরে, উঁচু টিলার ঘন বনের গভীর বুকে পলাতক সব গ্রাম। খালি চোখে দেখা যায় না। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ সাত অরণ্যের মাথায় উঠলে দুর্বিপাকে চোখে পড়েও যেতে পারে গ্রামগুলির টিমটিমে আলো। উবে থাকা এই গ্রামগুলিতে ঘুরে প্রতিবছর তিনি জাদুর খেলা দেখান।

আসলে সেই জাদুকর অথবা নিখোঁজ গ্রামগুলির সন্ধানে যেতে গেলে দীর্ঘকালীন বাস যাত্রার ধকল নিতে প্রস্তুত হতে হয় আগে। সারাদিনে একটাই লড়ঝড়ে বাস, কিছু দূর অন্তর ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। দূরে কেউ ছুটে আসছে, কারও আত্মীয়জন তাকে বাসে তুলে দিতে এসে কান্নাকাটি জুড়েছে, তাদের বিরহ শোকে বাসটিও সামিল হয়ে নীরবে অপেক্ষা করে। স্থানে স্থানে লোক ওঠে, সঙ্গে পোষ্য ছাগল, ভেড়া। গায়ের উৎকট গন্ধ নিয়ে চোখ বুজে পরম আরামে পরিপাটি জামার আস্তিন চিবিয়ে যায় তারা। লাল ঝুঁটি, উজ্জ্বল রঙ পালকের মস্ত মোরগ কোলে কৃষ্ণকায় আদিবাসী যুবক। লড়াইয়ের মোরগ, তার উদ্ধত গ্রীবা, পূর্ণ ঝুঁটির ফুল, ইস্পাত ধারালো নখর আর অগ্নিবর্ষী গোলাকার চোখের অস্থিরতা বারেবারে রণহুংকার দিলে ভেতর শিরশির করে ওঠে। আসলে কোথায় যেতে হবে তো জানা নেই। টিকিট চাইতে এসে পান খাওয়া দাঁতে হাসে কন্ডাক্টর, বাবু কুনঠি যাবন? জানা নাই? ভাস্কর পন্ডিতের ঘাট বেলে ঘুরি আসন!

রাস্তা সেখানে দু’পাশের ঘন বন নিয়ে শীর্ণ, সর্পিল, খানাখন্দে ভরা, বর্ষায় জল জমে থাকে গোষ্পদের মতো। টিলাপথের চড়াই-উতরাই। পাতালের দিকে নেমে যাওয়ার সময় যেভাবে বুক খালি বাতাস উধাও হয়, মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর দিকে দেহ ছুটে গেলে যে আকুলিবিকুলি। আবার খাড়াই। মাঝপথে বাসের স্টার্ট বন্ধ হয়ে পেছন দিকে হড়কে নামতে থাকলে অস্ফুট আর্ত স্বর গলা তেড়ে বেরোতে চায়, অথচ বাকি ভিড় নির্লিপ্ত, উন্নাসিক। বাস নামে, ঢালু, আরও ঢালু, বুঝতে হয় অনতিদূর নদী, বাতাসে জলের গন্ধ। নদীঘাট। এখানে বলে ভাস্কর পন্ডিতের ঘাট, দুর্ধর্ষ বর্গি নেতা, ওড়িশার কটক থেকে নদী পেরিয়ে এ-ঘাট ছুঁয়ে গিয়েছিল কবে।

শীতের নদীর ধূধূ বালি পেরিয়ে শেষ ফেরীর নৌকায় তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। আনাজ, শাকপাতা উপচানো নাইলন ব্যাগ হাতে হাট ফেরত সস্তা উলের চাদর গায়ে কালোকুলো পুরুষ, মহিলার দল, গরু-মহিষ-সাইকেল সমেত আস্ত একটি নিশ্চল জনপিন্ড নিয়ে নৌকো নড়ে ওঠে। ভিড়ের মাঝে নিরালম্ব দাঁড়িয়ে, অথচ নৌকা জলে দুলে উঠলে পড়ে যাবার ভয় নেই। আগুপিছুবাঁয়েডাঁয়ে মানুষের গরম রক্তমাংস ভরা সজীব দেহ প্রাচীর হয়ে ঘিরে থাকে। পশ্চিম শাল অরণ্যের মাথার পেছনে তখন অস্তে যান দিনমণি, প্রাচীন গাছেরা ক্রমে ওপারের কিনার থেকে নদীবক্ষের দিকে ছায়া বিস্তার করে আসে,দিনের অন্তিম আলো রক্তবমি করে দিয়ে যায় আন্দোলিত জলে।

তখন সেই জাদুকরের খোঁজ দেয় শাল অরণ্যের অন্ধ ছায়াপথ, মহুল আর সিধা গাছের ছমছমে ছায়া। টিলার বন প্রায় সারা বছর ভরে থাকে বৃহৎ সবুজ পাতার ফাঁকে ধরে থাকা সাদা সুগন্ধি কুর্চি ফুলে, ঘন আঁতাড়ি ঝোপে, বহুক্রোশ বনভৈরবীর ঝাড়ে উপচানো ফুলের বনজ গন্ধ, সে ফুলে আঙুল দিলে ঝাঁঝাল ঘ্রাণ ডগায় মেখে সঙ্গে যায়। পরিত্যক্ত এক সাঁকো, শতবর্ষের পচা পাতায় ঢাকা পড়ে থাকা, তলায় ঝিরিঝিরি বয়ে যায় আদিম সোঁতা। আধুনিক মোবাইল ফ্ল্যাশের আলোয় দেখে নিতে হয় ঝরে পড়া শালফুলে ঢাকা পথ কেমন গন্ধে মাতোয়ারা। বাদাড়, কাঁটাকুলের ঝোপ সরিয়ে পথ করে নিতে নিতে ঠিক যখনই মনে হবে এইখানে এসে পথ শেষ হলো, বাকি পথ হারিয়েছে, তখনই দূরে প্রাচীন ভগ্ন মন্দিরের গর্ভগৃহের আলো দেখা যায়। ভাঙা চাতালে চাদর মুড়ি দিয়ে জুবুথুবু বসা একজন বুড়ো লোক। শুকনো শালপাতায় জুতো পড়ার মড়মড় শব্দে সে একবার মুখ তুলে দেখেও দেখে না। মোবাইলের আলো ঘুরিয়ে দেখা যায় বহেড়া আর কেঁদু গাছের তলায় গতবারের মকরে মানত করা ভাঙা শুঁড়ের মাটির হাতি, কানভাঙা ঘোড়ার অগুন্তি স্তূপ, কোন বৃষ্টিতে গায়ে মাখানো সিঁদুর ধুয়ে গেছে। আলো নিভলেই রাতের নিশুত স্বর এই ঠান্ডা জঙ্গলের হাজার বছরের বুনো পোকাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখে, তবু এক-দুটি টিরি টিরি ডেকে যায়, চাপা পড়ে থাকা গোঙানির মতো রাতপাখি ডাকে। দূর থেকে স্পষ্ট ভেসে আসে এই শীতে নদী সাঁতরে আসা হাতির ডাক, নদীজলের কলকল।

“চালতাবেড়া গ্রাম যাবো।”

“নাম ত গটায়হ শুনচি, উপর টিলার বন-নু কি যাইতে হিবে?”

বুড়ো নিজেকেই প্রশ্ন করে চিন্তিত মুখে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে,

“কতো গ্যারাম যে হারাই গ্যালা।”

বৃদ্ধ বলে, হারিয়েছে তবে নিশ্চিহ্ন হয়নি। এই দেখা জগতের আশেপাশে কোথাও বেভুল হয়ে থাকে বনজ গ্রাম। এমন কালা জাদুর মায়া, বহিরাগতদের চোখ এখানে এলে অন্ধ হয়ে যায়! সেই আঁধারে আত্মগোপন করে থাকে জংলি গ্রামগুলি। বুড়ো তখন আশ্চর্য এক কালো যাঁড়ের গল্প শোনায়। রাত গভীরে সেই ষাঁড় জঙ্গলের উবে থাকা গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য সীমান্তে দাপিয়ে বেড়ায়। কেউ তাকে দেখেনি, অন্ধকারে ঝোপঝাড় ভেঙে তার ছুটে যাওয়ার শব্দ শুনেছে কেবল। পুরাকাল থেকে ভয়ংকর শার্দুলের সঙ্গে তার লড়াই। প্রতিবার বাঘ হারে, লেজ গুটিয়ে খেঁকি কুকুরের মতো কেঁউকেঁউ করে পালায়। পুনরায় নতুন সজ্জায়, ধূর্ত, বলীয়ান হয়ে ফিরে আসে। বাইরের শত্রু থেকে কালো ষাঁড় রক্ষা করে চলে এই গ্রাম, এই শাল মহুলের বন,বনের দেবতা। বদলে অরণ্যের মানুষ মন্দিরে মহুল বা ধেনো মদের ভোগ রেখে যায়, এখানে বলে ঝুরি। পড়ে থাকা ঝুরির প্রসাদ মাটির মালসায় গলায় ঢেলে বুড়ো সারারাত ঝিমোয়, প্রসাদের পচা কলা অতি প্রিয় তার। এভাবেই দিবারাত্র দেবতার প্রহরী হয়ে বসে থাকে। বুড়ো কপালে হাত ঠেকায়-

“আসিছু মর-অ কালুয়া ষাঁড়-অ, জয় বাবা কালুয়া ষাঁড়ের জয় হউ!”

অরণ্যের এইসব প্রাচীন প্রবাদে মন ভোলে না। জাদুকরের খোঁজে হাঁটতে হয় উপর টিলার পথে।

অরণ্যঘেরা চালতাবেড়া গ্রাম, খড়ের চাল আর নদীর পাড়ভাঙা মাটি দিয়ে গড়া ঘর, জমির পোষো মাটি লেপা উঠোন, বলে আইঙ্গনা। চাল থেকে লতিয়ে নামে লাউ, চালকুমড়োর ডগায় পাক দিয়ে থাকে সবুজ হিলহিলে সাপ। পাড় ধরে পালের কাঁটা সবুজ বেগুন, কালো বেগুন, বাইগন চাষ। ধূধূ করে সুবর্ণরেখার চর। সংক্রান্তির মেলা বসে নদীর বালির ওপর। পিতৃপুরুষের হাড় নদীর জলে বিসর্জন দিয়ে শুরু হয় পরব, গরীবের গতরেরে গরব, যেদিন আনল সেদিন পরব! আর ঠিক এইসময় উপর টিলায় পড়বে ম্যাজিকের রঙিন তাঁবু। তক্তপোষ জুড়ে স্টেজ, জেনারেটরে চলা ঝলমলে লাল বাতি, নীল বাতি। তাঁবুর গেটে দৈত্যাকার পোস্টারে বালক ম্যাজিশিয়ান, মাথার ওপর একটা সবুজ টিউবলাইট দপদপ করে যায়,কিছু পোকা টিউবের গা জড়িয়ে। রহস্যময় জাদুকরের মুখ জ্বলে-নেভে। তার মাথার পাগড়িতে বসানো লাল গোল রত্নের ছবি থেকে ঠিকরে আসে আলো। বিকেল থেকে ভ্যান রিকশায় চোঙা বেঁধে ফুঁকে যায়, দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ম্যাজিক শো! দেখুন দুরন্ত জাদুর খেলা, বিস্ময় বালক, দ্য গ্রেট ম্যাজিশিয়ান মাইকেল মুর্মু-র ম্যাজিক, রোজ দুটি করে শো, সন্ধে সাতটা এবং রাত্রি নয় ঘটিকায়।

বনের এ-প্রান্ত,ও-প্রান্ত, তলি গ্রাম থেকে টিলা উঁচিয়ে দলে দলে লোক এসে খুচরো পয়সার টিকিট কেটে ঢোকে। রাত নটার শেষদিনের শেষ শোয়ে মহুল আর হাঁড়িয়ার গন্ধে ভরপুর অশরীরী দর্শক। অন্ধকারে মাচিস কাঠির ফস করে জ্বলে মুহূর্তে নিভে যাওয়া। বিড়ির ধূমল মেঘ ভেসে থাকে ছায়া ছায়া মাথাগুলির ওপর। বারো বছরের ম্যাজিশিয়ান মাইকেল মুর্মু তাঁর সুন্দরী দিদিকে নিয়ে স্টেজ কাঁপান। ঝলমলে জরির শেরোয়ানি, মাথায় চুমকি বসানো পাগড়ি আর যাদু-দন্ড হাতে বাতাসে সশব্দ ঢ্যারা কেটে বালক চ্যাঁচান, বেঁটে মোটা কালো ধলা হাড়ে হাড়ে শয়তানি জোকাররা রেডি! দুজন জোকার মঞ্চের ওপর লাফিয়ে উঠে ডিগবাজি খেয়ে সমস্বরে বলে ওঠে, উস্তাদ রেডি!

“জামার ভিতরনু যাদুমন্ত্রে বাহিরায় ডাহুক!”

জোকার সঙ্গতে চ্যাঁচায়, বাহিরায় ডাহুক!

“চুলের ভিতরনু আকবর বাদশার মোহর!”

“আকবর বাদশার মোহর!”

চড়বড় হাততালি আর হোহো চিৎকারে কান পাতা দায়। লাঠি থেকে ফুলের গোছা, লোহার ছোট রিং গলে গোটা শরীরের দলে মুচড়ে বেরিয়ে আসা, রুমাল নেড়ে সাদা পায়রা ওড়ানো, কাপড়ের থলে থেকে মুঠো মুঠো লজেন্স বের করে ছুঁড়ে দেওয়া দর্শকদের আর হরির লুটের মতো মাতাল দর্শকের ঝাঁপিয়ে পড়া এইসব মামুলি ম্যাজিকের দিকে। এ কী সেই জাদু, হায়! আশাভঙ্গের মুখ নিয়ে যখন তাকিয়ে থাকতে হবে, জাদুকর মঞ্চের এ-ধার থেকে ও-ধার ঘুরে বলে ওঠেন-

“মানুষ হিলা বেকুব চুপ, হাটবারে সকলমেনে দেখু, কেমনপারা মোচড় দিকিরি, টাকা লিকি যায় বাজিকর!”

হোহো করে হেসে ওঠে তাঁবু।

“এ যে দেখেন বাবুমেনে, চক্ষের ভিতরনু কেমনপারা সোহাগের পাখিরে উড়াই, বুকের ভিতরনু পীরিতের পুন্নিমার চাঁদ!”

দর্শক তুমুল হর্ষে শিস দিতে দিতে ধুলায় গড়াগড়ি খায়। সুন্দরী দিদি বাতাসে দোলা বেতসী লতার মতো দুলকি চালে হেঁটে এলে কান ফাটানো শিস থামতেই চায় না! শীর্ণ, দীর্ঘাঙ্গী আদিবাসী কিশোরী, শ্যামল তনুর মুখে টলটলে আঁখি, তপোবনের ভিতর বুঝি ছায়াচ্ছন্ন শান্ত সরোবর। তাকে বাক্সে পুরে ভ্যানিশ করে দেন বালক, সে তখন চেক লুঙ্গি, গামছাকে গায়ে চাদরের মতো জড়িয়ে হতবুদ্ধি কোনো দর্শকের পাশে বসে আছে!

এ সমস্ত অনাড়ম্বর, সস্তা জাদু দেখতে দেখতে যখন গ্রামীণ সরলতায় মজা বোধ হবে, ক্রমেই সে খেলা ভয়ংকর হয়ে ওঠে! রঙ্গ, রসিকতায় হাসতে, হাসাতে সহসা টেবিল থেকে ধারালো ছুরি তুলে দিদির নরম চামড়ার গলা ফাঁক করে দেন জাদুকর! ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে, তাঁবুজুড়ে দর্শকের ভয়ার্ত আর্তনাদ। কাটা বনমুরগির মতো ছটকাতে ছটকাতে হুমড়ি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে দেহ।

“এ হিলা বোড়ো দারুণ বাজি, তারে কইমু বোড়ো বাজিকর, যে তার গটায়হ রুমাল হিলায় পরানের গহীন ভিতর!”

লাল কাপড়ে দেহটি ঢেকে জাদুকর উবু হয়ে বসেন দিদির পাশে। কাঁদেন ফুঁপিয়ে। নির্বাক দর্শক চেয়ে থাকে আলোকিত, অলৌকিক স্টেজে। সজল হয়ে ওঠে তাদের চোখ। তাঁবুর বাইরে তখন থমথম করে শীতার্ত রাত, অন্ধকার, আদিম জঙ্গলের মাথায় এক ফালি হিম কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ।

তবু শিক্ষিত মননে জানা থাকবেই এ ম্যাজিক নয়, জাদু অসমাপ্ত এখনও। একটি নকল খুনের অভিনয় শেষে দেহটি উঠে দাঁড়ালে সম্পূর্ণ হবে জাদু। মহানাগরিক মেধা তাই মনকে বিচলিত করে না। অপেক্ষা করে রক্তাপ্লুত দেহটির উঠে দাঁড়াবার। যে দেহ শো শেষে দর্শককে বাও করবে, দীঘল চোখে তার আলো পড়ে চিকচিক করার। এখন তারই বিরতি কেবল।



*

এই বিরামটুকুতে, সামনের উজ্জ্বল মঞ্চ স্মৃতির মতো দুলে উঠে মনে পড়ে যেতে পারে শৈশবে ফেলে আসা জীবন্ত কবরের খেলা দেখানো লোকটির কথা। প্রতি মাঘের দারুণ শীতকালে দূর গ্রাম থেকে নদী পেরিয়ে জঙ্গলমহালে তার খেলা দেখাতে আসা। সঙ্গে তার আট বছরের ছেলে। কালীর ফটোর নিচে লাল জবা রেখে, ঝকঝকে নতুন ব্লেডের ধারালো পাতিতে তর্জনী ছিন্ন করে রক্তের ফোঁটা দেয় দেবীর পায়ে, ধূলায় ভূলুণ্ঠিত হয়, কপালে রক্ততিলক কেটে মানুষটি ওঠে ব্রেকহীন, মার্ডগার্ডহীন, সম্পূর্ণ নগ্ন একটি সাইকেলে। যে সাইকেল থেকে তার কোনোমতেই নামা চলে না আগামী বাহাত্তর ঘন্টা। গোল করে ভিড় ঘিরে থাকে। গোলের কেন্দ্রে একটি বাঁশের খুঁটিকে বৃত্ত করে ঘুরে যায় সাইকেল। সেভাবেই সে মানুষের সঙ্গে কথা বলে, গল্প করে তার গাঁয়ের। যে গ্রামের বাড়ি বাড়ি বাজিকর, গা কাঁপানো ভয়ানক খেলা দেখানো যাদের পেশা। দুপুর গড়ালে ভিড় পাতলা হয়। বিকেল গড়িয়ে রাত। পরদিন ছেলে সেভাবেই বাবার শুকনো গলায় উঁচু করে ঢেলে দেয় এক ঢোক জল, হাত বাড়িয়ে মুখে দেয় সামান্য ভেজা মুড়ি। অনেক রাতে ঘুম ভেঙে ঘুলঘুলির ভেতর দিয়ে সাঁওতাল কিশোরীটি দেখে, জঙ্গলঘেরা শুনশান প্রান্তরে ফেটে পড়েছে জ্যোৎস্না, একা একা ঘুরে চলে অপার্থিব সাইকেল।

মনে পড়ে এই শীতেও কীভাবে লোকটির গা বেয়ে দরদর নেমে আসে ঘাম, থরে ওঠে প্যাডেল করা পায়ের পেশী। অনলস সাইকেল ঘোরা দেখে লোকে যখন অবসন্ন, পথে বিছিয়ে দেওয়া হয় থাক থাক বিচুলির খড়। কেরোসিনে ভিজিয়ে সন্ধ্যায় দাউদাউ জ্বলে ওঠে আগুনের পথ। থামা চলে না, আগুনের ভেতর ঢুকে যাবে সাইকেল। চাপা আতঙ্কে গুঞ্জন তুলবে জনতা। আর সবাইকে তাজ্জব করে জ্বলন্ত পিঠ নিয়ে বেরিয়ে আসবে লোকটি! গায়ের চাদর খুলে জনতা ছোটে, চাদরে জাপ্টে নেভায় সে আগুন। তার পিঠ জ্বলে গেছে, পা জ্বলে গেছে, প্যাডেল থামেনি। লোকে ছুটে এসে তার গায়ের গেঞ্জিতে গেঁথে দিতে চায় পুরস্কারের নোট। সে বলে, গেঞ্জি নয় বাবুমেনে, মোর গায়ে নু কি গাঁথ-অ! চামড়ায় গাঁথা সেফটিপিনে ঝোলে হরেক নোট, মৃদু উত্তুরে হাওয়ায় ফরফর ওড়ে।

“বাজিকর, এ মরণ খেলা অখনটুকু থামাও, সহ্য করি পাইনি!”

দোতলা সমান বাঁশের ভারা বাঁধা। ভারার তলায় রাখা গোছা গোছা নষ্ট সাদা টিউবলাইট। বাহাত্তর ঘন্টা শেষে সাইকেলের ওপর একপায়ে দাঁড়িয়ে বাঁশের গায়ে পা রেখে রেখে সে উঠে যায় ওপরে, গায়ের গেঞ্জি খুলে নগ্ন করে ছাতি। ছাতিতে অজস্র শুকনো বিগত কাটা দাগ। চাপা উৎকন্ঠায় চেয়ে থাকে জনতা। লোকটির মুখে অমলিন হাসি। সে জানে নশ্বর এ দেহ যতো যন্ত্রণায় দীর্ণ হবে, বিদ্ধ হবে, ততো জোরে ফেটে পড়বে জনতার সহর্ষ তালি! আতঙ্কের হাহা রবের ভিতর একমাত্র মানুষই বিনোদন খুঁজে নিতে জানে! তালির ভেতর, ভয়ার্ত, মুগ্ধ চোখের সে দৃষ্টি! আহা তারই লোভে, সে মরণেও জন্মের সুখ! লোকটি তীব্র স্বরে কালীর জয় হেঁকে ঝাঁপ দেয় নিচে। থাক করে রাখা টিউবে উপুড় হয়ে প্রচন্ড শব্দে আছড়ে পড়ে ভারি শরীর। খন্ড-বিখন্ড টিউবের ভাঙা ফালি আমূল ঢুকে যায়, চূর্ণ কাচের সূচিমুখে বিক্ষত, রক্তাক্ত ভয়াল ছাতি ফুলিয়ে সে বরাভয়ের ঢঙে দু-হাত তুলে উঠে দাঁড়ায়। বাকরুদ্ধ জনতার চোখে তাকায় সরাসরি।

আসে মহার্ঘ খেলাটির দিন। একটি বকুল গাছের তলায় দশ ফুট বাই দশ ফুট খোঁড়া হয় মাটি। স্বেচ্ছা কবরে যাবে লোকটি। হাতে নিয়ে বাঁধানো কালীর ফটো, পাঁচসেলি টর্চ, তুলসির একটি ক্ষুদ্র চারাগাছ। পাশে শোয়ানো হয় সাইকেলটিকেও। কবর ঘিরে সেদিন ভেঙে পড়েছিল আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে আসা মানুষের ভিড়। দু-চোখে জল নিয়ে সে হাত মিলিয়েছে মানুষের হাতে। যদি কবর থেকে বেঁচে না ফেরে, মানুষের অন্তিম স্পর্শ হাতে নিতে চেয়ে। ভরাট মাটির তলায় একজন জ্যান্ত মানুষ জীবন-মরণের খেলা দেখায় কোন সে বেঁচে থাকার তাগিদে?

গভীর অবিশ্বাসে মধ্যরাতে নিশুত কবরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ। কবরের মাটির ওপর ঝরে আছে শুকনো বকুলপাতা। লোকটির আট বছরের ছেলে চাদর গায়ে উবু হয়ে বসে। বাবা কি বেঁচে, সে কি মরে গেছে? সে কি টর্চের আলো চারাগাছের পাতায় ফেলে তৈরি করছে বেঁচে থাকবার অক্সিজেন! বাবা বলেছে, এ খেলা বয়ে নিয়ে যাওয়ার লোক নেই, একদিন লুপ্ত হয়ে যাবে, কেউ জানবে না খেলাও কীভাবে জীবন বাজি রেখে অসমসাহসী হয়ে উঠতো এককালে! তাই তাকেও এ খেলা শিখতে হবে পরম্পরায়, বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সে কি পারবে?

উৎকন্ঠায় দিন পার হয়। অবশেষে মাটি তুলে তোলা হয় লোকটিকে। অচেতন, মর মর এক দেহ, গলায় ফুল আর নোটের মালা, মুখে যুদ্ধজয়ীর হাসি লেগে, মানুষের হাতে হাতে চ্যাংদোলা হয়ে দুলতে দুলতে বুঝি এইমাত্র আলোর মঞ্চ ধরে ঐ চলে যায়। এ কি কেবল দুটো পয়সার তরে বাজিকর? কথাটি কানে গেলে রণক্লান্ত, বিশুষ্ক মুখে লেগে থাকবে হাসি-

“সে তুমার পাওনার টিকে ভি পরোয়া কর্-নি থায়, খেলা যে দেখিইবে, তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়...”

স্টেজে আলো কমে আসে। মেয়েটি আর উঠে দাঁড়ায় না। যেন এমনটাই হবার ছিল এই স্বাভাবিকতায় জনতা তাঁবু খালি করে বেরিয়ে আসে। সস্তা উলের চাদর আরেকটু ভালো করে মুড়ি দিয়ে হেঁটে যায় টিলার নিচের গ্রামের দিকে। যৌক্তিক মননের হতবুদ্ধি হওয়ার পালা এবার। লোককে বোঝানোর চেষ্টা করতে হয় এ ম্যাজিক নয়, ম্যাজিক হলো আবার বেঁচে ওঠা! কেউ শুনতে চায় না, শুকনো হাসে, ঘোরের মধ্য দিয়ে চলে যায়, বেকুব, নির্লিপ্ত। ছুটে যেতে হয় তাঁবুর পেছনের সাজঘরে। মেয়েটির দেহ সেভাবেই শোয়ানো।

রাত শেষ হলে চালতাবেড়া গ্রাম ছেড়ে ম্যাজিক-গাড়ি চলে যায় অন্য গ্রামে। প্রায় পাগলের মতো জনে জনে জিজ্ঞেস করতে হয়, মেয়েটি সত্যি মারা গেছে?তারা চায়ের দোকানের বাঁশের বেঞ্চিতে পা ঝুলিয়ে বসে, মাথা নেড়ে হ্যাঁ ব’লে অন্য কথায় মগ্ন হয়। পুলিশ কেস হবে না, টাকার জন্য খেলা দেখাতে গিয়ে মার্ডার? তারা হাসে। কেস নেয় না পুলিশ। অদৃশ্য গ্রাম, সরকারি খাতায় যার অস্তিত্বই নেই। সভ্যতার সবচেয়ে কাছের রেলপথ এ গ্রাম থেকে শত যোজন দূর, বাবুমেনে, একমাত্র জাদু আছে এখানে, জাদুর ভেতর মানুষ আছে, মানুষ বাঁচে, ভোলে, বাকি সব ভ্যানিশ! বলতে বলতে চোখের সামনে উবে যায় গ্রাম। ধূধূ গাছেদের অজস্র মাথা ছাড়িয়ে দূরে নদীর চিলতে নীল জল রোদে ঝলঝল করে।



কবিতাংশ :সৈয়দ শামসুল হক (সুবর্ণরৈখিক ভাষায় তর্জমাকৃত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. কী অপূর্ব ভাষা ও বর্ণনার মাদকতা!যেনএক আশ্চর্য হারিয়ে যাওয়া আধুনিক সভ্যতার প্রচ্ছায়া হয়ে অগোচরে বেঁচে আছে এই গ্রামগুলো। আশ্চর্য জাদুকরের মতো ওদের জীবন ধারা। কলমের মুন্সিয়ানায় হারিয়ে যাওয়া যাদুকরের আশ্চর্য যাপন মনের গহনে বেঁচে থাকবে।

    উত্তরমুছুন