একদিন মাচানের উপর, তখন চৈত্র কি আশ্বিন মাস, অনন্ত মণ্ডলকে মৃত পাওয়া গেল। একদিকে কতকালের ঘন বন, একদিকে নদী। মাঝখানে অনন্তর বাপকেলে চাষবাড়ি। খেতের এককোণে ফসল জাগার মাচান। কাকভোরে মাঠ বসতে আসা কেউ একজন আবিষ্কার করল মাচানের উপর অনন্ত মণ্ডল মরে পড়ে আছে। তারপর ভালো করে আলো ফুটে ওঠার আগেই গাঁ-সুদ্ধ লোক সে-খবর জেনে গেল। নামানো হয়েছে অনন্তকে। বাঁকানো পাঁজর সব জেগে আছে বুকের চামড়ায়। এলোমেলো দাড়িগোঁফ কাঁচাপাকা। কপালে চিবুকে কত ভাঁজ। মাটি মাটি রঙের সাদা পরিধেয় বস্ত্রটি, কাপড়ের বাইরে আস্ত দুটো কর্কশ পা আর চিমসানো পাছা অংশত প্রকাশিত।
মারা যে গেল, তার মানে জন্মের পর থেকে এতগুলো দিন সে কি বেঁচেবর্তে ছিল? হ্যাঁ ছিলই তো, বাস বাঁ ট্রেনের গেটে ঝুলন্ত যাত্রীর মত। তাকে কি আরোহণ বলে? বেঁচে থাকলেও জীবনের নাগাল পেল না অনন্ত। ফলওলার মতো মহার্ঘ জীবনকে ঝাঁকায় চাপিয়ে, তার ছিল লোকসানের কারবার, ফিরি করেছে সমস্ত দিন। এখন দিনের শেষে যেন তার হাতে অর্থহীন ক'টা মুদ্রা।
গ্রামের দিকে দেয়াল-পাঁচিল কম। এ পাড়ার ঢেউ সহজে ও পাড়ায় গিয়ে লাগে। এখন এই মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর গোটা গ্রাম, গ্রামের মাথার উপরের আকাশ, আলো-হাওয়া সব বিষণ্ণ হয়ে পড়েছে। দূরে অনন্তর ঘরে কান্নার রোল উঠেছে শোনা যাচ্ছে। চাষিদের কান্নায় আবার সুর থাকে। একটু পরেই কুড়ুলের কোপ পড়বে গাছে। অনন্তর ভিটায় আর বড় গাছ কোথায়? সেই শিরীষটাই। তাতে অবশ্য শ্মশানের কাঠও হবে, রান্নারও। যাক, ওদিকে পোড়ানোর তোড়জোড় চলুক। এদিকে রোদ বাঁচিয়ে তিনজন অসম বয়সের মানুষ বসে আছে বাঁশতলার ছেঁড়া ছেঁড়া ছায়ায়। তাদের মুখে-চোখে দুঃখের ছোপ। তারা পাখির বাসা বুনবার মত করে গল্প বুনছে লতায় পাতায়।
সামনেই অনন্তর খেত। ধান-গম, সরষে, ডাল, সবজি। সবুজে-হলুদে, ফুলে-ফলে একাকার। অদূরে বাঁশতলার ছায়ায় বসে তিন জনের বয়নপটু ঠোঁটে ঠোঁটে উঠে আসছে স্মৃতিচারণ। অপ্রকাশিত কথামালা, যুক্তি তক্কো ব্যাখ্যা। কথায় কথার ফুটে উঠছে অনন্তর অস্পষ্ট একটি রেখাচিত্র। এরা কেউই খুব কাছের বা দূরের মানুষ নয়। এদের কথাবার্তা শুনলে পড়শি বলে মনে হয়। এদের জীবন অধিকাংশত অনন্তরই মতো।
ফসলেরও মনখারাপ। ঘোলাটে রোদ এসে পড়েছে। খাঁ-খাঁ করছে মানুষের কাঁধ-সমান উঁচু বাঁশের মাচাটা। আহা, মানুষটা এসময় মাচার নিচে ছায়ায় বসে বিড়ি ফুঁকত। আর মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখত নিজের পরিশ্রমের সবুজ বাহার।
একটা বড়সড় ছাগল কখন ঢুকেছে পুঁই ঝোপের ভেতর। ফনফনে সবুজ ডগা খাচ্ছে চিবিয়ে চিবিয়ে। কেমন নিশ্চিন্ত ভাব, ভয় নেই, পালাবার তাড়া নেই। যার বয়স সবচে কম, সদ্য যৌবনছোঁয়া সেই মানুষটা 'হ্যাট হ্যাট' শব্দ করে। উঠে দাঁড়িয়ে তেড়ে যায়। ছাগলটা নড়েও না। এর মাঝে আবার কোথা থেকে একটা রোগাটে কুচ্ছিত লাল কুকুর ছুটে এসে মাচানের একটা খুঁটির গোড়ায় ঠ্যাং তুলে তীব্র ধারায় পেচ্ছাব করতে শুরু করে। এ দৃশ্য মানুষটার ভাল লাগে না। সে ছুঁড়ে মারবে বলে ঢিল তোলে। তখন সবচে' বয়স্ক মানুষটা, যার বয়স প্রায় অনন্তরই মত, কি একটু বেশিও হতে পারে, ফিস ফিস করে বলে, "হেই হেই, থাম!”
সেই স্বরে কী ছিল, উদ্যত যুবক নিরস্ত হয়, কেমন ভয় পায় সে। আস্তে আস্তে ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসে পড়ে। গা-ছমছম নিঃশব্দ দুপুর। রং রোদের খেলা অচেনা। একটা রোগা কুকুর এসে পেচ্ছাব করে, একটা নধর ছাগল পুঁই গাছের ডগা চিবিয়ে খায়। মাঝবয়সি মানুষটা বলে, "অনন্ত মণ্ডলও আসতে পারে এসময়।”
কিন্তু কোনটি সে?
কুকুরের পেচ্ছাবে তীব্র ঘৃণা, ছাগলের জিভে মায়া মোহ। প্রবীণ ভাবছে ছাগলটাই হবে। নবীন ভাবছে অন্যকথা, কুকুরটাই সম্ভবত। কারণ কুকুরটা তার মতে বোধোদিত, চক্ষুষ্মান। মধ্যবর্তী মাঝবয়সি এ বিষয়ে সিদ্ধান্তহীন। তিনজনেই নীরব বসে থেকে দৃশ্য দেখে। নিজের মতকেই সত্য বলে ভাবে, কিন্তু অন্যেরটাও নস্যাৎ করতে পারে না।
মূলত ধানের মরাই। তার চারপাশে চালা প্রসারিত করে অনন্তর সংসার। সামনে গোবর নিকানো খামার। একপাশে খড়ের গাদা। তুলসী মঞ্চ, মাধবীলতার ঝোপ। ওদিকে গোয়াল। গাইবাছুর মিলে পাঁচটি, একজোড়া বলদ। গোরুর গাড়ির চাকাদু'টি খুলে ঠেকানো আছে গোয়ালের গায়ে, লোহার বেড়ি মেরামত করতে কামারবাড়ি নিয়ে যেতে হবে। দেওয়ালে গোবরের ঘুঁটে ছোপানোর দাগ।
ভাঙা বেড়া, নুয়ে পড়া রান্নাঘরের ছিটেবেড়ার দেওয়াল। চাল দেবে গেছে, জোরে বৃষ্টিতে জল পড়ে। সবই কেমন ভাঙা ভাঙা অগোছালো অসম্পূর্ণ। আর এইরকম অসময়ে হুট করে চলে গেল অনন্ত। এখন এসব গোছাবে কে? অনন্তর বাপ অবনী যখন মরল তখন এরকম দৃশ্য দেখেছিল অনন্ত নিজে। তারপর কাজে হাত দিয়েছিল। তার হাতের কাজও ফুরোলো না।
অনন্তর বউ ফেঁতড়ি (শ্রীহীন)। রোগা গড়ন, কৃষ্ণ কালো। অনন্ত মেয়ে দেখতে যায়নি। তার বাপ-খুড়ারা দেখতে যায় এবং মেয়ের পায়ের পাতার সুলক্ষণ দেখে পাকা কথা দিয়ে আসে। অনন্ত কথার অন্যথা হতে দেয়নি। বাপ-খুড়া খুশি হয়ে আশীর্বাদ করে বলেছিল, "বউ বড় লক্ষ্মীমন্ত, তুই সুখী হবি বাপ।”
দু'ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটি বাপমুখো। দেখে-শুনে বিয়ে দিয়েছিল অনন্ত। যে সমস্ত পণ দেওয়ার জন্য সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার মধ্যে কিছু কিছু দু'বছর ঘুরে এখনও বাকি। নাকছাবি, কানের সোনা। মেয়েকে তাই তারা পাঠিয়ে দিয়েছে বাপের বাড়ি। গয়নাগুলি গড়ানো হলে অঙ্গে চাপিয়ে তবেই সে ফিরে যেতে পারবে। অনন্ত ভেবে রেখেছিল, অঘ্রানে কি বৈশাখে সে হয়ত সমর্থ হবে। সেই কাজও অসম্পূর্ণ রইল।
এসব তো দৃষ্টান্ত মাত্র। এরকম অনেক। আরও একজোড়া বলদ, একটি পাম্প মেসিন এবং আরও একটু অগ্রবর্তী কল্পনায় একটা শ্যালো টিউবওয়েল এই সমস্ত থরে থরে সাজানো ছিল স্বপ্নের কুলুঙ্গিতে। সেগুলি সাজানোই রইল। মাটিমুখো ঝুঁকে থাকা অনন্ত মাথা তুলবার ফুরসতই পেল না।
বাঁশতলার ছায়ায় যে আসর সেখানে মাঝবয়সি মানুষটা এখন কথক। "অনন্তদা বলত, সে যখন নাকি অনুখাদ্য ছড়াতে যেত ধান জমিতে বা উচ্ছে-বরবটির খেতে তখন সবুজ ডগাগুলি অবিকল মানব শিশুর নরম আঙুলের মত তাকে ছুঁয়ে দিত, ছুঁতে চাইত। আরও বলত, তার নাকি তখন শীতলা মন্দিরে পূজার প্রসাদ বিতরণের কথা মনে পড়ে যায়। তার হাতে যেন প্রসাদ ভর্তি বড় পিতলের গামলা আর কচি সবুজ ধানগাছ বরবটির গাছগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। রব ওঠে, 'আমাকে দাও, আমাকে দাও, আরও দাও, বেশি দাও, আগে দাও...।' সে বড় অদ্ভুত কথা। বলতে বলতে অনন্তদা-র চোখ জ্বলজ্বল করে উঠত।”
নবীন মানুষটা অবাক হয়ে শোনে। তার চোখের দৃষ্টিতে বিস্ময়। কিছু অংশ অবিশ্বাসও কি মিশে আছে তাতে! অনন্তর বয়সি মানুষটা বলে, "সত্য কথা, খাঁটি কথা। এমন আমারও মাঝে মাঝে হয়। আসলে চাষবাড়ি তো একটা আশ্রম। আশ্রমে উদ্ভিদের শিশুরা বড় হয়। চাষিকে তাই হতে হয় সন্ন্যাসীর মতন। হিংসা লোভ থাকতে নেই। অনন্ত তো তেমনই ছিল। আর ওই যে প্রাসাদের কথা এল, কার প্রাসাদ বলো দেখি।"
বাকি দু'জন নিরুত্তর থাকে। উত্তর শুনবার অপেক্ষা করে। প্রবীণ বলে, "প্রসাদ হল মা-লক্ষ্মীর। চাষি হ'ল মা-লক্ষ্মীর সন্তান। আবার সবুজ শিশুগুলি হল চাষির পালিত পুত্রকন্যা। মা-লক্ষ্মীর নীতি-নিষেধের ডোরে চাষির হাত-পা বাঁধা। একটা বাড়তি পা ফেলার জো আছে? অমঙ্গল হবে। অনন্ত ছিল নিষ্ঠাবান। তাই জীবনটা তার সহজেই পার হয়ে গেল।”
এই পর্যন্ত শুনে কৈশোর-ফুরানো মানুষটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। কারণ শেষ বাক্যটিতে তার সমর্থন নেই। অনন্তর ঘরের কুলুঙ্গিতে এবং তার চেতনার মণিকোঠায় যে লক্ষ্মীদেবীর অবস্থান ছিল একথা সত্য। সে কোনওদিন কাউকে ঠকায়নি (নিজে ঠকেছে অবশ্য), কাউকে হিংসে করেনি, কারও চুরি করেন। দু'একটি উপলক্ষে তার যে পদস্খলনের সম্ভাবনা দেখা যায়নি তা নয়। তবে সেই সমস্ত সময়ে ধর্মভীতিই তাকে সুপথে ফিরিয়ে এনেছে। অনন্ত দৈবাৎ দুএকবার মদ ছুঁলেও জীবনে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ল না। দু'চোখের অতিরিক্ত উপর চোখের উদ্ভবও হল না তার।
এ প্রসঙ্গে একটি গল্প আছে। নদীর ঘাটের কাছে যে তারাসুন্দরীর ঝুপড়ি, কার প্ররোচনায়, না নিজেরই কোন বদবুদ্ধির ঠেলায়, অনন্ত হঠাৎ একদিন সেখানে যায়। তখন তারা নাকি বলেছিল, "অনন্তদা, তুমিও শেষ পর্যন্ত এলে আমার ডেরায়? এসো এসো, আমার ঘরদুয়ার ধন্য হোক। ঠাণ্ডা হয়ে বস কিছুক্ষণ, একটু জল খাও, হুঁকাটা সাজিয়ে এনে দিই। তা, সত্যি করে বল দেখি অনন্তদা, কে তোমাকে পাঠাল আমার কাছে। নিজে নিজে এই নরকে এসে ঢুকবে এমন মানুষ তো তুমি নয়। কে অনন্তদা, নামটা বল শুনে রাখি। ...” এই পর্যন্ত শুনে লজ্জিত অনন্তর মোহভঙ্গ হয় এবং সে ফিরে আসে।
কিন্তু এত কঠোর নিষ্ঠার ফলে জীবনটা যে সহজে পার হয়ে গেল এ তথ্য ভুল। অনন্তর জীবন ছিল বড় কঠিন, বড় কষ্টের। নবীন মানুষটা ভাবে। আর এত কঠোর অনুশীলনের পুরস্কারের বদলে মা-লক্ষ্মী সারাটা জীবন তাকে কেবল ঠকিয়েই গেলেন।
তৃতীয় জনকে অন্যমনস্ক দেখে বাকি দু'জন তাকে আসরে সংযুক্ত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এবং এইভাবে আসরটি সজীব থাকে।
অনন্তর ভগ্নীপতি থাকে শহরে। সেখানে তার ছোটখাটো দালালির ব্যবসা। দেখা হলেই সে প্রথমটা অনন্তকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করে। 'গোঁয়ার চাষা' বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। তারপর অনন্তর কষ্টের কথা টেনে এনে খুব দুঃখপ্রকাশ করে। তারও খানিক পরে তার মুখ থেকে নিঃসৃত হয় নানা পরামর্শ, সাফল্যে উত্তীর্ণ হওয়ার গুঢ় পরামর্শ।
"এসব ফালতু জমি জিরেত বিক্রিবাটা করে দিয়ে শহরে চলো হে। সারাবছর গাধার খাটনি খেটে কী লাভ বলো তো! কী আছে এখানে, এইভাবে একজায়গায় অনড় হয়ে পড়ে থেকে কি মানুষের জীবন চলে? চাষের কি কিছু লাভ আছে, চাষ কি ভদ্রজনের কাজ? ছ্যা, ছ্যা, ওসব বাদ দিয়ে শহরে চলো। জমি বিক্রির টাকায় শহরে ছোটখাটো ব্যবসা খুলে দেবো তোমায়, বেশ চলে যাবে।"
অনন্ত লাজুক হাসি হাসে। ভগ্নীপতির ধবধবে জামাকাপড়, ঝকঝকে ঘড়ি-চশমা, ফুরফুরে হাসি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে। এবং মনে মনে তার সমস্ত মত-পরামর্শ সাবধানে গা থেকে মাছি তাড়ানোর মত ঝেড়ে ফেলে দেয়। বিনয় করে বলে, "আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, ব্যবসাপত্র কি আমার কাজ গো দাদা? এই মোটা মাথার চাষবাসই আমার ভালো। আর অত সুখ আমার কপালে সইবে কেন? তোমাদের মতন অত আরাম-বিরাম কি আমাকে মানায়?”
দু-ব্যাটার মধ্যে বড়টি বেশ চালাক চতুর আর ছোটটি বুদ্ধিহীন। বড় তরতর করে ইস্কুল পাশ করল, লায়েক হল। ফলত কৃষিকাজের প্রতি ঘৃণা জন্মাল তার মনে। সে বাপকে বলল, "তুমি হাবা-গবা লোক। আমি তোমার মতো এই অজগাঁয়ে পড়ে থেকে মার খেতে চাই না। সততা ধুয়ে ধুয়ে খেলে পেট ভরে না। দিনকালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। নাহলে সারাজীবন দুঃখ কাছ ছেড়ে যায় না। এই সহজ কথাটা এতটা বয়স পর্যন্ত তোমার মাথায় ঢুকল না। তুমি থাকো তোমার বাপকেলে মাটি ছুঁয়ে। আমাকে বাধা দিও না।"
সত্যি সে বাধা মানল না। পড়া শেষ করে শহরে গেল মেসিনের যন্ত্রপাতি সারানোর কাজ শিখবে বলে। কাজ শেখা শেষ হলে সে নদীঘাটের বাজারে দোকান দেবে। ব্যবসা করবে। আর এর মধ্যে চাকরি জুটে গেলে তো অন্য কথা। মোট কথা অনন্তর বড় ব্যাটা জীবন থাকতে চাষজমির কাদায় পা ডোবাতে যাবে না।
ছোটটি আলাভোলা। ঘণ্টা-প্রহর জ্ঞান নেই। মাঠে গরু চরাতে গেলে ফিরবার কথা মাথায় থাকে না। কাঠবেড়ালি এ গাছ থেকে ও গাছে লাফ দিলে সে হাততালি দিয়ে হাসে। এমনই মোটাবুদ্ধি ছোট ইস্কুল পার হয়ে বড়টায় আর তার যাওয়া হল না। এই ছোটটিকে নিয়ে মাথায় বড় ভাবনা ছিল অনন্তর। কী করবে জীবনে ছেলেটা?
সংকীর্তনের আখড়ায় যেমন খুব মগ্নতার ভেতর কীর্তনীয়াদের হৃদয়ে গৌরসুন্দর ছায়া ফেলেন, আজ তেমনই বাঁশতলার আসরে তিনজন অসম বয়সের মানুষের মনে অনন্ত মণ্ডলের অবয়ব ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। সদ্য-যুবকটি শুধায়, “অনন্তকাকা কি কোনওদিনই এই বাপকেলে চাষবাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবার কথা ভাবেনি? তার মন কি কখনও হতাশ হয়ে পড়েনি?"
মাঝবয়সি উত্তর দেয়, "যেবার খুব বন্যা হল, সংসার গেসে গেল আর যেবার খুব মাটি পোড়ানো খরা হল আর যে বছর খুব পোকামাকড়ের আক্রমণ হল খেত-খামারে সেইসব সময় খুব হতাশ হয়ে পড়েছিল অনন্তদা। কিন্তু সে শেষপর্যন্ত জমি ছেড়ে কোথাও পালিয়ে গেল না। জমিতেই মন মেরে পড়ে রইল।"
প্রবীণ মানুষটি এবার বলে, "কেন পড়ে রইল বল তো? সে বড় গূঢ় কথা। খুব বুক লাগিয়ে অনুভব করবার কথা। যে খুব মগ্ন মনোযোগী কৃষক সে কি আর মানুষ থাকে গো। সেও গাছ হয়ে যায়। বৃক্ষ। তার শিকড় নামে মাটির গভীরে। আকাশে ছড়িয়ে যায় শাখা-প্রশাখা। শাখায় শাখায় কত সংসার, মানুষ পাখি পোকা-মাকড়ের। আর শিকড়-বাকড়ে অবিচ্ছেদ্য টান। সেই টান এড়িয়ে কোথাও যাওয়া যায় না।”
আসরের তরুণতম মানুষটি এই গূঢ় কথা শুনে অবাক হয়ে পড়ে। সে দ্বিপ্রহরের আকাশে বাতাসে অদ্ভুত দৃশ্যাবলি দেখতে পায়। একটি গাছ উপড়ে পড়লে যেরকম হয়। শেকড়-বাকড়ের সঙ্গে একরাশ মাটি আলগা হয়ে উঠে আসে। চারপাশে মাটির বুকে সরু সরু ফাটল, টনটনে ব্যথা। গুমোট বাতাসে মনকেমন করা ঘ্রাণ। আকাশে আকাশে, মাটিতে বাস্তুহারা প্রাণ। চরাচরময় একটা হাহাকারের কনসার্ট বাজছে যেন।
মধ্যবয়সি মানুষটা আবার কথা শুরু করে। নদীর ওপারে যে শহর সেখানে বাজার। অনন্তদা তার ফসল বেচতে যেত সেই বাজারে। খেয়া পেরিয়ে যেতে হত। একদিন মাঝনদীতে দেখা এক বাউলের সঙ্গে। বাউল যাচ্ছে সাগরতীর্থে। স্নান সেরে সে চলে যাবে পাহাড়ে। তা সেই বাউল অনন্তদাকে পরিহাস করে বলেছিল, "সারাজীবন তোর এপার-ওপার করাই সার হল রে চাষা। নদীটার আর হদিস পেলি না। উৎস-মোহানা চিনলি না। চল আমার সঙ্গে। তোর চোখ ফুটবে। তখন দিব্য দৃষ্টি পাবি।..."
এ কথা সত্যি, যে অনন্ত মণ্ডলের দৌড় ছিল এপার থেকে ওপার অবধি। সে কখনওই দৈর্ঘ্য বরাবর একটু উজানে কি একটু ভাটিতে এগিয়ে গেল না। সারাজীবন প্রস্থচ্ছেদই করে গেল। কিন্তু বাউলের যে-আহ্বান, দিব্য দৃষ্টি লাভের যে-প্রলোভন, তীর্থ যাত্রায় একজন প্রাজ্ঞ পথপ্রদর্শক পাওয়ার যে আশ্বাস সেসবও তো অনন্ত হেলায় এড়িয়ে যেতে পারল! কীভাবে, কীসের জোরে?
প্রবীণ বলে, "সে শালার বাউল কতটা কী জানে হে? সাগরে পাহাড়ে গেলেই যদি জীবনের অর্থ জানা যেত তাহলে সবাই সেদিকেই ছুটে যেত। অত সোজা নাকি? সাগর বড়জোর একটা পথ বলতে পারো। তা অনন্তও তো একটা বড় কঠিন পথ ধরেছিল, নাকি গো?"
নবযুবক নড়েচড়ে বসে। প্রবীণ তার ব্যাখ্যা শুরু করে। "চাষা খুব ছোট কথা নয় গো। চাষা হল এ জগতের জমিদার। সেই জমিদারিতে কত প্রজা। কেউ বিমুখ হয়ে ফিরে যায় না। অতিথি-ফকির ভিক্ষা পায়, ঠাঁই পায় পথিক-পাগল। খামারে যে ফসল আসে তার সবটা কি হামারে ওঠে গো, ওঠে না। শালিখ-চড়াই খায়। ইঁদুর-ছুঁচো খায়। তারপরও যা থাকে পায় পিঁপড়ে-পোকামাকড়। কেউ ফিরে যায় না। এ কি বড় সহজ কথা নাকি গো? গেরস্থ ধর্ম মস্ত বড় ধর্ম। এ পথ বড় কঠিন পথ। অনন্ত ছিল মস্ত বড় পথিক।"
নবীন মানুষটার চোখে এখন তপোবনের তরুণ তাপসের মত মুগ্ধ দৃষ্টি। মধ্যবয়সি তন্ময় হয়ে বসে আছে। প্রবীণের চোখে ফেলে আসা যৌবনের স্মৃতি। বাঁশতলার আসর একটা সমবেত সিদ্ধান্তের অভিমুখে এগিয়ে চলে। দুপুর ফুরিয়ে ঢলে যায় বিকেলের দিকে। দূরে ক্লান্ত বিষণ্ণ কণ্ঠের হরিধ্বনি শোনা যায়।
শ্রাদ্ধের কাজকম্ম মিটে গেছে। একদিন খুব সকালে, সেদিন কিঞ্চিত কুয়াশা, সেই তিনজন মানুষ অনন্ত মণ্ডলের চাষবাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে চমকে উঠল। প্রবীণ মানুষটারই বিস্ময় সবচেয়ে বেশি। কারণ সম্মুখে যে দৃশ্য তা বহুকাল আগেই একবার তার দেখা। মাচানের উপর নবীন অনন্ত, মুণ্ডিত মাথা। এ দৃশ্য দেখা গিয়েছিল অনন্তর বাপ অবনী মণ্ডল মারা যাবার পর। বহুকাল পর পর দৃশ্য কি তবে ফিরে ফিরে আসে?
তিনজন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।
পক্ককেশ প্রবীণ মানুষটারও গা কেঁপে উঠল। ভীরু গলায় শুধোল, "সকালবেলা মাচানের উপর কে গো?"
উত্তর এল, "আমি গো খুড়া। অবনী মণ্ডলের লাতি অনাথ মণ্ডল। বাপের ছেড়ে যাওয়া মাচানে উঠেছি। ফসল জাগতে হবে তো।”
উত্তর শুনে সেই তিনজন মানুষের মুখ অমল হাসিতে পটের ঠাকুরের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যেন কোনও মন্দিরের প্রভাতী গান, অথবা যেন দূর থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি। কানে এলে মনে প্রত্যয় হয়, জগৎসংসারে এখনও চন্দ্রসূর্য ওঠে, জীবনের ধারা শুকিয়ে যায়নি এখনও। আজ যেন একটি বিশিষ্ট দিন। অনন্ত মণ্ডলের বুদ্ধিহীন ছোটছেলে এসে উঠেছে মাচানে। যেন যজ্ঞের শেষে বৃষ্টিপাত, তেমনই ভাবে সফল তাদের কথকতার আসর।
অনন্তর মৃত্যুর ফলে শূন্য হওয়া মাচানে আজ নতুন মানুষের অভিষেক হওয়ায় সেই তিনজন মানুষের কাজ ফুরায়। তারা অশরীর ছায়ার মতো কুয়াশার আলো-আঁধারিতে মিলিয়ে গিয়ে মিশে যায় লোকজীবনের ভেতর।
একটি প্রসন্ন সকাল।
লেখক পরিচিতিঃ
বিশ্বজিৎ অধিকারী - কবি ও গল্পকার। থাকেন পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর শহরের অদূরে।
প্রকাশিত হয়েছে তিনটি কবিতার বই এবং দুটি গল্পগ্রন্থ। গবেষণা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে।


0 মন্তব্যসমূহ