সন্‌জীদা খাতুন : ‘রঙিন ছায়ার আচ্ছাদনে’

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মৃত্তিকা সহিতা
লেখা প্রকাশ তারিখ : জুন ৯, ২০২৫

পারিবারিকসূত্রে তাঁকে দেখেছি ছোটবেলা থেকেই, চট্টগ্রাম এলে বরাবর উঠতেন আমাদের বাড়িতে। আমরাও স্কুলের ছুটিতে বৎসরান্তের নিয়মিত ঢাকা সফরে কখনো কখনো গিয়েছি ঈশা খাঁ রোডের টিচার্স কোয়ার্টারে তাঁর তখনকার নিবাসে অথবা ছায়ানটে গানের ক্লাসে। বলতে দ্বিধা নেই, আঁচলটানা সাদা-সিধে শাড়ি, কপালে বড় টিপ আর কোমল-কঠোর ব্যক্তিত্বের মানুষটি যে আর দশজনের থেকে আলাদা, সেটা একরকমভাবে বুঝতে পারলেও, সে বয়সে খুব কাছে ঘেঁষিনি ওঁর। আরো পরে, কলেজ পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যখন ঢাকায় এলাম, একই বছর, মা-র প্রবল আগ্রহেই ভর্তি হলাম ছায়ানটে; আর সেই থেকেই ক্রমশ তাঁর সাথে গড়ে উঠেছিল একটা নিজস্ব রকমের আত্মিক সম্পর্ক।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলঘরে বসতো আমাদের ক্লাস। তাঁকে আমরা পেয়েছিলাম একটু উঁচু ক্লাসে উঠে, তৃতীয় কি চতুর্থ বর্ষে। বিচিত্র স্বাদের গান শেখাতেন। রবীন্দ্রসৃষ্ট তালের গান সবচেয়ে বেশি তাঁর কাছেই শেখা হয়েছে। একটু খটোমটো তালবিভাজন – কিন্তু সহজেই তুলে দিতেন; মাত্রা-বিভাগের শাসনের মধ্যেও গানটাকে পাওয়া হতো। কিংবা আরো গভীর ভাবের দুরূহ গান – ‘পিপাসা হায় নাহি মিটিল’ – তাঁর তত্ত্বাবধানে অনায়াসেই আয়ত্ত হয়েছিল। একদিনের কথা আমার খুব মনে আছে। আমাদের শেখাচ্ছেন ‘বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে’। রবীন্দ্রনাথের গানে বাণী ও সুর কী করে হাত ধরাধরি করে চলে, সেটা বোঝাতে গিয়ে দেখালেন প্রথম ছত্রে বীণা শব্দের সুরপ্রয়োগে কী অপূর্বভাবে পরিমিত অথচ উপযুক্ত সুরঝংকার -- -হ্মপ -ধপ -মগ -রগ – প্রযুক্ত হয়েছে । চমক লেগেছিল, এ যেন সত্যিই বীণা বাজছে! মুহূর্তেই মনের মধ্যে, এমনকি চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠেছিল সমস্ত গানটা। আজ বুঝি, হাত বাড়িয়ে এমনি করেই সন্ধান দিয়ে গেছেন কত অরূপমাধুরীর, অমৃতময় করে তুলেছেন আমাদের সঙ্গীতযাত্রা।

শুধু সুর-তাল নয়, গানের বাণীর যথাযথ উপস্থাপনের প্রতি বিশেষভাবে যত্নশীল ছিলেন। গায়ক বা গায়িকার সুবিধা অনুযায়ী ইচ্ছেমত নয়, বরং শব্দে ও বাক্যে অর্থানুগ বিরাম দিয়ে কী করে একটি গানকে সার্থক করে তুলতে হবে, সে প্রসঙ্গ নানাভাবে এসেছে তাঁর আলোচনায়। একবার এক বক্তৃতায় খুব সরসভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, দমে কুলাচ্ছে না বলেই ‘বিশ্বধাতার যজ্ঞ/ শালা’ গেয়ে দিলে, রবীন্দ্রনাথের গানে এ হেন সম্পর্কবাচক (যার অন্যপ্রয়োগই বহুলপ্রচলিত) শব্দের উপস্থিতির কী কার্যকারণ – শ্রোতার মনে এমন প্রশ্নের উদ্রেক হলে তাকে তো আর ঠিক দোষ দেয়া যায় না! উচ্চারণের ব্যাপারেও খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন। কোন বছরে মনে নেই, ছায়ানটের ২৫শে বৈশাখের অনুষ্ঠানে গাইবার জন্য আমাকে নির্বাচন করে দিয়েছেন ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে’। গান তুলে তাঁর বাড়িতে গেছি শোনাতে। সবই ঠিক আছে, কেবল সঞ্চারীতে, যখন গাইছি ‘আমার ইচ্ছা হইতে, প্রভু, তোমার ইচ্ছা মাঝে’ – ধরিয়ে দিলেন, এক শব্দের অন্ত ও পরবর্তী শব্দের শুরুর বর্ণ স্বতন্ত্র না থেকে প্রায়ই লেপটে যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট হচ্ছেনা কথাটা, আর শ্রোতার কাছেও তার অর্থ পৌঁছাচ্ছেনা কোনো। বারবার অভ্যাস করে অনুষ্ঠানের আগে আরো অন্তত বারতিনেক শুধু এই নিয়েই ওঁর কাছে গেছি, ঠিক করে শুনিয়ে তবেই ছাড় মিলেছিল।

ওঁর কাছে শেখা আমার সবচেয়ে প্রিয় গান অবশ্য – ও চাঁদ, চোখের জলের লাগলো জোয়ার। কী যে এক মন-কেমন -করা প্রেমের গান! বিষাদ আছে, আছে হাহাকার আর অনিশ্চয়তা, আবার কোথাও যেন এক অসম্ভবের আশাও। চেনা কূলের বাঁধন খুলে হাওয়ায় হাওয়ায় পথ হারালো যে মন-তরী, দিশাহারা রাতের আকুল আলোয় সে কি ফিরলো ঘরে, না কি পথ মিললো অকূলেই? শেখানোর সময় ওঁর অনুচ্চ অথচ গভীর কণ্ঠ এখনো কানে বাজে, বিশেষ করে যখন প্রলম্বিত সুরে গাইতেন ‘ও চাঁদ’। ছায়ানটের সমাপনী পরীক্ষায় গেয়েছিলাম এই গান, ভারী খুশি হয়েছিলেন শুনে। পরীক্ষায় ভালো ফল হয়েছিল, কিন্তু সেদিন ওঁর সস্নেহ পরিতৃপ্তির অভিব্যক্তির মূল্য তার চাইতে কিছু কম নয়!

গান ছাড়াও, ইতিহাস নিয়ে আমার উচ্চতর পড়াশোনায় তিনি ছিলেন অন্যতম উৎসাহদাত্রী। মনে আছে, একবার কলকাতায় গেছেন কোনো কাজে, ফেরার সময় আমার জন্য উপহার নিয়ে এসেছেন সদ্য প্রকাশিত প্রয়াত ঐতিহাসিক অশীন দাশগুপ্তের স্মারকগ্রন্থ। সে বই এখনো রাখা আছে সযত্নে আমাদের চট্টগ্রামের বাড়িতে। এমনকি, আমার লেখালেখির বিষয়েও ওঁর অকাতর প্রশ্রয় পেয়েছি গোড়া থেকেই। সেই সময়ে, প্রায় সবকিছুতেই নড়বড়ে আত্মবিশ্বাসের আমার জন্য সেটা খুব কাজে দিয়েছে পরবর্তীকালে। একবার নালন্দার শিশুদের জন্য ইতিহাসভিত্তিক কিছু ছোট লেখা তৈরি করে দিতে বলেছিলেন। লিখে জমা দেবার দিনকয়েক পরে, সকালবেলায় ঘুম ভেঙেছে ওঁর ফোনে; শতেক ব্যস্ততার ভিড়ে, আমার মতো এক নবীনার সামান্য প্রয়াস তাঁর ভালো লেগেছে, সেকথা জানাতে ভুল হয়নি। আরো বড় পরিসরেও আস্থায় নিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ছায়ানটের বিশেষ প্রকাশনায় দেশের তাবড় গুণীদের পাশে সর্বকনিষ্ঠ লেখক হিসেবে যুক্ত করেছেন আমাকে। সে লেখার জন্য ওঁর কাছে একেবারে গাল-টেপা আদর পেয়েছিলাম!

তবে, এ সম্পর্কের সবটাই আদরে-স্তুতিতে মাখামাখি, তাও নয়। কোনো বিষয়ে অসন্তোষ জানাতে ফোনে অথবা সামনাসামনিই কড়া ভাষায় অনুযোগ করেছেন, বকেছেন। সেসবকে সঙ্গতকারণে শাসন হিসেবেই নিয়েছি, কেননা, তা কখনো তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষা আর স্নেহশীল সত্তাকে ছাপিয়ে যায়নি। ফলে বড়দের নানারকম টানাপোড়েনের মধ্যেও, অন্তত তিনি যতদিন সক্রিয় ছায়ানটে, কখনো উপেক্ষা বা অনাদর বোধ করিনি। আমিই বরং শেষের বছরগুলোতে ব্যক্তিগত নানান ব্যস্ততা-বিপর্যয়, করোনার প্রাদুর্ভাব, বিদেশযাত্রা – সব মিলিয়ে তাঁর সাথে যোগাযোগ রেখে উঠতে পারিনি। সে বেদনা মনে রইবে।

ওঁর ব্যক্তিত্বের নানান দিকের মধ্যে, বিশেষভাবে, একনিষ্ঠ কর্মযোগীর সত্তাটি সব সময়ই খুব আকর্ষণ করেছে আমাকে। অপরিসর খাবার টেবিলটিতে স্তূপাকৃতি বই-খাতা-কাগজের মধ্যে ডুবে আছেন, এ দৃশ্য বহুবার দেখেছি। এই পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকেই চলেছে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, গান বাছাই, রিহার্সালের তত্ত্বাবধান, সঙ্গে আরো বিচিত্ররকমের সাংগঠনিক কাজ। এরই মধ্যে, যাপিত জীবনে সংকট-বিপর্যয় এসেছে নিয়মিতই। কিন্তু সেসব কখনো অলঙঘনীয় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তাঁর সামনে। ‘তরীখানা বাইতে গেলে, মাঝে মাঝে তুফান মেলে’ – এ তো তিনি দেখেই গেছেন জীবনভর। তাই বলে হাল ছাড়েননি, বরং ‘শক্ত যা তাই সাধতে হবে, মাথা তুলে রইব ভবে’ – এই উজ্জীবনী নির্ভয়গান কন্ঠে নিয়ে বরাবর এগিয়ে গিয়েছেন স্থির প্রত্যয়ে। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের পথে একজন সনজীদা খাতুনের আজীবনের কর্মময় অভিযাত্রার তুলনা মেলা ভার।

কিন্তু তাঁর পথ কি গন্তব্যে পৌঁছলো শেষ পর্যন্ত? আজকের বাংলাদেশে সে কথা জোর দিয়ে বলা মুশকিল। তাঁর প্রয়াণের পর অশ্রুসজল সুরময় শেষযাত্রার বিপক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার যে প্রবল রূপ দেখা গেল, তা প্রায় অদৃষ্টপূর্ব। তবে এক অর্থে, এসকল যুক্তিরহিত, এমনকি ভব্যতার সীমাজ্ঞানশূন্য বয়ানের তাৎপর্য সুগভীর। এসব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা এ দেশে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ ও তা অটুট রাখার জন্য তরুণ বয়স থেকে যে সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন, ইতিহাসের কালপরিক্রমায় আজ তা এক নতুন পর্যায়ে উপনীত। উত্তরপ্রজন্মের হাতে সে লড়াইয়ের ব্যাটন হস্তান্তর করেই যেন তিনি ছুটি নিলেন। জানা রইলো, পথের কাঁটা পায়ে দলে তবেই এগোতে হবে তাঁদেরই মতো; আজ হয়তো সে কাঁটার ধরন বদলেছে কেবল।

কিন্তু এর বিপরীতে যে শত-সহস্রজন তাঁর বিদায়ে ব্যক্তিগত শূন্যতা অনুভব করেছে, শোকবিহ্বল চিত্তে নীরবে বা সরবে প্রতিবাদী হয়েছে, তাদের সংখ্যাও উপেক্ষা করার মতো নয়। তাদের অন্তরময় শোক-শ্রদ্ধা-শপথে আমরা দ্বিধাহীনভাবে এও অনুভব করি, তিনি আর কেবলই একটি পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের সদস্যমাত্র নন, সেসব ছাড়িয়ে কখন হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের এক আইকনিক চরিত্র। তাঁর আজীবনের সাধনা, বহু মানুষকে দিয়েছে পথের দিশা, এগিয়ে যাবার প্রেরণা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, তাঁকে নিয়ে বিরুদ্ধবাদীদের এতো ভয় ঠিক সে কারণেই!

ভুললে চলবেনা, এ পথে তিনি একা ছিলেন না, এ একদল সমমনা সাহসী মানুষের সম্মিলিত অভিযাত্রা। এক অবিস্মরণীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, রাজনৈতিক সংগ্রামের পথ উজিয়ে, সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে স্বাধীন বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে এঁদের জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। সেই প্রিয় স্বদেশের যেকোনো সংকট মোচনে আজ তাই প্রয়োজন সমদর্শী সুহৃদদের যূথবদ্ধতা, চাই তাদের সুচিন্তিত সক্রিয় পদক্ষেপ। তিনি ও তাঁর মতো সকল পূর্বসূরীদের আজীবনের সাধনার অমূল্য অর্জন সমুন্নত রাখার প্রত্যয়দীপ্ত শপথই হোক আজকের দিনের শ্রদ্ধা নিবেদনের অর্ঘ্য, বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারের প্রত্যুত্তর।

নবপর্যায়ের এই অভিযাত্রায় তিনি হয়তো সশরীরে নেই, কিন্তু আছে তাঁর ও তাঁদের উজ্জ্বল পথরেখাটুকু। সে পথের চিরন্তন এক বাতিঘর হয়ে তিনি আছেন-থাকবেন আমাদেরই সাথে।


লেখক পরিচিতি
মৃত্তিকা সহিতা
জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে।
পেশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন।
ছায়ানটের ছাত্রী এবং শিক্ষক।
সঙ্গীতসংগঠন রক্তকরবীর একজন সক্রিয় সদস্য।
সঙ্গীত শিল্পী। লেখক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ