রুখসানা কাজলের গল্প: নীল ও সাইদার গল্প





টপৌরে একটি রেস্টুরেন্টের কাপল টেবিলে বসে অপেক্ষা করছে সাইদা। সাত সমুন্দুর পেরিয়ে ওর বন্ধু নীল এসেছে। খুব বেশি বিশেষ বন্ধু। অনেক অনেকদিনের আলোচনা শেষে আজ হয়ত একটি সিদ্ধান্ত হতে পারে ওদের সম্পর্কের নামকরণে।

নীল জানিয়েছিল, ঢাকা শহরের কুখ্যাত জ্যাম যেন কিছুতেই আমাদের সময় খেয়ে না ফেলে। কাছাকাছি সময়ে পৌঁছে যাওয়া যায় এরকম কোন কফি শপ হলে ভাল হয়। সাইদারও গোপন ইচ্ছে বন্ধুকে আরেকটু বেশি সময় কাছে পাওয়ার। অনেকটা সময় নিয়ে গল্প করার। কিছুটা হলেও নিজেদের আরও একবার ভাল করে জেনে নেবে। শরীর পারমিট করলে বাঁধা দেবে না। ওরা ত টিনএজার বা তরুণ নয় । মতে না মিললে ভবিষ্যতেও যেন ভালো পড়শি হয়ে থাকতে পারে। মনপড়শি। মসজিদ-মন্দিরের সামনে দিয়ে নিত্য হেঁটে যাওয়া সেইসব দিলখুশ মানুষদের মতো যারা ঈদের নামাজ, দুর্গা পুজোর উৎসবকে সানন্দে উপভোগ করে। বছরে একবার দুবার দেখা হবে। তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের কয়েকটি দিন না হয় বেহিসাবি উড়ে যাবে ওদের।

নীলকে জানিয়ে দেয় সাইদা, লেকের ধারে খুব ঝকঝকে নয়, কিছুটা ঘরোয়া কিন্তু আপন গন্ধমাখা এ রেস্টুরেন্টের কথা। দূরত্বের মাপে এখানে দুজনের খুব বেশি সময় ক্ষেপণ হবে না। আর সময় বাঁচলে আমাদের গল্প যে কেবল লম্বা হবে তা নয়, ডালপালা ছড়িয়ে ঝোপালো হয়েও উঠতে পারে!

নাম বলতেই রেস্টুরেন্টটি চিনতে পারে নীল। ওর চেনাজানা লোকেশন। চেনার আনন্দে উচ্ছ্রসিত হয়ে পড়ে, তোমার চয়েসকে সেলাম। আমি চিনি। চিনি গো। খানিকটা হেরিটেজ টাচ্‌ আছে। নাইস প্লেস। থ্যাংকু থ্যাংকু সু--

পূর্বপুরুষের দেশে এসে সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে এখানে কফিপান করে গেছে নীল। এদেশে ওর বন্ধু সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। অনেক টলটলে, তরুণ, ব্রিলিয়ান্ট এবং ভালো মনের কবি গল্পকার নাট্যকর্মী মেয়েবন্ধু রয়েছে। তবু নীল সাইদাতেই নীলাভ হতে চাইছে। সাইদার সাথেই বাকি জীবনের গিট্টু বাঁধতে চাইছে গেল দুবছর ধরে ! সাইদা হ্যাঁ না এর দোলনায় ওর সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রেখে বলেছে, এসো কথা বলি। জানো ত দূরবর্তী কাশবন ঘনঘোর গাঢ় লাগে !

বাঙ্গালীর জীবনে হড়হড় করে ঢুকে পড়েছে আধুনিকতা। ভাঙ্গো ফেলো, মুছে দাওএর এক রে রে সংস্কৃতির তোড়ে সাবেকি বাঙ্গালী জীবন এখন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাই কোথাও এক ঝোপ সন্ধ্যামালতি, আকন্দবন কিম্বা ধুতরাফুলের গাছ দেখলে, মাটির শানকিতে ভাতমাছ সর্ষেচচ্চড়ি পরিবেশিত হলে মনে পড়ে যায় পঞ্চাশ বছর আগেও আমরা সর্বৈব বাঙ্গালী ছিলাম।

নো স্মোক জোনের কর্ণার টেবিলে বসে বাংলাদেশের অবসর প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত ভূমেন্দ্র গুহ এর ‘আলেখ্যঃ জীবনানন্দ’ বইটির পাতা উল্টেপাল্টে দেখছিল সাইদা। খুব মন লাগিয়ে কষে পড়তে হবে বইটি । ওর বহু বহুদিনের ইচ্ছে, ইচ্ছে না বলে অভিলাষ বলাটাই ঠিক হবে, কবি জীবনানন্দ দাশের অসুখি জীবনের জন্যে লাবণ্য গুপ্তকে দায়ী করে তার কপালে দেগে দেওয়া একমেবাদ্বিতীয়ম কলঙ্ক তিলকখানি মুছে দেওয়ার।

কি জন্যে শুনি ? যে স্ত্রী হাসপাতালে পড়ে থাকা মরণাপন্ন স্বামীকে সেবা ত দূরের কথা, দেখতে পর্যন্ত অনিচ্ছা দেখিয়েছে তার জন্যে এত টান কেন তোর ? নিজেকে সাইদার স্বঘোষিত প্রেমিক ভাবা মুস্তাক রেগেমেগে জানতে চেয়েছিল।

শান্ত মেজাজে সাইদা জানতে চেয়েছিল, আচ্ছা মুকাই তোর বউ কোন সাবান ব্যবহার করতে ভালোবাসে তুই কি জানিস ?

চরজাগার মত মুস্তাকের সদ্য উত্থিত ভুঁড়ি টুকি দিচ্ছে। টাক ঢাকার ব্যর্থ প্রয়াসে প্রাণান্তকর। তবু আত্মবিশ্বাসের লাটিম হাসি দিয়ে জানায়, অই ডাভ ছাড়া আর কী ! বডির জন্যে হার্ড ডাভ আর হাতে পায়ে মুখে লিকুইড বাটার ডাভ।

এক্সিলেন্ট ! টেন আউট অফ টেন। এবার বল ফিজিক্যালি তোরা —

কফির উপর ক্রিম দিয়ে আঁকা মিউ বিড়ালের ছবিটা স্পুন দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে পাক্কা প্রোগ্রোমারের মত মুখ করে মুস্তাক, এই তুই কি আমারে দিয়ে জীবনানন্দকে ম্যাপ করছিস নাকি ! তাইলে জেনে রাখ দুপিস ছেলেমেয়েও হয়েছিল ওদের। যদি ফিজিক্যালি হ্যাপি না ---

থাম। বাচ্চা পয়দা করতে জানলেই যদি হ্যাপি কাপল হয়, তবে তুই তোরা অসুখি কেন ? এত সুখে থেকেও তোদের বউরা কেন বয়ফ্রেন্ড পোষে আর তুই গার্লফ্রেন্ড খুঁজিস টাকলা গাধা !

শয়তানটা পরাজিত সৈন্যর মতো হাত উঁচু করে হেসেছিল, ওরে থাম থাম ! আসলে কি জানিস, জীবনানন্দ দাশ বিয়েটা না করলেই ভাল করত। সংসার ত রাজ্য পত্তনের সমান। তাতে অর্থ যেমন লাগে তেমনি মনের জোরও লাগে। খালি উত্থিত লিঙ্গতে ওসব কুলায় না। অই যে মহামতি আলেকজান্ডার বলে গেছেন, প্রেমিক বা স্বামীর অর্থকড়ি ধনসম্পদ না থাকলে বিয়ের পর জানালা ---

কে বলে গেছেন ? মুস্তাকের কাছ থেকেই উপহার পাওয়া ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উপর লেখা বই দিয়ে ওর মাথাটা আচ্ছা করে ঠুকে দিয়েছিল সাইদা। এখানে এই টেবিলে। গত সপ্তাহে ওদের আড্ডা জমেছিল।

।।দুই।।

নির্ধারিত সময়ের কুড়ি মিনিট উতরে গেছে। নীল এসে পৌঁছাতে পারেনি বলে বিরক্ত লাগছে না ওর। এ শহরে এটাই স্বাভাবিক। হয়ত কোথাও থির হয়ে জমাট বেঁধে আছে বাস, মিনিবাস, প্রাইভেট কার, রিক্সা। একচক্ষু রাক্ষসের মত অনন্তকাল চেয়ে আছে লাল সিগন্যাল বাতি। অই জ্যামের ফাঁকফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে আসছে কোন মোটর সাইকেল বা স্কুটি। ফুটপাত সচকিত করে চালক খানিকটা পথ এগুতে পারলেও বেদম গালিগালাজ খাচ্ছে হকার আর পথচলতি মানুষদের কাছ থেকে। ব্রিলিয়ান্ট বুদ্ধি হল, এরকম সময় বুদ্ধ বুদ্ধ মুখ করে নির্বিকার আর মৌন থাকতে হয় ! সোনার চেয়ে দামি সময় বাঁচাতে আম পাবলিকদের ওরকম দু চারটা কাঁচা গালাগালিকে পাত্তালে খ্যাচ বেঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাতে আরও দেরি হয়ে যায়। এই জ্যাম যন্ত্রণার চোটে সাইদা নিজেই গাড়ি ছেড়ে স্কুটি নিয়েছে। ধারে কাছের কাজগুলো আগের চেয়ে এখন কম সময়ে করে ফেলতে পারে বলে ফালতু টেনশনে পড়তে হয়না।

স্যরি সাইদা, তুমি মনে হয় বিরক্ত হচ্ছ ! নীলের বিপন্ন ভদ্র কন্ঠস্বর। জানিয়ে দেয় সাইদা, হচ্ছি না নীল। একটি বই পড়ছি। তুমি নিশ্চিন্তে এসো।

মনে মনে বলে, আজ তোমার দিন বন্ধু।

‘আলেখ্যঃ জীবনান্দ’ বইয়ের পঁচাত্তর পৃষ্ঠায় কথাঞ্চিত অবজ্ঞার সুরে ভূমেন্দ্র গুহকে কবি জীননানন্দের স্ত্রী লাবণ্য দাশ বলেছিলেন তোমার দাদার চেহারা এমন কিছু রাজপুত্তুরের মত ছিল না যে ছবিটবি তোলানো টোলানো ব্যাপারে বিশেষ মাথা ব্যাথা রাখতে হবে।

সময়টা ছিল শোকের। কবির মৃত্যুর মাত্র কয়েকটি দিন গত হয়েছে। কবি অনুরাগীরা শোকসভা করবে। সে কারণে কবির একটি একক ছবি পেলে খুব ভাল হয়। অথচ কোথাও ছবি পাওয়া যাচ্ছে না। স্ত্রী ভাইবোন কারও কাছে, এমনকি ছবি তোলায় অপারদর্শী হলেও নিজের রঙচটা পুরনো বক্স ক্যামেরায় যত্রতত্র যার তার ছবি তুলতে ভালবাসত কবির যে ছোট বোন সুচরিতা দাশ, তার কাছেও তার কবিদাদার কোন একক ছবি নেই। তাতে অবশ্য সুচরিতার কোন দোষ হতে নেই। কিন্তু বাড়ি ভর্তি শোকার্ত আত্মীয়পরিজন, ভক্তঅনুরাগী, বন্ধু গুণাগ্রাহী। কবির আত্মা অদৃশ্য আলয়ে থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাড়ির সিঁড়িঘর, ছাদরুম আর তালাবদ্ধ কালো ট্রাঙ্কের জাদুবাস্তবতার গর্ভে। সেই শোকাকুল পরিবেশে কবির একান্ত অনুরাগী, দুঃখতাপে বিক্ষিপ্ত সদ্য কবি স্নেহ থেকে চিরবঞ্চিত বিষাদাচ্ছন্ন ভূমেন্দ্রকে ঠাস করে কথাগুলো বলে দিলেন কবিজায়া দুষ্ট নারী লাবণ্য দাশগুপ্ত। তুচ্ছতার তবক লাগানো গ্লানি কলঙ্কিত অই মুহুর্তে ট্রাঙ্ক বন্দি মাল্যবান কি ঠোঁট টিপে অস্বস্তি চেপেছিলেন ? তিনি তো জানতেন, পৃথিবীর শেষ ঘুঘুটি যদি গেয়ে যায় মরণগান, কিছুতেই বদলাবে না লাবণ্য দাশ !

সাইদার বিশ্বাস, স্বামীর কর্মহীনতা নিত্য অভাবঅনটন আর যাপিত জীবনের চাওয়া পাওয়ার বৈষম্যে মানসিক স্থিতি হারিয়ে ফেলেছিলেন লাবণ্য গুপ্ত। বাবামাহীন এতিম লাবণ্যের পাশে কেউ ছিল না। অন্য দশটি মেয়ের মতো তিনিও স্বামিকে চেয়েছিলেন সুহৃদ সবল কর্মে উদ্দাম পুরুষ হিসেবে। খুব কি অপরাধ ছিল এ চাওয়ায় ?

অথচ নিরন্তর আত্মমগ্নতায় বিভোর থেকে আত্মীয়পরিজন লেখালিখির আশির্ব্বাদ ছাড়াও স্থায়ী কর্মহীন কবি পেয়েছিলেন শোভনাকে !

।।তিন।।

একানব্বই সালের একরাত। সাইদাদের রায়েরবাজারের বাড়িতে অনাদর অবহেলায় বেড়ে ওঠা ছোটখালার কাছে প্রচুর বিরক্তি নিয়ে জানতে চেয়েছিল, খালামণি এমন বাজে একটা লোককে তুমি কেন বিয়ে করতে রাজি হয়ছিলে বল ত দেখি !

দুহাতের সোনার কঙ্গন ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছোটখালা বলেছিল, এতিম ছিলাম যে। তোদের বাসায় পরগাছার মত থাকতাম। দেখেছিস ত রান্নাঘরের ফ্লোরে ঘুমাতাম। মাঝে মাঝে তোর ঘরে। ব্রেন ভাল ছিল। তাতে কি ! খর্চার ভয়ে কেউ পড়াশুনার ভার নেয়নি। তোর ছোটখালু চেহারা স্বভাবে দেখতে রাজপুত্তুর না হলেও আমি ত খেয়ে পরে নিশ্চিন্তে আছি। ভালো আছি।

খেয়ে পরে ? শুধু খাওয়া আর পরার জন্যে ? সেদিন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল সাইদার মন।

ছোটখালু কেবল দেখতে অসুন্দর ছিল তা নয়। অসহ্য বিরক্তিকর স্বভাবের একজন লোক ছিল। খাওয়ার সময় বিশ্রী ছপছপ শব্দ করে চিবোত। বোনপ্লেট ইউজ না করে টেবিলেই এঁটোকাঁটা ফেলে রাখত। খাওয়া শেষে প্লেটে হাত ধুয়ে পেট টান করে ঘেউঘেউ করে ঢেঁকুর তুলত। খকখক করে ডাইনিংএর বেসিনে সর্দিকাশি ঝেড়ে ভাল করে ক্লিন করত না। মাঝে মধ্যে বাথরুম নোংরা রেখে চলে আসত। সবচে বেশি রাগ লাগত যখন টিভি দেখতে দেখতে সশব্দে বাতকর্ম করে ছোটখালাকে ডেকে বলত, এট্টা ইন্টাছিট আনি দেও ত মুনিরা। গ্যাস জমি পাইখানাডা আটকি গেছে প্যাটে।

খালুকে দেখলে বাসার সবাই আতঙ্কে থাকত। যদিও মাত্র একদিনের জন্যে বেড়াতে আসত। অই একদিনেই বাসাশুদ্ধ আমাদের ওয়াকথু অবস্থা হয়ে যেত। অবশ্য যাওয়ার সময় খালুর মানিব্যাগ খুলে মুঠো ভরে টাকা নিয়ে ছোটখালা সাইদাকে বলত, তোর ইচ্ছেমত বই কিনিস বুনো। আপা দুলাভাইয়ের অবস্থা ত দেখছিস। ঝগড়া করিস না মা।

স্বামি গর্বে উদ্ভাসিত হয়ে লাবণ্য কি এমন দান কখনও কাউকে দিতে পেরেছে ! পারেনি। বরং বারবার আওয়াজ খেয়েছে। বাংলা সাহিত্যের নাভিমূল থেকে দুয়ো উঠেছে সহায় সম্বলহীন বিধবার হাহাকার নিয়ে। কবির মৃত্যুর পর, …হয়ত বাংলা সাহিত্যের জন্যে অনেক কিছু রেখে গেলেন কিন্তু আমাদের জন্যে কি রেখে গেলেন -- লাবণ্য দাশের এ হাহাকারটিকে স্বার্থপরতার মোড়কে মুড়ে কুবাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজও ভাসছে। অথচ দুটি সন্তানসহ বিধবার অবস্থানটি কেউ বুঝতে চায়নি। তখনও না। এখনও না ! লাবণ্য তাই বন্য নিষ্ঠুর দুর্মুখ মনোরুগি। কোন চিকিৎসা হয়েছিল লাবণ্যের ?

তুই কি পাগল ? কে করবে ? ড্রাই ফ্রুটের অর্ডার দিয়ে বলেছিল মুস্তাক, কপালও ছিল লাবণ্যে দাশের ! ছেলেটা ত জানিসই। মেয়ে মঞ্জুশ্রীও—

।।চার।।

পয়তিরিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। চেনা ওয়েটার এক বোতল পানি আর মেনু বই নিয়ে জানতে চাইল, চা খাবে কিনা ! খুব বেশি চা খায় না সাইদা। নইলে এতক্ষণে এককাপ রঙ চা খেয়ে নিত। অদ্ভুত ভালো রঙচা বানায় এরা। পিওর হানি কালার। তাতে দুলে দুলে ভাসে ইটালিয়ান বেসিলপাতা। সোনার কাঠির মত কয়েকটি লবঙ্গ থাকে কাপের তলদেশে। দারুণ টেষ্ট। নীল এলেই খাবো না হয়। তারচে বইটা পড়ি ভেবে মগ্ন হয়ে যায় সাইদা।

হাই সাইদা। অ্যা য়াম নীল উইলসন হাওয়ার্ড।

হঠাত আলো হয়ে উঠল নো স্মোক জোন। দেড় ফুট টেবিলের ওপাশ থেকে দুখানি হাত প্রসারিত করে হাসছে যে, সে পয়তাল্লিশের এক প্রৌঢ় যুবক। বহুবার দেখা চেহারা। অবশ্য ভার্চুয়াল। এবার একেবারে সামনে। কেমন যেন থ্রিল জাগে ওর। পয়তাল্লিশের একলা শরীরে তীব্র গোপন অনুনাদ জেগে ওঠে। গলে যেতে যেতেও সামলে নিয়ে বেকুবের মত হেসে ফেলে, এদেশে ওসব হাগফাগ চলে না নীল। আরাম করে বসে পড় প্লিজ।

অহো এক্সট্রিমলি স্যরি। ভুলে গেছিলাম নব্বই পার্সেন্ট মুস্লিমদের দেশে তুমি বসে আছ। আমি হয়ত শুধু হাগ করে থেমে থাকতে চাইতাম না সু ! উষ্ণ হচ্ছি তোমাকে দেখে।

স্বল্প চুল। লম্বা জুলফি। সেখানে দুএকটা মুক্তো রঙ সাদা চুল জ্বলজ্বল করছে। গলার বয়েস রেখার ভাঁজে ঘাম জমেছে। জামার কোথাও কোথাও ঘামে ভেজা। তার মানে পাবলিক বাসে করে এসেছে। তারপর আসাদগেট নেমে হেঁটে এসেছে এখানে। বেচারা। নীলকে ওর চেয়ারটা ছেড়ে দেয় সাইদা। ওর পেছনেই এসি। ঠান্ডা বাতাস সরাসরি এসে শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছিল শরীর।

ওহ্‌ নো ইট উইল বি---

ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে সাইদা। নীলের চোখে বিমোহন। এবার আরাম পাচ্ছে। জামার কলারটা খানিক টেনে ঢিলেঢালা করে দেয়। পানির বোতলের মুখ খুলে গ্লাস টেনে মৃদু হাসে, জানো বার বার কেন বাঙ্গালী বিশেষ করে বাংলাদেশী নারীদের কাছে আমি ফিরে আসি ? এই কেয়ারটুকু পাওয়ার জন্যে।

মন রাখা প্রশংসা বা যাই হোক হাসিমুখে গ্রহণ করে সাইদা, এবার কি নিয়ে লিখছ ? গেল সপ্তাহে তোমার নিবন্ধটা পড়েছি।

কেমন লাগল ? লাইন ঠিক আছে ত ?

ফ্রুট আইস্ক্রিমের অর্ডার দিয়ে সাইদা বলে, অতিরকমের অতিরিক্ত লাগল। তোমার লেখা বদলাচ্ছে।

মানে ?

রাজনৈতিক সমালোচনা নেই। ব্যক্তিগত আক্রমণে শানিত। অবশ্য তোমার পার্টি যদি কবুল বলে ত তুমি তাদের জামাইরাজা।

নীল হোহো করে হেসে ফেলে। বাঁধানো দুটি দাঁতের রুপো রঙ ঝলসে ওঠে দারুণ আনন্দে। কমরেড না বলে সাইদা যে ওকে জামাইরাজা বলেছে সেটি খেয়াল করে না বা ইচ্ছে করে এড়িয়ে যায় ।

ওদের আলোচনা বিশ্বমানচিত্র ঘুরে এমন একটি বিষয়ে এসে ঠেক নেয়, যার জন্যে কিছুটা প্রস্তুত হয়েই ওরা এসেছিল। উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব-পশ্চিম ভূতল উতল থেকে সাইদা নীলকে দেখে। দেখে বললে ভুল হবে। অনেকটা যেন যাচাই করে। বিবাহবিচ্ছিন্ন এক পুত্রসন্তানের বাবা। এদেশের অনেক নারীর সাথেই ওর সখ্যতা রয়েছে। কবি, লেখক অভিনেত্রী। নীলের পোষ্টে কমেন্টের বন্যা বয়ে যায়। কেউ কেউ ইনবক্স পর্যন্ত কামনার আশ্লেষ ছড়িয়ে ভাসিয়ে দিতে চায়। সাইদাও নীলের লেখা দেখে। দ্বিমতে কড়া কমেন্ট দেয়। তাতে নীলের কোন অনুযোগ থাকে না। প্রতিদিন একবার দুবার মন চাইলেই ওদের কথা হয়। কথার রাজা নীল। কিভাবে যেন অন্য একটি সম্পর্ক ওদের মধ্যে চারিয়ে গেছে।

সরাসরি প্রপোজ করে নীল। হিরে বসানো আংটি সাইদার আঙ্গুলে পরাতে গিয়ে অনুনয় করে, হ্যাঁ বল সাইদা। আমি তোমার কোনকিছুতেই অধিকার ফলাবো না। শুধু বছরে একবার দুবার পাঁচ-সাত দিনের জন্যে তোমার সাথে সংসার করতে আসব। তুমি লিস্ট করে দিবে আমি বাজার করে আনব। বেসিনের কল, এসি ফ্যানের রেগুলেটর ঠিক করে ঘরটাকে আমাদের গন্ধে ভরিয়ে রাখব। আমার স্পাউজের ঘরে লেখা থাকবে, সাইদাতুলন্নেসা নীল।

হাসতে হাসতে আংটিটা পরে নেয় সাইদা। দ্বিতীয় বারের মত হিরে উঠল ওর আঙ্গুলে। একটি কন্যা সন্তান আছে ওর। ক্যাথারিন। ইংল্যান্ডে বাবা আর স্টেপ মা মেলিন্ডা এবং সৎভাই কায়সারের সাথে থাকে। ভাল আছে। বৃটিশ বাঙ্গালী পরিবার হলেও মেলিন্ডা এশিয়া অনুরক্ত। সাইদার প্রথম স্বামি আনিস কায়সার এখন সুখি।

আংটিটা দেখতে দেখতে সাইদা হাসে, দ্যাট এটারন্যাল ড্রিম। এরপর বলবে না ত, ঘর কেমন খালি খালি লাগে, একটা বাচ্চা হলে ---- আমি কিন্তু পয়তাল্লিশ এবং ন্যাচারাল নিয়মে বন্ধ্যা।

নীল ওর বুকের ভেতর সাইদার হাত জড়িয়ে রাখে। উষ্ণ বিবশ কিছু মুহুর্ত। গলে যাচ্ছে। গলে যাচ্ছে সাইদা। যতখানি আশ্লেষ জমে ছিল কামের ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে ওদের শরীর জুড়ে। ঘন দুটি চুমু খাওয়ার ঘনিষ্ঠ আবেগের মুহূর্তে করুণ সুরে বেজে ওঠে নীলের মোবাইল। স্ক্রিনে হৃষ্টপুষ্ট একজন লোকের ছবি। হয়ত অবাঙ্গালী। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও নীল রিসিভ করে এবং এরপরেই উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ায়, স্যরি সু জাস্ট ওয়ান --

নারকেল গাছ বেয়ে উঠে গেছে জায়ান্ট মানিপ্ল্যান্ট। বিশাল হলদেটে পাতা ছুঁয়ে পাটের শিকায় ঝুলিয়ে রাখা লালনীল নকশা আঁকা মাটির হাঁড়ি পর্যন্ত হেঁটে এসে ঘুরে ঘুরে কথা বলছে নীল। কিছুটা উত্তেজিত। আগের কথাগুলো কি ছিল বোঝা যায়নি কিন্তু, ফাকিং রিলিজিয়ন, কাট দেম, অল দে আর বাস্টার্ড’ বলে নীল যখন টেবিলে ফিরে এলো তখন ওর চোখমুখ জুড়ে বিরক্তির লাল ছিটে দপদপ জ্বলছে।

।।পাঁচ।।

আংটিটা নীলের হাতে দিয়ে ওর হাত ধরে রাখে নিজের মুঠোতে। চুমু খায় উষ্ণ কম্পময় নরম হাতদুটিতে, আমরা বন্ধু থাকব নীল।

ঝুঁকে আসে নীল। অনেকখানি ঝুঁকে গলাভাঙ্গা সারসের মত ঘসঘস করে জানায়, ঘৃণাটা পেরুতে পারলাম না সু। আমার ধর্ম বদলেছে দুপুরুষ আগে। আমি এখন এশিয়ানও নই। তবু রক্তের ভেতর গেঁড়ে থাকা সংস্কারকে মুছে ফেলতে পারলাম না। এই যে তোমার রিলিজিয়ন ! কি যে ঘৃণা করি। অথচ তোমাকে ভালবাসি। ভীষণ। ভীষণভাবে। প্রাণের চেয়েও — কান্না উদ্যত ফোঁপানি চেপে রাখতে চেষ্টা করে নীল।

নীলের হাত ছেড়ে দেয় না সাইদা। ঝুমন দাশের জামিন হয়ে গেছে। আসছে পুজায় মূর্তিভাঙ্গা হবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আফগানিস্তানে চলছে শকুনের উৎসব। দক্ষিণ ভারত থেকে পালাচ্ছে মুসলিমরা। আসামে চলন্ত ট্রেনে খুঁজে খুঁজে ছুরি চাকু দিয়ে ক্ষতাক্ত করে মুসলিমদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে বাইরে। বাংলাদেশি তকমা মেরে সরকারি মদদে চলা উৎপীড়নে মৃত মিঞা মুসলিমের লাশের উপর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে প্রেতনৃত্য নাচছে হিন্দুত্বভাবি। আর অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ওর আত্মীয় হিন্দু মুসলিম দম্পতির মধ্যে লড়াই চলছে। হিন্দু বাবা তাদের মেয়েকে ত্যাগ করেছে। কারণ মেয়েটি মুসলিম বিয়ে করেছে। মাঝে মাঝে এ নিষ্ঠুরতা সাইদাকেও ছুঁয়ে যায়। ভারতে ঘুরতে গেলে জাতপাতের বৈষম্য না মানা বন্ধুদের সতর্ক ইশারায় কোথাও কোন স্থানে বা বাড়িতে সাইদাও লুকিয়ে ফেলে ওর ধর্ম পরিচয়। নীলকে বুঝতে পারে সাইদা। ওর হাতের ভেতর জড়িয়ে রাখা নীলের হাতের শিরাগুলো কাঁপছে। বিচ্ছিন্নতার বিপর্যয়ে কান্নাতোয়া সাইদার রক্তক্ষরণ বিপন্ন অসহায়ে মিশে যাচ্ছে ওই কাঁপুনির সাথে। পুরোহিত পরিবারের রক্ত বইছে নীলের শরীরে। চরম দারিদ্র্যের কারণে খ্রিষ্টান হলেও রক্তমজ্জায় জেগে আছে হিন্দুত্বের অহংকার। একই সাথে মার্কস লেনিনের উপর রয়েছে প্রচন্ড আস্থা। নীল যদি বস্তু হয় তবে সে দ্বান্দ্বিক মনোঘাতে বিপর্যস্ত। এভাবে ত কমিউনিজম হয় না। সেকুলার হওয়াও সুকঠিন ব্যাপার।

হাত বেয়ে স্নেহমায়ার নকশি আদর ঝরে পড়ে। নীলের ডানহাত ওর বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়ে কান্না চাপে সাইদা, জানো এই লেকপাড়ে বেতঝোপ, হিজলের সাথে শুনেছি একটি রক্তপলাশ গাছও আছে। যাবে নীল ? চলো খুঁজে দেখি। যদি পাই !

দুমড়ে মুচড়ে ধ্বস্ত শরীরটাকে টেনে তোলে নীল, একটু পরেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। অন্ধকারে--

এখনও হয়নি। চলো না প্লিজ।

রেস্টুরেন্টের বাইরে লম্বা ঠোঁট বিছিয়ে মেইনরোডে চলে গেছে একটি বুকখোলা রাস্তা। পেরুলেই বাসস্ট্যান্ড। ইচ্ছে করলে বাস ধরে চলে যেতে পারে নীল। দোলায়মান নীল সময় নিচ্ছে। বামে পাখনার মত ছড়িয়ে আছে লেকউন্মুখ একটি রাস্তা। সাইদাও সময় নেয়।


লেখক পরিচিতি: রুখসানা কাজল এর জন্ম তারিখ ২৩ নভেম্বর। বেড়ে ওঠা গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর এবং ঢাকায়। বর্তমান আবাসস্হান: ঢাকা। প্রকাশিত গ্রন্থ: নুনফলগল্পগুলি, রসেবশে প্রকাশনী, কলকাতা, জলের অক্ষর নালন্দা প্রকাশনী, ঢাকা এবং অণুগল্পের বই- অনুপ্রাণন প্রকাশনী, ঢাকা।উপন্যাস: তোমার জন্যে মেয়ে, অনুপ্রাণন প্রকাশনী, ঢাকা, আহা জীবন চিত্রা প্রকাশনী, ঢাকা। আলালের আনন্দঘর, পরানকথা প্রকাশনী, ঢাকা।, এক কিশোরীর মুক্তিযুদ্ধ, ইত্যাদি প্রকাশনী, ঢাকা। ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে তার অনুবাদ গল্পগ্রন্থ 'আফগান নারী লেখকদের নির্বাচিত গল্প' প্রকাশক গল্পকার।
























একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ