এলহাম হোসেনের সঙ্গে কথোপকথন
গল্পপাঠ: বাংলাভাষায় অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি পাঠকের একধরনের অনীহা কাজ করে। এর পেছনে কী কারণ আছে বলে মনে করেন?
এলহাম হোসেন: এখানে বিশ্বাসের সংকটই মূল কারণ। ইংরেজি থেকে বাংলা হোক, আর বাংলা থেকে ইংরেজি হোক- উভয় ধরনের অনুবাদেই অনুবাদককে বিশ্বস্ত থাকতে হবে পাঠকের কাছে। এই বিশ্বস্ততা একজন দক্ষ অনুবাদক অর্জন করতে পারেন। আসলে, অনুবাদ তো শুধু ভাষান্তর নয়; এটি একটি ইন্টারডিসিপ্লিনারী কাজ। যার গ্রন্থ অনুবাদ করা হচ্ছে, তাঁর মনোভঙ্গি, সংস্কৃতি, সময়ের প্রতি প্রতিক্রিয়া, সংবেদনশীলতা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে দ্বিরালাপ- সবকিছু সম্বন্ধে অনুবাদকের খোঁজখবর করতে হয়। আবার একটি গ্রন্থের সিনক্রোনিক ও ডায়াক্রনিক লোকেশন থাকে। সেটিও অনুবাদকের মাথায় রাখতে হয়। আর এই যে বললাম ‘রাখতে হয়’- এই রাখার কাজ কিন্তু সহজাত নয়, পরিশ্রমলব্ধ। উপরন্তু, অনুবাদককে অবশ্যই উৎসগ্রন্থ ও উদ্দিষ্ট গ্রন্থের ভাষার উপর সমান দক্ষতা থাকতে হবে। শুধু ভাষা জানলে চলবে না; ভাষার ব্যঞ্জনা, দ্যোতকতা, মেজাজ সম্বন্ধেও স্বচ্ছ জ্ঞান থাকতে হবে। এতসব প্রস্তুতি নিয়ে তবেই তো অনুবাদ করতে হবে। এসব ছাড়া যদি কোন অনুবাদ করা হয়, তাহলে সেটি পাঠক হোচট খেতে খেতে কেন পড়বেন?
আর একটা কথা প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, সেটি হলো- অনুবাদ কিন্তু অরাজনৈতিক বা আপলিটিক্যাল কাজ নয়। এর মধ্যে পলিটিক্স আছে। অদক্ষতার কারণেই হোক, আর জেনেশুনেই হোক কখনও কখনও অনুবাদক তাঁর নিজের স্বর, কন্ঠ, ভাবনাকাঠামো অনূদিত গ্রন্থের ওপর চাপিয়ে দেন। এমন দৃষ্টান্ত এই ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক আমলেও প্রচুর রয়েছে। বেঙ্গল ফোর্টের প্রথম গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস এগারজন পÐিত ভাড়া করে আমাদের ভারতবর্ষের শাস্ত্রগ্রন্থসমূহ অনুবাদের উদ্যোগ নেন। উদ্দেশ্য ছিল এখানকার জ্ঞানতত্তে¡র ওপর কব্জা করা। শাসন করা। ঔপনিবেশিক হেজেমনি প্রতিষ্ঠা করা। এই পণ্ডিতেরা সংস্কৃত ভাষার শাস্ত্রগ্রন্থ যখন ইউরোপীয়দের বোধগম্য করার জন্য কোডিং করলেন, তখন সেই গ্রন্থগুলো আর ভারতীয় থাকলো না, হয়ে গেল 'Anglo-Brahminical text', শাস্ত্রের ভাষাও রইলো না, স্পিরিট বা আত্মাও রইলো না। উইলিয়াম জোন্স, যাঁকে প্রথম প্রাচ্যবাদী পণ্ডিত বলা হয়, তিনি ১৭৯৭ সালে কলকাতায় যে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠা করেন, তার পেছনের কারণও ছিল মূলত রাজনৈতিক। তিনি ঘোষণা করেন, “I can no longer bear to be at the Mercy of our pandits who deal out Hindu Law as they please, and make it at reasonable rates, when they cannot find it ready made.” অনুবাদ তো অন্য সংস্কৃতি, জীবনচর্চা, ভাবনাকাঠামো সম্বন্ধে অবগত হওয়ার দরজাও বটে। এখন এই দরজা কতটুকু খোলা হবে, পাঠককে এই দরজা দিয়ে পুরো দৃশ্য দেখতে দেব, না-কি আংশিক দৃশ্য দেখাবো, তা নির্ভর করে অনুবাদকের ওপর। আর এখানেই অনুবাদক তাঁর ক্ষমতার ব্যবহারও করতে পারেন, অপব্যবহারও করতে পারেন।
আবার আজকাল দেখা যায়, যে বইটি আজকে কোন বড় পুরস্কার পেয়ে গেল, যেমন- নোবেল বা পুলিৎজার বা বুকার, কালকেই বা দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই বাজারে তার অনুবাদ চলে এলো। এক্ষেত্রে মানের চাইতে প্রকাশক ও অনুবাদক বাজারটাকেই প্রাধান্য দেন। এই বাজার অনুবাদকের ঐকান্তিকতার পথে একটি বড় অন্তরায়। ব্যাপারটা হলো- সাধারণত যিনি অনুবাদ করেন, তিনি বিনিয়োগকারী বা প্রকাশক নন। প্রকাশক অনেক সময় অনুবাদককে ডিকটেট করেন। প্রকাশকের চাহিদামাফিক বাজার ধরতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করতে হয় অনুবাদককে। এতে অনুবাদের মান ক্ষুন্ন হয়। এ কারণেও পাঠক অনুবাদে আস্থা রাখতে পারছেন না।
আবার অনুবাদের পঠন-পাঠনের সঙ্গে পাঠকের মনস্তাত্তি¡ক সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু অনুবাদ রাজনীতিমুক্ত নয় এবং রাখঢাক করে হলেও রাজনৈতিক, তাই এটি পাঠে সচেতন পাঠকের একই সঙ্গে পাঠক ও সমালোচকের ভূমিকা গ্রহণ করে এগোতে হয়। এগোনোর সময় আগেথেকেই তাঁর একধরনের মাইন্ডসেট বা মানসকাঠামো থাকে। মানসকাঠামোর এই বাঁধাছকে যখন অনুদিত গ্রন্থটি পড়ে না, তখন তিনি সেই অনুবাদে আগ্রহ হারান।
গল্পপাঠ: মৌলিক সাহিত্য হিসেবে অনুবাদকে অস্বীকারের পেছনে মূল কারণ কী?
এলহাম হোসেন: যা মূলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাই তো মৌলিক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুবাদ মূলানুগ হয় না। এর পেছনের কারণ অনুবাদকের তাড়াহুড়ো বা যথেষ্ট শ্রম ও সময়ের অভাব, বাজারের দিকে তাকিয়ে অনুবাদ করা, প্রকাশকের প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র অনুসরণ করা ইত্যাদি। অনেক পাঠককে বলতে শুনেছি যে, যখন মার্কেজ নোবেল পুরস্কার পান তখন একরকম রাতারাতি তাঁর ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচুড উপন্যাসের অনুবাদ বের হয়। এটি পড়ে কেউ কেউ মার্কেজ যে কেন নোবেল পেলেন, তা বুঝতে অসুবিধেয় পড়ে যান। কিন্তু আরো বেশ পরে যখন আর একজন অনুবাদক এটি মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন, তখন সেটি আগের অনুবাদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি সুখপাঠ্য হয়। এর কারণ- এটি আগেরটির চেয়ে অধিকতর বেশি মূলের কাছাকাছি। এই যে মূল থেকে সরে যাওয়া- এ কারণেই অনুবাদ পাঠকের আস্থা হারায়। এই আস্থা অর্জনের জন্য অনুবাদকের আরো সময় নেওয়া প্রয়োজন। আর মূল ভাষা থেকে অনুবাদ করলে অপেক্ষাকৃত বেশি ভালো হয়। যেগুলো অনুবাদের অনুবাদ সেগুলো মূল থেকে দূরে সরে যেতে পারে স্বাভাবিক ভাবেই।
আর একটা ব্যাপার আছে। সেটি হলো- অনুবাদক অনেক সময় ক্যানিবালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ক্যানিবালরা যেমন মানুষকে খেয়ে ফেলে, তেমনি অনেক সময় অনুবাদক মূল গ্রন্থকে খেয়ে, হজম করে নতুন একটি গ্রন্থের উপস্থাপনা করেন। এটি মূলের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে না। একে কেউ কেউ ট্রান্সক্রিয়েশনও বলে থাকেন। ট্রান্সক্রিয়েশন সবসময় খারাপ নয়। জীবনানন্দ দাস ডবিøউ. বি. ইয়েট্স এর ‘হি রিপ্রæভস দ্য কার্লিউ’ কবিতার অনুবাদ করতে গিয়ে ‘হায় চিল’ কবিতা লিখে ফেলেছেন। এটি বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু বেশিরভাগ অনুবাদের ক্ষেত্রে তো এমনটা হয় না। হয় বিকৃতি। এসব কারণেও এখনও অনুবাদ মৌলিক সাহিত্যের মর্যাদা অর্জন করতে পারে নি। তবে বাংলাদেশে অনুবাদের যে প্রভূত অগ্রগতি হয়েছে, তা আপনাকে স্বীকার করতেই হবে।
গল্পপাঠ: অনুবাদ পরিশ্রমসাধ্য একটি কাজ। ভালো অনুবাদক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?
এলহাম হোসেন: এ কথা সত্য, অনুবাদ একটি পরিশ্রমসাধ্য কাজ। এটি সহজাত কোন দক্ষতা নয়। এটি রপ্ত করতে দরকার যেমন বিস্তৃত পড়াশুনা তেমন চর্চা। পড়াশুনার ব্যাপারটির কথা বলছি এ কারণে যে, অনুবাদককে শুধু উৎসগ্রন্থের ভাষা জানলেই চলবে না, উৎসগ্রন্থের প্রেক্ষিত, টেক্সচুয়ালিটি, এর সাংস্কৃতিক লোকেশন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার গভীর পাঠ ছাড়া উদ্দিষ্ট পাঠকের কাছে বিশ্বস্ততা রক্ষা করা সম্ভব নয়। সুইজারল্যাÐের ভাষাবিদ রোমেইন ইয়াকবসন তিন রকমের অনুবাদের কথা বলেছেন- ইন্ট্রালিংগুয়াল, ইন্টার লিংগুয়াল ও ইন্টার সেমিওটিক ট্রানশ্লেষণ। ইন্টার সেমিওটিক ট্রানশ্লেষণের ক্ষেত্রে অনুবাদককে উৎসগ্রন্থের রচিত হওয়ার সময়, প্রেক্ষিত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্বন্ধে জানতে হবে। কারণ, এই উপষঙ্গগুলো গ্রন্থের অর্থ, ব্যঞ্জনা, তাৎপর্য নির্মাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। অনুবাদ মানে তো শুধু ভাষার বদল নয়। এ কথা সত্য যে, ভাষা বদলালে অর্থও বদলে যায়। কিন্তু একজন ভালো অনুবাদক ভাষা বদলালেও উৎসগ্রন্থের ভাবনা, অর্থ, তাৎপর্য বদলে ফেলেন না। ভিন্ন একটি ভাষায় উৎসগ্রন্থের তাৎপর্য, ভাবনা ইত্যাদি ধারণ করার কাজ কঠিন বলেই এই কৌশল অনুবাদককে পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে অর্জন করতে হয়।
ফর্ডিনান্ড ডি সস্যুরের ল্যাং ও প্যারোলের ধারণা সম্বন্ধে অনুবাদককে সম্যক জ্ঞান রাখলে তাঁর জন্য ভালো হবে। মাথায় যে ভাবনাব্যবস্থা তৈরি হয়, সেটি ল্যাং, আর এরপর কলমের ডগায় বা মুখে যা বের হয় যোগাযোগের জন্য, সেটি প্যারোল। এই দু’য়ের মাঝখানে একটা স্পেস আছে। বেশ পার্থক্য রয়েছে। ভাবনাব্যবস্থার সব তো আর কথায় প্রকাশ করা যায় না। কথ্যভাষার এটি একটি বড় সীমাবদ্ধতা। একজন অনুবাদক কিন্তু এই দু’য়ের ঠিক মাঝখানে নিজেকে স্থাপন করেন। করতে হয়। এই দু’য়ের মধ্যে দ্বিরালাপ তৈরি করতে হয়। যে অনুবাদক যত ভালো দ্বিরালাপ তৈরি করতে পারেন, তিনি তত বেশি উৎসগ্রন্থের সুর, স্বর, ব্যঞ্জনা উদ্দিষ্টগ্রন্থে আনতে পারেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি শ্রমসাধ্য কাজ। সর্বোপরি, এ কথা অনুবাদককে সবসময় মনে রাখতে হয় যে, ভাষা আসলে অর্থ নির্মাণের প্রক্রিয়া। এ কথা তো গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর “দ্য পলিটিক্স অব ট্রানশ্লেসন” প্রবন্ধের একেবারে শুরুতেই উল্লেখ করেছেন। এই যে অর্থ-নির্মাণ-প্রক্রিয়া- তা তো বেশ কষ্টসাধ্য কাজ এবং এ কাজে সফল হতে অনুবাদকের কাছে প্ররিশ্রমী হওয়ার কোন বিকল্প নেই।
গল্পপাঠ: একজন অনুবাদক উৎসভাষা এবং উদ্দিষ্টভাষায় দক্ষ হলেই তিনি ভালো অনুবাদক হবেন, এমন কোন ফরমূলা কি অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে ঘটে?
এলহাম হোসেন: অনুবাদককে অবশ্যই উৎসভাষা এবং উদ্দিষ্ট ভাষায় দক্ষ হতেই হবে। এ ব্যাপারে কোন ছাড় নেই। এখন ব্যাপারটা হলো এই ‘দক্ষ’ বলতে আসলে আমরা কী বুঝি? বা ভাষা বলতে আমরা কী বুঝি। ভাষা তো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম না; এটি একটি ব্যবস্থা। শুধু উভয় ভাষা বলতে পারা, লিখতে পারা, শব্দভাÐার সম্বন্ধে জানা যথেষ্ট নয়। ভাষার কয়েকটি স্তর আছে। এর এক স্তরে আছে যুক্তি, এক স্তরে আছে অলংকার, আবার আরেক স্তরে আছে অর্থ। এই তিন স্তরের মধ্যে সবসময় একটি দ্বিরালাপ বা ডায়ালগ চলে। এই ডায়ালগের মধ্য দিয়ে অনবরত অর্থের নির্মাণ হতে থাকে। এই নির্মাণপ্রক্রিয়া চলমান; কখনও থামে না। যে কারণে আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের রামায়ণ, মহাভারত আজও আমাদের এ সময়ের পাঠকের কাছে সমান উপভোগ্য। এ কথা পৃথিবীর সব ক্লাসিক গ্রন্থের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প দশ শতাব্দীতে কৃত্তিবাস ওঝা রামায়ণ- এর যে অনুবাদ হাজির করেছেন, তা কিন্তু বাল্মীকির রামায়ণ অপেক্ষা অনেকাংশে ভিন্ন। কৃত্তিবাসী রামায়ণের রাম যতটা ক্ষৈত্রীয়, তার চাইতে অনেক বেশি বাঙ্গালী। এই যে চরিত্রের প্যারাডাইম শিফট, তা কিন্তু সেই সময়ে দরকার ছিল। যখন শাসক ও শাসিতের মধ্যে নানান অভিঘাতে দূরত্ব বেড়ে চলেছে, সমাজ শ্রেণিবৈষম্যে খণ্ডিত হচ্ছে, তখন তার খানিকটা হলেও সূরাহা করতে ক্ষৈত্রীয় নয়, বরং বাঙ্গালীর চিরাচরিত আবেগসিক্ত রামের প্রয়োজন ছিল। আবার এই রাম দূর্গাপূজাও করে যেটি বাল্মীকির রামায়ণে নেই। কাজেই, অনুবাদককে ভাষা জানার পাশাপাশি সময়ের নাড়ি টিপে দেখার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। তিনি প্রয়োজনে ট্রান্সক্রিয়েশনও করবেন। তবে সেটিকে আবার মূলানূগও হতে হবে। মূল থেকে যে একটু-আধটু সরবেন না, তা নয়। তবে কতটুকু সরবেন, তা অনুবাদককে ঠিক করতে হবে। এ কাজ কঠিন বলেই তো অনুবাদকর্মকে দক্ষতার বিষয় হিসেবে অভিহিত করা হয়। এটি কোন সহজাত গুণ নয়। অনুবাদক যখন উভয় ভাষার নানান স্তর স্বতস্ফুর্তভাবে জানবেন, মানবেন এবং এগুলোর মধ্যে নেগোশিয়েট বা কো-অরডিনেট করতে পারবেন, তখন তাঁর পক্ষে নির্ভরযোগ্য অনুবাদ করা সম্ভব হবে।
শুধু শব্দ থেকে শব্দের অনুবাদ উৎসগ্রন্থের বিষয়ে পাঠককে ভুল ধারণা দিতে পারে। আবার শুধু সেন্স টু সেন্স অনুবাদও উদ্দিষ্টগ্রন্থকে উৎসগ্রন্থ থেকে আলাদা করে দিতে পারে। এই দুটি দিকের মধ্যে সিন্থেসিস বা সমণ¦য়ের জন্য অনুবাদককে নৃতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ ও নৃতাত্ত্বিকের ভূমিকাও গ্রহণ করতে হতে পারে। এটি একটি শ্রমসাধ্য কাজ। তবে শ্রমসাধ্য কাজ যে টেকসই হয়, তা তো সবারই জানা।
গল্পপাঠ: মৌলিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে অনুবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম, এই বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
এলহাম হোসেন: দেখুন, অনুবাদ একই সঙ্গে একটি প্রক্রিয়া ও সৃষ্টি। সাহিত্যের বয়স যত অনুবাদেরও বয়স ততো। গ্রীক পুরাণে অনুবাদ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দেবতা রয়েছে। তার নাম হার্মিস। অন্যসব দেবদেবীর মধ্যে সে সবচেয়ে বুদ্ধিমান। তার কাজ সব দেবদেবীর কাছে সংবাদ বয়ে নিয়ে যাওয়া। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, আনাতোলিয়া ও মিশরেও অনুবাদকদের বেশ কদর ছিল। পৃথিবীতে সাত হাজারের মতো ভাষা আছে। সব ভাষারই প্রতœসম্পদ রয়েছে। পৃথিবীর সব মানুষের এই প্রত্মসম্পদে উত্তরাধিকার রয়েছে। কিন্তু এটি আমার, আপনার কাছে পৌঁছবে কীভাবে? নিশ্চয় অনুবাদের কাঁধে ভর দিয়ে। একটু হোঁয়ালি করে বললে বলতে হয়, অনুবাদ নিজেই একটি ভাষা। তাই মৌলিক সাহিত্যচর্চা এবং অনুবাদের মধ্যে আমি তেমন কোন বিরোধ দেখি না।
গল্পপাঠ: বিদেশি সাহিত্য বাংলা ভাষায় যতটা অনূদিত হচ্ছে, বাংলা সাহিত্য ইংরেজিতে সেমাত্রায় অনূদিত হচ্ছে না। এক্ষেত্রে দক্ষ অনুবাদকের অভাব ছাড়া আর কী কী কারণ আছে বলে মনে হয়?
এলহাম হোসেন: এর অন্যতম কারণ অবশ্যই ভালো অনুবাদকের অভাব। কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয়। আমার মনে হয়- এর প্রধানতম কারণ হলো বাজার। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের অনেকখানিই প্রফেশনালিজমের জায়গায় এখনও পৌঁছে নি। এখানে ইংরেজি পাঠকের সংখ্যাও অপেক্ষাকৃত কম। যেহেতু অনুবাদককে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্ভর করতে হয় প্রকাশকের ওপর, আর প্রকাশক যিনি একটি বই প্রকাশে অথলগ্নি করেন, তাঁর স্বাভাবিক ভাবেই উদ্দেশ্য থাকে মুনাফাসহ তাঁর মূলধন বাজার থেকে তুলে আনা। কিন্তু ইংরেজি পাঠকের কাছে বই বিক্রি করে তা করা প্রায় অসম্ভব, কারণ বাজার তো ছোট (আমি কিন্তু এখানে বাজার বলতে ভোক্তা, কনজ্যুমার বা বইয়ের ক্রেতা ও পাঠককে বুঝাচ্ছি)। ফলে, দেখা যায়, যে বিদেশি ভাষার বই আজকে নোবেল বা বুকার পুরস্কার পায়, তা আগামীকালকেই অনুদিত হয়ে বাজারে চলে আসে। বেস্টসেলার বইগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা। কারণ এর কাটতি মোটামুটি ভালো, লগ্নিকৃত অর্থ উঠে আসে। প্রকাশক, অনুবাদক- উভয় পক্ষই কিছু পয়সা পান।
কিন্তু বাংলা ভাষার বই ইংরেজিতে অনুবাদ করলে আমাদের লোকাল মার্কেটের বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা বেশ দুঃসাধ্য। একটা কথা শুনলে অনেকে রাগ করতে পারেন। তারপরেও বলি- আমাদের ইংরেজি, বিশেষ করে, আমাদের সাহিত্যের ইংরেজি ইউরোপ-আমেরিকায় চালানো কঠিন। আমাদের দেশের অনেক তাঁবড় সব ইংরেজি-জানা অনুবাদক, হয়তো সবাই নয়, বিশ্বখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশক পান না। এ কথা অস্বীকার করার তো কোন উপায় নেই।
আবার আমাদের বাংলা ভাষার গ্রন্থ ইংরেজিতে অনুবাদ করার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বেশ কম। যেটুকু আছে সেটুকু বগলদাবা করার জন্য যে দৌড় আছে, সেই দৌড়ে আবার সবার ভাগ্যের শিকে ছেঁড়ে না। অনেকে আত্মমর্যাদা নিয়ে এই দৌড় থেকে দূরে থাকেন। কেউ কেউ কিছুদূর দৌড়ে হাঁসফাঁস করতে করতে থেমে যান, আর এগোন না। এগোতে পারেন না। এগোনোর প্রণোদনাও পান না।
তারপরেও বলব, যেহেতু আমাদের স্থানীয় ভাবে ইংরেজি পাঠকের সংখ্যা কম, তাই এক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো এবং সঠিক ও যোগ্য ব্যক্তিকে অনুবাদের কাজে লাগানো উচিৎ। গ্লোবাল পাবলিকেশনের ব্যাপারেও বাংলা একাডেমিসহ অন্যসব সংশ্লিষ্ট সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা ও মেনেজারিয়েল দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে আসা উচিৎ।
গল্পপাঠ: সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর প তন্ত্র বইয়ের অনুবাদ সাহিত্যপর্বের একটি জায়গায় বলেছিলেন, ইংরেজি সাহিত্য বহু ভাষা থেকে বহু বস্তু অনুবাদ করে কীভাবে পরিপুষ্ট হয়েছে, নব নব অনুপ্রেরণা পেয়েছে, নব নব অভিযানে বেরিয়েছে সেই আদিম শুভক্ষণ থেকে। যদি বলি, একই প্রক্রিয়ায় বাংলা সাহিত্যেরও উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে- এমন ভাবনার সঙ্গে আপনি কতটা একমত?
এলহাম হোসেন: সৈয়দ মুজতবা আলীর এই উক্তির সঙ্গে দ্বিমত করার কোন প্রশ্নই আসে না। আন্তগ্রন্থিকতা বা ইন্টারটেক্সটুয়ালিটি ছাড়া পারস্পরিক সমৃদ্ধি আসে না। ইংরেজি ভাষার আজকের যে মহা ঐশ্বর্য্য, তা তো এর অত্যন্ত একোমোডেটিভ ও নমনীয় হওয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে। ইংরেজি ভাষার এনাটোমি করলে আপনি জার্মান, ল্যাটিন, গ্রীক, সংস্কৃত, নর্মান ইত্যাদি ভাষার প্রচুর শব্দ পাবেন। এরা ঔপনিশেক হিসেবে পৃথিবীর যে প্রান্তেই গেছে সেখানকার ভাষা শিখেছে এবং এদের ভাষাও চাপিয়েছে ও শিখিয়েছে স্থানীয়দের। স্থানীয়দের গ্রন্থ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে। মিশনারী স্কুল চালানোর জন্য নিজেদের গ্রন্থ, বাইবেল স্থানীয়দের ভাষায় অনুবাদ করেছে। এটি ইংরেজরা তাদের সবগুলো উপনিবেশেই করেছে। যার ফলে, ইংরেজি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা।
আবার ইংরেজি সাহিত্যের ব্যাপারটি দেখুন। শেক্সপীয়র তাঁর সময়ে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত ইটালিয়ান বা গ্রীক ভাষার সাহিত্য থেকে প্রচুর উপকরণ নিয়ে অমর সব নাটক রচনা করেছেন। রোমান্টিক কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ মাত্র ছয় বা সাত বছর বয়সে আলিফ লায়লার ইংরেজি অনুবাদ পরেছিলেন। এই পঠনের কোন প্রতিফলন তাঁন লেখায় ঘটে নি, এ কথা বলা যাবে না। ১৯৬০ এর দশকে আফ্রিকার লোকজ মহাকাব্য সান্দিয়াতার অনুবাদ ফরাসিরাও করেছে, ইংরেজরাও করেছে। পড়েছেও। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ইংরেজি অনুবাদে ইয়েট্স, এলিয়টসহ ইংরেজরা পড়েছে। প্রাচ্যের মরমীবাদের সঙ্গে প্রতীচ্যের অতিন্দ্রীয়বাদের সম্মীলন ঘটিয়েছে। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিরাও ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে ১৯২০ ও ১৯৩০ এর দশকে বাংলা কাব্যে আধুনিকতাবাদের প্লাবন বইয়ে দেন। রবীন্দ্রনাথও এই প্লাবন থেকে গা বাঁচাতে পারেননি। হয়ত চান নি। তাঁর ‘বাঁশি’ কবিতায় এলিয়টের লিবিডোতাড়িত প্রæফ্রকের নির্লিপ্তার প্রতিফলন দেখা যায়। যাই হোক, এভাবে নেওয়া- দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভাষা ও সাহিত্যের ঐশ্বর্য বৃদ্ধি পায়। অনুবাদ এ প্রক্রিয়ায় একটি চাবী ভূমিকা পালন করতে পারে।
গল্পপাঠ: অনুবাদকর্মের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ফার্সী ভাষায় অনূদিত উপনিষদ পরবর্তীতে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছিল যা ইউরোপীয় মননশীলতায় গভীর প্রভাব রেখেছিল। প্রায় শুনতে হয় অনুবাদ সাহিত্য ঠিক সাহিত্য নয়, বা এর তেমন পাঠক নেই ইত্যাদি। প্রশ্ন হচ্ছে, অনূদিত বিদেশি সাহিত্য সার্বিকভাবে বাঙ্গালী লেখক/পাঠকের মননশীল জগতে টোকা দিতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে? এর জন্য শুধুমাত্র মানসম্পন্ন অনুবাদ না হওয়াটাই কি দায়ী? এমন অভিযোগকে কতটা যৌক্তিক ভাবেন?
এলহাম হোসেন: সম্রাট আকবরের সময় অনেক সংস্কৃত ভাষার শাস্ত্রগ্রন্থ ফার্সি ভাষায় অনূদিত হয়। আকবর মাদ্রাসায় আরবী, ফার্সি ভাষার পাশাপাশি সংস্কৃত ভাষার গ্রন্থও কারিকুলামভূক্ত করেন। এ সময় রামায়ণ, মহাভারত, ভগবত গীতা ও পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা রচিত পঞ্চতন্ত্র ফার্সি ভাষায় অনূদিত হয়। হাজি ইব্রাহীম সারহিন্দি অথর্ববেদ অনুবাদ করেন ফার্সি ভাষায়। সমন্বয়বাদী মনোভঙ্গি থেকেই আকবর এই আন্তঃগ্রন্থিকতার কাজগুলো করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং এ ধরনের কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। উইলিয়াম জোন্স, ফিটজেরাল্ড ফার্সি ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন।
একথা অনস্বীকার্য, অনুবাদ মানসম্পন্ন হলে তা দর্শকহৃদয়ে ঠিকই আলোড়ন সৃষ্টি করবে। ফিটজেরাল্ডের অনুবাদ রুবাইয়াতে উমর খৈয়াম রবার্ট ব্রাউনিংকে টেনেছিল বলেই তিনি ‘রেবাই বেন এজরা’ কবিতা লিখেছিলেন। আপনি কাজী নজরুলের রুবাইয়াতে উমর খৈয়াম পড়লে নিশ্চয় মূলের স্বাদ ও ঘ্রাণ পাবেন। খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, আব্দুস সেলিমসহ কারো কারো অনুবাদ পড়লেও আপনার তেমন অনুভূতি হবে। এছাড়া আলম খোরশেদ, কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, জি. এইচ. হাবিব, রাজু আলাউদ্দিন, মাসরুর আরেফিন, শামিম মণ্ডল, আনিসুজ জামান, মোজাফফর হোসেন প্রমুখ অনুবাদে ভালো ভালো কাজ করেছেন এবং করে চলেছেন। ফকরুল আলম বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদে বেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া আরো অনেকেই আছেন, যাঁদের সবার নাম এই মুহূর্তে মনে আসছে না, তারাও বাংলাদেশে অনুবাদ সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন। তবে একটা কথা অবশ্যই স্মার্তব্য যে, ভালো অনুবাদ অবশ্যই পাঠকের তানে টোকা দেবেই।
কিন্তু এ কথা আমি আগেও বলেছি যে, সমস্যা হলো অনুবাদের কমার্শিয়ালাইজেশন বা বাণিজ্যিকিকরণ। প্রকাশকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে যেসব অনুবাদ করা হয়, সেগুলো তো আমাদের মননে ও মনে আবেদন তৈরি করতে ব্যর্থ হবেই। অনুবাদকের পারিশ্রমিকের বিষয়টিও আমাদের দেশে বেশ হতাশাব্যঞ্জক। পাঠকের রুচি ও চাহিদা পাল্টাচ্ছে। জেনারেশন এক্স ও জেনারেশন জেন এর আগ্রহ বেশি বেস্টসেলার বইয়ে। স্বভাবতই বাজারের চাহিদার কথা বিবেচনায় বর্তমানে বিশ্বসাহিত্যের ক্লাসিকের চাইতে মোটিভেশনাল বই বা বেস্টসেলারের অনুবাদে অনুবাদকদের অপেক্ষাকৃত বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
মনে রাখবেন, আমাদের যে দক্ষ অনুবাদক নেই, তা কিন্তু নয়। একটু আগে যাঁদের নাম উল্লেখ করলাম, তাঁরা সহ আরোও অনেকেই তো খুব ভালো অনুবাদ করছেন। তবে সময়ের স্রোতে টিকে থাকার মতো অনুবাদকের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম। যাঁরা ভালো তাঁদের বেশিরভাগই সপ্রণোদিত হয়ে অনুবাদ করছেন। ফিকশন, ছোটগল্প, বেছে বেছে স্টিফেন হকিং, ডেল কার্নেগী বা নোয়া হারিরির বই বা বেস্টসেলারগুলোর যতটা অনুবাদ হচ্ছে, নাটক, মহাকাব্য, দর্শন, ইতিহাস, তত্ত্ব, নৃতত্তত্ত্ব এবং আরো অন্যান্য জান্রার ততটা অনুবাদ হচ্ছে না। কাজেই, অনুবাদ-জগতের শরীরটা সমসত্ব নয়। বেশ অসম। পাঠকের আগ্রহ তৈরির জন্য তার সামনে একটি সমসত্ব জগত হাজির করতে হবে। তা না হলে পাঠক একটা এবড়ো থেবড়ো অসম্পূর্ণ বন্ধুর পথের যাত্রী কেন হবেন? হলেও তিনি কতক্ষণ তাঁর আগ্রহ ধরে রাখতে পারবেন?
গল্পপাঠ: মানসম্মত অনুবাদ করতে হলে কোন কোন বিষয়ের ওপর একজন অনুবাদকের গুরুত্ব দেওয়া দরকার বলে মনে করেন?
এলহাম হোসেন:এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে প্রথমে অনুবাদের মান বলতে কী বুঝায়; মানসম্পন্ন অনুবাদ কী- এসব বিষয় ভালো করে খোলাসা করা প্রয়োজন। অনুবাদ যদি সাবলীল ভাষায় হয়, পাঠকের কাছে বোধগম্য হয়, উৎসসংস্কৃতির নির্যাস ধারণ করতে পারে এবং সর্বোপরি উদ্দিষ্টগ্রন্থ যদি উৎসগ্রন্থের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে, তবেই সেটি মানসম্পন্ন অনুবাদ। ভিটামিন সি’র ঘাটতি পূরণের জন্য আপনার হাতের কাছে যদি কমলালেবু থাকে তাহলে আপনি সিভিট ট্যাবলেট কেন খাবেন? প্রতিটি গ্রন্থের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক লোকেশন রয়েছে। প্রতিটি গ্রন্থের নিজেকে সংজ্ঞায়িত করার নিজস্ব কিছু অনুষঙ্গ রয়েছে। আবার প্রতিটি ভাষার মধ্যে অনেক কথা লুকিয়ে থাকে। কথা আর ভাষা কিন্তু এক নয়। ভাষার একটি চিরন্তন ও সর্বজনীন রূপ রয়েছে, কিন্তু কথার স্থানিক চরিত্র আছে। পাঠের সময় কথার ঝনঝনানি শোনা যায়, কিন্তু এর নীচে দ্যোতকতার একটি অন্তঃস্রোত প্রবাহমান থাকে। সেটি শুনতে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কান পাততে হয়। এটিকে অবশ্য গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক ‘ইন্টিমেট এক্ট অব রিডিং’ বলে অভিহিত করেছেন তাঁর ‘দ্য পলিটিক্স অব ট্রানশ্লেসন’ প্রবন্ধে।
ভাষার রেটোরিসিটি বা আলঙ্কারিকতা আছে। আবার ভাষাই শেষ কথা নয়। প্রতিটি গ্রন্থ একটি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নৈতিক কাঠামোর অংশ। এই অনুষঙ্গগুলোর সঙ্গে অনুবাদককে অবশ্যই বোঝাপড়া তৈরি করতে হবে ঘনিষ্ট ভাবে। একে অবশ্য স্পিভাক অনুবাদকের আত্মসমর্পন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই যে আত্মসমর্পন, দ্বিরালাপ, উৎসগ্রন্থের ঘনিষ্ঠ পাঠ, ভাষা ও কথার পার্থক্য─ এসব সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণাই অনুবাদককে মানসম্পন্ন অনুবাদ করতে সাহায্য করতে পারে।
গল্পপাঠ: উৎকৃষ্ট অনুবাদের ক্ষেত্রে উৎসটেক্সটের নিবিড়পাঠ, সময়, মনোযোগ ইত্যাদির পাশাপাশি মূলের প্রতি অনুবাদকের সৎ থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ- এ বিষয়ে কি আপনি একমত?
এলহাম হোসেন: অবশ্যই। অনুবাদ মূলানুগ হওয়াই বাঞ্চনীয়। তবে অনেকে মূলের প্রতি অতি বিশ্বস্ত থাকতে গিয়ে অনুবাদটিকে খটমটে, নিরস করে ফেলেন। কতটুকু মূলানুগ হবে আর কতটুকু মূল থেকে সরে আসা সম্ভব, তা ঠিক করা অনুবাদকের জন্য অতীব জরুরি একটি কাজ। এখন হয়তো জিজ্ঞেস করবেন, এ কাজ অনুবাদক কীভাবে করবেন? দেখুন, এর উত্তর আমি সরাসরি না দিয়ে শুধু একটি উদাহরণ দিই, তাহলে বুঝতে পারবেন। একবার একজন অনুবাদকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল অনুবাদের কলকব্জা নিয়ে। উনি অনুবাদ করেন। উভয় ভাষায়, অর্থাৎ বাংলা থেকে ইংরেজিতে এবং ইংরেজি থেকে বাংলায়। অনুবাদক হিসেবে তিনি একটি জায়গাও করে নিয়েছেন পাঠকমহলে। যাই হোক, কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম, উনি কী প্রক্রিয়ায় অনুবাদ করেন? অনুবাদ করার পূর্বে উৎসগ্রন্থটি এক বা একাধিক বার পড়ে নেন কি-না? উত্তরে বললেন, নাহ। উনি যখন পড়া শুরু করেন তখন একই সঙ্গে অনুবাদ করতেও শুরু করেন। দুই কাজ সমান্তরালে চলে। এ কথা শুনে আমি তাঁর অনুবাদ পড়ে আমার অনুভূতির সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করলাম। তাঁর অনুবাদ আমার কাছে কেমন জানি নিরস, খটমটে লাগে। দু’চারজন বিদগ্ধ পাঠকের কাছে তাঁদের পাঠানুভূতি জানতে চেয়ে একই রকম পাঠপ্রতিক্রিয়ার কথা জানতে পারি।
আমার মনে হয়, অনুবাদকর্ম শুরু করার পূর্বে উৎসগ্রন্থটি ভালোভাবে পড়ে নেওয়া দরকার। প্রত্যেক টেক্সটের কিন্তু কনটেক্সট রয়েছে। এই কনটেক্সটও একটি টেক্সট। একে কো-টেক্সট বলা হয়। নিউ হিস্টোরিসিস্ট ক্রিটিসিজম তাই বলে। আমি মনে করি, এই দু’য়ের সমান্তরাল পাঠ অনুবাদকের জন্য জরুরি। এছাড়া সম্ভব হলে মূল গ্রন্থের রচয়িতার সঙ্গে উৎসগ্রন্থটি নিয়ে নিয়মিত কথা বলেও উৎসগ্রন্থ ও উদ্দিষ্টগ্রন্থের মধ্যকার পার্থক্য কমানো যেতে পারে। এই শ্রমসাধ্য কাজের মধ্যেই অনুবাদকের সততা নিহীত রয়েছে।
গল্পপাঠ: বিদেশি এবং বাংলাভাষা সংস্কৃতির মধ্যে স্পষ্টতই ভিন্নতা রয়েছে। একজন অনুবাদক এই ভিন্নতা সম্পর্কে সচেতন থেকে ভাষার গ্রহণ ক্ষমতাকে বিস্তৃত করতে সক্ষম হন- এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।
এলহাম হোসেন: এ কথা আমি আমার একটি প্রবন্ধে লিখেছিলাম যে, অনুবাদ একটি আন্তঃসাংস্কৃতিক ক্রিয়া বা ইন্টারকালচারাল একশন। ভাষিক ও সাংস্কৃতিক যে অনুষঙ্গগুলো উৎসগ্রন্থ ও উদ্দেশ্যগ্রন্থের পাঠকদের মধ্যে ভেদরেখা টেনে দেয়, সেই অনুষঙ্গগুলোর সঙ্গে দ্বিরালাপ করে করে উভয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে কাছাকাছি আনাই অনুবাদকের কাজ। আর এ কথাও ঠিক যে, অনুবাদ একটি সৃজনশীল কাজ, শুধু ভাষা পরিবর্তন নয়। এই দ্বিরালাপের মধ্য দিয়ে উদ্দিষ্ট ভাষা বা বাংলা ভাষার এশ্বর্য্য বর্ধন হয়। আর ভাষা তো ভাবনা-ব্যবস্থারও ধারক। এক ভাষার গ্রন্থকে আরেক ভাষায় অনুবাদ করা কিন্তু এক ধরনের ডোমেস্টিকেশন বা আত্মীকরণও বটে। এটি একটি বিদেশী গ্রন্থের গায়ে চাপিয়ে দিতে পারে অনুবাদকের নিজের সংস্কৃতি ও মনোভঙ্গির চাদর। যার ফলে, অনূদিত গ্রন্থ হয়ে যায় রি-ক্রিয়েশন বা পুনঃসৃষ্টি। মিলান কুন্ডেরা বিদেশী গ্রন্থের ডোমেস্টিকেশন বা আত্মীকরণ প্রক্রিয়াকে সন্দেহের চোখে দেখেন। কোন বিদেশী গ্রন্থ যখন তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে অনূদিত হবে, তখন তাকে তার নিজস্ব অস্থিমজ্জা বজায় রাখতেই হবে। নইলে এর বক্তব্য হারিয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে কুন্ডেরা মনে করেন, অনুবাদের কাজ হলো ইন্টারপ্রিট বা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা। অর্থাৎ, অনুবাদক যে অনুবাদ হাজির করেন, তা আসলে উৎসগ্রন্থের বিশ্লেষণমাত্র। আর যেকেউ বা যেকোন সাহিত্য সমালোচক বা বোদ্ধা তাঁর নিজের মতো করে যেকোন গ্রন্থের বিচার-বিশ্লেষণ করতেই পারেন। সমালোচনা ভিন্ন হতে পারে। সমালোচক গ্রন্থের ব্যবচ্ছেদ করতেই পারেন। কিন্তু তাতে মূল গ্রন্থের বিকৃতি ঘটে না বা এটি এর স্বকীয়তা হারায় না। হারানো উচিৎ নয়। এই যে বললাম ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, রি-ক্রিয়েশন ইত্যাদি; এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভাষার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
গল্পপাঠ: অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল লেখায় লেখক তাঁর যে কৃষ্টি-সংস্কৃতি বা আচার-আচরণের প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন, অনুবাদক সেখান থেকে সরে গিয়ে নিজের মতো সেটা প্রকাশ করতে পারেন কি?
(উদাহরণ: একজন হিন্দু লেখক, যিনি তাঁর গল্পে সৌজন্যমূলক সম্বোধনে নমস্কার ব্যবহার করেছেন, একজন মুসলিম অনুবাদক সম্বোধনটিকে সালামে রূপান্তর ঘটাতে পারেন কি? ভাইসভার্সা)
এলহাম হোসেন: অনুবাদকের এখান থেকে সরে যাওয়ার পক্ষে আমি নই। এই সরে যাওয়ার পেছনে রাজনীতি থাকে। ঔপনিবেশিকরা এই রাজনীতি করেছে। সা¤্রাজ্যবাদীরা এখনও করছে। অনুবাদের নামে একটি টেক্সটকে অপরায়িত করেছে এবং করছে। এটি ঠিক নয়। আমার আইডিয়োলজি আমি আমার অনূদিত গ্রন্থের উপর চাপাতে পারি না। সেটি অন্যায়। এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক হেজেমনি বা আধিপত্যবাদী মনোভঙ্গি প্রকাশ পায়।
ভাষা কিন্তু একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তা, মনন, নন্দন, জ্ঞানব্যবস্থার আধার। ভাষা বদলে গেলে এই অনুষঙ্গগুলোর গায়ে অভিঘাত আছড়ে পড়ে। একজন হিন্দুর ‘নমস্কার’- এর মধ্যে তার সহ¯্র বছরের এতিহ্য, সামাজিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি, বিশ্বাস-ব্যবস্থার রসদ রয়েছে। এর সমার্থক তো অন্য ভাষার বা অন্য একটি ধর্মের শব্দ হতে পারে না, কারণ সেই ভাষা ও ধর্মের রিয়ালিটিজ বা বাস্তবতাগুলো আলাদা। একই ভাবে, মুসলমানের সালামের সমার্থক শব্দ ‘নমস্কার’ নয়। সৌজন্যমূলক সম্বোধন প্রকাশক শব্দগুলি একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় নির্ধারক অভিব্যক্তি। এগুলো বদলানো হলে আত্মপরিচয়ের জায়গাটাতে অভিঘাত তৈরি হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইংরেজি শব্দ ‘প্লিজ’ এর অর্থ বাংলায় ‘অনুগ্রহপূর্বক’ লিখলে অভিব্যক্তির শক্তি ও সৌন্দর্য্যরে হানি হয়। সে-ক্ষেত্রে ‘প্লিজ’ শব্দটি অপরিবর্তিত রাখাই ভালো। উৎসগ্রন্থের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার স্বার্থেই এই শব্দগুলোকে অপরিবর্তিত রাখা জরুরি। তবে এ কথাও ঠিক যে, ভাষাগুলোর মধ্যে একটি সিন্থেসিস বা সমন্বয়ের জায়গা আছে। সংকরায়নের স্পেস আছে। কিন্তু সে-কাজ অনুবাদককে করতে হবে বিশ্বস্ততার সঙ্গে, সততার সঙ্গে। এই বিশ্বস্ততার জায়গা কিন্তু নিবিড় পাঠে মগ্ন পাঠক অনুবাদ পড়ার সময় ধরতে পারেন।
এ কথা আগেও বলেছি, অনুবাদ অরাজনৈতিক নয়। একজন বিশ্বস্ত অনুবাদক এই রাজনীতি থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকবেন। তাঁকে সংকীর্ণতার বাধাছক ভাঙতে হবে। তা না হলে অনুবাদ বিশ্বস্ততা হারাতে বাধ্য।
গল্পপাঠ: উৎসভাষার টেক্সটের সময়কাল অনুবাদের উদ্দিষ্টভাষার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এলহাম হোসেন: অনুবাদ একই সঙ্গে একটি ভাষিক ও সাংস্কৃতিক ক্রিয়া। এটি মূলত অর্থের স্থানান্তর করে উৎসগ্রন্থ থেকে উদ্দেশ্যগ্রন্থের মধ্যে। যেহেতু পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থ বদলায়, তাই উৎগ্রন্থের হুবহু অনুবাদের ধারণা একটি মিথ ছাড়া আর কিছুই নয়। ভাষাবিদ সস্যুরের কথা আবারও বলতে হয়, ভাষা খামখেয়ালি। অর্থ শব্দের নিজস্ব কোন সম্পত্তি নয়। অর্থ বাইরে থেকে আসে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শব্দের ওপর চেপে বসে। অর্থ প্রেক্ষিতের সঙ্গে মিলিয়ে বদলে যায়। শব্দগুলো এক একটি মুখোশ এবং একই সঙ্গে মুখের মতো। মুখোশের ওপরের চেহারা এক রকম, আবার মুখোশ অপসারণ করলে আরেক রকমের চেহারা দৃশ্যমান হয়। অনুবাদও এমন এক শক্তিশালী কৌশল যা উৎসগ্রন্থের শুধু বহিরাঙ্গিক নয়, অভ্যন্তরীণ নির্যাসকেও প্রভাবিত করে। এটি ঘটে উৎসগ্রন্থের দুটি সময়কাঠামোকে একসঙ্গে ধারণ করার কারণে। এর একটি সমসাময়িক অবস্থান রয়েছে; একটি সর্বকালীন অবস্থান রয়েছে। অনুবাদক এই দুটি অবস্থানের মধ্যে সমণ¦য় ঘটান তাঁর উদ্দিষ্ট ভাষার মধ্যে। এ কাজ যতটা সফলভাবে করা যায়, অনুবাদ ততই সফল হয়। কাজেই উৎসভাষার টেক্সটের সময়কালের যথাযথ অনুধাবন জরুরি।
গল্পপাঠ: অনুবাদ সাহিত্যের সার্বিক সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে সংক্ষেপে আপনার বক্তব্য বলুন।
এলহাম হোসেন: অনুবাদ সাহিত্যের সমস্যা আছে। কিন্তু এর সম্ভাবনাও বিস্তর। ভালো অনুবাদক তৈরির জন্য সরকারের তরফ থেকে দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ আছে বলে আমার জানা নেই। এক্ষেত্রে সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন- বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি নিয়মিতভাবে কর্মশালার আয়োজন করতে পারে। বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার অনূদিত গ্রন্থ নিয়মিত ভাবে ক্রয় করতে পারে। বিশ্বসাহিত্যের ক্লাসিক গ্রন্থগুলোর নিয়মিত অনুবাদে সরকার প্রণোদনা দিতে পারে। সর্বোপরি, অনুবাদকদের তাঁদের কাজের জন্য স্বীকৃতি দিতে হবে।
আসলে, অনুবাদ ছাড়া তো বিশ্বকে জানাবোঝা সম্ভব নয়। ভুবনায়নের যুগে আমরা তো সবাই বিশ্বনাগরিক হতে চাই। তাই তো বিশ্বকে জানতে হবে। এই জানার মাধ্যম হলো অনুবাদ। জন্মগত ভাবেই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো অন্যকে জানার কৌতুহল। আর এই কৌতুহল মেটানোর জন্য আমাদের বার বার অনুবাদের কাছে যেতেই হবে। অনুবাদ বিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া ঘটায়। মিথষ্ক্রিয়া ছাড়া পারস্পরিক উন্নতি সম্ভব নয়। আমরা যদি আমাদের দেশ ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে হাজির করতে চাই, তবে অনুবাদের আশ্রয় নিতেই হবে। বাংলা সাহিত্যে বিশ্বমানের অনেক গ্রন্থ রয়েছে যেগুলোর অনুবাদ এখনও হয়নি। কাজেই এই ক্ষেত্রে অনুবাদকদের কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। আবার প্রতিনিয়ত বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় যেসব নতুন নতুন সৃষ্টিকর্ম যুক্ত হচ্ছে সেগুলোর অনুবাদ জরুরি নিজেদের জানা-বোঝার পরিধি বাড়ানোর জন্য, আন্তঃগ্রন্থিকতার জন্য। যেখানে দুটি ভিন্ন ধারণা এসে মেশে সেখানে নতুন একটি ধারণার সৃষ্টি হয়। নতুন নতুন জ্ঞান উৎপাদন ছাড়া শুধু জ্ঞানের খদ্দেরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পশ্চিমমুখীতা নিশ্চয় কারোও কাম্য নয়। কাজেই আমি মনে করি, অনুবাদে আমাদের অবারিত সম্ভাবনা রয়েছে। এই ক্ষেত্রে অনেক কাজ করার আছে।
গল্পপাঠ: অনুবাদ সাহিত্যের ভবিষ্যত নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
এলহাম হোসেন: অনেক আশাবাদী। অনুবাদ ছাড়া আমরা চলতে পারব না। আমাদের কৈশোরে আমরা সেবা প্রকাশনীর অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। আমার মনে আছে, হাই স্কুলে পড়ার সময় আমি সেবা প্রকাশনী থেকে ছাপা হওয়া বাংলায় উয়োদারিং হাইট্স পড়েছি। যদিও সেটি ছিল এব্রিজ্ড বা সংক্ষেপিত, তবুও ঐ অনুবাদের মধ্য দিয়ে আমি এমিলি ব্রন্টির উয়োদারিং হাইট্স-এর স্বাদ পাই। পরবর্তীতে যখন ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করি, তখন এই উপন্যাস ইংরেজিতে পড়ি। পড়ার সময় মনে হয়েছে, আরে, আমি তো এই চরিত্রগুলোর নাম আগে থেকেই জানি। গল্পটাও জানি। সে-সময় আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। অরব্য রজনীও আমি হাই স্কুলে পড়ার সময় বাংলা অনুবাদে পড়ি। আরব পণ্ডিত আব্দুল্লাহ ইবনে আল কুবায়েব আসমায়ী এই বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন আরবী ভাষায় ৭৫০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝখানের কোন এক সময়। আমি তো এই গ্রন্থের মূল ভাষা বুঝি না। কিন্তু এর বাংলা অনুবাদ আমাকে আরবী রোমান্টিক সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাস পড়েছি বাংলা অনুবাদে আমার কৈশোরে। আমরা এরিস্টোটল, প্লেটো, সক্রেটিস এবং তাঁদের দর্শনের যেটুকু জানি তার সবটুকুই সম্ভব হয়েছে অনুবাদের কাঁধে ভর দিয়ে। আমাদের দেশে হারুকি মুরাকামি ও গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখালেখির যেটুকুর সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে, তার সবটুকুই হয়েছে অনুবাদের মাধ্যমে। পৃথিবীতে অনেক ভাষা আছে। এর মধ্যে শুধু আফ্রিকাতেই রয়েছে দুই হাজারেরও বেশি ভাষা। ভারতে রয়েছে একশ’রও বেশি ভাষা। এগুলোর সবগুলো আমরা জানি না। কিন্তু তাই বলে কি আমরা আফ্রিকা, জাপান, ভারত, ল্যাটিন আমেরিকাকে জানব না? অবশ্যই জানব। আর এই জানার-বোঝার প্রবেশদ্বার হলো অনুবাদ। অন্যকে জানা-বোঝার আকাক্সক্ষা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীতে মানুষ যতদিন থাকবে ততদিন মানুষের অন্যকে জানার ইচ্ছাও থাকবে। ততদিন অনুবাদও থাকবে। তাই আমি মনে করি, শুধু বাংলাদেশ কেন, সারা বিশ্বেই অনুবাদের আবেদন সবসময় থাকবে। অনুবাদকে খাটো করে দেখার কোন যৌক্তিকতা নেই।
[উত্তরদাতার বানানরীতি অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে]

0 মন্তব্যসমূহ