ফরাসী কথাসাহিত্যিক এ্যান সেখ্‌-এর গল্প : সেই গ্রীষ্মে



মূল ফরাসী থেকে ইংরেজি অনুবাদ : Mark Hutchinson
ইংরেজি থেকে ভাষান্তর : সুতপা বড়ুয়া

আমাদের ধৈর্য্যের সীমা পেরিয়ে গিয়েছিল। এক মানসিক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেকটায় ছুটে বেড়ানো অসম্ভব ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছিল। আমাদের বাবা ছিলেন সুইৎজারল্যান্ডের একটা নামী স্বাস্থ্যনিবাসে। প্রত্যেক মাসে তাঁর নিজেকে আলফ্রেড দে মুসে ভাবা, আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলা যেন আমি জর্জ স্যান্ড, এছাড়া সম্পূর্ণ কাল্পনিক ঘটনাবলী নিয়ে স্মৃতিচারণ করা, তাও আবার এমন ফূর্তি আর অসূয়ার সঙ্গে যে ব্যাপারটায় যথেষ্ট আকর্ষণ থাকলেও প্রেক্ষিত বিবেচনায় অবান্তর তো বটেই –আমার উপর সাংঘাতিক চাপও তৈরী করতো। ব্যাপারটা হয়তো আরো বড় বোঝা হয়ে উঠেছিল এজন্য যে ভেতরে ভেতরে আমি তাঁর এমনতরো আচরণের মোহে জড়িয়ে গিয়েছিলাম, এবং যে ছোট্ট ট্রেন চেপে আমি বার্গেন গ্রামে যেতাম, তার প্রেক্ষাপটে ছিল বিস্তীর্ণ পাহাড়ি তৃণভূমি , বসন্ত কালেও সেই পাহাড়ের চূড়োয় বরফের মুকুট পরা থাকতো। প্রতি মাসেই আমি এই সফর করতাম , কতদিন পর পর যাব,তা আমি নিজেই ঠিক করতাম, খুব ঘনঘন নয়, আবার দীর্ঘ বিরতিও নয়, এবং প্রতিবারই বাবার সংগে কাটানোর সেই ভয়ঙ্কর আনন্দের অনুভূতিটি আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখতো । হয়তোবা এবার বাবা কিছুটা ভালো থাকবেন, আমি কি তার কথার মাথামুন্ডু বুঝতে পারবো? কোনো কোনো দিন তেমনই হতো, কিন্তু সেই 'ভালো' বাবাকে আমার আসলে ভালো লাগতো কিনা, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। দুর্ভাগ্যবশত আমার পাগল বাবাই আমার বেশি পছন্দেরকে ।

ট্রেনে যাওয়ার পথে বাবার সেই বিভ্রমের জর্জ স্যান্ড বা অন্য কোন বইয়ের কাল্পনিক চরিত্রগুলির একজন হিসেবে নিজেকে তৈরী করতাম । বাবা যে আমাকে পুরোপুরি অন্য কেউ ভাবতেন তা নয়- তিনি জানতেন যে আমি তাঁরই মেয়ে, এবং আমার যাপিত জীবনও তাঁর জানা ছিল। কখনো-সখনো তিনি আমার খবর নিতেন, আমার কাজের বা বন্ধুদের ব্যাপারে জানতে চাইতেন, কিন্তু হঠাৎ করেই যেন আলাপের প্রেক্ষিত পালটে যেতো। উনি যদি ফুর্তিতে থাকতেন, প্রায়শ তিনি তেমনই থাকতেন , ওঁর কল্পনা তখন উপচে পড়ত, ঠিক যেমনটি লেখকদের হয়। সেটা ছিল তার জন্য তেমনই একটা গোপন আনন্দ, যার মধ্যে খানিক কামদ ব্যাপার ছিল, যা তাঁকে তাঁর পড়া সেইসব বইগুলোর কথা মনে পড়াতো , যে বইগুলো তিনি ভালোবাসতেন, যে বইগুলো তাঁর কাছে অর্থবহ ছিল। এই সময়টিতে আমাদের কথোপথনে নিজেদের জীবনের জায়গায় তাঁর পড়া বইগুলোর ঘটনাবলীর নানান ছবি কিংবা স্মৃতির আচ্ছাদন পড়তো । এই আচ্ছাদন পড়ার মুহূর্তটি বড়ই নাজুক ছিল। এবং এই মুহূর্তটার জন্যেই যেন আমি অপেক্ষা করতাম এবং এজন্যেই হয়তো এই বিভ্রান্ত বাবাকে আমি এত ভালবাসতাম। তবে মাঝেমধ্যে সেই সময়টিতে আমি বিষণ্ণ বা উদ্বিগ্ন থাকলে নির্দয়ভাবে সেই আবরণ খসিয়ে দেবার চেষ্টা করতাম। আমার এমন ব্যবহারে তখন উনি যে খুব বিপর্যস্ত হতেন, তা নয়, বরং বলা যায় চমকে উঠতেন। ঘাড় কাত করে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকাতেন, যেন কোনো আওয়াজ শুনেছেন যার উৎস বা কিসের আওয়াজ, তা বোঝার চেষ্টা করছেন। ওঁকে তখন বাস্তব জগতে ফিরিয়ে আনতেও আমাকে নির্দয় হতে হতো , এবং ব্যাপারটা আমার নিজের কাছেও কুরুচিকর মনে হত।

যদি আমি তাঁর এই খেলায় সামিল হতে রাজি হতাম, অর্থাৎ তাঁর উচ্ছ্বসিত কথার স্রোতে বাঁধ না দিতাম, তাহলে আমিও সেই স্রোতের টানে বয়ে যেতাম , যা আমাকে দুইভাবে তাড়িত করত একদিকে আমার প্রকৃতজীবন, অন্যদিকে বিভ্রম যেটি আমার জন্য বিপজ্জনকও বটে!

বাবা সামাজিকতা করতে খুবই পছন্দ করতেন, আর স্বাস্থ্যনিবাসের ওই সীমিত গণ্ডির ভেতরেও অন্যান্য রোগীদের সঙ্গে দেখা হলে, তাদেরকে যথেষ্ট সৌজন্যের সঙ্গে উষ্ণ অভিবাদন জানাতেন। এসব দেখে আপনার এমনটা মনে হতেই পারতো যে উনি কোনো গ্রামের বাড়িতে প্রিয়জনদের সঙ্গে ছুটি কাটাচ্ছেন। বাবা আমার সঙ্গে যা করতে সবচে' বেশি পছন্দ করতেন, তা ছিল শিল্পকলা নিয়ে আলোচনা।যদি আমরা কোনো ছবি, বা স্থাপত্য, অথবা কোনো শহরের সৌন্দর্য্য নিয়ে আলাপ করতাম, তখন তাঁর জানার পরিধি আমাকে অবাক করত, কেননা বাবা প্রচুর পড়াশুনো করলেও সেভাবে ঘোরাঘুরি করেননি, এবং তিনি থেকেছেন বেশিরভাগই বিভাগীয় শহরে। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ --তিনি এমনকি কৈশোরে যে সব বই পড়েছেন, এবং যৌবনে যেসব অভিনয় দেখে অভিভূত হয়েছেন, সেইসব এতটাই স্পষ্ট মনে করতে পারতেন, যেন গতকালের ঘটনা। তাঁর কাছে 'সময়’ কোন অর্থ তৈরি করতো না। গ্রীক প্রেমের দেবতা 'ইরোস' এবং তার যন্ত্রনাই ছিল তাঁর মূল বিষয়।

আবার যখন আমি কম্ব্ল্যোতে আমার ছোট বোনের কাছে যেতাম, সেই আবহটা হয়ে উঠতো সম্পূর্ণ অন্যরকম। ইনেস আমাদের বাবার মত হাসিখুশি ছিল না বরং সে ছিল খুব একাগ্র, প্রবল এবং অবিশ্বাস্য রকমের সতর্ক। অবশ্য আমার ধারণা , বোনের অনেক ব্যাপারেই আমি ভুল ছিলাম এবং তাকে আমি আসলে কখনোই পুরোপুরি বুঝিনি। তার ভিতরে কিছু একটা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল, এবং তা বিস্ফোরিতও হয়েছিল। সে কখনোই তার মানসিক হাসপাতালকে অবকাশকেন্দ্র মনে করেনি, বরং কারো পক্ষে যতটা ঘটনায় উপস্থিত থাকা সম্ভব বা উচিত, সে সেখানে তার চেয়েও বেশি উপস্থিত ছিল, আর আমি নিজেকে যে দায়িত্বটা দিয়েছিলাম, তা হলো তার সেই উপস্থিতিকে কিছুটা স্বাভাবিক করা; তুচ্ছ না করে খানিকটা সহনীয় করা। আমরা অনেক কথা বলতাম, আর সেগুলো একেবারেই বাবার সঙ্গে আমার কথোপকথনের মতো নয় কারণ আমাদের কথার পেছনে সবসময় এমন একটা অন্তর্লেখ ছিল, যা আমরা কেউই ঠিকঠাক পড়তে পারতাম না, যদিও পড়ে বোঝার সবিশেষ চেষ্টা আমরা দুজনেই করে যেতাম।

আমার জীবনটা সেই সময় ছিল কেবল বার্গেন থেকে কম্ব্ল্যো আর কম্ব্ল্যো থেকে বার্গেন আর মাঝেমধ্যে প্যারিসে শ্বাস নেওয়ার জন্য খানিক বিরতি, কিন্তু প্যারিসে কিছুক্ষণ কাটানোর পরই আমার ভীষণভাবে বার্গেন বা কম্ব্ল্যোতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করত।

আমার আরেক বোন যে শহরে থাকত, সেখান থেকে সেও ঠিক একইভাবে যাওয়া আসা করত। আমি কখনো তার শহরে যেতাম না আর সেও কখনো প্যারিসে আসতো না, কিন্তু সেই গ্রীষ্মে, জুন মাসের শেষের দিকে, আমরা প্রথমবারের মত সিদ্ধান্ত নিলাম যে দুজনে একই সঙ্গে কয়েকমাস বিশ্রাম নেব। আমরা বার্গেনেও যাব না, কম্ব্ল্যোতেও যাব না, বরং আমরা ক্যাপ্রিতে যাব। সেখানে আমরা বেশ কিছুদিন ছিলাম, কারণ আমার বোন সেখানে একটা ছোটখাট কাজ পেয়েছিল, আর আমিও একটা ছাত্রবৃত্তি জোগাড় করেছিলাম। ঠিক এমন সময় বার্গেন এবং কম্ব্ল্যো থেকে উদ্বেগজনক দুঃসংবাদটি পেয়েছিলাম, বাবা এবং বোন দুজনেই গুরুতর অসুস্থ। আমাদের কি তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়া উচিত ছিল? আমরা অবশ্যই যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেটা আর সম্ভব ছিল না কারণ আমরা বুভুক্ষু ক্যাপ্রির দেয়ালের ভেতরে আটকা পড়ে গেছিলাম।

বাবা যখন এই বিভ্রান্তিকর, নির্মম পৃথিবী থেকে চিরদিনের মত বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন তাঁর বিছানার পাশে থেকে শেষ বারের মত জর্জ স্যান্ড না-হতে পারার বেদনা, আর কম্ব্ল্যোকে নিয়ে এই বিরাট দুঃখজনক ঘটনা ছাড়া অন্য কোনো স্মৃতি না থাকা আমাকে সবসময় কষ্ট দেয়। সেদিন আমার অন্য বোনটিকে বলছিলাম, ভেবে দেখলে আমাদের জীবনটা এখন ভীষণ রকমের একঘেঁয়ে। বোন তখন আমাদের পারিবারিক বাড়ির রান্নাঘরের টেবিলে বসে মটরশুঁটির খোসা ছাড়াচ্ছিল,আমার কথার উত্তরে সে কিছুই বলল না, এমনকি মুখ তুলেও তাকালো না।


লেখক পরিচিতি
লেখক এ্যান সেয়া ১৯৬০ সালে জন্ম গ্রহণ করেন দক্ষিণ ফ্রান্সের বরদ্যোঁ শহরে। ১৯৯২ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস Les Gouvernantes প্রকাশিত হয়। ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন মার্ক হাচিনসন।
এ্যান সেয়া বড় করে লেখেন না। কিন্তু খুব তীক্ষ্ণ তার স্বর। 



অনুবাদক পরিচিতি
সুতপা বড়ুয়া
অনুবাদক,
লেখিকা
সিডনী, অস্ট্রেলিয়া

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ

  1. ভালো লাগল। সুতপাদির কলমে আরো অনেক মৌলিক বা অনুবাদ লেখা পড়ার আশায় রইলাম।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব গভীর অনুভূতিময়

    উত্তরমুছুন
  3. ঝরঝরে সুরেলা অনুবাদ। মনস্তাত্ত্বিক ওজনদার বিষয়গুলোও তুলোর মতো হালকা করে বিছিয়ে প্রকাশ করেছেন।

    উত্তরমুছুন